কাল – সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

কাল

কিছুরই কি নেই অব্যাহতি?
জীবনের মরুপ্রান্তে স্মরণের অখ্যাত বসতি,
তারেও করিবে ছারখার
রক্তলোভাতুর তব দ্বিগ্বিজয়ী শকট দুর্বার
হে কাল, হে মহাকাল?
অতিক্রান্ত উৎসবের উচ্ছিষ্ট জঞ্জাল,
পলাতক পৃথ্বীশের নগণ্য পাথেয়,
প্রয়োজন তোমার তাতেও?
তবু ক্ষুধা
অক্লেশে করেছে জীর্ণ আমার বসুধা।
কীর্তিস্তম্ভসংবলিত সসাগর সাম্রাজ্যে আমার
নিরুৎপাদ প্রতিধ্বনি করে হাহাকার।
ভস্মশেষ পারিজাতবনে
উন্মথি পাংশুল ধূলি মাথা খোঁড়ে ব্যর্থ অন্বেষণে
চারণ মলয় আজ অমৃতের আমন্ত্রণ ল’য়ে।
চূৰ্ণ দেবালয়ে
তোমার যবনসেনা রেখে গেছে পদাঘাতরেখা
মোর কূলদেবতার বুকে।
আমি একা, আজ আমি একা।
আমার বাসবজয়ী ভয়াল কাকে
খণ্ডিত তারণ গুণ উচ্ছৃঙ্খলা স্বৈরিণীর দ্রোহে।
আন্তর কলহে
দিয়েছে কুটুম্ব, বন্ধু প্রাণবলিদান।
শূদ্রের অলক্ষ্যভেদে নিহত আমার ভগবান।।

তবে আজ কিসের আশায়
অজ্ঞাত শিবিরদ্বারে এলে পুনরায়
অনুযাত্র সঙ্গে ক’রে, রুদ্র রোষে আস্ফালি কুলিশ?
স্তব্ধ রাতে
শোকাবহ শিশিরসম্পাতে
মোর ফণিমনসায় ধরিল যে-অপুষ্পক শীর্ষ
এ-বিস্তৃত মরুভূর অনামিক কোণে,
ধ্বংসসার, দুর্গম নির্জনে,
তাতেও তোমার লোভ, তাতেও তোমার প্রয়োজন?
সর্বস্বান্ত কৃপণের শেষ সঞ্চয়ন
ওই কটা মূল্যহীন, নিরানন্দ, কণ্টকিত স্মৃতি।
চৌদিকে বিরচি ওই সহজাত বৃতি
মেয়াদ কাটায় বিশ্বে ম্রিয়মাণ অহমিকা মম।
ক্ষমো, ওরে ক্ষমো,
ওটুকু স্বত্বেরে আজ দাও অব্যাহতি।
হে রুদ্র, হে ভয়ংকর, হে দুর্ধর্ষ ত্রিলোকের পতি,
হবে না নির্ভার
ও-তিলেক কৃপাক্ষয়ে অক্ষয় ভাণ্ডার॥

মিছে চাওয়া, মিছে এ-মিনতি,
তোমার সংহার হতে নেই নেই কারও অব্যাহতি।
নিরুত্তর, সবই নিরুত্তর;
কেবল শূন্যের মৌনে ধাবমান রথের ঘর্ঘর
অনির্বেদ অট্টহাসি হেসে,
উড়ায়ে রঞ্জিত ধূলি বিলুপ্তির সীমান্তরে মেশে।

১৯ জানুআরি ১৯৩২

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *