বাংলার ইতিহাস : সুলতানী আমল – আবদুল করিম
বাংলার ইতিহাস : সুলতানী আমল
প্রফেসর আবদুল করিম
প্রাক্তন উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশক: কমলকান্তি দাস, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ
BANGLAR Itihas (Sultani AmAL) by Prof. Abdul Karim Published by: Kamolkanti Das, Jatiya Sahitya Prokash
অসম্পূর্ণ বই
.
চতুর্থ সংস্করণের ভূমিকা
“বাংলার ইতিহাস: সুলতানি আমল” বইখানি আবার প্রকাশ করতে পেরে আমি আনন্দিত ইতোমধ্যে বইখানি প্রথম পুনর্মুদ্রণসহ ৩বার প্রকাশিত হয়, প্রতিবারেই সকল মুদ্রিত কপি তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়, এতে বইখানির জনপ্রিয়তা বোঝা যায়। বইখানি পাঠকদের নিকট গ্রহণযোগ্য হওয়ায় আমি গৌরব বোধ করছি। পঞ্চাশের দশকে সন্দিগ্ধ মনে ভীরু পদক্ষেপে বাংলার ইতিহাস গবেষণায় আমার যাত্রা শুরু। সেই থেকে দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হয়েছে, আমিও এই দীর্ঘ সময় এই বিষয়ে গবেষণায় বিশ্বস্ততার সঙ্গে লিপ্ত থেকেছি। আমি আজ সন্তুষ্টির সঙ্গে বলতে পারি যে, আমার পরিশ্রম সার্থক হয়েছে; আমি এবং আমার মতো আরও কয়েকজনের প্রচেষ্টায় বর্তমানে বাংলার মুসলমান আমলের ইতিহাস এমন এক পর্যায়ে এসেছে যে, বাঙালিমাত্রই তাদের ইতিহাস নিয়ে গৌরব বোধ করতে পারে।
প্রথম সংস্করণের ভূমিকাতেই বলেছিলাম : “ইতিহাসে কোন কথার শেষ নেই। আজ যাহা সিদ্ধান্ত করা হয়, নূতন তথ্য আবিষ্কৃত হইলেই হয়তো তাহা পুনর্বিবেচিত হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। সমসাময়িক ইতিহাসের অভাবে মুসলমান আমলের বাংলার ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এই সত্য আরও প্রকট হইয়া উঠে। নূতন শিলালিপি বা মুদ্রা বা কোন সমসাময়িক উপকরণ আবিষ্কৃত হইলে ঐতিহাসিকদের নূতনভাবে চিন্তা করিতে হয় এবং প্রাপ্ত উপকরণের আলোকে স্বীয় সিদ্ধান্ত বারবার পরিবর্তন করিতে হয়।” এই বই-এর প্রত্যেক সংস্করণে বা মুদ্রণে তথ্যের সংযোজন, সংশোধন বা পরিমার্জন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সুলতানি আমলের বেশ কিছু শিলালিপি এবং মুদ্রা আবিষ্কৃত হওয়ায় সেগুলোর মূল্যায়ন করা হয়েছে। আমার লিখিত Corpus of Arabic and Persian Inscriptions of Bengal এবং সুখময় মুখোপাধ্যায়ের লিখিত “বাংলায় মুসলিম অধিকারের আদি-পর্ব” বই দুটিও উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সুখময় মুখোপাধ্যায়ও তাঁর “বাংলার ইতিহাসের দু’শো বছর” বইখানি কয়েকবার সংশোধন ও পরিবর্ধন করে প্রকাশ করেছেন
বর্তমান সংস্করণে নতুন আবিষ্কৃত তথ্যসমূহ মূল্যায়ন করা হয়েছে, অনেক বিষয়ে পূর্বের অস্বচ্ছ নতুন তথ্যে আলোকিত হয়েছে। আগের অনুমাননির্ভর কোন কোন বিষয় সত্যে পরিণত হয়েছে, বা বিপরীত তথ্যের আলোকে বর্জন করা হয়েছে। এখন প্রমাণিত হয়েছে যে বখতিয়ার খলজী সুলতান মোহাম্মদ ঘোরীর প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেন এবং বাংলার সুলতানেরা নিজেদের খলিফারূপে ও ঘোষণা দেয়। সুলতানেরা বাংলার গৌরব বৃদ্ধি করে এবং আরব দেশ, চীন এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে বাংলাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। বাঙ্গালা বা বাংলা নামটি মুসলমান আমলের সৃষ্টি।
বর্তমান সংস্করণটি তথ্যে যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি পাঠক ও গবেষকদের নিকট আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হবে, এই আশা পোষণ করে বইখানি প্রকাশ করা হল।
জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশনকে ধন্যবাদ, তাঁরা যত্ন করে অল্প সময়ের মধ্যে বইখানি প্রকাশ করেছেন। বইখানি ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক এবং পাঠকের উপকারে আসলে পরিশ্রম সার্থক হবে।
আবদুল করিম
নাসিরাবাদ, চট্টগ্রাম
৪. ১০. ৯৮
.
টীকা সংকেত
এইচ-বি ১ (HB I ) = হিস্টরি অব বেঙ্গল ভল্যুম, ১, রমেশচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৪৩!
এইচ-বি ২ (HB II ) = হিস্টরি অব বেঙ্গল, ভল্যুম ২, স্যার যদুনাথ সরকার সম্পাদিত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৪৮।
জে. এ. এস. পি. = জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব পাকিস্তান, ঢাকা।
জে. এ. এস. বি. = জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল, কলিকাতা।
জে. এ. এস. বিডি = জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা।
তবকাত-ই-আকবরী = নিজাম উদ-দীন আহমদ বখশী : তবকাত-ই-আকবরী।
ফিরিশতা = তারীখ-ই-ফিরিশতা, নেওল কিশোর।
বরণী = জিয়া-উদ-দীন বরণী : তারীখ-ই-ফীরূজ শাহী।
রিয়াজ = রিয়াজ-উস-সলাতীন, কলিকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত।
ঐ, অনুবাদ, আবদুস সালাম কৃত।
সুখময় মুখোপাধ্যায় = সুখময় মুখোপাধ্যায় : বাংলার ইতিহাসের দু’শো বছর।
সোশ্যাল হিস্টরি = আবদুল করিম : সোশ্যাল হিস্টরি অব দি মুসলিমস্ ইন, বেঙ্গল।
.
প্রথম সংস্করণের ভূমিকা
বাংলার মুসলমান শাসন আমলের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস মুসলমান আমলে রচিত হয় নাই। মুসলমান আমলের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হয় দেশে ইংরেজ শাসন প্রবর্তিত হওয়ার পর। সৈয়দ গোলাম হোসেন সলীম জায়েদপুরী জর্জ উড়নী নামক জনৈক ইংরেজ কর্মচারীর অনুরোধে ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁহার রিয়াজ-উস-সলাতীন রচনা করেন। চার্লস স্টুয়ার্ট ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি ভাষায় তাঁহার হিস্টরী অব বেঙ্গল’ রচনা করেন, তবে স্টুয়ার্ট তাঁহার গ্রন্থ রচনায় রিয়াজ-উস-সলাতীন-এর উপর বিশেষভাবে নির্ভর করেন। এইভাবে বাংলার মুসলমান শাসনের ইতিহাস রচনা আধুনিক যুগে প্রবেশ করে, তবে প্রামাণ্য সূত্রের অভাবে তৎকালীন রচনা বিশেষভাবে ব্যাহত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দী হইতে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বাংলার ইতিহাসের বিভিন্ন প্রামাণ্যসূত্র আবিষ্কারের কাজে লিপ্ত থাকেন এবং সমসাময়িক শিলালিপি, মুদ্রা, স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন, আরবি, ফার্সি এবং বাংলা পাণ্ডুলিপি আবিষ্কারের মাধ্যমে তাঁহারা বাংলায় মুসলমান শাসনের ইতিহাসের, বিশেষ করিয়া সুলতানি আমলের, প্রচুর তথ্য উদ্ঘাটন করেন। বিভিন্ন সাময়িকী, বিশেষত কলিকাতা এশিয়াটিক সোসাইটির মুখপত্র জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-এর বিভিন্ন সংখ্যায়; এইসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। যে সকল ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক এই মহৎ কাজে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন, যেমন এডওয়ার্ড টমাস, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, হেনরী ব্লখম্যান, এডওয়ার্ড রোজার্স, হেনরী বেভেরীজ, রুডলফ হোয়েল, আলেকজান্ডার কানিংহাম, এইচ. ই স্ট্যাপলটন, মনোমোহন চক্রবর্তী, খান সাহেব আবদুল ওয়ালী, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, নলিনীকান্ত ভট্টশালী এবং আরও অনেকে, তাঁহারা সকলেই বর্তমান কালের ঐতিহাসিকদের কাছে স্মরণীয় হইয়া থাকিবেন। তবে তাঁহাদের জ্ঞানগর্ভ গবেষণা বিভিন্ন সাময়িকীর মধ্যে ইতস্তত ছড়াইয়া ছিল! এই শতাব্দীর ত্রিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই বিষয়ে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সিদ্ধান্তের ফল হিসাবে ড. আর. সি. মজুমদারের সম্পাদনায় ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে হিস্টরী অব বেঙ্গল, ভল্যুম ১ এবং স্বর্গীয় স্যার যদুনাথ সরকারের সম্পাদনায় ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে হিস্টরী অব বেঙ্গল, ভল্যুম ২ প্রকাশিত হয়। ইতিপূর্বে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলার ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়, কিন্তু এই বইখানিতে শুধু সুলতানি আমলের ইতিহাস আলোচিত হয়। তাই স্যার যদুনাথ সরকার সম্পাদিত গ্রন্থই বর্তমানে বাংলার মুসলমান আমলের একমাত্র প্রামাণ্য পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস 1
১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যখন বাংলার সুলতানি আমলের ইতিহাসের গবেষণায় আত্মনিয়োগ করি, তখন আমার বন্ধু-বান্ধব এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকেই আমাকে নিরুৎসাহিত করেন। তাঁহাদের সকলের এবং আমার নিজেরও ভয় ছিল, হয়তো প্রামাণ্যসূত্র এবং তথ্যাদির অভাবে আমার গবেষণার কাজ ব্যাহত হইবে। কিন্তু কাজে হাত দিয়া দেখি যে প্রচুর তথ্য উপকরণ তখনও অনাবিষ্কৃত রহিয়াছে বা ঐতিহাসিকদের অগোচরে রহিয়া গিয়াছে। আজ আমি সন্তুষ্টির সঙ্গে বলিতে পারি যে, আমি এবং আমার মতো আরও যাঁহারা এই কাক্টে অগ্রসর হইয়াছিলেন তাঁহারা কেহই নিরাশ হন নাই। বাংলার সুলতানি অমলের গবেষণা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে যে, স্যার যদুনাথ সরকার সম্পাদিত হিস্টরী অব বেঙ্গল, ভল্যুম ২ নূতন করিয়া লিখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি হইতেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই এই বিষয়ে গবেষণা করিয়া একাধিক গবেষক পি-এইচ. ডি. ডিগ্রি লাভ করিয়াছেন। প্রায় দশ বার বৎসর আগে বিশ্বভারতীর অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায় বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর শিরোনামে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের আমলের একটি মূল্যবান ইতিহাস রচনা করেন। আমার বর্তমান গ্রন্থ বাংলার ইতিহাস (সুলতানি আমল) এই আমলের ইতিহাসে আর একটি সংযোজন। এই বইখানিতে মুসলমানগণ কর্তৃক বাংলাদেশ বিজয় হইতে শুরু করিয়া ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ মোগল সম্রাট আকবর কর্তৃক অধিকৃত হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ সারা সুলতানি আমলের ইতিহাস আলোচনা করা হইয়াছে। উপরোক্ত আলোচনায় বইখানি লিখার যৌক্তিকতা খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে। তদুপরি বাংলা ভাষায় লিখিত হওয়ায় বইখানি সাধারণ পাঠক এবং ছাত্রদের কাজে লাগিবে।
ইতিহাসে কোন কথার শেষ নাই। আজ যাহা সিদ্ধান্ত করা হয় নূতন তথ্য আবিষ্কৃত হইলেই কালই হয়তো তাহা পুনর্বিবেচিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে। সমসাময়িক ইতিহাসের অভাবে মুসলমান আমলের বাংলার ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এই সত্য আরও প্রকট হইয়া ওঠে। নূতন শিলালিপি বা মুদ্রা বা কোন লিখিত সমসাময়িক উপকরণ আবিষ্কৃত হইলেই ঐতিহাসিকদের নূতনভাবে চিন্তা করিতে হয় এবং প্রাপ্ত উপকরণের আলোকে স্বীয় সিদ্ধান্ত বারবার পরিবর্তন করিতে হয়। পরিশিষ্ট ‘ক’ এবং ‘খ’-এ এইরূপ পরিবর্তনের কিছু আভাস পাওয়া যাইবে। আমি আশা করি আমার বর্তমান গ্রন্থ বাংলার ইতিহাস (সুলতানি আমল)-কেও সহৃদয় পাঠকমণ্ডলী উপরোক্ত আলোকে বিচার করিবেন। তবে এইটুকু আমি জোর দিয়া বলিতে পারি যে এই পুস্তক লিখিতে গিয়া আমি আমার প্রায় ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাইয়াছি, প্রত্যেক সূত্র বা তথ্য, আমার পূর্ববর্তী এবং সমসাময়িক গবেষকদের মতামত, ঐতিহাসিক আলোকে যাচাই করিয়াছি এবং যতদূর সম্ভব সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস রচনার প্রয়াস পাইয়াছি। এই দুরূহ কাজে কতদূর সফল হইয়াছি তাহা বিচার করার ভার সহৃদয় পাঠকবৃন্দের হাতেই ছাড়িয়া দিলাম।
আগেই বলিয়াছি, সুখময় মুখোপাধ্যায়ের বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর বইখানি অত্যন্ত মূল্যবান। পাঠকমণ্ডলী লক্ষ্য করিবেন যে অনেক স্থানে আমি সুখময় বাবুর অনুবাদ হুবহু গ্রহণ করিয়াছি এবং তাঁহার বই হইতে প্রচুর উদ্ধৃতি দিয়াছি। প্ৰথমে আমি নিজেই এই সকল সূত্রের অনুবাদ স্বাধীনভাবে করার চেষ্টা করি, কিন্তু দেখি শুধু কয়েকটি শব্দ এবং লিখনভঙ্গি ছাড়া আমার অনুবাদ সুখময় বাবুর অনুবাদের সঙ্গে মিলিয়া যায়। এইভাবে নিজের অনুবাদ ছাপাইলে হয়তো সুখময় বাবুর অনুবাদের নকল করার দায়ে দোষী হইয়া পড়িতাম। সেই ভয়ে আমি সুখময় বাবুর অনুবাদকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। অবশ্য যেইখানে আমি তাঁহার অনুবাদের সঙ্গে একমত হইতে পারি নাই, সেইখানে আমি স্বাধীনভাবে অনুবাদ করিয়াছি। বলাবাহুল্য যেইখানে আমি সুখময় বাবুর অনুবাদ গ্রহণ করিয়াছি, সেইখানে যথাযথ স্বীকৃতি দিয়াছি। যদি ভুলক্রমে কোথাও স্বীকৃতি দেওয়া না হইয়া থাকে, আশা করি সুখময়বাবু নিজে এবং পাঠকবৃন্দ আমাকে ক্ষমা করিবেন।
মুসলমান আমলের ইতিহাস বাংলা ভাষায় লিখার সময় বানান বিভ্রাটের সম্মুখীন হইতে হয়। কারণ আরবি _ _ _ _ এবং _ এই ৫টি অক্ষরের জন্য বাংলায় শুধু ‘জ’ এবং ‘য’ দুইটি অক্ষর আছে। আবার আরবি _ এই একটি অক্ষরের জন্য বাংলায় ‘শ’ বা ‘ষ’ দুইটি অক্ষর রহিয়াছে। ইংরেজি এবং অন্যান্য পাশ্চাত্য ভাষার জন্য যেমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃত রীতি International transliteration system উদ্ভাবন করা হইয়াছে, বাংলা ভাষায় তেমন কোন স্বীকৃত রীতি বা উপায় উদ্ভাবন করা হয় নাই। এই কারণে আমার এই বইখানিতে আরবি নাম ইত্যাদি লিখিবার সময় আমি অত্যন্ত সোজা পদ্ধতি গ্রহণ করিয়াছি, অর্থাৎ _ এবং _ উভয়ের জন্য ‘ক’ অক্ষর ব্যবহার করিয়াছি, _-এর জন্য আলাদাভাবে ‘ক্ক’ ব্যবহার করি নাই, কারণ আরবি _ এবং বাংলা ‘ক্ক’-এর উচ্চারণ এক নয়। অনুরূপভাবে _ -এর জন্য ‘ধ্ব’ ব্যবহার করি নাই, ‘জ’ ব্যবহার করিয়াছি, কারণ। আরবি _ এবং বাংলা ধ্ব-এর উচ্চারণ এক নয়। এক কথায় বলিতে গেলে আমি বইখানি সহজপাঠ্য করার চেষ্টা করিয়াছি, ইহাতে বিশেষজ্ঞরা ক্ষুণ্ণ হইবেন সন্দেহ নাই; কিন্তু সাধারণ পাঠক এবং ছাত্রদের জন্য কোন বিঘ্ন সৃষ্টি হইবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমার ইচ্ছা যতই সৎ হউক না কেন, বইখানি যত সহজপাঠ্য করার ইচ্ছা ছিল, সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে ততটা সহজপাঠ্য হয় নাই। কারণ, আমি নিজে বইখানির প্রুফ দেখার সুযোগ পাই নাই। ফলে বইখানিতে ভাষা ও বানানের সমতা রক্ষা করা কিংবা ভাষা আর একটু মার্জিত করা সম্ভব হয় নাই এবং অসংখ্য ছাপার ভুল রহিয়া গিয়াছে। এই কারণে বইয়ের শেষে একখানি শুদ্ধিপত্র সংযোজন করা হইল, যদি সহৃদয় পাঠক বইখানি পড়ার আগে কষ্ট করিয়া শুদ্ধিপত্র দেখিয়া ভুলগুলি শুদ্ধ করিয়া নেন তাহা হইলে অনেক বিরক্তিকর পরিস্থিতি হইতে রেহাই পাওয়া যাইবে।
বইখানি প্রকাশ করার জন্য আমি বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। একাডেমী কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করিয়া আশাতিরিক্ত অল্প সময়ের মধ্যে বইখানি প্রকাশ করিয়াছেন। তাঁহাদের ঐকান্তিক চেষ্টা সত্ত্বেও বইখানিতে যে ভুলত্রুটি রহিয়া গিয়াছে, তাহার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার। সহৃদয় পাঠকমণ্ডলী ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখিলে বাধিত হইব।
বইখানি সাধারণ পাঠক, গবেষক এবং বিশেষ করিয়া ছাত্রদের উপকারে আসিলে পরিশ্রম সার্থক মনে করিব।
আবদুল করিম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
চট্টগ্রাম
৩/১১/১৯৭৭





Good