রামকানাই দাশ : লোকগানের সর্বশেষ কিংবদন্তি

রামকানাই দাশ : লোকগানের সর্বশেষ কিংবদন্তি

যখন শৈশবের ফেলে আসা গ্রামের কথা মনে পড়ে, যখন চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে রং-বেরংয়ের পালতোলা নৌকা কেবল বাতাসের সাহায্য নিয়ে ধীরলয়ে গন্তব্যে যাওয়ার দৃশ্য-ঠিক তখনই মন আনচান করে ওঠে। তখন বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে পুরোনো দিনগুলিতে। সেই দিনগুলি, যেখানে গ্রামের পথে-প্রান্তরে গাছগাছালিতে বসে আপন খেয়ালে নানা সুরে রবে গান গায় দোয়েল, কোকিল, বউ কথা কও। আর সে সুরে মুগ্ধ গ্রামীণ মানুষ গাছের নিচে ছায়ায় বসে শান্তির ঘুম সেরে নেন! এ-রকমই পরিবেশে কেউ-কেউ হয়তো গান বাঁধেন কিংবা গলা ছেড়ে গেয়ে থাকেন তাঁদের বংশ-পরম্পরায় রক্তে ঢুকে পড়া প্রাচীন গানের নানান ধারা। মাঝে মধ্যে যখন এসব ভাবি কিংবা ভাবতে বাধ্য হই, তখন প্রাসঙ্গিকভাবেই মন খুঁজে ফেরে সেসব গান। আর তখনই হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরী, খালেদ চৌধুরী, রণেন রায়চৌধুরী, অমর পালদের কাছে আশ্রয় খুঁজি। সর্বশেষ সে ধারায় যুক্ত হলেন রামকানাই দাশ (১৯৩৫-২০১৪)।

রামকানাই দাশ কেমন গাইতেন? কেমন ছিল তাঁর গান গাওয়ার ঢং? কিংবা তিনি কোন মাপের শিল্পী? তবে এরও আগে প্রশ্ন তোলা উচিত-কেন তাঁর গান শোনা জরুরি? এসব অসংখ্য প্রশ্নের জবাব কেবল একটি বাক্যেই দেওয়া সম্ভব। তা হলো-গ্রামের মাঝিমাল্লা, জেলে, শ্রমিক কিংবা কৃষক যেভাবে গাইতেন, সে কণ্ঠই হুবহু রামকানাই দাশ তাঁর কণ্ঠে নিয়ে এসেছিলেন। এ-কারণেই বোধহয় রামকানাইয়ের গাওয়া গানগুলোতে এত দরদি উচ্চারণ! লোকগানের আদি ও অকৃত্রিম সুরকেই তিনি তাঁর কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন। প্রাচীন গানের আসল রূপ-রসটুকু আস্বাদনের জন্য তাই রামকানাইয়ের কোনও তুলনা নেই।

রামকানাই জন্মেছেন বাংলাদেশের ভাটি এলাকায়। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে-হাওরাঞ্চলে। সেই হাওর যেখানে পানি কখনও উত্তাল আবার কখনও শান্ত-সুমন্ত। গান আর সুরের গতিপ্রকৃতিও সেখানে অনেকটা এ-রকমই। প্রকৃতির কারণেই ধীরতাল ও দ্রুততাল-এ দুই রকমের গানের ধারাই এই জনপদে বহমান। শান্ত পানিতে পাল উড়িয়ে যেমন ধীরগতিতে নৌকা এগিয়ে চলে আবার যৌবন উপচে পড়া বর্ষামৌসুমে বইঠা দিয়ে পানি কেটে-কেটে যেভাবে এগিয়ে চলেন মাঝিমাল্লারা-ঠিক সেভাবেই রামকানাইয়ের কণ্ঠেও সুরের উত্থান-পতন ধরা পড়ত। এ-কারণেই রামকানাই দাশ অনন্য, অনবদ্য।

রামকানাই দাশ ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের গুরু। সংগীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হক লিখেছিলেন, ‘আমাকে কেউ যদি বলেন, দেশের সবচেয়ে ভালো খেয়াল গাইয়ে কে? প্রশ্নটা ঠিক হবে না। তবু উত্তর করার আগে বেঠিক জেনেও আমার মন সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দেয়, রামকানাই। সিলেটের রামকানাই।’ রামকানাই যখন এপার-ওপার দুই বাংলাতেই খেয়ালসংগীতের .পন্ডিত হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর গানচর্চার ধারায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। একসময় যে লোকগানকে অনেকটা ‘অবজ্ঞাভরে’ তিনি প্রত্যাখান করেছিলেন, শেষবয়সে সেই লোকগানকেই পরম আপন করে নেন। তাই লেখায় ওয়াহিদুল হক এ বাক্যটিও লিখেছিলেন, ‘আমাদের দেশীয় গ্রাম্য গানের বিষয়েও তার রুচি, অভিজ্ঞতা এবং অধিকার অতুলনীয়।’

ওয়াহিদুল হক যে-অধিকারের কথা রামকানাই দাশ সম্পর্কে লিখলেন, সে অধিকার কিন্তু সবার পক্ষে আদায় করে নেওয়া সম্ভব নয়। লোকগানে অধিকার অর্জন করাটা এমনই এক বিষয়-যেটি কেবল শুদ্ধ, পরিশীলিত ও সঠিক চর্চার মাধ্যমেই আদায় করে নিতে হয়। আমাদের এই দেশে অনেকে লোকগানের চর্চা করলেও সেই অধিকার খুব একটা যে তাঁরা অর্জন করতে পেরেছিলেন, তা কিন্তু বলা যায় না। কেউ কেউ যে করেননি তাও অবশ্য নয়। তবে রামকানাইয়ের ব্যাপারটিই আলাদা। তিনি ‘আবহমান কালের বয়ে-আসা’ ‘প্রাণ-উৎসারিত’ এসব প্রাচীন লোকগানকে উপস্থাপন করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে ওয়াহিদুল বলেছিলেন, ‘গানগুলি তাদের স্রষ্টারা যেমন করে বেঁধেছিলেন, গেয়েছিলেন, তার খুব কাছের রূপে আমরা পাব রামকানাইয়ের কণ্ঠে। […] রামকানাইয়ের পথ ধরে দেশের সকল প্রাচীন সংগীত-কীর্তি যদি প্রকাশিত হতে আরম্ভ করে, তবে জাতির জন্য খুব বড়ো কাজ হবে।’ এই হলো বোদ্ধাদের বিশ্লেষণ। রামকানাই দাশ প্রাচীন গানের সুর ও কথার অক্ষুণ্নতা এবং আদিভাব বজায় রেখেছিলেন বলেই তাঁর গায়নশৈলী নিয়ে চারিদিকে এত প্রশংসা, বিস্তর আলোচনা ও মাতামাতি।

রামকানাই দাশ বিশেষত শিতালং শাহ, রাধারমণ, হাসন রাজা, রসিকলাল, দিব্যময়ী, যোগেন্দ্রসহ প্রমুখ গীতিকারের গান গেয়েছেন। এর বাইরে নানা ধারার প্রাচীন লোকগান যেমন-উরিগান, ঘাটুগান, কীর্তন, পদ্মপুরাণের গান, লুটের গান, ধামাইল, বিচ্ছেদী, সারি, পল্লিগীতি, কবিগান, মালজোড়া, মালসি, ফকিরালি গানও গেয়েছেন। সিলেটের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন গানগুলো তাঁর কণ্ঠে অপূর্ব মধুরতায় উচ্চারিত হতো। নিজে তবলা, ঢোল, খোল, দোতারাসহ নানা ধরনের দেশীয় বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। তাই কোন গানের সঙ্গে কোন বাদ্যযন্ত্র ভালো মানায় তা তিনি নিজেই ঠিক করে নিতেন।

প্রসঙ্গক্রমেই মনে পড়ছে তাঁর গাওয়া একটি গানের কথা। আজিম ফকির নামে এক ভিক্ষুক ছিলেন, যিনি ছিলেন রামকানাইয়ের পৈতৃক গ্রাম পেরুয়ার বাসিন্দা। অন্ধ এই ভিক্ষুকটি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে আশপাশের গ্রামগুলোতে ভিক্ষা করতে বেরোতেন, তখন একটি গান গাইতেন। সে গানটি ছিল আজিম ফকিরেরই লেখা। ওই গানের যথাযথ সুরটি ব্যবহার করে রামকানাই দাশ তাঁর অসময়ে ধরলাম পাড়ি (২০০৫) শীর্ষক সিডি-অ্যালবামটিতে প্রকাশ করেছিলেন। অসাধারণ ছিল ওই কণ্ঠ। একজন ভিক্ষুকের জীবনবাসের করুণ আর্তিগুলো রামকানাইয়ের কণ্ঠে তীব্রভাবে উঠে এসেছিল। গানের পাঠ নিম্নরূপ :

আল্লা সবুর করলাম সার
বুঝিতে না-পারি আল্লা কুদরতও তোমার
দিনের ভিক্ষায় দিন চলে না
ক্ষুধায় অঙ্গ জ্বলে।

বস্ত্র নাই শীতের কাপড় ধরমু কারও গলে
ঘর ভাঙা দুয়ার ভাঙা আরও ভাঙা বেড়া
আঁখি মেইল্যা চাইয়া দেখি
আসমানেরও তারা।

ইষ্টিকুটুম ভাই-বিরাদ্দর সকল হইল বৈরী
এই দুঃখে আর প্রাণ বাঁচে না যাইমু কার বাড়ি
কী কলম মারিলা আল্লা কপালে আমার
বৃদ্ধকালে ফিরাইলায় সকলের দুয়ার।

ওবা আল্লা সবুর করলাম সার
বুঝিতে না-পারি আল্লা কুদরতও তোমার।

আমার মতো দিনদুঃখী আর ত্রিজগতে নাই
মনের দুঃখ রইল মনে বলব কারও ঠাঁই
ফকিরও আজিম শাহ কয় হইয়া লাছাড়
না-জানি কি হইবে আমার কয়বরের মাঝার।

প্রায়সই পথ চলতে কিংবা দূরের যাত্রাপথে চলন্ত গাড়িতে দাঁড়িয়ে কিছু ভিক্ষুককে পথচলতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে যেমন সুরে আমরা আল্লার বন্দনাসূচক গান পরিবেশন করে ভিক্ষা মাগতে দেখি, এ গান অনেকটা সে ধাচেরই। তবে আজিম ফকিরের গানের ভাষার সঙ্গে হালের ভিক্ষুকদের পরিবেশিত এসব গানের অনেক তফাত রয়েছে। আজিম ফকির সৃষ্টিকর্তার প্রতি খেদ প্রকাশ করেছিলেন আর অন্যরা আনুগত্য প্রকাশ করে ভিক্ষা প্রার্থনা করছেন। আজিম ফকির ও অন্যদের পরিবেশিত গানগুলোর মধ্যে মূল পার্থক্য ছিল সুরের তারতম্য। আজিম ফকিরের গানটিতে ব্যবহৃত হয়েছিল হালকা চালের ভাটিয়ালি সুর। যে সুর হাওরের প্রকৃতির সঙ্গেই অনেকটা মিলেমিশে একাকার হয়ে রয়েছে। আর এ-কারণেই গানটি রামকানাইয়ের কণ্ঠে অনন্য মাত্রা পেয়েছে।

ঈর্ষণীয় রামকানাই দাশের গাওয়া অপর গানগুলোও। সুরধুনীর কিনারায় (২০০৫) শীর্ষক অডিও-অ্যালবামটিতে রামকানাই গেয়েছিলেন ‘বন্ধুহারা পোড়া দেশে’ গানটি। গানটির মুখ-পদটি এ-রকম : ‘বন্ধুহারা পোড়া দেশে। যায় না বসত করা। যা গো সখী চলে যা মথুরা।’ এ গানটিতে রামকানাই সুরের যে বৈচিত্র্য দেখিয়েছেন, তা অভিনব ও আকর্ষণীয়। ‘বন্ধুহারা পোড়া দেশে’ পঙ্ক্তিটি যখন তিনি গাইলেন তখন ‘দেশে’ শব্দটি বলার সময় ‘দেশে-এ-এ-এ-এ’ বলে কণ্ঠের যে টান দিয়েছিলেন তা শ্রোতাদের সুরের সঙ্গে অনেকটাই বেঁধে ফেলেন। একইভাবে ‘যায় না বসত করা’-এর ‘ক-অ-রা-আ-আ’ শব্দটিও একই অনুপ্রাস সৃষ্টি করে। আবার একই গানে রামকানাই যখন গেয়ে চলেন-‘ও আমার বাহিরেতে চামড়ার ছানি। ভিতরে আগুনের খনি গো। আমার বুক ছিঁড়িয়া দেখো না গো তরা [তোরা]।’ প্রথম পঙ্ক্তি দুটি শোনার পর শ্রোতাদের আর ‘বুক ছিঁড়িয়া’ দেখার কোনও প্রয়োজন পড়বে না। কারণ ‘ভিতরে আগুনের খনি গো’ পঙ্ক্তিটি এতই দরদ দিয়ে রামকানাই গেয়েছেন, সেখানে শ্রোতাদের আপনা-আপনিই বাক্যটি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে নেয়।

শ্রোতাদের অনুভূতি আর উপলব্ধি প্রাধান্য রেখে গান নির্বাচন করেই রামকানাই গেয়েছেন। কিন্তু কখনওই সেটি বিকৃত করে নয়। তাই অপরাপর লোকশিল্পীদের সুর ও কথার সঙ্গে রামকানাইয়ের গাওয়া গানগুলো অনেকটাই স্বতন্ত্র। হাওরে যেমন বর্ষায় একেকটি গ্রাম বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একাকী পানির ওপর ভাসতে থাকে, রামকানাইও ঠিক তেমনই একজন মানুষ। যাঁর বলতে গেলে তেমন কোনও সঙ্গী ছিল না, অনেকটা একা ও বন্ধুহীন। গ্রাম থেকে আদিসুরে গানগুলো সংগ্রহ করতেন এবং গাইতেন। তাই একই গান তাঁরও আগে যাঁরা গেয়েছেন, এমনকী তাঁদের সঙ্গেও রামকানাইয়ের গায়কি মিলছে না। এ-কারণেই হয়তো খোদ তাঁরই বিরুদ্ধে সুর বিকৃতির অভিযোগ করেছিলেন কেউ কেউ! কিন্তু শ্রোতারা যখন আসল সুরের সন্ধান পেয়ে যান রামকানাইয়ের বদৌলতে, তখন সেটাই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে পড়ে। আর উভয় সুর শুনে-শুনেই আসল-নকল সুরের বিভ্রান্তি শ্রোতারাই শেষপর্যন্ত বিচার করতে শিখে ফেলেন।

সংগীতশিল্পীর মুখোমুখি বসে তাঁর কণ্ঠে গান শোনার উপলব্ধিই আলাদা। বছরখানেক আগে ২০১৩ সালে রামকানাই দাশের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় তিনি বেশ কয়েকটি গান আমাকে শুনিয়েছিলেন। তাঁর কণ্ঠনিঃসৃত এসব গান আমার কাছে জীবন্ত দৃশ্য হয়ে যেন ধরা পড়ে। গানের সুর, চিত্র, মেজাজ, আবেগ, অনুভূতি আমার মুঠোতে যেন চলে আসে। সেদিনের শোনা নামপদবিহীন একটি গান নিম্নরূপ:

দুঃখে গেল কাল গো আমার
দুঃখে গেল কাল
এগো আরিপরির খোঁচা কথা
গোল মরিচের ঝাল।

দুঃখে গেল কাল গো আমার
দুঃখে গেল কাল।
আমার বাড়িত বন্ধু আইলে
কার বা কিতা করে
এগো আটকুন্নিরার চউখে যেমন
মরিচ ভাইঙা পড়ে।

রাইত অইলে নাইল্যা বনে লাউ ঘটঘট করে
এগো আরিপরি ডাইকা বলে
ঘরও কিয়ে লড়ে।

এই গানটির ভাষাবিন্যাস সুনামগঞ্জের কথ্য ভাষায় রচিত হলেও সেটা অপর অঞ্চলের বাসিন্দাদের বুঝতে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বরং এ গানটির সুরের মায়াবী টান যে-কাউকেই টানবে। এছাড়া রামকানাই দাশ গানটিতে ‘আটকুন্নিরা’, ‘চউখ’, ‘ভাইঙা’, ‘ঘটঘট’, ‘লড়ে’ শব্দগুলো তাঁর কণ্ঠে এতই সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন, যে কারণে শ্রোতাদের কাছে এসব শব্দ আঞ্চলিক ভাষার রূপ হিসেবে উপস্থাপিত না-হয়ে এক দ্যোতনাময় শব্দজগতের সৃষ্টি করে। প্রায় অভিন্ন কথা বলা যায় তাঁর গাওয়া এ গানটির ক্ষেত্রেও : ‘জলের ঘাটে দেইখ্যা আইলাম। কী সুন্দরও শ্যামরায়। শ্যামরায়, ভ্রমরায় ঘুইরা ঘুইরা মধু খায়। নিত্যি নিত্যি ফুল-বাগানে ভ্রমর এসে মধু খায়। আয় গো ললিতা সখী।’

রামকানাই দাশ যখন গান পরিবেশন করতেন, তখন গায়নশৈলীতেই তাঁর উঁচু গায়কির পরিচয় ফুটে উঠত। গানের পঙ্ক্তিতে বর্ণিত সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনাগুলোর পরিবর্তন তাঁর কণ্ঠে অনায়াসেই ধরা পড়ত। তিনি যখন বিচ্ছেদী গাইতেন, তখন চারপাশ বিচ্ছেদময় বার্তা জানান দিত। অপরদিকে যখন কীর্তন গাইতেন তখন আপনাআপনিই চারপাশে ভাবগাম্ভীর্যময় পরিবেশ তৈরি হয়ে যেত। এই যে গানের মাধ্যমে শ্রোতা এবং চারপাশের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া-সেটা কজন গায়কের পক্ষে সম্ভব? আর এখানেই রামকানাইয়ের বিশেষত্ব।

রামকানাই দাশ গাইতেন-‘গুরু কি ধন চিনলায় না মন। দেখলায় না ভাবিয়া পাগল মন রে। সাধের জনম যায় রে ফুরাইয়া। ওরে ভবনদীর কালতরঙ্গ রে। ও মন মরিবায় ডুবিয়া। পাগল মনরে, সাধের জনম যায় রে ফুরাইয়া।’ এ গানের সুর যখন তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হতো তখন শ্রোতাদের মন ও মননে কেবল এক ধরনের নিমগ্নতা বিরাজ করত। ‘সাধের জনম’ বিফলে চলে যাচ্ছে-এ চিন্তায় মনের গতিপ্রকৃতি তীব্রভাবে সমর্পিত হওয়ার আকুলতায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। আবার যখন তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়-‘আমার অন্তরে তুষেরই অনল। জ্বলে গইয়া গইয়া’, তখন অন্তরের গহিন ভেতরে কেবলই একটা বেদনাবোধ চাপা আর্তনাদ করে গুমরে কেঁদে ওঠে। সেই বেদনাবোধ লাঘব হয় রামকানাইয়েরই আরেক গানে এসে-‘তোরা শোন গো নীরব হইয়া। দেখ গো বাহির হইয়া। কী সুন্দর বাঁশিটি যায় বাজাইয়া। ও এগো ও এগো কী সুন্দর বাঁশিটি যায় বাজাইয়া।’

রামকানাই দাশ আদি ও মূল সুরে গান গেয়ে সবার কাছে আদরণীয় হয়েছেন, এটি একেবারেই যথার্থ ও সঠিক। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম তাঁর গাওয়া ‘ভ্রমর কইও গিয়া’ গানটির প্রসঙ্গ। রাধারমণের লেখা এ গানটির সুর অক্ষুণ্ন থাকলেও তাঁর গাওয়া গানের পাঠে পঙ্ক্তির অসংগতি ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। গানের কাগজ দইয়ল-এ (২০১৪) শুভেন্দু ইমাম ‘লোকগানের রণেন রায়চৌধুরী’ শীর্ষক লেখায় রণেনের গাওয়া এ গানটির একটি গ্রহণযোগ্য ও শুদ্ধ পাঠ উল্লেখ করেন। যেটি নিম্নরূপ :


ভ্রমর কইও গিয়া
শ্রীকৃষ্ণবিচ্ছেদে রাধার
অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে
ভ্রমর কইও গিয়া।

ভ্রমর রে
না খাই অন্ন না খাই পানি
না বান্ধি মাথার কেশ
একেলা মন্দিরে থাকি
পাগলিনীর বেশ রে
ভ্রমর কইও গিয়া।

ভ্রমর রে
শুকাইল ফুলের মধু
না খাইল আসিয়া
আর কতদিন রইবে রাধা
কৃষ্ণহারা হইয়া রে
ভ্রমর কইও গিয়া।

ভ্রমর রে
কইও কইও কইও ভ্রমর
কৃষ্ণরে বুঝাইয়া
তোমার রাধা প্রাণে মইলো
না দেখলায় আসিয়া রে
ভ্রমর কইও গিয়া।

ভ্রমর রে
চুয়া-চন্দন ফুলের মালা
বাসর-সাজাইয়া
সেই বাসর হইল বাসি
জলে দেই ভাসাইয়া রে
ভ্রমর কইও গিয়া।

ভ্রমর রে
বাউল রাধারমণ বলে
মনেতে ভাবিয়া
আইল না মোর প্রাণবন্ধু
নিশি যায় ফুরাইয়া রে
ভ্রমর কইও গিয়া।

মোটামুটিভাবে উপর্যুক্ত পাঠটিকেই প্রামাণ্য ও সঠিক বলে ধরা যায়। কিন্তু এ গানটি রামকানাই দাশ গেয়েছেন ভিন্নভাবে। তাঁর গাওয়া গানটির পাঠ নিম্নরূপ :

ভ্রমর কইও গিয়া
শ্রীকৃষ্ণবিচ্ছেদে রাধার
অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে।

ও ভ্রমর রে, কইও কইও কইও রে ভ্রমর
কৃষ্ণেরে বুঝাইয়া
আমি রাধা মইরা যাইমু
কৃষ্ণহারা হইয়া রে
ভ্রমর কইও গিয়া।

ভ্রমর রে, রাধায় না খায় অন্ন না খায় পানি
নাহি বান্ধে কেশ
ঘর থনি বাহির হইলাম
পাগলিনীর বেশ রে
ভ্রমর কইও গিয়া।

ভ্রমর রে, আগে যদি জানতাম রে ভ্রমর
যাইব রে ছাড়িয়া
দুই চরণ বান্ধিয়া রাখতাম
মাথায় কেশও দিয়া রে
ভ্রমর কইও গিয়া।

ভ্রমর রে, ভাইবে রাধারমণ বলে মনেতে ভাবিয়া
নিইভা ছিল মনের আগুন
কে দিল জ্বালাইয়া রে

ভ্রমর কইও গিয়া।

রণেন ও রামকানাই উভয়েই শুদ্ধ লোকসংগীতের চর্চা করে গেছেন আমৃত্যু। কিন্তু তাঁরা যখন উভয়েই ‘ভ্রমর কইও গিয়া’ শীর্ষক গানটি গেয়েছেন, তখন পঙ্ক্তির সাদৃশ্য-বৈশাদৃশ্যটি শ্রোতাদের কাছে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করে দেয়। শ্রোতারা তাহলে কোন পাঠটিকে গ্রহণ করবেন? এক্ষেত্রে নির্মোহ দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে রণেনের পাঠটিকেই যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। কারণ রামকানাইয়ের গাওয়া গানটিতে বিস্তর অসংগতি রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এটিও বলে রাখা উচিত-রামকানাইয়ের গাওয়া গানটির প্রচলনও কিন্তু হাওরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে রয়েছে।

রামকানাইয়ের গাওয়া ‘ভ্রমর কইও গিয়া’ গানটির শেষ অন্তরায় একটি বাক্য রয়েছে ঠিক এ-রকম : ‘ভাইবে রাধারমণ বলে মনেতে ভাবিয়া’। এ বাক্যের শুরুতেই রয়েছে ‘ভাইবে রাধারমণ’ অর্থাৎ রাধারমণ ভাবনা-চিন্তা করে বলছেন, তার ফলে পুনরায় আর ‘মনেতে ভাবিয়া’ শব্দটি বলার প্রয়োজন রাখে না। অনেকে রাধারমণের গান পরিবেশনের সময় এ-ভ্রমটি প্রায়ই করে থাকেন, যেটি রামকানাই দাশও করলেন। খুব সম্ভবত তিনি যাঁর কাছ থেকে গানটি সংগ্রহ করেছিলেন, সেটির মৌখিক রূপটিই ছিল তাঁর গাওয়া গানের পঙ্ক্তিগুলোর মতো। তাই হয়তো তিনি তাঁর শোনা ও সংগৃহীত রূপটির হুবহু রাখতে গিয়েই এমনটি করেছেন। তবে এই একটি গানের মাধ্যমে লোকসংগীতে তাঁর অবদান কিংবা ভূমিকা কোনওভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বরং লোকসংগীতে রামকানাই দাশ এক সম্মানিত কণ্ঠস্বর হিসেবে যুগযুগ ধরে বাঙালির কাছে বিবেচিত হবেন।

গ্রামীণ সহজাত সুরের ধারা রামকানাই দাশের কণ্ঠশৈলীতে অপূর্ব মহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছে। আদি ও মূল সুরে গান গাওয়ার কারণেই সকল মহলে সমাদৃত হয়েছেন। তাঁর বহুমাত্রিক সংগীতপ্রতিভার মূল্যায়নে লোকতত্ত্ববিদ শামসুজ্জামান খান বলেছেন : ‘ধ্রুপদী গানের খেয়ালে তাঁর সাধনা ও অর্জন অনন্য। বাংলাদেশে খেয়াল গানের অসাধারণ এক শিল্পী রামকানাই দাশ। তবে শুধু খেয়াল বা নানা ঘরানার ধ্রুপদী গান নয়, সিলেট অঞ্চলের লোকসংগীতগুলোর এক সাধক ও শিক্ষাগুরু ছিলেন এই গুণী। তাঁর তিরোধানে বাংলাদেশের সংগীতজগৎ অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেল।’ প্রকৃতই প্রাচীন গানের বৈচিত্র্যময় রূপটি তিনি শেষ বয়সে দেশবিদেশে অকৃত্রিমভাবে তুলে ধরেছিলেন। বাংলা লোকগানের ‘শেষ নবাব’ ছিলেন রামকানাই দাশ। তাঁর মৃত্যুতে তাই এখন সাথিহারা বাংলার লোকগান, বন্ধুহারা লোকগীতিকারেরা। তবে তাঁর সুর-বিছানো পথে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হেঁটে গেলে, সেটাই হবে তাঁর জীবনভর সাধনার প্রকৃত সার্থকতা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *