তিপান্ন
নবকুমার থতমত হয়ে বলল, ‘গীতিময়দার কাছে এসেছি।’
‘এসেছ যে তা দেখতেই পাচ্ছি। তুমি শুনেছিলাম হাওয়া হয়ে গিয়েছে। ছবির শ্যুটিং হচ্ছে অথচ তোমার পাত্তা নেই। গীতিময়ের পাগল হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমি আজ বাধ্য হয়ে স্টুডিওতে এলাম নতুন হিরো সিলেক্ট করার জন্যে।’ বড়বাবুর কণ্ঠস্বর চড়ছিল।
‘আমি, আমি দু:খিত। মায়ের অপারেশনের জন্যে—!’ থেমে গেল নবকুমার।
‘আমার সামনে থেকে সরে যাও। গীতিময়ের পাশের ঘরে গিয়ে বসো।’ হুকুম করলেন বড়বাবু। সামনে দাঁড়াবার সাহস চলে গিয়েছিল। নবকুমার খোলা দরজা দিয়ে দ্বিতীয় ঘরে চলে এল।
শূন্য ঘর। চেয়ারে বসতেই পাঁচ হাজার টাকার কথা মনে এল। শেফালি-মাকে কী করে ধার শোধ করবে সে? তাকে বাদ দিয়ে কাউকে যখন নেওয়া হচ্ছে তখন এই কাজটা করে রোজগারের পথটা বন্ধ হয়ে গেল, ঠোঁট কামড়াল সে।
কিন্তু সে তো জানিয়েই শহর ছেড়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ, গীতিময়বাবু বা বড়বাবুকে সে জানায়নি ঠিক। কিন্তু মন্দাক্রান্তাই তো তাকে যেতে বলেছিলেন মায়ের খবর শুনে। আশ্চর্য! মন্দাক্রান্তা এঁদের কিছুই জানালেন না! শেফালি-মাকে বারংবার ফোন করে বিরক্ত করেছেন আর গীতিময়বাবুকে বলতে ভুলে গিয়েছেন? নাকি ইচ্ছে করেই বলেননি? কিন্তু মন্দাক্রান্তা তো তার ভালো চান! কত ভালো ব্যবহার করেন, তিনি কেন ক্ষতি করতে চাইবেন?
নবকুমারের সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। মন্দাক্রান্তা বলেছেন তিনি এই ছবিতে ফিনান্স করছেন। তাঁর নামেই টাকা খরচ হচ্ছে। অতএব তাঁকে বলে গেলে অন্যরা সেটা কেন গ্রাহ্য করবে না? মাস্টারদা বলত, কলিকাতা কর্পোরেশনের জল পেটে পড়লে গ্রাম-মফস্বলের মানুষের চরিত্র পালটে যায়। তার ক্ষেত্রে বোধহয় সেটা হয়নি। হলে আরও একটু চালাক হতে পারত।
এই ঘরে কেউ আসছে না। নবকুমারের মনে হচ্ছিল, এখানে বসে থাকার কোনও অর্থ হয় না। তার জায়গায় অন্য কেউ অভিনয় করবে আর সে ফেকলুর মতো দেখবে তা বড়বাবু চাইলেও সে চায় না। মায়ের মুখ মনে পড়ল। মা এবং বাবা খুব খুশি হবে। হোক। কিন্তু গ্রামের বন্ধুদের কাছে কী জবাব দেবে? যারা জেনে গিয়েছে যে নবকুমার ফিল্মের হিরো হচ্ছে তারাই তখন ব্যঙ্গ করবে। ভাববে মিথ্যে রটিয়ে গিয়েছিল। নিজেকে সৎ প্রমাণ করতে হলে তাকে সিনেমায় অভিনয় করতেই হবে। কিন্তু তাকে কে দেবে সুযোগ?
উঠে দাঁড়াল নবকুমার। মাথা নাড়ল। আচ্ছা, সে নিজে কী করেছে? এরকম একটা সুযোগ পেয়েও নিজেকে ঠিকঠাক তৈরি করার কোনও চেষ্টাই করেনি। স্কুলে স্যার যা পড়ান তা বাড়িতে অনুশীলন করতে হয়। সেই কাজটা সে করেনি। ফাঁকিবাজি করে বৃহৎ কাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ করা যায় না এটা তার বোঝা উচিত ছিল। সে হয়তো ব্যর্থ হত, তাই ভাগ্য তার কাছ থেকে কাজটা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছে।
এই সময় একটি কিশোর এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘চা খাবেন?’
হ্যাঁ বলতে গিয়েও না বলল নবকুমার। তার তো কোনও অধিকার নেই এদের পয়সায় চা খাওয়ার। ছেলেটি চলে গেলে মনে হল নগদ দাম দিয়ে সে তো স্বচ্ছন্দে চা খেতে পারত। ঘরের বাইরে গিয়ে চা-ওয়ালাকে ডাকতে যেতে আলস্য লাগল।
ঘণ্টাদুয়েক অপেক্ষা করার পরে নবকুমারের মন যখন নির্লিপ্ত হয়ে গিয়েছে তখন পাশের ঘরে কথা শোনা গেল। একজন বড়বাবু অন্যজন গীতিময়বাবু। গীতিময়বাবুর পিওন এসে দাঁড়াল, ‘আপনাকে দাদা ডাকছেন।’
নবকুমার উঠল। পাশের ঘরে যেতে দেখল গীতিময়বাবুর চেয়ারে বড়বাবু বসে আছেন। পাশের চেয়ারে গীতিময়বাবু। তাকে দেখেই গীতিময়বাবু বললেন, ‘তুমি খুব দায়িত্বহীনের মতো কাজ করেছ। প্রাোডাকশন্সকে না জানিয়ে একদম উধাও হয়ে গিয়েছিলে?’
‘আমার মা খুব অসুস্থ, এই টেলিগ্রাম পেয়ে আমি মন্দাক্রান্তাদেবীকে জানিয়েছিলাম। তিনি খবর নিয়ে আমাকে দু-দিনের জন্যে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। তার বেশি দেরি হলে ফোন করতে বলেছিলেন। আমি তিনদিনের মাথায় রওনা হয়েছি ওখান থেকে।’ নবকুমার বলল।
‘মন্দাক্রান্তা কেন? গীতিময়কে জানাতে পারনি? ডিরেক্টার হল প্রাোডাকশনের ক্যাপ্টেন। তাকে না জানিয়ে তুমি চলে গেলে?’ বড়বাবু গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন।
‘ওঁর টেলিফোন নম্বর আমার জানা ছিল না।’ নবকুমার বলল, ‘আমি ভেবেছিলাম মন্দাক্রান্তাদেবী আপনাদের খবরটা দেবেন।’
‘দিয়েছিল।’ গীতিময়বাবু বললেন, ‘কিন্তু তুমি কবে ফিরবে তা কনফার্ম করতে পারেনি। তুমি যে-বাড়িতে থাকো তারাও নাকি জানেন না কবে ফিরবে। কোনও ফোন না পেয়ে মন্দাক্রান্তা ধরেই নিয়েছিল যে হয়তো তোমার মাতৃবিয়োগ হয়েছে। এদিকে আমাদের সেট তৈরি। অন্যান্য আর্টিস্টদের ডেট নেওয়া হয়ে গিয়েছে। কোনওভাবেই শ্যুটিং পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বুঝতেই পারছ!’
‘হ্যাঁ। আমি তাহলে আসি?’ শক্ত হয়ে তাকাল নবকুমার।
গীতিময়বাবু বললেন, ‘দ্যাখো, তুমি এর আগে কখনও অভিনয় করোনি। এই অবস্থায় আমি তোমাকে একটা সাজেশন দিতে পারি। তুমি আমার ছবিতে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করতে পারো। একদিনের কাজ কিন্তু চারটে সংলাপ আছে। রাজি থাকো তো বলো!’
মাথা নাড়ল নবকুমার, ‘না। দরকার নেই। আমি যাই?’
‘আশ্চর্য! এই চরিত্রে সুযোগ পাওয়ার জন্যে কত ছেলে রাতদিন ধরনা দিচ্ছে আর তুমি মুখের ওপর বলে দিলে দরকার নেই। অভিনয়ের ওপর একটু শ্রদ্ধা থাকলে একথা বলতে পারতে না।’ গীতিময়বাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
নবকুমার বেরিয়ে যাচ্ছিল, বড়বাবু বললেন, ‘এদিকে এসো।’
নবকুমার দাঁড়াল। মুখ ফেরাল না। ভাবল, বেরিয়ে যাবে।
বড়বাবু বললেন, ‘তোমাকে এখানে আসতে বলেছি।’
অতএব ফিরতে হল। বড়বাবু বললেন, ‘আজ থেকে তোমার কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। আমরা এই চরিত্রে একজনকে ভেবেছিলাম। কিন্তু তুমি যখন নায়কচরিত্র ছাড়া অন্য চরিত্রে অভিনয় করতে নারাজ, তখন তোমার এই জেদকে মেনে নিচ্ছি।’
গীতিময়বাবু হাসলেন, ‘এই স্পিরিটটা যেন সারাজীবন বজায় থাকে। চলো!’
‘কোথায়?’
‘মেক-আপ নেবে। আজ তোমার একটা শট নেব।’
.
কেমন ঘোরের মধ্যে কেটে গেল। নিজের পোশাক ছেড়ে ড্রেসারের দেওয়া পোশাক পরে আয়নার সামনে বসতে হল। মেক-আপ ম্যান প্রথমে তার চুল একটু ছেঁটে দিলেন। তারপর মুখে তিনরকমের মেক-আপ ঘষতে লাগলেন। তারপর তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছিয়ে দুটো হাত দিয়ে ঝাড়লেন। শেষে বললেন, ‘এবার চুল আঁচড়ে নিন।’
নিজের মুখ চুল অচেনা বলে মনে হল নবকুমারের।
একটি ছেলে এসে বলল, ‘এসো। গীতিদা ডাকছেন।’
সেটের একটামাত্র আলো জ্বলছিল। স্ক্রিপ্ট নিয়ে নবকুমারকে দেখে বললেন, ‘তুমি নায়িকার বাড়িতে প্রথম এসেছ। এইটে বাইরের ঘর। কাজের লোক তোমাকে জিজ্ঞাসা করবে, কার সঙ্গে দেখা করতে চাও। তুমি একটা চিঠি এগিয়ে দেবে। লোকটা খামের ওপর নাম দেখে জিজ্ঞাসা করবে, আপনার নাম? তুমি বলবে, ‘কমলকুমার দত্ত। হৃদয়পুর গ্রামে আমার বাড়ি। ব্যস, এটুকু। মনে থাকবে?’
নবকুমার মাথা নাড়ল। অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টার দেখিয়ে দিল তাকে কোথায় দাঁড়াতে হবে। কাজের লোক কোনদিকে এসে দাঁড়াবে এবং ক্যামেরা কোথায় থাকবে। নবকুমার মনে-মনে ‘হৃদয়পুর গ্রাম’ শব্দদুটো আওড়াচ্ছিল।
‘একটা মনিটার হয়ে যাক।’ গীতিময়বাবু চিৎকার করলেন। সঙ্গে-সঙ্গে চারধারে প্রচুর আলো জ্বলে উঠল। সেই আলোয় চোখ ঝলসে যাচ্ছিল যেন। স্টার্ট, ক্যামেরা, অ্যাকশন বলা মাত্র ঠিক কাজের লোকের মতো দেখতে একজন ওপাশ থেকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকে চান?’ নবকুমার খামটা এগিয়ে দিল। সেটা নিয়ে লোকটা ঠিকানা দেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার নামটা বলুন।’
হৃদয়পুর গ্রামের কথা মাথায় থাকায় সে বলে ফেলল, ‘নবকুমার দত্ত, হৃদয়পুর গ্রামে আমার বাড়ি।’ সঙ্গে-সঙ্গে কাট চিৎকার শোনা গেল।
ততক্ষণে অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টার ছুটে এসেছে কাছে, ‘কী নাম বললেন? আপনি যে চরিত্রে অভিনয় করছেন তার নাম কমলকুমার।’
খেয়াল হতেই কুঁকড়ে গেল নবকুমার। এ কী বলল সে? নবকুমার শব্দটা মুখে এল কেন? গীতিময়বাবু এগিয়ে গিয়ে ক্যামেরা ম্যানের সঙ্গে কথা বলছিলেন। সব শুনে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘ওকে। নেক্সট সিন।’
অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর ভুলটা স্মরণ করিয়ে দিল, ‘দাদা, আর-একবার টেক করবেন না?’
‘না। আজ যে-ক’টা শট হয়েছে ওর রেফারেন্স আসেনি। এখন থেকে কমলকুমারের জায়গায় নবকুমার লিখে রাখো। ও নিজের চরিত্রে অভিনয় করুক।’ গীতিময়বাবু বললেন।
অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টার হাসল। তারপর নবকুমারকে বললেন, ‘আজ আর আপনার শট নেই। কাল সকাল ন’টায় চলে আসবেন। দশটায় টেক হবে। পঞ্চু, দাদাকে মেক-আপ রুমে নিয়ে যা। স্বপন, নেক্সট সিনের আর্টিস্ট ডাক।’
একজন প্রাোডাকশনের ছেলে নবকুমারকে মেক-আপ রুমে পৌঁছে দিয়ে গেল। সে ভেতরে ঢুকতেই মেক-আপ ম্যান বললেন, ‘অভিনন্দন ভাই। খুব খুশি হয়েছি।’
নবকুমার অবাক হয়ে তাকাল। ভদ্রলোক ধুতি এবং শার্ট পরেন, ফরসা, চশমা পরা। বললেন, ‘প্রথমবার ক্যামেরার সামনে খুব কম অভিনেতাই ঠিকঠাক অভিনয় করতে পারেন।’
‘আমি ঠিক করিনি। নাম ভুল বলেছি।’
‘কিন্তু তোমার বলা নামটাই ডিরেক্টার ঠিক মনে করেছেন।’
‘আশ্চর্য! আপনি এতদূরে এই ঘরে বসে ঘটনাটা জানলেন কী করে?’
‘জামাটা ছাড়ো। উত্তমবাবু বলতেন টালিগঞ্জের বাতাসে খবর ওড়ে। খারাপ খবর হলে বাতাসের আগে ওড়ে। তুমি ধ্যাড়াচ্ছ কি না, ফেল করছ কি না তা শোনার জন্যে কত অল্পবয়েসি অভিনেতা হাঁ করে অপেক্ষা করছিল।’ জামা খোলার পর নবকুমারের মুখে স্প্রে করলেন ভদ্রলোক। তারপর ছোট তোয়ালে দিয়ে মেক-আপ তুলতে লাগলেন, ‘মন দিয়ে অভিনয় করো। আজ তুমি নার্ভাস ছিলে বলে নিজের নাম বলে ফেলেছ। এইটে কাটাতে হবে। তুমি যদি সিনসিয়ার হও তাহলে তার দাম পাবেই।’
‘আপনি অনেক অভিনেতাদের দেখেছেন, না?’
‘হ্যাঁ। চল্লিশ বছর তো হয়ে গেল।’
‘উত্তমকুমারকে মেক-আপ দিয়েছেন?’
‘না। আমি তখন যাঁদের ছবিতে কাজ করতাম তাঁরা ওঁকে নিয়ে ছবি করতেন না। নতুন ধরনের ছবি। দর্শক দেখতে চাইত না। কিন্তু ফেস্টিভ্যালে যেত।’
‘সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল কার সঙ্গে?’
‘অনিলদা, অনিল চ্যাটার্জি। ওরকম মানুষ হয় না। সব টেকনিসিয়ান্সদের খবর রাখতেন। কারও বিপদ শুনলেই সাহায্য করতেন, খুব বড় মন ছিল ভাই। তুমি কী চাকরিবাকরি করো?’ মেক-আপ ম্যান জিজ্ঞাসা করলেন।
‘না। আমি কিছুদিন আগে গ্রাম থেকে এসেছি।’
‘অ। দ্যাখো, সিনেমায় নাম করা একেবারে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করছে। তুমি খুব খাটলে, অথচ দর্শকরা দেখামাত্র তোমাকে অপছন্দ করতে পারে। বিশেষ করে হিরোর চরিত্র হলে। পার্শ্বচরিত্র হলে একটু-একটু করে দর্শক মেনে নেয়। তা ছাড়া, তুমি ভালো কাজ করলেও দর্শকরা ছবিটাকে পছন্দ করল না! ছবি ফ্লপ হলে তোমার ভাগ্যও শেষ হয়ে যাবে। এই লাইনে সাফল্য এলে সবাই নিজের কৃতিত্ব জাহির করে আর ব্যর্থ হলে অন্যের ওপর দোষ চাপায়। হিরো খারাপ বলে ছবি চলল না বলতে তো অসুবিধে নেই। আর সেটা রটে গেলে অন্য কেউ তোমাকে নিতে সাহস পাবে না।’ মেক-আপ ম্যান হাসলেন। ‘ভাগ্য ভালো হলে কথাই নেই। কিন্তু তুমি পাশাপাশি চাকরির চেষ্টা করো।’
‘দাদা, আপনার নাম কী?’
‘নিবারণ গুপ্ত।’
পোশাক পালটে বেরিয়ে যাওয়ার আগে, কী মনে হল, নবকুমার নিবারণবাবুকে প্রণাম করে পা বাড়াল। নিবারণবাবু বললেন, ‘আরে! করো কী!’ কিন্তু তার জবাব দেওয়ার জন্যে সে অপেক্ষা করল না।
গেটের দিকে এগোতেই পঞ্চু ছুটে এল, ‘দাদা আপনাকে দেখা করতে বলেছেন।’
‘উনি এখন কোথায়?’
‘অফিসে। এখনই প্যাক-আপ হয়ে যাবে।’
অফিসঘরের দরজায় যেতেই ওঁদের দেখতে পেল। বড়বাবু, গীতিময়বাবু ছাড়াও আর-একজন বসে আছেন। সে বলল, ‘ডেকেছেন?’
গীতিময়বাবু বললেন, ‘আগামিকাল এই সিনগুলো শ্যুট করব। এখন বাড়ি ফিরে গিয়ে সংলাপগুলো পড়ো। দয়া করে কাল নিজের সংলাপ বলো না।’
একটা ছোট ফোল্ডার হাত বাড়িয়ে নিল। বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওর ডেলিভারি কীরকম ছিল?’
‘ভালোই। নামটা চেঞ্জ করে দিতে হল?’
তৃতীয় ব্যক্তি হাসলেন, ‘নামে কী এসে যায়।’
.
গীতিময়বাবু উঠে দাঁড়ালেন, ‘চলুন, ফ্লোরে যাব। ওখানেই কথা বলব। এখনই প্যাক আপ হয়ে যাবে। নবকুমার প্রাোডাকশনস থেকে তোমাকে ট্যাক্সির ভাড়া দিয়েছে? দেয়নি? ওটা নিয়ে যাবে। শ্যুটিং-এর দিন আসা-যাওয়ার জন্যে ট্যাক্সিভাড়া পাবে।’ বড়বাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গীতিময়বাবু ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
নবকুমার আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বড়বাবু বললেন, ‘বোসো।’
নবকুমার টেবিলের উলটোদিকের চেয়ারে বসল।
‘মাস্টার তোমাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল। আমি এক কথায় তোমাকে প্রম্পটারের চাকরি দিয়েছিলাম। তারপর এই ছবির কাজ শুরু করতেই মনে হল প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা না নিয়ে তোমাকে কাস্ট করলে চরিত্রটি ভালো ফুটবে। তুমি বোধহয় বুঝলেই না কী বিশাল সুযোগ পেয়ে গেলে। হ্যাঁ, আমি খুশি, তুমি শেফালিদেবীকে আবার যাত্রা করতে রাজি করিয়েছ। কিন্তু এবছর ওই পালা নামানো যাবে না। ওঁর সাজেশন মতো নতুন করে পালা লিখতে হচ্ছে। আমি তোমাকে এখন যে কথাটা বলছি তা অবশ্যই তোমাকে শুনতে হবে। তুমি আজ থেকে মন্দাক্রান্তার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখবে না।’
আচমকা মুখ থেকে শব্দটা বেরিয়ে এল, ‘কেন?’
‘আমি বলছি, তাই। আমার খেলার পুতুল যদি অন্য একটি পুতুলের সঙ্গে খেলতে চায় তাহলে আমি কিছুতেই বরদাস্ত করব না। কথাটা মনে রাখবে। যাও।’ বড়বাবু হাত নাড়লেন।
