বুলবুল (প্রথম খণ্ড) – কাজী নজরুল ইসলাম
.
১. বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে
ভৈরবী — কাহারবা
বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে
দিসনে আজি দোল।
আজও তার ফুলকলিদের ঘুম টুটেনি
তন্দ্রাতে বিলোল॥
আজও হায় রিক্ত শাখায় উত্তরী-বায়
ঝুরছে নিশিদিন,
আসেনি দখ্নে হাওয়া গজল্-গাওয়া
মৌমাছি বিভোল॥
করে সে ফুলকুমারী ঘোমটা চিরি
আসবে বাহিরে,
শিশিরের স্পর্শসুখে ভাঙবে রে ঘুম
রাঙবে রে কপোল॥
ফাগুনের মুকুল-জাগা দুকূল-ভাঙা
আসবে ফুলের বানস
কুঁড়িদের ওষ্ঠপুটে লুটবে হাসি,
ফুটবে গালে টোল॥
কবি তুই গন্ধে ভুলে ডুবলি জলে
কূল পেলিনে আর,
ফুলে তোর বুকে ভরেছিস আজকে জলে
ভরবে আঁখির কোল॥
২. আমারে চোখ-ইশারায় ডাক দিলে হায় কে গো দরদি
জৌনপুরী-আশাবরী — কাহারবা
আমারে চোখ-ইশারায় ডাক দিলে হায় কে গো দরদি।
খুলে দাও রং-মহলার তিমির-দুয়ার ডাকিলে যদি॥
গোপনে চৈতি হাওয়ায় গুল-বাগিচায় পাঠালে লিপি,
দেখে তাই ডাকছে ডালে কূ কূ বলে কোয়েলা ননদি॥
পাঠালে ঘূর্ণি-দূতী ঝড়-কপোতী বৈশাখে সখী,
বরষায় সেই ভরসায় মোর পানে চায় জল-ভরা নদী॥
তোমারই অশ্রু ঝলে শিউলি-তলে সিক্ত শরতে,
হিমানীর পরশ বুলাও ঘুম ভেঙে দাও দ্বার যদি রোধি॥
পউষের শূন্য মাঠে একলা বাটে চাও বিরহিণী,
দুহুঁ হায় চাই বিষাদে মধ্যে কাঁদে তৃষ্ণা-জলধি॥
ভিড়ে যা ভোর-বাতাসে ফুল-সুবাসে রে ভোমর-কবি,
উষসীর শিশ্মহলে আসতে যদি চাস নিরবধি॥
৩. বসিয়া বিজনে কেন একা মনে
ইমন-মিশ্র গজল — কাহারবা
বসিয়া বিজনে কেন একা মনে
পানিয়া ভরণে চল লো গোরি।
চল জলে চল কাঁদে বনতল,
ডাকে ছলছল জল-লহরি॥
দিবা চলে যায় বলাকা-পাখায়,
বিহগের বুকে বিহগী লুকায়!
কেঁদে চখাচখি মাগিছে বিদায়
বারোয়াঁর সুরে ঝুরে বাঁশরি॥
সাঁঝ হেরে মুখ চাঁদ-মুকুরে
ছায়াপথ-সিঁথি রচি চিকুরে,
নাচে ছায়ানটী কানন পুরে
দুলে লটপট লতা-কবরী॥
‘বেলা গেল বধূ’ ডাকে ননদি
চ-লো জল নিতে যাবি লো যদি,
কালো হয়ে আসে সুদূর নদী,
নাগরিকা-সাজে সাজে নগরী॥
মাঝি বাঁধে তরি সিনান-ঘাটে,
ফিরিছে পথিক বিজন মাঠে,
কারে ভেবে বেলা কাঁদিয়া কাটে
ভর আখিঁ-জলে ঘট গাগরি॥
ওগো বে-দরদি, ও রাঙা পায়ে
মালা হয়ে কে গো গেল জড়ায়ে!
তব সাথে কবি পড়িল দায়ে
পায়ে রাখি তারে না গলে পরি॥
৪. ভুলি কেমনে আজও যে মনে
পিলু — কাহারবা-দাদরা
ভুলি কেমনে আজও যে মনে
বেদনা-সনে রহিল আঁকা।
আজও সজনি দিন রজনি
সে বিনে গণি তেমনই ফাঁকা॥
আগে মন করলে চুরি,
মর্মে শেষে হানলে ছুরি,
এত শঠতা এত যে ব্যথা
তবু যেন তা মধুতে মাখা॥
চকোরী দেখলে চাঁদে
দূর হতে সই আজও কাঁদে,
আজও বাদলে ঝুলন ঝোলে
তেমনই জলে চলে বলাকা॥
বকুলের তলায় দোদুল
কাজলা মেয়ে কুড়োয় লো ফুল
চলে নাগরী কাঁধে গাগরি
চরণ ভারী কোমর বাঁকা॥
তরুরা রিক্ত পাতা
আসল লো তাই ফুল-বারতা,
ফুলেরা গলে ঝরেছে বলে
ভরেছে ফলে বিটপী-শাখা॥
ডালে তোর হানলে আঘাত
দিস রে কবি ফুল-সওগাত
ব্যথা-মুকুলে অলি না ছুঁলে
বনে কি দুলে ফুল-পতাকা॥
৫. কেন কাঁদে পরান কী বেদনায় কারে কহি
মিশ্র বেহাগ-খাম্বাজ — দাদরা
কেন কাঁদে পরান কী বেদনায় কারে কহি
সদা কাঁপে ভীরু হিয়া রহি রহি॥
সে থাকে নীল নভে আমি নয়ন-জল-সায়রে,
সাতাশ তারার সতিন-সাথে সে যে ঘুরে মরে,
কেমনে ধরি সে চাঁদে রাহু নহি॥
কাজল করি যারে রাখি গো আঁখি-পাতে,
স্বপনে যায় সে ধুয়ে গোপন অশ্রু সাথে।
বুকে তায় মালা করি রাখিলে যায় সে চুরি,
বাঁধিলে বলয়-সাথে মলয়ায় যায় সে উড়ি,
কী দিয়ে সে উদাসীর মন মোহি॥
৬. মৃদুল বায়ে বকুল ছায়ে
সিন্ধু-ভৈরবী — কাহারবা
মৃদুল বায়ে বকুল ছায়ে
গোপন পায়ে কে ওই আসে।
আকাশ-ছাওয়া চোখের চাওয়া
উতল হাওয়া কেশের বাসে॥
উষার রাগে সাঁঝের ফাগে
যুগল তাহার কপোল রাঙে,
কমল দুলে সূরয শশী
নিশীথ-চুলে আঁধার-রাশে॥
চরণ-ছোঁয়ায় পাতার ঠোঁটে
মুকুল কাঁপে কুসুম ফোটে,
আঁখির পলক- পতন-ছাঁদে
নিশীথ কাঁদে দিবস হাসে॥
গ্রহের মালা অলখ-খোঁপায়,
কপোল শোভে তারার টোপায়,
কুসুম-কাঁটায় আঁচল বাধে
রুমাল লুটায় সবুজ ঘাসে॥
সাঁঝের শাখায় কানন মাঝে
বালার বিহগ- কাঁকন বাজে,
জীবন তাহার সোনার স্বপন
দোলায় ঘুমায় শিশুর পাশে॥
তোমার লীলা- কমল করে
নিখিল-রানি! দুলাও মোরে।
ঢুলাও আমার সুবাসখানি
তোমার মুখের মদির-শ্বাসে॥
৭. কে বিদেশি মন-উদাসী
ভৈরবী-আশাবরী — কাহারবা
কে বিদেশি মন-উদাসী
বাঁশির বাঁশি বাজাও বনে।
সুর-সোহাগে তন্দ্রা লাগে
কুসুম-বাগের গুল্-বদনে॥
ঝিমিয়ে আসে ভোমরা-পাখা,
যূথীর চোখে আবেশ মাখা,
কাতর ঘুমে চাঁদিমা রাকা
(ভোর গগনের দর-দালানে)
দর-দালানে ভোর গগনে॥
লজ্জাবতীর লুলিত লতায়
শিহর লাগে পুলক-ব্যথায়,
মালিকা সম বঁধুরে জড়ায়
বালিকা-বধূ সুখ-স্বপনে॥
সহসা জাগি আধেক রাতে
শুনি সে বাঁশি বাজে হিয়াতে,
বাহু-শিথানে কেন কে জানে
কাঁদে গো পিয়া বাঁশির সনে॥
বৃথাই গাঁথি কথার মালা
লুকাস কবি বুকের জ্বালা,
কাঁদে নিরালা বনশিওয়ালা
তোরই উতলা বিরহী মনে॥
৮. করুণ কেন অরুণ আঁখি
সিন্ধু — কাওয়ালি
করুণ কেন অরুণ আঁখি
দাও গো সাকি দাও শারাব।
হায় সাকি এ আঙ্গুরি খুন,
নয় ও হিয়ার খুন-খারাব॥
দুর্দিনের এই দারুণ দিনে
শরণ নিলাম পানশালায়,
হায় শাহারার প্রখর তাপে
পরান কাঁপে দিল্-কাবাব॥
আর সহে না দিল্ নিয়ে এই
দিল্-দরদির দিল্লগি
তাই তো চালাই নীল পিয়ালায়
লাল শিরাজি বে-হিসাব॥
এই শারাবের নেশার রঙে
নয়ন-জলের রং লুকাই,
দেখছি আঁধার জীবন ভরি
ভর-পিয়ালার লাল খোয়াব॥
আমার বুকের শূন্যে কে গো
ব্যথার তারে ছড় চালায়,
গাইছি খুশির মহ্ফিলে গান
বেদন-গুণীর বীণ-রবাব॥
হারাম কি এই রঙিন পানি,
আর হালাল এই জল চোখের?
নরক আমার হউক মঞ্জুর,
বিদায় বন্ধু, লও আদাব॥
দেখ রে কবি, প্রিয়ার ছবি
এই শারাবের আরশিতে,
লাল গেলাসের কাচ-মহলার
পার হতে তার শোন জওয়াব॥
৯. এত জল ও-কাজল-চোখে
মান্দ্ — কাওয়ালি
এত জল ও-কাজল-চোখে
পাষাণী, আনলে বল কে।
টলমল জল-মোতির মালা
দুলিছে ঝালর-পলকে॥
দিল কি পুব-হাওয়াতে দোল,
বুকে কি বিঁধিল কেয়া?
কাঁদিয়া কুটিলে গগন
এলায়ে ঝামর-অলকে॥
চলিতে পৈচি কি হাতের
বাধিল বৈঁচি-কাঁটাতে?
ছাড়াতে কাঁচুলির কাঁটা
বিঁধিল হিয়ার ফলকে॥
যে দিনে মোর দেওয়া মালা
ছিঁড়িলে আনমনে সখী,
জড়াল জুঁই-কুসুমি-হার
বেণিতে সেদিন ও লো কে॥
যে-পথে নীর ভরণে যাও
বসে রই সেই পথ-পাশে,
দেখি, নিত্ কার পানে চাহি
কলসির সলিল ছলকে॥
মুকুলি মন সেধে সেধে
কেবলই ফিরিনু কেঁদে
সরসীর ঢেউ পলায় ছুটি
না ছুঁতেই নলিন-নোলকে॥
বুকে তোর সাত সাগরের জল,
পিপাসা মিটল না কবি,
ফটিক-জল! জল খুঁজিস যেথায়
কেবলই তড়িৎ ঝলকে॥
১০. আসে বসন্ত ফুলবনে
ভীমপলশ্রী — দাদরা
আসে বসন্ত ফুলবনে
সাজে বনভূমি সুন্দরী।
চরণে পায়েলা রুমুঝুমু
মধুপ উঠিছে গুঞ্জরি॥
ফুলরেণু-মাখা দখিনা বায়
বাতাস করিছে বনবালায়,
বনকরবী-নিকুঞ্জছায়
মুকুলিকা ওঠে মুঞ্জরি॥
কুহু আজি ডাকে মুহুমুহু,
‘পিউ কাঁহা’ কাঁদে উহু উহু
পাখায় পাখায় দোঁহে দুহুঁ
বাঁধে চঞ্চর-চঞ্চরী॥
দুলে আলোছায়া বন-দু-কূল,
ওড়ে প্রজাপতি কলকা ফুল,
কর্ণে অতসী স্বর্ণদুল
আলোকলতার সাতনরি॥
পদ্ম ডালিয়া পায়ে বালা
করিয়াছে সারা বন আলা,
দ্বারে মঞ্জরী-দীপ জ্বালা,
ডালপালা রচে ফুলছড়ি॥
কবি, তোর ফুলমালি কেমন,
ফাগুনে শূন্য পুষ্পবন,
বরিবি বঁধুরে এলে কানন
রিক্ত হাতে কি ভুল ভরি॥
১১. দুরন্ত বায়ু পুরবৈয়াঁ
কাফি-সিন্ধু — কাহারবা
দুরন্ত বায়ু পুরবৈয়াঁ
বহে অধীর আনন্দে।
তরঙ্গে দুলে আজি নাইয়া
রণ-তুরঙ্গ-ছন্দে॥
অশান্ত অম্বর-মাঝে
মৃদঙ্গ গুরুগুরু বাজে,
আতঙ্কে থরথর অঙ্গ
মন অনন্তে বন্দে॥
ভুজঙ্গী দামিনীর দাহে
দিগন্ত শিহরিয়া চাহে,
বিষণ্ণ-ভয়-ভীতা যামিনী
খোঁজে সে তারা চন্দে॥
মালঞ্চে এ কী ফুল-খেলা
আনন্দ ফোটে যূথী-বেলা,
কুরঙ্গী নাচে শিখী-সঙ্গে
মাতি কদম্ব-গন্ধে॥
একান্তে তরুণী তমালী
অপাঙ্গে মাখে আজি কালি,
বনান্তে বাঁধা পল দেয়া
কেয়া-বেণির বন্ধে॥
দিনান্তে বসি কবি একা
পড়িস কি জলধারা-লেখা,
হিয়ায় কি কাঁদে কুহু-কেকা
আজি অশান্ত দ্বন্দ্বে॥
১২. চেয়ো না সুনয়না
বাগেশ্রী-পিলু — কাহারবা
চেয়ো না সুনয়না
আর চেয়ো না এ নয়ন পানে।
জানিতে নাইকো বাকি
সই ও আঁখি কী জাদু জানে॥
একে ওই চাউনি বাঁকা
সুরমা-আঁকা, তায় ডাগর আঁখি।
বধিতে তায় কেন সাধ
যে মরেছে ওই আঁখি-বাণে॥
কাননে হরিণ কাঁদে,
সলিল-ফাঁদে ঝুরছে শফরী,
বাঁকায়ে ভুরুর ধনু
ফুল-অতনু কুসুম-শর হানে॥
কুণাল কি পড়ল ধরা
পীযূষ-ভরা ওই চাঁদ মুখে,
কাঁদিছে নার্গিসের ফুল
লাল কপোলের কমল-বাগানে॥
জ্বলিছে দিবস রাতি
মোমের বাতি রূপের দেওয়ালি,
নিশিদিন তাই কি জ্বলি
পড়ছ গলি অঝোর নয়ানে॥
মিছে তুই কথার কাঁটায়
সুর বিঁধে হায় হার গাঁথিস কবি,
বিকিয়ে যায় রে মালা
আয় নিরালা আঁখির দোকানে॥
১৩. পরান-প্রিয়! কেন এলে অবেলায়
পিলু — দাদারা
পরান-প্রিয়! কেন এলে অবেলায়।
শীতল হিমেল বায়ে ফুল ঝরে যায়॥
সেদিনও সকাল বেলা
খেলেছি কুসুম-খেলা,
আজি যে কাঁদি একেলা
এ ভাঙা মেলায়,
কেন এলে অবেলায়॥
ক্লান্ত দিবস দূরে
কাঁদিছে পিলুর সুরে,
কেন শত পথ ঘুরে
আসিলে হেথায়॥
১৪. সখী জাগো, রজনি পোহায়
ভৈরবী — যৎ
সখী জাগো, রজনি পোহায়।
মলিন কামিনী-ফুল যামিনী-গলায়॥
চলিছে বধূ সিনানে
বসন না বশ মানে,
শিথিল আঁচল টানে
পথের কাঁটায়॥
১৫. নিশি ভোর হল জাগিয়া
ভৈরবী — কাহারবা
নিশি ভোর হল জাগিয়া
পরান-পিয়া।
কাঁদে ‘পিউ কাঁহা’ পাপিয়া
পরান-পিয়া॥
ভুলি বুলবুলি-সোহাগে
কত গুলবদনি জাগে,
রাতি গুলশনে যাপিয়া
পরান-পিয়া॥
জেগে রয় জাগার সাথি
দূরে চাঁদ, শিয়রে বাতি,
কাঁদি ফুল-শয়ন পাতিয়া,
পরান-পিয়া॥
কত আর সাজাব ডালা,
বাসি হয় নিতি যে মালা,
কত দূর যাব ভাসিয়া,
পরান-পিয়া
গেয়ে গান চেয়ে কাহারে
জেগে রস কবি এপারে
দিলি দান কারে এ হিয়া,
পরান-পিয়া॥
১৬. এ বাসি বাসরে আসিলে কে গো ছলিতে
বৃন্দাবনী সারঙ — মিশ্র দাদরা
এ বাসি বাসরে আসিলে কে গো ছলিতে।
কেন পুন বাঁশি বাজালে কাফি-ললিতে॥
নিশীথ গভীরে
কেন আঁখি-নীরে
এলে ফিরে ফিরে
গোপনকথা বলিতে॥
দলিত কুসুম-দলে রচিয়াছি শয়ন
অন্ধ তিমির রাতি, নিবু-নিবু নয়ন!
মরণ-বেলায় প্রিয়
আনিলে কি অমিয়
এলে কি গো নিঠুর
ঝরা ফুল দলিতে॥
১৭. বসিয়া নদীকূলে এলোচুলে
কালাংড়া — কাওয়ালি
বসিয়া নদীকূলে এলোচুলে
কে উদাসিনী।
কে এলে পথ ভুলে
এ অকূলে বন-হরিণী॥
কলসে জল ভরিয়া চায়
করুণায় কুলবধূরা
কেঁদে যায় ফুলে ফুলে
পদমূলে সাঁঝ-তটিনী॥
নিশিদিন চাহি তোমারে
ওপারে বাজিছে বাঁশি,
এপারে বাজে বধূর মল-
নূপুর মধু-ভাষিণী॥
আকাশে মেলিয়া আঁখি
লেখা কি পড়িছ পিয়ার,
কে গো সে রূপ-কুমার
তুমি গো যার অনুরাগিণী॥
দলিয়া কত ভাঙা মন
ও চরণ করেছ রাঙা,
কাঁদায়ে কত না দিল্
এলে নিখিল-মনোমোহিনী॥
হারালি গোধূলি-লগন
কবি, কোন্ নদী-কিনারে,
এ কি সেই স্বপন-চাঁদ
পেতেছে ফাঁদ প্রিয়ার সতিনি॥
১৮. কেন দিলে এ কাঁটা
বেহাগ — দাদরা
কেন দিলে এ কাঁটা
যদি গো কুসুম দিলে
ফুটিত না কি কমল
ও কাঁটা না বিঁধিলে॥
কেন এ আঁখি-কূলে
বিধুর অশ্রু দুলে,
কেন দিলে এ হৃদি
যদি না হৃদয় মিলে॥
শীতল মেঘ-নীরে
ডাকিয়া চাতকীরে
নীর ঢালিতে শিরে
বাজ কেন হানিলে॥
যদি ফুটালে মুকুল
কেন শুকাইলে ফুল,
কেন কলঙ্ক-টিপে
চাঁদের ভুরু ভাঙিলে॥
কেন-কামনা-ফাঁদে
রূপ-পিপাসা কাঁদে,
শোভিত না কি কপোল
ও কালো তিল নহিলে॥
কাঁটা-নিকুঞ্জে কবি
এঁকে যা সুখের ছবি,
নিজে তুই গোপন রবি,
তোরই আঁখির সলিলে॥
১৯. সখী, বোলো-বঁধূয়ারে নিরজনে
বিহারী খাম্বাজ মিশ্র — দাদরা
সখী, বোলো-বঁধূয়ারে নিরজনে
দেখা হলে রাতে ফুলবনে॥
কে করে ফুল চুরি জেনেছে ফুলমালি,
কে দেয় গহিন রাতে ফুলের কুলে কালি
জেনেছে ফুলমালি গোপনে॥
কাঁটার আড়ালে গোলাবের বাগে
ফুটায়েছে কুসুম কপট সোহাগে,
সে কুসুম-ঘেরা মেহেদির বেড়া,
প্রহরী ভোমোরা সে কাননে॥
ও পথে চোর-কাঁটা, সখী, তায় বলে দিয়ো,
বেঁধে না বেঁধে না লো যেন তার উত্তরীয়!
এ বনফুল লাগি না আসে কাঁটা দলি,
আপনি যাব আমি বঁধুয়ার কুঞ্জ-গলি!
বিকাব বিনিমূলে ও-চরণে॥
২০. নহে নহে প্রিয়, এ নয় আঁখি-জল
দুর্গা কাওয়ালি
নহে নহে প্রিয়, এ নয় আঁখি-জল।
মলিন হয়েছে ঘুমে চোখের কাজল॥
হেরিয়া নিশি-প্রভাতে
শিশির কমল-পাতে,
ভাব বুঝি বেদনাতে
কেঁদেছে কমল॥
মরুতে চরণ ফেলে
কেন বন-মৃগ এলে,
সলিল চাহিতে পেলে
মরীচিকা-ছল॥
এ শুধু শীতের মেঘে
কপট কুয়াশা লেগে
ছলনা উঠেছে জেগে —
এ নহে বাদল॥
কেন কবি খালি খালি
হলি রে চোখের বালি,
কাঁদাতে গিয়া কাঁদালি
নিজেরে কেবল॥
২১. এ আঁখি-জল মোছো পিয়া
ভৈরবী — কাওয়ালি
এ আঁখি-জল মোছো পিয়া
ভোলো ভোলো আমারে।
মনে কে গো রাখে তারে
ঝরে যে ফুল আঁধারে॥
ফোটা ফুলে ভরি ডালা
গাঁথো বালা মালিকা,
দলিত এ ফুল লয়ে
দেবে গো বলো কারে॥
স্বপনের স্মৃতি প্রিয়
জাগরণে ভুলিয়ো,
ভুলে যেয়ো দিবালোকে
রাতের আলেয়ারে॥
ঝুরিয়া গেল যে মেঘ
রাতে তব আঙিনায়,
বৃথা তারে খোঁজো প্রাতে
দূর-গগন-পারে॥
ঘুমায়েছ সুখে তুমি
সে কেঁদেছে জাগিয়া,
তুমি জাগিলে গো যবে
সে ঘুমায়ে ওপারে॥
আগুনে মিটালি তৃষা
কবি কোন্ অভিমানে,
উদিল নীরদ যবে
দূর বন-কিনারে॥
২২. কী হবে জানিয়া বলো
ভৈরবী — পোস্তা
কী হবে জানিয়া বলো
কেন জল নয়নে।
তুমি তো ঘুমায়ে আছ
সুখে ফুল-শয়নে।
তুমি বুঝিবে বালা
কুসুমে কীটের জ্বালা,
কারো গলে দোলে মালা
কেহ ঝরে পবনে॥
আকাশের আঁখি ভরি
কে জানে কেমন করি
শিশির পড়ে গো ঝরি
ঝরে বারি শাওনে।
নিশীথে পাপিয়া পাখি
এমনই তো ওঠে ডাকি,
তেমনই ঝুরিছে আঁখি
বুঝি বা অকারণে॥
কে শুধায়, আঁধার চরে
চখা কেন কেঁদে মরে,
এমনই চাতক-তরে
মেঘ ঝুরে-গগনে।
কারে মন দিলি কবি,
এ যে রে পাষাণ-ছবি,
এ শুধু রূপের রবি
নিশীথের স্বপনে॥
২৩. পরদেশি বঁধুয়া, এলে কি এতদিনে
বিহারী — ঠুংরি
পরদেশি বঁধুয়া,
এলে কি এতদিনে।
আসিলে এতদিনে
কেমনে পথ চিনে॥
তোমারে খুঁজিয়া
কত রবি শশী
অন্ধ হইল প্রিয়,
নিভিল তিমিরে,
তব আশে আকাশ
তারা-দীপ জ্বালি
জাগিয়াছে নিশি
ঝুরিয়া শিশিরে!
শুকায়েছে স্বরগ,
দেবতা, তোমা বিনে॥
কত জনম ধরি
ছিলে বলো পাশরি,
এতদিনে বাঁশরি
বাজিল কি বিপিনে॥
নিতি ফুল-সনে
ফুটিয়া কাননে
ঝরিয়াছি সাঝেঁ
নিরাশ হুতাশে,
নব নব গানে
বেদনা নিবেদন
করিয়াছি কবি,
প্রিয়, তব পাশে!
এলে আজি উদাসী
নিখিল-মন জিনে॥
২৪. কেন উচাটন মন
বেহাগ-খাম্বাজ — দাদরা
কেন উচাটন মন
পরান এমন করে
কেন কাঁদে গো বধূ
বঁধুর বুকে বাসরে॥
কেন মিলন-রাতে
সলিল আঁখি-পাতে,
কেন ফাগুন-প্রাতে
সহসা বাদল ঝরে॥
ডাকিলে অনুরাগে
কেন বিদায় মাগে,
(কেন) মরিতে সাধ জাগে
পিয়ার বুকের পরে॥
ডাকিয়া ফুলবনে
থাকে সে আনমনে,
কাঁদায়ে নিরজনে
কাঁদে সে কীসের তরে॥
কবি, তোরে কে কবে
সাধিল বেণুর রবে,
ধরিতে গেলি যবে
বিঁধিল কুসুম-শরে॥
২৫. আসিলে এ ভাঙা ঘরে
পিলু-ভৈরবী — কাহারবা
আসিলে এ ভাঙা ঘরে
কে মোর রাঙা অতিথি।
হরষে বরিষে বারি
শাওন-গগন তিতি॥
বকুল-বনের সাকি
নটিন পুবালি হাওয়া
বিলায় সুরভি-সুরা,
মাতায় কানন-বীথি॥
বনের বেশর গাঁথে
কদম-কেশর ঝুরি,
শিশির-চুনির হারে
উজল উশীর-সিঁথি॥
তিতির শিখীর সাথে
নোটন-কপোতী নাচে,
ঝিঁঝির ঝিয়ারি গাহে
ঝুমুর কাজরি-গীতি॥
হিঙুল হিজল-তলে,
ডাহুক পিছল-আঁখি,
বধূর তমাল-চোখে
ঘনায় নিশীথ-ভীতি॥
তিমির-ময়ূর আজি
তারার পেখম খোলে,
জড়ায় গগন-গলে
চাঁদের ষোড়শী তিথি॥
মিলন-মালায় বাজে
গোপন মৃণাল-কাঁটা,
নয়ন-জলে কি কবি
আঁকিস তাহারই স্মৃতি॥
২৬. আজি দোল পূর্ণিমাতে দুলবি তোরা আয়
কালাংড়া-বসন্ত-হিন্দোল — দাদরা
আজি দোল পূর্ণিমাতে দুলবি তোরা আয়।
দখিনার দোল লেগেছে দোলন-চাঁপায়॥
দোলে আজ দোল-ফাগুনে
ফুল-বাণ আঁখির তূণে,
দুলে আজ বিধুর হিয়া মধুর ব্যথায়॥
দুলে আজ শিথিল বেণি, দুলে বধূর মেখলা,
দুলে গো মালার পলা জড়াতে বঁধুর গলা।
মাধবীর দোলন-লতায়
দোয়েলা দোল খেয়ে যায়,
দুলে যায় হলদে পাখি সোঁদাল-শাখায়॥
বিরহ-শীর্ণা নদীর আজিকে আঁখির কূলে
ভরে জল কানায় কানায় জোয়ারে উঠল দুলে।
দুলে বসন্ত-রানি
কুসুমিতা বনানী
পলাশ রঙন দোলে নোটন-খোঁপায়॥
দোলে হিন্দোল-দোলায় ধরণি শ্যাম-পিয়ারি,
দুলিছে গ্রহ তারা আলোক-গোপ-ঝিয়ারি।
নীলিমার কোলে বসি
দুলে কলঙ্কী-শশী,
দোলে ফুল-উর্বশী ফুল-দোলনায়॥
২৭. রুমুঝুমু রুমুঝুম্ কে এল নূপুর-পায়
পিলু — দাদরা
রুমুঝুমু রুমুঝুম্
কে এল নূপুর-পায়।
ফুটিল শাখে মুকুল
ও রাঙা চরণ-ঘায়॥
সে নাচে তটিনী-জল
টলমল টলমল,
বনের বেণি উতল
ফুলদল মুরছায়॥
বিজরি জরির আঁচল
ঝলমল ঝলমল,
নামিল নভে বাদল
ছলছল বেদনায়॥
দুলিছে মেখলা-হার
শ্যামলী মেঘমালায়,
উড়িছে অলক কার
অলকার ঝরোকায়॥
তালীবন থই তাথই
করতালি হানে ওই
কবি, তোর তমালী কই —
শ্বসিছে পুবালি-বায়॥
২৮. আজি এ কুসুম-হার সহি কেমনে
সিন্ধু কাফি-খাম্বাজ — যৎ
আজি এ কুসুম-হার সহি কেমনে
ঝরিল যে ধুলায় চির অবহেলায়
কেন এ অবেলায় পড়ে তারে মনে॥
তব তরে মালা গেঁথেছি নিরালা
সে ভরেছে ডালা নিতি নব ফুলে।
(আজি) তুমি এলে যবে বিপুল গরবে
সে শুধু নীরবে মিলাইল বনে॥
আঁখি-জলে ভাসি গাহিত উদাসী
আমি শুধু হাসি আসিয়াছি ফিরে।
(আজি) সুখ-মধুমাসে তুমি যবে পাশে
সে কেন গো আসে কাঁদাতে স্বপনে॥
কার সুখ লাগি রে কবি বিবাগি,
সকল তেয়াগি সাজিলি ভিখারি॥
(তুই) কার আঁখি-জলে বেঁচে রবি বলে
ফুলমালা দলে লুকালি গহনে॥
২৯. গরজে গম্ভীর গগন কম্বু
মালকৌষ — গীতঙ্গী
গরজে গম্ভীর গগন কম্বু।
নাচিছে সুন্দর নাচে স্বয়ম্ভু॥
সে নাচ-হিল্লোলে জটা-আবর্তনে
সাগর ছুটে আসে গগন-প্রাঙ্গণে।
আকাশে শূল হানি
শোনাও নব বাণী,
তরাসে কাঁপে প্রাণী
প্রসীদ শম্ভু॥
ললাট-শশী টলি জটায় পড়ে ঢলি,
সে-শশী-চমকে গো বিজুলি ওঠে ঝলি।
ঝাঁপে নীলাঞ্চলে মুখ দিগঙ্গনা,
মুরছে ভয়-ভীতা নিশি নিরঞ্জনা।
আঁধারে পথহারা
চাতকী কেঁদে সারা,
যাচিছে বারিধারা
ধরা নিরম্বু॥
৩০. হাজার তারার হার হয়ে গো
ছায়ানট — কাওয়ালি
হাজার তারার হার হয়ে গো
দুলি আকাশ-বীণার গলে।
তমাল-ডালে ঝুলাই ঝুলাই
নাচাই শিখী কদম-তলে॥
‘বউ কথা কও’ বলে পাখি
করে যখন ডাকাডাকি,
ব্যথার বুকে চরণ রাখি
নামি বধূর নয়ন-জলে॥
ভয়ংকরের কঠিন আঁখি
আঁখির জলে করুণ করি,
নিঙারি নিঙারি চলি
আকাশ-বধূর নীলাম্বরী।
লুটাই নদীর বালুতটে,
সাধ করে যাই বধূর ঘটে,
সিনান-ঘাটের শিলাপটে
ঝরি চরণ-ছোঁয়ার ছলে॥
৩১. অধীর অম্বরে গুরু গরজন মৃদঙ বাজে
হাম্বীর — কাওয়ালি
অধীর অম্বরে গুরু গরজন মৃদঙ বাজে।
রুমু রুমু ঝুম মঞ্জীর-মালা চরণে আজ উতলা যে॥
এলোচুলে দুলে দুলে বন-পথে চল আলি
মরা গাঙে বালুচরে কাঁদে যথা বন-মরালী।
উগারি গাগরি ঝারি
দে লো দে করুণা ডারি,
ঘুঙট উতারি বারি,
ছিটা লো গুমোট সাঁঝে।
তালীবন হানে তালি, ময়ূরী ইশারা হানে,
আসন পেতেছে ধরা মাঠে মাঠে চারা-ধানে।
মুকুলে ঝরিয়া পড়ি আকুতি জানায় যূথী,
ডাকিছে বিরস শাখে তাপিতা চন্দনা তুতি।
কাজল-আঁখি রসিলি
চাহে খুলি ঝিলিমিলি,
চল লো চল সহেলি,
নিয়ে মেঘ-নটরাজে॥
৩২. ঝরে ঝরঝর কোন্ গভীর গোপন ধারা এ শাঙনে
দেশ-সুরাট — একতালা
ঝরে ঝরঝর কোন্ গভীর গোপন ধারা এ শাঙনে।
আজি রহিয়া রহিয়া গুমরায় হিয়া একা এ আঙনে॥
ঘনিয়া ঘনায় ঝাউ-বীথিকায় বেণু-বন-ছায় রে,
ডাহুকিরে খুঁজি ডাহুক কাঁদে আঁধার গহনে॥
কেয়া-বনে দেয়া তূণীর বাঁধিয়া
গগনে গগনে ফেরে গো কাঁদিয়া।
বেতস-বিতানে নীপ-তরুতলে
শিখী নাচ ভোলে পুছ-পাখা টলে।
মালতী-লতায় এলাইয়া বেণি কাঁদে বিষাদিনী রে,
কাজল-আঁখি কে নয়ন মোছে তমাল-কাননে॥
৩৩. হৃদয় যত নিষেধ হানে নয়ন ততই কাঁদে
জয়জয়ন্তী — একতালা
হৃদয় যত নিষেধ হানে নয়ন ততই কাঁদে।
দূরে যত পলাতে চাই নিকট ততই বাঁধে॥
স্বপন-শেষে বিদায়-বেলায়
অলক কাহার জড়ায় গো পায়,
বিধুর কপোল স্মরণ আনায়
ভোরের করুণ চাঁদে॥
বাহির আমার পিছল হল কাহার চোখের জলে।
স্মরণ ততই বারণ জানায় চরণ যত চলে।
পার হতে চাই মরণ-নদী
দাঁড়ায় কে গো দুয়ার রোধি,
আমায় ওগো বে-দরদি,
ফেলিলে কোন্ ফাঁদে॥
৩৪. শুকাল মিলন-মালা আমি তবে যাই
কালাংড়া-ভৈরোঁ — আদ্ধা কাওয়ালি
শুকাল মিলন-মালা আমি তবে যাই।
কী যেন এ নদী-কূলে খুঁজিনু বৃথাই॥
রহিল আমার ব্যথা
দলিত কুসুমে গাঁথা,
ঝুরে বলে ঝরা পাতা —
নাই কেহ নাই॥
যে-বিরহে গ্রহতারা সৃজিল আলোক,
সে-বিরহে এ-জীবন জ্বলি পুণ্য হোক।
চক্রবাক চক্রবাকী
করে যেমন ডাকাডাকি,
তেমনই এ-কূলে থাকি
ও-কূলে তাকাই॥
৩৫. স্মরণ-পারের ওগো প্রিয়
দরবারি কানাড়া — যৎ
স্মরণ-পারের ওগো প্রিয়, তোমায় আমি চিনি যেন।
তোমার চাঁদে চিনি আমি, তুমি আমার তারায় চেন॥
নতুন পরিচয়ের লাগি
তারায় তারায় থাকি জাগি,
বারে বারে মিলন মাগি
বারে বারে হারাই হেন॥
নতুন চোখের প্রদীপ জ্বালি চেয়ে আছি নিরিবিলি,
খোলো প্রিয় তোমার ধরার বাতায়নের ঝিলি-মিলি।
নিবাও নিবু-নিবু বাতি,
ডাকে নতুন তারার সাথি,
ওগো আমার দিবস রাতি
কাঁদে বিদায়-কাঁদন কেন॥
৩৬. গহিন রাতে ঘুম কে এলে ভাঙাতে
পিলু — কাহারবা
গহিন রাতে
ঘুম কে এলে ভাঙাতে।
ফুল-হার পরায়ে গলে
দিলে জল নয়ন-পাতে॥
যে জ্বালা পেনু জীবনে
ভুলেছি রাতে স্বপনে,
কে তুমি এসে গোপনে
ছুঁইলে সে বেদনাতে॥
যবে কেঁদেছি একাকী
কেন মুছালে না আঁখি,
নিশি আর নাহি বাকি
বাসি ফুল ঝরিবে প্রাতে॥
কেন এ কুহেলি ঠেলে
দখিনা বাতাস এলে,
কবি তুই হৃদয় মেলে
ছিলি কি এরই আশাতে॥
৩৭. কোন্ শরতে পূর্ণিমা-চাঁদ আসিলে এ ধরাতল
সিন্ধু — কাওয়ালি
কোন্ শরতে পূর্ণিমা-চাঁদ আসিলে এ ধরাতল।
কে মথিল তব তরে কোন্ সে ব্যথার সিন্ধু-জল॥
দুয়ার-ভাঙা জাগল জোয়ার বেদনার ওই দরিয়ায়।
আজ ভারতী অশ্রুমতী মধ্যে দুলে টলমল॥
কখন তোমার বাজল বেণু প্রাণের বংশীবটছায়।
মরা গাঙে ভাঙা ঘাটে ঘট ভরে গোপিনী দল॥
বিদ্যুতের বাঁকা হাসি হাসিয়া কালো মেঘে,
আসিলে কে অভিমানী বহায়ে মরুতে ঢল॥
লয়ে হাতে জিয়ন-কাঠি আসিলে কে রূপ-কুমার
উঠল জেগে রূপ-কুমারী আঁধারে ওই ঝলমল॥
আকাশে চকোরী কাঁদে, তড়াগে চাহে কুমুদ,
ঝরুক আঁখির শেফালিকা ছুঁয়ে তব পদতল॥
৩৮. জাগিলে ‘পারুল’ কি গো ‘সাত ভাই চম্পা’ ডাকে
ভীমপলশ্রী — দাদরা
জাগিলে ‘পারুল’ কি গো ‘সাত ভাই চম্পা’ ডাকে।
উদিলে চন্দ্র-লেখা বাদলের মেঘের ফাঁকে॥
চলিলে সাগর ঘুরে
অলকার মায়ার পুরে,
ফোটে ফুল নিত্য যথায়
জীবনের ফুল্ল-শাখে॥
আঁধারের বাতায়নে চাহে সাজ লক্ষ তারা,
জাগিছে বন্দিনীরা, টুটে ওই বন্ধ কারা।
থেকো না স্বর্গে ভুলে
এ পারের মর্ত্য কূলে,
ভিড়ায়ো সোনার তরি
আবার এই নদীর বাঁকে॥
৩৯. চরণ ফেলি গো মরণ-ছন্দে
খাম্বাজ — আড়-খেমটা
চরণ ফেলি গো মরণ-ছন্দে
মথিয়া চলি গো প্রাণ।
মর্ত্যের মাটি মহীয়ান করি
স্বর্গেরে করি ম্লান॥
চিতার বিভূতি মাখিয়া গায়
লজ্জা হানি গো অন্নদায়,
বাঁধিয়াছি বিদ্যুল্লতায়,
দেবরাজ হতমান।
পাতাল ফুঁড়িয়া করি গো মাতাল
রসাতল-অভিযান॥
৪০. নমো হে নমো যন্ত্রপতি নমো নমো অশান্ত
বৃন্দাবনী সারং — ঝাঁপতাল
নমো হে নমো যন্ত্রপতি নমো নমো অশান্ত।
তন্ত্রে তব ত্রস্ত ধরা, সৃষ্টি পথভ্রান্ত॥
বিশ্ব হল বস্তুময়
মন্ত্রে তব হে,
নন্দনে-আনন্দে তুমি
গ্রাসিলে মহাধ্বান্ত॥
শংকর হে, সে কোন্ সতী-শোকে হয়ে নৃশংস
বসেছ ধ্যানে হয়েছে জড় সাধিতেছ এ ধ্বংস।
রুক্ষ তব দৃষ্টি-দাহে
শুষ্ক সব হে,
ভীষণ তব চক্রাঘাতে
নির্জিত যুগান্ত॥
৪১. পুরবের তরুণ অরুণ
ভীমপলশ্রী — দাদরা
পুরবের তরুণ অরুণ
পুরবে আসলে ফিরে
কাঁদায়ে মহাশ্বেতায়
হিমানীর শৈল-শিরে॥
কুহেলির পর্দা ডারি
ঘুমাত রূপ-কুমারী,
জাগালে স্বপনচারী
তাহারে নয়ন-নীরে॥
তোমার ওই তরুণ গলার
শুনি গান সিন্ধু-পারে,
দুলিছ মধ্যমণি
সুরমার কণ্ঠ-হারে।
ধেয়ানি দিলে ধরা,
হল সুর স্বয়ংবরা,
এলে কি পাগল-ঝোরা
পাষাণের বক্ষ চিরে॥
৪২. কে শিব সুন্দর শরৎ-চাঁদ চূড়
দেশ — গীতঙ্গী
কে শিব সুন্দর শরৎ-চাঁদ চূড়
দাঁড়ালে আসিয়া এ অঙ্গনে,
পীড়িত নরনারী আসিল গেহ ছাড়ি
ভরিল নভতল-ক্রন্দনে॥
বেদনা-মন্দিরে আরতি বাজে তব,
কে তুমি সুন্দর শ্মশানচারী নব,
দিগদিগন্তরে জীবন-উৎসব-
শঙ্খ শুনি তব আগমনে॥
মৃত্যু-জয়ী তুমি হওনি সুধা পিয়ে,
দুখেরে দহিয়াছ বিষের দাহ দিয়ে।
ভূষণ করি ফণী আদরে দিয়ে দোলা
কী মণি পেলে বলো ওগো ও চির-ভোলা!
কভু সে ডম্বরু বাজাও অম্বরে,
প্রলয়-নর্তন জাগে চরাচরে,
ললাট-জ্বালা-পাশে
চন্দ্রলেখা হাসে
নবীন সৃষ্টির হরষনে॥
পতিতা গঙ্গারে ধরিলে নিজ শিরে,
কন্যারূপে তাই পেলে কি ভারতীরে,
স্বরগ এল নেমে মরতে তব প্রেমে,
নমানি দেব-দেব ও-চরণে॥
৪৩. কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে
গারা-ভৈরবী — কাহারবা
কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে
আসলে প্রাতে পুষ্পচোর।
ডাকছে পাখি, ‘বউ গো জাগো,
আর ঘুমায় না, রাত্রি ভোর’॥
জুঁই-কুঁড়িরা চোখ মেলে চায়,
চুমকুড়ি দেয় মৌমাছি।
শাপলা-বনে চাঁদ ডুবে যায়
ম্লান চোখে হায় চায় চকোর॥
ঘোমটা ঠেলি কয় চামেলি,
গোল কোরো না গুল-ডাকাত,
ঢুলছে নয়ন, দুলছে গলায়
বেল-টগরের ছিন্ন ডোর॥
বোরকা খুলি বন-কেতকীর
ফুলরেণুতে রাঙলে গা,
পারুল-বধূর মাগলে মধু,
হাসনাহেনার ভাঙলে দোর॥
গায় কাওয়ালি বাদলি রুমঝুম,
তয়ফাওয়ালি নাচে মউর
ঝুরছে কদম, মেঘ-তমালে
বিজলি-চোখে চায় কিশোর॥
শোন রে কবি পুষ্পলোভী
আজ ধরেছি ফুল চুরি,
হুল ফুটিয়ে, ফুলবালাদের
কুল ভুলানো ভাঙব তোর॥
৪৪. কেন আন ফুল-ডোর আজি বিদায় বেলা
ভীমপলশ্রী — কাহারবা
কেন আন ফুল-ডোর আজি বিদায় বেলা।
মোছো মোছো আঁখি-লোর যদি ভাঙিল মেলা॥
কেন মেঘের স্বপন আন মরুর চোখে,
ভুলে দিয়ো না কুসুম যারে দিয়েছ হেলা॥
আছে বাহুর বাঁধন তব শয়ন-সাথি,
আমি এসেছি একা আমি চলি একেলা॥
যবে শুকাল কানন এলে বিধুর পাখি,
লয়ে কাঁটা-ভরা প্রাণ এ কী নিঠুর খেলা॥
যদি আকাশ-কুসুম পেলি চকিতে কবি,
চলো চলো মুসাফির, ডাকে পারের ভেলা॥
৪৫. কেমনে রাখি আঁখি-বারি চাপিয়া
(রাতের) দুর্গা — আদ্ধা কাওয়ালি
কেমনে রাখি আঁখি-বারি চাপিয়া।
প্রাতে কোকিল কাঁদে, নিশীথে পাপিয়া॥
এ ভরা বাদরে আমার মরা নদী,
উথলি উথলি উঠিছে নিরবধি।
আমার এ ভাঙা ঘাটে
আমার এ হৃদিতটে
চাপিতে গেলে ওঠে
দু-কূল ছাপিয়া॥
নিষেধ নাহি মানে আমার পোড়া আঁখি,
জল লুকাব কত কাজল মাখি মাখি।
ছলনা করে হাসি
অমনি জলে ভাসি,
ছলিতে গিয়া আসি
ভয়েতে কাঁপিয়া॥
গাঁথিতে ফুলমালা বিঁধে সে কাঁটা হয়ে,
কাঁটার হার গাঁথি — সে আসে ফুল লয়ে।
কবি রে, জলধি এ তাহারে মন দিয়ে
গেলি রে জল নিয়ে জীবন ব্যাপিয়া॥
৪৬. কেন আসিলে যদি যাবে চলি
(দিনের) দুর্গা — আদ্ধা কাওয়ালি
কেন আসিলে যদি যাবে চলি
গাঁথিলে না মালা ছিঁড়ে ফুল-কলি॥
কেন বারেবারে আসিয়া দুয়ারে
ফিরে গেলে পারে কথা নাহি বলি॥
কী কথা বলিতে আসিয়া নিশীথে
শুধু ব্যথা-গীতে গেলে মোরে ছলি॥
প্রভাতের বায়ে কুসুম ফুটায়ে
নিশীথে লুকায়ে উড়ে গেল অলি॥
কবি শুধু জানে, কোন্ অভিমানে
চাহি যারে গানে কেন তারে দলি॥
৪৭. সাজিয়াছ যোগী বলো কার লাগি
যোগিয়া — ঝাঁপতাল
সাজিয়াছ যোগী
বলো কার লাগি
তরুণ বিবাগি॥
হেরো তব পায়ে
কাঁদিছে লুটায়ে
নিখিলের পিয়া
তবে প্রেম মাগি
তরুণ বিবাগি॥
ফাল্গুনে কাঁদে
দুয়ারে বিষাদে
খোলো দ্বার খোলো!
যোগী, যোগ ভোলো!
এত গীতহাসি
সব আজি বাসি,
উদাসী গো জাগো!
নব অনুরাগে
জাগো অনুরাগী
তরুণ বিবাগি॥
৪৮. মুসাফির! মোছ এ আঁখি জল
বারোয়াঁ — কাহারবা
মুসাফির! মোছ এ আঁখি জল
ফিরে ছল আপনারে নিয়া।
আপনি ফুটেছিল ফুল
গিয়াছে আপনি ঝরিয়া॥
রে পাগল! এ কী দুরাশা,
জলে তুই বাঁধিবি বাসা!
মেটে না হেথায় পিয়াসা
হেথা নাই তৃষ্ণা-দরিয়া॥
বরষায় ফুটল না বকুল
পউষে ফুটবে কি সে ফুল,
এ দেশে ঝরে শুধু ভুল
নিরাশার কানন ভরিয়া॥
রে কবি, কতই দেয়ালি,
জ্বালিলি তোর আলো জ্বালি,
এল না তোর বনমালি
আঁধার আজ তোরই দুনিয়া॥
৪৯. এ নহে বিলাস বন্ধু
মান্দ্ — কাহারবা
এ নহে বিলাস বন্ধু, ফুটেছি জলে কমল।
এ যে ব্যথা-রাঙা হৃদয় আঁখি-জলে-টলমল॥
কোমল মৃণাল-দেহ ভরেছে কণ্টক-ঘায়,
শরণ লয়েছি গো তাই শীতল দিঘির জল॥
ডুবেছি এ কালো নীরে কত যে জ্বালা সয়ে,
শত ব্যথা ক্ষত লয়ে হইয়াছি শতদল॥
আমার বুকের কাঁদন তুমি বল ফুল-বাস,
ফিরে যাও, ফেলো না গো শ্বাস
দখিনা বায়ু চপল॥
ফোটে যে কোন্ ক্ষত-মুখে
কবি রে তোর গীত-সুর,
সে ক্ষত দেখিল না কেউ,
দেখিল তোরে কেবল॥




Leave a Reply