বুলবুল চৌধুরী

বুলবুল চৌধুরী

গ্রিস দেশের একজন লোকের কথা শুনেছি হাজার বছরের আয়ু পেলেও সম্পূর্ণ বাঁচা যার সম্পন্ন হয় না। না, লোকটি গ্রিক পুরাণের কোনো দেবতা বা অনিন্দ্যকান্তি কোনো পুরুষ নয়; ভূমধ্যসাগর বা ঈজিয়ান উপসাগরের দ্বীপ-উপদ্বীপের কোনো কাব্যে তার নাম পাওয়া যায় না। সে একেবারেই একালের মানুষ, তার জন্ম ও বৃদ্ধি একটি উপন্যাসের মধ্যে। নাম জোবরা, ‘জোরবা দি গ্রিক বললে অনেকেই চিনবে। আধুনিক গ্রিক কথাশিল্পী নিকোস কাজানজাকিসের শক্তসমর্থ আঙুলের পেষায় লোকটি এমন সাংঘাতিক মজবুত হয়ে গড়ে উঠেছে যে, মনে হয় তার পূর্বপুরুষ প্রমিথিউস কী একিলিসের সঙ্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী হেসেখেলে কাটিয়ে দিলেও তার শরীরে এতটুকু চিড় ধরবে না।

খুব বিচিত্রভাবে ও তীব্রভাবে জীবনযাপন করা ছিল তার স্বভাব। নানারকম পেশায় নিয়োজিত ছিল : কখনো খনিতে কাজ করেছে, কখনো মালপত্র ফেরি করে বেড়িয়েছে; আবার কামারের কাজ করতে করতে হাপরের টানে নিজেই জ্বলে উঠেছে আগুনের শিখা হয়ে; সমুদ্রের নাবিক হয়ে ঢেউয়ের কণায় চড়ে সমুদ্রকে গেঁথে নিয়েছে বুকের সঙ্গে; জোবরা কখনো প্রেমিক ছিল, কখনো ছিল বিপ্লবী। প্রতিটি পরতকে সে উপভোগ করেছে, প্রতিটি মুহূর্তকে অনুভব করেছে তীব্রভাবে। উপভোগ ও অনুভব করার ক্ষমতা তার স্বভাবের অন্তর্গত। তার স্বভাবে আর কী ছিল? তার সমস্ত অনুভূতিকে জোরবা তুলে ধরতে চাইত মানুষের কাছে। কথা বলায় তার ক্লান্তি নেই, আবার বলার জন্য কথারও তার শেষ নেই। কিন্তু কথা দিয়ে তার অনুভূতির কতটা বোঝাবে? তার বিশাল আনন্দ, তার গভীর বেদনা ও উপলব্ধি বোঝাবার জন্য ভাষা যখন কুলাত না জোরবা তখন কী করত? জোরবার পা জোড়ায় তখন ডানা গজাত, কেবল জিভ ও কণ্ঠের ওপর ভরসা না-করে সমস্ত দেহপট সে তুলে ধরত বন্ধুর সামনে। জোরবা তখন নাচত। বাক্যকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জোরবা তখন হাত পাতত নিজের শরীরের কাছে। নাচ তার কাছে কেবল প্রকাশের একটি মাধ্যমমাত্র নয়, তীব্র ও গভীর মুহূর্তগুলো অসহনীয় হয়ে উঠলে নিজের ভেতরকার প্রবল কম্পন থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য নাচই ছিল তার একমাত্র আশ্রয়। তিন বছর বয়সের ছেলে মারা গেলে স্তম্ভিত হয়ে বসে ছিল জোরবা। মাথার ভেতর শোক যখন কেবলি ভারী থেকে আরও ভারী হয়ে নামল, পুত্রের মৃতদেহের সামনে সে তখন নাচতে শুরু করল। নাচতে না পারলে তার মগঞ্জ তখন ফেটে চৌচির হয়ে যেত, পাগল হওয়া ছাড়া তার তখন আর গত্যন্তর ছিল না। আমাদের যেমন হাসি কী কান্না, কারও কারও যেমন সঙ্গীত কী কবিতা, কারও কারও যেমন ছবি কী অভিনয়, জোরবার তেমনি ছিল নাচ।

এই জোরবা একজন মহৎ শিল্পীর বিরল সৃষ্টি। বুলবুল চৌধুরীর সঙ্গে তার পার্থক্য এই যে বুলবুল চৌধুরী নিজেই নিজের সৃষ্টি, তিনি নিজেই শিল্পী, শিল্পও তিনি। তিনিই জোরবা, কাজানজাকিসও তিনি নিজে। মানুষের অস্তিত্বের মূল সত্যটির অনুসন্ধান ও তার প্রকাশ-এই দুটোই ছিল তাঁর জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অস্তিত্বের সারাৎসারের জন্য অনুসন্ধান তাঁর সমস্ত জীবনব্যাপী, একদিনের জন্যও থেমে থাকেনি। প্রকাশের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মাধ্যম ভাষাকেও তিনি ব্যবহার করেছেন, একটি উপন্যাস ও কয়েকটি গল্প লেখা ছাড়াও নাটক লেখার উদ্যোগও তিনি নিয়েছিলেন। নাট্যমঞ্চে অনেকবার এসেছেন, একটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। কিন্তু জোরবার মতো তাঁকে সবসময় ও শেষ পর্যন্ত ধরনা দিতে হয়েছে নৃত্যের পরম মাধ্যমটির কাছে। বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ে তাঁর জন্ম, এই শতাব্দীর তিরিশের দশকে গান গাইলেও সেখানে পাপ। আর নাচ? শরীরকে যেভাবে পারো অস্বীকার করো— মুসলমান ভদ্দরলোকদের প্রধান ব্যায়াম তখন এই। সেই সম্প্রদায়ের মানুষ হয়ে রশীদ আহমদ চৌধুরী নিজের সত্য-অনুসন্ধান ও উপলব্ধি-জ্ঞাপনের জন্য বেছে নেন শরীরের বেহায়া প্রদর্শনী। এতে তাঁর অসাধারণ সাহসের পরিচয় পাওয়া যায়—এতে সকলেই নিশ্চয়ই একমত। কিন্তু এই সাহসের কাজটি বুলবুল চৌধুরীর কোনো সচেতন উদ্যোগের পরিণতি নয়। মুসলমানসমাজের ধর্মান্ধ গোঁড়ামিকে আঘাত করার জন্য তিনি নৃত্যচর্চা শুরু করেন— এরকম সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া যায় না। তাঁর অনুসন্ধান ও অনুভূতি এবং শরীরকে তিনি একটি অখণ্ড সত্তায় সংহতি দিয়েছিলেন, কিংবা আরও সোজা করে বলা যায় যে, তাঁর গভীর ভাবনাবোধ থেকেই চেতনা ও শরীর একাত্মতা লাভ করেছিল। আফ্রিকায় কোথাও কোথাও সাপের পূজার প্রচলন রয়েছে—পূজারিরা মনে করে যে যাবতীয় পশুপাখি মাটিকে স্পর্শ করে কেবল পা দিয়ে, আর সর্বাঙ্গে অনুভব করে বলে সাপ নাকি পৃথিবীকে অনেক ঘনিষ্ঠভাবে চেনে। জীবন ও অস্তিত্বের মূল সত্যটিকে স্পর্শ করার জন্য বুলবুল চৌধুরী যেমন নিবিড় অনুসন্ধান চালান এবং যেভাবে তাকে অনুবর করেন তার প্রকাশের জন্য ভাষা বা নাট্যমঞ্চ বা পর্দা তাঁর কাছে যথেষ্ট বিবেচিত হয়নি। অনুসন্ধান-জ্ঞাপনের জন্য তাঁর দরকার পড়ে গোটা শরীরের, অন্য কোনো মাধ্যম সেখানে অল্প ও অসম্পূর্ণ।

তাই পশ্চাৎপদ ও ধর্মান্ধ সমাজের পটভূমিতে এরকম অমিত সাহসকে বিশেষভাবে প্রশংসা করার দরকার নেই। যিনি নিজের সমস্ত দেহকে ব্যবহার করেন নিজের জিজ্ঞাসাকে জ্ঞাপন করার জন্য তাঁর রক্তে এই সাহস হচ্ছে একটি মৌল উপাদান। এজন্য তাঁর আলাদা কোনো প্রস্তুতির দরকার পড়েনি। আদ্যোপান্ত শিল্পস্বভাব হলেও বুলবুল চৌধুরী স্বভাব-শিল্পী নন। প্রকৃতি ও জীবনে অবিরাম গতি সঞ্চার করে চলেছে যে তরঙ্গ নৃত্যে তারই সংহত রূপ দেখা যায়। সংহত তরঙ্গের সাহায্যেই নৃত্যশিল্পী মানুষের মধ্যে রসসঞ্চারের চেষ্টা করেন। রসসৃষ্টির মধ্যে নৃত্যকে সীমাবদ্ধ না রেখে বুলবুল চৌধুরী এর সাহায্যে জীবন সম্পর্কে নিজের জিজ্ঞাসা ও উপলব্ধি-প্রকাশের আয়োজন করেন। আনুষ্ঠানিক নৃত্যশিক্ষার সুযোগ তিনি পাননি। তাতে শাপে বর হয়েছে এই যে, মুদ্রার কসরত প্রদর্শনীকে তিনি নৃত্যশিল্পের চরম লক্ষ্য বলে বিবেচনা করেননি। বরং মানুষের আনন্দ-বেদনার অনুসন্ধানকে স্পষ্ট রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেন।

কলকাতায় তাঁর প্রথম নৃত্যপ্রদর্শনী বেকার হোস্টেলের একটি অনুষ্ঠানে। প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র, তখন তাঁকে পরিপূর্ণ যুবক বলাও মুশকিল, সেই নৃত্যে একজন ব্যাধের পাখিশিকারের প্রচেষ্টা ও তার সফলতা এবং ব্যর্থতার মধ্যে বুলবুল চৌধুরী নিজের অজ্ঞাতেই জীবনের একটি অতিপরিচিত সত্যকেই নতুনভাবে তুলে ধরেন। হাফিজের স্বপ্ন কী ইরানের এক পান্থশালা কী ব্রজবিলাস প্রকৃতপক্ষে মানুষের স্বপ্নময়তার সঙ্গে বাস্তবের সংঘাতকেই জানাবার একেকটি সফল প্রচেষ্টা। এইসব নৃত্যে বিক্ষুব্ধ ও ক্লান্ত চিত্তকে সর্বাঙ্গে জ্ঞাপন করার জন্য তিনি বড় বেশি উদ্গ্রীব। এখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তিনি ব্যবহার করেন ধ্রুপদরীতি, প্রচলিত মুদ্রা ও আঙ্গিকেই তাঁর রোমান্টিক চেতনা তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে। তাঁর প্রতিটি কাজে উপমহাদেশের ধ্রুপদ নৃত্যকলা কেবল আমেজসৃষ্টির পর্যায়কে অতিক্রম করে যায়, দর্শক সেখানে নিজের গভীর ভেতরটিতে বড় উদ্বেলিত বোধ করে।

কেবল এই রোমান্টিক তৎপরতার মধ্যে নিয়োজিত থাকলেও বুলবুল চৌধুরী বড় শিল্পী বলে বিবেচিত হতেন। কিন্তু অস্তিত্বের গভীরে মহৎ খোঁড়াখুঁড়ি থেকে তিনি দেখতে পান যে মানুষের আনন্দ-বেদনা বা দুঃখ-ক্ষোভের অনেক ভেতরে রয়ে গেছে সমাজব্যবস্থার অবাঞ্ছিত কাঠামো। কাঠামোটি নির্মিত হয়েছে কিছু বদমাইশ ও শয়তান মানুষের কারসাজির ফলে। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, মহামারি প্রভৃতি উপসর্গ এরই উৎপাদন। এই উপলব্ধিকে রূপ দেওয়ার তাগিদে রচিত হয় মহাবুভুক্ষা বা ব্ল্যাক আউট। এখানেও কিন্তু ভারতীয় ধ্রুপদ নৃত্যের কলা ও আঙ্গিক অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু ধ্রুপদ নৃত্য রস সঞ্চারের সাহায্যে মানুষের মধ্যে আমেজ সৃষ্টি করে। বুলবুল চৌধুরী তাকেই তরঙ্গায়িত করলেন মানুষের মধ্যে সাড়া জাগাবার জন্য। তাঁর শিল্পকর্ম তাই কেবল কোমল ও পেলব প্রবৃত্তির অনুরণনের মধ্যে শেষ হয়ে যায় না। বরং, অনেক ভেতরে ঢুকে মানুষকে তিনি হাত ধরে নিয়ে গেছেন এমন একটি খাড়া জায়গায় যেখান থেকে সে তার নিজের অবস্থান সম্পর্কে বিচলিত বোধ করে এবং ভাবনায় উদ্বেলিত হয়। মানুষের নিদারুণ অপমান ও গ্লানি এবং এরই মধ্যে বাঁচবার জন্য মানুষের নিরন্তর সংগ্রামের দিকে চোখ না মেলে মানুষের তখন আর কোনো উপায় থাকে না।

সুকুমার প্রবৃত্তির কোমল আন্দোলন ও সামাজিক পটভূমিতে মানুষকে দেখার প্রচেষ্টা— উভয়ক্ষেত্রে ভারতীয় নৃত্যের ধ্রুপদরীতিকে তিনি স্পষ্ট আকার দিতে সক্ষম হন। নৈপুণ্য ও কসরতের সাহায্যে আমেজ ধরিয়ে যাঁর বিলুপ্তি ঘটত তাঁর শরীরে এসে তা-ই হয়ে উঠল মহৎ শিল্পীর উপলব্ধি প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম।

ব্যক্তি ও সমাজের আনন্দ-বেদনা-সংকটের মূল ভিত্তিটির খোঁজে বেরিয়েছিলেন বলে বুলবুল চৌধুরীর পক্ষে কেবল ধ্রুপদরীতির ওপর নির্ভর করে বসে থাকা সম্ভব হয়নি। সংস্কৃতির নানা স্তরে তাঁকে অভিযানে বেরুতে হয়। পাশ্চাত্য নৃত্যকলার ভিত্তিতে সেখানকার লোকনৃত্যের প্রভাবে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু তার আগেই তাঁর দৃষ্টি পড়ে নিজেদের লোকসংস্কৃতির দিকে। আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষ নিজের নিজের পেশায় কাজ করার সময় সেখানে সৌন্দর্য ও রসসঞ্চার করে আসছেন। ভদ্রলোকদের সংস্কৃতিচর্চা হল মনোরঞ্জনের উপায়, আর শ্রমজীবীর সৌন্দর্যসৃষ্টি তাঁর পেশার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাঁদের গান কী কথা বলবার ভঙ্গি কী কাজের ভেতরকার ছল কোনোটাই পেশার সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনো উটকো ব্যাপার নয়। লোকসংস্কৃতি তাই যে কেবল শ্রমজীবীদের জীবনযাপনের অংশ তা-ই নয়, তা তাঁদের জীবনধারণেরও একটি উপাদান। পেশার সঙ্গে সংস্কৃতির এই অবিচ্ছিন্নতার কারণেই হাজার বছরের লুণ্ঠন ও শোষণ সত্ত্বেও নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীর মধ্যে সংস্কৃতিচর্চা আজও অব্যাহত রয়েছে। তাঁদের জীবনযাপনের মান আগেও কোনোদিন ভালো ছিল না, যতই দিন যাচ্ছে ততই তা আরও নিচে নামছে। তাঁদের সংস্কৃতিচর্চাও একই পর্যায়ে রয়ে গেছে, এতে নতুন ধারা সংযোজিত হয় না। কিন্তু প্রতিভাবান শিল্পীর হাতে লোকসংস্কৃতি নমুন মাত্রা পায়, নতুন ব্যঞ্জনায় তা উদ্ভাসিত হয় এবং এইভাবে সংস্কৃতি উন্নীত হয় শিল্পকর্মে। আমাদের দেশে আদিবাসী সম্প্রদায়সমূহ ছাড়া লোকনৃত্যের তেমন প্রচলন নেই। কিন্তু বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত শ্রমজীবী মানুষের কাজের মধ্যেই নৃত্যের তরঙ্গ বার করতে বুলবুল চৌধুরীকে বেগ পেতে হয়নি। জেলের জাল ফেলবার ভঙ্গি, চাষির লাঙল চষা কী মই দেওয়া, নৌকা-বাইবার সময় মাঝির হাতের ব্যবহার—এ-সবের ভেতরকার ছন্দ একজন শিল্পীর হাতে অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। এমনকী ক্ষমতার গুণে শিল্পী এর সাহায্যে তাঁর বক্তব্যও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।

অস্বীকার করা যায় না যে লোকসংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ শিক্ষিত মানুষের মধ্যে দিনদিন বাড়ছে। এঁরা প্রায় সবাই লোকসংস্কৃতির ব্যাপক প্রদর্শনীতে আগ্রহী। ব্যাপক প্রদর্শনীতে লোকসংস্কৃতি খুব পরিচিতি পায়। এটা হল সংরক্ষণের কাজ। কিন্তু কেবল সংরক্ষণের দিকে মনোযোগ দিলে সংস্কৃতির বিকাশ ও বিবর্তন ঘটে না, তা হয়ে পড়ে প্রাণহীন, নির্জীব স্থিরচিত্রের মতো, তা হয়ে থাকে জাদুঘরের সামগ্রী। লোকসংস্কৃতির অবিকল সংরক্ষণ করার কাজটিকে সৃজনশীল শিল্পী তেমন গুরুত্ব দেন না, অন্তত এই কাজের ভার তিনি গ্রহণ করেন না। একে তিনি ব্যবহার করেন, নতুন মাত্রা দিয়ে একে গতিশীল ও প্রাণবন্ত করে তোলাই তাঁর দায়িত্ব। চট্টগ্রামের চাকমা নাচ কী ময়মনসিংহের গারো নাচ, এমনকী অনেক পরিণত মণিপুরী নৃত্য ঢাকার মহাবোদ্ধা ও বিজ্ঞ দর্শকদের সামনে প্রদর্শন করার মধ্যে সৃজনশীলতার পরিচয় নেই, এই তৎপরতাকে সংস্কৃতিচর্চার অতিরিক্ত মূল্য দেওয়াটা বাড়াবাড়ি। মানুষের সুকুমার প্রবৃত্তির আবেগময় প্রকাশের জন্য ভারতীয় ও ইরানি পুরাণ ও গাধা ব্যবহার করে বুলবুল চৌধুরী তাকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেন। আর, লোকসংস্কৃতি তাঁর কাছে লাভ করে নতুন মাত্রা; তিনি একে গতিশীল করেন এবং শিক্ষিত ভদ্রলোকের চোখে যা ছিল কেবল কয়েকটির অভ্যাস তার সাহায্যেই তিনি সামাজিক কাঠামোর অনাচারগুলো তুলে ধরেন। এই ক্ষেত্রে তাঁর কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই বুলবুল চৌধুরীর মৃত্যু হয়, কিন্তু নৃত্যকলায় লোকসংস্কৃতির এরকম ব্যাপ্তি এই উপমহাদেশে আর কেউ দিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।

আমাদের শিল্পসৃষ্টির সমগ্র ক্ষেত্রটি আজ একঘেয়ে ও প্রাণহীন। আমাদের কবিতার একটি মান তৈরি হয়েছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। আজকাল মোটামুটি পাঠযোগ্য কবিতার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ছল, শব্দ, বাক্য, প্রতীক, উপমা, রূপক প্রভৃতি এমনভাবে তৈরি হয়ে আছে যে কলমের একটু ব্যায়াম করতে পারলে একটি কবিতা মোটামুটি দাঁড় করানো চলে। প্রেম, ভালোবাসা, এমনকী প্রতিবাদের ভাষা পর্যন্ত প্রস্তুত। কেউ যদি এসবের মধ্যে নিজেকে ফিট করিয়ে নিতে পারেন তা ভাবনার কিছু নেই, কবিতা আপনা-আপনি বেরিয়ে আসে। ফলে বাংলা কবিতা এখন শিল্পের আনন্দ ও কম্পন, বেদনা ও ভার এবং সংশয় ও সংকল্প থেকে বঞ্চিত। নৃত্যকলা, সংগীত, নাটক, উপন্যাস ও চিত্রকলা সম্বন্ধেও এই কথা প্রযোজ্য। বহুপ্রচলিত গান কী ছড়ার মতো, মিনাবাজারে প্রদর্শিত এমব্রয়ডারির মতো, ড্রয়িংরুমে ঝোলানো পাটের শিকা কী রঙ-করা-কুলার মতো কিংবা সায়েবসুবোর বৌ-ঝিদের চাইনিজ-রান্নার মতো শিল্পচর্চা আজ শৌখিন সংস্কৃতিচর্চায় পর্যবসিত হতে চলেছে।

বুলবুল চৌধুরী, হ্যাঁ, এখনও পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, কেবল বুলবুল চৌধুরীই এই অবস্থা থেকে আমাদের শিল্পচর্চাকে উদ্ধার করতে পারতেন। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানের বাংলাভাষীদের মধ্যে শিল্পচর্চার যথার্থ সৃজনশীলতাকে উজ্জীবিত করার ক্ষমতা ছিল কেবল তাঁরই। সেই সময় আমাদের এখানে প্রজ্ঞাসম্পন্ন মানুষ যে ছিলেন না, তা নয়। দেশের শিল্পসংস্কৃতির যথার্থ ঐতিহ্য ও অবস্থান সম্বন্ধে তাঁদের রচনা ও উক্তি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হতে মধ্যবিত্তসমাজকে সাহায্য করেছে। আবেগকে সম্বল করে মানুষের জীবনযাপন ও আনন্দ-বেদনাকে রূপ দেওয়ার জন্য অনেকেই তৎপর হয়েছে। কিন্তু সমাজ, মানুষ ও ব্যক্তিকে গভীরভাবে জানবার জন্য সামগ্রিক ও স্বচ্ছ দৃষ্টি ছিল কেবল বুলবুল চৌধুরীর। কোনো তত্ত্ব প্রয়োগ না করে, কিংবা তরল ও শিথিল আবেগের দ্বারা তাড়িত না-হয়ে জীবনের প্রতি সশ্রদ্ধ ও সতর্ক পর্যবেক্ষণের দ্বারা তিনি এই দৃষ্টি অর্জন করেছিলেন। সমাজসংস্কারের প্রবণতা তাঁর মধ্যে কম, বোধহয় নেই বললেই চলে; বরং তাঁর শিল্পসৃষ্টির যে-বিবর্তন দেখা যাচ্ছিল তাতে বোঝা যায় যে তাঁর নিরঙ্কুশ আস্থা ছিল কেবল বিপ্লবেই। এর ফলে আঙ্গিক ও বিষয় তাঁর কাছে বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, ধ্রুপদরীতির ব্যবহারের সময় সামন্ত আমেজকে পাত্তা দেননি। নিজের উপলব্ধির যাতে জলাঞ্জলি না ঘটে সেদিকে প্রখর দৃষ্টি রেখেছেন। শিল্পের সবগুলো মাধ্যম তাঁর চোখে অবিচ্ছিন্ন। তিনি জানেন : সবকিছুর উৎস মানুষের চেতনা। লোকসংস্কৃতির নমুনা গ্রাম থেকে শহরে বহন করে আনার সংগ্রাহকের কাজ তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বরং, শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে যে-ছন্দ, তাদের কাজকর্মের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন যে-সংস্কৃতি – নিজের জিজ্ঞাসাজ্ঞাপনের জন্য তার প্রয়োগের মধ্যে তাকে শিল্পের মহিমা অর্পণ করেছেন। আবেগ ও বিশ্লেষণ, অনুভূতি ও প্রজ্ঞাকে বুলবুল চৌধুরী নিজের অনিন্দ্যকান্তি দেহে স্রোতস্বিনী করে তুলেছিলেন। তাই বিশ্বাস করি : আমাদের শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে বরফ গলাবার তাপ তিনিই দিতে পারতেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *