ওল্ড র‍্যামন – ১

এক

‘ভেড়ার মতন বোকা প্রাণী আর নাই,’ বলল বুড়ো র‍্যামন।

‘কেউ না। একটাও না।’

‘কেন, মুরগির বাচ্চা?’ বলল ছেলেটি।

‘মুরগির বাচ্চা?’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘হ্যাঁ। মুরগির ছানারাও বোকা। কিন্তু ওরা তো প্রাণী না। ওরা হচ্ছে পাখি।’

‘পাখিরাও প্রাণীদের মধ্যে পড়ে,’ বলল ছেলেটি।

‘তোমার কচি মাথায় এসব বোকামি বুদ্ধি কে ঢুকিয়েছে?’

‘আমার স্কুলের বইতে পড়েছি।’

‘বইতে।’ বুড়ো র‍্যামন পেছনে খাট জুনিপারের পাতলা ছাউনিতে আরেকটুখানি ঝুঁকে বসল। চোখ তার শিরা বেরনো হাত দুটোর ওপর। প্রাচীন আঙুলগুলোর ভোঁতা নখ পরীক্ষা করছে। তবে তাই হবে। কিন্তু ওইসব বইয়ের কথায় আমার বয়সী কোন লোকের কিছু আসে যায় না। তোমরা বই পড়ো, ওইসব তোমাদের জন্যে। তুমি যখন বড় হবে, দাদা হবে তখন এমন কিছু বলবে না কোন বাচ্চা ছেলে যার ভুল ধরিয়ে দিতে পারে।’

ফি বছর দূর দূরান্ত থেকে ভেড়াদের চরিয়ে আনতে হয়। তাতে ওদের গায়ে মাংস লাগে, ভাল পশম জন্মায়। এ কাজেই চলেছে বুড়ো র‍্যামন আর ছেলেটি।

মাথার ওপরে স্বচ্ছ নীল আকাশ। প্রথম গ্রীষ্মের সোনালী সূর্যচ্ছটা বিছিয়ে পড়ে রয়েছে প্রকাণ্ড প্রান্তরটিতে, সর্বত্র তাড়া করে বেড়াচ্ছে ছায়াদের, জুনিপার সারির নামমাত্র ডাল-পালার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করছে চুইয়ে চুইয়ে। ঠায় বসে বুড়ো র‍্যামন, আনতমস্তক, জরিপ করছে চামড়া কুঁচকানো হাতজোড়া, এবং ছেলেটি লক্ষ করছে ওকে। চওড়া ব্রিমের মোচাকৃতি একটা প্রাচীন হ্যাট বুড়োর মাথায় দেখতে পাচ্ছে ও, চিবুকের নিচে একটা দড়ি দিয়ে বাঁধা, চওড়া, সমতল মুখের গভীর আয়ত চোখ দুটো এখন নিচের দিকে চেয়ে, কুঁচকানো চামড়া ঠেলে বেরিয়ে এসেছে গালের হনু, সুদূর অতীতের কোন আঘাতে বুঝিবা একপাশে কাত হয়ে গেছে বুড়োর মস্ত নাকটা, চ্যাপ্টা সুবিশাল মুখের একপাশে একটা তির্যক খাঁজ। বহু আগের কোন ছুরির কাটা দাগ।

‘ভেড়ার ব্যাপারে তুমিই আমার বই,’ বলল ছেলেটি।

ফাটা নখের ভেতর থেকে ধীরেসুস্থে বালির কণা বের করছে বুড়ো র‍্যামন। ‘কিভাবে? এই বুড়া তো বই-ই পড়তে জানে না।’

‘তুমি যেভাবে আমার বাবার ভেড়া দেখাশোনা করো সেভাবে আর কেউ পারে না। তুমি ভেড়ার বাচ্চা হারাও না। তোমার পালের ভেড়া যেমন স্বাস্থ্যবান তেমনি পশমী। বাবা বলে সে নাকি ছোটবেলা থেকে এটা দেখে আসছে। সেই ‘যখন থেকে তুমি আমার দাদার ভেড়া দেখাশোনা করছ।’

বুড়ো মাথা তুলল ঝট করে।

‘আমার মনিব বলে একথা?’

‘বলে। আমাকে বলেছে: ‘তুমি এ বছর র‍্যামনের সঙ্গে যাবে। খালি বই পড়ে কিছু শেখা যায়? র‍্যামনকে দেখে হাতেকলমে শিখবে। ওর সঙ্গে যত কথা বলবে তত বেশি জানতে পারবে।’

দূরে সূর্যরশ্মি কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে দেখতে পাচ্ছে র‍্যামন, চোখ চলে যাচ্ছে ওর সুদূরে সবুজ অরণ্য-পাহাড়ের পাদদেশে। নীরবে, প্রায় নিস্পন্দভাবে, ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ভেড়ার পালটি জিরিয়ে নিচ্ছে অন্যান্য জুনিপারের পাতলা ছায়ায়। কুকুর দুটো আরেক টুকরো ছায়া বেছে নিয়ে নীরবে হ্যা-হ্যা করছে জিভ বের করে। মালবাহী গর্দভটা নিঃসাড়ে মাঝেমধ্যে লেজ নাড়ছে আর ঢুলছে আরেকটা জুনিপারের আড়ালে।

‘কিছু বলো না শুনি,’ বলল ছেলেটি। ‘আমার কান কিন্তু খোলা আছে।’

দশ-এগারো বছর বয়সী ছেলেটির দিকে চাইল বুড়ো র‍্যামন। বুড়ো মুখটার বোম্বেটে, দুর্বৃত্তসুলভ কঠোর দাগগুলো এমুহূর্তে নরম হলো কিছুটা।

‘আর কোন জানোয়ার, অবশ্যই মুরগির বাচ্চা ছাড়া, ভেড়ার মতন এমন গাধা না।’ নিচু ডালগুলোয় হেলান দিয়ে বসল ও, চোখ বুজে গেছে, যেন বা মনের মধ্যে হাতড়াচ্ছে উপযুক্ত শব্দ। ‘ভেড়ার মতন। ভেড়ার পালের মতন না। পালও বোকা তবে অতটা না। ভেড়া, একটা ভেড়া, মানুষের কাটা আঙুলের মতন। আঙুলটার তখন আর দাম নাই। কিন্তু মানুষের অংশ হিসাবে দাম আছে। ভেড়ার ক্ষেত্রেও তাই। একটা ভেড়া একটা দলের অংশ ছাড়া আর কিছু না দলের কথা সর্বক্ষণ মাথায় রাখতে হবে তোমাকে। এই ভেড়াটা অথবা ওই ভেড়াটা না পুরা দলটা…যারা বই লেখে তাদের মতন করে তোমাকে বলতে পারছি না। কিন্তু ব্যাপারটা এইরকমই…একটা ভেড়া চিন্তা-ভাবনা করে না। সে এইটা করে ওইটা করে এবং তার কোন অর্থ থাকে না। কিন্তু দল চিন্তা করে। আর দল যা চিন্তা করে দলের প্রত্যেকটা ভেড়া সঙ্গে সঙ্গে এবং একসঙ্গে সেটা জানতে পারে। অদ্ভুত হলেও এটাই সত্য…’

অলস মুহূর্তগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে চলেছে, তেমনি হেলান দিয়ে নিশ্চুপ বসে বুড়ো র‍্যামন, পাশের ছায়াটায় পা গুটিয়ে বসা ছেলেটি। বুড়ো র‍্যামন খাট জুনিপারে পিঠের চাপ দিয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। ‘দেখেছ? দলটা নড়াচড়া করছে। এই ভেড়াটা বা ওই ভেড়াটা না। পুরা দলটা। সব কয়টা এক সাথে। ওরা জানে দিনের সবচাইতে গরম সময়টা কেটে গেছে। দল এখন নড়ে চড়ে খাবার খোঁজার কথা ভাবছে। দেখতে পাচ্ছ, দলটা নিজেই কেমন একটা আকার নিচ্ছে?…ওই যে সবার সামনে থেরেসা, অন্যরা ওর পিছে পিছে। গত বছরও আমার সঙ্গে ছিল এবারও আছে কারণ ওকে সবাই মেনে চলে…ওই যে ওদিকে জুয়ানিটাকে অনুসরণ করছে অন্যরা। ওই পাশের ওইটা হচ্ছে মারিয়া, ওকেও নেতা মানে অনেকে। কিন্তু লক্ষ্য করো, সবাই কিন্তু ওরা একই দিকে যাচ্ছে। দলের দিকে…আমরা বেরিয়েছি মাত্র একদিন হলো অথচ এরইমধ্যে দলটা আকার পেতে লেগেছে। প্রতিটা ভেড়াই এখন নিজের জায়গা চেনে। আর এখন থেকে সবসময় এইরকমই হতে থাকবে। যারা আগে আছে তারাই আগে থাকবে। যারা পিছে আছে পিছেই থাকবে। আর সেইটাই ভাল। এখন যে অবস্থা, এর কোন উল্টাপাল্টা দেখলে বুঝতে হবে কোথাও কোন গোলমাল আছে, তখন সেটা খুঁজে বের করে মেটাতে হবে।

জীর্ণ লাঠিটা তুলে নিয়ে ওটায় ভর দিয়ে দাঁড়াল বুড়ো র‍্যামন, ভেড়ার পালটার ধীর গতি নড়াচড়া লক্ষ করছে। ছেলেটি তার পাশে দাঁড়ানো। ভেড়াদের মৃদু ব্যা ব্যা শব্দ কানে আসছে ওদের, মাদী- ভেড়ারা তাদের তিন মাসের বাচ্চাদের কাছে ডাকছে, ছানাগুলো জীবনের প্রাণপ্রাচুর্যের আনন্দে পাল্টা আওয়াজ করছে, নড়ছে চড়ছে, এক কথায় সামাজিক কর্মকাণ্ড চলছে গোটা দলটার। ছায়ার ফালিতে কুকুর দুটো নিথর পড়ে থাকলেও মাথা তোলা। চলমান ভেড়াদের পর্যবেক্ষণ করছে কমবয়সী কালো কুকুরটা। বুড়ো বাদামী কুকুরটা নিরীখ করছে বুড়ো র‍্যামনকে।

‘আমি বুঝি না,’ বলল ছেলেটি, ‘তুমি কোন্‌টা কোন্ ভেড়া চেনো কিভাবে?’

বিস্ময়ে খানিকটা সিধে হলো র‍্যামন।

‘কারণ সবগুলাই যে আলাদা।’

‘আমি তো দেখছি একই রকম। একটা আরেকটার মত। বাচ্চাগুলোর সবে লোম গজাচ্ছে, ওগুলো ছোট আর বেশি ছটফটে। কিন্তু বুড়োগুলো তো সব একই রকম।’

‘এক রকম?’ বলল বুড়ো র‍্যামন। কিন্তু ওরা ঠিক- ঠিক মানুষের মতনই আলাদা। না। মানুষের মধ্যে তফাত বেশি অবশ্য ভেড়াদেরও তফাত আছে। আগে কখনও এইটা ভেবে দেখি নাই তবে ব্যাপারটা এমনই। ভাল মেষপালক ভেড়াদের সঙ্গে কয়েকদিন থাকলেই সবগুলাকে আলাদা করে চিনে নিতে পারে, তার কুকুরও পারে। আমি ঠিক ঠিক জানি না কারণ আগে কখনও এইটা মাথায় আসে নাই কিন্তু আমার মনে হয় এইটা একটা ভেড়ার কোন একটামাত্র ব্যাপার না। ভেড়াটার সবটা মিলিয়ে ব্যাপারটা ঘটে। ওইটার আকার, গায়ে কতখানি মাংস, কিভাবে হাঁটে, লোম জন্মায় কিভাবে, কানের গড়ন, লেজের মাপ, তাকায় কেমনে, খানা খায় কিভাবে। কোন একটা ব্যাপার না কিন্তু সবটা মিলিয়ে ওইটাকে চিনতে হয়। র‍্যামন আর কয়দিনের মধ্যে প্রত্যেকটাকে আলাদা করে চিনে নিবে। ব্যাপারটা তোমার কাছে নতুন। কিন্তু পাহাড়ে পৌঁছানোর পর দেখবে দলের অনেকগুলিকে চিনে ফেলেছ তুমি।’

ওরা দু’জন পালটাকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে এসময় কালো কুকুরটা উঠে এক ছুটে এসে ছেলেটির গায়ে নাক ঘষতে শুরু করল। বুড়ো বাদামীটা জায়গা ছেড়ে নড়েনি, মাথা তুলে তখনও বুড়ো র‍্যামনকে দেখছে-

‘দেখেছ? দলটা মনে করছে দক্ষিণে জমি যেখানে হন্ডো অ্যারোয়োতে মিশেছে ওখানকার ঘাস উত্তম হবে। ওরা ঠিকই ভেবেছে। কিন্তু ওইটা প্রাইভেট রেঞ্জ। আমরা যে পাহাড়ে যাচ্ছি সেখানেও ভাল ঘাস আছে, অনেক সপ্তাহের খোরাক। আমাদেরকে পশ্চিমে যেতে হবে। কিন্তু সত্যিকারের পশ্চিমে না। র‍্যামন আর পেদ্রোর পক্ষেও ভেড়ার পাল নিয়ে সূর্যের চোখে যাত্রা করা সম্ভব না। দক্ষিণ-পশ্চিমে যাব আমরা। তারপর পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ডুবে গেলে রাতের জন্যে রওনা হব ওজো ফ্রিয়োর দিকে।’

বুড়ো কুকুরটার দিকে চেয়ে মাথা নাড়ল র‍্যামন। ওটা চকিতে উঠে পড়ে ধাওয়া লাগাল ভেড়াদের। কালো কুকুরটা চেয়ে চেয়ে দেখল উৎসাহ-উদ্বেগ নিয়ে লাফিয়ে সামনে এগোচ্ছে বাদামী কুকুরটা, সামনে পিছনে বারেবারে ছোটাছুটি করে তাড়া লাগাচ্ছে ভেড়ার পালটাকে। এবার দলটার ঠিক পিছনটায় থমকে দাঁড়িয়ে পিছু ফিরে চাইল। বুড়ো র‍্যামন বাঁ হাতটাকে কাঁধ অবধি তুলে সহসা সামনে ঝটকা মেরে চওড়া করে ঘুরাল, দক্ষিণ-পশ্চিম নির্দেশ করল আসলে। বাদামী কুকুরটা এক ছুটে দলের বাঁ পাশে গিয়ে দলনেত্রীদের পাশে থেমে পড়ল, তারপর কাঁধ দিয়ে আলতো গুঁড়ো মারতে লাগল ওদের পাঁজরে, দক্ষিণে যেতে তাগাদা দিচ্ছে। ওর দেখাদেখি কালো কুকুরটাও তাড়া দিতে লাগল ভেড়াগুলোকে, গুঁতো মারছে, ঘেউ ঘেউ করছে গলা ফাটিয়ে।

লাঠিতে আরেকটু ঝোঁক দিল বুড়ো র‍্যামন।

‘আস্তে আস্তে, বিড়বিড় করছে। ‘আই, ওই স্যাঞ্চো। পেদ্রোকে দেখে কি কিছু শিখবে না?…এবার…যথেষ্ট হয়েছে। বুড়ো র‍্যামন মুখে দু’আঙুল পুরে শিস বাজাল। বাদামী কুকুরটা থেমে ঘুরে চাইল

বুড়ো র‍্যামন ডান হাতটা সোজাসুজি মাথার ওপর তুলে দলটা এখন যেদিকে যাচ্ছে সেদিকটা নির্দেশ করল। বাদামী কুকুরটা দৌড়ে সামনে দলের ডান ধারে চলে গেল। কালো কুকুরটা ওটার পিছু নিল। বাদামীটা ঘুরে কালোটার উদ্দেশে দাঁত খিঁচাল, এবং কালোটা অপ্রস্তুত হয়ে পিছু হটে বাঁয়ে সরে গেল। দুটো কুকুরকে দু’পাশে নিয়ে দলটা ধীরেসুস্থে এগিয়ে চলল দক্ষিণ পশ্চিম লক্ষ্য করে।

গর্দভটার লীড রোপ ধরতে ছেলেটিকে এবার ইশারা করল বুড়ো র‍্যামন।

‘আমরা এখন পিছে পিছে যাব। দলটা এখন ভাবছে ওরা যেইদিকে যেতে চেয়েছিল আমরা সেইদিকেই ওদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ওরা খুব আস্তে ধীরে যাবে। ঠিকই আছে, কারণ রাস্তা থেকে খাবার জোগাড় করতে হবে তো, কিন্তু এরা বেশি আস্তে যাচ্ছে। চারদিন, হয়তো পাঁচদিন আমাদেরকে তাড়া লাগিয়ে যেতে হবে। হালকাভাবে। মোলায়েমভাবে। কোন দলকে তাড়িয়ে নিতে নাই, দরকার ছাড়া ছোটাতে নাই। এইটা গরুর বা ঘোড়ার দলের মতন না। তাড়িয়ে নিলে ভাল খাবার পেলেও চরতে পারে না ওরা, ফলে গায়ে শুকিয়ে যায়। কিন্তু আস্তে ধীরে তাড়িয়ে নিলে ওরা মনে করে আমরা ওদের ইচ্ছাতেই চলছি। জোর্নাডা সেকা, মানে ওই শুকনা জায়গাটা পার না হওয়া পর্যন্ত পিছন থেকে হালকা তাড়া দিয়ে যাব আমরা। ওইটা পার হলে পর সামনে চলে যাব। দলটা বুঝবে সামনেই ভাল জমি আছে, তাই তাড়াহুড়া করবে নিজেরাই। হয়তো পাহাড়ী ঘাসের গন্ধ পেয়ে যাবে ওরা। থেরেসা, জুয়ানিটা আর মারিয়ার যদি গত বছরের কথা মনে থাকে তো সেইটা বাকি দলও একই সঙ্গে জেনে যাবে। কিন্তু খাবার নাই তাও যদি তাড়াহুড়া করে তখন সামনে গিয়ে ঠেকাতে হবে আমাদের…’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *