কাঞ্চন-মূল্য – ১৩

১৩

বেশ চ’লে যাচ্ছেল, দা’ঠাকুর, চলেও যেত একরকম ক’রে; বাবাঠাকুর নেই, তা ওনার না থাকাটা ক্রমেই যেন গা-সওয়া হয়ে আসছেল। নেই বলেই দিদিমণির বিয়ের কথাটা একটু চাপা পড়েচে, তার ওপর আমি আবার দিদিমণিকে ভরসা দেবার জন্যে পঁচিশটা ট্যাকার কথাটা বাড়িয়ে চল্লিশটা ক’রে দিয়েচি—নিশ্চিন্দি হয়ে গিয়ে দিদিমণির হাসিখুশি ভাবটা পুরোপুরি ফিরে এয়েচে, এমন সময় ব্যাপারটা আবার হঠাৎ সঙ্গীন হয়ে উঠল দা’ঠাকুর, আর এবার যা অবস্থা, আর বুঝি সামলানো যায় না। কিন্তু তার আগে আবার একটু ছ’আনি তরফের দেবনারায়ণ রায়চৌধুরীর কথা এসে পড়ছে।

সেরকম কাল-বৈশিখী কৈ আর দেখিনে তো আজকাল দা’ঠাকুর, সে-রকম শীতই বা কৈ, সে-রকম গ্রীষ্মিই বা কৈ? ক’দিন থেকে গুমট ভাবে রয়েচে এই পজ্জন্ত, নৈলে আকাশ দিব্যি পস্কের, মেঘের নাম গন্ধ নেই। চাকা ডুবে আসচে, কৈলীকে নিয়ে মাঠ থেকে ফিরছিলুমই, হঠাৎ মনে পড়ল দিদিমণি বলে দেছল একটু সকাল সকাল ফিরতে, ওনার সই শ্বশুরবাড়ি যাবে, দেখা ক’রে আসবে একটু। ব্রেজঠাকরুনের কথকতা আচে। কৈলীটার আর একটা দোষ, বড্ড গেঁতো ছেল, নিজের চাল ধরে ধিকি ধিকি যাবে, বাড়ি কি ন্যাজ মোড়া দিলেন, দু’পা চলল, আবার যে কে সেই। দেরি হয়ে গেচে, ত্যাখনও অনেকটা পথ, ওর পিঠে দুটো বাড়ি দিয়ে আমি হনহনিয়ে এগিয়ে এলুম। দূর থেকেই দেখি, দিদিমণি চৌকাঠ ধ’রে পথ চেয়ে দাঁড়িয়ে আচে। কাছে আসতেই বললে— ‘দেরি করিয়ে দিলি, আমি চললুম, দেখ, সইয়ের পালকি আবার বেরিয়ে গিয়ে না থাকে। পিদিম আর ল্যাম্পো দুটো বাইরেই রেখেছি; সন্ধ্যে দিয়ে দিবি।’

সন্দেটা একটু আগে-ভাগেই জ্বেলে আমি গোয়ালের মধ্যে গিয়ে কৈলীর জাবনাটা মেখে রাখচি, এমন সময় হঠাৎ গুমগুম গুমগুম করে একটা আওয়াজ হোল। কালবৈশিখী নাকি! কিন্তু মেঘ ছেল না তো! বেরিয়ে দেখি পশ্চিম কোণে একরাশ কালো মেঘ ধুলো-বালির সঙ্গে পাক খেতে খেতে শনশন ক’রে এগিয়ে আসছে মাথার ওপর। গোটা দুই দমকা হাওয়ার ধাক্কা, তার পরেই যেন সব ওলটপালট করে দিলে-ঝড়ে, ধুলোয় অন্ধকার হয়ে গেল চারিদিক, সঙ্গে সঙ্গে মেঘের ডাক, তারপর একটু সামলাতে না সামলাতে একেবারে মুষলধারে বৃষ্টি! বাড়ি ঢুকেচি মিনিট দশেকও হয়নি বোধ হয়, তার মধ্যেই কোথা থেকে যেন কী হয়ে গেল। পুকুরপাড়ে গোটাকতক ডাল ভেঙে পড়ল মটমট ক’রে, আমাদের কাঁটালগাছ থেকে গোটাতিনেক কাঁটালও মুচড়ে ফেলে দিলে, কি হবে, কি করব যেন ভেবে উঠতে দিলে না খানিকক্ষণ। তারপর কৈলীটার কথা মনে পড়ল, এমনি তো চলে আসবার কথা এতক্ষণে। ডাল-টাল চাপা পড়ল না তো!

গুণ থাক না থাক বড্ড ভালোবাসতুম গরুটাকে, তার ওপর গোহত্যের ভয়, আর কিছু না ভেবে সেই ঝড়-বৃষ্টি মাথায় ক’রে বেরিয়ে পড়লুম। সামনের ঘাস জমিটুকু পেরিয়েই চোখে পড়ল কৈলী মাথা নিচু ক’রে ছুটে আসচে, তারপর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে যা নজরে পড়ল তাতে আমার ওর সঙ্গে আর বাড়ি ফেরা চলল না সদ্য সদ্য।

ঘাস জমিটা পেরিয়েই রাস্তা। তার পাশে একটু এগিয়ে দাঁয়েদের পোড়ো শিবমন্দির। মন্দিরের কিছু নেই, দাঁয়েরা দেশ ছেড়ে বিগ্রহ পর্যন্ত তুলে নিয়ে গেচে, শুধু চারিদিকের দেয়াল খানিক খানিক আর অশ্বত্থগাছে জড়ানো খানিকটা ছাত আছে দাঁড়িয়ে। বেশ অন্ধকার হয়ে এসেচে, তারই মধ্যে দেখলুম একটা লোক ঘোড়ায় ক’রে ছুটে এসে মন্দিরের সামনে বড় বেলগাছটার নিচে নেমে পড়ল, তারপর ঘোড়াটাকে সেইখানে ছেড়ে পিঠে দুটো থাপ্পড় দিয়ে ছুটে গিয়ে মন্দিরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। ঝড়-বৃষ্টি আরও যেন চতুর্গুণ বেড়ে উঠেছে, কয়েকটা কড়া বিদ্যুতে আমার আর বুঝতে বাকি রইল না, ছ’আনি তরফের সেই দেবনারাণ চৌধুরী। একটুও আর না ভেবে-চিন্তে একেবারে ক’টা লাফে মন্দিরের রকটার ওপর গিয়ে উঠে পড়লুম।

চৌধুরীমশাই হাঁকলে—“কে?’ তারপরেই বিদ্যুতের আলোয় আমায় নিশ্চয় চিনতে পারলে, বললে—‘পণ্ডিতমশাইয়ের সেই নফর মনে হচ্ছে যেন, তানারই বাড়ির কাছে এসে পড়েছি, না?’

বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘তা ভেতরে চলে আয় শিগগির, ভারী দুয্যোগ।’

বললুম—‘আপনিই বরং বাড়ির ভেতর চলুন না, মন্দিরটা ভাঙা, জল আটকাবে না, ভেঙে পড়তে পারে।’

খুব ঘন ঘন বিদ্যুৎ, মন্দিরের ভেতরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে জিগ্যেস করলে- ‘পণ্ডিতমশায় আছেন নাকি বাড়িতে?’ একবার নিয়ে যাবার খুব ইচ্ছে, একটা বলবার কথা তো, জাঁক ক’রে বললুম—‘ছিলেন তো।’

উনি বললে—‘ছিলেন তো মানে? দুয্যোগ দেখে বাড়ি ছেড়ে পালাবেন?

সামলে নেবার চেষ্টা করে বললুম— ‘আমি সবেমাত্র গোরু নিয়ে ঢুকলুম কিনা, মনে হোল যেন বাবাঠাকুরের গলা শুনলুম—ঝড়ের শব্দও হ’তে পারে।’

—তারপরেই মনে পড়ে গেল, ত্যাখন আবার ও জ্ঞানটাও হয়েছে কিনা, যে মেয়েদের কেউ থাকলে উনি যাবেন না; বললুম- ‘ওনারাও কেউ নেই, মাসিমা কথকতা শুনতে গেল। দিদিমণির সই শ্বশুরবাড়ি যাবে, এইমাত্র দেখতে গেল তিনি।’

জিগোলে—‘দিদিমণিটা কে?…ও, পণ্ডিত মশায়ের সেই মেয়েটি?’

বললুম—‘হ্যাঁ।’

তারপর দিদিমণির কথা উঠলেই যেমন একটু সুখ্যেত না করে ছাড়তুম না, জুড়ে দিলুম, ‘–আপনি সিদিনকে যে দেখলেন-সোন্দোরপানা-শাঁক হাতে ক’রে বেরিয়ে এল।’

দুয্যোগ যেন বেড়েই চলেচে। নেয়ে চুপসে গেচে একেবারে, মন্দিরের একটা কোণ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছেল, একটু চুপ ক’রেই রইল, তারপর বললে—‘কেউ নেই বলচিস? অবিশ্যি গেলে হোতো, ভিজে নেয়ে গেচি একেবারে।’

বললুম—‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলুন, কাপড়টা ছেড়ে নেবেন।

‘দিতে পারবি একখানা?”

প্রায় ঠিক করে এনেচি, বললুম—‘যখানা চাইবেন, কাপড়ের অভাব কি? চলুন। আর শিবের মন্দির—জায়গাও তো ভালো নয়।’

‘না, কেন?’

‘এই ভূত প্রেত…তার ওপর বেলগাছটাও রয়েছে…

অবিশ্যি ভূত-প্রেতের ভয়ে নয়, তবে মনে হোল যেন যেতই, দু’পা এগিয়ে গলাটা বাড়িয়ে একবার দেখলেও বাড়িটার দিকে, কিন্তু ঠিক এই সময়টাতে দেখি দিদিমণি জলে ছপছপ করতে করতে ওদিক থেকে কতকটা ছুটে ছুটেই আসচে। বেশ বোঝা যায় রাস্তাতেই জল পেয়ে ফিরে এসেচে, ভিজে একবারে নেয়ে গেছে, আমাদের কাছ দিয়েই রাস্তা থেকে ঘাস জমিটার ওপর পড়ল, তারপর বাড়ির ভেতর চ’লে গেল। বিদ্যুতের বিরাম নেই, বরাবরই গেল দেখা, দুজনেই একঠায় চেয়ে আচি, চ’লে গেলে নিশ্চিন্ত হয়ে একটু হেসে চৌধুরীমশাইয়ের দিকে চেয়ে বললুম—‘যাক, নিব্বিঘ্নে চলে গেল। পড়ে যায় নি ভাগ্যিস, না?’

বললে—“হ্যাঁ, পেচল তো। তোর দিদিমণি বুঝি?’

‘দিদিমণিই; আপনি চিনতে পারলে না?’

বললে—‘অত চিনে রাখতে পারা যায় কখনও? থাক সে কথা?, এখন ইদিককার কি করা যায় বল দিকিন?’

এই সময় বাড়ির মধ্যে ঝড় ঠেলে দিদিমণির গলার আওয়াজ শুনতে পেলুম, আমায় দেখতে না পেয়ে ‘স্বরূপ! স্বরূপ!’ বলে ডাকছে। বেরিয়ে উত্তর দিতে যাব, চৌধুরীমশাই হাতটা ধ’রে ফেললে, বললে—‘থাম একটু।’

সঙ্গে সঙ্গে উদিকে দিদিমণিও সদর দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়াল। গলাটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বার তিন চার ডাকলে, ভিজে মুখে সোজা বিদ্যুতের আলো এসে এসে পড়েছে, একটু ব্যাজার ব্যাজার ভাবটা, আওয়াজ না পেয়ে—‘এই ছেলের হাতে বাড়ি ছেড়ে গেচি!’—ব’লে ভেতরে চ’লে গেল। আমি একটু হেসে বললুম—‘নয় দিদিমণি?’

বললে—‘না হয় হোল।…কিন্তু আমি তোকে কী যে বলতে যাচ্ছিলুম… ‘

বললুম – ‘ বলছিলেন—ইদিককার কি করা যায়?’

‘হ্যাঁ, ইদিককার মানে- এ-রকম ভিজে জামা কাপড় থাকলে আবার অসুখে পড়ে যাব, এই ক’দিন হোল এক ঝোঁক কাটিয়ে উঠেচি। তা মনে করছিলুম না হয় যাব তোদের বাড়ি, আর তো হয় না। পণ্ডিতমশায় তো দেখচি নেই!’

একটু কাঁপতে কাঁপতেই বললে—‘শীতও ধরিয়ে দিয়েচে রে!’

বললুম, ‘নে আসব শুকনো কাপড়।’

‘আচে তো বেশি?’

‘য্যাতো চান।’

‘য্যাতো চানের দরকার নেই। একখানা পরতে হবে আর একখানা পাট ক’রে গায়ে দিতে হবে—এই দুখানা হলেই হবে। যদি পারিস যোগাড় করতে তো মন্দ হয় না। মন্দিরের এ কোণটায় ঝাপটা আসতে পারচে না, ওপরটুকুও ভালো। কিন্তু তুই আনবি কি করে?’

বললুম—‘বাঁশের ছাতা আচে।’

‘সে কথা বলচি নে, সে তো কোনরকম ক’রে ঢেকেঢুকে আনতেই হবে, ছাতার মধ্যেই হোক, টোকার মধ্যেই হোক, আমি বলছিলুম টের পাবে না তোর দিদিমণি? আমি এখানে রয়েচি-এ অবস্থায়, সেটা জানবে না তো; তাই না তখন উত্তর দিতে বারণ করলুম।’

বললুম—উনি লোক ভালো, কাউকে বলবে না।

একটু ব্যাজার হয়ে উঠল, বললে—“তুই বড় বাচাল হচ্চিস ছোঁড়া। যেটুকু জিগ্যেস করি তারই উত্তুর দে। একেবারে লুকিয়ে আনতে পারবি?-তোর দিদিমণি কিচ্ছু টের পাবে না!’

অত তো ভেবে বলতুম না কোন কথা, তারপর একটা উপায় বের করেই নিতুম; বললুম— ‘পারব!’

‘কি করে?’-তারপর উনি নিজেই বললে— ‘থাক, অত সওয়ালের দরকার দেখি না, ফিচেল আচিস, একটা উপায় বের করবিই! যা।’

বললুম না?—ও সার্টিফিটিটা আমার খুবই লেহ্য দা’ঠাকুর,—ঘা খেয়ে খেয়ে আর নানা ধান্ধায় ঘুরে ভালো বলুন, ফিচলেমি বলুন, বুদ্ধি একটা এসেই যেত; ঘাস-জমিটুকু পেরুতে পেরুতে একটা জুটেও গেল মন্দ নয়।

দিদিমণি রেগেই বললে’ছিলি কোথায়? তোর ওপর না আমি বাড়ি ছেড়ে চ’লে গেলুম?’

বললুম—‘কৈলীটা আসে না দেখে খুঁজতে বেরিয়েছিলুম—গাছটাছ ভেঙে পড়েছে।’

রেগেই বললে—‘ও-গোরুর ঘাড়ে পড়বে না, সাক্ষাৎ বশিষ্টির কপিলে, অনেক ভোগাবে। তারপর, গোরু তো অনেকক্ষণ এসে গেচে দেখচি।’

বললুম—‘খুঁজতে বেরিয়ে বিদ্যুতের আলোয় মনে হোল-দাঁয়েদের পোড়ো মন্দিরে যেন কি নড়চে-টড়চে। ভাবলুম দেখি তো, কৈলীটা ঢুকে পড়ে নি তো!…ওমা, কাছে গিয়ে দেখি এ এক কৈলী।”

দিদিমণি হাঁ ক’রে শুনছেন, জিগ্যেস করলে–’তার মানে?’

বললুম—সেই গেঁজেলটা, একাদশী ঘোষালের ছেলে ছিরু ঘোষাল! ‘

‘সেকি রে! আবার এদিক মাড়ালে? বিয়ের শখ মেটেনি এখনও?’

তারপর বোধ হয় মনে পড়ে গেল ওনার সঙ্গেই তো বিয়ের কথা উঠেচে আবার, চোখ ঘুরিয়ে বললে—‘বুঝেচি—মাসিমার হ’তে হোল না; এইবার আমার হাতের পাচনবাড়িটা একবার পড়লেই বাছার শখ জন্মের মতন মিটে যায়। হবে। তারপর, তোকে দেখে কি কি বললে?”

‘ভিজে একেবারে আমসি হয়ে গেছে তো, বাঁশপাতার মতন কাঁপচে, বললে দু’খানা শুকনো কাপড় এনে দিতে পারিস? একখানা পরব, একখানা পাট করে গায়ে দোব। গুলির নেশা, ভিজে তো আর কিছু নেই। আমি বললুম—পারব না কেন? মনে মনে ঠিক করে আচি—এই করে আটকে তো রাখি বাছাধনকে—ত্যাতক্ষণে মাসিমা এসেও পড়বে, তারপর ঐ মন্দিরের দরজা আটকেই আর একচোট। বিয়ের নাম ভুলে যেতে হবে বাছাধনকে।’

দিদিমণি একটু অন্যমনস্ক হয়ে কি যেন ভাবছেল। এখন আন্দাজ ক’রে মনে হচ্চে, বোধ হয় এই কথা দা’ঠাকুর-অদিষ্টের কথা কে জানে, হয়তো এরই হাতে পড়তে হবে, কথাবার্তা ত্যাখন খুব জোরই তো—আর যেন কোন উপায় নেই—বোধ হয় ঐ কথাই ভাবছেল, মুখটা যেন নরম হয়ে এসেচে, বললে- ‘না রে, বিপদে পড়ে মানুষটা সাহায্য চাইচে নিরুপায় হয়ে, এর ওপর আর ওরকম করা ঠিক নয়; তার ওপর আবার দেবস্থান, বিগ্রহ না হয় নাই রইল। নাঃ; কিন্তু কাপড় পাই কোথায়? বাবার দুখানি কাপড়—তা তো তাঁর সঙ্গেই। মাসিমার একখানা থান আর একখানা পুজোর মটকা–সাধারণ মানুষ হলেও না হয় বাড়ি গিয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করত—ওনার ফিরতে তো সেই দশটা, এগারটা; কিন্তু গেঁজেল মানুষ, এর তো আর সে হুঁশ নেই।’

বললুম –’ফিরিয়ে দেবে, সে আমি বলচি।’

‘কি ক’রে বলচিস?’

‘নেশা চ’টে গেচে তো।’

‘সেইজন্যেই আরও আগে আড্ডায় গিয়ে ঢুকবে! নাঃ, ও সাহস করা যায় না।”

তারপর একটু ভেবে বললে—‘শোন, শাড়িতে হবে? নেশাখোর মানুষ তো, ওর আবার ধুতি আর শাড়ি! খুব হবে, তুই নিয়ে যা। শাড়ি বরং দিলে অসুবিধেও হবে না। মার ক’খানা রয়েচে তো! তাই থেকে আর দোব না, মার জিনিস, আমারই খান দুই দিচ্চি, তুই নিয়ে যা।… আহা, সিদিন বড্ড গোবেড়েনটা খেয়েছেল রে!’

ত্যাখন পাছাপেড়ে ডুরেই পরে দিদিমণি, একটা চাঁপা রঙের চেক, একটা নীলাম্বরী। চেকটা আস্ত; নীলাম্বরীটা আঁচলের কাছে খানিকটা ছেঁড়া। সেটাকে পাট ক’রে আর খয়ের রঙেরটা কুঁচিয়ে বললে— ‘বলবি এইটে পরে নেবে আর এইটে গায়ে জড়িয়ে নেবে!’

তারপরেই খিল খিল করে হেসে উঠল—‘একবার বড্ড ইচ্ছে করচে রে দেখতে, সেই রাজবেশ, তারপর এই শ্যাম আবার মালিনীর বেশ ধ’রলেন।’

ঝড় তুফান চলেচেই, আঁজলায় মুখ চেপে দুলতে দুলতে, হাসতে হাসতে দাওয়া পর্যন্ত এগিয়ে এল; আমিও বাঁশের ছাতাটা মাথায় দিয়ে ছপছপ করে বেরিয়ে এলুম।

চৌধুরীমশাই তো দেখেই আমায় এই মারে তো সেই মারে! ‘আমি ঝড়-বিষ্টিতে ভিজে কালিয়ে যাচ্চি, ও হারামজাদা ঠাট্টা করে একজোড়া শাড়ি এনে বলে পরো! এই তোর য্যাত কাপড় চান? এই মন্দিরের সানে আছড়ে হারামজাদাকে শেষ করব! ফিরিয়ে নিয়ে যা এক্ষুণি, গেলি? না, ধরব ঠ্যাং দুটো তুলে-দোব আছাড়!”

সে সিংহের গর্জন দা’ঠাকুর, মনে হচ্ছে ঝড়ের আওয়াজ ছাপিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। একেবারে আচমকা, কোথায় খুশি হবে, না, এই কাণ্ড, আমি তো হতভম্ব হয়ে গেচি, মুখে রা সরচে না একেবারে, তারপর কাঁদ-কাঁদ হয়ে বললুম—‘আজ্ঞে ঠাট্টা করচি না, এই পা ছুঁয়ে বলচি, আপনি হোচ্চ দেবতা…’

কানটা ধ’রে মুখটা তুলে ধরলে।- ‘কোন্ দেবতা শাড়ি পরে র‍্যা হারামজাদা- ফরেশডাঙার নীলাম্বরী!’

তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি, একবার রেহাই পেলে আর কে এ-মুখো হয়।

বললুম—‘বদলে নে আসচি এক্ষুণি।’

ছেড়ে দিলে কানটা। মন্দিরের চাতাল থেকে নাপ্যে দু’পা এগিয়েচি, এই ছুট দোব, গলাটা বের ক’রে ডাকলে—‘এই, শোন, উঠে আয়।’

একটু যেন ঠাণ্ডা হয়েচে, উঠে আসতে নরম গলায়ই সুদোলে—‘শাড়ি নিয়ে আসতে গেলি কেন?—দুখানাই শাড়ি?’

বললুম—‘নুক্যে নে আসতে হোল, আলোও নিভে গেচে, যা পেলুম হাতের কাচে নিয়ে নিলুম।’

‘নুক্যে নে’সচিস, তা অমন বীরভদ্দর এক ছাতা মাথায় দে বেরুচ্চিস, তোর দিদিমণি টের পেলে না?’

বললুম না?—ও ক্ষ্যামতাটা ছেল ছেলেবেলায়, উনি বলচে, ইদিকে মনে মনে আমার উত্তুর ঠিক হয়ে গেচে, বললুম— ‘কৈলীকে দু’ঘা বাড়ি দিয়ে বের করে দিলুম গোয়াল থেকে, দিদিমণিকে বললুম—মেঘের ডাকে প্যাল্যেচে, ধ’রে নে আসি।’

‘বেটা যেন…’ তারপর কি একটা ইঞ্জিরি কথা বললে, মনে হোল যেন তারিফই করলে দা’ঠাকুর, তারপর মুখের দিকে চেয়ে বললে—‘এই যে ফিরে যাচ্ছিস, দেখতে পাবে তো? তোর পথ চেয়ে তো দাঁড়িয়ে আচে—যদি জিগ্যেস করে কাঁকালে তোর কি? কি বলবি?”

একটা জুতসই উত্তুর ভাবছিলুম, নিজেই বললে—‘কাজ নেই আর গিয়ে, থাক্। দে শাড়ি দুটো।…খবরদার কাউকে বলবিনে; বলবি নে তো?”

বললুম— ‘আমার কি গরজটা বলুন না।

‘পরতুম না—তবে এদানি জ্বর থেকে উঠলুম তো…’

সায়েবী ঘোড়-সোয়ারি পোশাক পরে ছেল দা’ঠাকুর। প্যান্টলন, একটা জামা, মাথায় একটা পাগড়ি। পাগড়িটা নামিয়ে মাথাটা মুচেই ফেলেছিল, ভালো করে নিংড়ে গায়ের জামাটা খুলে গা’টাও মুচে নিলে, তারপর কোঁচানো চেক-ডুরেটা পরে পা দু’টোও বেশ ভালো ক’রে মুচে নিয়ে পাট-করা নীলাম্বরীটা গায়ে জড়িয়ে নিলে। ঝড়-বৃষ্টি অবিশ্যি তেমনি উপশ্রান্তে চলচে, চারদিকে জল দাঁড়িয়ে গেচে, তবে চৌধুরমশাইকে দেখে মনে হচ্চে যেন দেহে সাড় এয়েচে খানিকটা। আমরা যে-কোণটা ঘেঁষে দাঁড়িয়েচি, সেখানে ঝড়ের ঝাপটাটা আসচে মাঝে মাঝে, তবে ওপরটা ভালো, জল পড়চে না। চৌধুরীমশাই ছাতাটা আবার একটু আড়াল করে দিলে, বললে—‘তুই এইরকম ক’রে ক’রে ধরে বোসে থাক। দাঁড়া, আমিও দেখি, একটু বসতে পারলেই ভালো হোত।’

বিদ্যুতের আলোয় খানকতক ইট নজরে পড়ল, ছেলেমেয়েরা ঘর-ঘর খেলে, আমি ছাতাটা ওনাকে ধরতে ব’লে, খানচারেক এনে পেতে দিলুম, উনিও বসল।

রাত্তিরটা বেশ মনে আছে দা’ঠাকুর। দুয্যোগ ঠিক তেমনি চলচে—মনে হচ্চে—যেন এ বাদলও থামবে না, এ রাত্তিরও শেষ হবে না, আর আমরা দুজনে চিরকাল ধরে এইখেনে এমনিধারা ক’রে বসে থাকব মুখোমুখি হয়ে। চৌধুরীমশাইকে বড্ড ভালো লাগচে—একে আর অমন সুপুরুষ প্রায় চোখে পড়ে না, তায় অমন পরিশ্রমের পর গা হাত মুচে’ শুকনো কাপড় প’রে—তা হোক না শাড়িই—ওনাকে বড় তাজা দেখাচ্চে বিদ্যুতের ঝলকগুনোয়। ইচ্ছে করছে দুটো কথা কইতে, কিন্তু শাড়ি আনার পর থেকে আর নিজে হ’তে কিছু আরম্ভ করতে সাহস হচ্চে না। অথচ যদি জিগ্যেস করেন তো শাড়ি প’রে ওনাকে দেখাচ্চে যেন আরও চমৎকার। বুঝলেন না?—পরণেরটা চাঁপা রঙের, তার ওপর খয়েরের চেক, গায়েরটা নীলাম্বরী, এর ওপর বিদ্যুতের ঝলকানি এসে পড়চে, সেকালে সবাই মাথায় বাবরি চুল রাখত তো—ওনাকে দেখে মনে হচ্চে ঠিক যেন যাত্রাদলের কোন রাজা কি রাজপুত্তুর। তার ওপর দুরভাবনাই তো—তাতে যেন আরও যাত্রাদলের রাজার মতন দেখতে হয়েছে; রাজা যেন একটা বিপদে পড়েছে—যুদ্ধই হোক বা মৃগয়াই হোক, বা অন্য কিছুই হোক। তাতেই উনি ঐ কথাটা বলতে আমিও ঐরকম জবাবটা দিলুম কিনা। কথাটা উঠল শাড়ি থেকেই। চুপ ক’রে বাইরের দিকে চেয়ে ব’সে ছিল, একবার নীলাম্বরীটা ভালো করে বুকে পিঠে জড়িয়ে নিয়ে বললে—“শাড়িগুনো কিন্তু বেশ গরম হয় রে!…নামটা কি বলেছিলি যেন?’

বললুম—স্বরূপ। স্বরূপ মণ্ডল। আমার বাবা আবার গেঁয়ের মোড়ল কিনা?’

 ‘বলছিলুম—শাড়িগুনো ধুতির চেয়ে বেশ গরম হয়, তোর কি মনে হয়?’

বললুম—‘মেয়ে ওনারা ভালো জিনিসটাই বেছে নেয় তো—বস্ত্রে বলুন, গয়নায় বলুন।’

দেখলুম একটু হাসলে। তারপর বললে— ‘তোর দিদিমণিকে বলিস এই কথা, কিম্বা তোর মাসিমাকে; সরবতের গেলাস মুখে ধরবে।’ চুপ করে রইল আবার খানিকটা। কতদূরে দিষ্টি নিয়ে গিয়ে কি যেন ভাবচে। তারপর বেশ একটু হেসেই বললে- ‘ভালো জিনিসে কিন্তু বেশ মানিয়েচে আমায় না?’

এরপর নিজেই বললে—‘খবরদার কিন্তু কাউকে কিছু বলবি নে! আমায় চিনিস নে, বড্ড কড়া লোক, খবরদার!

উদিকে যেমন আকাশে ক্ষ্যানে এই ভাব, ক্ষ্যানে ঐ, তেমনি সিদিন ওঁর মুখেও যেন নানা ভাব খেলে যাচ্চে। আবার একটু চুপ ক’রে থেকে বললে – দেমাক যে-রকমই, কিন্তু হোল বেশ মজাটা নয়? ঘোড়ায় চড়ে শিকার করতে বেরিয়ে…’

যা বললুম দা’ঠাকুর, ছেলেমানুষ, বাহাদুরী আছে কিন্তু অত জ্ঞান নেই বলেই মুখ দিয়ে বের করতে পারলুম, নৈলে কি পারি? বলিনি আপনাকে?-যাত্রা-অপেরায় তো ডুবে থাকতুম, সেকালে হতোও খুব। ওনার মুখের কথাটা একরকম কেড়ে নিয়েই বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ, এ যেন ঠিক ধ্রুবর বাবা রাজা উত্থানপাদের মত হোল। মৃগয়ায় গেছেন—ঝড় জল, সৈন্যসামন্তরা কোথায় ছিটকে পড়ল, শেষকালে পথ ভুলে সেই দুয়োরানী ধ্রুবর মা সুনীতির কুটিরে এসে হাজির। কাপড়ের ব্যাপারটাও সেইরকম কেমন মিলে গেল দেখুন না। দিদিমণি না হয় নিজের আধখানা ছিঁড়ে নাই দিলে, তবু তানারই পরণের তো…’

চৌধুরীমশাই যেন কিরকমটা হ’য়ে গিয়ে শুনছেল, হঠাৎ শিউরে উঠল, বললে—এই দেখ, নিজের ভাবনাই বড় করেচি, আসল কথার দিকে খেয়াল নেই—শাড়ি দুটো তো তোর দিদিমণির পরণের।… তাহলে?’

বললুম— ‘আরও আচে।’

বললে—‘থাকলেও পরার শাড়ি, খোঁজ করবে তো। আর, গেরস্তর ঘরে ক’টাই বা থাকে?…নাঃ, কাজের কথা নয়, ভেবেছিলুম বিষ্টি থামলেই বেরুব, এর ওপর আবার ভেজা ঠিক হবে না। কিন্তু তাহলে হচ্চে না তো। তুই এক কাজ করবি?’

আমি কি বলব যেন বুঝতে পারচি না। কোন সমিস্যেই নেই, কিন্তু সে-কথা দিদিমণি নিজের হাতে দিয়েচে এটুকু না বললে তো বোঝাতে পারচি নে। উনি ত্যাতক্ষণে কিন্তু দাঁড়িয়ে উঠেচে। ভাবছেল, বললে—‘হ’য়েচে, তোকে যা বলি শোন্, আমি ঘোড়ায় চ’ড়ে ঐ ছাতাটা মাথায় দিয়ে চ’লে যাচ্চি, বিষ্টিটা কমেচে, কালবৈশিখীর বিষ্টি, যেতে যেতে বোধ হয় থেমেও যাবে, তবু অন্ধকার, একটু দেরি হবেই আমার। তুই ত্যাতক্ষণে এইখানেই ব’সে থাকবি। ভয় করবে না তো শিবমন্দির বলে?”

বললুম—‘ঠাকুর তো নেই।’

‘সোতোরাং তানার সঙ্গী-সাথীরাও নেই, এই তো? ঠিক। চুপ ক’রে ব’সে থাকবি, আধঘণ্টার মধ্যেই আমার লোক এসে উপস্থিত হবে’খন। হাতে একটা তালা-আঁটা ব্যাগ থাকবে, চাবিটা তোকে দিয়ে বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকবে লোকটা। এ পোশাকগুনো রইল, নিংড়ে রেখে যাচ্চি, তুই এই কোণটায় এসে, ছাতা আড়াল ক’রে শাড়ি দুটো বের করে নিয়ে এগুলো পুরে তালা এঁটে আবার চাবি দিয়ে দিবি। হোল তো? মনে থাকবে?’

বললুম—‘খুব থাকবে।

‘শাড়ি দুটো বেশ নুকিয়ে আবার যেখেনকার সেখেনে রেখে দিতে পারবি তো?’

তা আর পারব না কেন বলুন? বললুম—‘খুব পারব।’

‘আর, ঐ কথা। ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পাবে না। বলবিনি তো কাউকে?’

বললুম –’আমার কি দরকার, কন্ না।’

‘খবরদার বলবিনি। আচ্ছা আমি তাহলে যাই।’

দরজায় গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াল, বললে—‘বলবিনি, বুঝলি? ব্যাগের মধ্যে পাঁচটা ট্যাকাও থাকবে। নিয়ে নিস তুই, কেমন?’

পারি কখনও অতক্ষণ বসে থাকতে দা’ঠাকুর, অত বড় একটা কথা, খোদ গাঁয়ের রাজা এসেছেল, অত কথা, অত কাণ্ড—পেট ফুলচে আমার বলবার জন্যে। য্যাতক্ষণ উনি বসেছেল, কোন উপায় ছেল না, চলে যেতেই তিন লাফে আমি একেবারে বাড়ির ভেতর।

“দিদিমণি শোন’সে কি কাণ্ড হয়েছে!’

ত্যাতক্ষণে বিষ্টিটাও আর খানিকটা ধ’রে এয়েচে, দিদিমণি একেবারে হন্তদন্ত হয়ে দাওয়ায় বেরিয়ে এল—“কিরে, আবার মাসি এসে পড়ল নাকি!’

বললাম— ‘ন্যাও, মাসির অমন ভাগ্যি হবে যে রাজপুত্তুরকে দেখবে! কে এয়েছিল বলো দিকিন মন্দিরে? তাহলে বুঝব।’

‘কে?’

‘ছ’আনির চৌধুরীমশাই।’

দিদিমণি একেবারে থমকে দাঁড়িয়েচে, কথাটা যেন বিশ্বাসই করতে পারলে না, আবার সুদোলে—‘কি বললি?’

‘ছ’আনি তরফের দেবনারাণ চৌধুরী। ঘোড়ায় চড়ে শিকারে গেছল, তারপর এই জল ঝড়, ভিজে চুপসে মন্দিরে গিয়ে উঠেছেল।’

‘ছ’আনি?…আর তুই হতভাগা যে আমায় বললি একাদশী ঘোষালের ছেলে সেই গেঁজেলটা…শাড়ি দুটো কি হোল?”

‘প’রে গেছে?’

‘কে প’রে গেচে রে হতভাগা? গুচিয়ে বল্ একটু। শাড়ি প’রে শাড়ি গায়ে দিয়ে কে. গেল?’

‘উনিই, আবার কে? ভিজল উনি, শাড়ি পরবে কে?’

‘সেকি রে! বলিস্ কি!’—বলে দিদিমণি দু’হাতে দুটো গাল চেপে একেবারে ডুকরে হেসে উঠল। ‘শাড়ি তুই ওনার জন্যেই নে গেছলি?’

বললুম—‘আর কার জন্যে তবে নে যাব?’

হাসিতে দিদিমণি ঝড়ে গাছের ডালগুলোর মতন নুয়ে নুয়ে পড়তে লাগল—‘আমায় বললি নে কেন হতভাগা -আড়াল থেকে দেখতুম একটু।…হ্যাঁরে, পরণে খড়কে শাড়ি, তার ওপর নীলাম্বরী—ঘোড়ায় চ’ড়ে-মাগো!—-তা গেল যে আবার? সেই ভিজে যাবে তো…’

বললুম—‘এক হাতে বাঁশের ছাতাটা ধ’রে নে গেলো যে-পাকা ঘোড়সওয়ার…’

দিদিমণি হাসির চোটে একেবারে যেন মোচড় খেয়ে তাড়াতাড়ি দেয়ালের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বললে, ‘তুই দূর হ হতভাগা, আজ আমায় হাসিয়ে মেরে ফেলবে। ছোঁড়া দুনিয়াসুদ্যু লোককে বাঁদর সাজিয়ে ছেড়ে দিচ্চে-এর পরকালে কি হবে মা! —পরণে শাড়ি, গায়ে শাড়ি, মাথায় সেই বীরভদ্দর বাঁশের চেঁচাড়ির ছাতা-আবার বলে পাকা ঘোড়সওয়ার! —বেরো তুই সামনে থেকে!’

এদিকে ক’দিন থেকে মনের ওপর বড্ড চাপ যাচ্ছেল, ভালো ক’রে হাসতে পারেনি, যেন আর থামতে চায় না। বৃষ্টিটা ধরে এল—আগাগোড়া সব কাহিনীটাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনলে- এক এক জায়গায় চুপ ক’রে যায়— অন্যমনস্ক হয়েও যায় এক একবার- যেমন ধরুন সেই ধ্রুবর মায়ের গল্পে, তারপর আবার খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে, বলে—‘বলতে হয় একবার —অমন দিশ্যটা দেখতে পেলুম না, ম’লেও আপসোস যাবে না…’

আবার ইদিকে ওনার লোক এসে পড়বে, গল্প ছেড়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলুম।

একটু চুপ করলে স্বরূপ। আমি বললাম—‘কষ্টের সংসার, যাই হোক, হাসির ক্ষমতাটা দিয়েছিলেন বিধাতাপুরুষ।’

স্বরূপ বললে— ‘আজ্ঞে, তা দিয়েছিলেন। তবে বিধেতাপুরুষের দান, একহাতে যা দেন অন্য হাতে আবার তা কেড়ে নেন যে; নৈলে য্যাত হাসি ত্যাত কান্না কথাটা বলেচে কেন? এর পরে যা সব ঘটতে লাগল বাড়িতে, হাসির পাট দিনকতকের জন্যে আবার বন্ধ রইল কিনা।’

জিগ্যেস করলাম— ‘কিরকম?’

‘রইল বৈকি। যদি বলি—ঐ হাসির মধ্যে থেকেই কান্নাটা ঠেলে বেরিয়ে এল তো সেও কিছু এমন ভুল বলা হবে না। তা বৈ আর কি? একটা কারণ সদ্য সদ্যই ঘটল কিনা চৌধুরীমশাইয়ের ভুলে। আমি যেতে না যেতেই ওনার লোক ব্যাগ আর ছাতা হাতে করে হাজির। বিষ্টি থেমে গেচে, আমি মন্দিরের চাতালেই ব’সেছিলুম, চাবি নিয়ে ভেতরে গিয়ে ছাতা আড়াল ক’রে ব্যাগ খুলে দেখি, মোটে একখানা শাড়ি! নীলাম্বরী—যেটা পাট ক’রে গায়ে দিয়ে নে’ গেছল সেটা নেই। আমার মুখটা শুকিয়ে গেল। বড় মানুষ, কষ্টের মধ্যে গেচে, ইদিকে জানে আমি ছেলেমানুষ মন্দিরের মধ্যে অপেক্ষা করে ব’সে রয়েচি, তাড়াহুড়ো ক’রে ব্যাগে পোরবার সময় একটা ছেড়ে গেচে, তাও ছেঁড়াটাই, কিন্তু তবু গেল তো? জাঁক ক’রে না হয় ওনাকে বললুম—কত কাপড় চান? কিন্তু জানি তো-ছেঁড়াই হোক, যাই হোক, একখানি গেলে আর কেনবার অবস্থা নেই। চুপ ক’রে ব’সে রইলুম দা’ঠাকুর, ইদিকে যে বলব কথাটা লোকটাকে তার উপায় নেই; বুঝেছি তো, চৌধুরীমশাইয়ের যা ব্যবস্থা তাতে ইচ্ছেটা নয় যে লোকটা জানতে পারে ব্যাগে কি এলো কি গেলো। তবু দোমনা হয়ে চুপ ক’রে ব’সেই রইলুম খানিকক্ষণ—বলি, কি না বলি; তারপর মোনো স্থিরই করে ফেললুম, একটা কাগজে পাঁচটা ট্যাকা ছেল, সেটা বের করে নিয়ে প্যান্টুলুন, জামা, পাগড়ি পুরে তালা এঁটে ব্যাগ আর চাবিটা লোকটার হাতে দিয়ে দিলুম, তারপর সে চলে গেলে, শাড়িটা কাঁকালে করে আস্তে আস্তে বাড়িতে গিয়ে উঠলুম। দিদিমণি দাওয়াতে ওপিক্ষ্যেই করছেল, হাসির জেরটা রয়েচে তো মনে, বোধ হয় হেসেই কি বলতে যাবে, আমার ভাবগতিক দেখে থমকে গিয়ে জিগ্যেস করলে কি রে স্বরূপ? অমন ক’রে এলি যে।’

প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললুম—‘একখানা শাড়ি দিতে ভুলে গেচে।’

দিদিমণি শিউরে উঠল একেবারে, বললে—“সে কি! তুই দেখেছিলি ব্যাগটা ভালো ক’রে?’

বললুম—‘খুব ভালো ক’রে দেখেচি।’

‘আর কিছু ছেল না?’

বললুম—না।’ ট্যাকাটার কথা আর তুললুম না দা’ঠাকুর।

দিদিমণি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ত্যাখনও থেকে থেকে বিদ্যুৎটা হ’চ্চে, একবার চোখ

তুলে মুখটার দিকে নজর পড়তে আমিও যেন আরও আড়ষ্ট হয়ে গেলুম। কাপড় গেচে, অভাবের সংসার, কিন্তু এ তো ঠিক ক্ষেতির জন্যে মনমরা ভাব নয়, দিদিমণি ভয়ে একেবারে কি রকম ধারা হয়ে গেছে। আমি একবার ক্ষেতির কথাটাই ধ’রে বললুম—‘ছেঁড়াটাই ভুল হয়ে গেচে।’

এক্কেবারে কানে গেল না। একটু থেমে আবার বললুম— ‘তাড়াতাড়ি ভ’রে দিয়েচে, টের পেলে নিশ্চয়ই পাঠিয়ে দেবে।’

সেই একরকম ভাব, বাইরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আচে, আর একটা বিদ্যুতের ঝলকানিতে দেখলুম শুধু সেই ভয়ের ভাবটা গিয়ে যেন রাগে থমথম করচে মুখটা। খানিকটা গেল, কথা কইতে সাহস পাচ্ছি না, তারপর হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যেতে যেন সমিস্যটার কিনারা দেখতে পেলুম, বেশ খুশি খুশি হয়েই বললুম—‘তুমি না হয় একটা চিঠি নিকে দেবে?—ওরা ঘরে আগুন দিতে আসবার সময় যেমন দিছলে…’

—সবটুকু বোধ হয় বলতেও পারিনি। দিদিমণি সেই সমস্ত রাগ নিয়ে যেন আমার ওপর ভেঙে পড়ল, ‘কি বললি! আর চিঠি লেখার কথা মুখে আনবি!’—বলে এগিয়ে আমার কানটা ধরে ঠাস ঠাস ক’রে দু’চড়!…”চিঠি”। চিঠি।’ বার দুই তিন ব’লে আবার চুপ ক’রে গেল। এতেই ও-ভাবটা কতটা যেন কেটে গেল, রাগটা বেরিয়ে গেল তো—যেমন ডালপালা ভেঙে ঝড়টা গেছে।—সব রকমের মারে তো কান্না আসে না দা’ঠাকুর, আমি চুপ ক’রে গালে আস্তে আস্তে হাত বুলুচ্ছিলুম, বললে—শোন্, যা বলচি একটি একটি ক’রে মনে রাখবি; রাখবি তো?

ঘাড় নেড়ে জানালুম—রাখব!

‘একটু ইদিক-উদিক হোলে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব। শুনে রাখ—চৌধুরীদের বাড়ির দিকপানে যাবার নাম করবিনে। যা হোল আজ, শাড়ি ভুলে যাওয়া ইস্তক—একবর্ণ কেউ টের পাবে না একেবারে ছায়া মাড়াবিনে ছ’আনির, যদি বা কোথাও হয়ে যায় দেখা, তো এক্কেবারে মুখ ঘুরিয়ে চলে আসবি সেখেন থেকে, আজকের ব্যাপার নিয়ে, কি, অন্যদিনের ব্যাপার নিয়ে একটি কথা নয়। মনে থাকবে তো?’

বললুম—‘থাকবে।’

‘পা ছুঁয়ে দিব্যি কর।’

দিব্যি করলুম। বললে— ‘থালাটা নিয়ে বোস্, ভাত বেড়ে দিই।’

তারপরেই ঐ যে কান্নার কথা বললুম দা’ঠাকুর। দাওয়ায় ব’সে খাচ্ছিলুম, প্রায় আধাআধি হয়েছে, এমন সময় ঘরে চাপা কান্নার শব্দ উঠল, তারপরেই আবার দুই—“উঃ!—উঃ!” খুব কষ্টে পড়ে কাঁদলে দিদিমণি যেমন ক’রে ওঠে। আমি হাত গুটিয়ে উঠে গিয়ে ঘরের চৌকাঠের বাইরে দাঁড়ালুম। ত্যাখনকার দিনে তো একালের মতন ফটোগেরাফের রেওয়াজ ছেল না; মা-ঠাকরুন য্যাখন মারা যান, দিদিমণি পা দুখানি আলতায় রাঙিয়ে একখানা কাগজে তার ছাপ তুলে রেখেছেল, তারপর একটা মোটা পিজবোটে সেটা সেঁটে ঘরের মধ্যে একটা কুলুঙ্গিতে হেলান দিয়ে রেখেছেল, সন্দের পরই তুলসীতলায় পিদিম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি পিদিম জ্বেলে কুলুঙ্গির মধ্যে সেইখানটিতে রেখে দিত। দেখি, এদিকে পেছন ফিরে কুলুঙ্গির পাড়ে মাথা চেপে ফুলে ফুলে কাঁদচে দিদিমণি; এক একবার সেই ‘উঃ!—উঃ!’ শব্দ; কপালটা চেপে মাথাটা দুলিয়ে দুলিয়ে নিচ্চে—যেন আর পারচে না সহ্যি করতে।

বাইরের কপাটটা বন্ধ ছেল, মাসিমা ঘা দিয়ে ডাক দিতে মুখটা মুছতে মুছতে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল; আমি এসে খেতে বসেছিলুম আবার, বললে— ‘খবরদার, সব মনে রাখবি!’

সাতদিন পরে বাবাঠাকুর এসে উপস্থিত হোল। কাল মা-ঠাকরুনের বাচ্ছরিক, কোন ব্যবস্থাই নেই, দিদিমণি কবারই দেখলুম সেই কুলুঙ্গিটার সামনে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছচে। বেশ গরম পড়েছে, সন্দে জ্বেলে দিদিমণি রান্নাঘরের নীচু দাওয়াটাতে বসল, আমি বসলুম পৈঠেয়। মন্দিরের ব্যাপারের পর থেকে কম কথা কইচে, শুধু দু’দিনে বারকয় জিগ্যেস করলে, ছ’আনি তরফের সঙ্গে আর দেখা হয় নি তো। ব’সে আচি, জিগ্যেস করলে—“কি করি বল তো? এক ভাবনায় পড়া গেল না?’

মন্দিরের ব্যাপার নিয়েই মনে ক’রে আমি কি বলতে যাচ্ছিলুম, একটু যেন দেঁতো হাসি হেসে বললে—‘না হয় যাবি একবার নবীন স্যাকরার ওখানে, দেখবি কোথায় আচে? মনে করেছিলুম—আর হাত পাতব না—ওরও তো বোন, আমার একলার দায় তো নয়-একটা আশাও ছেল বাবা এসে পড়বে- চিরজন্ম ঘর করলে, এতটা কি ভুলতে পারে? একজন্মের সম্বন্ধও নয় তো—-তা যেমন সোয়ামী তেমনি বোন।—তা আমার তো মা-ই স্বরূপ, না হয় দেখবি একবার? নেমরক্ষে ক’রে কাজটুকু সেরে দুটো বামুনও তো খাইয়ে দিতে হবে।…লোকে বলে—মা হওয়া দায়, কেন, মেয়ে হয়ে বড্ড নিশ্চিন্দি ক’রে রেখেচে, না?’

মুখে আঁচলটা চেপে ধরলে, চোখ বেয়ে দরদর ক’রে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।

সেই পাঁচটা ট্যাকা দা’ঠাকুর। পাওয়া ইস্তক কবারই মনে হোল দিদিমণিকে দিয়ে দিই, অভাবের সংসার তো, তবে ছেলেমানুষের লোভ, পারিনি, ব্যাঙের আধুলির মতন কাপড়ের খুঁটে বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্চি। আর পারলুম না, কাপড়ের খুঁটটা বের করে গেরোটা সামনে ধ’রে বললুম—‘আমার কাছে পাঁচটা ট্যাকা আছে দিদিমণি…’

যেন গোখরোয় ছুবলেচে এইভাবে দিদিমণি চমকে উঠল, সঙ্গে সঙ্গেই জলে ভরা অমন নরম চোখ দুটো যেন শুকিয়ে জ্বলে উঠল, সুদোলে—কোথায় পেলি! ট্যাকা পেলি তুই কোথায়!’

আর চৌধুরীমশাইয়ের দিকে যেতে পারলুম না তো, নৈলে নুকুবার জন্যে ট্যাকা দিয়েচে, দিদিমণি সমস্ত কাহিনীটা জানেও, দ্বিধে করবার তো কিছু ছিল না তার মধ্যে। চোখ দেখে কিন্তু আর ভরসা হোল না। ব্রেজঠাকরুন যে বলছেল—যা দেয় তা থেকে নুকিয়ে রাখিনে তো কিছু কিছু?—সেই কথা মনে পড়ে গেল। বললুম- ‘একটা দোষ করেচি, যদি রাগ না করো। অভাবের সংসার তো, মাসিমা যা দিয়ে এয়েচে তাই থেকে একটা একটা করে বাঁচিয়ে এসেচি- মনে করলুম, অভাবের সংসার, তেমনি কখনও দরকার পড়ে দিয়ে দিলেই হবে…’

দিদিমণি একঠায় চেয়ে চেয়ে শুনছেল, শুনতে শুনতেই আবার ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল, হাতটা বাড়িয়ে বললে—দে, তোর বুদ্ধি নয় রে স্বরূপ, ছেলেমানুষের অত বুদ্ধি হয় না, যাঁর কাজ তিনিই তোকে দিয়ে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে রেখেচেন। দে। আর দেখি, সতীলক্ষ্মী পুণ্যবতী মা আমার—একটা কি গায়ে আঁচড় লাগতে দেবেন?—এই যে কুচক্রী একাদশী ঘোষাল—সতীলক্ষ্মীর মেয়ে ঘরে নিয়ে যাবেন! ওঁদের হাঁড়িতে চাল দেবে!—উনুন জ্বেলে, হাঁড়ি চড়িয়ে বসে থাকতে বলগে বাপ-বেটাকে ঠাঁইয়ের ওপর।…আরও যাদের কুমতলব আচে—যদি থাকেই—যত বড়ই হোক না সে

ঠিক আমাকেই যে বলেছেল তা নয়, মা-ঠাকরুনের কথা উঠলে নিজের মনেই যেমন বলে যায় সেইরকম বলে যাচ্ছিল, থেমে গিয়ে বললে—‘দে, তুলে রাখি। রাগ করব কেন? ….এক এক সময় মেরে বসি, মাথার ঠিক থাকে না; বড্ড লেগেছিল তখন?’

গেরোটা খুলতে খুলতে বললুম—‘এক এক সময় মারো, বরং ভালোই লাগে।’

বললে—ঐ রোগ তোর, হাসব না, হাসবার মতন অবস্থা নয়, তবু হাসিয়ে দিবি। মার খাওয়া নাকি সন্দেশ খাওয়া, ভালো লাগবে!…দে।’

টাকা ক’টা একবার ডান হাত থেকে নিয়ে বাঁ-হাতে ঝনঝন করে ঢাললে, তারপর বাঁ হাত থেকে নিয়ে ডান হাতে, তারপর আঁচলে বেঁধে কপালে ঠেকাচ্চে, খিড়কির দিকে নজর পড়তে চাপা গলায় বলে উঠলুম— ‘মাসিমা না দিদিমণি।’

দিদিমণি আঁচলটা নামিয়ে নিলে, সঙ্গে সঙ্গে ব্রেজঠাকরুনও উঠোনে পা দিলে। এসময় থাকে না বাড়িতে, আর এলও যেন একেবারে অন্যরকম। দু’হাতে নতুন গামছায় বাঁধা দুটো বেশ মাঝারি গোছের মোট। দেখলে আমাদের দুজনকে, কিন্তু কিছু না ব’লে গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে বড় ঘরটার ভেতর চলে গেল। একটু মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম আমরা, তবে সেই বাড়ি মেরামতের দিন থেকে এমনিই ভাব তো, কথা কম, মুখ ভার-ভার, অতটা আর নোতুন ব’লে বোধ হোল না। দিদিমণি চাপা গলায় বললে’দেখতে পায় নি। নিশ্চয় কালকের বাজার সব সেরে নিয়ে এল, দেখিগে।’

পেয়েছিল দেখতে। আমার য্যাখন নজর পড়ল ত্যাখন দিদিমণি এক হাত থেকে ট্যাকাগুনো অন্য হাতে ঢালচে-ঝনঝন শব্দও হচ্ছে, ব্রেজঠাকরুন উঠোনে পা দিয়েছিল, টেনে নিয়ে আবার দোরের আড়াল হয়ে পড়ল। সে-কথা কিন্তু আর দিদিমণিকে বললুম না। তারপর উনিও উঠতে যাবে, এমন সময় আর এক কাণ্ড; হঠাৎ বাবাঠাকুর এসে উপস্থিত। উঠোন বেয়ে সোজা বড় ঘরের দিকেই চ’লে যাচ্ছিল, আমাদের দেখে হনহন ক’রে এগিয়ে এসে দাঁড়াল। কয়েকবারই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে বেরিয়ে গেচে, ব্রেজঠাকরুন আসা ওবধি, কিন্তু এরকম চেহারা হয়নি একবারও, ক’দিন খেউরি নেই, চুলগুলো উস্কখুস্ক, চোখ মুখ গেচে ব’সে, শুকিয়ে গিয়ে গায়ে যেন খড়ি উঠচে; সব মিলিয়ে এমন একটা ভাব যে প্রশ্ন করবে তা দিদিমণির মুখে যেন রা সরল না। বাবাঠাকুর একটু কটমটিয়ে চেয়ে রইল, তারপর বললে— ‘দেখ চেয়ে, কদ্দিন আমায় এমন ক’রে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হবে? তোর মাসি কোথায়?”

—বেশ জোরেই; জানে তো ব্রেজঠাকরুন এসময়টা বাইরে বাইরেই কেত্তন কি কথকতা শুনে বেড়ায়। গলাটাও খনখন করচে; দিদিমণি কিন্তু উত্তুর দেওয়ার আগেই আবার নিজেই বললে—যেখেনেই থাকুক, এলে বলবি আমি দোব আমার মেয়ের বিয়ে যেখানে খুশি, ধার ক’রে হোক্ যা ক’রে হোক্। করাব আমার বাড়ি মেরামত – যার ভালো না লাগে সে নিজের পথ দেখুক—মাথায় ক’রে ব’য়ে নিয়ে এয়েচি?’

দিদিমণির চোখ দুটো যেন ওনার মুখের ওপর আটকে রয়েচে, আমারও সেই অবস্থা। ঘরের দিকে মুখ ক’রে ব’সে ছিলুম, নজরে পড়ল ব্রেজঠাকরুন ঘর থেকে বেরিয়ে এয়েচে—ওনার কথার সঙ্গে সঙ্গে দাওয়ায় এসে দাঁড়াল, তারপর শেষের দিকে পৈঠেয় নেমে কোমরে দুটো হাত দিয়ে দাঁড়াল, সেই খনখনে আওয়াজই, কিন্তু গলা বেশি না তুলে বলল—‘না, তা আনোনি মাথায় ক’রে ব’য়ে।’ —

একেবারেই আচমকা, ঘুরে দেখেই বাবাঠাকুর একেবারে চুপ ক’রে গেল। তারপর সেইরকম কোমরে হাত দিয়ে দুলে দুলে চিপটেন কাটতে লাগল ব্রেজঠাকরুন—‘আনোনি তো; শত্তুরেও সে অপবাদ দিতে পারবে না। আনোনি সে তা শুকনো ন্যায়শাস্তোর ছাড়া মাথায় কিছু নেই ব’লে। কিন্তু না এসে পড়লে সংসারটা কোথায় থাকত ভেবে দেখেছ কি? ঐ একটা ধুম্বো আইবুড়ো মেয়ে, বে-পর্দা, নিজেকে মস্ত জ্ঞানী মানী ব’লে মনে করো, কিন্তু গাঁয়ের আর কেউ তো করে না—কী হোত, এখনও ব্রেজবামনী থাকা সত্ত্বেও নিত্যি কি বিপদটা যাচ্ছে—এই আজ—এই মুহুখ পজ্জন্ত, তার খোঁজ আচে জ্ঞানী-গুণী মহাপুরুষের?…আনোনি মাথায় করে কুটুম-আদরে, রেখেচও কি কুটুমের মতন ক’রে?—খাচ্চি যে খাওয়াচ্চিও যে সে কি তোমার পয়সায়?…কেন? রয়েচি যে, সেও কি তোমার বাড়িতে যে পথ দেখতে হবে? এক একখানি ক’রে ইট যার কাছে বিক্রি হয়ে রয়েছে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করব, য্যাখন দরকার। ‘মেয়ের আমার যেখেনে খুশি বিয়ে দোব!’—কেন, কি অধিকারে শুনি? শুধু জন্ম দিয়েচ বলে? তারপর? কি করেচো মেয়ের জন্যে, কি কচ্চ এখনও?…’

ঠিক বলতে পারি না দা’ঠাকুর, তবে বাবাঠাকুরকে তো জানি, ওনার কাছে এঁটে উঠবে সে ক্ষ্যামতা তো নেই, নিশ্চয় সদ্য সদ্য পিষ্টভঙ্গ দেবার জন্যেই খোলা দরজার দিকে চেয়েছে, ব্রেজঠাকরুন একরকম ছুট্টে গিয়েই দরজা দু’টো ভেজিয়ে পিঠ দে চেপে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল—‘পাবে না যেতে, বড় গলা ক’রে বললেই হবে না তো, শুনতেও হবে, জবাবও দিতে হবে, বলি—কি করেচ মেয়ের জন্যে যে—তাকে হাত-পা বেঁধে গাঙের জলে ভাসিয়ে দিতে হবে?’

তারপরেই সে যা দিশ্য তা শুধু দেখেছিনু যাত্রায় দুৰ্ব্বাসা মুনি য্যাখন শাপ দিচ্চে শকুন্তলা- ঠাকরুনকে—বাবাঠাকুর একেবারে বন্ ক’রে ঘুরে দাঁড়াল ব্রেজঠাকরুনের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে। শিক্‌ড়ে শিক্‌ড়ে হাত দুটো মুঠো করে শক্ত ক’রে নিয়েচে, অমন যে কেঁচোটি হ’য়ে শুনছেল এতক্ষণ, রাগে-আক্রোশে সমস্ত শরীরটা থরথর করে কাঁপছে, সেই খনখনে গলা যতটা পারলে তুলে বললে—‘মাসি! —খুব খোঁজ রাখো! ভাসাচ্চি গাঙের জলে-কিন্তু আমি না ভাসালে ও যে নিজেই ভেসে যাবে নর্দমার জলে-জিগ্যেস করো ওকেই—ঐ অবোধ বালককে জিগ্যেস করো—’

একটা হাত আমাদের দিকে বেঁকিয়ে ধরেচে, আর গলা যাচ্চে ক্রেমেই উঠে— ‘জিগ্যেস করো!—-জিগ্যেস করো!! – জিগ্যেস করো!!…’

তারপরেই পতন ও মুচ্ছো, সেই যে যাত্রাদলের অধিকারীরা মহলা দেওয়ার সময় বলে দেয় না। এক লহমায় কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল—জল আন্ মুখে ঝাপটা দে…’

দিন, আর ধোঁয়া বের করতে পারচেন না দা’ঠাকুর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *