কাঞ্চন-মূল্য – ৩

ওরা চলে যেতে আমি আরও খানিকটা এগিয়ে গোরুটার পিঠে কষে দু’ঘা পাচনবাড়ি কষিয়ে মাঠের দিকে খেদিয়ে দিলুম, তারপর ত্যাখুনি ত্যাখুনি এসে দিদিমণিকে একটি একটি ক’রে সব কথা বলে গেনু। দিদিমণি রান্নাঘরের দাওয়ায় ব’সে বাটনা বাটছেল, বললে—“ঐ হিড়িম্বে রাক্কুসীর মতন চেহারা, বয়সের গাছ পাথর নেই, আর ওকে ডানাকাটা পরী বলে চালিয়ে দিলি তুই।…আমার চেয়ে সরেস।’

বললুম— ‘তা জোর ক’রে বললে, আমি কি করব?’

হাসি রোগ তো, বাটনা ছেড়ে দিয়ে খুব একচোট হাসলে, বললে—‘তা করেচিস ভালো। আমি শুধু ভাবচি—য্যাখন জোড়া-বকুলতলায় শীরাধিকের সঙ্গে দেখাটা হবে, শ্যামরায়কে যে আমার সদ্য সদ্য ভির্মি যেতে হবে রে!… আর টের পেলে তোর অবস্থাও যে কি করবে ঘোষালের কু-পুত্তুর তাও ভেবে যে হদিস পাচ্ছি না রে স্বরূপ। দেরি হবে না তো টের পেতে, পাড়া কাঁপাতে কাঁপাতে মাসিমা এই খানিকক্ষণ হোল নদীতে চান করতে বেরিয়ে গেল,—‘হ্যাঁ, স্বয়ংবরা হবো- হ্যাঁ, বিধবা-বিয়ে হ’তে এয়েচি, দেখি মসনের লোকের ক্ষ্যামতাটা, একবার আটকাক ব্রেজোরামনীকে।… বাড়ি নুট করবে? -ঘরে আগুন দেবে?—দেখি কত বুকের পাটা সবার!’…কমণ্ডুলুটা হাতে নিয়ে এই করতে করতে গেল যে এই মাত্তর। কালকের যে কাণ্ডটা হোল, তারপর সমস্ত মসনের জানাজানি হয়ে গেচে যে, রাখালের মা, দামোদরের পিসি-এরা সব এসে আমায় টিটকিরি দিয়ে গেল কিনা—মাসিমা ঘাটে গেছল, ফিরে আসতে সব বললুম- তারপরেই কমণ্ডুলু নিয়ে ঐ করতে করতে বেরিয়ে গেচে। তাই ভাবচি—ডানাকাটা পরী চিজটা কি যখন টের পেয়ে যাবে ঘোষালের কু-পুত্তুর, তোর ব্যবস্থাটা কি করবে!

আমি বললুম—‘উনি অন্য পথে গেচেন, ওরা তিনজনে অন্য পথ দিয়ে লোচন ঘোষের আড্ডা ছেড়ে নিধু সাঁবুইয়ের আড্ডায় গেল; টের পাবে না।’

বললে—‘না হয় আজ না টের পেলে, কাল?—না হয় পরশু—তরশু–একদিন তো পাবেই।’

ভয় তো নেগেই ছেল, আরও ভয় পেয়ে গেলুম দা’ঠাকুর, বললুম— ‘আমি তাহলে আর বাড়ি ছেড়ে বেরুব না দিদিমণি—ওনার কাচে থাকব, বেশ শক্ত মেয়েমানুষ।’

দিদিমণি আবার ডুকরে হেসে উঠল; অনেকক্ষণ ধরে দুলে দুলে হেসে চোখ মুছে বললে—‘কী জিনিসই এসে বাড়িতে ঢুকল বাবা! দুটি পুরুষ বাড়িতে—একজন বলচে বাড়ির বাইরে পা দেবে না, একজন উদিকে বাড়ি ছেড়ে তাড়াতাড়ি পালাতে পারলে বাঁচে।’

আবার হেসে উঠল, তারপর বললে—‘বাবা সটকে পড়েচে—জানিস সে কথা?’

জিগ্যেস করলুম—‘সত্যি নাকি?’

বললে— ‘সত্যি নয় তো মিথ্যে বলচি?—নৈলে এত সকাল সকাল হেঁসেলে ঢুকব কেন? -দেখেচিস কখনও আমায়?… বাবা বিধবা বিয়ের ভয়ে পালাচ্চে। অবিশ্যি তা বললে না, বললে—“দুটি ভাতে-ভাত নামিয়ে দে, দিনকতক শিষ্যিবাড়ি ঘুরে আসি”…আর কিছু অবিশ্যি বললে না, তবে আমি যেন বুঝতে পারি না!… একটা মানুষ এল বাড়িতে, কুটুম, আর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির কত্তা ভিটে ছাড়া। ওমা, কেন গো।… বললে না, তবে আমি একটু বলিয়ে নিলুমও তো…হ্যাঁ বাবা, মাসিমা এলেন, আর তুমি সঙ্গে সঙ্গে শিষ্যিবাড়ি বেরিয়ে যাবে, কিরকম দেখতে হয় না?…না, ‘ঠিক দেখতে হয় বাছা, খ্যাপাটে মানুষ, কী মতলব ক’রে এয়েচে, তারপর এসেই এই কাণ্ড—আরও গেচে মাথার গোলমাল হয়ে, কি করতে কি ক’রে বসবে। আমি বরং একটু ঘুরে আসি, ত্যাদ্দিনে মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হোক; তুই একটু মানিয়ে-সানিয়ে রাখিস।”

দিদিমণি তাড়াতাড়ি আবার মশলাটা পিষতে আরম্ভ করে দিলে, বললে’দেখ, ভুলেই যাচ্ছিলুম, মাসিমা নেয়ে আসবার আগেই বাবা বেরিয়ে যাবে কিনা।… জিজ্ঞেস করচিস-কেন? …ওমা, ক’নে যদি বরের পথ আটকে দাঁড়ায়?

—হাসতে হাসতেই ঘ্যাস ঘ্যাস করে পিষে যেতে লাগল মশলাটা। ওনার যেমন রীত —একটু পরেই মুখটা থমথমে হয়ে গেল, আর সে মানুষই নয়। ঐরকম হয়ে গেলে একটু ভয়ও হোত, আমি চুপ করেই আচি, ওই বললে—“কি বলছিল র‍্যা ঘোষালের কু-পুত্তুর? —ভশ্চাজের মেয়েটা বড় ফিচেল? একটু সবুর ধ’রে থাকতে বলিস, এখনও ফিচলেমির কি দেখেছেন বাছাধন?’

ঠাকুরমশাই খানিক পরেই বেরিয়ে গেলেন দা’ঠাকুর—সে চম্পট দেওয়াই বৈকি। দিদিমণি ভাত চড়িয়ে রান্নাঘরের চৌকাঠে ব’সে আমার সঙ্গে গল্প করচে, আমি দাওয়ায় পৈঠেয় ব’সে আচি, এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে এসে ঢুকলেন বাড়িতে। ‘মা নেত্য, তোর হোল? তা’ হ’লে দু’টি দে বেড়ে, রোদটা চড়চড়িয়ে উঠচে, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ি, দূরে যেতে হবে।’

বলতে বলতে ঘরের পানে চলে গেলেন।

সে যা চাপা হাসি দিদিমণির, মনে হোল ভুঁয়ে বুঝি নুটিয়ে পড়বে। জিগ্যেস করলুম—‘কি হোল গা দিদিমণি, অত হাসচ কেন?’

বললে—দেখো! যেমন মনিব তেমনি তার নফর।….হ্যাঁরে, রোদ্দুর কোথায়? সকাল থেকে একটার পর একটা মেঘ জমে আসচে, আমি ভেবে মরছি আজও বুঝি বড়িগুনো শুকুতে দেওয়া হোল না…’

বললুম— ‘উনিও বোধ হয় মেঘের কথাই বলতে যাচ্ছেল…’

দিদিমণি আবার ডুকরে হেসে উঠল, বললে—‘তুই সামনে থেকে বেরো স্বরূপ, দূর হ’; আর ব’সে ব’সে আমায় হাসাস নে এমন করে, বাবা এক্ষুণি খেতে আসবে।…একটা মানুষের মাথা এমন গুলিয়ে বসল যে বলতে যাচ্ছিল মেঘের কথা, বলে বসল রোদ্দুর চড়চড়িয়ে উঠছে!—অথচ ব্যাপারখানা কি, না, শালী এসে ভয় দেখিয়ে বলেচে বিয়ে করবে।… বেশ হয়েচে, পাপে প্রাশ্চিত্তির—যান্ না নাপিয়ে নাপিয়ে যত বিধবাদের বিয়ে দিতে…. ‘

নকল করতে হ’লে কাউকে তো আর বাদ দিত না; বলে আর দুলে দুলে হেসে ওঠে, বলে আর দুলে দুলে হেসে ওঠে।

তাও কি একটু সুস্থির হয়ে দুমুঠো খেয়ে যেতে পারলেন ঠাকুরমশাই?

‘ঝোলটা বেশ রেঁধেছিস নেত্য, আর একটু দে দিকিন বলে আরও চারটি ভাত ভেঙেচেন, এমন সময় বোসেদের পুকুরঘাটের কাছে ব্রেজোঠাকরুনের গলা উঠল।

ঠাকুরমশাই কান খাড়া ক’রে সোজা হয়ে বসলেন। দিদিমণি কড়া থেকে খানকতক আনাজ আর খানিকটা ঝোল হাতা ক’রে তুলে দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই তাড়াতাড়ি গণ্ডুষ করে উঠে পড়লেন ঠাকুরমশাই। দিদিমণি তো অবাক; জিগ্যেস করলেন—‘কি হোল বাবা?’

ঠাকুরমশাই ততক্ষণ কুলকুচু করচেন, বললেন—‘না, ভেবে দেখলুম মা, অনেকটা পথ যেতে—চাপ হ’য়ে যাবে খাওয়াটা।’

‘তা খেলে কোথায় তুমি যে চাপ হবে? ভাত-হাতেও তো করলে না।’

‘তুই তো দেখতেই পাবি না, মা হোস্ কিনা। না, বেশি লোভ করা ঠিক না।’

বলতে বলতেই কাঁধে চাদরটা ফেলে চটি প’রে ছাতাটা নিয়েছেন। ‘কি যেন ভুলে গেলুম, কি যেন ভুলে গেলুম’—ক’রতে ক’রতে একটু থমকে ইদিক-উদিক চাইলেন, তারপর—‘থাকগে, পথে মনে পড়ে যাবে’খন’ ব’লে দুগ্ধা নাম নিয়ে সদর দোর পর্যন্ত এগিয়েচেন আবার থমকে দাঁড়িয়ে ঘুরে এলেন।

‘দেখলি তো, বলছিলুম না—কি যেন ভুলে যাচ্ছি?’—বলে চাদরের খুঁটের গেরো খুলে চারটে ট্যাকা বের ক’রে দিদিমণির হাতে দিলেন। ‘ত্যাদ্দিন চালাবি কোনরকম করে মা, শিগগিরই ফিরে আসচি, পারি কখনও বাইরে বসে থাকতে?—বাড়িতে একটা কুটুম।’

দিদিমণি বললে—‘দাঁড়াও, পেন্নামটা ক’রে নি, এমন তাড়াহুড়ো করে বেরুচ্চ বাবা, টুকতেও তো পারি না।

গড় ক’রে উঠে বললে—‘কুটুমকে বলব কি তা তো মাথায় আসচে না। তা সে না হয় একটা কিছু হবে, কিন্তু তুমি আবার তো ঘোষাল বুড়োর কাছ থেকে টাকা নিয়ে এলে বাবা?’

‘সে তুই কিছু ভাবিস নি। দেখ না, এইবারেই ফিরে এসে কি রকম হালকা হই, সে তুই কিচ্ছু ভাববি নি।’—বলতে বলতে খিড়কির দিকে বেরিয়ে গেলেন হনহন ক’রে।

রান্নাঘরের খুঁটোয় ঠেস দিয়ে দিদিমণি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো আকাশের দিকে চোখ ক’রে, ট্যাকা কটা মুঠোর মধ্যেই রেখেচে। অনেকক্ষণ একভাবে থেকে দু’চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। তারপর খামোকা আঁচলটা তুলে নিয়ে চোখ দুটো মুছে বললে- ‘নাঃ, কিচ্ছু ভাববো না তো, যাদের অনেক ভুগতে হবে তাদের কথায় কথায় মন খারাপ করলে চলে?’

ট্যাকা চারটে আঁচলে বেঁধে গেরোটা খুব ক’ষে টেনে দিলে, বললে, ‘আমি সতীলক্ষ্মী মায়ের মেয়ে, ঢের উপায় আচে-কোনও মতলব খাটবে না আমার কাছে।’

শেকলটা তুলে দিয়ে বললে— ‘তুই আজ ঐ ভাত, ঝোল, ভাজা, অম্বল সব নিয়ে যাবি বাড়ি স্বরূপ; না হয় বাকোড়ে আঁটে একলাই গিলিস্।

বললুম— ‘আর তুমি খাবে না?”

মুখঝামটা দিয়ে উঠল— ‘ঐ ভাত, ঐ ঝোল মুখে ওঠে?’ হাতাটার ঝোল তুলে আবার কড়ায় রেখে দিতে হোল। বলি তো মনখারাপ করব না কিছুতেই, কিন্তু রাগ বলেও তো একটা জিনিস আচে, মানুষের শরীল তো…’

বলতে বলতেই আবার খিলখিল করে হেসে উঠল।

—ওর ঐ রকম ছেল তো—বললে— ‘তাও রাগ করতে দেবে লোককে তবে তো…কেন যেতে যেতে সদর থেকে ফিরে এল বাবা বল দিকিন।’

বললুম—তোমায় ট্যাকা দিতে হবে মনে পড়ে গেল, তাই।’

‘নেঃ, আমার জন্যে তো কত মাথাব্যথা! ঐ এক দজ্জালের হাতে ছেড়ে দিয়ে গেল। বাবা সদর থেকে পালিয়ে এল, মাসিমা যে উদিক দিয়ে এসে পড়তে পারে—তখন।… তার চেয়ে তাড়াতাড়ি খিড়কি দিয়ে সটকে পড়ি বাবা—দরকার কি…’

বানিয়ে বানিয়ে বলে আর হাসতে থাকে, বলে আর হাসতে থাকে; বেশি হাসলেও চোখ দিয়ে জল পড়ত তো, খানিকক্ষণ পরে ভালো করে মুছে নিয়ে বললে— ‘জ্বালা! এক দিকে ঐ ভয়-কাতুরে পুরুষ আর এক দিকে ঐ দজ্জাল মেয়েমানুষ—কি ক’রে সামলাবে সামলাও এখন—‘

ঠাকুরমশাইয়ের পালাবার কথাটা কয়েকটা দিন ব্রেজঠাকরুনের কাছ থেকে চাপা দে’ রাখলে দিদিমণি।

—এই তুমি আসবার আগে একটু শিষ্যিবাড়ি বেরিয়ে গেল…এই একটু দক্ষিণপাড়ায় মিত্তিরদের বাড়ি গেচে…বাবা কাল অনেক রাত ক’রে ফিরল যে মাসিমা, তুমি ত্যাখন ঘুমুচ্চ, তুলতে মানা করলে’…কখনও বা বলে— ‘এসেই তাড়াতাড়ি দুটি খেয়ে বেরিয়ে গেল, ঘোষেদের পুকুর থেকে নেয়েই এসেছিল, তুমি পুজোয় বসেছিলে, ব্যাঘাত হবে ব’লে আর গলা তোলে নি…’

বোশেখ মাস, বিয়ে, পৈতে, ব্রোতোপাব্বনের হিড়িক, অবিশ্যি তার সঙ্গে ঠাকুরমশাইয়ের সম্বন্ধ অল্পই, তবু ঐ ছুতো করে দিন চার পাঁচ বেশ কাটিয়ে দিলে দিদিমণি—য্যাখন ব্রেস্টাকরুন বাড়িতে থাকে না ত্যাখন বলে বাবা এই তো ছেল, য্যাখন তিনি বাড়িতে, ত্যাখন বলে গাঁয়ের কোথায় যজমানবাড়ি বেরিয়ে গেচে। একদিন হয়তো বললে, মাঝেরপাড়ার হালদারদের বাড়ি থেকে ব’লে পাঠ্যেচে ঠাকুরমশাই রাতটা ওখানেই থাকবেন—বড় কাজ, যোগাড়যন্ত্র করতে হবে।…চালাক মেয়ে, বেশ একরকম চাপাচুপি দে চালিয়ে নিলে কটা দিন। পাছে ব্রেজঠাকরুনের সন্দো হয় সেইজন্যে রেওয়াজ-মাফিক ঠাকুরমশাইয়ের সিধে বের ক’রে যাচ্চে, রান্না ভাতডাল আমি নে যাচ্চি।

চলে যে যাচ্চে তার হেতু, ব্রেজঠাকরুন ত্যাখনও বাইরেটা নিয়েই পড়ে রয়েচে—বাড়িতে কে আচে না আচে, কি করচে না করচে তার হিসেব রাখবার তেমন ফুরসতই বা কোথায় বলুন? কথাটা বুঝলেন না? যে সময়ের কথা বলচি আপনেকে সেটা তো আর এইরকম পিলে-ম্যালেরিয়ার সময় নয়। কী হাঁকডাক গ্রামের! এই পাড়াতেই ত্যাখন শোভা করে রয়েচে উদিকে রাখালের মা, দামোদরের পিসি, নকুড় ঠাকুরের মেজো ভাজ; ইদিকে সামন্তদের মেজবৌ, তারপর আপনার গিয়ে সৈরভী বাগদিনী,—কোঁদল পেলে নাওয়া খাওয়া ভুলে যায় সব, ছোটখাটোগুলোর আর নাম করলুম না এদের সামনে। প্রেথম ঝোঁকটা এদের সঙ্গে পরচে করতে, এদের সবাকোর কার কতো দম বুঝে নিতে কেটে গেল তো, বাড়িতে কি হচ্চে না হচ্চে তার ভালোমত হিসেব রাখবার আর ফুরসত পেলে কোথায় ব্রেজঠাকরুন? আগেকার দিনের জেরটা টানতে টানতে বিছেনা থেকে উঠে পথে দিগ্বিজয় করতে করতে গঙ্গার ঘাটে যায়। পথে পয়লা দামোদর মুকুজ্জের বাড়ি, তানার পিসি দরজার কাছে রেডি হয়ে দাঁড়িয়েই থাকে, একচোট বেধে যায়। তার জের মিটতে মিটতে নকুড়ঠাকুরের মেজো ভাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। গঙ্গায় ডুব দিয়ে মাথা যেটুকু ঠাণ্ডা হোল ফিরতে ফিরতে আবার পুব্বেকার মতন হয়ে যায়। শ্মশান-বন্ধুদের মতন তেমন তেমন ডাকসাইটে কুঁদুলীরাও যে-রাস্তায় যায় সেই রাস্তায় ফেরে না দা’ঠাকুর, জানিনে একটু লক্ষ্য ক’রে দেখেছেন কিনা। আপনি হয়তো বলবেন ওরা যেখানে মানুষটোকে ব’য়ে নিয়ে যায় ঘাড়ে ক’রে, এরাও সেখানেই পাঠাবার ব্যবস্থা করে তো, তাই পদ্ধতিটা একইরকম ধরে রেখেচে। হয়তে, তাই-ই, একেবারে কাটতে পারি নে কথাটা, তবে যারা জাত-কুঁদুলী তারা আবার একটু রকমারি চায় তো…যেতেও সেই দামোদরের পিসি, নকুড়ঠাকুরের ভাজ, আসতেও সেই দামোদরের পিসি, নকুড়ঠাকুরের ভাজ—এতে মন বসবে কেন বলুন না। তাই আসবার সময় ব্রেজঠাকরুন ও রাস্তাটা বাদ দিয়ে ভিজে গামচাখানা পাট ক’রে মাথায় চাপ্যে ভগ্‌চায্যিপাড়া হয়ে আসত। ও-পাড়ায় রাখাল গোঁসাই-এর মা, ত্যাখন পাড়ায় তিনিই ফাস্টো যাচ্চে। এ-লোভটুকু অবিশ্যি ছেল, তবে ব্রেজঠাকরুন আরও বেশি করে ও-পাড়া দে যে আসত তার হেতু ঐ পাড়ায়, বড় রাস্তার ওপরেই ছেল রিদয় ভচায্যির বাড়ি। আজ্ঞে হ্যাঁ, যার বোলবোলাওয়ের কথা গোড়ায় বললুম না আপনেকে, সেই রিদয় ভচায্যি। উনিই যে ঠাকুরমশাইয়ের য্যাত কিছু ক্ষতি করার মূলে সে সংবাদটা তো পেয়েচেন ব্রেজঠাকরুন; একবার বাসনাটা তানার সঙ্গে একটু সামনাসামনি হবার, নড়াইয়ে নামলে উদিকে পুরুষ রয়েচে কি মেয়ে রয়েচে সেটা তো গ্রাহ্যির মধ্যে আনতেন না। তা কিন্তু রোজ পহর ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে ফেলেও কোন ফল হোল না। ওবিশ্যি নাম ধ’রে তো ডাক পাড়া যায় না, স্ত্রীলোক একটা হায়া আচে, অতবড় জলজ্যান্ত পুরুষটোর নাম ধ’রে তো হাঁক দেওয়া যায় না, তবে তানারই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে যাত্রার গোড়ায় দাশরথি অধিকারীর গুরুবন্দনার মতন পা থেকে মাথা পর্যন্ত যে-বর্ণনাটা সাজিয়ে দিত তাতে তো আর কারুর মনে দ্বিধে-সন্দো থাকতে পেত না কাকে উদ্দিশ করে কথাগুলো বলচে ব্রেজঠাকরুন।… ভুঁড়ো, গজকচ্ছপ, বেলমুণ্ডী, মুখ্যু, পেটে এক ছটাক বিদ্যে নেই শুধু টিকির গোছা দুলিয়ে ভালোমানুষদের পসার নষ্ট ক’রে বেড়াচ্চে-কোথায় আচে সে, বেরিয়ে আসুক না মদ্দ হয় তো।…উঃ! বড় বড় পণ্ডিতের টিকি উপড়েচেন তারই দেমাক। আসুক না বেরিয়ে, এবার নিজের টিকি নিয়ে কেমন ফিরে যায় দেখি!… “

আজ্ঞে হ্যাঁ, বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে; আর এই ভাষা, এই ব্যাখ্যানা; কিন্তু কে বেরুচ্চে? অমন দুদ্ধষ্যি মানুষ তো রিদয় ভচায্যি, দূর থেকেই ব্রেজঠাকরুনের গলা শুনে আগে থাকতেই বাড়ি ছেড়ে সটকে পড়ত, যদিই বা কোন কারণে আটকে গেল তো দোরে খিল লাগিয়ে ভেতরে বসে থাকত। ও-পাড়ায় আবার উনিই মেয়ে-পুরুষ সবাইকে দাব্যে রেখেছিল তো, অন্য কেউও বেরিয়ে এসে যে প্রিতিবাদ করবে তাও নয়, নিঃঝুম পাড়ায় পহরখানেক দাঁড়িয়ে মনটা হাল্কা করে ব্রেজঠাকরুণ একেবারে ঘোষপুকুরের ঘাটে এসে উঠত। মন হাল্কা হোক, মাথাটা তো আবার তপ্ত হয়ে উঠেচে। গোটাকতক ডুব না দিলে ঠাণ্ডা হবে কি করে? তা ভেন্ন ঘোষপুকুরে শেষ মোরাড়া; ওখেনে সামন্তদের মেজবৌ আর আপনার গিয়ে সৈরভী বাগদিনী ত্যাতক্ষণে আসর গরম করে রেখেচে; এরা আবার মণ্ডলপাড়ার নোক তো, ব্রেজঠাকরুনের পাটিতেই এসে পড়েছে। তিনি উদিক থেকে আসার সঙ্গে যেন মা রগচণ্ডীও স্বয়ং এসে অবতীন্না হতেন। ক’দিনেরই বা কথা? কিন্তু ইরিই মধ্যে ঘোষপুকুরের নামডাক বেরিয়ে গেল। এর ওপর আবার বাড়িতে ফিরেও অকস্মাৎ এক-আধবার মনটা উতলে উঠলে, বেরিয়ে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হালকা হয়ে এল। ইদিকটা নোকচলাচল কম তো, তা কে শুনলে না শুনলে সেটা তো কথা নয়, নিজের মনটাকে হালকা করা। কতকটা আজকালকার আপনাদের ঐ রেডিও না কি, তার মতন। চৌধুরীরা এনেচে তো, গিয়ে বসি মাঝে মাঝে…মানে, আমি আমার যা বলবার বলে গেনু, যা গাইবার গেয়ে গেনু মন সাফ ক’রে—যার শোনবার কল ঘুরিয়ে শুনে নেও, যে চাও না শুনতে কল টিপে ব’সে থাকো। মাঝে মাঝে ছোটখাটো একটা বেধেও যেতো। এর মধ্যে বাড়িতে কে কখন এল, কে কখন গেল, কে খেলে কে না খেলে তা দেখবার ফুরসতই বা কোথায় বলুন না। একদিন দিদিমণি বললে না? বলে— ‘শালী-ভগ্নীপোতে যদি হয়ে যেত বিয়েটা তো কিন্তু যাকে বলে রাজযোটক একেবারে সেই জিনিসে দাঁড়াত স্বরূপ!

জিগ্যেস করলুম, কেন গা দিদিমণি? না, ‘দেখচিস না, বাবা যেমন আগে নিজের পুঁথি নিয়েই থাকত, কোথায় কি হচ্চে সাড় থাকত না, মাসিমারও সেই রকম নয়? নিজের কাজ নিয়ে মশগুল, আর কার হিসেব রাখবে?”

বললুম—‘কাজ তো শুধু কোঁদল।’

দিদিমণি বললে—‘মর ছোড়া, যার যা কাজ, তুই যে এই নাহক বাঁজা গোরু তাড়িয়ে মরচিস। তা ভেন্ন, কোঁদলই যদি বললি, বাবারও তো কোঁদলেরই পুঁথি, সে না হয় নিবিষ পণ্ডিত মানুষের কোঁদল, আর মাসিমার একেবারে ফণিমনসা।…মুখিয়ে আচি কবে মালা বদলটা হবে।’

দিনকতক দিব্যি চলল, দক্ষিণপাড়ায় কাক-চিল বসতে পায় না, তারপর ও পক্ষের ওরা যেন কাহিল হয়ে এল। গয়ারামের কোন্ সেই সাত পুরুষের বোনঝির বিধবা-বিয়ে দেওয়া নিয়ে হল্লাটা আগেই ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল, ওনার নিজের বিধবা-বিয়ে করা নিয়ে ঘোটটিও তাবৎকালের জন্য চাপা পড়ল। সবাইকে বলতে হোল—হ্যাঁ, এ্যাদ্দিন পরে মসনেতে একটা স্ত্রীলোকের মতন স্ত্রীলোকের পদাপ্পন হয়েছে।

তা হোক, কিন্তু ইদিকে যে সংসার চলা দায়। ঠাকুরমশাই সেই সদর এড়িয়ে খিড়কি দে পালাবার কালে সেই যে চারটে ট্যাকা দিয়ে গেছল সেই ক’টি তো সম্বল, তা এই অভাবের সংসারে তার আর পরমায়ু কতটুকু বলুন না। তার ওপর বাড়িতে কুটুম, আর ঐরকম কুটুম, খাওয়ার দিকটা একটু নজর রেখে মাথা ঠাণ্ডা রাখবার যথাসাধ্য একটু চেষ্টা করতেই হয়। তার ওপর আবার এই সময় সামনে একাদশীর উপোস এসে পড়ল।

সলা পরামর্শ করতে তো একা আমি; দিদিমণি বললে—“কি করি বল তো স্বরূপ, হাতে যে ক’গণ্ডা পয়সা আছে, মাসিমার একাদশীটা না এসে পড়লে আরও দিন পাঁচেক চালিয়ে নিতুম টেনেটুনে, এখন যে আতান্তরে পড়লুম।’

আমি বললুম— ‘কেন গা দিদিমণি, একাদশীতে দিব্যি তো দুবেলার খোরাক বাদ পড়ল ওনার।’

দিদিমণি মুখনাড়া দিয়ে বললে—‘খুব নোকের কাচে সলা নিতে গেচি। ওঁর নজরে শুধু একাদশীটুকুই পড়ল! আগে পিছে একটা দশুমী আর একটা দ্বাদশী নেই?… তা ঠিক কথাই দা’ঠাকুর, আর সবের বেলায় একাদশী বলতে একাদশীই বুঝোয়, ব্রেজঠাকরুনের বেলায় দশুমী আর দ্বাদশীর কথাই বেশি ক’রে ধরতে হয় কিনা। বামুনের মেয়ে, খুঁড়তে নেই, কিন্তু শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে খোরাকটুকুর দিকে চাইলে দুশমনের মুখ শুকিয়ে যাবে না? তা দোষও দেওয়া যায় কি ক’রে বলুন, ঐ তো দাপট দেখলেন—গ্রামকে গ্রাম ক’দিনের মধ্যে ঠাণ্ডা,তা এর জন্যে রসদ চাই তো? মালগাড়ি-টানা ইঞ্জিনের যা ব্যবস্থা করবেন করুন, তবে আপনার গিয়ে যে ইঞ্জিনটাকে ডাকগাড়ি টেনে নিয়ে যেতে হবে তাকে তেমনি কয়লা যোগান দিতে হবে তো?’

আমি বললুম –’আমার দো-আনিটা না হয় নেবে বের ক’রে দিদিমণি?’

ওনারই দেওয়া পয়সা জমিয়ে জমিয়ে একটা দো-আনি ক’রে রেখেছিলুম দা’ঠাকুর, সেটা ওনারই কাছে থাকত। ছেলেবেলার একটা সম্পত্তি তো, দরকারে-অদরকারে সেটার কথা তুলতুম, তার কারণ, যেমন খুব ইচ্ছে হোত অভাবের সময় সেটা খরচ করুক দিদিমণি, তেমনি আবার ভয়ও হোত, অভাবের মাথায় করেই ফেলে নি তো খরচ! – ছেলেমানুষের মন তো ত্যাখন? সুবিধে পেলেই ঐরকমের খোঁজখবরটা নিতুম।

দিদিমণি বললে—‘ওমা, সত্যই তো, তোর আবার একটা ব্যাঙের আধুলি আছে যে, মনেই ছেল না, দুভ্‌ভাবনা গেল।…না, বাজে কথা থাক্, আমি এক মতলব বের করেচি স্বরূপ, বাপেরই বেটি তো।’

জিগ্যেস করলুম—‘কি মতলব গা দিদিমণি!’…না, ‘আমি না একাদশী ঘোষালের হবু পুত-বৌ, আমার ট্যাকার অভাব কি র‍্যা? বাবাকে তো তবু ঘর-বাড়ি, ইস্তক মেয়ে পর্যন্ত বন্ধক রেখে ট্যাকা নিতে হয়েচে, আমার কি? —-আমার খাজাঞ্জি তোবিল আগলে ব’সে আচে, হাতচিটে কাটব হুকুম করব আর ট্যাকা এসে পড়বে।

কথাটা হালকা ভাবেই বলেছেল, বলতে বলতেই কিন্তু দিদিমণির মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। ঘোষালবাড়ির কথা উঠলেই যেমন হয়ে যেত না? -রান্নাঘরের খুঁটিতে ঠেস দে’ কথাগুলো বলছিল আমায়, নারকোল গাছের মাথার দিকে চেয়ে খানিকটা চুপ ক’রে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর বললে—“তোকে সিদিন ঘোষালের কুপুত্তুর কি বললে রে স্বরূপ? —ভট্‌চায্যের মেয়ে ভারী ফিচেল?…ফিচলেমির এখনও দেখেচে কি ওরা?…আজ হচ্চে অষ্টমী, আর দিন নেই, তুই একটা চিঠি নিয়ে আজ সন্দের সময় একাদশী ঘোষালের ওখানে যাবি, শুধু দেখবি আর কেউ যেন না জানতে পারে। হ্যাঁ, ট্যাকার কথাই নিকচি, দেখি ও না খেয়ে, নেংটি প’রে কত ট্যাকা জমিয়েছে। কেন দেবে না মিন্‌সে?—বৌ না খেতে পেয়ে শুকুচ্চে, ট্যাকা দেবে না? —আর সে বৌও কে না, এ তল্লাটের ডাকসাইটে পণ্ডিত অনাদি ন্যায়রত্নের মেয়ে, ওর চৌকাঠ মাড়ালে ওর চোদ্দপুরুষের পাপক্ষ্যায় হয়ে যাবে।…দেবে না! না দেয়, আরও ফন্দিফিকির আছে আমার মাথায়, সাবালক মেয়ে, আইন আমার দিকে…. ‘

কতকটা নিজের মনেই ব’লে যাচ্ছেল, এমন সময় ব্রজঠাকরুনের গলা উঠল, ঘোষপুকুর থেকে ডুব দিয়ে আসচে। দিদিমণি তাড়াতাড়ি খুঁটি ছেড়ে দাওয়া থেকে নেমে পড়ল, বললে— ‘ঐ রে আসচে পোড়াকপালী…পোড়াকপালী ওকে বলব, না নিজেকেই বলব? একটা মাসি জুটল বরাতে তাও ঐ ভাঙা কাঁশি!… আজ যেন আবার সকাল সকাল ফিরল যে! বেশ একটু মন খোলসা ক’রে হালকা হচ্ছিলুম…কালও ফিরেছিল টাইমের আগেই।’

বললুম—‘শুনছিলুম কোঁদলে আর কেউ ওনার তেমন মোহাড়া নিতে পাচ্চে না, তাই কাল থেকে কতকটা একতরফা সেরেই তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরচেন উনি; দামোদর ঠাকুরের পিসি তো মসনে ছেড়ে বদ্যিবাটিতে তানার শ্বশুরবাড়ি চলে গেচে; আমায় লখনা বললে।’

লখনা ছেল আমাদের পাড়ারই ছেলে দা’ঠাকুর, আমারই সমবয়সী, আমার সঙ্গে গোরু চরাত। কিন্তু লখনা কলহ বড্ড ভালোবাসত করতে নয়, শুনতে দা’ঠাকুর। রোগা লিকলিকে, কলহ করবার ক্ষ্যামতা তার ছেল না—কলহটা ভালোবাসত ব’লে আমাদের হাতে গোরু ছেড়ে বেরিয়ে যেত দুটো খ্যাংরা কাটি হাতে করে, একটু তফাতে আড়ালে থেকে ব্রেজঠাকরুনের পেছনে পেছনে ঘুরত, বেধে গেলে আরও একটু আড়াল হয়ে কাটি দুটো হাতের তেলোয় পাক্যে নারোদ নারোদ বলতে থাকত—উনি আবার দেবতাদের কলহ ডিপার্টমেন্টের ইনচার্য কি না। আগুন লাগতেই এসে ফুঁ দিয়ে গনগনিয়ে দিত। তারপর ব্রেজঠাকরুন ফিরে এলে, আমাদের কাছে প্রিতি দিবসের রিপোর্টটা দাখিল করত লখনা।

লখ্‌নার কথা শোনে আর উলসে উলসে হেসে ওঠে দিদিমণি; বলে—“তুই বেরো আমার সামনে থেকে স্বরূপ, খবরদার আমায় হাসাবি নি, হাসবার ফুরসত নেই আমার। ঐ এসে পড়ল বলে, এখনও পুজোর যোগাড় হয় নি, ওদিকে খোরাক পায় নি, আজ আমারই ঘাড় ভাঙবে এসে।’

ওবিশ্যি দিদিমণির সঙ্গে তুলনা হয় না, মনে কী কষ্টটা চাপা যে হাসিমুখে কাটিয়ে দিত এখন তো বুঝি, তবু আমারও হুজ্জতটা কম ছেল না দা’ঠাকুর। এই যে বললেই বুঝতে পারবেন।

দুপুরে সবার খাওয়া-দাওয়া সারা হ’তে ব্রেজঠাকরুন যখন পাশের ঘরে শুয়েচে, দিদিমণি সত্যিই একখানা চিঠি নিকে আমায় ডেকে গোয়ালে নিয়ে গেল। চিঠিটা হাতে দিয়ে ফিশফিশ ক’রে বললে— ‘গোরু নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিস তো, এখন নয়, যখন বেশ সন্দে হয়ে আসবে, গোরুটাকে কারুর সঙ্গে বাড়িমুখো ক’রে দিয়ে তুই উদিক দিয়ে উদিক দিয়েই একাদশী ঘোষালের বাড়ি চলে যাবি। দেখবি যেন ছিরের হাতে পড়িস নি, পড়লে টপ করে চিঠিটাকে গুলি করে পাকিয়ে নিয়ে মুখে ফেলে গিলে ফেলবি। ঘোষালকে পঞ্চাশটা ট্যাকার জন্যে নিকলুম।’

আমি দিদিমণির কথা রেখেই বললুম—‘গালমন্দ লেখনি তো দিদিমণি?…বুঝলেন না দা’ঠাকুর? সন্দে, তায় একলা থাকে লোকটা, ভয় করে তো?

দিদিমণি বললে— ‘সে বুদ্ধি আছে আমার ঘটে, না হয় শোনই কি রকম গোড়াবেঁধে লেখা, মুখে যাই বলি, ধৰ্ম্মজ্ঞান নেই? মানুষটা দু’দিন পরে তো শ্বশুরই হবে

নকুলে তো?—ইদিকে বেশ ভালো ক’রেই নেখাপড়া করেচে ঠাকুরমশায়ের কাচে, শীল শীযুক্ত মহামহিম দানসাগর শীরাজীবচন্দোর ঘোষাল বরাবরেষু’ ব’লে গড়গড় ক’রে খানিকটা পড়ে গেল, পাটোয়ারিরা রাজা জমিদারদের নামে যেমন মুসাবিদে করে; তারপর হেসে বললে—‘না রে ঠাট্টা করচি—তবে যা নিকেচি ঠিকই আচে, তোর ভয় নেই। তা যাই দেয় তুই চুপি চুপি নিয়ে চ’লে আসবি, দেখবি যেন আবার ছেলের খপ্পরে না পড়িস। তুই এলে আমি মাসিকে নুকিয়ে তোকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে নিয়ে নোব ট্যাকাটা।’

এখুনি বললুম না আপনাকে? –দিদিমণির সঙ্গে তুলনা হয় না, তবু আমার হুজ্জুতটাও কিছু কম ছেল না। ছিরু ঘোষালের ভয়ে গাঁয়ের দিকে যাওয়া একরকম ছেড়েই দিয়েছিলুম, তার ওপর ট্যাকা নিয়ে কাণ্ড, কি করব, কি রকম ক’রে যাব ভাবতে ভাবতে গোরুটাকে খুলে নিয়ে বিদেয় তো হলুম। গোরু ছেড়ে দিয়ে সব রাখালেরা মিলে আমরা একজোট হয়ে খেলা করতুম, কিন্তু সিদিন আর খেলায় মন বসে না, শুধু চিঠির কথাই ভাবচি—না হয় ছিঁড়েই ফেলব? না হয় বলব ছিরু ঘোষাল কেড়ে নিয়েচে? আবার দিদিমণিকে মনে পড়চে—অভাবের চিন্তেয় খুঁটিতে পিঠ দিয়ে মুখটি চুন ক’রে দাঁড়িয়ে আচে।…কি করব কি করব ভাবতে ভাবতে বিকেল গড়িয়ে গেল। আমি কতকটা চাঁই গোচের ছিলুম ছেলেদের মধ্যে; খেলা জমে নি, যে যার গোরু নিয়ে নিয়ে ঢাকা ডোববার আগেই চলে গেল, আমিও লখাকে গোরুটা আমাদের গৈলে বেঁধে দিতে ব’লে উঠে পড়লুম। মাঝেরপাড়ার আর নাম করলুম না, বললুম একবার গয়লাপাড়া ঘুরে যাব, ব্রেজঠাকরুনের দশুমী আসচে, সের আষ্টেক দুধের কথা ব’লে আসতে হবে।…বুঝলেন না কথাটা? আমাদের বাড়িরই নোক, গাঁয়ে হাঁকডাক জমিয়ে ফেলেচে ইরি মধ্যে, দু’এক সেরের কথা বলে খেলো করি কেন তানাকে? ওর সঙ্গে সেরখানেক ছ্যানার কথাও দিলুম জুড়ে।

উঠলুম বটে, তবে দুশ্চিন্তেটা লেগে রয়েচে তো, খানিকটা গিয়ে আবার একটা অশথ গাছের গোড়ার ওপর ব’সে পড়লুম। ঐ ভাবনা-কি করব? না হয় ছিঁড়েই ফেলি চিঠিটা? —আবার সঙ্গে সঙ্গে উদিকে দিদিমণির মুখটা মনে পড়ে যাচ্চে…এই ক’রে ক’রে একবার কি মনে হোল, চিঠিটা ট্যাক থেকে বের করে চোখের সামনে মেলে ধরলুম। সময় পেলে-টেলে দিদিমণি আমায় নিয়ে পড়াতে বসত দা’ঠাকুর; ভাবলুম দেখি তো কি নিকেচে।

স্বরে অ থেকে নিয়ে মূদ্ধন্য ণ পজ্জন্ত অক্ষরগুনো খানিকটা করে উদিকে চিনেছিলুম দা’ঠাকুর, তার পরেই এই ব্রেজঠাকরুনের হিড়িক এসে পড়ল, খানিক গুলিয়েও গিয়েছিল তাতে। তবু মুক্তর মতন হাতের নেকা দিদিঠাকরুনের, খুঁজে পেতে গোটাকতক অক্ষর বের করলুম কোনরকমে, কিন্তু তাতে তো চিঠি পড়া যাবে না। সেই মাথা ঘামাচ্চি ব’সে ব’সে —মানে চিঠির ওপর চোখ রেখে ওদিককোর ভাবনা ভাবচি, এমন সময়…সে কথা মনে হ’লে এখন পর্যন্ত গা শিউরে শিউরে ওঠে দা’ঠাকুর-হোলও তো ইদিকে পেরায় আপনার গিয়ে তিনকুড়ি দশ বছরের কথা।

খুঁজে খুঁজে চেনা অক্ষরগুলো বের করচি, এমন সময় পেছন থেকে কাঁধের ওপর ঠাণ্ডা হাত—‘এখানে একলা ব’সে কি করচিস রে স্বরূপ?’

আঁতকে যে উঠেছিলুম তার জন্যে দোষ দেওয়া যায় না দা’ঠাকুর, যেখানে গোরু চরাতাম আমরা, জোড়া-বকুলতলার মশানটা তার নিকটেই—এই ধরুন যেমন এখান থেকে ঐ ঘোষেদের পুকুরটা। আর আচমকাও তো? ঘুরে চাইতেই কিন্তু সে ভাবটা তখুনি কেটে গেল, বরং বেশ ভরসাই ফিরে এল—ওবিশ্যি তখন-তখনের জন্যে—দেখি আমাদের ঠাকুরমশাই!

ঠাকুরমশাই বললে—‘তা তুই এখানে কি করচিস? আর হাতে তোর চিঠি কি ও? যেন নেত্যর হাতের লেখা মনে হচ্চে না? দেখি তো।’

এখন তো বুঝি তার কারণটা, মুখখানা যেন হঠাৎ কি রকম হয়ে গেচে ঠাকুরমশাইয়ের। চিঠিটা নিয়ে পড়তে পড়তে কিন্তু মনে হোল যেন ঠিক সে ভাবটা কেটে আসচে, শেষ ক’রে জিগ্যেস করলে– ‘ব্যাপারখানা কি?’

সব খুলে বললুম এক এক ক’রে, ওবিশ্যি দিদিমণি আর যা-যা বলেছেন সেগুনো বাদ দিলুম, কতক বুঝতে শিখেচি তো ত্যাখন। শুনে ঠাকুরমশায় চুপ ক’রে দাঁড়িয়েই রইল খানিকক্ষণ, তারপর বললে—‘একটু সর তো বসি, অনেক দূর থেকে আসচি, হা-ক্লান্ত হয়ে পড়েছি; তুই বরং পা দুটো একটু টিপে দে।’

আমি জিগ্যেস করলুম— ‘ঘরকে যাবে না বাবাঠাকুর? সন্দে হয়ে এল।’

একেবারে চটেমটে খিঁচিয়ে উঠল। বেশ মনে আচে, চোখের সামনে এখনও যেন দেখচিঠাকুরমশাইয়ের চেহারাটা শুকিয়ে গেচে অনেকখানি, কতদিন খেউরি হয় নি, দাড়ি গজিয়ে গেচে, চুল উস্কখুস্ক, খিঁচিয়ে উঠে বললে—‘না, ঘরে যাব কেন? কে এক মদ্দ মাগী উড়ে এসে জুড়ে ব’সেচে কোথা থেকে, আবল-তাবল বকচে, মাথার ঠিক নেই, তার ভয়ে এ-গ্রাম ও-গ্রাম ক’রে ঘুরে ঘুরে বেড়াব।…শোন্, বলে দিচ্চি—গিয়ে বলবি তাকে—বলবি … বুঝলি তো, ভয় করবি নি, পষ্ট ক’রে বলবি… ‘

আঙুলটা উঁচিয়ে রইল অনেকক্ষণ দা’ঠাকুর, কিন্তু কি বলবে তা আর মুখ দিয়ে বেরুল না। একটু পরে বললে—‘ওঠ, বসি একটু।’

আমার গা ছমছম করতে লাগল দা’ঠাকুর। ঠাকুরমশাই একটু কেমন কেমন ছেলই কিন্তু সে অন্য রকম, দিদিমণি বলত ঐ শাস্তোরটা পড়লে ঐরকম একটু নাকি হয়েই যায় নোকে; এ কিন্তু মনে হোল চেহারার ভাবগতিকে উন্মাদের লক্ষণ। অশথ গাছের শেকড় অনেকটা এগিয়ে এসে আবার মাটি ফুঁড়ে এক এক জায়গায় উঁচু হয়ে ওঠে না? আমি সেই রকম শেকড়ের ওপর বসেছিলুম, উঠে পড়লুম। ঠাকুরমশাই বসলে বেশ জোরে জোরে পা টিপতে নেগে গেলুম।

অনেকক্ষণ নিঝুমই কেটে গেল; তারপর উনিই জিগ্যেস করলে— ‘তোদের মাসিমা ঝগড়াঝাঁটি সেই এক ভাবেই ক’রে যাচ্ছে তো গাঁয়ের নোকের সঙ্গে?’

আর সেরকম ভাবে নয়, দিব্যি সহজ গলাতেই বললে।

আমি বললুম— ‘আর ওরা পাল্লা দিতে পারচে না, দামোদর ঠাকুরের পিসি বদ্যিবাটী চলে গেছে।’

বললে—‘তা কেউ আর পাল্লা দিতে পারচে না তো এবার যাক ফিরে। কুটুমবাড়ি ক’দিন থাকে নোকে? কিছু বলে সেকথা?’

আমি একটু বুদ্ধি করে বললুম— ‘বলে, আপনার সঙ্গে দেখাটা হলেই চলে যাবে, তাই ওপিক্ষে ক’রে আচে।’

শুনতে দেরি, ঠাকুরমশাই শেকড় ছেড়ে আবার খিঁচিয়ে উঠল, বললে—আমায় নিয়ে করবেটা কি যে ওপিক্ষে করচে? আমি কি আর মানুষ আচি? এই দেখ, দেখে নে ভালো করে চেহারাটা, গিয়ে বলবি…।’

ব্যস্, আর ভালো ক’রে কিছু কানেও গেল না, ওনার দিকে চেয়ে গাঁ-গাঁ-গাঁ-গাঁ—করতে করতে ভুঁয়ে লুটিয়ে প’ড়ে আমি একেবারে অচৈতন্য।

কতক্ষণ ত্যামন ছিলুম বলতে পারিনে দা’ঠাকুর, তবে য্যাখন চোখ খুললুম দেখি ঠাকুরমশাই মুখে ক্রমাগত জলের ঝাপটা দিচ্চে, জিগ্যেস করলে—“কি রে, কি হোল হঠাৎ?’

আমি ঠায় চেয়েই আচি মুখের পানে, বেশ মনে আচে তো, আবার বুঝি ভির্মি যাই, ঠাকুরমশাই জলের ঝাপটার ওপর ঝাঁকুনিও দিলে, জিগোলে—“কি রে, অমন ক’রে চেয়ে আচিস কেন? চিনতে পারচিস না? আমি তোদের বাবাঠাকুর, অমুক ন্যায়রত্ন, ভালো ক’রে দেখ দিকিন; বলি অ স্বরূপ, আমি তোর দিদিমণির বাবা—দেখ দিকিন ভালো ক’রে।’

জলের ঝাপটা আর মাঝে মাঝে একটু ঝাঁকানির সাথে ঐরকম ক’রে খানিকটা ব’কে যেতে আমার সাড় ফিরে এল। বললুম – ‘বাবাঠাকুর?

‘হ্যাঁ, কি হয়েছিল তোর? দিব্যি কথা কইছিলি, তা আচমকা ভির্মি গিয়ে বসলি যে?’

বললুম—‘আমি মনে করলুম তুমি জোড়া-বকুলতলা থেকে উঠে এয়েচ বাবাঠাকুর, ঐ যাঁদের এই সন্দের সময় নাম করতে নেই তানাদের মতন হয়ে গেচো। তুমি আরও কথা কও খানিকটা বাবাঠাকুর, আমার এখনও তোমায় দেখে গা ছমছম করচে একটু একটু। বাড়ি যাবেনি?’

বাবাঠাকুর একটু হাসলে, বললে- ‘আর মানুষের মধ্যে নেই—তার অর্থ ঘরবাড়ি সব থাকতেও এক পাগলের পাল্লায় পড়ে এর দোর ওর দোর ক’রে বেড়াচ্চি-ও ছোঁড়া ধরে নিয়েচে ভূত হয়ে গেচি। দেখ, সংস্কৃত শ্লোক বলচি, রামনাম করচি, ভূতে পারে?’

কয়েকটা শ্লোক আউড়ে গেল, কয়েকবার রামনামও করলে। বললুম—‘বেম্মদত্তিরা তো পারে, তানারা বামুন তো।’

ঠাকুরমশাই বললে—‘কি গেরোয় পড়া গেল! বেম্মদত্তি হ’লেও কথাগুলো তো খোনাই হোত, সেইরকম শুনচিস কি? চল বাড়ি চল, রাত হয়ে এল।’

ত্যাতক্ষণে ওবিশ্যি সন্দোটা ভালো করেই কেটে গেছে, উঠে পা বাড়িয়ে বললুম—‘দিদিমণির চিঠিটা নে যেতে হবে না?

বললে—“আমি তো এসেই গেলুম এই, ট্যাকা নে’সতে হয় আমিই ব্যবস্থা করব তার। হাত একেবারে খালি তোর দিদিমণির?’

বললুম—‘আচে গণ্ডা দশেক পয়সা, তেমনি পরশু দশমী, তারপর একটা দিন বাদ দিয়ে দ্বাদশী, মাঝের ও দিনটা আবার উপোসের দিন তো।’

আর কোন কথা হোল না। মিথ্যে কথা বলব না দা’ঠাকুর, সন্দো মিটে গেচে বটে, কিন্তু ত্যাখনও কথা না হলে গা ছমছম ক’রে ওঠচে এক-একবার। সেইজন্যে কয়েকবার আড়চোখে মুখের পানে চেয়ে দেখলুম যেন খুব তদগত হয়ে কি একটা ভাবচে বাবাঠাকুর। তারপর আমরা য্যাখন মাঠ ছাড়িয়ে গ্রামে ঢুকব, ঠাকুরমশাই মিত্তিরদের মজা পুষ্করিণীর কাছটায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল, বললে—‘আয় স্বরূপ একটা সলা করতে হলো, আয় এখানটায় বসি।’

ঘাটের শানটায় গিয়ে বসলুম দু’জনে।

জিগ্যেস করলে— ‘আর ভয় করছে না তো তোর?”

বললুম—না, ত্যাখন তুমি ঐরকম ক’রে বললে কিনা আর কি মানুষ আচি?—আর জোড়া-বকুলতলাটাও কাছে ছেল তো?’

বললে—‘ওসবও ছেল, তার সঙ্গে চেহারাটাও বড্ড খারাপ হয়ে গেচে, নয় কি? তা তুই এক কাজ করবি, এই নে দিকিন আগে।’

পিরেণের পকেটে হাত দিয়ে গোটাকতক ট্যাকা বের করে আমার কাপড়ের খুঁটে বেঁধে দিতে দিতে বললে—এই পাঁচটা ট্যাকা দিচ্চি; তুই আগে তোর দিদিমণির হাতে দিয়ে দিবি, বলবি, ঘোষাল পঞ্চাশটা দিলে না, কেপ্পন মানুষ তো, আপাতত এই পাঁচটা দিলে, বললে ফুরিয়ে গেলে আবার আসতে…’

ওনার কথা রেখেই বললুম—‘আর তুমি যাবে না?”

বললে—সেইটেই তো সলা-পরামর্শের কথা। আমি আর আজ এলুম না। দূরে কোথাও নেই, পাশেই বাতাসপুরে আচি এক শিষ্যিবাড়িতে, ফিরে যাব। কথাটা হচ্চে, ব্রেজো থাকতে আমার ফিরে যাওয়াটাই ঠিক হবে না, সে তোর দিদিমণিও বোঝে।…ব্ৰেজো যে বিধবা-বিয়ে করবে ব’লে গ্রামে রটিয়েচে তা নিয়ে কিছু বলে তোর দিদিমণি?’

বাড়ি ঢুকতে চায় না দেখে আমি দিদিমণির সেদিনকার কথাটা একটু ঘুরিয়ে বললুম- ‘দিদিমণি বললে-বেশ তো রাজযোটক হয়, মা মাসি আলাদাও তো নয় কিছু।’

ঠাকুরমশাই বললে—‘কিছু বোঝে না ও, কি ক’রে বাগিয়েচে ওকেও ব্রেজো। শোন্ যা বলছিলুম সলা-পরামর্শের কথা। আগে নেত্যকে ঐ কথা ব’লে ট্যাকাটা দিয়ে দিবি, তারপর বলবি আমি মরে গেচি।’

আবার একটু যেন আঁতকে উঠেই বললুম—কিন্তু মরে তো যাওনি তুমি বাবাঠাকুর?

‘শত্রুর মরুক, কিন্তু মরে গেচি ব’লে ভয় হয়েছিল তো তোর? ঐটেকে একটু কাজে লাগাতে হবে। একবার মনে করেছিলুম নেত্যকে না হয় ভেতরকার মতলবটা চুপি চুপি বলেই দিতিস। আবার ভেবে দেখচি, থাক এখন। তাহলে মড়া কান্নাটাতে তেমন জোর হবে না! বলবি, আমি ঘোষালমশাইয়ের কাছ থেকে ট্যাকা নিয়ে আসছিলুম, জোড়া বকুলতলাটা পেরিয়েচি, এমন সময় মনে হোল যেন কে পেছন থেকে ডাকলে-নাকীসুরে ডাকলে বলবি, ঘুরে দেখি ঠাকুরমশাই—তবে ঐ যা বলছিলি বেম্মদত্তির মতন করেই বলবি-ধবধবে সাদা কাপড়, ধবধবে পৈতে, পায়ে খড়ম। বলবি ঠাকুরমশাই নাকীসুরে বললে—‘নেতাকে বলে দিস আঁমি মরে গেঁচি, নিজে বলতুম মাঁয়া কেঁটে গেঁচে তো আঁর জোঁড়াবকুলতলা ছেঁড়ে যেতে মন সঁরচে না।… মতলবটা বুঝতে পারচিস তো, ঐ রকম একটা না রটালে ব্রেজো নড়বে না বাড়ি থেকে। তারপর সত্যিই তো মরচি না, ও চলে গেলেই এসে উঠচি বাড়িতে, ত্যাখন বানিয়ে একটা কিছু বলে দিলেই হবে, ভয়ের মাথায় কি দেখতে কি দেখেছিল স্বরূপটা। পারবি তো গুছিয়ে বলতে?’

বললুম—‘তা ছেরাদ্দর আগে তো যাবে না মাসিমা, বড্ড বেশি বিলম্ব হয়ে যাবে না?’

ঠাকুরমশাই চুপ ক’রে ভাবতে লাগল, তারপর বললে—“তা তুই তো রোজ আসচিসই গোরু চরাতে মাঠে, একটু থেকে যাবি সবাই চলে গেলে, কি হয় বলবি, সেই বুঝে আবার ব্যবস্থা করা যাবে।’

আমি বললুম—‘না হয় বলব- বাবাঠাকুর বললে দশদিন আগে মারা গেছে? তাহলে ছেরাদ্দটা কাছিয়ে যাবে বেশ।’

ঠাকুরমশাই আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বললে—‘না হয় তাই বলিস, তাড়াতাড়ি বিদেয় হবে পাপ, শোকটাও বেশিদিন ভুগতে হবে না নেত্যকে! তারপর এসেই তাড়াতাড়ি ওর বিয়েটা দিয়ে আমি কাশীবাসী হব—-গাঁ আমায় ছাড়তেই হবে।…তুই যা এখন। এইটুকু যেতে ভয় করবে না তো?’

ভয়? নেহাত গাঁয়ের মধ্যে এসে পড়েচি, তাই, নৈলে তখনও গা ছমছম করচে, ছাড়ান পেলেই বাঁচি। বললুম—‘না, তুমি যাও গিয়ে।’

বললে—কাল আবার আসব, তুই থাকবি একটু সবাই চলে গেলে।’

আমি বলললুম— ‘তুমি এখেনেই এসো বাবাঠাকুর, জোড়া-বকুলতলার উদিকে নয়। আমি থাকব’খন এই সময়টায়।…একবার ছিলিমটা পাব নাকি দা’ঠাকুর।’

আমি হুঁকোটা কাৎ করে দিতে স্বরূপ কলকেটা তুলে নিয়ে দুটো টান দিয়ে একটু হেসে বললে—‘না, কিছু নেই, আপনি টানছিলেন তবে কি?’

নাতিকে ডাক দিলে। আমি বললাম— ‘যা জমিয়ে তুলেচ তুমি গল্প! হুঁশ ছিল?”

স্বরূপ বললে—‘জমবার এখনও তো সবই বাকি, এই তো কলির সন্দে সবে।… আমি যখন বাড়িতে পৌঁছুলুম ত্যাখন বেশ অন্ধকারই হয়ে গেচে, দিদিমণি সন্দের পার্ট সেরে, দোরগোড়াতেই এসে হা-পিত্যেশ ক’রে দাঁড়িয়ে ছেল, আবার একটা দুর্ভাবনাও তো; আমায় দেখতে পেয়েই একরাশ প্রশ্ন— ‘এত দেরি করলি কেন? ছিরের হাতে পড়িস নি তো? দিলে ট্যাকা? কটা দিলে র‍্যা? কিছু বললে চিঠিটা পড়ে একাদশী ঘোষাল?’

আমি জিগোলুম—‘মাসিমা কোথায়?’

‘তাকে বুদ্ধি করে পাঠিয়ে দিয়েচি মিত্তিরদের বাড়ি। সই এসে নিয়ে গেচে, বলেচি তুই না ডাকতে যাওয়া ইস্তক আটকে রাখবে।

আমার পেটে বাবাঠাকুরের ভূতের গল্পটা গজগজ করছিল দা’ঠাকুর, কি হয় কি হয় একটা ধুকপুকুনি নেগে রয়েছে তো? আমি ট্যাকার কথা তুলে আগে সেই কথাটাই পেড়ে রাখলুম, বললুম—‘বাবাঠাকুর মরে গেছে দিদিমণি—ম’রে বেম্মদত্তি হয়েছে….’

সবটুকু কানেও গেল না, ‘অ্যা! বাবা!!’…বলে দিদিমণি গলা ফাট্যে চিৎকার ক’রে উঠল, তারপরেই আছড়ে প’ড়ে কেঁদে উঠেচে, আমি তাড়াতাড়ি ব’সে প’ড়ে হাতদুটো চেপে ধ’রে চাপা গলায় বললুম—‘না না, মরেনি মরেনি….যাত্রার মড়ার মতন…তুমি থির হও, সব বলচি।’

দিদিমণি হাতের ওপর ভর দে উঠে বসে আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল ক’রে চেয়ে রইল, বললে—‘যায়নি মারা? তবে—তবে তুই যে বললি মারা গেচে। না, তুই আমায় নুকুচ্চিস—ঠিক আমার সব্বনাশ হয়েচে —আমার মন বলচে রে স্বরূপ, তুই নুকুলে কি হবে?…ও বাবাগো!!’- ব’লে আবার নুটিয়ে পড়বে, আমি পিঠে হাত দে তাড়াতাড়ি বলে উঠলুম—না, সত্যি মরে নি, এই তোমার গা ছুঁয়ে বলচি দিদিমণি, এই কথা ক’য়ে এলুম তানার সঙ্গে, মোটেই খোনা নয়, সব শোন না।’

দিদিমণিও যেন পাগলের মত হয়ে গেচে, দু’টোই একসে এক খবর তো; প্রেথমটা যেমন আঁতে ঘা দেওয়া, পরেরটা আবার তেমনি বিশ্বাস করা শক্ত, গায়ে গায়েই দুটো তো, আমার একটা হাত চেপে ধ’রে বললে—‘কোথায় দেখা হল তোর বাবার সঙ্গে…এল না কেন? বেশ বলই আগে কি বলেছে।’

আগাগোড়া, মায় ছেরাদ্দর দিনটা বুদ্ধি ক’রে কমিয়ে আনা পজ্জন্ত সব খুলে বলে গেলুম। একটা হাত চেপে ধরেই ছেল, শেষ হ’তে—‘তবে রে অলপ্পেয়ে, আগে বলিস নি কেন?” —ব’লে গুম গুম করে গোটাকতক কিল বসিয়ে দিলে আমার কাঁধে পিটে, তাতেও আশ না মিটতে—‘রোস্ তোর হয়েচে কি এখনও,’ বলে হাতটা ছেড়ে উঠানের ওদিক থেকে মুড়ো ঝাঁটাটা আনতে যাবে, আমি ছুট্টে খিড়কির বাইরে এসে দাঁড়ালুম। দিদিমণি ঝাঁটাটা হাতে করে এগিয়ে এল—‘বেরো বাড়ি থেকে, বেরো! খবরদার আর ঢুকবিনি, মনিব চাকর একজোট হয়ে আমায় নাজেহাল করবার যোগাড় করেচে। দুর হ’ বাড়ি থেকে তুই!’

খানিকক্ষণ দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আসে আসে আবার ভেতরে চলে যেতে আমি চৌকাটে এসে দাঁড়ালুম চুপটি ক’রে; জানি তো, রাগটা থাকবে না বেশিক্ষণ। হোলও তাই, ঝাঁটাটা ফেলে দিদিমণি দাওয়ার সিঁড়ির ওপর গিয়ে বসেছিল, একটু পরে খিলখিল ক’রে নিজের মনেই হেসে উঠল কি ভেবে, আবার চুপটি ক’রে বসেচে, আমি আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে কাছটিতে দাঁড়ালুম, কাপড়ের খুঁটের গেরোটা খুলে ট্যাকা ক’টা বাড়িয়ে ধরে বললুম—‘এই ট্যাকা পাঁচটা…যা দেছলো বাবাঠাকুর।’

দিদিমণি মুখটা একটু ঘুরিয়ে নিয়ে বললে- ‘ও ট্যাকা আমি ছোঁব না, যে দিয়েচে তাকে ফিরিয়ে দিস; যা বেরো আমার কাছ থেকে

আমি আর পারলুম না দা’ঠাকুর, সন্দে থেকে অনেক কাণ্ডই তো হোল, তার ওপর দিদিমণি বড্ড ভালোবাসত, তার কাছে মার খেয়েচি, মনটা হঠাৎ কেমন উৎলে উৎলে উঠল- ‘হ্যাঁ, নেবে টাকা’–বলে ট্যাকা কটা ওনার কোলে ছুঁড়ে ফেলে সেই কোলেই মুখ গুঁজড়ে একেবারে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলুম।

অনেকক্ষণ ধ’রেই কাঁদলুম ফুলে ফুলে। দিদিমণি আগে খানিকক্ষণ চুপ ক’রে পিঠে হাতটাই বুলিয়ে যেতে লাগল, মনে হোল যেন নিজেও আস্তে আস্তে কাঁদচে, তারপর বললে- ‘চুপ কর স্বরূপ, কাঁদিস নে; বড্ড নেগেচে পিটটায়, না? চুপ কর।”

বললুম,—‘আমার বাবাঠাকুরের জন্যে বড্ড মন-কেমন করচে। ভূত হয়ে যায় নি তো?’

দিদিমণি আবার আস্তে আস্তে একটু খিলখিল করে হেসে উঠল, মুখটা ওর কোলেই গুঁজড়ে রয়েচি তো ত্যাখনও, মনে হোল যেন কান্নাটাও আর একটু বেড়ে গেচে উরির সঙ্গে। একটু চুপ ক’রেই রইল, তারপর গলাটা পস্কের ক’রে নিয়ে বললে—‘ভূত হ’তে যাবে কেন? চুপ কর তুই।…রোস্, মনেই ছেল না, যা ফ্যাসাদ একটার পর একটা! উঠে বস দিকিন।

উঠে গিয়ে গোটাকতক নাড়ু নিয়ে এসে আমার হাতে দিলে, বললে—‘নে আনন্দ-নাড়ু, চাটুজ্যেদের মেয়ের বিয়ে, দিয়ে গেছল।’ নিজেও দু’টো নিয়ে কামড়ে খেতে লাগল। আবার সেই নকুলে ভাবটা ফিরে এয়েচে, খেতে খেতে একবার হেসে উঠে বললে— ‘এবার আমাদেরও নাড়ু হবে, না রে স্বরূপ! শুধু ভাবচি, বাপের বিয়ের নাড়ুটা আগে হবে, কি আগে মেয়ের বিয়ের নাড়ুটা।…কিন্তু উদিকে বর যে আসতে চায় না, তার কি হবে?

বললুম—‘ছিরু ঘোষালের কথা বলচ?’

বললে— ‘দুর্, সে তো আমার বর, হামড়ে রয়েচে, তু’ ক’রে ডাকলেই হয়। বলছি বাবার কথা, মাসির বর—সে যে উদিকে ক’নের ভয়ে ভূত সেজে শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়াচ্চে।’

দুলে দুলে হাসতে লাগল, তারই মধ্যে একবার হঠাৎ চুপ ক’রে যেয়ে হাতটা একটু তুলে বললে—‘হয়েচে রে স্বরূপ, খুব এক মতলব বের করেছি, দাঁড়া, যেমন ভূত, আমিও তেমনি তার রোজা। আসবে না বাড়ি, এমন মন্তর পড়চি যে আসতে পথ পাবে না।’

চুপ করে নাড়ু হাতে করে কি খানিকটা ভাবলে, কোনও দুষ্টুমির মতলব আঁটতে থাকলে যেমন মিঠে মিঠে হাসতে হাসতে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভাবে না? তারপর বললে—‘ভূত আবার কাল মিত্তিরদের ঘাটে সন্দের সময় আসবে তো?’

জিগোলুম—‘বাবাঠাকুর?’

বললে—হ্যাঁ, বাবাঠাকুর আর কোথায়? আসবে বলেচে তো? তা তুই এক কাজ করবি, বলবি, যেমন যেমন বলেছিলে সব বললুম, বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে। তা দিদিমণি অনেকটা সামলেচে, বললে, যাক, কি আর হবে? বাবা তবু বুদ্ধি করে আমার একটা হিল্লে করে গেচে তো, ছেরাদ্দ-শান্তি সেরে নিশ্চিন্দি হয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে উঠলেই হবে। মাসিমাকে কিন্তু কোনমতেই ঠাণ্ডা করা যাচ্ছে না। সতীনক্ষ্মী বিধবা তো? বলচে- আমার নতুন বর যখন মরে ভূত হয়েছে, আমিও আপ্তহত্যে ক’রে ম’রে পেত্নী হব, তারপর সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে বিয়ে করব। আমি ঘর ছেড়ে তার জন্যে এলুম, এবার পৃথিবীর ছেড়েই যাব না হয়। বলবি, কালকে কোনরকমে সামলেসুমলে রাখা গিয়েছিল, আজ রাত্তিরে আফিমই খাক, কি, গলায়ই দড়ি দিক-একটা কাণ্ড ঘটাবেই।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *