• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

মার্কস মোদি মমতা – ইমানুল হক

লাইব্রেরি » ইমানুল হক » মার্কস মোদি মমতা – ইমানুল হক
মার্কস মোদি মমতা
লেখক: ইমানুল হকবইয়ের ধরন: প্রবন্ধ ও গবেষণা

মার্কস মোদি মমতা – ইমানুল হক

মার্কস মোদি মমতা – ইমানুল হক
প্রথম প্রকাশ – জানুয়ারি ২০২১
প্রচ্ছদ – মাসুম রহমান

MARX MODI MAMATA
A Chronicle of Indian Politics
by Emanul Haque

.

বিমান বসুকে
শ্রদ্ধায়

.

ভূমিকার বদলে

জীবনের পড়া কখনও সম্পূর্ণ হয় না। কিন্তু আপনি সম্পন্ন ও সমৃদ্ধ হবেন কী করে, বিস্তৃত পাঠ ছাড়া? পাঠ দাবি রাখে মনস্কতা ও মনোযোগের। কোরানে প্রথম শব্দ—ইকরা। মানে, পাঠ করো। বাইবেলে আছে, ফিয়াট লাক্স। আলোকিত হউক। মনের মধ্যে আলো আসে পাঠে।

‘পড়া’ শব্দটি বাংলায় প্রথম ব্যবহৃত হয়, চর্যাপদ বা চর্যাগীতিতে। অর্থ, চৌদিকে বিস্তৃত হওয়া। (বেঢ়িল হাক পড়অ চৌদীস)। চৈতন্যজীবনীকার বৃন্দাবন দাস ব্যবহার করছেন, ‘পড়া’ শব্দটি, পাঠ করা অর্থে।

মার্কসীয় বিচারে রাষ্ট্র একটা যন্ত্র, যা দিয়ে এক শ্রেণি আরেক শ্রেণিকে দমন করে। রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রশাসন, সেনা, পুলিশ, বিচার বিভাগ থাকে। তাদের মধ্যে বিচার বিভাগকে লোকে নিরপেক্ষ মনে করে। কিন্তু এখন অনেক আদালতের কাজ করা দেখে কী মনে হচ্ছে? তলস্তয়ের বই রাষ্ট্রদ্রোহী! পরে সংশোধনী এলেও নাকি দেখা যাচ্ছে পরস্পরবিরোধী লেখা নিয়ে এমনকী মাওবাদীদের তীব্র সমালোচনাময় তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ নামক প্রবন্ধ সংকলনও শুধু নামের কারণে বাড়িতে রাখলে বিপদ! ২০০১-এ শিলিগুড়িতে ২৬ জন গ্রেফতার হয়েছিলেন। কেন জানেন, লেনিনের ‘কী করিতে হইবে’ রাখার জন্য।

মার্কসীয় লেখা ছাপানোর জন্য একজন ২০০৬ থেকে বাম আমলে জেলে ঢুকে মরে গেল। একটা নমুনা—’প্রেসিডেন্সি’, মধ্যবিত্তের উচ্চবিত্তীয় সাধের প্রেসিডেন্সিতে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি ‘ইন দ্য নেম অফ গড’ দেখানো যাচ্ছে না। বলা হচ্ছে, কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের পক্ষে বিপক্ষে কিছু বলা বা দেখানোর অনুমতি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেবেন না।

ভাবুন, রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়! তবু কেন্দ্রীয় সরকারের অনুগত হতে ব্যস্ত। কারণ প্রাপ্তির লোভ আছে কর্তৃপক্ষের কর্তাদের।

মার্কস বলেছিলেন, এরা পরস্পরের বউকে ফুঁসলিয়ে নেয়। সুইঙ্গিংয়ের যুগ। মার্কস কবে বলে গেছেন।

খেয়াল করুন কর্ণাটক ও মধ্যপ্রদেশের ক্ষমতা দখল! আর দেখুন কাশ্মীর। ভারতীয় গণমাধ্যম ও গণতান্ত্রিক কাঠামোটা পরিষ্কার হবে। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদী দখলদারি ছাড়া টিকতে পারে না। শুধু অবাধ বাণিজ্যতত্ত্ব দিয়ে সে বাঁচে না। নিজের বাজারের জন্য অবাধ, অন্যের জন্য অজস্র বাঁধন। চীন আর আমেরিকার অর্থনীতির লড়াইটা দেখলে বুঝবেন। হংকং বনাম কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ বা আসামের অবস্থান প্রচার মাধ্যমে কেমন—তা খেয়াল করে যান।

রাষ্ট্রযন্ত্র একদিন থাকবে না। থাকতে পারে না! ‘উইদারিং অ্যাওয়ে অফ দি স্টেটে’-র কথা মনে পড়ছে? করোনা ভাইরাস সব সীমান্তরেখা চুরমার করে দিতে চাইছে।

ঘাবড়ে যাচ্ছেন? মনে তো হচ্ছে, রাষ্ট্র আরো শক্তিশালী হচ্ছে!

বিপরীতে বলব, রবীন্দ্রনাথ পড়ুন। রবীন্দ্রনাথ! বাঁধন যতই শক্ত হবে, ততই বাঁধন টুটবে…। শঙ্খ ঘোষও সেদিন ব্রিটিশদের প্রসঙ্গে লিখেছেন, দমনপীড়ন যত বাড়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাও তত বাড়ে। নাগাল্যান্ড দেখুন, আলাদা পতাকা উড়িয়ে দিল। মণিপুর মেঘালয় বাধ্য করল কেন্দ্র সরকারকে ইনার লাইন পারমিট চালু করতে। আসামে ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেতে পারলেন না। তার সভামঞ্চ পুড়িয়ে দিল বিক্ষুদ্ধ জনতা। অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়ে প্রচার মাধ্যমের ভাষায় লৌহমানব অমিত শাহ যে কাগুজে বাঘ, তা বুঝিয়ে ছাড়ল। অমিত শাহ যেতে পারলেন না। সভা বাতিল করতে হল। এমনকী নিজের রাজ্য গুজরাতে ব্যাপক বন্ধ হল। আবার বাতিল অমিত শাহের সফর।

ভাজপা-র তৈরি এন আর সি ফতোয়া সরাসরি ভাজপা-র দুই মুখ্যমন্ত্রী কর্ণাটকের ইয়েদুরাপ্পা এবং গোয়ার প্রমোদ সাওন্ত মানবেন না—বলে দিতে পারছেন। সঙ্ঘী রাজনীতিতে এটা একেবারে গ্লাসনস্ত! পরাক্রান্ত মণিপুর স্বাধীনতা দিবসের দিন পাল্টে দিল। হল ১৪ আগস্ট। আসামের এন আর সি তালিকা ঘোষণার প্রথম দিনে জাতীয় সঙ্গীতের আগে ‘আই অসম’ বাজিয়ে দিল। মার্কসীয় জাতিসত্তার অধিকারের আন্দোলনকে পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র শক্তিশালী করে চলেছে। ফেডারেশন থেকে কনফেডারেশনের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। দেখুন না, গোর্খাল্যান্ড বোড়োল্যান্ড তিপ্রাল্যান্ড—কত কত স্বাধিকারের নামে স্বাধীনতার লড়াই! এ লড়াই নিজেদের মধ্যেও।

মতাদর্শের সংকটে যুক্তিবাদ ও যুক্তিবাদী মনেরও বিস্ময়জনক অভাব দেখা যায়। তখন তার স্থান পূরণ করে বিশ্বাস ও ভাবাবেগ। আর বিশ্বাসী মন সহজেই দ্রবীভূত ও অভিভূত হয়। কারণ, অভিভূত হতে মধ্যবিত্ত ও মধ্যবৃত্তে থাকা ব্রাহ্মণ্যবাদী এলিটিস্ট মন ভালোবাসে। তাই অভিমুখ বদলে যায়। চরম দক্ষিণপন্থাকেও বামপন্থা বলে ভুল হতে থাকে। আর ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-র পুনরাবৃত্তি হতে থাকে—হতেই থাকে। থামার কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। পচন যখন মস্তিষ্কে—তখন কে রোধে পচনের গতি?

ইদানীং কিছু বামপন্থী কাগজ দেখে সেই পুরোনো বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতির ভাষা ধার করে বলতে হয়—প্রকাশিত লেখাগুলির অধিকাংশই মার্কসবাদের আদ্যশ্রাদ্ধ করেছে ও করছে। মনে হচ্ছে, আগামীতেও করবে। আন্তর্জালে চলা মার্কস ও সোভিয়েত বিদূষণের বস্তাপচা ‘ল্যাখা’গুলি হয় পড়তে হবে, নয় অতি কষ্ট পেলেও ছাড়তে হবে। দোহাই, খেয়াল করুন—জীবন ও লড়াইয়ের অভিমুখ পালটে যাচ্ছে। সাবেক সোভিয়েতকে কি অতি বাম নকশালদের মতো ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী’ ভাবেন আজও (অতি বাম আর অতি দক্ষিণ একজায়গায় মিলে যায়! বলেছিলেন লেনিন)?

সোভিয়েত বিপ্লব গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে—ঘুম পাওয়ার অজুহাতে মোদি-বন্দিত ‘গণতন্ত্রের মন্দির’-এর অধিবেশন ভেঙে দিচ্ছে লালরক্ষী বাহিনী; আর তাতে কত নিবন্ধকারের হাহাকার! (আহা, কী ভালোই না হতো, আমেরিকা, ভারত, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডে বহুদলীয় গণতন্ত্রে কতই উন্নতিই না দেখছি। রেগান, বুশ, ক্লিন্টন, ওবামা, ট্রাম্প…আদর্শ!)

কী উদ্দেশ্য অনেকের? ১৯১৭-র সোভিয়েত বিপ্লব এক নতুন স্বপ্নের জন্ম দিয়েছিল—গরিব খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষকে হাজার হাজার বছর পরে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিল, উঠে এসেছিল ইতিহাসের পাতা থেকে কোটি কোটি স্পার্টাকাস। মুদ্রারাক্ষস এবং ‘মুদ্রারাক্ষস’-এর বসন্তসেনারা বুঝেছিল দেহ ব্যবসা আধুনিকতা নয়, আট ঘণ্টা কাজ আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা ঘুম—শিকাগোর হে মার্কেটের লালপতাকা শোভিত এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল। কৃষকসমাজ দেরিতে হলেও বুঝেছিলেন যৌথ খামারেই মুক্তি, একক মালিকানায় নয়। ছাত্র-ছাত্রীরা বিনা পয়সায় পড়ার সুযোগ পেয়েছিল, এমনকী দরিদ্রতম পরিবারের সন্তানও। কাউকে বিনাচিকিৎসায় মরতে হয়নি, বিনা বিচারে বন্দি হতে হয়নি ধর্ম জাতি বা বর্ণের বিচারে। জাতিবিদ্বেষ, ধর্মবিদ্বেষ প্রশমিত হয়েছিল। আর কিউবা চীন দেখাল কীভাবে মোকাবিলা করতে হয় করোনাকে।

সোভিয়েতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হয়েছে হয়তো। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাও চরিতার্থ হয়েছে দেশ ও দলের নামে। কিন্তু ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারি কর্মসংস্থানহীনতার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানসম্মতভাবে রুখে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল সোভিয়েত সমাজতন্ত্র। দেশে দেশে মুক্তির সংগ্রামের বাণী এমনি এমনি ছড়িয়ে পড়েনি। পূর্ব দিগন্তের সূর্যের আহ্বান বৃথাও যায়নি। বহু জাতি মাথা তুলে দাঁড়ায়, স্বাধীনতালাভ করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে। প্রযুক্তি শিক্ষা বিজ্ঞান ক্রীড়া কৃষি শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে লেনিন স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ব্যবস্থা।

নির্বাচনে বলশেভিকরা পরাজিত হয়েছিল, এ তো নতুন কোনও তথ্য নয়। জন রিডের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ বইয়ে বহু আগেই সে কথা লেখা হয়েছে। শ্রমিক ও সৈন্যবাহিনী সোভিয়েত বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা বুঝলেও কৃষক, মধ্যবিত্তরা পরে বোঝেন। এ নিয়ে বহুলপঠিত বহু উপন্যাস আছে—ধীরে বহে ডন, কুমারী মাটির ঘুম ভাঙল…। এমনকী ‘ইস্পাত’-এও আছে নায়ক পাভেলের দাদা লেনিনের মৃত্যুর পর পার্টিতে এলেন। ১৯২২-এর পরও বলশেভিকদের বহু লড়াই লড়তে হয়েছে। বিপ্লব তো কোনও ভোজসভা বা বিতর্কসভা নয়, যে সবকিছু সুচারুভাবে নিয়ম মেনে সম্পন্ন হবে।

আশা রাখি, একদিন সোভিয়েত বিপ্লবের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে। দেশ ও বিদেশ জুড়ে মানুষ খুঁজবেন মুক্তির ঠিকানা। ‘এটা এই মুহূর্তে হট্টমালার দেশ, যাঁদের গলার দাপট বেশি, তাঁদের কথাই বেশি কর্ণগোচর হচ্ছে’—এই প্রবণতা থেকে বের হতে চেয়ে ‘প্রথাগত চর্চা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে একটু আলাদা ধরনের কথোপকথন’ সম্ভব। অশোক মিত্রের এই ভাবনা থেকে অনেক লেখা ও প্রকাশনার জন্ম।

আমার কয়েকটি সামান্য নিবেদন আছে।

আজকাল লেখা চয়ন এবং প্রকাশে যথেষ্ট সতর্ক থাকা হচ্ছে কি? না হলে কিছু বামপন্থী পত্রিকার সংখ্যায় যিশু ‘আপসহীন বিপ্লবী’ জাতীয় মন্তব্য ছাপা হয় কী করে? শৈশবে মার্কসের সঙ্গে হজরত মহম্মদের তুলনা করতে কিছু ‘প্রগতিশীল’ মৌলভিকে শুনেছি। সুদহীনতা, মুনাফাহীনতা, সাম্যবাদ—ইত্যাদি বিষয়ে মহম্মদ যেখানে শেষ করেছেন মার্কস সেখানে শুরু করেছেন, এই ছিল তাঁদের প্রতিপাদ্য। ঈশ্বরহীনতা, শোষণমুক্তি, বিপ্লব—এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন তাঁরা। ‘কেউ কেউ’ যখন যিশুর সঙ্গে মহম্মদের তুলনা করতে বসেন, ছোটবেলার মৌলভিদের কথা মনে পড়ে।

ভাববাদীরা যাই বলুন বা ভাবুন, যিশু মার্কসীয় বিচারে বিপ্লবী নন। কারণটা চমৎকার লিখেছেন ক্রিস্টোফার কডওয়েল, ‘ফার্দার স্টাডিজ ইন এ ডায়িং কালচার’ গ্রন্থে :

‘বিপ্লবী উপকল্প (অ্যাপ্রোচ) নয়, সংস্কারপন্থী উপকল্পটিই খ্রিস্ট ধর্মের পরাজয় সুনিশ্চিত করে।’

কডওয়েল লিখছেন, ‘যিশুর মনের মধ্যে স্পষ্টতই ”জনগণের প্রজাতন্ত্র” গোছের একটা কথা ছিল। মানুষ যেখানে সামগ্রী নিজেদের মধ্যে একযোগে ভোগ করবে, কেউ প্রভু থাকবে না, কেউ ভৃত্যও থাকবে না এবং শোষণের অবসান হবে।’

এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতার কী হবে? শাসকের কী হবে? যিশুর মত, ‘সিজারের যা প্রাপ্য সিজারকে দাও।’

ক্ষমতা অন্ধ আনুগত্য দাবি করে। ধর্ম সেই ক্ষমতাকে শিলমোহর দিয়ে কিছু রিলিফ চায় ভাববাদী ভাবে। বিশ্বাস করে, দারিদ্র্যের কারণ বঞ্চনা বা শোষণ নয়, মানুষের পাপের বা পূর্বজন্মের কর্মফল।

ভাববাদী ভাবনা আর বস্তুবাদী ভাবনা কি এক? রাষ্ট্র ক্ষমতার পরিবর্তনের কথা না ভেবে উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন না ঘটিয়ে কি বিপ্লব সম্ভব? মার্কসবাদ কোনও আপ্তবাক্য বা ভাববিলাস নয়। ইতিহাস, বিজ্ঞান ও অর্থনীতিনির্ভর মতাদর্শ।

সেই মতাদর্শে বিপ্লবীর সংজ্ঞা কী? সংস্কার আর বিপ্লব কি এক? সংস্কারকে বিপ্লব ভাবা অতিব্যাপ্তি দোষে দুষ্ট শুধু নয়, চরমশোধনবাদী মনোভাবের পরিচায়ক। মার্কসবাদ শুধু পড়ার বিষয় নয়, তাকে আত্মস্থ করে প্রয়োগের বিষয়। ধর্ম আর জিরাফে নিশ্চিত তফাত থাকবে।

‘আপসহীন’—মানে কী? ‘সিজারের প্রাপ্য সিজারকে দাও’! সিজারের ‘প্রাপ্য’ দিয়ে গরিবের প্রাপ্য ন্যায্য হওয়া কি সম্ভব?

কডওয়েল লিখেছিলেন, ‘যিশু খ্রিস্টধর্মকে এক মারাত্মক নীতির সঙ্গে অঙ্গীকারবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তা হল নিষ্ক্রিয় অসহযোগের নীতি। সেই কারণেই এটা সম্ভব যে ভারতবর্ষে পতনোন্মুখ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে গান্ধীবাদ যে ভূমিকা পালন করেছিল—এবং যা ছিল বিদ্রোহকে অন্যখাতে চালিত করার এবং নিরাপদ কার্যকলাপে পরিণত করার উপায়—পতনোন্মুখ রোমক সাম্রাজ্যে খ্রিস্টধর্ম সেই ভূমিকা পালন করেছিল। (ফার্দার স্টাডিজ ইন এ ডায়িং কালচার, অসন্তোষের দীর্ঘশ্বাস)। যিশুর ভূমিকা আসলে বিদ্রোহীরূপে আপসপন্থার নামান্তর।

মার্কস যৌবনে ২৩ বছর বয়সে হেগেলের ভাববাদী দর্শনের বিরুদ্ধাচারী প্রথম দার্শনিক ফয়েরবাখের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন ‘খ্রিস্টধর্মের মূলকথা’ (১৮৪১) পড়ে। ভাববাদের থেকে বস্তুবাদের যাত্রায় এই গ্রন্থ মার্কসের ওপর প্রভাব ফেলে। ফয়েরবাখের বস্তুবাদী ভাবনার সীমাবদ্ধতাও অতিক্রম করেন মার্কস। পরে তিনি হয়ে ওঠেন লেনিন কথিত ‘আধুনিক বস্তুবাদের প্রতিষ্ঠাতা’। এই প্রতিষ্ঠাতা হয়ে ওঠার মূলে আছে তাঁর নিষ্ঠ অধ্যয়ন, গণসংগ্রামে অংশগ্রহণ, দেশ বিদেশের কবি দার্শনিক শ্রমিকনেতৃত্ব ও শ্রমিকশ্রেণির সাহচর্য।

মার্কস প্যারিসে জার্মান দেশান্তরীদের নিয়ে গঠিত ‘ন্যায়নিষ্ঠ লিগে’-র পরিচালক এবং বিভিন্ন ফরাসি শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। আসেন কবি হাইনের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে। লুই ব্লাঙ্ক, এতিয়েন কাবে, পিয়ের লেরু প্রমুখ ফরাসি কমিউনিস্টদের সঙ্গে পরিচিত হন। পিয়ের জোসেফ প্রূঁধোর সঙ্গেও তাঁর আলাপ হয়। মিখাইল বাকুনিন, ভাসিলি বোতকিন প্রমুখ রাশিয়ান বিপ্লবীর সঙ্গেও চেনাজানা হয় প্যারিসে। পড়েন রিকার্ডো আর অ্যাডাম স্মিথের তত্ত্ব। আঁরি সাঁ সিমো, শার্ল ফুরিয়ে, রবার্ট ওয়েনের ইউটোপিয়ান সমাজতন্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন। ফরাসি বিপ্লব আর কনভেন্টের দিনগুলি আত্মস্থ করেন কঠিন অধ্যবসায় আর পরিশ্রমে।

মার্কস একদিনে মার্কস হননি। ঘরে বসে নয়, গ্রন্থাগারে নয়, ফরাসি, জার্মান, ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়, তাদের জীবন ও আদর্শগত সংগ্রাম তাঁকে শিক্ষিত ও লড়াকু করে গড়ে তুলেছে। ‘সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে বুর্জোয়া অর্থশাস্ত্রের ক্লাসিক ও ইউটোপিয় সমাজতন্ত্রীদের রচনাদির অধ্যয়ন ভাববাদ থেকে বস্তুবাদে, বিপ্লবী গণতন্ত্রবাদ থেকে কমিউনিজমে মার্কসের উত্তরণে সহায়তা করেছে’।

মার্কস আর যিশু দুজনেই তবু বিপ্লবী?

মার্কসের সম্পর্কে কেউ কেউ লিখেছেন—’খ্যাতিহীন, দরিদ্র, নিঃসহায় এই দার্শনিকের তাই তেরোজনের বেশি স্বজন জোটেনি’। এর পরেই বালখিল্যভাবে চটকদারিত্বের মোহে সংযোজন—’এই পৃথিবীর মানুষের মুক্তি কামনায় আপসহীন আরেক বিপ্লবীর শেষ ভোজসভাতেও উপস্থিত ছিলেন, কী আশ্চর্য, সেই তেরোজনই’।

এসবের মানেটা কী?

ক) মার্কসের মতোই যিশুও ‘আপসহীন বিপ্লবী’?

খ) তেরোজনের উল্লেখে কী বোঝায়?

গ) মার্কস (৫ মে ১৮১৮—১৪ মার্চ ১৮৮৩) তাঁর মৃত্যুর সময় ছিলেন খ্যাতিহীন? ভাবা যায়? আন্তর্জালহীন বিমান পরিবহণহীন পৃথিবীতে ইংল্যান্ড, আয়ার্ল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, ভারত, ইতালি থেকে মানুষ তাঁর লেখা পড়ে তাঁর কাছে যাচ্ছেন, চিঠি লিখছেন—খ্যাতি না থাকলে?

তিনি নিজে গেছেন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আলজিরিয়া, ইতালি প্রভৃতি দেশে। থেকেছেন বার্লিন (১৮৩৬), প্যারিস (১৮৪৩-৪৫), ব্রাসেলস (১৮৪৫-৪৮), কলোন (১৮৪৯), লন্ডন (১৮৫০-৬০), ভিয়েনা প্রভৃতি শহরে, শাসকশ্রেণি দ্বারা বহিষ্কৃত হচ্ছেন—’খ্যাতিহীন’ বলে? ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২৪ বছর বয়সেই তিনি খ্যাতিমান। পি এইচ ডি থিসিসের জন্য খ্যাতিমান হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরে ‘রাইনিশ জাইতুং’-এর লেখক ও সম্পাদক হিসেবে বিখ্যাত হন।

১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে বহিষ্কৃত হতে হয়। ‘কমিউনিস্ট ইস্তেহার’ প্রকাশের আগেই কয়েকবার।

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ‘কমিউনিস্ট ইস্তেহার’ প্রকাশের বছরেই ‘নয়ে রাইনিশ জাইতুং’ পত্রিকায় প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য আদালতে মার্কস এঙ্গেলসের বিরুদ্ধে মামলা শুনতে বিপুল সংখ্যক মানুষ আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন, সে কি এমনি এমনি?

বার্লিন, নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিসের সংবাদপত্রে তাঁর নিবন্ধ ছাপা হচ্ছে—’খ্যাতিহীন’ বলে?

ঘ) দরিদ্র, কিন্তু ‘নিঃসহায়’ কি বলা যায়? এঙ্গেলস, যিনি বন্ধু মার্কসকে সাহায্য করবেন বলে বাবার কারখানায় কেরানির কাজ নিলেন, তাঁর সহায়তার কোনও মূল্য নেই? মৃত্যুর সময়ের আগের দু’মিনিট ছাড়া যিনি সবসময় পাশে থেকেছেন সেই আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এঙ্গেলস সহায় নন? কী লিখছেন, কেন লিখছেন? কোনও মূল্য নেই নামে পরিচারিকা আসলে পরিবারের একজন মানুষটির? মার্কসের শেষকৃত্যে ১৩ জন উপস্থিত মানেই তিনি খ্যাতিহীন?

আজকাল মার্কস সম্পর্কিত লেখায় ‘বহুত্ববাদ’ শব্দটি খুব লেখা হচ্ছে। একরৈখিক থেকে বহুরৈখিক বহুকৌণিক দৃষ্টিতে দেখা আর ‘বহুত্ববাদ’ এক? মার্কসীয় পরিভাষা কী বলে?

এত সব ভারী ভারী কথার পর পাঠক জানতে চাইতেই পারেন, বইয়ের নাম মার্কস মোদি মমতা কী করে হল?

আসলে এই বই এক রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাস।

নানা দৃষ্টিকোণ তুলে ধরা হয়েছে এই বইয়ে। ১৭৫৭ থেকে ২০১৯ ভারতের রাজনীতির এক কালক্রমিক বিবরণ পাবেন পাঠক। পলাশির যুদ্ধ হয় ব্রিটিশের অবাধ বাণিজ্যের সাম্রাজ্যিক বিরোধিতায়, তার ফলাফল ইংরেজের ২০০ বছর ধরে লুটপাঠ! মার্কস, লেনিন, স্তালিন, জ্যোতি বসু, বাজপেয়ী, বুদ্ধদেব, মোদি, মমতা—সবার রাজনীতি ও দর্শন আলোচিত হয়েছে এই বইয়ে।

আর পাঠক খুব বুদ্ধিমান। তিনি বুঝতে পারবেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষণা আর বাস্তব কি মিলছে? আসলে আমাদের মধ্যবিত্তীয় চিন্তায় এক প্রবল গলদ এসে গেছে। আমরা ভয়ঙ্কর একমাত্রিক হয়ে উঠছি। প্রচলিত জীবন ও দর্শন ভাবনায় এই গলদ আছে। শিশু মাটিতে পড়ে গেলে আমরা মাটিকে পা দিয়ে মারি। শিশু বোঝে তার চলার বা সিদ্ধান্তের ভুল নয়—দোষ মাটির। এ থেকে সে শেখে অন্যকে দোষ দেওয়ার প্রবণতা।

আর রামায়ণ, মহাভারত থেকে ভারতীয় প্রবণতা দ্বিমাত্রিক। চার্বাক বা অন্যদের লোকায়ত দর্শন তো প্রায় অনালোচিত থেকে গেছে।

মধ্যবিত্ত সরকারি কর্মচারী মহার্ঘভাতা/ডিএ পেলে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে আগে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। বিমানভাড়ায় ভর্তুকি তথা জ্বালানি তেলের দামে রাগ হত। এখন উলটো। গরিব দু’টাকা কেজি চাল পেলে, সাইকেল পেলে, মেয়েরা কন্যাশ্রী পেলে ব্যঙ্গবিদ্রুপে ছেয়ে যায় সামাজিক মাধ্যম। অথচ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সারে ভর্তুকি কমার বিষয়ে কোনও কথা নেই!

এই বঞ্চিত মানুষরা ৬০-৭০ ভাগ। এদের কোনও প্রতিনিধিত্ব সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই। গণমাধ্যম তো দূরের কথা, এদের পক্ষ নিয়ে বা নিজেদের এজেন্ডায় মাওবাদীরা অস্ত্র ধরলে তবেই খবর হয়, না-হলে নয়। গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের পর জয়ী দল বিজেপি সুরাটে বিজয় মিছিল করতে পারেনি। উল্টে বিশাল মিছিল বের হয়—’ইভিএম তোড়ো’ বলে। গরিব জনগণ যদি দেখে ইভিএমে তার মতের ছায়া পড়ছে না, তখন নিশ্চিত বিকল্প রাস্তা নেবে!

পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত জীবনে এখনও ছাঁটাই, মাইনে বন্ধ, পেনশন বন্ধের ছায়া নেই! তাই খুব কষে গাল দিচ্ছেন ইচ্ছেমতো। আন্দোলন করলে পুলিশের দ্বারা বাড়ি ভাঙচুর বা উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, কি ঝাড়খণ্ডের মতো ২২,৫০০, ১২,০০০ বা ৩০,০০০ রাজদ্রোহের মামলা নেই, এন আই এ নেই, তাই আমরা বুঝছি না।

এর মানে এই নয় যে, এখানে সব ঠিক আছে। বারবার হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও তোলাবাজি আছে, হুমকি-ধমকি আছে। কিন্তু এটা গুজরাট উত্তরপ্রদেশ নয়। আসামে ৪১ হাজার শিক্ষকের চাকরি অনিশ্চিত, ত্রিপুরায় ১০ হাজার শিক্ষকের, আসামে গত ছয় মাসে ১১ হাজার শিক্ষকের বেতন হয়নি, আসামে এক লাখ ৫১ হাজার অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী কর্মহীন, ত্রিপুরায় ইস্কনকে ৮২১টি বিদ্যালয় দিয়ে দিয়েছে সরকার। গুজরাটে গত ২০ বছর কোনও স্থায়ী শিক্ষক বা কর্মচারী নিয়োগ হয়নি, পাঁচ বছর অন্তর বেতন ও ভাতা বাড়ে, কোনও ডিএ-র গল্প নেই। সর্বোচ্চ বেতন ২৬৭২৫ টাকা, সর্বনিম্ন ১৬২৭৫ টাকা।

এই ভারত কোথায় যাবে? কোনদিকে যাবে?

দেশভাগের ফলে ১৯৪৭-এ সরকারিভাবে পাকিস্তান থেকে ৭০ লাখ মানুষ আসেন ভারতে। ভারত থেকে পাকিস্তানে যান ৭২ লাখ। পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুরা পাশে পান বামপন্থীদের। ধর্মীয় বিদ্বেষের রাজনীতি নয়, রুটি রুজি বাসস্থানের লড়াইয়ে পর্যবসিত হয় তাঁদের জীবন সংগ্রাম। কিন্তু ১৯৯০ পরবর্তী ক্ষেত্রে যেসব উদ্বাস্তু আসছেন তাঁদের মধ্যে প্রগতিশীলদের ভূমিকা কম, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির দাপট বেশি। এঁদের একশো শতাংশ ভোটার। তবু এঁদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ ঢুকিয়ে দিয়ে সাদা কাগজে শরণার্থী হিসেবে লিখে আবেদন করার কথা বলা হচ্ছে CAA আইন অনুযায়ী। এটা যে উদ্বাস্তুর গলায় ফাঁসির চেয়েও বেশি! যাঁর ভোটার আধার রেশন কার্ড বা পাসপোর্ট আছে তিনি নাগরিক নন? আর কী কাগজ দেবেন, যা নাগরিক বলে প্রমাণ করবে? এর মানে আপনার চাকরি, সম্পত্তি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট—সব বেআইনি। দলাই লামা শরণার্থী। দলাই লামা তো ভোট দিতে পারেন না।

মোদি সরকারের আমলে গত তিন বছরে ১২৮টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে। ৩৬ লক্ষ সিটের মধ্যে মাত্র ১০ লক্ষ আসনে ছাত্র ভর্তি হয়েছে গতবার। এইসব হচ্ছে মোদি সরকারের বিকাশের নমুনা। কিছু বুঝলেন???

৩৭০ ধারা নিয়ে চেঁচান। ৩৭১ এবং ৩৭২ ধারা পড়েছেন? মুসলিম বলেই এত আপত্তি? কাশ্মীর যেতে কোনও পারমিট লাগে না। অরুণাচল প্রদেশ যেতে পারমিট লাগে। নাগাল্যান্ডে, মিজোরামেও।

আয়কর দিতে হয় না সিকিমের বাসিন্দাদের।

মদের কর লাগে না মেঘালয়, সিকিমে।

বিমানবন্দরের ভেতরে মদ কিনলে কর দিতে হয় না।

হিন্দু সম্প্রদায়ের পরিবারের জন্য আলাদা আয়কর ছাড় আছে।

পশ্চিমবঙ্গেও আদিবাসীদের জমি কেউ কিনতে পারেন না।

নাগাল্যান্ড মিজোরাম অরুণাচল প্রদেশ সিকিমে অন্য কোনও ভারতীয় জমি কিনতে পারেন না।

কাশ্মীরে জাতীয় পতাকা উড়ত।

সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর হত।

পাকিস্তানের লোক ভারতের নাগরিক হয় না। অথচ পুরাতন নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী পাকিস্তানের নাগরিক শামি আদনান সহ ১২,০০০ জনকে নাগরিকত্ব দিয়েছে বিজেপি। কাশ্মীরে উগ্রপন্থীদের নেতা সাজ্জাদ লোনকে দলে নিয়েছে বিজেপি। জানেন?

ভোটার কার্ড, আধার কার্ড প্রমাণ নয় নাগরিকত্বের, বলছেন অমিত শাহ। তার মানে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ১৯৪৮-এর ১৯ জুলাইয়ের আগের জমির দলিল লাগবে! এ কী ধরনের ধোঁকাবাজি!

আশ্চর্য লাগে, ২৫ শতাংশ দাম কমা, বছরে দু’কোটি চাকরি, নোটবন্দি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে কথা নেই। জিএসটিতে দাম ও কর কমেনি, জনধন অ্যাকাউন্টে কোনও ন্যূনতম টাকা/ ব্যালেন্স রাখতে হবে না বলে জরিমানা আদায়, অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে আগে টাকা লাগত না—জনধনের ৬৭৩০০০০০ (ছয় কোটি তিয়াত্তর লাখ) গরিবের কাছ থেকে ১২০০ কোটির বেশি টাকা আদায় করে আদানি-আম্বানিদের ছয় লাখ কোটি টাকা কর ছাড় দেওয়া, ব্যাংক ঋণ মকুব করা—আসামের বিধানসভা নির্বাচনে ডিটেনশন ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেব বলে বাঙালির ভোট নিয়ে বাঙালিদেরই ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি করা—এসব দেখেও বেশ কিছু লোক মোদি-অমিত শাহকে বিশ্বাস করছেন!

নাগরিক না হলে ভোট দেওয়া যায় না, পাসপোর্ট হয় না—তবু আপনি এখনও নাগরিক নন? আবার প্রমাণ দিতে হবে জমির দলিল দেখিয়ে? CAA হয়েছে, কিন্তু ২০১৫-এর নির্দেশিকা বহাল। অন্যদেশে অত্যাচারের এফ আই আর করে প্রমাণ দেওয়া কি সম্ভব? ফরেনার্স রেজিস্ট্রেশন ক’জনের আছে?

১৯৪৮-এর ১৯ জুলাইয়ের আগের জমির দলিল আছে তো?

না-হলে অমিত শাহের মতে, আপনি দেশের নাগরিকই নন!

কত কত মিথ্যা মিথ গড়ে তোলা হয়। যেমন, ব্যবসায়ীরা নাকি বেশি কর দেন।

কিন্তু বাস্তব কী বলে?

এক সাংবাদিক লিখছেন, ‘একটা প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, ব্যবসায়ী বা পেশাদার ব্যক্তিরা চাকুরিজীবীদের চেয়ে অনেক বেশি আয় করেন। কিন্তু আয়করের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যক্তিগত আয়কর বাবদ সরকারের মোট যে আদায় হয় তার বেশিরভাগটাই আসে চাকুরিজীবী করদাতাদের কাছ থেকে। ২০১৬-১৭ অ্যাসেসমেন্ট বছরে ১.৮৯ কোটি চাকুরিজীবী আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন এবং তাঁরা মোট ১.৪৪ লক্ষ কোটি টাকা কর দিয়েছিলেন। যার অর্থ চাকুরিজীবী করদাতারা মাথাপিছু ৭৬,৩০৬ টাকা আয়কর দিয়েছিলেন। অন্য দিকে, ১.৮৮ লক্ষ কোটি ব্যবসায়ী এবং পেশাদার ব্যক্তি ওই বছর রিটার্ন দাখিল করে মোট ৪৮,০০০ কোটি টাকা (মাথাপিছু ২৫,৭৫৩ টাকা) কর দিয়েছিলেন সরকারকে। ‘এই যুক্তিতে জেটলি চাকুরিজীবী করদাতাদের সুবিধা দিতে ৪০,০০০ টাকার স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন ব্যবস্থার পুনপ্রবর্তন করেন। ২০০৪ সাল অবধি ”স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন” চালু থাকার পর পি চিদম্বরম চাকুরিজীবী করদাতাদের ওই সুবিধা তুলে দেন। স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন হল মোট করযোগ্য আয় থেকে একটি থোক টাকা করছাড় বাবদ বাদ দিয়ে করের হিসাব করা (এ ক্ষেত্রে ৪০,০০০ টাকা)।’

অনেকে বলেন, বাঙালি নাকি পিছিয়ে? জানেন, আয়কর সংগ্রহে দেশের প্রথম আট শহরের একটি কলকাতা! ৪২,০০০ কোটি টাকার আয়কর।

জানেন, দেশের সবচেয়ে বেশি জি এস টি আদায় হয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে। দেশে আয়কর দেওয়ার পরিমাণে পশ্চিমবঙ্গ ৮ নম্বরে। গুজরাট ঠিক তার আগে। ৭ নম্বরে।

‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ মমতা সম্পর্কে ৮ জানুয়ারি ২০২০ লিখেছেন—’মমতার সাংগঠনিক ক্ষমতা অসাধারণ। যেখান থেকে শুরু করে তিনি যেখানে পৌঁছেছেন, এই ক্ষমতা ছাড়া সেটা সম্ভবই হত না। সম্প্রতি তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, সংগঠনের দিকে তেমন নজর দিতে পারেননি। তার ফল কী হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে তিনি বিলক্ষণ দেখেছেন। গত তিন দশকের অভিজ্ঞতাকে সত্যি মানলে বলতে হয়, মমতা এটা সামলে নিতে পারবেন। তিনি জানেন, ঘরে বসে নির্বাচন জেতা যায় না। তার জন্য পদাতিকদের প্রয়োজন। এবং, সেই তৃণমূলস্তরের কর্মীদের কাছে ‘দিদি’-র গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও অবকাশ এখনও নেই।

সর্বভারতীয় রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য বাড়বে, এমনটা মনে করার সবচেয়ে বড় কারণ হল, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ—ধর্মনিরপেক্ষ, উদারবাদী মানুষ—একজন নেতার অপেক্ষায় রয়েছেন। এমন নেতা, যিনি নরেন্দ্র মোদীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, কার্যত তাঁর প্রেসিডেনশিয়াল ধাঁচের রাজনীতির পালটা দিয়ে, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারেন। মমতা নিজের ধর্মনিরপেক্ষ, বস্তুত মুসলমান-দরদী ভাবমূর্তি তৈরি করে ফেলেছেন। সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর লড়াকু চেহারা দেশের চেনা। সিঙ্গুরের ঘটনা বলবে, বড় কর্পোরেটের সামনেও তিনি সমান লড়াকু। কাজেই, ভারতের বিকল্প নেতা হয়ে ওঠার সুযোগ তাঁর আছে।

মোদী-বিরোধিতা তাঁকে যত দূর নিয়ে যাওয়ার, যাবে। কিন্তু, তার পরের ধাপটা পেরোনোর জন্য একটা গ্রহণযোগ্য বিকল্প তৈরি করতে হবে তাঁকে। সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায়, ভঙ্গিতে সেই বিকল্পের কথা বলতে হবে। এবং তাঁকে ঘিরে যে অভিযোগগুলো এখনও আছে—দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ, সহিষ্ণুতার অভাবের অভিযোগ, অস্থিরমতিত্বের অভিযোগ—সেগুলোকে অতিক্রম করতে হবে।’

তবে পত্রিকা একটা কথা বলেছেন, মমতার রাজনীতি আদর্শকেন্দ্রিক নয়। এটা সবটা মানা যায় না! মমতার অবশ্যই একটা স্বপ্ন আছে—গরিবের ভালো করা। ব্যক্তিগত লাভ-অলাভের প্রশ্ন একেবারে হিসেব করেন না, বলা যাবে না—তবে তাঁর আমলে গরিবের কল্যাণ হয়েছে। সারা ভারতে যেখানে দারিদ্র্য বাড়ছে, পশ্চিমবঙ্গে কমেছে।

বিপরীতে মোদি কেবলই বাকসর্বস্ব। শুধু বলে যান, বলে যান এবং বলে যান। কাজের হিসেব করেন না, কাজ করেননি। দেশের অর্থনীতি ধুঁকছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঞ্চয় থেকে ১.৭৬ ট্রিলিয়ন টাকা নজিরবিহীনভাবে নেওয়া হয়েছে। রাজস্ব ঘাটতি ৩.৫ শতাংশের বেশি। মনমোহনের আমলের জি ডি পি ১০ থেকে নেমে ৪.৫। রাজধানী এক্সপ্রেস সহ দেশের ১৫৬টি লাভজনক ট্রেন বেচে দেওয়া হচ্ছে। ৮ জানুয়ারি দেশের ২০৪টি কয়লাখনি বিদেশিদের কাছে নিলাম করতে অধ্যাদেশ জারি করা হল। লাভজনক ভারত পেট্রোলিয়াম বেচে দেওয়া হচ্ছে। পাঠক, ভাবতে পারছেন!

নাগরিকদের চাকরি নেই, বাসস্থান নেই, খাওয়া ও পরার চরম অসুবিধা—নাগরিকত্ব আইন করে বিদেশিদের নাগরিকত্ব দিতে ব্যস্ত। দেশ কার্যত জ্বলছে। উত্তরপ্রদেশে ৩৬ জনকে গুলি করে মারা হয়েছে CAA আইনের প্রতিবাদ করায়। আসামে নিহত ৭ জন। এরই মাঝে দিল্লিতে ৫৩ জন মানুষ নিহত হয়েছেন শাসকের মদতে। ভারতের প্রধান বিচারপতি প্রাক্তন হয়েই রাজ্যসভার সাংসদ। জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়—কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে পুলিশ ও আর এস এস ক্যাডার ঢুকে মেরেছে ছাত্র-ছাত্রীদের। আরেক কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানেও অবস্থা মর্মন্তুদ। ৫ জানুয়ারি ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের হোস্টেলে পর্যন্ত ঢুকে মেরেছে বহিরাগত দুষ্কৃতীরা। মার খেয়েছেন অধ্যাপিকারা, মার খেয়েছেন ছাত্র সংসদের সভানেত্রী ঐশী ঘোষসহ ৩২ জন ছাত্র-ছাত্রী।

এর প্রতিবাদে নজিরবিহীনভাবে পথে নেমেছেন বলিউডের তারকারা। অনুরাগ কাশ্যপ, স্বরা ভাস্বররা তো ছিলেনই! মুখ খুলেছেন অনিল কাপুর, আলিয়া ভট্ট, বিশাল দাদলানি, সোনাক্ষী সিনহারা। ২০১৬-এ ‘পদ্মাবতী’ ছবি করে আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন দীপিকা পাড়ুকোন। সেই দীপিকা পাড়ুকোন সবাইকে চমকে দিয়ে চলে গেছেন আন্দোলন ও শিক্ষার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুনেছেন নতুন ভারতের কানহাইয়ার আজাদির শ্লোগান। যা হয়ে উঠছে ‘জয় শ্রীরাম’ নামে রণহুঙ্কারের বিকল্প।

ভারতের সংস্কৃতি মিশ্র সংস্কৃতি। তাকে মেরে ফেলা এত সহজ নয়। তাই ফার্সি শব্দ ‘হিন্দু’ ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর ধর্মপরিচিতির নাম হয়, মুসলমানরা সংস্কৃত শব্দ ‘পানি’ বলেন। তুর্কি শব্দ ‘বাবা’, ‘দাদা’, ‘কাকা’—হয়ে যায় বাঙালি হিন্দুর ডাক। তুর্কি ‘তগগড়’ হয়ে যায় ‘ঠাকুর’।

আপনি অবাক হয়ে বলবেন, এ তো চেনা অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলছে না।

অবশ্যই মিলছে! ভারত জাগছে।

কোথায়? রাজনীতিবিমুখ নতুন প্রজন্ম নেমেছেন রাস্তায়। রাত জাগছেন শাহিনবাগে, পার্ক সার্কাসে। দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজের দলের শাসনে থাকা আসামে যেতে সাহস করছেন না! ১৫, ১৬ ডিসেম্বর অমিত শাহ বাতিল করেছেন মেঘালয়, অরুণাচল সফর। ১৯ ডিসেম্বর নিজের খাসতালুক গুজরাটে যেতে পারেননি। ৮ জানুয়ারি দেশ জুড়ে চাক্কা বন্ধ।

এ ভারত জেগে ওঠার! এ ভারত সত্য উচ্চারণের।

প্রিয় পাঠক, এবার বইয়ের পাতা খোলার সময় হয়েছে। চলুন আপনার সঙ্গে আমিও পড়তে এবং তর্কে মাততে থাকি।

যত খুশি অপ্রিয় প্রশ্ন করুন। মেল করুন পত্রভারতীতে।

মতান্তর হোক, মনান্তর না হলেই ভালো।

দেখা যাক, দেশ টুকরো হবে, না ঐক্যবদ্ধ প্রকৃত যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারত গড়ে উঠবে?

আগামীর ভারত, আশা জাগানো, পথ দেখানো তরুণ ভারত কোন পথ বেছে নেয়—মার্কসবাদ, মমতাবাদ (পন্থা) নাকি মোদিপন্থা?

ইমানুল হক
৬ নভেম্বর ২০২০
সল্টলেক সিটি
কলকাতা ৭০০ ০৬৪

Book Content

মিরজাফর থেকে মনমোহন
দ্বারকানাথ, রবীন্দ্রনাথ এবং
লেনিনের শেষজীবন : প্রচার বনাম সত্য
স্তালিনের সপক্ষে
বাংলায় কমিউনিস্ট সংস্কৃতি
জ্যোতি বসু ও বাংলার সমাজ সংস্কৃতি
বাজপেয়ি থেকে মোদি
গুজরাত : মিথ ও মিথ্যা
মেকলে, মার্কস, মমতা, মাও ও বাংলা
রাজতন্ত্র, মৌলবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ
বামপন্থা নয়, সমাজতান্ত্রিক বুর্জোয়াদের পতন
কিছু অ-হিসেবি কথা
তর্ক আর ঝগড়া এক নয়
কোন উত্তরাধিকার আমরা বহন করব?
সে সব কথা কেন যে আজ কেউ বলে না
বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও কলকাতা
সংবাদ মূলত…
আশা নিরাশা
ব্রান্ড বুদ্ধ, মমতা, মমতাবাদ
তরুণ ভারত
ইতিহাস পুরাণ : মিথ ও মিথ্যা

ইতিহাস পুরাণ : মিথ ও মিথ্যা – ইমানুল হক

Reader Interactions

Comments

  1. S

    August 27, 2025 at 4:42 pm

    বই টি পড়া যাচ্ছে না।

    Reply
    • বাংলা লাইব্রেরি

      August 27, 2025 at 10:29 pm

      লগইন করে দেখুন তো হয় কি না।

      Reply
      • Rizwan Sk

        August 29, 2025 at 3:50 am

        Log in korar poreo hocche na

        Reply
  2. Debasish

    September 4, 2025 at 2:43 am

    Lekhok ekti adyopanta gora molla…ore Tora edese achis..etai baro katha..toderke tariye amra hindu rastro kore dite partam..ta korini…eta amader daya…Hindustan jindabad..sanatani ki jai ho… bharatmata ki joi…joy ma kali..joy sree ram.. Narendra Modi jindabad..Amit Shah jindabad…
    Bangla mayer damal chele Suvendu Adhikari jindabad…

    Reply

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.