মহুয়ার গান – কাজী নজরুল ইসলাম
মহুয়ার গান – কাজী নজরুল ইসলাম
বাংলা একাডেমী, ঢাকা থেকে প্রকাশিত নজরুল-রচনাবলী দ্বিতীয় খণ্ডের (নতুন সংস্করণ ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪০০/২৫ মে ১৯৯৩) ৮৮৩ পৃষ্ঠায় প্রদেয় গ্রন্থপরিয় অনুসারে নিচের পাঠটি তুলে ধরা হলো।
নজরুল-রচনাবলীর নতুন সংস্করণে মহুয়ার গান সংযোজিত হলো। ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি এ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থের প্রকাশক গোপালদাস মজুমদার, ডি, এম, লাইব্রেরি, ৬১ কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট, কলিকাতা। মুদ্রাকর কৃষ্ণপ্রসাদ ঘোষ, প্রকাশ প্রেস, ৬৬ মানিক-তলা স্ট্রিট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৩ এবং মূল্য দুই আনা।
মহুয়ার গান মন্মথ রায়ের মহুয়া নাটকের জন্য রচিত গানের সঙ্কলন। মহুয়া নাটক ১৯২৯ বা তার পূর্বে কোনো এক সময়ে প্রথম মঞ্চস্থ হয়। নাটকটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালে।
গীতিগ্রন্থ মহুয়ার গানে ১৫টি গান ছিল। তার মধ্যে ১৪ সংখ্যক গান (আমার গহীন জলের নদী) এবং ১৫ সংখ্যক গান (তোমায় কূলে তুলে বন্ধু আমি নামলাম জলে) চোখের চাতক (অগ্রহায়ণ ১৩৩৬) গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখানে পরিবর্জিত হলো। মূল গ্রন্থের ১৩ সংখ্যাক গানটিও (ও ভাই আমার এ নাও যাত্রী না লয়) চোখের চাতক গ্রন্থে মুদ্রিত হয়, কিন্তু মহুয়ার গানে পাঠভেদ থাকায় গানটি এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
.
১
(বেদে ও বেদেনিদের গান)
কে দিল খোঁপাতে ধুতুরা ফুল লো।
খোঁপা খুলে কেশ হল বাউল লো॥
পথে কে বাজাল মোহন-বাঁশি
(তোর) ঘরে ফিরে যেতে হল ভুল লো।
কে নিল কেড়ে তোর পৈঁচি চুড়ি
বৈঁচি মালায় ছি ছি খোয়ালি কুল লো॥
ও সেবুনো পাগল পথে বাজায় মাদল।
পায়ে ঝড়ের নাচন শিরে চাঁচর চুল লো॥
দিল নাকেতে নাকছাবি বাবলা ফুলি
কাঁচের চুড়ি আর ঝুমকোফুল দুল লো,
নিয়ে লাজদুকূল দিল ঘাগরি সে
আমার গাগরি ভাসাল জলে বাতুল লো॥
২
(মহুয়ার গান)
ভৈরবী-পিলু – কার্ফা
বউ কথা কও, বউ কথা কও,
কও কথা অভিমানিনী।
সেধে সেধে কেঁদে কেঁদে
যাবে কত যামিনী॥
সে কাঁদন শুনি হেরো নামিল নভে বাদল,
এল পাতার বাতায়নে জুঁই চামেলি কামিনী॥
আমার প্রাণের ভাষা শিখে
ডাকে পাখি, পিউ কাঁহা,
খোঁজে তোমায় মেঘে মেঘে
আঁখি মোর সৌদামিনী॥
৩
(মহুয়ার গান)
কত খুঁজিলাম নীল কুমুদ তোরে।
আছে নীল জলে শূনো সরসী ভরে॥
উঠেছে আকাশে চাঁদ, ফুটেছে তারা,
আছে সব, একা মোর কুমুদ-হারা।
অভিমানে সে কি গিয়াছে ঝরে॥
বিল ঝিল খুঁজি, নাই সে যে হায়,
হৃদয় শুধায় চোখে, কোথায় কোথায়!
ঘুমায়ে আছে সে কি আছে লুকায়ে,
সোঁদামাখা এলোচুল গেল শুকায়ে
নদীরে শুধাই – জল যায় যে সরে॥
৪
(মহুয়ার গান)
বেহাগ ও বসন্ত – একতালা
ভরিয়া পরান শুনিতেছি গান
আসিবে আজি বন্ধু মোর।
স্বপন মাখিয়া সোনার পাখায়
আকাশে উধাও চিত-চকোর।
আসিবে আজি বন্ধু মোর॥
হিজল-বিছানো বনপথ দিয়ে
রাঙায়ে চরণ আসিবে গো পিয়া।
নদীর পারে বন-কিনারে
ইঙ্গিত হানে শ্যাম কিশোর।
আসিবে আজি বন্ধু মোর॥
চন্দ্রচূড় মেঘের গায়
মরাল-মিথুন উড়িয়া যায়,
নেশা ধরে চোখে আলো-ছায়ায়,
বহিছে পবন গন্ধ-চোর।
আসিবে আজি বন্ধু মোর॥
৫
(বেদে ও বেদেনিদের গান)
তিলক-কামোদ দেশ – কাওয়ালি
একডালি ফুলে ওরে সাজাব কেমন করে।
মেঘে মেঘে এলোচুলে আকাশ গিয়েছে ভরে।
সাজাব কেমন করে॥
কেন দিলে বনমালী এইটুকু বনডালি,
সাজাতে কি না-সাজাতে কুসুম হইল খালি।
ছড়ায়েছে ফুলদল অভিমানে ডালি ধরে॥
কেতকী ভাদর-বধূ ঘোমটা টানিয়া কোণে
লুকায়েছে ফণী-ঘেরা গোপন কাঁটার বনে।
কামিনীফুল মানে না মানা ছুঁতে পড়েছে ঝরে॥
গন্ধ-মাতাল চাঁপা দুলিছে নেশার ঝোঁকে,
নিলাজি টগরবালা চাহিয়া ডাগর চোখে,
দেখিয়া ঝরার আগে বকুল গিয়াছে মরে॥
৬
(বেদেনির গান)
দরবারি-কানাড়ি – কাওয়ালি
মহুল গাছে ফুল ফুটেছে
নেশার ঝোঁকে ঝিমায় পবন।
গুনগুনিয়ে ভোমর এল
ওলো গুণ করে ওর ভোলাল মন॥
আউরে গেছে মু-খানি ওর,
করল বাতাস খুলে আঁচর,
চাঁদের লোভে এল চকোর
মেঘে ঢাকিসনে লো নয়ন॥
কেশের কাঁটা বিঁধে পাখায়
রাখল ওরে বেঁধে শাখায়,
মউ টুসি মউ-মদের মিঠায়
কপটে কর নিকট আপন॥
৭
(পালঙ্কের গান)
আড়ানা – কাওয়ালি
খোলো খোলো গো দুয়ার
নীল ছাপিয়া এল চাঁদের জোয়ার॥
সংকেত-বাঁশরি বনে বনে বাজে
মনে মনে বাজে।
সাজিয়াছে ধরণি অভিসার-সাজে।
নাগর-দোলায় দুলে সাগর পাথার॥
জেগে উঠে কাননে ডেকে ওঠে পাখি
চোখ গেল চোখ গেল চোখ গেল!
অসহ রূপের দাহে ঝলসি গেল আঁখি,
চোখ গেল চোখ গেল চোখ গেল।
ঘুমন্ত যৌবন তনু মন জাগো
সুন্দরী সুন্দর-পরশন মাগো।
চলো বিরহিণী অভিসারে বঁধুয়ার॥
৮
(বেদেনিদের গান)
দরবারি কানাড়া – কাওয়ালি
আজি
ঘুম নহে, নিশি জাগরণ।
চাঁদেরে ঘিরি নাচে ধীরি ধীরি
তারা অগণন॥
প্রখর-দাহন দিবস-আলো,
নলিনী-দলে ঘুম তখনই ভালো।
চাঁদ চন্দন চোখে বুলাল
খোলো গো নিদমহল-আবরণ॥
ঘুরে ঘুরে গ্রহ তারা বিশ্ব আনন্দে
নাচিছে নাচুনি ঘূর্ণির ছন্দে।
লুকোচুরি-নাচ মেঘ তারা মাঝে,
নাচিছে ধরণি আলোছায়া-সাজে,
ঝিল্লির ঘুমুর ঝুমু ঝুমু বাজে
খুলি খুলি পড়ে ফুল-আভরণ॥
৯
(রাধু পাগলির গান)
ভাটিয়ালি – কারফা
ও ভাই আমার এ নাও যাত্রী না লয়
ভাঙা আমার তরি।
আমি আপনারে লয়ে রে ভাই এপার ওপার করি।।
আমায় দেউলিয়া করেছে রে ভাই যে নদীর জল
আমি ডুবে দেখতে এসেছি ভাই সেই জলেরই তল।
আমি ভাসতে আসি, আসিনি কো কামাতে ভাই কড়ি।।
আমি এই জলেরই আয়নাতে ভাই দেখেছিলাম তায়
এখন আয়না আছে পড়ে রে ভাই আয়নার মানুষ নাই।
তাই চোখের জলে নদীর জলে রে
আমি তারেই খুঁজে মরি।।
আমি তারই আশায় তরি নিয়ে ঘাটে বসে থাকি,
আমার তারই নাম ভাই জপমালা তারেই কেঁদে ডাকি।
আমার নয়ন-তারা লইয়া গেছে রে
নয়ন নদীর জলে ভরি।।
ওই নদীর জলও শুকায় রে ভাই সে জল আসে ফিরে,
আর মানুষ গেলে ফেরেনা কি দিলে মাথার কিরে।
আমি ভালোবেসে গেলাম ভেসে গো
আমি হলাম দেশান্তরী।।
১০
(রাধু পাগলির গান)
ভাটিয়ালি – কাহারবা
আমার গহিন জলের নদী।
আমি তোমার জন্যে ভেসে রহিলাম জনম অবধি॥
ও ভাই তোমার বানে ভেসে গেল আমার বাঁধা ঘর,
আমি চরে এসে বসলাম রে ভাই, ভাসালে সে চর।
এখন সব হারিয়ে তোমার সোঁতে ভাসি নিরবধি॥
আমার ঘর ভাঙিলে ঘর পাব ভাই, ভাঙলে কেন মন,
ও ভাই হারালে আর পাওয়া না যায় মনের রতন।
ও ভাই জোয়ারে মন ফিরেনা আর, ভাটিতে হারায় যদি।
তুমি ভাঙো যখন কূল রে নদী ভাঙো একই ধার,
আর মন যখন ভাঙোরে নদী দুইকূল ভাঙো তার।
ও ভাই চর পড়েনা মনের কূলে, একবার সে ভাঙে যদি॥
১১
(রাধু পাগলির গান)
ভাটিয়ালি – কাহারবা
তোমায় কূলে তুলে বন্ধু আমি নামলাম জলে।
আমি কাঁটা হয়ে রই নাই বন্ধু তোমার পথের তলে॥
আমি তোমায় ফুল দিয়েছি সখা তোমার বন্ধুর লাগি,
যদি আমার শ্বাসে শুকায় সে ফুল, তাই হলাম বিবাগী॥
আমি বুকের তলায় রাখি তোমায় গো
পরে শুকাইনিকো গলে॥
ওই যে দেশ তোমার ঘর রে বন্ধু সে দেশ থেকে এসে
আমার দুখের তরি দিলাম ছেড়ে চলতেছে সে ভেসে।
এখন সে পথে নাই তুমি বন্ধু গো
তরি সেই পথে মোর চলে॥
১১
(রাধু পাগলির গান)
ভাটিয়ালি – কাহারবা
তোমায় কূলে তুলে বন্ধু আমি নামলাম জলে।
আমি কাঁটা হয়ে রই নাই বন্ধু তোমার পথের তলে॥
আমি তোমায় ফুল দিয়েছি সখা তোমার বন্ধুর লাগি,
যদি আমার শ্বাসে শুকায় সে ফুল, তাই হলাম বিবাগী॥
আমি বুকের তলায় রাখি তোমায় গো
পরে শুকাইনিকো গলে॥
ওই যে দেশ তোমার ঘর রে বন্ধু সে দেশ থেকে এসে
আমার দুখের তরি দিলাম ছেড়ে চলতেছে সে ভেসে।
এখন সে পথে নাই তুমি বন্ধু গো
তরি সেই পথে মোর চলে॥
১২
(মহুয়ার গান)
ফণীর ফণায় জ্বলে মণি
কে নিবি তাহারে আয়
মণি নিতে ডরে না কে
ফণীর বিষ-জ্বালায়॥
করেছে মেঘ উজালা
বজ্র-মানিক-মালা,
সে মালা নেবে কি কালা,
মরিয়া অশনি ঘায়॥
১৩
(মহুয়ার গান)
দেশ – একতালা
মোরা ছিনু একেলা, হইনু দুজন।
সুন্দরতল হল নিখিল ভুবন॥
আজি কপোত-কপোতী শ্রবণে কুহরে,
বীণা-বেণু বাজে বন-মর্মরে।
নির্ঝর-ধারে সুধা চোখে মুখে ঝরে,
নতুন জগৎ মোরা করেছি সৃজন॥
মরিতে চাহি না, পেয়ে জীবন-অমিয়া।
আসিব এ কুটিরে আবার জনমিয়া।
আরও চাই আরও চাই অশেষ জীবন।
আজি প্রদীপ-বন্দিনী আলোক-কন্যা,
লক্ষ্মীর শ্রী লয়ে আসিল অনন্যা,
মঙ্গল-ঘটে এল নদীজল-ধন্যা,
পার্বতী পরিয়াছে গৌরী-ভূষণ॥
১৪
(মহুয়ার গান)
আশাবরী – কাওয়ালি
(ওগো) নতুন নেশার আমার এ মদ
(বলো) কী নাম দেব এর বঁধুয়া।
গোপীচন্দন গন্ধ মুখে এর
বরণ সোনার চাঁদ-চুয়া॥
মধু হতে মিঠে পিয়ে আমার মদ
গোধূলি রং ধরে কাজল-নীরদ,
প্রিয়েরে প্রিয়তম করে এ মদ মম,
চোখে লাগায় নভো-নীল ছোঁওয়া॥
ঝিম হয়ে আসে সুখে জীবন ছেয়ে,
পানসে জোছনাতে পানসি চলে বেয়ে,
মধুর এ মদ নববধূর চেয়ে
আমারই মিতালি এ মহুয়া॥
১৫
(মহুয়ার গান)
পিলু – কাওয়ালি
কোথা চাঁদ আমার!
নিখিল ভুবন মোর ঘিরিল আঁধার॥
ওগো বন্ধু আমার, হতে কুসুম যদি,
রাখিতাম কেশে তুলি নিরবধি।
রাখিতাম বুকে চাপি হতে যদি হার॥
আমার উদয়-তারার শাড়ি ছিঁড়েছে কবে,
কামরাঙা শাঁখা আর হাতে কি রবে।
ফিরে এসো, খোলা আজও দখিন-দুয়ার॥
***

Leave a Reply