চর্চিকা
হেমন্তের শেষ বিকেলগুলো কেমন যেন মন কেমনিয়া হয়। গঙ্গার জলটা যখন পড়ন্ত সূর্যের সোহাগ মেখে লালাভ হতে থাকে মনটা কেমন যেন উদাস হয় আমার। আজ না, এখন না, বরাবর। হয়তো সেই ছোটোবেলা থেকেই। সাঁঝ বিকেলের মিলনসীমা বা গোধূলি বেলাতে আমার মন বড্ড খারাপ হয়। কোনও নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই হয়, কেন জানি না। আসলে জীবনের ব্যস্ততায় আর অভ্যাসে মনের ভিতর ঘরগুলো তো ঠিক করে ঘুরেই দেখা হয় না। তথাকথিত ভালো থাকার কারণগুলো জীবনে ঠিকঠাক সাজানো থাকলে মন খারাপ আবার কী! আর কেনই বা? আসলে প্রথাগত বাঁধাধরা কারণের বাইরেও যে মন খারাপ হয় বা হতে পারে এটা আমরা নিজের কাছেই স্বীকার করতে পারি না বা হয়তো চাই না।
আজকের মন খারাপের একটা লাগসই কারণ অবশ্য খুঁজে পেয়েছি, আমার আসলে মন কেমন করছে। সনৎ ঠাকুরের জন্য। গত পাঁচ মাস যাবৎ ওঁর কোনও খোঁজই নেই। মাঝে অবশ্য বার দুই নিজেই ফোন করেছিলেন। ব্যাস এটুকুই। ওঁকে ফোন করলে প্রায় সবসময়ই ফোন সুইচ অফ বলে। প্রথম প্রথম অবাক হয়েছি, পরে বুঝেছি ওঁর মতো ছাঁচ ভাঙা মানুষের কাছ থেকে লৌকিক নিয়মের ছাঁচে ফেলা ব্যবহার আশা করা ভুল। তবে মানুষ তো অভ্যাসের দাস। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ সম্পর্কের মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়তে ভালোবাসি বা বলা ভালো অভ্যস্ত। কিন্তু ঠাকুর তো আমার মতো না, উনি স্নেহ ভালোবাসায় অন্যকে বাঁধতে পারলেও নিজে বাঁধা পড়েন না। আসলে অভ্যাস, আমি হয়তো অল্প সময়েই সনৎ ঠাকুরে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। বিভিন্ন অজানা বিষয় আলোচনা। ওঁর অদ্ভুত অভিজ্ঞতাগুলো শোনা, আর সব থেকে বেশি ওঁর আন্তরিক অসম বয়সি বন্ধুত্ব, এসবেই বড্ড অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। আর তাই হয়তো ওঁর অনুপস্থিতি এতটা মনকে বিকল করছে। একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে মনে মনে বিড় বিড় করলাম
“সময় বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়।”
এই তো গতবছর নভেম্বরে পিসিমণির মেয়ে গুড্ডির বাড়ির বিষয়টা হল। নশ্বর কৃত্য কথাটা ঠাকুরের কাছেই প্রথম শুনেছিলাম তখন। তাও প্রায় বছর ঘুরতে চলল।
“তোর মন খারাপ? নাহ খুনের সম্পর্কের কারুর জন্য না। তোর জীবনে কেউ একজন আছে, তার জন্য? তোর বাপ তোর জন্য সব গুছিয়ে গেছে, তোর ছাত্ররাও তোকে ভালোবাসে পরন্তু তুই খুশ না!”
আচমকা কর্কশ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বিজাতীয় বাংলা উচ্চারণে রীতিমতো চমকে উঠলাম। গাছের ছায়ার জন্য ঘাটের এদিকটা গোধূলিতেই সন্ধের আঁধার মাখা। চোখ সইয়ে শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়ে শব্দ উৎপাদনকারীকে দেখার ও চেনার চেষ্টা করলাম। আমাকে বেশি খাটতে হল না। সে নিজেই এগিয়ে এল আমার কাছে, সামনে যাকে দেখলাম তার উচ্চতা মাঝারি, মাথার ওপর মাথার থেকে প্রায় দ্বিগুণ আকারের জটাজুট। পরনে কালো ধুতি আর চাদর। গলায় প্রচুর পরিমাণে রুদ্রাক্ষ আরও নানাবিধ পুঁতির মালা। কাঁধে কালো কাপড়ের পোটলা। হাতে একটা ছোট্ট ত্রিশূল। মুখ ও দাড়ির জঙ্গলে ঢাকা আর কপালের ফাঁকটুকু পূরণ করেছে দুটাকার কয়েনের সাইজের একটি কালো টিপ।
“আপনি আমাকে কিছু বলছেন?”
অবাক হয়ে প্রশ্ন করি।
“হাঁ, তোকেই, ইধার আয়।”
আমি খানিক কৌতূহলবশতই লোকটির দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম।
“বলুন?”
“মন অশান্ত আছে? কেন আছে? তোর তো আগে পিছে কেউ নেই। চিন্তা কাহে কা? উসকা সায়া তো এক সাল আগেই সরে গেছে।”
দৃঢ় কণ্ঠে এবং উচ্চ গ্রামে কথাগুলো বললেন সামনের ব্যক্তিটি।
“কে আপনি এসব…এসব কি বলছেন?”
“হামি সর্বজ্ঞ, তোর ছোটোবেলায় একবার তুই মরতে মরতে বেঁচেছিলি, তোর মা শিউজির কাছে বলেছিল যে তুই বেঁচে গেলে উনি সারা জিউয়ান আম খাবেন না। কি তাই তো?”
এবার সত্যি অবাক হই। আমার মা সত্যি আম খেতেন না। ঠাম্মা বলেছিলেন বটে যে মায়ের প্রিয় ফল মা ত্যাগ করেছিলেন আমার জন্য। কী নাকি মানত ছিল। কিন্তু সে-কথা তো আমরা ছাড়া কেউ জানত না। মা কাউকেই কারণটা বলতেন না।
আমার চিন্তার মাঝেই কর্কশ কণ্ঠ বলে উঠল,
“তবে তোর সামনে সময়টা আচ্ছা না আছে…।”
ঘটনার আকস্মিকতায় হোক বা মনের খানিক বিকল অবস্থার জন্যই হোক এতক্ষণ লোকটির কথাগুলো শুনে একটু অবাক ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। এবার নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
“আচ্ছা ঠিক আছে, আমি বুঝে নেব…আপনি আসুন এবার।”
কথাটা বলেই লোকটিকে পাস কাটিয়ে রাস্তার দিকে পা বাড়ালাম।
“তোর বাঁয় জেবে একটা ৫০০ রূপিয়ার নোট আছে আর ডান জেবে দুটো ২০০-র নোট আর একটা কাগজ এর চিরকুট।”
আমার পা দুটো অবাধ্যের মতো আপনিই দাঁড়িয়ে গেল। চূড়ান্ত অবাক হয়ে লোকটার দিকে এগিয়ে গেলাম,
“কি…কী করে…”
গর্ব আর অহংকার মেশানো হাসি হেসে বলল,
“কহে থে না আমি সর্বজ্ঞ আছি। শুন তোর সামনে বড়ো ফাঁড়া আসছে, এটা কেটে গেলে তুই রাজা হবি বেটা, এদিকে আয় দেখি তোর লালাট মে কি লিখা আছে।”
“আমি বাধ্য বাচ্চার মতো ওঁর দিকে এগিয়ে গেলাম”
আঁধার আরও এক পোঁচ গভীর হয়েছে। লোকটার মুখটা স্পষ্ট না তবে চোখটা আর ঠোঁটের ফাঁকের দাঁতগুলো বেশ উজ্জ্বল। এই আধা আঁধারেও যেন ঝিলিক দিচ্ছে। লোকটা পোটলায় কি যেন হাতরাচ্ছে, একটা ছোট্ট কৌটো বের করে তার থেকে কাজলের মতো কিছু আঙুলে তুলে নিয়ে সেটা নিয়ে আমার কপালের দিকে হাত বাড়াল,
“আজা বেটা দেখি তোর ললাট কী বলছে…দেখি তোর বিপদ… “
“তুই নিজের ললাট সামলা হরিপ্রাসাদ, আমার কিন্তু বশীকরণ কাজলের ডিবেরও দরকার হবে না…”
লোকটার কথার মাঝেই জলদ গম্ভীর স্বরে কেউ কথাগুলো বলে ওঠাতে লোকটি বেশ চমকে আর থতোমতো খেয়ে থেমে গেল আর আমারও চমক ভাঙল।
যিনি কথাগুলো বলছেন তিনি আমার পিছনে আছেন আর তার মুখের ওপর জটাধারী লোকটির অবাক দৃষ্টি নিবদ্ধ। স্বরটা আমার খুব চেনা…
“ঠাকুর…!”
বলেই পিছন ঘুরে দেখি, ঠিক…আমি একদম ঠিক, এ স্বর আমার ভোলার নয়।
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম সেই সুযোগ না দিয়েই ঠাকুর লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
“তো সর্বজ্ঞ হরিপ্রসাদ জি, এবার আমি বলি…. নিবাস বিহারের ছাপড়া জেলার সীতাপুর, টুক টাক হাত সাফাই করতিস, গ্রামে এক সাধু এল তার সঙ্গে ঝুলে পড়ে কলকাতা সেখান থেকে তারাপীঠ। গুরু তোর ভালোই জুটেছিল, শিখলি ও কিছু কিন্তু অপরাধ তোর শিরায়, লোক ঠকাতে বেশি মন, গুরু খেদিয়ে দিল।”
লোকটা নিজেকে সামলে নিয়ে হাতের ত্রিশূল নিয়ে অভিশাপ দেওয়ার ভঙ্গিতে ঠাকুরকে কিছু বলতে যেতে উদ্যত হতেই ঠাকুর আবার বললেন,
“ওই সাড়ে চারশো টাকার এনামেলের ত্রিশূল নিয়ে বেশি লাফাস না, ভেঙে যাবে। আর হ্যাঁ তোর ঝোলায় ওই উল্লু পালক পোড়ার কাজল তার পর শ্মশান থেকে চুরি করা খপ্পর, হাজার বিশেক টাকা দুটো মোবাইল ফোন সিগারেট লাইটার আর ওই দুটো বিলাতি ছবির ম্যাগাজিন ছাড়াও একটা ভোজালি আছে।
আর এই ভোজালি নিয়ে ঘোরার ব্যাপারটা ওই যে সামনের মোড়ের ট্রাফিক পুলিশকে জানাতে পারলে বাকি খাতিরদারী ওঁরাই করে দেবেন, কি হরি প্রসাদ? বলব?”
এতক্ষণে রাস্তার কম পাওয়ারের হলুদ আলোটা জ্বলে উঠেছে। হরিপ্রসাদের চঞ্চল লালচে চোখের চাহনি আর কপালের চিক চিকে ঘামের কুচি বলে দিচ্ছে সে মারাত্মকভাবে ভয় পেয়েছে। কিন্তু তার চোখের ভাষায় শুধু ভয় না আরও কিছু একটা ছিল সে যেন কিছু একটা ঠাওর করতে চেষ্টা করছে, হঠাৎ তার কুঞ্চিত ভ্রূ যুগল টান টান সোজা হয়ে খানিক উপরের দিকে উঠে গেল আর তার বিস্মিত বিস্ফারিত চোখের ভাষা বলে দিচ্ছে যা সে ঠাওর করতে চাইছিল তা সে পেরেছে।
ভূত দেখার মতো আতঙ্কিত চোখে…
“ভৈরো…সমশান ভৈরো… জীসম এক যান দো!”
কথাটা বিড়বিড় করতে করতে পিছু হটতে থাকে হরিপ্রসাদ। কিছুটা দূরে গিয়ে পিছন ফিরে দৌড় লাগায়, একবার শুধু যেতে যেতে ঘাড় ফিরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে “বাচকে রেহেনা…” বলতে বলতে গলির বাঁকে হারিয়ে যায় হরিপ্রসাদ।
কথাটার মধ্যে ধমকি বা হুমকি ছিল না মোটেই যেটা ছিল তা হল চাপা আতঙ্ক!
পুরো বিষয়টা কোথা দিয়ে যে কী ঘটে গেল সেটা আত্মস্থ করতেই মিনিট খানেক লেগে গেল আমার। ধাতস্থ হয়ে দেখি ঠাকুর মিটিমিটি হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি মুখ খোলার আগেই বললেন,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ জানি অনেক প্রশ্ন জমেছে মনে, সব হবে আগে বাড়ি যাও দেখি। অনেক গপ্পো আছে, অনেক গল্পের প্লট পাবে।”
কথাটা বলে চোখ টিপে হাসলেন। এতক্ষণে ওঁর দিকে ভালো করে লক্ষ করলাম। খুব উশকোখুশকো আর ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
“আমি যাব মানে? আপনি আসবেন না এখন… চলুন এখুনি, কি চেহারা করেছেন?”
“হাহাহা, যাব যাব… বলেছিলাম না আমার বোধগুলো ঘাট পেয়েছে এতদিনে তা তোমায় যদি সবটুকু নাই বলতে পারি আমার তো মুক্তি নেই যে।”
***
বাড়ি এসেই চা এর জোগাড়ে লেগেছি। মোড়ের মাথার দোকান থেকে বেশ কিছু কচুরিও নিয়ে এসেছি। এখন শুধু ঠাকুর আসার অপেক্ষা।
রান্নাঘর থেকে শুনতে পেলাম নীচে আমার নাম নিয়ে কেউ কিছু বলছে, কে আবার এল! বারান্দা দিয়ে মুখ ঝুলিয়ে যাকে দেখলাম তাকে দেখার কথা মাথাতেও ছিল না। আশ্চর্যান্বিত আনন্দ বলে অভিধানে কোনও শব্দ আছে কিনা জানি না, আমার অবস্থা এখন ওটাই। সমর এসেছে, সমর পাল।
“আরে! সমর কতদিন পর রে! কী ভাগ্য আমার, আয় আয় উপরে আয়।”
সমর আমার স্কুল জীবনের বন্ধু। মাধ্যমিকে র পরই ওরা এখন থেকে চলে যায়। তারপর আর যোগাযোগ ছিল না। সেসময় সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির ঘরে ঘরে ল্যান্ড ফোন ছিল না। আর ইন্টারনেট সোশ্যাল মিডিয়ার নামও মানুষ শোনেনি। হ্যাঁ চিঠিপত্র ছিল অবশ্যই তবে জীবনের ব্যস্ততা বড়ো বালাই।
“রুদ্র, তোদের বাড়িটা কিন্তু একই আছে রে, ভালো মেন্টেন করে রেখেছিস।”
“হুম, পরিবার তো নেই পরিবারের স্মৃতিটুকুই বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি সবাই মিলে। তবে তুই যে এত বছর পর চিনে আসতে পেরেছিস, সেটা দেখে অবাক হচ্ছি!”
“চিনব না কি রে! ছোটোবেলায় কত এসেছি তোদের বাড়ি, কাকিমার হাতের রান্না খেয়েছি, খেলেছি, মনে থাকবে না মানে!”
ঠাকুর এখনও এলেন না। ভালোই হয়েছে চা-টা তৈরি আছে। সমরকে চা কচুরি গুছিয়ে দিলাম। পুরোনো দিনের গল্প শুরু হলে থামতে চায় না। জানলাম ওরা নাকি ওদের দেশের বাড়ি মালদাতে চলে গেছিল। ওর বাবা এখানে একটা ছোটো সৌদাগরি অফিসে কাজ করতেন। মালদায় নাকি ওদের বিরাট পৈতৃক বাড়ি আর ঠাকুরদার জমাটি থান কাপড়ের ব্যবসা ছিল। মালদার নামকরা ধনাঢ্যদের মধ্যে সময়ের ঠাকুরদাদা ছিলেন একজন। ওর বাবা দাদুর সঙ্গে মনোমালিন্য করে বাড়ি ছেড়েছিলেন। কিন্তু ঠাকুরদার মৃত্যু শয্যায় উনি সমরের বাবাকে ডেকে পাঠান। আর মিটমাট করে নেন। সমরের বাবা ছিলেন ওঁর একমাত্র বংশধর। সেই থেকে সমর ওখানেই।
“দেখ তোর বাড়ি যে কারণে আসা সেটাই বলা হল না, আমি কলকাতায় একটা বাড়ি আর জমি কিনেছি, আর সেই বাড়ির গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানে তোকে আসতেই হবে।”
“বাহ, এত দারুণ খবর, অবশ্যই যাব। তোর মালদার ব্যবসা বাড়ি… সেসব।”
“হুম, এদিকে সেটল করে গেলে ধীরে ধীরে ওগুলো বেচার ব্যবস্থা করব। আসলে ঠাকুরদার থান কাপড়ের ব্যবসার পাশে আমি কার ডিলারশিপ এর ব্যবসা শুরু করি। বুঝিসই তো থান কাপড়ের ওই ব্যবসা এখন তেমন চলেও না। গাড়ির ব্যবসাটা বরাবরই কলকাতাকেন্দ্রিক। বাবা বছর দেড়েক হল গত হয়েছেন, সাডেন হার্ট অ্যাটাক!
“তাই ওদিকের পাট মিটিয়ে কলকাতায় পাকাপাকিভাবে চলে আসব ঠিক করেছি। আর বাবা ছিল ঠাকুরদার একমাত্র সন্তান আমিও বাবার একই ছেলে, তাই ওই অত বড়ো বাড়িতে এখন থাকাটাও মুশকিল।”
“বাহ, ভালোই হল মাঝেমধ্যে ছুটির দিনে এখানে এসে ঘুরে যাবি।”
“একদম সে আর বলতে।”
আমাদের কথার মাঝেই সেই অতি পরিচিত আর অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত “কই হে রুদ্র, আছো নাকি….”
ডাক শুনতে পেলাম। বাইরে এসে দেখলাম ঠাকুর সিঁড়ি দিয়ে উপরে আসছেন, মুখে হাসি আর হাতে বড়োসড়ো একটা ঠোঙা। বেশ অনেকগুলো সিঙ্গারা নিয়ে এসেছেন। আগের অভ্যাস বদলায়নি একটুও।
ঘরে ঢুকেই সমরকে দেখে একটু থমকে গেলেন,
সময়ের সঙ্গে আলাপ করালাম ঠাকুরের। সৌহার্দ্য বিনিময়ের পালা চুকল। ঠাকুরের মুখে হাসি, কিন্তু কি যেন… এই ‘কিন্তু’টা ঠিক কী ধরতে পারলাম না তবে একটা খটকা যেন রয়ে গেল মনে।
দ্বিতীয় প্রস্থ চা এর সঙ্গে গল্প আরও জমাটি হল। সমর, গুড্ডিদের বাড়ির ঘটনা শুনে তো অভিভূত। বলল,
“ঠাকুর আপনাকেও কিন্তু আমার গৃহপূজায় আসতেই হবে। আমার স্ত্রী আর মা খুব খুশি হবেন, প্লিজ আসবেন।”
সমর খানিক পর বিদায় নিল। এবার আমি পাকড়ে ধরলাম ঠাকুরকে। ঘাটের ওই হরিপ্রসাদ এর ব্যাপারটা নিয়ে।
“আচ্ছা ঠাকুর, আমার না অদ্ভুত লাগছে এটা ভেবে যে লোকটা আমার পকেটে কত কি টাকা আছে তা কী করে জানল আর ঠিক তেমনই আপনি ওর ঝোলার খবর পেলেন কী করে?”
“কাকচরিত বা কাক তন্ত্র…”
“অ্যাঁ… কাকেরাও তন্ত্র করে নাকি!”
“হাহাহা… খানিক নিম্ন মানের তন্ত্র, অনেকে মায়াং তন্ত্র বা বিদ্যাও বলেন। গুরুর আদেশ নিয়ে শ্মশানে গাত্র বন্ধন করে, কোনও শনি বা মঙ্গলবার অমাবস্যা তে “ওঁম ক্রং কাঁ কাঁ” মন্ত্রটি দশ হাজার বার জপ করলেই হল। হুম বিশেষ কিছু উপাচার এবং জপাচারও দরকার হয় অবশ্য। কাকতন্ত্রে সিদ্ধ হলে তুমি মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে তার সম্পর্কে বেশ কিছু প্রাথমিক অনুমান করতে পারবে এমনকি ওই যে পকেটে কী আছে তাও বলতে পারবে, লোকজনকে চমকে দিয়ে টু পাইস ইনকামের সহজ রাস্তা।”
“বাহঃ এ তো দারুণ ব্যাপার…সব জানা যাবে সহজেই।”
“না হে, যা কিছু সহজ লব্ধ জানবে তার ফুটোফাটা অনেক। কাকতন্ত্রের দ্বারা প্রাথমিকভাবে সাম্প্রতিক ভবিষ্যত অতীত হয়তো বলতে পারবে তবে প্রকৃত ভাগ্য দ্রষ্টা হওয়া যায় না।”
“আপনিও তার মানে কাক তন্ত্র জানেন?”
“হ্যাঁ, শুরুর দিকে কৌতূহলের বশে শিখেছিলাম বৈকি। তবে যত ধৰ্মকে বুঝতে শুরু করলাম, তার সারবত্তা বুঝতে শুরু করলাম তখন বুঝলাম এগুলো কতটা অন্তঃসারশুন্য। কেন জানো? মানুষের ভবিষ্যৎ কিন্তু প্রস্তর খোদিত না, পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিক ও কর্মফলের সঙ্গে তা পরিবর্তনশীল।”
“হুম কিন্তু আপনি তো ওর সব কিছুই বলে দিলেন, মানে আপনার কাকতন্ত্র লব্ধ জ্ঞান রয়ে গেছে, আপনি না চাইতেও রয়ে গেছে? মানে ওর ত্রিশুলের দামটাও বলে দিলেন!”
“ঠিক বলেছ তুমি, আমরা যা কিছু শিখি সারা জীবন সেটাকে শত চেষ্টা করে ভোলা সম্পূর্ণভাবে সম্ভবও না। তবে…হাহাহা…”
কথা না শেষ করেই হেসে ফেললেন ঠাকুর,
“কী হল..!”
“না কিছু না…মানে তুমি বললে না যে ত্রিশূল এর দামটাও…ওটার জন্য কোনও তন্ত্রের দরকার হয় না। ওর ত্রিশূলর ফলায় দাম লেখা স্টিকারটা খুলতে ভুলে গেছিল হতভাগা …”
কথাটা শুনে আমিও ঠাকুরের সঙ্গে একচোট হেসে নিলাম।
***
সমরের বাড়িটা ঠিক হার্ট অফ দা সিটিতে না গড়িয়ার ভিতর দিকে। বেশ জমকালো খোলামেলা বিরাট দুধ সাদা বাড়ি। কারুকাজ করা মেন লোহার গেট থেকে সোজা নুড়ি বিছানো পথ চলে গেছে বাড়ির সামনের গাড়ি বারান্দা পর্যন্ত।
আর বাড়ির বাম পাশে আর পিছন দিকে কাঠা পাঁচেক জমি তাতে বিভিন্ন ফুল ফলের গাছ। পুরো জায়গাটাই দেড় মানুষ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। বাড়ির বামপাশের জায়গাটিতে বিশাল প্যান্ডেল। অতিথি অভ্যাগততে বাড়ি সরগরম। সমর আপ্যায়নের ত্রুটি রাখেনি। কাকিমা মানে সমরের মা অনেকদিন পর আমাকে দেখে খুব আনন্দিত। আমার মা বাবার গত হওয়ার খবর শুনে বেশ মুষড়ে পড়লেন। সমরের স্ত্রী ইন্দ্রাণী আর সব থেকে মিষ্টি মানুষ ‘চিনি’… ওর চার বছরের কন্যারত্নটির সঙ্গেও আলাপ হল। এবং চিনি আর তার ভালো কাকুর (মানে আমি, নামটা চিনিরই দেওয়া) বন্ধুত্ব জমতে সময় লাগল না।
সমর নিজে আমাদের বাড়ি আর বাগান ঘুরিয়ে দেখাল। বলল সামনের মাসটি মলমাস পড়ে যাচ্ছে তাই গৃহপ্রবেশটা করে রাখল। তেরাত কাটিয়ে ফিরে আসবে কেননা বাড়ির ইন্টেরিয়রর কাজ নাকি বেশ কিছু বাকি।
সারাদিন হই হই কাটিয়ে সন্ধের আগেই আমরা বিদায় নিলাম পথ অনেকটা। সমর আমাদের সঙ্গে কিছুটা এগিয়ে দিতে এল এবং সঙ্গে চিনিও। বিদায় নেওয়ার আগে ঠাকুর চিনিকে কোলে নেওয়ার ছুতোয় ওর মাথায় হাত দিয়ে কি যেন একটু বিড় বিড় করলেন।
বাড়ি ফেরার পথে বিষয়টা জিজ্ঞেস করায় বললেন,
“ছোট্ট মানুষ, বাড়িতে আজ কত লোক সবাই কোলে নিচ্ছে আদর করছে, নজর ইত্যাদি যাতে না লাগে তাই আর কী…। সবাই যে ক্ষতির ইচ্ছায় নজর দেয় তা নয়, কিছু মানুষের নজর দোষ থাকে, তারা তা জানতেও পারে না।”
কেন জানি আমার মনে হল ঠাকুর কিছু লুকোচ্ছেন, কেন তা জানি না।
তবে কারণটা যে এভাবে জানতে হবে ভবিষ্যতে তা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।
***
সেই গঙ্গার ঘাট সেই গোধূলি বেলা। পাশাপাশি ঠাকুর আর আমিও সেই এক শুধু মাঝখানে প্রায় একটি বছর কেটে গেছে আর এই একটি বছরে একটি অপরিচিত অনাত্মীয় ভবঘুরে মানুষ আমার সব থেকে বড়ো ভরসার স্থল হয়ে গেছেন। মাঝে মাঝেই উধাও হয়ে যান, ভয় করে আবার যদি অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়ি। কিন্তু ওই যে ভরসা, জানি প্রকৃত প্রয়োজনে উনি থাকবেনই। এক দৃষ্টিতে মা গঙ্গার চিরায়ত বহমানতার সঙ্গে চিন্তা স্রোতের তাল মেলাচ্ছি। দুজনেই নির্বাক।
“আর ঐটিই তো গণ্ডগোলের বস্তু…”
দুম করে কথাটা বলে উঠলেন ঠাকুর। আমি কিছু বুঝতে না পেরে বললাম,
“অ্যাঁ…!”
“ওই যে ভরসা…এক্সপেক্টেশন…ওটি বড়ো বিষম বস্তু হে…নাহ ভেবেছিলাম অভিজ্ঞতাগুলো ঘাট পাবে তোমায় কলমে, মহাকালের বুঝি সেই ইচ্ছে। এখন দেখছি শেষ বেলায় আবার আমিই না বাঁধা পড়ে যাই।”
কথাটার মধ্যে খোঁচা আর কৌতুক যুগপৎ ছিল, সেটা ভালোই বুঝলাম। গায়ে না মেখে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বললাম,
“অ…!”
নাহ এখন আর অবাক হই না জানি ওসব মন-টন পড়েন না আসলে কাকতন্ত্রের বলে এসব বুঝতে পারেন…”
ঠাকুর কথাটা শুনে “হাহাহা” করে এমনভাবে হাসতে থাকেন যেন কি নাকি মজার কথা বলেছি।
আমাদের কথায় মাঝে ফোনটা বেজে ওঠে।
সমরের ফোন। আমি ফোন ধরার সময় লক্ষ করলাম ঠাকুরের কপালে ভাঁজ পড়ছে। ঠিক যেমন সেদিন সমরকে দেখে পড়েছিল। কিছু একটা গরমিল হচ্ছে বুঝছি কিন্তু সেটা ঠিক ধরতে পারছি না। ফোন ধরা মাত্রই অপরপ্রান্ত থেকে সমরের ধরা ধরা গলা শুনতে পেলাম।
“রুদ্র ভাই আমি তোর বাড়ির সামনে অপেক্ষা করছি, তাড়াতাড়ি আয়।”
“আরে, একটা ফোন করে দিলে তো বেরোতামই না, ইস অনেকক্ষণ ওয়েট করছিস নাকি? পাঁচ মিনিটেই আসছি। কাছেই আছি।”
ঠাকুর দেখলাম আমার থেকেও ব্যস্ত পায়ে হাঁটা দিলেন বাড়ির পথে।
দরজার সামনে সমরের স্কর্পিওটা দেখতে পেলাম। সামনে যেতে দেখলাম কেমন শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে। আমরা যে আসছি সেটা ওর দেখতে পাওয়ার কথা কিন্তু ও যেন একদম বেখেয়ালে রয়েছে। কাছে গিয়ে জানলার কাঁচে টোকা মারতেই থতোমতো খেয়ে যেন জেগে উঠল। কিন্তু ও ঘুমাচ্ছিল না, স্পষ্ট জেগেই ছিল।
“আরেহ, ভিতরে গিয়ে না বসে এখানে কেন? আয়…”
সমরের গৃহপূজার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে কিন্তু জীবনের ব্যস্ততায় আর ফোন টোন করা হয়নি। তবে ভেবেই রেখেছিলাম ওরা পাকাপাকিভাবে নতুন বাড়িতে এসে গেলে ওদের সবাইকে একদিন আমি নিমন্ত্রণ করব। কিন্তু আজ সমরের মুখ দেখে বুকটা কেঁপে উঠল। যেন কী এক ঝড় বয়ে গেছে ওর ওপর দিয়ে।
চোখের দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত। চুল উশকোখুশকো, মুখে বেশ কিছুদিনের না কমানো দাড়ির জন্য বড্ড অসুস্থ দেখাচ্ছে ওকে। এক গ্লাস জল এগিয়ে গিয়ে বললাম,
“বাড়িতে সব ঠিক আছে তো? তোকে এরকম কেন…!”
“হুম…জানি না রে…বুঝতে পারছি না…”
কেমন আনমনা হয়ে ছাড়া ছাড়া ভাবে কথাগুলো বলেই হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল ছোটো বাচ্চাদের মতো। এমন কিছু হবে আচমকা আমি আশা করিনি।
ঠাকুর আর আমি মিলে ওকে শান্ত করলাম। ঠাকুর বললেন,
“সব ঠিক হয়ে যাবে তবে তোমার হাত ধরে বুঝলাম নাড়ি অতি ধীর গতি, তুমি বোধহয় সারাদিন খাওনি কিছু।”
“আর খাওয়া ঠাকুর…সবটা শুনলে…”
“সব শুনব, তবে বিপদে মন দুর্বল থাকে সঙ্গে সঙ্গে শরীরটাকেও দুর্বল করলে চলবে কী করে? সামনের লড়াই যে কঠিন, জুঝতে হবে তো।”
ঠাকুরের শেষের কথাগুলো কেমন যেন দ্ব্যর্থক শোনাল। তবে বিষয়টা কী কিছুই ধরতে পারছি না।
ঠাকুরের কথামতো গরম দুধ সঙ্গে কিছু ব্রেড টোস্ট আর ডিম সেদ্ধ সমরের সামনে দিয়ে বললাম,
“আগে খা তার পর সব শুনব, তেমন কিছুই বাড়িতে ছিল না, জানিসই তো ব্যাচেলরের সংসার।”
আমার আর ঠাকুরের মুখের দিকে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে শুন্য সজল দৃষ্টিতে তাকাল ও। ওর চোখটা দেখে আমার মনের ভেতরটা মুষড়ে উঠল। চোখ মুছে একটা টোস্ট তুলে মুখে দিল কিন্তু খেতে পারল না হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।
ঠাকুর ত্বরিতে ওর মাথায় হাত রেখে কিছু একটা বললেন, আর ম্যাজিকের মতো সমর বেশ শান্ত হয়ে গেল। এক প্রকার ধরেবেঁধে ওকে খানিকটা খাবার খাওয়ালাম। কিছুটা ধাতস্থ হল সমর। ঠাকুর বললেন,
“এবার সবটুকু বলো এবং শুরু থেকে গুছিয়ে বলো কোনও কিছু বাদ দেবে না।”
সমর শুরু করল,
“গৃহ প্রবেশের দিন সব কাজ সুন্দরভাবেই সমাধা হল, আপনারা চলে এলেন তারপর ধীরে ধীরে অন্য অতিথিরাও বিদায় নিলেন। পুরোহিত বলেছিলেন বাড়িতে তে রাত কাটাতে হবে। তাই ওই তিন দিনের জন্য ওই পাড়ারই একটি অল্পবয়সি ছেলেকে কাজে রেখে নিই। তিন দিনের ব্যাপার সবাই মিলে আনন্দ করে কেটে যাবে জানতাম। কিন্তু রাত আটটার দিকে যখন সব অতিথিরাই বিদায় নিয়েছেন তখন হঠাৎ ইন্দ্রাণীর বাপের বাড়ি থেকে ফোন আসে, ওর মাসির ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। এই মাসি ইন্দ্রাণীর খুব কাছের। আর একটা কথাও এখানে বলা দরকার আমার মা আর ওর মাসি ছোটোবেলার বন্ধু যাকে বলে বেস্টফ্রেন্ড। ওঁদের পরিচয় সূত্রেই আমাদের বিয়ে। তো মা-ও স্বাভাবিকভাবে খবরটা শুনে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তো ইন্দ্রাণীই বলে ও ড্রাইভারকে নিয়ে মাসির বাড়ি চলে যাচ্ছে, আমাকে যেতে হবে না। মা বন্ধুর জন্য এবং অবশ্যই বউমা কে রাতে একা না ছাড়ার জন্য সঙ্গে যাবেন বললেন।
ঠিক হল মা আর ইন্দ্রাণী যাবে আমি চিনিকে নিয়ে বাড়িতে থাকব। কেননা কোনওভাবেই আজ রাতটুকু আমাকে এ বাড়িতে কাটাতেই হবে সেটাই নাকি নিয়ম।
ঠাকুর বললেন,
“হুম, ঠিক…গৃহপূজার পর তে রাত থাকতেই হয়।”
আমি বললাম,
“কিন্তু অত রাতে দু’জন মহিলা এভাবে মালদা পর্যন্ত…”
সমর মাঝ পথে কথা কেটে বলে,
“মালদা তো না, মাসি সোদপুরে থাকেন, তবে হ্যাঁ গড়িয়া থেকে সোদপুরের দূরত্ব ও নেহাত কম নয়। আর ড্রাইভার যিনি ওঁকে আমি কাকা বলি। কালী কাকা, বাবার আমলের মানুষ আর ওঁর এই বয়সেও অমন পাকানো চেহারা দেখলে চোর ডাকাত তো দূর বাঘ সিংহ ও ভিরমি খাবে। তাই ওদের নিয়ে চিন্তিত ছিলাম না।”
“ওহ আচ্ছা, তারপর…?”
“সে রাতে খাওয়া মিটিয়ে আমি আর চিনি দোতলার মাস্টার বেডরুমে ঘুমোতে গেলাম। ওকে ঘুম পাড়িয়ে আমি নীচে এলাম সব জানলা দরজা গুলো বন্ধ কিনা চেক করার জন্য। কাজের ছেলেটি ওর নাম গণেশ, দেখলাম রান্না ঘরে কাজ করছে, বললাম ওসব কাল করো যাও অনেক রাত হল শুয়ে পড়। ও আমার দিকে পিঠ করেছিল, শুধু ঘাড় নাড়ল। ছেলেটা ফাঁকিবাজ না, অল্প কথায় মানুষ কিন্তু বেশ করিৎকর্মা।
তারপর একটু নীচের ঘরগুলো ঘুরে উপরে উঠতে যাব হঠাৎ কাঁচের জানলা দিয়ে দেখলাম লোহার মেন গেটটা হাট করে খোলা। কিন্তু আমি স্পষ্ট জানি। ইন্দ্রাণী আর মা বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি নিজে হাতে গেট বন্ধ করেছি। তাহলে! গণেশের পক্ষে খোলা সম্ভব না। কেননা চাবির গোছা এখনও আমারই পকেটে। যাইহোক সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই বাড়ির মেন কাঠের দরজা খুলে লোহার মেন দরজা টা দিতে ছুটলাম। তোরা তো দেখেছিস দরজাটা বেশ কিছুটা দূরে, আমার ভয় হচ্ছিল কোনও চোর ডাকাত ঢুকে পড়েনি তো, নতুন জায়গা, লোকজনও কম এদিকে। কেউ ঢুকে পিছনের বাগানে লোকালে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। দরজাটা বন্ধ করে ফিরতে যাব হঠাৎ বামদিকের জঙ্গলে আমি স্পষ্ট কিছু একটা ছুটে যেতে দেখলাম। ফোনের আলো ফেললাম তবে অতটা জায়গা তার ওপর গাছ গাছালি কিছুই দেখতে পেলাম না। হয়তো কুকুর টুকুর ঢুকে পড়েছে। এবার মনে পড়ল চিনি ঘরে একা, জেগে উঠলেই ভয় পেয়ে যাবে কাউকে না দেখতে পেলে। দৌড় দিলাম বাড়ির দিকে কিন্তু সেই মুহূর্তে আর এক বিপত্তি। পাওয়ার কাট। আগেই বলেছি বাড়ির কিছু কাজ বাকি এখনও তাই জেনেরটার ইত্যাদির ব্যবস্থা এখনও হয়নি। তবে এই কয়দিনের জন্য তিনটি ইমার্জেন্সি ল্যাম্প এনেছিল ইন্দ্রাণী। তারই একটা আছে উপরের ঘরে। আর বাকি দুটো নীচে। ওগুলো তো প্লাগইন করা থাকলে কারেন্ট গেলে আপনিই জ্বলে ওঠে। উপরের ঘরের ব্যালকনি লাগোয়া যে কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা আছে সেদিকে তাকালাম হ্যাঁ আলো জ্বলছে। নেটের পর্দা আর দরজার ঘষা কাঁচের বাধা টপকে যেটুকু আলো আসছে সেটা খুবই ক্ষীণ। কিন্তু একটা কিছু যেন দেখলাম…আর তারপর…তারপর…
সমরের চোখ যেন এখনও সেই ভয়ংকর দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছে। ওর চোখ দুটো লাল, মুখের পেশিগুলো কাঁপছে।
“কী দেখলি!?”
অধৈর্য উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ে আমার গলায়।
“দেখলাম ঘরের ভিতর যেন অনেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে! আবছায়া স্পষ্ট না। আমার মন কেঁপে মন কেঁপে উঠল মেয়েটার জন্য। কিন্তু পর মুহূর্তে যা দেখলাম…দেখলাম… ও কাঁচের স্লাইডিং দরজা খুলে ও ব্যালকনি তে বেরিয়ে আসছে। আমি চিৎকার করে ওকে ঘরে যেতে বলি ও যেন শুনতেই পায় না। সেদিন পূর্ণিমা ছিল চাঁদের আলোয় ও নিশ্চয়ই আমাকে দেখতে পাচ্ছিল। আমি ফোনের টর্চ জ্বেলে হাত নাড়াতে থাকি যাতে ও বুঝতে পারে যে ওকে মানা করছি। কিন্তু ওর কোনও যেন ভ্রূক্ষেপই নেই।
ব্যালকনিতে রেলিংয়ের ফাঁকগুলো বেশ বড়ো, ওখানে কাচ দিয়ে ঘেরা হবে। আপাতত ব্যালকনিটা বেবি প্রুফ না।
ও ক্রমশ এগোতে থাকছে আমি বাড়ির দিকে দৌড় লাগাই, গণেশের নাম নিয়ে ডাকতে থাকি। কিন্তু গণেশের ঘুম যে এত গভীর জানতাম না। আর এই তো খানিক আগে কাজ করছিল এইটুকু সময়ের মধ্যে সে এত গভীর ঘুমোয় কী করে!
বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে দেখি ভিতর থেকে বন্ধ! কিন্তু কে বন্ধ করল? গণেশই বোধহয় মনের ভুলে লক করেছে। ওকে ফোন করি। বেজেই যায়। তোলে না। এদিকে চিনি ক্রমশ আরও রেলিংয়ের ধারে চলে এসেছে। আমি প্রাণপণে চেঁচিয়ে ওকে বারণ করতে থাকি কিন্তু কোনও লাভ হয় না। আর আমি…আমি স্পষ্ট হ্যাঁ এবার স্পষ্ট দেখি তিনটি ছায়া শরীর ঘষা কাঁচের দরজার ওপারে আবছায়া শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দর্শকদের ভূমিকায়, চিনিকে নিজেদের জগতে আহবান জানাতেই যেন তারা দাঁড়িয়ে আছে।
আপনি বিশ্বাস করবেন না ঠাকুর সেই মুহূর্তে আমার মনের কী অবস্থা হচ্ছিল! কী ভীষণ হেলপ্লেস লাগছিল নিজেকে।
চিনি যখন একদম রেলিংয়ের ফাঁকের কাছে আর হয়তো এক পা বাকি। ঠিক তখনই…
আমি আর উৎকণ্ঠা ধরে না থাকতে পেরে বললাম,
“তখনই কী?”
ঠাকুর বিরক্তি মাখা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থামার ইশারা করলেন।
“ঠিক তখনই দেখলাম কেউ যেন চিনির বাম হাতটা ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিল আর বস্তুতই চিনির ছোট্ট অবয়বটা প্রায় ছিটকে গিয়ে দরজার ভিতরে ঘরে গিয়ে পড়ল। আর আমি সেই অদৃশ্য সত্তাকে দেখতে পায়নি বটে তবে চিনি বোধহয় দেখেছিল আমি ওর নির্লিপ্ত ঘোরাচ্ছন্ন মুখে হঠায় অবাক হওয়া আর ভয় পাওয়ার অভিব্যক্তি দেখতে পাই। চাঁদের আবছায়া জ্যোৎস্নার আলোয় তেমনটাই আমার মনে হয়েছিল, আর ওকে যে তিনটি অবয়ব এর কথা বলেছিলাম সেগুলোকে আর দেখতে পেলাম না।
আর অদ্ভুতভাবে সেই মুহূর্তে কারেন্ট এসে গেল। আমি দরজার ঠেলা মারতেই দরজা দিব্যি সুন্দর খুলে গেল। ভিতরে ঢুকেই চিনি চিনি বলে ওপরে দৌড়ে গেলাম। দেখলাম কাচুমাচু মুখ করে বিছানার ওপর বসে চোখ কচলাচ্ছে। ওকে বললাম বাইরে গেলি কেন? বলল ও কিছু জানে না শুধু একজন কে নাকি ওর হাতে টান দিয়ে ঘরের ঢুকিয়ে দিয়েছে, সে নাকি খুব রাগি রাগি দেখতে। পরিষ্কার বোঝেনি তবে বিন্তি দিদার মতো জামাকাপড় পড়া। আর এত্ত এত্ত চুল সব মুখের ওপর। সে রাতে আর কথা বাড়ায়নি আর ওইটুকু চার বছরের বাচ্চা আর কিই-বা বলবে।”
এটুকু বলে সমর থামল। এক ঢোক জল খেল।
আমি বললাম,
“বিন্তি দিদাটা কে?”
“আমাদের পাড়ায় থাকে, পাগলি। বয়স্কা বিধবা। আমিও ছোটো থেকে দেখছি। তাঁর যেমন নোংরা থান কাপড় পরিধানে তেমনটাই নাকি দেখেছিল।”
ঠাকুর খুব মন দিয়ে সবটা শুনলেন।
“ব্যাস এটুকুই তো? নাকি …
“না না ঠাকুর এটুকু হলে তো… এত সবে শুরু। পরদিন সকালে গণেশকে আগের রাতের কথা বলতে ও আকাশ থেকে পড়ল বলল ও নাকি আমাদের খাবার দিয়ে নিজেও দু’টি খেয়ে পিছনের ঘরে শুয়ে পড়েছিল। ওই ঘরে ইন্দ্রাণী ওর থাকার ব্যবস্থা নাকি করে দিয়ে গেছিল। আমি কিন্তু রান্না ঘরে স্পষ্ট ওকেই…জানি না ঠাকুর সেদিন কি হয়েছিল। যাইহোক সকালের জলখাবার খেয়ে চিনিকে নিয়ে মাসির হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ইন্দু মানে ইন্দ্রাণী জানিয়েছিল মাসি আউট অফ ডেঞ্জার। আর দু’দিন অবসার্ভেশন-এ রেখেই ছেড়ে দেবে।”
“তো বউদির মাসিমার বাড়ির কেউ নেই?”
“হুম ছেলে বউ আছে তবে বিদেশে। ওঁর হাসবেন্ড রিটায়ার করার পর এই বাড়িটা করেন মাসি ও স্কুলে পড়াতেন। এখন রিটায়ার। তো মেসোমসাই বছর চারেক আগেই গত হয়েছেন। আপাতত ঠাকুর চাকর নিয়ে মাসি একাই থাকেন আর দু’বেলা সময় কাটানোর জন্য ছাত্র পড়ান।
তো মা ইন্দুকে আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিল বলল মা কয়দিন মাসির সঙ্গেই থাকবেন। সঙ্গে ওঁর এক দেওরের ছেলেও ছিল দেখলাম। যাইহোক আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম, সত্যি ওই বাড়িতে একা ফিরতে…জানেন তো ঠাকুর বাড়ির মেন গেটের সামনে গাড়িটা ঢোকার সময় কেমন যেন একটা আবছায়া ধোঁয়া বাড়িটাকে ঘিরে দেখলাম।”
আমি অতি উৎসাহী হয়ে বলে উঠলাম,
“ধোঁয়া! ঠাকুর বিত্তি পাগলির মতো নোংরা পোশাক আর ধোঁয়া ধোঁয়া চার দিকে… ধুমাবতী দেবী..!”
“আঃ থাম তো হে, গপ্পো গাছায় তোমরা মা ধুমাবতীর যা হাল করেছ দেখেও কষ্ট হয় কিছুটি না জেনে শুনে শুধু বিধবা, রুক্ষ চুল, শীর্ণ চেহারা সঙ্গে ধোঁয়া! ধুমাবতী দেবীর সাক্ষাৎ অত সোজা নয়, আদপে কোনও ঈশ্বরেরই প্রকৃত রূপ কেউ সম্পূর্ণ দেখতে পায় না যেটা পারে তা অনুভব করতে। আর আজ পর্যন্ত কোনও সাধক ধুমাবতীর চার দিকে ধোঁয়া দেখেনি। সুতরাং তোমার ওই রোমাঞ্চকর গল্প পড়া বিদ্যাটা দয়া করে বাদ দাও।”
ঠাকুর এত রুক্ষ আর রুষ্টভাবে আজ পর্যন্ত কথা বলেননি আমার সঙ্গে। একটু অপমানিত লাগল তবে বেশিটাই কষ্ট।
পরক্ষণেই ঠাকুর বললেন,
“খারাপ লাগল জানি। তবে কি জানো অপ্রচারের থেকে অপপ্রচারে খারাপ লাগে বেশি। আমার এভাবে বলা হয়তো…”
“এমা ছি ছি ঠাকুর আপনি… না না আপনি বয়োঃজ্যেষ্ঠ, বলতেই পারেন। আমিই একটু প্রগলভতা করে ফেলেছি। সরি।”
“সরি রে সমর, ইন্টারাপ্ট করে ফেলেছি, তুই বল…”
“কি জানি সত্যি ধোঁয়া নাকির মনের সংশয় আর পূর্ব রাতের ঘটনার মিশ্র বহিঃপ্রকাশ। ইন্দ্রাণী দেখলাম নির্বিকার। সারা দিন সব ঠিকই গেল। আমি অনেক দোনা মোনার পর ইন্দ্রাণীকে আগের রাতের সব কিছু বললাম। যেটা আশা করেছিলাম সেটাই ও বলল তোমার মনের ভুল, চিনি নিজেই হয়তো ব্যালকনিতে এসে গেছিল আর হয়তো কোনও টিকটিকি বা পোকামাকড় দেখে ভয়ে দৌড় দিয়েছে আর অন্ধকারে তুমি সেটাই অন্য কিছু ভেবেছো। আর রান্নাঘরে তুমি গণেশ কে আগে দেখেছিলে সেটাই গুলিয়ে ফেলেছ হয়তো, সারাদিনের এত স্ট্রেস, হতেই পারে।
আসলে আমারই ভুল ইন্দ্রাণী চিরকালই অমন, ও এসব কিছু বিশ্বাস করে না। আর খুব ডাকাবুকো মেয়ে। সেদিন রাতে খাওয়া দাওয়া মিটিয়ে চিনিকে ঘুম পাড়িয়ে আমি আর ইন্দ্রাণী নীচের ঘরে বসে ইন্টিরিয়রের ব্যাপারে কিছু কথা টথা বলছিলাম। হঠাৎ ইন্দ্রাণীর পাশে রাখা বেবি মনিটরের…
“সেটা কী জিনিস?”
“আরে একটা ওয়ারলেস সিস্টেম একটা ট্রান্সমিটার বাচ্চার কাছে থাকে আর অন্য রিসিভারটা বাবা মা বা বাচ্চার দায়িত্বে যে আছে তার কাছে, বাচ্চা শব্দ করলে বা কাঁদলে অন্য ঘর থেকেও বড়ো রা সেটা ট্র্যাক করতে পারে। অডিও ভিডিয়ো দুরকমেরই হয়।”
“ও আচ্ছা, বল তারপর…”
“হঠাৎ কিছু খচমচ শব্দ হয় তারপরই চিনির গলা পাই। ঘুম জড়ানো গলায় কারোর সঙ্গে কথা বলছে যেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই বলছে, ভয় বা আতঙ্ক ওর গলায় নেই। সব কথা বুঝতে পারলাম না। একটা কথা শুনলাম স্পষ্ট, চিনি বলছে ‘কোন্ বাড়ি যাব? পুরোনো বাড়ি? কেন? নতুন বাড়িটা তো ভালো।’
আমি অবাক হবার ঘোরটা কাটিয়ে প্রায় দৌড়ে দিই দোতলার দিকে, ইন্দু বলে চিন্তা না করতে নিশ্চয়ই চিনি ঘুমের মধ্যে কথা বলছে। তবু আমার মন মানে না। ঘরে গিয়ে দেখি চিনি জেগে। জিজ্ঞেস করতে বলে কাল যে বিন্তি ঠাম্মার মতো ঠাম্মাটা এসেছিল সে আজ এসে বলল বাড়ি ফিরে যাও। তারপর কোথায় যেন চলে গেল। ইন্দু ওকে হালকা ধমক দিয়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিল। বিশ্বাস কর রুদ্র ওই তিন রাতের নিয়ম না থাকলে আমি ওই বাড়িতে আর থাকতাম না। বাকি রাতটুকু আমি জেগেই কাটিয়ে দিলাম।
পর দিন সকালে উঠে মনে হল আজ রাতটুকু পার করতে পারলেই শান্তি।
কিন্তু শান্তি কি এতই সহজ? গণেশ বাড়ির পিছনের বাগান থেকে কারি পাতা না কি আনতে গেছিল, ইন্দুই পাঠিয়েছিল। হঠাৎ ওর চিৎকার শুনে ছুটে যাই দেখি পা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ওকে নাকি বিশাল এক কালো সাপে কেটেছে। আমি তাড়াতাড়ি পায়ের ওপরটা বেঁধে দিই কিন্তু কোনও বাইট মার্ক দেখিনি। আর সাপে কামড়ালে এভাবে রক্ত বেরোয় না। হয়তো কিছু ফুটেছে বা কিছু দিয়ে কেটে গেছে। জায়গাটা চট করে দেখে নিই, নাহ কোনও কিছু এমন নেই যা দিয়ে পা কাটতে পারে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে তিনিও বলেন সাপ কামড়ায়নি। ড্রেসিং, টিটেনাস, ওষুধ সব দিয়ে দেন। গণেশকে আমরা বাড়ি পৌঁছে দিই। ও তখনও বলে চলেছে ওকে সাপেই কামড়েছে।
এই করতে করতেই বেলা হয়ে গেল।
দুপুরে খেয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, আগের রাতে পুরো জেগে কেটেছে, আজ ও তাই করব। মাথায় প্রচুর চিন্তা। ঘুমের মধ্যে কী যেন অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম, জাগার পর ঠিক মনে ছিল না তবে কে যেন বারবার বলছিল আমায় খেতে দিবি বলেছিলি, ভুলে যাস না। ঘুমটা ভেঙে গেল। ধরমর করে উঠেই একটা বিশ্রী পোড়া গন্ধ পেলাম। চামড়া পোড়া গন্ধ। দেখলাম চিনিকে বুকের কাছে জড়িয়ে ইন্দু নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। ওদের ডাকলাম না। ঘর থেকে বেরিয়ে অবাক হয়ে গেলাম, যে সারা বাড়ি, ব্যালকনি এমন কি বাগানে পর্যন্ত কোনও পোড়া গন্ধ নেই। শুধু আমাদের ঘরটুকুতেই!
নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম যে, নাহঃ ভুল…সব মনের ভুল। কিন্তু সেটা…সেটা যে কতটা ভুল ছিল…!”
কথাটা মাঝ পথে থামিয়ে ঢগ ঢগ করে কিছুটা জলে গলাটা ভিজিয়ে নিল আর বোধহয় খানিক সাহসও সঞ্চয় করে নিল মনে মনস্ক। পুনরায় শুরু করল,
“আমি দু’কাপ কফি আর চিনির জন্য কিছু বিস্কিট নিয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে যাই, আমি যা দেখছি তা সত্যি হতে পারে না, আমি হয় এখনও ঘুমিয়ে না হলে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। দেখি ইন্দুর হাত দুটো চিনির গলায় চেপে বসতে চলেছে, চিনির সার নেই তবে প্রাণ আছে সেটা ওর শ্বাসের গতিই বলে দিচ্ছে। আর বিকেলের হলদে আলোতে ভেসে যাওয়া ঘরের কোণটায় যেন এক তাল অন্ধকার জমা হয়েছে ওই করুণ দৃশ্য দেখার জন্য। অন্ধকারটা যেন সজীব! আমি হাতের ট্রে-টা নামিয়ে রেখেই ‘ইন্দু কী করছ…’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ি বিছানায়, কিন্তু কই কোথায় কী! কেউ তো নেই। চিনি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। আর তখনই বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে ইন্দু। হেসে বলল,
“উফ মেয়ে সোহাগি বাবা বটে, মেয়ে ঘুমোচ্ছে আর উনি সেটাই দেখছেন, বাহ কফি এনেছ! থ্যাংক ইউ গো। চল ব্যালকনিতে বসে খাই।”
“আমার এসব কোনও কথাই কানে ঢুকছিল না আমি শুধু ভাবছিলাম, আমি এত ভুল দেখলাম! কী করে? আমি যে স্পষ্ট!”
“হুম, তা এই ব্যাপারটা তুমি কি বউমা মানে ইন্দ্রাণী কে বলেছিলে?”
“নাহ…জানতাম এর ও একটা যুক্তি ও খাড়া করত অথবা হেসে উড়িয়ে দিত। তাই কিছু বলিনি।”
“তবে শেষ রাতটা আর কিছু হয়নি, মানে দুটো ঘটনা ছাড়া। এক সেদিন রাতে আমি যখনই ঘুমোতে চেষ্টা করেছি কেউ যেন বারবার বলছে, ‘আমাকে খেতে দে! কথা দিয়েছিলি খেতে দিবি!” স্বপ্ন না যেন স্পষ্ট শুনেছি। আর টাটকা নতুন করে করা রান্না মুখে দিয়েই ফেলে দিতে হল, খাবারগুলো পচে উঠেছিল।”
ঠাকুর খানিক চিন্তান্বিতভাবে বললেন,
“বুঝলাম, তা এত প্রায় মাসখানেক আগের ঘটনা তারপর তো তোমরা মালদা ফিরে গেলে?”
“হ্যাঁ আবার নাও, মানে বলেছিলাম না যে আমার গাড়ির ব্যবসাটা মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক তাই আমাকে ফ্রিকোয়েন্টলি কলকাতা আসা-যাওয়া করতে হয় তাই একটা ফ্ল্যাট রেন্ট নেওয়া আছে হাজরার দিকে। তো আমি ওদের মালদা রেখে দু’দিন পর ফিরে এলাম কেননা বাড়ির বাকি কাজগুলোও করানোর ছিল।
মাসি হসপিটাল থেকে বাড়ি ফেরে আর মা তখনও কিছুদিন ইন্দ্রাণীর মাসির সঙ্গেই থেকে গেছিলেন।”
“মানে চিনি আর বউমা ওখানে একা ছিলেন?”
“হ্যাঁ ঠাকুর, হবে ও বাড়িতে ঠাকুর চাকর, ঠিকে ঝি ছাড়াও ঠাকুমার সমরের লোক হরিদাসী দিদিও আছেন, বয়স প্রায় পঁচাত্তর কী তারও বেশি। কিন্তু মারাত্মক সবল মানুষ। শুধু কানে একটু খাটো।
“আমাদের অভিভাবকের মতোই। তাই নিশ্চিন্ত ছিলাম। আর এই তিন দিনের অভিজ্ঞতার পর নিজের বাড়িই সব থেকে সেফ মনে হচ্ছিল। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম ঠাকুর… সম্পূর্ণ ভুল।”
“কেন…! আর তোমার নতুন বাড়িতে এই গত মাসে আর একদিনও কী থেকেছো বা অন্য কেউ থেকেছে?”
সমর পরের প্রশ্নের উত্তর আগে দেয়।
“হ্যাঁ ঠাকুর একজন কাঠের মিস্ত্রি একদিন রাতে কাজের পর ফিরতে পারেনি কোনও কারণে সে ছিল, এবং সেও রাতে অদ্ভুত শব্দ পেয়েছে জানলা বন্ধ করার পর খুলে যেতে দেখেছে আর গণেশের মতো কালো একটা সাপও দেখতে পায়। ভোর হতেই সে পালিয়ে যায় তাদের মালিক আমাকে জানায় বিষয়টা এবং বলে ও নাকি আর কাজ করবে না। বাড়িটাতে কোনও প্রবলেম থাকলে আমি ধনে প্রাণে মারা পড়ব ঠাকুর। অনেকটা ইনভেস্টমেন্ট আছে ওই জমি আর বাড়িতে। আশা স্বপ্নগুলো না হয় বাদই দিলাম। আর আমিও একরাত ছিলাম। এক পণ্ডিত মশাইকে দিয়ে যজ্ঞ করিয়েছিলাম। কিন্তু … “
“কিন্তু কী?”
“হঠাৎ আমার মাথায় কি ভূত চাপলো যে আমি নিজে ওই বাড়িতে একা থেকে দেখব, মানে স্বস্ত্যয়ন করেছি এবার কী হয় সেটাই জানার ইচ্ছে…”
কথাটা বলতে গিয়ে একটুখানি থামে সমর, যেন নিজেকে মনে মনে কিছুটা গুছিয়ে নিতে চায়, পুনরায় শুরু করতে যাবে ঠিক সেসময় টেবিলে রাখা সমরের ফোনটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনের ছবি বলে দিচ্ছে কল করেছে ইন্দ্রাণী। আমরা ওইপারের কথা শুনতে না পেলেও বিষয়ের গাম্ভীর্য বা তাৎপর্য খানিক আঁচ করতে পারলাম সমরের মুখের বদলে যাওয়া অভিব্যক্তির আঁকিবুকির সঙ্গে। এবং সেটা যে মোটেই সুখদায়ক বা শুভকর নয় সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত!
“কী হয়েছে রে…সব ঠিক তো?”
সমর হেরে যাওয়া সৈনিকের মতো মাথা নত করে দু’দিকে নাড়ে।
ঠাকুর ওর মাথায় আশ্বাসের হাত রাখেন আর ঠিক সেই মুহূর্তে ওঁর মুখের ভাব চকিতে বদলে যায় যেন কিছু ভারী অদ্ভুত উনি দেখে ফেলেছেন কিন্তু
পুরোটা এখনও ওঁর কাছে পরিষ্কার না। একটা স্পষ্ট দ্বন্দ্ব ওঁর মুখে আমি দেখতে পাচ্ছি। ব্যস্ত স্বরে বললেন,
“সমর, সময় কম, এখনই বেরোতে হবে। বাকি কথা পরে গাড়িতে বোল। তবে তোমার এই মানসিক অবস্থায় তুমি কি ড্রাইভ করতে পারবে?”
সমর ঠাকুরের কথায় কিছুটা অবাক হয়েছে দেখেই বুঝতে পারছি, কিন্তু এখন ওর দুশ্চিন্তা বাকি সব অনুভূতিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম গাড়ি না হয় থাক না, তুই তোর কোনও এমপ্লয়ইকে ফোন করে দে নিয়ে যাবে আমরা ট্রেন নিয়ে নিই। এমনিতেও বাই কার প্রায় ছয় সাড়ে ছয় ঘণ্টা লেগে যাবে।
এখনই তো প্রায় রাত আটটা।
সমর কাকে একটা ফোন করল, তারপর বলল,
“ট্রেনের ঝামেলার দরকার নেই, কখন আসবে না আসবে আমি পরিচিত এক ড্রাইভারকে ডেকে নিয়েছি, ও মিনিট কুড়ির মধ্যেই আসছে।”
আমরা চট জলদি তৈরি হয়ে নিলাম। সঙ্গে দুই সেট জামাকাপড় নিয়ে নিলাম জানি না যদি থাকতে হয়।
সমর ফোনে ব্যস্ত। কিন্তু পুরো সময়টা ঠাকুর যেন কেমন আনমনা হয়ে থাকলেন। কিছু একটা ভাবছেন, খুব গভীরভাবে ভাবছেন।
***
ওই তো আজ আবার সেই বিজাতীয় শব্দটা শোনা যাচ্ছে সঙ্গে মন্ত্র গম্ভীর আরও একটা কীসের যেন শব্দ! দিন কয়েক আগেও এমনটা শুনেছিল সুলোচনা। শব্দটা আসে বাড়ির খিড়কির দরজার দিকে থেকে। কীসের শব্দ এটা আর কেনই-বা নির্দিষ্ট সমরের ব্যবধানে শোনা যায়!
সবে মাস কয়েক হয়েছে বিয়ে হয়ে সেই সুদূর কলকাতা থেকে এবাড়িতে এসেছে সে। নববধূ সে। সম্ভ্রান্ত শ্বশুরবাড়ি তার। যত্নের অভাব নেই। যতটা আহ্লাদ তাকে তার দাদা রাখতেন ততটাই যত্ন সে এবাড়িতে পায়। তবে যত্ন আর আন্তরিকতার তফাৎটা থেকেই যায়। এবাড়িতে মানুষের থেকে ঠাকুর চাকর বেশি। বাড়ির গিন্নি মানে ওর শাশুড়ি গত হয়েছেন বছর কয়েক আগে। বাড়ির কর্তা মানে সুলোচনার শ্বশুর, ওর স্বামী এবং স্বামীর থেকে প্রায় পনেরো বছরের ছোটো একটি দেওর যার বয়স কিনা বারো বছর। এক ননদও আছে তবে সেও বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি। এ ছাড়া আছে কিছু জ্ঞাতি তবে তারা সুলোচনার শ্বশুরকে প্রায় মনিবের সম্মান দেয় এবং খানিক দূরত্ব বজায় রাখে। সম্পর্কে আত্মীয়তার উষ্ণতা কম কিন্তু সমীহপূর্ণ বশ্যতা বেশি।
এটা ওর একটু অদ্ভুত লাগে।
স্বামী অখিলেশ মানুষ ভালো তবে তিনি ইংরেজ সরকারের অধীন তাই চাকরির সুবাদে ওঁকে কলকাতাতেই থাকতে হয় বেশি। সুলোচনা দাদার সঙ্গে কোনও এক ক্লাবে পরিচয় আর সেই পরিচয় ঘন হতেই সেটাকে আত্মীয়তায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেন দাদা। অবশ্য সুলোচনা বা অখিলেশ কেউই অখুশি বা অরাজি ছিল না এতে। সুলোচনা লেখাপড়া ভালোবাসে। সে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর করেছে। অধ্যাপক দাদা ও তাকে সমাজের নিয়মে সাত তাড়াতাড়ি পাত্রস্থ করতে চায়নি। বাবা মা-কে হারানোর পর দাদাই সুলোচনার সব। সব কিছু ছবির মতো নিখুঁত হওয়া সত্ত্বেও কীসে আর কোথায় যেন তাল কাটছে।
এবাড়িতে সুলোচনার সঙ্গী বলতে কেউ নেই তবে ওদের জ্ঞাতি আত্মীয়দের বাড়ির বউটি, প্রায় ওরই বয়সি তার সঙ্গে বেশ সখ্যতা তৈরি হয়েছে সুলোচনার। তবে রুচি আর শিক্ষার খানিক অন্তরায় থেকেই যায়, গ্রাম্য, সদা সন্দিগ্ধ, অতি কৌতূহলী এবং কিঞ্চিৎ প্রগলভ কালীমতির। আর একজন ছায়া সঙ্গী আছে তার, প্রায় বছর আটকের ছোটো, বছর বারোর তার দেওর নিখিলেশ।
দুপুরে খাওয়ার পর একটা বই নিয়ে দখিণের বারান্দার মিঠে রোদটায় পিঠ দিয়ে বসেছে সুলোচনা। নিখিলেশ গেছে স্কুলে। এমন সময় সিঁড়িতে দুম দাম পায়ের শব্দ আর কড়া দোক্তা পানের গন্ধ কালীমতি সশরীরে হাজির হওয়ার আগেই তার আগমন বার্তা বয়ে আনল।
“নতুন বউ, শুনেছ কী কাণ্ডি!”
ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই বিস্ময়মাখা প্রশ্নবাণ ছুড়ে দিল সুলোচনার দিকে,
“কী হয়েছে ভাই?”
“আরে তুমি তো কোনও খবর রাখো না দেখছি, আরে আজ সকালে বাড়ির খামারের ওইদিকে ডুমুর গাছটার গোড়ায় নাকি চাপ চাপ রক্ত পড়েছিল। কোনও কাজের লোক সেটা দেখে ফেলে আর তারপর হুলুস্থুল।”
“রক্ত! রাতে শিয়াল হয়তো ছোটো কোনও প্রাণী এনে খেয়েছে তারই…।”
“থামো বাপু, তুমি শহরের মনিষ্যি এসব জানো না, শিয়াল খেলে সেই জন্তুর লোম বা পালক কিছু তো থাকত, আর শিয়াল বা বনবিড়াল এভাবে
মানুষের ঘরের দোরের সামনে খায় না। আমার তো মনে হয়…”
কালীমতি দেখল সুলোচনা পুনরায় বইয়ের পাতায় চোখ নিবিষ্ট করেছে। সে বুঝল বিষয়টা সুলোচনার কাছে খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। তখন সে নিজের মনেই বলতে থাকে …
“কী জানি বাপু নতুন বউ, বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে আসা ইস্তক দেখছি, এরা যেন কেমন পারা…এমনিও আমার শ্বশুররা তোমাদের দূর সম্পর্কের জ্ঞাতি হলেও আসলে আশ্রিত। তাই মনের কতা মনেই রাখি।”
কথাটা বলেই একবার আড় চোখে সে সুলোচনার অভিব্যক্তি পড়ার চেষ্টা করে কালীমতি। দেখল এবার সুলোচনা মুখ তুলে উৎসুক মুখে কালীমতির দিকে চেয়েছে।
“কী… মানে কি অসংগতি দেখেছ তুমি? ওই যে বললে না এরা কেমন যেন…তার কারণ?”
কালীমতি এবার বুঝল এতক্ষণে সুলোচনাকে উৎসাহিত করতে পেরেছে। সে কোলের ওপর বালিশটা টেনে নিয়ে, পানের ডিবে থেকে আর একটি পান মুখে দিয়ে আয়েশ করে বলতে শুরু করে,
“আমি তো তোমার ও বছর দুই তিন আগে এবাড়িতে এয়েছি। কোনো গেরস্তের বাড়িতে লক্ষ্মীর পিঁড়ি আর ঘট থাকে না বলত? বিসশুদবার করে লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়ে না এমন বাড়ি দেখেছ? লক্ষ্মী কেন কোনও ঠাকুর দেবতার মূর্তি বা কিছু আছে এবাড়িতে?”
“কিন্তু ওই যে বাড়ির দক্ষিণে ঠাকুর বাড়ি আছে বাবা নিজে পুজো করেন প্রতিদিন…”
“উফফ, আরেহ তা জ্যাঠাবাবু পুজো করেন কিন্তু কোনোদিনও কোনও পুরুতকে পুজো করতে দেখেছ? বা কোনও বিশেষ দিনে উৎসব হতে দেখেছ? এবাড়িতে সন্ধে পড়ে না আর…বাড়ির কোনও মেয়ে বউরা ও ওই ঠাকুর ঘরে ঢোকে না। আমি যতবার আমার শাশুড়ি মা-কে জিজ্ঞেস করেছি উনি বলেছেন উনিও বিয়ে হয়ে এসে এই নিয়মই দেখেছেন আর মেনেছেন।”
সুলোচনা মাত্র মাস কয় এবাড়িতে এসেছে তাই এত কিছু তার মাথায় আসেনি। আর এমনিতেও ছোটো বেলায় মা আর একটু বড়ো হয়ে বাবাকে হারিয়ে ওরা দুই ভাই বোন নিজেদের মতো করে বড়ো হয়েছে। নাস্তিক তারা নয় তবে বাড়িতে পুজো পাঠ করার চল তাদের ছিল না বা বলা ভালো আচার উদযাপন করার মতো মানুষ তাদের বাড়িতে ছিল না। তাই এসব বিষয় তার নজর কাড়েনি। তবে কালীমতির কথাগুলো নেহাত উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটা ঠিক যে গৃহস্ত বাড়িতে নিয়মিত পুজো, সন্ধে দীপ দেওয়া এগুলো হয় বইকি, তার ছোটোবেলায় তার মাকেও গুছিয়ে লক্ষ্মী পুজো করতে সুর করে পাঁচালী পড়তে শুনেছে সুলোচনা।
কালীমতি চলে যাওয়ার পর থেকে কথাগুলো পাক খেতে থাকে ওর মাথায়। সত্যি তো ওর বিয়ের পরদিন যখন ওকে সারা বাড়ি ঘুরিয়ে দেখানো হয় তখন বাড়ির ঠাকুর মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়নি।
সুলোচনার শ্বশুর রমাকান্ত ওকে খুবই স্নেহ করেন। দুপুরে খাবার পরিবেশন এর সময় সুলোচনা বিষয়টা ওঁর কাছে জানতে চাইলে ক্ষণিকের জন্য ওঁর মুখের ভাব পরিবর্তন হয়ে যায় সেটা সুলোচনা খেয়াল করে না। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন,
“এসব কথা হঠাৎ কেন মা? আচ্ছা তুমি যখন জানতে চাইছ… আসলে আমাদের কুল দেবী, অতি প্রাচীন। আমাদের বংশ কিন্তু সেই পাল রাজাদের সময়কার। কোনো এক পূর্বপুরুষ এই মাতৃমূর্তি লাভ করেন। আর দেবী স্বপ্নাদেশে পুজোর নিয়মাচারও জানিয়ে দেন, তখনকার নিয়মই চলে আসছে। আমরা বংশপরম্পরায় শুধু নিয়ম মেনে চলেছি মা। আচ্ছা এসব কথা তোমাকে কে বলল?”
সুলোচনা বলে,
“কালীমতি দিদি…’
“মা তুমি শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, নিজের সমগোত্রীয় মানুষ ভিন্ন অন্যদের কথায় কান দিতে নেই।”
খাওয়া দাওয়া মিটিয়ে রমাকান্ত সুলোচনাকে ডেকে তার হাতে এক গোছা পুরোনো চাবি তুলে দেয়।
“এ কীসের চাবি বাবা?”
“তিনতলার পূর্বদিকে দেখবে দু’টি ঘর পাশাপাশি তালা দেওয়া, ওটা লাইব্রেরি। এ তারই চাবি। তুমি শিক্ষিতা মেয়ে, ওখানে অনেক বই পাবে, পড়ে সময় কাটাও, বইগুলোও একটু নাড়াচাড়া হবে। আমাদের বংশে পড়া শোনার রেওয়াজ বরাবরের। আমিও এককালে পড়তাম খুব, একজন বয়স বাড়ার সঙ্গে বোধহয় ধৈর্য্যটা খানিক কমছে।”
সুলোচনা বেশ খুশি হল, পড়াশোনা তার পছন্দের কাজ। কালীমতি আজ কাল ওকে একটু এড়িয়ে চলে মানে কাজের কথা ছাড়া তেমন গল্প গাছা করতে আসে না। কারণ জিজ্ঞেস করেছিল কিন্তু সদুত্তর পায়নি ও। যাই হোক এইভাবে দিন কাটতে থাকে সুলোচনার। এর মধ্যেই খবর আসে অখিলেশকে কোম্পানি কোনও দরকারে বোম্বাই পাঠাচ্ছে মাস কয়েকের জন্য। সুলোচনার মন স্বাভাবিকভাবেই খারাপ হয়ে যায়। এখন তার সর্বক্ষণের সঙ্গী লাইব্রেরির এই বইগুলো। আর তার পুঁচকে দেওরটি।
লাইব্রেরির বইগুলো ঝাড়া পরিষ্কার করা বেশ অনেক দিনই যে হয়নি তা দেখেই বোঝা যায়। চাকরদের দিয়ে এসব হয় না। বই এর যত্ন সবাই বোঝে না। সে নিজের হাতেই করে। এভাবে ঝাড় পোছ করতে গিয়ে আলমারির একদম নীচে বেশ কিছু মলিন লাল কাপড়ের পুটলি পায় ও। সবগুলোই দস্তাবেজে ভরতি। সেগুলো সরাতেই নীচে কোণের দিকে পাটাতনের একটা কাঠ কেমন যেন আলগা মনে হল। একটু টানাটানি করতেই সেটা খুলে এল এবং তার নীচে অদ্ভুত দেখতে গয়নার বাক্সের মতো কিছু একটা দেখতে পেল সুলোচনা। সেটা বের করে এনে টেবিলের ওপর রাখে।
কাঠের আয়তাকার বাক্স। খুব একটা বড়ো নয়।
উপরে তামা জাতীয় কোনো ধাতুর পাতলা পাত দিয়ে নকশা করা। কোনও কব্জা নেই বা চাবি ঢোকানোর ছিদ্রও নেই। সুলোচনাভাবে এ বাক্স খুলবে কী করে সে। নাড়াচাড়া করতে গিয়ে বাক্সের ডান পাশে নীচের দিকে কোথায় একটা আঙুলের চাপ পড়তেই ডালাটা খট শব্দ করে খুলে গেল। ভিতরে দুইটি পুরোনো পুথি। সন্তর্পণে খুলে দেখে ভিতরের কিছু কিছু পাতার লেখা খুব অস্পষ্ট। আর যে ভাষায় পুথিগুলো লেখা সেটা সংস্কৃত বা বাংলা নয়। তবে এ ভাষাটি সুলোচনা চেনে।
বাংলা ভাষার প্রাচীনতম রূপ। চর্যাপদ যে ভাষায় রচিত এ সেই ভাষা। বড়ো জানতে ইচ্ছে হয় কি আছে এতে লেখা। দাদা কাছে থাকলে কোনও চিন্তাই ছিল না, এ বিষয় দাদার জ্ঞান ও আগ্রহ দুই প্রচুর। কিন্তু সে নতুন বউ হঠাৎ দাদার কাছে যাবে এমনটা সে নিজে মুখে বলতে পারে না। অজানাকে জানার আকর্ষণ মানুষের চিরন্তন। আর একটা বিষয় ওর অদ্ভুত লাগে যে সেটা হল এই বাক্সটা যেভাবে রাখা ছিল তাতে মনে হচ্ছে যেন এটা লুকোনোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এবং বাক্সটিও কেমন গোলমেলে। বাক্সটি সে নিজের ঘরে এনে রাখে এবং ঠিক করে এ কথা সে কাউকে বলবে না।
সুলোচনা তখনও জানত না ভবিষ্যৎ এর গর্ভে তার জন্য কী চমক লুকিয়ে আছে! সে জানত না তার জীবনটা আমূল বদলে যেতে চলেছে।
***
শহরের সীমা ছাড়িয়েছি অনেক আগে। যতটা ভেবেছিলাম তার থেকেও সময় বেশি লাগছে খানিক
সনৎ ঠাকুর বললেন,
“বলো তারপর, সস্তয়ন স্বস্ত্যয়ন তো করলে… যদিও…”
‘যদিও’ কথাটা আনমনে বলে ফেলেই নিজেকে সামলে নিলেন ঠাকুর।
“যদিও কী ঠাকুর?”
“কিছু না তুমি বল, সবটুকু জেনে নেওয়া বড়ো দরকার।”
ঠাকুরের কথা বাত্রা আমাকে বড়ো বেশি সন্দিহান করে তুলছে।
সমর শুরু করল,
“সে-রাতে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে বাড়ি ঢুকলাম যখন তখন প্রায় রাত নয়টা। নীচের ঘরে কাঠের এবং ইন্টিরিয়রের কাজ হচ্ছে তাই বেশ অগোছালো আর নোংরা। বাড়ির আর কাজের দেখভালের জন্য একজনকে রেখেছি, তাকেও সেদিন ছুটি দিয়ে দিলাম ইচ্ছে করেই একপ্রকার। সারা বাড়িতে আমি একা। মনে মনে নিজেকে শক্ত করে নিলাম। সারাদিনের ব্যস্ততার ক্লান্তিতে ঘুম আসতে বেশি সময় লাগল না। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। নীচের ঘর থেকে কেমন যেন শব্দ আসছে। আমি নীচের সব ঘরের আর উপরের হলের আলো জ্বালিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলাম নাহঃ কোনও শব্দ নেই কিন্তু একটু আগেই শুনেছি!
সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে নীচের হল আর রান্নাঘরের দিকটা দেখা যায়। কিন্তু অবাক হয়ে গেলাম নীচে একটি ঘর ছাড়া সব আলো নিভে গেছে! আর সেই ঘরের খানিকটা আলো ট্যারচাভাবে হলে এসে পড়েছে। আর সেই আধো আলোয় আমি চলমান অন্ধকারকে দেখলাম। একতাল আকার বিহীন অন্ধকার, সরীসৃপের ভঙ্গিতে যেন পাশের ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তার পিচ্ছিল মসৃণ ত্বকের আলোর রশ্মিকণাগুলো পিছলে যাচ্ছে! হঠাৎ আমার চেতন আমায় বলল ওটা ‘সাপ’! অত বড়ো সাপ! আর কী জানি আমার অনুভব করা মাত্রই সাপটা যেন আমার মনের কথা নাকি আমার অস্তিত্ব অনুভব করে আমার দিকে আসতে লাগল!
“আর…আর অদ্ভুতভাবে আমার বাড়ির বৈঠক খানাটা কোন জাদুবলে একটা ঊষর প্রান্তরে বদলে গেল নিমেষে। শুন্য রিক্ত প্রান্তর, ঘোলাটে আঁধারে ঢাকা প্রান্তর। কোথায় আমার ঘর বাড়ি! আছে শুধু ওই বিশাল কালো কুচকুচে সরীসৃপ টি। সে ক্রমশ আমার দিকে এগোচ্ছে আমি এক পা এক পা করে পিছন হাঁটছি। সাপ টার হিসহিস আমি স্পষ্ট শুনতে পারছি। অবশ্য ভয়ের বোধহয় তখন অনেক বাকি। আমি বেশ কিছু সিঁড়ি উঠে এসেছি এবার ভাবলাম আর তো একটু খানি এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেলেই হল। যা ভাবা তাই কাজ। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। আমি পিছন ফিরে দৌড়ে দোতলার হলে আসা মাত্র মুখের ওপর বিশ্রী ঠান্ডা হওয়ার ঝাপটা অনুভব করলাম, পিছন ফিরে দেখি কোথায় সাপ! নেই তো! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেলাম না দেখলাম মাথার ওপর পাক মারছে বিরাট এক বাদুড় তারই ডানার ঝাপটায় হওয়া লাগল আমার মুখে, ভাবতেই গাটা ঘিন ঘিন করে ওঠে। বাদুড়টা আমার মাথা আর মুখ লক্ষ করে ঠোক্কর মারার চেষ্টা করছে। দু’চারবার তীক্ষ্ণ নখের আচর মুখের চামড়ায় অনুভব করলাম। চিড় চিড় করে জ্বালা দিচ্ছে। আমি দরজার খুব কাছে ঘরে ঢুকতে পারলে আজকের মতো নিশ্চিন্ত। কিন্তু কীভাবে যেন চটিটা স্লিপ করে গেল আর আমি ও হোঁচট খেয়ে পড়লাম দেখলাম বাদুড়টা কোন জাদুতে প্রায় তিন গুণ আকারে বড়ো হয়ে গেছে। আমি তখনও দ্বন্দ্বে যে আমি যা দেখছি বা অনুভব করছি তা কি আদৌ ঘটছে নাকি সবটাই মনের ভুল, হ্যালুসিনেশন!
“হঠাৎ দেখলাম বাদুড়টা পূর্ণ ক্ষিপ্রতার সঙ্গে আমার দিকে আক্রমণের জন্য ধেয়ে আসছে। বিকট হিংস্র দাঁতগুলো যেন একটু বেশিই বীভৎস, চোখ দুটো অদ্ভুত উজ্জ্বল! বাদুড়টা এবার প্রায় আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়বে ঠিক সেই মুহূর্তে আলো নিভে গেল, আমি রিফ্লেক্স অ্যাকশন এ দুই হাতদিয়ে মুখটা ঢেকে ফেলি। কয়েক সেকেন্ড পরও যখন অনিবার্য আক্রমণ হল না, আমি চোখ খুলি। আর চোখ খুলে যা দখি তা…তা আরও বেশি ভয়ংকর। রাস্তার আলোয় ক্ষীণ আভা কাঁচের জানলা ভেদ করে ঘরে এসে পড়ছিল। দেখলাম…
“আমার মুখের থেকে মাত্র ফুট খানেক দূরে একটি শীর্ণ শুষ্ক কিন্তু সবল নারী মূর্তি, তার পরিধান মলিন মাথার নোংরা জটালো চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে মুখের ওপর বুকের ওপর ছড়ানো। গায়ের চামড়াটা ঠিক মানুষের মতো না যেন শুকনো গাছের ছাল। আজানুলম্বিত সুতিক্ষণ নখযুক্ত ডান হাতটা যেন বট গাছের মোচড়ানো ঝুড়ির মতো, শীর্ণ কিন্তু মারাত্মক সবল। আর আঙুলের বাঁকানো কালচে নখগুলো দেখে মনে হচ্ছে এটা কোনও মানুষের না বরং বন্য পশুর!
“মুখ দেখতে পাচ্ছি না, মুখটা পিছন দিকে ঘোরানো, যেন ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে কাউকে দেখছে। মূর্তিটির যেদিকে ঘাড় ঘোরানো সেদিক বরাবর নজর চালিয়ে দেখলাম তার সবল বাম হাতের বজ্র কঠিন মুঠিতে ধরা সেই বিরাট বাদুড়টার গলা। ধীরে ধীরে বাঁকা কালো নখগুলো চেপে বসেছে বাদুড়টার গলার চামড়ায়। নারী মূর্তিটি যেন রাগে ফুঁসছে। হঠাৎই দেখলাম চোখের সামনে ম্যাজিকের মতো বাদুড়টা হওয়ায় মিলিয়ে গেল।
“আমি না সেই মুহূর্তে কেমন যেন হয়ে গেছিলাম, মানে কী ঘটছে কেন ঘটছে বা আদৌ কি কিছু ঘটছে নাকি আমি স্বপ্ন দেখছি, সব চিন্তা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছিল।
“বাদুড়টি মিলিয়ে যাওয়ার পরই হঠাৎ নারী মূর্তিটি আমার দিকে মুখ ফেরায়, উফ ওইরকম মুখ আমি জীবনে দেখিনি। যদিও পুরো মুখটাই চুলে ঢাকা প্রায়, ঘরে আলোও অপ্রতুল কিন্তু স্বয়ংপ্রভ একজোড়া চোখ আর ঠোঁটের কোণের স্বদন্ত দুটো যেন ঝিলিক মেয়ে উঠল। মূর্তিটি ক্রমশ আমার মুখের আরও কাছে এগিয়ে আসতে থাকে, একটা অদ্ভুত চড়া গন্ধ আমার চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে থাকে। একটা হিসহিস কণ্ঠ ক্রমাগত বলতে থাকে, ‘আমাকে খেতে দে, আমি ক্ষুধার্ত… ‘
“কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখতে পাই যে ওই মূর্তিটার মুখ নড়ছে না। আমি না আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না আমার নার্ভ আর নিতে পারে না, মাথাটা ঘুরে যায় আর তার পর চোখের সামনে সব কাল।”
একটানা এতক্ষণ কথা বলে সমর এবার থামল। দেখলাম ও জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছে, ওর মানসিক চাপটা ঠিক কতটা সত্যি বুঝতে পারছি। আমার জীবনে সনৎ ঠাকুর না আসা পর্যন্ত এ সব বিষয় আমার ও একটাই মত ছিল… ‘বুজরুকি’
আসলে সনৎ ঠাকুর একটা কথা ঠিকই বলেন বিজ্ঞানের মতো আমরা কখনও এই বিষয়গুলোর অধ্যয়ন বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে চাইনি তাই এ বিষয়গুলো আমাদের কাছে অস্পষ্ট। আর যা কিছু আমাদের জানার বাইরে তাকে বুজরুকি, ভণ্ডামি এসবের নাম দিয়ে আমরা দায় এড়িয়ে যাই। অথচ এই পশ্চিমি বিজ্ঞানের বহু
বহু হাজার বছর আগে জিরোর আবিষ্কার বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপেরশন এর চল এদেশেই শুরু হয়। আর সেই ঋষি মুনিদের হাত ধরেই তৈরি হয় ধার্মিক মন্ত্র আচার ইত্যাদি। সব কিছুরই কিছু না কিছু যৌক্তিকতা আছে কিন্তু আমরা সেগুলো জানতে চাই না, বুঝতে চাই না। ঠাকুর বলেন অবিশ্বাসও অন্ধবিশ্বাসের মতোই ক্ষতিকর।
সনৎ ঠাকুর, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“হুম, তারপর কী করলে?”
“পরের দিনই সকালে জ্ঞান ফিরতেই ওই বাড়ি ছেড়ে চলে আসি, আর যায়নি। সাহস হয়নি থাকার।”
“তা এত গেল তোমার নতুন বাড়ির কথা, সমস্যা তো এখনও শেষ হয়নি, এবার আসল বিষয়টা বল।”
সমর যে বেশ অবাক হয়েছে ওকে দেখেই বুঝতে পারছি।
“আপনি…আপনি তো…”
নিজেকে চট করে সামলে নেয় সমর। আমি বিষয়টা একটু ঘোরানোর জন্য বললাম,
“মালদা তো ঢুকে গেছি, মালদার ঠিক কোথায় রে তোদের বাড়িটা?”
“জগজ্জীবনপুরের ওই দিকে।”
সনৎ ঠাকুর কথার খেই ধরে বলেন,
“হিস্টোরিকালি খুব সমৃদ্ধ জায়গা। পাল যুগের বৌদ্ধমঠের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।”
“হ্যাঁ, আসলে আমি এসব তেমন… তবে আমার বড়ো ঠাকুমা মানে ঠাকুর দাদার বড়ো বউদি, ছিলেন ইতিহাসে এমএ সেই যুগের। আমার ঠাকুমা নাকি এক অনেক পুরোনো পারিবারিক পুথি পেয়েছিলেন সেটা নাকি মাগধী নাকি ভাষায় লেখা আর তার থেকে তিনি নাকি অনেক অদ্ভুত বিষয় জেনেছিলেন এবং সেগুলো ট্রান্সলেট করেছিলেন বাংলায়। তাতে নাকি জানা গেছিল আমাদের বংশ আসলে বাংলায় মুসলিম ইনভেশন এর অনেক আগে থেকেই আছে। এ ছাড়াও নাকি আরও কীসব জেনেছিলেন না কি, তাই নিয়ে পরিবারে খুব অশান্তি হয়। তারপর একদিন তিনি নাকি গৃহ ত্যাগ করেন। কেউ তার কোনও খোঁজ পায়নি। আর উনি চলে যাওয়ার পর বড়ো দাদুও কেমন যেন হয়ে যান। আমার ঠাকুর দাদা তখন অনেক ছোটো। শুনেছি ঠাকুমার সেই ডায়েরি নাকি আমাদের বাড়িতেই কোথাও একটা আছে, বড়ো ঠাকুমাই নাকি লুকিয়ে রেখেছিলেন অনেক খুঁজেও পাওয়া যায়নি। সবই শোনা কথা অবশ্য।”
সনৎ ঠাকুরের চোখটা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল যেন। তবে শান্ত কণ্ঠেই বললেন,
“এবার বল, এবাড়িতে ঠিক কী…হয়েছে?”
তারপর সমর যা বলল, সেটা বলতে গিয়ে ও মাঝে মাঝেই খেই হারাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল সেই বীভৎস অভিজ্ঞতা জেঁকে বসে আছে ওর মনে। ও চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে সেগুলো আবার। সেই বিভীষিকা যাপন করছে পুনরায় আর মাঝেমধ্যেই অন্যান্য প্রসঙ্গও এনে ফেলছে। ওর কথাটা গুছিয়ে বললে যা দাঁড়ায় তা হল…
ওদের নতুন বাড়িতে ওই তিনরাত কাটিয়ে ও চিনি আর ইন্দ্রাণীকে মালদার বাড়ি রেখে আসে। ওর মা তখনও ফেরেননি। ও দু’দিন পর ফিরে আসে কলকাতায়। প্রথম কয়দিন সব ঠিক থাকে। দিনান্তে ইন্দ্রাণী আর চিনির সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ ভিডিয়ো কলে কথা বলত সমর। তখনও ওর নতুন বাড়ির সেই একা থাকার রাতের ঘটনাটা ঘটেনি।
এমনই একদিন চিনি ওর বাবাকে একটা নতুন শেখা নাচের অংশ করে দেখাচ্ছিল। ঘরের মেঝেতে সমর দেখে চিনির দুটো ছায়া পড়েছে, বিষয়টা একটু চোখে লাগে কেননা ঘরের আলোয় উৎস একটা, এবং সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রাণীকে ডাকে দেখে ইন্দ্রাণীর ছায়া একটাই। তবে সমর চেপে যায় ভাবে এভাবে কিছু বললে ওরা ভয় পেয়ে যেতে পারে। ইন্দ্রাণী শুধু কথায় কথায় বলে এবারে বাড়িতে ফিরে ওর কেমন যেন মনে হচ্ছে। ঠিক কী মনে হচ্ছে বোঝাতে পারল না। তবে একটা অদৃশ্য সমরের মনটা খচখচ করতে থাকে। কিন্তু কাজের ব্যস্ততায় ফেঁসে গেল। আর ব্যস্ততার কারণেই হয়তো বিষয়টা মাথা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ইতিমধ্যে ওর মা-ও বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। তার ঠিক কয়দিন পর ওর সঙ্গে নতুন বাড়িতে ওই অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটে। এবং তারপর দিনও পত্রপাঠ বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ি ফিরে কিছু একটা অনুভব করে। মানে কেমন যেন শূন্যতা গ্রাস করেছে। এমনিতেই বিশাল বাড়ির সাপেক্ষে মানুষ কম। বাড়ির বেশিরভাগ অংশই এখন অব্যবহৃত। বিশেষ করে দক্ষিণের দিকটা যেটাকে ওরা দখিণ বাড়ি বলে। ওইদিকের ঘরগুলোতে ওরা লুকোচুরি খেলেছে ছোটোবেলায়। বরাবরই এদিকটা অব্যবহৃত কিন্তু এমন কখনও মনে হয়নি। আছে শুধু এক পুরোনো মন্দির। কিন্তু অব্যবহৃত হলেও পোড়ো হয়ে যায়নি, নিয়মিত যত্নে সব ঠিকঠাক আছে।
সন্ধেবেলা সবাই বসে টিভি দেখছে হঠাৎ হরিদাসী দিদি গজগজ করতে করতে এসে বলে কে নাকি তাকে বড্ড জ্বালাচ্ছে, খালি কানের কাছে ফিসফিস করে কে যেন, কী সব বলছে। সমররা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারে না। তার কয়দিন পর সন্ধের দিকে খামারের পূর্বদিকের রাস্তা দিয়ে ঠিকে ঝি-টি যখন বাড়ি ফিরছিল তখন ঝাঁকড়া ডুমুর গাছটায় নাকি কি বা কিছু দেখে সে মারাত্মক ভয় পায়। সেদিনের পর থেকে সে সন্ধের পর আর ও বাড়িতে থাকতে চাইত না। তারপর থেকে…
কিন্তু সমর এই পর্যন্ত বলার পরই থেমে যেতে বাধ্য হল কেননা আমাদের গন্তব্য এসে গেছে।
গাড়ির শব্দ শোনা মাত্রই বিশাল প্রেতের মতো সিংহ দরজাটা ক্যাচ ক্যাচ করে খুলে গেল। গাড়িটা একটা বিরাট উঠোনের মাঝে এসে দাড়াল। উঠোন না বলে এটাকে ছোটো মাঠ বলা যায়। ডান পাশে সার দিয়ে ঘর আর সামনে টানা বারান্দা। বাম পাশে বেশ কিছুটা ফাঁকা তার পর গাছ গাছালি, উঠোনটা টপকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেলে একটা বেশ উঁচু পাঁচিল আর সেই পাঁচিল আর একটি বেশ বড়ো দরজা। এই উঠোন বা মাঠটায় দু’ তিনটি উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা আছে।
গাড়ি থেকে নামা মাত্র আমি ঠাকুরের মুখের এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করলাম। এখন আমি এ বিষয় বেশ দড় হয়ে গেছি। ঠাকুরের প্রতিটি অভিব্যক্তির আঁকি বুকি ঠিক বুঝে যাই। ঠাকুর এখন চিন্তিত, চমৎকৃত এবং কিছুটা দ্বন্দ্বে আছেন সোজা ভাষায় অল্প কনফিউস। সমর চাকরকে গাড়ির থেকে ব্যাগগুলো নামাতে বলতে বলতেই দেখি ঠাকুর নিজের মনে হাঁটা দিয়েছেন। সমর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল আমি বাধা দিলাম।
“একটু দাঁড়া, এখনই কিছু বলিস না, চিন্তা নেই…”
“মানে…মানে উনি এরকমই… মানে একটু অন্যরকম!”
“দেখ উনি যে ঠিক কি করে কি বোঝেন তা আমিও জানি না, উনি হোম যজ্ঞ করেন না, তাবিজ কবচও দেন না, নিজেকে মায়ের সাধক ইত্যাদি ও বলেন না। ওঁর মতে উনি সনাতন ধর্মের নির্যাসটা বুঝতে চান। ধর্মের ক্ষমতাকে যে আজ কাল বুজরুকির সঙ্গে এক করে দেখা হয় উনি সেটা ভুল প্রমাণ করতে চান। ঈশ্বরের উপলব্ধি বা কৃপা প্রার্থনার জন্য বাহ্যিক আড়ম্বরের দরকার হয় না।
ভীষণ আটপৌরে একজন মানুষ তবে বিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি ওঁর সত্যি কিছু অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, আর তথাকথিত মহাত্মাদের থেকে খানিক বেশিই আছে। তবে ওঁকে আমিও সম্পূর্ণ বুঝি না। তবে ভীষণ ভরসা করতে পারি।
এই যে উনি নিজের মতো করে ওদিকে গেছেন আসলে উনি কিছু একটা নিশ্চয়ই সেন্স করেছেন।”
“ওহ মানে সাইকিক বলছিস?”
“সাইকিক শব্দটা ওঁকে বোঝানোর জন্য যথেষ্ট নয়।”
ওরা ভিতর বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতেই দেখে ঠাকুর একটু হন্ত দন্ত হয়ে ওদের দিকেই আসছেন।
“আচ্ছা ওই দিকটা কি আছে?”
“ওই দিকটা দখিণ বাড়ি বলি আমরা। অব্যবহৃত আর এক কালের এ বাড়ির মন্দির ছিল।”
“ছিল…এখন নেই?”
“না না আছে…আসলে…আচ্ছা আমি সবটা গুছিয়ে না বললে আপনি ঠিক বুঝবেন না। পপি ভিতরে চলুন।”
বাড়ির ভিতরে এসে এমন কিছু দেখব আমি ভাবিনি। প্রায় ভোর রাত এখন। আমরা হাতে মুখে জল দিয়ে একটা বেশ বড়ো ঘরে বসলাম। চাকর সঙ্গে সঙ্গে গরম চা আর কিছু খাবার নিয়ে এল। সমর একটু বাড়ির ভিতরে গেছে। রাস্তার এত ঘণ্টার ধকল কাটানোর জন্য আমি আর ঠাকুর শুধু চায়ের পেয়ালা দুটো তুলে নিলাম। কিছু খাওয়ার মতো মানসিকতা আমাদের এখন নেই। তা ছাড়া এ বাড়িতে ঠিক কী বিপর্যয় হয়েছে সেটা কিন্তু সমর সবটুকু বলেনি।
ঠাকুর এখনও কিছু একটা হিসেব মেলানোর চেষ্টা করেই চলেছেন। কিন্তু আমি আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না।
“ঠাকুর…”
বাকি কিছু বলতেও হল না, ঠাকুর চোখটা বন্ধ করে চিন্তিতভাবে বললেন,
“বড্ড জটিল, বুঝলে হে রুদ্র…জটিল। এখানে যুদ্ধটা শুভ অসুভের মতো সহজ নয়। অন্ধকার খারাপ, আলো ভালো…কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত আলো কি ভালো?”
কথাগুলো আমার উদ্দেশ্যে বললেও ওঁর বলার ভঙ্গিমা বলে দিচ্ছে উনি যেন নিজেকেই কথাগুলো বলছেন।
“মাত্রাতিরিক্ত আলো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, প্রকারান্তে গাঢ় আঁধারের মতো সেও দৃষ্টিকে ব্যাহত করে…অন্ধ করে।”
স্বগতোক্তির মতো বিড়বিড় করলাম আমি। ঠাকুর কিছু বললেন না আর।
হঠাৎ বাড়ির ভিতরে থেকে একটা আতঙ্কিত মেয়েলি চিৎকার শুনে আমরা চমকে উঠি। সমর উৎকণ্ঠিত মুখে প্রায় দৌড়ে আসছে আমাদের দিকে।
অজ্ঞাত আতঙ্কে মনটা কুঁকড়ে গেল, কী হল আবার?
***
ভ্যাপসা গরমে রাতে ঘুম আসছিল না সুলোচনার। ঘুম না এলে মাথায় অনেক কথা পাক চক্কর দেয়। পুথিগুলোর বিষয় কি? কেন ওভাবে ওগুলো লুকিয়ে রাখা ছিল? কি রহস্য আছে? কালীমতি ওকে এভাবে কেন এড়িয়ে যায়?
আর কালীমতির বলা কথাগুলোও তো ঠিকই। বাবা ওকে এত স্নেহ করেন কিন্তু পরোক্ষে কালীমতির থেকে দূরত্ব কেন রাখতে বললেন! এই পুথির কথা আর কে কে জানে?
প্রশ্ন প্রচুর কিন্তু উত্তর নেই কোনটারই। হঠাৎই আবার সেই মন্ত্র গম্ভীর উচ্চারণ! আজ এর কারণ তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। পা টিপে টিপে সে নেমে আসে এক তলায় এবার শব্দটিকে অনুসরণ করে এগোতে থাকে। পূর্ণিমা গেছে কয়েকদিন আগে ভগ্ন স্বাস্থ্য চাঁদ চোয়ানো আলো টুকুই ভরসা। আজ সুলোচনা দৃঢ় প্রত্যয়। শব্দের উৎস সে জেনেই ছাড়বে। ক্রমশ শব্দের তীব্রতা বাড়ছে। মানে সুলোচনা সঠিক পথেই এগোচ্ছে। এ বাড়ির চত্বর বিশাল। গৃহ দেবীর মন্দিরটা বাম দিকে রেখে সে এগিয়ে চলে। মন্দিরের ভিতর টিম টিম করে একটা প্রদীপ জ্বলেছে।
বাড়ির এদিকে আগে সে আসেনি। এক টানা অজানা কোনও রাত চড়া পাখি কিটির কিটির স্বরে ক্রমাগত একই লয়ে ডেকেই চলেছে। মন্ত্র গম্ভীর স্বর সঙ্গে রাত্রির শব্দ মিশে কেমন এক ঝিম ধরা আবহ তৈরি করেছে। সুলোচনা ভীতু না মোটেই। কিন্তু অনিশ্চিত পথের এই যাত্রা খানিক হলেও তার মনকে বিকল করেছে।
পায়ে পায়ে সে বাড়ির চত্বর পেরিয়ে পিছনের ফুল আর ফলের বাগান পেরিয়ে কখন যে খিড়কির দরজা পার করে ফেলেছে খেয়াল নেই। খিড়কি দরজা পার করে মাত্রই মনে হল এ কোনো অন্য জগতে সে এসে পড়েছে। মনে হচ্ছে এ যেন আলাদাই জগৎ। হঠাৎ করেই যেন একটা শীতল বলয় ওকে ঘিরে ধরেছে। ভাদ্র মাসের পচা গরম যেন নিমেষে উধাও।
একটা অদ্ভুত গন্ধ পাচ্ছে ও, কিছুটা চন্দন অগুরু মেশানো তবে তার সঙ্গে একটা বিশ্রী আঁশটে কিছু। গন্ধটা আঘ্রাত পূর্ব। এদিকটায় গাছ গাছালি বেশি। ঝুপসি অন্ধকার ও বেশি। চোখ বুজে বোঝার চেষ্টা করে শব্দের উৎসটা। পা বাড়ায় সেই দিকে কিন্তু এমন কিছু যে সে দেখবে তা ওর কল্পনার ও অতীত ছিল।
একটা বিশাল গাছের নীচে একটা ছোট্ট ধুনি জ্বলছে। তার সামনে বসে এক পুরুষ তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। মন্ত্র গম্ভীর স্বরে সে একটানা মন্ত্র পাঠ করেই চলেছে।
সুলোচনা খানিক অবাক হয় এত দূর থেকে কী করে সে এই শব্দ শুনতে পেল! লোকটির সামনে কোনও সেরকম পূজার উপকরণ নেই। শুধু একটা বড়ো পাত্র আছে। আর একটা কলাপাতায় মোড়া কিছু একটা।
পায়ে পায়ে আরও একটু এগিয়ে যায় সুলোচনা। মন্ত্রের প্রাবল্য বাড়ছে আর তার সঙ্গে যেন ধুনির আগুনের লেলিহান শিখার আকারও বাড়তে থাকে। ধকধকে লালচে আলো মহীরুহের পুরুষ্ট পাকানো কাণ্ডের গায়ে পড়ে এক অপার্থিব আলো ছায়ার চিত্রপট তৈরি করেছে। হঠাৎই অকারণেই গাছের পাতাগুলো বিনা বাতাসে পাগলের মতো আন্দোলিত হতে থাকে। আর তার পর যা ঘটে তার জন্য বিন্দুমাত্র তৈরি ছিল না সুলোচনা।
হঠাৎই গাছের গুঁড়ির পিছন থেকে বেরিয়ে আসে এক ভীষণ দর্শনা নারী। না সে সুন্দরী যুবতি না। সে শুষ্ক কাষ্ঠ প্রায়। যেন একটা জীবন্ত কঙ্কাল। মলিন বসন, কোমরে গলায় একাধিক সাপ জড়িয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে। কোমরবন্ধনী থেকে ঝুলছে একটা চকচকে দা এর মতো অস্ত্র। আর তার সমগ্র অবয়বের সঙ্গে ভীষণরকম অমানানসই একটি পদ্ম ফুল ধরে আছে ডান হাতে। ফুলটি গাঢ় নীল বর্ণ। এতটাই গাঢ় যে দূর থেকে কালো বলে ভ্রম হয়।
মাথা থেকে বটের ঝুড়ির মতো নেমে এসেছে এক রাশ জটা জুট। আর সেই লম্বিত জটার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে নরকরোটির উপবীত। তবে করোটিগুলো আকারে খুব ছোটো, তবে কী ওগুলো শিশুদের…! কথাটা ভাবতেই মাথাটা ঘুরে গেল যেন সুলোচনার! চোখ দুটো ঘোলাটে যেন মৃত মানুষের চোখ। কিন্তু মারাত্মক লোভাতুর সেই চোখের দৃষ্টি। মুখের চামড়া শুষ্ক রুক্ষ কুঞ্চিত। আর সব থেকে ভয়ংকর হল, অসংখ্য তীক্ষ্ণ শলাকার মতো সম্মুখপ্রসারিত দত্ত পঙ্ক্তি। যেন মূর্তিমান হিংস্র শ্বাপদ।
কিন্তু পূজারী এই ভীষণ রূপ দেখে বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়। বরং সে আরও জোরে মন্ত্র পাঠ শুরু করেছে।
মূর্তিটি সামনে পেতে রাখা ছালের বা চামড়ার আসনে বসল। এতক্ষণে আর একটা জিনিস লক্ষ করল সুলোচনা, চর্ম আসনটি হরিণ, ভাল্লুক বা বাঘের না, ওটা একটা মানুষের চর্ম আসন! আসনের সামনে স্পষ্ট একটি শুষ্ক বিকৃত নরমুণ্ড। চোখের কোটর ও ঈষৎ ফাঁক হয়ে থাকা মুখ গহ্বরটি শূন্য… ফাঁকা!
নিজের পায়ের ওপর শাসন নেই সুলোচনার, কখন যে অনেকটা কাছে পৌঁছে গেছে সেটা তার খেয়াল নেই।
বিকট বৃদ্ধা মূর্তিটি লোলুপ দৃষ্টিতে সামনের পাত্র ও কলা পাতার মোড়ক টির দিকে তাকিয়ে আছে। কি আছে ওগুলোয়? এবার পুরুষটি মন্ত্র পাঠসমাপন করে,
“ওঁ এঁ হাঁ ক্লী চামুণ্ডায়ৈ চর্চিকেওই বিচ্চে’–বলে ভূমিষ্ট হয়ে প্রণাম করে কলাপাতার মোড়কটি খুলে দেয়। সুলোচনা বিশ্বাস করতে পারে না সে যেটা দেখছে, একটি হৃদপিণ্ড! পশুর না মানুষের তা জানে না সুলোচনা। বৃদ্ধাটি হাত না ব্যবহার করে মুখ দিয়েই খেতে থাকে তাজা হৃদপিণ্ডটি, বিশ্রী কচমচ শব্দে গা গুলিয়ে ওঠে ওর, তবে বীভৎসতার শেষ এখানেই না। এবার পুরুষটি পাত্র তা এগিয়ে দেয়। বৃদ্ধা মুখ ডুবিয়ে দেয় তাতে। পশুর মতো খাচ্ছে সে। তবে ভীষণ তৃপ্তি করে খাচ্ছে। খানিক পরে সে পাত্র থেকে মুখ তোলে।
তার মুখের অর্ধেক অংশ মুখের পাশে ঝুলে পড়া কিছু জটা চুল আর বিশেষ করে তার শলাকা নিন্দিত বীভৎস দন্ত পঙ্ক্তিগুলো রক্ত সিঞ্চিত! রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে জটার শেষাংশ থেকে। রক্তিমাভ আগুনের রং মিশে ওই রক্ত স্নাত পৈশাচিক মুখটি আরও বীভৎস লাগছে। সুলোচনা বিশ্বাস করতে পারছে না তার নিজের চোখকে! মাথা ঘুরছে শরীর খারাপ লাগছে। অসাবধানতাবশত আর ঘটনার আতিশয্যে হঠাৎই তার মুখ ফসকে ‘ওমা গো’ শব্দটি বেরিয়ে আসে আর ঠিক তখনই ক্ষিপ্র গতিতে কেউ একজন তাকে গাছের পিছনে টেনে নেয়। সুলোচনা কিছু বলা বা করার আগেই একটা হাত ওর মুখে চেপে বসে। অন্ধকারে কিছু বুঝতে পারে না সুলোচনা। সে প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই চাপা গলায়,
“শ শ শ নতুন বউ চুপ কোনও আওয়াজ করো না…”
কথাটি বলে ওঠে যে ওর মুখ ধরেছিল। কালীমতি!
সুলোচনার শব্দেই হোক বা অন্য কারণেই হোক পুরোহিতটি এবার ওদের দিকে মুখ ঘোরায়, পুরোহিতের মুখটি বড্ড চেনা সুলোচনার!
পূজারীর তীক্ষ্ণ কানকে ফাঁকি দিতে পারেনি সুলোচনা। পূজারী চকিতে পিছন ফিরে দেখে একটি চেনা শাড়ির আঁচল গাছের পিছনে লুকিয়ে পড়ছে। মনে মনে সন্দিহান হয় সে। কিন্তু এটা সঠিক সময় নয়। সঠিক সময় আসলে সে সঠিক কাজটা সে সমাধা করবে। মুখের পাশে ক্রুর এক চিলতে হাসি খেলে গেল তার। বৃদ্ধা অন্তরহিতা। পূজার অবশেষ আর প্রসাদের উচ্ছিষ্টস্বরূপ কিছু চাপ চাপ রক্তের দাগ পড়ে রইল।
পূজারীর প্রস্থানের বেশ কিছুক্ষণ পর সুলোচনা আর কালীমতি ফিরে আসে। কোনও কথা না বলে যে যার ঘরে চলে যায়। বাকি রাতটা দু’চোখের পাতা এক করতে পারে না সে। এ কোন্ বাড়িতে এসে পড়েছে সে! বৃদ্ধাটিই বা কে? দেবী দানবী নাকি …অন্যকিছু? কী রহস্য আছে এই বংশের? কালীমতির বলা কথাগুলো ভীষণ প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে এখন। কেন এ বংশে কোনও দেবতার পুজো হয় না, কেন নেই লক্ষ্মী আসন ও ঘট! কেন বাড়ির মেয়ে বউরা পুজো করে না? কুলদেবী আসলে কোন্ দেবী! কী নাম তাঁর! কেন কেউ জানে না? বাড়ির ঠাকুরের। মন্দির কিন্তু বাড়ির সবাই কেন সেখানে যেতে পারে না? কেনই বা পুরোহিত পুজো করে না! আর আজ পুরোহিত এর আসনে কেন ছিলেন সুলোচনার নিজের শ্বশুরমশাই?
অনেক অনেক প্রশ্ন! কিন্তু উত্তর…উত্তর কোথায় পাবে ও? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চোখ পড়ে পুথিগুলোর ওপর। এবং সঙ্গে সঙ্গেই তার মাথায় খেলে যায় অদ্ভুত বুদ্ধি। সে কাগজ কলম নিয়ে বসে। পুথির লেখাগুলো হুবহু নকল করে চিঠিতে লিখে দেয়। এবং দাদাকে লেখে,
“দাদাভাই আমি জানি না এ কোথায় আসিয়া পড়িয়াছি আমি, তবে ইহার শেষ আমি দেখিব, পরে তোমায় সব লিখিব বিস্তারে। এক্ষণে চিঠিতে চর্যাপদী ভাষায় যাহা লিখলাম তুমি যত শীঘ্র সম্ভব তাহার পাঠোদ্ধার করিয়া আমাকে পাঠাও। চিঠিতেই পাঠাইও, বিষয়টি যথাসম্ভব গুপ্ত রেখ। তুমি এখনই এখানে আসিও না, আমি সঠিক সময় তোমাকে পুনরায় চিঠি লিখিব।”
পরদিন চাকরের হাতে কাছারি বাড়িতে চিঠি পাঠিয়ে দেয় সে। কেউ বিশেষ নজর করে না বিষয়টি কেননা সুলোচনা নিয়মিত তার দাদাকে চিঠি পাঠাত। কাছারির অন্য দরকারি চিঠির সঙ্গে সুলোচনার দাদার চিঠিও পোস্ট করে দেওয়া হয়।
সুলোচনা জানে অন্তত দিন দশেক অপেক্ষা করতেই হবে। অপেক্ষার প্রহর বড্ড লম্বা। কালীমতি আগের মতো ওর সঙ্গে গল্প করতে আসে না। কিন্তু সুলোচনার সেই রাতের পর কালীমতির সঙ্গে অনেক কথা বলার আছে। দুদিন পরে সুলোচনার শ্বশুর ব্যবসার কাজে দু’দিনের জন্য বাইরে যায় আর সেই সুযোগে কালীমতি সুলোচনার ঘরে দেখা করতে আসে। তবে সে বেশ ত্রস্ত যেন কেউ তাকে দেখে না ফেলে।
“নতুন বউ, আমি আগেও দেখেছি, কাউকে বলিনি জানি কেউ মানবেনি।”
“কালী দিদি আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না…!”
“তুমি কেন বউ, এ গুষ্টির কেউই বোঝে না বা বুঝলেও মুখ খোলে না কেন তা জানিনে। তবে আমার সোয়ামী বলেন এবাড়িতে থাকতে হলে কান আর চোখ দুই বুজতে শেখ।”
“মানে?”
“মানে আমিও জানি নে বউ, তবে এ ঘটনা নিয়মিত ঘটে, কোনও বিশেষ দিন ক্ষণ আছে বোধহয় কখনও ফি মাসে কখনও সারা বছরে একবার এ ঘটনা ঘটে। কুলদেবী ভোগ খায়।”
“কী…! এ কীরকম দেবী দিদি?”
“কী জানি ভাই, কিছু জানি নে, মেয়ে মানুষ নাকি যত কম বোঝে সংসারে সুখ তত বাড়ে। তবে দেবীর মহিমে আছে, আমার শউর বলেন যে, এ বংশ নাকি অক্ষয়, সেই মোছলমান নবাব এর আগেও পাল রাজাদের সময় থেকে টিকে আছে। এই অঞ্চলে এমন পুরোনো বংশ আর একটাও নেই সব মরে হেজে গেছে।”
“ওহ… পাল বংশ। সে তো প্রায় আটশো ন’শো…”
“শোন বউ, তুমি কাউকে বুঝতে দেবে না তুমি সেদিন কিছু দেখেছ, দেবী কাউকে মারে না…তবে…।”
জানলা দিয়ে বাইরে কাকে যেন দেখে কালীমতি কথা অসম্পূর্ণ রেখেই সন্ত্রস্তভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। এরপর কালীমতির সঙ্গে সুলোচনার আর কথা হয়নি।
ইতিমধ্যে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ওর দাদার চিঠি আসে। ব্যস্ত হাতে চিঠিটা খোলে সুলোচনা। পুথির তর্জমা ছাড়া একটা ছোটো চিঠি দিয়েছে দাদা।
“বোন, আমি কি পড়িলাম তাহা অবিশ্বাস্য। যে পুথি তুমি পাঠাইয়াছ তাহা কোনও ধর্ম গ্রন্থ বা সাহিত্য বিষয়ক নহে বরং তাহা এক অদ্ভুত ইতিহাসের দলিল। বলা যায় কেহ একটি ডায়েরি লিখিয়া গিয়েছিল তাহার উত্তরসূরিদের কিছু বিষয় অবগত করিবার নিমিত্তে।
তবে লেখায় বেশ কিছু অসংগতি এবং সঠিক তারিখ ইত্যাদির উল্লেখ না থাকায় নির্দিষ্টভাবে বলতে পারি না এটি কত সনে রচিত। তবে ইহা যে পাল যুগের শেষ অংশে রচিত তাহাতে কোনও দ্বিমত নেই।
আমি নিজে সবটুকু পাঠোদ্ধার করিয়া আমার প্রফেসরকে দিয়ে সেটি সংশোধন করিয়া পাঠাইতে খানিক সময় বেশি লাগিয়া গেল। আসলে বিষয়বস্তু এতটাই অবিশ্বাস্য যে নিজের জ্ঞানের প্রতি সন্দিহান হইয়া পড়িয়াছিলাম। জানিনা অখিলেশ এই সব জানে কিনা। তবে এ এমনই অদ্ভুত আখ্যান যে বোধকরি জানিলেও সে তাহা নিজ মুখে স্বীকার করিবে না। কিন্তু সে জানুক বা না জানুক আমি তোমাকে শ্বশুর বাটি হইতে লইয়া আসিব। ও বাটি বাসযোগ্য নহে।
সুলোচনা এক নিশ্বাসে সবটুকু পড়ে ফেলে। পড়ার পর কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ়ভাবে বসে থাকে। যা সে পড়ল তা হতে পারে! শুধুমাত্র বংশ বীজ বাঁচিয়ে রাখতে এমন পদক্ষেপ কে নেয়! কি লাভ সেই রাজ রক্তের যার পরিচয় গুপ্ত ও লুপ্ত। কালের অমোঘ স্রোত প্রবাহে এক সময় রাজা প্রজা সবাই একই পলিতে স্থিত হয়। এ তো আশীর্বাদ না, এ তো সাক্ষাৎ অভিশাপ!
কিছুদিন আগে হলে হয়তো সুলোচনা এসব কোনও কথাই বিশ্বাস করত না কিন্তু সে রাতের ঘটনার পর সবটাই সে বিশ্বাস করে।
পরদিন সকালে বিশ্রী মেয়েলী গলার বিলাপে ঘুম ভাঙে সুলোচনার। কাজের মেয়েকে জিজ্ঞেস করতে সে বলে,
“কালীমতি মা ঠাকরেন পুকুরে ডুবে মরিচে …”
বজ্রাহতের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কথাটা আত্মস্থ করতে চেষ্টা করল সুলোচনা। নীচে গিয়ে দেখে কালীমতির ফ্যাকাশে সাদা শরীরটি তুলে উঠোনে রাখা হয়েছে। সুলোচনার একটি বিষয় অদ্ভুত লাগে শরীরটি বেশিই সাদা, যেন রক্ত শূন্য। গত রাতে জলে ডুবলে এই কয়টি ঘণ্টায় শরীর এতটা সাদা হতে পারে না। আর গলার কাছে গভীর এক ক্ষতের দাগ। কালীমতির শাশুড়ি কাঁদতে কাঁদতে জানায়,
“খোকা না হওয়ার দুক্কে কালী বউ গলায় বঁটি দিয়ে কেটে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যি করেছে।”
কথাগুলোর একটিও বিশ্বাস করেনি সে। কথাগুলিতে এতটাই অসংগতি ছিল যে-কোনো সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই তা বিশ্বাস করবে না। তাছাড়াও কথাটা যে সর্বৈব মিথ্যে তা সুলোচনা জানে কেননা কালীমতি দিদি কয়দিন আগে নিজে মুখে তাকে সুখবরটি দিয়েছিল। এবং এও বলেছিল এখনও সে কাউকে বলেনি। আরও মাস খানেক পর জানাবে।
কেবলই মনের মধ্যে এক সংশয় পাক দিচ্ছে। রাতে ঘুমোতে পারছিল না সে হঠাৎ কানে আসে সেই দূরাগত মন্ত্র গম্ভীর সুর। আবারো আজ কাঁচা হৃদপিণ্ড আর রক্তের ভোগ খাবে কুলদেবী! কার রক্ত! কালীমতি দিদির শরীরটা অমন রক্ত শুন্য কেন দেখাচ্ছিল? বিচারবোধ সব যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে ওর।
সুলোচনা মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল।
কী মনে হতে সুলোচনা একটি চামড়া বাঁধানো ডায়েরিতে তার এযাবৎ কালের সমস্ত অভিজ্ঞতা, তার সংশয়, তার অনুমান এবং তার শ্বশুরমশাইয়ের ওই বীভৎস পূজা নৈবেদ্য দান। এবং অবশ্যই তার দাদার ওই পুথির পাঠোদ্ধারের মর্মসার সব লিপিবদ্ধ করে রাখে। এ ডায়েরি তাকে লুকিয়ে ফেলতে হবে সুরক্ষিত স্থানে। যদি কালীমতির মতো ওরও পরিণতি হয় তাহলে এই সত্য কোনো না কোনো দিন সামনে আসবেই আর এই সর্বনাশা নিয়মের অন্ত বিধান হবে। ভালোভাবে বিষ কর্পূর মাখিয়ে কয়েক পরত সালু কাপড় জড়িয়ে ডায়েরিটা লুকিয়ে ফেলে। তবে কাউকে তো বলে যেতে হবে তার স্বামীকে এসব চিঠিতে বলে বোঝানো সম্ভব না, তা ছাড়াকে জানে তার স্বামী অখিলেশ এসব কিছুই জানে কি না! সে না হয় পরে সময় করে তিনি ফিরলে বুদ্ধি করে গুছিয়ে বিষয়টা বলতে হবে। তাহলে কাকে বলবে ও…! হঠাৎ ওর ছোট্ট সঙ্গী ওর দেওর নিখিলেশ এর কথা মনে পড়ে। একমাত্র তাকেই ভরসা করতে পারে সুলোচনা। সে ছোটো মানুষ, নিশ্চই পারিবারিক বীভৎসতা সম্পর্কে কেউই তাকে কিছু জানায়নি এখনও। পরদিন সকালে সে নিখিলেশকে বলে সে একটা ডায়েরি লিখেছে। তাতে আছে এই বংশের ইতিহাস, সেই পাল রাজবংশের সময় থেকে এ বংশ আজও কীভাবে বেঁচে আছে যে তার ইতিহাস। তা শুধু সে নিখিলেশকেই দেবে, আপাতত লুকিয়ে রেখেছে।
“কিন্তু বউদিদি তুমি তখন কোথায় যাবে আর আমি যদি খুঁজে না পাই?”
“জানি না ভাই, তখন যদি না থাকি তাই এখন দিলাম। আর খোঁজার জন্য একটা ছড়া শিখিয়ে দিচ্ছি এটা মুখস্থ রাখবে। এবংশের অদ্ভুত ইতিহাস আর চির মুক্তির পথ রইল এই বইতে। এ যে তোমাকে জানতেই হবে ভাই। তুমি যখন স্কুল পাস করে কলেজ যাবে তখন তুমি ওই ডায়েরিটা খুঁজে বের করে পড়বে। মনে থাকবে? তার আগে না। আর এটা শুধু তুমি আর আমি জানি, আর কেউ না।”
নিখিলেশ শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। বউদিদির কথা সে অমান্য করবে না।
এবার দাদাকে চিঠি লেখে,
“তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে এই নরক থেকে লইয়া যাও দাদাভাই।”
দাদা আসে এবং সুলোচনাকে ওর শ্বশুরের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও এক প্রকার জোর করে নিয়ে রওনা হয়।
তার পর আর কোনো দিন শ্বশুরভিটায় তার পা পড়েনি। অখিলেশ কর্ম সমাধা করে ফিরে এসে জানতে পারে তার স্ত্রী কুলত্যাগী হয়েছে। কলকাতায় তার বন্ধু ও শ্যালক সুবিমল এরও কোনও খবর সে পায় না। সুলোচনার পিতৃগৃহের দরজার তালায় জং আর অখিলেশের মনে অবসাদের পড়ত বাড়তে থাকে বিগত প্রতিটি ঋতুর সঙ্গে। সুলোচনার বিরহে দিনে দিনে সমাজ সংসার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয় অখিলেশ। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সে সুলোচনার স্মৃতি আঁকড়ে তার অবাস্তব প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশায় কাটিয়ে দেয়। নিখিলেশ দাদাকে কিচ্ছুটি বলে না, তার বউদিদির বারণ যে।
***
শব্দের প্রাবল্য এতটাই ছিল তাতে বুঝতে অসুবিধা হয়নি বিষয়টা কতটা জটিল।
“কী হয়েছে সমর? ও কার চিৎকার?”
সমর আমার কথার উত্তর না দিয়ে ঠাকুরের সামনে দু’হাত জোর করে বলে,
“ঠাকুর কিছু করুন আমার চিনি মা-কে বাঁচান… আমি তো বলার সুযোগই পেলাম না সবটা, ঠাকুর…”
একজন বাবা ঠিক কতটা অসহায় হয়ে পড়লে এভাবে ভেঙে পড়ে বুঝতে বাকি রইল না। ঠাকুর বললেন,
“আচ্ছা, তুমি সব পরে বলো খন, এখন চিনির কাছে জমাকে নিয়ে চল।”
আমরা বেশ লম্বা দু’টি দালান পেরিয়ে বেশ কয়েকবার ডানদিক বামদিকে মোড় নিয়ে একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম।
দরজা অল্প ফাঁক। দরজার বাইরে ইন্দ্রাণী আর একটি মহিলা হয়তো কাজের বউ দাঁড়িয়ে আক্ষরিক অর্থে ঠক ঠক করে কাঁপছে।
ঠাকুর এখানে এসে যেন একটি অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খেলেন। ওঁর মুখের রেখায় বিস্ময় প্রকট। বোঝা যাচ্ছে যা তিনি অনুধাবন করছেন তা তিনি কখনোই আশা করেননি। দরজার ওপর থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন
“ভিতরে চিনি একা নাকি কেউ আছে ওর সঙ্গে?”
উত্তরটা ইন্দ্রাণী দিল।
“মা আছেন, উনিই ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে ছিলেন আমরা এখানে এসে দেখি দরজা এটুকুই খোলা আর খোলা যাচ্ছে না, ওই তো দেখুন মা অজ্ঞান হয়ে নেতিয়ে পড়েছেন বিছানার ওপর।”
“আচ্ছা, এখন আমি যা বলব তোমরা তার বেশি নিজেদের থেকে কিচ্ছুটি করবে না। সমর এখানে আর কোনও ফাঁকা ঘর আছে কি?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ এই তো উলটো দিকের ঘরটা আছে, গোছানো কিন্তু অব্যবহৃত।”
“বেশ এবার শোনো, ঘরে আমি একা ঢুকব এবং চিনিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে এসে ঠিক বিপরীতের ঘরটিতে ঢুকব, দরজা খুলে রাখবে, আমরা যখন এখান দিয়ে যাব কেউ কোনও শব্দ করবে না কথা বলবে না। আমরা ঢুকে গেলে ঘরে দরজাটা আস্তে করে টেনে ভেজিয়ে দেবে। আমি না বেরিয়ে আসা পর্যন্ত চুপচাপ অপেক্ষা করবে, ভয় নেই চিনির কিছু হবে না।”
এবার সমর ওঁর কথামতো বিপরীতের দরজাটা খুলে দিল। ঠাকুর ওঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী ঝোলাটি থেকে কি একটা বের করে হাতের মুঠিতে শক্ত করে ধরে সেই হাতটি যে ঘরে চিনি আছে সেই ঘরের দরজার পাল্লার ওপর রাখামাত্রই দরজাটা ধীরে খুলে গেল। ঘরের ভিতরে একটা হালকা কম পাওয়ারের আলো জ্বলছে, ভোরের আলো ফোটেনি বাইরে। জানলাগুলো বন্ধ। সমরের মা বিছানায় লুটিয়ে আছেন। চেতনা নেই। আর চিনিকে কোথাও দেখা গেল না। ঠাকুর খুব চাপাস্বরে কোনও একটা মন্ত্র পড়ে চলেছেন ওঁর চোখ বন্ধ। উনি ওই চোখ বোজা অবস্থায় অনায়াসে কোনও আসবাব ঠোক্কর না খেয়ে খাটের পিছনের দিকে এগিয়ে যান। আর তারপর ঠিক একটি উন্মত্ত বন্যপশুর মতো চিনির ছোট্ট শরীরটা ঠাকুরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঠাকুর যেন প্রস্তুতই ছিলেন। এক লহমায় তিনি কায়দা করে ওকে জড়িয়ে নিজের বুকের কাছে ধরে ফেলেন। এবং এমনভাবে চিনির মাথাটা দু’হাতে জড়িয়ে ধরেন যাতে চিনির কান ও চোখ দু’টি চাপা পড়ে। ওই অবস্থায় ওকে প্রায় কোলে করেই খুব জোরে জোরে,
“ওঁ আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক শক্তি বিনাশয়চ। শোত্রমথবলমিন্দ্রিয়ানি চ সর্বাণি। ময়ি সন্তু তে ময়ি সন্তু। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।”
মন্ত্রটি ওর কানের কাছে পাঠ করতে করতে ওকে অন্য ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেন। প্রথমে চিনি মারাত্মক ছটফট করলেও মন্ত্রপাঠের পর ধীরে ধীরে সে স্তিমিত হয়। সমর, ঠাকুরের বলা কথানুসারে দরজার পাল্লা ভেজিয়ে দেয়। দরজা বন্ধের আগে দেখলাম ওই মন্ত্রটি ঠাকুর পড়েই চলেছে উচ্চৈস্বরে। এবং শেষে উনি চিনির দু’পায়ের পাতায় মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেন। চিনি এখন সমাহিত শান্ত। আমরা উৎকণ্ঠিতভাবে দরজার বাইরে অপেক্ষা করতে থাকি। ঠাকুর মিনিট পাঁচ পর বেরিয়ে আসেন।
“চল সমর, এবার সবটা গুছিয়ে বলবে। চিনি দিদিভাই এখন খানিকক্ষণ ঘুমবে। বউমা ঘুম ভাঙলে ওকে একটু গরম দুধ খাইয়ে দিও আর হ্যাঁ একজন ডাক্তারবাবুকে খবর দিয়ে রাখো। ওঁকে এখানে আগামী কিছু ঘণ্টা থাকতে হতে পারে সুতরাং বিশ্বস্ত ও পরিচিত হলে ভালো হয়।”
ইন্দ্রাণী বলল, ওর এক সম্পর্কের দাদা আছে। তিনিই বরাবর চিনিকে দেখেন। তাকেই এখনি ফোন করে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে কাকিমার জ্ঞান ফিরেছে ওঁকে বিশ্রাম নিতে বলা সত্ত্বেও উনিও আমাদের সঙ্গে এসে বসলেন। একমাত্র নাতনির এই বিপদে ঘুম ওঁর আসবে না।
ঠাকুর বললেন,
“এবার আপনারা বলুন… সমর ওই বাড়ির সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি কিন্তু এবাড়ির সম্পর্কে তেমন কিছু তবে…”
কথাটা বলতে বলতে অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলেন ঠাকুর, নিজেকে সামলে নিলেন সবার অলক্ষ্যে, তবে আমার নজর এড়ালো না।
ইন্দ্রাণী শুরু করে,
“আমরা গৃহপূজার পর এবাড়িতে ফিরে আসি। মা ছিল না। তবে ঠাকুর চাকর হরিদাসী দিদি আর একজন ড্রাইভার ছিল। সমর দিন দুই পর কলকাতা চলে যায়। যে পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। তবে বাবা গত হয়েছেন বছর খানেকের একটু বেশি। তারপর থেকেই কিছু বিষয় ঘটেছিল। আমি অবশ্য এগুলো মানি না, আমি কিছু প্রত্যক্ষ ও করিনি তবে, বাড়ির কাজের লোকরা সন্ধের পর ভয় পাচ্ছিল। বিশেষ করে বাড়ির পিছন দিকে খিড়কি খামারের দিকটায়। ওদিকটাই যাতায়াতের জন্য বেশি ব্যবহার হয়। হরিদাসী দিদি কানে কম শোনেন কিন্তু এযাবৎ উনি খালি বলছিলেন কে যেন মাঝে মাঝে তাঁকে কানের কাছে কি সব বলে বিরক্ত করছে। কিন্তু কেউ কোথাও নেই।
আমি এগুলো নিয়ে বদার করিনি। কিন্তু এর কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন চিনি পাশের মাঠে খেলতে গেছিল, সঙ্গে একটা কাজের মেয়ে যায়, তো খেলার সময় বাচ্চাদের মধ্যে কিছু ঝামেলা হয় তো একটি ছেলে যে কিনা চিনির থেকে বেশ কিছুটা বয়সে বড়ো ওকে মারার জন্য হাত তোলে হঠাৎ আমাদের কাজের মেয়েটি দেখে চিনির এক ধাক্কায় সেই বছর দশেকের বাচ্চাটি ছিটকে দূরে গিয়ে মাটিতে পড়ে। কাজের মেয়েটি দৌড়ে পৌঁছোনোর আগেই ঘটনাটা ঘটে যায়। তারপর দিন দুই এক ওকে মাঠে পাঠায়নি বাড়িতেই খেলছিল। বাড়ির চত্বরটা বেশ বড়ো। আর লোকজন তো থাকেই তাই আলাদা করে নজর রাখতে হয় না।
আমি বিকেলের দিকে কিছু স্টুডেন্টদের গান-এর ক্লাস করাই। সেদিন একটু দেরি হয়ে গেছিল। প্রায় সন্ধের মুখে ঘরে ওর ঘরে গিয়ে দেখি ও ঘরে নেই। সঙ্গে সঙ্গে সবাই চার দিকে খুঁজতে থাকি, প্রায় আধ ঘণ্টা খোঁজ করার পর দখিণ বাড়ির দিকে ঠাকুর মন্দিরের পিছনে ওকে পাওয়া যায়। কেমন ঘোরের মধ্যে ছিল। আমরা ওকে খুঁজে পাওয়ার পর কেমন অদ্ভুতভাবে কাউকে কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে যায়। সেদিনের পর থেকে ওর ব্যবহার ক্রমশ বদলে যেতে শুরু করে।”
ইন্দ্রাণী একটু থেমে আবার বলে,
“মানে একটা চার বছরের পুঁচকে বাচ্চা হঠাৎ করে পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতো ব্যবহার করতে থাকে। আর আমি তো মা, আমার না ওর চোখটা বড্ড অচেনা লাগত…ঠিক বোঝাতে পারব না, কিন্তু মনে হত ও আমার মেয়ে না। ওর চোখের ভিতর মন দিয়ে তাকালে যেন বর্তমান ভবিষ্যৎ কোনও কিছুর অস্তিত্ব আছে মনে হত না, যেন মূর্তিমান মহাশূন্য। একটা অদ্ভুত বৈরাগ্য ভাব মনকে ঘিরে ধরত, মনে হত জীবনের এইসব টান সম্পর্ক সব কিছু মোহ শুধু ওই মহাশূন্যই শাশ্বত।”
সমরের মা মানে কাকিমা হঠাৎ মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন। বললেন,
“এই পর্যন্ত হলে তবু না হয় ঠিক ছিল যে ছেলেমানুষের খেয়াল, কিন্তু…কিন্তু কয়েকদিন পরে রান্নার ঠাকুর বাজার রেখে আমার কাছে জানতে এসেছিল কি রান্না হবে। তার পর সে রান্না ঘরে ঢুকেই আর্ত চিৎকার করে ওঠে, আমরা সবাই দৌড়ে যাই গিয়ে দেখি…দেখি…মানে চিনি উবু হয়ে বসে কি যেন করছে, ওকে ডাকতে কোনও উত্তর দেয় না তার পর ওর কাঁধ ধরে টান দিতেই ও মুখ ঘোরায় দেখি সারা মুখে রক্ত মেখে কাঁচা মাংসগুলো চিবচ্ছে! সমু তখন কলকাতায়।”
ইন্দ্রাণী কথার খেই ধরে বলে,
“আমি সমরকে বিষয়টা বলে বিব্রত করতে চাইনি কেননা কলকাতার বাড়ির ঘটনা নিয়েও এমনিই টেন্সড ছিল। আমি এখানেরই একজন সাইক্রিয়ারটিসকে কনসল্ট করি। ওঁর মতে এটা একটা ফর্ম অফ Lycanthropy, এটা একটা মেডিক্যাল কন্ডিশন। যাতে মানুষ নিজেকে কোনও কারণে পশুভাবে আর সেইভাবেই ব্যবহার করে। মেডিকেশন চলল কিন্তু দিন দিন আরও ডিটোরিয়েট করতে থাকে। ওষুধের ডোস বাড়ে। ওষুধের প্রভাবে সারাক্ষণ ঝিমিয়ে থাকে। চোখ মুখ বসে গেছে, কথা বলে না খেলে না এমনকি খায়ও না। তবে ঘুমের ঘোরে মাঝেমধ্যেই বলে ওঠে আমাকে খেতে দে, খিদে বড্ড খিদে… কিন্তু…”
কথা শেষ করতে পারে না ইন্দ্রাণী গলা ধরে আসে কান্নায়। সমর বলে ওকে যখন জানানো হয় ও কলকাতার নাম করা এক ডাক্তারকে নিয়ে আসে। অনেক টেস্ট হয় ওই একই ডায়াগনোসিস হয়। Lycanthropy.
