• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

সমুদ্রের সন্ন্যাসিনী – নবনীতা দেবসেন

লাইব্রেরি » নবনীতা দেবসেন » সমুদ্রের সন্ন্যাসিনী – নবনীতা দেবসেন
লেখক: নবনীতা দেবসেনবইয়ের ধরন: কিশোর সাহিত্য

সূচিপত্র

  1. এক : জাম্বো জেট
  2. দুই : ওরা কারা?
  3. তিন : প্যারিসের পথে—ঘাটে
  4. চার : মূর্তি এবং মূর্তি
  5. পাঁচ : পোপের প্রাসাদে
  6. ছয় : পাতালপুরীর গোলোকধাঁধা
  7. সাত : হেলভ্যালির গুহায়
  8. আট : কামার্গের খামারবাড়িতে
  9. নয় : তেপান্তরের ঘোড়সওয়ার
  10. দশ : মহোৎসবের মধ্যমণি
  11. এগারো : সমুদ্রের সন্ন্যাসিনী

সমুদ্রের সন্ন্যাসিনী – নবনীতা দেবসেন

‘সমুদ্রের সন্ন্যাসিনী’ একটি কিশোর উপন্যাস হলেও বাংলা সাহিত্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের। এক কিশোরীর ফরাসি দেশে ভ্রমণ—অভিজ্ঞতাকে শেষপর্যন্ত মিথের জগতে নিয়ে গেছেন নবনীতা। একটা কুইজ প্রতিযোগিতায় জিতে হঠাৎই ফ্রান্সে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়ে যায় তেরো বছরের সারা। তার সঙ্গে যায় শিল্পানুরাগী ছোটমামু। ফরাসি দেশে ভ্রমণের অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। সারার ভ্রমণের মধ্য দিয়ে ফরাসি দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাঠককে দিতে চেয়েছেন তিনি। এই দেশে গিয়ে সারার বিস্ময়, কৌতূহল, নানা উন্মোচন, অনুভূতি, শিল্পানুরাগ ইত্যাদির পর গল্পটি আচমকা অন্য মাত্রা পায় সারা অপহৃত হওয়ার পর। সারাকে অপহরণ করে জিপসিরা আর সারাও যেন অ্যালিসের মতো এক বিস্ময়—প্রদেশে অনুপ্রবেশ করে। প্রকৃতপক্ষে যে স্বপ্নের রাজ্যে সারা ঢোকে তা ফরাসি দেশের চেয়েও বিস্ময়কর। এখানেই একটি মিথকে জড়িয়ে দেন লেখক। যিশুখ্রিস্টের মৃত্যুর পর প্যালেস্টাইন থেকে একটি নৌকোয় যিশুর সাক্ষাৎ—শিষ্যদের সঙ্গে কামার্গের ফরাসি বন্দরে এসে পৌঁছয় এক ভারতীয় মেয়ে। তার নামও ছিল সারা। সেই সেন্ট সারাই জিপসীদের আরাধ্য দেবী। সেই মিথের ভারতীয় দেবী আর আলোচ্য কাহিনীর সারা জিপসীদের কাছে একাকার হয়ে যায়, সরার মধ্য দিয়ে যেন মিথের জগতেরই প্রত্যাবর্তন ঘটে। সারাকে শেষপর্যন্ত উদ্ধার করা হয়, কিন্তু মিথের জগতটি জড়িয়ে থাকে তার চেতনায়। সারাকে নিয়ে লেখা আরেকটি কিশোর উপন্যাসও রয়েছে এই সংকলনে, যার নাম, ‘বিষহরির প্রসাদ।’ এই কাহিনীর পটভূমি বিষ্ণুপুর। ইতিহাস ও রহস্য মিলেমিশে, নানা প্রতীকী ঘটনায়, অ্যাডভেঞ্চারে সমৃদ্ধ এই কাহিনী।

.

এক : জাম্বো জেট

সারার মধ্যে যেন একটা ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে। এসব কি সত্যি? এমনও সত্যি সত্যি হয়? গত অক্টোবর মাসে বারো পূর্ণ হয়ে এখন তার তেরো চলছে—এই বয়সেই সারা দু’দুটো ফ্রান্স বেড়ানোর টিকিট পেয়ে গেছে। কৃতিত্বটা অবশ্য আধখানা মাত্র সারার —বাকিটা ছোটোমামুর। ঐ বিজ্ঞাপনের খবরটা কে এনেছিল? ছোটোমামুই তো। আর ছোটোমামুর সঙ্গে পরামর্শ করেই তো ধাঁধার উত্তরটা বের করেছিল সারা। কে জানতো ফার্স্ট প্রাইজ জুটে যাবে সারারই কপালে? সারার কপালটাকে তো এমনিতে বিশেষ ভালো বলা যায় না! পরপর পাঁচ বোনের পর ছ’নম্বর বোন সে—ঠাম্মা প্রথমটায় আদর করে নাম রাখছিলেন মিলিয়ে মিলিয়ে। ইরা, মীরা, ধীরা, তারা, ধারা—কিন্তু অস্থির হয়ে শেষকালে নাম রেখে দিলেন সারা! তার মানে ঢের হয়েছে—এবারে মেয়ের ধারা সারা হোক। হলোও তাই! সারার পরেই ভাই—মহারাজ। ইস্কুলে আগে আগে সারাকে সবাই খেপাতো, ‘তোমার হলো শুরু—আমার হলো সারা’ বলে। এখন থেকে অবশ্য আর বলবেনা। কেননা সেই সারা আজ ফ্রান্সে যাচ্ছে, পনেরো দিনের জন্যে। সাউথ অফ ফ্রান্সে বেড়াতে। মা—বাবার সঙ্গে নয়, ইস্কুলের সঙ্গে নয়, নিজের জোরে। ধাঁধার জবাব লিখে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়ে। ‘এ ট্রিপ ফর টু।’ দুজনের ফ্রান্সে যাবার টিকিট দিচ্ছে বিজ্ঞাপন কোম্পানি, আর সেই টিকিটে ছোটোমামুও যাচ্ছে সঙ্গে, সারার গার্জেন হয়ে। ছোটোমামুর স্কুল নেই, কলেজ নেই, আপিস—কাছারি নেই, আছে কেবল বই আর বই। এম. এ. পাশ করে কয়েকবছর ছোটোমামু বেকার বসে আছে। কখনো জার্মান শিখছে, কখনো ফ্রেঞ্চ, কখনো—বা রাশিয়ান। আর কেবল স্ক্র্যাবল খেলা, শব্দ—সন্ধান, ধাঁধার জবাব, এই প্রতিযোগিতা সেই প্রতিযোগিতার সুলুক সন্ধান আনছে। এর আগেও একবার সারা আর ছোটোমামু প্রাইজ পেয়েছিল, বেশ কিছু বই। টিভি কুইজ—এ। আর একবার তো পেয়েছিল কী একটা খবরের কাগজের প্রতিযোগিতায় একটা মস্তবড় ফ্লাস্ক। কিন্তু এবারের এইটেই সবচেয়ে বড়সড় ব্যাপার, একেবারে ফ্রান্সের টিকিট। দু’খানা।

এখন সারা একটা প্লেনে বসে আছে। পাশেই ছোটোমামু একটা বই পড়ছে খুব মন দিয়ে। ফ্রান্সে কোথায় কোথায় যাবে, কী কী দেখবে, কী কী খাবে, এইসব বিষয়ে একটা ভালো গাইডবই। অনেক ছবি আছে ওতে। সুন্দর সুন্দর। ছোটোমামুর পরনে পাজামা—পাঞ্জাবীর বদলে ছাইরঙের সুট, গলায় লাল টাই বাঁধা। সারা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল—ছোটোমামুকে বোকা বোকা লাগছে কিনা। না তো দিব্যি ভালোই দেখাচ্ছে। সারা পরেছে পুজোয় পাওয়া সবুজ সিল্কের ম্যাক্সিটা, শ্যাম্পু করা কালচে ব্রাউন চুলগুলো ওর যেন থাকে—থাকে সাজানো, ঢেউ খেলানো, সুন্দর। চুলে একটা ম্যাচ করা রিবন বেঁধেছে সে—সারাকে দেখতে খুব মিষ্টি। বড় বড় কালো চোখ দুটি সবসময়েই যেন কাজল পরা দেখায়।

বয়স অনুপাতে সারা বেশ লম্বা মেয়ে। মেয়ে আবার ফ্যাশন করে একটু উঁচুহিলের জুতো পরেছে। পরে হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। ফ্রান্সে পৌঁছেই আগে এ—জুতোজোড়া খুলে ফেলে পুরোনো ইস্কুলের জুতোটা পরে নিতে হবে, নইলে বেড়ানো শিকেয় উঠবে। ছোটোমামু তো গাইডবই পড়ছে। সারা জানালার দিকে বসেছে। সবসময়েই তাই বসতে চায় সে। কিন্তু মহারাজ সঙ্গে থাকলে কক্ষনো বসতে দেয় না—মহারাজটা বড্ডই দুষ্টু, একগুঁয়ে ছেলে হয়েছে। সারা জানালার পাশে বসতে পেয়ে খুব খুশি। বাইরে বহু নিচে পৃথিবীর মাটি দেখা যায়—চৌকো চৌকো নানা রঙের খেত, ঘন সবুজ ঝাঁকড়া বন—জঙ্গল, উঁচুনিচু হিজিবিজি পাহাড়—গেরুয়া ফিতের মতন সব নদী। মাটিতে আয়নার টুকরো বসিয়ে যেমন মডেল গ্রামের সব পুকুর বানিয়েছিল ক্লাস টেনের ছেলেমেয়েরা ওয়ার্ক এডুকেশনের ক্লাসে, ঠিক তেমনি সব দীঘি, জলা দেখা যায়। কী ছোট্ট ছোট্ট ঘরবাড়ি, যেন পুতুলের দেশ। এরই মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ নীল সমুদ্র দেখা গেছে। একঘেয়ে স্রোতের নীল ছবি। মাঝে মাঝেই ভেসে আসছে রাশিরাশি সাদা মেঘের দঙ্গল, মাটির ছবি, জলের ছবি সব একদম ঢেকে দিচ্ছে। সাদায় সাদা হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। জানালার নিচে সমুদ্রের জল ফুরিয়ে গিয়ে একসময়ে আবার আবির্ভাব ঘটল মাটির, গ্রামের, নদীর।

—’ছোটোমামু, ওটা কি গঙ্গানদী?’ হঠাৎ একটা খুব চওড়া নদী দেখে সারা বলে ওঠে।

—’দূর বোকা মেয়ে। গঙ্গা কি করে হবে? আমরা কি এখনো ভারতবর্ষে নাকি? এক্ষুনি কায়রোয় নামবো, ওটা নিশ্চয় নীলনদ।’

—’নীল—ন—দ?’ অবাক হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে সারা। নীলনদ দেখতে পাচ্ছে সে? স্বচক্ষে হিস্ট্রিবইতে যে নদীর কথা এত এত পড়েছে—মিশরীয় সভ্যতার উৎসস্থল—সেই নীলনদ! তাহলে হয়তো এবার পিরামিডও দেখা যাবে। চোখদুটোকে তীক্ষ্ন করে নিচের দিকে পাঠিয়ে দেয় সারা—ওখানে পাহাড়ের মতো কিছু দেখা যাচ্ছে কি? কিন্তু, নাঃ। একসময় প্লেন নামতে শুরু করে দেয়—’ফাসন সীটবেল্টস— নো স্মোকিং’ চিহ্নদুটি জ্বলে উঠেছে। নীলনদ আর দেখার উপায় নেই, মাথা ঘুরছে একটু একটু সারার। এই প্লেন—নামার সময়টায় সারার একটু একটু শরীর খারাপ লাগে। কোমরে বেল্ট বেঁধে, চোখ বুজে, চোয়াল শক্ত করে থাকে সে। ছোটোমামু একটা পিপারমেন্ট লজেন্স গুঁজে দেয় হাতে, সেটা চটপট মুখে পুরে চিবুতে শুরু করে সারা, কিছু চিবুলে নাকি কানে তালা ধরে না। একসময় ঘটাং করে ভারী উড়োজাহাজ 747 জাম্বোজেট মাটিতে গিয়ে ঠেকে যায়। আকাশকুমারীর ঘোষণা শোনা যায় মাইকে, ‘যতক্ষণ না প্লেন একদম থামছে ততক্ষণ দয়া করে সীট ছেড়ে কেউ উঠবেন না। যাঁরা কায়রোতে নামবেন, তাঁদের সাদর বিদায়—সম্ভাষণ জানাই। আর যাঁরা আরো দূরে যাবেন, তাঁদের জানাচ্ছি যে কায়রোর এয়ারপোর্টে আমাদের প্লেন চল্লিশ মিনিট থামবে। আপনারা নেমে এয়ারেপোর্টে ঘুরে আসতে পারবেন, তবে প্লেনে দামী কিছু রেখে যাবেন না। আমাদের সঙ্গে ভ্রমণ করার জন্যে আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।’ প্লেন থামতে ছোটোমামু উঠে দাঁড়ায়, সঙ্গে সঙ্গে সারাও। জাম্বোজেটগুলো যেন আস্ত এক একটা প্রাসাদ। কত বড় একটা হলঘর, সারিবন্দী ৩, ৪, ২ হিসেবে পাশাপাশি ৯ জন মানুষ বসতে পারে—যাতায়াতের জন্যে দুটো গলি—রাস্তা রেখেও। তিনশোপঁয়ষট্টি জন মানুষ বুকে নিয়ে ঠিক তিমি মাছের মতো দেখতে দোতলা প্লেনটা আকাশ চিরে পঁয়ত্রিশ হাজার ফুট উঁচু দিয়ে তীরের মতো ছুটে মেঘ—তারার পাড়া নাড়িয়ে দিল্লি থেকে সোজা কায়রোয় চলে এসেছে। দীর্ঘ মই বেয়ে নেমে যাচ্ছে যাত্রীরা।

দুই : ওরা কারা?

মাটিতে পা রেখেই সারার মনে হলো এই হলো পিরামিডের দেশ মিশর। মমির দেশ মিশর। মানব সভ্যতার দোলনা, এই মিশর দেশের মাটি। এয়ারপোর্টে বসে বসে অস্থির হয়ে যায় সারা। শেষপর্যন্ত বলেই ফেলে—’ছোটোমামু, দৌড়ে বাইরে গিয়ে একটু পিরামিডগুলো দেখে আসা যায় না? কায়রোর মাটিতে নামলুম, অথচ একটাও পিরামিড দেখা হলো না?’

 ছোটোমামু হেসে ফেলে সারার মাথায় হাত বুলোয়—’দূর পাগলি, অমন করে কি পিরামিড দেখা হয়? সে অনেক দূরে, মরুভূমির মধ্যে। যেতে দু’ একদিন সময় লাগে। ভাবিস না, আবার কখনো ঠিক এমনি ফট করে কায়রো আসা হয়ে যাবে তোর, পিরামিড দেখতে। এক যাত্রায় কি সবকিছু হয়? এবারে কেবল ফ্রান্স!’ এয়ারপোর্টেই একটা মস্ত পাথরের মূর্তি আছে ‘রামেসিস—২’ নামে এক রাজার। রাজার কি সুন্দর চৌকো লম্বাটে পরিষ্কার আঁচড়ানো দাড়িটা। সারা তাঁর প্রায় হাঁটুর কাছাকাছি।

—’জানিস, এসব মূর্তিগুলো আসলে যেখানে পাওয়া গেছে, নীলনদের অসওয়ান বাঁধের প্রবল জলের তোড়ে এখন ডুবে গিয়েছে সেই আবু সিমবেল। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অসমান্য স্মৃতিচিহ্ন!’ ভীষণ দুঃখ করে বলে ছোটোমামু।—’মূর্তিগুলোকে অবশ্য বাঁচিয়েছে। তুলে রেখেছে মিউজিয়ামে। কিন্তু বাঁচাতে পারেনি শহরটাকে। একেবারেই আমাদের দেশের নাগার্জুন—কুণ্ডের বাঁধের ব্যাপারটা আর কি। অমন প্রাচীন একটা ফিফথ সেঞ্চুরির শহর, আর ঘর—দোর নর্দমা—নালা, সমস্ত বাঁধের জলে ডুবে গেল, অতবড় সিঁড়িগুলো পর্যন্ত! কতটুকুই—বা তোলা আছে যাদুঘরে? কিন্তু উপায় ছিল না—অতীতের মুখ চেয়ে তো ভবিষ্যৎকে বলি দেওয়া যায় না—’, অন্যমনস্কভাবে ছোটোমামু যেন নিজেই নিজেকে কৈফিয়ত দিতে থাকে। এমন সময় সারা লক্ষ করল তিনজন মানুষকে। একটি মেয়ে, দুটি পুরুষ। অদ্ভুত তাদের সাজ—পোশাক। মেয়েটির পরনে কয়েক পরত মোটা ঢোল্লা নানারঙের ঘাঘরা, বড় গলা সাদা ঘটিহাতা ব্লাউজ, মাথায় একটা রঙচঙে রুমাল বাঁধা, তার তলা দিয়ে দুটো লম্বা কালো বিনুনী ঝুলছে বুকের ওপর, কানে ইয়া বড় বড় দুটো রুপোর চাকার মতো মাকড়ি, হাতে অনেক গোছা চুড়ি, গলায় নেপালীদের মতো অনেকগুলো পুঁতির মালা। সঙ্গের লোকদুটির পরনে ঢোলা কালো গরম কাপড়ের পাজামা, সাদা শার্টের ওপরে লাল—সবুজ জহর কোট, কানে ছোটো ছোটো মাকড়ি, মাথায় কাশ্মীরীদের মতো গোলগোল টুপি। হাতের পাতায় উলকি। একজনের হাতে একট ম্যান্ডোলিন, অন্যজনের হাতে আর একটা মজার বাদ্যযন্ত্র, গোল একটা টিনের চালুনির মতো দেখতে, তার গায়ে গায়ে ঘুঙুর লাগানো। প্রত্যেকের কাঁধেই আমাদের দেশের শান্তিনিকেতনী ঝুলির মতো ঝোলা। তাদের গায়ের রঙ লালচে বাদামী, কালো চোখ, সোজা সোজা চুল—চেহারার মধ্যে কেমন একটা অন্যরকম ভাব আছে।—ঠিক সাহেব—সাহেবও নয়, আবার ঠিক দিশি—দিশিও নয়। ছোটোমামু সারার চোখমুখ দেখেই বুঝে নেয় ওর মনের কথাটা কী—এবং উত্তরও দিয়ে দেয়।

—’ওরা জিপসী। আমাদের দেশের বেদে—বেদেনীর মতন। দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায় ক্যারাভান নিয়ে। কোথাও ওদের স্থির ঠাঁই নেই। নৃতত্ত্ব বিজ্ঞানে বলে ওরা নাকি ভারতবর্ষেরই মানুষ। ক’হাজার বছর হলো দেশছাড়া হয়ে পথে পথে ঘুরছে। ওদের ভাষায় এখনো অনেক সংস্কৃত কথা আছে। সুনীতিবাবুর একটা প্রবন্ধ দেখেছিলুম, তাতে উনি দেখিয়েছিলেন জিপসীদের ভাষায় বেশ ক’টা বাংলা শব্দও আছে।’

—’ঈশ—তোমার শব্দগুলো মনে নেই? তাহলে ওদের সেগুলো শুনিয়ে দিতে পারতুম? ওরা অবাক হয়ে যেত?’

—’না, ওরা একটুও অবাক হতো না। ওরা তো নিজেদের ভারতীয় বলেই দাবি করে। ভারতবর্ষ অবশ্য ওদের দাবি করতে চায় না। কেননা জাত হিসেবে জিপসীরা ইউরোপে খুব নিন্দেমন্দ কুড়োয়—সবাই ওদের চোরের জাত, জোচ্চোরের জাত বলে গাল দেয়। তারপর ছেলেধরা বলেও ওদের দুর্নাম আছে—যে—জন্য বিলিতি বাচ্চারা ওদের জুজুর মতো ভয় পায়।’

—’কিন্তু ছোটোমামু, আমাদের দেশের বেদেদেরও তো ওইরকম চোর—জোচ্চোর ছেলেধরা বলেই দুর্নাম আছে? সেবার বেদেরা যখন তাঁবু ফেলল পাঠকপাড়ার মাঠে—’

—’তা অবশ্য আছে। আসলে কি জানিস? যাদের চালচুলো নেই, যাযাবর হয়ে ঘুরে বেড়ায়, গেরস্থমানুষে তাদের বিশ্বাস করে না। এই জিপসীরা আবার কীসব মন্ত্রতন্ত্র জাদুটাদু জানে, জ্যোতিষ—টোতিষও জানে—ক্রিস্ট্যালবল দেখে দেখে ভবিষ্যৎ বলে দেয়, ম্যাজিক করে মন্ত্র পড়ে হারানো জিনিস উদ্ধার করে দেয়। এসব কুকম্মো করে কিনা, তাই সব মিলিয়ে যুক্তিবাদী পশ্চিমী মানুষ ওদের ঠিক বিশ্বাস করে না।’

সারারও ওদের খুব একটা ভালো লাগলো না। কেমন কেমন একটা চোখে ওরা তিনজনে মিলে সারাকে দেখছে। প্রায় একদৃষ্টে চেয়ে আছে। সারার ভয় ভয় করলো। সে সরে গেল ছোটোমামুর কোলের কাছে, ডেকে বলল, ‘চলো না, আমরা অন্য দিকে যাই?’ ওরা কেমন করে যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।’—ছোটোমামু হেসে ফেলে—’দূর, তোর দিকে কেমন কেমন করে তাকাবে কেন? যত বোকার মতো চিন্তা।’ একটু পরেই সিকিওরিটি চেকিং—এর জন্য উঠে যেতে হলো, এবার প্লেনে ফিরে যেতে হবে। হাতের ব্যাগগুলো আলাদা একটা মুভিং বেল্টের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে, চেকপোস্টের ইলেকট্রনিক চোখের তলা দিয়ে। মানুষেরা যাবে পাশের গেট দিয়ে। সারা দিব্যি বেরিয়ে এল, ইলেকট্রনিক চোখ ওকে আটকালো না। জিপসীরাও বেরুচ্ছে, এমন সময়ে হঠাৎ অ্যালার্ম ঘণ্টি বেজে উঠল। পুলিশেরা সচেতন হয়ে উঠতেই জিপসী পুরুষটি তাড়াতাড়ি পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে দেয়, এটার জন্যেই পাগলাঘণ্টি বেজে উঠেছে। আরেকবার হেঁটে গেল সে ওই গেটের ভিতর দিয়ে। না, এবারে আর পাগলাঘণ্টি বাজলো না। প্লেন হাইজ্যাকিং হয় বলে এখন এতরকম চেকিংয়ের ব্যবস্থা, সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র থাকলেই ধরা পড়বে। কিন্তু মাঝে মাঝে দড়িকেও সাপ বলে ভুল করে ফেলে ইলেকট্রনিক আই! এই যেমন এখন!

পাসপোর্ট দেখানোর সময়ে হঠাৎ পিছনে একটা ধাক্কা খায় সারা—ওর ঘাড়ের ওপর দিয়ে কে যেন মুখ বাড়াতে চেষ্টা করছিল। পিছন ফিরে সারা দেখতে পেল, দুটো বিনুনী দুলে উঠল, বিরাট মাকড়ি ঝিকিয়ে উঠল, সেই জিপসী মেয়েটা। কিউ ভেঙে গলা জিরাফের মতো লম্বা করে ওর খোলা পাসপোর্টটার মলাট বন্ধ করে ফেলে। ওর সমস্ত মন এক অজানা ভয়ে বুজে আসে, ঐ বন্ধ পাসপোর্টটার মতোই। জিপসীরা কাছাকাছি আসতে পারার আগেই প্রায় ছুটে ছুটে গিয়ে প্লেনে উঠে পড়ে সারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাম্বোজেট মিশরের মাটি ছেড়ে ভূমধ্যসাগরের আকাশে পাড়ি জমায়—প্যারিসের অরলি এয়ারপোর্টের দিকে ডানা মেলে দিয়ে।

তিন : প্যারিসের পথে—ঘাটে

একটা রঙিন ছাতার নিচে বসে বসে শরবৎ খেতে ভীষণ ইচ্ছে করছে সারার। কিন্তু ছোটোমামুর কেবলই তাড়া—’চল চল, আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফ তো দেখে আসি আগে? তারপরে বসবি।’ শাঁজেলিজে দিয়ে হাঁটছে ওরা, এটা একটা বিরাট চওড়া রাস্তা, মাঝখানে সবুজ ঘাস, ফুটপাতের ওপরে দুপাশেই রঙিন ছাতা পেতে রেস্তরাঁ, কাফে। সুন্দর কালো পোশাক পরা ওয়েটার—ওয়েট্রেসরা সেখানে নানারকম সুদৃশ্য খাদ্য—পানীয় এনে দিচ্ছে টেবিলে—টেবিলে। দারুণ দামী আতর মেখে, পরম ফ্যশানেবল সব সাহেব—মেমেরা সেসব টেবিলে বসে আছে। তাদের দেখে মনে হয়, সেজেগুজে দোকানে বসে শরবৎ খাওয়া ছাড়া ওদের বিশ্বভুবনে আর কোনো কাজ থাকতে পারে না। এই রাস্তার প্রান্তে তোরণটি দেখেই দেখেই সারা চিনতে পারলো—ঠিক বম্বের ‘গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া’র মতো।—’ঐ যে ছোটোমামু। আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফ। নয়াদিল্লিতে তো আছে একটা, রাজপথের ঠিক মাঝখানে।’—সেটাও সদ্য দেখে এসেছে সারা।

—’এই জায়গাটা নাম ”এতোয়াল”, মানে তারা, বুঝলি? কেননা ছ’টা রাস্তা এখানে এসে মিলে গিয়েছে ঠিক তারার মতো, ছ’কোণ থেকে—’, ছোটোমামু গাইড বই দেখে বক্তৃতা দিচ্ছিল, সারা হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে একধাক্কা মারলো—’ঐ দ্যাখো ছোটোমামু—’, এক জায়গায় ফুটপাতে একজন জিপসী পুরুষ ম্যাণ্ডোলিন বাজিয়ে গান গাইছে—অন্য বাদ্যযন্ত্রটায় চাঁটি মেরে ঝুমঝুম করে তাল দিচ্ছে মেয়েটি, আর সামনে দিয়ে যখনই কেউ যাচ্ছে, বাজনাটাকেই পেতে ধরছে থালার মতো করে! তারপর পয়সাটা এপ্রনের পকেটে পুরে আবার তাল দিচ্ছে। কিন্তু এদের চোখ সারার দিকে। সারার ভয় দেখে ছোটোমামু হেসে উঠল।

—’দূর! ওরা ওদের কাজ করছে—শুধু শুধু ভয় পাস না। সাধে বাঙালিদের বলেছে, ‘ভিতুর জাত? তার চেয়ে বল দেখিনি ওর হাতের বাজনাটার নাম কী?’ সারা ভয়ে ভয়ে বলে—’ব্যাঞ্জো?’

‘হলো না! হলো না! ট্যাম্বুরিন! বোকা, ট্যাম্বুরিন!’ ছোটোমামু চেঁচিয়ে ওঠে, আর সারা লজ্জা পেয়ে যায়।

ইফেল টাওয়ারে গিয়ে সারা আর ছোটোমামু হেঁটে—হেঁটে উঠবে ঠিক করল। হেঁটে হেঁটে ছুটে ছুটে দুজনে মিলে ঘোরানো লোহার মইসিঁড়ি বেয়ে উঠেছে, এমন সময় ওদের পাশ দিয়ে বহুলোক নিয়ে লিফটটা উঠে গেল। একনজর তাকিয়েই সারার মনে হলো যেন সেই মাকড়ির ঝিকিমিকি—কিন্তু ছোটোমামুকে বলবার সাহস হলো না, দোতলায় পৌঁছে দ্যাখে টেবিল—চেয়ারে বসে বসে তিনজন জিপসী স্ট্র দিয়ে কোকাকোলা খাচ্ছে। সারাকে দেখেই সেই তিনজনের মুণ্ডু একত্র হয়ে গেল, কী যেন ফিসফিস শুরু করল ওরা।

—’এবার দেখছো?’ সারা বললো।

—’দেখছি!’

—’ফিসফিস করছে, কি করছে না?’

—’কী বলছো?’

—’বলছে—”ওরে বাবারে! দেখেছিস—ঐ যে, সেই মেয়েটা! এখানেও তাড়া করে এসেছে।” আমরাও যেমন ওদের দেখে ভয় পাচ্ছি, ওরাও বোধহয় আমাদের দেখে তেমনিই—’, বলতে বলতেই সারা ছোটোমামুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে হেসে ফেলে।

সেদিন বিকেলে নতরদামের গির্জেয় বিশাল ঘণ্টাটার দিকে চেয়ে চেয়ে সারার ভীষণ মন কেমন করতে লাগলো কোয়সিমোদোর জন্যে। আহা বেচারি হাঞ্চব্যাক অফ নতরদাম! সেখানেও কয়েকবার এদিক—ওদিক চেয়ে কাদের যেন খুঁজলো সারা—কিন্তু, না, ওরা নেই। ছোটোমামু গাইডবই খুলে বললে—’ঐ দ্যাখ, ঐ যে দেখেছিস গোল গোল রঙিন কাচের জানালা, ঐ হচ্ছে নতরদামের বিখ্যাত লোটাস উইনডো—’, সারা সেদিকে তাকিয়ে জিপসীদের কথা ভুলে গেল।

লুভর মিউজিয়াম গিয়ে ছোটোমামু যেন পাগল হয়ে গেছে! দু’দিন ধরে শহরময় হেঁটে হেঁটে সারার পা ব্যথা হয়ে গেল। ছোটোমামুর যেন লুভরে এসে বেশি বেশি হাঁটাহাঁটি শুরু হয়েছে। সারাদিন ধরে ঘুরে ঘুরে কেবলই ছবি দেখছে, আর মূর্তি দেখছে আর সারাকে ধরে ধরে সব বোঝাচ্ছে, দেখাচ্ছে। লুভরেই আরো দু’দিন কাটলো সারার—কিন্তু যে ছবিটা দেখতে তার সবচেয়ে উৎসাহ, সেটা তখনো দেখলই না ছোটোমামু। বললেই বলে—’ওঃ ওটা? হবে, হবে।’ শেষপর্যন্ত একসময়ে মোনালিসার সামনে এসে দাঁড়ালো। মোনালিসার সামনে সর্বদাই ভিড়। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা সেই বিখ্যাত ছবি—তুমি যেদিকেই যাও, যেদিক থেকেই তাকাও, দেখবে মোনালিসা তোমার দিকেই তাকিয়ে মৃদুমৃদু হাসছে। এই হাসির রহস্যময় তাকানো নিয়ে কত ব্যাখ্যা, কত গল্প! সারা দেখছে—হঠাৎ দেখলো ভিড়ের মধ্যে দুটো পাশাপাশি মাথা—তাতে রুমাল বাঁধা। অমনি সে ছুটে গিয়ে ছোটোমামুকে বললো—’চলো ছোটোমামু, চলে যাই—ঐ যে আবার ওরা।’ ছোটোমামু বললে—’আরে ওরাও তো প্যারিস ঘুরতেই এসেছে। আমরাও যে—সব দ্রষ্টব্যস্থানে যাচিছ, ওরাও সেইখানেই যাচ্ছে। এতে অবাক হবার কী আছে?’ কথাটা এতই স্বাভাবিক আর যুক্তিসঙ্গত, যে সারা এবার সত্যি সত্যি লজ্জা পেয়ে গেল। তারপর প্লাস দ্য লা কংকর্দে আইসক্রীম কোণ চুষতে চুষতে ঘুরে বেড়ালো নির্ভয়ে—মঁমার্তের শিল্পীঠাসা ফুটপাথে ছবি দেখতে দেখতে ঘুরলো—ক্রেপ সুজেৎ খেতে খেতে। সরুচাকলিতে মাখন—চিনি মাখানো, দারুণ খেতে কিন্তু ক্রেপ সুজেৎ! তারপরেই দেখা হয়ে গেল।

—স্যেন নদীর ধারে ঘুরতে ঘুরতে। ছোটোমামু তো বইয়ের দোকান ছেড়ে নড়বে না। স্যেন নদীর বাঁ—পাড়ে ফ্রান্সের যত কবি—লেখকদের আড্ডা। —’বুলভার সাঁ মিশেল, বুলভার সাঁ—জারম্যান এইসব কাফেতে সার্ত্রের মতো বুদ্ধিজীবীরাও আড্ডা দেন, বুঝলি?’ ছোটোমামু ভক্তিভরে বলে। আর উৎসাহে জ্বলতে থাকে ফুলঝুরির মতো। মঁমার্তে যেমন ফুটপাত ভর্তি নোংরা পোশাকপরা দাড়িওয়ালা যত কবি, সাহিত্যিক আর ছাত্রছাত্রী, এই পাড়াটা শাঁজেলিজের ঠিক যেন উলটো।

ছোটোমামু বেশ দূরে ছিল—আপন মনে দোকানে দাঁড়িয়ে বই পড়ছে, সারা ঘুরে ঘুরে দোকানে দোকানে ঝোলানো ছবিগুলো দেখছে, রঙিন পোস্টকার্ড কিনছে। একটা মোড় ঘুরতেই হঠাৎ জিপসী মেয়েটা আবির্ভূত হয়ে কাছে এসে ওকেই ডেকে কিছু বললো—সারা কিছুই বুঝতে পারল না।— কেবল ‘সারা’—এই শব্দটা ছাড়া। অমনি সারা পড়ি—কি—মরি করে পেল্লায় এক দৌড় লাগিয়ে ছোটোমামুর কাছে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—’ছোটোমামু! জিপসী মেয়েটা—আমার নাম জানে। স্পষ্ট ডাকলো ”সারা”—’, ছোটোমামু চমকে উঠে বই নামিয়ে পিছনে তাকালো। চোখ দিয়ে দুজনেই অনেক খুঁজলো,—জিপসীদের কিন্তু আর দেখা গেল না।

চার : মূর্তি এবং মূর্তি

‘মেট্রো’তে চেপে সোজা গার দ্য লিয়ঁ স্টেশনে এসে ছোটোমামু আর সারা ট্রেনে উঠলো। প্যারিসের এই ‘ মেট্রো’তে চাপতে সবার ভয়ানক ভালো লাগছে—কী সুন্দর মাটির নীচ দিয়ে দুপদুপিয়ে ট্রেন ছুটে যাচ্ছে, অথচ মাটির ওপরে দ্যাখো—দিব্যি রাস্তাটাস্তা, গাড়িঘোড়া, বাড়িটাড়ি, লোকজন,—সব যেমনকে তেমনি। মাটির নিচে দিয়ে যে এত কাণ্ড হয়ে যাচ্ছে, তার কিছু বোঝা যায় না! কলকাতাতেও তৈরি হচ্ছে ভূগর্ভ—রেল; তৈরি হয়ে গেলে নিশ্চয়ই এই ‘মেট্রো’র মতোই হবে। ‘মেট্রো’ যখন প্রথম তৈরি হচ্ছিল, প্যারিসের লোকেদেরও নিশ্চয় তখন ঠিক কলকাতার লোকদের মতোই ঝঞ্ঝাট গেছে! এইসব ভাবতে ভাবতে সারা ছোটোমামুর পেছন পেছন এসে একটা কামরায় ঢুকল। এটাকে বলে কুশেৎ—শোবার কামরা। অনেকটা দেশের কূপের মতোই, কেবল দুজনের বদলে ছ’জন (!) যাত্রী তাতে। বিছানা—টিছানা ওরাই দিয়েছে—কম্বল, বালিশ, চাদর—সব প্লাস্টিকের খামে মোড়া।—’দেখেছিস? কী স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা? মহানন্দে সেলোফেনের থলি ছিঁড়তে ছিঁড়তে ছোটোমামা বলে—’সভ্যদেশে এসেছিস, সেটা বলে দিতে হবে না।’ দুটি বার্থে বিছানা পেতে শুয়ে পড়ল দুজনে। উল্টোদিকে দুটি ফরাসী মেয়ে, একটি ছোটো ছেলে, আর একটা বাস্কেটের ভেতর থেকে অসহায়ভাবে চেয়ে আছে সাদা রেশমের মতো একটি লাল—চোখো কুকুর। বাস্কেটের ভেতরে কুকুর দেখে সারার প্রথমে খুব মজা লাগলেও তারপরে কেবলই মনে হতে লাগলো, ‘আহা! ওর কত কষ্ট হচ্ছে। কেন ওকে ছেড়ে দিচ্ছে না!’ কিন্তু ছেড়েও তো দেওয়া সত্যি সত্যি সম্ভব নয়। এইরকমভাবে ধরে—বেঁধে ওকে যে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, বেচারি কুকুর তা জানেও না। ও কী—বা বোঝে, কোনটা মার্সেই, কোনটা এইক্স, কোনটা আভিনিয়ঁ? ঈশ, কোনো মানুষকে যদি অমনিভাবে বন্ধ করে নিয়ে যেত কেউ? ভাবতেই হঠাৎ জিপসীগুলোর কথা মনে পড়ে গেল সারার! —’বাব্বাঃ—বাঁচা গেল। প্যারিস ছেড়ে পালাচ্ছি! কাল সকালে মার্সেই শহরে পৌঁছে যাবো,’ সারা মনে মনে ভাবে,—’আরা তোমরা আমাকে খুঁজে পাবে না।’ এক সময়ে কামরার আলো নিবে যায়; শরীর ভরা ক্লান্তি, আর প্যারিসের পথে পথে ঘোরার উত্তেজনা নিয়ে সারা ঘুমিয়ে পড়ে। আর মাথার ওপরের বার্থে ছোটোমামু নাক ফুরফুরিয়ে গান গায়।

সকালবেলায় মার্সেই শহরে নেমে, স্টেশন থেকে বেরিয়ে দ্যাখে সামনেই বিপুল এক সিঁড়ি নেমে গেছে। অনেক নিচে রাস্তাঘাট, ঘরদোর, দোকানপাট। কী রাজকীয় সিঁড়ি! তার দু’পাশে বিশাল কয়েকটি মূর্তি—একটা মূর্তিতে দেখা যাচ্ছে একটি মেয়ে, হাতে ত্রিশূল। নৌকোয় বসে আছে রানীর মতো—নিচে লেখা—

‘বন্দর মার্সেই—প্রাচ্যের তোরণদ্বার!’ অন্য পাশে, আরেকটি মূর্তিতে লেখা, ‘গ্রীসের উপনিবেশ’! নিচে বাঁদিকের মূর্তিটি সুন্দরী একটি আফ্রিকান মেয়ের, তার পায়ের কাছে দুটি শিশু, প্রচুর ফল নিয়ে শুয়ে শুয়ে খেলছে—তার নিচে লেখা, ‘আফ্রিকার উপনিবেশ’!—আর দক্ষিণ দিকে একটি চীনে চেহারার মেয়ের মূর্তি, ঠিক একই ভঙ্গিতে—তার নিচে লেখা—’এশিয়ার’—

এমন সময়ে ভীষণ চমকে ওঠে সারা। মূর্তির পিছন থেকে বেরিয়ে এসেছে আরো তিনটি মূর্তি। হতে বাজনা, কাঁধে ঝোলা, কানে মাকড়ি, মুখে হাসি।

—’ছোটোমামু!’ বিকৃত গলায় চেঁচিয়ে ওঠে সারা—ভীষণ ভয় পেয়ে। কই—কোথায় ছোটোমামু?—’কি রে, কী হলো?’ ছোটোমামু উত্তর দেয় খুব কাছেই। আরেকটা ছোট ব্রোঞ্জের মূর্তির পিছন থেকে বেরিয়ে আসে সে—চোখ অন্যমনস্ক—হাতে গাইডবই। সারার ভয়ার্ত দৃষ্টি অনুসরণ করেই দেখতে পায়।—জিপসীরা তখন সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাচ্ছে রাস্তার দিকে। ছোটোমামু সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বলে—’সত্যিই আশ্চর্য!’

হঠাৎ ভীষণ ভয়ে সারার শরীরটা কেঁপে ওঠে, ঠিক শীত করার মতো। কিন্তু সারা মুখে কিছু বলে না। সে বুঝতে পেরেছে এতদিনে ছোটোমামুরও একটুখানি খটকা বেধেছে। আর সেটা বুঝেই তার নিজের ভয়টা হঠাৎ তিনগুণ বেড়ে গেছে যেন।

—’আমি আর শ্যাতো দ’ইফ দেখতে যাব না ছোটোমামু, তুমি আজই এইক্সে চলো, আমার ভয় করছে।’

—’সে কি রে? কাউন্ট অফ মন্টিক্রিস্টোর দ্বীপটা দেখবি না? মাত্র একটুখানি দূরে, এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়।’

—’তাহলে এখান থেকেই দেখে যাই চলো, দ্বীপে—টিপে আর যেতে হবে না—আমার এখন যে একটুও ভালো লাগছে না।’

পাঁচ : পোপের প্রাসাদে

জোরজার করে সেদিনই এইক্স অঁ প্রভন্সে পালিয়ে এল সারা। সেখান থেকে আভিনিয়ঁ যাবে, আর্ল যাবে, নিস যাবে,—কৎ দ’আজুর যাবে—(বিলেতে যাকে ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা বলে)—ছোটোমামুর লম্বা লিস্টি, চওড়া প্ল্যান। আর তো ন’দশ দিন মাত্র হাতে, তার মধ্যে ওকে কত কী যে দেখাতে হবে! ভ্যান গগের প্রকৃতি, সেজানের শহর, আলফঁস দোদের উইণ্ডমিল, এমিল জোলার কাফে, আলব্যের কাম্যুর কবর, উঃ!

ছোটোমামুর লিস্টি খুব লম্বা। লরা—পেত্রার্কের ভোক্লুজ গ্রাম দেখা চাই—দেখতেই হবে আভিনিয়ঁতে পোপের প্রাসাদ আর পঁ দ আভিনিয়ঁ, আর্লের রোমান অবশেষ, দান্তের হেলভ্যালি, লে—বো গ্রাম। —কী করে যে এতসব হবে এই ক’দিনে! কিন্তু সব আনন্দ নষ্ট করে দিচ্ছে ভয়। কী যে আছে ওই জিপসীদের মনে!

কেন ঘুরছে ওরা সারার পিছু পিছু? নিশ্চয়ই ওর পিছু পিছুই এসেছে মার্সেইতে—কী করে বুঝতে পারছে ওরা ছোটোমামুর প্ল্যান? কী চায় ওরা? ছেলেধরা হলেও, সারাকে ধরে ওদের লাভ কি? সারার বাবা তো বড়লোক নন, দাদুও বড়লোক নন। ওদের নিশ্চয় সে খবর জানা নেই। বাবা বলেছেন এককালে নাকি ইউরোপের সবাই পথেঘাটে ভারতীয় দেখলেই কোনো রাজা—মহারাজা বলে ধরে নিতো। এই জিপসীরা সেরকম কোনো ভুল করছে না তো? কী যে করবে সারা!

বেচারী সারা খুব একটা রহস্য—রোমাঞ্চের গল্প পর্যন্ত পড়তে ভালোবাসে না। বেশি উত্তেজনা তার স্বভাবে সয় না। আর তারই জীবনে কিনা জিপসী ছেলেধরাদের রহস্যময় আবির্ভাব ঘটল?

আভিনিয়ঁতে পৌঁছে প্রথমেই আভিনিঁয়র সেতুটি দেখা গেল, রোন নদীর বুকে। ছোটোমামু ফরাসী নার্সারি রাইমের সেই গানটি শিখিয়েছিল সারাকে—’স্যুর ল্য পঁ দাভিনিয়োঁ। লঁ নি দাঁস’ তুত ল্য মোঁদ’—’আভিনিয়ঁর সেতুর ওপরে সারা পৃথিবী নাচছে।’—কিন্তু দেখা গেল কার্যত সেটা অসম্ভব। কেননা সেতুটা আধখানা ভাঙা এবং বেশ সরু।

একটু দমে—গেলেও বেশি দমে না ছোটোমামু।

—’যাকগে, পোপের প্যালেসটা দেখবি চল, সে একেবারে দা—রুণ ব্যাপার!’

সত্যিই দারুণ ব্যাপার। পোপের প্রাসাদের বিরাট হলঘর আর ছোটো—বড় পুজোর ঘরগুলোয় তত উৎসাহ না পেলেও ছোটো ঘরগুলি ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে যায় সারা। উঃ! কী প্রকাণ্ড একটা চিমনি পোপের খাস রান্নাঘরে! যেন একটা আস্ত ষাঁড়, ঘোড়া, উটপাখি? কতজনের রান্না? পোপের শোবার ঘরে ঢুকে লুকিয়ে লুকিয়ে পা ঘষে নেয় সারা। ঘরটার মেঝেয় কী চমৎকার রংচঙে সেরামিকের টালি বসানো। দেয়াল কাঠের। তাতে আবার গোলাপী রঙের পর্দার সারি আঁকা! আঁকা পর্দাগুলো দেখে ভীষণ হাসি পেয়ে যায় সারার! কি আশ্চর্য! এমন বড়লোক পোপ—মশাইয়ের সত্যিকারের পর্দা টাঙানোর ক্ষমতা ছিল না? পাড়ার থিয়েটারের সিনারিওর মতো এঁকে রেখেছেন? পাশের ঘরটা পোপের স্টাডি। সেই ঘরটা সবচেয়ে সুন্দর। দেয়াল—জোড়া কেবল ছবি আর ছবি। বাগানে ছবি, সেখানে শত শত রকমের পাখি! একটা ফোয়ার আর চৌবাচ্চার ছবি, তাতে কতরকমেরই যে মাছ আর জলচর প্রাণী! একটা ঘন বনের ছবি—সেখানে কুকুর নিয়ে শিকারীরা ছুটছে! এক জায়গায় কিছু মেয়ে স্নানে যাচ্ছে।

ঘরের দেয়ালের গায়ে তিনদিকে তিনটে মস্ত মস্ত কারুকার্য করা কাঠের সিন্দুক রাখা। কী থাকতো ওতে? বই? ছবিগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ সামনের জানালার কাচে একটা ছায়া ভেসে ওঠে। দুটো রুমাল বাঁধা মাথার। হঠাৎ কী যে হয়ে যায় সারার বুকের মধ্যে। এখানেও! হে ভগবান—এখানেও? ছোটোমামু এ—ঘরে নেই— কোন ঘরে কে জানে—এ—ঘরে এখন কেউই নেই, সারা একা। জ্ঞানগম্যি হারিয়ে সারা সামনের সিন্দুকটার ডালা তুলে ঢুকে বসে পড়ে।

প্রথমে ঘন ঘোর অন্ধকার। তারপর একটা ফুটো দেখা যায়। সম্ভবত চাবির ফুটো। বেশ বড় ফুটো—এক চোখ বন্ধ করে তার ভেতর দিয়ে সারা দেখতে পায় দু’জন জিপসী এ—দরজা দিয়ে ঢুকে ও—দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল কী যেন খুঁজতে খুঁজতে। একবার চেয়ে দেখলও না ঘরের দেয়ালভর্তি ছবিগুলোর দিকে। বুকের ধড়ফড়ানি কমে এলেও সারা বেরুতে পাচ্ছিল না—হঠাৎ দেখে ছোটোমামু হন্তদন্ত হয়ে ঢুকছে, চোখে উদভ্রান্ত দৃষ্টি। নির্ঘাৎ জিপসীদের দেখতে পেয়েছে। সেই দেখেই ছোটোমামুর টনক নড়েছে। আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে সারা। ‘এই যে আমি ছোটোমামু!’—কিন্তু একি, ছোটোমামু খুব রেগে গেছে যে!

—’তুমি কি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে আছ সারা, যে সিন্দুকের মধ্যে ঢুকে আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছো? আমি এদিকে তোমাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান!’ অভিমানে চোখে জল এসে যায় সারার। সে কিছুই বলে না।

—’চলো চলো, সবাই ওদিকে প্রেয়ার হল দেখতে চলে গেল’—ছোটোমামু এবার হাতটা মুঠোয় ধরে ছোটে—সারা রেগে গেলেও, হাত ছাড়িয়ে নিল না। একটু বরং নিশ্চিন্তই লাগে তার।

ছয় : পাতালপুরীর গোলোকধাঁধা

—’আবে দ্য মঁমাজুর। দুভাগে তৈরি, দুই যুগে। ১২ শতাব্দীতে একবার, আবার ১৭ শতাব্দীতে একবার। এখানে—’, মিশলাঁ গাইডবই দেখে ফরাসি থেকে অনুবাদ করে করে সারাকে বোঝাচ্ছে ছোটোমামু। ঘুরে ঘুরে দেখছে দুজনে মিলে। সারার খুব ভালো লাগছে পুরোনো ভাঙাভাঙা গির্জাটার মধ্যে ঘুরে বেড়াতে। ছোটোমামুর বক্তৃতা সে মাঝে মাঝে শুনছে, মাঝে মাঝে শুনছে না। ভাঙা পাথরের গায়ে একটা মস্ত ফাটলে কয়েকটা সবুজ ঘাস, আর একটা সাদা—হলুদ ছোট্ট ঘাসফুল। কী সুন্দর! বাইরে বেরিয়ে এসেছে সারা। —আবে দ্য মঁমাজুরের পিছন দিকে, অনেক ভাঙা ভাঙা পাথরের সিঁড়ির ধাপ, পাথরের কড়ি—বরগা, ঘাসের ওপরে ছড়িয়ে আছে। তুর্কীরা এসে ভেঙে দিয়েছিল বোধহয়। এই অঞ্চলে যেদিকে তাকাও, পাহাড়ের মাথায় মাথায় ছোটো ছোটো কেল্লায় আর প্রাসাদে ভরা। সবই মধ্যযুগের কেল্লা, কিছু তুর্কীদের, কিছু ফরাসী—ভাঙা ভাঙা স্মৃতিচিহ্ন পুরোনো ইতিহাসের। কেমন স্বপ্নপুরীর মতো মনে হয়। কত যুদ্ধ, কত শত্রুতা,—সারা যতই গল্পগুলো শুনছে ততই মুষড়ে পড়ছে। হয় ক্যাথলিকদের কেল্লা জ্বালিয়ে দিয়েছে তুর্কীরা, না হলে প্রটেস্টান্টদের গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে ক্যাথলিকরা। মানুষ কি মানুষকে কেবল কষ্টই দেয়? ইতিহাস কি কেবলই হত্যার, ধ্বংসের কাহিনী? ভেবে সারার মন খারাপ লাগে। একটা ছোট গলিপথ গির্জের তলার দিকে নেমে গেছে সামনেই! কী ওখানে? সারা পায়ে পায়ে নেমে দেখতে পায়। পথটা সুড়ঙ্গ হয়ে মাটির নিচের দিকে ঢুকে গেছে, ইলেকট্রিক আলো জ্বলছে, ভয়ের কিছু নেই। ‘—ও, বুঝেছি, এটাই হলো ভিত্তিটা।’ সারা মনে মনে বলে। ছোটোমামু একটু আগেই বুঝিয়েছে, পাহাড়ের ওপরে তৈরি বলে এই গির্জের মেঝেটাকে সমতল করে নেবার জন্যে প্রথমে যে ভিত্তিটা গাঁথা হয়, তার ফলে পুরো একটা তলাই থেকে গেছে মাটির নিচে। সেখানেও একটা গির্জে আছে। আর আছে কবর। মধ্যযুগের যেসব সন্ন্যাসীরা প্রথমে এখানে থাকতেন, তাঁদের কবরগুলো আছে ওখানে। গলিটাকে যেন কেউ গড়িয়ে দিয়েছে নিচের দিকে—আস্তে হাঁটাই যায় না; আপনা আপনিই প্রায় ছুটতে শুরু করেছে সারা, কখন যেন। যেখানে এসে থামলো, সেখানে আর বিজলী আলো নেই। উঁচু একটা জানালা থেকে অল্প আলো এসে পড়ছে। জানালাটা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঘাস, ঝোপ—ঝাড়, মাটি, পাথর। আকাশ প্রায় দেখাই যায় না। সামনেই একটা গোল ঘর। তার মধ্যে একটি কবর। গোল ঘরটি ঘিরে চারিদিকে সূর্যের ছটার মতো ঘর, প্রত্যেকটিতে একটি করে কবর। আর ওপরে একটি করে ছোট্ট জানলা। এতগুলো কবরের মধ্যে এসে পড়ে কেমন যেন গা ছমছম করতে থাকে সারার। শুধু ঘরই নয়, গলিও বেরিয়েছে চারদিকে চারটি। ক্রুশচিহ্নের মতো! কোনটা দিয়েই বা এসেছে সে? সারা তাড়াতাড়ি একটি গলি দিয়ে ছুটতে থাকে, এটা ওপর দিকে উঠছে। কিছুদূর গিয়ে গলিটা ক্রমশই আরো অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে দেখে সারা থমকে দাঁড়ায়। এটা নয়। সেটাতে তো বিজলী বাতি জ্বলছিল। দৌড়ে দৌড়ে আবার মধ্যিখানে ফিরে আসে। তারপর আরেকটা গলি ধরে ছোটে। এ—গলিটা ক্রমশ যে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে! না? পা যেন টেনে নিচ্ছে। আপনা আপনি ছুটে যাচ্ছে নিচের দিকে সারা। সারা থামতে চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। হঠাৎ দ্যাখে দেয়ালের দু’ধারে ছোটো ছোটো খোপ—খোপ কামরা, তার ভেতর তাক তৈরি করা। সেইসব তাকে একের পর এক পাথরের কফিন ঠাসা। একটা মোটে মোমবাতি মৃদু জ্বলছে, গলিটা এখানে তিনভাগে ভাগ হয়ে গেছে—তিনটে রাস্তায়। প্রতি রাস্তার ধারে ধারে খোপ—খোপ কেটে কফিনের কুলঙ্গি। ও কি? দেয়ালের গায়ে ওটা কি কাঁপছে—কী ওটা? সারা শিউরে ওঠে। ছায়া! কিসের ছায়া? ওঃ, সারার নিজেরই। কাঁপা কাঁপা মোমবাতির শিখায় ছোটো বড় হচ্ছে। চলন্ত ছায়া। পাতালপুরীর কবরখানাতে এসে পড়েছে—এখন পালানোর উপায় কি? পিছন ফিরে ছুটে ছুটে ওপরে উঠতে থাকে সারা। কী ঠাণ্ডা এখানটা! আর কী ঘন অন্ধকার! ছুটতে ছুটতে এক সময়ে সারা বুঝতে পারে, সে হারিয়ে গেছে। সেই মাঝখানের ঘরটাতে এসে পৌঁছুনো যাচ্ছে না আর—’ছো—টো—মা—মু—উ’—বলে ডুকরে কেঁদে ওঠে সারা।—’মু—উ—উ—উ—উ’ করে প্রতিধ্বনি ফিরে আসে। সারার ভীষণ ভয় করে। এইসব কবর থেকে যদি এখন মৃতদেহগুলি উঠে আসে?

আর ভূত যদি নাও থাকে, তবুও আর যদি কেউ কোনোদিনও তাঁকে খুঁজেই না পায়? পৃথিবীতে কেউ হয়তো জানেই না যে এখানে এমন একটা জায়গা আছে! না, তা হতে পারে না। কেউ নিশ্চয়ই জানে। ওখানে ঐ মোমবাতিটা যে জ্বেলে দিয়ে গেছে অন্তত সে তো জানে? সে নিশ্চয় আবার আসবে?

কিন্তু এই গহন অন্ধকারে মাটির নিচের কবরখানায় যদি সে একবছর বাদে—বাদে ফেরে? ততদিনে শীতে, ভয়ে, খিদেয়, তেষ্টায় ও মনের কষ্টে কবেই তো মরে ভূত হয়ে যাবে সারা! আচ্ছা সত্যিসত্যি কি ছোটোমামু তাকে খুঁজে পাবে না? এত শক্ত শক্ত ধাঁধার উত্তর বের করতে পারে, আর এইটুকুনি পারবে না? ঠিক পারবে। কোথা থেকে একটা ঠাণ্ডা হিমবাতাস বইছে হু হু করে। কিন্তু যদি ছোটোমামুও এর মধ্যে ঢুকে পড়ে সারার মতোই হারিয়ে যায়? আর যদি দুজনের কেউই ফিরে না যেতে পারে কোনোদিনও সাতের দুই বাই—সি বসন্ত মল্লিক লেনের বাড়িতে? চোখ জ্বালা করে কান্না এসে যায় সারার। ছোটোমামু ওকে না পেয়ে কত খুঁজবে… দাদু—দিম্মা—মা—বাবা—মহারাজ—ঠাম্মা—পিসি— বড়মামু—ছোটোমামু, সেজদি, ন’দি, ইস্কুলের বন্ধুরা, টুনু, বেলা…মুখগুলো সব সিনেমার ছবির মতো সামনে দিয়ে ভেসে যেতে থাকে—আর কি কোনোদিনও এই মুখগুলো দেখতে পাবে না সে? জীবনে কোনোদিনও না? বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে সারার। কলকাতায় বেচারি মা হয়তো এখন ওর কথাই গল্প করছেন, হয়তো ছোড়দি এখন…’ও…মা…গো’ বলে সারা ডুকরে কেঁদে ওঠে। তক্ষুনি মোড় ঘুরে একটা আলোর ফলক এসে পড়ল দেয়ালে। কে যেন ডাকছে ‘সা—রা!’

‘—সা—রা!’ ওকি? ছোটোমামু তো নয়? এ তো মেয়ের গলা মনে হচ্ছে। সারা কান খাড়া করে শোনে—চোখে অন্ধকারের ঢেউ—এক ঝলক জ্বলেই আলোটা নিবে গেছে। ‘সারা’—আরেকবার ডাকটা শুনেই কানের মধ্যে হঠাৎ ঝিঁঝিঁপোকার ডাক শুরু হয়ে যায়। মাথার মধ্যে আগুন, চোখে যেন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সারা—কে এসে তার হাত ধরলো—অচেনা ভাষায় কারা সব কী—সব কথা বললো তাকে! সারা কিছুই বুঝল না—শুধু বুঝল একটা জ্যান্ত মানুষের উষ্ণ হাত তার হাতটা ধরেছে, একটা টর্চের আলো তাকে পথ দেখাচ্ছে। আর কতকগুলি মানুষের অচেনা ভাষার আওয়াজ তাকে ঘিরে আছে। এক সময়ে কেউ তাকে পাঁজা—কোলা করে কোলে তুলে নিলো।

সাত : হেলভ্যালির গুহায়

অবশেষে একটা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো সারা চিৎ হওয়া অবস্থায় তারা—ভরা আকাশের নিচে। অন্ধকার হয়ে গেছে। টর্চ জ্বলছে না। অনেকগুলো মানুষ কথা বলতে বলতে একটা গাড়ির দরজা খুলে ধরে সারাকে তার মধ্যে তুলে দেয়। ‘ছোটোমা—মু—উঃ।’ সারা চেঁচাতে শুরু করতেই কে যেন ওর মুখটায় সজোরে রুমাল গুঁজে দিয়ে হাত চেপে ধরলো। সারা কিছু বলতে পারার আগেই গাড়ি চলতে শুরু করে দিল। আপ্রাণ চেষ্টা করেও সারা সে বজ্র—আঁটুনি ছাড়াতে পারল না। খানিকক্ষণ পরেই হাত আলগা করে মুখটা খুলে দিল জিপসীটা। তারপর ঝোলা থেকে একটা লাল টুকটুকে আপেল বের পরে শার্টের হাতায় মুছে সারার হাতে তুলে দিল।

ঠিক সারা যে—ভয়টি পেয়েছিল তাই! এতদিন যে বসেছিলাম পথ চেয়ে আর কাল গুণে—দেখা পেলেন ফাল্গুনে! ধরা পড়েছে ছেলেধরার হাতে! কে জানে এর চেয়ে ভূতের হাতে থাকাটা বেশি ভালো ছিল কিনা! আবার আদর করে আপেল খেতে দেওয়া হচ্ছে! এই আপেলে নিশ্চয় কিছু মেশানো আছে! সারা মোটেই খাবে না। অত বোকা মেয়ে সে নয়। জিপসীটার ঝোলা থেকে আরো কয়েকটা আপেল বের করলো, অন্যদের হাতে দিল, নিজেও একটিতে দাঁত বসালো। দেখেশুনে সারার কেমন মনে হলো, এতে ভয়ের কিছু নেই। সে নিজেও এবার আপেলে কামড় দিয়ে নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখে নিয়ে অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করলো। তার হাত—পা খোলাই আছে। গাড়ির ভেতরটা মস্তবড়। একেই বোধহয় ক্যারাভ্যান ট্রেলর বলে। একদিকে বিছানা পাতা আছে, ওপর—নিচে দুটো বাংকে। প্রত্যেকটা জানলায় পর্দা টানা। অন্যদিকে একটা কল—সমেত বেসিন, একটা ছোট্ট ফ্রিজ, ছোট্ট জালের আলমারি, একটা দেয়াল—আলমারিতে কিছু জামাকাপড় টাঙানো। আছে একটা ইলেকট্রিক উনুন, কিছু ফল—সবজি, বাসন—কোসন। ঈশ—কতদিন ধরেই যে মনে মনে সারার ইচ্ছে ছিল ঠিক এমনি একটা আস্ত চলন্ত ঘরের মধ্যে থাকতে—গাড়ির মধ্যেই যেটা বাড়ি! কী মজা! অথচ এখন দ্যাখো কপাল! সেই ক্যারাভানেই চড়া হয়েছে, কিন্তু কী অবস্থায়! ছেলেধরার পাল্লায়। কে জানে ওরা এখন সারাকে নিয়ে কী করবে। বেচে দেবে? ক্রীতদাসী করে রাখবে? ভিখিরি বানাবে? ছোটোমামুর কাছে টাকাকড়ি দাবি করবে? ভাবতে ভাবতে ভয়ে আর ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে সারার। হঠাৎ একসময়ে ও বুঝতে পারে ওর মাথার নিচে কেউ একটা কুশন গুঁজে দিচ্ছে, গায়ে চাপিয়ে দিচ্ছে একটা কম্বল। কী চায় ওরা? কেন ধরেছে আমাকে? সারা ঘুমের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকে। কিছুতেই ঘুমোলে চলবে না। এই অবস্থায় কেউ ঘুমোয়? জেগে থাকলে তবে কিছু একটা আত্মরক্ষার সুযোগ আছে। কিন্তু সারার বুদ্ধি এবং ইচ্ছের প্রাণপণ বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে এক সময়ে তার চোখদুটো বুজে যায়, গাড়ির দুলুনিতে, ক্লান্তিতে, ভয়ে, উদ্বেগে।

ঘুম ভেঙে সারা দেখলো, সে একটা গাড়ির ভিতরে। তার চারিদিকে কয়েকজন জিপসী বসে বসে মগে করে চা—কফি কিছু একটা খাচ্ছে। সারা উঠতেই জিপসীরা ওকে হাসি মুখে কী যেন বললো। বোধহয় গুডমর্নিং বলছে। সারা উত্তর দিল না। এখনো পর্দা টানা আছে প্রত্যেক জানালায়, কিন্তু তার রঙের উজ্জ্বলতাই বলে দিচ্ছে এখন ভোরবেলা। সূর্য উঠে পড়ল বলে। ছোটোমামু? ছোটোমামুর কী হলো? ছোটোমামু কী ভাবছে? কোথায় এখন ছোটোমামু? আবে—দ্য—মঁমাজুরে ছোটোমামুর সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে মাটির তলায় করবখানার গোলকধাঁধার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল সে। অন্ধকার—ঠাণ্ডা হু হু বাতাস—চারদিকে কবর—মনে পড়তেই ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল সারার। কিন্তু এখন? এখন কী হবে? এখন তো জিপসীদের হাতে বন্দী! সহায়সম্বলহীন বাচ্চা মেয়ে সে, সঙ্গে না আছে তার টাকাপয়সা, না সঙ্গীসাথী। এই গাড়ির জিপসীদের ভাষাও সে জানে না। আবার এই দেশের রাস্তার লোকেদের ভাষাও জানে না। জিপসীদের কী হবে ওকে নিয়ে? সারা দ্যাখে তার লালটুকটুকে ব্যাগটি তার পাশেই রাখা আছে। আস্তে আস্তে সারা হাত বাড়াতে থাকলো সেদিকে। কেউ বাধা তো দিলই না, বরং একজন জিপসী ব্যাগটা এগিয়ে দিল। খুলে দ্যাখে ভেতরে তার রুমাল, চকোলেট, পাসপোর্ট, কলম, নোটবই, আর দশ ফ্রাঙ্কের দুখানা নোট তেমনিই আছে। আর ব্যাগের ভেতর—পকেটে পরীক্ষার সময়ে গুঁজে রাখা সরস্বতীর ফুলটাও। অমনি সারার সেই প্রার্থনাটি মনে পড়ে গেল, যেটা ও প্রত্যেকবার পরীক্ষার সময়ে বলে—’হে মা সরস্বতী! এবারটির মতো ভালো করে পাশ করিয়ে দাও মা। সামনের বারে আর এমন ফাঁকি দেব না—দেখে নিও—খুব মন দিয়ে পড়াশুনো করব—এবার থেকে আমি খুব ভালো মেয়ে হয়ে যাব মা’—কিন্তু প্রার্থনাটা একটু বদলে নিতে হলো,—’হে মা সরস্বতী। আমার মাথায় বুদ্ধি যুগিয়ে দাও মা। বুদ্ধি দিয়ে এবারটির মতো আমাকে রক্ষে কর মা। আর কক্ষনো কোনোদিনও আমি অমন করে একা একা অচেনা নতুন জায়গায় ঢুকে পড়ব না, মাগো—এবার থেকে আমি খুব শান্ত লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে যাব—।’ মা সরস্বতী শুনলেন কিনা কে জানে। জিপসীরা ইতিমধ্যে সারাকে একমগ দুধ আর প্লেটে করে রুটি—মাংস এগিয়ে দিয়েছে, এবং ফলের সাজিও। সারা মুখ না ধুয়ে কিছুই খেতে পারে না। সে উঠে গিয়ে বেসিনের কাছে গিয়ে কল খুলে মুখে—চোখে জল দিতেই তাড়াতাড়ি জিপসী মেয়েটা ওকে নতুন টুথপেস্ট, নতুন বুরুশ আর নতুন তোয়ালে এগিয়ে দিল একমুখ হেসে এবং নিচু হয়ে বিরাট একটি কুর্নিশ করে। সারা তো অবাক। এ কি! এরা তো খুব ভালোমানুষ ছেলেধরা! সর্বক্ষণ ওরা সারাকে অনেক কথা বলতে লাগল, যার কিছুমাত্র সারা বুঝলো না। খুব চেষ্টা করেও না। ছোটোমামু বলেছিল ওদের ভাষায় অনেক সংস্কৃত শব্দ আছে—কিন্তু কই সে—সব? এই ছড়ছড়িয়ে তোড়ের মতো বলা শব্দ—বন্যায় সে—সব কোথায় ভেসে যাচ্ছে কে জানে। এক সময়ে সারা বুঝল পর্দা সরিয়ে, গাড়ি পাহাড়ে উঠেছে। অদ্ভুত একটা উপত্যকা পেরুচ্ছে গাড়িটা। সাদা সাদা সব ন্যাড়া কটকটে পাথরের গা দেখা যাওয়া পাহাড়ে। সবুজ ঝোপঝাড়ের বন—বাদাড়ের ফাঁকে ফাঁকে পাহাড় হাঁ করে আছে। বড় বড় গুহার পরে গুহা। বেশিরভাগ গুহার মুখই গোল নয়, চৌকো। ভীষণ চেনা চেনা লাগছিল জায়গাটা। তারপর বেশ ওর মনে পড়ল—ছোটোমামুর গাইডবুকে এই জায়গাটার ছবি দেখেছে। এরই নাম ‘ হেলভ্যালি’! ছোটোমামু বলছে প্রাগৈতিহাসিক গুহাবাসী ট্রোগলোডাইট মানুষরা এখানে বাস করতো। এইসব গুহার মধ্যে তাদের ঘরকন্না ছিল। এই দাঁত বের করা মড়ার খুলির মতো দেখতে ভয়ংকর—দর্শন উপত্যকাটাকে দেখেই নাকি মহাকবি দান্তে তাঁর নরকের আইডিয়া পেয়েছিলেন। কিন্তু যদি সেই জায়গা না হয়? নাও—তো হতে পারে? একরকম দেখতে কত জায়গাই থাকতে পারে। কিন্তু এটা যদি হেলভ্যালিই হয়, তবে এর কাছে ‘লে—বো’ বলে একটা ছোট গ্রাম থাকার কথা—যেখানে ছোটোমামু আর সারার আজকে আসবার কথা। কিছুক্ষণ পরে গাড়ি নির্জন বনের মধ্যে একটা গুহার কাছে থামলো। গাড়ি থেকে জিপসীরা টুপটাপ লাফিয়ে নেমে পড়লো। এদের মধ্যে দুজন বুড়োবুড়ি জিপসী আছে—আর আছে সেই প্রথম তিনজন। সারাকেও হাত ধরে যত্ন করে নামিয়ে বুড়ি জিপসী ওর হাতে একটা মস্ত জাগ ভর্তি দুধ দিল ধরতে। গুহাটা খালি। কেউ নেই। তারপরেই সারা চমকে উঠলো। এক কোণে একটা কম্বল পাতা। তার ওপরে ভয়ংকর দেখতে প্রকাণ্ড একটা জানোয়ার শুয়ে আছে। ভালো করে দেখলে বোঝা যায় সেটা একটা কুকুর! কুকুরটার সামনে একটা মস্তবড় হাতলওলা তামার পাত্র। কুকুরটা ঘুমোচ্ছে। নিশ্বাসের সঙ্গে তার পেটটা উঠছে—পড়ছে। জিপসীরা গিয়ে গুহার মুখের কাছে দাঁড়ায়। কুকুরটার দিকে চেয়ে প্রথমে বুড়ো জিপসী একটা তীব্র শিস দিল। তারপর সারার হাত থেকে দুধের জাগটা নিয়ে কী যেন মন্ত্র বলতে বলতে দূর থেকেই আলগোছে তামার পাত্রটার মধ্যে দুধটা ঢেলে দিল সে। কুকুরটা শিস শুনেই চোখ মেলেছিল। লাল টকটকে রাগী রাগী চোখ। এবার উঠে এসে দুধটা শুঁকলো। দু’বার তাকালো ওদের দিকে। তারপর দুধটা খেতে শুরু করে দিল। জিপসীরা অধীর আগ্রহে সেইদিকে চেয়ে আছে। যেন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে কিছুর। আস্তে আস্তে পুরো দুধটা খেয়ে ফেলল কুকুরটা। তামার পাত্রের তলাটা চকচক করে উঠতেই জিপসীর দল একটা আহ্লাদের হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। কুকুরটা যেন তাদের ধমক দিতেই একবার শুধু ‘ ভোঃ’ বললো। গুহার মধ্যে গাঢ় সেই শব্দের গম্ভীর ধ্বনি—প্রতিধ্বনি জিপসীদের হুঙ্কারের প্রতিধ্বনিকে হার মানিয়ে ঘুরে বেড়তে লাগলো। জিপসীরা আহ্লাদে ভাসতে ভাসতে সারাকে কোলে করে গাড়িতে তুলে নেয়। গাড়ি এবার পাহাড় পেরিয়ে নামতে থাকে। হঠাৎ দূরে পাহাড়ের মাথায় একটা ছবি ভেসে ওঠে—ভাঙা দুর্গ, ভাঙা প্রাসাদ, ভাঙা গির্জেয় ভরা একটা ভাঙা গ্রামের পাথুরে ছবি। এই ছবিও গাইডবইতে সারা দেখেছে। ছোটোমামু বলেছিল—এ গ্রামে প্রটেস্ট্যান্টরা থাকত। ১৭ শতাব্দীতে ফ্রান্সের ক্যাথলিকরাজ দশ হাজার লোক হত্যা করে গ্রামসুদ্ধু বিধ্বংস করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সেখান নতুন করে জনবসতি হয়েছে।—’লে বো’! সারা বলে ফেলে ‘ লে—বো?’ জিপসীরা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে —’উই, উই, ‘লে—বো, লে—বো’!—হ্যাঁ হ্যাঁ, লে—বো। মনে মনে ভেবে নিল সারা—একবার ‘লে—বো’—তে পৌঁছুলে নিশ্চয়ই ট্রাফিক পুলিশ দেখতে পাবে রাস্তায়, নীল পোশাক করা ফরাসী পুলিশের চেহারা সে চিনে গেছে। একবার কোনোরকমে নেমে পড়ে ছুটে গিয়ে পুলিশটাকে আঁকড়ে ধরতে পারলেই হবে। এরাও তো জিপসীদের পছন্দ করে না, ছেলেধরা বলেই জানে। ব্যাপার কী, পুলিশ ঠিকই বুঝে নেবে! নাই—বা সারা জানলো বইয়ের ভাষা! ভয়ের ভাষা সবাই বুঝে নেয়। মনে—মনে উত্তেজিত হয়ে সারা জানলার ধারে বসে থাকে। মুক্তি বেশি দূরে নয়। একবারটি ‘লে—বো’ তে পৌঁছতে পারলে হয়। ওর সঙ্গে জিপসীদের ব্যবহার খুবই ভদ্র, এত ভদ্র, যে ভেতরে ভেতরে কেমন যেন ভয়টা মাঝে মাঝে কমে যাচ্ছে সারার—অথচ কমবার তো সত্যি কোনো কারণ নেই। ওরা সারাকে জোর করে চুরি করে এনেছে। অনেক দিন ধরে তাড়া করে বেড়িয়ে, সুযোগ বুঝে বন্দী করেছে। ছোটোমামুকে এরা কেন সঙ্গে ধরে আনেনি? ছোটোমামু বেচারা উদ্বেগে, দুর্ভাবনায় নিশ্চয়ই পাগল হয়ে গিয়েছে এতক্ষণে! সারার হঠাৎ খুব ভয় করে ওঠে। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে ওরা? ঐ বাঘের মতো কুকুরটার কাছে কেন ধরে এনেছিল ওকে? দুধের জাগটা ওর হাতেই বা প্রথমে কেন দিল? ও ছোটোমামু! কী করছো তুমি? পুলিশকে খবর দিয়েছো তো? পালাতে পারছি না ছোটোমামু। আমাকে এরা সব সময় সবাই মিলে ঘিরে রেখেছে। আমার কাছে টাকাকড়ি নেই, আমি এ—দেশের ভাষাও জানি না—কিন্তু ‘লে—বো—তে একবার পৌঁছুলেই’—

এমন সময় হঠাৎ খেয়াল করে তাকিয়ে সারা দেখলো যে লে—বো’র দিকে না গিয়ে, গাড়ি অন্যদিক দিয়ে নেমে যাচ্ছে সারাকে নিয়ে। লে—বো’র দূরের ছবিটা ক্রমশ ছোট থেকে আরো ছোট থেকে আরো ছোট হয়ে যাচ্ছে।

সারার বুক হিম হয়ে গেল।

আট : কামার্গের খামারবাড়িতে

সারা কেঁদে ফেলে। সারাকে কাঁদতে দেখে জিপসীরা যেন অস্থির হয়ে উঠল। এতক্ষণ সারা যে না কেঁদে আছে, সেটাই যে কত আশ্চর্য ব্যাপার তা ওদের খেয়াল হয় না, বরং কাঁদাটাই যেন অস্বাভাবিক হচ্ছে এমনিভাবে ওরা তাড়াতাড়ি সবাই মিলে ওকে ভোলাতে শুরু করে দেয়। একজন পকেট থেকে একটা চকোলেট বের করে দেয়, একজন হাতে একটা পাকা টুসটুসে ফল গুঁজে দেয়, জিপসী মেয়েটি ওকে বুকে টেনে নিয়ে কত কি বোঝাতে থাকে। আর সবচেয়ে মজা করে বুড়োবুড়ি জিপসী দুজন। এরা সত্যি খুব মজার। দুজনে হঠাৎ সারার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তারপরে হাত জোড় করে সুর করে কীসব গান গাইতে থাকে—তার মধ্যে ‘শান্তা’ আর ‘সারা’ শব্দদুটো সারা বারবার শুনতে পায়। ‘শান্তা’ ‘সারা’ নাম দুটোকেই ওরা ‘S’ দিয়ে বলে, যেমন Soত্যজিৎ কি Soঞ্জয়। ওদের কাণ্ডকারখানায় থ’ হয়ে গিয়ে সারা কাঁদতে ভুলে যায়। সারা থেমেছে দেখেছে দেখে জিপসী মেয়েটি উঠে গিয়ে ওকে এক গ্লাস বরফ—ঠাণ্ডা দুধ এনে খাইয়ে দিল—খেয়ে খুব আরাম পায় সারা। তারপর আস্তে আস্তে কখন ঘুমিয়ে পড়লো।

ঘুম ভেঙে সারা দ্যাখে আশ্চর্য একটা ব্যাপার হচ্ছে। তাদের গাড়িটা একটা নৌকোয় চেপে একটা নদী পার হচ্ছে। নদীটা খুব বেশি চওড়া নয়। কী নদী? কী নাম এর? কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ওকে? ছোটোমামুর গাইডবই ফরাসী ভাষায় লেখা, সারা নেড়েচেড়ে ছবিগুলোই যা দেখেছে, আর ছবির বিষয় জিজ্ঞেস করলে ছোটোমামু যা বলে দিয়েছে, সেইটুকুই ওর জ্ঞান। এমন ধারা কত নদী আছে ফ্রান্সে, গাইডবইতে কোনো নদীর ছবি নেই। গাড়ি দিব্যি নৌকো চড়ে ভাসতে ভাসতে ওপারে এসে লাগল। জিপসীরা টপাটপ লাফিয়ে নৌকোয় নেমে পড়লো। তারপর একটা কাঠের তক্তা লাগিয়ে দিলো পাড়ের সঙ্গে, সেই তক্তা বেয়ে সারাকে খুব যত্ন করে হাত ধরে সাবধানে পাড়ে নিয়ে গেল দুই বিনুনী দুলিয়ে জিপসী মেয়েটি। জিপসী বুড়োবুড়ি ওদের পিছন পিছন হাতজোড় করে গুনগুনিয়ে কীসব গান করতে করতে আসতে লাগল।

সামনে ধু ধু মাঠের মধ্যে খাপছাড়া একটা খামারবাড়ি। উঁচু টিনের চাল, বিরাট বড় ঘর। তার পিছন দিকে একটা ঘেরা জায়গায় পনেরো—ষোলটা আশ্চর্য ছাইছাই সাদা রঙের ঘোড়া, তেজী ঘাড় উঁচু করে দাঁড়িয়ে পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে তাদের ছাইছাই সাদা রঙের মোটা চামরের মতো লেজের গোছা রোদ্দুরে ঝামরাচ্ছে।

ভয়—টয় ভুলে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল সারা। কী রূপ! কী রূপ! কী আশ্চর্য সুন্দর! ঠিক যেন ছবির মতো। কোথায় যেন এরকম ঘোড়ার ছবি দেখেছে সারা। ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ে গেল—একটা সিনেমা দেখেছিল—’দ্য হোয়াইট স্ট্যালিয়ন’ নামে, সেইখানে। তাছাড়া আরো কোথায় যেন দেখেছে, কিছুতেই মনে করতে পারছে না। ওরা পৌঁছুতেই দৌড়োতে দৌড়োতে ওদের অভ্যর্থনা করতে এলো একদল মেয়ে—পুরুষ জিপসী—’শান্তা সারা’ চেঁচাতে চেঁচাতে। তাদের মুখে—চোখে উল্লাসের অন্ত নেই। সারার কেমন ভয় ভয় করতে থাকে আবার। এ কোথায় এসে পড়লো সে? মানব সভ্যতার কোনো চিহ্নই এখানে নেই—যতদূর দেখা যাচ্ছে নদীর পাড় থেকেই কেবল শুকনো খটখটে মাঠ আর মাঠ। ধূধূ তেপান্তর। মাঠের ওপরে কাঁটা ঝোপের ছিটেফোঁটা, আকাশ থেকে রোদের আগুন ফেটে পড়ছে। সারাকে ওদের মধ্যে একজন বয়স্ক লোক প্রথমেই পাঁজাকোলা করে তুলে নিল, তারপরে আনন্দে গান গাইতে গাইতে, ম্যান্ডোলিন বাজাতে বাজাতে হৈ হৈ করে ভেতরে নিয়ে গেল।

ভিতরে নিয়ে গিয়ে একটা গদিমোড়া চেয়ারে তাকে বসিয়ে দিল ওরা, সঙ্গে সঙ্গে হাতে এনে দিল এক গ্লাস ঠাণ্ডা বরফ দেয়া রঙীন লেবুগন্ধী সবুজ শরবৎ।

এতক্ষণে সারা টের পায় খুব তেষ্টা পেয়েছে। আর সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে। প্রচণ্ড গরম এখানে। সারাকে একটু পরেই ওরা স্নানের ঘরে নিয়ে গেল। বড় একটা খড় ছাউনির ঘরে কাঠের টবে ভরা পরিষ্কার টলটলে জল রয়েছে। জলে সুন্দর একটা আতর মিশিয়ে দিয়েছে ওরা। একটি মেয়ে এসে সারাকে স্নান করিয়ে দিল, সুগন্ধী সাবান মাখিয়ে। তারপর সারা অঙ্গে সুরভিত পাউডার মাখিয়ে যে—একটা পোশাক তাকে পরিয়ে দিল, তেমন দামী পোশাক সারা তার জীবনে নিজে তো কখনো পরেইনি, অন্য কাউকে পরতেও দেখেনি। আশ্চর্য সুন্দর পোশাক। গায়ে সূক্ষ্ম লেসের কারুকার্য করা সাদা সিল্কের ব্লাউজ, মাথায় পরিয়ে দিল একটা স্প্যানিশ লেসের কালো ঝিরঝিরে ওড়না। আর কোমরে কালো ভেলভেটের ম্যাক্সি স্কার্ট। তার ওপরে সবুজ জড়িতে কাজ করা এপ্রন। হাতে দিল সাদা লেসের রুমাল। স্নান করে সেজেগুজে বেরিয়ে সেই বিরাট ঘরে ঢুকে সারা তো অবাক। ঘরে বিপুল উৎসবের চেহারা। মস্ত টেবিল সাজিয়ে, দুদিকে চেয়ার পাতা হয়েছে, টেবিলের মাথায় একটা বিশেষ চেয়ারে খুব সম্মান করে বসালো ওরা সারাকে নিয়ে। সামনে রীতিমতো ভোজের ব্যবস্থা। বোতল বোতল লাল—সাদা পানীয়, থালা থালা ফল উপছে পড়ছে—আঙুর, আপেল, কলা, কমলা, পীচ, প্লাম, খেজুর, নাশপাতি, এমনকী বেদানা পর্যন্ত। সবকিছুর মধ্যিখানে মস্ত একটা তরমুজ।

সারার জন্য এলো প্রথমেই রুপোর প্লেটে করে মস্ত বড় বড় লাল তরমুজের ফালি। আর তার সঙ্গে পাতলা হ্যাম কয়েক টুকরো। একটু পনীর। তারপরে বিরাট একখানা চ্যাপটা লোহার কড়াই একটা চাকা লাগানো গাড়ি করে ঠেলে নিয়ে এলো একজন লোক—সেই কড়াইভর্তি একটা পোলাওয়ের মতো জিনিস। হলদে রঙের ভাত, ভাতের মধ্যে নানরকমের পশু—পাখির মাংসের আর মাছের ছোটো ছোটো টুকরো, টোমাটো, পাহাড়ী লঙ্কা আর পেঁয়াজের কুচি—গন্ধেই খিদে পেয়ে গেল সারার।

সবাই প্রথমেই তাদের পানীয়ের গ্লাস তুলে ‘শান্তা ‘সা—রে’ বলে সমবেত কণ্ঠে কিছু বললো, তারপর গ্লাস মুখে ছোঁয়ালো। শান্তাটা আবার কে রে বাবা? সারা ভাবে। বুড়োবুড়ির গানের মধ্যে ওই শান্তা নামটি বার বার একসঙ্গেই শুনতে পাচ্ছিল সে।

ভাতটা অপূর্ব খেতে। ভাতটা হাত দিয়ে দেখিয়ে সে পাশের জিপসীকে জিজ্ঞেস করলো পুরো বাংলায়—’এর নাম কী? কী নাম এর? জিপসীটিও ভাতটাকে দেখিয়ে হেসে বলল—’নাম? পাইয়েল্লা।’—সারার বুকের মধ্যে নেচে ওঠে। ‘নাম’ শব্দটা ওরা তাহলে বুঝতে পেরেছে। অবশ্য ইংরিজি, ফরাসী, জর্মনেও প্রায় এই শব্দটা একইরকম—নেম, নম, নামেন! বিদেশে আসবার সময়ে যে—সব ফর্ম ভর্তি করতে হয়েছে সারাকে, তাতেই এই তথ্যটা সে জেনে ফেলেছে!

রাশি রাশি লেমন—সেরবেট, ফল, ক্রীম আর আইসক্রীম দিয়ে খাওয়া শেষ হলো। তারপর সবাই ক্ষুদে কাপে কাদার মতো ঘন কালো কফি খেতে লাগল। সারার তো কফি মুখে দিয়েই প্রাণান্ত! ইচ্ছে করলেও উপায় নেই ফেলে দেবার। ঈশ! কী তেতো! খাচ্ছে কি করে এরা? তাড়াতাড়ি মুখে কয়েকটি আঙুর পুরে দিল সারা! আহ, কী মিষ্টি! ভোজ শেষ হলে সারাকে ওরা আর একটা ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে চমৎকার নীল ভেলভেটের বিছানা পাতা, সারাকে ওরা একটা নরম তুলতুলে গোলাপী লেসের ঘুমের পোশাক দিল। ঘরময় ধূপের গন্ধ ভুরভুর করছে। একটা জানালায় একটা ছোটো টেবিল ফ্যানের মতো পাখাও ঘুরছে। ইওরোপে এই প্রথম ফ্যান দেখলো সারা। জিপসীরা তার পা থেকে জুতো—মোজা খুলে নিয়ে একটা নরম, পাতলা, ঘাসে বোনা চটি এগিয়ে দিলো। যেন ঘাসের সুতোয় তৈরি লেস! এত সুন্দর আর নরম! জিপসীরা এইসব বুনুনি—টুনুনির কাজই করে বটে—মনে পড়ে গেল সারার। স্কুলের একটা বইতে পড়েছিল বটে জিপসীদের বাস্কেট বোনার কথা। কিন্তু এরা কেন ওকে ধরে এনেছে? কী করে পালাবে সে?

ঘণ্টাখানেক বিশ্রামের পরেই এক মগ গরম ফেনা ওঠা দুধ আর আবার এক ঝুড়ি ফল এনে সামনে ধরল জিপসীরা। এত খেতে পারে কেউ? সারা তো পারেই না! তাছাড়া—দুধ খেতে তার একটুও ভালো লাগে না। সারা কিছুই খেল না দেখে জিপসীরা এবার এনে দিল এক প্লেট ভর্তি নানারকমের চকোলেট। সারা আর না খেয়ে থাকতে পারে না! আহ। কি স্বাদ! মহারাজকে যদি খাওয়ানো যেতো! আহা রে—ওরা তো এমন চকোলেট জীবনেও খেতে পাবে না সাতের—দুই—বাই—সি বসন্ত মল্লিক লেনের বাড়িতে! চকোলেট খেতে খেতেও সারার কান্না পেয়ে যায়। এবার সারাকে ওরা পরিয়ে দিল একেবারে অন্য রকমের পোশাক। নতুন ব্লু—জিনসের পাঁৎলুন, সুতীর সাদা শার্ট আর মাথায় দিল একটা মস্ত চওড়া কাউবয় টুপি। পায়ে তার জুতো—মোজা। কোত্থেকে যে এরা ঠিক সারার মাপে মাপে পোশাকগুলো পাচ্ছে! সারা বুঝতে পারছে পালানোর চেষ্টা এখন বৃথা। এই খামারবাড়িতে যারা আছে তারা কেউই ওকে পালাতে সাহায্য করবে না। এরা সকলেই একজোট। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গিয়ে সারার সমস্ত শরীর ভয়ে কুঁকড়ে এলো—এরা যে ওকে ঘিরেই একটা উৎসব করছে, তাতে সন্দেহ নেই—একটা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে সারা। কে জানে জিপসীদের কোন ধর্ম? তাদের কেমনই—বা আচার। দেশে কালীপুজোয় বলি দেবার আগে পাঁঠাদের গঙ্গাস্নান করিয়ে সিঁদুর—চন্দনের টিপ পরিয়ে ফুলের মালা পরিয়ে, সাজানো হয়। সারা শুনেছে আগেকার দিনে যক দেবার জন্য ছোটো ছেলে—মেয়েদের এমনিভাবে স্নান করিয়ে, খাইয়ে, নতুন ধুতি, সোনার গয়না পরিয়ে সাজিয়ে—গুছিয়ে তারপরে মরণের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হতো। এই সেদিনও কাগজে পড়েছে মধ্যপ্রদেশে না কোথায় একটা বাঁধ বসানোর সময়ে সেই গাঁয়ের লোকেরা নরবলি দিয়েছে পাঁচটি হরিজন শিশুকে ধরে এনে। জিপসীরা তো পুরাকালে ভারতবর্ষেরই লোক ছিল, হয়তো তাদেরও অমনি কোনো আচার আছে! সেরকম কিছু করছে না তো? নরবলি? যক দেওয়া? মা গো—! উঃ—

কিন্তু যাই করুক, সারা অসহায়। সহযোগিতা করা ভিন্ন সারার আর কোনো পথ নেই। তার ভেতরেই মনে মনে মুক্তির উপায় খুঁজতে হবে।

একটুক্ষণের মধ্যেই ঠিক হলিউডের ওয়েস্টার্ন ছবিতে দেখা কাউবয়দের মতো টুপি মাথায়, ব্লু—জিনসের পোশাক পরা দু’তিনটি ছেলে সাদা ঘোড়ায় চড়ে এসে পাশে দাঁড়ায়। একজনের লম্বা হলদে চুল কাঁধের নিচে ছড়ানো—চমকে তাকিয়ে সারা দ্যাখে সে ছেলে নয়, মেয়ে। কাউগার্ল। কাউগার্লটি ওর দিকে চেয়ে হাসে। তারপর লাফিয়ে নেমে এসে সারাকে তার নিজের ঘোড়ায় তুলে নেয়। সঙ্গে সঙ্গেই ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে পড়ে ওরা। যাবার সময়ে খামারের জিপসীরা ওদের হাত তুলে প্রবল গর্জনে ‘শান্তা! সারা! অ রভুয়ার!’ বলে বিদায় জানাতে থাকে। পিছনে পিছনে তিনটি সাদা ঘোড়ায় আসছে সেই জিপসী ছেলেমেয়ে তিনজনও।

নয় : তেপান্তরের ঘোড়সওয়ার

টগবগ টগবগ করে ছুটতে থাকে সারাকে নিয়ে কাউগার্লের ঘোড়া কামার্গের ধূ ধূপ্রান্তরের বুক চিরে। যতদূর চোখ যায় কেমন মাঠের পরে মাঠ আর আকাশের পরে আকাশ। ‘—ধূ ধূ করে যেদিক পানে চাই কোনোখানে জন—মানব নাই’—খামারবাড়িটা অনেকক্ষণ দিগন্তে মিলিয়ে গিয়েছে। মাঠভর্তি কী চোর—কাঁটা! এটাই যেন সারার ছোটোবেলায় কল্পনায় দেখা সেই তেপান্তর—’চোর—কাঁটাতে মাঠ রয়েছে ঢেকে, মাঝখানেতে পথ গিয়েছে বেঁকে…গরু—বাছুর নেইকো কোনখানে…আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে…

দৌড়োতে দৌড়োতে হঠাৎ কিসের যেন গন্ধ পেয়ে গতি কমাতে চেষ্টা করলো ছুটন্ত ঘোড়াগুলো। তারপর সওয়ারিদের তাড়ায় আবার ফুঁসে ওঠে, খুরের ধুলো দ্বিগুণ ওড়ে। মাঠের মধ্যে প্রথমে দূরে কিছু কালো—কালো ফুটকি দেখা যাচ্ছিল। সারা ভেবেছিল ওগুলো কাঁটাবনের ঝোপঝাড়ই হবে। কিন্তু কাছাকাছি আসতেই আস্তে আস্তে সেই কালো ফুটকিগুলো বড় বড় হয়ে অগণিত জংলি বাইসনের দল হয়ে দাঁড়ালো। কত…কত? দুই, আট, চোদ্দো, কুড়ি,… সারা আর গুনতে পারে না। অন্তত তিন—চারশো জানোয়ার তো হবেই! ধূ ধূ তেপান্তরের মধ্যে কাঁটাঝোপ মাড়িয়ে কত নিশ্চিত হয়ে চরে বেড়াচ্ছে! কী বাঁকা? কী সাদা তাদের শিং! আর কী বুনো তাদের সাদা চোখের চাউনি! দেশের গরু—মহিষের চোখে এরকম দৃষ্টি কখনো দেখেনি সারা, তাদের চোখ কত শান্ত, কত পোষমানা।

ঘোড়সওয়ারদের দেখে ঘাড় বাঁকিয়ে, চোখ পাকিয়ে স্থির পাথরের মূর্তির মতো থমকে দাঁড়ালো বুনো বাইসনের দল—অতগুলো জানোয়ারকে কে যেন ‘স্ট্যাচু’ করে দিয়েছে। ঝড়ের আগের গাছপালার মতো এদের এই নিবাত—নিষ্কম্প স্থির হয়ে থাকা দেখে সারার ভয় করতে লাগলো।—লক্ষণ তো ভালো মনে হচ্ছে না! এইবারে হয়তো—

কাউবয়দের মধ্যে কিন্তু ভয় দেখা গেল না।—একসঙ্গে জিভ দিয়ে হঠাৎ একরকম শব্দ করে উঠল ওরা সব ক’জনে মিলে—’উরররর’…বুনো বাইসনের দল কালো পাথরে কোঁদা মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়েই রইল, আক্রমণ করল না। এমন সময় হঠাৎ ঘোড়া ছুটিয়ে কাউবয় দুজন বাইসনদের দলের দুদিকে চলে গেল, এবং একরকম আওয়াজ করতে লাগলো মুখে। হঠাৎ সারার চোখ ধুলোয়—ধুলোয় অন্ধকার হয়ে যায়—খুরে—খুরে ধুলোর ধোঁয়া উড়িয়ে বাইসনের দল ছুটে চলে যাচ্ছে দূরের দিকে— ‘—রাঙাধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে…।’

বাইসন তাড়িয়ে ফিরে এসে ওদের যাত্রা আবার শুরু হয়। সোজা দক্ষিণে চলেছে ওরা। শুকনো জমি পার হয়ে সারাদের ঘোড়াগুলো এবার একটা জলা জমির মধ্যে এসে পড়লো। জলের মধ্যে কত বক বসে আছে। লম্বা লম্বা ঘাসের মধ্যে টুপটাপ মাথা ডুবিয়ে মাছ ধরছে। হঠাৎ ওদের সাড়া পেয়ে জলে যেন একটা হুটোপুটি শুরু হয়ে গেল। একটু দূরেই হঠাৎ একঝাঁক গোলাপী রঙের সারস বিশাল ডানা মেলে আকাশে উড়লো—লম্বা লম্বা ঠ্যাং বুকের নিচে গুটিয়ে নিয়ে—’পিংক ফ্লেমিংগো!’ আলিপুরে চিড়িয়াখানাতে এদের দু—একটিকে খাঁচার মধ্যে হেঁটে বেড়াতে দেখেছে সারা।

আর এখানে দেখছে জংলী জলার মুক্ত ফ্লেমিংগো! ওদের ঘোড়া জলার মধ্যে দিয়ে ছুটে চলে, খুরে—খুরে প্রচুর জল ছিটিয়ে। ফোয়ারার মতো স্প্রে উঠে আকাশ ভরে দেয়। জলের ছিটে এসে সারার গায়ে—মুখে—চোখে লাগে। জলের নোনা স্বাদ। হঠাৎ দূর দিগন্তে একটা অবিশ্বাস্য সুন্দর ছবি ফুটে ওঠে—নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার মতো সুন্দর! দূর দিগন্ত থেকে প্রবল বেগে ছুটে আসছে একদল সাদা ঘোড়া—ঠিক যেন স্বপ্ন—পায়ে পায়ে অফুরন্ত জল ছিটিয়ে। আকাশজোড়া সাদা জলের ঝারি দিয়ে। এই ঘোড়াদের পিঠে কোনো সওয়ার নেই। এক মুহূর্তেই সারা বুঝতে পারে এরা বুনো ঘোড়া। জীবন কখনো বুনো বাইসনের ঝাঁক, বুনো ঘোড়ার দল—বুনো ফ্লেমিংগো পাখির উড়ে যাওয়া স্বচক্ষে দেখা হবে এ কি কোনোদিনও ভেবেছিল সে? সারার মনে একের পরে এক কতই প্রশ্ন জাগে—কিন্তু বৃথা। জিপসীরা তার ভাষা বোঝে না। —যদি কখনো ছাড়া পাই, দেশে ফিরে যাওয়া হয়, আমার ইস্কুলের বন্ধুরা কি বিশ্বাস করবে এসব কথা? দিদিরা বিশ্বাস করবে? মহারাজটা তো কক্ষনোই বিশ্বাস করবে না…। ওদের কথা মনে পড়তেই সারার আবার ভীষণ কান্না পেয়ে যায়। হয়তো জীবনে আর কোনোদিনও অতি আপন ওই মুখগুলো দেখতে পাবে না—এই বুনো ঘোড়া, বুনো মহিষ, আর বুনো জিপসীদের মধ্যেই বুড়ো হয়ে যাবে সারা! তারপরে একঝলকে সারা বুঝতে পেরে যায়, সে কোথায় এসেছে!—’কামার্গ!’

দক্ষিণ ফ্রান্সের সেই কুখ্যাত জনবসতিপূর্ণ বিস্তীর্ণ বন্য সভ্যসমাজ—বিবর্জিত অঞ্চল—সেখানে কেবল কাঁটা ঝোপ, শুকনো মাঠ, আর নোনা জলার মরুভূমি—একটু একটু মিঠে জলের জলাও আছে মধ্যে মধ্যে—ভাগ্যিস!—তাই এইসব বাইসন, ঘোড়া, ফ্লেমিংগোর জল এখানে থাকতে পারে!—বুনো ঘোড়া আর বুনো বাইসনের দেশে এই বুনো কামার্গ। এদের মধ্যে থেকেই হিংস্র ষাঁড় ধরে নিয়ে গিয়ে স্পেনে বুলফাইটের জন্যে ট্রেনিং দেওয়ানো হয়। সেই ষাঁড় বাচ্চাবয়সে ধরার কাজ করে এইসব অসমসাহসী কাউবয়রা। এরা বুনোঘোড়াদেরও বশ করে, বুনো গরু—মহিষদেরও বাগ মানায়। এদের বলে কামার্গের ‘গার্ডিয়ান্স’। প্রধানত দক্ষিণ ফ্রান্সেরই মানুষ এরা—আর কিছু—বা স্পেনের লোক। কিছু কিছু জিপসীও কিন্তু এই কাজ করে—ওরাও পারে দিব্যি বুনো জন্তুকে পোষ মানাতে।

—এই ‘কামার্গ! মনে হতেই সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে সারার। এই সেই বুনো ‘কামার্গ’। ঈশ! ছোটোমামুরই ভীষণ ইচ্ছে ছিল কামার্গ দেখতে। বারবার ঐ বিজ্ঞাপন কোম্পানিকে বলেছিল যে ওদের কামার্গটা ঘোরানোর ব্যবস্থা করতে। কিন্তু ওরা তা করেনি। তার বদলে ‘নীস’ থেকে ‘কান’ পর্যন্ত ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরাটা ঘোরানো ঢের জরুরি বলে সেই ব্যবস্থাই করেছে।

কোম্পানি বললে—’সে কি করে হবে—কামার্গে গিয়ে থাকবে কোথায়? হোটেলই নেই। যাবেই—বা কেমন করে? ট্রেন নেই, বাস নেই, ঠিকঠাক রাস্তাঘাট পর্যন্ত নেই! কিছুই তো নেই!—তাছাড়া দেখবেই—বা কী? করবেই কা বী?’—সেই রোন নদীর এপার থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত কামার্গের বন্য পরিত্যক্ত জমি পড়ে আছে। মানুষজন থাকে না সেখানে। ছোটোমামু সব বুঝিয়েছিল সারাকে! তার মানে যে—নদীটা পার হলো সেইটেই রোন!

ওঃ হো—তাই তো! খামারবাড়ির সাদা ঘোড়াগুলো দেখেই কেন সারার অত চেনা—চেনা লেগেছিল, এবার বোঝা যাচ্ছে। কামার্গের রঙিন ছবি দেখিয়েছে যে তাকে ছোটোমামু গাইডবইতে—চার পায়ে সাদা জলের ফোয়ারা ছিটিয়ে ছাইছাই কেশর উড়িয়ে লেজ ফুলিয়ে সাদা ঘোড়ার দল ছুটে যাচ্ছে নীল দিগন্তের দিকে। ঠিক যে দৃশ্য সে এইমাত্র দেখল, তেমনি! এই ঘোড়াগুলো নাকি জন্মায় কালোরঙের হয়ে, তারপর দু’বছর বয়স হলে আপনিই সাদা হয়ে যায়, ছাই—ছাই—সাদা। ছোটোমামু বলেছিল কামার্গের ঘোড়ার জাতই আলাদা। দেখলেই চেনা যায়। দুধ—সাদা নয়, ছাই—সাদাটে—’আহা, —ছোটোমামু! তুমি দেখতে পেলে না তোমারই সাধের কামার্গের মধ্যে দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছি আমি। কে জানে কোথায়!’

দশ : মহোৎসবের মধ্যমণি

ঘোড়াগুলি গিয়ে থামলো একেবারে সমুদ্রের ধারে! তখনো কামার্গের আকাশ টকটকে লাল, যদিও সমুদ্রে সূর্য অস্ত গিয়েছে। সেইখানে বিপুল জিপসী—জনতা জড়ো হয়েছে একসঙ্গে। তাদের ‘শান্তা—সারা’ হাঁকে সারার বুকের মধ্যে কাঁপুনি ধরে গেল। কী হচ্ছে সব? কী ব্যাপার? সামনেই একটা ভাঙাচোরা গির্জে। প্রায় জল থেকেই উঠে গেছে। দেখলেই বোঝা যায় পুরোনো। গির্জেটাকে দেখতে অনেকটা কেল্লার মতো। সারাকে সেই গির্জের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে একটা ঘরে ওর বিশ্রামের ব্যবস্থা হয়েছে, রাজকীয় যত্নে! চতুর্দিকে কেবল জিপসী আর জিপসী। কত যে তাঁবু পড়েছে গির্জেটার চারিদিকে, তার ঠিক নেই! থেকে থেকেই ‘শান্তা—সারা’ নামদুটো স্লোগানের সুরে দিকে—দিকে শোনা যাচ্ছে। এই শান্তাটা কে? তার সঙ্গে এখনো সারার দেখা হয়নি। নিশ্চয়ই আরেকটা ওরই মতো মেয়ে, যাকে ওরা ধরে এনেছে। সারার মনে হলো এইবারে শান্তার সঙ্গে দেখা হবে। নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিলেও, অদ্ভুত একটা ভয়ে বুক দুরদুর করতে থাকে সারার—সে দিব্যি বুঝতে পারছে আসল সময়টা কাছে এসে পড়েছে। আর দেরি নেই, এদের উত্তেজনা যেন টঙে পৌঁছেছে—এবারে বোঝা যাবে কিসের জন্যে ওকে ধরে আনা। বাইরে জোরালো বাজনা বাজছে, গান হচ্ছে, জিপসীরা সকলে মিলে নাচছে। উদ্বেগে, ঘোড়ায় চড়ার পরিশ্রমে সারা কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল—ঘুম ভাঙলো একেবারে পরদিন সকালে। ভোরে উঠে সারাকে ওরা সুগন্ধজলে স্নান করিয়ে আশ্চর্য—সুন্দর একটা দীর্ঘ সাদা জোব্বার মতো সিল্কের পোশাক পরালো, মাথার ওপর দিয়ে সুন্দর সাদা ফিনফিনে ওড়না ঢেকে দিলো—কিন্তু পা—দুটি রাখলো খালি। সাজিয়ে—গুজিয়ে মেয়েরা ওকে একটা কারুকার্য করা কাঠের বেদীর ওপর দাঁড় করালো। তারপরে কয়েকজন মিলে দৌড়ে গিয়ে ডেকে নিয়ে এলো একজন পাদ্রীকে। ঘরে ঢুকেই বেদীর ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা সারাকে দেখে বৃদ্ধ পাদ্রীটি প্রচণ্ড অবাক হয়ে গেলেন। তারপরেই হাঁটু মুড়ে নতজানু হয়ে বসে পড়লেন সারার সামনে হাতজোড় করে। এবং সারার পোশাকের প্রান্তটি পায়ের কাছে দুই হাতে ধরে বারবার চুমু খেয়ে লাতিন ভাষায় মন্ত্রপাঠ করতে শুরু করে দিলেন। সারা দেখলো তাঁর চোখ থেকে টপটপ করে জল তাঁর মুঠোর ওপরে ঝরে পড়ছে। হাতের মুঠোয় একটা কাঠের পুতুল ধরা।

বুড়োমানুষের চোখের জল দেখতে এত খারাপ লাগে! সারা বেদীর থেকে নেমে গিয়ে পাদ্রীটির হাত ধরে, তাঁকে টেনে তোলে। অমনি আশেপাশের সব জিপসীরা ‘শান্তা—সারা’ বলে আহ্লাদে গলায় চিৎকার করে ওঠে।

পাদ্রীটি কিছু বলতে বলতে সারার সামনে নত হয়ে কুর্নিশ করেন। তারপর চলতে শুরু করে দিলেন, তাঁর সঙ্গে সারাকে আসার ইঙ্গিত জানিয়ে। সারাকে নিয়ে তিনি একটি হলঘরে গিয়ে দাঁড়ালেন,—ঘরে ধূপের গন্ধ, আবছা অন্ধকার। মোমের আলোয় দেখা গেল, সেখানে পাশাপাশি তিনটি মন্দিরের মতো বড় বড় কুলুঙ্গীর খোপ—কাটা। তিনটি কুলুঙ্গীতে তিনটি মূর্তি, তাদেরই সামনে ধূপধুনো, মোমবাতি জ্বলছে। প্রথমে একনজরে তিনটিকেই মেরীমাতার মূর্তি বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু কাছে গিয়ে সারা দেখে, না তো! একটিও তো মেরীমাতার মূর্তি নয়! কোলে যীশু নেই। প্রত্যেকের সামনেই একটি কাঠের নৌকোর গলুই গড়া। একটি মূর্তির নিচে লেখা আছে Santa Marie-Jacobe, আরেকটা মূর্তির নিচে Santa Marie-Salome, আরেকটার নিচে লেখা—দেখেই সারার সমস্ত অস্তিত্ব চমকে উঠল—Santa Sara! কিন্তু আসল চমকটা তখনো বাকী ছিল। কাছে গিয়ে মূর্তিটির মুখের দিকে তাকিয়ে সারা হতভম্ব, হতচকিত হয়ে পড়ে। এ কি! এ তো তারই মূর্তি! এইরকম করেই সাজানো হয়েছে তাকে আজ—! গায়ের রঙ বাদামী, থাকথাক কোঁকড়া কালো চুল। বড় বড় কাজল—পরা কালো চোখ, মাথায় সাদা আঁচলের ঘোমটা—গায়ে সাদা জোব্বা, খালি পা, দুই হাত জোড় করে ওপরদিকে চেয়ে আছে—অবিকল সারারই মূর্তি! সারা এবারে আরো ভয় পেয়ে অসাড় হয়ে গেল। সে দিল্লিতে রামরাবণের মূর্তি পোড়ানোর বাজী দেখেছে ‘দসেরা’ উৎসবে, আর গল্পের বইতে পড়েছে ডাইনিরা নাকি যাকে খুন করতে চায় তার কুশপুত্তুলি তৈরি করে মন্ত্র পড়ে পোড়ায়। এসব কীরকম রহস্যময় ব্যাপার হচ্ছে? জিপসীদের সমাজে নিশ্চয়ই সেই জাতীয় ব্যাপার চালু আছে। কবে বানালো এরা সারার এত বড় মূর্তি? সান্তা তাহলে কারুরই নাম নয়, বম্বের সান্তাক্রুজ এয়ারপোর্টের মতো—সান্তা মানে সেন্ট। সেন্ট মারি জাকোবে, সেন্ট মারি সালোমে, আর সেন্ট সারা। ও, আজকে সারাকে তাহলে ‘সেন্ট’ বানানো হচ্ছে। মরে না গেলে যেমন লোকে ‘শহীদ’ হয় না, তেমনি মরে না গেলে কি কেউ ‘সেন্ট’ হয় কখনো? নিশ্চয়ই হয় না! আজই তাহলে সারার জীবনের শেষ দিনটি! সারা অস্থির হয়ে ভাবে—আহা, এরা যদি কেউ একটুও ইংরেজি বলতে পারতো! তাহলে অন্তত এতটা অবুঝ অন্ধকারের মধ্যে অসহায়ভাবে পড়ে থাকতে হতো না আমাকে। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, সেটুকু জানতে পেরে মরতে পারতুম! কিন্তু সাধের জীবনটা শেষই হয়ে যাবে একটা অমীমাংসিত ধাঁধার মধ্যে। শেষপর্যন্ত একটা অজানা প্রশ্ন বুকে নিয়ে, ঘনরহস্যের মধ্যেই স্বর্গে চলে যাবে সারা। জিপসীদের শিকার হয়ে। বাড়ির লোকেরা জানতেও পারবে না।

একটু বাদেই বাজনা বেজে উঠল জোরে। সারাকে সবাই বের করে নিয়ে একটা খোলা গাড়িতে তুলল। লরির ওপরে ঠিক একটা পুরোনো দিনের কাজ করা কাঠের নৌকো রাখা। রঙিন ফিতে দিয়ে, ক্রুশ দিয়ে আর পতাকা দিয়ে নৌকোটা সাজানো! আটটি কামার্গের ঘোড়ায় টেনে নিয়ে যাবে গাড়িটা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা ঠুকছে তারা। নৌকোর ওপরে দুটি কাঠের মূর্তি, সেন্ট জাকোবে আর সেন্ট সালোমের। তাদের মাঝখানে আর একটি কাঠের বেদীতে বসানো হলো সারাকে! তার সামনে রাখা হলো চুপড়ি—চুপড়ি ফল, তোড়া—তোড়া ফুল, আর ঝুড়ি—ঝুড়ি পানীয়ের বোতল! যেন নৈবেদ্য সাজানো হয়েছে। যতদূর দৃষ্টি চলে, বিরাট এক শোভাযাত্রার প্রস্তুতি হয়েছে! রাস্তায় দলে দলে কামার্গের ঘোড়া, ঝাঁকে ঝাঁকে কালো বাইসন—এরা নিশ্চয় বুনো নয়, পোষা! তাদের তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে জমকালো পোশাক পরা, টুপি মাথায় ঘোড়ায় চড়া ঘোড়সওয়ারের দল। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে বাজিয়েরা যাচ্ছে, কত রকমের পোশাক পরে, কত রকমের বাজনা বাজাতে বাজাতে, কত রঙ—বেরঙের সাজগোজ করে নাচতে নাচতে যাচ্ছে শ’য়ে শ’য়ে পুরুষ, মেয়ে আর বাচ্চারা—জিপসীরা ছাড়াও অনেক সাদা চামড়ার লোকও আছে শোভাযাত্রায়। তারাও নানা দলে নানা ঢঙে নাচছে, গাইছে, বাজাচ্ছে। এতবড় উৎসবের মধ্যমণি কে? না, সারা! সে যেন জগন্নাথ, আর এরা যেন রথ টানছে! শোভাযাত্রার মানুষরা ধ্বনি দিচ্ছে—’সান্তা—সা—রা!’ ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে, আর মদ ঢেলে দিচ্ছে সারার নৌকাগাড়িতে। গান—বাজনার ঝমাঝম শব্দে, তালে—তালে নাচের দৃশ্যে, দু’পাশে লোকের ভিড়ে, ঘোড়া—বাইসনের পায়ের ক্ষুরের ধুলোয়, ধূপের গন্ধে, ফুলের গন্ধে, মদ আর পাকা ফলের গন্ধে সারার সমস্ত শরীর কেমন যেন ঝিমঝিম করতে থাকে। ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে শোভাযাত্রা এগিয়ে চললো সমুদ্রের ধার দিয়ে। মাথার ওপর কামার্গের সূর্য জোরালো হয়ে উঠতে থাকে, ক্রমশ যেন অগ্নিপিণ্ড হয়ে গনগনে আগুন ছিটোতে থাকে নিচে—বালি—মাটি—মানুষ—গাড়ি—জন্তু—জানোয়ারের ওপরে। ‘সান্তা… সা—রা’ হাঁক শুনতে শুনতে সারার মাথা ঘুরতে থাকে, চোখে সর্ষেফুলের ছবি ভাসতে শুরু করে।—কখন? কখন আসবে সেই আসল মুহূর্ত? কোথায় গিয়ে শেষ হবে এই শোভাযাত্রা? কোথায় থামবে এরা। সারাকে কি পোড়ানো হবে, জোন অব আর্কের মতো? সারাকে কি জ্যান্ত গোর দেওয়া হবে এইসব ফলফুলসুদ্ধ যকের ধন আগলানোর জন্যে? শোভাযাত্রা এসে সমুদ্রের ধারে থামলো।

গাড়ি থেকে নৌকোটা নামানোর তোড়জোড় শুরু হতেই সারা সব বুঝতে পারে।—ওকে তাহলে এবার ভাসিয়ে দেওয়া হবে। এইসব ফলফুল, বোতল—বোতল পানীয়—সুদ্ধ নৌকোটা তাহলে এবার জলে ঠেলে দেবে এরা। বিসর্জন! এতক্ষণ পুজো—আচ্চা হলো—এবারে বিসর্জন! একদম একা দূর সমুদ্রে, সাঁতারও জানা নেই—মনে হতেই সারার চোখে ঘনঘোর অন্ধকার নেমে আসে। জ্ঞান হারিয়ে চেয়ারে ঢলে পড়তেই হায় হায় করে চেঁচিয়ে জিপসীরা ছুটে এলো সারার দিকে।

এগারো : সমুদ্রের সন্ন্যাসিনী

জ্ঞান ফিরতে সারা দ্যাখে সে একটা চমৎকার ঘরে ফর্সা সাদা বিছানায় শুয়ে আছে। সামনে একজন ডাক্তার, একজন নার্স, আর একজন…।

একি সে সত্যি দেখছে? একজন ফরাসী পুলিশ! পুলিশের হাতে তারই পাসপোর্ট! সারা চোখ মেলতেই ঘরসুদ্ধু তিনজন লোকই তাকে হেসে অভ্যর্থনা জানায়। ডাক্তারবাবু বলেন—’পার্লে ভু ফ্রাঁসে?’ সারা মাথা নাড়তেই পুলিশ বলে —’পার্লে ভুজ অংলে? ইউ স্পীক ইংলিশ?’ সারার প্রাণটা নেচে উঠল। ওঃ ইয়েস! ইয়েস! ইয়েস?’ ‘ইউ ফীল বেতার—ইয়েস?’ ‘—ইওর নেম সারা রে?’—এক মিনিটেই গোঁফওলা পুলিশের সঙ্গে সারার দিব্যি ভাব হয়ে যায়! পুলিশও দিব্যি ভুলভাল ইংরিজি বলে দেখে সারার তাকে আরো ভালো লাগে। গোঁফ নেড়ে নেড়ে পুলিশ তাকে জানায়, ভয় নেই, খানিকক্ষণ বাদেই তার ‘আংকল কামিং হিয়ার।’ ছোটোমামু পুলিশে খবর দিয়েছে, পুলিশরা তার খোঁজ করছিল। কথা বলতে বলতেই ঘরের মধ্যে মার্চ করে চলে আসে তিনজন জিপসী, বুড়ো পাদ্রী সমেত। তাদের প্রত্যেকের হাতে বেতের ট্রের ওপরে এক একটি মস্ত বাক্স, রঙিন কাগজে, রাংতায়, রিবন দিয়ে, সুন্দর করে মোড়া। —’গাত্যো গাত্যে, মিনিং কেক!’ বলে পুলিশ হাসে—’ফর ইউ, ফর সান্তা সারা! —অল ফর ইউ!’ তারপর ওর পিছনদিকে আঙুল দেখায়! পেছন ফিরে দেখেই সারা চমকে ওঠে। মস্ত টেবিলভর্তি কেবল ফলের, ফুলের, পানীয়ের ঝুড়ি। আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বেশ বড়সড় বাদামী পুতুল। গির্জেতে দেখা সারার সে মূর্তিরই ছোটো সংস্করণ।

—’অল ফর ইউ; ফর সান্তা সারা।’ আগেকার বিশাল বাক্স এগিয়ে দেয় একজন —’শোকোলা—’

—’চকোলেট! ইউ লাইক চকোলেট?’

আরেকটি বাক্স এগিয়ে দেয় আরেকজন—’ক্যানডি ফ্রুটস! সুইটস’—

এরকম চলতেই থাকে। সারা বুঝতেই পারে না কী হচ্ছে। পুলিশের ধরছে না কেন জিপসীদের? এত উপহারই—বা কেন দিচ্ছে? ব্যাপারটা কী? এমন সময়ে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢোকে—উদভ্রান্ত চেহারায়—ছোটোমামু।

 টেবিলে বসে খেতে খেতে গল্প করছিল ছোটোমামু আর পুলিশ আর সারা। সবকিছু বোঝা গেছে এতক্ষণে! ওঃ! কী আশ্চর্য ঘটনা! পুলিশই সব খুলে বলছিল ওদের।:—

—এই জায়গাটা নাম সেন্ট মেরি অফ দ্য সী (St. Marie-de-la-Mer), কেননা খ্রিস্টের মৃত্যুর মাত্র ৪০ বছর পরে এই জায়গাটিতে একটি নৌকো এসে লেগেছিল। কাহিনী আছে, সেই নৌকো সোজা ভেসে এসেছিল প্যালেস্টাইন থেকে, যীশুখ্রিস্টের সাক্ষাৎ শিষ্যদের কয়েকজনকে নিয়ে—তাঁদের মধ্যে ছিলেন মেরি—মাদলেন, ল্যাজারাস, সেন্ট—ম্যাক্সিমিল, আর ছিলেন মেরি—সালোমে—মেরি জাকোবে। আর সারা বলে তাঁদের একটি সখী! এই সারার গায়ের রঙ কালো। বিনা পালের বিনা হালের বিনা দাঁড়ের নৌকোয় ভাসতে ভাসতে তাঁরা এসে এখানে পৌঁছুলেন। নেমে একেকজনে একেক—দিকে চলে গেলেন যীশুর নামের মহিমা প্রচার করতে, কেবল মেরি—সালোমে আর মেরি—জাকোবে থেকে গেলেন কামার্গের প্রচণ্ড গরমেই, যীশুর নামের শরণ নিয়ে। তাঁদের সখী কালো মেয়ে সারাও রয়ে গেল তাঁদের সঙ্গে। কালো বলে জিপসীরা বলে সারা ভারতবর্ষেরই মেয়ে। তাই তাকেই করেছে জিপসীদের আরাধ্য দেবী। সমগ্র জিপসী জাতির রক্ষাকর্ত্রী এই কালো মেয়ে—সেন্ট সারা!

প্রত্যেক বছর মে মাসে এই St. Marie de-la-Mer গির্জেতে একটা বিরাট উৎসব হয়, জিপসীদের তীর্থস্থান এটা। কামার্গের সব কষ্ট সহ্য করে দলে দলে জিপসীরা এখানে তীর্থ করতে জড়ো হয় প্রত্যেক বছরে। এখন কাণ্ডটা এই, পনেরো বছর আগে একটা দৈববাণী হয়েছিল, যে পনেরো বছর বাদে সান্তা সারা আরেকবার প্রাচ্য থেকে কামার্গের সমুদ্রতীরে উপস্থিত হবেন। সশরীরে মে মাসের উৎসবে যোগ দেবেন। সেই থেকে দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে যাযাবর জিপসীর দল সেই মুহূর্তটির পথ চেয়ে দিন—মিনিট গুনেছে। অবশেষে সমাগত সেই পুণ্যবছর, সেই পুণ্যমাস। তাই বছরের গোড়া থেকেই জিপসীরা বেরিয়ে পড়েছিল তাকে খুঁজতে—সেন্ট সারাকে অভ্যর্থনা করতে, সান্তা সারাকে তাদের তীর্থভূমিতে নিয়ে আসতে। কায়রোতে ওকে দেখেই জিপসীরা আশ্চর্য হয়ে যায়, একেবারেই সান্তা সারার মুখ। তারপরে পাসপোর্টে নামটিও উঁকি মেরে দেখে নেয়। যেই দেখেছে সারা—অমনি ওদের মনে আর সংশয় থাকে না যে ইনিই তাদের আরাধ্যা সন্তদেবী সারা, জন্মেছেন জিপসীদের উদ্ধার করতে! St. Marie-de-la-Mer তীর্থস্থানে উপস্থিত করতেই হবে এঁকে। যেমন করে হোক। জ্ঞান কবুল।

ইতিমধ্যে ছোটোমামুকে কেউ এক বোতল শ্যম্পেন সমেত একটা চিরকুট দিয়েছিল তাতে খুব ভদ্র ভাষায় লেখা ছিল—ভয়ের কিছু নেই, ২৪মে St. Marie-de-la-Mer—এর পুলিশ থানায় খোঁজ নিলেই সারাকে অক্ষত দেহে, সুস্থ শরীরে পাওয়া যাবে। কিন্তু ইতিমধ্যে পুলিশে খবর দিলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। সেই চিরকুট নিয়ে ছোটোমামু এই দুদিন ধরে ভীষণ উদ্বিগ্ন অবস্থায় কাটিয়ে ঠিক করেন ২৪শেই খবর দেবেন। ২৪শে পুলিশের থানায় যান এবং সঙ্গে সঙ্গেই সাক্ষাৎ মিলেছে।

যদিও ডাক্তার এবং পুলিশকে ডেকে এনেছে জিপসীরা নিজেরাই—তবু সারাকে ধরে আনাটা তো নিঃসন্দেহে বেআইনি কাজ, কাজেই ছোটোমামু যদি ছেলেধরার মামলা দায়ের করেন, তবে পুলিশ এক্ষুনি এদের গ্রেপ্তার করতে পারে।

শুনেই সারা চেঁচিয়ে ওঠে—’না না, ওরা খুব ভালো, ওদের কোনো শাস্তি দিও না, ছোটোমামু। ওরা আমাকে খুব যত্ন করেছে।’ মামলা করা হবে না শুনে কামার্গের পুলিশও যেন খুশিই হয়। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যায় সারার। সেই গুহার মধ্যে ঢুকে বাঘা কুকুরটাকে দুধ খাওয়ানোর ঘটনাটা। পুলিশকে সেটা জানিয়ে সারা জিজ্ঞেস করে ঘটনাটার মানে কি? পুলিশ হাসে। —বলে—ওই গুহাতেই জিপসীদের সেই বিখ্যাত সন্ন্যাসী বাস করতেন, যিনি এই দৈববাণী করে গিয়েছেন। এই কুকুরটি তাঁরই পোষা কুকুর। ঐ সন্ন্যাসীর আশ্চর্য দৈব—ক্ষমতা ছিল, অনেক কিছু বলে দিতে পারতেন। তিনি মাত্র কিছুদিন হলো মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর কুকুরটি আছে। জিপসীরা যখনই কোনোকিছুর সত্যতা যাচাই করতে চায়, তখন ওরা ওই গুহাতে এসে ওই কুকুরের পাত্রে দুধ ঢেলে দেয়। কুকুর যদি সবটা দুধ খেয়ে ফেলে, তার মানে সবটাই সত্যি। আর একদম যদি না খায়, তবে বুঝতে হবে একদম ভুল, আর অল্প—স্বল্প খেলে, অল্প—অল্প সত্যি—এইরকম সব হিসেব আর কি। ছোটোমামু সারার দিকে লুকিয়ে তাকিয়ে চোখ টিপলে, অর্থাৎ ‘এসব বাজে কথায় খবরদার বিশ্বাস করবি না।’ এমন সময় বাইরে গাড়ির শব্দ হয়। সেই ক্যারাভান গাড়িটা নিয়ে হাসি হাসি মুখে সেই জিপসীরা তিনজন হাজির। গাড়িটা ভরভর্তি ফল, ফুল, কেক, চকোলেট, পানীয়, পানীয়—আর সেই সমস্ত দামী দামী পোশাক।

পুলিশ বলে—’তবে এবার ওঠো সান্তা সারা, তোমার ভক্তদের গাড়িতে। ওরাই তোমাদের এখন এইক্সে পৌঁছে দেবে। ভয়ের কিছুই নেই। তোমাকে পেয়ে ওরা ধন্য হয়ে গেছে। ওদের উৎসব সার্থক হয়েছে।’

ছোটোমামু একগাল হেসে, উঠে দাঁড়িয়ে সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিতে দিতে বললো—’যাক—সন্তদেবীর কল্যাণে আমারও কামার্গটা এই ফাঁকে ঘোরা হয়ে গেল। তুই আবার নিজেকে সেন্ট—ফেন্ট ভাবতে শুরু করিস নে যেন, ওসব আসলে কাকতালীয়, জেনে রাখিস। যত সব কুসংস্কার। জগতে মির‍্যাকল বলে কিছু নেই।’—সারা আস্তে করে জিজ্ঞেস করে—’কাকতালীয় মানে কি, ছোটোমামু?’ ‘মানে তালগাছে একটা কাক উড়ে এসে বসলো আর নীচে দিয়ে একজন লোক যাচ্ছিল, তার সামনে একটা তাল পড়লো; লোকটা ভাবলো কাকই তালটা ওকে পেড়ে দিয়েছে। কিন্তু আসলে তো তা নয়, তালটা পেকে উঠে আপনিই খসে পড়েছে। কাকের বসার সঙ্গে তার মোটে যোগই নেই। তেমনি তোর আসার সঙ্গে তো আসলে ওদের দৈববাণীর কোনো যোগই নেই! দৈবক্রমে মুখের চেহারাটা হঠাৎ মিলে গেছে। ওরকম কত হয়!’

—আর নামটা? সেটাও কি দৈবক্রমে? সারা নিজের মনে মনে ভাবলো—আর আমার ফ্রান্সে আসাটা? সেটাই কি একটা মির‍্যাক্ল নয়? বসন্ত মল্লিক লেনের কোনো বাসিন্দাই কি কখনো ফ্রান্সে এসেছে? বিশেষ করে এত ছোটোবেলায়? গাড়িতে ওঠার সময়ে রাস্তাভর্তি জিপসীদের খুশিভরা উজ্জ্বল মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সারার মনে হলো, ছোটোমামু ঠিক নয়, জিপসীরাই ঠিক—সারারই আসবার কথা ছিল কামার্গে, সারাই ভেসে এসেছিল এই সমুদ্রতীরে পাল—বিনে নৌকোয় চড়ে আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে। এরা সকলেই তাই সারার খুব চেনা, সারার নিকট আত্মীয়। গাড়ি স্টার্ট দিতেই জিপসীদের জন্যে সারার হঠাৎ মন কেমন করে উঠল, যেমন করেছিল মা—বাবা—দিদিদের জন্যে, কলকাতা ছাড়বার সময়ে।

***

প্রবাসে দৈবের বশে

প্রবাসে দৈবের বশে – নবনীতা দেবসেন

হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে - নবনীতা দেব সেন

হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে – নবনীতা দেবসেন

একটি ইতিবাচক প্রেমকাহিনী

একটি ইতিবাচক প্রেমকাহিনী – নবনীতা দেবসেন

ভ্রমণ সমগ্র ২ - নবনীতা দেব সেন

ভ্রমণ সমগ্র ২ – নবনীতা দেবসেন

Reader Interactions

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.