মন্দ মেয়ের উপাখ্যান – সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
ভূমিকা ও সম্পাদকীয় সংযোজন – শৈলেন্দ্র হালদার
.
আগামী পাঠকের উদ্দেশে
.
প্রাককথন
আমার মতে সব মেয়েই ভালো, কোনো মেয়েই মন্দ নয়। আমাদের সমাজ কিছু মেয়ের গায়ে ‘খারাপ’ তকমা এঁটে দেয়—যা একান্তই অনুচিত।
আমার পূর্বসূরী অনেক মহান লেখকের লেখা এতে আছে, আছে উত্তরসূরীদের লেখাও।
আশা করি, উত্তম পাঠকেরা এই মন্দ মেয়ের উপাখ্যান-এর সমাদর করবেন।
বুদ্ধদেব গুহ
.
ভূমিকা
যুগে যুগে মানবসমাজে বঞ্চিত-লাঞ্ছিত দেহোপজীবিনী নারীদের অস্তিত্ব লক্ষ করা গেছে। প্রাচীনকাল থেকেই ধর্ম, অর্থ আর কামকে গৃহস্থরা মোক্ষ হিসেবে মনে করেছে। এমনকী কামই প্রধান পুরুষার্থ হিসেবে গণ্য হয়েছে। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। পুরুষশাষিত সমাজে নারীবাদ মাঝেমধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও আজও নারীরা সমান অধিকার পাননি।
মানুষের জীবনধারণের যতগুলি পেশা বর্তমান, পতিতাবৃত্তি তাদের মধ্যে আদিমতম। অথচ আজও বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এই পেশা অস্বীকৃত।
দেহোপজীবিনী নারীরা একদিকে যেমন কালিমালিপ্ত জীবন বয়ে ভোগ্যপণ্যে পরিণত হয়েছেন, অন্যদিকে উৎসর্গীকৃত হয়েছেন মাঙ্গলিক কর্মে। আমরা দেখি সূর্যের উপাসনায় পতিতাকে উৎসর্গ করা হয়েছে মাঙ্গলিক মন্ত্রের মোড়কে : ‘বেশ্যাকমদম্বকং যস্তু দস্যাৎ সূর্যায় ভক্তিতঃ’। এমনকী দেবদাসীরাই মন্দির প্রাঙ্গণে ভগবানের উপাসনার দুয়ার উন্মুক্ত করেছেন। আমরা দেখেছি সমাজের প্রান্তবাসী এই নারীদের রূপ-যৌবন-শরীর-কলা-শিল্পকে উল্লসিত লোলুপ সমাজ শুধু ব্যবহারই করেছে, কিন্তু প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়নি। সামাজিক কাজকর্মে বারাঙ্গনাসমাজ অচ্ছুৎ। অথচ গণিকালয়ের মাটি ছাড়া আরাধ্য দেবী দুর্গার মূর্তি নাকি গড়া যায় না! এ কী প্রহসন!
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে বাৎস্যায়নের কামসূত্র—সর্বত্রই পতিতাদের চাই। ভরতের নাট্যশাস্ত্র-য় পতিতাদের ‘বাহ্যা’ বলা হয়েছে—অর্থাৎ কিনা রাজা ব্যতীত সর্বসাধারণের ভোগ্যা। কামসূত্র-য় তাদের শ্রেণিবিভাগও করা হয়েছে—কুম্ভদাসী, পরিচারিকা, কুলটা, স্বৈরিণী, নটী, শিল্পকারিকা প্রকাশ বিনষ্টা, গণিকা প্রমুখ। আবার শাস্ত্রমতে সহজেই পতিতা হওয়া যায় না। তাদের চৌষট্টি কলায় পারঙ্গমা হতে হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য : নৃত্য, গীত, বাদ্য, পঠন, চিত্রকলা, সংবাহন প্রভৃতি।
আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে মতাদর্শগতভাবে সমাজ পরিবর্তনের ফলশ্রুতিতে যৌনতা সংক্রান্ত ভাবনায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। সমাজের প্রান্তিক এই নারীদের অনেকেই যৌনকর্মীর অভিধা পেতে চান। দারিদ্র, প্রতারণা কিংবা মাফিয়া চক্রের শিকার হয়ে যাঁরা অনিচ্ছায় যুক্ত এই বৃত্তিতে, তাঁরা মিলতে চান সমাজের মূল স্রোতে।
যে কথা না বললে সত্যের অপলাপ হয় তা হল প্রাচীন ইতিহাসের পাতা থেকে আরম্ভ করে আজ পর্যন্ত নারীদের পাশাপাশি পুরুষকেও অনেক ক্ষেত্রে দেহব্যাবসার পণ্য হতে হয়েছে। কিন্তু অন্ধকার এই জগতে নারীরাই মুখ্যত বিপন্ন।
দেহোপজীবিনী নারীদের নিয়ে সাহিত্যরচনার উল্লেখ পাই ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্যে। মৃচ্ছকটিক-এর বসন্তসেনা কিংবা কথাসরিৎসাগর -এর মদনমালার গল্প তো সর্বজনবিদিত।
বাংলা সাহিত্যের সমস্ত শাখার মতো ছোটোগল্পেরও জনক রবীন্দ্রনাথ। তাঁর কলমেই প্রথম সার্থকভাবে দেহোপজীবিনী নারীর উল্লেখ পাই। রবীন্দ্র পরবর্তী সময়ে ভারতী গোষ্ঠী থেকে কল্লোল পত্রিকা, এমনকী হাল আমলেও অনেক গল্প লেখা হয়েছে এ বিষয়ে। বিভূতিভূষণ, তারাশংকর, মানিক, বিমল কর, সমরেশ বসু বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থেকে এ সময়ের তসলিমা, তৃণাঞ্জন অবধি গণিকাজীবন নিয়ে অনেক গল্প লেখা হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের পূর্বাপর ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি রেখে মোট চল্লিশটি গল্প সংকলনভুক্ত হয়েছে। স্মরণীয় গল্পগুলিকেই প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
ডা. বিশ্বপতি মুখোপাধ্যায় এবং বিশিষ্ট ছড়াকার তথা গবেষক দেবাশিস বসু নানান বইপত্র দিয়ে সহায়তা করেছেন। তাঁদের দুজনকেই জানাই অশেষ ধন্যবাদ। পারুল প্রকাশনীর কর্ণধার শ্রীগৌরদাস সাহার সুপরামর্শ ও উৎসাহ ছাড়া এ কাজটি সম্পন্ন করা অসম্ভব ছিল। তাঁকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাই।
শৈলেন্দ্র হালদার






Leave a Reply