“জানেন ঠাকুর আর একটা অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করছি ও স্পর্শ পছন্দ করছে না, মানে ওর মা ঠাকুমা বা অন্য কোনও মানুষের স্পর্শ একদম পছন্দ করছে না। যখন সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল তখন আপনার কথা মনে এল। আমার মেয়েটাকে বাঁচান ঠাকুর।”
ঠাকুর ওর কাঁধে ভরসার হাত রাখে।
আমি এতক্ষণ শুনছিলাম, বললাম আচ্ছা ওর স্কুলে কোনও ঘটনা বা ট্রমা…ইন্দ্রাণী বলল,
“আমরা ওকে নিজেরাই পড়াই রুদ্রদা, ওই হোম স্কুলিং বলতে পারো। এখন কোনও স্কুলে দিইনি। কলকাতায় গিয়ে একেবারে পাঁচ বছরে স্কুলে ভরতি করব।”
কাকিমা সনৎ ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করলেন
“কোনও হাওয়া বাতাস লেগেছে কি… মানে ভূত প্রেত?”
“না মা, বরং উলটো…”
“মানে…!”
“পরিষ্কার নয় মা, আরও কিছু জানার আছে। তার আগে আমাকে আপনাদের ওই মন্দিরের ওখানে নিয়ে যাবেন যেখানে চিনিকে আপনারা খুঁজে পেয়েছিলেন।”
মন্দিরটা বাড়ির চত্বরের মধ্যেই তবে বেশ কিছুটা দূরে। যেন বাড়ির ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে বানানো। বাড়িটি পুরোনো কিন্তু মন্দিরটি যেন আরও অনেক বেশি পুরোনো, আর স্থাপত্যরীতিটাও অন্যরকম।
“চতুষ্কোণ ভীত, ধাপে ধাপে তৈরি বেদি…পদ্মাকৃতি, ক্রমহ্রস্বায়মান দণ্ড…” কথাগুলো নিজের মনেই বিড়বিড় করছিলাম ভাবতে পারিনি ঠাকুর শুনেছেন আমার মুখের কথা টেনে বললেন,
“পাল যুগের বৌদ্ধস্তূপগুলির স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য।”
ঠাকুরের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। ঠোঁট দুটো ঈষৎ নড়ছে, শুনলাম খুব চাপা কণ্ঠে নিজের মনেই ছাড়া ছাড়াভাবে কিছু বলছেন,
“জীবন্ত, ভীষণ জীবন্ত… বন্দি…এও কী হতে পারে!”
এমন কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ঠাকুর কাকিমার দিকে ফিরে বললেন,
“মা মন্দিরটি কি ভিতর থেকে দেখা যায়? এখন মন্দিরটি কি পরিত্যক্ত?”
“হ্যাঁ যান দেখুন না…”
ভিতরে ঢুকলাম। একটা কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বালিয়ে দিল সমর। ইন্দ্ৰাণী বা কাকিমা কেউ এলেন না।
পোড়া মাটির ইটের তৈরি মন্দির। একটি পাথরের লাস্যময়ী প্রায় ভঙ্গুর নারী মূর্তি আছে। যেটুকু বুঝলাম একটি পুরুষের শবের ওপর দাঁড়ানো নারীটি, তার সর্বাঙ্গে সাপের অলংকার, কাঁধের ওপর থেকে আড়াআড়িভাবে উপবীতের মতো করোটির মালা। পায়ে মোটা মল বা নূপুর। কোমরবন্ধের সঙ্গে ঝুলছে একটা দা (কাটারি) জাতীয় অস্ত্র। আর মূর্তির পায়ের কাছে বসে আছে একটি শিয়াল জাতীয় প্রাণী।
পুজো নিয়মিত হয় না, পায়ের সামনে কিছু শুকনো পাতা আছে। পূজার উপকরণ নৈবেদ্য কিছুই নেই।
আমি একটা জিনিস লক্ষ করলাম মন্দিরটি পরিত্যক্ত কিন্তু অগুরু, চন্দন আর চাঁপা ফুলের মিশ্র একটা গন্ধ বাতাসটা ভারী করে রেখেছে।
“এই মন্দির তো পরিত্যক্ত!”
কাকিমা একটু আমতা আমতা করে বলেন
“আসলে ওর বাবার মৃত্যুর পর থেকে আর…”
সমর বলল,
“আসলে…আসলে জানি না আপনারা কীভাবে নেবেন বিষয়টি তবে আমাদের বাড়িতে অদ্ভুত এক নিয়ম আছে মানে আমাদের কুলদেবীকে বহু যুগ আগে কেউ পেয়েছিলেন ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এবং এই দেবীর পুজো বাড়ির কোনও মেয়েরা করতে পারেন না, এমনকি এ বাড়িতে অন্য কোনও ঠাকুরের পুজো ও হত না। বাবাকেও দেখেছি মাসে একটি নির্দিষ্ট দিনে সারা রাত জেগে দেবীর পুজো করতে, আমাদের সে সময় আসা মানা থাকত।
নিয়ম…এটাই জেনে এসেছি কিন্তু কোনও প্রশ্ন কিরিনি। তবে মৃত্যুর আগে বাবা একবার আমাকে কিছু বলবেন বলেছিলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত সুযোগ হয়নি, বাবার শেষ সময় আমি কাজের সূত্রে বাইরে ছিলাম।”
আমি বললাম “এটা কোন্ দেবীর মূর্তি?”
দেখে অবাক হলাম সমর বা কাকিমা এটা জানেন না। কাকিমা বললেন,
“বরাবর কূলদেবী হিসেবেই জেনে এসেছি, কোন্ দেবী এটা আমার শ্বশুরশাশুড়িও জানতেন না…!”
“পুজো হয়, অথচ কোন্ দেবী তা কেউ জানেন না! স্ট্রেঞ্জ!”
ইন্দ্রাণী ইতস্তত করে বলে,
“আমারও এটাই মনে হত রুদ্রদা, কিন্তু পরে ভেবেছিলাম হয়তো কোনো লোকায়ত বা লৌকিক দেবী যিনি সেই সময় খুব প্রচলিত ছিলেন এখন তেমনটা আর নেই, তাই হয়তো সবাই নামটা জানেন না। জানি বিষয়টা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য না, তবু এটাই আমার এনালাইসিস বলতে পারো।”
ঠাকুরের ভিতর একটা চাঞ্চল্য খেয়াল করছি। পকেট থেকে কিছু একটা বের করে দু’হাতের তালুতে মধ্যে নিয়ে দু’হাতের তালু ঘষতে ঘষতে কিছু একটা বিড়বিড় করতে থাকেন। তারপর হঠাৎ সমর, কাকিমা ও ইন্দ্রাণীর মাথায় হাত দিয়ে,
“মন্ত্রঃ আ পর ব্রহ্ম পরমাত্মনে নমঃ মম শরীর। পাহি-পাহি কুরু-কুরু স্বাহা।” পাঠ করেন। ওরা স্বাভাবিকভাবেই হকচকিয়ে যায়।
“আমি আপনাদের দেহ বন্ধন করে দিলাম, আর এরপর থেকে যাইহোক না কেন বিচলিত হবেন না। চিনি দিদিভাই যাই বলুক যাই করুক বিশ্বাস করবেন না, জানবেন এখন ও আপনাদের ঘরের মেয়ে নয়। আমি দিদিভাইকে শান্ত করে ঘরে শুইয়ে দিতে গিয়ে অনুভব করেছি, যে আছে সে মহাশক্তিশালী। সে কিন্তু তোমাদের ক্ষতিসাধন করতে চায় না কিন্তু…কিন্তু সে রুষ্ট। চুক্তি ভঙ্গ হয়েছে, সে যে ক্ষুধার্ত। বহুকালের খিদে তার।
কপাল দোষে এসবের মধ্যে চিনি দিদিভাই পড়ে গেছে। কিন্তু…কিন্তু… কী সেই চুক্তি কেন ত্রাতা আজ হস্তায় রূপান্তরিত! জানতে হবে…জানতে হবে এর আদি কথা! না হলে চিনি দিদিভাইকে বের করে আনা অসম্ভব হবে।”
ঠাকুরের কথা শেষ হওয়ার আগেই উপরের বারান্দা থেকে একটি কাজের মেয়ে মুখ ঝুলিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
“বউদিমণি গো, চিনি দিদিরে ঘরে পাচ্ছি না!”
“মানে? তোমার তো ওর ঘরেই থাকার কথা ছিল নাকি…”
কথাগুলো বলতে বলতে ওপরের ঘরের উদ্দেশ্যে দৌড়োয় ইন্দ্ৰাণী সঙ্গে আমরাও।
মেয়েটি কাচুমাচুভাবে বলে,
“চিনি দিদি ঘুম ভেঙে উঠে বলে ওর খিদে পেয়েছে, সে তার চোখমুখীর সেকি তেজ ভাব, আমি ভয় পেয়ে যাই, তাই আমি চট করে ওর জন্য এক গেলাস দুধ আনতে যাই কিন্তু যাওয়ার আগে বাইরে থেকে দরজার আগোল দিয়ে গেছলাম গো, তার পর এসে দেখি দিদিমণি ঘরে নেই!
“ঠাকুর, ঠাকুর আমার মেয়ের কী হবে! ওকে কোথায় পাব ঠাকুর… ঠাকুর…”
কান্নায় ভেঙে পড়ে ইন্দ্ৰাণী।
“বউমা, কিছু হবে না, আমাকে একটু বিষয়টা বুঝে নিতে দাও, গল্পের অনেকগুলো পরিচ্ছদ মাঝখান থেকে উধাও। তবে ঠিকঠাক সমাপ্তির জন্য সবটুকু জানা দরকার।”
ঠাকুর সমরকে বললেন, যে ওঁর কিছু বিষয় জানা দরকার। উনি যতক্ষণ সেগুলো জানার চেষ্টা করছেন সেই সময় সমর যেন চিনিকে খুঁজে নিয়ে আসে। আমি অবাক হয়ে বললাম,
“কোথায় খুঁজব ঠাকুর?”
উনি ওর হাতে একটা কাঠের গুলির মতো কিছু দিয়ে বললেন,
“এটা হাতের মুঠোয় রেখে ইষ্ট নাম স্মরণ করতে করতে যাবে যখন দেখবে এই জিনিসটা প্রচণ্ড গরম হয়ে উঠেছে তুমি আর হাতে ধরে রাখতে পারছ না, বুঝবে গন্তব্যে পৌঁছে গেছ। আর এটা সম্পর্কে কাউকে কিছু বলবে না।
সমর একটি চাকর আর ড্রাইভারকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
কাকিমা ব্যাকুল হয়ে বললেন,
“কিন্তু ঠাকুর আমার নাতনি…ওর কিছু হয়ে গেলে!”
“মা ভয় পাবেন না, বিচলিত হবেন না, আচ্ছা একটা কথা বলুন তো আপনার স্বামীর মৃত্যুর আগে কিছু কি বলেছিলেন বা ওঁর মৃত্যুর পর ঠিক কী কী পরিবর্তন এ বাড়িতে হয়েছে? বা এমন কিছু কী হয়েছে যা জীবনে এ বাড়িতে ঘটেনি আগে?”
“পরিবর্তন তো কিছু তেমন… ওহ হ্যাঁ, আমাদের বাড়িতে অন্য কোনও দেবতার পূজার রেওয়াজ ছিল না। এমনকি কোনও ঠাকুরের ছবিও দেখিনি কখনও। দেবী ওই কুলদেবীই ব্যাস। আর পুজো মাসে একবার সারারাত জেগে উনিই করতেন, শেষের হার্ট অ্যাটাকের পর ডাক্তার ওপর নীচ করতে মানা করেছিলেন, হাঁটা চলাও খুব একটা পারতেনও না অশক্ত শরীরে কিন্তু কেমন যেন ছটফট করতেন, বলতেন পূজা না হলে বড়ো বিপদ হতে পারে। ভোগ না দিলে বড়ো সর্বনাশ হবে, কিছু বলতে চাইতেন কিন্তু বলতেন না।
শেষের দিকে বলেছিলেন সমুকে ডাকতে, ওঁর নাকি অনেক কিছু বলার আছে কিন্তু সমরও কলকাতায় তখন। ফোন করা মাত্র ও রওনা হয় কিন্তু আসার আগেই সব শেষ।
তো ওঁর মৃত্যুর পর সমর যখন থাকত ওই দেবীর মন্দিরে মিষ্টি, বাতাসা বা ধুপ প্রদীপ দিয়েছে কয়বার কিন্তু পুজো দেওয়ার খানিকক্ষণ পরই গিয়ে দেখেছে সেই প্রসাদ যেন পচে উঠেছে বা পোকা খাচ্ছে। ফুলগুলো কয়েক ঘণ্টায় এমন শুকিয়ে যেত যেন কত দিনের পুরোনো। আমিই তখন বারণ করলাম যে বলা যায় না দেবী হয়তো পুজো নিতে চাইছেন না। আর বাড়ির সার্বিক মঙ্গল কামনার জন্য একটা সত্যনারায়ণের সিন্নি দিলাম। ব্যাস এটাই, এ বাড়িতে এই
প্রথম অন্য কোনও দেবতার পুজো হল।”
“বুঝলাম, তা মা আপনাদের বাড়ির যে এই নিয়ম মানে মহিলারা পুজো করতে পারবেন না, এমনকি অন্য কোনও দেবতার পুজা হবে না, এগুলো সম্পর্কে কিছু জানতে মন চায়নি?”
“আসলে আমাদের সময় তো আমরা অত প্রশ্ন করতাম না গুরুজনদের, যা বলতেন মেনে নিতাম। আর কত পরিবারেরই তো কত নিয়মটিয়ম থাকে… তাই।”
ইন্দ্রাণী এতক্ষণ সব শুনছিল, ও বলল,
“আমার অদ্ভুত লাগত বিষয়টা, এমন আমি জীবনে শুনিনি। তো আমার বিয়ে হয়ে আসার পর দাদু মানে সমরের ঠাকুরদাদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি পরিষ্কার বলে দেন যে বাড়ির নিয়ম তিনি ভাঙতে পারবেন না, তাতে নাকি আমাদেরই ক্ষতি। এ পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এবাড়ির পুরুষদেরই দায় নিতে হবে। কথাগুলো ভীষণ অদ্ভুত লাগত আমার। আরও একটু জেদাজেদি করতে বলেন ওঁর বড়ো বউদি নাকি এমন ভুলটাই করেছিলেন। উনি সবটা জেনেছিলেন আর তার ফল ভালো হয়নি।
ওঁর লেখা ডায়েরি উনি এবাড়িতে কোথাও একটা লুকিয়ে রেখেছিলেন, এবং ছোট্ট ঠাকুরদাদাকে একটা ছড়ার ধাঁধা শিখিয়ে গেছিলেন বলেছিলেন বড়ো হয়ে তিনি নাকি এই ধাঁধার সাহায্যে ওই ডায়েরি খুঁজে পাবেন। আর জানতে পারবেন অনেক অজানা ইতিহাস।”
ঠাকুর উৎসুক হয়ে বললেন ডায়েরিটি কী পাওয়া গেছিল।
“নাঃ, দাদু তখন অনেক ছোটো ছিলেন আর ওই ধাঁধার ছড়া তাঁর মনেও ছিল না, তাই সে ডায়েরি খুঁজে পাওয়া যায়নি তবে সেটা এ বাড়িতেই আছে।
ঠাকুরের চোখ উজ্বল হয়ে ওঠে, উনি আমাকে বলেন,
“আচ্ছা কোনও কিছু লোকাতে হলে কোথায় লুকানো বুদ্ধিমানের কাজ রুদ্র?”
“উম…যেটা নিজের চোখের সামনে থাকবে। অথচ কেউ বুঝবে না যেমন নিজের ঘর।”
ইন্দ্ৰাণী বলল,
“অথবা একদম চোখের সামনে যেখানে অমন জিনিস বহু আছে, যাতে
কারোর মনে সন্দেহ না হয়।”
“ঠিক…ঠিক বলেছ বউমা…ওই ডায়েরিটা পেলেই…বড্ড দরকার ওটা। আচ্ছা এ বাড়িতে কোনও বইয়ের আলমারি বা পুরোনো বইয়ের বক্স জাতীয় কিছু আছে?”
“বাক্স কি বলছেন ঠাকুর, একটা গোটা লাইব্রেরি ঘর আছে তিন তলায়!”
“ভৈরব সহায়..” বলে ঠাকুর কপালে দু’হাত জোড় করে ঠেকালেন। এতক্ষণে যেন তিনি একটা দিশা পেয়েছেন। ঠিক তখনই ইন্দ্রাণীর ফোনটা বাজল। চিনিকে পাওয়া গেছে। আশ্চর্যভাবে বাড়ির চত্বরের মধ্যেই ছিল মেয়েটা। দক্ষিণ বাড়ির পিছনে যেখানটায় বেল, ড্যাপল আর আমড়া গাছগুলো জড়াজড়ি করে জঙ্গল তৈরি করেছে যেখানে সাপ খোপের ভয় দিন মানেও কেউ যায় না। সেখানে ও নাকি সংজ্ঞাহীনভাবে পড়ে ছিল। কিন্তু এত খোঁজ খুজির সময় ও কী করে আগে কেউ ওকে ওখানে পায়নি কে জানে।
ওরা ওকে নিয়ে আসছে।
ইতিমধ্যে পুব আকাশে আলোর রেখা ফুটেছে। ইন্দ্রাণীর ফোন পেয়ে তার ডাক্তার দাদা এসে পড়েছিলেন, ডক্টর বিকাশ দেব। ইন্দ্রাণী সংক্ষেপে পুরোটা ওঁকে বুঝিয়ে দিয়েছে।
চিনিকে নিয়ে সমর যখন ফিরল ও তখন অজ্ঞান। বাচ্চাটার মুখ দেখে মনেটা বসে গেল আমার। ছোট্ট মানুষ কিন্তু মুখে যেন বয়সের কালিমা, কণ্ঠার হাড় জেগে উঠেছে গালটা ভেঙে গেছে। হাতপাগুলো শীর্ণ কঙ্কালবৎ। কে বলবে কিছু মাস আগের সেই ফুটফুটে পুতুলের মতো মিষ্টি চিনি আর এই চিনি একই মানুষ। সমরের আর ইন্দ্রাণীর ওপর দিয়ে যে কি যাচ্ছে তা ভালোই অনুভব করতে পারছি। মনে মনে ঈশ্বরকে বললাম বাচ্চাটাকে সুস্থ স্বাভাবিক করে দাও। ওকে ঘরে নিয়ে গিয়ে শোয়ানো হল। ঠাকুর ডক্টর বিকাশ দেবকে আগে ওকে পরীক্ষা করতে বললেন।
উনি প্রাথমিক পরীক্ষা করে একটা ইনজেকশন দিলেন। সঙ্গে ওঁর সহকারী ভদ্রলোকটি একটা স্যালাইনের ব্যবস্থাও করলেন। উনি সেইভাবেই তৈরি হয়ে এসেছিলেন। বললেন বিপি খুব কম সঙ্গে মারাত্মক এনিমিক। যেন শরীরে রক্ত আর বাকি নেই।
বললেন ও এখন ঘুমবে কিছু ঘণ্টা। ইন্দ্রাণীকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন উনি সারাক্ষণ মনিটর করবেন কোনও চিন্তা নেই।
আজ সকাল টা যেন বড্ড মন মরা। ঠাকুর বলেছিলেন বটে আজ সূর্যগ্রহণ ঠাকুর চিনির মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখলেন বেশ কিছুক্ষণ, তার পর ওর ছোট্ট হাতের তালু আর কপালটা ভালো করে দেখলেন কিছুক্ষণ। ভ্রূর সরল রেখা ক্রমশ কুঞ্চিত হচ্ছে, আমি এর আগে কোনওদিন ঠাকুরকে এতটা বিচলিত বা চিন্তিত দেখিনি। হঠাৎই সমরের মুখের খুব কাছে গিয়ে মন দিয়ে ওর ও কপাল টা দেখলেন, তার পর খানিক নিজের মনে কি ভেবে নিয়েই একটু উত্তেজিতভাবে সমর আর ইন্দ্রাণীকে বললেন,
“আমাদের হাতে সময় কম, ভৈরব বড়ো চড়া পরীক্ষা নিচ্ছেন। আজ সূর্যগ্রহণ তার ওপর তোমার মেয়ের জন্ম ‘নক্ষত্র গণ্ডান্ত’ যোগে। আমি সারাক্ষণ চিনি দিদিভাইকে নিয়ে চিন্তা করছিলাম কিন্তু, বিপদ তোমাদের ওপরও কিছু কম নয়।”
ইন্দ্ৰাণী বলে “সেটা কী?”
“রেবতী ও অশ্বিনীর সন্ধিক্ষণে, অশ্লেষা ও মঘার সন্ধিক্ষণে এবং জ্যেষ্ঠা মূলের সন্ধিক্ষণে গণ্ডান্ত হয়। রেবতী, জ্যোষ্ঠা অশ্লেষা নক্ষত্রের শেষের ৪৮ মিনিট, অশ্বিনী, মঘা ও মূলের শুরুর ৪৮ মিনিট নক্ষত্র গণ্ডান্ত হিসেবে মানা হয় আর নক্ষত্র গণ্ডান্তর মতো তিথি ও লগ্ন গণ্ডান্ত ও হয়। চিনির হাতে তিনটি যোগই আছে এই যোগ যুক্ত জাতক জাতিকার বাবা ও মায়ের জীবন বেশ কঠিন হয়। তার ওপর আজ সূর্যগ্রহণও।”
কাকিমা বললেন,
“কিন্তু ঠাকুর, আমার নাতনি আমার ছেলে বউমা তো কারুর কিছু ক্ষতি করেনি তাহলে ওদের জীবনে এসব কেন…!”
“মা পূর্ব পুরুষের পুণ্য ফল যেমন আমরা ভোগ করি তেমনই তাদের পাপ লিপ্সার দায়াধ ও বর্তাই আমরা।”
সমর বলল,
“পূর্ব পুরুষের পাপ লিপ্সা! কিন্তু ঠাকুর….”
ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ঠাকুর বললেন,
“যে করেই হোক তোমার বংশের ইতিহাস সম্বলিত সেই ডায়েরি খানা খুঁজে পেতেই হবে, বউমা তোমাদের লাইব্রেরিতে নিয়ে চল আমাকে।”
তিনতলার লাইব্রেরির ঘরটা খোলা মাত্র একটা একটা ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে ধাক্কা দিল। লাইব্রেরিটা নিয়মিত ব্যবহার হয় না দেখেই বোঝা যায় তবে অবহেলিত নয় সেটাও বোঝা যায়। ইন্দ্রাণী বলল,
“দাঁড়ান আমি গিয়ে ঘরের জানলা দুটো খুলে দিচ্ছি, আসলে নিয়মিত ব্যবহার তো হয় না তাই বছরে দু’বার লোক দিয়ে ঝাড় পৌঁছ করিয়ে কীটনাশক ইত্যাদি দিয়ে রাখি, তারই গন্ধ।”
আমি আর ঠাকুর দরজার দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি আবারও ঠাকুরের মুখ পড়তে চেষ্টা করছিলাম, ঠাকুর হঠাৎ স্মিত মুখে বললেন,
“বুঝলে হে লেখক, আমরা খামখাই চিন্তা করি, কার্য কারণ খুঁজতে চেষ্টা করি, ভুলে যাই ভৈরব সব আগে থেকেই ছকে রেখেছেন। যিনি আছেন তিনি তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করবেন বলেই কবে থেকে মঞ্চ বেঁধেছেন, এগুলো তো হওয়ারই ছিল। এখন আমাদের শুধু খণ্ডগুলো জোগাড় করে পর পর সাজিয়ে গোটা ছবিটা বানাতে হবে।”
আমি স্বাভাবিকভাবে কিছুই বুঝলাম না তবে জানি যে এই সময়ে জিজ্ঞেস করে কোনও সদুত্তরই পাব না। সুতরাং চুপ থাকাই বাঞ্চনীয়। খানিক স্বাগতোক্তির মতো আবার ঠাকুর বললেন,
“এবারের অভিজ্ঞতাটা একদম ভিন্ন হবে বুঝলে রুদ্রবাবু…!”
“কী রকম?”
“একই সঙ্গে দৈব আর দৈত্য দুইয়ের প্রভাব এ বাড়িতে, আবার দুজনেই তথা কথিত অশুভ নয়। শুভ তবে উগ্র। তোমায় বলেছিলাম না আঁধার আমাদের দৃষ্টি ঢাকে, ঠিক তেমন মাত্রাতিরিক্ত আলো ও আমাদের চোখ ঝলসে দেয়।”
আবার ও কিছুই না বুঝে চুপ করে থাকাটাই শ্রেয় মানলাম।
সমর আর ইন্দ্রাণীর সঙ্গে আমরাও হাত লাগিয়েছি। বইগুলো যত্নে আছে তবে আদরে নেই। এর মানে যারা বই ভালোবাসে তারাই কেবল বুঝবে। বইগুলো থাকে থাকে সাজানো আছে, পোকা মাকড়ের থেকে সুরক্ষিত ও করা হয়েছে তবে বিষয়বস্তু বা সন ইত্যাদি মিলিয়ে ক্রোনোলজিকালী সাজানো নেই। সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্ম এমনকি বার্ষিক পত্রিকা সব একসঙ্গে। কাজটা কঠিন জানতাম কিন্তু এখন অসম্ভব ঠেকছে। ঠাকুর ঘড়িটা দেখে বিড় বিড় করলেন “সময় বেশি নেই, পুষ্যা নক্ষত্র যোগের আগেই সমাধা করতে হবে।”
ঠাকুর লাইব্রেরি ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে, দুহাত জোড় করে মাথায় ঠেকিয়ে
“ওম হৃীং শ্রীং ক্রীং পরমেশ্বরী কালিকে স্বাহা।”
মন্ত্রটি পাঠ করে বললেন,
“মাগো সর্ব বাধা দূর করো আর সেই শুদ্ধ আত্মাকে আমাদের সাহায্য করতে বলো মা।”
তারপর বেশ কিছুক্ষণ আত্মস্থভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন একটা খুব পুরোনো আলমারির দিকে। আলমারিটার গায়ে হাত দিয়ে কি যেন বোঝার চেষ্টা করলেন, তারপর অতর্কিতে আলমারিটা এক হ্যাঁচকা টানে খানিকটা এগিয়ে আনলেন, আর সঙ্গে সঙ্গেই আমরা একটা সর সর শব্দ শুনলাম! আর পর মুহূর্তে মাটিতে কিছু একটা পড়ার শব্দ! সমর নীচু হয়ে দেখল কি একটা আলমারির নীচে পড়েছে হাত বাড়িয়ে সেটা বের করে আনল। জীর্ণ সালু কাপড়ে মোড়া একটা কিছু।
ঠাকুর দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন জয় ভৈরব জয় মা। আলমারি আর দেওয়ালের মাঝের ফাঁকে রাখাটা সত্যিই বুদ্ধির পরিচয়।
“সমর সাবধানে খোল, জিনিসটা অনেক পুরোনো। তবে তোমাদের বড়ো ঠাকুমা অত্যন্ত বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন তাই এমনভাবে জিনিসটা রেখেছিলেন যে সেটা আজও অক্ষত।”
“ঠাকুর…তার…তার মানে এটাই বড়ো ঠাকুমার ডায়েরি।”
“হ্যাঁ, আচ্ছা বেশ এবার তোমরা গিয়ে চিনি দিদিভাইকে দেখ, আমাকে একটু পড়তে হবে এটা, মুক্তির উপায় এখান থেকেই পাব, আমি নিশ্চিত। তবে সামনের কয়েক ঘণ্টা আরও কঠিন হবে। ডাক্তারবাবুকে আজ এখানেই থাকতে বল, জানবে চিকিৎসা শাস্ত্রের কাজ কিন্তু মন্ত্র দিয়ে হবে না। ভয় পেও না ভৈরব আছেন।”
বুঝলাম ঠাকুর আমাকেও যেতে বলছেন। চিনির ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম, ডাঃ দেব অক্সিজেন সিলিন্ডার, হার্ট বিট মনিটর জাতীয় আরও কিছু সরঞ্জাম এর মধ্যেই আনিয়ে নিয়েছেন। উনি আর ওঁর সহকারী দুজনেই ঘরে আছেন। আমাদের দেখে দূর থেকে হাতের ভঙ্গিমায় আশ্বাস দিলেন যে সব ঠিক আছে।
আমরা গিয়ে বসার ঘরে বসলাম। ইন্দ্রাণী চায়ের ব্যবস্থা করল। রাত্রি জাগরণের পর এটা সত্যিই অমৃত সমান। সমর বলেছিল একটু গড়িয়ে নিতে, পারিনি। এ পরিস্থিতিতে পারব না। চাপা উত্তেজনা আর অসংখ্য প্রশ্ন মাথার মধ্যে পাক দিচ্ছে। চা পান শেষ করে মনের মধ্যে ঘূর্ণায়মান প্রশ্ন গুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে পায়চারী করতে থাকি।
সমরের নতুন বাড়িতে যে বা যাকিছু ওকে হন্ট করছিল সেটাই কি চিনিকেও তাড়া করছে! আচ্ছা ঠাকুর কেন বললেন এখানে যাদের সঙ্গে ওঁর মোকাবিলা তারা শুভ। শুভ র সঙ্গে লড়াই কেন হবে? চিনি ই বা কেন এসবে জড়িয়ে পড়লো! ও তো নিষ্পাপ শিশু!
কখন যে চিনির ঘরে র দরজার কাছে পৌঁছে গেছি বুঝতে পারিনি, দরজা অল্প ফাঁক ঘরের ভিতরটা ঘোলাটে অন্ধকার। কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। বাকিদের কাউকে দেখলাম না, কোথায় গেল সবাই বাচ্চাটাকে একা রেখে! আর ডক্টর দেব ও বা কই! আমি দরজায় অল্প ঠেলা দিতেই সেটা ক্যাচ ক্যাচ শব্দে খুলে গেল। আমি ঘরে ঢুকলাম আর বিছানায় চোখ পড়তেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। চিনি কই? বিছানায় তো নেই? ওর ওষুধ স্যালাইনের স্ট্যান্ড সব সরঞ্জাম ঠিক আছে শুধু চিনি নেই! তাহলে কী অন্য কোথাও…?
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে আসছিলাম হঠাৎ একটা বিজাতীয় খচমচ শব্দে কান খাড়া হয়ে উঠল, শব্দ টা এই ঘরেই হচ্ছে, সেটা আসছে খাটের হেড বোর্ডের পিছন দিকে ফাঁকটা থেকে। আমি এগিয়ে গেলাম সেদিকে, আর যেটা দেখলাম তাতে প্রকৃত অর্থেই আমার হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে গেল! একটা মানুষ হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে আর শীর্ণ কঙ্কালবৎ ছোটো একটি আকৃতি তার বুকের ওপর বসে। মুখ দিয়ে পশুর ভঙ্গি কিছু একটা খাচ্ছে। ঘরের বন্ধ জানলার রঙিন সর্শী ভেদ করে যেটুকু আলো আসছে তাতে বুঝতে পারছি কালচে গাঢ় একটা তরল মেঝেতে মরণ কল্কা এঁকেছে। ওটা রক্ত! আমি পায়ে পায়ে পিছিয়ে যেতে থাকি, হঠাৎ খাটের কোণায় ধাক্কা লেগে শব্দ হতেই শীর্ণ মূর্তিটি আচমকা আমার দিকে ঘোরে। তার মুখের অর্ধাংশ এবং মুখের পাশে ঝুলে থাকা অবিন্যস্ত চুলগুলো রক্ত সিঞ্চিত। চোখ দু’টি কোটরাগত কিন্তু অস্বস্তিকর রকমের উজ্জ্বল। চিনি! কথাটা অনুধাবন করা মাত্র চিনি চিতার ক্ষিপ্রতায় অর্ধভুক্ত ডাঃ দেবের শরীর এর ওপর থেকে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমি “ঠাকুর বাঁচান” বলে ধর মর করে উঠে বসি। সমর বোধহয় কাছেই ছিল “কি হল রে রুদ্র…ঠিক আছিস তো?” বলে দৌড়ে আসে। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে ধাতস্থ হয়ে বুঝতে পারি আমি স্বপ্ন দেখছিলাম হয়তো একটু চোখ লেগে গিয়েছিল। ঘড়ি দেখলাম বেশ অনেক ক্ষণই ঘুমিয়েছি। বেলা পড়ে আসছে।
“চিনি?…সমর চিনি?”
“ঘুমোচ্ছে, ডাক্তারবাবু আছেন…।”
আমাদের কথায় মাঝেই ঠাকুর এসে পড়লেন। ইন্দ্রাণীও এসে পড়ে, বলল, খাবার তৈরি সবাইকে অল্প কিছু খেয়ে নিতে।
“বউমা, এখন ওসবের সময় নেই… খাওয়া পরে হবে।”
আমাদের আর কিছু বলা বা জিজ্ঞেস করার সুযোগ না দিয়েই চিনির ঘরে গিয়ে ডাঃ দেবের সঙ্গে কীসব কথা বললেন। উনি সম্মতি সূচক মাথা নাড়লেন।
“সমর, বউমা মন দিয়ে শোনো, আমার যা জানার বোঝার তা জানা হয়ে গেছে। চিনি দিদিকে স্বাভাবিক করার বদলে তোমাদের একটি মূল্য চোকাতে হবে, তোমরা কী প্রস্তুত?”
ওদের দু’জনের মুখ দেখেই বোঝা গেল ওরা কিছুই বুঝতে পারেনি। “কী …কী মূল্য ঠাকুর?”
“বউমা ভয় পেও না, ধরো একটি অক্ষয় কবচ যার বিনিময়ে তোমাদের এখানেই এক প্রকার বন্দি থাকতে হবে পুরুষানুক্রমে। সেই রক্ষা কবচের বিনিময়ে অলিখিত দস্তখত লিখিয়ে রাখতে হবে আজীবন আর পালন করতে হতে পারে কিছু অদ্ভুত বীভৎস নিয়মাচার….সেই কবচ কি তোমরা ত্যাগ করতে প্রস্তুত?”
“ঠাকুর আমার স্বামী সন্তান মা আর সংসারের বাকিদের যদি তাতে কোনও ক্ষতি না হয় তাহলে আমি সব কিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত।”
সমর বলল,
“অক্ষয় কবচ…ঠাকুর এই পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে অক্ষয় আদৌ কি কিছু হয় আর আমার বিশ্বাস আপনি যা করবেন আমাদের তাতে ভালোই হবে।”
“বেশ… তাহলে আমি যা বলছি সেগুলো চটপট করতে হবে, বেলা পড়ে এসেছে, সময় বড়ো কম।
ঠাকুর সমরকে বুঝিয়ে দিলেন কী কী দরকার। আর বলে দিলেন এই সময় বাড়ির অন্য কেউ বা ঠাকুর চাকর কেউ যেন এখানে না থাকে। ইন্দ্ৰাণীকে বললেন,
“বউমা আমাদের যার সঙ্গে লড়াই আজ সে কিন্তু তোমাদের বংশের ত্রাতা তিনি আসলে তোমার মেয়ের ক্ষতি চান না তবে তিনি চুক্তিতে বদ্ধ। তাই এক মায়ের সামনে আর এক মা-ই ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। সর্বান্তকরণে তোমার ইষ্টকে স্মরণ করো আর মেয়েকে আগলে থাকো। মায়ের টানের কাছে পৃথিবীর সব তন্ত্র মন্ত্র ধর্ম ফিকে, এই বিশ্বাসটা মনে রেখ।”
ইন্দ্রাণী আর কাকিমা দু’জনেই চিনির পাশে। ডাক্তার চিনির হার্ট বিট, অক্সিজেন লেভেল প্রেসার ইত্যাদি দেখে নিলেন। ঠাকুর চিনির মাথা স্পর্শ করে মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করে ওর গলায় একটি একমুখী রুদ্রাক্ষ পরিয়ে দিলেন।
সমর তখন এসে পড়েছে। ঠাকুর আমাকে আর সমরকে নিয়ে দখিণ বাড়ির দিকে চললেন। সঙ্গে দুজন সমর্থ ছেলে তাদের হাতে গাইতি কোদাল জাতীয় সরঞ্জাম। কিন্তু অবাক হলাম উনি কুলদেবীর মন্দিরে ঢুকলেন না বরং মন্দির পাশ কাটিয়ে খিড়কি খামার পেরিয়ে একটা বিরাট পুরোনো ডুমুর গাছের নীচে এলেন। আমি এত বড়ো ডুমুর গাছ আগে দেখিনি। গাছটার প্রাচীনত্বের প্রমাণ দিচ্ছে তার পাকানো কাণ্ডের কোটর থেকে উদ্ভূত অন্যান্য বিভিন্ন গাছের আকৃতি। ডুমুর এবং তার কাণ্ডের কোটর থেকে উৎপন্ন অন্য গাছগুলোর মিলেমিশে এমন নিরবিচ্ছিন্ন সবুজ চাঁদোয়া তৈরি করেছে যে দিনের বেলাতেও গাছের নীচে গোধূলির ছায়া যেন। পাতা গুলো হওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে, আর এক অদ্ভুত শব্দের ব্যঞ্জনা তৈরি হচ্ছে যেন ফিসফিসে হওয়ার ভাষায় কেউ সতর্ক বাণী শোনাচ্ছে,
“চলে যাও, এখান চলে যাও।”
ঠাকুর গাছের নীচে এসে ঠিক কাণ্ডটি স্পর্শ করে যোগাসনে বসলেন। ওঁর চোখ বন্ধ কোনও পূজার উপাচার নেই। শুধু গম্ভীর স্বরে কিছু পাঠ করছেন। আমাদের খানিক দূরেই দাঁড়াতে বলেছিলেন। আর পুরো জায়গাটা স্থান বন্ধন করে দিয়েছিলেন তার আগে।
বেশ কিছু ক্ষণ মন্ত্র পাঠের পর হাতের মুঠো থেকে সাদা ছোটো কিছুর টুকরো “জয় ভৈরব” বলে ছড়িয়ে দিলেন আসে পাশে। তারপর সরে এসে দাঁড়াল আমাদের কাছে। তারপর চোখের সামনে যা দেখলাম সেটা ভেলকি, ম্যাজিক নাকি অন্য কিছু সেটা বলতে পারব না। সাদা টুকরোগুলো কোন জাদু বলে একে অপরের কাছে এগিয়ে এল যেন লোহা চুম্বকে টানছে। তার পর পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি কঙ্কালের হাতের তালুর আকার নিল যার তর্জনী একটা বিশেষ দিকে নির্দেশ করছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম “এটা কী?”
নির্লিপ্ত উত্তর এল,
“কঙ্কালের হাতের হাড়ের টুকরো…আর এবার নিশ্চই বলবে কার হাত? আমার গুরুর।”
আর কথা বাড়ালাম না।
ঠাকুর সঙ্গে আসা লোক দু’টিকে তর্জনী নির্দেশিত জায়গায় খুঁড়তে বললেন। কিন্তু প্রথম কোদালের ফলা মাটি স্পর্শ করা মাত্র যেন মাটিটা কেঁপে উঠল। ঠাকুর ওদের হাত চালাতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু প্রতিটা কোদাল এর আঘাতের সঙ্গে প্রকৃতি তার রূপ বদলাতে থাকে। এমনিতেই জায়গাটা ছায়াছন্ন কিন্তু এখন আকাশটা যেন সত্যিই কালিমায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। ঝকঝকে আকাশে কোথা থেকে ভেসে আসছে রাশি রাশি কালো ধূম। প্রকৃতি যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। জীবনের কোন শব্দ পাচ্ছি না আর। পাখির ডাক দূর থেকে ভেসে আসা জীবনের স্বাভাবিক ছন্দের শব্দ সব যেন ব্রাত্য এখানে। কোন অদৃশ্য প্রাচীর আমাদের সমগ্র চরাচর থেকে বিচ্যুত করে দিয়েছে।
হঠাৎ সেই শ্মশানের নীরবতা ভঙ্গ করে কানে ভেসে এল রক্ত জল করা শিয়ালের ডাক। অন্ধকার ক্রমশ বাড়ছে। আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম এখন শেষ দুপুর, সন্ধ্যা নামতে অনেক দেরি। এবার লক্ষ করলাম অন্ধকারের মধ্যে দূরে বেশ কয়েক জোড়া উজ্জ্বল আলোক বিন্দু ক্রমশ আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। হঠাৎ করে মনে হচ্ছে মহা শুন্যে আমি একা কেউ কোথাও নেই, কিন্তু স্পষ্ট দেখছি আমার পাশেই সমর আছে সেও শুন্য দৃষ্টিতে না জানি কি দেখছে, ওর দুচোখ দিয়ে অঝোরে জলের ধরা নামছে। সবটা বুঝতে পারছি, ওকে সান্ত্বনা বা সাহস দেওয়া উচিত জানি কিন্তু কিছুই যেন করতে পারছি না।
আচমকাই গাছের মাথাটা অদৃশ্য ঝড়ের দাপটে প্রবলভাবে দুলতে থাকে আর গাছের ওপর থেকে ঝরে পড়তে থাকে পচা শব দেহের টুকরো। লোক দু’টি এতক্ষণ সাহস দেখলেও এবার তারা তাদের সরঞ্জাম ফেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দেয়। আমরা আটকাতে পারি না। ঠাকুর সমরকে বলেন, কিন্তু সমরের অবস্থা দেখে বুঝতে পারছি ও প্রকৃতিস্থ নেই। আমিই কোদালটা তুলে নিই। ঠাকুর এর আশ্বাস বাণী শুনতে পাই
“রুদ্র, ভৈরব তোমার সহায় তুমি হাত চালাও বাবা, আমি আছি।”
আমি প্রবল বেগে কোদাল চালাতে থাকি। এসব কাজে অভ্যস্ত নই ঠিকই কিন্তু জীবনেও যে করিনি এমন নয়। কিন্তু মাটিটা পাথরের মতো শক্ত যেন আর বিশ্রী পুতিগন্ধময়। আমি থামি না। প্রলয় যেন আরও ভীষণতম রূপ নিয়েছে। আমি আরও জোরে হাত চালাতে থাকি। হঠাৎ কদলের কোপের সঙ্গে এক চলক তাজা রক্ত ছিটকে এসে মুখে লাগে। মাটির নীচে রক্ত আসবে কোথা থেকে! ঠাকুর চিৎকার করে মন্ত্র পড়ছেন আর আমাকে হাতের ইশারায় কাজ চালিয়ে যেতে বলছেন। আমি মন শক্ত করে ঈশ্বরের নাম নিয়ে হাত চালাতে থাকি।
খানিক পর হঠাৎ মনে হল আমার কোদালের ফলা টা মাটি না অন্য কিছু একটার ওপর পড়েছে। চোখ খুলে আতংকে “ঠাকুর…একি!” বলে চেঁচিয়ে উঠি। আমার কোদালের ফলাটা পড়েছে একটি ফুটফুটে মেয়ের মুখের ওপর, আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে কচি মুখটি, রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মুখটা চিনির! উফ কী বীভৎস সে দৃশ্য!
সমর দৃশ্য টা দেখে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে! আর ঠিক তখনই ইন্দ্রাণীর করুণ কণ্ঠের হাহাকার ভেসে আসে। সমর ব্যাকুলভাবে বাড়ির দিকে দৌড়ে যেতে চায় কিন্তু ঠাকুর ওর হাতটা ধরে ফেলে।
“স্থান বন্ধনের বাইরে ভুলেও পা দেবে না, চিনির কিছু হয়নি, হবে না।”
পরমুহূর্তে তাকিয়ে দেখি কোথায় মুখ কোথায় রক্ত! কিছুই নেই। বেশ অনেকটা খুঁড়ে ফেলেছি। হঠাৎই একটা ধাতব কিছুতে কোদালটা স্পর্শ করল!
গাছের শিকড়ের জালিকাকার ঘেরা টোপের ভিতর কি যেন কালচে মতো একটা জিনিস। ঠাকুর আমাকে থামতে বললেন। এবার উনি ও হাত লাগালেন দু’জনের চেষ্টায় বেরিয়ে এল একটা ফুট খানেকের ধাতব মূর্তি। আমরা যখন মূর্তিটা টেনে তুলতে ব্যস্ত তখন সমর খানিক দূরেই দাঁড়িয়েছিল। ওর আকস্মিক চিৎকারে ওর দিকে তাকিয়ে দেখি বিস্ফারিত চোখে ও আমাদেরই ঠিক পিছন দিকে গাছের গুঁড়ির পিছনে কিছু একটা নির্দেশ করছে, ওর আঙুলের সরল রেখায় চোখ রেখে যা দেখলাম আদৌ দেখছি কিনা বিশ্বাস করতে কিছুটা সময় চলে গেল।
একটি কঙ্কাল সার বৃদ্ধা, শীর্ণ কিন্তু মারাত্মক সবল তার গঠন। মলিন ছিন্ন বস্ত্র মাথায় জটা জুট পিঠ ছাপিয়ে কোমর পর্যন্ত নেমেছে। মুখের চামড়া কৃষ্ণ কুঞ্চিত। তার প্রায় সমতোল শুষ্ক বক্ষের ওপর করোটির উপবীত দোদুল্যমান। কোমরে হাতে আর জটায় জড়িয়ে আছে জীবন্ত সাপ। কোমরবন্ধের থেকে ঝুলছে একটা শানিত দা। ভীষণ আক্রোশে সে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল তখনই দেখলাম বিকৃত বীভৎস মুখ গহ্বরপূর্ণ অসংখ্য শলাকার মতো দন্ত পঙ্ক্তি! সব থেকে অদ্ভুত চোখ দু’টি। কোটরের ভিতর যেন দু’টি জ্বলন্ত মনি। কী যেন এক অদ্ভুত নির্লিপ্তি ওই চোখে। ও চোখের দিকে তাকালে মনে হয় জীবনের সব মিথ্যে, অদ্ভুত বৈরাগ্য ভাব মনটাকে ঘিরে ফেলে। আর বৃদ্ধার সম্পূর্ণ অবয়বের সঙ্গে একদম বেমানান একটি পদ্ম ফুল ধরা তার ডান হাতে।
প্রচণ্ড ক্রোধে উন্মত্ত নারী মুর্তিটি তার কোমরের দা খানি হাতে তুলে আমার দিকে ধেয়ে আসছে আর তাকে অনুসরণ করে একদল বিকট বিশাল আকৃতির শিয়াল ও আমাকে আক্রমণ করতে ধেয়ে আসছে। আমি আসন্ন মৃত্যুর সামনে ভয়ে চোখ বুজে ফেললাম।
কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পরেও অবধারিত আক্রমণ না হওয়ায় চোখ খুলে দেখলাম ঠাকুর ইতিমধ্যেই একটি পাত্রে কিছু কাঁচা মাংস ও অন্য পাত্রে কিছুটা গাঢ় লাল উষ্ণ তরলে খানিকটা মদ মিশিয়ে নৈবেদ্য সাজিয়েছেন। বৃদ্ধা মূর্তিটি আসক্ত চোখ সেদিকেই নিবদ্ধ। ঠাকুর উচ্চকণ্ঠে ধ্যান মন্ত্র পাঠ করতে থাকেন,
“ওঁ চর্চিকে করালবদনা বিনিষ্ক্রান্তাসিপাশিনী। বিচিত্র খট্টাঙ্গধরা নরমালাবিভূষণা।।
“দ্বীপিচর্মপরিধানা শুষ্কমাংসাতিভৈরবা। অতিবিস্তারবদনা জিহ্বাললনভীষণা। নিমগ্না রক্তনয়না নাদাপুরিতদিন্মুখা।”
নারী মূর্তিটি নৈবেদ্যর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পরম তৃপ্তিতে মুখ ডুবিয়ে দেয়া শানিত পাত্রে। তারপর তৃপ্তি করে মাংসের নৈবেদ্যও গ্রহণ করে।
ঠাকুর ক্রমাগত বিভিন্ন মন্ত্রের দ্বারা দেবীর স্তুতি করতে থাকেন। দেবীর বিকরাল রূপ খানিক শান্ত সমাহিত হয়। ঠাকুর ভূমিষ্ট হয়ে প্রনাম করে দেবীর উদ্দেশ্যে বলেন,
“মা তুমি তো রক্ষা কর্তী। তুমি মা, শতাব্দী প্রাচীন চুক্তির জালে কেন একটা ফুলের মতো শিশুকে তার মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেবে মা? জানি চুক্তির জালে তোমাকে বন্ধন করা হয়েছে। আমি সে বন্ধন কাটব মা গো। তুমি তোমার উপযুক্ত স্থানে ফিরে যাও মা। তোমার কৃপা ধারা অব্যাহত রেখ মা শুধু এই চুক্তি তুমি খারিজ করো।”
ঠাকুরের সঙ্গে আমরাও নতজানু হয়েছিলাম। হঠাৎ মনে হল প্রকৃতির যে বিরূপ চাপটা তৈরি হয়েছিল তা আর নেই, ওই তো পাখির ডাক দূরের রাস্তা দিয়ে যাওয়া পথচারীদের কথাবার্তার শব্দ পাচ্ছি।
আমরা উঠে দাঁড়ালাম। ঠাকুর বললেন,
“চল, মা তৃপ্ত হয়েছেন।”
আমরা মূর্তিটি নিয়ে সবে খিড়কি দরজার কাছে এসেছি। একটা শব্দে পিছন ঘুরে দেখি। ডুমুর গাছটা হাউ হাউ করে আগুনে জ্বলছে! ঠাকুর মূর্তিটা কপালে ছুইয়ে বললেন,
“চল আর ভয় নেই।”
আমরা চিনির ঘরে গিয়ে দেখি। ইন্দ্রাণী আর কাকিমার চোখে জল, ডাক্তার দেবের ও মুখ ঘামে ভেজা। সমর উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,
“চিনি ঠিকাছে তো?”
ডাক্তারবাবু বলেন কিছুক্ষণ আগে সত্যিই ওর হার্ট বিট ছিল না পালস ছিল না, একবার মনে হয়েছিল আমরা বোধহয় ওকে হারিয়ে ফেলছি, কিন্তু এখন সব ঠিক আছে। আর অদ্ভুতভাবে ও এখন একদম সুস্থ। হ্যাঁ একটু দুর্বলতা আছে ঠিকই।”
চিনি উঠে বসেছে। আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।
***
পরদিন সকালে রোদ ঝলমলে সকালের মতোই উচ্ছল মুখ নিয়ে চিনি সমরের সঙ্গে আমাদের ঘরে আসে,
“ও ভালো কাকু, চলো আর ঠাকুর দাদুও চল, ঠাম্মি ইয়াম্মি ইয়াম্মি লুচি বানিয়েছে, তাই তো আমি তোমাদের ডাকতে এলাম।”
চিনি সেই আগের মতো স্বাভাবিক। দেখে বড্ড স্বস্তি লাগল। খাবার টেবিলে ইন্দ্ৰাণী বলল,
“ঠাকুর এবার সবটুকু জানতে চাই কী হয়েছিল আর কেনই বা হয়েছিল? আর কাল আপনি আমাকে কী ত্যাগের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন?”
“বউমা মানুষ যখন চায় তখন সে ভুলে যায় তার প্রাপ্যের হিসেব সে ভৈরবের খাতায় লিখিয়ে এসেছে। একটা কথা বললে বিশ্বাস করবে কিনা জানি না। আজ থেকে তিন জেনেরেশন আগে তোমাদের বড়ো ঠাকুমার লেখা ডাইরীটার যৌক্তিকতা বা প্রয়োজনীয়তা ছিল আজকের চিনি দিদি ভাইয়ের বা বলা ভালো তোমাদের মুক্তির জন্য। আমরা যেটুকু দেখি সেটুকু নিয়েই সবটা বিচার করি। কিন্তু দেখার বাইরে অদেখার পরিসর কিন্তু ঢের বেশি। আর ওই অদেখার অধিপতি ভৈরব।”
“আর একটু পরিষ্কারভাবে…”
“হাহাহা, বেশ তাহলে আগে ডান হাতের কাজটা মিটিয়ে নিই। তার পর গুছিয়ে বসব সবাই মিলে।”
খাওয়া দাওয়া মেটানোর পর বৈঠকে সবাই গুছিয়ে বসলাম। ঠাকুর শুরু করলে।
“তোমাদের নতুন বাড়ির ঘটনা শুনে মনে একটা কথা বার বার আসছিল যাকে চিনিদিদি ভাই ‘বিন্তি ঠাম্মা র মতো দেখতে বলছে সে আসলে কোনও দুষ্ট আত্মা নয় বরং সে তোমাদের ত্রাণ কর্ত্রী। সেদিন যে বা যারা চিনি দিদির ক্ষতি সাধন করতে চেয়েছিল যাদের ছায়া সমর ও অনুভব করেছিল তাদের থেকে উনিই সেদিন দিদিভাই কে রক্ষা করেন।
সমর ও যেদিন রাতে ভয় পেয়েছিলে সেদিন ইনিই তোমাকে রক্ষা করেছিলেন। কেননা তোমাদের রক্ষা কবচ হিসেবেই ওঁর সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল।”
সমর ঠাকুরকে মাঝপথে থামিয়ে বলে,
“চুক্তি? কে করল? কীসের চুক্তি আর উনি কে? দেবী নাকি দানবী?”
“সব বলছি। তবে এই কাহিনির মেরুদণ্ড কিন্তু তোমাদের বড়োমার ডায়েরিটি। তবে আশা করছি ওটা নির্ভুল, কোননা সে সমরের ঘটিত ঘটনার সত্যাসত্যের বিচার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
“এ গল্পের শুরু আজ থেকে প্রায় নয় শত বছরের ও আগে। পাল বংশের ইতিহাস নিশ্চই অল্প বিস্তর জানা আছে। পাল বংশের প্রভাবশালী রাজা দেব পালের উত্তরসূরি মহারাজাধিরাজ মহেন্দ্রপাল এর পৃষ্ঠপোষকতায় ওঁর সেনাপতি বজ্র দেব এর তত্ত্বাবধানে তোমাদের এই জগজ্জীবনপুরের আসে পাশে বৌদ্ধ মঠ নির্মাণ হয়। এবং তখন থেকে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রভাব বাড়তে থাকে। পাল যুগের রাজত্ব কালেই অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারে যান। এই সময় শাক্ত ও শৈব ধর্মও সমান সমাদৃত ছিল। আর বজ্র যান বৌদ্ধ ধর্মের সহজিয়া পন্থা এ সময়েরই দান। তাঁদের সহজযানী বলা হত। সহজযানী বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারকগণ যে পদ রচনা করেছিলেন, সেগুলি চর্যাপদ নামে পরিচিত।
“তো গৌরবের অস্ত অবধারিত। পাল বংশে ও তা হল। মহারাজাধিরাজ মহেন্দ্র পালের পর প্রায় পাঁচজন উত্তরসূরির সময় পাল বংশের গৌরব তলানিতে ঠেকে। সেই হৃৎ গৌরব পুনরুদ্ধার হয় নবমতম সিংহাসনপতি মহীপালের সময়।
মাঝের এই সময়টা বড্ড অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল শুধু রাজনৈতিক নয় বরং ধর্মীয় দিক দিয়েও। এসময় হিন্দু তথা বৌদ্ধ ধর্ম যে কামাচারীদের প্রভাব দেখা যায়। কামবজ্রযান এ সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, পরবর্তীতে অতীশ দীপঙ্করের চেষ্টায় তা অনেক খানি প্রশমিত হয়েছিল বটে। তবে পাপের ফল্গুধারা নিঃশেষ হয়নি। প্রকৃত ধর্মের বাইরে অসৎ নিম্ন মানের তন্ত্রের প্রভাব দেখা যায় তার সঙ্গে যুক্ত হয় তিব্বতি তন্ত্রের অপভ্রংশিত রূপ। এক কথায় ডামাডোল অবস্থা।”
আমি একটু উসখুস করছিলাম কিন্তু কথা কাটতে সাহস হচ্ছিল না, ঠাকুর ঠিক বুঝেছিলেন, বললেন,
“বল, প্রশ্ন মনে চেপে রাখতে নেই।”
“হ্যাঁ মানে এই যে বজ্রযান বৌদ্ধ ধর্ম এর সঙ্গে হিন্দু দেব দেবী বা ধর্মের এত মিল কী করে হয়?”
“খুব সহজ, মায়ের আর বাবার মুখের সঙ্গে যেমন সন্তানের মুখের মিল থাকে। ভুলে যেয়ো না বৌদ্ধ ধর্মের স্রষ্টা গৌতম বুদ্ধ নিজেও জন্মসূত্রে সনাতন ধর্মেরই ছিলেন। তাই প্রভাব আসতে বাধ্য
“যাক যা বলছিলাম। এ সময় বিভিন্ন তিব্বতি সাধকরা পাল সাম্রাজ্যে এসেছেন, থেকেছেন। সোজা ভাষায় সাংস্কৃতিক আদান প্রদান হয়েছে। আগেও বলেছি পাল রাজার বৌদ্ধ হলেও তাঁরা সনাতন ধর্মের সম্মান করতেন। রাজা গোপাল নিজে ‘চুন্দি’ দেবীর পুজো করতেন, চুন্দি আসলে চণ্ডীরই অপভ্রংশ।
“তো মহীপাল হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করেন। তার উত্তরসূরি নয়পাল ও দাপুটে রাজা ছিলেন তিনি আবার বৌদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও শক্তির পূজা করতেন ওঁর আমলে দেবী চর্চিকা বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছিল।
“দেবী চর্চিকা কে? নিশ্চিতরূপে এ প্রশ্ন মনে আসছে? দেখ পুরাণের মতো কিন্তু বিজ্ঞানের থিওরির মতো স্পষ্ট বিভাগে বিভক্ত করে যায় না। কিছু ক্ষেত্রে চর্চিকাকে মা চামুরই রূপ হিসেবে কল্পনা করা হয়। আবার অনেক জায়গায় চর্চিকা এক যোগিনী। অষ্ট মাতৃকার প্রতি জনের অধীনে আট জন করে যোগিনী থাকে। সেই হিসাবে চর্চিকা মা চামুণ্ডার অষ্ট যোগিনীর একজন। তাঁর রূপ বিকরাল। কাঁচা মাংস ও রক্ত তাঁর খাদ্য। তিনি শবের ওপর অধিষ্ঠিত। দ্বি, চতুর বা অষ্ট বহু যুক্ত দেবী। তিনি বৃদ্ধা, তিনি বৈরাগ্যের প্রতীক। তিনি সংহার করেন আবার পালন ও। তো তোমাদের বংশের কুলদেবীর সাক্ষাৎ ও মূর্তি অনুসারে উনি চর্চিকা যোগিনী।
“তো আবার ফিরে আসি পালবংশের কথায়। আচ্ছা আবারও বলে রাখি আমি যা বলছি বা বলতে চলেছি তা সম্পূর্ণ তোমাদের বড়োম্মা যে পুথি পেয়েছিলেন সেই অনুসারেই আমি বলছি। নয় পাল ও তার পরের রাজারা ওই নিম্ন তন্ত্র বা কামাচারী দের প্রতিহত করেন বটে কিন্তু সম্পূর্ণ বিনাশ তার হয়নি। নয়পালের উত্তরসূরি বিগ্রহপাল (তৃতীয়) তাঁর তিন উত্তরসূরির মধ্যে রামপাল অন্যতম এই রাম পালের চার উত্তরসূরি কুমার পাল, রাজ্য পাল, বিত্ত পাল ও মদন পাল। এই চারজনের মধ্যে ইতিহাসে বিত্তপালের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না। তোমার ঠাকুমা যে পুথি পেয়েছিলেন তা এই বংশে কবে থেকে আছে তা তিনি জানতে পারেননি। বা পুথিটি আসলে কার লেখা সেই উল্লেখও নেই। পুঁথিটি লেখা হয়েছে অপভ্রংশিয় মাগধী এর গৌড়বঙ্গীয় রূপে মানে সোজা কথায় চর্যাপদ যে ভাষায় লেখা। সুতরাং পুঁথিটির প্রাচীনত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না।
“তবে এ পুঁথি এক অদ্ভুত ইতিহাসের কথা বলে আর বলে তোমাদের বংশের গুপ্ত রহস্যের কথা। পুথি অনুসারে বিত্ত পালের সঙ্গে আলাপ হয় এক তিব্বতি সাধিকার। পাল রাজাদের বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতায় গৌড় তখন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান। তা ছাড়াও অতীশ দীপঙ্কর এর সুবাদে তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার হয় এবং তিব্বতিরা গৌড় সম্পর্কে অবগত হয়। স্বভাবতই সেসময় অনেক তিব্বতি সাধক সাধিকা পাল সাম্রাজ্যে আসতেন, ওই যে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আদান প্রদান বললাম।
“সে সময় কুমার পাল উত্তরসূরি তৃতীয় গোপাল সিংহাসনে। বিত্ত পাল জানে রাজ্যের অধিকার সে কখনওই পাবে না। পাল সাম্রাজ্যের সূর্য তখন পাটে যেতে বসেছে। বিত্ত পাল শেষ চেষ্টা করে। সাহায্য নেয় সেই সাধিকার। সে বিভিন্ন তিব্বতি তন্ত্রে দক্ষ ছিল সঙ্গে সে গোপনে কামবজ্রযান সাধনা করতেন এবং সাধিকার কামাচারের জন্য ও পুরুষ প্রয়োজন ছিল। বিত্ত পাল প্রচুর অর্থ ও সম্পত্তি দান করেন সাধিকাকে। বিত্ত পালের ইচ্ছে ছিল তাঁর শোনিত ধারাতেই পাল সাম্রাজ্যের রেখা থেকে যাবে। ইতিহাসে না থাকলেও বাস্তবের মাটিতে তাঁর বংশজরাই অনন্ত কাল ধরে পাল সাম্রাজ্যের বংশ বীজ বহন করে চলবে। তারপর পুথিতে বিত্ত পালের প্রসঙ্গ আর পাওয়া যায়নি। বলা হয়েছে সাধিকা তার অপত্য মানে সন্ততিদের জন্য এই মূর্তিটি তার বাস্তুতে পুঁতে দেন, যা কিনা চর্চিকা দেবীর বা যোগীনির মতোই তবে তার গূঢ় আপাত অজ্ঞাত অপ্রচলিত তামসিক তিব্বতি তান্ত্রিক রূপ ‘বজ্র চর্চিকা’!
“বজ্র চর্চিকা দেবী কে এভাবে বাঁধা যায় না আর তিনি গৃহীর পূজ্যও না। কিন্তু দুরাত্মার তো ছলের অভাব হয় না। সেই কামাচারী সাধিকা তার কুটিল বুদ্ধিতে নিয়মের কোনও এক ফাঁকের সূত্রে দেবীর সঙ্গে চুক্তি করে যে বিত্ত পালের ঔরসে আর সাধিকার গর্ভে জন্মিত এই বংশ হবে অক্ষয়। চর্চিকা হবেন তাদের রক্ষাকর্তী। যেকোনো রকম বিপদ থেকে এ বংশের রক্ষার দায় তাঁর।
“দেখতে গেলে বিত্ত পালের স্বপ্ন ও তাই ছিল। কালের স্রোতে ঢাল হয়ে দাঁড়াবেন তিনি। তবে বদলে নির্দিষ্ট সময় ব্যবধানে বংশের পুরুষদের দেবীকে ভোগ খাওয়াতে হবে নিজে সামনে বসে থেকে। নারীর পূজা গ্রহণ করবেন না দেবী। দেবী ওই বিকরাল রূপ নিয়ে ভোগ গ্রহণ করবেন। বংশে অন্য কোনও দেব দেবীর পুজো করা যাবে না। আর সব থেকে প্রয়োজনীয় বিষয় এ বংশের কেউ এই ভিটে পাকাপাকীভাবে ছাড়তে চাইলে বজ্র চর্চিকা নিজে বংশের নাশ করবেন। তিনি যেমন বাঁধা পড়ছেন ঠিক সেভাবেই অনন্ত কাল ধরে এই বংশের বংশজদের এই ভিটের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। আর কেউ যদি স্বেচ্ছায় এই রক্ষা কবচ ভাঙতে চায় তাহলে তাকে, মা কে চিন্ময়ী রূপে শেষ ভোগ প্রদান করে তুষ্ট করতে হবে। মা তুষ্ট হয়েছেন কিনা মানে মা এই ভিটের বন্ধন মুক্ত হয়েছেন তা বোঝার উপায় ওঁর আবাস মুহূর্তে ভস্মীভূত হবে। এবং অবশ্যই মূর্তিটি খুঁজে বের করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে।”
সমর বলল,
“বড়ো ঠাকুমা এতটা জেনেছিলেন যখন তাহলে ব্যবস্থা করেননি কেন?”
“ওঁর ডায়েরি অসম্পূর্ণ। তবে উনি লিখেছেন উনি আর ওঁর এক জা চর্চিকার ওই বিকট ভোগ ভক্ষণ দেখে ফেলার পর। ওঁর শ্বশুর হয়তো সেই জা-টিকে হত্যা করেছিলেন। এবং ওঁর ধারণা ছিল তোমাদের বড়ো ঠাকুরদাদা বাইরে কাজের সূত্রে থাকার সুবাদে এসব কিছুই হয়তো জানতেন না। তবে শেষের দিকে লেখায় এবং তোমার ১২ বছরের ঠাকুরদাদাকে ধাঁধার কবিতা শিখিয়ে ডায়েরি লুকোনোর ব্যাপারটা থেকে অনুমেয় তিনিও হয়তো খুন হয়েছিলেন। এটা আমার অনুমান। কেন না অমন সাহসী বুদ্ধিমতী মানুষ সব জেনেও কোনও ব্যবস্থা নেননি এটা অদ্ভুত। আরও একটা কারণ আছে অবশ্য…’
“কী ঠাকুর?”
“তোমাদের বাড়িতে ঢুকেই এবং বিশেষ করে লাইব্রেরিতে ডায়েরিটা খুঁজতে গিয়ে আমি একজনের স্ট্রং প্রেজেন্স অনুভব করেছি। খুব শুদ্ধ তাঁর অস্তিত্ব। তিনি যেন আমাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। খুব সম্ভবত উনি তোমার বড়ো ঠাকুমা।”
আমি উত্তেজিতভাবে বললাম,
“তার মানে সমর তোদের শিরায় রাজ রক্ত বইছে!”
ও কাঁধ ঝাকিয়ে বলল,
“কী জানি হয়তো। তবে এখন থেকে বিগত নয় শত বছরের বজ্র চর্চিকার রক্ষা কবচ আমরা হারালাম।”
ইন্দ্রাণী রুক্ষ গলায় বলল,
“তোমার কি খুব আপশোশ হচ্ছে? ওমন কবচ থেকে কী লাভ, এতদিন কী জানতে পেরেছিলে যে, মে বি তোমরা পাল বংশের রক্ত বাহক। আর আজ জেনেই বা কী লাভ হচ্ছে? এমন বীভৎস দেবী কে নিয়মিত মদ রক্ত… উফফ মা গো কী বীভৎস। আর যার প্রটেসনের পরিবর্তে নিজেদের স্বাধীনতা খোয়া দিতে হয় সব সময় মরণ ভয় তাড়া করে বেড়ায় অমন প্রোটেকসন থাকার থেকে না থাকা ভাল।”
ঠাকুর সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে বললেন,
“বউমা একদম ঠিক বলেছেন। সত্যি তো বজ্র চর্চিকা তোমাদের রক্ষা করেছেন বটে, কিন্তু বিত্ত পাল কি ইতিহাসে থেকে যেতে পেরেছে? ইতিহাসে বিত্ত পালের সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। সেই সাধিকা কি সর্বত্র পূজ্য হয়েছেন তোমরা কি রাজ বংশের অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছ? সব কয়টির উত্তরই না।
“ভবিতব্য নির্ধারিত ভৈরবের খাতায় সব হিসেব আগে থেকেই করা তাই জোর করে ভবিতব্য বদলানো যায় না। আর ওই ভবিতব্যে এই অবসান পূর্ব নির্ধারিত ছিল বলেই তোমার বড়ো ঠাকুমা ডায়েরিটা লিখে যান। আর একটা ব্যাপার জানবে বৈদিক দেব-দেবী তান্ত্রিক দেব-দেবী সম্পূর্ণ আলাদা। প্রত্যেকের নিজ নিজ স্থান আছে, তন্ত্র ক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁদের বেঁধে রেখে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করাতে আখেরে ক্ষতি আমাদেরই।”
আমি কাকিমাকে জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনারা তো বরাবর চুঁচুড়া যে ছিলেন অনেক পরে এখানে এসেছিলেন তাহলে তখন দেবী পূজা… কাকু এসব কি জানতেন? আর সমর? আপনি বাধা দেননি কেন কাকুকে?”
“না বাবা তোমাদের কাকু মানে সমুর বাবা প্রথমে জানতেন না তবে পরে যখন সমুর ঠাকুরদাদা ওঁকে ফিরিয়ে আনেন তখন বোধহয় সবটা বলেছিলেন। আমার তো মনে হয় ওই নৈবেদ্য দানের জন্যই উনি তোমাদের কাকুকে ডেকে আনেন। তবে এ বাড়িতে ফেরার পর মানুষটাকে সব সময় মন মরাই দেখেছি। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতে চাননি। শেষ সময় সমুকে ডেকেছিলেন সব কিছু বলে যাবেন বলে কিন্তু সুযোগ হয়নি তাই সমু কিছুই জানত না।”
সমর কথার খেই ধরে বলে,
“আর ওই ভোগ না পাওয়ার জন্যই বোধহয় অত বিপত্তি শুরু হয়, কে যেন ‘খেতে দে, খেতে দে’ কথাটা বার বার কানের কাছে বলতো। তবে কলকাতার বাড়িতেও বিপদ থেকে উনিই বাঁচিয়েছেন। উফ এখনও পুরো বিষয়টা গল্প কথার মতো শোনাচ্ছে।”
“সেটাই রে বন্ধু, কোথায় বলে না ট্রুথ ইস স্ট্রেনজার দ্যান ফিকশন।”
ঠাকুরের ফোনটা বেজে ওঠে, ওঁর মুখটা বজ্র কঠিন হয়ে যায় মুহূর্তে ওই পারের কথা শুনে। একটি কোথায় উত্তর দেন।
“আসছি আমি…!” বলেই ঝটিতি কাঁধের ঝোলাখানা নিয়ে,
“আমাকে এখুনি বেরোতে হচ্ছে, আপনাদের সংসারের ওপর আর কোনও বাধা বিপত্তি নেই, ভৈরব মঙ্গল করুন। বজ্র চর্চিকাকে আমি সঠিক স্থানে পৌঁছে দেব।” বলে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলেন।
ওঁর এমন ব্যবহারে সবাই মারাত্মক অবাক। আমার সঙ্গে একটাও কথা বলে গেলেন না আমি জানি ফোন করলেও উনি ধরবেন না। তাই বৃথা চেষ্টা করলাম না।
ভবঘুরেকে মায়ার বন্ধনে বাঁধা পাপ। আমি জানি ঠাকুর আমার সঙ্গে আছেন। আমার থেকেও উনি বেশি জানেন কখন আমার ওঁকে প্রয়োজন।
উনি চলে যাওয়ার মিনিট দশেক পর হঠাৎ সমর প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে…
“সর্বনাশ হয়ে গেল রে রুদ্র!”
“কী হল…?”
আমার সঙ্গে সমস্বরে কাকিমা ও ইন্দ্রাণী চেঁচিয়ে উঠল।
“এ বাড়ির ঝামেলায় আমার ওই বাড়ির যে অদ্ভুত ঘটনাগুলো হচ্ছিল সেটার বিষয় তো ঠাকুরকে কিছু বলাই হল না! ও বাড়িতে তো সত্যি সমস্যা আছে? আর ওই প্রোপার্টি যে আমার প্রচুর ইনভেস্টমেন্ট আছে আমি যে ধনে প্রাণে মারা পড়ব রে ভাই।”
ইন্দ্রাণী ঠাকুরকে অনেক বার কল করার চেষ্টা করল, কিন্তু ফোন বন্ধ। আমি জানি এটাই হবে। বললাম,
“আরে বলা যায় না ওই অভিজ্ঞতাগুলো বজ্র চর্চিকার জন্যই হচ্ছিল।”
“না রে, উলটে দেবী আমাদের বাঁচাচ্ছিলেন, চিনিকেও বাঁচিয়েছিলেন। অন্য কিছু অন্য কেউ।”
ইন্দ্রাণী বলল,
“তাহলে উপায়!”
সত্যিই এর উত্তর আমার জানা নেই। আনন্দের পরিবেশটা মুহূর্তে কেমন মেঘলা হয়ে গেল। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। আমাকে কাকিমা আজ যেতে দিলেন না। সমর কাল কলকাতা ফিরবে আমিও সঙ্গেই যাব।
হঠাৎই আমার ফোনটা বেজে উঠল,
“ঠাকুর ফোন করেছেন!” বলে উচ্ছ্বসিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, এবং সমরের নতুন বাড়ির বিষয়টা বলার আগেই, সমাহিত কণ্ঠে ঠাকুর বললেন,
“সমর বলতে ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি হে। কোনও গুপ্ত শত্রু বা বিজনেস রাইভালো সস্তার তান্ত্রিক দিয়ে উচাটন ক্রিয়া করেছিল তাই অমন উপদ্রব হচ্ছিল। শুনেই বুঝেছিলাম ও এমন কিছু মারাত্মক বিষয় না। সে যাই হোক, আমি ওদের নতুন বাড়ির চত্বরে অথবর্ণ ভদ্রকালীর মন্ত্র বন্ধন করে দিয়েছি। বন্ধুকে বলো নিশ্চিন্তে সে সপরিবার ওই বাড়িতে সুখে বাস করতে পারবে। সব মঙ্গল হবে। আর অথর্বণ ভদ্রকালী বা প্রত্যঙ্গীরা মন্ত্র বন্ধনের ফলে যা উচাটন ক্রিয়া সমরের ওপর করা হয়েছিল সেটা ফিরে যাবে যে করেছিল তার দিকেই, সুতরাং সমর বুঝতে পারবে কে ওর ক্ষতি করতে চেয়েছিল। নিশ্চিন্তে থাকতে বল, আর কোনও রকম অমঙ্গলের ভয় ওদের পরিবারের ওপর নেই।”
“কিন্তু ঠাকুর, আমার মানে আমি… মানে আপনি তো আবার চলে গেলেন, কবে আসবেন আবার!”
“হাহাহা, কালের স্রোতে তোমাতে আমাতে আবার দেখা হবে। ভৈরবের তাই ইপ্সা। তোমার থেকে দায় যে আমার বেশি হে লেখক। বলেছিলাম না আমার অনুভবেরা ঘাট পাবে তোমার কলমে। সব মঙ্গল হবে। জয় ভৈরব।”
আমিও আশ্বস্ত কণ্ঠে বললাম,
“জয় ভৈরব।”
***
