কলিকাতায় নবকুমার – ৫৯

উনষাট

মন্দাক্রান্তা হাসলেন, ‘নবকুমারের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক, তা আমি জানি না!’

‘কথার খেলা খেলো না মন্দা।’ বড়বাবু গম্ভীর গলায় বললেন।

‘মনে হচ্ছে আপনি এ-ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন।’

‘হ্যাঁ। তোমার কার্যকলাপই বলছে তুমি এই গ্রাম্য মফস্বলের অর্বাচীনের প্রতি অনুরক্ত। অথবা এ-ও হতে পারে, তুমি ওকে পুতুলের মতো ব্যবহার করছ। তোমার খেলার পুতুল। কিন্তু আমি যাই ভাবি না কেন, তোমাকে মুখ খুলতে হবে।’

মন্দাক্রান্তা বড়বাবুর দিকে তাকালেন, ‘নবকুমারকে আমি স্নেহ করি।’

‘স্নেহ!’ ছিটকে বেরুল শব্দটা বড়বাবুর মুখ থেকে।

‘হ্যাঁ। দুজন নারী-পুরুষ মানেই তাদের সম্পর্ক শরীরের ছাড়া আপনারা ভাবতে পারেন না। মাঠে একটি গরু শুয়ে থাকলে যেমন আকাশে ওড়া শকুন তাকে মৃত বলে ভেবে নেয়। নবকুমারকে আমি ভাই বলে কখনও ভাবিনি। কিন্তু ওর প্রতি যে টান অনুভব করি সেটা স্নেহ ছাড়া আর কিছু নয়। অন্তত এই মুহূর্ত পর্যন্ত নয়।’

‘কিন্তু আমি চাই না, তুমি ওকে প্রশ্রয় দাও। এই টান বা স্নেহ প্রকাশ করা তোমাকে মানায় না। একটা চাষার ঘরের কোনওমতে বি এ পাস করা গ্রাম্য ছেলে সে, আর কোথায় তুমি! ছি-ছি-ছি!’

‘আমি কোনও অন্যায় করছি না। এই বাড়ি, গাড়ি, টাকাপয়সা যা আপনি আমার নামে তৈরি করেছেন ইনকাম ট্যাক্স বাঁচাতে, তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা এখন পর্যন্ত আমি করিনি। আপনি ওকে নিষেধ করেছেন আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে। আমাকে না জানিয়ে একথা ওকে বলা মানে যে আমাকে অপমান করা তা আপনার মাথায় ঢোকেনি। আমাকে ছি বলার আগে নিজেকে বলুন।’ মন্দাক্রান্তা বললেন।

‘তুমি, তুমি এই একটা ফালতু ছেলের জন্যে আমার সঙ্গে ঝগড়া করছ?’

‘ঝগড়া করছি না। আপনার নোংরা প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে বাধ্য হচ্ছি।’

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন বড়বাবু। তারপর বললেন, ‘কিন্তু আমার এই একটা অনুরোধ রাখতে তোমার এত অসুবিধে হচ্ছে কেন?’

‘কারণ এর আগে কোনও পুরুষ ওর মতো চোখে আমার দিকে তাকায়নি। আমার শরীর, আমার সৌন্দর্য মানে ভোগের জন্যে তৈরি, এই তো জেনে এসেছি এতদিন! আপনি আমার মাথার ওপর ছাতা ধরতে কেউ আর সরাসরি প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ পায় না কিন্তু কেনাকাটার জন্যে যখন মলে যাই তখন আশেপাশের পুরুষের চোখের দৃষ্টি চিনতে অসুবিধে হয় না। সব এক। এই প্রথম একটি ছেলেকে দেখলাম, যে আমার শরীর সম্পর্কে আদৌ আগ্রহ দেখায়নি। আমার সৌন্দর্যে কোনও আকর্ষণ বোধ করেনি। ওর জন্যে কিছু জামাকাপড় কিনেছিলাম। সেগুলো পড়েই আছে। এখানে একবারও বলেনি ওগুলোর কথা। এখনও আমি কাউকে একবার ডাকলে সে দশবার ছুটে আসবে কিন্তু দেখুন গিয়ে, ও হয়তো আমার বাড়ির রাস্তাই ঠিকঠাক মনে রাখতে পারেনি। আপনি মিছিমিছি ভয় পাচ্ছেন। এত ভয় যে শ্যুটিং বন্ধ করে ওকে সরাতে চেয়েছেন। আমার কাছে আপনি এত নীচে নেমে যাচ্ছেন কেন?’

বড়বাবু উঠে দাঁড়ালেন, ‘শোনো, আমি পরিষ্কার কথা জানতে চাই!’

‘বলুন।’

‘তুমি কি ওর সঙ্গে শুয়েছ?’

শব্দ করে হেসে উঠলেন মন্দাক্রান্তা। তারপর বললেন, ‘মিছেই এতক্ষণ এত কথা বলালেন আমাকে দিয়ে। ওকে নষ্ট করার কথা আমি চিন্তাও করতে পারি না।’

‘যাক। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।’ বড়বাবু বললেন, ‘আসলে, কী করে বোঝাই, তোমার কোনও অ-সুখ তো আমি রাখিনি। তাই তুমি কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলে আমি ভয় পাই।’

‘ভয় কেন?’

‘তোমাকে যা দিয়েছি, তা নিয়ে তুমি যে-কোনও মুহূর্তে আমাকে ত্যাগ করতে পার।’

‘পাগল! যতই রোবট হয়ে থাকি, নিজের ভালোলাগাগুলো বিসর্জন দিয়ে মন্দলাগাগুলো নিয়ে এই বৈভবের মধ্যে যতই একা হয়ে থাকি কিন্তু কেউ আমার শরীরটাকে বিরক্ত করে না। আপনি না থাকলে সেইসব নোংরা কালো হাতগুলো নখ বের করে ছুটে আসবে। এই ভুল কি আমি করতে পারি?’ মন্দাক্রান্তা শ্বাস ফেললেন।

‘কেন? আমাকে ত্যাগ করে পছন্দসই কোনও ছেলেকে তো বিয়ে করতে পার!’

‘বিয়ে! আমি? কে আমাকে বিয়ে করবে? কেন করবে? বাড়ি-গাড়ি-টাকার জন্যে যে রাজি হবে তার তো একটাই উদ্দেশ্য থাকবে, আমাকে সরিয়ে দেওয়া। আপনারা, পুরুষ মানুষরা দশটা মেয়ের সঙ্গে শুয়েও যখন বিয়ে করতে যান, তখন গঙ্গাজলের মতো পবিত্র থাকেন। আর আমার মতো মেয়েরা তো নোংরা জলের ডোবা। যে জলে হাতমুখ ধুতে ঘেন্না করে তা পান করার কথা ভাবা যায় না।’

বড়বাবু এগিয়ে এসে মন্দাক্রান্তার কাঁধে হাত রাখলেন।

মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘ভালো লাগছে না। হাতটা নামান।’

‘ও। আচ্ছা, আমি চলি।’ বড়বাবু হাত নামালেন।

‘তাহলে কি কাল থেকে শ্যুটিং হচ্ছে?’

‘নিশ্চয়ই। তোমাকে কথা দিয়েছি যখন তখন—।’

‘বেশ। তাহলে আপনার আদেশ আমি মেনে নিচ্ছি।’

‘আদেশ? না-না। ওটাকে আদেশ বোলো না। আমি ভুল করেছিলাম। কাউকে স্নেহ করে যদি তুমি একটু ভালো থাকো, তাহলে আমারও ভালো লাগবে। চলি, শনিবার আসব। রাতে খেয়ে যাব।’ বড়বাবু চলে গেলেন।

.

সকাল আটটায় গাড়ি এসে গেল।

আজ ব্যথা অনেক কম। আস্তে হাঁটলে অসুবিধে হচ্ছে না। নবকুমার স্নান সেরে নিয়েছিল। মুক্তো জিজ্ঞাসা করল, ‘কখন ফেরা হবে?’

‘জানি না।’

‘জানি না বললে তো হবে না। মা বলেছিল তোমাকে আজই সোনাগাছিতে নিয়ে যেতে। দিনে-দিনে যেতে হবে।’ মুক্তো গলা তুলল।

‘কখন আসতে পারব সেটা তো ওদের ওপর নির্ভর করছে।’

মুক্তো গাড়ির ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করে হতাশ হল। লোকটার কাজ নিয়ে যাওয়া। কখন শেষ হবে তা সে জানবে কী করে! কিন্তু ফিল্ম লাইনের ড্রাইভার বলে সে অনায়াসে বলে দিল, ‘বন্ধ থেকে আবার শুরু হচ্ছে তো! তা ধরে নিন রাত এগারোটা তো হবেই’।

ভরসা পেল মুক্তো। সারাদিন এই বাড়িতে ভূতের মতো বসে না থেকে সে সোনাগাছি থেকে ঘুরে আসবে বলে ঠিক করল। হাজারার মোড় থেকে পাতাল রেলে চড়লে মিনিট পনেরোর মধ্যে শোভাবাজারে নেমে সোনাগাছিতে ঢোকা যায়।

সকালের কলকাতার পথঘাট বেশ নির্মল থাকে। ছুটন্ত গাড়ির পেছনের সিটে বসে নবকুমারের বেশ ভালো লাগছিল। ডানদিকে বসুশ্রী সিনেমা। তার মাথায় হিন্দি ছবির নায়ক-নায়িকার ছবি। হিন্দি ছবিতে যারা অভিনয় করে, তাদের কত কী জানতে হয়। নবকুমার একটু পাশ ফিরতেই কোমরে খচ করে লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথাটা গিলল সে।

স্টুডিওর ভেতরে গীতিময়ের অফিসের সামনে গাড়ি না থেমে চলে এল একেবারে মেক-আপ রুমের কাছে। একজন সহকারী পরিচালক ছুটে এসে দরজা খুলে জিজ্ঞাসা করল, ‘এখন কেমন আছ?’

‘এখনও—।’

‘যাইহোক। এমনভাবে নেমে হাঁটবে, যেন কেউ বুঝতে না পারে তুমি অসুস্থ। শালারা হেভি পেঁদিয়েছিল দেখছি। মুখের ঘা এখনও শুকোয়নি। নামো।’

প্রায় আড়াল করে নবকুমারকে নিয়ে ছোট ঘুরে ঢুকল সহকারী পরিচালক।

‘হাঁটতে কষ্ট হল?’

‘সামান্য।’

‘বসো। এখনই মেক-আপ ম্যান এসে যাবে। চা খাবে?’

‘না।’

নবকুমার একটা চেয়ারে বসতেই ছেলেটা বেরিয়ে গেল। আয়নায় নিজেকে দেখল সে। এখনও মুখ ফোলা, কপালে এবং গালে কালসিটে, কাঁচা। চোখ বন্ধ করল সে।

এই সময় গীতিময়ের গলা কানে আসতেই সে মুখ ফেরাল। চেয়ার টেনে পাশে বসে গীতিময় বললেন, ‘শোনো নবকুমার, এটা আমাদের একটা চ্যালেঞ্জ। আমি তিনদিন শ্যুটিং করব তোমাকে নিয়ে। তারপর দিনসাতেক বিশ্রাম পাবে। ওই সময়ে শরীর ঠিক করে ফেলতে হবে। এখন কেমন বোধ করছ?’

‘আগের থেকে ভালো।’

‘দেখি মুখখানা।’ গীতিময় এগিয়ে এলেন। নবকুমার মুখ তুলল।

গীতিময় বললেন, ‘অনেকটাই শুকিয়েছে। কমল!’ গলা তুললেন গীতিময়।

‘আছি।’ পেছন থেকে মেক-আপ ম্যানের সাড়া এল।

‘যেমন বলেছিলাম তেমন করে দাও।’ গীতিময় উঠে পড়লেন।

.

প্রায় দেড়ঘণ্টা লাগল মেক-আপ শেষ করতে। ছেঁড়া জামা পরতে হল। দেখলেই মনে হবে এইমাত্র খুব মারধোর খেয়ে এসেছে। মেক-আপ ম্যান জিজ্ঞাসা করল, ‘কালসিটের জায়গাগুলোয় চিড়বিড় করছে না তো?’ নবকুমার মাথা নেড়ে না বলল।

ঠিক বারোটার সময় নবকুমারকে স্টুডিওর ফ্লোরে নিয়ে যাওয়া হল। যাওয়া মাত্র দশ-বারোটা ক্যামেরা তার ছবি তুলতে লাগল। গীতিময় ক্যামেরাম্যানদের বললেন, ‘আগে শ্যুটিং শেষ হোক। তারপর ছবি তুলবেন?’

একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করল, ‘দাদা, ক্ষতগুলো অরিজিন্যাল, না মেক-আপ?’

‘অভিনয় মানেই মেক-আপ। ছবিতে অরিজিন্যাল দেখালেই হল।’

‘ও। শুনেছিলাম ওঁকে নাকি পুলিশ খুব মারধোর করেছে?’

‘কে বলল একথা? সত্যি, অ্যান্টিপার্টির বানানো কথায় আপনারা কেন যে কান দেন।’

‘অ্যান্টিপার্টি মানে?’

‘একটা নতুন ছেলেকে হিরো করেছি বলে অনেকেই খুশি হয়নি। ঠিক আছে, এবার আপনারা জোন থেকে সরে যান। এস নবকুমার।’ ডাকলেন গীতিময়।

অত্যন্ত সতর্ক হয়ে হাঁটল নবকুমার। কোমরের ব্যথাটা যেন কেউ বুঝতে না পারে, এমনভাবে পা ফেলল।

সামনেই একটা বন্ধ দরজা। পাশেই বেল বাজাবার বোতাম। গীতিময় নবকুমারকে বুঝিয়ে দিলেন। বন্ধ দরজার সামনে এসে সে ইতস্তত করবে। একটু আগে মার খেয়েছে বলে শরীরে তীব্র ব্যথা। সেই ব্যথাটা মুখ চোখে এবং দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে বোঝাতে হবে। তারপর হাত তুলে বেলের বোতামটা টিপে এক পা সরে দাঁড়াবে। দু-দুবার বুঝিয়ে গীতিময় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বুঝতে পেরেছ তো?’

মাথা নাড়ল নবকুমার।

‘তাহলে রিহার্সাল নয়। একটা মনিটার করি?’

মনিটার শব্দটার মানে স্পষ্ট না হওয়ায় চুপ করে থাকল নবকুমার। গীতিময় চিৎকার করলেন, ‘অল লাইটস। সাউন্ড রেডি? স্টার্ট ক্যামেরা। অ্যাকশন!’

সঙ্গে-সঙ্গে সমস্ত সেট আলোয় ভরে উঠল। গীতিময় যেমন বলেছিলেন ঠিক সেইরকম অভিনয় করল নবকুমার। ব্যথার অভিব্যক্তি ফোটানোর সময় ওর আরাম লাগল। অনেকক্ষণ পরে চেপে রাখা ব্যথাটাকে উপড়ে দিতে পারল।

‘কাট।’ গীতিময় চিৎকার করলেন, ‘নেক্সট শট। ভেতর থেকে!’

একজন অ্যাসিস্টেন্ট পরিচালক মনে করিয়ে দিল, ‘দাদা, এটা মনিটার ছিল!’

‘একদম যা চেয়েছি তাই হয়েছে!’ তারপর ক্যামেরাম্যানকে জিজ্ঞাসা করলেন গীতময়, ‘কী? ছবি ঠিক ছিল?’

‘যা বলেছিলেন তাই। দশে দশ।’

.

আড়াইটে নাগাদ লাঞ্চ ব্রেক। শরীর শক্ত করে হেঁটে নবকুমার মেক-আপ রুমে চলে এল। সাংবাদিকরা ঢুকতে চাইছিল। মেক-আপ ম্যান কমল বাধা দিল, ‘এখন ওকে খেতে দিন। যা জিজ্ঞাসা করার শ্যুটিং শেষ হলে করবেন।’ দরজা বন্ধ করে মেক-আপ ম্যান জিজ্ঞাসা করল, ‘খুব খিদে পেয়েছে তো?’

‘না। আমি একটু শুতে পারি? খুব কষ্ট হচ্ছে?’

‘নিশ্চয়ই। ওই ইজি চেয়ারে শুয়ে পড়ো।’ শরীর এলিয়ে দিতে বেশ আরাম লাগল।

‘কাজ খুব ভালো করেছ ভাই। শাবাশ! চালিয়ে যাও।’

নবকুমার জবাব দিল না। সে চোখ বন্ধ করল। তাকে এই তিনদিন যেমন করে হোক, ভালোভাবে কাজটা শেষ করতেই হবে। তারপরে তো বিশ্রামের সময় দেবেন গীতিময়বাবু। নৌকো থেকে পড়ে জলের তলায় তলিয়ে গিয়েছিল সে। মন্দাক্রান্তা আর গীতিময়বাবু তাকে আবার ওপরে টেনে তুলেছেন। আর এই সুযোগটাকে হাতছাড়া করবে না। যত ব্যথা হোক, সে সহ্য করবে। কাউকে বলবে না। এই কাজ করলে যে টাকা পাওয়া যাবে, তা থেকে শেফালি-মায়ের ঋণ শোধ করতে হবে।

.

নবকুমারের অভিনয় দেখে ফ্লোরের সবাই খুব খুশি। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় সে যেভাবে পড়ে গেল, গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াল, মুখে যন্ত্রণার ছাপ ফুটিয়ে তুলল তা মুগ্ধ হয়ে দেখল দর্শকরা। খুব বড় জাতের অভিনেতা ছাড়া এরকম অভিব্যক্তি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যে কাজের লোকটি তাকে ওপরে নিয়ে যাচ্ছিল সে হকচকিয়ে গিয়েছিল। কারণ নবকুমারের পড়ে যাওয়ার কথা চিত্রনাট্যে ছিল না। কিন্তু নবকুমার আবার উঠে এগিয়ে আসতে বেচারি জিজ্ঞাসা করে ফেলল, ‘লেগেছে?’ নবকুমার নি:শব্দে মাথা নেড়ে না বলে ওপরে ওঠার জন্যে পা বাড়াল। সঙ্গে-সঙ্গে গীতিময় চিৎকার করলেন, ‘কাট।’

কাজের লোকের চরিত্রে যিনি অভিনয় করছিলেন তিনি হাতজোড় করলেন, ‘সরি দাদা। উনি পড়ে গিয়েছেন দেখে মুখ থেকে ফস করে প্রশ্নটা বেরিয়ে গেল।’

গীতিময় বললেন, ‘সরি বলার দরকার নেই। দারুণ লেগেছে, স্বত:স্ফূর্ত ব্যাপার। সুনীলদা, তোমরা পুরোনো দিনের অভিনেতারাই এটা করতে পার। আমি তোমাকে বলিনি নবকুমার পড়ে যাবে। ওর মার খাওয়া শরীর তো তরতর করে উঠে যেতে পারে না। তুমি ম্যানেজ করে নিয়েছ। আজ এই পর্যন্ত থাক। প্যাক আপ ফর দি ডে।’

ক্যামেরাম্যান এগিয়ে এল গীতিময়ের কাছে, ‘অসাধারণ শট দিল ছেলেটা। মুখে যে যন্ত্রণার ছাপ ফোটাল সেটা এত স্বাভাবিক, পাবলিক খেয়ে যাবে। আপনি দারুণ আবিষ্কার করেছেন দাদা।’

‘নবকুমারকে মেকআপ রুমে নিয়ে যাও।’ গীতিময় সহকারীকে বললেন।

.

ইজি চেয়ারে শোওয়া অবস্থায় মেকআপ ম্যান মেকআপ তুলে ফেলেছিল। কালসিটের জায়গাগুলো স্পিরিট দিয়ে মুছিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কষ্ট হচ্ছে নাকি?’

মাথা নাড়ল নবকুমার, ‘না।’

গীতিময় ঢুকলেন, ‘কী ব্যাপার বলো তো? তোমাকে তো পড়ে যেতে আমি বলিনি।’

নবকুমার উঠে বসার চেষ্টা করলে, ‘কোমরের কাছে এমন যন্ত্রণা হল, সহ্য করতে পারলাম না।’

‘বুঝেছি। কিন্তু মজার কথা হল, লোকে এটাকেই অভিনয় বলে ভাবছে। এর মধ্যেই তোমার সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছে সবাই। আর হ্যাঁ, বড়বাবু তোমার পারিশ্রমিকের আগাম হিসেবে ছয় হাজার টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন। নিয়ে যেও। আর ওষুধটা খেও।’

রাত আটটার সময় ওরা ভবানীপুরের বাড়িতে পৌঁছে দিল নবকুমারকে। গাড়ি থেকে নেমে দরজার সামনে গিয়ে নবকুমার অবাক। দরজায় বড় তালা ঝুলছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *