তুমি চিরকাল – ৫

লাইব্রেরি রুমে আলো জ্বলছে, যদিও এখনও পুরোপুরি সন্ধে হয়নি। শান্তা ভেতরে ঢুকতেই ডেস্ক থেকে মুখ তুলে তাকাল হাসান। এই যে, বলল সে, কোথায় গিয়েছিলে বলো তো? ফিরে দেখি আন্টি তখনও রয়েছেন, বললেন, তোমার নামে অভিযোগ করবেন খালাম্মার কাছে। তুমি নাকি তাকে কিছু না বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছ।

তাতে তাঁর কি? বেসুরো গলায় বলল শান্তা, অসম্ভব নার্ভাস বোধ করছে সে। ..

কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল হাসান। না, তার হয়তো কিছু না, তবে হঠাৎ কেউ গায়েব হয়ে গেলে দুশ্চিন্তা তো হতেই পারে, তাই না?

আমার মনে ছিল না। একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল শান্তা।

তোমাকে খুব কাহিল দেখাচ্ছে, বলল হাসান। যদিও কাহিল হবার কথা আমার। বইটা শেষ হয়ে গেছে।

এত তাড়াতাড়ি কিভাবে শেষ হলো?

কাল সারা রাত লিখেছি, বলল হাসান, বলার ভঙ্গিটা দেখে মনে হতে পারে সে যেন রাজ্য জয় করেছে, চেহারায় শিশুসুলভ সরলতা। এখানে আসার পর সম্পাদনাও করেছি। এখন তুমি টাইপ করে ফেললেই হয়।

যাক, আপনার মাথা থেকে একটা বোঝা নামল।

হ্যাঁ, সেজন্যেই ভাবছি কোথাও বেড়াতে যাব কিনা। তোমাদের এই জায়গাটা কেমন যেন দৃষিত লাগছে আমার। কোথাও যদি যাই, নমি কি আমার সঙ্গে যাবে, শান্তা?

আপনি খুব ভাল করেই জানেন যে তা সম্ভব নয়।

মানলাম, জানি। কিন্তু যদি সম্ভব হত, ব্যাপারটা তুমি উপভোগ করতে না? তুমি সঙ্গে থাকলে কোথায় না যেতে ইচ্ছে করবে আমার। আমার খুব ইচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিটি দ্বীপে যাই, জেলেদের সঙ্গে রাত কাটাই সাগরে, সুন্দরবনে ঢুকে বাঘ দেখি। প্রেমিকা হতে যদি আপত্তি করো তুমি, তোমাকে আমি ছোট্ট আদরের বোনটি মনে করে হাত ধরে বেড়াই…।

আর তখন যদি ঝর্ণা আপা ফিরে আসে, আমরা যখন বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি? জিজ্ঞেস করল শান্তা।

সে ফিরবে না।

মাথা তুলে তার দিকে তাকাল শান্তা। না…আপা আর কোনদিন ফিরবে না, সায় দেয়ার সুরে বলল সে।

পরস্পরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওরা, নীরবতা দীর্ঘ হচ্ছে। তারপর ডেস্কের পিছন থেকে উঠে দাঁড়াল হাসান, এগিয়ে এসে শান্তার মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসল। কি ঘটেছে বলো তো? শান্ত সুরে জানতে চাইল সে।

আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম, বলল শান্তা।

তো?

সোহানার সঙ্গে দেখা করলাম। আজ সকালের কাগজে তার ছবি দেখার পর ওর সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিই। কথা শেষ করে হাতব্যাগ থেকে ভাঁজ করা কাগজটা বের করল শান্তা, ধরিয়ে দিল হাসানের হাতে।

কাগটা খুলে ছবিটার ওপর চোখ বুলাল হাসান। কিছুক্ষণ চুপচাপ চিন্তা করল সে, তারপর বলল, ঘাগরাটা তুমি চিনতে পারো, তাই না?

হ্যাঁ, কিন্তু সেটা আমার অপরাধ নয়। যদিও ভয় পাবার কে। কারণ নেই। অন্তত আমি কোন বিপদের ভয় দেখছি না। ঘাগরাটা আপা এখানে একবারই মাত্র পরেছিল, ইসমত আপা ছাড়া আর কেউ মনে রেখেছে বলে মনে হয় না। ছবিটা তার চোখে না-ও পড়তে পারে। তাছাড়া, ঝর্ণা আপার সঙ্গে সোহানার পরিচয় আছে এ-কথা কজনই বা জানে।

সোহানা তাহলে সব কথাই ফাঁস করে দিয়েছে? জিজ্ঞেস করল হাসান।

ইচ্ছে করে যে, তা নয়। কিছু গোপন করার আছে কিনা তা-ও তার জানা ছিল না। এখনও কিছু জানে না সে। আমাকে আপনি মিথ্যে কথা না বললেও পারতেন। বলেছিলেন আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন।

তোমাকে একটা গল্প বানিয়ে বলার দরকার ছিল, বলল হাসান। তারপর, ইন্সপেক্টরকে ধোকা দেয়ার সময় বুঝতে পারি, গল্পটা দারুণ বানিয়েছি। এখন আর সে গল্প কাউকে বিশ্বাস করাবার উপায় নেই।

কিন্তু কাজটা আপনি সচেতনভাবে করেছেন, ইচ্ছে করে, বলল শান্ত। আপনি ঝর্ণা আপার কাপড়চোপড় নিয়ে যান, কারণ জানতেন প্রতিবেশীরা নানা আজেবাজে কথা ভাবছে, বিশেষ করে আয়েশা আন্টি। আরমানিটোলার ট্রান্সপোর্ট কোম্পানীর অফিসে সোহানাকে নিয়ে অনেকক্ষণ ছিলেন, যাতে তদন্ত হলে ওখানকার কর্মচারীরা চিনতে পারে। গোটা ব্যাপারটাই একটা : পরিকল্পনার অংশ, হাসান ভাই। এত সব ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে আপনি তো বললেই পারতেন যে ঝর্ণা আপা আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে।

কারও স্ত্রী যখন অন্য কোন পুরুষের সঙ্গে পালায়, সে কি তার প্রিয় শখের কাপড়চোপড় ফেলে রেখে যায়? ঝর্ণা তার ওই ঘাগরা আর শালটা খুব পছন্দ করত, কাজেই ওগুলো চেয়ে ফোন করাটা স্বাভাবিক বলেই মনে হবে। সে কথা ভেবেই গল্পটা বানাই আমি, একেবারে শান্ত সুরে কথা বলছে সে, চোখ কুঁচকে লক্ষ করছে শান্তাকে। তার চোখে কোন ভয় দেখতে পেল না শান্তা, শুধু কৌতূহল রয়েছে সেখানে।

শান্তা চিন্তিত সুরে বলল, কিছু কিছু কাজ হয়তো আপনি নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে করেছেন, তবে কিছু কাজ করেছেন মানুষকে মানসিক যন্ত্রণা দেয়ার জন্যে বা উত্ত্যক্ত করার জন্যে। ভাল করেননি। বিশাল একটা স্যুটকেস নিয়ে যাওয়ায়, ব্যাংক থেকে তোলা টাকা তাঁকে দেখানোয়, আন্টি তো ধরেই নিয়েছেন যে আপনি পালিয়েছেন। তার মুখে আপাতত কোন রকমে হাত চাপা দিয়ে রাখতে পারলেও, বেশিদিন পারব বলে মনে হয় না। আবার যদি পুলিশ আসে, সেটা কি আপনার জন্যে ভাল হবে?

হাসল হাসান, কথা বলল না।

এরপর আপনি কি করবেন? জিজ্ঞেস করল শান্তা। এখন যদি আপনি ঢাকায় গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন, আমার ধারণা তারপরও আপনার ওপর নজর রাখবে পুলিশ। আপা ফিরে না এলে আরও অনেক প্রশ্ন উঠবে। পুলিশ হয়তো জেনে ফেলবে আরমানিটোলায় সোহানার সঙ্গে দেখা হয়েছে আপনার, ঘাগরাটা আপনি তাকে দিয়েছেন।

হ্যাঁ, সে সম্ভাবনা আছে বৈকি।

তখন মিথ্যেগুলো বলার পিছনে কি অজুহাত দেখাবেন?

আগে সে পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, তখন দেখা যাবে।

অবাক লাগছে আপনি আমাকে কেন মিথ্যে কথা বলতে গেলেন। এই আমাকে আপনার বিশ্বাস করার নমুনা?

বাহ্, কী অদ্ভুত! স্ত্রীকে খুন করার অপরাধ তুমি ক্ষমা করতে পারো, কিন্তু অপমানিত বোধ করবে সব কথা তোমাকে খুলে বলিনি ভেবে। বোকা মেয়ে, এ-ধরনের একটা পরিস্থিতিতে যে তোমাকে ভালবাসে সে তোমাকে রক্ষা করতে চাইবে না? তুমি যত কম জানো ততই ভাল, তোমারই স্বার্থে।

আপনি কি সত্যি আমাকে ভালবাসেন? জিজ্ঞেস করল শান্তা, তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে হাসানের মুখে।

তোমাকে আমি ছোঁব না বলে কথা দিয়েছি। এই প্রতিজ্ঞা থেকে আমাকে তুমি মুক্তি দাও, তা না হলে কিভাবে আমি তোমাকে বিশ্বাস করাব?

আমাকে ছুঁলেই আপনাকে আমি বিশ্বাস করব, এ-কথা কেন ভাবছেন আপনি? ছুঁতে আপনি আমাকে অনায়াসেই পারেন, পরীক্ষা করার জন্যে আমার কি প্রতিক্রিয়া হয় দেখার জন্যে। তাতে আপনার অতি সামান্য অংশই ভালবাসায় অংশগ্রহণ করবে, বাকি গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো সরে দাঁড়াবে এক পাশে, নজর রাখবে আগ্রহের সঙ্গে।

নিজেদের সম্পর্কে অনেক কিছু শিখছি আমরা, মন্তব্য করল হাসান। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, সোহানার সঙ্গে কথা বলে কি লাভ হবে বলে ভেবেছিলে তুমি? বোঝাই যায়, আমাকে সাহায্য করার জন্যে কাজটা তুমি করোনি। তার সঙ্গে দেখা করায় তার বরং সন্দেহ হবার কথা।

তা হয়নি, আমার ব্যাখ্যা সে বিশ্বাস করেছে।

তারমানে স্রেফ কৌতূহলবশত তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে?

তা-ও বলতে পারেন। মনে হয়েছিল আসলে কি ঘটেছে আমার জানা দরকার।

মানে তোমার ঝর্ণা আপা বেঁচে আছে কিনা? এ-কথাও ভেবেছিলাম যে আপনাকে সাহায্য করব। এখনও সে ইচ্ছে আছে আমার…যদিও আমার কি করা উচিত বুঝতে পারছি না। ঝর্ণা আপার আত্মীয়-স্বজন কেউ তেমন না থাকলেও বন্ধু-বান্ধব কম নয়, তার কোন খবর না পাওয়া গেলে সবাই খোঁজ শুরু করবে।

মনে হয় না। বেশিরভাগ বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গেই কালে-ভদ্রে যোগাযোগ হয় তার, তা-ও সে যখন ঢাকায় যায়। আমি যদি এই বাড়ি ছেড়ে দিয়ে দূরে কোথাও সরে যাই, কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের কথা ভুলে যাবে মানুষ, ঝর্ণার কথাও।

কিন্তু আপনার লেখালেখি?

অন্য নামে, মানে-ছদ্মনামে লিখব। বেশ কিছুদিন চলার মত টাকা আমার কাছে আছে।

মাথা নাড়ল শান্তা। ব্যাপারটা এত সহজ হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। কত রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাছাড়া, আপাকে যদি পাওয়া যায়?

তার লাশ? কোন সম্ভাবনা নেই।

এতটা নিশ্চিত হন কিভাবে? তারপর হঠাৎ কেঁদে ফেলল স্তা। আপনি আমাকে সব কথা বলছেন না কেন? আর কত কষ্ট দেবেন!

তোমার ভালর জন্যেই সব কথা তোমাকে বলা সম্ভব নয়, শান্তা। তাছাড়া একদিন হয়তো তুমি তোমার বিবেকের দংশন সহ্য করতে না পেরে পুলিশের কাছে ছুটে যাবে। এখন গেলে কিছু সে যায় না, কারণ তেমন কিছু বলার নেই তোমার।

দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদতেই থাকল শান্তা। কিছুক্ষণ পর দুই কাঁধে হাসানের ভারি হাত অনুভব করল সে। একটা হাত মৃদু চাপ দিল, অপর হাতটা উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরল কোমর। তারপর, কি ঘটছে ভাল করে বুঝে ওঠার আগেই, তাকে ধরে বুকে তুলে নিল হাসান, নামাল লম্বা একটা সোফার ওপর। আমি ঠিক তা বোঝাতে চাইনি, শান্তা, তার মুখে মুখ রেখে নরম সুরে ফিসফিস করল হাসান। আমি জানি, নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেবে তুমি, তবু আমার সঙ্গে বেঈমানী করবে না। তবে একটা কথা না বলে পারছি না যে তুমি আমাকে খুব অবাক করছ। এত কিছুর পরও আমার আর তোমার মায়া থাকে কি করে, সেটা একটা রহস্য। তবে আমি কসম খেয়ে বলছি, যদিও এই কদিন অনেক কষ্ট দিয়েছি, সম্ভব হলে কালই তোমাকে আমি বিয়ে করব।

আপনি চলে গেলে কোনদিন আর আপনার দেখা পাব না, ফুপিয়ে উঠে বলল শান্তা।

আমি যদি চলেও যাই, তোমার একটা ব্যবস্থা না করে যাব, কথা দিল হাসান। সঙ্গে যদি যেতে না পারো; দুদিন পর আমার সঙ্গে দেখা হবে তোমার। ঠিক দুদিন হয়তো নয়, যতদিন না পরিবেশটা ঠাণ্ডা হয় আর কি। মানুষ সব একসময় ভুলে যাবে। আমাদের দেখা হবে দূরে কোথাও, যেখানে চিরকাল আমরা একসঙ্গে থাকব।

তা যদি যাই আমি, যাব শুধু আমাকে আপনার প্রয়োজন মনে করে—যদি বুঝি মার যতটা দরকার আমাকে, তারচেয়ে বেশি দরকার আপনার।

একজন লেখকের জীবনে প্রেরণাটাই সবচেয়ে বড় কথা, বলল হাসান। তুমি আমার কাছে সেই অমূল্য সম্পদ।

ব্যাপারটা কিভাবে ঘটল—আপনার আর ঝর্ণা আপার ব্যাপারটা? কিছুক্ষণ পর জানতে চাইল শান্তা। অন্তত এটুকু আপনি আমাকে বলতে পারেন। অনেক আগে থেকে, ঠাণ্ডা মাথায়, ভেবে রেখেছিলেন, তা হতে পারে না। নিশ্চয়ই দুর্ঘটনা। আবার বোধ। ঝগড়া হয়েছিল?

হ্যাঁ, হয়েছিল। সে…আমি…অতীতে আমাদের মধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেছে যা তুমি জানো না। ঝর্ণা আমাকে ছাগল বানিয়ে রেখেছিল, ফলে তার কপালে যা ঘটার কথা তাই ঘটেছে। এ বেশি আর কিছু তোমাকে আমার বলার নেই।

আর সেই টেলিফোনটা? আমি যেটা রিসিভ করলাম?

তুমি নিজেই তো বলেছ, গলাটা চিনতে পারোনি, মনে করিয়ে দিল হাসান।

তবু গলাটা তো একটা মেয়েরই ছিল। আপনার গলা নয়। হাসান ভাই, মনে হচ্ছে…মনে হচ্ছে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি! এর মধ্যে কি অন্য কেউ আছে? তৃতীয় একজন? যার কথা আমি কিছু জানি না?

শান্তা! আঁতকে মত উঠল হাসান, এই প্রথম যেন শান্তা তাকে যাবড়ে দিতে পেরেছে। এরকম বোকার মত কথা বলো না!

কিন্তু ফোনটা আপনি করেননি, আমি জানি! শান্তার গলায় জেদ। সেদিন একটা মেয়ে কথা বলেছিল আমার সঙ্গে, ঝর্ণা আপার এত পরিচিত যে তার গলা নকল করতে কোন অসুবিধে হয়নি। কি যেন একটা আমি বুঝতে পারছি না, ভয়ঙ্কর কিছু একটা-ঝগড়ার মধ্যে আপার খুন হয়ে যাবার চেয়ে মারাত্মক সেটা। দুর্ঘটনাবশত, রাগের মাথায় হঠাৎ খুন করে ফেলা আর ঠাণ্ডা মাথায় মেরে ফেলার মধ্যে পার্থক্য আছে, হাসান ভাই। বুঝতে পারছি, এখানে আর আমার থাকা উচিত নয়। আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি।

শান্তা এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ শান্ত, কিন্তু হাসান উপলব্ধি করল তার এই শান্ত ভাবের মধ্যে ভীতিকর কি যেন একটা আছে, যা দেখে শঙ্কিত হয়ে উঠল সে। পাশ কাটিয়ে এমন ভঙ্গিতে হেঁটে গেল শান্তা, তাকে যেন দেখতেই পায়নি। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে, তারপর দরজা খুলে বাড়ির সামনে বাগানে, সেখান থেকে সদর, দরজার দিকে হাঁটছে সে। শান্তা শুনতে পেল পিছন থেকে তাকে ডাকছে হাসান, কিন্তু সে থামল না। সদর দরজা খুলতে যাবে, একটা গাড়ির আওয়াজ পেল। কালো আর হলুদ রঙ দেখে বোঝা গেল ট্যাক্সি ওটা। প্রথমে শান্তা ভাবল, তার খোঁজে এসে বাড়িতে পায়নি, তাই আশা ভিলায় চলে এসেছে সাইফুল ভাই। গত এক হপ্তা হলো প্রতিদিনই তাকে দেখতে আসেন তিনি। দরজা খুলে দাঁড়িয়েই থাকল সে, নড়তে পারল না। কয়েক সেকেণ্ড পর ভুলটা ভাঙল তার। সাইফুল ভাই তো ট্যাক্সি নিয়ে আসবেন না। শান্তা আরও উপলব্ধি করল, তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন হাসান ভাই। কে যেন ট্যাক্সি থেকে নামল, এগিয়ে আসছে তার দিকে। না, সাইফুল ভাই নন, একটা মেয়ে। কিন্তু এ কেমন মেয়ে? এত সাদা কেন মুখ? চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে, ভাল করে দেখতে পাচ্ছে না শান্তা। তার নাম ধরে কথা বলল মেয়েটা। আরে শান্তা, তুই এখনও এখানে! তোরা কেমন আছিস রে?

তারপর নিস্তব্ধতা জমাট বাঁধল। একটু পর বিষম খাওয়ার মত একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল শান্তার গলা থেকে। অনুভব করল, পড়ে যাচ্ছে সে। অন্ধকার পাতালে তার পতন ঘটছে।

কতক্ষণ পর বলতে পারবে না শান্তা, খেয়াল হলো কে যেন তার চোখে-মুখে পানি ছিটাচ্ছে আর নরম সুরে আদর করছে। খসখসে মেয়েলি গলা। চিন্তা করবি না, ভাই। কিছুই হয়নি তোর। আমি রে, আমি, ভয় পাবার কোন কারণ নেই। আমাকে এভাবে দেখে ঘাবড়ে যাবারই কথা অবশ্য, কিন্তু তাই বলে একেবারে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবি…!

বিপুল ইচ্ছাশক্তির জোরে, অনিচ্ছাসত্ত্বেও, চোখ দুটো খুলল শান্তা। মেয়েটা পিছিয়ে গেল, বলল, তুমি ওর সঙ্গে কথা বলো, হাসান। আমার এই ব্যাণ্ডেজ ঢাকা অবস্থা দেখে আবার না ভয় পায় ও।

মেয়েটার শেষ কথাটা শুনে ভয় মেশানো কৌতূহল জাগল শান্তার মনে। ধীরে ধীরে মাথাটা ঘোরাল সে। নিজেকে দেখল বৈঠকখানার লম্বা একটা সোফায় শুয়ে রয়েছে, হাসান ভাই আঙুল দিয়ে ধরে রেখেছে তার একটা কজি। হাসান ভাইয়ের পিছনে ড়িয়ে রয়েছে মেয়েটা, এতক্ষণ যে তার সঙ্গে কথা বলছিল। মেয়েটার মাথা স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা। স্কার্ফের সামান্যই দেখা যাচ্ছে, কারণ গোটা মুখ আর মাথা সাদা ব্যাণ্ডেজ দিয়ে মোড়া। শুধু মাথা আর মুখই নয়, তার ডান হাতটাও তাই, একটা স্লিং-এর সঙ্গে সুলছে।

সুস্থ হয়ে গেছিস তুই, বলল ঝর্ণা। ব্যাণ্ডেজের আড়ালে আমাকে চিনতে পারা একটু কঠিনই বটে, তবে আমি তোর সেই আদি ও অকৃত্রিম ঝর্ণা আপাই, তার প্রেতাত্মা নই। অন্তত আমার গলা তো চিনতে পারছিস?

কি ঘটেছে? দুর্বল গলায় জিজ্ঞেস করল শান্তা, ঝর্ণার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে আছে।

রোড অ্যাক্সিডেন্ট, কোলকাতায়। এখন থাক, সে অনেক কথা, পরে শুনিস।

কিন্তু তুমি তো মারা গেছ, গলা চড়িয়ে বলল শান্তা।

অস্বস্তিকর হয়ে উঠল পরিবেশটা, কেউ কিছুক্ষণ কথা বলল না। তারপর হেসে উঠল ঝর্ণা। দূর বোকা, মরব কেন! বলতে পারিস মরতে মরতে বেঁচে গেছি। আঘাতটা আরও সিরিয়াস হতে পারত। গত তিন হপ্তা একটা নার্সিং হোমে ছিলাম। ডাক্তাররা তো বলছেন, সব ঘা শুকিয়ে গেলে দাগ প্রায় থাকবেই না, কিন্তু আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। হাতটা ভাঙেনি, তবে ফেটে গেছে হাড়। খুবই ভাগ্যের জোর রে, শান্তা। বাঁচার কোন কথা ছিল না।

হাসান ভাই বলেছেন তুমি মারা গেছ, শান্তার সেই একই কথা।

মাথা নাড়ল হাসান। শান্তা, আমি তা বলিনি-চিন্তা করে দেখো। এ-ধরনের কিছু আগেও বলিনি, আজ সন্ধের সময়ও বলিনি। লোকের ধারণা যে আমি…আমি…থাক, এ-সব কথা এখন আর তুলব না। আমি শুধু তোমাকে একটা কথাই বলেছি, বলেছি যে ঝর্ণা আর ফেরত আসবে না। ও যে ফেরত এসেছে, বিশ্বাস করো এটা আমার কাছে বিরাট একটা চমক।

এখানে সাংঘাতিক সব ব্যাপার ঘটে গেছে, বলল শান্তা, ভাব দেখে মনে হলো এখনও তার ঘোর কাটেনি।

অত্যন্ত দুর্বল লাগছে নিজেকে, ঝিম ঝিম করছে মাথাটা, তবু সোফার ওপর উঠে বসার চেষ্টা করল। তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলল হাসান। আমি তোমার সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করেছি। লক্ষ্মী সোনা, আমি আসলে বুঝতে পারিনি…বলতে পারো গোটা ব্যাপারটাই আমার এক ধরনের পাগলামি বা শয়তানি ছিল, কিংবা বলতে পারো একটা ছেলেমানুষি খেলা ছিল। আমি মনে খুব আঘাত পেয়েছিলাম, প্রচণ্ড রাগে আগুন জ্বলছিল আমার সারা শরীরে, অন্তত কিছুটা সময়। সেজন্যেই মানুষকে নিয়ে এই খেলাটা খেলে আমি এক ধরনের তৃপ্তি পেয়েছি।

আপনি কিন্তু আমাকে বোকা বানাতে পারেননি, বলল শান্তা।

জানি। কাল পর্যন্ত আমার কথা বিশ্বাস করেছ তুমি। কিন্তু প্রমাণগুলো একের পর এক আমার বিরুদ্ধে জমা হতে থাকায় তোমার বিশ্বাসের ভিত নড়ে যায়। সেজন্যে আমি তোমাকে দোষ, দিতে পারি না।

আপনি এখনও আমাকে বোকা বানাতে পারছেন না, বলল শান্তা।

এখন আর কাউকে বোকা বানাবার দরকার নেই, লক্ষ্মী সানা। খেলাটা শেষ হয়ে গেছে। এতদিন ভাল মানুষের পো যারা আমাকে জঘন্য অপরাধী ভেবে এসেছে তাদেরকে এখন হতভম্ব দেখাবে। তুমি এখন তাদেরকে বলতে পারবে ওদের সন্দেহ যে মিথ্যে তা তুমি প্রথম থেকেই জানতে।

ঝর্ণা বলল, তোমাদের এসব কথার অর্থ কিছুই আমি বুঝতে পারছি না। তবে আগে আমার লক্ষ্মী বোনটি সুস্থ হোক, সব কথা পরে শুনলেও চলবে আমার।

এসো, প্রথমে আমরা শান্তাকে ওদের বাড়িতে দিয়ে আসি। বেচারা খুব বড় একটা ধাক্কা খেয়েছে। তবে, লক্ষ্মী সোনা, দুএকটা কথা অবশ্যই তোমাকে বিশ্বাস করতে হবে। দুজন একসঙ্গে যাবার কথা যেটা বলেছি, সেটা মিথ্যে নয়। তোমাকে সত্যি আমি ভালবাসি।

হাসান! বিস্ময়ে আঁতকে উঠল ঝর্ণা।

কেন, এটাই তো তুমি চেয়েছিলে, ঠাণ্ডা সুরে বলল হাসান। ভুলে গেছ? মনে করে দেখো, আমাকে তুমি বলোনি—সত্যিকারের একটা লাভ অ্যাফেয়ার দরকার আমার? বললানি, আমার উচিত শান্তার দিকে ঝুঁকে পড়া, প্রয়োজনে নিজের ওপর জোর খাটিয়ে হলেও?

উত্তরে ঝর্ণা কিছু বলার আগেই মটরসাইকেলের আওয়াজ ভেসে এল।

বোধহয় সাইফুল ভাই এসেছেন, কোন রকমে বলল শান্তা, তবে তার চেহারায় খানিকটা স্বস্তির ভাব ফুটে উঠল।

পিছনে লেগে থাকা পাণিপ্রার্থী? হ্যাঁ, বোধহয় সে-ই। যাই দেখি, কি চায় সে।

না, আমি যাই, সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল শান্তা। সাইফুল ভাই আমাকে নিতে এসেছেন।

তুই কি এই অবস্থায় যেতে পারবি? উদ্বেগে বোনের দিকে ঝুঁকে পড়ল ঝর্ণা।

মনে হয় পারব, হ্যাঁ পারব।

শান্তা কামরা থেকে বেরিয়ে যেতে ঝর্ণা আর হাসান পরস্পরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল।

তোমার আঘাত কি খুব গুরুতর? অবশেষে মুখ খুলল হাসান, চেহারায় বিব্রত ভাব।

প্রথমে মনে হয়েছিল যে চেহারা নিয়ে এত গর্ব আমার, সেটা গেছে। কোলকাতায় প্লাস্টিক সার্জারি বেশ ভালই করে ওরা, তবে প্রচুর সময় লাগে আর খুব কষ্টও। বলল, ব্যাণ্ডেজ খোলার পর সব ঠিক হয়ে যাবে। আরও ছহপ্তা খোলা নিষেধ। সার্জেন ভদ্রলোক নার্সিং হোম থেকে ছাড়তে চাননি আমাকে, এক রকম জোর করেই চলে এলাম। বাড়ি ফেরার জন্যে হঠাৎ উতলা হয়ে পড়েছিলাম। আসার পর মনে হচ্ছে, আরও দেরি করলে ক্ষতি হয়ে যেত।

আমাকে না হোক, আর কাউকে একটা চিঠি লেখার কথাও তোমার মনে হলো না? তিক্তস্বরে জিজ্ঞেস করল হাসান।

প্রথমদিকে এত অসুস্থ ছিলাম যে চিঠি লেখা সম্ভব ছিল না। আমার সঙ্গে মধুরিমা আর তার স্বামী কাজী মহসীন ছিল, আমরা ওদের গাড়ি নিয়ে দিঘায় যাচ্ছিলাম। ওরা দুজনও আহত হয়েছে, তবে তেমন সিরিয়াস কিছু না। তোমার আমার কথা যদি বলো, এমন অদ্ভুত শর্তে বিচ্ছিন্ন হই আমরা যে ভাবলাম চিঠি না লিখে কথা যা হওয়া দরকার সব সামনাসামনি বসে। তাই চলে এলাম।

তবু চিঠি লিখলে বা ফোন করলে এদিকে আমি কিছুটা শান্তি পেতাম। বিশ্বাস করো, এখানে সবাই ধরে নিয়েছিল আমি তোমাকে খুন করে লাশটা লুকিয়ে রেখেছি বাগানে। পিছনের বাগানটা এখনও যে খোড়া হয়নি, সেটা স্রেফ ভাগ্য।

চোখে অবিশ্বাস, ঝর্ণা বলল, যাহ্, তুমি বাড়িয়ে বলছ!

দুএকদিন থাকো, এর তার সঙ্গে দেখা হোক, তখন বুঝতে পারবে বাড়িয়ে বলছি কিনা। যাবার সময় বলে গেলে জীবনে আর কোনদিন ফিরে আসবে না। যখন দেখলাম দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে, তুমি ফিরছ না, আমি ধরে নিলাম হারানো সুখ খুঁজে পেয়েছে তুমি, ভুলে গেছ আমাকে। বুঝলাম, আশরাফকে খুঁজে পেয়েছ তুমি, তার সঙ্গে আমেরিকা বা আর কোথাও চলে গেছ।

আশরাফ মারা গেছে। প্রথম যে খবরটা পাই আর সেটাই সত্যি ছিল। সাগরে ডুবে মারা গেছে সে। তীরে যে লাশটা ভেসে আসে সেটা তারই লাশ ছিল। আমি যেমন ভেবেছিলাম অন্য কারও লাশ, তা নয়। তুমি জানো, আমার এরকম ভাবার পিছনে যথেষ্ট সঙ্গত কারণও ছিল। মধুরিমা চিঠি লিখে জানিয়েছিল, কোলকাতায় আশরাফকে দেখেছে সে। কিন্তু না, ভুল দেখেছিল। যাকে দেখে এই ভুল বোঝাবুঝি তাকেও আমি কোলকাতায় দেখেছি। হ্যাঁ, আশরাফের সঙ্গে তার চেহারার অনেক মিল আছে, মধুরিমার ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। ভদ্রলোক একজন আর্টিস্ট, বাঙালী, তবে হিন্দু। বিবাহিত তিনি, দুটো বাচ্চাও আছে। ওখানকার একটা সিকিউরিটি এজেন্সির সাহায্য নিই আমরা। দিঘার যে গ্রামটায় লাশটা ভেসে আসে সেখানকার লোক বেশিরভাগই জেলে, তাদের সঙ্গে কথা বলে এজেন্সির লোকজন। লাশের ভাঙা হাতঘড়িও উদ্ধার করা হয়েছে। আমার দেয়া উপহার ছিল ওটা, ডায়ালের পিছনে আশরাফের নাম লেখা, চিনতে অসুবিধে হয়নি।

তাহলে ওদিকটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, তোমার মনে এখন আর কোন সংশয় নেই, তাই না? কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার হাসান বলল, সত্যি আমি দুঃখিত। ব্যাপারটা তোমার জন্যে নিশ্চয়ই বিরাট একটা আঘাত। তবে এ-ও বোধহয় সত্যি যে সন্দেহটা দূর হওয়ায় তোমার মন থেকে বিরাট একটা বোঝা নেমে গেছে।

ওগো…এ যে কি পরম স্বস্তি, ঝর্ণা খসখসে গলায়, নরম সুরে, বলল, কি করে বোঝাব তোমাকে! সে বেঁচে আছে কিনা জানার জন্যে রওনা হবার পর বুঝতে পারি, নিজেরই স্বার্থে আশরাফকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পেতে চাই না আমি। এখান থেকে চলে যাবার পর উপলব্ধি করি কী অবাস্তব একটা জগতে বাস করছিলাম, কী ভয়ঙ্কর একটা দুঃস্বপ্নের ভেতর আমার জীবন কাটছিল। তোমাকে কত কষ্ট দিয়েছি ভেবে মরে যেতে ইচ্ছে করছিল আমার।

বুঝতে একটু দেরি করে ফেলেছ বলে মনে হচ্ছে, গভীর সুরে বলল হাসান।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় ডুবে গেল ঝণী। আমি খুব ক্লান্ত। সেই বেনাপোল থেকে আসছি, সারাটা দিন গাড়িতে, বলল সে। এক কাপ চা খেলে হয়তো মাথাটা ছেড়ে যেত।

ইতস্তত করল হাসান, তবে তা মাত্র পলকের জন্যে, তারপর বৈঠকখানা ছেড়ে বেরিয়ে গেল। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চা বানাচ্ছে সে, পায়ের আওয়াজ শুনে বুঝল বৈঠকখানা থেকে শোবার ঘরে চলে এসেছে ঝর্ণা।

দুকাপ চা নিয়ে ভেতরে ঢুকে হাসান দেখল, বিছানার ওপর বালিশে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে সে, চোখ দুটো বন্ধ। তারপর চোখ খুলল, হাসানের হাত থেকে একটা কাপ নিয়ে সিধে হয়ে বসল। ঠিক কি ঘটেছে বলো এবার আমাকে, বলল ঝর্ণা। এখানকার পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় আমাকে দেখে স্বস্তি পেয়েছ, এটুকু বোঝা যাচ্ছে। তবে এ-ও বোঝা যাচ্ছে, শুধু এই কারণটা ছাড়া আমাকে দেখে খুশি হওনি তুমি.। ব্যক্তিগতভাবে আমার আর কোন মূল্য নেই তোমার কাছে। তুমি কি সত্যি শান্তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছ? তা যদি সত্যি হয়, দোষ আমি নিজেকেই দেব। আমিই ওর দিকে ঠেলে দিয়েছিলাম তোমাকে।

হ্যাঁ, ওকে আমি ভালবাসি, কিন্তু ও তা বিশ্বাস করে না, বলল হাসান। এক অর্থে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেছি আমি ওর সঙ্গে। যে উপন্যাসটা শেষ করলাম ওটার একটা চরিত্রের সঙ্গে ওকে আমি এক করে ফেলি। একবার হয়তো ওই নারী চরিত্রটিকে ভেঙেচুরে শান্তার মত আদল দেয়ার চেষ্টা করি, তারপর আবার বিশেষ একটা পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়ে দেখতে চেষ্টা করি নায়িকা যে আচরণ করবে বলে আমার ধারণা শান্তাও সেই আচরণ করে কিনা। তারপর ধরো, আগেই বলেছি, এখানকার লোকজন ভাবতে শুরু করে তোমাকে আমি খুন করে লুকিয়ে রেখেছি লাশ। বলতে পারো, একথা ভাবতে ওদেরকে আমি প্ররোচিত করি। সত্যি কথা বলতে কি, আমার খুব মজা লাগে, বিশেষ করে থানা থেকে একজন ইন্সপেক্টর। তদন্ত করতে আসার পর। বিশ্বাস করো, রীতিমত একটা নাটক হয়ে গেছে এখানে। আমাকে বাঁচাবার জন্যে অস্থির হয়ে ওঠে বেচারি শান্তা। কি যে মজা পেয়েছি, সে তুমি কল্পনা করতে পারবে না।

পারব, শুধু আমার পক্ষেই পারা সম্ভব, বলল ঝর্ণা। কারণ একা শুধু আমিই তোমার জটিল মানসিকতা কমবেশি বুঝতে পারি।

শারীরিক অর্থে আমি ওর কোন ক্ষতি করিনি, বলল হাসান। একবারই শুধু ওর কাঁধে হাত রেখে নিজের দিকে টেনেছিলাম, তবে তারপর আর ছুঁইনি। না, একটু ভুল হলো, আমি ওকে…মানে ওর কপালে চুমো খেয়েছিলাম। মেয়েটা আসলে কি যে ভাল…এত মিষ্টি আর সরল। এটুকুই লাভ বা নিজের কৃতিত্ব আমার যে শান্তাকে আমি চিনতে পেরেছি। আমাকে বিশ্বাসও করেছে, অন্তত কাল পর্যন্ত। অথচ তার কানে আমার বিরুদ্ধে বিষ ঢালার কম চেষ্টা করা হয়নি। কিন্তু আজ সকালের কাগজে তোমার সেই ঘাগরা পরা সোহানার ছবি দেখে এমন এক বিষম ধাক্কা খেয়েছে, এখনও সামলে উঠতে পারছে না। সোহানার সঙ্গে দেখা করার জন্যে আজ সকালে ঢাকায় চলে গিয়েছিল সে।

ঝর্ণার ঘাগরা সোহানার কাছে কিভাবে গেল, ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করল হাসান।

চুপচাপ শুনল ঝর্ণা, হাসান থামতে সে বলল, আমার অত সুন্দর ঘাগরা আর শাল তুমি…কাজটা ভাল করোনি?

এরপর ঢাকায় গেলে চেয়ে নিয়ে তুমি, বলল হাসান।

কিন্তু এ-সব তুমি করেছ শুধু কুৎসাপ্রিয় প্রতিবেশীদের বোকা রানাবার জন্যে? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ঝর্ণা।

হেসে ফেলল হাসান। সব না হলেও, কিছু কিছু। সোহানা অনেকটাই তোমার মত দেখতে, ভাবলাম প্রশ্ন করা হলে ট্রান্সপোর্ট কোম্পানীর লোকেরা যদি বলে তোমার মত দেখতে একটা মেয়ের সঙ্গে আমাকে দেখেছে তারা তাহলে হয়তো আমার ওপর থেকে সন্দেহ খানিকটা কমবে। ঠিকই ভেবেছিলাম আমি, কারণ পুলিশ আর আমাকে বিরক্ত করেনি। তবে এখনও তারা দূর থেকে নজর রাখছে বলে মনে হয়।

যাক, এখন থেকে আর রাখবে না।

হ্যাঁ, তুমি ফিরে আসায়। কিন্তু শান্তাকে বোঝানো সহজ হবে না।

কেন? আমাকে তুমি খুন করেছ, এ-কথা তো কখনোই ওকে বললানি।

ঝর্ণার দৃষ্টির সামনে অস্বস্তিবোধ করায় চোখ নামিয়ে নিল হাসান, স্নান গলায় বলল, তা সত্যি, তবে অনেক সময় কোন কথা এমন ভঙ্গিতে অস্বীকার করা যায়, শুনে মনে হবে স্বীকার করা হচ্ছে। ইচ্ছে করেই সব আমি অস্পষ্ট করে রেখেছিলাম। আমাকে দেখে রহস্যময় মনে হয়েছে, মনে হয়েছে ভয়ে ভয়ে আছি। তুমি আমাকে বলে গিয়েছিলে বটে যে শান্তা আমার প্রেমে পড়েছে, কিন্তু তুমি চলে যাবার পর শুরুতে আমি ওর দিকে মোটেও ঝুঁকিনি। ওর বিশ্বাস ওকে কতদূর নিয়ে যায়, এটা দেখার খুব ইচ্ছে ছিল আমার। খোর ইচ্ছে ছিল আমার নায়িকা আর শান্তা একই টাইপের কিনা।

এ তুমি ভারি অন্যায় করেছ।

এ-সব জঞ্জাল আমি সাফ করতে পারব, বলল হাসান, তার চেহারায় ব্যাকুল একটা ভাব ফুটে উঠল। তুমি ফিরে আসায় এখন ওকে বিশ্বাস করতে হবে যে সত্যি আমি ওকে ভালবাসি। ওকে আমি বিয়ে করতে চাই, ঝর্ণা; কাজেই তোমার কাছ থেকে ডিভোর্স। চাই আমি। তুমি আমার সঙ্গে যে আচরণ করেছ; মুক্তি আমি চাইতেই পারি।

হ্যাঁ, তা চাইতে পারো, স্বীকার করল ঝর্ণা।

ঝর্ণার মুখ আংশিক ঢাকা পড়ে আছে ব্যাণ্ডেজে, খুব বেশি দেখতে পাচ্ছে না হাসান, তবে মাথাটা নত করে রেখেছে সে, আর ঠোঁট দুটো পরস্পরের সঙ্গে শক্তভাবে সেঁটে আছে। তিক্ত হাসি ফুটল হাসানের মুখে, বলল, অন্য কেউ হলে বোধহয় গালাগাল দিত তোমাকে, কিংবা হয়তো মারধর করত। আজ আমি বুঝতে পারছি, সে-ধরনের কিছু করার মানসিকতা আমারও থাকা উচিত ছিল। আরও অনেক আগে যদি কড়া শাসন করতে পারতাম তোমাকে, আজ বোধহয় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হত না। বিয়েটা হয়তো শেষ পর্যন্ত টিকত।

বিয়ের পর এক বছর ধরে আমাকে তুমি কম অপমান করোনি, তোমার কি ধারণা তাতে আমার উপকার হয়েছে?

আমি নই, অপমান করেছ তুমি আমাকে, বারবার। তুমি যে অত্যাচার আমার ওপর করেছ, কোন স্বামী তা সহ্য করবে না। ঘর করেছ আমার সঙ্গে, কিন্তু সারাক্ষণ ভেবেছ অন্য একজনের কথা। তুমি যদি অপমানিত বোধ করে থাকো, তার জন্যে দায়ী তোমার বদমেজাজ।

মনে হত তোমাকে আমি কোনদিন ক্ষমা করতে পারব না, নিচু গলায় বলল ঝর্ণা। তবে আজ বুঝি, সত্যি তোমার ওপর অত্যাচার হয়েছে।

কী সৌভাগ্য আমার, এ-সব কথা শোনার জন্যে আজও আমি বঁচে আছি! চোখ তুলে বলল হাসান।

আমার কি হলো না হলো সে-কথা ভেবে ভয় লাগেনি তোমার? আমার জন্যে তোমার দুশ্চিন্তা হয়নি?

প্রথম দিকে, হ্যাঁ। কিন্তু তারপর তুমি ফিরে আসছ না দেখে, আমাকে বিপদে ফেলে দিয়ে মজা পাচ্ছ বুঝতে পেরে, তোমার ওপর খুব রাগ হয় আমার।

নরম সুরে জিজ্ঞেস করল ঝর্ণা, লেখাটা কেমন হলো?

মনে হয় খুবই ভাল।

তাহলে তো ক্ষতিপূরণ হয়েই গেছে, বলা চলে। তোমার কাছে তো সবকিছুর আগে লেখা।

কথাটা সত্যি নয়। একটা সময় ছিল যখন আমি তোমাকে ছাড়া বাচতাম না।

আর এখন তুমি শান্তাকে ছাড়া বাঁচো না?

তাকে অসুখী করে বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছে নেই আমার। কি ভাবো তুমি, ওর সঙ্গে এত কিছু করার পর, ওই নিষ্প্রাণ সাইফুলের হাতে তুলে দেব ওকে?

তার সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি, সাইফুল নিষ্প্রাণ নয়। তার ব্যক্তিত্বে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা নেই, আর সেটাই তোমার অপছন্দ,বলল ঝর্ণা। আসলে তোমার ভেতর একটা খেপামি রোগ আছে, মাঝে মধ্যে সেটা খুব বাড়াবাড়ি করে, এই যেমন এখন। এই মুহূর্তে শান্তা ছাড়া বাকি সবাই তোমার ওই খেপামির শিকার। খুব ভাল করেই বুঝতে পারছ যে শান্তার ওপর তুমি অন্যায় করেছ। তার সঙ্গে আবার তুমি সম্পর্কটা স্বাভাবিক করে নিতে পারবে বলে ভাবছ বটে, তবে আমার মনে হয় না কাজটা অত সহজ হবে। তাছাড়া, খালাম্মা চাইবেন না যে আমাকে ছেড়ে দিয়ে শান্তাকে তুমি বিয়ে করো। ..

শান্তা তার মাকে ভালবাসে, তৰে আমাকে আরও বেশি ভালবাসে, জোর দিয়ে বলল হাসান।

সেটা দেখার বিষয়। হাসান, তুমি আসলে বোকার মত আচরণ করেছ। সত্যি যদি প্রমাণ করতে চাইতে যে আমি বেঁচে আছি, ঢাকায় আমার ব্যাংকের ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তুমি। কোলকাতায় যেতে হলে টাকা লাগবে আমার, কিন্তু এখান থেকে যাবার সময় তুমি আমাকে টাকা দাওনি। ব্যাংকের ম্যানেজার তোমাকে বা পুলিশকে জানাতে পারতেন যে কোলকাতায় যাবার আগে আমার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলেছি আমি।

কথাটা আমার মনে পড়েনি, বলল হাসান।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল ঝর্ণা। থাক, তোমার সমালোচনা করা আমার উচিত নয়। প্রথম যখন দেখা হলো তোমার সঙ্গে, মনে হয়েছিল তুমি একটা আদর্শ পুরুষ। মনে হয়েছিল, খোদা তোমাকে শুধু আমার জন্যেই তৈরি করেছেন। বিয়ের পর আমি যতটা সুখী হলাম, আর কোন মেয়ে অতটা সুখী হয় কিনা জানা নেই আমার। এ-কথা অস্বীকার করলে পাপ হবে যে তুমি আমার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করোনি। কিন্তু তারপর, সম্পূর্ণ ভুল বুঝতে শুরু করলে আমাকে। একটু থামল সে, তারপর বলল, থাক এ-সব, যা ঘটার তা তো ঘটেই গেছে। শুধু একটা কথা বলি, সব কিছুর জন্যে সত্যি আমি দুঃখিত।

হ্যাঁ, এখন আর কিছু করার নেই, বলল হাসান। তবে আমিও সে-কথা বুঝি যে খুব অশান্তির মধ্যে ছিলে তুমি। আশরাফ তোমার একটা অবসেসন হয়ে ওঠে। বিয়েতে তোমাকে আমি জোর করে রাজি করাই, সেটাই বোধহয় ভুল হয়ে গেছে।

তুমি বিয়ে করতে চাওয়ায় নিজেকে মনে হয়েছিল ভাগ্যবতী, বলল ঝর্ণা। দেখে ভাল লেগেছিল, এক অর্থে ভালও বেসে ফেলেছিলাম, কিন্তু তখনও ভাবিনি যে তুমি আমাকে চাইবে। আসলে দ্বিতীয়বার বিয়ে করলে সুখী না-ও হতে পারি, এ-ধরনের একটা ভয় ছিল মনে। কিন্তু বিয়ের পর বুঝলাম, ভয়টা মিথ্যে। যদিও পরে, বোধহয় নিজেকে এত সুখী হতে দেখে, এক ধরনের মানসিক অশান্তি শুরু হয় আমার। সব সময় মনে হত, আশরাফ বেঁচে আছে। আর তারপরই মধুরিমা চিঠি লিখে জানাল, কোলকাতায় ভিড়ের মধ্যে আশরাফকে দেখেছে সে। শুনে আমার যেন মাথা খারাপ হয়ে গেল। আমাদের, মানে তোমার আর আমার জীবনে এই অশান্তি ডেকে আনার জন্যে মধুরিমাকে খুব বকাঝকা করেছে মহসীন। তারপর আমার মনে পড়ল, তোমাকে বিয়ে করার পর মধুরিমাই আমার মনে সন্দেহটা ঢুকিয়ে দেয়। তবে, আমি জানি, খারাপ কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এ-সব করেনি সে। এখান থেকে আমি রাগ করে চলে এসেছি শুনে মহসীনই প্রস্তাব দেয়, নিশ্চিতভাবে জানা দরকার আশরাফ সত্যি বেঁচে আছে কিনা। পথে যে দুর্ঘটনা হলো, সেজন্যেও নিজেদেরকে দায়ী করল ওরা। আমাকে একটা পয়সা খরচ করতে দেয়নি…সার্জেন ভদ্রলোককে  নিজেদের প্রায় অর্ধেক সঞ্চয় দিয়ে ফেলেছে। আমার কাছে খুব বেশি টাকা ছিলও না। কোলকাতায় ওদের বাড়িতে উঠি, আর দিঘায় ছিলাম ওদের এক বন্ধুর বাড়িতে।

ঠিক আছে, মহসীন ঢাকায় এলে তার ঋণ শোধ করা যাবে, বলল হাসান।

তখন সেটা তোমার দায় থাকবে না। তুমি যদি ডিভোর্সই চাও, তখন আমি তোমার স্ত্রী থাকব না।

হ্যাঁ, তাই তো, বিড়বিড় করল হাসান, যেন হঠাৎ এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে হকচকিয়ে গেছে সে।

তবে এখানের যে পরিবেশ, অন্তত কিছুদিন এমন ভাব দেখাতে হবে যে আমাদের মধ্যে যেন কিছুই হয়নি, সব আগের মত আছে। তারপর একদিন চুপিসাড়ে ঢাকায় চলে যাব আমরা, উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করে ছাড়িয়ে নেব নিজেদের। তুমি যখন চাইছ আমি ডিভোর্সের জন্যে অ্যাপ্লাই করব, ঠিক আছে, তাই হবে।

তুমি দেখছি আমার সঙ্গে খুব নরম ব্যবহার করছ।

হাসান, তুমি যদি আমাকে আর না চাও, ভালবাসো অন্য একটা মেয়েকে, তোমাকে বেঁধে রাখার কোন ইচ্ছেই নেই আমার, এতক্ষণ পর এই প্রথম আবার সেই পুরানো জেদ প্রকাশ পেল ঝর্ণার কথায়।

বুঝেছি।

আসলে, কাজী মহসীন খুব বড় একটা সুযোগ দিচ্ছে আমাকে। নাম করা একজন সাহিত্যিকের লেখা উপন্যাস নাটকে রূপান্তর করছে সে, টিভির জন্যে ধারাবাহিক। মহসীনের ধারণা, নায়িকা চরিত্রে আমাকে ছাড়া আর কাউকে মানাবে না, অবশ্য যদি ব্যাণ্ডেজ খোলার পর দেখা যায় যে আমার মুখে কোন দাগ নেই। সে আমার জন্যে অপেক্ষা করতে রাজি আছে। ঘাড় থেকে আশরাফের ভূত নেমে যাবার পর ভাবলাম বাড়ি ফিরে আসি, এ-ব্যাপারে তুমি কি বলো জিজ্ঞেস করি। তবে এখন আর কারও অনুমতি নেয়ার দরকার হচ্ছে না।

না, তার আর দরকার নেই। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল হাসান, চারপর আবার বলল, আমি তোমাকে বহুবার বলেছি, অভিনয়বাদ দেয়া উচিত হয়নি তোমার। আবার তুমি কাজ করতে রাজি হয়েছ গুনে ভাল লাগছে আমার।

হ্যাঁ, অনেক বদলে গেছি আমি, বলল ঝর্ণা। এখন আমি সেই আগের ঝর্ণা, যাকে দেখে ভাল লেগেছিল তোমার। তখন আমার মেজাজ ছিল না, কথায় কথায় তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতাম না। কি, মিথ্যে বলছি?  না। খুব শান্ত ছিলে তুমি। বিষন্ন। তোমার শান্ত উদাস ভাবটুকুই সাংঘাতিক ভাল লেগে যায় আমার।

অমূল্য একটা সম্পদ অবহেলায় হারিয়ে বসেছি। কি বোকামি, কি সাংঘাতিক বোকামিই না হয়ে গেছে, তিক্ত, মান গলায় বিড়বিড় করল ঝর্ণা। কিন্তু এখন দুঃখ করে লাভ কি।

হ্যাঁ, অনেক দেরি হয়ে গেছে, নির্লিপ্ত স্বরে প্রতিধ্বনি তুলল হাসান।

তিন দিন ধরে চেষ্টা করেও শান্তার সঙ্গে দেখা করতে পারল না ঝর্ণা, বা হাসান। ফাল্গুনী ইসলামের সঙ্গে রোজ দেখা করে শান্তার অসুস্থতার সব খবরই অবশ্য পাচ্ছে। শহরের সবচেয়ে নামকরা ডাক্তার চিকিৎসা করছেন তার, যদিও রোগটা এখনও তিনি ঠিকমত ধরতে পারেননি। বলেছেন, শান্তার মনের ভেতর আজেবাজে অনেক চিন্তা জট পাকিয়ে গেছে, সব আবার ঠিক হতে সময় নেবে। দিন কয়েক কারও সঙ্গে দেখা করতে বা কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছেন তিনি, কারণ এই অবস্থায় অস্থির বা উত্তেজিত হলে অবস্থা আরও খারাপের দিকে চলে যাবে।

কিন্তু এদিকে খুব অস্থির হয়ে উঠেছে হাসান। মুখ ফুটে কিছু বলছে না বটে, তবে বোঝা যায় যে বেশি সময় নষ্ট না করে ঝর্ণার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে শান্তাকে আপন করে নেয়ার জন্যে ব্যাকুল হয়ে আছে সে। মুশকিল হলো, সারা দিন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে রেখেছে শান্তা, পরিচয় না জেনে ভেতরে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না।

আজ এত বেশি তাগাদা দিতে শুরু করল হাসান, তাকে নিয়ে আবার শান্তাদের বাড়িতে চলে এল ঝর্ণা। ফাল্গুনী ইসলাম স্কুলে, বাড়িতে শান্তা ছাড়া আর শুধু রয়েছেন আয়েশা বেগম। ওদেরকে দেখেই তিনি বললেন, শান্তা আজ একটু ভাল, তবে বলে দিয়েছে কারও সঙ্গে দেখা হবে না।

কথা না বলে শান্তার ঘরের সামনে চলে এল ওরা। ঝর্ণা বলল, শান্তা, দরজা খোল। আমার সঙ্গে তোর হাসান ভাইও এসেছে।

তিন-চারবার ডাকাডাকির পর ভেতর থেকে সাড়া দিল শান্তা। ওঁকে তুমি চলে যেতে বলো।

আমার সঙ্গে একা কথা বলবি?

হ্যাঁ।

হাসানের দিকে ফিরল ঝর্ণা, দেখল তার চেহারা কালো হয়ে গেছে। চিন্তা কোরো না, হাসানকে বলল সে। কথা দিচ্ছি, কোন কারচুপি হবে না। যদি ভেবে থাকো তোমার বিরুদ্ধে ওর মনটাকে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করব আমি, ভুল করবে। আমি আমার নিয়তিকে মেনে নিয়েছি।

এক ঘণ্টা পর ঝর্ণাকে নিতে আসবে বলে ফিরে গেল হাসান।

তারপর দরজা খুলল শান্তা, ঝর্ণা ভেতরে ঢুকতে দরজাটা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিল। ঝর্ণাকে একটা চেয়ার দেখিয়ে বিছানায় কসল সে, হেলান দিল বালিশে। ঝর্ণার মুখ এখনও ব্যান্ডেজে ঢাকা, মাথায় স্কার্ফ জড়ানো, সেদিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকল।

শান্তা, হাসান আমাকে সব বলেছে, বলল ঝর্ণা। তুইও মন খুলে সব কথা বলতে পারিস আমাকে। তার আগে বলে রাখি, তোদের ওপর রাগ বলিস ঘৃণা বলিস কিছুই নেই আমার। – আচ্ছা! তাই? ঠোঁট বাঁকা করে হাসল শান্তা, যেন ব্যঙ্গ করল।

হাসান তোর ওপর কিছু কিছু অন্যায় করেছে, তবে সেজন্যে তার চেয়ে বরং আমিই বেশি দায়ী। সে যাই হোক, ঠিক হয়েছে আমরা আর একসঙ্গে থাকব না—আমি হাসানকে ডিভোর্স দিচ্ছি। তারপর সে…তারপর সে যা খুশি করুক, আমার কোন মাথাব্যথা নেই।

তার ডিভোর্সের কোন দরকার নেই, শান্তার গলা ভেঙে গেল।

পাগলামি করিস না। বললামই তো, যা কিছু ঘটেছে, সব আমার দোষে। আমি যদি টেলিফোন না করে সোমবারে ফিরে আসতাম ঢাকা থেকে, সব আবার ঠিক হয়ে যেত। এখন আর…।

ফোনটা তাহলে তুমিই করেছিলে?

হতভম্ব দেখাল ঝর্ণাকে। আমি ছাড়া আর কে করবে?

প্রশ্নটা নিয়ে অনেক ভেবেছি আমি। প্রথমে মাঝে মধ্যে, তারপর দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা। তবে এখন বুঝতে পারছি, বোধহয় তুমিই করেছিলে-তোমার গলা অনেকটা তার মতই।

কার মত? অবাক হয়ে জানতে চাইল ঝর্ণা।

ঝর্ণা আপার মত।

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা জমাট বাঁধল, নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করছে ঝর্ণা। তারপর সে বলল, তোর কি মাথা খারাপ হলো? ধ্যেত, এ-সব কি প্রলাপ বকছিস! ভাল করেই জানিস যে আমি ঝর্ণা।

না, তুমি ঝর্ণা হতে পারো না। ঝর্ণা আপা মারা গেছে।

ঝট করে চেয়ার ছাড়ল ঝর্ণা, দরজা পর্যন্ত হেঁটে গেল, তারপর এক সেকেণ্ড দাঁড়াল, ঘুরে ফিরে এল আবার বিছানার পাশে। এক হতে পারে যে তোর মাথায় গোলমাল দেখা দিয়েছে, কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করি না, বলল সে। আমি যদি ঝর্ণা না হই, তাহলে কে? কি কারণে নিজেকে আমি ঝর্ণা বলে দাবি করছি?

উত্তর খুব সহজ, ঠাণ্ডা, কঠিন সুরে বলল শান্তা। হাসান ভাই এখান থেকে দূরে কোথাও পালাতে চান, পালাবার আগে তাঁর প্রমাণ করা দরকার ঝর্ণা আপা এখনও বেঁচে আছে। তাহলে আর মানুষ কোন প্রশ্ন বা সন্দেহ করবে না। তোমাকে হয়তো অনেক দিন থেকে চেনেন তিনি, কিংবা টাকা দিয়ে ভাড়া করেছেন, ঝর্ণা আপার ভূমিকায় অভিনয় করানোর জন্যে। সেজন্যেই হাতে আর মুখে ব্যাণ্ডেজ। হাতে ব্যাণ্ডেজ থাকায় তুমি লিখতে পারবে না,অর্থাৎ ঝর্ণা আপার হাতের লেখার সঙ্গে তোমার হাতের লেখা মেলানো যাবে না।

কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকল ঝর্ণা, তারপর জানতে চাইল, কেন তোর মনে হচ্ছে আমি মারা গেছি?

কারণ তুমি বেঁচে থাকলে কোন না কোনভাবে হাসান ভাই তা প্রমাণ করতেন। তিনি আসলে সেভাবে চেষ্টাই করেননি। চেষ্টা করেছেন শুধু যাতে মনে হয় ঝর্ণা আপার নিখোঁজ হওয়াটা স্বাভাবিক। একটা পর্যায় পর্যন্ত তার ওপর আমার বিশ্বাস ছিল, কিন্তু তারপর আর অত্যাচারটা সহ্য হচ্ছিল না।

কিন্তু হাসান আমাকে ডিভোর্স দিতে চাইছে! আমি যদি ঝর্ণা না হই, আমার যদি কোন অস্তিত্বই না থাকে, তাহলে সে ডিভোর্স দেবে কাকে?

লোককে দেখানোর জন্যে তোমাকেই ডিভোর্স দেবে। ভেবেছ এই সহজ কথাটা আমার মাথায় ঢুকবে না? পাল্টা প্রশ্ন করল শান্তা।

ব্যাপারটা এমনিতেই জটিল, তুই সেটাকে আরও শতগুণ জটিল করে তুলছিস! রেগে যাচ্ছে ঝর্ণা।

এ নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে আর কোন কথা বলতে চাই না, লল শান্তা। তুমি চলে যাও।

শোন, শান্তা, একটু সুস্থভাবে চিন্তা কর। আমিই ঝর্ণা। শোন, তোকে আমি পুরো গল্পটা শোনাই, বুঝতে তোর সুবিধে বে। এর আগে আমার একবার বিয়ে হয়েছিল। তাকে আমি ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম, বিবাহিত জীবনে অত্যন্ত সুখীও ছিলাম আমরা। তারপর আমার স্বামী দিঘায় বেড়াতে গিয়ে সাগরে ডুবে মারা যায়। কয়েকদিন তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি, তারপর যখন লাশটা ভেসে এল তখন তাকে চেনার উপায় ছিল না। অন্তত আমি চিনতে পারিনি। তবে কোলকাতায় তাকে যারা চিনত, তাদের চোখে অনেক মিল ধরা পড়ে। সে-সময় আমি অত্যন্ত অসুস্থ ছিলাম, ওদের কথায় মেনে নিই আশরাফ মারা গেছে। সুস্থ হতে অনেকদিন লেগে যায় আমার। তারপর ঢাকায় ফিরে আসি। তারও কিছুদিন পর তোর হাসান ভাই তার লেখা একটা টিভি নাটকে অভিনয় করার অনুরোধ করে আমাকে। অভিনয় খুব খারাপ করিনি, তবে শু্যটিং করতে গিয়ে আবার আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি-স্নায়ুর রোগ, ডাক্তাররা বললেন। ইতিমধ্যে তোর হাসান ভাই আমার প্রেমে পড়ে গেছে। সে আমাকে বিয়ে করার জন্যে অস্থির হয়ে উঠল। আমি রাজি হলাম শুধু একটা কারণে, তাকে আমার অসম্ভব ভাল লেগে গিয়েছিল। যদিও আবার বিয়ে করে সুখী হতে পারব কিনা সেসন্দেহ আমার মনে ছিল। সন্দেহ ছিল, কারণ নিজেকে তো চিনি-আশরাফকে তখনও আমি ভুলতে পারিনি। তবে বিয়ের পর দেখা গেল হাসান আমাকে অসম্ভব সুখে রেখেছে। কিন্তু সে সুখ আমার সইল না। নতুন করে আশরাফ একটা অবসেসন হয়ে উঠল আমার জন্যে। আর তারপরই শুনতে পেলাম, আশরাফ বেঁচে আছে। বলতে পারিস, প্রায় উন্মাদ হয়ে গেলাম আমি। ভেবে দেখ, আশরাফ বেঁচে থাকলে তোর হাসান ভাইয়ের সঙ্গে আমার বিয়েটা বৈধ থাকে না, থাকে কি? এই নিয়ে তোর হাসান ভাইয়ের সঙ্গে শুরু হলো ঝগড়া-ঝাটি। হাসান চাইল, আশরাফের কথা আমি ভুলে যাই, কিন্তু আমার পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। আমার প্রথম স্বামী, যাকে আমি ভালবাসতাম, সে যদি বেঁচে থাকে, তাহলে হাসানের সঙ্গে কিভাবে আমি ঘর করি, বল? এরপর সে আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার শুরু করল। সেজন্যে দায়ী অবশ্য নিজেকেই করি আমি। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত তাকে ছেড়ে ঢাকায় চলে গেলাম আমি, বলে গেলাম আর কোন দিন ফিরব না…।

ঝর্ণা আপা ময়মনসিংহ ছেড়ে কোথাও যায়নি, জেদের সুরে বলল-শান্তা। কেউ তাকে যেতে দেখেনি।

তার কারণ, ট্রেন ধরব বলে আমি একাই রওনা হয়েছিলাম বাড়ি থেকে, বলল ঝর্ণা। তোর ভাই আমাকে রাস্তা থেকে গাড়িতে তুলে নেয়। মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে গেছি অনেকটা পথ, তাই প্রতিবেশীরা কেউ আমাকে দেখেনি।

গল্প তোমরা দেখছি ভালই বানিয়েছ, হিস হিস করে উঠল শান্তা।

দেখ শান্তা, যথেষ্ট হয়েছে, এবার সুস্থ মানুষের মত কথা বল…।

এ-সব কথা বলার জন্যে হাসান ভাই তোমাকে শিখিয়ে দিয়েছে। ঝর্ণা আপা খুন হয়ে গেছে, এটা জানাজানি হয়ে গেলে ফাসি হয়ে যাবে তাঁর। সেজন্যেই তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে ঝর্ণা আপা মরেনি। হাসান ভাইকে আমি তো বলেইছি, তার সঙ্গে আমি বেঈমানী করব না…অন্তত চেষ্টা করব তাঁর যেন কোন বিপদ না হয়, যদিও মাঝে মধ্যে এত বেশি জটিল লাগে সব কিছু, এত বেশি দিশেহারা বোধ করি, কি বলছি নিজেও ভাল বুঝি না। হাসান ভাইকে যে ঝর্ণা আপা ডিভোর্স দেবে, সেই ঝর্ণা আপা এখানে বসে আমার সঙ্গে নরম সুরে কথা বলবে, এ কোনদিন হয়? তার তো আমার ওপর ঘৃণা আর আক্রোশই শুধু হবার কথা। অবশ্য, তোমার কথা মত, হাসান ভাই কোনদিনই ঝর্ণা আপার স্বামী ছিলেন না।

না, হাসান আমার স্বামী ছিল, এখনও আছে। আমার প্রথম স্বামী মারা গেছে। তবে এখন যে আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাচ্ছে, সেজন্যে ওকে আমি দোষ দিই না। লেখকরা একটু উদ্ভট টাইপের তো হয়ই, আমি ওকে বিদঘুটে একটা এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোেগ করে দিই। সেজন্যেই তোর আজ এই অবস্থা। তবে সমাধানও আছে। তোর হাসান ভাইকে আমি ডিভোর্স দেয়ার পর তোদের ব্যাপারটা তোরা যা ভাল বুঝবি করবি।

তোমার কিছু কিছু কথা হয়তো সত্যি, অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল শান্তা। বাকি সব তোমার বানানো।

তোর সঙ্গে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আমি যাই, চিন্তা করে দেখি কি করা যায়। তুই তোর হাসান ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইলি না কেন?

করার কাজ একটাই আছে তোমার,বলল শান্তা। এখুনি তুমি ময়মনসিংহ ছেড়ে চলে যাও। কখন আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাবে বলতে পারি না, সব কথা ফাঁস করে দিতে পারি। ঝর্ণা আপার লাশ কোথাও না কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এতদিন ব্যাপারটাকে অত গুরুত্ব দিইনি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে আমার বোেন, তার সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক…আমার এভাবে চুপ করে থাকা উচিত হচ্ছে না। হাসান ভাইয়ের সঙ্গে কেন দেখা করতে চাইনি? তা আমি তোমাকে কেন বলতে যাব!

তোকে আসলে ধরে মার লাগানো দরকার, রেগে গিয়ে বলল, ঝর্ণা। বারবার বলছি আমিই ঝর্ণা।

তাহলে ব্যাণ্ডেজ খোললা, চেহারা দেখাও, চ্যালেঞ্জ করল শান্তা।

ঝর্ণার কপাল আর চোখের চারপাশ থেকে রক্ত নেমে গেল। তা সম্ভব নয়, বিড়বিড় করে বলল সে।

সর্বনাশ, কি বলছ! শুনে আঁতকে উঠল হাসান। তারমানে কি মেয়েটাকে আমি পাগল বানিয়ে ছেড়েছি?

নিজেদের বৈঠকখানায়, সোফার এক কোণে, ভঁজ করা পা তুলে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসেছে ঝর্ণা, এটা তার প্রিয়.রসার ভঙ্গি। হাসছে সে বলল, এত চিন্তার কিছু নেই। আমি যে ঝর্ণা, এটা প্রমাণ করার অনেক উপায় আছে। আমার পায়ে কাটা দাগ আছে। ডেন্টিস্টকে ডেকে সাক্ষ্য দিতে বলা যায়।

চিন্তা করতে নিষেধ করছ…কিন্তু আমি নিজের কথা ভাবছি, ভাবছি শান্তার কথা।

ও সম্পূর্ণ সুস্থ, শুধু একটা ভুল ধারণা ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। আমার মনে হয়, সাইফুলকে ডেকে সব কথা বলা দরকার, সে হয়তো শান্তার এই ভুল ধারণা ভাঙতে পারবে।

তাকে এর মধ্যে জড়াবার দরকার কি!

কারণ সাইফুলকে ভাল জানে শান্তা। শান্তার পাণিপ্রার্থীও বটে সে।

সে পরে দেখা যাবে। তবে তাকে তোমার পাণিপ্রার্থী বলা উচিত হচ্ছে না।

তুমিই তো বলেছ।

বলেছিলাম শান্তার সঙ্গে ঠাট্টা করার জন্যে।

তোমার ঠাট্টাগুলো দেখা যাচ্ছে বারবার শুধু সীমা ছাড়ায়, কষ্ট দেয় মানুষকে।

আমাকে এভাবে খোচা না দিয়ে পারো না? স্নান গলায় বলল হাসান।

ব্রাউনিং কি বলে গেছেন ভুলে গেছ? ইটস অ ডেঞ্জারাস থিং টু প্লে উইথ সোলস, মন্তব্য করল ঝর্ণা।

আমি কি তাই করেছি? কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল হাসান।

নিজেকে প্রশ্ন করো। তবে বুঝি, আমিও সে দায়িত্ব এড়াতে পারি না। এ-ব্যাপারে আমরা অংশীদার, অন্য ব্যাপারে অংশীদারিত্ব ছিন্ন করলেও।

ঠিক আছে, সাইফুলের সঙ্গে কথা বলা যাক। কিন্তু সে-ও যদি শান্তার ভুল ভাঙতে না পারে, তখন কি হবে?

আমি তো যে-কোন সময় শান্তার ভুল ভেঙে দিতে পারি, ব্যাণ্ডেজটা খুলে, বলল ঝর্ণা। কিন্তু এখন ব্যাণ্ডেজ খুললে দাগগুলো চিরকাল থেকে যাবে মুখে। কাল ডাক্তার তরফদারের সঙ্গে কথা বলেছি, তিনিও তাই বললেন।

মাথা নাড়ল হাসান। তোমার এত সুন্দর চেহারা…না, অসম্ভব! তা আমি তোমাকে করতে দেব না।

তুমি দাও বা না দাও, কাজটা আমি করতে পারি। শান্তার স্বার্থে। ওর এই মানসিক কষ্ট আমার সহ্য হচ্ছে না।

এ তো দেখছি সাংঘাতিক একটা পরিস্থিতি! একবারও মনে হয়নি, শান্তার কোন ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে! বুঝতে পারলে এ-সব আমি করতে যাই! ঝর্ণা, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে শান্তার সঙ্গে আমার একবার দেখা হওয়া দরকার। আমি হয়তো তার ভুল ভাঙাতে পারব।

যাও তাহলে, চেষ্টা করে দেখো, একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল ঝর্ণা।

তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাওনি কেন? উদ্বিগ্ন হাসানের প্রথম প্রশ্ন।

শান্তা বলল, আপনার সঙ্গে ওই মেয়েলোকটা ছিল, তাই। আপনি সব সময় একা আসবেন।

শান্তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হলো হাসানের পরদিন। ঝর্ণাকে দেখে ভয় পেয়েছিল শান্তা, তার ওপর একটা আক্রোশ অনুভব করছিল, তবে হাসানকে দেখে খুশিই হলো সে। কিন্তু খুশি হলে কি হবে, হাসানের যুক্তিও সে কানে তুলল না।

হাসান ভাই, এখনও আপনি আমাকে বোকা বানাতে চেষ্টা করবেন! শান্তার বলার, সুরে অভিমান উথলে উঠল। এখনও বোধহয় সময় আছে, আপনি সত্যি কথাটা বললে আমি সুস্থ হয়ে উঠতে পারি। অপরাধ যত বড়ই হোক, আপনাকে আমি ক্ষমা করতে পারব। আমাকে না আপনি ভালবাসেন? একবার বিশ্বাস করে দেখুনই না। মাঝে মধ্যে মাথার ভেতরটা কেমন যেন করতে থাকে, মনে হয় চিৎকার করি। ভয় হয়, চিৎকারটা শুরু হলে তা আর থামাতে পারব না।

প্লীজ, লক্ষ্মীসোনা, ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করো। গোটা ব্যাপারটাই তোমার কল্পনা। ঝর্ণা বেঁচে আছে। আমি কখনোই তার কোন ক্ষতি করিনি। আমাদের মধ্যে তুমুল একটা ঝগড়া হয়েছিল, আমি হুঁশ-জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম…সেদিনই প্রথম আমি তোমার আপার গায়ে হাত তুলি। এটা সে আমার কাছ থেকে একেবারেই আশা করেনি। মার খেয়ে প্রচণ্ড অপমানবোধ করে সে। সেজন্যেই আমাকে ক্ষমা করতে পারেনি, আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল…।

শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল শান্তা, এমন সুরে শুরু করল, হাসানের কথা যেন সে শুনতেই পায়নি, যদি জানতাম ঝর্ণা আপা কোথায় আছে, তাকে নিয়ে কি করেছেন আপনি, আবার আমি শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম। ঘুম আসে, কিন্তু দুঃস্বপ্ন আমাকে জাগিয়ে দেয়। দেখি ঝর্ণা আপা চিৎকার করে আমাকে ডাকছে। মাঝে মধ্যে তাকে আমি নদী বা কুয়োর তলায় পড়ে থাকতে দেখি, মারা গেছে।

শান্তা, আল্লার কিরে বলছি…।

না, কিরে-কসম খাবেন না। আপনি যা-ই বলুন, আপনার কথা আমি বিশ্বাস করব না।

যদি বলি, ঠিক আছে, যাও, পুলিশকে গিয়ে সব কথা বলো তুমি—তাহলেও বিশ্বাস করবে না? তোমার যা খুশি তাই করতে পারো, শান্তা, আমার তাতে কোনই ক্ষতি হবে না।

নিজের বিপদ সম্পর্কে কখনোই আপনাকে আমি ভয় পেতে দেখিনি। সব সময় ভেবে এসেছেন, পুলিশকে বোকা বানানো আপনার পক্ষে পানির মত সহজ। তার কারণটাও স্পষ্ট। আপনি জানেন, এমন জায়গাতেই লুকিয়ে রেখেছেন যে ঝর্ণা আপার লাশ কেউ কোনদিন খুঁজে পাবে না।

তোমাকে নিয়ে দেখছি বিপদেই পড়া গেল। আরে বোকা, পুলিশ যদি চায়…।

হাসান ভাই, আপনি এখনও আমাকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছেন। আপনাকে ইতিমধ্যে খুব চিনে ফেলেছি আমি, তবু ব্যাপারটা আমাকে অবাক করছে। কারণ উপন্যাসটা তো শেষ হয়ে গেছে, হতভাগিনী তমাকে আপনি শেষ পর্যন্ত অনুগতই দেখিয়েছেন—যদিও নিজেকে অনুগত প্রমাণ করার জন্যে আত্মহত্যা করতে হলো বেচারিকে। নিশ্চয়ই আপনি চান না যে তার মত আমিও ওই কাজ করি? ভবিষ্যতে আপনার অপরাধের কথা যাতে ফাঁস করে না দিই?

এবার রেগে গেল হাসান। এই প্রথম এমন একটা অনুভূতি হলো তার, প্রায় হতাশাই বলা চলে। শান্তা, উপন্যাসের কথা ভুলে যাও, ভুলে যাও তমার কথা। এটা বাস্তব দুনিয়া। আমি তোমাকে ভালবাসি, তোমাকে সুখী করতে চাই। ঝর্ণার সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে, তারপর আমরা বিয়ে করতে পারব। এখন বলল, তুমি কি এখন আর আমাকে আগের মত মায়া করো না?

কি জানি, বুঝতে পারি না…প্রশ্নটা নিজেকেও তো বারবার করছি, কিন্তু কোন উত্তর পাই না।

তবে আমি জানি তুমি আমাকে ভালবাস, বলল হাসান। তুমি আমার জীবনে একটা প্রেরণা হয়ে দেখা দিয়েছ। আনি এ-ও জানি যে আমার যে-কোন বিপদে আর কাউকে না পেলেও তোমাকে আমি ঠিকই পাশে পাব।

হ্যাঁ, পাবেন, যদি আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন।

কেন ভাবছ তোমাকে আমি বিশ্বাস করি না? তোমার মত বিশ্বাস আর কাউকে আমি করি না।

না, যা কিছু করেছেন সব নিজের বুদ্ধিতে করেছেন আপনি, আমাকে কিছু জানাননি। করার পর সব কথা লুকিয়ে রেখেছেন নিজের ভেতর। আপনার বুদ্ধি আর শক্তি এত বেশি, একা শুধু নিজের ওপর আস্থা রাখেন। শান্তার বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। চোখ বুজল সে। হাসান ভাই, আমি খুব ক্লান্ত। এত ক্লান্ত যে বলার নয়। আপনি বরং এখন যান।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *