সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
[বইটি ভাল করে প্রুফরীড করা হয়নি। আর ভূমিকার কিছু অংশ মিসিং।]
.
প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী
.
ফ্ল্যাপের লেখা
কথাশিল্পী হিসেবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর জীবনকালেই সমকালীন বাংলা সাহিত্যে এক মর্যাদার আসন করে নিয়েছিলেন। কিন্তু যাকে বলে বিশুদ্ধ মননচর্চার ক্ষেত্র সেই প্রবন্ধসাহিত্যেও তাঁর শিখরস্পর্শী সাফল্য সম্পর্কে আমরা অনেকেই হয়ত সেভাবে অবহিত নই। মৃত্যুর পরে প্রকাশিত তাঁর এই একমাত্র প্রবন্ধগ্রন্থ সংস্কৃতির ভাঙা সেতু-তে পাঠক তাঁর প্রতিভার সেই অন্যদিকটির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন। গল্প-উপন্যাসের মতো এক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন এক স্বল্পপ্রজ লেখক। আবার তাঁর সৃষ্ট কথাসাহিত্যের মতোই প্রবন্ধগুলোও তাঁর গভীর জীবনবোধ, বিষয়কে তার সমগ্রতায় দেখার চোখ এবং শিল্পীর দায়বদ্ধতায় তাঁর বিশ্বাসকে তুলে ধরে।
লেখক বা সংস্কৃতিকর্মীর দায়িত্ব, উপন্যাসে সমাজ বাস্তবতা, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পদৃষ্টি, বুলবুল চৌধুরীর প্রতিভা, রবীন্দ্র সঙ্গীতের শক্তি, সূর্যদীঘল বাড়ি বা গান্ধী চলচ্চিত্র, ছোটগল্পের ভবিষ্যৎ কিংবা কায়েস আহমেদ বা অভিজিৎ সেনের মতো সমকালীন লেখকদের রচনা প্রভৃতি যে-বিষয়েই তিনি কথা বলুন না কেন, তাঁর সুগভীর অন্তর্দৃষ্টি, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি ও অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ক্ষমতা আমাদেরকে বিস্ময়-বিমুগ্ধ করে। এমনকি যেখানে আমরা তাঁর সঙ্গে একমত নই সেখানেও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে আমরা পারি না।
তাঁর গল্প-উপন্যাসের মতোই প্রবন্ধগুলোও হয়ত একটানে পড়া যায় না কিংবা পড়েই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা যায় না। ভাবতে-ভাবতে পড়তে হয়, আবার পড়তে-পড়তে থমকে ভাবতে হয়। কখনো তা পাঠককে ঝাঁকুনি দিয়ে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ‘জীবনযাপনের মধ্যে মানুষের গোটা সত্তাটিকে’ প্রকাশের যে দায়িত্বের কথা ইলিয়াস বলেছেন ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বা ‘খোয়াবনামা’র পেছনে তাদের স্রষ্টার সে নিখাদ দায়বোধ ও দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতির চিনে নিতেও প্রবন্ধগুলো আমাদের সাহায্য করে।
.
প্রকাশকের নিবেদন
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মৃত্যুর পরপরই এই একমাত্র প্রবন্ধগ্রন্থটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় লেখক বইটির জন্য একটি ভূমিকাও লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর, লেখকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, ১৯৯৭-এর একুশের বইমেলায় আমরা প্রকাশ করেছিলাম তাঁর শেষতম গল্পগ্রন্থ জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর প্রবন্ধগ্রন্থ সংস্কৃতির ভাঙা সেতুর বাংলাদেশ সংস্করণের দায়িত্ব নিয়েও নানা কারণে এতদিন আমাদের পক্ষে তা প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। দেরিতে হলেও লেখকের এই অনন্যসাধারণ গ্রন্থটি এদেশের পাঠকদের হাতে তুলে দিতে পেরে আমরা নিজেদের কৃতার্থ মনে করছি। আমাদের আশা এই গ্রন্থটিতে পাঠক সমকালীন বাংলাসাহিত্যের একজন সেরা লেখকের প্রতিভার ভিন্নমাত্রার সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন। শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল্যবান ভূমিকাটি আমরা বর্তমান সংস্করণেও সংযোজন করলাম। আর এজন্য শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় ও ‘নয়া উদ্যোগ’ (কলকাতা)-এর কাছে আমরা ঋণী। গ্রন্থটি প্রকাশের অনুমতি দেয়ার জন্য আমাদের কৃতজ্ঞতা সুরাইয়া ইলিয়াসের প্রতি।
আহমেদ মাহমুদুল হক
.
কৃতজ্ঞতা
এই লেখাগুলো নানান আলোচনা সভায়, আড্ডায়, এমনকী দু-একটি সেমিনারেও বলা হয়েছিল, পড়া বলতে যা বোঝায় তা হয়নি। কারণ এদের কোনো নির্ভরযোগ্য খসড়া তখন ছিল না। পরে বদরুদ্দীন উমরের চাপে, আনু মুহাম্মদের তাগাদায় আর মাহবুবুল আলমের উসকানিতে এগুলো বর্তমান চেহারা পায়। এবং বিভিন্ন সাময়িকীতে ছাপা হয়। লেখার সময় এগুলোকে বই-এর মধ্যে আনার কোনোরকম প্রস্তুতিই ছিল না। কিন্তু ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লেখাগুলো জোগাড় করে ফেলেন সুশান্ত মজুমদার, ফিরোজ আহ্সান, হাসান হাফিজ, মঈনুল আহসান সাবের, আজিজ মেহের, শোয়েব আনোয়ার ইলিয়াস, গৌরাঙ্গ মণ্ডল, অমিতাভ মালাকার এবং শাশ্বত ভট্টাচার্য। এবং তরুণ পাইন কলকাতা থেকে বইটি ছাপার ব্যাপারে প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগও করেন।
শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা আমার একটি বড় ভরসা। তিনি এই লেখাগুলোর মধ্যে কোনো কোনো বিষয়ে লেখকের উদ্বেগ ও ভাবনার ঐক্য লক্ষ করেন। এতে যদি দু’মলাটের মধ্যে এদের সহাবস্থান, শাস্তিপূর্ণ না হলেও, মেনে নেওয়া যায়।
এই লেখাগুলো তৈরি হওয়ার এবং বই হিসেবে ছাপার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আমার গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই।
বইটি প্রকাশের ঝুঁকি নেওয়ায় ‘নয়া উদ্যোগে’র পার্থশংকর বসুর দুঃসাহস দেখে অবাক হই। তাঁকে ধন্যবাদ।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
৫ ডিসেম্বর ১৯৯৬
৭০ এ আজিমপুর এস্টেট
ঢাকা ১২০৫
.
ভূমিকা
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, চিলেকোঠার সেপাই-খোয়াবনামার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, স্পষ্ট চাঁচাছোলা ভাষায় আওয়াজ তুলেছেন : বাংলা উপন্যাস এবার রং ফেরাক : বন্ধ হোক “মধ্যবিত্ত ব্যক্তির তরল ও পানসে দুঃখবেদনার পাঁচালি”, কথায়-কথায় মধ্যবিত্তকে, মধ্যবিত্তের ছকে ফেলা কোনো ধাঁচকে, চরম-পরম বলে চালিয়ে-চাপিয়ে দেওয়ার কেচ্ছা। সন্দেহ নেই, ইলিয়াস যত উঁচু তারেই স্বর বাঁধুন, অধিকাংশ লেখক তাঁর আবেদনে সায় বা সাড়া দেবেন না, হাড়ে পাঁজরায় মিশে থাকা হাজার-এক সংস্কার, হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে আসা নানান পাওনা বিশ্বাস খেলাচ্ছলেও বাজিয়ে দেখবেন না। মুখে যাই জপান মনে-মনে তাঁরা ঠিক জানেন : খেলার প্রতিভা কম হলেই মঙ্গল : ঝুঁকি নিলে ঝক্কি বাড়ে, পরের পর ‘তলবহুল’ উপন্যাস গেঁথে তোলায় বেকার বাধা পড়ে। যাঁদের সহজ সিদ্ধি আর যুক্তহস্ত দানে বাংলা উপন্যাস ক্রমশ নিরাপদ হয়ে উঠেছে, আদতে তাঁরা কোনো না কোনো অতিচর্চিত অতএব বহুবিদিত বয়ানের ঘেরে ঘোরে বন্দী। তাঁদের ভূমিকাও তাই একটাই : চালু সব বাচন-রচনাকে শুদ্ধ ও টেকসই রাখতে, দাগকাটা সব বাক-এলাকায় অবাঞ্ছিত অনুপ্রবেশ রুখতে, সীমান্তরক্ষীবৎ টহল দিয়ে ফেরা। অন্যদিকে ইলিয়াসের অভিমত : “কঠিনেরে ভালোবাসিলাম—এটুকু জেদ না থাকলে কারও শিল্পচর্চায় হাত দেওয়ার দরকার কী?” সে জেদ যে অন্তত জনতোষ সাহিত্যের জোগানদারদের নেই, থাকবার কারণও নেই, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রচলিত মর্জিরুচির পোষক, সমাজবিবেকের অভিভাবক, দিকপাল সব লেখকদের পক্ষে তাই ইলিয়াসকে সহ করা, তাঁর সঙ্গে বনিবনায় আসা, বড়ই কঠিন। ইলিয়াস নিজেও তা ভালোরকম জানেন। জানেন বলেই তাঁর অভিপ্রেত পাঠক ও আবেদনের মূল লক্ষ্য বিশেষ এক গোষ্ঠীর লোকজন। সংখ্যায় নগণ্য হলেও তাদের রোখ আছে, রোষ আছে, কায়েমি স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যোঝবার জোর আছে। নিরেট বন্দোবস্তের ছিদ্র-সন্ধানে তৎপর, স্বভাব-জেহাদি এই লেখককুলই ইলিয়াসের বলভরসা : ব্যবস্থার বাম যারা তাদের সঙ্গেই তাঁর যত যা বিনিময়, যত যা বোঝাপড়া!
ইলিয়াস অবশ্য শুধু সন্ধি পাতিয়ে ক্ষান্ত হওয়ার পাত্র নন : মিতালির সুবাদে সংলাপের যে-জমি তৈরি হয় তাকে পুরোপুরি কাজে লাগান : সমগোত্রের লেখকদের রচনায় আপোসের ফাঁকি পেলে চাপঢাকার বদলে নির্মম ভাবে উদ্ঘাটিত করে দেন, দরকারে খোলাখুলি সংঘাতে নামতেও পিছপা হন না। অযথা সমীহ করা বা ভাবালু প্রশ্রয় জোগানো স্পষ্টবাক ইলিয়াসের ধাতে নেই—যে যত নিকট তার যাচাই পরখে তত নির্মোহ তিনি। এটাই তাঁর সমালোচনার দস্তুর, ফের আত্মসমীক্ষারও।
চিলেকোঠার সেপাই-এর পর যিনি খোয়াবনামা লেখেন—এতই আলাদা দুই বই যে মনে হয় মলাটে লেখক-নামের মিলটা নেহাৎ কাকতালীয়— তাঁরই বলা সাজে : স্বউদ্ভাবিত রচনা-প্রণালীও এক মস্ত ফাঁদ; কারও যদি “নিজের ব্যবহৃত, পরিচিত ও পরীক্ষিত রীতির বাইরে যেতে বাধো বাধো ঠেকে,” “নিজের রেওয়াজ ভাঙতে মায়া হয়”, তাহলে বুঝতে হবে তার শিল্পীজীবনে ইতি এই ঘনালো বলে। আর যার হোক; নিরাপত্তার স্বস্তি কখনো শিল্পীর অন্বিষ্ট হতে পারে না। বাস্তবতার দোহাই পেড়ে, সামাজিক অদলবদলের সঙ্গে নিছক তাল গুনে ঠেকা দেওয়াও তার কাজ নয়— পরিবর্তনের ঝোঁক কোনদিকে ধরতে চাইলে সাহিত্য-পাঠের পরিসরে জেনেবুঝেই তাকে গড়তে হয় অংশস্বতন্ত্র বিকল্প এক জগৎ। ঐ জানাবোঝার প্রেরণায় কেবল ‘বক্তব্য’ বা ‘সিদ্ধান্ত’ নয় পালটে যেতে পারে গোটা শিল্পঅবয়ব – তাতে হয়তো এমন কথাও তৈরি হতে পারে সাম্প্রতিকের নজিরসাক্ষ্যে যার তল পাওয়া দুষ্কর। অবশ্য আজ না হোক, কাল বা পরও ঠিক পাঠোদ্ধার হবে, উপস্থাপনার প্রয়োগসিদ্ধ রীতি ত্যাগ করলেই মোক্ষ মিলবে, তেমন স্থিরতাও নেই। ঐ অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও যারা বাস্তবের সম্ভাব্যতাকে খতিয়ে দেখতে যায়, শেষ পর্যন্ত হয়তো তাদের দু-একজন, সমাজরূপান্তরের যুক্তি চিনে ঘটিয়ে দেয় সাহিত্যযুক্তির রূপান্তর। গল্প-উপাখ্যানে যেমন ঘটিয়েছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। সুতরাং এতে অবাকের কিছু নেই যে প্রাবন্ধিক ইলিয়াসের প্রধান অভিযোগ ও আক্ষেপের বিষয় হয় : স্পর্ধা থাকলেও, সাহস থাকলেও, বেশির ভাগ ‘বিপ্লবী’ লেখক সংকল্পের যোগ্য আধার খুঁজে পায় না কেন, চলতি মতের, চলতি মডেলের বিরূপত্তা সত্ত্বেও কিসের দায়ে কোন সে বাধায় ঠেকে যায় তারা?
ইলিয়াসের প্রশ্নের একটি সিধেশাদা জবাব হল : ‘আত্মচেতনা’র খামতি। সে-খামতি প্রকারভেদে বিচিত্র, তার দুর্লক্ষণও প্রচুর। তবে ঐ অ-ভাবকে নির্দ্বিধায় শনাক্ত করতে স্রেফ একটি লক্ষণ যথেষ্ট। সেই মোক্ষমটি হল : নৈতিকতার তামাম সমস্যাকে নীতিবাদিতার সহজ ঢং-এ, সরল অঙ্কে পেশ করা; রপ্ত ভাষা -অভ্যাসের চাপে, জাস্তে বা অজান্তে, শ্রেয় ও প্রেয়র ভেতর গোল পাকিয়ে একের ঘাড়ে অন্যকে চাপিয়ে দেওয়া। এর ফলে কখনো, যা আমাদের আছে, যাতে আমাদের তৃপ্তি, যার প্রতি আমাদের মমতা, তাই অন্বেষণের নামে, সংগ্রামের নামে, ‘নতুন’ কলেবরে ফিরিয়ে আনি : আর কখনো, আদর্শ কোনো নিরিখ বানিয়ে, ভাবের ধ্বজা উড়িয়ে, এই ভেবে বেজার হই কিছুই কেন সাধের আদর্শভাবের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না ঐ গরমিল নিয়ে এমন চিন্তিত, এমন পীড়িত হই যে, চারধারে যাই দেখি তাই মনে হয় বিকারগ্রস্ত, অসুস্থ। একদিকে : ‘যা আছে’র স্তুতিগান; অন্যদিকে : ‘যা-নেই’ তার জন্যে হাহাকার। দুই মনোভাব বা প্রেক্ষিতের ভেতর ফারাকটা কি নেহাৎ আপাত নয়। ‘যা আছে’ এবং ‘যা-নেই’ দুয়ের ধারণাই যদি গোলাকার ও পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম ও সম্পূর্ণ হয়, দুই ভাবনারই আধেয় যদি সমান চিরসাব্যস্ত ইতিবাচক হয়, তাহলে কি হরেদরে ব্যাপারটা একই দাঁড়ায় না? সত্যের নির্বিকল্প ছাঁচ যত গেঁথে বসে চৈতন্যে তত বাড়ে শুচিবায়ুর প্রকোপ – কাড়া -আকাড়া ছানতে বাহুতে এতই মগ্ন, এড়িয়ে-বাঁচিয়ে চলতে এতই ব্যস্ত, কাটছাঁট করতে এতই নিবিষ্ট হয়ে পড়ে গুরুগম্ভীর নীতিবাগীশরা যে তাদের আর খেয়াল থাকে না, তালেগোলে কবে ব্যবস্থার ছিদ্র সন্ধানের কাজটাই গেছে ভেস্তে। ‘সমাজস্বাস্থ্য’ সম্বন্ধে পাকাপোক্ত কোনো বিধানকে সামনে রেখে যে-যাত্রার সূচনা, পরিণতিবাদী সে-যাত্রার অনিবার্য পরিণাম : সূচনা-বিন্দুতে ফিরে আসা। যার বিশ্বাস, বাইরের খোলস ছাড়াতে-ছাড়াতে একদিন ঠিক পাওয়া যাবে চিরসত্যের ঠিকানা, অবশেষে উন্মোচিত করা যাবে অক্ষত অন্তঃসার, সে আসলে অনড় : তার যাওয়া তো নয় যাওয়া। যে প্রশ্নের উত্তর আগেভাগেই ফাঁদা, ইতোমধ্যে জ্ঞাত, সে-প্রশ্ন উত্থাপন করার অর্থ হয় : ‘যা-নেই’কে ‘যা-আহে’র শাসন-অধীনে রাখা, আত্মনির্মাণের আখ্যানকে আর বাড়তে না দেওয়া। নিয়ন্ত্রণের চোরা অভিলাষ আছে বলেই না নীতিবাগীশরা অমন গোমড়ামুখো আর খিটখিটে, পরের জরিপতদন্তে অমন নির্দয়। নিঃসম্পর্কের সমালোচনা আত্মরক্ষার বর্ম বিশেষ তাতে নিজেকে ছেড়ে স্বচ্ছন্দে আর সবাইকে দু-হাত নেওয়া যায়। আত্ম-পরের নিপুণ বিশ্লেষ স্বচ্ছ করে দেয় বিশ্বকে–‘শ্রেণী’ বা ‘লিগ’-সম তত্ত্বপ্রকল্পের, সমষ্টিবাচক যোগাত্মক সব ধারণার প্যাঁচপয়জারে জড়িয়ে পড়ার ভয় কাটে, ভুলের ভবে পথ খুইয়ে অহেতুক ঘুরে মরার আশঙ্কা দূর হয়। নৈতিকতার স্থলে নীতিবাদিতার মন্ত্র জপে বিস্তর সুবিধে আদায় করলেও একটি ব্যাপারে নীতিবাগীশেরা পার পায় না : হাস্যরসের বেলায়। তাদের রচনায় খুচরো ঠাট্টামস্করা-ব্যাঙ্গবিদ্রূপ ও বাঁধা গৎ-এর বক্রোক্তি মিললেও, ইলিয়াস-কথিত “কৌতুকে ক্রোধের শক্তি” কিংবা আর এক সম্ভাবনা, আক্রোশে রঙ্গের ছটা, হাজার চুঁড়লেও মিলবে না। ঐ শক্তি ও দ্যুতির উৎস হরেক স্বর ও অবস্থানের প্রতি যুগপৎ দরদ ও বিরাগ। একাধারে কৌতূহলী এবং বীতস্পৃহ হবে, যোগ-বিয়োগের দুই খেলায় মাতবে সমান উৎসাহে, নৈতিকতার দায় মেনেও সাজিয়ে দেবে উৎসবের পসরা, ভারিক্কি চালের তিরিক্ষে মেজাজের ভদ্রলোকদের কাছ থেকে তেমন প্রত্যাশা করা অসংগত, অশোভনও বটে। ভাবের ঘরের বাসিন্দাদের অন্য ঘরে অন্য স্বর শোনার সময় কই? বস্তুজ্ঞানের এমন বহর যে তাদের জড়-অজড়ের ডায়ালেকটিকে ‘জড় জিনিসটাই বেপাত্তা—’চৈতন্যে’র খবরদারিতে নিত্যরত ব্যস্তমস্ত ভাবুকরা শরীর নামক পদার্থটিকে দেখে কেবল ঠারেঠোরে, যৌনতার অবাধ প্রবেশ প্রকাশ নিষেধ তাদের ভাবদুনিয়ায়। দোকানদারি বুদ্ধির বশে যৌনকর্ম আর যৌন আবেশ-স্ফুরণের মাপতোল এক বাটধারাতেই চালায় সভ্যতব্যরা। অতি অল্পে নিবৃত্ত হয় যারা তাদের উদ্দেশ করে এঙ্গেলস কবেই বলেছিলেন : ‘(এদের) লেখা পড়ো, তোমার সত্যি মনে হবে, জনগণের বুঝি যৌনাঙ্গ বলেই কিছু নেই।’ ইলিয়াসের গল্প-উপন্যাসে দেদার রঙ্গশ্লেষ আর যৌনতার খোলামেলা বিবরণ যে একে অপরের লাগোয়া আদৌ তা আপতিক নয়। “নীতিবাগীশ ব্যাপারটা মার্কসবাদের সঙ্গে খাপ খায় না”, এই যাঁর ঘোষণা তাঁর পক্ষে ও-দুয়ের মিশেল ঘটানো খুব স্বাভাবিক।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রবন্ধে-সাক্ষাৎকারে -আলাপচারিতায় জন কয়েক বাঙালি সাহিত্যিকের নাম-প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসে। যেমন: সুকুমার রায়। তাঁর মতে : “স্যাঁতসেঁতে তরল আবেগতাড়িত” বাঙালিদের ভিড়ে আগাগোড়া বেমানান, “জীবনের সব বিষয় নিয়ে অবিরাম মজা করার ক্ষমতায়” অদ্বিতীয় সুকুমারের বৈশিষ্ট্য ঠিক এখানেই যে তিনি “কখনো মুগ্ধ করেন না, হাসাতে হাসাতে সচেতন করে তোলেন”, “তাঁর প্রতি ভক্তিতে গদগদ হওয়ার সুযোগ তিনি নিজেই দেন না”। তুলনীয় কারণে সুকুমার রায় বাদে আরো দুই কৌতুকের কারিগর ইলিয়াসের অতি প্রিয় : ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় ও শিবরাম চক্রবর্তী এবং অতি অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ : “যাঁর দেখার মধ্যে কোনো কিছুর সঙ্গে মাখামাখি ভাব ছিল না” তাঁর কৌতুকবোধও যে অসামান্য হবে এতে বিষয়ের কিছু নেই।
এঁদের পাশেই আছেন : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। রবীন্দ্রনাথ-ত্রৈলোক্যনাথ-সুকুমার শিবরাম মানিক ও ওয়ালীউল্লাহর রচনা চালচেহারায় পৃথক : কোথাও স্বখণ্ডিত কখনো পরস্পরবিরোধী : তা-ও এঁদের নাম একসারিতে বসাতে ইতস্তত করেন নি ইলিয়াস। তাঁর যুক্তি : কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো ভাবে, ‘নির্বিকার, অথচ নিরপেক্ষ নই’ এই দুরূহ সমন্বয় সত্য করে তুলেছেন ঐ পাঁচ শিল্পী। পক্ষপাতী নির্বিকারের চোখেই ধরা পড়ে বিকারের লক্ষণ। যার স্বাস্থ্য’ নিয়ে বাড়তি মাথাব্যথা নেই, ‘সাবধানের মার নেই’ আপ্তবাক্যে মাত্রাছাড়া আস্থা নেই, সে-ই সুস্থ। সে-স্বাস্থ্য’ সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে বহির্জগতের সঙ্গে লিপ্ত হওয়ার সামর্থ্য, এক প্রবল ইন্দ্রিয়ম্মন্যতা। অন্যদের মতো আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকেও তা অর্জন করতে হয়েছে : কঠোর শ্রমে, কঠিনকে ভালোবেসে।
যে কখনো করে না বঞ্চনা : তাকে পেতে হলে এক মারাত্মক প্রমাদ থেকে আগে রেহাই পাওয়া দরকার : মুক্ত বিষয়ীর বিভ্রম। কর্তা আমি, কর্ম জমি, ক্রিয়াও আমি, স্বয়সাধনের প্রতিটি পর্বে নিত্যবর্তমান আমি— এ-স্বেচ্ছাবাদ, আর কিছু না, আত্মপ্রবঞ্চকের ভ্রান্তিবিলাস। শুধু ‘চৈতন্য নিয়ে যার কারবার, যার হিশেবনিকেশে ‘স্পৃহা’ আর ‘প্রয়োজন’ পাশাপাশি ঠাঁই পায় না, পঞ্চভুতের বিষয়রূপ নজরে আসে না, খোদ ‘আমিত্বে’র বোধটাই তার অচিরে লোপ পায়। তন্ময় সমাজবিজ্ঞানী আর মন্ময় শিল্পীর মধ্যে তেমন তফাৎ নেই—-অন্তিমে দুজনেরই এক রা, এক রায়। একপ্রান্তে নির্দেশ্যবাদ : ব্যাকরণের বাঁধাবাঁধি; ব্যক্তিউচ্চারণ : দমিত-শাসিত। অন্যপ্রান্তে স্বেচ্ছাবাদ : ব্যতিক্রমের ছড়াছড়ি; ব্যক্তিউচ্চারণ : উদ্দাম-উচ্চও। এ দুয়ের ফেরে মাঝখান থেকে আসল কথাটাই উবে যায় : স্বাধীনতা’র প্রাকশর্ত ‘আবশ্যিকের মর্মোদ্ধার; বিষয়বন্ধনের সত্য যার এড়িয়ে যায় তার আবার মুক্ত বিষয়ীর অহংকার! বয়ান-সীমানার লঙ্ঘন যদি কারো লক্ষ্য হয় তাহলে ‘সীমা’ অনুধাবনের দায়ও তার ওপর বর্তায়। বস্তুর ‘বিচার’ শব্দের তাৎপর্যই হল সীমাসরহদের বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা। মিশেল ফুকো যাকে বলেন limit attitude’, সীমা-নিরীক্ষা’, তা একইসঙ্গে ইতি এবং নেতিমূলক বাধা সম্বন্ধে অবহিত হলে তবেই না বাধা পেরোবার প্রশ্ন ওঠে। মানবসমাজের আর বিশটা জিনিসের মতো গল্প উপন্যাসও অগুনতি ক্রিয়াবিক্রিয়ার, সমবেত চর্চাউদ্যমের পরিণাম, নিখাদ একক সৃষ্টি নয়। লিখন মানেই পুনর্লিখন : ভিন্ন কোনো পাঠের ভেতর থেকে, সমঝোতা বা বিবাদ যে-সুবাদে হোক, নতুন কিছু খাড়া করা দাগ কাটতে দাগা বোলাতেই হয় শিল্পীকে। নিশ্চেতন দাগা বোলানো রক্ষা করে ধারাবাহিকতা : সচেতন দাগা বোলানো দেখিয়ে দেয় কত রন্ধময় সে ধারাবাহিক। বিপরীত বিহারে মতি হলে লেখক আপনা থেকেই পঠন-ক্রিয় হয়ে ওঠে, উৎখননে নামে নিজের গরজে। ঐ গরজের অপর নামই ইতিহাসবোধ। ভাষা-অবস্থার বিচার মানে আত্মবিচারও, যে-আত্মতার অংশভাক আমি তারও বিচার। ‘যা আছে’, ‘যা হয়েছে’ তার খতিয়ান না নিয়ে নিজেকে স্বসম্পূর্ণ ভেবে যা ইচ্ছে তাই করলে, বাংলা সন্ধির নিয়ম মোতাবেক যা হয় তা ‘যাচ্ছেতাই’। পঠন-লিখন কূটগ্রন্থির এমনই মহিমা কেবল যে ঐ খতিয়ান নেওয়ার বাবদে নতুন কোনো আখ্যানের দিকে এগোতে পারে লেখক। খোয়াব বিনা গত্যন্তর নেই; আবার, ইলিয়াসের জবানিতে : “স্বপ্নের বিশ্লেষণ ছাড়া স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার আয়োজন নেওয়া যায় না, জিজ্ঞাসাবঞ্ছিত স্বপ্ন এক ধরনের ইচ্ছাপূরণ মাত্র।” স্বপ্নজিজ্ঞাসার তাগিদেই গল্পকার-ঔপন্যাসিক ইলিয়াসকে ঢুকতে হয় বাংলা গল্প-উপন্যাসের কন্দরে, সেখানে সঞ্চিত যত উক্তি-উপলব্ধি সব ঝেড়ে বেছে দাখিল করতে হয় স্বনির্বাচিত এক সংকলন। যে তাড়নাতে তারাবিবির মরদ পোলা বা চিলোকোঠার সেপাই-খোয়াবনামা লেখেন সে তাড়নাতেই পদ্ম-উপন্যাস নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন তিনি। ইলিয়াসের সাহিত্যচিন্তার সূত্রে ইলিয়াসের সাহিত্য পড়ায় হয়তো বিপাক আছে, কিন্তু এটুকু অন্তত জোর দিয়ে বলা যায়, তাঁর কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের পেছনে রয়েছে অভিন্ন রাজনৈতিক অভিনিবেশ। প্রবন্ধে তাই রাগ-ক্ষোভ-হাসি সব নিয়েই ইলিয়াস উপস্থিত–পদ্ম-উপন্যাসে যেমন তেমনি এখানেও তন্ন তন্ন করে দেখেন বাঙালি মধ্যবিত্তকে, জানতে চান ইতিহাসের কোন বাঁকে কোন উপায়ে সমাজ-সংস্কৃতির ভরকেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় সে, মধ্যবিত্তের সৃষ্টিতে সচরাচর কোন আদলে কোন গ্রন্থনায় হাজির হয় প্রান্তদেশের লোকজন — কোন রহস্য সে-আখ্যানে?
অতএব আশ্চর্যের কী, শিল্পসাহিত্য, শুধু শিল্পসাহিত্য কেন, রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতি, বিষয় যাই হোক, ইলিয়াসের বিচারভাবনায় প্রায় আদি-প্রত্যয়ের গুরুত্ব পায় এক বিশেষ তত্ত্বধারণা : ‘ব্যক্তি’। তাঁর চোখে; ‘আধুনিকতা’র ইতিবৃত্তে অন্যতম প্রধান ঘটনা : ‘ব্যক্তির উত্থান ও পতন, ক্রমবিকাশ ও ক্রমবিনাশ। পুঁজিবাদের সঙ্গে, নব্য-বিজ্ঞানের সঙ্গে পুঁজিবাদের অচ্ছেদ্য যোগ : “ব্যক্তির আয়নায়” তাই ধরা দেয় পুঁজিবাদের শক্তি ও শোষণের চেহারা, বিজ্ঞানের কল্যাণ ও ধ্বংসের মূর্তি। ইলিয়াসের অভিধানে যা “ব্যক্তির আয়না” তারই পারিভাষিক আখ্যা : ‘উপন্যাস’। পুঁজিবাদের প্রথম লগ্নে, ‘ব্যক্তি’ যখন সবে জাগছে, একটা বেতো ঘোড়ায় চেপে উদ্ভট সব অভিযানে বেরিয়ে পড়ে লম্বা টিঙটিঙে দন কিহোতে। ইলিয়াসের বিশ্বাস : সে অভিযান আজ অব্দি বহাল আছে – বাস্তব ও বিভ্রমের আলেখ্য নানান রূপে প্রকাশ করে চলেছে ব্যক্তিচরিত্র। তাঁর উপন্যাস-সংক্রান্ত আখ্যানে দন কিহোতের আজব কাণ্ডকারখানা, সারভান্তেসের রোমান্স-বিরোধী পাঠ, আরম্ভবিন্দুর মতো— “চাকমা উপন্যাস চাই” ধ্বনি তোলার সময়েও দন কিহোতেকে স্মরণ করতে তাঁর ভুল হয় না। এর কারণ কি এই, পুঁজি যেমন ভৌগোলিক সীমার বেড়া মানে না, মানলে তার পোষায় না, তেমনি ‘ব্যক্তি’র আবিভার্বও অরোধ্য, সময়ের হিসেবে সামান্য হেরফের হলেও, দেশে-বিদেশে তার উদয় ঠেকানো অসম্ভব? ঐ বিমূর্ত ‘ব্যক্তি’ কি সংজ্ঞায় অবিকল্প, ধাম বহু তবু নাম একশত ভঙ্গে ভরা আধুনিক পৃথিবীতে তাও কি হয়। এই দুই প্রশ্নের টানাপোড়েনে দ্বিধান্বিত ইলিয়াস মাঝেমধ্যেই পালটে ফেলেন অবস্থান — সুনিশ্চিত কোনো সমাধান দিলে তৎক্ষণাৎ জাগে সংশয়।
পুঁজির আন্তর্জাতিকতা বড় বিষম ব্যাপার। স্থলে-জলে-অন্তরীক্ষে সর্বঘটে তার বিচরণ, কিন্তু তার ওপর দখল সবার সমান পাকা নয়। ঔপনিবেশিক তো বটেই, উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগেও ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় ভারত-বাংলার কপালে পুঁজির প্রসাদ তেমন জোটে নি। হৃষ্টপুষ্ট প্রথম বিশ্বের পাশে তৃতীয় বিশ্বকে বেজায় রুপণ, বেজায় রোগাটে লাগে। ‘ব্যক্তি’-বিকাশের মাত্রা যদি কেবল পুঁজির ভাগের অনুসারে নির্ধারিত হয়, তাহলে কে না মানবে : উপনিবেশের ব্যক্তি; জন্মমুহূর্ত থেকেই ক্ষীণ বিকলাঙ্গ, ইউরোপীয় বা মার্কিন বুর্জোয়ার মতন তেজ বা দাপট দুটোর কোনোটাই নেই। একই যুক্তিতে, দুর্বল ‘ব্যক্তি’র আয়নাও তথৈবচ : ঝাপসা, ধোঁয়াটে। প্রাগাধুনিক পশ্চাটান, অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস, কুসংস্কার, উপনিবেশের উপন্যাসকে জোরদার সাজোয়ান কিছুতেই হতে দেয় না। উপনিবেশের ভৃত্যদের তাই দূর্ভোগের অন্ত নেই : প্রভুর নকল করতে চায়, করতে যায় অথচ বারেবারেই পশু হয় সব আয়োজন। দুষ্টচক্রের এই নক্সা, এই নিদানের আড়ালে আছে একটি সরল প্রত্যয় : পশ্চিমের আখ্যান আর পঁচিশটা আখ্যানের মতো ঠুনকো নয়, তা এক অধিআখ্যান : যাবতীয় বস্তুর শেষ ও সার, বিচারের এক ও অনন্য মাপকাঠি। যেন, পশ্চিমখণ্ডে যা প্রত্যক্ষ, যা জীবন্ত, তার অস্ফুট আভাস, তার প্রেতচ্ছায়া বাদে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে আর কিছু নেই : নেহাৎ যদি টুকরো-টাকরা বেখাপ কিছু থাকেও আদৌ সে-সব ধর্তব্য বা বিবেচ্য নয়। মার্কস কবেই সাবধান করে দিয়েছিলেন : পশ্চিমের ক্রমগতির গল্পকে সার্বভৌম ঐতিহাসিক-দার্শনিক তত্ত্ব, সবখোন চাবি বানানো, ইউরোপীয় দত্তের এক নমুনা : অন্য ভূখণ্ডের অধিবাসীদের ক্রমমুক্তির পথে অন্তরায় তৈরি করার কল মাত্র। আমরা, উপনিবেশের মানুষরা, বিশেষত উচ্চবর্গের মানুষরা যে, অনেকসময় বিনা তর্কে পশ্চিমি মধ্যস্থতাকে মেনে নিই, মেনে নিই সহজ অভ্যাসে, তার অঢেল প্রমাণ আমাদের ইতিহাসে আছে। ফলে, প্রায়শ ভুলে মেরে দিই, ক্ষমতার দিগ্বিজয় সত্ত্বেও, পুঁজির ভুবনজোড়া প্রসার ও প্রতাপ সত্ত্বেও, পশ্চিমের নজিরে কোনো আখ্যান—-রাষ্ট্রতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক অথবা সাহিত্যিক পূরো গড়া বা পড়া যায় না। অমন বাঁকিয়ে চাওয়ায় আমাদের যা আছে’, ‘যা হয়েছে তার চিহ্নসংকেত নিজেরাই চিনতে পারি না। বাঙালি মধ্যবিত্তকে ইউরোপীয় বুর্জোয়ার এক তরণিত সংস্করণ হিসেবে দেখবার ঝোঁক, সংজ্ঞার নানাত্ব নামঞ্জুর করে ‘ব্যক্তি’কে ‘homo-economicus’ বা ‘আর্থ-মানবের’ বকলমে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, জায়গায়-জায়গায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো দলছুট লেখকের প্রবন্ধেও রয়েছে। যাঁদের ঘোর অপছন্দ করেন, যেমন বঙ্কিম, তাঁদের আলোচনাতেই সবচেয়ে অসতর্ক তিনি। নিঃসন্দেহে, তুলনা-প্রতিতুলনা শুধু প্রয়োজনীয় নয়, অপরিহার্য, আধুনিকতার অঙ্গই একরকম। তা ভুলে, যা আছে তা-ই খালি মহিমামণ্ডিত করে চললে জাতীয়তাবাদী/ মৌলবাদী গাড্ডায় পড়তে হতে পারে, কিন্তু আবার তুলনার মানদণ্ড চূড়ান্ত-অনড় হলে তার দরুনও কম দণ্ড দিতে হয় না। এই উভয়সংকট থেকে নিস্তার পেতে দরকার এক নতুন সমস্যাপট; আমাদের ‘সজ্ঞান’ অতএব টানটান ইতিহাসবোধের মধ্যে ‘অজ্ঞান’ অতএব এলোমেলো যুক্তি-তক্কো গল্পের সংক্রাম, সার্বভৌম ঐতিহাসিক-দার্শনিক তত্ত্বের ভূত ঝাড়তে আঞ্চলিক খোয়াবনামা। ঐ নতুন সমস্যাপটের, ‘খোয়াবনামা’র, ছাপ বা নিশান কি ইলিয়াসের সাহিত্য-আলোচনায় আছে?
ইলিয়াসের আদর্শ ‘ব্যক্তি’ আসলে দ্বিধাবিভক্ত, দ্বৈতসত্তার : বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নায়ক আবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথিকৃৎ-ও। গোলটা ঠিক এখানেই। ইউরোপীয় সমাজ-আখ্যানের মডেল-নির্ভর ধারাভাষ্য অনুযায়ী : প্রথমজনকে এড়িয়ে গেলে দ্বিতীয়জনের সাক্ষাৎ পাওয়া ভার; প্রগতির পর্যায়ক্রম, সামাজিক বিবর্তনের রূপরেখা উপেক্ষা করে ধনতন্ত্র টপকে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর চেষ্টা, হঠকারিতার সামিল। ঐ বিধির বাঁধন পশ্চিমের উপহার : কাটে কার সাধ্য! আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতন শক্তিমান লেখকও সবসময় তা পারেন নি; ধারাবিবৃতির ধোঁয়াশা কোথাও কোথাও তাঁকেও আচ্ছন্ন করেছে। ‘ভদ্রলোক’ কেন ‘বুর্জোয়া’-সমান হল না এই অবান্তর প্রশ্ন নিয়ে মাঝেসাঝে বড়ই কাতর হয়ে পড়েছেন। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে উনিশ শতকের রথী-মহারথীদের ভালোমন্দ বিচার নিছক বুর্জোয়া ভাব বা অ-ভাবের ভিত্তিতে সারা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের আংশিক সাফল্য ও বঙ্কিমের সমূহ ব্যর্থতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইলিয়াস : “ব্যক্তির বিকাশে রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ ও সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তাঁর উপন্যাসে ব্যক্তির বিকাশ বারবার বাধা পায়” কিন্তু “মানুষকে বিপ্লবের দিকে উদ্বুদ্ধ না করলেও শক্তসামর্থ ব্যক্তি গঠনে রবীন্দ্রনাথের গানের ক্ষমতা অসাধারণ”; “ইউরোপীয় উপন্যাসে ব্যক্তির পরিচয় পরতে পরতে উন্মোচিত হয়েছে…(আর) সমাজ বাস্তববোধের অভাবে ব্যক্তির ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করতে পারেননি বঙ্কিম”। দেশে বুর্জোয়া বিপ্লব সাধিত না-হওয়া ইলিয়াসের খেদের কারণ; সঙ্গে সঙ্গে এটাও লক্ষ করেন : “ব্যক্তি থেকে আসে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র সেখান থেকে আসে ব্যক্তিসর্বস্বতা। সমগ্র পশ্চিম এখন ব্যক্তিসর্বস্বতার চরম অসুখে ভুগছে; ভুগছে আমাদের দেশের মানুষও”। এই সর্বব্যাপী বিকারের ওষুধ কী, কোথায় মিলবে স্বাস্থ্যোজ্বল ‘ব্যক্তি’র খোঁজা। নিশ্চয়ই বিশ্বায়নের বর্তমানে নয়; ধূসর অতীতেও নয়; আগামীতে? কিন্তু প্রগতি ও উন্নয়নের সুভদ্র আখ্যানটির আঁট জোড়গুলো না খুললে কি সে–আগামীর পরিকল্পনা, নিদেন খসড়াটুকুও খাড়া করা যাবে? ইতিহাসবাদী প্রতিশ্রুতির ভরসা ছেড়ে নিমগ্ন বর্তমানের ভেতর থেকে ভবিষ্যৎকে যে দেখতে চায়, তারই মনে স্বপ্ন দানা বাঁধে, অবচেতনের অন্ধকারে এতকাল যারা তলিয়ে ছিল তাদের বের করে আনে সে। একচুল নড়তে নারাজ যে সে অবশ্য খোয়ার পাগলের স্বপ্নে ধৃত মানুষের নাগাল পায় না; প্রবীণ পাকার চোখে ওরা শুধুই কল্পজীব, অলীক মানুষ মাত্র।
বাংলা সাহিত্যে ‘বাস্তব’ আর ‘অলীকে’র মধ্যে চলাচলের এক নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছেন ইলিয়াস। বুর্জোয়া ‘ব্যক্তি’র ধ্যানার্চণায়, বাস্তববাদের কুহেলিকুহকে শেষ পর্যন্ত মন টেকেনি বলেই সমাজ তথা ‘ভদ্র -বয়ানের প্রত্যন্ত কোণের বাসিন্দাদের আনতে পেরেছেন উপন্যাসের কেন্দ্রমূলে : ওসমান-আনোয়ারদের জায়গা কেড়ে নিয়েছে হাড্ডি খিজির আর তমিজের বাপের দলবল। স্থানবদলের ওলটপালট কাণ্ড, “মানুষের শাসিত স্পৃহা ও দমিত সংকল্পে”র মুক্তি কাম্য হলে নিঃসাড় ‘ব্যক্তি’কে বরদাস্ত করার জো নেই। ইলিয়াসকে তাই ‘ব্যক্তি’র বরাত ছেড়ে ফের নামতে হয় সমালোচনায়; যাঁদের সঙ্গে তাঁর ঘরবার, আন্তরিক আদান প্রদান, প্রয়োজনে তাঁদেরও আক্রমণ করতে হয়, “ফাঁকিবাজির ভাঁওতা” টের পেলে জানাতে হয় ধিক্কার।
চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে ওসমানের চিলেকোঠায় নির্বিঘ্নে ঘুমোয় ‘বিপ্লবী’ আনোয়ার –তার মাথার ওপর চারকোণা মশারি, চারধারে দেয়াল। খিজিরের ডাকে ওসমান যে ওসমান সে-ও দরজা ভাঙে, আস্ত খেপে ওঠে, কিন্তু ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ সুস্থমস্তিষ্কের আনোয়ার মোটে সাড়া দেয় না। স্বচ্ছন্দে ঐ ঘুমস্ত ‘বিপ্লবী’কে প্রথা-বিরোধী মধ্যবিত্তের, তার প্রথা বিরোধী কথাকর্মেরও, অন্যতম রূপক হিসেবে গণ্য করা যায় বাইরে এসেও যার ঘরটান ঘোচে না, ঘরটানের মায়া নিয়ে যে ভাবিত পর্যন্ত নয়, সে-ই আনোয়ার-প্রতিম। গল্প-উপন্যাসে যেমন তেমনি প্রবন্ধেও আনোয়ারদের কানে খিজিরের ডাক পৌঁছে দেবার ভার নিয়েছেন ইলিয়াস : মধ্যবিত্ত স্বপ্নসাধের একবচনে মজে না থেকে নিজের এবং পরের স্বর যাতে বহুবচনের বিপুলতা পায়, “শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্ন দেখার অসীম শক্তি” যাতে যুক্ত হয় তাতে, সে জন্যেই কলম ধরেছেন তিনি। তাঁর সমালোচনার উদ্দেশ্য : ব্যক্তিগত ত্রুটিচ্যুতি নয়, শ্রেণীগত মুদ্রাদোষ; তাঁর মূল জিজ্ঞাসা : কোন সে দৃষ্টিসীমায়, কোন সে দিশাপাশে বারেবারেই নষ্ট হয় ‘সীমা-নিরীক্ষা’র ক্ষমতা।
“ন্যাকা ন্যাকা ছবি” ও “ছিঁচকাঁদুনে গল্প-উপন্যাসের” চোটে ব্যতিক্রমী শিল্পীরাও যখন গুটিয়ে যায় তখনই বিপদ : তাল কাটতে গিয়েও সমে এসে মেলে তারা। সাম্প্রতিক সাহিত্য থেকে যুগপৎ ছন্দভঙ্গ ও ছন্দরক্ষার কটি মার্কামারা দুর্লক্ষণ প্রায় তালিকা-বন্ধ করে দিয়েছেন ইলিয়াস : “হাস্যরসকে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে” ক্রোধজ্ঞাপনের অস্ত্র করেও “তরল কৌতুকে ক্রোধের চেহারা” ঢেকে ফেলা; “সবকিছুতেই তৃপ্তির উদ্ধার শুনিয়ে মধ্যবিত্ত পাঠকদের তেল মারতে” “তোয়াজ করতে” না চেয়েও ___ সাফল্যের নিরাপদ ও সুনিশ্চিতে পথ” ধরা; শ্রেণীসম্পর্কের গহনে ___ সৎ উদ্যোগ সত্ত্বেও “এসো ভাই একটুখানি বিপ্লব করি” বুলি কপচে “মধ্যবিত্তসুলভ জাতীয়তাবাদের” স্রোতে গা ঢালা; “অন্তরঙ্গ স্মৃতি”র উন্মোচনের সঙ্গে “নস্টালজিয়া”র প্রতারণা : “আঁটোসাঁটো কাঠামোর ভেতর “শিথিল বুনোট”। একতিল সর্ষের মধ্যে এতগুলো ভূত আবিষ্কার করেই না ইলিয়াস আওয়াজ তুলেছেন, বাংলা উপন্যাস এবার রং ফেরাক, দাখিল করেছেন তাঁর ঈন্সিত উপন্যাসের ইস্তেহার : “কেবল সামাজিক বিকাশের ইতিহাস নয়, রাজনৈতিক আন্দোলনের কালপঞ্জি নয় কিংবা কেবল আত্মপ্রতিষ্ঠার সংকল্প ঘোষণাও নয়, বরং জীবনযাপনের মধ্যে মানুষের গোটা সত্তাটিকে বেদনায়, উদ্বেগে ও আকাঙ্ক্ষায় প্রকাশের দায়িত্ব” নেবে সে-উপন্যাস।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রবন্ধে এত কথা জমে আছে যে কথার টানে আরো কথা—কোনোটা সোজা কোনোটা বাঁকা—আপনা থেকেই উঠে আসে। তাঁর বিশ্লেষণী পদ্ধতিতে যদি খটকা লাগে, বহু মতামতে আপত্তি জাগে, তা-ও তাঁকে আগপাশতলা অস্বীকার করা যাবে না; যাবে না মূলত একটি কারণে : বাংলা ভাগ হলেও, মাঝখানে
(বাকি অংশ মিসিং)






অসাধারণ লেখনী
নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী রচিত ‘রূপজালাল’ ae book ta ki paoa janae?