পাষাণময়ী
লেখকের জীবনে সুখ কম, স্বাচ্ছন্দ্য তো আরও কম। তবে আমার মতো ঝাড়া হাত-পা মানুষের একটা পেট; ছাত্র পড়িয়ে আর আমার দূরদর্শী বাবার ব্যাংকে জমানো আমানতের সুদে দিব্যি চলে যায়। বাবা বোধহয় বুঝেইছিলেন, তাঁর সুপুত্র খুব একটা করেকম্মে খেতে পারবে না। তবে আমার ঠাম্মা বলতেন “কাঞ্চন দাসের হাটে দাদুভাই না হয় আমার কলমদাসই হল, ক্ষতি কি?”
ঠাকুরদার বাবার, চুঁচুড়া চন্দননগরের মাঝামাঝি অখ্যাত ভৈরবপুরে বানানো গঙ্গা ঘেঁষা এই শরিকি বাড়ির ছাদটা আছে মাথার ওপর, আর কীই-বা চাই একটা জীবন বাঁচতে! একশো বছর আগে ভৈরবপুরের যেটুকু জেল্লা ছিল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গাগর্ভের মতো তাতেও পলি জমেছে। মানুষজন জীবন- জীবিকার টানে ক্রমে শহরমুখী হওয়ার ফলে ভৈরবপুর অতীতের সম্পন্ন জনপদের কঙ্কাল আর আমার মতো কিছু “করে কম্মে না খেতে পাওয়া” অতীত আঁকড়ে থাকা জ্যান্ত প্রেতদের সম্বল করে টিকে আছে।
লেখাটা অনেকটা আমার মনের খিদে। ওই যে পরিচিতির লোভ। মনে হয় যেদিন ফুরিয়ে যাব সেদিন এই লেখাগুলোই কোথাও না কোথাও থেকে গিয়ে আমাকে হারিয়ে যেতে দেবে না। কিন্তু ওই যে লেখকের জীবনে সুখ নেই বললাম। প্লট খুঁজতে আর জীবনের গল্প থেকে রসদ খুঁজে বের করতে বেশ খাটনি।
মাঝে মাঝে মগজ উত্তর দিয়ে দিলে গঙ্গার এই ভাঙা ঘাটটায় এসে বসি। এদিকে মানুষজন কম, শান্তি পাই। দু’চারদিন যাবৎ দেখছি একজন ভবঘুরে ধরনের মানুষ এখানে ডেরা করেছে।
পোশাক সাধারণ বা বলা ভালো একটু মলিনই। কাঁধে একটা পুরোনো শান্তিনিকেতনি ঝোলা। পায়ে সস্তার রাবারের চপ্পল। ঈষৎ এলোমেলো সাদা- কাঁচা চুল। কারোর সঙ্গে কখনও কথা বলতে দেখিনি বা কোনো সাহায্য বা ভিক্ষা কোনোটাই চাইতেও দেখিনি।
নিজের মতো চুপচাপ জলের দিকে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে বসে থাকেন। তবে ওই মলিন মুখ খানায় চোখ দুটো যেন অদ্ভুত উজ্জ্বল। ও চোখের চাহনির দিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না যেন মনের ভিতর পর্যন্ত পড়ে ফেলে। মাঝেমধ্যে বার কয়েক চোখাচোখি হয়েছে। দু’তিন দিন এমনি চোখাচোখির পর সেদিন হঠাৎ নিজেই আমার উদেশ্য বললেন,
“একটু আগুন হবে?”
“কী! …ওহ… হ্যাঁ…”
বলে দেশলাই বাক্সটা বাড়িয়ে দিলাম।
বিড়িটা ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে বাক্সটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন,
“মনে এত প্রশ্ন পুষে রাখতে নেই, উগরে দিন, শান্তি পাবেন।”
খানিক হক চকিয়ে গেলাম, দুটো কারণে এক বাচনভঙ্গির স্পষ্টতা ও কণ্ঠস্বরের গভীরতা। মানুষের উচ্চারণ বা বাচনভঙ্গি শুনে তার সম্পর্কে বেশ কিছুটা আঁচ করা যায়। লোকটাকে দেখে এমন কণ্ঠ আর ভাষার পরিচ্ছন্নতা হয়তো আশা করিনি। মনে মনে নিজের কাছেই লজ্জিত হলাম, প্রচ্ছদ দিয়ে কখনও বইয়ের সারবত্তা বা মান বিচার্য নয় সেই ইংরেজি প্রবাদটা মনে পড়ে গেল।
ভাব জমাতে দেরি হল না। নাম বললেন, সনৎ ঠাকুর।
বললাম,
“ঠাকুর…! তা সাধু গুণিন নাকি তান্ত্রিক, কোটা?”
হালকা হেসে বললেন,
“আবার ও আন্দাজ ভুল করলেন তো?”
“আবার ও” কথাটা যেন একটু কানে বাঁধলো…তবে কী উনি…মানে ওঁর স্বর আর উচ্চারণ শোনার আগে যে ভুল আন্দাজটা করেছিলাম উনি কি সেটা ধরতে পেরেছেন…নাকি..!”
চিন্তাটা সরিয়ে রেখে বললাম,
“তাহলে?”
জানলাম, ঠাকুরটা ওঁর নিজে যোগ করা উপাধি না বরং পিতৃপ্রদত্ত পদবি সনৎ কুমার ঠাকুর।
বয়স ৬০-৬৫ বা আরও খানিক বেশি। কিছু মানুষের চেহারা বয়স বলে না। সাদামাটা দোহারা চেহারা তবে ন্যুব্জ বা অশক্ত না। উনি সাধু, পুরোহিত, তান্ত্রিক, মাতৃসাধক কোনোটাই নন।
কলিকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে সাইকোলজিতে স্নাতকোত্তর করেছিলেন কিন্তু ধর্মকে জানতে বা বলা ভালো তথাকথিত ধর্ম জ্ঞানের বাইরে ঈশ্বরকে বুঝতে নাকি ঘর ছাড়েন। সারা ভারত ঘুরেছেন, জোগাড় করেছেন অনেক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। ভবঘুরের জীবন, যখন যেমন পান খান আর যখন যেখানে সুযোগ হয় মাথা গোঁজেন। খুব ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার।
আমি মনে ভাবলাম হাতে স্বর্গ পেয়েছি, এ তো গল্পের প্লটের খনি। মা জগদ্ধাত্রী এ যাত্রা আমার সহায়।
কোথাও একটা শুনে বা পড়েছিলাম প্রতিটা মানুষের একটা চৌম্বক ক্ষেত্ৰ থাকে বা সহজে বললে আউরা থাকে। যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারব না কিন্তু নিজে বুঝলাম মানুষটার প্রতি একটা টান তৈরি হয়েছে অল্পসময়েই, শ্রদ্ধা বা সম্মান না কেমন যেন এক অদ্ভুত শান্তি পাই ওঁর সান্নিধ্যে, যেমনটা আমরা মায়ের পাশে বসলে পেতাম। তাই খুব অল্প সময়ে আমাদের অসম বয়সি বন্ধুত্ব গাঢ় হয়।
ওঁকে বয়সের হিসেবে কাকাবাবু বলাটাই সামাজিক নিয়মে সমীচীন। কিন্তু আমি ওঁকে “ঠাকুর” বলেই সম্মোধন করলাম, জানি না কেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওই ডাকটাই এল।
সকাল বিকেল ছাত্র পড়াই; কিন্তু দুপুরের সময়টা ফাঁকা। তাড়াতাড়ি দুটো সেদ্ধ ভাত মুখে দিয়েই ঘাটে গিয়ে বসতাম। দেখতাম ঠাকুর এক দৃষ্টিতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে। পাশটাতে বসে একটা সিগারেট এগিয়ে দিতাম, একটা লম্বা টান দিয়ে কথা শুরু হত, এক একদিন এক একটা বিষয়।
প্রশ্ন করেছিলাম,
“ঠাকুর আপনি তো বলেছেন বিভিন্ন সাধু সঙ্গ করেছেন বিভিন্ন সময়, আচ্ছা আপনি ঈশ্বর মানেন?
“বড়ো কঠিন প্রশ্ন করলে হে, দেখো ঈশ্বর আছে কী নেই এই তর্কের অন্ত নেই, আমি নিজে হয়তো বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করেছি, কিন্তু সেটা তোমাকে বললে তুমি মানবে কেন? কেননা মানুষের স্বভাবে বিশ্বাসের আগে অবিশ্বাস আসে, আর তাতে মোটেও কোনও দোষ নেই।”
“তাহলে…!”
“তাহলে? (দিগন্তের দিকে তাকিয়ে মিনিট খানেক চুপ করে যেন মনের ভিতরটা গুছিয়ে নিয়ে বললেন) আমি মনে করি ঈশ্বর বিশ্বাস একটা ডিফেন্স মেকানিজম, জীবনের যুদ্ধে বারবার হারের পরও উঠে দাঁড়ানোর শক্তি দেয় এই বিশ্বাস, নিজেকে আশ্বাস দিয়ে আমরা বলি ঈশ্বর সব ভালো করবেন, এটা আমাদের জীবনে এগোনোর ফুয়েল।
চারিদিকে কত মন্দ। কিন্তু শুধু মন্দ থাকলে কি পৃথিবী টিকতো? This world is all about balancing. সুতরাং কালোকে ব্যালেন্স করার জন্য ভালোও আছে। তা এই ভালোটাকেই ঈশ্বর ভাবাই যায়।”
কথাটার গভীরতায় খানিক হারিয়ে গেছিলাম। সত্যি এভাবে তো ভাবিনি কখনও।
চমক ভাঙতে খেয়াল হল কথায় কথায় ঘড়ির দিকে নজর যায়নি। সূর্য তার তপ্ত শরীর গঙ্গায় জুড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছে। উঠতে হবে। কিন্তু মন পড়ে আছে গল্পটার দিকে। জানতাম ওঁর বর্তমান রাতের ঠাঁই ঘাটের পাশের পুরোনো কালী মন্দিরের নাটমন্দিরটা। বললাম,
“ঠাকুর আজ রাতটা আমার বাড়িতেই কাটালেন না হয়…।”
“হা হা হা, লেখক মানুষ গল্পের গন্ধ পেলে মন তো টানবেই।”
বেশ হকচকিয়ে গেলাম কেননা, আমি যে লিখি সে কথা তো ওঁকে একবারের জন্যও বলিনি বা কোনো আভাসও দিইনি। তাহলে…আগেও একবার মনে হয়েছিল উনি কী মন পড়তে পারেন! এখন সে বিশ্বাস আরও খানিক দৃঢ় হল। মুখে কিছু বললাম না শুধু হাসলাম।
“বেশ তো কাল যাব না হয় তোমার বাড়ি, চা খাওয়াতে হবে কিন্তু।”
সানন্দে মাথা নেড়ে বললাম,
“অবশ্যই…আমি আপনাকে এসে নিজে নিয়ে যাব।”
সেদিনের পর আমাদের ভাব আরও ভালোরকম জমল। হেসে বলেছিলেন,
“জীবনে মোক্ষ লাভ সেদিন হবে যেদিন এই চা আর বিড়ির মায়াটুকু ত্যাগ করতে পারব।”
বিভিন্ন বিষয়ে কথা হতে হতে দেব ও দৈবের প্রসঙ্গ এল, হঠাৎ উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আচ্ছা দেব বা ঈশ্বর মানেই কি শুভ? মানে ঈশ্বর মানেই ভালো? আর ভালো বিষয়টা কি সর্বৈব নাকি আপেক্ষিক? মানে একের জন্য যা ভালো সেটা তো অপরের জন্য নাও হতে পারে।”
বুঝলাম নিশ্চই এর পিছনে কোনো গল্প আছে তাই অকপটে বললুম,
“আমি তর্কে যাব না ঠাকুর, তাত্ত্বিকতা বোঝার জ্ঞান আমার নেই তবে এ ঘটনার পিছনের গল্পটা শুনতে আগ্রহী।”
উনি হেসে কয়েকবার মাথা নাড়লেন। শুধু বললেন,
“জগৎ নিজের নিয়মে যোগ সৃষ্টি করে। আমার অনুভবগুলো বোধহয় এত কালে ঘাট পেল।”
সে কথার মানে তখন বুঝিনি; বুঝেছি অনেক পরে। সে গল্প অন্য কখনও হবে না হয়।
চায়ের কাপটা নামিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে উনি বলা শুরু করলেন।
“ঘটনাটা আজ থেকে বছর ত্রিশেক আগের। জায়গাটা উত্তর চব্বিশ পরগনার বেড়াচাঁপার থেকেও থেকে বিশ ত্রিশ কিলোমিটার ভিতর দিকে নাম কুবেরপুর, বেশ গাঁ গাঁ ভাব ছিল জায়গাটার। সেইসময় আমার এক পরিচিত মানুষ বিকাশ গুপ্ত তাঁর বাড়ির সাবেকি কালীপুজোয় আমাকে ডাকেন, আমিও মায়ের টানে যাই। আমি কোনোকালেই প্রথাগত সাধু বা গৃহী নই। ও সব উপাচার আড়ম্বর গায়ের গয়নার মতো। থাকলে দেখতে ভালো লাগে, তবে না থাকলেও দিব্যি চলে যায়।
ওদের বাড়ি বেশ পুরোনো আর সাবেককালের পুজো প্রায় একশো বছরের পুরোনো। গেলাম পুজোর দিন বেশ সবার সঙ্গে মিলে আনন্দ করলাম। তো পর দিন বিকাশ গুপ্তর ভাইদের সঙ্গে গাঁ ঘুরতে বেরোলাম। বেরোনোর আগে বড়োরা ওদের বারবার বলে দিল যেন পাষাণময়ীর মন্দিরের দিকে না যাই, কিন্তু মানুষের মন তো যাতে মানা সেদিকেই টানে বেশি। আমার জোরাজুরিতে বাকিরাও রাজি হল।
গিয়ে দেখি আদ্দিকালের এক বিশাল মন্দির আর তার সামনে লোকে লোকারণ্য। ভিতর থেকে মহিলাদের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। ভিড় ঠেলে ভিতরে গিয়ে দেখলাম একটি বছর আঠারো উনিশের মেয়ের শরীর মায়ের মূর্তির সামনে শোয়ানো আর কিছু বয়স্ক মহিলা বসে প্রলাপ করছে, কাঁদছে। বিষয়টা জানার জন্য মন আকুল হল, কিন্তু ওই খানে কাউকে জিজ্ঞেস করাটা সমীচীন মনে হল না। বিকাশের ভাইদের মধ্যে যেটি বড়োজন সে বলল,
“সনৎদা বাড়ি চলো, জ্যাঠাবাবু (মানে বিকাশের বাবা) তোমাকে আসল ঘটনাটা বলতে পারবেন। কী জানি এ বিষয় আমরা জানতে চাইলেও বড়োরা তেমন খোলসা করে বলেন না এমনকি ওই পাষাণময়ীর নাম ও বিশেষ কেউ মুখে আনেন না, কিন্তু পুজো-টুজো হয় ঠিকঠাক। আমাদের এখানে জানো তো পাষাণময়ীকে নিয়ে ভক্তির থেকে বেশি ভয় আছে।”
বাড়ি ফিরে বিকাশকে বললাম বিষয়টাও বলল ওর বাবা বিষয়টা জানেন হয়তো, ওর বাবাকে বলতে উনিই ঘটনাটা বললেন, যদিও এটাও বলে রাখলেন যে উনিও শুনেছেন ওঁর পূর্বপুরুষদের থেকে, সত্য মিথ্যার দায় ওঁর নয়।
যা শুনলাম,
আজ থেকে প্রায় দু’শো বছর আগে ওই প্রতিমা নাকি রায় পরিবার পেয়েছিল পুকুর খনন করার সময়। তার আগে রায়দের অবস্থা অতি সাধারণ ছিল বলা ভালো দরিদ্রই ছিল। আগের দিনে মাটির দেয়ালি ঘর তুলতে হলে মানুষ নিজের ভিটের চত্বরের মধ্যেই পুকুর খুঁড়ত, এতে করে বাড়ির জন্য মাটির ব্যবস্থা হত আর বাড়ি তৈরির পর জলের ব্যবস্থাটাও হয়ে যেত।
তো রায়দের পূর্বজরা ওই ঘরামির কাজ—পুকুর কাটার কাজ করত। তো এমনই এক পুকুর খুঁড়তে গিয়ে রায়দের পরিবারের কেউ একটা মূর্তি পায়। মূর্তির কথাটা তারা জমির মালিককে জানায় না। এটাই বোধহয় ওদের মস্ত ভুল ছিল। মূর্তিটা লুকিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে। এবং সেই রাতে মা এর স্বপ্নাদেশে পায় যে মা ওঁকে মন্দির বানিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে বলছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের অত সংগতি ছিল না। মা নিজেই যেন জানিয়ে দেন কোন্ জমিতে তিনি প্রতিষ্ঠিত হতে চান আর সেখানেই কোন্ গাছের নীচে খুঁড়লে মন্দির বানানোর উপযুক্ত পরিমাণ অর্থ তারা পেয়ে যাবে। আর অদ্ভুতভাবে তাই হয়।
রায়রা ওই মন্দির তৈরি করে, আর অল্প সময়ের মধ্যেই কথাটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে প্রচুর মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আসতে থাকে। পাষাণময়ী যেন সাক্ষাৎ কল্পতরু। কেউ খালি হাতে ফেরে না। মন্দিরের আর দেবীর গুণ মাহাত্ম্য প্রচারের সঙ্গে সদর অচিরেই মন্দিরের আয় প্রচুর বৃদ্ধি পায়। আর রায়দের অবস্থাও ফুলেফেঁপে ওঠে। রায় ভাইরা সেই টাকা আরও বিভিন্ন ব্যবসায় লাগায়। সেইসময় নাকি ওরা যা স্পর্শ করত তখন যেন তাই সোনায় পরিণত হচ্ছে, মানে প্রতি ক্ষেত্রে অসীম সফলতা পাচ্ছে ওরা। তবে মায়ের স্বপ্নাদেশের একটা কথা বোধহয় রায়রা ভুলে গেছিল বা তোয়াক্কা করেনি।
মা নাকি বলেছিলেন রায়রা যা চাইবে তাই পাবে। তবে মায়ের ভোগের ব্যবস্থা যেন মনমতো হয়, আর মা যা ভোগ চাইবেন তাঁকে তাতেই তুষ্ট করতে হবে। কেবলমাত্র তবেই মা রায় পরিবারে অচলা হবেন। যেন কোনও ফাঁক না থাকে।
আর তারপর থেকে বিভিন্ন ব্যবসায় রায়দের সম্পত্তি ফুলেফেঁপে ওঠে। রায়রা সেইসময় পাঁচ তরফ ছিল, মানে পাঁচ ভাই। পাঁচ ভাইয়ের সকলেরই একাধিক পুত্র সন্তান একমাত্র সেজো জনের একটি মেয়ে ছিল। মেয়েটির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রূপও বাড়তে থাকে। বিয়ের বয়স হয়। কিন্তু অত ধনবান পরিবার ও রূপবতী মেয়ের কিছুতেই বিয়ের ঠিক হয় না, অনেক পুজো মানত করা হয় তবু কিছু হয় না। তখনকার যুগে মেয়েদের বিয়ে না হলে সমাজ অনেক কিছু বলত। মেয়েটিও মনে মনে ভেঙে পড়েছিল।
তো মেয়েটি নাকি এক অমাবস্যার রাতে মায়ের সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে নৈবেদ্য সাজিয়ে বসে আকুল আকুতি করতে থাকে যে মা যেন তার বিয়েটা এবার দেন নতুবা মা নিজেই যেন তাকে গ্রহণ করেন, এই বিড়ম্বনা তার আর সহ্য হচ্ছে না। সারা রাত সে দোর দিয়ে মন্দিরে পড়ে থাকে। তার সঙ্গে তার দশ বছরের ছোটো ভাইটিও ছিল। কিন্তু সে নাকি কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল হঠাৎ মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে মারাত্মক কিছু একটা দেখে সে অজ্ঞান হয়ে যায়। ভোরে দরজা খুলে সবাই দেখে বাচ্চা ছেলেটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে আর সঙ্গে সেই মেয়েটির দেহও মাটিতে পড়ে তবে সে প্রাণহীন!
শোকের ছায়া নেমে আসে ওই পরিবারে স্বাভাবিকভাবেই। ছোটো ছেলেটি ধাতস্থ হয়ে ওঠার পর সবাই জানতে সহায় তার দিদির কি হয়েছিল? সে জানায় সেদিন মাঝরাতে সে দেখেছিল তার দিদি করুণ আকুতি করছিল মায়ের কাছে আর একটা ভীষণ দর্শনা কেউ হঠাৎই যেন ঘরের মধ্যে আবির্ভূত হয় আর ওর চোখের সামনে দিদির শরীর থেকে প্রাণ বায়ু শুষে নেয়। দিদি অল্প ছটফট করেই নেতিয়ে পড়ে। সেই ভীষণরুপা কালো মূর্তি আবার হঠাৎই যেন মিলিয়ে যায় মাতৃমূর্তির মধ্যে। সব শুনে মেয়েটির বাবা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে মন্দিরে গিয়ে মাতৃমূর্তিতে আঘাত করে ঘণ্টা দিয়ে আর সঙ্গে সঙ্গে মূর্তির কপালের একপাশ ফেটে যায় আর পাথরের মূর্তি থেকে চুঁইয়ে পরে টাটকা রক্ত।
এই পর্যন্ত শুনে আমি বললাম,
“পাথরের মূর্তিতে রক্ত!”
সনৎ ঠাকুর বললেন,
“পৃথিবীতে অনেক কিছুই ঘটে, আমরা যুক্তি মেলাতে না পারলেই তা আজগুবি হয়ে যায় না…আর তুমি তো গপ্পো শুনতে চাইছ, বিশ্বাস অবিশ্বাস না হয় পাশে সরিয়ে রাখলে।”
হালকা হেসে মাথা নাড়লাম, বুঝলাম সনৎ ঠাকুর আমার অভীপ্সাটা ঠিক আঁচ করেছেন, উনি আবার ধরলেন।
“হ্যাঁ তো এই ঘটনার সবাই মারাত্মক ঘাবড়ে যায় যে এই বুঝি মা কুপিতা হলেন। কিন্তু যার মেয়ে হারিয়েছে তার দুঃখ সত্যি অসহনীয়। মেয়ের ক্রিয়া কর্মসম্পন্ন হওয়ার পর, এক রাতে রায়রা পাঁচ ভাই নাকি একই স্বপ্ন দেখে মানে এটা পরে জানা যায় আর কী। স্বপ্নে দেখেন মা শান্ত সমাহিত রূপে এসে তাদের বরাভয় দিয়ে বলেন—’তোদের রক্ষক আমি। ভাগ্যদেবী রূপে তোদের পরিবারে আমি অচলা হলাম তবে আগেই বলেছিলাম আমার ভোগের যেন অব্যবস্থা না হয়, আমি বলেই ছিলাম আমি ভরিয়ে দেব কিন্তু আমার ভোগ চাই। আমি প্রতি শতাব্দীতে চার বার ভোগ নেব। আর তা হবে এই পরিবারের কন্যা সন্তান!’
এই অদ্ভুত কথা বলেই উনি অন্তরহিতা হন। পরদিন সকালে সেই মেয়েটির বাবা এই কথা তার গিন্নিকে জানায়, গিন্নি ভাবেন মনোঃকষ্টে মাথার বিকার হয়েছে কিন্তু বাকিদের জানাতে তাঁরা সবাই স্বীকার করেন ওই অদ্ভুত স্বপ্ন তারাও দেখেছেন।
সবাই মহা আতান্তরে পড়েন অনেক সাধু সন্তর পরামর্শ নেন, পশুবলির ব্যবস্থা করেন কিন্তু অদ্ভুতভাবে আজ পর্যন্ত গত চার পাঁচ পুরুষ ধরে এই নিয়ম চলে আসছে। প্রতি পঁচিশ বছর অন্তর ওই পরিবারের একটি করে অনূঢ়া মানে অবিবাহিতা কন্যা সন্তান বিনা কারণে সুস্থ শরীরে থাকলেও হঠাৎ ওই নির্দিষ্ট তিথিতে মারা যায়। মায়ের ভোগ!
ওদের বংশে বরাবরই ছেলের সংখ্যা বেশি। তবে কন্যা সন্তান জন্মালেই বুকে পাথর বেঁধে থাকে মা বাবা।”
“উফ কী মারাত্মক…! মানে ওদের ফ্যামিলিতে কোনও মেয়েই নেই?”
“না তা নয়, আছেন তবে কম… পঁচিশ বছর একজন মারা যায় এবং সে অবিবাহিতা থাকে। মেয়েদের অন্য বাড়ি, এমনকি অন্য দেশে পাঠিয়ে ও দেখেছে কিন্তু নিয়মের পরিবর্তন হয়নি।”
“ঠাকুর এ গল্প আপনি বিশ্বাস করেন?”
মৃদু হেসে সেই অন্তদর্শী আমার চোখের পানে খানিক চেয়ে থেকে বললেন,
“তোমাকে আগেই বলেছিলাম আমি বিবাগী হয়েছিলাম প্রথাগত ধর্মের আচারের বাইরে ঈশ্বরকে খুঁজতে, ঈশ্বর মানেই কী মহৎ নাকি তিনিও ঠিক ভুলের মিশেল, ঈশ্বর কী সত্যিই সর্ব শুভদায়ক নাকি তিনি আমাদের ফাঁদেই আমাদের ফেলেন আর চোখে আঙুল দিয়ে ঠিক ভুলের ফারাক বুঝিয়ে দেন। আর কোনো কিছুর মর্মাস্বাদন করতে গেলে মনকে একটু যে মুক্ত করতে হয়, বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচল থেকে বেরিয়ে আসতে হয়।”
“হ্যাঁ বলেছিলেন বটে, কিন্তু এক্ষেত্রে…”
“দেখো ঈশ্বরের কৃপায়, কী নিজের পুণ্যে নাকি গুরুর বিদ্যায় তা জানি না তবে কিছু জিনিস আমি বুঝি, চেষ্টা না করেও বুঝি আর কী, তেমনই ওই পাষাণময়ীর থানেও বুঝেছিলাম জায়গাটা অন্য অনেক জায়গায় থেকে আলাদা। দেশ-বিদেশের অনেক মন্দিরে ঘুরেছি সব জায়গায় এমন শক্তির আধার অনুভূত হয় না। জানবে শুভ শক্তি মানেই যে সতত মঙ্গলদায়ক তা নয়, তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানতে হবে। আগুন যেমন শক্তির চরম আধার, আগুনকে দিয়ে তুমি পেটের অন্ন জোগাতে পারো, অন্ধকারে আলোও জ্বালতে পারো আবার সঠিকভাবে প্রয়োগ না জানলে সব কিছু বিনাশও করে ফেলতে পারো।”
উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করি,
“কী… কী হয়েছিল…?”
উনি মুচকি হেসে বলেন,
“আমি লোভী মানুষ, আর এক কাপ চা চড়াও দিকি তবে বলব…”
আদা দিয়ে দু’কাপ চা নিয়ে এসে বসে বললাম,
“এবার বলুন…”
ঠাকুর গরম চায়ে সন্তর্পণে দুটো চুমুক দিয়ে আবার শুরু করলেন,
“পুরো ঘটনা বিকাশ গুপ্তর বাবার থেকে শোনার পর মন বড়ো অস্থির হচ্ছিল। খালি মনে হচ্ছিল মা কী করে এমন নিষ্ঠুর হন। আর খালি মনে হচ্ছিল যে পরিবারের ভাগ্যলক্ষ্মী রূপে উনি অধিষ্ঠিত সেই পরিবারের সন্তানদের উনি কী করে…! সকালের দেখা সন্তান হারা মায়ের কান্না আমার মনকে বড্ড বিকল করে দিয়েছিল।
“সে রাতে সবার অলক্ষ্যে মন্দির চত্বরে এলাম। মায়ের সামনে টিম টিমে একটা পিদিম। কালো পাথরের মূর্তিটার মাথার বামদিকটা ফাটা।
“আমি কোনও মন্ত্র পাঠ করিনি। কিছু সময় মনের অন্তরতম স্থল থেকে মা’কে ডাকাটা মন্ত্রের থেকেও বেশি কাজ দেয়। আমি মায়ের পানে চেয়ে থাকি শুধু। যে আত্মিক অদৃশ্য সুতোয় ওঁর চরণে আমরা বাঁধা সেই টানটুকু খুঁজে পেলেই সব উত্তর পাওয়া যায়, একাত্ম হয়ে শুধু সেই আত্মার আকর্ষণটুকু খুঁজতে হয়। কখন ওঁকে ডাকতে ডাকতে চোখ দুটো বুজে এল জানি না, দেখলাম সেই সন্তান হারা মা আর পাষাণময়ী যেন একই। মনে ভাবলাম মা এত করুণা তোমার তাহলে কেন একটি করে নির্দোষ প্রাণ কেন নিচ্ছ!”
ব্যস্ত হয়ে বললাম কী উত্তর পেলেন,
সনৎ ঠাকুর হেসে বললেন,
“কোনও উত্তর উনি দেননি…
“তাহলে…!”
“বলতে পারো উপলব্ধি আবার বলতে চাইলে বুজরুকিও বলতে পারো। ঈশ্বর এসে নিজে কি কথা বলেন? তবে আকস্মিকভাবে মন শান্ত হয় আর একটা অদ্ভুত অনুভব অনুভূত হয় যাকে আমরা রিয়ালাইজেশন বলি।”
“মানে…!”
“মানে অশান্ত মন হঠাৎই শান্ত হয়ে গেল আর দুটো কথা উপলব্ধি করলাম,
এক মৃত্যু তো শাশ্বত, এমন কোনও মানুষ আছে যে মৃত্যুকে জয় করেছে? গৌতম বুদ্ধের সেই গল্পটা জানো নিশ্চয়ই। আর…”
“আর?”
“আর, মানুষ কিছু পাওয়ার লোভে এটা ভুলে যায় যে পৃথিবীতে কোনও কিছুই বিনামূল্যে আসে না এমনকি গুরুকে দক্ষিণা না দিলে জ্ঞানও অসম্পূর্ণ থাকে। রায়রা মাতৃমূর্তি পেল, টাকা পেল আর মা বারংবার যখন ভোগের কথা বললেন তখন তারা পাওয়ার লোভে কী মূল্য চোকাতে হবে ভুলে গেল। মা শতাব্দী যে চার বার ভোগ চাইলেন, একবারও তাদের মনে আসেনি কী ভোগ বা এমন অদ্ভুত সময়ের বিভাজন কেন। তারা প্রাপ্তির লোভে আত্মহারা তখন।
“জানবে বিনাশ্রমে আর বিনামূল্যে এ জগতে কিছুই মেলে না আর মিললেও তার মূল্য চোকাতে হয় মর্মান্তিকভাবে। তবে…”
“কী তবে…”
“আমি মনের আকুলতা দিয়ে জানিয়েছিলাম যে মা গো এই পরিবারের মেয়ে হারা মায়েদের মুখ চেয়ে তুমি এ পরিবারে আর কন্যা সন্তান পাঠিও না, পূর্ব পুরুষদের পাপের দায় ও নিষ্পাপ মেয়েগুলো কেন পাবে? আমার জীবনে যদি কিছু মাত্র পুণ্য থেকে থাকে তা তুমি গ্রহণ করো মা তার বিনিময় তুমি এ পরিবার থেকে ভোগ নেওয়া বন্ধ করো মা!
“এক্ষেত্রে আমি সত্যিই জানতাম না কি মন্ত্রে কি পুজোয় মা’কে তুষ্ট করব। শুধু এটুকু জানতাম পরিবারের অভাগী মেয়েগুলো আর তাদের ততোধিক অভাগী মা যাঁরা, তাঁরা বিনা দোষে কষ্ট পাচ্ছেন। আর এটাও বুঝেছিলাম মা নিজের প্রাপ্য ভোগ নিচ্ছেন, তাতেও কোনো ভুল নেই। এখন দরকার শুধু মধ্যবর্তী উপায়ের। আমি দাম দিতে প্রস্তুত কিন্তু আমি নিঃস্ব মানুষ পুণ্যটুকু বাদে আর কিছুই নেই আমার, তাই মায়ের চরণে ওই পুণ্যটুকুই ভোগ চড়াই। তবে আমি জানতাম না, সত্যি জানতাম না মা আমার দাম গ্রহণ করবেন কিনা।”
“তারপর…”
“বিকাশের সঙ্গে শেষ দেখা হয় বছর দুই আগে হঠাৎই বেনারসে। সস্ত্রীক তীর্থ করতে এসেছিল। কথায় কথায় রায়দের কথা ওঠে। শুনলাম আগের জাঁক তাদের নেই তবে গত ২৬-২৭ বছরে তাদের বংশে একটিও কন্যা সন্তান জন্মায়নি। আর মা’ও কোনো ভোগ নেননি। শুনে বুঝেছিলাম মা আমার পুণ্যের মূল্য নিয়েছেন।”
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
ঠাকুর মুচকি হেসে খানিকক্ষণ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“বিশ্বাসের থেকে অবিশ্বাস অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত আর স্বাভাবিক। একটা সময় পর্যন্ত আমিও তেমনটাই ভাবতাম, তবে জীবন দুমড়ে মুচড়ে শিখিয়েছে কোনো ধারণাই শাশ্বত না। আজ থেকে একুশ বছর আগে যদি কেউ বলত মানুষ যখন খুশি যেখানে খুশি আরেক জনের সঙ্গে কথা বলতে পারবে, তাকে দেখতে পারবে, এক অদৃশ্য তরঙ্গ জাল সারা বিশ্বকে তোমার আঙুলের ডগায় নিয়ে আসবে, তাহলে সেটাকেও বুজরুকিই বলা হত। কিন্তু আমরা এখন ফোন ভিডিয়ো কল ইন্টারনেট সব কিছুই ব্যবহার করছি তো? কি তাইতো?”
ঠাকুর বেরিয়ে গেলেন। সত্যি মানুষটা বড্ড অন্যরকম।
অকাট্য যুক্তি বটে।
কিছু বিষয় বোধ করি সত্যিই যুক্তির বাইরে। আর যুক্তি তে যার উত্তর মেলে না সেটাই বুজরুকি এটা ভাবাও বোধহয় আতিশয্য। সত্যি আমাদের জানার পরিধি কত সংক্ষিপ্ত। এ মহাবিশ্বের একটি ধুলোকণার থেকেও নশ্বর আমি। একটা
অদ্ভুত শূন্যতা মনকে গ্রাস করছে। সঙ্গে একটা স্বস্তির ভালোলাগা ও খাতাটা টেনে নিলাম। লিখতে হবে যে। ঠাকুরের বলা কথাটা কানে বাজল…
“জগৎ নিজের নিয়মে যোগ সৃষ্টি করে হে। আমার অনুভবগুলো বোধহয় এত কালে ঘাট পেল। ভৈরব সহায়। জয় ভৈরব।”
