নশ্বর কৃত্য – সুপর্ণা নাথ

নশ্বর কৃত্য

“রুদ্র বাড়ি আছো নাকি হে?”

গত পাঁচ মাসে এই কণ্ঠস্বরটি আমি কেন আমার বাড়ির শরিক এমনকি আমার ছাত্রদেরও চেনা হয়ে গেছে। ঠাকুর কখন কীভাবে যে এতটা আত্মিক হয়ে গেছেন কে জানে। মাঝেমধ্যেই কোথায় চলে যান, তখন বেশ ফাঁকা লাগে। বুঝি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। টানটা এখন আর শুধু গল্পের প্লটকেন্দ্রিক একদমই নেই।

শেষ কার্তিকের ঠান্ডাটা আমাকে কিছুটা কাবু করেছে বটে, হালকা জ্বরের জন্য দিন কয়েক বাড়ির বাইরে বেরোইনি।

হাসি মুখে বেরিয়ে এসে বললাম,

“আরে আসুন আসুন, একটু বসুন ছাত্রদের আর একটু পরই ছুটি। আসছি আমি বসুন।”

“বসব না এখন, এই নাও ধরো তো…”

একটা ছোটো শিশি দিলেন হাতে,

“চারটে বড়ি দিনে তিন বার, হালকা গরম জল দিয়ে খেলে ভালো…মনে করে খেও কিন্তু।”

অবাক হয়ে বললাম,

“ও এ তো দেখছি হোমিওপ্যাথি ওষুধ, আমি ভাবলাম কোনও ঠাকুরের ফুল বা বিভূতি হয়তো…!”

“হা হা হা… চিকিৎসা বিজ্ঞান বলেও একটা বস্তু হয় আর সেটা ফুল, বিভূতির থেকে অনেক বেশি কার্যকরও বটে, জাগগে মনে করে খেয়ে নিও, আমি বিকেলে খবর নিয়ে যাব।”

উনি বেরোতে উদ্যত হলেন, আমি পিছু ডেকে বললাম,

“কিন্তু আপনি জানলেন কী করে যে আমার জ্বর…”

কথাটা শেষ করতে পারলাম না উনি মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু অদ্ভুত হাসলেন। যাওয়ার আগে একটু থমকে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবলেন তারপর বেরিয়ে চলে গেলেন। আমি খানিকক্ষণ মূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম সেদিকে তাকিয়ে। এই নিয়ে তিন বার! উনি কী সত্যিই সব বুঝতে পারেন নিজেই? সব অব্যক্তই কী ওঁর কাছে বাঙ্ময়!

সেদিন বিকেলে আমার পড়ানো ছিল না, দুপুর থেকেই ঠাকুরের পথ চেয়ে বসে আছি। দু’পুরিয়া ওষুধেই বেশ চাঙ্গা বোধ করছি। সাড়ে চারটে নাগাদ রোদটা একটু পড়ে আসতেই মেইন দরজার শব্দে বুঝলাম ঠাকুর আসছেন।

“রুদ্র আছো নাকি হে…”

বলে চিরাচরিত হাঁক পেড়েই ভিতর উঠোনে পা দিলেন সনৎ ঠাকুর।

হাতে একটা মাঝারি সাইজের ঠোঙা। দোতলার বারান্দা থেকে মুখ ঝুকিয়ে বললুম,

“আপনি আবার এসব কী আনলেন?”

“দাঁড়াও দাঁড়াও উপরে তো আসতে দাও…”

আমি চায়ের জল চাপালুম। সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ পেলাম। ঠাকুর ওপরে উঠে আসছেন।

“এই নাও ঘাটের পাশের দোকানটায় গরম ভাজছিল, নিয়ে এলুম, তোমার জ্বরের জিভে ভালো লাগবে।”

খুলে দেখলাম খান ছয় সাত সিঙ্গারা। একটু লজ্জিত হয়েই বললাম,

“আপনি এসব আবার… কেন ঠাকুর?”

“হা হা হা… আহা ওতে তো আমিও ভাগ বসাব।”

চায়ের কাপ আর সিঙ্গারা একটা পাত্রে গুছিয়ে নিয়ে বাইরের ঘরের চৌকিতে গুছিয়ে বসলাম। শুরু হল নানা বিষয় গল্প। একটা জিনিস লক্ষ করছিলাম ঠাকুর বারবার একটু অন্যমনস্ক হয়ে আমার অংশের (বাড়ির) উলটো দিকের পিসিমণির ঘরগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলেন।

এ বাড়িটা দোতলা। বাইরের উঠোন পেরিয়ে ভিতর বাড়ি। বাড়ির মাঝে একটি বড়ো সান বাধানো উঠোন আর সেই উঠোনের তিনদিকে ঘিরে বাড়িটা। নীচের তলায় আমার দুই জ্যাঠতুতো দাদার অংশ। একজনকে অংশ তালা বন্ধ। তারা কলকাতায় থাকে। আর একজনের অংশে ভাড়াটে থাকে।

উপরের তলায় আমি আর পিসিমণি (বাবার খুড়তুতো বোন)। পিসিমণির ব্যারাকপুরে বাড়ি। পিসেমশাই রেলে ছিলেন গত বছর অবসর নিয়েছেন। ঝাড়া হাত পা জীবন। মাঝেমধ্যে আসেন কয়েকদিন থেকে সাফ সুফ করে আবার চলে যান। কালই পিসিমণি আর পিসেমশাই এসেছেন।

কথার মাঝে বারবার আনমনা হতে দেখে বললাম,

“ঠাকুর, কী হয়েছে বলুন তো?”

উনি একটু আনমনা হয়ে বললেন,

“উম…না কিছু না, সামনের ঘরের দিদি আছেন কি?”

“পিসিমণি? কালই এসেছেন তো, কেন কী হয়েছে?”

“নাহঃ কিছু না…”

কথাটা বলেই যেন সাড়ে ফিরলেন ঠাকুর আর বিষয়টা ঘোরানোর জন্যই বোধহয় হালকা হেসে বললেন,

“এখন কিছু বললে তা খাড়া করতে যে পরিমাণ যুক্তি দরকার তা যে আমার কাছে নেই “

কথাটা বলেই উঠে বেসিনে হাতটা ধুয়ে আমার মাথায় হাত রেখে কী যেন বিড় বিড় করলেন।

“কী….. কী হয়েছে?”

“কিছু না…আর কিছু যাতে না হয় তার জন্যই…ঈশ্বর করুন আমি যেন ভুল প্রমাণিত হই। ও বাদ দাও তুমি। তবে কোনো দরকার বোধ করলে খবর দিও।”

এই কয় মাসে ঠাকুরকে ভালোই চিনে গেছি। তাই ওঁর হঠাৎ এ জাতীয় ব্যবহারে অবাক হই না আর। আর এটাও জানি ওঁর প্রতিটা কথা বা কার্যের পিছনে অবশ্যম্ভাবীভাবে কিছু কারণ থাকবেই। তবে এটাও জানি ঠাকুর থাকলে চিন্তা নিষ্প্রয়োজন।

ঠাকুর পুনরায় চা সিঙ্গারায় মন দিয়েছেন। আগে আগে ওঁর এমন কথায় বেশ অবাক হতাম এখন হই না, আগেই বললাম কিন্তু ভবিষ্যৎ যে এতটা চমক জমিয়ে রেখেছে তার গর্ভে তা কল্পনাও করতে পারিনি।

***

দিন চার পাঁচ কেটেছে, ঠাকুরের দেওয়া হোমিও ওষুধে বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছি। কিন্তু এই কয়দিন বাইরে তেমন যাওয়া হয়নি। আসলে পিসিমণি যখন এ বাড়িতে আসেন আর যে কয়দিন থাকেন আমি মায়ের মতো শাসন আর আদর দুটোই খুব উপভোগ করি। এক প্রকার পিসিমণির বারণেই বাইরে যাওয়া হয়নি। তবে আজ অনুমতি পেয়েছি।

দুপুরের দিকে ঘাটে গিয়ে দেখলাম সেই নির্দিষ্ট জায়গায় ঠাকুর বসে আছেন। পাশটায় গিয়ে বসলাম। অন্য দিন একমুখ হাসি নিয়ে স্বাগত জানান কিন্তু আজ ওঁর মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

“কিছু হয়েছে ঠাকুর, চিন্তিত দেখাচ্ছে?”

“না হে, হয়নি তবে বোধহয় হবে…মঙ্গলময় রক্ষা করুন।”

চিন্তামিশ্রিত উদাস কণ্ঠে বলা কথাগুলো অসমাপ্ত রেখেই চুপ করে গেলেন সনৎ ঠাকুর। আমার মনে একটু খটকা লাগল।

সেদিন বেশি কথা হল না। শুধু বললেন,

“চোখ কান আর অন্তরাত্মা খোলা রাখবে। চোখ আর কানের বাইরেও একটা অনুভবের পৃথিবী আছে। যাকে তোমরা বলো Gut feeling, instinct সেটাকে অগ্রাহ্য করবে না।”

মনের খটকাটা আরও গাঢ় রং ধরছে।

আমি উঠে চলে আসার আগে একটা কাগজ হাতে গুঁজে দিলেন, একটা নম্বর।

“কার নম্বর?”

“আমার। দরকারে ফোন করো।”

মারাত্মক অবাক হয়ে বললাম,

“আপনার ফোনও আছে! আপনাকে দেখে…”

গঙ্গার ঢেউয়ে চোখ রেখে স্তিমিত স্বরে মাঝ পথে আমাকে থামিয়ে বললেন,

“সে তোমার অনুমান ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।”

“না মানে সেটা না, আপনিই তো বললেন সংসারের মায়া ত্যাগ করেছেন…”

“হুম করেছি কিন্তু সংসার হয়তো এখনও আমায় ত্যাজ্য করেনি।”

কথা না বাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম।

বাড়ি ফিরে পিসিমণির কাছে খবর পেলাম গুড্ডির শ্বশুরমশাই গত হয়েছেন। হার্ট অ্যাটাক্ট। গুড্ডি পিসিমণির মেয়ে আমার বোন। বছর তিনেক আগে বিয়ে হয়েছে। বাগবাজারে শ্বশুরবাড়ি। গুড্ডির সঙ্গে আর সৌম্য মানে গুড্ডির স্বামীর সঙ্গে কথা হল।

পিসেমশাইয়ের জ্বর, শরীর ভালো নেই তাই আমি বললাম আজ না হয় আমিই যাচ্ছি। তোমরা কাল যেও। গুড্ডি, সৌম্যও তাতে মত দিল। বেরোতে একটু দেরি হল। যেতে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক লাগে সন্ধের সময় জ্যামজটও বেশ ভালোরকমের থাকে। গুড্ডিকে ফোনে জানিয়ে দিলাম একটু দেরি হবে। পৌঁছোতে সাড়ে আটটা বাজল।

গুড্ডির শ্বশুরবাড়িটাও বেশ বনেদি আর পুরোনো। গলির শেষ প্রান্তে বাড়িটা, সাবেক কালের বিশাল কাঠের দরজার পাল্লা দুটো ভেজানো। একটু অবাক হলাম এই অবস্থায় বাড়ির লোকজন নিশ্চয়ই যাতায়াত করছে কিন্তু দরজা বন্ধ কেন। বাড়ির সামনের রাস্তায় আলোটা বোধহয় খারাপ। আধো অন্ধকারের অর্ধস্বচ্ছ পর্দা যেন বাড়িটাকে ঘিরে রেখেছে। আশ্চর্যভাবে বাড়ির ভিতরে থেকেও তেমন শব্দ আসছে না। কীরকম একটা অস্বস্তি মনে হচ্ছে। নিজের ভাবনাগুলোকে শাসন করে আমি দরজাটা খোলার জন্য হাত বাড়ানো মাত্রই দরজাটা শব্দ করে আপনিই খুলে যায়, মিথ্যে বলব না ক্ষণিকের জন্য একটু চমকে গেছিলাম। দু’পা পিছিয়ে আসি। একজন লোক ভিতর থেকে দরজাটা খুলে তড়িঘড়ি বেরিয়ে আসেন তাকে কিছু বলার বা জিজ্ঞেস করার সুযোগ না দিয়েই হনহন করে প্রায় আমাকে গোত্তা দিয়ে বেরিয়ে গলির আঁধারে হারিয়ে যান। লোকটা কেমন যেন অদ্ভুত প্রায় গায়ের ওপর এসে পড়েই যেন ছিটকে সরে গেল। মুখটাও এমনভাবে নীচু করা যে দেখতেই পেলাম না। আমি ভিতরে ঢুকি। চৌকাঠ পেরোনো মাত্রই গলির আলোটা জ্বলে ওঠে। বাইরের উঠোন থেকে ভিতর বাড়ি যাওয়ার জন্য একটা দরজা। ওখানেই সৌম্যর সঙ্গে দেখা হয়। খুব বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে ছেলেটাকে।

“রুদ্রদা যাক এসে পড়েছ, শ্রী (গুড্ডির ভালো নাম শ্রীতমা) চিন্তা করছিল। আমরা এই বার বেরোবো। ওদিকে সব রেডি, মরচুয়ারি হার্স ভ্যান তো গলিতে ঢুকবে না। দেখি এল কিনা।”

“আমি এই এলাম গলির মুখে কোনও ভ্যান ছিল না, আর তোমাদের এই আলোটাও নিভে ছিল তার ওপর দরজাটাও বন্ধ, ভাবলাম তোমরা বেরিয়ে গেছ হয়তো।”

“দরজা বন্ধ! কই না তো, এমনিতেও এ বাড়ির দরজা রাত এগারোটার আগে বন্ধ হয় না, আর আজ তো সারাক্ষণ লোকজন আসছেন এই তো জাস্ট মিনিট পাঁচ আগেই আমার মাসিরা এলেন, দরজা তো খোলাই ছিল।”

“খুব অবাক হলাম, কিন্তু মুখে কিছু বললাম না…এটা এসব বলার সময় না।”

আমাকে ভিতর বাড়ি যেতে বলে সৌম্য বেরিয়ে গেল। আমি ভিতরে গেলাম। বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলে গুড্ডিকে সান্ত্বনা দিয়ে নীচে নেমে এলাম। বাকি শ্মশান বন্ধুদের সঙ্গে মেসোমশাই এর শেষযাত্রায় কাঁধ দিলাম। কাশী মিত্র ঘাটে আসতে খুব বেশি সময় লাগল না। বেশ কিছু জনের পর মেসোমশাই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কেউ কেউ চায়ের খোঁজে গেল। আমাকেও বলেছিল, কিন্তু শ্মশানে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করাটা আমার একদমই রুচি হয় না।

সৌম্য পরপর ফোন করেই যাচ্ছে। আমি ঘাটের ফাঁকা দিকটায় গিয়ে বসলাম। প্রায় নভেম্বরের মাঝামাঝি, গঙ্গার ঠান্ডা হওয়ার ঝাপটা বেশ ধারালো। হাত কাটা সোয়েটারে বাঁধছে না। মনটা ভারী লাগছে। নিজের বাবা-মা-দাদু- ঠাম্মা তাছাড়া পাড়ার অনেকের জন্যই শ্মশানে বহুবার এসেছি। একটা জিনিস লক্ষ করেছি, শ্মশানে ভয় কম আর শান্তি বেশি অনুভূত হয় আমার। চোখের সামনে এই সাধের জীবনের অন্তিম মঞ্জিলটা দেখলে কেমন যেন বৈরাগ্যের ভাব আসে মনে। মনে হয় সারা জীবনটাই মিথ্যে, মৃত্যুই একমাত্র শাশ্বত সত্য।

তবে এবারে যেন প্রকৃতির ভাষা একটু অন্যরকম, ঘাটের পাশেই বিশাল প্রেতের মতো যে গাছটা আছে সেটা বাতাসের থেকে দ্বিগুণ বেগে দুলছে। বিজলীবাতির আলোর কুচি গঙ্গার কালো জলের ওপর আঁকিবুকি কাটছে। হঠাৎ মনে হল জলের ভিতর থেকে কী যেন একটা উঠে আসতে চাইছে, চোখটা সইয়ে নিয়ে আর একটু ভালো করে দেখলাম হ্যাঁ কিছু একটা তো আছে, মাছ? অত বড়ো! হঠাৎ কে যেন তীব্র বেগে পাশ দিয়ে ঘাট দিয়ে নেমে গেল মনে হল। কিন্তু কই কেউ তো নেই…নাকি….না তো! ওই তো! ওই তো জলের ঠিক তিনটে সিঁড়ি উপরে একজন দাঁড়িয়ে। আমি গলা তুলে বললাম, জলের অত কাছে যাবেন না জোয়ার আসবে শুনলাম। লোকটা আরও এক ধাপ নামল। আমার মন কু ডাকল লোকটার কী অভিসন্ধি! ধারে কাছে কাউকে দেখলাম না, আবারও জোর গলায় মানা করলাম, সে আরও এক ধাপ নামল আমি নিশ্চিত হলাম লোকটা মারাত্মক কিছু করতে চাইছে, আত্মহত্যা! এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে,

“ও দাদা, দাঁড়ান বলছি, জলে যাবেন না এত রাতে, জোয়ার আসছে।”

বলতে বলতে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলাম, লোকটা বোধহয় একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল আঁধারে তার মুখ বুঝলাম না, এবার সে একদম নীচের সিঁড়িতে আমি তার প্রায় হাত তিন চার দূরে। চোখের কোণ দিয়ে বুঝতে পারলাম জলের নীচে তোলপাড় বেড়ে গেছে বহুগুণ, মাছ… নাকি জোয়ার…নাকি অন্য কিছু? হঠাৎ কেন জানি না একটা অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল মেরুদণ্ড দিয়ে। আমাকে লোকটাকে ধরে ফেলতেই হবে, হাত বাড়ালাম আমি।

লোকটাও বোধহয় হাতটা বাড়ালো, ওর গায়ে জড়ানো চাদরের নীচে ঠিক বুঝলাম না। আর মাত্র ফুট খানেকের দূরত্ব, বাঁচিয়ে ফেলব লোকটাকে ঠিক, যে মুহূর্তে ওর হাতটা ধরতে যাব ঠিক সেই মুহূর্তে কে যেন মারাত্মক গম্ভীর স্বরে ধমকের সুরে বলল, “যাও এখান থেকে…” মারাত্মক চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে দেখলাম কেউ কোথাও নেই! তাহলে কে বলল…?

মুহূর্তের মধ্যে সামনে তাকিয়ে আমার হৃদপিণ্ডটা আক্ষরিক অর্থে গলার কাছে উঠে এল! লোকটা নেই! ফ্র্যাকশন অফ সেকেন্ডে সে কোথায় গেল! চারিদিকে দেখলাম কেউ কোথাও নেই। অদ্ভুতভাবে জলের আন্দোলনও স্তিমিত! লোকটা জলে ঝাঁপাইনি! তবে কী…!

ঠাকুরের কথাটা কানে বেজে ওঠে,

“চোখ কান আর অন্তরাত্মা খোলা রাখবে। চোখ আর কানের বাইরেও একটা অনুভবের পৃথিবী আছে। যাকে তোমরা বলো Gut feeling, instinct সেটাকে অগ্রাহ্য করবে না।”

সব কাজ মিটিয়ে আমরা যখন ফিরলাম তখন ভোর। নিম পাতা দাঁতে কেটে আগুন তাপ নিয়ে লোহার কিছু ছুঁতে হয়। অদ্ভুতভাবে নিমপাতার কোনো তিতো স্বাদ আমি বুঝলাম না। বেশ কিছু দিন জ্বরে ভুগেছি হয়তো তাই। গা-টা খুব ম্যাজ ম্যাজ করছিল, একটু ভারী লাগছিল। গুড্ডি-সৌম্য বলেছিল স্নান খাওয়া সেরে একটু রেস্ট নিয়ে বেরোতে কিন্তু আমার বাড়ির জন্য মন টানছিল।

বাড়ি ফিরে পিসিমণির সঙ্গে একটু কথা বলে স্নান খাওয়া মিটিয়ে শুয়ে পড়লাম। রবিবার আমার ছাত্র পড়ানো থাকে না। ঘুমের মধ্যে ঘুরে ফিরে আবছায়া সেই ঘাটের লোকটাকে দেখলুম, ও আমার হাতটা ধরতে চেয়েও পারছে না। আমিও ওর মুখটা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। কেমন যেন ঘোলাটে। হঠাৎ যেন কুয়াশার চাদর সরে যেতেই একটা অপার্থিব কদাকার বীভৎস গলিত মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠল। লোকটা ওর পাথর ঠান্ডা হাতটা দিয়ে আমার হাতটা ধরে ফেলেছে, উফ কী শক্ত সে বাধন, ও কি আমাকে টানছে? কিন্তু কেন? হঠাৎ কপালে ঠান্ডা একটা স্পর্শ! এ ঠান্ডাটা আরামের, অসহ্য না।

আর ওই স্পর্শ মাত্রই সেই পাথর ঠান্ডা হাতের বাধনটা যেন আলগা হয়ে গেল আর লোকটাও যেন ধোঁয়ায় হারিয়ে গেল। আমি ধরমর করে উঠে বসি। কয়েক সেকেন্ড নিই নিজেকে গুছিয়ে নিতে। তারপর খাট থেকে নামতে গিয়ে ভীষণ চমকে উঠি ঠাকুর কখন এসে চুপটি করে মাথার কাছটায় দাঁড়িয়েছে। তার মানে কপালের স্পর্শটা সত্যি ছিল।

“শরীর কেমন? কাল আবার ঠান্ডা লাগিয়েছ ভালোই। ওই ওষুধটাই আবার এনে রেখেছি খেও মনে করে।”

“আপনি কী করে জানলেন…?”

“সকালে এসেছিলুম, তুমি তখন সবে খেয়ে শুয়েছ, রাতে ধকল গেছে তাই জাগাইনি। দিদি মানে তোমার পিসিমণির থেকে শুনলাম সব।”

“ওহ…আচ্ছা বসুন আমি একটু চা…”

“সেসব আমি গুছিয়ে রেখেছি, তোমার ওঠার অপেক্ষা করছিলুম, দাঁড়াও নিয়ে আসি…। এই কয় মাসে আমার বাড়ি, জীবন আর মনের সব অলিগলি ঠাকুরের চেনা হয়ে গেছে। সর্বত্র ওঁর অবাধ যাতায়াত।

তোমার তো অনেক কিছু বলার আছে, তাই না!”

একটা অর্থবহ দৃষ্টি আমার দিকে আলগোছে ছুড়ে দিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলেন ঠাকুর।

গলাটা ব্যথা ব্যথা করছিল, আদা এলাচ দেওয়া ঘন দুধের চা-টা অমৃত মনে হল।

“গা হাত পা ম্যাজ ম্যাজ করছে, ভারী ভারী লাগছে।”

একটু চিন্তিতভাবে ঠাকুর মাথা নাড়লেন, বললেন,

“ম্যাজ ম্যাজটা ওষুধেই কাটবে, তবে ভারীটা…দাঁড়াও তো।”

বলেই আমার কাছে এসে খুব মন দিয়ে চোখের ভিতরটা দেখলেন, বাতাসে কী যেন ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করলেন।

তার পর আবার চেয়ারে বসে আমার দিকে খুব নিবিষ্ট মনে খানিক ক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। মর্মভেদী দৃষ্টিতে আমাকে না আমার অন্তরাত্মাকে যেন পড়তে চাইছেন। খানিক পর বললেন।

“তুমি কি তাকে স্পর্শ করেছিলে?”

কিছুই না বুঝতে পেরে বোকার মতো জিজ্ঞেস করলাম,

“কাকে? মেসোমশাই মানে বোনের শ্বশুর কে? হ্যাঁ কাঁধ দিয়েছি, তখন স্পর্শ হয়েছে নিশ্চয়ই….”

“আহ! ওঁর কথা বলছি না। সে তোমার খুব কাছে ছিল, ওরা স্পর্শলোভী, মনে করে দেখো তো ছোঁয়া পড়েছিল কি?”

কয়েক সেকেন্ড হতবাক হয়ে থাকার পর হঠাৎ কাল রাতের ঘাটের ঘটনাটা মাথায় এল, ঠাকুর কি তবে সে বিষয়ে কিছু বলতে চাইছেন?

এতগুলো দিন ওঁকে চিনি আজ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারলাম না লোকটা আসলে কি? নিজেকে সাধক তান্ত্রিক বলে না আবার অজ্ঞাত জেনে যান, অদৃশ্য দেখে ফেলেন। সাধু সঙ্গ করেছেন বিস্তর। কথায় কথায় ধর্মের গূঢ় তত্ত্বগুলো কেমন সহজ করে বলে দেন। ধর্ম মানেন কিন্তু অন্ধ আনুগত্য নেই। বিজ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে চলেন। মানুষটার এমন কিছু আছে যাতে শ্রদ্ধায় মাথা আপনি অবনত হয়ে যায়।

গত রাতের সবটুকু ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ওঁকে বললাম। এই প্রথম আমি ওঁকে রাগতে দেখলাম। প্রচণ্ড রেগে প্রায় ধমকে বললেন,

“রুদ্র এটুকু তো সবাই জানে যে শ্মশানে কোনো সময় একা বা দলছুট হতে নেই।”

বেশ ভয় পেয়ে বললাম,

“কেন ঠাকুর কি হয়েছে?”

“কাল তুমি যাকে তোমার বোনের বাড়ির দরজার বাইরে দেখেছ বা ঘাটের কাছে দেখেছ আমার মনে হচ্ছে সে একজনই, বললাম না সঙ্গলোভী হয় ওরা। তবে তোমার…”

ওঁর কথা শেষ হওয়ার আগে আমি আতঙ্কিত স্বরে বলে উঠি,

“ঠাকুর মানে কি বলছেন আমাকে ভূতে ধরেছে!”

“উফ তা কখন বললাম…!”

“তবে…?”

“দেখ আমি আগের দিনই কিছু একটা খারাপের ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম, সব ইঙ্গিত কিন্তু জলের মতো সরল বা স্পষ্ট হয় না, কীভাবে যেন বুঝতে পেরে যাই। কী করে তার ব্যাখ্যা আমারও জানা নেই, তবে বারবার ইঙ্গিতগুলো ফলে যেতে দেখে দেখে একটা ধারণা হয়েছে যে ইঙ্গিতগুলো অর্থহীন নয়।”

“আচ্ছা এই ইঙ্গিত দেখার ক্ষমতা কি আপনি তন্ত্র সাধনা করে পেয়েছেন?”

“না… আমার গুরু বলেছিলেন এটা নাকি ঈশ্বরের দান, আমি আদৌ জানি না এমন দান হয় কিনা। সেদিনই তোমার গাত্র বন্ধন করে দিয়েছিলাম। সে কারণেই তুমি দরজার কাছে যাকে দেখেছিলে তোমার গায়ে ধাক্কা দিয়েই ছিটকে সরে গেছিল। মন্ত্র বন্ধন বড়ো কঠিন জিনিস। তবে…একটা খটকা…”,

“কী খটকা?”

“সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। সময় বুঝিয়ে দেবে। তবে খারাপ এর সঙ্গে তোমার অজ্ঞাতে তুমি ভালো কারোরও আভাস কাল পেয়েছিলে, বুঝতে পারোনি।”

“ভালো?”

ঠাকুর স্মিত হেসে বললেন যে তোমার চরম ক্ষতির আশঙ্কা দেখে মারাত্মক জোরে ধমক দিয়েছিল ঘাটে তিনি ছিলেন খুব শুদ্ধ আত্মা। তিনি চাননি তোমার ক্ষতি হোক। আত্মা মানেই যে অশুভ তা কিন্তু নয়।

ঠাকুর যাওয়ার আগে হঠাৎ কী মনে করে পুনরায় আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন কিছু ভাবছেন। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে কী একটা মন্ত্রের মতো বললেন। সম্পূর্ণটা বুঝলাম না কী বললেন তবে কানে মন্ত্রটা যাওয়া মাত্র মাথার ভিতর আর সারা শরীর যেন গরম হয়ে উঠল, মুহূর্তের মধ্যে কপাল কানের পাশ ঘেমে উঠল। গায়ের চাদর খুলে ফেললাম। একটা উর্যা গোলক যেন শরীর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। একটা অদ্ভুত পরিতৃপ্তির আরাম বোধ করছি শরীরের মধ্যে।

সনৎ ঠাকুর ‘পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে। ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ।” মন্ত্র পাঠ করে ঠাকুরের আসনের গঙ্গাজলের পাত্র থেকে খানিকটা জল দেহে ছিটিয়ে দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই শরীরটা যেন নিমেষে জুড়িয়ে গেল।

“নিশ্চিন্তে থাকো, আর হ্যাঁ ওষুধটা খাবে ওটার কোনো বিকল্প মন্ত্ৰ কিন্তু কোনও শাস্ত্রে নেই।”

***

মাঝে বেশ কিছুদিন কেটে গেছে, সেদিন ওই ঘটনার পর ম্যাজিকের মতো শরীর সুস্থ হয়ে উঠেছিল। তবু ওষুধগুলো খেয়েছিলাম। এই কয়দিন গুড্ডির বাড়ি যেতে পারিনি ব্যস্ততার জন্য, তবে ফোনে কথা হচ্ছে। সেদিনের কোনও ঘটনাই ওকে বলিনি। পিসিমণি আর পিসেমশাই ব্যারাকপুরে ফিরে গেছেন আগেই। শ্রাদ্ধের দিন ভোর ভোর পৌঁছে গেছিলাম গুড্ডিদের বাড়ি। আমি ভীতু মানুষ মোটেই নই তবে সেদিন সকালের ঝকঝকে আলোয়ও ওই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সেদিনের ঘটনাগুলো মনে পড়তেই শিরদাঁড়া দিয়ে এক কুচি বরফ নেমে গেল। মনকে শাসন করে পা বাড়ালাম বাড়ির ভিতরে।

সুষ্টভাবে আদ্যশ্রাদ্ধ সমাধা হল। শ্রাদ্ধান্তে পূজারী বললেন মৃতের উদ্যেশ্যে তার প্রিয় খাবারগুলো থালায় সাজিয়ে কোনো এক জলাশয়ের পাশে রেখে আসতে হয়। সৌম্য যাবে সঙ্গে ওর এক ভাই আর আমিও গেলাম। জায়গাটা ওদের বাড়ির থেকে বেশ কিছুটা ভিতর দিকে। একটু নির্জন একটা বেশ বড়ো পুকুর দেখলাম পাশে বিরাট একটা জাম গাছ। কে বলবে এটা কল্লোলিনী কলকাতার মধ্যে কোথাও, যেন কোনো পল্লিগ্রামের সবুজ স্নিগ্ধ টুকরো কেউ সযত্নে তুলে এনে রেখেছে এই ধুলো ধোঁয়ার শহরের মধ্যে!”

পুরুতমশাই বারবার বলে দিয়েছিলেন খাবার পুকুরের পাশে একটা পরিষ্কার জায়গায় রেখে চলে আসবে, পিছন ফিরে তাকাবে না। সৌম্য খুব ভেঙে পড়েছে। এতক্ষণ বাড়িতে নিজেকে সামলে রেখেছিল। এখানে এসে আর পারল না। ওকে সান্ত্বনা দিয়ে এক প্রকার আমি আর আর ওর ভাই জোর করে টেনে নিয়ে গাড়ির দিকে এগোলাম। কিন্তু ও যে এমন কিছু করবে ভাবতে পারিনি। গাড়ির পিছনে ওকে তুলে দিয়ে আমি আর ওর ভাই সামনে বসতে যাব হঠাৎ দেখলাম সৌম্য গাড়ি থেকে নেমে ওই পুকুরের দিকে দৌড় দিল। আমরা বিষয়টা বুঝে ওর পিছনে যেতে যেটুকু সময় লেগেছে তা এমন কিছু না, সৌম্য সামনে দৌড়োচ্ছে আমরা পিছনে। ওকে ক্রমান্বয়ে বারণ করছি ওদিকে না যেতে কিন্তু ওর কানে যেন কোনও কথাই ঢুকছে না। হঠাৎ দেখলাম ও দাঁড়িয়ে পড়েছে, এক দুই সেকেন্ড পরেই পা ঘষে পিছন দিকে হাঁটতে লাগল, এক দুই পা পিছন হাঁটার পরই হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল আর তারপর পড়ি কী মরি করে দৌড়ে আমাদের দিকে ফিরে আসতে লাগল, আমরা দু’জনেই মূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। ও কাছে আসতে দেখলাম ওর চোখ মুখে মারাত্মক আতঙ্কের ছাপ।

ওর ভাই জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে রে দাদাভাই?”

ও কোনও উত্তর না দিয়ে গাড়ির ভিতর উঠে গুটিসুটি হয়ে বসল। এ সৌম্যকে আমি চিনতে পারছি না। গাড়িতে ওঠার আগে দূর থেকে গাছের দিকে অনিচ্ছাকৃতভাবেই চোখ চলে গেল আর এক লহমার জন্য মনে হল একটা অস্পষ্ট ধোঁয়া রঙের কিছু যেন ক্ষিপ্র গতিতে ওই ভাতের পাত থেকে পাশের জাম গাছের কাণ্ড বেয়ে উঠে গেল। যে উঠে গেল তার আকৃতি ঠিক বুঝলাম না তবে তার চলন ভঙ্গি সরীসৃপের মতো।

এক মুহূর্তের জন্য হৃদপিণ্ডটা বোধহয় স্পন্দিত হতে ভুলে গেল। বুঝলাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ স্থান ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। সৌম্যর ভাই রাজাই ড্রাইভ করছিল,

“রাজা, জলদি চলো ভাই।”

মনে ভাবলাম যত দ্রুত সম্ভব এ জায়গা ছাড়তে হবে। কিন্তু আমি বুঝিনি আমরা ছাড়তে চাইলেই হল না। হঠাৎ গাড়ির রেয়ার ভিউ মিরর-এ চোখ পড়তেই শ্বাসটা যেন আটকে গেল। উজ্জ্বল দিনের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম একটা বিকৃত পৈশাচিক অবয়ব যেন আমাদের গাড়ির পিছনে দৌড়ে আসছে। রাজা খেয়াল করেনি আমি ওকে কিছু বললাম না, ও স্টিয়ারিং-এ আছে ও প্যানিক করলে বিরাট অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যেতে পারে। আমি শুধু আস্তে করে ড্রাইভার আর প্যাসেঞ্জার কার উইন্ডো সুইচগুলো টিপে দিলাম। জানি একটা কাঁচের জানলা বোধহয় আমাদের বাঁচাতে পারবে না কিন্তু ওই মুহূর্তে রিফ্লেক্স একশন হিসেবেই হোক আর যাইহোক ওটাই করলাম। সবে ভাবছি ঠাকুরকে কল করব কিন্তু আমাকে মারাত্মক চমকে দিয়ে ঠাকুরের মেসেজ ঢুকল,

ভয় পেও না প্যানিক করো না যে মন্ত্রটা লিখে পাঠাচ্ছি সেটা ক্রমান্বয়ে জপ করতে থাকো

সত্যি লোকটা সাইকিক, আমার আর কোনও সন্দেহ নেই। টুং করে সনৎ ঠাকুরের আর একটি sms ঢুকল,

“ওম আইম হ্রিম ক্লিম শ্রী বাটুকভৈরব নমঃ ॥”

রেয়ার ভিউ মিররে আর একবার চোখ চলে যেতেই আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল, এ আমি ঠিক দেখছি তো? পিছনের সিটে সৌম্য চোখ বুজে গুটিসুটি হয়ে বসে আর ঠিক ওর পাশে সেই ধোঁয়া রঙের শরীর নিয়ে বসে এক আকৃতি। আমি তার বুকের নীচ পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি আমি। যেন একটা কালচে ধোঁয়া বেরোচ্ছে অবয়বটি থেকে। অবয়ব একারণেই বলছি যে ঠিক মানুষের সুস্পষ্ট আকৃতি তার নয়। গলার ওপর মুখের জায়গাটা শুষ্ক কাষ্ঠল আর নাক মুখ কিছুই স্পষ্ট না যেন ঘষা কাঁচের আবরণে ঢাকা শুধু চোখ দু’টি যেন মারাত্মক অতলান্টিক ক্ষুধার ভাণ্ডার…মারাত্মক জীবন্ত! সে সৌম্যর শরীরটা যেন শুঁকতে চেষ্টা করছে। আমাদের অস্তিত্বের প্রতি সে উদাসীন, অজ্ঞ।

আমি এক মনে জোরে জোরে মন্ত্রটি পাঠ করতে লাগলাম। রাজা একটু চমকে আমার দিকে তাকালো তারপর মিররে চোখ ফেলতেই ওর মুখটা

ফ্যাকাশে কাগজের মতো হয়ে গেল, বুঝলাম আমার চোখ বা মনের ভুল নয়। ও কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“রুদ্রদা ওটা কী!”

আমি মুখে কিছু না বলে হাতের ইঙ্গিত যে ওকে আশ্বস্ত করলাম। মন্ত্ৰ পাঠ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই দেখলাম অবয়বটি যেন মাঝে মাঝে মিলিয়ে যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে, আমি চোখ বন্ধ করে আরও মনোযোগ দিয়ে মন্ত্র পড়তে লাগলাম।

কতক্ষণ মন্ত্র পাঠ করেছি জানি না তবে বাড়ির কাছাকাছি আসার কিছু আগে তাকিয়ে দেখলাম সে নেই। সৌম্যও ধাতস্থ হয়েছে।

রাজা আর আমি ঠিক করলাম সবাইকে এসব কিছু বলে আতঙ্কিত করব না। আমি বিকেলের মধ্যেই বাড়ি ফিরে এলাম। আমি জানতাম আজ যা ঘটেছে তা ঠাকুর বুঝেছেন। আমাকে ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে হবে।

মেসেজ করে ছাত্রদের জানিয়ে দিলাম আজ পড়াব না। আজ আমার মানসিক স্থিতিই নেই পড়ানোর মতো।

ঘাটে গিয়ে ঠাকুরকে পেলাম না। মন্দিরে খোঁজ করতে গিয়ে শুনলাম সেখানেও নেই। ফোন করলাম ধরলেন না।

আজ যে আমার ওঁকে বড়ো দরকার। বিফল মনোরথে ফিরে আসতে যাব পিছন থেকে ডাক শুনলাম,

“কী হে চলে যাচ্ছ কেন?”

আমার ধড়ে প্রাণ এল।

সবটা শুনে উনি বললেন,

“পুরোহিত মশাইয়ের বারণ শোনা উচিত ছিল। দেখো মৃত্যুর পর যে অন্তিমভোগ দেওয়া হয় তা অনেক সময় যার উদ্দেশে দেওয়া হচ্ছে সেই যে গ্রহণ করবেন তা কিন্তু নয়। আমাদের জানার বাইরে যে জগৎ যাকে বেশিরভাগ মানুষ বুজরুকি ভাবেন সেখানে বিভিন্ন রকম অতৃপ্ত আত্মা, পিশাচ আছে বা আরও কিছু থাকতে পারে যা হয়তো আমাদের অজানা। এই দুই জগতের মাঝে একটা পর্দা আছে ওরা আমাদের বা আমরা ওদের দেখার কথা নয় তবে কখনও কখনও সংযোগ হয়ে যায়, ওরা গন্ধ বোঝে…জীবনের গন্ধ, প্রাণের গন্ধ আর সৌম্য সেভাবেই ওদের চোখে এসে যায় আর প্রাণের লোভে ওরা সৌম্যর পিছু নেয় ওরা হয়তো তোমাদের অস্তিত্ব বোঝেওনি, অথবা হয়তো বুঝেছিল। তবে কাল ভৈরব মন্ত্রের সামনে সবার সব জারি জুড়ি শেষ হয়ে গেছিল। তাই শেষ রক্ষাটা হয়ে ছিল।”

“ঠাকুর আপনি ঠিক সময় মেসেজ করলেন কী করে? কী করে করেন এসব!”

সনৎ ঠাকুর অর্থবহভাবে হেসে উপরে আকাশের দিকে ইঙ্গিত করলেন।

মানে ওপরওয়ালা জানেন।

ভাবলাম যাক বিপদ কাটল তাহলে। কিন্তু অলক্ষ্যে কেউ বোধহয় সেদিন হেসেছিলেন।

***

হপ্তা খানেক কেটেছে আমি নিজের কাজের ব্যস্ততায় ও বাড়িতে আর ফোন করে উঠতে পারিনি। কী জানি অবচেতনে হয়তো চাইওনি, ওই ঘটনার পর হয়তো চাইছিলাম না যোগাযোগ করতে। হয়তো ভয়ই পেয়েছিলাম, নিজের কাছে নিজেই সেটা হয়তো মানতে চাইছিলাম না।

দিনটা ছিল রবিবার। পড়ানো থাকে না। সকালবেলা বাজার করে সেলুন ঘুরে বাড়ি ফিরতে একটু দেরিই হল। স্নান সেরে রান্না আর খাওয়া মিটিয়েছি সবে মাত্র। হঠাৎ দেখলাম বাড়ির দরজায় গাড়ি থামার শব্দ। বারান্দায় গিয়ে দেখলাম পিসিমণি এসেছেন। পিসিমণি এসেই একপ্রকার উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়ে আমার কাছে এসে বললেন,

“রুদ্র বাবা সনৎ ঠাকুরকে ডাকতে পারবি… বড়ো বিপদ রে…”

“কী হয়েছে পিসিমণি, এমন কেন করছ?”

“সব বলব তবে আগে সনৎ ঠাকুরকে ডাক, সময় যে বড়ো কম।”

এই কয়দিন নিয়মিতভাবে ঠাকুরের সঙ্গেও দেখা হয়নি আমার। ফোন করেছিলাম, বলেছিলেন কোনও এক কাজে যাচ্ছেন। ভবঘুরে মানুষকে মায়া বা নিয়মে বাঁধা যায় না, বোধহয় উচিতও না। বেশি কৌতূহলও দেখানো যায় না। ঘাটে ছুটলাম দেখলাম, মন্দিরের দিক থেকে ব্যস্ত পায়ে আমার দিকেই আসছেন ঠাকুর। চেহারা উদ্ভ্রান্ত, চুল গুলো যেন ধূসর রুক্ষ, হাত-পা কেমন যেন ধুলো মাখা। যেন কত পথ মাঠ মরু পেরিয়ে এসেছেন পায়ে হেঁটে। মুখে সেই স্মিত হাসিটাও নেই,

“চলো রুদ্র, সময় কম আর লড়াইটা কঠিন। আমার মন বলছিল আসল অভিসন্ধি আরও নিগূঢ়, বিপদ…বিপদের গন্ধ পাচ্ছিলাম।”

আমি স্বভাবতই কিছুই বুঝলাম না। বাড়িতে ওঁকে নিয়ে পা দেওয়া মাত্র পিসিমণি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। এখানে বলে রাখি সনৎ ঠাকুরের সঙ্গে পিসিমণি ও পিসেমশাই এর বেশ ভালো আলাপ আছে, পিসিমণিকে ঠাকুর দিদি ডাকেন।

“ঠাকুর… আমি কোনও পথ না পেয়ে তোমার কাছেই …তুমি বাঁচাও…”

আবেগের আতিশয্যে পিসিমণি সবটুকু কথা পরিষ্কারভাবে বলতেও পারলেন না।

“দিদি আপনি চলুন, গাড়িতে যেতে যেতে সব শুনব।”

পিসিমণি যা বললেন তা সংক্ষেপে হয়…

শ্রাদ্ধের পর সব আত্মীয়রা বাড়ি ফিরে যান। ওই বাড়িটার আয়তন অপেক্ষা মানুষ কম। গুড্ডি সৌম্য ওর মা আর গুড্ডির কাকা শ্বশুর-শাশুড়ি আর তাদের দুই ছেলে রাজা আর রজত। ওদের এখনও বিয়ে হয়নি। আর বাড়ির কিছু কাজের মানুষ।

রজত কর্মসূত্রে বিদেশে, নতুন চাকরি তাই এত বড়ো খবর পেয়েও সে বাড়ি ফেরার ছুটি পায়নি। ওদের পারিবারিক সোনার ব্যবসা সৌম্য ওর বাবা আর কাকা মিলেই সামলাত।

সৌম্য সেদিনের পর থেকে খুব চুপচাপ হয়ে গেছিল, তাই ওর কাকু বলেছিল যে ও কয়দিন ব্রেক নিক। ও বাড়িতে থাকলেও ঘর থেকে বেরোত না এমনকি গুড্ডির সঙ্গেও কথা বলত না, যতটা প্রয়োজন সেটুকু বাদে। সবাই ভেবেছিল বাবার মৃত্যুর শোক। এ পর্যন্ত তবু ঠিক ছিল। কিন্তু হঠাৎ বাড়িতে শুরু হল অদ্ভুত উপদ্রব। ওদের বাড়ির অনেকগুলো ঘরই অব্যবহৃত। সেগুলো তালা বন্ধ থাকে। নীচের তলার একটা দিকে সারিবদ্ধ চার পাঁচটি ঘর বাড়ির কাজের লোকদের জন্য বরাদ্দ বাকি ঘর বন্ধ। তো হঠাৎ সেই ঘরগুলো থেকে বিশ্রী গন্ধ আসতে থাকে। কিছুদিন আগেই আত্মীয়রা এসে থাকার জন্য ঘর সাফ করা হয়েছে, সুতরাং গন্ধ থাকার কথা নয়, গন্ধের কারণ কেউ বুঝলেন না। তবু আবার সব পরিষ্কার হল। কিন্তু গন্ধ গেল না। উলটে আরও উপদ্রব বাড়ল। রান্না করা খাবারে কখনও চুলের দলা কখনও কাঁচা মাছের কাঁটা ইত্যাদি আবার কখনও গাছের পাতা শিকড় ইত্যাদি পাওয়া যেতে শুরু করল। রান্নার ঠাকুর বদল হল কোনও লাভ হল না। গুড্ডির কাকিমা নিজে রান্না করলেন। আশ্চর্যভাবে টাটকা রান্না করা খাবার পাত্র খুলতেই মনে হল কত দিনের বাসি- পচা খাবার। শুধু এখানেই শেষ নয় রাতের দিকে বাড়ির ঝি উঠেছিল কী একটা শব্দ পেয়ে তো ওর মনে হল একাধিক লোকজন যেন ওর পাশে চলাফেরা করছে ও তাদের দেখতে পাচ্ছে না আর বিশ্রী একটা পচা গুমোট গন্ধ। তাছাড়া বন্ধ ঘরের দরজা ধাক্কানো, কাঁচের জিনিস ভাঙার শব্দ ইত্যাদি লেগেই আছে।

আর সৌম্য যেন অদ্ভুতভাবে শুকিয়ে গেছে এই কয়দিনে ডাক্তার দেখানো, ব্লাড টেস্ট সব হয়েছে, ডাক্তার বলেছেন কোনও প্রবলেম নেই।

এই পর্যন্ত বলে পিসিমণি থামলেন। পিসেমশাই বরাবরই অল্প কথার মানুষ। শুধু একটা কথা মৃদুভাবে বললেন,

“আচ্ছা এর পিছনে কোনও গুপ্ত ব্যবসায়িক শত্রুতা নেই তো? মানে পুরো বিষয়টার অলৌকিক না হয়ে একটা যৌক্তিক দিকও থাকতে পারে নাকি?”

আমি ওঁর কথার উত্তর দিতে যাচ্ছিলাম কিন্তু ঠাকুর চোখের ইশারায় বারণ করলেন। কেননা পর পর যতগুলো ঘটনা আমি প্রত্যক্ষ করেছি সেগুলো কোনওটাই স্বাভাবিক নয়। ঠাকুর বললেন,

“একদম ঠিক বলেছেন দাদা, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অলৌকিক এর থেকে লৌকিক কারণই থাকে। তবু একবারটি গিয়ে দেখি, সমস্যা যখন এসেছে সমাধান তো করতেই হবে।”

পিসিমণি বললেন,

“তুমি ওঁর কথা রাখো তো ভাই, আমার মেয়েটার স্বামী সংসার বাঁচাতে যা করতে হয় আমি করব।”

“দিদি আপনার মায়ের মন তাই ব্যাকুল হচ্ছে কিন্তু দাদা যেটা বলছেন সেটাও যুক্তি পূর্ণ। ঠিক আছে গিয়ে দেখি। চিন্তা করবেন না। ভৈরব সহায় আমাদের।”

কথায় কথায় আমরা গুড্ডিদের বাড়ির গলির মুখে পৌঁছে গেছি। বাড়ির দরজা দিয়ে ঢোকার সময় ঠাকুর দরজার দু’পাশটায় কী যেন ভালো করে খুঁজে দেখলেন। তার পর কিছু একটা মন্ত্র পড়ে কাঁধের শান্তিনিকেতনি ব্যাগের থেকে একটু সাদা চুনের মতো গুঁড়ো নিয়ে দরজার দু’পাশে ছড়িয়ে দিলেন। ওঁর কপালে চিন্তার রেখা ঘন হচ্ছে। আমরা যে আসব তা বোধহয় সবাই জানতেন না। তবে গুড্ডির শাশুড়ি মা জানতেন কেননা আমরা যাওয়া মাত্রই উনিই এগিয়ে এসে বললেন,

“যাক সনবাবু এসেছেন তাহলে, দিদি বলেছিলেন যে, যে করেই হোক … “ কথাটা মাঝে কেটে যায়, গুড্ডির কাকাশ্বশুর খানিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“উনি কে বউদি তুমি চেনো?”

পরিচয় দেওয়ার পর দেখলাম উনি খুব একটা খুশি হননি। ঠাকুর দেখলাম এসব দিকে খেয়ালই করছেন না। ওঁর চোখ মুখের ভাব আমি এখন কিছুটা বুঝতে পারি, এ সেই চাহনি যা সামনের প্রত্যক্ষকে পার করে অন্তর্নিহিত কে দেখতে পায়, অশ্রুত কে শুনতে পায়।

ঠাকুর কিছু বা কাউকে যেন খুঁজছেন। হাতের মুঠিতে শক্ত করে কিছু একটা ধরা। ঠোঁট দুটো হালকা কাঁপছে মনে উনি বিড় বিড় করে কোনও মন্ত্র জপ করে চলেছেন। হঠাৎ গুড্ডির শাশুড়ির মুখের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, তার পরমুহূর্তে ওর কাকিশাশুড়ির দিকে গেলেন, তার পর কাজের লোক দু’টির দিকে। সবাই যে বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে বোঝা যাচ্ছে।

যেদিন ঠাকুর আমার মুখটা ধরে চোখের ভিতরটা ওইভাবে দেখছিলেন সেদিন আমিও খুব অবাক হয়েছিলাম। এই সময়টায় উনি যেন অন্য মানুষ হয়ে যান। বাড়ির ঝি টি তো এক প্রকার ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে কিন্তু সেই শব্দ বোধহয় ঠাকুরের কানেও ঢোকেনি। ঠাকুর নিজের মতোই ব্যস্তভাবে এক জনের থেকে অন্য জনের দিকে ঘুরে চলেছেন, বুঝতে পারছি কিছু একটা অনুভব করছেন কিন্তু তাকে ঠিক খুঁজে পাচ্ছেন না। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সৌম্যর কাকুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে যান। বলেন,

“মেশবাবু আপনি বা বলা ভালো আপনারা তো এসব মানতেন, তাই না?” রমেশ বাবু হকচকিয়ে বলেন,

“কী…কী বলছেন? বুঝলাম না!”

ঠাকুর কোনও উত্তর দিলেন না। একটু ধাতস্থ হয়েছেন এতক্ষণে। পিসিমণিকে বললেন গুড্ডি সৌম্যর ঘরে যাওয়া যায় একটু?

গুড্ডির শাশুড়িই নিয়ে গেলেন আমাদের। ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। ওর শাশুড়ি নক না করেই দরজা ঠেলে ঢুকলেন। গুড্ডি কাউচে বসে ফোন দেখছে আর সৌম্য একটা চাদর চাপা দিয়ে শুয়ে। আমাদের দেখে গুড্ডি উঠে এল। সনৎ ঠাকুরের কথা গুড্ডি জানে কিন্তু সেভাবে পরিচয় নেই। সৌম্য তখনও শুয়ে। ঠাকুর হাতের মুঠোয় জিনিসটা নিয়ে সৌম্যর পিঠের ওপর স্পর্শ করা মাত্র ওর শরীরটা যেন একটু কেঁপে উঠল। মিনিট খানেক ওইভাবে থাকার পর ঠাকুর বললেন,

“সৌম্য ওঠ, কোনও ভয় নেই। যাকে খুঁজছিলাম পেয়ে গেছি। তোমার চিন্তা নেই।”

সৌম্য উঠে বসল। এই আট দশ দিন এ কী চেহারা হয়েছে ওর। একটা ছয় ফুটের জিম করা সুঠাম যুবক যেন শুকিয়ে গেছে। চোখের নীচে কালি, গাল ভেঙে গেছে। ঠাকুরের হাত দুটো শক্ত করে নিজের হাতের মধ্যে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে সৌম্য। ওকে শান্ত করে ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন,

“সেদিন কী হয়েছিল সৌম্য কি দেখেছিলে তুমি?”

“আমরা খাবার দিয়ে চলে এসেছিলাম, আমি জানি পিছনে ফিরে তাকানো বারণ, কিন্তু কিছু দূর আসার পর স্পষ্ট শুনলাম বাবা ডাকছে বলছে শেষ বারের মতো আমার মুখটা দেখতে চান। বাবা কাঁদছিলেন সনবাবু, আমি পারিনি নিজেকে সামলাতে, মনে হয়েছিল শেষবারের মতো বাবাকে….

গলা বুজে আসে সৌম্যর।

“তারপর?”

“তার…তারপর…উফ সে কী বীভৎস…উফ সনবাবু আপনি বিশ্বাস করবেন না সে কী বীভৎস। দেখলাম একটা কালো ছায়ার মতো কিছু যেন পাতের পাশে ঘোরা ফেরা করছে যেন একটা ফ্যাকাসে কালচে ধোঁয়ার মতো কিছু, তার পর হঠাৎ দেখলাম গাছের গুঁড়ির পিছন থেকে কে একটা বেরিয়ে এল একটা মানুষের আকৃতি কিন্তু তার চোখ মুখ আলাদা করে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না…কেননা পুরো অবয়বটা দাউ দাউ করে জ্বলছে!

জীবন্ত জ্বলন্ত একটা মানুষ ওই খাবারের পাতের কাছে উবু হয়ে বসল তারপর মুখ টা ডুবিয়ে দিল ভাতের মধ্যে, যেভাবে কুকুর বিড়াল খায় আর কী। একটা পাশবিক জান্তব শব্দ করে খাচ্ছিল ও। আমার বাবা অমন হতেই পারে না। নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে বাবা শব্দটা বেরিয়ে গেছিল। আর সেটাই কাল হল। হঠাৎ ও আমার দিকে সরাসরি তাকালো আর সেকেন্ডের মধ্যে আমার দিকে দৌড়ে আস্তে শুরু করল, জায়গাটা ফাঁকা আর আমি বেশ কিছুটা দূরে ছিলাম আমি। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট দেখেছি ওই জ্বলন্ত মূর্তিটা নিমেষে রূপ বদলে একটা কালো ধোঁয়ার তালে পরিণত হল। তার হাত পা কিছু বুঝতে পারলাম না শুধু মুখের জায়গায় একটা পোড়া কাঠের মতো মুখ তাতে মাংস চামড়া কিছু নেই। শুধু যেন একজোড়া ধকধকে আগুনের মতো চোখ। আর বিশ্রী চামড়া পোড়া গন্ধ।

আমার মাথা কাজ করছিল না জানেন। আমি ভাবতেই পারছিলাম না যে দিনের আলোয় আমি প্ৰেত দেখছি। আমি দৌড়তে থাকি আর প্রেতটা আমার দিকে হওয়ার গতিতে…তারপর রুদ্রদা আর রাজা আমায় ধরে গাড়িতে তুলে নেয়। আমি আর চোখ খুলিনি। কিন্তু বাড়ি ফেরার পর আমি ওকে অনুভব করতে পারি। এক মারাত্মক ভয় আমাকে চেপে ধরেছে। এ বাড়ির চার দিকে কেমন যেন কালচে ধোঁয়া দেখতে পাই। একটা চাপ যেন বুকের ওপর। মাথাটা ধরে থাকে সবসময়।”

এই পর্যন্ত বলে সৌম্য হাঁফাতে থাকল। ঠাকুর ওর মাথায় দু’হাত রেখে চোখ বুজলেন। বিড়বিড় করতে লাগলেন….

“ওঁ অপবিত্র পবিত্রোবাং সর্বাবস্থান গতহ্বপিবা। যৎ সরেত পুণ্ডরিকাক্ষং স বাহ্য অভ্যান্তরে শুচি।। পাপোহং পাপ কর্মাহং পাপাত্মা পাপ সম্ভাবান্। ত্রাহি মাং পুণ্ডরীকাক্ষং সর্ব পাপো হরো হরি।”

এতক্ষণে বাড়ির বাকিরাও ওপরে এই ঘরে চলে এসেছেন। সবার মুখে আতঙ্ক আর অবিশ্বাস মাখামাখি। ঘটনাটা সবাইকে তখন বলা হয়নি। রাজা চুপ করে ছিল, এবার সে ও বলল সেদিন সে কি দেখেছে আর অনুভব করছে।

ঠাকুর সৌম্যকে বললেন,

“তোমার আর কোনো ভয় নেই, তোমার দেহ শুদ্ধি করে দিয়েছি, কোনও অশুভ তোমার স্পর্শ করতে পারবে না বাবা।”

গুড্ডির দেখলাম নার্ভ বেশ স্ট্রং। ও চুপচাপ সবটুকু দেখছে কিন্তু ভয়ের ছাপ নেই ওর মুখে। তবে চুল গুলো উশকোখুশকো। মুখটা শুকনো। যেন অনেকদিন নিজের পরিচর্যা করেনি।

সৌম্যর কাকা পুরো বিষয়টায় বেশ বিরক্ত। উনি খানিক আপত্তির সুরে বললেন,

“এমনিতেও ওর কিছু হবে না। ওটা শকে হয়েছে, হি উইল রিকভার ভেরী সুন। আপনার মন্ত্রর দরকার হবে না এর জন্য। যত্তসব।”

ঠাকুর হেসে বললেন,

“এসবের সূত্রপাত তো আপনার অজানা নয় রমেশবাবু? এন্ড ইয়েস হি উইল বিকজ হি ইস এ পিওর সোল।”

কথাটা শুনে সবাই স্বাভাবিকভাবেই চমকে গেল।

“কি আজে বাজে বলছেন?”

গুড্ডির শাশুড়ি বললেন,

“একটু খুলে বলুন না… “

“মা, সব বলব তবে বিশ্বাস করানোর দায়িত্ব আমার নয়। আমার কাজ অশুভকে দূর করা তার জন্য ম্যাজিক দেখাতে আমি পারব না। শুধু একটাই অনুরোধ আপনাদের যা বলব সেটা শুনবেন আর নিষেধগুলো মানবেন।”

পিসিমণি কাতর কণ্ঠে বললেন,

“ঠাকুর ভাই তুমি যা ঠিক মিনে করবে করো, আমার মেয়ে জামাইকে…”

বলেই ডুকরে কেঁদে উঠল।

ঠাকুর সবাইকে নীচের বৈঠকে ঘরে একত্রিত হতে বললেন। বাড়ির সবাই সঙ্গে কাজের ঠাকুর চাকর সবাই বৈঠকে এসে বসল। এক ঘটি গঙ্গাজল চাইলেন। গুড্ডির কাকিমা শাশুড়ি নিয়ে এলেন। গুড্ডি এতক্ষণে একটাও কথা বলেনি। অতটুকু মেয়ের মনের জোর দেখে আমি অবাক। ঠাকুর বললেন,

“এ বাড়িতে কিছু না, অনেক কিছু আছে। এবং যারা আছে তারা সংখ্যায় অনেক। একটা জিনিস বলে রাখি প্রেত বা আত্মা মানেই কিন্তু খারাপ নয়। ওপারের আর এপারের জগতের মধ্যে একটা অদৃশ্য পর্দা আছে। আমরা তাদের আর তারা আমাদের জগতে আসতে চায় না বা চাইলেই পারে না। তবে মাঝেমধ্যে বিশেষ কিছু সময় বা পরিস্থিতিতে ওই পর্দায় কিছু ফাঁক তৈরি হয়। আর তখনই… আর কিছু ক্ষেত্রে তাদের ডেকেও আনা হয়। কি ঠিক বললাম তো রমেশবাবু?”

“আপনি আমাকে অ্যাকিউস করাটা বন্ধ করবেন প্লিজ ইফ ইউ ডোন্ট হ্যাভ এনিথিং সিরিয়াস টু সে দেন প্লিজ এক্সকিউজ মি।”

“সরি রমেশবাবু আই কান্ট এক্সকিউজ ইউ। তো সবটা বলা আপনি শুরু করবেন নাকি আমি?”

উনি কোনও উত্তর দিলেন না। তখন ঠাকুরই বলতে শুরু করলেন,

“ঈশ্বর আর গুরুর কৃপায় কিছু কিছু সময় আমি কিছু অশুভ ঘটার আগে বুঝতে পারি, কীভাবে তা বলতে পারব না, চাইলে আপনারা বুজরুকি ভাবতেই পারেন। যাইহোক, যেকোনও অশুভ কিন্তু ধীরে ধীরে আসে এবং গ্রাস করে। ঠিক যেমন তুফানের আগে আকাশে কালো মেঘ জমে। বেশ কিছুদিন আগে থেকেই আমি রুদ্রর মাথার পিছনে একটা কালচে ছায়া দেখতাম, তারপর সেদিন ওর পিসিমা মানে দিদির ঘরের দরজায় সামনে ও কিছু একটা অনুভব করি। একটা খারাপের আভাস পাচ্ছিলাম তবে সেটা যে এই বাড়ির সঙ্গে যুক্ত তা তখন বুঝিনি। আসলে রুদ্রর সঙ্গে গুড্ডির রক্তের সম্পর্ক আর এই বাড়িতে রুদ্রর যাতায়াত এবং সেদিন সৌম্য ও রাজার সঙ্গে রুদ্র ও তাকে দেখেছিল এই কয়েকটি সূত্রেই হয়তো আমি রুদ্রের ওপর ছায়াটা অনুভব করছিলাম। যাইহোক….

যেদিন খারাপ খবরটা পেলাম কিছুটা হিসেব পরিষ্কার হল। এবং সেদিন রুদ্র এ বাড়িতে কিছু ব্যাপার অনুভবও করেছিল। যাইহোক তারপর শ্রাদ্ধের দিনের অন্তিম ভোগ দেওয়ার ঘটনা তো সবাই জানেন। আর সেদিন সৌম্য একা না রুদ্র আর রাজাও সবটা দেখেছিল।

তো যেটা বলছিলাম, কিছু ক্ষেত্রে ওই পর্দাটা সরে যায় তেমনই বিষয় হল মৃত্যু। নতুন একটি আত্মা প্রেতলোকে প্রবেশ করে। সে তখন জীবনের আর পরিবারের মায়া কাটিয়ে ওঠেনি। সে তার পরিবার পরিজন আশপাশেই থাকে। আর তাকে অনুসরণ করে কিছু অতৃপ্ত প্রেত এসে পড়ে আমাদের মাঝে। ওরা স্পর্শ লোভী। ওদের জীবনের প্রতি বড়ো লোভ। ওরা যে-কোনো একটা আধার খোঁজে। তেমনি কিছু একটা রুদ্রকে অনুসরণ করেছিল। কিন্তু কোনও এক শাশানচারী শুদ্ধ আত্মার জন্যও বেঁচে গেছে।

তবে এবাড়ির বিষয়টা অন্য। আমি ঢোকার সময়ই বুঝেছি এখানে একাধিক অশুভ অস্তিত্ব আছে। আর তারা শুধু মাত্র প্রেত নয়…”

পিসিমণি আর সৌম্যর মা সমস্বরে বলে ওঠেন,

“তাহলে?”

“পিশাচ… প্রেত আর পিশাচ সম্পূর্ণ আলাদা। প্রেত এমন কিছুর আত্মা যে- কোনো দিন জীবিত প্রাণী ছিল এই পৃথিবীর বুকে। আর পিশাচ আলাদাই সত্তা। তারা কোনোদিনই এ পৃথিবীর বাসিন্দা নয় তবে মানুষের জগতে ঢোকার আকাঙ্ক্ষা তাদের সর্বদাই। পিশাচ প্রেতের থেকে অনেক বেশি ভয়ংকর। আর এ বাড়িতে পিশাচকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল।”

সৌম্য অবাক হয়ে বলে ওঠে,

“কে করেছিল? আর কেনই বা?”

“তোমার বাবা সোমেশ বাবু আর তোমার কাকা রমেশবাবু… কি রমেশবাবু?… তারাপীঠের গোকুল তান্ত্রিক, কি তাই তো?”

রমেশবাবুর মুখের ভাব বলে দিচ্ছে ঠাকুর যা বলেছেন সব ঠিক।

“হ্যাঁ…হ্যাঁ তবে আমি শুধু দাদার সঙ্গে গেছিলাম মাত্র, পুরো প্ল্যান দাদারই ছিল। আসলে বিজনেসে খুব লস যাচ্ছিল। কিছুতেই কিছু করা যাচ্ছিল না। তা সেই সময় দাদার সঙ্গে কালীঘাটের মন্দিরে গোকুলের আলাপ ওই বলে পিশাচতন্ত্রের মাধ্যমে এসব ঠিক করা খুব সহজ। পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা নিয়ে একটা যজ্ঞ করে ও। তার পর থেকে ম্যাজিকের মতো ব্যবসা লাভ করতে থাকে। প্রথমে সব ভালোই চলছিল কিন্তু কিছুদিন পর থেকে দাদা ভয় পেতে শুরু করেন কেন জানি না। তার পর একদিন হঠাৎ… সব শেষ।”

ঠাকুর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তন্ত্র মানে কি জানেন রমেশবাবু? তনুর মাধ্যমে আত্মার মুক্তির প্রক্রিয়া, মারণ, উচাটন, তুক, প্রেত চালান এগুলো নিম্ন শ্রেণির কাজ। এরা তন্ত্রকে

কলুষিত করে।”

পিসিমণি বললেন,

“তাহলে উপায়?”

“মা আছেন দিদি, ভরসা রাখুন। আর হ্যাঁ এখন এই ঘরে যাই হোক কেউ

ভয় পাবেন না আর এখান থেকে বেরোবেন না।”

হাতের গণ্ডূষে গঙ্গাজল নিয়ে,

ওঁ ক্রীং ক্রীং হৃং হৃং হিং হিং দক্ষিণে কালীকে ক্রীং ক্রীং ক্রীং হৃং হৃং হ্রীং হ্রীং হ্রীং স্বহা।

বলে সবার গায়ে ছিটিয়ে দিলেন। এবার পৈতেটা আঙুলে জড়িয়ে পঞ্চ মুদ্রা করে মন্ত্র পাঠ করতে লাগলেন, ওঁর চোখ বন্ধ আর বাম হাতের তালুতে ওপর মুখ খোলা গঙ্গাজলের ঘটিটা তুলে নিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা স্পষ্ট দেখলাম একটা বিশালাকায় সরীসৃপ যেন ঘরের দেওয়ালে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার নির্দিষ্ট আকৃতি নেই তবে অবয়বটা বোঝা যাচ্ছে। জানলার কাচগুলো যেন ভেঙে পড়তে চাইছে। ঘরের মেঝেটা দুলছে। বিকট পুতিগন্ধে গা গুলিয়ে উঠছে। ঘরের তাপমাত্রা প্রায় হিমাঙ্কের কাছে।

আর ঘরের বিভিন্ন দিক থেকে ছেঁড়া ছেঁড়া কালো ধোঁয়ার টুকরো এসে ওই জলের ঘটের মধ্যে যেন মিশে যাচ্ছে। প্রত্যেকের মুখে আতঙ্কের খেলা।

হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে গুড্ডি পিছু হেঁটে মেন গেটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা মাত্রই ক্ষিপ্র চিতার মতো ঝাঁপ দিয়ে ঠাকুর ওর সামনে গিয়ে উপবীত জড়ানো হাতটা ওর মাথার ওপর চেপে ধরলেন আর গুড্ডি অদ্ভুত ঘৃণা আর রাগ নিয়ে ধকধকে চোখে ঠাকুরের চোখে চোখ রেখে ভারী কণ্ঠে বলে ওঠে,

“আমাকে ছুঁবি না তুই! আমাকে যেতে দে বলছি।”

ঠাকুর তাচ্ছিল্যর হাসি হেসে বললেন,

“হ্যাঁ তুই অবশ্যই যাবি তবে এই বাচ্চা মেয়েটা কোত্থাও যাবে না।” বলেই উনি,

“ওঁ মহাকালং যজেদব্যং দক্ষিণে ধূমবর্ণকম। বিভ্রতং দণ্ড খটাঙ্গো দংস্ট্রাভীমমূখম্ শিশুম্।। ব্যাঘ্রচর্মাবৃতকটীং তৃন্দীলং রক্তবাসসম্। ত্রিনেত্রমূর্ধং কেশঞ্চ মুণ্ডমালা বিভূষিতম্।

মহাকাল মন্ত্র পাঠ করতে শুরু করেন, গুড্ডি পালাতে চাইছিল কিন্তু ঠাকুরের ডান হাতটি ওর মাথায় আশীর্বাদের ভঙ্গিতে দৃঢ়ভাবে চেপে ধরা। প্রথমে ভীষণ চিৎকার ও ছটফট করলেও দেখতে দেখতে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায়।

পড়ে যাওয়া মাত্র পিসিমণি হাহাকার করে ওঠেন,

“সর্বনাশ ও পড়ে গেল! ও যে সন্তানসম্ভবা।”

সৌম্য ও বাকিরা বেশ অবাক হয়, বুঝলাম যে বাড়ির কেউ জানত না। সৌম্যর মা বললেন,

“তাই নাকি দিদি…কই আমরা তো…”

“এই কিছুদিন আগেই মেয়ে আমাকে জানায় দিদি, বললে সামনেই সৌম্যর জন্মদিন সেদিন সবাইকে জানাবে। আমাকেও বলতে যারণ করেছিল। বলেছিল শুভদিনে শুভ খবরটা সবাইকে দেবে ও নিজে।”

কথাটা শোনা মাত্র ঠাকুরের চোখে যেন একটা আলো ঝিলিক দিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে কাকে যেন একটা ফোন করে কী বলল। তারপর পুনরায় মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন। গুড্ডি এখনও অজ্ঞান। সবাই ওর শুশ্রূষা করছে। ওকে ওখানেই মাটিতে শুইয়ে দিতে বললেন। ওঁর ঝোলা থেকে একটা মোটা লাল সুতোর টুকরো বের করে কপালে ছুঁইয়ে গুড্ডির হাতের কব্জিতে আলতো করে ফাঁস দিয়ে বেঁধে দিয়ে অন্য প্রান্তটি নিজের মুঠিতে পাকিয়ে দৃঢ়ভাবে ধরলেন।

এক মনে মন্ত্র জপ করতে থাকলেন। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ বাড়ির আমাদের চারপাশের পরিবেশ যেন আমূল বদলে যেতে। যেন পৃথিবীর অংশই না। প্রলয় লীলার চলছে যেন। জানলা দরজার বাইরেটা মিশমিশে কালো। ঘরের ভিতরের বাতাস এত ভারী যেন শ্বাস নেওয়া দায়। যেন এক অদৃশ্য কৃষ্ণ গহ্বর শুষে নিচ্ছে সবটুকু আলো আর শক্তি আমাদের জীবন থেকে। মাথাটা ঘুরছে। তবু ঠাকুরের নির্দেশমতো আমি হনুমান চালিসা পাঠ করে চলেছি। বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ যেন স্তিমিত হল সব। ঠাকুর চোখ খুললেন আর সঙ্গে সঙ্গে ঘটির মুখটা ঢেকে দিলেন। ওঁর মুখে ক্লান্তি মাখা প্রশান্তি।

একটা ফোন এল। কি সব কথা বললেন। তারপর সবার উদ্যেশ্যে বললেন,

“বিপদ কেটে গেছে। পিশাচ মোচন হোম সমাধা হয়েছে বেনারসে।”

এবার গুড্ডির হাতের মোটা লাল সুতোর বাধন আলগা করে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে গুড্ডির জ্ঞান ফিরে আসে।

গুড্ডি উঠে বসেছে, ওর চোখ মুখের ভাব স্বভাবিক।

পিসিমণি বললেন,

“বেনারসে কী করে? কে গেল?”

“আমি গেছিলাম।”

“মানে ভাই…তুমি…আমাদের জন্য কেন…মানে কীভাবে?”

“সব বলছি আগে একটু জল খেতে চাই…

জল খেয়ে ঠাকুর শুরু করলেন। সবাই উন্মুখ হয়ে বসে আছে শোনার জন্য।

“আমি এ বাড়িতে আসার সময় গৃহ বন্ধন করে দিই। যাতে এই পিশাচটি কোনওভাবেই পালাতে না পারে। এই বাড়িতে এসে বুঝি সোমেশ ও রমেশবাবুর অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আর ওই ঠগ গোকুল গুণিনের মূর্খতার জন্য এ বাড়িতে একাধিক প্রেত পিশাচ ঢুকতে পেরেছে। সোমেশবাবু ব্যবসায় বিঘ্ন কাটাতে চেয়েছিলেন আর গোকুল তার সীমিত বুদ্ধির জোরে এক পিশাচের সঙ্গে চুক্তি করিয়ে দেয়। যে মৃত্যুর পর শেষ কৃত্য হলেও সোমেশবাবুর আত্মা হবে ওই পিশাচের অধীন। আর সেদিন তারই কিছু ঝলক সৌম্য দেখে ফেলেছিল। আমি বুঝতে পেরে রুদ্রকে একটি মন্ত্র পাঠাই ও জপ করতে বলি আর তাই পিশাচটি সে মুহূর্তে কোনো ক্ষতি করতে পারে না।

“তবে ও জীবনের গন্ধ পেয়ে গেছিল। সৌম্যর সঙ্গে ও এ বাড়িতে আসে। কিন্তু এখানে এসে আমি বিতাড়ণ জপ করার পরও যখন ও যেতে চাইছে না তখন ভারি অবাক হচ্ছিলাম যে কার দেহ অবলম্বন করেছে ও কেননা আমি তো সবাইকে অঙ্গ শুদ্ধি করে দিয়েছি এসেই।

“তার পর যখন গুড্ডি অমন আচরণ করল বুঝলাম ওই অবলম্বন কিন্তু তাতেও ওকে মুক্ত করতে পারছিলাম না। সব হিসেব মিলল যখন শুনলাম গুড়ি মা, সন্তানের মা হতে চলেছে। একটা নতুন প্রাণ, যে এখনও আলো দেখেনি তাকেই আসলে অবলম্বন করেছিল পিশাচ। মানুষ রূপে পৃথিবীর আলো দেখার লোভে। এটা জানা মাত্র আমি বেনারসে ফোন করি। ব্যবস্থা সব করাই ছিল। আর যে সময়টা যজ্ঞের মাধ্যমে ওকে এ জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হচ্ছিল ও সর্ব শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করছিল। ও যাতে যাওয়ার সময় গুড্ডির বা ওর সন্তানের আত্মা নিয়ে যেতে না পারে তাই গুড্ডির হাতে মন্ত্রপূত ডোর বেঁধে দিয়েছিলাম আত্মা তন্তু হিসেবে। তবে শেষ জয় সত্যের হয় আলোরই হয়। বেনারসের পিশাচমোচন কুণ্ডে হোম করলে মুক্তি নিশ্চিত। এমনকি সোমেশবাবুর আত্মার ওপর যে কালিমা ছিল তাও কেটে গেছে উনি অক্ষয় স্বৰ্গ লাভ করেছেন। এখন সব শুভ হবে।”

আসার আগে রমেশবাবু ঠাকুরের হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে নেন। ওঁদের আতিথ্য গ্রহণ করতে বলেন। ঠাকুর বললেন,

“এক কাপ চা পেলেই আমি খুশি। রুদ্র জানে আমার মোক্ষ লাভের মূল অন্তরায়টি আসলে কী।”

রমেশবাবু বুঝতে পারেন না বিষয়টা, একটু অবাক হয়ে যান। আমি হেসে বলি,

“বুঝলেন না কাকাবাবু, চা আর বিড়ি এই দুই এর মায়া কাটাতে পারছেন না ঠাকুর, তাই মোক্ষ ও লাভ হচ্ছে না।”

রমেশবাবু হো হো করে হেসে ওঠেন।

***

ঘটনার পর প্রায় দিন পনেরো কেটে গেছে। যথারীতি ঠাকুর কে ঘাটে, মন্দিরে এমন কি ফোনেও পাচ্ছি না। একটা চাপা ভয় ঘিরে ধরে, যদি ঠাকুর আর এখানে না ফেরেন। ভবঘুরে মানুষ, যেভাবে এসেছিলেন হঠাৎ তেমনি যদি হারিয়ে যান!

তবে একটা বিশ্বাস তৈরি হয়েছে আমি যদি অন্তর দিয়ে ডাকি যাকে বলে টেলিপ্যাথি তার জোরে ঠাকুর নিশ্চয়ই আসবেন আমার কাছে। আমার যে অনেক কিছু জানার বাকি রয়ে গেছে।

ভাবতে ভাবতেই সেই চেনা হাঁক,

“কই হে লেখক…বাড়ি আছো?”

আমি মিছে রাগ দেখিয়ে বলি,

“অমন হাঁক পাড়ার কী দরকার ঠাকুর আপনি তো হাত গুনেই বুঝে যান আমি বাড়ি আছি নাকি নেই।”

আমার কথা শুনে মিচকি হাসেন ঠাকুর।

“নাও নাও তোমার তো মন ভরতি প্রশ্ন করে ফেল জলদি।”

“এটাও কী… “

“হা হা হা… না এটা মনোবিজ্ঞান, ওটাও খানিক পড়েছিলাম কিনা। আমি তো জানি কোন্ কোন্ বিষয়গুলো সেদিন ওই বাড়িতে আলোচনা হয়নি সেগুলোই তুমি জানতে চাইবে। খুব স্বাভাবিক।”

“অ…….!”

“সব বিষয়ের মধ্যে অলৌকিক খুঁজলে হবে?”

“বলুন তাহলে… পিশাচ বিষয়টা বুঝলেন কী করে? আর বেনারসের ব্যাপারটাই বা কি?”

“হুম বলব তবে আগে চা খাওয়াও দেখি কড়া করে এক কাপ।”

চা নিয়ে জমিয়ে বসে বললাম,

“বলুন…”

“হুম, পিশাচ বুঝলাম কী করে? কিছুটা গুরুর দেওয়া জ্ঞান আর বাকিটা তোমার ডেস্ক্রিপশন। মানে তুমি বিড়ালের বর্ণনা দিলে রুমাল তো ভাবব না।”

বলেই ফিক করে হাসলেন।

“এবার পিশাচ প্রসঙ্গ, ওরা অমন যখন তখন আসে না, যদি না তন্ত্র ক্রিয়ায় তাকে জাগানো হয়, আগেই বলেছি ওরা আমাদের জগতের বা realm এর নয়। তার মানে ডাকতে হলে সোমেশই ডেকেছেন তাই তার অন্তিমভোগ এর জায়গায় পিশাচ এসেছে মানে সোমেশের সত্তার সঙ্গে সে জড়িত। এবার সোমেশ কোনও সাধু তান্ত্রিকের কাছে গেছে কিনা সেটা ড্রাইভারের সঙ্গে ভাব করলেই জানা যায়। জানলাম।

গোকুল পুরোনো পাপী ও আমায় ভালোই চেনে। কালীঘাট আর তারাপীঠের অনেকেই একসময় চিনত আমায়।

চেপে ধরতে সব বলল। পাড়ি দিলাম বেনারস। কেননা ওখানে পিশাচ মোচনে হোম করলে সমস্ত পিশাচ বা অতৃপ্ত আত্মা অপঘাতে মৃত আত্মা সবার মুক্তি হবেই। সোমেশবাবু যে পিশাচের কাছে বাঁধা পড়েছিলেন অপদার্থ গোকুলের কল্যাণে ওঁর-ও মুক্তি দরকার। তাই আমার গুরুভাইকে বলে সব বুঝিয়ে এলুম। আমার নামে যজ্ঞ সংকল্প করে বলে এসেছিলাম যে, প্রক্রিয়া শুরু করে দিতে নির্দিষ্ট সময়। যেই পিশাচের অবলম্বনকে জানতে পারছি তোমায় ফোনে জানাব তুমি তখন মূল যজ্ঞ শুরু করবে। সম্পন্ন করবে নশ্বর কৃত্য।

“ব্যাস বাকি তুমি সব জানো।”

“আচ্ছা নশ্বর কৃত্য কী?”

“নশ্বর জীবনের জন্য কৃত বা করা শেষ কাজ বা কৃত্য

সব উত্তর পেয়েছ? আচ্ছা আজ উঠি বুঝলে তোমার ছাত্ররা এল বলে।” সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন আমার জীবনে দেখা সব থেকে অদ্ভুত মানুষটি। যাকে আমি রোজ একটু করে চিনছি।

সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ওপরের দিকে তাকিয়ে গলা তুলে বললেন,

“আর হ্যাঁ হে, ওটা ঠিকই ভেবেছ। মন দিয়ে মনে টেলিপ্যাথির জোরে ডাকলে, যেখানেই থাকি ঠিক আসব। জয় ভৈরব।”

কথাটা বলেই একটা অর্থবহ হাসি বেরিয়ে গেলেন সনৎ কুমার ঠাকুর।

আবার ও মনের কথা গুলো বুঝে ফেললেন….!

না আমি আর অবাক হই না। কেননা উনি যে সনৎ ঠাকুর।

আমিও বিড় বিড় করলাম,

“জয় ভৈরব।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *