কালোমেয়ে – ৬

৬.

আসিয়া যথাসময়ে দীঘারপাড়া গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছাল।

পরের দিন সকালে নাস্তা খাওয়ার পর হাফিজুর রহমান নাতনির ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করার পর লেখাপড়ার খোঁজ-খবর নিলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, কলেজ বন্ধ কতদিন?

আসিয়া বলল, পাঁচ সপ্তাহ।

হাফিজুর রহমান বললেন, একটা কথা তোকে বলব। কথাটা চিঠিতে জানাব ভেবেছিলাম। তোর চিঠি পেয়ে জানতে পারলাম, তুই কলেজের বন্ধে আসছিস। তাই আর চিঠি দিইনি। ঝিনাইদহে একটা ছেলের সন্ধান পাওয়া গেছে। নাম আবিদ। তারা তিনভাই দু’বোন। আবিদ বড়। গত বছর বি.এ. পাস করেছে। অবস্থা মোটামুটি ভালো। ঝিনাইদহ টাউনে তার বাবার কাপড়ের দোকান আছে। ছোট ভাইবোনেরা লেখাপড়া করছে। আমি নিজে গিয়ে সবকিছু দেখে এসেছি।

সবাই নামায কালম পড়ে। ছেলের বাবাকে তোর ফটো দিয়ে বললাম, ফটোর থেকে আমার নাতনির গায়ের রং কালো। রঙের কথা শুনে ছেলের মা-বাবা অমত করলেও ছেলে তোকে খুব পছন্দ করেছে। সে কথা ছেলের মা-বাবা জেনে এই কাজে মত দিয়েছে। আমি তাদেরকে বলেছি, আমার নাতনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ে। তাকে আনিয়ে আপনাদের খবর দেব। আপনারা ছেলেসহ তাকে দেখতে আসবেন। দেখে যদি আপনাদের পছন্দ হয়, তাহলে তখন বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হবে। ভাবছি দু’একদিনের মধ্যে তাদেরকে আসার জন্য খবর দেব।

নানার কথা শুনে আসিয়া খুব চিন্তায় পড়ে গেল। সৈকতের কথাটা কীভাবে শুরু করবে, মাথা নিচু করে চিন্তা করতে লাগল।

নাতনিকে ঐ অবস্থায় দেখে হাফিজুর রহমান বললেন, কী ব্যাপার কিছু বলছিস না যে?

আসিয়া নানার দিকে তাকিয়ে জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, “তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া এবং কোনো কাজ করা শয়তানের কাজ”। এই হাদিস একদিন আপনিই আমাকে বলেছিলেন। তাই চিন্তা ভাবনা করে আপনাকে জানাব।

 : কিন্তু আমি তো তড়িঘড়ি করি নাই। বেশ কিছুদিন ধরে পাত্রের ও তাদের বাড়ির সম্বন্ধ খোঁজ-খবর নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

: আপনি যা করেছেন ভালো করেছেন। কিন্তু বিয়ের মতামতের ব্যাপারে মেয়েদের স্বাধীনতা আছে। আর সেই জন্যেই গার্জেনরা বিয়ের ব্যবস্থা করলেও বিয়ে পড়াবার আগে পাত্রপক্ষের লোকেরা প্রথমে মেয়ের এজেন নিতে আসে। মেয়ে এজেন দিলে তবে বিয়ে হয়, নচেৎ হয় না। এটা ইসলামের নিয়ম। আমি অনেকদিন আগের একটা “নেদায়ে ইসলাম” পত্রিকায় পড়েছিলাম, দিগ্বীজয়ী বীর নেপোলিয়ান যখন একের পর এক দেশ জয় করে চলেছেন তখন পথে এক মুসুলমান রাজ্য পড়ল। সেই দেশের বাদশা নেপোলিয়ানের কথা শুনে বিনা যুদ্ধে তার বশ্যতা স্বীকার করে নেন। নেপোলিয়ান সেই দেশের সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে তা উপভোগ করার জন্য সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করার কথা বাদশাহকে জানালেন। বাদশা তাঁকে মহাসমাহারে রাখলেন। একদিন নেপোলিয়ান বাদশাহর বন্দীখানা দেখার সময় অপরূপ সুন্দরী একটা যুবতি মেয়েকে দেখে বাদশাহকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে এই যুবতি? একে বন্দি করেই বা রেখেছেন কেন? বাদশাহ বললেন, এই সুন্দরী যুবতি এক কামারের মেয়ে। একদিন নগর ভ্রমণ করার সময় একে দেখ আমি আসক্ত হয়ে পড়ি। তারপর তাকে বিয়ে করার জন্য বিয়ের পয়গাম পাঠাই। কিন্তু মেয়েটা প্রত্যাখ্যান করে। তাই তার মত পরিবর্তনের জন্য ওকে বন্দীখানায় এনে রাখা হয়েছে। যতদিন না রাজি হচ্ছে ততদিন ওকে আমি বিয়ে করতে পারি না। তবে বন্দীখানায় রাখলেও আমার শাহী মেহমানের মতো মর্যাদার সঙ্গে রাখা হয়েছে। নেপোলিয়ান শুনে হো হো করে হেসে উঠে বললেন, আপনি পুরুষ না কাপুরুষ? দেশের বাদশাহ হয়েও সামান্য একটা কামারের মেয়েকে বিয়ে করতে পারছেন না, এ কেমন কথা?

বাদশা বললেন, বাদশা হবার যোগ্যতা আল্লাহ পাক আমাকে দিয়েছেন। কিন্তু আমার ধর্মের আইনে, বিয়েতে মেয়েদের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। একজন সাধারণ মুসলমান থেকে যত বড় বাদশাহই হোক না কেন? মেয়ের অনুমতি ব্যতীত কেউ তাকে বিয়ে করতে পারবে না। যদি কেউ জোর জবরদস্তি বিয়ে করে, তাহলে সে বিয়ে সিদ্ধ হবে না। ধর্মীয় আইনে সে খুব বড় অপরাধী। আমার ধর্ম ইসলাম। প্রকৃত ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা এতবড় আপরাধ কখনো করে না। নেপোলিয়ান ইসলামের আইনের যৌক্তিকতা চিন্তা করে এত অবিভূত হয়ে পড়েন যে, তৎক্ষণাৎ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

সেই পত্রিকায় আরও লেখা ছিল, কোনো এক যুদ্ধক্ষেত্রে নেপোলিয়ানকে। ছয় লক্ষ সৈন্য নিয়ে নামায পড়তে দেখা গেছে।

হাফিজুর রহমান সুবহান আল্লাহ বলে বললেন, সেই নেদায়ে ইসলাম পত্রিকাটা তোর কাছে আছে?

আসিয়া বলল, সেটা আমার রুমমেটের। তার কাছ থেকে নিয়ে পড়েছিলাম।

হাফিজুর রহমান বললেন, এবারে ঢাকায় গিয়ে পত্রিকাটা চেয়ে রাখবি। আবার যখন আসবি তখন সঙ্গে করে নিয়ে আসবি। আর যদি সে না দেয়, তাহলে কোন সালের কোন মাসের জেনে লিখে এনে আমাকে দিবি। আমি ওদের অফিস থেকে কালেকশান করার চেষ্টা করব। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললেন, তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে, তুই এখন বিয়ে করতে চাস না। কী ওয়াদা করেছিলি মনে নেই বুঝি?

: মনে থাকবে না কেন? তবে….বলে থেমে গেল।

: কিরে থেমে গেলি কেন? তবেটা কী শুনি?

আসিয়া নানাভাই বলে ওঁর দুটো হাত ধরে বলল, একটা কথা বলব, রাগ করবেন না তো?

হাফিজুর রহমান নাতনির মনের খবর একটু আন্দাজ করতে পারলেন। বললেন, ভালো কথা বললে রাগ করব কেন? হাত ছেড়ে বস দেখি, তোর কথা শোনার আগে আমি তোকে কিছু কথা বলছি মন দিয়ে শোন। এসব কথা তোর জানা দরকার। তুই তোর মায়ের কাছে বোধ হয় শুনেছিস, তোর একজন মামা আছে। সে আমার কথা শুনেনি বলে তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখিনি। সে ঢাকাতে গিয়ে বিয়ে-শাদি করে বসবাস করছে। কিন্তু কেন এরকম হলো সব কথা জানিস না। তার নাম ফায়জুর রহমান। সে আমার প্রথম স্ত্রীর গর্ভে জন্মায়।

নাম শুনে আসিয়া চমকে উঠল। তখন তার সৈকতের কথা মনে পড়ল। তার বাবার নামও ফায়জুর রহমান। তিনিও বিয়ের ব্যাপার নিয়ে বাবার সঙ্গে মনোমালিন্য করে অনেক কষ্টে লেখাপড়া করে মানুষ হয়েছেন।

নাতনিকে চমকে উঠে গম্ভীর হতে দেখ হাফিজুর রহমান জিজ্ঞাসা করলেন, কিরে চমকে উঠলি কেন?

আসিয়া ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে বলল, না কিছু না, আপনি বলুন।

হাফিজুর রহমান বললেন, মন দিয়ে শোন। তারপর ছোট ভাই হামিদুরের বিয়ের ঘটনা থেকে শুরু করে নাবিলা বেগম ও হামিদুরের মৃত্যু, হামিদুরের বিধবা স্ত্রী সাজেদা বেগমকে নিকে করা, সাজেদা বেগমের সঙ্গে ফায়জুরের দুর্ব্যবহার, তার ঢাকায় কলেজে পড়ার কারণ, রাবুর সঙ্গে তার বিয়ে দেবার ও তার অমতের কথা এবং শেষমেষ রাগারাগি করে যা ঘটেছে তা সব বললেন। আরও বললেন, ফায়জুরকে আমি ত্যাজ্যপুত্র করতে চেয়েছিলাম। আল্লাহকে ভয় করে তা করিনি। তবে সেই থেকে তার কোনো খোঁজ খবর রাখিনি। তারপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, আমার আর কিছু বলার নেই। এবার তুই যেন কী বলবি বলছিলি বল।

আসিয়া নানার সব কথা শুনে তার অনুমানটা আরও দৃঢ় হল। ভাবল, খুব সম্ভব সৈকতের আব্বাই আমার মামা। সৈকতের কাছে তার বাবার পরিচয় জানতে হবে। নানাকে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলতে দেখে বুঝতে পারল, নানার একমাত্র পুত্র থেকেও নেই, সেই কথা ভেবে আজও দুঃখের আগুনে দগ্ধ হচ্ছেন। মনে মনে আল্লাহকে জানাল, আল্লাহপাক, সৈকতের আব্বাই যদি মামা হন, তা হলে আমি মামাকে না আনতে পারলেও তার ছেলে সৈকতকে স্বামী করে যেন নানার কাছে আনতে পারি, সেই সৌভাগ্য তুমি আমার তকদীরে রেখ।

তাকে চুপ করে থাকতে দেখে হাফিজুর রহমান বললেন, কী ভাবছিস? বলবি না?

আসিয়া বলল, ঢাকাতে একটা ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। সেও মেডিকেল কলেজে পড়ে, তবে আমার চেয়ে এক বছরের সিনিয়র। আপনার সাথে দেখা করতে চায়। এবারে আমার সঙ্গে আসতে চেয়েছিল। আমি বলেছি। আপনার অনুমতি নিয়ে তারপর নিয়ে আসব।

হাফিজুর রহমান এতটুকুতেই যা বোঝার বুঝে গেলেন। রসিকতা করার জন্য বললেন, আমার সঙ্গে কেন দেখা করতে চায়, জিজ্ঞেস করিসনি?

: তার মনের কথা আমি বলব কী করে, আপনি অনুমতি দিলে, তাকে নিয়ে আসব, তখন তার কাছেই শুনবেন।

: তা না হয় শুনব; কিন্তু শুধু পরিচয় থাকলে কোনো ছেলে কোনো মেয়ের গার্জেনের সঙ্গে দেখা করতে চায় না। পরিচয়ের সাথে আরও কিছু থাকলে আলাদা কথা। আমার তো মনে হচ্ছে, তার সঙ্গে তার পরিচয় ছাড়াও এমন কিছু সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যার ফলে সে ঢাকা থেকে এই সুদূর পল্লিগ্রামে এসে

আমার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছে।

আসিয়া মাথা নিচু করে বলল, সে আমাকে বিয়ে করতে চায়।

: তাই নাকি? তা সোজা কথাটা এত ঘুরিয়ে বললি কেন? তা তুই তাকে কী বলেছিস?

: আমি আবার কী বলব? বলেছি আমার গার্জেন আমার নানা, তিনি যা করবেন তাই হবে।

 : তাই তিনি আমার সাথে দেখা করতে চান, তাই না? আচ্ছা তুই আমাকে কী মনে করিস? বুড়ো হয়ে গেছি বলে কি বুদ্ধিও লোপ পেয়েছে? না মনে করেছিস, তোর চালাকি আমি ধরতে পারব না। আরে বুদ্বু, মানুষ বুড়ো হলেও তার মন বুড়ো হয় না। এতই যদি তোর মনে, তাহলে নেপোলিয়ান আর সেই বাদশার গল্প শোনাবার কী দরকার ছিল? সরাসরি বললেই তো পারতিস, তুই তোর নাগরের সন্ধান পেয়েছিস?

আসিয়া উঠে পিছন থেকে হাফিজুর রহমানের দু’চোখ দু’হাতে বন্ধ করে বলল, নানা, অসভ্যের মতো কথা বলবেন না বলছি। কেউ প্রস্তাব দিলে সে নাগর হয়ে যায় বুঝি?

 : আহ্ ছাড় ছাড়, বস। মনের মানুষকেই নাগর বলে। আর যারা প্রকৃত নাগর হয় শুধু তারাই বিয়ের প্রস্তাব দেয় বুঝলি। শোন, তাকে নিয়ে আসার অনুমতি দিলাম।

আসিয়া নানাকে ছেড়ে দিয়ে সামনে এসে বসে বলল, আমি জানতাম আমার নানা খুব ভালো মানুষ।

: তাই নাকি? অনুমতি না দিলে নিশ্চয় খারাপ মানুষ হয়ে যেতাম, তাই না?

: তা তো বটেই, বলে জিভ কেটে বলল, থুড়ি তা হবেন কেন? আমি তো অন্যায় কিছু আব্দার করিনি যে, অনুমতি পাব না।

:ছেলেটা নিশ্চয় দেখতে শুনতে খুব ভালো?

: আসিয়া মাথা নেড়ে সায় দিল।

: তার বাবার অবস্থা নিশ্চয় খুব ভালো?

: আসিয়া হেসে উঠে আবার মাথা নেড়ে সায় দিল।

: ছেলেটার নাম কী?

: মনসুর, ডাক নাম সৈকত।

: বাহ, দু’টো নামই খুব সুন্দর, মনসুর মানে বিজয়ী। তোকে জয় করে নামের সার্থকতা রেখেছে। আর সৈকত মানে সাগরের বেলাভূমি। বিয়ের পর তোরা কক্সবাজারে বেড়াতে যাবি। সৈকতের সঙ্গে সাগর সৈকতে বেড়িয়ে খুব মজা পাবি।

: নানা, আপনি কিন্তু অসভ্যতা করে আমাকে লজ্জা দিচ্ছেন। যাই পালাই বলে উঠে দাঁড়াল।

: আরে বস বস, এসব অসভ্য কথা হবে কেন? বরং খুশির কথা। তা তাদের বাড়িতে গেছিস নাকি?

: সৈকত নিয়ে যেতে চেয়েছিল, আমি যাইনি।

: তাহলে তার মা-বাবা তোকে দেখেনি?

: না।

: এবার হাফিজুর রহমানের মুখ একটু গম্ভীর হয়ে গেল। বললেন, সৈকত কি তার মা-বাবাকে তোর কথা বলেছে?

আসিয়া নানার পরিবর্তন লক্ষ্য করে বলল, হ্যাঁ বলেছে। ওঁরা ছেলের অমতে কিছু করবেন না।

: কিন্তু আমার যেন মনে হচ্ছে, তোকে দেখলে রাজি হবে না।

: সে কথা আমি সৈকতকে বলেছিলাম। শুনে বলল, দুনিয়ার কোনো কিছুর বদলে আমাকে সে হারাতে পারবে না। দরকার হলে মা-বাবাকে ও তাদের বিপুল ঐশ্বর্য ছেড়ে আমাকে বিয়ে করবে।

হাফিজুর রহমান চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তারপর বললেন, তুই নিশ্চয় সে কথার প্রতিবাদ করিসনি?

 : এই কথা শোনার আগে, মানে পরিচয় হবার পর ঐসব কথা অনেক আলোচনা করে প্রতিবাদ করেছি। তাতে কাজ না হলে আমি চিরকুমারী থাকার সিদ্ধান্তের কথাও বলেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। শেষে বলল, আমিও চিরকুমার থেকে তোমাদের গ্রামে গিয়ে গরিবদের চিকিৎসা করে জীবন কাটিয়ে দেব।

হাফিজুর রহমান হু বলে আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, তোরা দুজনেই অনেক দূর এগিয়ে গেছিস। এরপর আমাকে খুব সাবধানে এগোতে হবে। একটু ভুল হলে, তোদের দুজনেরই জীবন দুঃখের সাগরে ভাসবে। তুই এত বুদ্ধিমতী হয়েও একথা ভাবলি না, নিজের স্বার্থের জন্য তার মা-বাবার কাছ থেকে তাকে কেড়ে নেয়া উচিত না? যাক গে, যা হবার হয়েছে। সে আগে আসুক, তার সঙ্গে কথাবার্তা বলে দেখি, তারপর ভেবে চিন্তে যা করার করা যাবে।

নানা, নাতনি কথা বলতে বলতে কখন যে দুপুর হয়ে গেছে তাদের খেয়াল নেই। এক সময় রাবু এসে আব্বাকে বলল, আব্বা, নাতনির সঙ্গে আর কত গল্প করবে? এদিকে দুপুর হয়ে গেছে। এবার গোসল করে নাও। তারপর মেয়েকে বলল, যা তুইও গোসল করে নে।

মেয়ের কথা শুনে হাফিজুর রহমান হেসে উঠে বললেন, তোর মেয়ে ঢাকায় পড়তে গিয়ে যে কীর্তিকলাপ করে এসেছে, সেসব শুনলে তোরও সময়ের জ্ঞান থাকবে না।

আসিয়া মেকী রাগ দেখিয়ে বলল, মাকে সেসব বললে ভালো হবে না বলছি নানা।

হাফিজুর রহমান হাসতে হাসতেই বললেন, তুই পাগল হয়েছিস, নাতনি নাতজামাইয়ের গোপন কথা কি মাকে বলা যায়?

আসিয়া বড় বড় চোখ বের করে নানাকে শাসনের ভঙ্গি করে ছুটে পালিয়ে গেল।

হাফিজুর রহমান হাসতে হাসতে মেয়েকে বললেন, লুঙ্গি-গামছা এনে দে, গোসল করে আসি।

রাবু লুঙ্গি-গামছা এনে আব্বার হাতে দেবার সময় বলল, তখন নাতজমাইয়ের কথা কী যেন বললে?

হাফিজুর রহমান বললেন, তোর মেয়েকে একটা ছেলে পছন্দ করেছে। সে আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। ছেলেটা বড়লোকের। সেও মেডিকেলে পড়ে।

: তাহলে ঝিনাইদহের ছেলেটার সম্বন্ধে কী হবে।

: এটা এখন হাতে থাক। ঢাকার ছেলেটাকে তোর মেয়েরও পছন্দ। প্রথমে তাকে দেখি, তারপর যা ভালো বুঝব করব। অন্য এক সময় তোর সাথে এ ব্যাপারে কথা বলব। কথা শেষ করে তিনি পুকুরে গোসল করার জন্য চলে গেলেন।

নানার কাছে ফায়জুর মামার সব কথা শুনে আসিয়ার কেবলই মনে হতে লাগল, সৈকত তার মামাতো ভাই। প্রত্যেক নামাযের পর কেঁদে কেঁদে আল্লাহপাকের কাছে ফরিয়াদ করতে লাগল, “হে আল্লাহ, তুমি দয়ার সাগর, আমি যা আশা করছি, দয়া করে আমার সেই আশা পূরণ কর। আমাকে নিরাশ কর না।”

একদিন রাবু মেয়েকে কাছে বসিয়ে বললেন, তোকে কয়েকটা কথা বলছি মন দিয়ে শোন। তোর নানাকে যে ছেলেটার কথা বলেছিস, ভালো করে তার পরিচয় নিয়েছিস? শহরের বড় লোকের ছেলেরা খুব উশৃঙ্খল হয়। তারা মেয়েদের সঙ্গে কিছুদিনের জন্য ভালোবাসার অভিনয় করে তাদের সর্বস্ব লুটে নিয়ে সরে পড়ে।

আসিয়া বলল, তুমি তোমার মেয়ের উপর বিশ্বাস রেখ মা। আমাকে যেভাবে তোমরা মানুষ করেছ, তাতে করে ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা আল্লাহপাক আমাকে দিয়েছেন। ওসব নিয়ে আমি চিন্তা করি না। নানার কাছে মামার সব কথা শুনে এবং ঐ ছেলেটার কাছ থেকে তার যতটুকু পরিচয় পেয়েছি, তাতে মনে হচ্ছে, ঐ ছেলেটাই ফায়জুর মামার ছেলে। সে পরিচয় দেবার সময় বলেছিল, তার বাবার পছন্দমত মেয়েকে বিয়ে করেননি বলে তার বাবা তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। তারপর অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেন এবং শ্বশুরের সাহায্যে ব্যবসা করে বড়লোক হয়েছেন।

রাবুর আগের জীবনের সব কথা মনে পড়ল। তখন তার চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল। চোখ মুছে ভিজে গলায় বলল, তোর অনুমান যেন আল্লাহপাক সত্যে পরিণত করেন। এবারে ঢাকায় গিয়ে তুই ছেলেটার কাছ থেকে তার বাবার সবকিছু জেনে নিবি। আবার যখন আসবি তখন তাকে সাথে করে নিয়ে আসবি।

আসিয়া বলল, নানাও তাকে নিয়ে আসতে বলেছেন। আমার অনুমান যদি সত্য হয়, তাহলে নানা শেষ বয়সে অন্ততঃ কিছুটা শন্তি পাবেন।

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *