মধ্যযুগের বাংলা : বখতিয়ার খলজি থেকে সিরাজ-উদ-দৌলা – খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার
মধ্যযুগের বাংলা : বখতিয়ার খলজি থেকে সিরাজ-উদ-দৌলা – খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার
প্রথম প্রকাশ : পৌষ ১৪২৭, জানুয়ারি ২০২১
Modhyojuger Bangla : Bakhtiyar Khalji Theke Siraj-ud-Daulah By Khandker Swanan Shahriar
.
লেখক-সম্পাদক মিলা মাহফুজা রহমান
জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখছি, মা আমাকে ইতিহাসের গল্প শোনাচ্ছেন, ভেতরে প্রেক্ষাপট-সচেতনতার বীজ বুনে দিচ্ছেন। বড় হওয়ার পরও আমার ইতিহাসপ্রীতি, পাঠ ও আলোচনা তাঁর কাছ থেকে বিপুল প্রশ্রয় ও উৎসাহ পেয়েছে।
.
ভূমিকা
ইতিহাস আমাকে টানে, বিশেষ করে বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাস। মাত্র কয়েক শ বছর আগেই বাংলার মানচিত্র কতটা আলাদা ছিল, এটা ভাবলে বিস্ময় লাগে। আবার বাংলার মসনদ ঘিরে ইতিহাসের চরিত্রগুলোর ক্ষমতালিপ্সা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আনুগত্য আর বিশ্বাসভঙ্গের কথা শুনলে মনে হয়, মানুষ খুব বেশি বদলায়নি। মধ্যযুগের ইতিহাসের ঘাত-প্রতিঘাত এক হাজার বছর ধরে তার প্রভাব বজায় রেখেছে। আজকে, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমরা যে সামাজিক আর রাষ্ট্রীয় কাঠামো দেখছি, তার অনেক উপাদান মধ্যযুগের বিভিন্ন বাঁকবদলের ফলে তৈরি হয়েছে। বাংলায় ইসলামের প্রসার, ধর্মের কারণে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বিভেদ এবং বাঙালির স্বাধীনচেতা মনোভাব তার অন্যতম।
বিশ্ব-ইতিহাসের মধ্যযুগকে রোমান সাম্রাজ্যের পতন (৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে রেনেসাঁর (১৩০০ খ্রিষ্টাব্দ) সূচনা পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলার ইতিহাস পড়ে আমার অবশ্য মনে হয়েছে, সেন সাম্রাজ্যের পতন (১২০৩ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলায় রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা অর্জন (১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত সময়টুকুকে বাংলার মধ্যযুগ হিসেবে গণ্য করা যায়। বাংলার সাহিত্যের ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখেছি, সাহিত্যের পণ্ডিতেরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ১২০০-১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কে মধ্যযুগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বাংলার মধ্যযুগের কয়েকটি বর্ণাঢ্য চরিত্র নিয়ে হাতের কাছে পাওয়া সব বইপত্র পড়ে আমার যা মনে হয়েছে, তা এই বইয়ে লিখে রাখার চেষ্টা করেছি। এই চরিত্রগুলোর মধ্যে কয়েকটি আমার বিশেষ প্রিয়, কয়েকটি তত প্রিয় নয়। নিজের কালে তাঁরা বাংলার রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজের ওপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিলেন বলেই আমি এঁদের মধ্যযুগের নায়ক বলে বিবেচনা করেছি, তাঁরা ইতিহাসের নায়ক, নীতি বা ন্যায়ের বিচারে নায়ক নন। প্ৰত্যেক যুগের মূল্যবোধকে কেবল সেই যুগে দাঁড়িয়েই বিচার করা যায়। আমি মধ্যযুগের মানুষ নই; সে কারণে আমি ইতিহাসের এই নায়কদের বিচার করতে যাইনি। তবু হয়তো আমার ভালো লাগা-মন্দ লাগার ছাপ অবচেতনভাবেই এই লেখায় পড়েছে।
ইতিহাস সব সময় রাজনীতি আর ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় লেখা হয়, আজও হচ্ছে। সুতরাং নির্দিষ্ট কোনো সূত্রকেই ইতিহাসের নিরপেক্ষ বা বস্তুনিষ্ঠ বয়ান বলে আমি ধরে নিইনি। নিজের বিচার-বিবেচনা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যগুলোকে আমার মতো করে ছেঁকে নিয়েছি। আমার বিবেচনা গ্রহণ-বর্জনের সম্পূর্ণ এখতিয়ার পাঠকের। এই বই ইতিহাসের পণ্ডিতদের জন্য নয়, অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্য লেখা। তথ্যপ্রমাণের ভারে তাঁদের পাঠ-অভিজ্ঞতাকে আমি ভারাক্রান্ত করতে চাইনি। কেবল কৌতূহল মেটানোর জন্য একটি সহায়ক গ্রন্থ-তালিকা বইয়ের শেষে দিচ্ছি।
আমার বিবেচনায় বিভিন্ন ইতিহাসের বইয়ে পাওয়া যেসব গল্প বা বিবরণ অতিরঞ্জন বা অতিশায়ন বলে মনে হয়েছে, তাকে বাদ দিতে চেষ্টা করেছি। ধর্মীয় বা সম্প্রদায়গত পক্ষপাতদুষ্ট বিবরণকেও অগ্রাহ্য করতে চেষ্টা করেছি। কোনো রঙের প্রলেপ না পড়লে ইতিহাস তার আপন বিভায় সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বলে আমি বিশ্বাস করি।
খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার
ঢাকা, জানুয়ারি ২০২১






Leave a Reply