কাঞ্চন-মূল্য – ১৪

১৪

হুঁশ ছিল না। হুঁকোটা কাত ক’রে দেখি, সত্যিই আগুনটা একেবারে নিভে গেছে। স্বরূপ নাতনীকে ডেকে, তাড়াতাড়ি সেজে আনতে ব’লে, ছিপটা আবার তুলে নিলে, কাতার গোটাকতক টান দিয়ে বললে—‘কাহিনীটে কিঞ্চিৎ দীঘ দা’ঠাকুর, তবে এবার গুটিয়ে এয়েচে। বলিনে কাউকে, কাকে বলব ক’ন, আজকাল আপনারা সব যেন ডেলি প্যাসেঞ্জার, ফুরসতই বা কোথায়?—মনের দরদই বা কোথায়? অথচ ইচ্ছে করে বলি, আর তো শেষ হয়ে এল আমার—তাই আরও ইচ্ছে করে শুনিয়ে যাই কাউকে-কী যে ছেল দিদিমণি?—দিদিমণির কথা সে যে আমার কাচে কী অমর্ত সমান, শুধু দিদিমণিই বা কেন—ব্রেজঠাকরুনের মতনই কি আর একটা মানুষ নজরে পড়ল এই চারকুড়ি বয়েসের মধ্যে—তারপর বাবাঠাকুর মুনিঋষিদের কাহিনীই শুনেচি—সরল, নিষ্পাপ, নিশ্লোভ—কাহিনীই শুনেচি—যাত্রায় বলুন, কথকতায় বলুন, কিন্তু চোখে তো দেখিনি কখনও, তা…’

নাতনী তামাক সেজে নিয়ে এল। ‘আমারই দে, মুখপাতটা সামলে দিই।’—ব’লে কয়েকটা. টান দিয়ে, কলকেটা আবার হুঁকোর মাথায় চাগিয়ে দিয়ে স্বরূপ আরম্ভ করলে—

‘ব্যাপারখানা বুঝলেন না দা’ঠাকুর? সেই যে সিদিন ওনাকে বলেছিলুম দিদিমণি বলেচে—ঘোষালমশায়ই হোক বা ছিরু ঘোষালই হোক, ওনার বাদবিচের নেই আর, বিয়েটা হোলেই হোল, না হয় বেম্মজ্ঞানী হয়ে গিয়ে কলকাতায় মাস্টারনী হবে—নকুলে মানুষ, নানান সময় নানান কথা বলে, তা আমি বাহাদুরি ক’রে ঠাকুরমশাইকে বললুম না সিদিন?—শুনে ওনার ভয়ঙ্কর অভিমান হয়েছেল তো, আর তাই থেকেই তো তাড়াতাড়ি আর সাতপাঁচ না ভেবে বাড়ি মেরামত, চুন ফেরানো—তা ব্রেজঠাকরুন দোর আগলে দাঁড়াতে সেই মোক্ষম কথাগুলো অভিমানের মাথায় মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ল, কাহিল শরীর, আর সামলাতে পারলে না।

মা-ঠাকরুনের কাজটা ভালোভাবেই হয়ে গেল দা’ঠাকুর। আজ্ঞে হ্যাঁ, বেশ ভালোভাবেই, ব্রেজঠাকরুন একটা ব্যবস্থা ক’রেই ছেল, বাবাঠাকুর বাকিটুকু বেশ ভালো করেই নিষ্পন্ন করলে। বিয়ের আয়োজনে ভালোরকমই নিয়ে এসেছিল তো, বাড়িতে অল্প কিছু ছাড়া খরচও হয় নি, বেশ ভালো ক’রেই ব্যবস্থা ক’রে দিলে উনি। খাওয়ান-দাওয়ান, দেওয়া-থোওয়া প্রায় সেই আদ্যছেরাদ্দরই কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল।

সবই ভালো হোল, কিন্তু ভাঙা আর জোড়া লাগল না। বাড়ি গমগম করচে, সতীনক্ষ্মী মা-ঠাকরুন যেন বছর ঘুরিয়ে দুগ্‌গাঠাকরুনের মতন অবতীন্না হয়েচেন—সবই ভালো, কিন্তু তিনজনের কারুর সঙ্গে কারুর কথা নেই, আমায় খুঁটি করে কাজ চলচে— ‘স্বরূপ, এটা আনিয়ে দিতে বল্–স্বরূপ, এ কাজটা এখনও কেন হয়নি?’

দিদিমণি অবিশ্যি করলে চেষ্টা—দুজনারই রাগ ভাঙিয়ে কইতে কথা, কিন্তু শুনচে কে? নিত্যিদিনের ছোটখাটো ব্যাপারগুনো একে গায়েই মাখত না, তার ওপর মায়ের কাজটা মনের মতন ক’রে হচ্চে, মনটাও খুব ভালো—একবার ব্রেজঠাকরুনকে কি একটা জিগ্যেস করে উত্তুর না পেয়ে উনি চলে যেতে আমার দিকে চোখ নাচিয়ে বললে- ‘ভাঙা কাঁসি, তারও কত কদর!’—খিল খিল ক’রে চাপা গলায় একটু হেসেও উঠল-

তারপর হাতের কাজ নিয়ে আবার আমার দিকে একটু চোখটা নাচিয়ে উঠে গেল। একদিনেই সব ব্যবস্থা, পাট সেরে গুছিয়ে-গাছিয়ে নিতে বেশ রাত হয়ে গেল। দিদিমণি বাবাঠাকুরকে দাওয়ায় খেতে দিলে। কাজের বাড়ির ঘাঁটাঘাঁটি গেচে সমস্ত দিন, ব্রেজঠাকরুন ঘোষপুকুরে গা ধুতে গেছল, ফিরে এলে ঘরের ভেতর ওনার জন্যে ঠাঁই করে ফল, সন্দেশ, ক্ষীরের বাটি গুছিয়ে রাখছেল, ভাঙা কাঁসির আওয়াজ উঠল—‘স্বরূপে কোথায় গেলি? বলে দে আমি আর এ বাড়িতে জলস্পর্শ করব না। আর বাড়ির কত্তাকে এও বলে দে-নিজের সংসার বুঝে নিক; কাল থেকে আমি আর এ বাড়িতে নেই।’

একটা চলন্ত গাড়ি কল টিপে কে যেন আচমকা থাম্যে দিলে দা’ঠাকুর। বাবাঠাকুর বেশ দমের ওপর খেয়ে যাচ্ছেল, সমস্তদিনের খাটুনি তো, তা য্যাতটুকু তুলেছেল হাত ত্যাতটুকুই রয়ে গেল, দিদিমণি তো পাষাণ মূর্তি হয়ে গেছে, তারপর ‘ও মাসিমা!’ ব’লে বোধ হয় পা জাপটে ধরতে যাচ্ছেল, ব্রেজঠাকরুন খখন ক’রে উঠল—‘স্বরূপ, বলে দে, যদি এর ওপর চাপাচাপি করতে যায় তো এই মুহূর্তেই আমি চৌকাঠ ডিঙিয়ে যাব বাড়ির!’

একটি শব্দ নেই আর বাড়িতে, তারপর আপনার গিয়ে বাবাঠাকুরও রুখে উঠল—‘তা হলে আমিও এই উঠলুম—’ ব’লে পাত চেপে উঠে পড়বে, ব্রেজঠাকরুন একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল, পাতের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললে-আজ্ঞে, আর স্বরূপকে নয়, খোদ বাবাঠাকুরকেই—পাতের দিকে আঙুলটা সোজা করে বললে— ‘খবরদার বলচি, আর বাড়াবাড়ি নয়! বামুন, তার ওপর য্যাতই অপদার্থ হোক য্যাতই যা হোক, সোয়ামী, পাত ছেড়ে উঠলে হরোর আমার সেখেনে অকল্যেণ হবে। এই আমি দাঁড়িয়ে রইলুম, উঠেচ কি নিজের কপালে থান ইট ভেঙে আপ্তঘাতী হব এইখানে।…দে একটা থান ইট এনে আমায়—কোথায় গেলি, এই ছোঁড়া!’

আমি ইট খুঁজে আনবার জন্যে বাইরে গিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলুম, দা’ঠাকুর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *