লোকায়ত জীবন ও লোকসাহিত্য – সুমনকুমার দাশ
লোকায়ত জীবন ও লোকসাহিত্য – সুমনকুমার দাশ
Lokayata Jibon O Loksahitya
By SumanKumar Dash
প্রথম প্রকাশ: বৈশাখ ১৪২৫, মে ২০১৮
প্রচ্ছদ: চারু পিন্টু
.
উৎসর্গ
সোমব্রত সরকার
কবি ও গবেষক
আমার কথা
আমি বাংলাদেশের বাসিন্দা। আরও নির্দিষ্ট করলে বলা চলে, বাংলাদেশের এক মফস্বল শহর সিলেটে আমার বসবাস। এরও আগে অবশ্য শৈশব আর কৈশোর কাটিয়েছি সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার ঘুঙ্গিয়ারগাঁও নামক এক অজপাড়াগাঁয়ে। সেই ঘুঙ্গিয়ারগাঁও অঞ্চলটি হাওরের মধ্যবর্তী এক স্থান, যেখানটার চারপাশজুড়ে বছরের সাত মাস পানিতে টুইটম্বুর থাকে। বর্ষায় এই অঞ্চল যেন সমুদ্রের রূপ পায়। সেই সমুদ্রসম হাওরপারে কেটেছে আমার ছেলেবেলা। তো, সেই অঞ্চলে পুরো বর্ষার সময়টাতে নানা ধরনের উৎসব-আনন্দে মেতে ওঠেন হাওরবাসী। সেসব দেখতে-দেখতেই আমার বড়ো হওয়া। আর এই দেখা থেকেই বাংলার লোকায়ত জীবন ও লোকসংস্কৃতির প্রতি গভীর প্রেম তৈরি হয়। সে প্রেম থেকেই কেবল মনের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য নগরবাসী হওয়ার বহুকাল পর পুনর্বার চষে বেড়াতে শুরু করি হাওরাঞ্চল। প্রেমের তীব্রতা যখন আরও বাড়ে, তখন দেখার তৃষ্ণাও আমার পাল্লা দিয়ে বাড়তে শুরু করে। সে কারণেই লোকায়ত সংস্কৃতির খোঁজে ঘুরতে শুরু করি গোটা বাংলাদেশ।
আমি ঘুরি আর লিখি। লিখি আর ঘুরি। কখনও বেদে-বাইদ্যানিদের গান নিয়ে, কখনও ভিক্ষুকদের গান নিয়ে। যখন ইচ্ছে হয় তখন চলে যাই বাউলের আখড়ায়, ফকিরের ডেরায়, ওরশে কিংবা মাজার-শ্মশান-কবরে। এভাবে সমাজের প্রাকৃতজনেরা আমার বন্ধু হয়ে ওঠেন, আমার শুভাকাক্সক্ষীও হয়ে ওঠেন। তাঁদের সুখদুঃখ-উৎসব-আনন্দে যেমন আমি ছুটে যাই, একইভাবে তাঁরাও ছুটে আসেন আমার কাছে। একটু অবসর পেলেই তাঁদের ওখানে চলে যাই। গল্পে-গল্পে রাত কাটাই, শুনি তাঁদের জীবনযাপনের কাহিনি, সাধনার তন্ত্রমন্ত্রের কথা। আপনমনে ঘুরে বেড়াই আর নানা ধরনের লোকগান, লোকনাট্য, পাঁচালির পান্ডুলিপি সংগ্রহ করতে থাকি।
একসময় এই সংগ্রহের নেশা আমাকে দারুণভাবে পেয়ে বসে। আমি এক ঘোরের মধ্যে একটা বস্তা সঙ্গে করে বাংলাদেশের এগ্রাম-ওগ্রাম ঘুরে বেড়াই। গ্রামের নিরক্ষর নারী-পুরুষেরা পরম যত্নে আমার হাতে তুলে দেন যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখা তাঁদের গান-নাট্য-পাঁচালির পান্ডুলিপি। আমি সযত্নে এসব বস্তায় ঢুকিয়ে আরেক গ্রামের পথ ধরি। এভাবে ঘুরতে গিয়েই পরিচয় হয় কতশত গ্রামীণ লোকশিল্পী, গীতিকার, বাউল, ফকির, বৈষ্ণব, সাধক, লোকনাট্যের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে। তাঁদের কথা ব্যক্তিগত ডায়েরিতে টুকে রাখি, কখনও কখনও মান্য কোনও সাহিত্য সম্পাদকের আহ্বানে পত্রপত্রিকা-সাময়িকী-ছোটো কাগজে লিখিও। কখনও প্রবন্ধ, কখনও নিবন্ধ, কখনও আখ্যান আবার কখনও স্মৃতিগদ্য। যখন যেভাবে যা মনে আসে সেসব নিজের মতোই লিখে চলি। কখনও আবার পরিচিত-আধা পরিচিত-অপরিচিত সাধক-গীতিকারদের পদ সংকলন-সম্পাদন করি। পেশাগত কাজের ফাঁকে ফাঁকে এভাবে ভালোই চলছে আমার দিনকাল। এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে আমার রচিত ও সম্পাদিত প্রায় অর্ধশতাধিক বইও বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়ে গেছে। এই লেখালেখির সূত্র ধরেই বেশ কয়েক বছর আগে ফেসবুকের সুবাদে আমার সঙ্গে পরিচয় হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মান্য গবেষক ও কবি সোমব্রত সরকারের। সে এখন আমার প্রাণের স্বজন, প্রিয় বন্ধু। এখন পর্যন্ত ওর সঙ্গে আমার দেখাই হয়নি, অথচ মনে হয় ও যেন আমার জনম জনমের বন্ধু। সেই প্রিয় বন্ধুর মাধ্যমেই ভারতে প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয় আমার একখানা কিতাব। কী নাম দেব কিতাবের, এ নিয়ে যখন আমার কপালে চিন্তার ভাঁজ, তখন সহায়কর্তা হলেন স্ত্রী শম্পা দেবনাথ। সংকলিত ৪০টি প্রবন্ধের বিষয়সূচি দেখে স্ত্রী-ই কিতাবের নাম রাখলেন লোকায়ত জীবন ও লোকসাহিত্য।
কিতাবে দুটো পর্ব। প্রথম পর্বে বাঙালির লোকায়ত জীবন, লোকসাহিত্য, লোকসংস্কৃতির নানা ধারা-উপধারা গান-নাট্যসহ নানা বিষয় আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে বাংলাদেশের খ্যাত-অখ্যাত বিভিন্ন লোকগীতিকার-সাধক-ফকির-সাধুসন্তদের জীবন, দর্শন ও সৃষ্টি নিয়ে বিশ্লেষণী আলোচনা। এসব লেখার কোনও একটিও যদি পাঠকদের ভালো লাগে, তাহলে হয়তো-বা মনে করব, এই ঘোরাঘুরিটা অন্তত কিছুটা হলেও সার্থক হলো। আর, ভারতে আমার মতো সম্পূর্ণ অপরিচিত-অখ্যাত এক লেখকের কিতাব প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ায় আত্মজা পাবলিশার্সের প্রকাশক অরুণাভ চট্টোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ দেওয়াটাও বোধহয় হয় একটু কমই হয়ে যাবে। সোমব্রত-অরুণাভের জন্য কেবল একরাশ ভালোবাসাই রইল।
সুমনকুমার দাশ






Leave a Reply