ওল্ড র‍্যামন – ১০

দশ

ছোট্ট তাঁবুটায় তোফা ঘুম দিল বুড়ো র‍্যামন আর কিশোর। তাঁবুটা চওড়া হলেও নিচু ছাদের, উঠে বসলে মাথা ঠেকে যায় প্রায়। বাইরে রাতের চেয়ে তাঁবুর ভেতরে অন্ধকার বেশি। পশ্চিমে উঁচু পাহাড়ের পেছনে গা ঢাকা দিতে তৈরি হয়ে ঝুলছে প্রথমার চাঁদ, বাইরে তারই ম্লান, বিবর্ণ আলো।

হঠাৎ ধড়মড় করে ঘুম ভেঙে উঠে বসল ছেলেটি। বাইরে থেকে ক্রমেই কাছে আসছে একটা গভীর ঘেউঘেউ ডাক। আঁধারে টের পেল পাশ দিয়ে টলমল পায়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে গেল বুড়ো র‍্যামন। ওকে অনুসরণ করল কিশোর, বাইরের ক্ষীণ আলোয় আড়মোড়া ভেঙে সিধে হতে দেখল বুড়ো র‍্যামনকে এবং রাদামী কুকুরটাকে দেখতে পেল সবেগে দৌড়ে আসতে, এখন আর গর্জাচ্ছে না, শুধু একটা গুরুগম্ভীর গরগর আওয়াজ ওটার গলার ভেতর।

‘কি হয়েছে?’ চেঁচিয়ে উঠল কিশোর।

‘নেকড়ে!’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘পেদ্রো বলছে নেকড়ে!’

তাঁবুর প্রবেশমুখে জবুথুবু হয়ে বসে পড়ল ছেলেটি, দেখল বুড়ো র‍্যামন পুরানো সিঙ্গল-শট রাইফেলটা প্যাকের পাশ থেকে তুলে নিয়ে পা বাড়াল, এবং বাদামী কুকুরটা বিজলী চমকের মতন ছুটল তার আগে আগে।

বুড়ো র‍্যামন হঠাৎ থেমে পিছু ফিরে চাইল।

‘তুমি এখানে থাকো। আগুন জ্বালিয়ে একটা মশাল নিয়ে আসবে।’ বুড়ো র‍্যামনের ছুটন্ত ছায়ামূর্তি অন্ধকারে বাদামী কুকুরটার পিছু নিল।

শরীর ঝাঁকিয়ে কাঁপুনি দূর করতে চাইল কিশোর, নিভু নিভু আগুনে সাজানো গাদা থেকে নিয়ে খড়ি দিতে লাগল। হাঁটু গেড়ে বসে

প্রাচীন রাইফেলটা গর্জে উঠল ফুঁ দিচ্ছে স্ফুলিঙ্গে। বাইরে একবার এবং তারপর নেমে এল নীরবতা। দু’মুহূর্ত পরে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করল বুড়ো র‍্যামনের চিৎকার। ‘পেদ্রো! ভেড়ার পাল! ভেড়ার পাল!’

তাজা কাঠ থেকে খুদে অগ্নিশিখা লকলকিয়ে উঠছে দেখে ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়ে উঁকি দিল রাতের অন্ধকারে। গর্তে ধূসর জমাটবদ্ধ একটা বিন্দুর মতন দেখাচ্ছে পালটিকে। সমস্ত ভেড়া পরস্পর গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে এবং দুটো ছায়ামূর্তি ছুটে আসছে ওদের দিকে, এক বৃদ্ধ আর একটা বুড়ো বাদামী কুকুর। লোকটা দৌড়ে ঢুকে পড়ল দলের মধ্যে, নিচু হয়ে হাতের আর কাঁধের ধাক্কায় ভেড়াগুলোকে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে একপাশে, এবং পরক্ষণে কুকুরটা ঘনবদ্ধ পিঠগুলোতে লাফিয়ে উঠে দলের মাঝখানটার উদ্দেশে ছুটে গেল।

মোহিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে থাকতে আচমকা চমক ভাঙল ছেলেটির। চারদিকে চেয়ে এক টুকরো পিনিয়ন তুলে, এক প্রান্তে দড়ি পেঁচিয়ে ঠেসে ধরল আগুনে। প্রান্তটিতে ভালমতন আগুন ধরলে পর, কাঠটা টেনে বের করে, মশালের মত বাগিয়ে ধরে ভেড়ার পালের উদ্দেশে দৌড়ে গেল।

দলটা খানিকটা ছত্রখান এমুহূর্তে, দলে দলে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। জায়গাটা বড় করে চক্কর দিচ্ছে বাদামী কুকুরটা, যাতে একটাও ছুটে পালিয়ে যেতে না পারে। বুড়ো র‍্যামন দাঁড়ানো বৃত্তের প্রান্তে, ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস টানছে। মশালের ঈষৎ কম্পমান আলোয় তার দিকে চেয়ে রইল ছেলেটি।

‘কিন্তু- কিন্তু- আমি বুঝতে পারছি না,’ বলল ছেলেটি।

‘আর কোন প্রাণী- এমনকি মুরগির ছানারাও- ভেড়ার মত এত বোকা নারাতে বিপদ ঘনায়- তারা হয়তো তখন দৌড় দেয়- চোখের পলকে এবং সব একসঙ্গে- চলে যায় এইখানে সেইখানে এবং সবখানে- এইটা ভাল না- একটা গোটা দিন তখন লেগে যায় তাদের জড়ো করতে…হয়তো তারা ছোটাছুটি করে না- আজ রাতের মত ঘন হয়ে থাকে পরস্পর- শক্ত একটা পিণ্ডের মত জড়াজড়ি করে থাকে- সেইটা আরও খারাপ- মাঝখানে চাপ পড়ে খুব- বাচ্চাগুলি পড়ে যায় আর অন্যগুলা তাদেরকে ঢেকে রাখে- তারা দম নিতে পারে না- ফলে বেশ কিছু মারাও পড়ে…’

বুড়ো র‍্যামন মশালটা নিয়ে হনহন করে পা চালালে ওকে অনুসরণ করল কিশোর। বুড়ো র‍্যামন নুয়ে পড়ে, মাটি থেকে রাইফেলটা তুলে নিয়ে হেঁটে চলল দীর্ঘ পদক্ষেপে। খানিক বাদে ঝুঁকে মশালের আলো ফেলল মাটিতে, কি যেন খুঁজতে খুঁজতে এবার ধীর পায়ে চলেছে। থমকে দাঁড়িয়ে নিচু হয়ে পায়ের কাছে মাটি পরখ করছে এমুহূর্তে।

‘দেখো। ট্র্যাক। বড়, বিরাট বড়। আর এই যে রক্ত। আহ্, নেকড়েটাকে লাগাতে পেরেছি। আর ত্রিসীমানায় ঘেঁষবে না। মরসুমের এই সময়ে ওর পাহাড়ে থাকার কথা, গহীন জঙ্গলে থাকার কথা। জান নিয়ে সেইদিকেই পালাচ্ছে এখন।’

বুড়ো র‍্যামন মন্থর পায়ে এগোচ্ছে, জমি নিরীখ করতে করতে।

‘ভাল। ভাল। একটাই ছিল। খুব ভাল।’ সিধে হয়ে চারধারে দৃষ্টি বুলাল ও, কান পেতে শুনতে চাইছে যেন কিছু। মাথা ঝাঁকিয়ে ছেলেটির দিকে চাইল, তারপর কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেও চুপ করে গেল, চোখ সরিয়ে হাঁটা দিল ভেড়ার পালটার দূর প্রান্তের উদ্দেশে। আগু-পিছু করে জমি পরীক্ষা করছে। সে আবারও থেমে পড়তে কিশোরটি তার পাশে এসে দাঁড়াল। দু’জনে একসঙ্গে চেয়ে রইল মাটিতে নিস্পন্দ পড়ে থাকা কালো আকৃতিটার দিকে। মাজল ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, দাঁতের সারির পেছনে টেনে দেয়া হয়েছে যেন ঠোঁট, মশালের মৃদু কম্পমান আলো প্রতিফলিত হলো কুকুরটার প্রাণহীন চোখের তারায় আর ছেঁড়া টুটির জমাট বাঁধা রক্তে।

‘আই, বোকাটা,’ মৃদু স্বরে বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘আই, সেই দুঃসাহসী টগবগে বোকা কুকুরটা।’

ফুঁপিয়ে উঠল ছেলেটি।

‘কান্না আটকে রেখো না,’ নরম সুরে বলল বুড়ো র‍্যামন। কাঁদলে মনটা হালকা হয়। আর কুকুরটাও তা জানতে পারবে। কুকুরটার আত্মা জানতে পারবে…তুমি এখানে ওর কাছে একটু দাঁড়িয়ে থাকো। বেলচাটা নিয়ে আসি আমি। ওকে অনেক নিচে কবর দেব আমরা। জায়গাটার নিশান হবে ঝর্না থেকে বয়ে আসা পাথর…’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *