কলিকাতায় নবকুমার – ৬০

ষাট

হাঁ হয়ে গেল নবকুমার। দরজা তো বন্ধই, জানলাগুলোও খোলা নেই। মুক্তো তাহলে বাড়িতে নেই! অথচ এখন তার ইচ্ছে করছিল, গা-হাত-পা ধুয়ে বিছানায় শরীরে এলিয়ে দিতে। কী করবে সে? মুক্তো ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে তাকে। দরজার গায়ে ঠেস দিয়ে সে দেখল, যে-গাড়িটা তাকে স্টুডিও থেকে পৌঁছে দিতে এসেছিল সেটা ফিরে গেল।

এখন রাত হয়েছে। মুক্তো নিশ্চয়ই শেফালি-মায়ের কাছে গিয়েছে। কিন্তু ওর তো উচিত ছিল অনেক আগে ফিরে আসা। শেফালি-মাকে ফোন করলে জানা যাবে ও রওনা হয়েছে কি না! কিন্তু এ-পাড়ায় টেলিফোন বুথ কোথায়? এই সময় ট্যাক্সিটা এসে থামল বাড়ির সামনে। উলটোদিকের বাড়ির মেয়েটা ভাড়া মিটিয়ে নামতেই তার মোবাইল বেজে উঠল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে তিনবার ‘সরি’ বলে লাইন কেটে দিতেই নবকুমার বলে ফেলল, ‘শুনছেন?’

মেয়েটি তাকাল। ট্যাক্সি চলে যেতেই ভ্রূ কুঁচকে মেয়েটি তাকাল। নবকুমার বলল, ‘আমি এই বাড়িতে থাকি। এসে দেখি দরজায় তালা দেওয়া। আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা ফোন করতে পারি।’

মেয়েটি কাছে এগিয়ে এল, ‘নম্বর প্লিজ!’

শেফালি-মায়ের ফোন নম্বর বলল নবকুমার। মেয়েটি বোতাম টিপল। যন্ত্রটা কানে চেপে মাথা নাড়ল, ‘ইটস নট ওয়ার্কিং। ফোন খারাপ আছে।’

‘ফোন খারাপ?’

‘ইয়েস! শুনতে চান?’

‘না-না। ঠিক আছে। এখন আমি কী করি!’

মেয়েটি কাঁধ নাচিয়ে নিজের বাড়ির দরজায় চলে গিয়ে বেল বাজাল। কেউ সেটা খুলে দিলে ভেতরে ঢুকে গেল।

দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছিল। কোমরটা যেন পাথর হয়ে আছে। এই কোমরেই পুলিশের লাথিটা পড়েছিল বেশ জোরে। হঠাৎ মন্দাক্রান্তার কথা মনে এল। আশুতোষ কলেজের কাছাকাছি টেলিফোন বুথ থেকে মন্দাক্রান্তাকে ফোন করে সমস্যার কথা বলবে? প্রশ্নটা মনে আসতেই মাথা নাড়ল সে। মন্দাক্রান্তাকে সে এমনিতেই কত ঝামেলায় ফেলেছে, বড়বাবু যে তার প্রতি সদয় হয়েছেন সেটাও মন্দাক্রান্তার জন্যেই, আর নতুন করে ওঁকে বিব্রত করা উচিত হবে না।

রাত সাড়ে ন’টা বেজে গেল। পকেটে প্রাোডাকশনের দেওয়া ছয় হাজার টাকা রয়েছে। কথাটা খেয়ালে আসতে কীরকম অস্বস্তি শুরু হয়ে গেল। কোনওমতে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হেঁটে বড় রাস্তায় চলে এল নবকুমার। শেষপর্যন্ত আর না পেরে সে একটা টেলিফোন বুথে ঢুকল। শেফালি-মায়ের নম্বর ডায়াল করতে একটা যান্ত্রিক আওয়াজ কানে এল। টানা। রিং হচ্ছে না। রিসিভার নামিয়ে মন্দাক্রান্তার নম্বর ডায়াল করল সে। এই নম্বর দুটো এখন সে মুখস্থ করে ফেলেছে। রিং হচ্ছে। তার পরেই মন্দাক্রান্তার গলা কানে এল, ‘হ্যাঁ! বলছি।’

‘আমি নবকুমার।’

‘আরে! কী আশ্চর্য! কনগ্র্যাচুলেশন! আজ নাকি তুমি খুব ভালো অভিনয় করেছ। গীতিময়বাবু তো বটেই, খোদ বড়বাবুও একটু আগে তোমার প্রশংসা করলেন। কোথায় তুমি?’

‘আমি রাস্তায়। অনেকক্ষণ আগে ভবানীপুরের বাড়িতে পৌঁছে দেখছি, দরজায় তালা দেওয়া। মুক্তো নেই। শেফালি-মাকে ফোন করছি। কিন্তু রিং হচ্ছে না।’ নবকুমার বলল।

‘সেকী! মুক্তো কোথায় গেল?’

‘জানি না। আমার শরীরটা, মানে খুব টায়ার্ড লাগছে—!’

‘লাগবেই তো। তুমি ওখানেই দাঁড়াও। আমি শেফালি-মাকে ফোন করে দেখি!’ লাইন কেটে দিলেন মন্দাক্রান্তা। বুথের লোকটাকে টাকা দিয়ে একটু সরে দাঁড়াল নবকুমার। মিনিটখানেকের মধ্যেই বুথের ফোন বেজে উঠতেই লোকটা রিসিভার তুলে কথা বলে বেরিয়ে গেল, ‘এই যে, আপনার নাম নবকুমার তো? আপনার ফোন এসেছে। রিসিভ করলে এক টাকা দেবেন।’

ভেতরে ঢুকে রিসিভার তুলল নবকুমার, ‘বলুন।’

‘হ্যাঁ। ফোনটা খারাপ। তুমি এক কাজ করো। আমার এখানে একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে এসো। কাল সকালে তোমার শ্যুটিং আছে। কতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে তুমি।’

‘আপনার ওখানে? কিন্তু বড়বাবু—!’

‘সেটা আমি বুঝব।’

‘না। আমার জন্যে আপনি সমস্যায় পড়বেন। তার চেয়ে আমি ট্যাক্সি নিয়ে শেফালি-মায়ের কাছে চলে যাচ্ছি!’

‘দ্যাখো, শেফালি-মাকে আমি যতটুকু বুঝেছি উনি দায়িত্বজ্ঞানহীন নন। তুমি বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছ জেনেও মুক্তোকে পাঠাবেন না, এটা কখনওই উনি করবেন না। আমার মনে হচ্ছে ওঁর কোনও অসুবিধে হয়েছে।’ মন্দাক্রান্তা বললেন।

‘তাহলে তো আমার এখনই যাওয়া উচিত।’

‘দাঁড়াও। তুমি এখন কোথায় আছ?’

‘আশুতোষ কলেজের উলটোদিকের গলির কাছে।’

‘তুমি কলেজের গেটের কাছে চলে এস। পনেরো মিনিটের মধ্যে আমি আসছি।’ লাইন কেটে দিলেন মন্দাক্রান্তা। একটা টাকা লোকটাকে দিয়ে বাইরে চলে এল নবকুমার। এটা কী হল? মন্দাক্রান্তা আসছেন মানে তাকে শেফালি-মায়ের কাছে পৌঁছে দেবেন। এত রাতে সোনাগাছিতে ওঁকে নিয়ে যাওয়া যায় না। বড়বাবু জানতে পারলে তাকে শেষ করে দেবেন। তা ছাড়া, ওখানকার খারাপ লোকগুলো কীরকম ব্যবহার করবে তা কেউ জানে না। সে হাত তুলে একটা ট্যাক্সি থামাল। উঠে বসে বলল, ‘সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যু-গ্রে স্ট্রিট।’ ট্যাক্সি চলতে শুরু করলে একটু স্বস্তি হল দুটো কারণে। বসতে পেরে এতক্ষণ বাদে শরীর একটু আরাম পেল আর মন্দাক্রান্তার যাওয়া বন্ধ করতে পারল। গাড়ি নিয়ে আশুতোষ কলেজের সামনে পৌঁছে তাকে দেখতে না পেলে মন্দাক্রান্তা নিশ্চয়ই তাঁর বাড়িতে ফিরে যাবেন।

সিনেমা হলগুলো সরে-সরে যাচ্ছে। এই শহরে প্রথম যেদিন পা দিয়েছিল সে, সঙ্গে মাস্টারদা ছিল। লোকটা দুম করে মরে গেল। মাস্টারদা বলত, কর্পোরেশনের জল পেটে পড়লে মানুষ বদলে যায়। কথাটা বোধহয় ঠিক। প্রথম শহরের পথে হাঁটতে ভয় লাগত। যদি রাস্তা গুলিয়ে ফেলে, যদি বাড়ি ফেরার পথ খুঁজে না পায়। ট্যাক্সিতে একা ওঠার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না। এখন পারছে সে। কর্পোরেশনের জলে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে বলেই হাসপাতাল থেকে মাকে বাবা গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে কি না তা জানতে ইচ্ছে করলেও জানা হয়নি। এই শহর তাকে শেখাতে চাইছে কী করে শুধু নিজের জন্যে বাঁচতে হয়। তাই গোলমাল হয়ে যায় শেফালি-মা বা মন্দাক্রান্তাকে দেখে। সারা শহর জুড়ে যখন লোহায় জং পড়ছে তখন কেউ-কেউ ইস্পাত হয়ে দারুণভাবে বেঁচে আছে।

ক্লান্তিতে এবং ব্যথায় ঘুম আসছিল। শরীরটাকে আরও একটু আরামের জন্যে ট্যাক্সির সিটে ছড়িয়ে দিতেই অন্ধকারে কিছুর স্পর্শ পেল নবকুমার। হাতড়ে-হাতড়ে যেটা তুলে নিল সেটা একটা বই। ট্যাক্সিটা তখন একটা রেড লাইটে দাঁড়িয়ে। বাইরের আলোয় সে বইটাকে দেখল। একলা নদীর সঙ্গে। এটা নিশ্চয়ই কবিতার বই। পাতা ওলটাতে কবিতার চেহারা দেখতে পেল সে। কবিতার ব্যাপারে তার কোনও আগ্রহ নেই। সে ট্যাক্সিওয়ালাকে বইটার কথা বলল। অবাঙালি ড্রাইভার বলল, আগে যে মেয়েটা উঠেছিল, সম্ভবত সে ফেলে গিয়েছে। তার দরকার নেই, বাবু ইচ্ছে করলে নিয়ে যেতে পারেন।

বিন্দুমাত্র আগ্রহ হচ্ছিল না বইটা নিয়ে যেতে। অন্ধকারে কিছুই পড়া যাচ্ছে না। এসপ্ল্যানেডে ট্যাক্সি দাঁড়াতেই যে পাতাটা খুলে চোখের সামনে ধরল সে, তার লাইনগুলো পড়তে বাধ্য হল নবকুমার, ‘আমার বুকের ভিতর একটা গভীর ক্ষত আছে। সেখানে/একসঙ্গে বাস করে অগ্নি, জল আর বায়ু/এরা রোজ দাবা খেলে, চাল দেয়, কিস্তিমাত করে/এদের নিয়েই আমি বেঁচে আছি/এরাই আমার পরমায়ু…

দাবা খেলা অনেক দেখেছে নবকুমার। গ্রামের বটতলার বাঁধানো চাতালে কৃষ্ণজ্যেঠু আর বলরাম কাকা দাবা খেলতেন। মাঝে-মাঝে রাতদুপুর পর্যন্ত। অনেকেই ভিড় করে ওঁদের খেলা দেখত। কৃষ্ণজ্যেঠুর বউ জেঠিমা বলতেন, ‘আহা খেলুক। ওই নিয়েই তো বেঁচে আছে।’ আজ মনে হল, জীবনটা বোধহয় ওই দাবা খেলার মতো। যতক্ষণ চাল দেওয়া যায় ততক্ষণ পরমায়ু থাকে। বইটার নাম আবার দেখল সে। একলা নদীর সঙ্গে। রচয়িতার নাম সুশান্ত গঙ্গোপাধ্যায়।

ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে কিছুটা পেছনে হেঁটে এসে নবকুমার দেখতে পেল পেট্রল পাম্পের সামনে তিন-তিনটে পুলিশের জিপ আর ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। ওখান থেকেই বুঝতে পারল রাস্তা জনশূন্য। সে সোনাগাছিতে ঢোকার আগের গলিতে ঢুকে পড়ল। এদিক দিয়ে একটু ঘোরা হলেও শেফালি-মায়ের বাড়ির সামনে যাওয়া যায়। চৌমাথার কাছে এসে দেখল, রাস্তার দোকানপাটগুলো বন্ধ। আলো নিভে গিয়েছে। সোনাগাছিতে এই সময় দিনের আলোর মতো চারধার উজ্জ্বল থাকে। পান-সিগারেটের দোকানটা আধা বন্ধ। তার সামনে গিয়ে নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে?’ উড়িষ্যাবাসী দোকানদার ভেতর থেকে বলল, ‘আপনি কি কাস্টমার?’

‘না। আমি এখানেই থাকতাম।’

‘তাড়াতাড়ি বাড়িতে ঢুকে পড়ুন। বহুত হামলা হয়েছে আজ।’

‘কারা হামলা করল?’

প্রশ্ন করা মাত্রই দূরে ‘মার-মার-মার শালাকে’ চিৎকার করল কয়েকজন। দোকানদার বাকিটা বন্ধ করে দিল। ফুটপাত ধরে এগিয়ে গেল নবকুমার। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল খুব। শেফালি-মায়ের বাড়ির দরজা হাট করে খোলা। সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই মেয়েগুলোকে দেখতে পেল। সাজগোজ নেই, মুখে রং নেই, মেয়েগুলো মাটিতে বসে আছে চুপচাপ, পাথরের মতো। ওদের একজন নবকুমারকে দেখতে পেয়েই চিৎকার করে কেঁদে উঠল। সঙ্গে-সঙ্গে কান্নাটা ছড়িয়ে গেল অন্যদের মধ্যে। হতভম্ব নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে?’

যে মেয়েটি সেদিন ওদের হয়ে শেফালি-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিল, সে উঠে দাঁড়াল, ‘সব্বোনাশ হয়ে গিয়েছে দাদাভাই।’

নবকুমার ওপরের দিকে তাকাল। দোতলা অন্ধকারে ঢাকা।

‘শেফালি-মা ওপরে নেই?’

‘না।’ মেয়েটি চোখ মুছল।

‘কী হয়েছে বলবেন?’

এবার সবাই মুখ খুলল, একসঙ্গে। প্রত্যেকের কথাগুলো থেকে যেটুকু জানা গেল তাতে নবকুমারের মনে হল পৃথিবীটা দুলছে। সে বসে পড়ল।

আজ দুপুরে সেই লোকটা দলবল নিয়ে এসেছিল। এই লোকটাই আগের দিন একজন সঙ্গী নিয়ে এসে শেফালি-মাকে বাড়ি বিক্রি করতে বলেছিল। আজ সে সরাসরি জানতে চায় শেফালি-মা তাদের কাছে বাড়িটা বিক্রি করবে কি না? তাদের কাছে খবর গিয়েছে এই বাড়ি হয় দুর্বারকে দিয়ে দেওয়া হবে, নয়তো ভাড়াটে যৌনকর্মীদের দান করা হবে। সোনাগাছি পাড়ায় এরকম কথা কেউ শোনেনি। শেফালি-মা স্পষ্ট বলে দেন, তিনি বাড়ি বিক্রি করবেন না। ঝগড়া আরম্ভ হয়। লোকটা দলবল নিয়ে ওপরতলায় ঢুকে যায়। জিনিসপত্র ভাঙে, টেলিফোনের তার ছিঁড়ে দেয়। প্রতিবাদ করায় একজন শেফালি-মাকে এত জোরে চড় মারে যে তিনি ঘুরে পড়ে যান। তখন ইতি আর স্থির থাকতে পারে না। সে সবসময় শেফালি-মায়ের পাশে থেকে ওদের চলে যেতে বলছিল। শেফালি-মা মার খেতে রান্নাঘর থেকে বঁটি এনে যে লোকটা চড় মেরেছিল, তার ঘাড়ে আঘাত করে। লোকটা পড়ে যায়। তখন তিন-চারজন ইতিকে ধরে উলঙ্গ করে ধর্ষণ করতে শুরু করে। শেফালি-মা কোনওমতে উঠে বঁটিটা তুলে নিয়ে লোকগুলোকে আঘাত করতে যেতে ওরা সরে যায়। বঁটিটা গিয়ে আঘাত করে ইতির গলায়। সঙ্গে-সঙ্গে মারা যায় সে। লোকগুলো দুদ্দাড় করে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু পাড়ার লোকজন ওদের দুজনকে ধরে ফেলে। প্রচণ্ড মার মারে ওদের। পুলিশ আসে। লোকদুটোকে হাসপাতালে পাঠায়। ইতির ডেডবডি নিয়ে যায়। আর শেফালি-মাকে খুনের দায়ে গ্রেফতার করে। কিন্তু শেফালি-মা তার আগেই পাগল হয়ে গিয়েছেন। মুক্তোও মার খেয়েছে খুব। তাকেও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পাড়ার লোকজনের ধারণা, দু-একজন গুন্ডা এখনও এখানে লুকিয়ে আছে। পুলিশ এসে আবার সব কিছু তছনছ করছে।

মাথা তুলতে পারছিল না নবকুমার। চোখের সামনে যেন নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। ঠিক যেই কিস্তিমাত বলে বলরামকাকা সোল্লাসে চিৎকার করতেন তখন কৃষ্ণজ্যেঠুর মুখটা যেরকম ঝুলে পড়ত, নবকুমারের যেন সেরকম হয়ে গেল।

খবর পৌঁছে গিয়েছিল। খানিক বাদেই দুর্বারের মেয়েরা চলে এল এই বাড়িতে। কবিতা কথা বলতে পারছিল না। চন্দ্রিমা বললেন, ‘আমরা যদি হেজিটেট না করে ওঁর কথায় রাজি হয়ে যেতাম তাহলে হয়তো এই ঘটনা ঘটত না। আমরা চেষ্টা করছি শেফালি-মাকে জামিনে ছাড়িয়ে আনতে। কিন্তু উনি তো একটাই কথা বলছেন, আমি খুনি, আমি খুনি।’ নবকুমার চোখ বন্ধ করে দু-হাতে মুখ ঢেকে বসেছিল।

কবিতা বলল, ‘কাল সকালেই বড় উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করব আমরা। শেফালি-মায়ের মাথা খারাপ ছিল বললে বেশি শাস্তি হবে না।’

সঙ্গে-সঙ্গে মুখ তুলল নবকুমার, ‘মিথ্যে কথা। শেফালি-মায়ের মাথা আমাদের সবার চেয়ে অনেক ভালো ছিল, ভালো আছে।’

‘তুমি জানো না ভাই, এখন উনি মানুষ চিনতে পারছেন না।’

‘এত ভালো মানুষ চিনেছিলেন, তাই ইতিকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আমরা কেউ তো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারি না। উনি সুস্থ বলে পেরেছিলেন।’ নবকুমার জোরে-জোরে শ্বাস নিল।

চন্দ্রিমার মোবাইল বেজে উঠল। অন করে কথা শুনে চন্দ্রিমা বললেন, ‘ইতির পোস্টমর্টেম হয়ে গিয়েছে। ডেডবডি নিয়ে আসা হচ্ছে। তোমরা নিশ্চয়ই ওর শেষ যাত্রায় সঙ্গী হবে?’ প্রশ্নটা অন্য মেয়েদের উদ্দেশ্যে।

একসঙ্গে উত্তর ছুটে এল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ।’

.

একটা ছোট ম্যাটাডর ভ্যান ফুলে-ফুলে উপচে পড়ছে। ইতি সেই ফুলের পাহাড়ের নীচে শুয়ে আছে। শুধু তার মুখখানি উন্মুক্ত। দুর্বারের কেউ হয়তো, একটা বড় ফেস্টুন ম্যাটাডরের ওপর টাঙিয়ে দিল। ইতি যুগ-যুগ জিও। তার নীচে বড় করে লেখা, শেফালি-মা জিন্দাবাদ।

মানুষে-মানুষে থিকথিক করছে সোনাগাছির রাস্তা। দরজায় না দাঁড়িয়ে আজ সব মেয়ে নেমে এসেছে পথে। রংবিহীন মুখগুলো পাথর। নবকুমার ওই বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল পথে। সে দেখল, যে ছেলেগুলো একদিন ইতির কারণে তাকে মেরেছিল আজ তারা হাউ-হাউ করে কাঁদছে।

ম্যাটাডর এগিয়ে যাচ্ছে নিমতলা শ্মশানের দিকে। ভিড়ের সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে আবার ব্যথাটা টের পেল নবকুমার। এতক্ষণ এইসব ঘটনার মধ্যে থেকে তার শরীর যেন অসাড় হয়েছিল, এখন জানান দিল। তার পক্ষে এই শরীর নিয়ে শ্মশান অবধি হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়।

মেয়েরা কেউ কথা বলছে না। যে যেমন ছিল, নেমে এসেছে এই অন্তিম যাত্রায়। এদের কে ইতিকে কতটা চিনত তা নিয়ে কোনও কথাই ভাবছে না। ওদের একজন প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন হয়েছে, তাকে সম্মান জানানো কর্তব্য।

নবকুমার ধীরে-ধীরে ফুটপাতে উঠে দাঁড়াল। অসংগঠিত মিছিল তার পাশ দিয়ে নীরবে চলে যাওয়ার পর তার মনে হল, সোনাগাছি খালি হয়ে গিয়েছে।

তার উচিত ছিল ইতির সঙ্গে যাওয়া। এই ইতি তাকে জোড়াসাঁকো দেখিয়েছিল। এই ইতি তার জন্যে ব্যাবসা ছেড়ে দুর্বারে যোগ দিয়েছিল। নিজের নানান বানানো নাম ছেড়ে দিয়ে সে তাকে সত্যি নামটা বলেছিল।

‘ইতি, তুমি কিছু মনে কোরো না, আমি হাঁটতে পারছি না।’

‘বাবু, যাবেন?’ একটা রিকশাওয়ালা সামনে এসে দাঁড়াল।

ওই রিকশায় উঠলে বিনা কষ্টে শ্মশানে যাওয়া যায়। সে শুনেছে নিমতলায় ইলেকট্রিক চুল্লি আছে। তাই কাউকে জ্বলতে দেখতে হয় না। কিন্তু ফিরতে রাত হবে। অনেক রাত। মাথা নেড়ে না বলে নবকুমার শেফালি-মায়ের বাড়িতে ফিরে এল। নীচে কোনও মেয়ে নেই। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে এসে খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে আলো জ্বালল সে। বাগানে কয়েকটা গরু ঢুকে যে দশা করে এই ঘরগুলোর এখন সেই অবস্থা। দরজাটা বন্ধ করে যে ঘরে সে থাকত সেখানে চলে এল নবকুমার। আর দাঁড়াতে না পেরে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল।

ইতি আর চুপচাপ এসে সামনে দাঁড়াবে না। শেফালি-মা হয়তো কোনওদিন—! হঠাৎ বিদ্যুতের শক খেল নবকুমার। কোনওদিন কি সে শেফালি-মায়ের ঋণ শোধ করতে পারবে? সেই সুযোগ হয়তো কোনওদিনই পাবে না। কিন্তু শেফালি-মাকে সুস্থ করে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্ত করে আনা কী সম্ভব নয়?

হঠাৎ কথাটা মনে হল। শেফালি-মা বলেছিলেন, ‘আবেগ না থাকলে সে মানুষ নয়। কিন্তু আবেগে যে ভেসে যায় সে তলিয়ে যায়। আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে যে কাজ করে যেতে পারে সে-ই ঠিকঠাক মানুষ।’

নবকুমার পাশ ফিরল। এখন তার খিদে পাচ্ছে, ব্যথাও। কিন্তু সে এখন ঘুমোতে চায়। এই শহর তাকে শিখিয়েছে সুযোগের সদব্যবহার করতে। সেটা করতে হলে কাল ভোর-ভোর উঠে ভবানীপুরের বাড়ির সামনে যাওয়া দরকার। সেখানে স্টুডিওর গাড়ি আসবে সকালে, তাকে রং মাখাতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে।

আগামীকালের লড়াই-এর জন্যে তার আজ ঘুম দরকার।

.

সমাপ্ত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *