তুষারমানবের ডায়েরি (১৯৭১)

তুষারমানবের ডায়েরি (১৯৭১)
আলেক্সান্ডার অ্যাব্রামভ ও সের্গেই আব্রামভ। অনুবাদ অরিন্দম দেবনাথ

১৯৪৪ সালের মার্চ মাসের রাশিয়ার একটি আঞ্চলিক খবরের কাগজ ব্যানার অফ ভিক্টরি’ তে খবরটা বেরিয়েছিল।

হিটলারের বাহিনী যে চতুরতার সঙ্গে তাঁর বিমানবহরকে যুদ্ধে ব্যবহার করছে তাতে কোনো ন্দেহ নেই। দু দিন আগে, নবম ব্রিগেডের শিবিরের কাছে একেবারে অপরিচিত চেহারার একটা বিমান উড়ে আসে। বিমানের গড়ন একটু অন্যরকম ছিল, সম্ভবত অত্যাধুনিক কোনো ডিজাইনে তৈরি। বাহিনীর অগ্রিম ও মূল ঘাঁটি থেকে বিমানটিকে চিহ্নিত করবার পর তাকে আক্রমণ করা হয় ও তাতে বিধ্বস্ত বিমানটি ধীরগতিতে গোঁত্তা খেতে খেতে যুদ্ধক্ষেত্রের শত্রু-এলাকায় নেমে পড়ে। গতকাল তুমুল অনুসন্ধান চালিয়ে আমাদের বহর ওই বিমানের কোনো হদিশ পায়নি। হয় ওটাকে কোনোভাবে দূরে কোথাও সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অথবা আমাদের বোমারু হানায় সেটা একেবারেই ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু বন্দি হওয়া ফ্যাসিস্টটার থেকে জানা যায়নি যে বিমানটার কী গতি হয়েছে।

সামরিক বিদ্যালয়ের এক উপদেষ্টা ওই সংবাদপত্রের খবরের প্রেক্ষিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বিমানবহর গ্রন্থে এই বিষয়ে টিকায় লিখেছিলেন, বিশেষ অন্বেষণের পরেও ওই সংবাদের সততা যাচাই করা সম্ভব হয় নাই।

.

ভলোকভ নামে এক প্রাক্তন স্নাতক পর্যায়ের ছাত্রের জবানি

বর্তমানে আমি মস্কো রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়য়ের একজন অধ্যাপক। গণিতশাস্ত্রে পি.এইচ.ডি। অদূর ভবিষ্যতে ‘অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’–এর সদস্যপদ পাবার সম্ভবনা আমার প্রবল। আমার অনেক কাজই বিশেষজ্ঞদের কাছে সমাদৃত। খালি মার্লেই উলটো কথা বলেছিল; আমি নাকি আমার কাজে নতুন কোনো পথের দিশা দেখাতে পারিনি। মার্লে গণিতবিদ হিসেবে পৃথিবীর একদম প্রথম সারিতে।

স্কুলে আইনস্টাইন, গ্যালোয়া, নিকোলাই লোভাচিভাসস্কি প্রমুখ গণিতজ্ঞের সঙ্গে মার্লের অবদানের কথাও পড়ানো হয়। তবে আমি বিশ্বাস করি যে গণিতশাস্ত্রে মার্লের মতো নতুন পথের সন্ধান অন্তত আমার জীবদ্দশায় কেউ আর দেখাতে পারবেন না।

প্রায় সিকি শতাব্দী আগে, নোভোসিবিরস্কে স্নাতক স্তরের পাঠ নেবার সময় ওঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। সেই সময় আমি প্রাথমিক স্মরণশক্তির গাণিতিক মডেল শিরোনামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম। লেখাটা পড়ে আমার অনার্স সাবজেক্টের শিক্ষক অধ্যাপক দাভিদেঙ্কো আমাকে তুলোধোনা করেছিলেন। বলেছিলেন, “একেবারে অপরিণত, ভুলভাল পদ্ধতি। সার্কাসে জোকারের লোক হাসানোর মতো ব্যাপার। তোমার উচিত মার্লের দলে যোগ দেওয়া। ও এইধরনের জগাখিচুড়ি জোকারের কাজ পছন্দ করে।”

মার্লে বিজ্ঞান জগতে যথেষ্ট সম্ভ্রম আদায় করে থাকলেও ওঁকে অপছন্দ করবার লোকের অভাব ছিল না। তার কারণও ছিল অবশ্য। এমন এক-একটা কাজ করে বসতেন ভদ্রলোক মাঝে মাঝে যেটা মোটেই তাঁর সুনামের সঙ্গে খাপ খেত না। কোনো সৌজন্যের ধার ধারতেন না। ভীষণ উদ্ধত আর চাপা স্বভাবের মানুষ ছিলেন এবং চূড়ান্ত অসামাজিক। কখনো নিজের তরফে কোনো ছাত্রকে কাজ করবার জন্য ডাকবেন না; যারা নিজে থেকে আসবে, তাদের মধ্যে থেকে উনি হাতেগোনা কয়েকজনকে বেছে নেবেন, আর বাকিদের সটান ভাগিয়ে দেবেন।

তবে এসব জানা সত্ত্বেও আমি একদিন ওঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে ধরে একরকম জোর করেই আমার গবেষণামূলক প্রবন্ধের কাগজগুলো ওঁর হাতে ধরিয়ে আমার কাজের সম্বন্ধে আমতা আমতা করে বলেছিলাম। উনি কোনো কথা না বলে বারান্দার বিশাল খোলা জানালার কাছে গিয়ে হাতের কাগজগুলো ওলটাতে লাগলেন। কিন্তু কোনোটাই ভালো করে দেখলেন না। তারপর ওতে আমার তৈরি যে অঙ্কের সূত্রটা নিয়ে দাভিদেঙ্কো আমাকে যাচ্ছেতাইভাবে অপদস্থ করেছিলেন, সেইটে নিয়ে খানিক কাঁটাছেঁড়া করলেন। তারপর মনে মনে খানিক বিড়বিড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বললেন, “তাহলে দাভিদেঙ্কো শেষমেশ তোমায় তাড়িয়েই ছাড়ল? অপরিণত! ভুলভাল! বেশ বেশ।” কথাগুলোর মধ্যে একটা তাচ্ছিল্য আর শ্লেষের ভাব লুকোনো থাকছিল না। তারপর একটু থেকে ফের বলেন, “সূত্রটায় ত্রুটি আছে ঠিকই, কিন্তু এতে ভবিষ্যতে এই বিষয় নিয়ে গবেষণার দিশা দেখিয়েছ মানতে হবে। আসলে, বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণায় তোমার পথ তোমাকেই স্থির করতে হবে। এটাই বিজ্ঞান সাধনার মূল কথা। কাজ করতে গেলে ভুল হবে। তাই বলে পিছিয়ে গেলে চলবে না। ওই ভুলগুলোই তোমাকে সঠিক দিশা দেখাবে।”

আমার কাগজপত্রগুলো আমাকে ফেরত দিয়ে আর কোনো কথা না বলে উনি গটগট করে হেঁটে চলে গিয়েছিলেন। খানিক পর ওঁর এক সিনিয়ার ছাত্র এসে আমায় জানিয়ে গেল, মার্লে আমাকে ওঁর কাছে কাজ করতে দিতে রাজি। আমি অবাক হয়ে গেলাম, উনি আমার নাম জানলেন কী করে? খানিক আগে কথাবার্তা বলবার সময় তো আমি নিজের পরিচয় দিতেই ভুলে গিয়েছিলাম। তারপর মনে হয়েছিল, হয় উনি আমার নাম ও কার্যকলাপ আগে থেকে জানতেন, না হলে নিজ উদ্যোগে আমার ঠিকুজি-কুষ্ঠি খুঁজে বের করিয়েছেন।

***

“আমার সঙ্গে কাজ করবার সিদ্ধান্তটা ভালো করে ভেবেচিন্তে নিয়েছ তো?” অনেকটা হুমকি দেবার ভঙ্গিতে কথাটা বলেছিলেন আমাকে মার্লে, “জেনে রেখো, আমার দলে যোগ দেওয়া অনেকটা সন্ন্যাস নেবার সামিল। হুঁ হুঁ, একেবারে মাথা মুড়িয়ে সন্নিসি হবার প্রতিজ্ঞা-টতিজ্ঞা নেবার মতো ব্যাপার।”

কথাটা ভুল বলেননি মার্লে। ওঁর বিভাগটা সত্যিই একটা মঠের মতো। অঙ্কশাস্ত্র এখানে ঈশ্বর, আর মার্লে হলেন তার প্রধান পূজারি। দিনরাত এখানে গণিতের সাধনা চলেছে। এখানে সপ্তাহান্ত বলে কিছু নেই। নেই দ্বিপ্রহরিক বিশ্রাম। এখানে আড্ডা মানে শুধুই বিষয়-সংশ্লিষ্ট তর্কবিতর্ক। লেকচার আর পড়ানোগুলো একেবারেই আর দশটা লেকচার বা পড়ানোর মতো নয়।

মার্লে প্রতিনিয়ত আমাদের ভেতরের জিজ্ঞাস্যগুলোকে আরও উস্কে দিতেন। তবে তার পদ্ধতিটা মোটেই নরম-সরম ছিল না। বাইবেলে সেই যে আছে না, জ্বলন্ত ফার্নেসে লোকগুলো জ্বলছে কিন্তু পুড়ছে না, ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকম হত। কোয়ান্টাম ফিল্ড তত্ত্ব কিংবা তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গের চলনের সূত্রগুলো পড়াতে পড়াতে মার্লে আমাদের একেবারে ধর্মযোদ্ধার তেজ নিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিতেন।

সেন্ট্রিফিউজের তীব্র ঘূর্ণনের মতো শক্তিধালী সেই বৌদ্ধিক চাপ নিতে না পেরে অনেকেই ছিটকে যেত তাঁর বৃত্ত থেকে। কিন্তু আমি ছিটকে যাইনি। উলটে তার কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম আস্তে আস্তে। ওঁর সাহচর্যে দু’বছর ধরে আমি আমার তাত্ত্বিক বিষয়ের গভীর থেকে গভীরে ডুব দিয়েছিলাম –একেবারে ওঁর আকস্মিক মৃত্যুর আগে পর্যন্ত।

অনেকেই গুরুর আদর্শ চেলা’ বলে আড়ালে আমাকে নিয়ে মজা করত। কিন্তু আমি সে-সব আদৌ গায়ে মাখিনি।

অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করত, “তুই এত এনার্জি কোথা থেকে পাস বল তো?”

“মার্লের এত শক্তির রহস্যটা কী? জানিস?”

“উদ্ভট জীব মাইরি! খায় তো কতকগুলো ঘাসপাতা। গরুমোষের জাবনা। আমি নিজে চোখে ক্যান্টিনে বসে ওইসব ঘাসপাতা চিবোতে দেখেছি। মাছ, মাংস দূরস্থান, কোনোদিন এক চামচে ক্যাভিয়ার পর্যন্ত খেতে দেখিনি। যদি এর এহেন এনার্জির উৎস জানতে কোনো কমিটি গড়া হয়, তারা কী খুঁজে পাবে জানিস? ও ব্যাটা নানান জাতের পাতা-লতা দিয়ে তৈরি কবিরাজি তেজবর্ধক গুলি খায় রোজ। অনেকেই বলে ওঁর বাড়িতে নাকি একশো বছর চলার মতো ওই গুলি রাখা আছে।”

আমি এসব কথার কোনো জবাব দিইনি। উলটে বলেছি, “খবর তো অনেক কিছুই রাখিস, কিন্তু কবিরাজি গুলি কোনো মানুষকে এতটা এনার্জি দিতে পারে বলে তো আমার মনে হয় না।”

“আরে না না, তুই কিছু জানিস না, ওঁর কাছে বিশেষ জড়িবুটি আছে যেগুলো হিমালয়ের চূড়ায় পাওয়া যায়।”

“হিমালয়ের?”

“হুঁ হুঁ বাবা! ইয়েতির বাসা কোথায়? মাউন্ট এভারেস্টে! হ্যাঁ। মার্লে নাকি ওই এলাকার মানুষ। খুব ছোটবেলায় একদল ভূতাত্ত্বিক নাকি ওঁকে ওখান থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। মানুষের আকারের হলে হবে কী, দেখিস না, কেমন খালি পায়ে বরফের ওপর হেঁটে বেড়ান? ওর পায়ের ছাপগুলো দেখেছিস? ঠিক ওই ইয়েতির মতো ধ্যাবড়া। পায়ের পাতার মাপ পায়ের অর্ধেকের বেশি। যদি উনি স্নো-বুট পরতেন তাহলে ছেচল্লিশ সাইজের জুতো বানাতে হত।”

আমি জানি মার্লে ন’ নম্বর জুতো পরেন। ঠিক আমার মাপের। এটা ঠিক ওঁর পায়ের পাতাগুলো একটু বড়ো। সেটার কারণও আমি জানি। সাঁতার। আমরা একসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরে নিয়মিত সাঁতার কাটতাম।

তবে উনি যেখানেই যান, ওই ‘তুষারমানব’ নামটাও ওঁর পেছন পেছন তাড়া করে বেড়ায়। যদিও এই নামের প্রাসঙ্গিকতা অস্বীকার করার উপায় নেই। হিমাঙ্কের ৩০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড তলায় একটা পাতলা বর্ষাতি পরে, কোনো টুপি ছাড়া তুষারপাতের মধ্যে কেউ যদি খালি পায়ে ঘুরে বেড়ায়, তাকে তুষারমানব নামের হাত থেকে কে বাঁচাবে?

নোভোসিবিরস্কে কাছের শহর আকাডেমগোরোদক। পুরোদস্তুর বিজ্ঞানীদের শহর। সেখানকার পুরোনো বাসিন্দারা শহরের নতুন অতিথিদের মার্লের সম্পর্কে বলতেন, “ও যদি সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়েও বরফের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়, ওর কিচ্ছু হবে না। গায়ের চামড়া কী দিয়ে তৈরি কে জানে। ঠান্ডা ওর গায়েই ঠেকে না। মনে হয় এটা ওর কোনো জন্মগত গন্ডগোল। ওর গায়ের চামড়ায় বয়সের কোনো ছাপ পাবে না। ওর বয়স দেভিদেঙ্কোর সমান। দু’ জনেই প্রায় কুড়ি বছর আগে একসঙ্গে ইশকুল কলেজের পাট চুকিয়েছে। অথচ দেভিদেঙ্কোকে দ্যাখো! বিশাল ভূঁড়ি, মাথায় টাক। আর মার্লে? একেবারে তরতাজা। ঠিক যেন গোল কিপার লেভ ইয়াসিন। এখানে আসার পর থেকে ওর শরীরে কেউ কোনো বদল দেখেনি। একটা চুলও পাকেনি। চামড়ার কোথাও একটা ভাঁজ দেখতে পাবে না…”।

এটা ঠিক, ওঁর স্থির যৌবনকে অনেকেই বাঁকা চোখে দেখত।

“তোমার চিরযৌবনের রহস্যটা কী আমাদের বলবে, নাকি নিজের আত্মাটা ফস্তের কাছে বাঁধা রেখেছ?” মাঝে মাঝেই অনেকে মজা করে এই প্রশ্নটা ওঁকে ছুঁড়ে দিত। কিন্তু মজা ব্যাপারটা হয় উনি বুঝতেন না, অথবা উপভোগ করতে চাইতেন না। ঠান্ডা চাউনি ওঁর উত্তর হত।

যখন আমার সঙ্গে ওঁর আলাপ হয়, তখন কেউ সেরকম আর বোকা বোকা প্রশ্ন করে ওঁকে বিব্রত করত না। ব্যক্তিত্ব আর প্রজ্ঞার গুণে নিজেকে ততদিনে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন অন্য মাত্রায়। ছিপছিপে চেহারায়, পাকা গমের মতো রঙে উনি যেন প্রাচীন রোমান ঈশ্বর। মার্লের চেহারায় রাশিয়ানদের থেকে স্ক্যান্ডিনিভিয়ানদের সাদৃশ্য বেশি। ওঁর পদবি বিদেশি হলেও নামটা কিন্তু রাশিয়ান, নিকোলাই ইলিচ।

একদিন আমাদের পার্সোনেল বিভাগের এক কর্মী ওঁর এই মিশেল নাম রহস্যের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

“বুঝলে, ওঁর নামটা পুরোটাই জালিয়াতি করে বানানো। মার্লে আর নিকোলাই ইলিচ, দুটোই! ওঁকে পাওয়া গিয়েছিল ৪৩-৪৪ এর যুদ্ধক্ষেত্রে। সারা গায়ে কালশিটের দাগ ভর্তি। একবিন্দু রাশিয়ান বা জার্মান বলতে পারত না। অঙ্গভঙ্গি করে তুতলিয়ে তুতলিয়ে নিজেকে দেখিয়ে বলত, ‘নিক… মার্লে… নিক… মার্লে।’

“প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন যে উনি বোধ হয় ফ্রান্সের নরমান্ডি-নেমান বিমানপপাতের বৈমানিক। কিন্তু ওঁকে যেখানে পাওয়া গিয়েছিল সেখানের আকাশে ওই বিমানবহর কোনোদিন ওড়েইনি। তাই ওঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার সময় ওঁর নাম লেখা হয়েছিল নিকোলাই মার্লে বলে। আর বাবার নামের জায়গায় যেই সার্জেন্ট ওঁকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অজ্ঞান অবস্থায় তুলে নিয়ে এসে বাঁচিয়েছিলেন সেই ইলিচের নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।”

“ওঁর আত্মীয়দের কোনো খোঁজ করা হয়নি?” আমি জানতে চেয়েছিলাম।

“ভুলে যেও না তখন যুদ্ধ চলছিল।”

“যুদ্ধশেষে?”

“খোঁজ করা হয়েছিল। হাজারের বেশি ছবি বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।”

“কিন্তু ওঁর স্মৃতি তো অবিশ্বাস্য!”

“সেটা অনেকটাই নির্ভর করে কী বিষয়ে জানতে চাইছ। ওঁর অতীত, পরিবার বা বাসস্থানের কথা কিছুই বলতে পারেননি। এমনকি ভাষাটাও ওঁকে আবার শিখতে হয়েছিল। শোনা কথা, মাত্র সপ্তাহ খানেকের মধ্যে রাশিয়ান ভাষার অনেকটাই আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। মাত্র একবছর লেগেছিল হাই স্কুল আর কলেজের পাঠক্রম আয়ত্ত করতে। তারপর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে সোজা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য নাম লেখান।”

“হাসপাতালে উনি কী ধরনের চিকিৎসা পেয়েছিলেন?”

“ওঁকে সর্বক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। ওইরকম অদ্ভুত মেধাসম্পন্ন লোকের অতীতকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়াটা ডাক্তারদের কাছে ছিল বিস্ময়ের। মাত্র দু-বছরে অক্ষরজ্ঞান লাভ থেকে শুরু করে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন অবিশ্বাস্য। কিন্তু উনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, অসম্ভবটাকে সম্ভব করা যায়। মাথায় একটা কালশিটের দাগ ছিল ওঁর। সেই চোটটাই ওঁর মস্তিষ্কের ক্রিয়াকে আমূল বদলে দিয়েছে বলে চিকিৎসকদের ধারণা। চাইলে মার্লেকে জিজ্ঞেস করতে পারো।”

একদিন আমি সরাসরি এই ব্যাপারে মার্লেকে প্রশ্ন করেছিলাম।

“আপনার এই অসাধারণ স্মরণ ক্ষমতা কি সেই ছোটবেলা থেকে?”

মার্লে ঝটিতি জবাব দিয়েছিলেন, “ছোটবেলা? আমার ছোটবেলা শুরু হয়েছিল একটা সামরিক হাসপাতালে যখন আমার বয়স বছর সাতাশ কি তিরিশ।”

“কিন্তু মাথায় একটা কালশিটে কী করে মস্তিষ্কের স্মৃতির কোষগুলোর ক্ষমতাকে ওই পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হল?”

উনি একটা বাঁকা হাসি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “দেশবিদেশের ডাক্তার-কবিরাজরা এই নিয়ে অনেক ভেবেছেন, কিন্তু কোনো হদিশ করে উঠতে পারেননি। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আণবিক স্তরে স্নায়ুকোষের কাজকর্ম বুঝে ওঠবার মতো যন্ত্রপাতি এখনো তৈরি হয়নি। তার থেকেও বড়ো কথা, যে বিস্ফোরণটার ধাক্কা এই নিকোলাই মার্লের জন্ম দিয়েছিল, তার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের কিংবা সে প্রয়োগের ফলাফল মাপবার কোনো রেকর্ড নেই।”

সম্ভবত সেই প্রথম, শুধু আমার কাছেই মনটাকে খানিক খুলে ধরেছিলেন মার্লে। হয়তো আমার একাকিত্ব, তাঁর স্বভাবগত একাকিত্বকে কোথাও একটা স্পর্শ করেছিল।

কারণ, আমি তখন আকাঁদেমগোরোডোকে প্রথম বর্ষের ছাত্র। একটাও বন্ধু জোটাতে পারিনি তখনও। আমি ছোটবেলা থেকেই লাজুক প্রকৃতির। আর মেয়েদের থেকে শত হস্ত দূরে থাকতাম।

মার্লে একদিন আচমকা আমাকে জিজ্ঞাসাও করেছিলেন, “ভলোকভ, তুমি কারো প্রেমে পড়োনি? সবসময় তোমাকে একা দেখি?”

“স্যার, আপনিও তো…”

“আরে আমার কথা ছাড়ো, আমি একটা বুড়ো মানুষ।”

“স্যার, আপনি এতো লজ্জা পাচ্ছেন কেন? আপনি ভালো করেই জানেন ইনা যতই উদাসীন হাবভাব করুক, আপনার প্রতি একটা আলাদা টান ওর আছে।”

“সে তো গ্রুপের বাকিও সবারই আছে। যে-কারো ভেতরে যে-কোনো ইমোশন জাগিয়ে তোলা আমার বাঁহাতের খেল হে! শুধু ওই উদাসীনতা ছাড়া।”

“আমি ঠিক সে অর্থে বলতে চাইনি প্রফেসর…”

“কিন্তু আমি ঠিক ওই কথাটাই বলেছি। আমাদের আয়ু খুব অল্প, যদি ঘরোয়া আনন্দেই মেতে থেকে জীবনের মেয়াদ শেষ করে দিতে চাও তাহলে আলাদা কথা। আর যদি বিজ্ঞান তোমার প্রেমিকা হয়, তবে তার প্রতিই অনুরক্ত থাকো। অন্য কিছুর জন্য তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা কোরো না ভলোকভ।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা করিডোরে শুরু হয়ে এই অপ্রত্যাশিত আলোচনাটা চলেছিল প্রফেসরের বাড়ি পর্যন্ত। বাড়ির সামনে গিয়ে আমি ফের দাভিদেঙ্কোর গাল খাওয়া আমার সেই অঙ্কগুলো তাঁর হাতে গুঁজে দিতে তিনি হঠাৎ বললেন, “ভেতরে এস ভলোকভ। কিন্তু খবরদার, গায়ের কোটটা খুলো না। আমি সকালবেলা জানালাগুলো খুলে রেখে গিয়েছিলাম। এই ঘরটা তোমার পক্ষে একটু বেশি ঠান্ডা।”

আমি শীতে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে বলেছিলাম, “আপনি এখানে বসে কাজ করেন কী করে? বাইরে খোলা আকাশের নীচেও বোধ হয় এর চাইতে গরম।”

“সত্যি বলছি, হাওয়া না চললে আমি বাইরে বসে বরফের মধ্যে কাজ করতেই পারি। আসলে তো আমি একটা দানব তুষারমানব!” ঠোঁটের কোণে একচিলতে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে মার্লে বলেছিলেন।

টের পাচ্ছিলাম, ঠোঁটের কোণের ওই হাসিটা ছিল লুকোনো কষ্টের। আগে কখনো আমি ওঁকে হাসতে দেখিনি।

আমি সত্যিই খানিক অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম।

“আমি কিন্তু মজা করছি না প্রফেসর মার্লে। আমরা ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি, আর আপনাকে দেখে মনেই হচ্ছে না যে আপনার ঠান্ডা লাগছে।”

“এটা হল সেই বিস্ফোরণের ধাক্কার প্রভাব। আমার ত্বকের চরিত্রটাই বদলে গেছে। তা, তোমার কাগজপত্র কী বলছে?”

আমি আমার গাণিতিক সূত্রগুলো এগিয়ে ধরলাম। উনি এক ঝলক দেখে কী যেন ভেবে একপাশে রেখে দিলেন। স্পষ্ট ইঙ্গিত পরে দেখব’। কিন্তু কেন জানি না, আমি চলে আসতে চাইছিলাম না।

“প্রফেসর, আপনি যখন বিজ্ঞানের প্রতি অনুগত থাকার কথা বলছিলেন, তখন কি আসলে বিজ্ঞানীর কর্তব্যের ব্যাপারে…”

“হ্যাঁ। সেটা আমার বক্তব্যের একটা অংশ। যা করছি তার প্রতি সৎ থাকা। একেবারে গোঁড়া ধর্মান্ধের মতো সৎ। যার সেবা করছি তার জন্য ওই গোঁড়া ধর্মান্ধের মতোই প্রয়োজনে আত্মবলি দেয়া।”

‘বড়ো বেশি আদর্শবাদ! আমি মনে মনে বললাম।

“ভীষণ আদর্শবাদী, না?” প্রফেসর বললেন।

আমি চমকে উঠলাম। আমি তো মুখে কিছু বলিনি, শুধু মনে মনে ভেবেছিলাম। তাহলে?

“আমি সবসময় আঁচ করতে পারি আমার প্রতিপক্ষ আমার সম্পর্কে কী ভাবছে।”

আমার অনুচ্চারিত প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে গেলাম।

“তাহলে, তুমি ভাবছ আমি গোঁড়া আদর্শবাদী। তাই না? তোমরা নব্য যুবকরা একটা একেবারে আলাদা মনস্তত্ত্বের জীব, বুঝলে? তোমাদের চিন্তাভাবনাগুলো উদ্দাম, বেপরোয়া, সিনিক। তবে, বাঁচোয়া এই যে তুমি এদের মতো লম্বা-চুলো হিপি হয়ে কোনো বন্ধুর গিটারের সুরে দুর্বোধ্য গানও গাও না। তাহলে? নিজেকে ওদের ছাঁচে নাই বা ফেললে। যা সত্য, অলঙ্ঘনীয়, তা সবসময়ই অলঙ্ঘ্য। তুমি তাকে যেই নামেই ডাকো না কেন!”

আমার গবেষণা তখন জ্বণাবস্থায়। কাজটা শুরু করেছি সবে। এবারে এগিয়ে নিয়ে যাবার পালা। সেটা ছিল একটা রবিবার। এমনিতে রোববার রোববার স্কি করতে বেরোই। কিন্তু সেদিন তার বদলে একটা সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। ফেরার সময় দূর থেকে দেখি আমাদের ডিপার্টমেন্টের এক সহপাঠী ক্লিমুখেন মাতালের মতো টলতে টলতে আসছে। ও কাছে আসতেই চমকে উঠলাম। বরফভর্তি দস্তানা দিয়ে ও সমানে চোখের জল মুছছিল।

“তোমার যত নোটবই আছে এবার সব ছুঁড়ে ফেলে দাও।” দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে কাঁদতে কাঁদতে ও বলল, “সব পুড়িয়ে ফেললো। মার্লে মারা গেছেন।”

ওর কাছেই শুনলাম, সকালে স্কিইং করার সময় বাস স্ট্যান্ডের দশ-পনেরো মিটার দূরে মুখ থুবড়ে পড়েন প্রফেসর। মৃত্যুস্থলে ওঁর স্কি করার লাঠিদুটো বরফে গেঁথে ছিল। মার্লে কোনোদিন স্কি করার সময় জ্যাকেট-ট্যাকেট কিছু পরতেন না। এমনকি ওঁর লাল রঙের নাইলনের জামার কলারের বোতামটা পর্যন্ত খোলা ছিল। কিন্তু বরফে ঢাকা মুখটায় লেগে ছিল সুস্থ সবল পুরুষালি হাসি। ডাক্তাররা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে পৌঁছেও কিছু করতে পারেননি। এমনকি ওঁর যে কী হয়েছিল তাও বলতে পারেননি।

মার্লে মারা গেলেন কী করে? তবে কি ওঁর হার্ট… সেটাই কি বিগড়েছিল! কিছুদিন আগে উনি এরকম একটা আভাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু অসুস্থ বলতে যা বোঝায় তা তো উনি কখনোই ছিলেন না! এমনকি সাধারণ জ্বর-সর্দিতেও কেউ ওঁকে ভুগতে দেখেনি। এই শহরের সব বিজ্ঞানীদের মতো ওঁকেও নির্ধারিত সময়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হত। কিন্তু কখনও ওঁর হৃৎস্পন্দনের চিহ্নে অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়েনি। ওঁর রক্তচাপ ও নাড়ির গতি সবসময় স্বাভাবিক থেকেছে। তাই পোস্টমর্টেম রিপোর্টে সেনাইল আর্টেরিওস্লেরোসিস ও মস্তিষ্কে অকস্মাৎ রক্ত জমায় মৃত্যু– স্ট্রোক এইসব দেখে আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম।

কোনো সন্দেহ নেই মৃত্যুর সময় প্রফেসার হয়তো তেমন কোনো ব্যথা-বেদনা ভোগ করেননি। ভোগান্তিহীন শান্তির মৃত্যু হয়েছিল ওঁর। কিন্তু সত্যিই কি ওঁর মৃত্যুটা সাধারণ ছিল? ময়নাতদন্তের রিপোর্ট গোপন রাখা হয়েছিল। মার্লের ব্রেন ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছিল নিউরোলজিক্যাল রিসার্চের জন্য। কিন্তু আদপেই ওটা নিয়ে কোনো নাড়াচাড়া হয়েছিল কি না, বা হলেও কে করেছিল বা তার রিপোর্টই বা কী, জানতে পারিনি। কে জানে কেন পুরো ব্যাপারটাই চেপে রাখা হয়েছিল।

বছরকয়েক আগে প্রফেসর মার্লের পোস্টমর্টেম টিমে থাকা এক ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন যে মার্লের শরীরে অনেক অস্বাভাবিকতা ছিল। বাইরে থেকে ওঁকে দেখতে একদম যুবকদের মতো দেখতে হলেও ওঁর ভেতরটা ঝরঝরে হয়ে গিয়েছিল। ওঁর হার্ট ভালো থাকলেও ভেইনগুলো ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। মেটাবলিজম ঠিক থাকলেও শরীরের অধিকাংশ গ্ল্যান্ড কাজ করছিল না। এছাড়া আরও একটা ডাক্তারি টার্ম উনি বলেছিলেন, যা বুঝতে পারিনি। কিন্তু এখন আমি মার্লের আসল রহস্য জানি।

মালেকে কবর দেবার সময় বহুকষ্টে চোখের জল চেপে রেখেছিলাম। সে সময় ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি আগামী দিনে কী ঘটতে চলেছে। আমার মনের ভেতর শুধু মার্লের কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল। চোখের সামনে ভাসছিল ওঁর মুখ। ওঁকে কোনোদিন দুঃখ করতে দেখিনি। দুঃখ করবেনই বা কীসের জন্য? ওঁর মনপ্রাণ জুড়ে বিজ্ঞান সাধনা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ওঁর শরীরের প্রতিটি কোষে জড়িয়ে ছিল বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান। ওঁর কাছে ভালোবাসার একটাই সংজ্ঞা ছিল আর সেটা হল একজনের প্রতি অনুগত থাকা, আর সেই একজনও ছিল বিজ্ঞান।

ওঁর লেখা ১৬৮টি প্রবন্ধ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ওঁর প্রতিটি তত্ত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু ওঁর অন্ত্যেষ্টির সময়ও জানতাম না যে জীবনের শেষ নিবন্ধটিতে যা বলেছেন, তার একক শক্তি ওই ১৬৮টি প্রকাশিত নিবন্ধ মিলে সৃষ্টি করতে পারেনি। আর এই প্রবন্ধটির খোঁজ মানব সমাজ পায় আমারই হাত ধরে। আর আমি প্রবন্ধটি পেয়েছিলাম স্বয়ং স্বর্গীয় প্রফেসর মার্লের কাছ থেকে! হ্যাঁ, ঠিকই বলছি, স্বর্গীয় প্রফেসরের কাছ থেকে, আর সেটি এসেছিল সাধারণ ডাকযোগে।

ঘটনাটা একটু খোলসা করে বলি। মার্লের শেষকৃত্যের ঠিক দু-দিন পর, ডাকযোগে একটা মোটা প্যাকেট আসে আমার কাছে। প্যাকেট খুলতেই দেখি বেশ কয়েকটা মোটাসোটা নোটবই। উলটেপালটে দেখি নোটবইগুলোর চারটেতে ক্ষুদে গোটা গোটা অক্ষরে টানা লেখা। এই চারটেকে নোটবই না বলে ডায়েরি বলাই ভালো। আর একটা খাতা ভর্তি গাণিতিক সূত্রে। হাতে নিয়েই বুঝেছিলাম যে খাতাগুলো একদম নতুন। হ্যাঁ, আই কনফার্ম, প্যাকেটটা আমাকে পাঠিয়েছিলেন স্বয়ং মার্লে!

প্যাকেটের ওপর সেন্ডারের জায়গায় মার্লের নামে দেখে নোটবইগুলো হাতে নিয়ে আমার মনে একটাই চিন্তা এসেছিল। তবে কি মার্লে তাঁর মৃত্যুর দিনক্ষণ জানতেন? উনি কি আমাকেই ওঁর উত্তরসূরি ঠাউরে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর অপ্রকাশিত কাজগুলো? আমি প্রথমেই ডায়েরিগুলো সরিয়ে রেখে তুলে নিয়েছিলাম গাণিতিক সূত্র লেখা খাতাটা।

প্রফেসর মার্লের প্রকাশিত গবেষণার বিষয় নিয়ে কিছু বলতে চাই না। এই লাইনে সারা বিশ্বে খুব কম মানুষই আছেন যাঁরা ওঁর কাজের বিষয়ে জানেন না। বিগত পঁচিশ বছর ধরে তাঁর অবদানের কথা ভোলার নয়।

আমাকে পাঠানো নোটবইগুলোতে উনি শুধু অঙ্কই নয়, এর জ্ঞাতিগুষ্টির দল, যেমন জ্যোর্তিবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা ও সাইব্যানেটিক্স নিয়ে পৃথিবীকে আসামান্য সব সূত্র উপহার দিয়ে গেছেন।

যদিও সাইব্যানেটিক্স বিষয়টি নতুন। এটি হল যন্ত্রকে প্রাণীর মনের কথা বোঝানোর উপায় বের করার গবেষণার একটা ধারা। ইউনিভার্স তথা স্পেস আর সাব-স্পেসের ঘূর্ণন ও তার ধাপ নিয়ে তিনি যা লিখে গেছেন তা শুধু এই শতাব্দীতেই নয়, আগামী শতাব্দীর কাছেও নতুন দিশা হবে।

কখন, কীভাবে যে তিনি এই এক্সপেরিমেন্টগুলো করেছিলেন আর কেনই যে তিনি নিজে বেঁচে থাকতে এইসব কথা প্রকাশ করেননি, সব বলে গেছেন এই নোটবইগুলোতে। আর এমনভাবে লিখেছেন যে পড়তে পড়তে মনে হয় যেন উনি মুখোমুখি বসে বলছেন একের পর এক ঘটনা। একদিনে উনি লিখে শেষ করেছেন চার চারটে মোটা ডায়েরি। আর তার আগের রাতটা পুরোটাই কাটিয়েছেন অঙ্ক নিয়ে।

‘ভলোকভ, আমি তোমাকে আমার কিছু লেখা পাঠালাম। আমি নিশ্চিন্ত জানি তুমি যখন এগুলো পাবে, তখন আমি আর বেঁচে থাকব না। খুঁটিয়ে পড়বে, তারপর এইগুলো নিয়ে যা ভালো মনে হয় তাই কোরো। জেনে রাখো, এগুলো হল বিশ্বজোড়া সমস্ত দাভিদেঙ্কোদের উল্টোপাল্টা কথার উত্তর। শুধু তাই নয়, এগুলোই আমার একমাত্র প্রেমিকা, বিজ্ঞানের প্রতি আমার ভালোবাসার উপহার। ডায়েরির পাতায় পাতায় সব খুলে লিখেছি। আমার নিরামিষ ভোজনের কারণও বলেছি ডায়েরিতে।’

আজ পর্যন্ত কেউ জানে না এই ডায়েরিগুলোর কথা। সব আমার ড্রয়ারের এক গোপন খুপরিতে লুকোনো আছে। নোটবুকগুলোর প্রতিটি পাতার হাতের লেখা এমন সুন্দর, যেন। টাইপ রাইটারে লেখা। পুরো বিষয়টা এখনো গোপনই রেখেছি। জানাব, নিশ্চয়ই জানাব। তবে তার আগে এগুলো আরও একবার পড়া দরকার। কিছু বিষয় আছে যা যতক্ষণ না প্রকাশের অবস্থায় আসে ততক্ষণ গোপন থাকাই ভালো।

.

প্রফেসর মার্লের নোটবই

নোটবই-১

১.

‘যেকোনো লোককে নিজের জন্মভূমি সম্পর্কে বলতে বললে সে কী বলবে? হয়তো সে আরম্ভ করবে মনের কোনায় ভেসে ওঠা একটি ছবি দিয়ে! আচ্ছা, ব্যাপারটাকে একটু অন্যভাবে বলি। জীবনের শুরু কীভাবে হয়? প্রথমে যা দেখলাম তাই দিয়ে? যেমনি ধরা যাক, দোলনার ওপর ঝুঁকে থাকা একটা মানুষের মুখচ্ছবি দিয়ে? নাকি যা বোঝা যায় না এমন অবরুদ্ধ কান্না দিয়ে! আমার ক্ষেত্রে জীবনের শুরুটা হয়েছিল দু’বার। প্রথমটা আমার শিশুকালে। যার কিছুই আমার মনে নেই। কেউই তাঁর একদম জন্মের ঠিক পরমুহূর্তের কথা মনে করতে পারে না। কারণ সেই সময়কার স্মৃতি একদম শূন্য থাকে। বিলকুল জিরো। কিন্তু আমি আমার দ্বিতীয় জন্মের পরমুহূর্তের কথা একদম নিখুঁতভাবে বলতে পারি। সব মনে আছে আমার। যদিও আমার দ্বিতীয় জন্মের সময় স্মৃতির ভাণ্ডার মোটেই খালি ছিল না। আমার মস্তিষ্ক কোষ যে-কোনো প্রাণীর মতোই কাজ করছিল সে সময়। যেমন, কী করে খাবার খুঁজে বের করতে হয় বা কী করে বিপদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হয়… আমার ব্রেন শব্দ ও দৃশ্যকে ঠিক ঠিক বিশ্লেষণ করতে পারছিল। ঠিক বুঝতে পারছিল কোনটা করা উচিত আর কোনটা নয়।

যখন চপ্পলের আওয়াজটা ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসত, আমি বুঝতে পারতাম সাদা পোশাক পরা মহিলাটি আমার গা থেকে সরে যাওয়া কম্বলটা চাপিয়ে দিতে আসছেন। আমার পাশের টেবিলে বাসনপত্রের ঠনঠনানি শুনলেই বুঝতাম আমার জন্য কেউ খাবার আর চা নিয়ে এসেছে। যদিও তখন বুঝতাম না চা বা প্লেট কী। এই শব্দ বা জিনিস দেখিয়েই আমার দ্বিতীয় জন্মের প্রথমদিকে বাক্যালাপ চলত।

আমার দ্বিতীয় জীবনের প্রথম স্মৃতি হল একটি সাদা ঘর। যার কাঁচের জানালার বাইরে যতদূর দেখা যায় খালি ধপধপে তুষার, আর সেই ঘরের মাঝে দুটো বিছানা। তার একটায় মাথায় বিশাল পট্টি বেঁধে দিনভর শুয়ে ককিয়ে চলা একটা লোক। আর অন্যটায় স্নানের পোশাক পরে একটু পরপর ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে থাকা পেল্লায় লাল মোচের কুতকুতে চোখের একটা লোক।

এই দ্বিতীয় লোকটাকে আমি খুব পছন্দ করতাম। খুব খুশি হতাম লোকটা আমার কাছে এলে। আমি এখন লোকটার সবকিছু খুঁটিয়ে বলতে পারি। কিন্তু সে-সময় আমি জানতাম না মানুষ কী। জানতাম না গোঁফ, ঘর, বিছানা, পছন্দ কাকে বলে। আমি এসব শব্দই জানতাম না। কিন্তু শব্দ বা উচ্চারণের পার্থক্যগুলো ধরতে পারতাম। হাত-পা বা মুখের ভঙ্গি দেখে বেশ বুঝতে পারতাম সে কী বলতে চাইছে।

একদিন আমার খুব তেষ্টা পেয়েছিল। আমি একটা খালি গ্লাস বার বার ঠোঁটের সামনে তুলে ধরে সাদা পোশাক পরা মহিলাটির দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিলাম। আমি জানতাম সাদা পোশাক ও মাথায় রুমাল বাঁধা মহিলাটি জল বা চা দিয়ে যান।

ঠোঁটের কাছে আমার খালি গ্লাস বার বার তুলতে দেখে নার্সটি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তেষ্টা পেয়েছে?”

“তেষ্টা পেয়েছে।” আমি নার্সের কথাটাই নকল করে বলেছিলাম।

খানিক পর নার্সটি চা নিয়ে এলে আমি গ্লাসটি ছুঁয়েই হাত সরিয়ে নিয়েছিলাম।

“গরম?” গোঁফওয়ালা লোকটা আমার রকম-সকম দেখে বলে উঠেছিলেন।

“গরম।” আমি লোকটির কথা হুবহু নকল করেছিলাম।

“আনা, এক গ্লাস জল নিয়ে এসো তো।” গুফো লোকটি নার্সটিকে বলেছিলেন।

নার্সটি জলভর্তি একটি গ্লাস আমার সামনে ধরেছিলেন। গ্লাসটা ঠান্ডা ছিল। আমি ঢকঢক করে গ্লাসভর্তি জল খেয়ে ফেলেছিলাম।

“জল।” লোকটা বলেছিলেন।

“জল।” লোকটার কথা আমি হুবহু নকল করেছিলাম।

“বুঝলে আনা, এ ছোকরাকে শেখাতে আমাদের খুব একটা বেগ পেতে হবে না।”

যদিও লোকটার কথাগুলো আমি আর বলে উঠতে পারিনি। কারণ অনেকগুলো শব্দ ছিল ওতে।

“অত নিশ্চিন্ত হয়ো না।” কটকট করে ফোকে কথা শুনিয়েছিলেন নার্সটি। যদিও কথা বলার ভঙ্গির জন্য ওই শব্দগুলোর অর্থ আমি বুঝতে পারিনি।

“একমিনিট দাঁড়াও।” লোকটি নার্সটিকে বলেছিলেন।

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে নার্সের দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, “আনা।”

তারপর নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন, “ভাসিলি লিনোভিচ। বুঝতে পারছ? ভা-সি-লি লি-নো-ভি-চ…”।

আমি সঙ্গে সঙ্গে তোতাপাখির মতো বলেছিলাম, “ভাসিলি লিনোভিচ।” তারপর নার্সের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, “আনা।”

আনা হো হো করে হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাসিলি হাসেননি। উনি আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন, “নিকোলাই, কোলয়া।”

তারপর ভাসিলি আমাকে ঘরের প্রতিটি জিনিসের নাম শেখাতে লাগলেন। জানালা, গ্লাস, কাপ, বিছানা… উনি প্রতিটি জিনিস দেখিয়ে দেখিয়ে ধৈর্য ধরে ধরে সেগুলোর নাম বলতে লাগলেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি সঠিকভাবে সেই জিনিসের নাম বলতে পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত আমাকে পড়িয়েই চললেন।

একটু পরে উনি জানালার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, “এটা কী?”

আমিও সঙ্গে সঙ্গে তোতা পাখির মতো আওড়ে গেলাম, “এটা কী?”

“মাথা মোটা!” উনি রাগে চেঁচিয়ে উঠলেন।

“তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছিলাম, বুঝলে? আমি তোমার কাছে জানতে চেয়েছিলাম ‘এটা কী?’ তোমাকে বলতে হত ‘জানালা।’

আমি খানিক বাদে সব প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিতে শুরু করলাম। আমি চটজলদি বুঝতে পারছিলাম কোনটা কী। জানালা, কাপ, চা। তখনও আমি নিজের স্মৃতিশক্তির দৌড়টা টের পাইনি। শব্দ শুনে বা চোখে দেখে অচিরেই বস্তুর সঙ্গে বস্তুর ফারাক বুঝতে পারার এক সহজাত ক্ষমতা যে আমার মধ্যে রয়েছে তাও জানতাম না তখন। কিন্তু আমার শিক্ষক ঠিক চিনতে পেরেছিলেন আমার স্মৃতিশক্তির ক্ষমতাকে। আধঘণ্টার মধ্যে উত্তেজিত হয়ে তিনি ছুটেছিলেন ডাক্তারের কাছে।

ডাক্তার ছিলেন কমবয়সী। আমারই মতন। সব শুনে তাঁর চোখ কপালে উঠেছিল।

“কোথাও কিছু একটা ভুল হচ্ছে বন্ধু।” আমার কাঁধে হাত রেখে উনি বলেছিলেন। “অ্যামেনেশিয়া এত তাড়াতাড়ি ঠিক হয় না।”

“বিশ্বাস হচ্ছে না! ওকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করো!” বেশ জোরের সঙ্গে বলেছিলেন ভাসিলি।

“তাহলে তুমি কথা বলতে পারছ, তাই তো?” ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন। “বেশ বেশ, তা তোমার কেমন লাগছে?”

আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি। কারণ, ডাক্তারের বলা এই শব্দগুলো আগে আমায় কেউ বলেনি।

“তোমার কিছু লাগবে?”

“না।” আমি বলেছিলাম।

‘লাগবে বা চাই’ শব্দটা আমি চিনে গিয়েছিলাম। বুঝেছিলাম ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’–এর ফারাক।

“তোমার নাম কী?”

“কোলয়া।”

“ওঁর নাম কী?”

“ভাসিলি লিনোভিচ।”

“আর আমি?”

“ডাক্তার।” বেশ জোর দিয়ে বলেছিলাম। কারণ, আমি অন্যদেরকে ওঁকে ‘ডাক্তার বলেই ডাকতে শুনেছিলাম।

সব দেখেশুনে ডাক্তার অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

“বলো তো এই ঘরে কী কী আছে?”

আমি ঘরের প্রতিটি জিনিসের নাম একেবারে দেখিয়ে ঠিক ঠিক ভাবে বলছিলাম। ডাক্তার সব দেখেশুনে কী বলবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “বলো তো জানালার বাইরে ওগুলো কী?

ভাসিলি যদিও আমাকে বরফ সম্পর্কে কিছু শেখাননি। তবুও আমি আমার শোনা ভাসা ভাসা স্মৃতির ওপর ভর করে ঠিক উত্তর দিয়েছিলাম।

“বরফ।”

“ভাবা যায় না!” ডাক্তার উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। সম্ভবত দুর্ঘটনার আগের স্মৃতিগুলো ওর মনের ভেতর থেকে ভেসে উঠছে। বলো তো দেখি ‘নিক মার্লে’ কে?”

আমি বলতে পারিনি। পরে শুনেছিলাম, বোমা পড়ে তৈরি হওয়া বিশাল গর্তের ভেতর থেকে আমাকে যখন উদ্ধার করা হয়, তখন আমি বিড়বিড় করে এই শব্দগুলোই নাকি বলেছিলাম।

আমার শিক্ষা চলছিল। গোটা হাসপাতালের লোক আমাকে শেখাতে উঠেপড়ে লেগেছিল। আরো খানিক সুস্থ হয়ে উঠতে আমাকে যেটা করতে হত তা হল, একবার করে রোজ সব ঘরগুলোতে ঢু মারা। দেখামাত্রই সব ঘর থেকে হইচই শুরু হয়ে যেত, “আরে কোলয়া নিকোলাই, এসো এসো।”

তার পরে প্রশ্ন “বাইরে গিয়েছিলে নাকি?”

“হ্যাঁ।”

“বরফের ওপর দিয়ে আবার খালি পায়ে হেঁটেছ?”

“খালি পা কী?”

“জুতো ছাড়া। এই যে এরকম বুট জুতো।”

“বুঝতে পেরেছিস।”

“বুঝতে পেরেছিস না। বলল, ‘বুঝতে পেরেছি,’ বলো বলো।”

আমি যে-কোনো জিনিস খুব তাড়াতাড়ি বুঝে যাচ্ছিলাম। একবার শুনলেই তা স্মৃতিতে গেঁথে যাচ্ছিল। কিন্তু আমার শিক্ষাটা পদ্ধতি মেনে না শেখানোর ফলে ঠিক ঠিক হচ্ছিল না। যাঁরা আমাকে শেখানোর চেষ্টা করছিলেন তাঁদের এই বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। সেটাই স্বাভাবিক। তবে ঠিকমতো মাস্টারমশাই পেলে ভিনদেশি ভাষা শেখা খুবই সোজা, এতে প্রতিটি বক্তবকে বার বার মাতৃভাষায় মনে মনে অনুবাদ করে নেবার দরকার পড়ে না। কিন্তু যাই বলো, মাতৃভাষা সবকিছুর পেছনে নিঃশব্দে কাজ করে চলে। ভাষা শিক্ষা তো আসলে কতগুলো ধ্বনির সমষ্টি।

কিন্তু যে শিখছে তার যদি মাতৃভাষা বলে কিছু না থাকে? কিংবা শিক্ষার্থী যদি কোনো পশু বা পাখি হয়? আমার অবস্থাও তখন ছিল একটা তোতা পাখির মতো। যে শুধু নকল করতে পারে।

আমি ঠিক-ভুলের ফারাক করতে পারতাম না। কোনটা ঠিক বা কোনটা ভুল জানতে চাইলে হাসপাতালের অন্য রুগিরা হেসে উঠত। আমাকে শিশুভোলানো ছড়া শোনাত। আমি কিছু বুঝতে পারতাম না, কারণ ওই ছড়াগুলোতে থাকত অনেক নতুন শব্দ।

আমি তখনও জানতাম না ছড়া কী। আমি শব্দ শেখার চেষ্টা করতাম। প্রায়ই অবুঝের মতো বলে উঠতাম, “বুঝতে পারলাম না।”

একজন একবার ছোটো ছুরি দিয়ে আমাকে খোঁচা দিয়ে বুঝিয়েছিল ব্যথা কী। খোঁচা খেয়ে আমি ঝাঁকিয়ে উঠেছিলাম। জেনে গিয়েছিলাম ব্যথা কাকে বলে। লোকটি জানতে চেয়েছিল, “বেশি লাগেনি তো?

“বুঝলে, কাউকে কিছু দিয়ে আঘাত করা মোটেই ভালো কাজ নয়, তোমারও নিশ্চয়ই খোঁচা খেয়ে ভালো লাগেনি। ঠিক?

“যখন তোমার কিছু ভালো লাগবে না, সেটা ‘খারাপ’ আর যেটা পছন্দ করবে সেটা ‘ভালো’। বুঝলে?”

আমার অভিধানে ভালো খারাপ কাকে বলে ঢুকে গেল, আমি ভালোমন্দের পার্থক্য বুঝতে শিখলাম।

.

২.

ঠিক দু’মাসের মধ্যে গড়গড় করে রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে শুরু করলাম। তারপর পড়তে শেখার শুরু। কয়েকদিনের মধ্যে হাসপাতালের লাইব্রেরিতে রাখা উশাকভ আনব্রিজেড-এর চার খণ্ডের রাশিয়ান ভাষার ডিকশনারি মুখস্থ করলাম। তারপর দশ খণ্ডের সোভিয়েত এনসাইক্লোপিডিয়া প্রথম সংস্করণ শেষ করলাম।

যখন আমাকে শেখানোর পালা চলছিল তখনই আমার ক্ষতগুলো ঠিকমতো শুকোচ্ছিল না বলে আমাকে ফিল্ড হাসপাতাল থেকে রোস্তভ হাসপাতালে পাঠানো হল। এসময় থেকে আমার মধ্যে খানিক জটিলতা দেখা যাচ্ছিল। এই ঠিক আছি, পরমুহূর্তে আমি বেসামাল হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতাম। তারপর জ্ঞান ফিরে এলে আবার স্বাভাবিক হয়ে যেতাম। আমাকে সুস্থ করে তুলতে ডাক্তাররাও লড়ে যাচ্ছিলেন। নানারকম ওষুধ খাইয়ে ও অনেকরকম এক্সারসাইজ করিয়ে আমাকে ঠিক করে তোলার চেষ্টা হচ্ছিল।

বই পড়ার পাশাপাশি দাবা খেলতে শুরু করেছিলাম। একদিনের মধ্যে দাবা খেলায় এক্সপার্ট হয়ে উঠেছিলাম। আমাকে কেউ দাবা খেলায় হারাতে পারত না। সে যত বড়ো খেলোয়াড়ই হোক না কেন! যদিও আমি দাবা খেলা দিন কয়েকের মধ্যেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। সে কারণটা আমি পরে বলব। ভাগ্য আমাকে দিয়েছিল এক অসাধারণ উপহার। সেই উপহারটা ছিল আমার অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি। এই স্মৃতির জোরেই দুনিয়াকে কাছে টানতে সমর্থ হয়েছিলাম। প্রথমে আমার এই স্মৃতি কাউকে খুব একটা অবাক করেনি। সবার কাছেই আমার এই চটজলদি শিখে নেওয়াটা ছিল একটা আলাদা ক্ষমতা। অনেকেই ধরে নিয়েছিল আমার দুর্ঘটনার আগের মেধা ও স্মৃতি আস্তে আস্তে ফিরে আসছে।

আমার স্মৃতি নিয়ে প্রথমে মাথা ঘামান কামিননাস্কি। হাসপাতালে তিনিই আমার দাবা খেলার প্রধান সঙ্গী ছিলেন। উনি সামরিক বাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন। যুদ্ধের আগে অনেকের মতো উনিও ছিলেন এক অসামরিক ব্যক্তি, স্কুলে অঙ্ক শেখাতেন।

একদিন কামিননাস্কির সঙ্গে দাবা খেলা নিয়ে কথা হচ্ছিল। উনি বেশ কয়েকদিন আগে একটা হেরে যাওয়া চালের কথা তুলেছিলেন। আমি দাবার বোর্ডে সেই হেরে যাওয়া খেলার প্রতিটি চাল খেলে দেখিয়ে দিলাম।

“সেদিনের প্রতিটি চাল তোমার মনে আছে?” তিনি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। “জানো কি, এটা অসাধারণ দাবাড়ুর লক্ষণ?”

আমি খানিক হামবড়া ভাব দেখাতে বলেছিলাম, “শুধু দাবার চালই নয়, অসুস্থ হবার পর থেকে যা যা পড়েছি সব হুবহু বলে দিতে পারি।”

মুচকি হেসে উনি বলেছিলেন, “যা পড়েছ তা হুবহু বলে যাওয়া অত সহজ নয়।”

“সত্যি বলছি।”

“কবিতা?”

“না না, সবকিছু।”

“বেশি বড়াই করা ভালো নয় কোলয়া। তুমি কী বোঝো ‘সত্যি বলছি’ কথার মানে কী?”

আমি টেবিলের ওপর পড়ে থাকা শর্ট সোভিয়েত এনসাইক্লোপিডিয়ার চতুর্থ খণ্ডটা ওঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, “যে-কোনো পৃষ্ঠা থেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।”

খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে, বই খুলে বলেছিলেন, “পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৬৩-তে কী লেখা আছে বলো তো।”

“কন্ট্রাকচার।” আমি বলতে শুরু করছিলাম। “পেশির স্থায়ী সংকোচন..”

“দাঁড়াও, দাঁড়াও। বলো দেখি প্রথম প্যারার তিন নম্বর শব্দটি কী?”

“কমপ্লিমেন্টারি টিকিট।”

তিনি বইটি বন্ধ করে আবার হঠাৎ খুলে বলেছিলেন, “পৃষ্ঠা ৪৩৩-এর দ্বিতীয় শব্দ বলো।”

“কুন্দা সাইট।” আমি বলেছিলাম। “এস্তোনিয়ার কুন্দা নদীর তীরে আদিম মানুষদের বিশ্রামের জায়গা। পুরোটা বলব?”

“না, থাক।” এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন যে মনে হচ্ছিল কোনো অদ্ভুত ভিনগ্রহী প্রাণী দেখছেন। “তুমি এই বইয়ের দশটা খণ্ডের সবকটি থেকে এরকমভাবে বলতে পারবে?”

“পারব।”

“তোমার মাথাটা চুম্বকের মতো, যা পড়ো, যা শোনো তাই ওতে আটকে যায়। ভাবা। যায় না।” উনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলেছিলেন। “আমার মনে হয় না দুর্ঘটনার আগে তোমার স্মৃতি এরকমই ছিল। থাকতে পারে না। থাকলে এতদিনে তোমাকে নিয়ে বই লেখা হয়ে যেত। তোমার বর্তমান বিস্ময়কর মেমোরি দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত লাগার ফলে হয়েছে। তোমার মস্তিষ্কের কোষে কিছু না কিছু পরিবর্তন হয়েছেই।”

খানিক চিন্তা করে আবার বলেছিলেন, “তোমার যা স্মৃতি বা মেধা, তাতে করে অনায়াসে তুমি হাই স্কুলের ডিপ্লোমা পেয়ে যাবে। অবশ্য সব বিষয়ে খানিক পড়াশুনা করতে হবে। তোমার অঙ্কের হাল কী?”।

“খুব একটা ভালো নয়।” খানিক লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলেছিলাম।

আমরা প্রথমে পাঠ্য বইয়ের মধ্যে ডুবে ছিলাম। তারপর একের পর এক অঙ্ক করতে করতে আমরা ছুট লাগাচ্ছিলাম প্রথাগত গণিত শিক্ষার বাইরে। কিছুদিনের মধ্যে কামিনোস্কি আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছিলেন।

মাস খানেকের মধ্যেই কামিনোস্কি গিয়েছিলেন মস্কোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিষদীয় সভ্য সোসিনের সঙ্গে দেখা করতে। সোসিনকে কামিনোস্কি চিনতেন স্কুল থেকেই। কামিনোস্কি চাইছিলেন সোসিন আমাকে নিয়ে শীঘ্রই কিছু করুন।

সোসিনের হস্তক্ষেপে আমি অচিরেই আমি স্নাতক পরীক্ষায় বসেছিলাম এবং পরীক্ষার ফলাফল এত ভালো হয়েছিল যে সরাসরি গবেষণায় যোগ দিতে আমার আর কোনো বাধা ছিল না।

তার পরপরই একদিন আচমকা হার্ট অ্যাটাক হয়ে কামিনোস্কি মারা গেলেন। আমি একা হয়ে গিয়েছিলাম। নিঃসঙ্গতা এসে ভর করেছিল আমায়। আমি এই নিঃসঙ্গতা নিয়েই প্রথম গবেষণা শুরু করেছিলাম। একাকিত্বই আমার নতুন জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল।

তখন আমার অবস্থাটা ছিল নির্জন গির্জার নিঃসঙ্গ যাজকের মতো। সবাই চলে গেছে, কিন্তু তিনি বসে আছেন উপাসনার ডালি নিয়ে। সাধারন মানুষ সময়কে এঅবস্থায় একটা বোঝা মনে করে, কিন্তু আমার দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল আলাদা, আমি ছ’ টি ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলাম। অসংখ্য বইয়ের লক্ষ লুখ পৃষ্ঠার আমার স্মৃতিতে গেঁথে গিয়েছিল। কিন্তু আমার মাথায় সবসময় ঘুরত পিথাগোরাস আর নিউটনের কথা।

আমি এই দুই মহা ঋষির কর্মকাণ্ড বার বার বিভিন্ন কোণ থেকে পর্যালোচনা করেছি, আর আমার এই কাজের ধারাই আমাকে অন্যদের থেকে সরিয়ে রেখেছিল। আমি কারো ‘কাছের’ হতে পারিনি। আমার বিস্ময়কর স্মৃতি বা মেধা আমাকে অন্যদের থেকে দুরে সরায়নি। সরিয়েছিল অন্য কিছু। একটা ভয় বা বিতৃষ্ণা। মহিলা, মহিলাদের কাছ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে আমি অন্যদের থেকে সরে থাকতাম। আমি কোনোরকম পোষা প্রাণী পছন্দ করতাম না। ঠান্ডা আমাকে কখনোই কাবু করতে পারেনি। কাউকে মাংস খেতে দেখলে আমার বমি পেত। কিন্তু তার থেকেও সাংঘাতিক একটা বিষয় আমাকে অন্যদের থেকে দূরে সরে থাকতে বাধ্য করত। আমি আমার সঙ্গে কথা বলতে থাকা ব্যক্তির মন পড়তে পারতাম। ঠিক যেভাবে আমরা বই পড়ি। হাসপাতালে থাকাকালীন আমি অনেককেই, সে মুখে কিছু বলার আগেই তার মনের কথা জেনে উত্তর দিয়ে দিতাম, মন্তব্য করে বসতাম কেউ কিছু বলার আগেই। তারপর হাসিমজা করে ঘটনাটাকে হালকা করার চেষ্টা করতাম। আমি কারো মন পড়তে না চাইলেও ব্যাপারটা ঘটেই যেত। প্রশ্ন করার আগেই উত্তরটা দিয়ে ফেলাতে বিষয়টা প্রায়ই বিরক্তিকর দিকে চলে যাচ্ছিল। তাই আমি কম কথা বলে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া শুরু করলাম। কিন্তু ভুলেও কাউকে অন্যদের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার রহস্য প্রকাশ করিনি। করলে আমার কী অবস্থা হত? হয় মঞ্চে ভাঁড়ামো করতে হত, না হয় সার্কাসে ঠাঁই পেতাম।

শুধু একবার, একবার আমার মন পড়তে পারার কথা উত্তেজনার মাথায় বলে ফেলেছিলাম হাসপাতালে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে আসা এক গ্র্যান্ড মাস্টারের কাছে। আমি ওঁকে হারিয়ে দিয়েছিলাম। আমি দশম চালের পর থেকে পরবর্তী চালগুলো নিয়ে উনি কী ভাবছেন আমি জেনে গিয়েছিলাম। হাসপাতাল থেকে হোটেলে পৌঁছে দেবার সময় আমি সরল মনে ওঁকে বলে দিয়েছিলাম কেন এবং কীভাবে ওঁকে হারিয়ে দিয়েছিলাম। উনি প্রথমে বিশ্বাস করেননি। হোটেলে পৌঁছে আমি ১৪তম চাল পর্যন্ত পুরো খেলাটা আবার বোর্ডে খেলে দেখালাম।

“আপনি গজটা তিন নম্বর ঘরে তুলে মন্ত্রীকে খাইয়ে আমাকে ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিলেন।”

যদিও আমার কথা শোনার পর অবিশ্বাসটা ওঁর থেকেই গিয়েছিল।

“ঠিক। কিন্তু এটা তো একটা প্রাথমিক কৌশল। যে-কোনো ভালো দাবাড়ু বুঝে যাবে যে আমি কী করতে চাইছিলাম।

“কিন্তু যতই ভালো খেলোয়াড় হোক না কেন, আপনার পরের মতলবের কথা তার জানার কথা নয়। আপনি তখন অন্য চাল ভাবছিলেন।” আমি দুটো চাল খেলে দেখিয়ে দিয়েছিলাম। “আপনি এই দুটো চাল ভেবেও দেননি। কারণ, মনে মনে আপনি আমার পরের পাঁচটা চাল কী হতে পারে ছকে নিয়েছিলেন। এই যে খেলে দেখাচ্ছি।” আমি বোর্ডে খুঁটি বসিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলাম।

“ঠিক ধরেছ!” বলে খানিক চিন্তা করতে করতে ঘরে পায়চারি করতে শুরু করেছিলেন। তারপর আমার সামনে এসে চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি। তোমার মধ্যে এক বিরল ক্ষমতা আছে। তুমি সহজেই গ্র্যান্ড মাস্টার হয়ে যাবে, তারপর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু সেটা দাবা খেলা হবে না, হবে জোচ্চুরি। যে-কোনো থিয়েটারের মঞ্চে নেমে তোমার এই বিরল প্রতিভার খেলা দেখানোটাই ঠিক হবে। কিন্তু কোনোদিন দাবা খেলা উচিত হবে না। যদি খেলো সেটা হবে অনৈতিক, আন-এথিক্যাল।”

আমি চলে এসেছিলাম। উনি হয়তো আমাকে ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমি ওঁর কথা ভুলিনি। সেদিনই দাবা খেলা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আর কোনোদিন কারো কাছে আমার বিশেষ ক্ষমতার কথা প্রকাশ করিনি।

.

৩.

আমার কোনোদিন কোনো মনের রোগ ছিল না। হলে এই বিষয়ে আমি টের পেতাম। কিন্তু আমার মনের ওপর আক্রমণ হত। হ্যাঁ, কেউ বা কারা আমার চিন্তার দখল নিতে চাইত। আমার মন নিয়ে নাড়াচাড়া চলত। আমি আর আমি থাকতাম না। প্রথম প্রথম এটা হত যখন আমি সম্পূর্ণ একা থাকতাম। কেউ ধারেকাছেও থাকত না। মাঝে মাঝে পড়াশুনা শিকেয় তুলে ঘুরে বেড়াতাম একা, দূরের কোনো শহরতলির নির্জন জঙ্গলে। যেখানে সম্ভবত কোনোদিন কোনো মানুষের পাও পড়েনি। হ্যাঁ, ঠিক। তাইগা– পাইনগাছ ভরা জলাভূমিতে।

গরমকালে জঙ্গলের ঘন পাতার ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে-বসে আমি ভাবতাম উত্তর না পাওয়া নানা রহস্যের কথা। শহরের তাপ আমার সহ্য হত না। শহরের উষ্ণতা আমার চিন্তাগুলোকে মেরে ফেলত। থার্মোমিটারের পারা যত নামত, আমার চিন্তাগুলো তত ধারালো হত। থার্মোমিটারের পারা ওপরের দিকে উঠতে থাকলে আমার অবস্থাটা হত ভেঙে পড়া গাছের মতো। থেকেও নেই।

ভরা গ্রীষ্মে জঙ্গলের ছায়ায়, শিশির ভেজা ঠান্ডা ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটলে আমার গায়ের চামড়া যেন সজীব হয়ে উঠত, আর আমার চিন্তা করার ক্ষমতা বেড়ে যেত।

হঠাৎ করেই একদিন জঙ্গলের মাঝে একা একা ঘোরার সময় আমার মাথাটা টলে উঠল। কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন ছুঁড়ে ফেলে দিল আমার ভাবনাগুলোকে। পরিচিত জঙ্গলটা অচেনা হয়ে উঠল। মনে হল যেন এখানে আমি আগে কখনো আসিনি। একটা অদ্ভুত অনুভূতি দখল নিল আমার মনের। মনে হল আমার চারপাশে ঘিরে থাকা কোনো কিছুই এই পৃথিবীর নয়। আমি এসব চিনি না। কোনোদিন দেখিনি। মনে হল আমি যেন এখানে এক আগন্তুক, ভুল করে ঢুকে পড়েছি। ঠিক যেন নেকড়ে মানব মোগলি ঢুকে পড়েছে শহরে। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠল, কোনো কিছু চিনতে পারছিলাম না, বুঝতে পারছিলাম না। একটা বিদ্যুৎ-চমকের মতো কিছু যেন ঝলসে উঠে আমার মনটাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছিল, জাগাতে চাইছিল। কিন্তু পারছিল না। চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়েছিলাম। পৌঁছে গিয়েছিলাম মৃত্যুর দোরগোড়ায়।

হ্যাঁ, মারা যাইনি আমি। জ্ঞান ফিরতেই উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। কত ঘণ্টা বা কত মিনিট ওই অবস্থায় ছিলাম জানি না। তবে সে না জানলেও তাইগার গাছের ডালপালার খোঁচা খেয়ে যে চোখদুটো যায়নি সে-ই ঢের। কেউ জানতেও পারেনি আমায় এই অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা। তবে সবসময় একা নয়, অন্য কেউ কাছে থাকলেও এই ঘটনাগুলো ঘটতে শুরু করল।

আজ থেকে প্রায় পনেরো বছর আগে মস্কোর কাছের এক জঙ্গলে প্রথম এরকম হয়েছিল। সে-সময় আমি আর কামিনোস্কি জঙ্গলের মাঝে হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম। উনি পরে বলেছিলেন আমি নাকি মিনিট খানেকের মতো জ্ঞানশূন্য অবস্থায় ছিলাম। কিন্তু আমার হার্ট বিট, ব্লাড প্রেসার সব নর্মাল ছিল।

“আমার মনে হয় ডাক্তাররা তোমার এই জ্ঞান হারানোর বিষয়টা নিয়ে একটা ভুল কিছু ভাবছে কোলয়া। তোমার শরীরের ভারসাম্য ঠিক আছে। হয়তো তোমার ব্রেনে কিছু একটা ঘটছে। তুমি বলেছিলে তুমি কুয়াশার মধ্যে দিয়ে একটা বিদ্যুৎ-চমকের মতো কিছু দেখতে পেয়েছিলে। সম্ভবত ওটা ছিল তোমার পূর্বের কোনো স্মৃতি।” নেকড়ে মানবের তুলনাটা উনিই টেনেছিলেন।

“বুঝলে কোলয়া, তুমি হচ্ছ গল্পের সেই মোগলি। প্রকৃতির জঙ্গল থেকে মানুষের অরণ্যে ঢুকে পড়েছ। তোমাকে আবার সবকিছু নতুন করে শিখতে হবে, বুঝতে হবে। সব প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। তুমি সেই মোগলির মতো স্মৃতি হারিয়ে ফেলা এক ব্যক্তি। তুমি জঙ্গল জীবনের কথা ভুলে গেছ। আচমকা জ্ঞান হারিয়ে উলটোপালটা স্বপ্ন দ্যাখা, হতে পারে সেই স্মৃতি ফিরে আসার লক্ষণ। মোগলির উদাহরণ শুনে আমার উপর মনে মনে ক্ষেপে যেও না কোলয়া। আমি এখনো শেষ করিনি। তোমার স্বপ্নে দেখা জঙ্গল ধারেকাছে কোথাও নেই। কারণ, তোমার স্বপ্নের জঙ্গলে কোনো জন্তুর উপস্থিতি নেই। সেখানে কোনো মাংসাশী প্রাণী নেই। তাছাড়া ভেবে দ্যাখো, সেখানে কেউ ঠান্ডাকে ভয় পায় না।”

কামিনোস্কির বিশ্লেষণ একদম ঠিক ছিল। কারণ আমার মাথায় আঘাতটা আসতেই আমার চোখের সামনে ফুটে উঠত কোনো জায়গার ছবি, কিংবা কোনো বই অথবা কানে আসত কখনো স্পষ্ট কখনো অস্পষ্ট কথোপকথন। সেগুলো হয়তো আমার অতীতের কোনো ঘটনারই ঝলক যা আমার মনের কোণে ফিরে আসার চেষ্টা করছে।

একদিন বাল্টিক সমুদ্রে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। আচমকা আমার চোখের সামনের দৃশ্যগুলো সব ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, বাষ্পে ভেজা কাঁচের মধ্যে দিয়ে দেখলে যেমন হয় অনেকটা সেরকম। সমুদ্র সরে গিয়ে আমার চোখের সামনে ফুটে উঠেছিল খাড়া পাহাড়ের গা। তাতে বেগুনি আর নীলের ছটা। কিন্তু সমুদ্রের যেখান দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম সেখানে কোনো পাহাড়ই ছিল না। সমুদ্র কিনারায় ছিল শুধু পাইনগাছের জঙ্গল আর ধুধু বালির সাম্রাজ্যে শান্ত ঢেউয়ের আনাগোনা।

ঠিক তার একদিন পরে আমি পাকাপাকিভাবে চলে এসেছিলাম আকাডেমগোরোদক শহরে। সেখানে এক নামকরা বিজ্ঞানীর বাড়িতে আমার সম্মানে এক রিসেপশন পার্টি হয়েছিল। সেই পার্টিতে খাবার টেবিলে শেষপাতে ফ্যাকাসে হলদে রঙের একটা ডেসার্ট সার্ভ করা হয়েছিল। কিন্তু খাবারটার গন্ধ নাকে আসতেই আমার কেন জানি না মনে হয়েছিল এই খাবার আমি আগে খেয়েছি। কয়েক মুহূর্তের জন্য জ্ঞান হারিয়েছিলাম। যদিও আমার আশেপাশে যাঁরা ছিলেন তাঁরা কেউ ধরতে পারেননি যে আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম। শুধু আমার উলটোদিকে বসা আমার পরিচিত এক ডাক্তার ব্যাপারটা টের পেয়েছিলেন।

“কী ব্যাপার, খেতে খেতে আবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে? সেই পুরোনো স্মৃতি-স্বপ্ন আবার ফিরে এসেছিল নাকি?”

“ঠিক ধরেছেন।” আমি বলেছিলাম।

ঠিক মরা মানুষের হাতের মতো শক্ত করে আমার অতীত মাঝে মাঝেই আমার মনটা আঁকড়ে ধরত। বুঝতে পেরেছিলাম সহজে এই বাঁধন থেকে মুক্তি নেই। যদিও গত কয়েক বছর ধরে এই আক্রমণের বহরটা একটু একটু করে কমে আসছে। কিন্তু যখন আসে, তখন আসে হঠাৎ করে। ঝাঁপিয়ে পড়ে সহসা।

গতবছরও ঠিক এরকম হয়েছিল শহরের এক মোড়ের মাথার বেঞ্চে বসা একদল বাচ্চা ছেলেমেয়েকে খেলতে দেখে। আমার কোনো সন্তান নেই, তাই অন্যদের বাচ্চাদের থেকেও খানিক দূরে থাকি। আমি বাচ্চাগুলোর দিকে এক ঝলক তাকিয়েছিলাম। তখনই আমার মাথায় এল জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিণতির কথা। মুহূর্তের মধ্যে আমার ব্রেনে একটা ঝটকা লাগল। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। এবার একটু বেশি সময় ধরে, যেটা সাধারণত হয় না। আমার অতীতের স্মৃতি খানিক ফিরে এসেছিল। যদিও সেটা অনেকক্ষণ ছিল না, কয়েক মিনিটের জন্য একটা ছবি ভেসে উঠেছিল আমার মনের ভেতরে।

যেভাবে আগেও এসেছিল। মেঘে ঝাপসা হয়ে যাওয়া চারপাশ ক্ষণিকের জন্য আলোকিত করা বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো। না, আমি কোনো পাহাড়ের ছবি দেখিনি, দেখিনি কোনো দরজা বা চেয়ার টেবিলের ছবি। দেখেছিলাম এক মানুষের মুখ, যার সঙ্গে আমার ভীষণ মিল। দেখেছিলাম লাল পোশাক পরা এক মহিলা আমার দিকে পেছন ঘুরে বসে আছেন। মহিলার মাথার পেছনটা কামানো ছিল।

“তোমার খুশি হওয়া উচিত যে ছোকরা মাঝেমধ্যেই নাক লাল করে ফিরছে।” মহিলার সামনে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ কথা বলছিলেন। “এটা পুরুষত্বের চিহ্ন। দেখছ তো, আজকাল শুধু কন্যাসন্তানেরই জন্ম হচ্ছে। পুরুষের সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে কমছে, আমাদের গ্রহ ধীরে ধীরে শুধু মহিলায় ভরে যাবে।”

আমি যে কথাবার্তা শুনেছিলাম তা রাশিয়ান ভাষাতে না হলেও তা যে রাশিয়ান ঘেঁষা ছিল, তাতে ভুল নেই। কারণ, কথাগুলো বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। অন্য কোনো ইউরোপিয়ান ভাষা হলেও আমি ধরতে পারতাম। অজ্ঞান অবস্থায় শুনলেও ভাষার ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু মহিলাটি কী উত্তর দিয়েছিলেন শুনতে পাইনি। আমার জ্ঞান ফিরে এসেছিল। আমি নিশ্চিত, ওই দৃশ্যগুলো ছিল আমার অতীতেরই অংশ।

কয়েকদিনের মধ্যে ঠিক আবার একই ঘটনা ঘটেছিল। চোখের সামনে ঝলসে উঠেছিল আলো। না, এবার আমার মনের কোণে কোনো ছবি ভেসে ওঠেনি। শুনেছিলাম খানিক টুকরো টুকরো আলোচনার অংশ। দু’ জন মানুষ কথা বলছিল। খুব আস্তে আস্তে। ঠিক যেন একই টেবিলে পাশাপাশি বসে কথা বলছে। দুটোই পুরুষ কণ্ঠ ছিল। তার একটি আমার খুব পরিচিত। আমি নিশ্চিত, এ কণ্ঠ আমি আগে শুনেছি।

“ওকে দিনরাত অঙ্ক শিখিয়ে চলেছেন কেন, যখন এই বিদ্যা কোনো কাজে লাগবে না? জানেন তো, এ-বিদ্যা আগেও কাজে লাগেনি, এখনও লাগছে না, ভবিষ্যতেও লাগবে না।”

“তুমি কী করে জানো?”

“সংখ্যা, খালি সংখ্যা দিয়ে গল্প। নাচের ভঙ্গি, শিকারের ভঙ্গি… সব সংখ্যা। আরও ঠিকভাবে বললে বলতে হয়, ভূতুড়ে সব সংখ্যা… বোঝো অবস্থা! খুব শিগগিরই আমাদের হাতেপায়ে আরো বেশি আঙুল গজাবে এত গোনাগুনি করতে।”

“হতে পারে। শুধু শুনে রাখো, বাঁচার উপায় কিন্তু ওই সংখ্যাতেই আছে।”

“বিজ্ঞানকে কে বাঁচাবে, যখন লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাচ্ছে আর গুটিকয়েক জন্মাচ্ছে?”

“সেই জন্যই কি তুমি শেখাতে বারণ করছ?”

“ঠিক বলেছেন। মানুন আর না মানুন, স্বাধীনতা হল বিজ্ঞানের ঠিক উলটো পিঠ। সমাজের প্রয়োজনে তাই আমরা কখনো সংখ্যা, কখনো যন্ত্র, কখনো বা নিছক বস্তুর দাস হয়ে পড়েছি।”

“আমার খুব খারাপ লাগছে, না, তোমার জন্য নয় অষ্টা, এই গ্রহটার জন্য।”

“আমি আপনার সঙ্গে একমত।”

শব্দগুলো হঠাৎই থেমে গিয়েছিল। যেই জগতের আভাস আমার কাছে আসছিল, তা ফিকে হয়ে গিয়েছিল ওই শব্দগুলোর মতোই। আমি জানতে পারিনি ওই পৃথিবীর কথা। বিন্দুমাত্র ধারণা করতে পারিনি ওই মুখগুলো বা শব্দগুলোর উৎস কী। কিন্তু এটা বুঝতে পেরেছিলাম, ওই সমাজের মানুষগুলো মোটেই সুখে ছিল না। বিষয়টা আমাকে মোটেই চিন্তিত করেনি। কারণ, আমি আর ওই সমাজের অংশ ছিলাম না। কিন্তু আমিও বর্তমান নিয়ে স্বচ্ছন্দ ছিলাম না। প্রথম থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমি বর্তমান জগতের সকলের থেকে আলাদা। ঠিক মোগলির সহ-বাসিন্দাদের মতো। জঙ্গলই তার সব ছিল। তার ধাত্রীভূমি, চারণভূমি… কিন্তু তবুও সভ্যতাই তাকে টেনে এনেছিল। আমারও মস্তিষ্কের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা আমার অতীত স্মৃতি আমাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইত সেখানে, যা নাকি আমার নিজস্ব ভূমি।

তাই যখন একাকী থাকতাম, তখন যন্ত্রের মতো কাগজের গায়ে লিখে চলতাম একটা প্রশ্ন–’আমি কে?

কে আমি? কে, কে?

.

নোটবই-২

১.

ওর হাঁটাটা ছিল অদ্ভুত। কোনোভাবেই ওই হাঁটার ধরনকে মেয়েদের হাঁটা বলা যায় না। ছোটো ছোটো স্টেপ নয়, বরং ঠিক উলটোটা, লম্বা লম্বা পা ফেলে ছেলেদের মতো হাঁটত ও। আর হাসিটাও ছিল কেমন অদ্ভুত। মুখটা হাঁ করে মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে হাসত। হাসলেই চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইত। মাঝে মাঝেই আমার মনে হত ও যেন আমার প্রতিটি চলাফেরা লুকিয়ে লুকিয়ে ফলো করে। আর কিছু সিগারেট খেত বটে মেয়েটা। ফোঁকার স্টাইলটা ছিল বিজনেসম্যানদের মতো। লম্বা টান, তারপর ছুঁচলো নখের আঙুলের ডগায় টোকা দিয়ে পাক্কা চেন স্মোকারের ভঙ্গিতে ছাই ফেলা। ধূমপানের নেশাটা তাড়িয়ে উপভোগ করত।

আমিও একবার সিগারেট খাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। মোটেই ভালো লাগেনি। মুখটা ভরে গিয়েছিল বিস্বাদে। স্মোক করে কী আয়েশ পাওয়া যায় বুঝতে পারিনি। এজন্য এ জন্মে আর ধূমপানের মজা টের পাওয়া হল না।

স্বীকার করছি, মেয়েটাকে একেবারেই বুঝতে পারিনি। আমাদের বয়সের ফারাকটাও মোটেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো ছিল না। কম করে পঁচিশ বছরের বড়ো ছিলাম মেয়েটার থেকে। ও ছিল বছর কুড়ির ঝকঝকে তরুণী। যদিও ওঁর মধ্যে তরুণীর থেকে কিশোরীর উচ্ছলতাই বেশি ছিল।

প্রায়ই ও ভাবলেশহীনভাবে বলত, “আরে, তোমার ভাগ্য তো খুব ভালো। যুদ্ধের কতটুকুই বা দেখেছ! আমার বাবা আমাকে মস্কোতে থাকাকালীন তাঁর যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কত গল্প বলেছেন। রাতে সব অন্ধকার হয়ে যাওয়া… অন্ধকারে সার্চিং লাইটের আকাশ কুঁড়ে ছোটাছুটি… বুঝলে, আমার বাবা যখন ছোটো ছিলেন, তখন আমাদের বাড়ির ছাদ বোমা পড়ে ভেঙে যেতে বাবা তার তলায় চাপা পড়ে গিয়েছিলেন।”

কোনো সন্দেহ নেই আমি ওর বাবার থেকেও বড়ো ছিলাম। যদিও আমার নবজন্ম হয়েছিল যুদ্ধের সময় দুর্ঘটনার ফলে। কিন্তু যতই আমার মনের নতুন জন্ম হোক না, আমার তো একটা ফুরফুরে, শক্তপোক্ত শরীর ছিল! কত বয়স ছিল সে সময় আমার শরীরের? পঁচিশ-তিরিশ? আর এখন? পঞ্চাশ অনেক আগেই পার করে এসেছি, ষাট ছুঁই ছুঁই বলা যেতে পারে। সত্যি তো মানতেই হয়। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে কান পাতলেই শোনা যেত এক বুড়ো প্রফেসর আর এক ইয়ং স্কলারকে নিয়ে রসালো আলোচনা। যদিও আমি যে বুড়ো তা মানতে চাইত না মেয়েটি। বলত, “আপনি মোটেই বুড়ো নন প্রফেসর। আপনার ফিজিক্যাল ফিটনেসকে ছাত্রেরা হিংসা করে। আপনি যেভাবে পাতলা পোশাকে কোনো টুপি ছাড়া শীতের সাইবেরিয়ার বরফে ঘুরে বেড়ান, তা কি কোনো বৃদ্ধের পক্ষে সম্ভব? আপনাকে টেক্কা দিতে ভিতালি ভলোকও ওজন কমানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। রোজ সকালে দেখি ব্যালকনিতে ব্যায়াম করছে।”

আমি বেশ বুঝতে পারতাম, ভলোকভের কথা বলে আমাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করত ও।

মনটাকে চাঙ্গা রাখার জন্য ও আমাকে প্রায়ই গাড়িতে করে ঘুরতে নিয়ে যেত। আমি প্রথমদিনই ওকে বলেছিলাম গাড়ির পেছনের সিটে বসার জন্য। কারণ, গাড়ি দ্রুত স্পিডে চললে পেছনের আসনই সবচাইতে সেফ। ও উত্তর দিয়েছিল, “যা হয়নি বা আদৌ হবে কি না তা নিয়ে অত ভাবার কী আছে? আপনি দারুণ গাড়ি চালান প্রফেসর।”

আমি ওর মন পড়তাম। একদম পরিষ্কার, কোনো ঘোরপ্যাঁচ ছিল না। স্পষ্ট শুনতাম ও মনে মনে বলছে, ‘আমি তোমার পাশে বসতে চাই। পেছনে নয়, সামনে নয়। তোমার পাশে। কেন বোঝো না আমার মনের কথা! তোমার পাশে থাকতে চাই সবসময়। গবেষণায়, গাড়িতে, তোমার হিমশীতল ঘরে… সারাজীবন। তুমি শুধু মনেই বুড়িয়ে গেছ, তাই বোঝো না আমার কথা।’

আমি বুঝতে পারতাম, ঠিকই বুঝতে পারতাম ওর মনের কথা। কিন্তু নিরুপায় ছিলাম। ঈশ্বর আমাকে অন্য পথের পথিক হতে পাঠিয়েছিলেন। আমার মনটা তৈরি করেছিলেন এমনভাবে যে সাধারণ বিষয় আমার মনে কোনো আঁচড় কাটত না। আমি যেন একটা মঠের প্রধান, জ্ঞানের ঝুলি আঁকড়ে বসে থাকা চামড়া কোঁচকানো মহাস্থবির। আর সে মঠের অন্য পূজারিরা সব এক-একটা জীবন্ত আত্মা। আর তাঁরা কেউই পূজাপাঠে অংশ নেওয়া সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনী নন। যখন ওদের সমবয়সীরা নাচগানে মত্ত, তাঁরা তখন এখানে নীরবে গণিতের সাধনা করে চলেছেন। শুধু তাই নয়, চিরাচরিত প্রথার অঙ্কের পথ তাঁরা ধরেননি। তাঁরা এমন ধারায় আঁক কষে চলেছেন যা নিয়ে আগে কেউ ভাবেনি। এ পথের শরিক হয়েছেন সম্মান বা খ্যাতির আশায় নয়, সমর্পিত প্রাণ হয়ে, ভালোবেসে, জ্ঞানের সন্ধানে। যেখানে কোনো ফাঁকি চলে না। লক্ষ্যে পৌঁছনোর কোনো শর্টকাট নেই। ঠিক সেই কবিতার পঙক্তির মতো:

আমাদের সাধনার সীমা নেই কোনো
সে অসীমে ভেসে ফিরি, উত্তরণ আশে
স্থির লক্ষ্য; তবু তাকে অপেক্ষায় রেখে
যদি মজি অন্য মোহে দিগভ্রান্ত হয়ে
আমি পরিণত হব আমিহীন বর্জ্যবিশেষে”

আমার ছাত্ররা হতাশা কী বস্তু জানে না। আমি ওদেরকে, আমার অংশ বলেই মনে করি, আর ওরাও ওদেরকে আমি বলে মনে করে। আমাদের মধ্যে কোনো প্রাচীর ছিল না, অন্তত অঙ্কের বেলায়। গণিত! গণিত আমার সব। আমার ভালোবাসা। মিষ্টি মেয়েটা একথাটাই বুঝতে পারেনি। অঙ্ক ছাড়া আর কিছুকে আমার মনপ্রাণ দিতে পারিনি।

সেদিন ওর সঙ্গে বেরোনোটা ঠিক হয়নি। যদিও শেষটা এমন কিছু খারাপ ছিল না। আমার কথাবার্তায় আরও নরম হওয়া উচিত ছিল। আরও সংযত হতেই পারতাম। খানিক বাপ-সুলভ ভাব দেখিয়ে আলোচনাটাকে হালকা করতে পারতাম।

“কখনো বিয়ে করেছিলেন প্রফেসর?”

প্রশ্নটা আমার মোটেই ভালো লাগেনি। শালীনতার গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। হতে পারে ও কিছু ভেবে বলেনি। পরিবেশের গাম্ভীর্যটাকে ছিঁড়ে দিতে চেয়েছিল ও। ওর পক্ষে অভিনয় করাটা যে সম্ভব নয় সেটা আমি জানতাম।

“না, করিনি।”

“করেননি কেন?”

“সিগারেট লাইটারটা নিয়ে খেলা কোরো না ইনা।”

ওর হাবেভাবে বুঝলাম আমার ধমকটা ও গায়ে মাখেনি। তাই আবার বললাম, “বিয়ে করিনি, কারণ বিয়ে করার সময় ছিল না।”

কথাটার মধ্যে খানিক মিথ্যে ছিল। আমার সময়ের অভাব ছিল না, অভাব ছিল ইচ্ছের। কত কত সুন্দরী, শিক্ষিতা আর দয়াময়ী মহিলার সঙ্গে যে পরিচয় হয়েছে এত বছরে তার হিসেব নেই। কিন্তু কাউকেই জীবনসঙ্গিনী করার কথা ভাবিনি। ঠিক হাইস্কুলের পড়ুয়াদের মতো মনে মনে ভেবেছি, কোনটা ভালো! ভালোবাসা, না বন্ধুত্ব? আমি বন্ধুত্বকেই পছন্দ করেছি সবসময়। কোনো ভুলে নেই, আমি আমার নিজের ইচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত নিইনি, কেউ যেন আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছিল। ঠিক যেন স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা। নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।

“প্রফেসর, আপনি যখন ছোটো ছিলেন আপনার নাম নির্ঘাত ‘কে’ ছিল। ঠিক ‘দ্য স্নো কুইন’ সিনেমার বাচ্চাটার মতো। আপনার সেই সিনেমার কথাটা মনে আছে প্রফেসর, যেখানে শিশুটি বরফের ইট সাজিয়ে ‘অনন্তকাল’ শব্দটা বানিয়েছিল?”

“অনন্তকাল!” আমার মনে হয়েছিল আমিও যেন এইরকম কোনো শব্দ গড়েছিলাম কখনো, কিন্তু বরফের টুকরো দিয়ে নয়। সস্তামার্কা নভেলগুলোয় যেসব ফ্ল্যাশব্যাকের গল্প থাকে, ওই ‘অনন্তকাল’ শব্দটা শুনে ঠিক সেইভাবেই আমার মনে কিছু ভুলে যাওয়া

স্মৃতির টুকরোটাকরা ঝিলিক দিয়ে উঠতে শুরু করেছিল। যেন চেনা কোনো মুখ! শুধু, কোথায় তাকে দেখেছি সেইটে কিছুতেই মনে আসছে না। ঘুমন্ত স্মৃতি? হ্যাঁ। কখনো সেই ‘অনন্তকাল’ কে অন্য কোনো চেহারায় স্পর্শ করেছিলাম আমি। বড়ো শীতল সেই ছোঁয়া। আমার মত সহনশীল মানুষও সইতে পারিনি তাকে… কিন্তু কোথায়? কীভাবে? কেন? বারবার আমার মনে হচ্ছিল, কেবল চোখদুটো বন্ধ করে একটু ভাবলেই… একটু… প্রায় তাকে ছুঁয়ে ফেলা… নাঃ। মনে পড়ে না।

“প্রফেসর, প্রফেসর… আপনার কী হয়েছে? আপনি ঠিক আছেন?”

“ঠিক আছি ইনা। কাঁচ নামিয়ে দাও। জানালা খোলা রাখো প্লিজ।”

“আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে যে? গাড়িটা একটু আস্তে চালান প্রফেসর!”

“ভয় পাচ্ছ?”

“না না, ভয় পাচ্ছি না। সামনে একটা বাঁক আছে, সেখানে রাস্তাটা আবার ভাগ হয়ে গেছে।”

“আমি জানি।”

মুখে সেসব বললেও ভেতরে ভেতরে আমি টের পাচ্ছিলাম আসলে আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না। আমার চোখের সামনে ভিড় করে ছিল পুরু কুয়াশার ভেতর দিয়ে যেমন দেখা যায় সেরকম আবছা আবছা কিছু দৃশ্য। বাঁকটার আগে আমার গতি কমানো উচিত ছিল।

“ব্রেক মারুন প্রফেসার! ডানদিকে দেখুন!” চিৎকার করে উঠেছিল ইনা।

ও চিৎকার করছে কেন? চমকে উঠেছিলাম আমি। ওহ!

আবছা টের পেয়েছিলাম একটা ধীরগতির বিশাল ট্রাক এসে পড়েছে আমার গাড়ির সামনে।

সঙ্গে সঙ্গে সজোরে ব্রেক কষেছিলাম। স্টিয়ারিংটা আরও, আরও অনেকটা ডানদিকে কাটানো উচিত ছিল। ট্রাকটাও আমাদের কাটানোর চেষ্টা করেছিল। কে যেন আমার মধ্যে বলে উঠেছিল, ‘জোরে, আরও জোরে চালাও। সোজা আঘাত হানো তেলের ট্যাঙ্কে।’

আমি কি পারব না? পারতে আমাকে হবেই।

অনেক, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। তুষারপাতের আবছায়ায় অস্পষ্টভাবে ট্রাকটার রেডিয়েটরটা ঝলসে উঠেছিল। এবার সংঘর্ষটা হবে। আর কিছু মনে ছিল না আমার।

.

২.

চারপাশটা ভীষণ শান্ত। পৃথিবীর ওপর ভারশূন্য হয়ে উড়ে বেড়ানোর অনুভূতিটা অদ্ভুত। পৃথিবীটাকে লাগছে বাচ্চার হাতে ছোটো রাবারের বলের মতো। বলটা ঘুরছে, ঘুরেই চলেছে। বলটায় মাত্র দুটো রং। নীল আর সবুজ। না না, আরও রঙ দেখতে পাচ্ছি.. হলুদ, বাদামি। আরও রঙ… আকাশি… আরও, আরও রঙ… আমার স্বপ্নের নীল গ্রহ, অজানা, বহুদূরে।

“নামার জন্য প্রস্তুত হও।” আদেশ এসেছিল নেভিগেটরের কাছ থেকে।

কম্পিউটারের পর্দাটা জুড়ে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ।

“গ্রহটা তো পুরোটাই মেঘে ঢাকা। কোথায় নামব প্লটার?”

“পূর্বগোলার্ধে। মেরুবৃত্তের কাছাকাছি কোথাও। কিন্তু আমি সঠিক জায়গাটা এখনো হিসেব করে উঠতে পারিনি।”

হিসেব! হ্যাঁ, হিসেব কষাই আমার কাজ।

আমার সামনের প্যানেলে কম্পিউটারের বোতামের সার। ইন্ডিকেটর ল্যাম্প, আর মনিটর জুড়ে থাকা মেঘের ছবি। হ্যাঁ, আমি প্লটার। কোথায় নামব সেই সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব আমারই। এটাই আমার কাজ।

“নীচে কিছু একটা হচ্ছে!”

কম্পিউটারের পর্দায় মাঝে মাঝে ঝলসে উঠেছে পৃথিবীর বাদামী মাটি-কাদার ছবি। আমরা ঠিক ঝরনার জলের মতো মসৃণ গতিতে নেমে চলেছি ভূপৃষ্ঠের দিকে।

নীচে এবড়োখেবড়ো জমি। বিশাল এক গর্ত মাটির বুকে। আমি স্পিকারের ভলিউমটা বাড়িয়ে দিলাম। ছোটো কামরাটা গমগম করে উঠল জোরালো শব্দে। হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দে যেন কেঁপে উঠল কেবিনটা। বাতাসের শব্দ ছাপিয়ে ভেসে আসছিল মানুষের আর্তনাদ।

মানুষ? আমি তখনো জানতাম না মানুষ কী।

একটা রাস্তার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে রাস্তার ধারের গাছের আড়ালে কিছু মানুষকে ছোটাছুটি করতে দেখলাম। এক-দুই-তিন… পাঁচ.. সবকটাকে গুনতে পারিনি, তার আগেই ওরা লুকিয়ে পড়েছিল ঝোঁপের আড়ালে। সামনেই একটা বরফঢাকা পাতাহীন গাছের বন, একবারেই আমাদের জঙ্গলের মতো নয়।

পাতাঝরা অরণ্যের মাঝে ঘন সবুজরঙা কিছু কাঠামো। কিছু লোক নোংরা বরফের ওপর দিয়ে দৌড়চ্ছে, কিছু মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বরফের ওপর। আমি কম্পিউটারের একটা বোতামে চাপ দিলাম। সামনের পর্দার ছবির ঔজ্জ্বল্য বেড়ে ছবি খানিকটা পরিষ্কার হল।

ছুটতে থাকা লোকগুলোর পরনে নোংরা হয়ে যাওয়া সাদা জ্যাকেট, অনেকেরই জ্যাকেটের নিচের দিকটা ছিঁড়ে হাঁটুর কাছে ঝুলছে। ওখান থেকেই আর্তনাদের শব্দটা ভেসে আসছিল। সেই শব্দটা আরও জোরালো হয়েছে।

একটা ধূসর রঙের ফিতের মতো নদী দেখতে পেলাম। নদীর ধারে সবুজরঙা পোশাক পরা মানুষের জটলা। নদীর ওপর একটা সেতু। কিছু মানুষ সাপের মতো বুকে ভর দিয়ে এঁকেবেঁকে সেদিকে এগোচ্ছিল।

ওগুলো কী? কোনো গাড়ি? সম্ভবত তাই।

ওদের ছোটাছুটির কারণ বোঝার চেষ্টা করছিলাম। কিছু তো ঘটেছেই! আবার সেই চিৎকার গমগম করে উঠল কেবিনের স্পিকারে, “আহ…”

বরফের ওপর দিয়ে ছুটন্ত মানুষগুলোর হাতে লাঠির মতো কিছু ধরা। ওগুলো কি অস্ত্র? ওরা ওই লাঠিগুলো আকাশের দিকে তাক করছে। আমাদের স্পেসশিপকে টার্গেট করছে না তো?

ছাড়া ছাড়া হালকা ঠনঠন শব্দ ভেসে আসছে। ঠিক যেন আমাদের যানের খোলসের ওপর নুড়ি-পাথর আছড়ে পড়ছে।

“মনে হচ্ছে আমাদের যানে আঘাত লেগেছে।” বলে উঠল সহকারী চালক।

“মারাত্মক কিছু কি?”

“না না, সাংঘাতিক কিছু নয়। কতকগুলো সীসের টুকরো। আমরাও কি গুলি ছুড়ব?”

“কেন? আমরা তো ওদের কাজে কোনো নাক গলাতে আসিনি।”

“কী বিষয়ে নাক গলানোর কথা বলছেন?”

“যুদ্ধে।”

“যুদ্ধ! এরা কোন স্তরে আছে?”

“সম্ভবত মাঝারি প্রযুক্তির স্তরে।”

“কীসের ওপর ভিত্তি করে একথা বলছেন?”

“যন্ত্রের ওপর। বিশ্লেষক যন্ত্র ভুল করে না। মনে হচ্ছে আমরা এখানকার কোনো। অন্তঃগ্রহ যুদ্ধের সময়ে এসে পড়েছি।”

“কারা কাদের সঙ্গে লড়ছে?”

“নিজেদের ইতিহাসের কথা ভাবো। আমরাও আমাদের গ্রহে এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। এখন ঠিক করো কী করা উচিত। এইখানে নামা ঠিক হবে কি? মনে হয়

খুব একটা দেরি হয়ে যায়নি। এখনো যাত্রাপথ বদলানো যেতে পারে।”

“না, দেরি হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে তা আর সম্ভব নয়। যাত্রাপথ নতুন করে সাজাতে সময় নেবে।”

“কত সময় লাগবে?”

“বেশি নয়, দুটো চক্কর।”

আমি চালকদের আলোচনায় অংশ নিইনি। শুধু মন দিয়ে শুনে যাচ্ছিলাম। আমার কাজ শুধু কক্ষপথ, আর তার আবর্তনের হিসেব রেখে চালকদের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা। প্লটার হিসেবে আমার প্রয়োজন তখনই হয় যখন আমরা কোনো গ্রহের কাছে পৌঁছই। গ্রহে নামার আগে ফেরার পথের ছক কষে তা চালকের হাতে তুলে দিলেই আমার কাজ শেষ। চালক সেই ছকটা ঢুকিয়ে দেয় স্বয়ংক্রিয় চালকের যন্ত্রমস্তিষ্কে।

আমি চুপ করে দেখছিলাম নীচে হয়ে চলা ঘটনাগুলো। দেখছিলাম ঝলসে ওঠা আগুনের হলকা আর বরফ-কাদার ওপর দিয়ে ছুটে চলা মানুষের দল।

কেউ মুখ থুবড়ে পড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটছে, কেউবা আবার পড়েই থাকছে। পড়ে থাকছে অন্য কারো ওপরে, হাত থেকে ছিটকে যাচ্ছে অস্ত্র। কেউ বা অস্ত্র হাতেই পড়ে আছে। বরফের ওপর পড়ে ছটফট করতে থাকা অনেকেরই মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে।

পৃথিবীর মাটি দ্রুত উঠে আসছিল তলা থেকে সাদা, চারদিকে সাদা বরফের পাহাড়। খানিক বাদে সেই বরফের বুকে একটু ঝাঁকুনি খেয়ে সামান্য হড়কে দাঁড়িয়ে গেল

আমাদের যান।

অসাধারণ অবতরণ।

আমি অন্যদের দিকে তাকালাম। সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। বাইরের তুষার প্রান্তে কী হচ্ছে দলের বাকি কারো তা দেখার সময় নেই।

বাইরের মানুষগুলো হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে কোথাও।

“আমি একটু বাইরে যাচ্ছি ন্যাভিগেটর।”

“কেন?” সে আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকাল। এই গ্রহটা তার পছন্দ হয়নি।

“একটু কৌতূহল হচ্ছে।”

আমাদের গ্রহে প্রায় কেউই কৌতূহল দেখায় না। কারণ, কৌতূহল কখনোই কোনো উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ হতে পারে না।

“ঠিক আছে, যাও প্লটার, আমার কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু খুব সাবধান।”

আমি আমাদের যানের হ্যাঁচ খুলে বেরিয়ে এলাম। আমার পায়ের তলায় তাল তাল জমাট বাঁধা মাটি আর বরফের অসমান জমি। হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু শরীরে কোনো অস্বস্তি বোধ করছিলাম না। নিঃশ্বাস নিতে কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না। ঠিক যেন আমাদের গ্রহ। মিহি তুষারের দানা ঝরে পড়ছিল অনবরত। আমাদের গ্রহে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি যেরকম থাকে, অনেকটা ঠিক সেরকম। স্যাঁতসেঁতে আর উষ্ণ ঠেকে শরীরে। আমাদের গ্রহ এর থেকে অনেক অনেক ঠান্ডা। আমাদের গ্রহের অনেক জায়গাতে বরফই গলে না। এমনকি নিরক্ষরেখা অঞ্চলেও।

আমার ঠিক সামনে একটা গাছের ঝোঁপ। আমি খানিক দৌড়নোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু পড়ে গেলাম। হাতদুটোয় নোংরা লেগে গেল। বরফে মাখামাখি হয়ে গেল হাতদুটো। একটা সরু গাছের গুঁড়িতে হাত ঘষে পরিষ্কার করার চেষ্টা করলাম। গাছের নরম গুঁড়িটা কালচে আর সাদা ছালওয়ালা। ডালপালা মেলে ধরা গাছটায় একটাও পাতা বা কুঁড়ি নেই।

খানিক দূরে একটা লোক বরফে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। অনেক কষ্টে ওর শরীরটাকে ওলটালাম। শক্ত হয়ে যাওয়া শরীরে চোখের স্থির হয়ে থাকা মণিদুটো, তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।

হঠাৎ, পেছনে থাকা মহাকাশযানের দিকে তীক্ষ্ণ শিসের মতো শব্দ করে কিছু একটা ছুটে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেখান থেকে পরপর দুটো প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ জেগে উঠল। গাছের ঝাড়ের আড়াল সেই বিস্ফোরণের ধাক্কা থেকে আমাকে রক্ষা করতে পারল না। ছিটকে পড়লাম মৃত লোকটার পাশে। খানিক পর যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে উঠে বসলাম।

ছোটো থেকেই আমাদের কষ্ট সহ্য করার শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষা দেওয়া হয় হাসি কান্না প্রকাশ না করতে। নিজের অনুভূতিকে দমিয়ে রাখা তাই আমাদের রক্তে। নিঃশব্দে যে-কোনো পরিস্থিতির সামনে হতে আমরা তৈরি। কিন্তু এইরকম কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হবার শিক্ষা আমি পাইনি। তীক্ষ্ণ চিৎকার করে আমি ছুটতে শুরু করলাম।

প্রাণপণে ছুটে যাচ্ছিলাম আমি যেখানে আমার যানকে খানিক আগে ছেড়ে এসেছি। সেখানটা লক্ষ করে। দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে ছুটতেই বারবার হোঁচট খেয়ে পড়েছিলাম গাছপালায় ধাক্কা লেগে। আর তারপর ফের উঠে দাঁড়িয়ে মুখটা হাত দিয়ে মুছতে মুছতে ফের… আমার মুখে… কী লেগে আছে আমার মুখে? রক্ত, বরফ, অশ্রু? জানি না। মাথা কাজ করছিল না আমার। কারণ, পা দুটো তখন আমায় ছুটিয়ে আনতে আনতেই একেবারে হঠাৎ করে নিঃসাড় হয়ে গেছে। একটা বিরাট গর্তের কাছে এসে বজ্রাহতের মত থমকে দাঁড়িয়েছি আমি। ঐখানেই আমাদের মহাকাশযান নেমেছিল। মাত্রই কয়েক মিনিট আগে।

থমকে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিটা বোঝবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বোঝবার মতো কিছুই ছিল না। আঘাতটা আমার সব কিছু খুঁড়িয়ে দিয়েছিল। আমার মাতৃভূমি, আমার বন্ধু-পরিজন…

ন্যাভিগেটর ঠিকই বলেছিল। আমার কৌতূহল দেখানো উচিত ছিল না। আমার উচিত ছিল না এই অজানা গ্রহের মাটিতে একলা পা দেওয়া। মহাকাশযান ছেড়ে বেরিয়েছিলাম। তাই আমার বন্ধু-স্বজনদের মধ্যে কেবল আমি একলা বেঁচে গিয়েছি। একলা… একটা সম্পূর্ণ অচেনা গ্রহে… অভিশপ্ত নির্বাসনের জীবন…।

তবে সে নিয়ে বেশিক্ষণ ভাববার অবসর তখন আমার নেই। এখানে টিকে থাকতে নিজেকে তৈরি করতে হবে। অসাড় আঙুলগুলো দিয়ে কোনোমতে শরীর থেকে মহাকাশচারীর পোশাকটা খুলে বরফের গভীরে সেটাকে চাপা দিয়ে রাখলাম আমি। আমার ভিনগ্রহের অস্তিত্বের শেষ প্রমাণ। এইবার খানিক আগে দেখা সে মৃত সৈনিকের কাছে গিয়ে তার পোশাক খুলে নিলাম। খাকি রঙের প্যান্টের কোমরে একটা বেল্ট বাঁধা। একই রঙের কোটের বোতামগুলো পিতলের। ফিতেহীন জুতোজোড়া অস্বস্তিকর রকমের উঁচু ও রদ্দি মালে তৈরি। কোটের তলায় পরে থাকা লোকটার সাদা জামাটা বরং অনেক পরিষ্কার ও নরম। লোকটার খাকি প্যান্টের তলায় আরও একটা গোড়ালির দিকে লেস দেওয়া সাদা মোলায়েম প্যান্ট পরা ছিল। আমি মৃত লোকটার সব পোশাকগুলো একে একে পরে ফেললাম।

আমাকে এখন যে করেই হোক আমাদের অবতরণ স্থান থেকে দূরে সরে যেতে হবে। ধরা পড়লে ওরা প্রশ্ন করতে ছাড়বে না। ওরা আমাদের আকাশযান দেখেছে ও তাতে গুলি ছুঁড়েছে।

বরফের ওপর সবুজ গাড়িগুলোর চলার শুয়োপোকার মতো দাগ ধরে আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাঁটতে লাগলাম। বহুদূর থেকে ভেসে আসছে মানুষের গলার চিৎকার আর ছুটোছুটির শব্দ। এই গ্রহের প্রাণীগুলো দেখতে হুবহু আমাদেরই মতো। ওদের কাছে। গেলে নিশ্চয়ই আশ্রয় পাওয়া যাবে। সুযোগটা নেওয়া উচিত।

কিন্তু নিজের পায়ে হেঁটে তাদের কাছে যাওয়া আর হল না আমার। কয়েক পা এগোতেই শিসের মতো একটা শব্দ ভেসে এসে আমার সামনে আগুনের গোলা হয়ে আছড়ে পড়ল। আমার গায়ে সরাসরি আঘাত না লাগলেও আমি ছিটকে পড়লাম। চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেল…

.

৩.

আমার চোখেমুখে কেউ জলের ছিটে দিচ্ছিল। চোখ খুলে তাকাতেই কুয়াশার মধ্যে দিয়ে একটা পরিচিত মুখ দেখতে পেলাম।

“চোখ খুলুন প্রফেসর, প্লিজ চোখ খুলুন। হা ঈশ্বর, আর সহ্য করতে পারছি না।” কেউ আমার মাথাটা দু-হাত দিয়ে খানিক উঁচু করে রেখেছিল। আমি জানতাম ওটা কার হাত। কিন্তু তখনও আমার আতঙ্কের ঘোর কাটেনি। খানিক আগে দেখা দুঃস্বপ্নটা তখনও পুরোপুরি ছেড়ে যায়নি আমায়। কিন্তু… ওটা কি সত্যিই স্বপ্ন ছিল? না। স্বপ্ন নয়। আমি নিশ্চিত, ও আমার অতীত জীবনের আরো একটা ঝলক। আমার নিজের কাছেই অধরা থেকে যাওয়া নিজের বেশ কিছু রহস্যকে ব্যাখ্যা করে দিয়েছে এই ঝলকটা। প্রফেসর মার্লে হিসেবে আমার পুনর্জন্মের রহস্য এবার আমার কাছে পরিষ্কার। প্রফেসর মার্লের কোনো অস্তিত্ত্ব ছিল না এই পৃথিবীতে। ছিল একজন প্লটার। নামহীন, আশ্রয়হীন, মাতৃভূমি-চ্যুত এক অন্যগ্রহের বাসিন্দা।

সেই বিস্ফোরণের পর স্মৃতিহীন হয়ে জেগে ওঠবার সময়টার মতই, এই মুহূর্তেও আমি আমার নিজের গ্রহ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতাম না। কখনো কিছু টুকরো টুকরো আলাপ, ধোঁয়াটে কিছু ছবি আর একটা নিষ্ঠুর গ্রহের কিছু অস্পষ্ট আভাসের স্মৃতি থেকে থেকে আমি আমার অতীত সম্পর্কে একটা ধারণা পাবার চেষ্টা করছিলাম মাত্র। অতীতের সেই জগৎটা আমার থেকে বহুদূরে। ধারণাতীত, অজানা কোনো গ্রহ।

কিন্তু আমি কখনোই সেই গ্রহে আর ফেরার তাগিদ অনুভব করিনি। এই পৃথিবীতে বাস করতে করতে আমি অতিথি থেকে এই গ্রহেরই সন্তান হয়ে গিয়েছি। নিজেকে সঁপেছি পৃথিবীর সেবায়। আমার স্মৃতি, আমার মেধা সব আমার পৃথিবীর ভাইদের প্রতি উজাড় করে দিয়েছি। যদিও মাঝে মাঝে আমাদের মধ্যে না-দেখা লড়াই চলে। কিন্তু আমি সবাইকে শুধু ভালোবাসতেই শিখেছি। যদিও অনেক সময় এই ভালোবাসা প্রতিদানহীনই হয়েছে।

না, আমি সময়ের আগে ছুটিনি। আমি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি হইনি। শুধু একজন অসাধারণ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন পণ্ডিত হয়েই থেকেছি। কিন্তু যদি আমার অতীত ফিরে আসত? আমি যদি আবার প্লটার হয়ে যেতাম? আমি আমার প্লটার জীবনে অর্জিত জ্ঞান ওদের বিলিয়ে দিতাম। ‘প্রতিভাধারী’ তকমা অর্জনের কোনো ইচ্ছেই ছিল না। না বর্তমান জীবনে, না মৃত্যুর পরে। আমি শুধু জ্ঞান অর্জন করতে চেয়েছি, আর এই জ্ঞান। আমার ছাত্রদের বিলিয়ে দিতে চেয়েছি। বিশেষ করে ইনা বা ভিতালির মধ্যে।

আমি ওর ফ্যাকাশে আতঙ্কিত মুখটা দেখেছিলাম। দেখেছিলাম সেই ভয়ার্ত মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা।

“ঘাবড়িও না ইনা, আমার সব হাড় আস্ত আছে।”

“চলুন আপনাকে ধরে আগে গাড়িতে নিয়ে তুলি। সব ঠিকই আছে মনে হচ্ছে। শুধু গাড়িটা খানিক তুবড়েছে।”

“অনেক ধন্যবাদ ডিয়ার।” কোনোরকমে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম।

“আমি হেঁটে যেতে পারব। বেঁচে তো আছি! সেটাই বড়ো কথা।”

.

নোটবই-৩

১.

ব্যাপারটা সাধারণ। আমাদের ল্যাবরেটরির সে বছরের বাজেটের অনুমোদন ওপরওয়ালাদের কাছ থেকে তখনো আসেনি। তবে সেটা এমন কিছু ভয়াবহ ব্যাপার নয় আদৌ। দু-একদিন বা এক সপ্তাহের মধ্যে বাজেট পাস হয়েই যেত। সেজন্যে তাড়াও তেমন কিছু একটা ছিল না। কিন্তু কোনো কারণে বাজেট পাস হওয়ায় আমি খানিক অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। ঠিক বাচ্চাদের মতো। কী হবে! কী হবে! অনুমোদন পাবে তো? সুস্থির হয়ে কোনো কাজই করতে পারছিলাম না। এখানকার লোকজনের স্বভাবটাই এমন। সবকিছুতেই একটা ঘোঁট পাকিয়ে তোলা চাই ওদের।

আবার ‘ওদের!’ এই ‘ওদের,’ ‘ওরা’ শব্দগুলো মাঝেমধ্যেই আমার মনের গভীর থেকে হঠাৎ করেই লাফ মেরে বেরিয়ে আসে। ঠিক যেন পায়ের পেছনে লুকিয়ে থাকা বিড়াল-বাচ্চা। আচমকা পায়ে মুখ ঘষে ভয় ধরিয়ে দেয়।

কিন্তু ‘ওরা’ মানে কারা? এ গ্রহের সাধারণ মানুষজন? আমিও তো একজন সাধারণ মানুষই। আমার আচরণ, চিন্তাভাবনা… আমি তো পৃথিবীবাসী, কোনো ভিনগ্রহের জীব নই! তাহলে লোকজনের ব্যাপারে ভাবতে গেলেই হঠাৎ হঠাৎ এই ‘ওরা’ ব্যাপারটা চলে আসে কোত্থেকে?

কথায় বলে, অতীত কাউকে ছেড়ে দেয় না। আমি সবসময় আমার অতীত থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি, কিন্তু আমার হৃদয়হীন অতীত আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। অতীতের আবছায়া জগত আর বর্তমানের চেনা দুনিয়া, এই দুই আলাদা জগতের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছি যেন আমি। কথাটা হয়ত অদ্ভুত শোনাবে খানিক, কিন্তু আমি সত্যিসত্যিই গুলিয়ে ফেলছি আজকাল, আসলে আমি এই দুইয়ের মধ্যে কোন জগতের বাসিন্দা।

তবে ভাগ্য ভালো, আমার ইচ্ছেশক্তিটা খুব জোরালো। সে-ই আমায় ঠিক রাস্তায় ধরে রাখে। বলে, ‘যেখানে আছি, যার আলো হাওয়া ভোগ করছি, চিন্তা করছি, বেঁচে আছি… সেটাই আমার জগৎ। পুরোনো দুনিয়াটাকে নিজের বলে দাবি করবার আর পথ নেই কোনো।

অতীত যেন টুকরো টুকরো স্মৃতির ভাঙাচোরা খণ্ডে ভরা একটা ক্যালাইডোস্কোপ। আমার স্মৃতি ও বিস্মৃতির অন্ধকারের গভীরে এলোমেলো ছড়ানো। স্থানকালের নির্দিষ্ট অক্ষের বাইরে। কখনো কি ওই রঙিন টুকরোগুলোর সবক’ টাকে হাতের মুঠোয় আর ধরতে পারব আমি? জানি না। এখন অবধি শুধু একটা টুকরোকেই ঠিকমত নাগালে আনতে পেরেছি, একটা শব্দ। বজ্রাক্ষরে লেখা। ‘আগন্তুক!

“আগন্তুক! প্রফেসর, তার মানে বর্হিবিশ্বের প্রাণী পৃথিবীতে এসেছিল। কী বলেন?”

“হ্যাঁ, তার মানে ওইটেই হয়। কিন্তু আপনারা সাংবাদিকরা একে আবার কাগজের হেডলাইন বানাতে যাবেন না। কেন না এখনও কেউ এদের দেখা পায়নি।”

“আপনি নিজে কী, প্রফেসর?”

“আমি আবার কী? ক্ষ্যাপাটে বুড়ো এক মাস্টার, যার ডিপার্টমেন্টের বাজেট এখনও পাশ হয়নি। ওইসব এলিয়েন-টেলিয়েন নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। আমার মাথায় খালি একটাই চিন্তা, আমার প্রোজেক্টটা ভালোয় ভালোয় শেষ হোক।”

***

না, এধরনের কোনো সাক্ষাৎকার আদপেই ঘটেনি। ঘটবেও না। আচ্ছা এমন একটা ইনটারভিউ যদি সত্যিই হতো? আমার কথা শুনে ইনা কী বলত? কী আর বলবে? মাঝেমাঝেই আমার কথাবার্তা শুনে যা বলে সেটাই, “পাগল নাকি?”

নাঃ। আমি পাগল টাগল নই। শুধু একটু ক্ষুধার্ত। আমি জানি, একবাটি ওট আর আমার সেই নিরিমিষ খাবার নিয়ে ঠিসিঠাট্টা করবার জন্য একগুচ্ছের পণ্ডিত আমার অপেক্ষায় আছে।

কে জানে আমার এই নিরামিষ খাবার কারণ কী। এই অভ্যাস সম্ভবত আমার এখানে জন্মায়নি। যে গ্রহ থেকে এখানে এসেছিলাম সেখান থেকেই নিরামিষ খাবারের অভ্যাস নিয়ে এসেছিলাম। আচ্ছা, আমার ফেলে আসা গ্রহের সব বাসিন্দারাই নিরামিষাশী? নাকি এখানকার মতই, সেখানেও কেবল অল্প কিছু পাগলাটে লোক ঘাসপাতা খায়? কে জানে! তবে সেটা না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। হলে তো ইনার কথার জবাবে আমাকে সায় দিতে হবে!

***

“প্রফেসর মার্লে, আচ্ছা বলুন তো ড্যান্ডেলিয়ন না ডেইজি কোনটায় ক্যালরি বেশি? ক্যান্টিনে এসে বসতেই এক পণ্ডিত এসে চোখ মেরে জিজ্ঞেস করল।

“জানি না। এসব কোনোদিন চেখে দেখিনি। খানিক ওটমিল, জেলি আর দই পাব?”

“আহা অবশ্যই অবশ্যই। জানেন কি প্রফেসর, আমেরিকাতে একটা আলাদা গোষ্ঠী আছে নিরামিষাশীদের?”

“হ্যাঁ জানি, আমি ওই গ্রুপের একজন অনারারি মেম্বার। সার্টিফিকেট আছে। দেখবেন?”

সারাটা দিন বেশ ঝামেলায় কেটেছে আজ। ক্লান্ত ছিলাম। নার্ভাসও লাগছিল। দাঁড়াতে গেলে টলছিলাম একটু একটু। বুঝতে পারছিলাম বুড়ো হয়ে পড়ছি। বাড়ি গিয়ে একটা লম্বা ঘুম দেয়া খুব জরুরি আমার। চোখের সামনে কুয়াশার একটা পর্দা নেমে আসছিল আমার। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল সবকিছু।

“আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে প্রফেসর? চলুন আপনাকে বাড়ি নিয়ে যাই।”

“না না, আমি ঠিক আছি। একুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেই সুস্থ হয়ে যাব।”

চোখের সামনের কুয়াশাটা পাক খেয়ে ঘন হয়ে উঠছিল আমার। চারপাশে সবকিছু দুলছিল। যেন ঘন মেঘের ভেতর দিয়ে একটা প্লেনে চেপে উড়ে যাচ্ছি। হালকা একটা দুলুনি শরীরে। চারপাশের কিছুই চোখে পড়ে না। আস্তে আস্তে চারপাশের সমস্ত শব্দ মৃদু হয়ে এল। প্রথমে মিলিয়ে গেল ক্যান্টিনের গুণগুণ শব্দ। তারপর একে একে চারপাশের টেবিলগুলো থেকে কথাবার্তা আর হাসির আওয়াজ। আর তারপর হঠাৎ সেই আঁধার ঘেরা, দোলায়মান নৈঃশব্দের ভেতর থেকে একটা কথার টুকরো ছিটকে এল আমার কানে।

“একটা বই পড়ছি বুঝলে? দুর্দান্ত বই। ছাড়তে পারছি না। বইটার নাম ‘হেড হান্টার্স।’ তোমরা কেউ পড়েছ বইটা?”

আমি উত্তরটা শুনতে পাইনি। কিন্তু আমার চোখের সামনে ঝলসে উঠেছিল একটি দৃশ্য। পরিষ্কার। ঠিক ‘ইজভেস্তিয়া’র মস্কোর অফিসগুলোর মাথার নিয়ন আলোর বোর্ডগুলোর মত ঝলমলে, স্পষ্ট। কিন্তু দেখা দিয়েই হারিয়ে গিয়েছিল সেটা। তারপর দেখেছিলাম গভীর নীলাভ অন্ধকারের বুক থেকে বিশাল বড়ো, হলদেটে কিছু একটা ভেসে উঠছে। সমুদ্র?

.

২.

“জঙ্গল এসে গেছে। এখানেই নামব আমরা।”

মেঘের গণ্ডি থেকে নেমে এসে দিগন্তবিস্তৃত জঙ্গলের ওপর চক্কর খেতে লাগল আমাদের হেলিকপ্টারটা।

“এখানেই কোথাও হবে জায়গাটা।”

“কী করে বুঝলে?”

“মেমোরি ইউনিটটা অন্তত এযাত্রা ঠিকঠাক কাজ করেছে হে। এখানেই এসেছিলাম শেষবার।”

আমরা দশজন আছি হেলিকপ্টারে। প্রত্যেকের পরনে সবজে উর্দি। সবার মাথায় স্বচ্ছ ভাইসর লাগানো হেলমেট। হাতের অস্ত্রগুলো আকারে অনেকটা পৃথিবীর অস্ত্রের মতো, তবে তার থেকে অনেক শক্তিশালী। নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদ করতে পারে। মুশকিলটা হল আমরা যাদের ধরতে এসেছি তাদের কাছেও ঠিক এরকমই অস্ত্র আছে। ওরা অস্ত্রগুলো জুটিয়েছে এক শিকারির কাছ থেকে। এখন কারা আগে কাদের ধরে সেটাই দেখার। হয় মারো, নয় মরো।

“লোকগুলো শয়তানের মত চালাক হয়ে উঠেছে।”

“ওদের কাছ আর কী আশা করো? এদের জান্তব ইন্সটিঙ্কটগুলো ফিরে এসেছে। ওটাই এদের আত্মরক্ষার অস্ত্র।”

“ওদের স্বভাবটা এরকম হল কী করে?”

“কন্ডিশনড রিফ্লেক্স হে। নেহাত বাঁচবার তাগিদ।”

“আরে সেটা তো সবাই চায়। আমরা চাই না?” কথাগুলো আমরা কেউই মজা করার জন্য বলছিলাম না। তাই একে অন্যের কথা শুনে আমরা কেউ হেসে ওঠিনি। একটা ভয়ংকর লড়াইয়ে নামার আগে আকাশ থেকে আমরা সবাই শিকারি বাজের মতো চারপাশটা দেখছিলাম। আমরা ঠিক সৈনিক না হলেও কাজটা অনেকটা সৈনিকেরই মতো। আমরা একটি পুলিশের দল, যাদের কাজ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের উত্তর অংশ নিয়ন্ত্রণ করা।

আমরা নামছি। এখান থেকে পায়ে হেঁটে এগোতে হবে আমাদের। যে জায়গায় ওই শয়তানের দল ঘাপটি মেরে আছে বলে খবর, সেটা এখান থেকে খুব একটা দূর হবে না।

হেলিকপ্টারটা মাটিতে নেমে খানিক ঝাঁকুনি খেতে খেতে গড়িয়ে কতকগুলো বড়ো গাছের ছায়ার নীচে দাঁড়িয়ে গেল। গাছের গুঁড়িগুলো এমন চকচক করছিল যে যেন মনে হচ্ছিল কেউ ধরে ধরে এক-একটাকে পালিশ করেছে। গাছের মাথাগুলো রাজমুকুটের মতো ঝকঝক করছিল। ওতে সূর্যের আলোর বেশিরভাগটাই আটকে গেলেও পাতার ফাঁক দিয়ে খানিক সূর্যের আলো যা মাটিতে পৌঁছচ্ছিল তাতে যথেষ্ট তাপ। আমরা রয়েছি দক্ষিণ গোলার্ধে। ঘাসগুলো কার্পেটের মতো নরম। জঙ্গলের খানিক ভেতরে, বড়ো গাছের নীচের ঘাসগুলোর আকৃতি আবার অন্যরকম। অনেক লম্বা ওগুলো। একেবেঁকে ছড়িয়ে গিয়ে গাছের শেকড় আর ঝরা পাতাগুলো জড়াজড়ি করে ছবি এঁকে রেখেছে। যেন। নানা রঙের ছোঁয়ায় এ এক অদ্ভুত বাগান। ঘাসের ঝোঁপের মাঝে ইতিউতি উঁকি মারছিল বাদামি মাটি। ঘাস আর মাটিকে মাকড়শার জালের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে গাছের শিকড়।

“হেলিকপ্টার পাহারা দিতে কাকে রেখে যাব?”

“কাউকে রাখার দরকার নেই। ভয়ের কী আছে? ওরা এটা ধ্বংস করতে পারবে না।”

“কিন্তু এটাকে নিয়ে তো উড়ে যেতে পারে?”

“ওরা এতদিনে হেলিকপ্টার ওড়ানোর কায়দা ভুলে গেছে।”

“সত্যি? ভেবে দেখো। অস্ত্রের ব্যবহার এরা ভোলেনি কিন্তু!”

“ভোলেনি, কারণ গুলি চালানোটা ওদের নিয়মিত রপ্ত করতে হয় নিজেদের রক্ষা করার জন্য।”

আমি ছিলাম দলের নতুন সদস্য। মনে হল একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। তাই জিজ্ঞেস করলাম, “আমরা এই জঙ্গল থেকে ওদের তাড়াতে চাইছি কেন? ওরা কি কিছু ক্ষতি করছে?”

“আরে সভ্যতার চাপে প্রায় সব জঙ্গলই তো ধ্বংস হয়ে গেছে। টিকে থাকা অবশিষ্ট এই ঘাস আর গাছগুলোকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। রাসায়নিক বস্তু থেকে বানানো খাবার খেয়ে খেয়ে হাজারো রোগের জন্ম হচ্ছে। এই ঘাস, গাছের পাতা আর শেকড় থেকে যে খাবার তৈরি হয় সেটাই শুধু প্রাকৃতিক। এগুলোই পারে আমাদের সুস্থ রাখতে। আমাদের মতো ওদেরও ঠিক একই খাদ্য চাই যা আমরা খাই। তাই ওদের নজর এই জঙ্গলের দিকে।”

“কেন?”

সবাই হেসে উঠল।

“নইলে তো একে অন্যকে মেরে খেতে হয়! মানে ধরো, আর কোনো খাবার নেই। তাহলে বেঁচে থাকতে লোকজনকে একে অন্যের মাংস খেতে হবে। কিন্তু শুধু মাংস মানে প্রোটিন খেয়ে তো আর বাঁচা যায় না, শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিনের জন্য শাকসবজিরও দরকার। তাছাড়া ঝোল ছাড়া তোমার মাংস খেতে কি ভালো লাগবে?”

একে অন্যের মাংস খাওয়া সরকার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পুরোপুরি নিষিদ্ধ, কিন্তু ওর বাইরের রিজার্ভেশান এলাকাগুলোয় সবই ওই কাগজে কলমে। কেউই এসব আইনের বুলি মানা হচ্ছে কি না দেখতে যায় না। নজরদারি করাটা অসম্ভব। অসহ্য গরম, ধুলো আর লাইলাক রঙের পাহাড় চারপাশে। হাজারো সমস্যা। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে মানুষ শহর ছেড়ে পাগলের মতো ছুটে যাচ্ছে তার আওতার বাইরের রুক্ষ এলাকাগুলোতে। বিশেষ করে যারা শহুরে পরিবেশে আর নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না তারা। আর, এই শহরভীতি রোগটা তাদেরই ধরেছে যারা শারীরিকভাবে শক্তপোক্ত। এরাই পালিয়ে এসে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এইসব এলাকায়। নিজেদের সংখ্যা বাড়াচ্ছে আর বেঁচেও থাকছে। পুরোনোকালের লুপ্ত জন্তুদের মত এরা একে অন্যকে শিকার করে।

“না! এদের আমরা মারব না। এমনিতেই মরবে এরা।” কাউন্সিল এই সিদ্ধান্তই নিয়েছিল। কাজেই আমরাও এদের মারি না। কেবল আমাদের হাতে থাকা জঙ্গল

এলাকাগুলোয় এদের কোনো দল এসে ঢুকলে তাড়া করে এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে। বের দেওয়া হয়। সে-রকম একটা অভিযানেই আমাদের এখানে আসা।

জঙ্গলের শুকনো ঘাসের ওপর পা দিয়ে মাড়ানোর ছাপ স্পষ্ট। ঘাসগুলো পায়ের চাপে এমনভাবে নুয়ে গেছে যে ওরা আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। পায়ের চাপে শুয়ে পড়া ঘাসের সার মাথা ঝুঁকিয়ে এগিয়ে গেছে জঙ্গলের ঘোর অন্ধকারের নীচে। আর ওখানেই লুকিয়ে আছে বিপদ।

“ওরা যে-কোনো জায়গায় লুকিয়ে থাকতে পারে।” বলে উঠলেন ইন্সপেক্টর। “ওরা ঝোঁপের আড়ালে এমন নিঃসাড়ে ঘাপটি মেরে থাকতে পারে যে, একটা পাতাও নড়বে না। ওরা গাছের মাথায় লুকিয়ে থাকলেও টের পাবে না। সুযোগ পেলেই বোঝার কোনো সুযোগ না দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের ওপর।”

ইন্সপেক্টর আর তাঁর দলের কাছে পলাতকদের তাড়া করে বেড়ানোটা একটা পেশা। আর এটা সেই পেশাদারিত্ব প্রমাণের এক উত্তেজনাময় মুহূর্ত। কিন্তু আমি ওদের মধ্যে কেন? শুধু কৌতূহলের বশে!

“এই কৌতূহল দেখানোটা তোমার সবচেয়ে বড় বোকামি।” অষ্টা অনেক আগেই আমাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, “এই গলদটা শোধরানো দরকার।”

কিন্তু আমি আমার এই কৌতূহলের গলদ শুধরাতে চাইনি। আমার মনে হয় কৌতূহলই বেঁচে থাকার রসদ।

মাটিতে নেমেই আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। কান পেতে শোনার চেষ্টা করছিলাম কোনো পাতা মাড়ানোর শব্দ শোনা যায় কি না। গাছের ফাঁক দিয়ে নড়াচড়ার চিহ্ন দেখার চেষ্টা করছিলাম। মাথার সামনে ঝুলতে থাকা গাছের ডাল অতি সন্তর্পণে সরিয়ে নুইয়ে থাকা ঘাস লক্ষ করে এগোচ্ছিলাম। প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছিল এই বুঝি বেজে উঠল শিসের শব্দ, গাছের ওপর থেকে ঘাসে বোনা দড়ির ফাঁস নিঃশব্দে নেমে এল আমাদের গলা লক্ষ করে।

“সবাই কাছাকাছি থাকো।” ইন্সপেক্টর চাপা গলায় বলে উঠলেন। “আঙুলগুলো যেন সবসময় বোম ছুঁয়ে থাকে।”

বুঝলাম উনি আমাদের হাতিয়ারের কথা বলছেন। আমাদের এই বন্দুকের এক-একটা বোতামে চাপ দিলে বেরিয়ে আসে এক-একটি রশ্মি। আর এই রশ্মি মুহূর্তে নিয়ে আসে বেদনাহীন মৃত্যু। কিন্তু ওরাই যদি আমাদের আগে দেখে ফেলে, তাহলে?

অষ্টা আগেই আভাস দিয়েছিল, “ওরাই আমাদের দলের খোঁজ আগে পাবে, তারপর ওরা তাই করবে যেটা আমরা ওদের আগে খোঁজ পেলে করতাম। হয়তো তার থেকেও আরও মারাত্মক কিছু করবে। অনেকদিন ধরে ওরা এই জঙ্গলে এসে ঢুকেছে, জঙ্গলটা ওরা আমাদের থেকে অনেক ভালো চেনে।”

সম্ভবত এই জঙ্গলটাকে কেউই ভালো করে জানে না। ঠিক ততটুকুই জানে, যতটুকু খাবার ও শিকার করতে গিয়ে চেনা সম্ভব। আমারাও জঙ্গলটা জানতে খুব একটা উৎসাহ দেখাইনি। জঙ্গল থেকে পাওয়া জিনিসগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট থেকেছি।

নিঝুম রহস্যময় জঙ্গলটা জনশূন্য। পায়ের নিচে নরম ঘাস থাকায় আমাদের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। সবাই ঘামে ভেজা হাত দিয়ে যে যার অস্ত্রগুলো আঁকড়ে ছিলাম।

“ওরা যদি পালিয়ে যায়,” বললেন ইন্সপেক্টর “তাহলে ওদের খুঁজে বের করে তাড়াতে তাড়াতে অনেক লোকের প্রাণ যাবে।”

তখনও পর্যন্ত আমাদের দু-পক্ষের কারোই কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তার থেকেও বড়ো কথা ওরা আদপেই এখানে আছে কি না আমরা নিশ্চিন্ত নই। না কোনো শব্দ, না কোনো নড়াচড়ার আভাস। তাহলে কি ওরা অন্য কোথাও পালিয়ে গেছে? বাতাসও স্তব্ধ হয়ে আছে। পুরো জঙ্গলটা যেন এক বিশাল নিস্তব্ধ পরিত্যক্ত হলঘর। বিশাল গাছগুলো যেন ওর ছাদ, আর গুঁড়িগুলো এক-একটা থাম। বছরের পর বছর ধরে একাকী চুপটি করে টিকে আছে।

আমাদের দলের যিনি সবার আগে ছিলেন, তিনি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন।

“কী হল?”

“মনে হচ্ছে আমরা জায়গাটা পার হয়ে এসেছি।”

“ঠিক বলছ তো?”

“হ্যাঁ, আমরা অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছি।”

“ভুল দিকে আসিনি তো?”

“না, না। তা নয়।”

“তার মানে ওরা এখান থেকে সরে পড়েছে।”

“মনে হয় না। ওরা এখানেই আছে এবং আশেপাশেই লুকিয়ে আছে।”

“কী বলতে চাইছ?”

“ওরা গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকলে খুঁজে পাবে না। ক্যামোফ্লেজিংয়ে ওদের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। আমরা সেই ক্ষমতাটা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু ওরা সেই দক্ষতাটা শুধু ধরেই রাখেনি বরং আরও পটু হয়ে উঠেছে।”

“ওরা যে-কোনো জায়গায় লুকিয়ে থাকতে পারে। আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।”

“কিন্তু ওরা যদি আগে আমাদের হদিশ পায়?”

যদিও প্রশ্নটা খানিক বোকা বোকা ধরনের ছিল, কিন্তু ঝানু পুলিশ কর্তাটি উত্তর দেবার আগেই একটা কালো কিছু বাতাসে ঝলসে উঠল। একটা আর্ত চিৎকার করে মাটিতে পড়ে নিঃসাড় হয়ে গেলেন উনি। ফালা হয়ে যাওয়া গলা থেকে রক্তের লাল স্রোত বেরিয়ে এল।

“মাটিতে শুয়ে পড়ো।” কেউ একটা চাপা গলায় বলে উঠল।

আমি একটা গাছের গুঁড়ির পেছনে মাটিতে লেপটে গাছটার শিকড়ে গালটা চেপে রাখলাম। মনে পড়ে গেল অষ্টার সেই ছাড়া ছাড়া কথাগুলো, “তুমি এর আগে কখনো মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখোনি। মৃত্যুকে যেরকম বলে জানো, আসলে তা মোটেই সেরকম নয়। তাই মৃতের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে না থাকাই ভালো।”

আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলাম না। সহকর্মীর প্রাণহীন দেহটার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম খানিক। দেহটা ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নামতে নামতে একটা গাছের শিকড়ে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে উঠে হারিয়ে গেল চোখের আড়ালে।

এটাও কি একটা অদ্ভুত রহস্যময় কল্পনা ছিল?

না, ছিল না। ওরা ছিল। আমি ওদের দেখতে পেয়েছিলাম, নগ্ন বাদামি শরীর। লম্বা চুল, আর দাড়িভর্তি মুখ। খানিক লতাপাতা কোমরে জড়ানো। ওরা আমাদের অস্ত্রের নাগালের বাইরে গাছের গুঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে ছিল। আমাদের উচিত ছিল ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে ওদের আরও কাছে আসতে দেয়া। কিন্তু আমাদের দলের একজন অধৈর্য হয়ে তাঁর রশ্মি বন্দুকের বোতামে চাপ দিল। গাছের পাশ দিয়ে রশ্মিরেখা ঝলসে উঠল। সামনে থাকা কয়েকটা গাছের গুঁড়ি নিঃশব্দে দো-ফালা হয়ে লতাপাতার বাঁধনে আটকে ঝুলতে থাকল শুন্যে। মাথা উঁচু করে থাকা অন্য গাছগুলো কেটে যাওয়া গাছগুলোর মাথাকে আকাশের দিকেই ধরে রাখল।

এত বড়ো একটা ঘটনা ঘটল, অথচ জঙ্গলে তার কোনো রেশ টের পাওয়া গেল না। ঠিক একই নিস্তব্ধতা টিকে রইল। যেন কিছুই হয়নি। গভীর নিস্তব্ধতা গায়ে মেখে জঙ্গল একইভাবে দাঁড়িয়ে।

হঠাৎ একটা তীব্র চিৎকার ভেঙে দিল জঙ্গলের নিস্তব্ধতা। লম্বা একটা শ্বাস টানার শব্দ আচমকাই শুরু হয়ে শেষ হয়ে গেল। টের পেলাম খানিক আগে বন্দুক থেকে রশ্মি ছোঁড়া সহযোদ্ধাটি আর বেঁচে নেই।

আমরা বোকার মতো কোনো আড়াল না নিয়েই ছুটতে লাগলাম। সবার সঙ্গে আমিও ছুটেছিলাম। আমার মুখ ঘাম আর চোখের জলে মাখামাখি হয়ে ছিল। ফাঁদে পড়া বুনো জন্তুর মতো আমরা ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। ঝানু শিকারির দল আমাদের ঘিরে রেখেছে। পালাবার পথ নেই।

আচমকা মাথার পিছনে একটা আঘাত পেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লাম মাটিতে। প্রায় অচেতন হয়ে গেলাম সঙ্গে সঙ্গে। আমার ওপর ঝুঁকে পড়ে কেউ কথা বলে উঠল। আর এই গলার আওয়াজটা আমার সঙ্গীদের কারো ছিল না।

“এটাকে নিয়ে কী করব? এখনও বেঁচে আছে।”

“চলো ওকে গাড়িতে নিয়ে তুলি।”

“মেরে ফেললেই তো ল্যাটা চুকে যায়!”

“ঘাবড়াচ্ছ কেন? ওদের চারজন খতম। একে বাঁচিয়ে রাখলে ওদের খানিক ঠেকিয়ে রাখা যাবে।”

“তাহলে?”

“তাহলে আবার কী? ভাগব এখান থেকে। এটা ওদের অঞ্চল, ওদের জঙ্গল। আমরা যদি ওদের একজনকে জ্যান্ত ছেড়ে দিই তাহলে ওরা মনে করবে আমরা এই জঙ্গল ছেড়ে যেতে রাজি। এটা একটা ট্রিক, বুঝলে?”

***

ওরা আমাকে তুলে নিয়ে এগোতে লাগল। আমি দুলতে দুলতে টের পাচ্ছিলাম আমার মাথার ওপরকার ঘন সবুজ চাঁদোয়া ধীরে ধীরে আবছা হয়ে আসছে। আমার দৃষ্টি ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছ। জানালার কাঁচের ওপর দিয়ে অবিশ্রান্ত ঝরে চলা বৃষ্টির জলের মধ্যে দিয়ে আবছায়া কিছু দেখার মতো দেখার চেষ্টা করছি। অস্পষ্ট দৃষ্টির মতো আমার কানে এল ছাড়া ছাড়া কিছু কথা। গলার আওয়াজ একেবারে নতুন।

“আমাদের অ্যাম্বুলেন্স ডাকা উচিত।”

“কেন? এর আগেও তো এরকম কত নিয়ে গিয়েছি। গাড়িতে নিয়ে যাওয়াটাই ভালো। উরির গাড়ি আছে।”

“ভলোকভকে ডাকব?”

“না না, ওর থেকে ইনাকে ডাকা ভালো।”

এক, দুই… এক, দুই… ঠিক বাচ্চাদের দোলানোর মতো তালে তালে ওরা আমাকে দুলিয়ে নিয়ে চলেছে। কিন্তু নিয়ে চলেছে কোথায়? আমি আছিই বা কোথায়?

আমার চেতনা এক জগৎ থেকে আরেক জগতে গোঁত্তা খাচ্ছিল। এক, দুই.. এক, দুই… ঠিক যেন ঘড়ির পেণ্ডুলাম। লম্বা লাঠির তলায় একটা ছোট্ট গোলক। কাজই হচ্ছে এ-প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দোল খেয়ে যাওয়া। মৃদু হিসেব করা দুলুনি। মনের আনাগোনা চলছে জগতের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। যেন একটা অতিকায় সমুদ্রনীল ঘরের মাঝখানে ঝুলে থাকা আমিএক পেণ্ডুলাম। দোল খেয়ে চলেছি তার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে… অতীত… বর্তমান…অতীত…

.

৩.

অর্থাৎ ঝটকাটা তখনো পুরোপুরি কাটেনি আমার। সেই মুহূর্তটাকে মনে করতে গিয়ে এখন খেয়াল হচ্ছে, সেটা হিমশীতল কুয়াশায় মোড়া একটা নীলচে রঙের বিশাল ঘর। কুয়াশা, আরও একটা ইঙ্গিত যে সবকিছু মনে পড়েনি তখনও আমার! শুধু কিছু কথাবার্তা… সেই অজ্ঞতার কুয়াশা পেরিয়ে এসে ঘা মারছিল আমার কানে।

দু’ জন লোক কথা বলছে, আর আমি তাদেরই একজন। আর এই অন্যজনের আওয়াজ খুব পরিচিত।

“আমি তোমাকে আগেই সাবধান করেছিলাম যে শেষটা ভালো হবে না। চারজন মৃত। এতেও কি তোমার শিক্ষা হয়নি?”

“ওরা কি জানত অভিযানের পরিণতি কী হতে পারে?”

“অবশ্যই জানত। শত হলেও ওরা পুলিশ। কিন্তু তুমি জানতে কি?”

এই বিষয়টা নিয়ে ওড়ার আগে অনেকবার আমরা আলোচনা করেছিলাম। এখন সে বলতেই পারে যে আমার ভাগ্য খুব ভালো আর আমি খানিক শিক্ষা পেয়েছি।

“কী বলতে চাইছ অষ্টা?”

“উপেক্ষা। রিজার্ভেশনে লোকজন কীভাবে বাঁচে, কী খেয়ে বাঁচে সেগুলোকে আর দশজননের মত উপেক্ষা করতে পারছ না তুমি কেন? আরে আমাদের মরবার অনেক আগেই তো ওগুলো মরে ভূত হয়ে যাবে। তাহলে ওদের নিয়ে এত কৌতূহল কেন তোমার?”

“আমরা ওদের ওই জঙ্গল থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইছি কেন?”

“কারণ ওই জঙ্গলটা আমাদের দরকার।”

“ওই লোকগুলো কোন আদর্শের জন্য শহর ছেড়ে রিজার্ভেশনের ঐ ভয়াবহ জীবনে চলে যাচ্ছে? কেন অষ্টা?”

“আমরা ওদের দেখা পাই না, তাহলে কেন ওরা এমন করছে সে নিয়ে ভাববার দরকারটা কী তোমার?”

“এত ভয় থাকতেও কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই লোকে ছুটছে ওই নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের উদ্দেশ্যে। কীসের লোভে? সেইজন্যই ওদের নিয়ে ভাবছি।”

“এতই যদি জানার শখ তবে ওদের জিজ্ঞেস করো। ওদের সঙ্গে নিরস্ত্র অবস্থায় একাকী দেখা করো। ওরাই তোমাকে উত্তর দেবে।” অষ্টার জীর্ণ গলাটা খরখর করে উঠল, “তা না চাইলে বলল, আমিই তোমাকে বলে দিচ্ছি। হতে পারে এতে করে তোমার খানিক শিক্ষা হবে।”

পেন্ডুলামটা দুলছিল নিঃশব্দে। তার সোনালি বল চারপাশে কত না আবছায়া বর্ণময় স্মৃতির প্রতিফলন ছড়িয়ে যায়! কিন্তু বড়ো তাড়াতাড়ি। ধরেও ধরতে পারি না আমি তাদের পুরোপুরি। সময়ের কঠিন অক্ষে বাঁধা দুলন্ত পেণ্ডুলাম, স্মৃতির মধুর সুর ছড়ায়, ছাড়া ছাড়া টুকরো টুকরো সুর,

“এটাই অনিবার্য ছিল, বুঝলে? সময় থেমে থাকে না বা উলটোদিকে চলে না। আমরা সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, আর কোনোদিন সেটা করতেও পারব না। আমরা একটা জায়গার কিনারায় থমকে আছি, আর এগোনোর উপায় নেই। সামনে একটা প্রাচীর। তারপর একটা গহুর, যাকে বলে পাতাল, নিঃসীম শূন্য। বেছে নাও কোনটা ভালো। এটা হতে পারে এই পাতালের ওপর দিয়ে একটা সেতু তৈরি করে এগিয়ে যাওয়া, বা ওই প্রাচীরের মধ্যে একটা গর্ত করে তার ভেতর দিয়ে সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়া। কিন্তু কেন? কোনো কারণ নেই। এর জন্য অনেক শক্তি লাগে যা আমাদের নেই। কথাগুলো শুনতে ভয় লাগছে? আমরা একটি মরতে বসা সভ্যতা। কোনো কিছুর প্রতিবাদ করাটা সোজা। তবে শেষটা দু-পক্ষেই এক –মৃত্যু।

বিভিন্ন সময়ে অনেকরকমের প্রতিবাদ হয়েছে আমাদের জীবনযাপন নিয়ে। অনেকবার হয়েছে। অধিকাংশ প্রতিবাদই হয়েছে অতীতে ফিরে যাবার জন্য চেষ্টার পথে। প্রকৃতির কাছে ফিরে যাবার শিশুসুলভ আকুতি। প্রাচীনযুগের বাসিন্দাদের মত আদিম স্বাধীনতার শখ। স্বাধীনতার চাহিদা।

কিন্তু কিছু হয়নি। বরং তথাকথিত সভ্যতারই জয় হয়েছে। কেন জানো? কারণ সভ্যতা যত এগোয় তত আমরা প্রকৃতির থেকে, আদিমযুগের সরল জীবন থেকে দূরে সরে যাই আর ততই অসম্ভব হয়ে ওঠে সেই জীবনটায় ফিরে যাওয়া।

তবে আদিম যুগের পূর্বপুরুষের আত্মারা সবসময়েই টিকে থাকে আমাদের মধ্যে। তাদের অস্তিত্ব হারায় না। আণবিক শক্তির আবিষ্কার হল, মহাকাশে উড়ে যেতে শিখলাম, প্লাজমা বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠলাম… তখনও ছিল, আর এখন, যখন সেই সবকিছু ফের একবার ভুলতে বসেছি আমরা, তখনও সে আত্মারা রয়ে গেছে। ফের মাথা চাড়া দিতে শুরু করেছে তারা।

“আসলে আদিম হল আধুনিকতার উল্টোটা। আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য সমুখগতি। আর আদিমের বৈশিষ্ট্য পশ্চাদগমন। প্রথমে এরা দু’ একটা ঘাসের শিসের মত শহরের সীমানার বাইরে এদিক ওদিক মাথা তোলে। তারপর এদের সংখ্যা বাড়ে ক্রমশ। উইঢিবির মত জড়াজড়ি করে থাকা আদিম জীবন, মারামারি, ড্রাগ, মহামারীতে মাছির মত মরতে থাকা, আবার মাছির মতই জন্মানো অজস্র নিষ্কর্মার দল। আলস্যের পূজারি। চিন্তা করে না। নড়ে না। কারণ চিন্তা না করে বেঁচে থাকাটা অনেক সোজা। হামাগুড়ি দিয়ে একটা গুহায় ঢুকে যাও অন্ধকার নামলে। খিদে পেলে পাশের লোকটাকে মেরে খেয়ে নাও।

আর এই করেই দক্ষিণের পাথুরে মরুর বুকে ঐ জন্তুর মত লোকজনের দলগুলো দেখা দিয়েছে। সমাজের বাইরে, আইনের বাইরে, সভ্যতার চৌহদ্দির বাইরে থাকা একদল জন্তু। এই হল এদের শহরভীতি রোগ। আমরা এদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোয় ঢুকে আসতে দেখলেই তাড়াই। আমাদের সভ্যতাকে এরা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছে। তাহলে তার আওতার বাইরে নিজেদের রাস্তায় এরা মরুক বাঁচুক আমাদের তাতে কিছু যায় আসে না…”

কানের কাছে বাজতে থাকা কথাগুলো হারিয়ে গেল, হারিয়ে গেল ঝকঝক করতে থাকা সোনার গোলাটাও। জোরালো আলোর রশ্মিগুলো বুজে গিয়ে চারধার আবার অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। চোখের সামনে আর নীল দেওয়ালটা নেই। সেটা বদলে গিয়ে হয়ে গেছে বেগুনি আর তাতে রুপোলী তারা ঝিকমিক করছে। জানালার বাইরের জমাট বাধা কুয়াশা আবার ফিরে এসেছে। সেই জানালা, যে জানালা প্রায় সবসময় ভোলা থাকে। তার মানে আমি বাড়ি ফিরে এসেছি। ছেলেরা আমাকে ঘরে নিয়ে এসেছে। ওদের অনেক অনেক ধন্যবাদ।

.

৪.

ভলোকভ ওর টেবিলে বসে, ঘাড়টা একদিকে হেলিয়ে একমনে লিখে চলেছে। মাথাটা খানিক তুলল। ওর ঠোঁটগুলো নড়ছে। হিসেব করছে, নাকি কিছু ভাবছে? এতক্ষণে ওর নজরে এসেছে যে আমার হুঁশ ফিরে এসেছে। ওর মুখটা হাসিতে ভরে উঠল।

“কেমন লাগছে, প্রফেসর মার্লে?”

“মোটামুটি। আর সবাই কোথায়?”

“এই আধঘণ্টা খানেক আগে বেরিয়ে গেছে। আপনি যখন ঘুমোচ্ছিলেন, আমি তখন খানিক হিসেব কষছিলাম। ইনা দোকানে গেছে। আপনার রেফ্রিজেটার তো একদম খালি। আপনার উচিত অন্তত খানিক কড়াইশুটি বা স্কোয়াশ রাখা। সেটাকে একদম আন্টার্কটিকার মতো ফাঁকা করে রাখা মোটেই কাজের কাজ নয়।” উঠে দাঁড়িয়ে কোটটা গলিয়ে নিয়ে ভলোকভ বলল, “যাই, ইনা কী করছে দেখে আসি। সম্ভবত ও খানকতক বাঁধাকপি কিনেছে, ওগুলো নিয়ে আসি গিয়ে, ততক্ষণ আপনি শুয়ে থাকুন। আমরা তাড়াতাড়িই ফিরে আসব।”

ভলোকভ চলে যেতে আমি চোখ বুজেছিলাম। মনে করছিলাম কয়েক মুহূর্তের জন্য কী দেখেছি। এই মুহূর্তের ঘটনাটাগুলো আমার অতীতের খানিক তুলে ধরার চেষ্টা করছে। যা আমি ভুলে গিয়েছিলাম। একটা জিনিস পরিষ্কার হয়েছে যে আমি ভেজিটেরিয়ান ছিলাম, আর ভেজিটেরিয়ান ছিলাম আমার নিজের গ্রহের সেই কঠোর জীবনযাপনের প্রয়োজনে।

সামনের দরজাটা বন্ধ। পাশের হলঘর থেকে কথা বলার শব্দ ভেসে আসছে। কেউ জুতো খটখটিয়ে বারান্দা পেরিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল।

ওটা ছিল ইনা। রান্নাঘরে ঢুকে ওর মাস্টারমশাই অর্থাৎ আমার জন্য খাবার বানাচ্ছে। না, মাংস দিয়ে কোনো লোভনীয় খাবার নয়। গাজর আর বাঁধাকপি কোঁচানো সেদ্ধ। এই নিয়ে না দিন সেই একই মেনু। আমি ওদের মুখ দেখতে পেয়েছিলাম কয়েক মুহূর্তের জন্য, তারপর আবার আমার চেতনা ডুবে গিয়েছিল কুয়াশার আড়ালে।

.

নোটবুক-৪

১.

আমার জ্ঞান হারানোর দশাটা এখন ঘন ঘন ফিরে আসছে। আর যত দিন যাচ্ছে, জ্ঞান হারালেই আমার অতীত ভীষণভাবে দখল নিতে শুরু করেছে বর্তমানের ওপর। পরিষ্কার হয়ে আসছে সবকিছু! আর এই দৃশ্যগুলো এক-একটা ইট হয়ে উঠে আমার মনের দেওয়ালটাকে আরও উঁচু করতে করতে লোকের সঙ্গে আমার দূরত্বটা বাড়িয়ে দিচ্ছে ক্রমশ।

কিন্তু, দূরত্ব বাড়লেও, ‘মোগলি’ ততদিনে মানুষের ছোঁয়া পেয়ে ‘মানুষ’ হয়ে উঠেছে। জঙ্গলে ফেরত যাবার আর কোনো উপায় ছিল না ওর। হয়তো, ফেরত যাবার পথ থাকলেও ও আর যেতে চাইত না। যে দুনিয়া তাকে জন্ম দিয়েছিল সেখানে ফিরে গেলে সে কী দেখবে কে জানে! নরখাদক পিথেকেনথ্রোপসের দল? নাকি, অকেজো জ্ঞানের বোঝা নিয়ে পাথরের বুকে ফসিল হয়ে যাওয়া একদল পণ্ডিত জীব? সে জানত না। জানবার আর কোনো আগ্রহও অবশিষ্ট ছিল না তার।

কিছুদিন আগের কথা। আমি লন্ডনে এক ম্যাথমেটিক্যাল সিম্পসিয়ামে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। সেখানে উপস্থিত সবাই যার যার মতো করে কমিউনিকেশন (যাকে ইনফর্মেটিকও বলা যায়) বিষয়ে এক-একটা আলাদা আলাদা তত্ত্ব খাড়া করার চেষ্টা করছিল। সে-সময় সিম্পোসিয়ামের অধিবেশনগুলোর ফাঁকে ফাঁকে আমি বিজ্ঞানী বন্ধুদের সঙ্গ ছেড়ে পিকাডিলিতে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে চারপাশে চোখ চালাতে চালাতেই ভাবছিলাম, যদি এই গ্রহটাও কোনো যুদ্ধবিগ্রহের বালাই ছাড়া বেড়ে উঠতে পারত তাহলে, সম্ভবত একদিন সে-ও ছায়াপথের সুদূরে আমার নিজের গ্রহের সভ্যতার স্তরে পৌঁছে যেতে পারত। বিকাশের সর্বোচ্চ স্তর! আর তার বৃদ্ধি হয় না। বৌদ্ধিক সুখ বা সৃজনশীলতার উষ্ণতা সেখানে হিমায়িত হয়ে গেছে। আমার ডাকনামটি সার্থক! তুষারমানব! ‘দ্য অ্যাবোমিনেবেল স্নোম্যান! কারণ যে শীতল, মুমূর্ষ সভ্যতার গ্রহের সন্তান আমি সেখানে শুধু জলই নয়, তার বাসিন্দাদের হৃদয়ও হিমায়িত হয়ে গিয়েছে বহুকাল।

সিম্পসিয়ামে চল্লিশ বছর বয়সি অধ্যাপক কিংসলে তাঁর বক্তৃতায় দাবি করলেন, বিজ্ঞানের গবেষণার আর বেশি না এগোনোই ভালো। কারণ নতুন তত্ত্ব সবসময়েই কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

আমি যেন তাঁর বক্তব্যে আমার গ্রহের সেই বৌদ্ধিক চিরতুষারের শীতল স্পর্শ অনুভব করেছিলাম।

কিংসলে রাদারফোর্ডের উদাহরণ দিচ্ছিলেন। বলছিলেন রাদারফোর্ডের পরমাণু গবেষণার ফল হয়েছে জাপানের হিরোশিমা আর নাগাসাকি। “শুধু পরমাণু গবেষণা নয়,” কিংসলে জোর দিয়ে বলছিলেন, “ইতিহাস বলে, যেকোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকেই যে-মুহূর্তে বড়ো আকারে কাজে লাগাবেন, সেই মুহূর্তেই তা থেকে সভ্যতার সঙ্কট ঘনিয়ে আসবে।”

কথাগুলোর বৌদ্ধিক দৈন্য সে-মুহূর্তে আমাকে চমকে দিয়েছিল। আর তারপর, একেবারে হঠাৎ করেই মনে হয়েছিল, আচ্ছা, আমার গ্রহের মানুষজনও হয়তো এই পথেই ভেবেছিল!

উত্তরটা অবশ্য সভায় বসে কোনো জ্ঞান হারানোর মুহূর্তে ফিরে পাওয়া স্মৃতির ঝলকে আমার কাছে আসেনি। সে-জবাব আমি পেয়েছিলাম পরে। মস্কো ফিরে আসার পর দুই বিজ্ঞানীর প্রবন্ধ পড়বার পর।

একজন আমেরিকান প্রফেসর। না কিংসলে নন, তবে বৌদ্ধিক চিরতুষারের ছোঁয়াচ তাঁর মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন বিজ্ঞানের উন্নতি অনেক সময়ই মানবজাতির স্বার্থবিরোধী। তিনিও প্রায় কিংসলের মতো একই যুক্তিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি ভবিষ্যতে মানবজাতির পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে বলে সওয়াল করেছেন।

আবার আর এক রাশিয়ান বিজ্ঞানী এইসব যুক্তিকে আত্মহত্যার সামিল বলে বলেছেন। চতুরভাবে যুক্তি আর উদাহরণ সাজিয়ে সাজয়ে তিনি দেখয়েছেন, বিজ্ঞানের প্রতিটি অগ্রগতি মানুষের জীবনে মঙ্গলই এনেছে।

এরপর একদিন হোটেলের বিছানায় শুয়ে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে ফের অজ্ঞান। হয়ে যাই। সেই অবস্থায় আমার মনে ভেসে উঠেছিল আমার নিজের গ্রহের আরও একটি খণ্ডস্মৃতি –আমার অতীত গ্রহের বাসিন্দাদের ধ্বংসের অতল গহ্বরের দিকে আরো একটি পদক্ষেপের দৃশ্য। এযাত্রা দৃশ্যটা ছিল ভীষণ জীবন্ত। ঠিক যেন ঘটনাগুলো ঘটে চলেছিল আমার চোখের সামনে।

..আমার বয়স তখন তিরিশ হবে। নতুন মহাকাশ অভিযানে আমি সুযোগ পেয়েছি প্লটার হিসেবে। তিনশো বছর বন্ধ থাকার পর প্রথম মহাকাশযাত্রা। (আমি এই অঙ্কটা করছি পথিবীর সময়কে ভিত্তি করে, কারণ আমার বর্তমান রূপ আমাকে অন্যভাবে হিসেব কষতে দেয় না।)।

এটা জানতাম, তিনশো বছর আগে গ্রহ ছেড়ে বের হওয়া আমাদের শেষ মহাকাশযানটি ফেরত আসেনি। মাঝের সময়ে নতুন করে কোনো মহাকাশযান তৈরিও হয়নি, আর মহাকাশ চর্চাও বন্ধ ছিল। কোনো গবেষণাও হয়নি, হয়নি মহাকাশযাত্রার জন্য কাউকে প্রশিক্ষণ দেওয়াও। ছিল কিছু পুরোনো অবজারভেটরি, আর ছিল কিছু বন্ধ করে দেওয়া মহাকাশযান তৈরির স্বয়ংক্রিয় কারখানা।

কয়েকজন শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ওইসব কারখানার কয়েকজন কর্মীদের রেখে তাদের সহায়তায় গোপনে স্ফটিকের মধ্যে সংরক্ষিত তথ্য নিয়ে নাড়াচাড়া করত। আমি ওদেরই একজন ছিলাম।

একদিন জানতে পারলাম যে নতুন করে মহাকাশযাত্রা হচ্ছে আর আমি প্লটার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। নির্বাচনের পর থেকে সবাই আমাকে প্লটার বলেই ডাকত।

“ভয় পাচ্ছ না তো প্লটার?”

“না!”

“কয়েক শতাব্দী ধরে কোনো মহাকাশযান কিন্তু তৈরি হয়নি।”

“তৈরি হয়নি তো কী হয়েছে? আমরা কি মহাকাশযান বানাতে ভুলে গিয়েছি? আরে, এটাকে তো সেই পুরোনো নকশা ধরেই বানানো হয়েছে।”

“বানাবার জিনিসপত্রগুলো জোগাড় হল কী করে?”

“অনেক মালপত্র গুদামে পড়ে ছিল। তাছাড়া মহাকাশযান বানানোর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতিগুলো ঠিক ঠিক কাজ করছিল। কয়েকজন পুঁদে লোককেও পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা, ওরাই এই ভেলকিবাজিটা দেখিয়েছে।”

“কিন্তু মনে রেখো, এই মহাকাশযানটা এখনও পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।”

“উড়তে উড়তে পরীক্ষা করে নেব!”

সন্ধে বেলা টিমটিম করে জ্বলতে থাকা অবজারভেটরির ভেতরকার হালকা আলোয় প্রশ্নকর্তার মুখে স্বস্তির ভাব ফুটে উঠেছিল।

“তুমি আমাদের পূর্বপুরুষদের যোগ্য উত্তরসূরি।” ওর কথায় বিদ্রুপের কোনো লেশ ছিল না।

“পূর্বসূরিদের রোমান্টিকতা তোমার মধ্যে পুরোপুরি আছে। বন্ধু, তুমি অনেক দেরি করে জন্মেছ।”

আনন্দে আমার মন নেচে উঠলেও আমি চুপ করে ছিলাম। জানি ও যা বলছে, প্রাণের ভেতর থেকেই বলছে।

“ভেবে দেখো হয়তো এই মহাকাশযান আর কখনোই ফিরবে না। হতে পারে আমরা দেখব ওড়ার সময়ই ধ্বংস হয়ে গেল এ যান। চাইলে নাও যেতে পারো এ যাত্রায়। তোমাকে কেউ বদনাম দেবে না। কেন ছুটছ এই নিশ্চিত মৃত্যুর পিছনে? কাটিয়ে দাও না বাকি জীবনটা আমাদের সঙ্গে।“

“না।”

.

২.

শীতল ভোর কেটে গিয়ে আরো একটা বরফঢাকা সকাল শুরু হল। আমি যে জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলছিলাম তিনি আমার থেকে বছর সাত-আটের বড়। আর কয়েকবছর মাত্র বাঁচবেন উনি। কারণ, আমাদের গড় বয়স তো মাত্র চল্লিশ।

“প্লটার, তুমি কি জানো যে কোথায় যাচ্ছ?”

“অন্য কোনো গ্রহে।”

“সে গ্রহের স্থানাঙ্কের হিসেব করেছ?”

“একটা হিসেব করেছি।”

“আমি একবার দেখতে চাই। তোমার মনে আছে?”

আমি দূরের সৌরজগতের ছবিটা দেখেছিলাম। জ্যোতির্বিজ্ঞানীও ছবিটি দেখেছিলেন, কারণ হলঘরের বড়ো সাদা অংশে ছবিটি স্পষ্টভাবে জ্বলজ্বল করছিল।

“গ্রহটিকে খুঁজে বের করো।”

আমি যে ছবিটি দেখেছিলাম, সেটি ছিল সোভিয়েত মহাকাশচারীদের তোলা অনেকটা পৃথিবীর ছবির মতো। নীল সমুদ্র। তার মাঝে মহাদেশগুলোর স্বতন্ত্র রূপরেখা। আফ্রিকার পরিচিত আউটলাইন।

সেই সময় আমি জানতাম না যে আমার কী করা উচিত। এই গ্রহের শারীরিক রূপ আমার কাছে অজানা ছিল। কিন্তু তাও এ-গ্রহ আমাকে টানছিল।

আমার রকম দেখে জ্যোতির্বিদ মৃদু হাসছিলেন।

“বিশাল ছায়াপথ তোমাকে ডাকছে, তাই না? আমার মধ্যেও সেই একই অনুভূতি হচ্ছে। কিন্তু আমার বয়স হয়ে গেছে। আর বছর তিনেক হয়তো বাঁচব। এই বয়সে কেউ আমাকে মহাকাশযাত্রায় পাঠাবে না।”

“কিন্তু দীর্ঘদিন কোনো মহাকাশযাত্রা হয়নি। কেন জানতে পারি?”

“তুমি স্ফটিক তথ্যভাণ্ডার থেকে জেনেছ কেন এবং কখন থেকে বিজ্ঞান চর্চা বন্ধ হয়েছিল, স্পেশালাইজড শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সব কেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তথ্য ভরে রাখার স্ফটিক আঁধার তৈরি। …শুধু তোমার আমার মতো কিছু পাগল নীরবে অতীতের বিজ্ঞানের কবর ঘেঁটে গিয়েছি।”

“আর কবর ঘেঁটেই খুঁজে পেয়েছি আমাদেরই মতো অক্সিজেন গ্রহণ করে বেঁচে থাকা প্রাণীর গ্রহের সন্ধান।”

“আমি যখন সব বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে ফেলতে ডাকা কাউন্সিলের মিটিংয়ে গিয়েছিলাম, তখন মিটিংয়ের মাঝেই হেসে ফেলেছিলাম। মিটিংয়ে বলেছিলাম, ‘সব ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলতে চাও ফেলো, কিন্তু হতেও তো পারে ঠিক আমাদের মতোই কোনো গ্রহ এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও আছে। সেটাকে খুঁজলে হত না?’ ওরা কী উত্তর করেছিল জানো? বলেছিল আমাদের যথেষ্ট জ্ঞান আছে, ভিন্নগ্রহীদের বুদ্ধির প্রয়োজন। নেই। তবে পরিষদের ওই সভা তখনই সবকিছু ধ্বংস না করার পক্ষেই রায় দিয়েছিল।”

কথা বলার মাঝেই জ্যোতির্বিদের পেছন থেকে ঘন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে এক লম্বাচওড়া মানুষ এসে হাজির হলেন। লোকটা আমার থেকেও লম্বা। মহাকাশযানের ক্যাপ্টেন। ভদ্রলোক আমার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে যেন নীরবে মাথা নাড়িয়ে বললেন, “কোনো অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন কোরো না।”

আমিও তাঁর দিকে তাকিয়ে নীরবে মাথা নাড়িয়ে মনে মনে বলে উঠেছিলাম, ‘আমি শুধু শুনে যাব।’

“আমাদের প্রায় সবারই বয়স তিরিশ পার করেছে, মাথার ওপর মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ঘুরছি।” উনি বলে উঠলেন।

“মাত্র দশ বছর ধরে আমরা এই কাজটা করছি। কিন্তু কিছু লোক এই দশ বছরের কাজটাকেও গুঁড়িয়ে শেষ করে ফেলতে চায়। বিগড়ে দিতে চায় এই গবেষণাটাকে… আর কিছু লোক আগামীকাল শেষদিন হতে পারে ধরে নিয়েও নতুন কিছু খুঁজে পাবার আশায় এই গবেষণাটা চালিয়ে যেতে চায়। তুমি এই দ্বিতীয় দলের লোক, আর আমি তোমার কাজে খুশি। আমি তোমার গণনাগুলো দেখেছি, যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নিয়ে তুমি হিসেব কষেছ। তুমি আমাদের সঙ্গে মহাকাশযাত্রায় যাচ্ছ।”

কিন্তু আমি বেমক্কা একটা প্রশ্ন করে বসলাম। “তিনশো বছর ধরে কোনো যান মহাকাশে যায়নি। তাহলে এমন কী হল যে পরিষদ মত পালটে মহাকাশ অভিযানকে অনুমতি দিল?”

জ্যোতির্বিজ্ঞানীর হাবভাবে বুঝলাম, একজন প্লটারের এই ধরনের প্রশ্ন করার অধিকার নেই–এইধরনের প্রশ্ন শঙ্খলাভঙ্গের সমান। কিন্তু ক্যাপ্টেনের মুখ দেখে মনে হল, হয় তিনি আমার কথা শোনেননি, অথবা এই শৃঙ্খলাভঙ্গকে তিনি কোনো গুরুত্ব দেননি। বললেন, “আমি পরিচালন কাউন্সিলের অষ্টম ব্যক্তি অষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। বিজ্ঞান। চর্চা চলবে কি চলবে না, সে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারী উনিই। আমাদের সভ্যতার মৃত্যু যে ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে সেকথা ওঁকে ভালো করেই বুঝিয়েছি। মৃত্যুর ফলে যা সামান্য জনসংখ্যা কমছে তা প্রায় কিছুই নয়। চল্লিশ বছর আয়ু। কিন্তু ধ্বংসের আসল কারণ, সবকিছুই উদাসীনভাবে নেয়া। আমি ওকে বলেছিলাম মৃত্যুর ভয়ে কুঁকড়ে থাকার ভাবটাকে কি ছুঁড়ে ফেলা যায় না? এখনও তো অন্য মনের কয়েকজন আছে। তাদের নিয়ে অন্য গ্রহের খোঁজ কি করা যায় না? জানেন কি, আমাদের শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আমাদেরই মতো একটি গ্রহের খোঁজ পেয়েছেন, আর আমাদের মহাকাশচারীরা এই গ্রহের সন্ধানে যাবার জন্য প্রস্তুত?

“ ‘আমাদের মহাকাশচারীরা সত্যি টিকে আছে নাকি?’ অবাক হয়ে উনি জানতে চেয়েছিলেন।

“আমি উত্তর দিয়েছিলাম, ‘প্রজন্মের পর প্রজন্মের ধরে কয়েকজন নিঃশব্দে তাঁদের জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে এসেছে। এইরকম জ্ঞানধারী প্রায় তিরিশ জন আমরা টিকে আছি। এখনও আমরা একটা লড়াই দিতে পারি।”

আমার মনে হচ্ছিল ক্যাপ্টেন নয়, আমিই যেন এক কাউন্সিল মেম্বারের সঙ্গে তর্ক করে যাচ্ছি। খানিক মুচকি হেসে বলেছিলাম, “ওঁকে বোঝাতে পেরেছিলেন?”

“না। ওঁর ফ্যাকাশে চোখ সে কথাই বলে দিচ্ছিল। উৎসাহ হারানো একটি লোক। আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম ওঁর মনোভাব। তবে আমাদের মতো কয়েকজন বিদ্রোহী বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিকে ঝেড়ে ফেলার এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাননি ধুরন্ধর লোকটা। বেশ বুঝেছিলেন, ওঁর অসম্মতি আমাদের মতো মনস্ক লোকের সংখ্যা আরও খানিক বাড়িয়ে দিতে পারে। বাড়িয়ে দিতে পারে জেদ। কিন্তু সম্মতি দিলে এই সংখ্যাটা বাড়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু মহাকাশযান যদিও-বা ওড়ে, তা উনি বেঁচে থাকা পর্যন্ত ফিরে আসবে না। আর যদিও-বা আসে, তখন দেখা যাবে…”

কাউন্সিলের এই অষ্টম ব্যক্তিটি ছিলেন আমারই বাবার ছাত্র। আর এই জ্যোতির্বিজ্ঞানী এটা ভালোই জানতেন। উনি বললেন, “অষ্টা তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। না না, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। উড়ান হবেই। প্রয়োজন হলে তুমি আমার কাছ থেকে যা জেনেছ তা বলতে পারো।”

.

৩.

…চোখের সামনে ঘন কুয়াশাটা আবার নেমে আসছে। আজকাল আমি এতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। আমার দরজার সামনে অজস্র শুকনো পাতা ঝরে পড়ে কার্পেট বানিয়ে রেখেছে। লম্বা, চৌকোনা বিভিন্ন আকৃতির শুকনো পাতাগুলো হাওয়ায় ভেসে যেন পেন্সিলের ডগার এক-একটা চলমান রেখা হয়ে ছুটে যাচ্ছে একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। একটা বিরক্তিকর গলায় কারো ঘোষণা শুনতে পেলাম, “অষ্টার সঙ্গে এখনই দেখা করো প্লটার।”

অষ্টার গলার স্বর শুনতে পেলাম। বহুবার শোনা সেই কণ্ঠস্বর। অষ্টাকে দেখতে কিন্তু আমার থেকে বেশি বয়স্ক লাগে না।

“আমার আর একবছর বাঁচার বাকি।” সে বলে উঠল, “সিগন্যাল পেতে শুরু করেছি।”

“কী সিগন্যাল?”

ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়! সিক্সথ সেন্স প্রবলভাবে কাজ করতে শুরু করেছে। বেশ বুঝতে পারছি। আমার মস্তিষ্কের রক্তসঞ্চালক ধমনীগুলো সরু হয়ে রক্তচাপ বেড়ে চলেছে। না, সাধারণ কোনো রক্তচাপ নয়, আরও কিছু ঘটছে। আমার চিন্তাগুলো আরও দ্রুত ও পরিষ্কার হচ্ছে। সুস্পষ্ট হচ্ছে অনেক কিছুই। আমার সিদ্ধান্তগুলো আরও ধারালো হচ্ছে। শীঘ্রই চূড়ান্ত ঘণ্টা বাজবে। কয়েক ঘণ্টা ধরে সবকিছু দ্রুত চরমে উঠবে, তারপর সব শেষ…”

“জানি, আমার বাবার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল।” আমি সরাসরি বললাম। ওঁর সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতে আমার খুব একটা অসুবিধা হয় না। যদিও ওঁর হতাশ মনোভাবের জন্য আমরা কোনোদিনই বন্ধুর মতো মিশতে পারিনি।

“তুমি জানো তোমায় কেন ডেকেছি?”

“না।”

“তোমাকে এই কথা বলার জন্য ডেকেছি যে, তুমি আমার আগে মরবে।”

“আপনি সম্ভবত’ শব্দটা যোগ করতে ভুলে গেছেন।”

“না, আমি ‘নিশ্চিত’ শব্দটা যোগ করতে ভুলে গিয়েছি।”

আমি চুপ করে রইলাম। না, ভয় পেয়ে বা সম্মান দেখাতে নয়। জানতাম তিনি যা বলছেন তার ব্যাখ্যাও দেবেন।

“জানো তো, আমাদের ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমণের জ্ঞান লুপ্ত হয়ে গেছে অনেক আগে।”

উনি এমনভাবে বললেন যাতে মনে হল, এটাই হবার ছিল আর ঠিক তাই হয়েছে। নির্লিপ্ততা ওঁর প্রতিটি কথায় প্রকাশ পাচ্ছিল।

“মহাশূন্যে হারিয়ে যাবে। যদি টিকে থাকো, তোমাকে নিজের মহাকাশযান নিজে বানিয়ে নিজেকেই গতিপথ হিসেব করে একাকী ফিরে আসতে হবে।”

“আমি হিসেব কষে রেখেছি।”

“আমি জানি না তোমার হিসেব কতটা ঠিক, যদিও তুমি একজন গণিতজ্ঞ। একদম বাপ কা বেটা।”

“আপনিও তো ঠিক তাই।”

“হ্যাঁ, আমিও তোমার বাবার যোগ্য শিষ্য ছিলাম, কিন্তু সব ভুলে গিয়েছি।”

“আপনি কি খুশি?”

“কী আসে যায়! প্রায় সব যন্ত্রগণক ভেঙে ফেলা হয়েছে। কে আর তোমার হিসেব ঠিক কি না যাচাই করবে? কার বা আগ্রহ আছে জটিল সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে চর্চার? সংখ্যা নিয়ে চর্চার উৎসাহ আছে শুধু গাণিতিক খেলায় উৎসাহী কিছু পাগল আর নয়তো তোমার মতো কিছু ক্ষ্যাপার মধ্যে। ভাগ্যক্রমে এদের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে।”

“ভাগ্যক্রমে? সেই জন্যেই কী আপনি মহাকাশযাত্রার অনুমতি দিয়েছেন?”

“একদম ঠিক। তোমার সহযোদ্ধা জ্যোতির্বিজ্ঞানী ঠিকই বুঝছিলেন। তবে আমি তোমার জন্যই অনুমতি দিয়েছি। আমি জানতাম ছায়াপথে ঘুরতে ঘুরতে তুমি একদম চিন্তার শীর্ষে উঠে যাবে। যে ভাবনার ঊর্ধ্বে আর কারো পক্ষে ওঠা মুশকিল।”

“ধন্যবাদ অষ্টা।”

“এগিয়ে যাও, আশা করি আমি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিইনি।”

না, অষ্টার ভুল হয়েছিল। অবশ্যই ভুল হয়েছিল। আমি আমার জ্ঞানের শিখর ছুঁয়েছিলাম ছায়াপথের কোথাও নয়। মহাকাশে পৃথিবীর পথে উড়তে উড়তেও নয়। সে শিখরে পৌঁছেছিলাম অনেক অনেক পরে নোভোসিবিরস্কে শহরের কাছে আকাডেমগোরোদকের এক তুষারস্নাত কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় আমার জানালা খোলা ঘরে।

আমি মাঝে মাঝেই আমার মৃত্যুমুখী গ্রহের কথা ভাবি। একটা এত উন্নত সভ্যতা নষ্ট হল কী করে? আমার গ্রহের ইতিহাস সম্পর্কিত জ্ঞান আমার এত কম যে, এর উত্তর খুঁজে পাইনি। আর জানলেই বা কী করতে পারতাম? আমি নিজের জীবনের কথাই খুব সামান্য জানি।

পৃথিবীতে আসার পর আমি সবকিছু বুঝতে শিখেছি। শক্লোভস্কি, ব্রেসওয়েল এবং ভন হর্নারের রচনায় আমি উৎসাহিত হয়েছি। জেনেছি মহাবিশ্বে সম্ভাব্য সভ্যতার মৃত্যুর কারণ। মানসিক আর শারীরিক অবক্ষয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি অনীহা ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে উন্নত গ্রহের বাসিন্দাদের। অষ্টার কথা ধরলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি বিতৃষ্ণাই আমার গ্রহের সভ্যতার মৃত্যুর কারণ।

আমি চল্লিশ বছরের বেশি বাঁচব কি? ওটাই তো আমার মাতৃ-গ্রহের গড় আয়ু? সম্ভবত বাঁচব, কারণ পৃথিবীর জীবমণ্ডলের অদ্ভুত বাতাবরণই আমাকে টিকিয়ে রাখবে।

কোনো সন্দেহ নেই আমার দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বেঁচে থাকার তাগিদেই একই চরিত্রের গ্রহের সন্ধানে ছিলেন। তবে আমি আমার গ্রহে আমাদের গড় আয়ুর থেকে অনেক কম সময়ই ছিলাম। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জাগ্রত হয়েছিল আমাদের গ্রহে যে বয়সে এটা অনুভূত হয় তার এক দশকেরও বেশি পরে।

“আপনার রক্তচাপ কিন্তু অনেক বেশি।” লন্ডন থেকে ফিরে নিয়মমাফিক শারীরিক পরীক্ষার পর বলেছিলেন আমার ডাক্তার। “আপনার হার্টও খানিক টলমল করছে। কিছু একটা করতে হবে মনে হচ্ছে। আপনার কি খানিক অস্বস্তি লাগছে?”

“অদ্ভুত অনুভূতি ডাক্তার।”

“অদ্ভুত, মানে কীরকম?”

“আমি আমার আমার প্রতিটি রক্তবাহী ধমনীকে অনুভব করতে পারছি। বুঝতে পারছি রক্তের চলাচল।”

“শিরা আঙুলের ডগা দিয়ে চেপে ধরে তো?”

“না, মাথায়।”

“মানে একটা চেপে ধরা অনুভূতি?”

“না। মনে হচ্ছে যেন রক্ত আমার ব্রেনে অনেক অনেক শক্তি জুগিয়ে চলেছে। আমার চিন্তাগুলো যেন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে… কী করে বোঝাব? অনেক অনেক যুক্তি তথ্য আমার মাথায় ভিড় করে আসছে। কোনো ভাষাতে আমি আপনাকে এর ব্যাখ্যা দিতে পারব না। কিন্তু এটা বলতে পারি আমি অনেক কিছু নিয়ে ভাবতে পারছি, কাজ করতে পারছি অনেক বেশি।”

“তাহলে তো ভালোই বলতে হয়।”

“জানি না।” আমি বললাম। “ঠিক যে কী ঘটছে আমি তা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি।”

“আমরা একটি এনসেফালোগ্রাম করব।”

আমি আর ডাক্তারের কাছে ফিরে যাইনি, কারণ আমি জানতাম আমার মধ্যে ঠিক কী ঘটছে। অনেক আগে অষ্টা আমাকে বলেছিল, একেই বলে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। চিন্তাশক্তির সুতীব্র বৃদ্ধি। যখন শেষ ঘনিয়ে আসে তখন এটা হয়। তার মানে আমাকে এই অবস্থার পূর্ণ ব্যবহার করতে হবে। আমাকে এই গ্রহের ঋণ চুকিয়ে যেতে হবে। এই গ্রহ আমাকে আশ্রয় দিয়েছে, দ্বিতীয় জীবনে শিখিয়েছে আমাকে অনেক কিছু।

প্লটারের চিন্তাগুলো প্রফেসর মার্লের মস্তিষ্কে আরও ঘন ঘন ধাক্কা মারছিল। সম্প্রতি এক সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে হঠাৎ সব ভুলে উত্তেজিত হয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে ছুটে গিয়ে সব জটিল অঙ্ক কষতে শুরু করেছিলাম। স্তব্ধ হয়ে বসেছিল সবাই। কেউ কোনো কথা বলেনি। শুধু একজন বলে উঠেছিলেন, “আমরা কিছু বুঝতে পারছি না প্রফেসর মার্লে।”

“সব ভুলে যান। আমি এখন কিছু ব্যাখ্যা করতে পারব না।” আমি তখন প্লটারের মানসিক রাজ্যে বিচরণ করছিলাম।

“না!” লাফিয়ে উঠেছিল জেদি ভলোকভ। “আমরা সব লিখে রাখছি, আপনি পরে ব্যাখ্যা দেবেন। শুধু বলুন ওই চিহ্নটা কী?” একটা ব্যাসচিহ্নিত বৃত্তকে দেখিয়ে প্রশ্ন করেছিল।

আমার মধ্যে দিয়ে প্লটার উত্তর দিয়েছিল, “এটা মহাশূন্যের স্থানাঙ্কের স্বতন্ত্র চরিত্রের প্রতীক। অসীম মহাশূন্যে বস্তুর অবস্থান পরিবর্তন আমাদের চেনা ধারণা দিয়ে বিচার করা যায় না।”

আমার তখন কিছু ব্যাখ্যা করার সময় ছিল না। শুধু চাইছিলাম প্লটারের সব জ্ঞান নিংড়ে বের করে নিয়ে আসতে। টের পেয়েছিলাম আমার সামনে বাকি শুধু একটা হিমশীতল দিন ও রাত। জানতাম পরদিন সকালে সব শেষ হয়ে যাবে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, আলো জ্বালাবার পালা। আমি টেবিলের সামনে বসে উন্মাদের মতো কাজ শুরু করলাম। টেলিফোন, দরজায় খটখটানি কোনো কিছুতেই সাড়া দেইনি।

খোলা জানালা দিয়ে গোধূলির আলোয় হাওয়ায় ভেসে বরফের কুচি ছড়িয়ে পড়ছিল ঘরে। আনোদান থেকে আলো ছড়িয়ে ছিল শুধু আমার নোটবুকের ওপর।

এই প্রথম মার্লে পৃথিবীকে শোনাতে চলেছেন এক আজগুবি গল্প। এটাই তাঁর শেষ রাত। তাঁর চিন্তাভাবনাগুলো পৌঁছে গেছে শেষ পর্যায়ে। সুদূর ছায়াপথের এক অজ্ঞাত প্লটার পৃথিবীর মানুষের কাছে প্রকাশ করতে চলেছেন গণিতের অনেক গোপন বিষয়, যা তিনি তাঁর বাবার কাছে শিখেছিলেন আর জেনেছিলেন গোলাকৃতি এক স্ফটিকের তথ্য ভাণ্ডার থেকে, যা পৃথিবীর সমগোত্রীয় এক বহুদূরের মৃতপ্রায় গ্রহে নষ্ট হয়ে গেছে।

কাল সকালে সব শেষ হতে চলেছে। ভালো লাগবে যদি সব শেষ হয়, গ্রামের কাছের কোনো স্কিইংয়ের ঢালে। লোকে বলে গণিতজ্ঞ গাললাইসেরও এরকম দশা হয়েছিল, যদিও তিনি ছিলেন পৃথিবীর সন্তান। যাই হোক, কাল কী হবে নিশ্চিত করে বলা যায় না।

.

প্রফেসর ভলোকভের পোস্টস্ক্রিপ্টাম

আমি ওঁর প্রাক্তন স্নাতক ছাত্র ভলোকভের চোখ দিয়ে ভূমিকাটি লিখলাম। প্রফেসর মার্লের নোটবই যদি কখনো পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়, তাহলে লোকে এভাবেই পড়বে। কিন্তু প্রফেসর মার্লের পোস্টস্ক্রিপ্টাম বা লেখার শেষে দেওয়া ফুটনোট কখনোই ছাপা হবে না।

প্রফেসর মার্লের এই গণনাগুলো নিয়ে একাডেমি অফ সায়েন্সে আমার অনেক ঘঘারাঘুরির পর এগুলো নিয়ে গবেষণার জন্য গণিতের একটি নতুন শাখা খোলা হয়। কিন্তু আমি ছাড়া আর কেউ মার্লের ডায়েরি পড়ার সুযোগ পায়নি। এমনকি ইনা, যার সঙ্গে

পরে আমার বিয়ে হয়েছে, সেও নয়।

কেন? কারণ, আমি পৃথিবীকে তাঁর পুত্রকে নিয়ে গর্ব করা থেকে বঞ্চিত করতে চাইনি। প্রফেসর মার্লে, অবশ্যই নামগোত্রহীন প্লটার নন, পৃথিবীরই সন্তান, মৃত্যুর পর তাঁর জ্ঞান সঁপে দিয়ে গেছেন গোটা বিশ্বকে, বিশেষ করে রাশিয়ার বিজ্ঞান শাখাকে। আমি রাশিয়ান ভাষায় লেখা তাঁর নোটবুক বার বার পড়ে এই বিষয়ে আরও নিশ্চিত হয়েছি। নিশ্চিত হয়েছি তাঁর সমস্ত চিন্তা রাশিয়ান ভাষাতেই ছিল, কখনোই তিনি তাঁর প্রাচীন গ্রহের ভাষা শেখার বা মনে করার চেষ্টা করেননি। ওই গ্রহ তাঁর কাছে ভিনগ্রহই ছিল।

একবার মার্লের নোটবুকগুলো আমি পুড়িয়ে ফেলতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কিছু যেন আমার হাত চেপে ধরেছিল। সম্ভবত এই রহস্য পৃথিবীর সামনে প্রকাশ্যে নিয়ে আসা না আসার দ্বিধাগ্রস্ততা আমাকে বাধা দিয়েছিল।

না, এই রহস্যের দায় আর একা কাঁধে বইতে পারছি না। আমার স্ত্রী ইনা প্রফেসর মার্লেকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনত, সে নিজেও একজন বিজ্ঞানের কৃতী সৈনিক, আমাদের বড়ো হয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েরাও এক-একজন বিজ্ঞান সাধক, তারাই ঠিক করুক প্রোফেসার মার্লে পৃথিবীর সন্তান ছিলেন না পৃথিবীর অতিথি…