• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

লাইব্রেরি » প্লেটো, সরদার ফজলুল করিম » প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম
প্লেটোর রিপাবলিক - সরদার ফজলুল করিম
লেখক: প্লেটো, সরদার ফজলুল করিমবইয়ের ধরন: ধর্ম ও দর্শন

প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

প্ৰথম প্ৰকাশ – আগস্ট ১৯৭৪
প্রকাশক – আহমেদ মাহমুদুল হক, মাওলা ব্রাদার্স
প্রচ্ছদ – কাইয়ুম চৌধুরী

PLATOR REPUBLIC: Bengali translation of Plato’s Republic with introduction, discussion and explanatory notes by Sardar Fazlul Karim based on English translation by Benjamin Jowett, F. M. Cornford and H. D. P. Lee. Published by Ahmed Mahmudul Haque of Mowla Brothers. Cover Designed by Qayyum Chowdhury.

.

উৎসর্গপত্র

১৯৯৯কে অতিক্রম করে ২০০০ সালে
অভাবিতরূপে নতুনতর যে-বিশ্বে মনুষ্যজাতি
পদার্পণ করছে, তাদের মহত্ত্বর
এক মনুষ্যসমাজ তৈরির প্রয়াসের ক্রম সার্থকতার
প্রত্যশায়—

.

মুখবন্ধ : সপ্তম সংস্করণ

মাওলা ব্রাদার্স থেকে ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর বর্তমান সপ্তম সংস্করণটি আমার মনে একটি সার্থকতাবোধের সৃষ্টি করেছে। বাংলাভাষা ও সাহিত্যে ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ আজ আর কোনো অপরিচিত গ্রন্থ নয়। ‘প্লেটোর সংলাপ’ ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ ‘এ্যারিস্টট্‌ল-এর পলিটিক্স’ প্রাচীন দর্শন, রাষ্ট্রতত্ত্বসাহিত্যে এবং সমাজতত্ত্বের আকর-গ্রন্থরূপে বাংলাভাষার পাঠকসমাজে আজ সম্যকরূপে সমাদৃত।

একজন মানুষের যেমন জীবনকাল থাকে, একখানি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের ও তেমনি জীবনকাল থাকে। ব্যক্তির জীবনের সঙ্গে গ্রন্থের জীবনের একটি পার্থক্য এই যে, ব্যক্তির মৃত্যু অনিবার্য হলেও, একখানি মূল্যবান গ্রন্থের জীবনকালের বৃদ্ধি বৈ কোনো মৃত্যু ঘটে না। আমার ব্যক্তিগতজীবন যদি তার পঁচাত্তর পেরিয়ে প্রয়াণের মুহূর্তে এসে পৌঁছে থাকে, তবে ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ ১৯৭৪ সনে তার প্রথম প্রকাশের পরে ১৯৯৯-এর শেষে তাঁর পঁচিশ বৎসরের বয়স অতিক্রম করে আমার মনে এমন একটি প্রত্যয়ের সৃষ্টি করছে যে, তার জীবনকাল বাংলাভাষার পাঠক এবং জ্ঞানার্থীদের সমাদরে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

মানুষের যে-কোনো সৃষ্টিই যৌথ সৃষ্টি। একখানি গ্রন্থের ক্ষেত্রে এ কথাটি সবিশেষ সত্য। ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর একটি আত্মকাহিনী আছে : সে আত্মকাহিনী কেবল তার অনুবাদক হিসেবে আমার নিজের শ্রমের কাহিনী নয়। সংস্করণ থেকে সংস্করণে এই গ্রন্থের সঙ্গে আন্তরিকভাবে সংযুক্ত প্রকাশক, মুদ্রক, প্রুফ সংশোধক এবং পাঠকবর্গের কাহিনী। আমার বোধ এরূপ যে, একখানি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত গ্রন্থের অন্তরালে অপর একখানি অপ্রকাশিত কিন্তু অধিকতর একনিষ্ঠ গ্রন্থ যুক্ত থাকে। একজন পাঠক কেবল তার পঠিত গ্রন্থখানিকে দেখেন এবং পাঠ করেন। অন্তরালের গ্রন্থখানিকে নয়। ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ও এক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম নয়। তথাপি এ গ্রন্থের সহৃদয় পাঠক যদি গ্রন্থখানির ভূমিকা এবং তার উৎসর্গপত্রসমূহকে সহানুভূতির সঙ্গে অনুধাবনের প্রয়াস পান, তবে এই গ্রন্থের অন্তরালের গ্রন্থখানিরও একটি আভাস তিনি লাভ করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।

‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর আগ্রহী পাঠকবর্গকে এবং তার প্রকাশককে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি এবং তার অধিকতর জীবন কামনা করছি।

সরদার ফজলুল করিম
ডিসেম্বর ১৯৯৯, ঢাকা

.

মুখবন্ধ : ষষ্ঠ সংস্করণ

মাওলা ব্রাদার্স-এর আগ্রহ এবং উদ্যোগে ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর বর্তমান সংস্করণটি এই গ্রন্থের ষষ্ঠ সংস্করণ। মাওলা ব্রাদার্সকে এজন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭৪ সনে এই অনুবাদের প্রথম সংস্করণটি প্রকাশিত হয়। ২৪ বৎসরের অধিককাল যাবৎ গ্রন্থখানি বাংলাদেশের উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে যেমন তেমনি বৃহত্তর সংখ্যক পাঠক বর্গের নিকট থেকে যে-সমাদর লাভ করে এসেছে তার অভিজ্ঞতাতে একটি সার্থকতার বোধে আমি উদ্দীপিত।

এতদিনে ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ একটি নিজস্ব অস্তিত্ব এবং পরিচয় লাভ করেছে। ইংরেজী ভাষায় প্রকাশিত প্লেটোর ‘রিপাবলিকের’ আন্তর্জাতিক অবয়বটি অনুসরণ করেই আমি এর বাংলা সংস্করণটি তৈরী করেছিলাম। সেই অবয়বটির কোন পরিবর্তনকে আমি উচিত বলে মনে করিনি। মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত বর্তমান সংস্করণটি সেই মূল সংস্করণ অনুযায়ী মুদ্রিত হয়েছে।

বর্তমান সংস্করণটির প্রকাশোপলক্ষে নিজের মনের দিকে তাকিয়ে কেবল যে এই শতকের সবচাইতে প্রলয়ঙ্করী বন্যার অভিজ্ঞতাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সঙ্গে নিজেকেও প্রকৃতির শক্তির কাছে এক অসহায় প্রাণী বলে মনে হচ্ছে, তাই নয়। পৃথিবীর মানুষকে আজ প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কের পারস্পরিকতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে।

প্রকৃতি এবং মানুষ কি পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী এবং প্রতিকূল শক্তি? সামগ্রিকভাবে স্বল্প দৃষ্টির মানুষ এতকাল এই দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে এসেছে। এমন দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই কথা তৈরী হয়েছে : ‘প্রকৃতিকে জয় করতে হবে মানুষকে।’ মানুষকে চেতনাসম্পন্ন প্রাণী বলা হয়। প্রকৃতিকে তেমন বলা হয় না। তথাপি বস্তুর সঙ্গে বস্তুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় যে অবস্থা সৃষ্টি হয় এবং যুগে যুগে হয়েছে তাতে মানুষের পক্ষ থেকে প্রকৃতিকে সহমর্মিতার ভিত্তিতে না দেখে প্রতিদ্বন্দ্বীর ভিত্তিতে দেখা হয়েছে। এ আমার অনুভূতি। প্রকৃতির উপর চেতনা এবং উদ্দেশ্য আরোপ না করেও ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে বলতে হয় : প্রকৃতি তারই অবুঝ সন্তান মনুষ্য নামক প্রাণীর উপর অকরুণভাবে প্রতিশোধ গ্রহণের মূর্তিতে যেন প্রকাশিত হচ্ছে। তার এক প্রকাশ থেকে আর এক ভয়াবহ প্রকাশের কাল-ব্যবধান যাই থাকুক না কেন, এবং প্রতিটি প্রকাশ যে পূর্ববর্তী প্রকাশের চাইতে ভয়ঙ্কর থেকে অতীব ভয়ঙ্কর হচ্ছে এবং হবে, আতঙ্কিত অবস্থায় আজ আমার তাই মনে হচ্ছে।

ভবিষ্যতের সেই ভয়ঙ্কর প্রকাশের দিনে অপর সাথীদের সঙ্গে আমিও থাকব না। তা নিশ্চিত। তবু মরণশীল হয়েও যে-মানুষকে অমর বলে আমি মনে করি, তার চিহ্নহীন বিলুপ্তির আশঙ্কা নিয়ে আমরা মরতে চাইনে। আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই যে, আজকের অবুঝের মধ্যে কিছু বুঝমানেরও জন্ম ঘটবে। তারা তাদের সামাজিক-রাষ্ট্রীয়-বৈশ্বিক জীবনের সংকট ও সমস্যায় সক্রেটিস-প্লেটো-এ্যারিস্টটল-বুদ্ধ এবং অন্যসকল চিন্তাশীল প্রাজ্ঞের স্মরণে মনুষ্য সমাজের মূল সমস্যা সম্পর্কে এঁদের চিন্তার পরিচয় দ্বারা হতাশার মধ্যেও জীবনের জয়ের আশা পোষণ করবে।

জীবন এবং মৃত্যু পরস্পর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সম্পর্কিত। তবু মৃত্যুহীন আশাবাদী প্রাণী হিসাবে আমাদের এই প্রত্যয়টিকে ধারণ করতে হবে : জীবন-মৃত্যুর দ্বন্দ্বে জীবনের জয় হয়। মৃত্যুর নয়। জীবনের নবজন্ম লাভ হয়। মৃত্যুর মৃত্যু ঘটে।

প্রীতিভাজন শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরীকে আমার আবার আন্তরিক ধন্যবাদ। যেমন এ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদটি তিনি তাঁর নিজস্ব চিন্তা এবং বৈশিষ্ট্য দিয়ে তৈরী করেছিলেন তেমনি এই সংস্করণটির প্রচ্ছদও তিনি তৈরী করে দিয়েছেন।

সরদার ফজলুল করিম
নভেম্বর ১৯৯৮, ঢাকা

.

মুখবন্ধ : পঞ্চম সংস্করণ

যেমন মুখবন্ধ, তেমনি উৎসর্গপত্র : একখানি গ্রন্থের এ-দুটি বিষয় লেখকের বা অনুবাদকের একটি আবেগের বিষয়।

ব্যক্তিগত জীবনে নানা বিপর্যয়। সেখানে নানা অসহায়তা এবং হতাশার উচ্চারণ। সে অনিবার্য। তাকে স্বীকার না করে পারিনে। বয়সের বার্ধক্যও মনের অনেক মহৎ ইচ্ছাকেও কার্যে পরিণত করতে দেয় না। ইচ্ছামাত্রই কাজ হয় না। কাজমাত্রেরই সমাজ, পরিবার, অর্থ ইত্যাদিগত নানা বাধাবিপত্তি। এইসব মোকাবেলা করে যদি একটি সাধারণ কার্যও আমি সাধন করতে পারি, তার সকল অসম্পূর্ণতাসহ : তবে তাতেই জীবনের কিছুটা সার্থকতাবোধ।

‘প্লেটোর রিপাবলিক’ গ্রন্থখানির বাংলা অনুবাদের বর্তমান পঞ্চম সংস্করণের প্রকাশ আমার জীবনে তেমনি একটি আবেগ এবং সার্থকতাবোধের ব্যাপার। ব্যক্তিগত জীবনে হতাশার কথা দু’এক সময়ে প্রকাশ করলেও ‘মানবজাতি’ হিসাবে, বর্তমানের সব সংকট ও জটিলতা সত্ত্বেও মানুষ সম্পর্কে আমি আশাবাদী।

একটা তত্ত্ব : ‘মানুষ’ এক সময়ে এই প্রকৃতিজগতে বর্তমান আকারে অস্তিত্বময় ছিল না। তার পরে বস্তুজগতের কোটি কিংবা লক্ষ বছরের বিরামহীন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের অস্তিত্বলাভ এবং সে অস্তিত্বের হাত, পা, মাথার অব্যাহত পরিবর্তন। এ নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক। আমি এ-মুখবন্ধে তার আলোচনায় যাচ্ছিনে।

কিন্তু চিন্তার ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ যদি এসব তত্ত্বের ‘হাঁ’ এবং ‘না’ নিয়ে চিন্তা না করে, তা হলে তার আর ‘মানুষ’ নামধারণের কোনো অর্থ থাকে না। যে-সমাজে মনুষ্য সমাজ ও রাষ্ট্রের মানুষের ইতিহাসের পরিবর্তন প্রক্রিয়া নিয়ে যত অধিক তর্ক এবং বিতর্ক, সেই মনুষ্যসমাজ তত ঋদ্ধ, তত অধিক সে মনুষ্যসমাজ। মানুষ নানা রাষ্ট্রে বিভক্ত থাকে এবং থেকেছে। সেক্ষেত্রেও নিরন্তর পরিবর্তন। আজ রাষ্ট্রের এক সীমারেখা, তো কাল আর এক সীমারেখা।

প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে প্রাচীন গ্রীসের সক্রেটিস, প্লেটো, এ্যারিস্টটল : এই মহৎ মানুষেরা মানুষের মনে মানুষের নিজের চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, তার সমাজ ও রাষ্ট্রগত সমস্যার নানা মৌলিক প্রশ্নের উদ্রেক করেছেন। সমাধানের কথাও হয়তো বলেছেন। কিন্তু সমাধানের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সমস্যার কথা জানা, সমস্যাকে অনুধাবন করা। কেবল যে গ্রীসের এই ধীমানরা আমাদের জীবনকে প্রশ্নময় করে তুলতে চেয়েছেন, তাই নয়। ভারত, চীন : প্রাচীন কালের সব সমাজের গুরু, ঋষি, ধীমানরা মানুষের জন্য এই কাজ করেছেন। মানুষের ইতিহাসের নানা পরিবর্তনের অন্যতম মূল কারণ মানুষের চিন্তা। সমস্যাকে চিহ্নিত করা। সমস্যা সমাধানের জন্য সচেষ্ট হওয়া। হাজার হাজার বছরেরও পূর্বের, দেশ নির্বিশেষে মহৎ মানুষদের এই অবদানের জন্য বর্তমান কালের মানুষ হিসাবে আমরা তাঁদের কাছে ঋণ এবং কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ। এই ধারাতেই আরো মনীষীর আগমন। সে প্রক্রিয়া অব্যাহত।

আমার স্নেহভাজন ছাত্র-ছাত্রী, আমার প্রীতিভাজন সুহৃদবর্গ যদি এই দৃষ্টিভঙ্গীটি গ্রহণ করে বাংলাদেশে বাংলাভাষায় “প্লেটোর রিপাবলিক’ : সংলাপ মূলক গ্রন্থখানার পুনঃসংস্করণের দাবী না করতেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রীতিভাজন উপাচার্য, অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, প্রকাশণা সংস্থার অন্যতম কবি ও সাহিত্যিক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং অন্যান্য সহকর্মীবৃন্দ যদি আগ্রহের সঙ্গে প্লেটোর রিপাবলিক-এর পঞ্চম সংস্করণটি প্রকাশ করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করতেন, তাহলে গ্রন্থখানির বর্তমান সংস্করণটি প্রকাশিত হতে পারত না। এখন আর এ অনুবাদ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। বাংলাদেশের জ্ঞান ভান্ডারের একটি স্বীকৃত সম্পদ। যতক্ষুদ্র পরিমাণেই হোক, এ গ্রন্থ আমাদের ছাত্র-ছাত্রী এবং পাঠক সাধারণের চিন্তাকে আলোড়িত করার ভূমিকা পালন করছে। এ গ্রন্থের শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎকেও আমি আনন্দ এবং আশার সঙ্গে তাদের হাতে সমর্পণ করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয় এবং তাঁর প্রকাশনা সংস্থার সদস্যবৃন্দের নিকট ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

বাংলা বানান কিংবা বাক্যগত ভুলত্রুটি আমি যথাসাধ্য সংশোধন করে দেবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোন বাংলা বইকেই ভুল-ত্রুটি শূন্য বলে দাবী করার দুঃসাহস খুব কম লেখকই দেখাতে পারেন। আমার সে সাহস নেই। তবে এ চেষ্টায় আমার আন্তরিকতার কোন অভাব ঘটেনি, একথা আমি বলতে পারি।

উপসর্গ পত্রে একটি আবেগ থাকে। সে কথা আমি প্রথমেই বলেছি। চতুর্থ সংস্করণের উপসর্গ পত্রটিতে যে অনুভূতিটুকু ‘১৯৯২’ সনের উল্লেখ করে প্রকাশ করেছিলাম, এই সংস্করণটিতে সেই অনুভূতিটিই ‘১৯৯২’ এর স্থানে ‘১৯৯৭’ সনটি উল্লেখ করে প্রকাশ করার চেষ্টা করছি। ‘প্লেটোর রিপাবলিক-এর প্রথম সংস্করণটি প্রকাশ করেছিলেন ১৯৭৪ সনে তৎকালীন অন্যতম প্রকাশনা সংস্থা ‘বর্ণমিছিল’-এর বন্ধুবর তাজুল ইসলাম। সম্প্রতি অকালে তিনি প্রয়াত হয়েছেন। এ এক মর্মান্তিক ঘটনা। বর্তমান সংস্করনের প্রকাশ উপলক্ষে প্রয়াত সুহৃদ তাজুল ইসলামকে পরম প্রীতি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

আর একটি কথা। ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর বর্তমান পঞ্চম সংস্করণের প্রুফ সংশোধনের কাজ যখন যথাসাধ্য ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করছি, তখন ২৭শে অক্টোবর, ‘৯৬ তারিকে সোনারগাঁও হোটেলের কাছে একটি বেবিট্যাক্সি আমার রিকসাটাকে উল্টে দিয়ে আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। মেরে ফেললে জাগতিক অন্যসব বিষয় থেকে মুক্তি পেতাম। কিন্তু ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর গ্রুপ সংশোধনের কাজ বাকি থাকত। এই কারণে পঙ্গু অবস্থায় পঙ্গু হাসপাতালে শুয়ে বড় অসহায় লাগছিল। সেই করুণ অসহায় অবস্থায় এগিয়ে এসেছিলেন অনুজ প্রতিম সহকর্মী অধ্যাপক ডালেম চন্দ্র বর্মন। কাজটি যে শেষ পর্যন্ত সমাপ্ত হতে পেরেছে তার জন্য আমি তাঁর কাছে একটি অপরিশোধ্য ঋণে ঋণী। এ ঋণ আনন্দের ঋণ। কৃতজ্ঞতার ঋণ।

সরদার ফজলুল করিম
ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭

.

মুখবন্ধ : চতুর্থ সংস্করণ

‘প্লেটোর রিপাবলিক’ মানুষের জীবনের সমাজের ক্ষেত্রে একখানি চিরায়ত জীবনকোষ বিশেষ। মানুষের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের মৌলিক সমস্যাগুলি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ প্লেটো তাঁর অনবদ্য সংলাপের রীতিতে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। তাঁর লিপিবদ্ধ সমস্যা প্রায় আড়াই হাজার বছর পরের বর্তমানের যে-পৃথিবী এবং তার অন্তর্গত রাষ্ট্রসমূহ : সেই পৃথিবী ও রাষ্ট্রসমূহের মানুষের জীবনেরও মৌলিক সমস্যা।

আমাদের সামাজিক-রাষ্ট্রীয় জীবনের নানা সমস্যার আমরা সমাধান অন্বেষণ করি। সমস্যার সমাধানের জন্য যে-প্রয়োজনটি সবার আগে আসে সে হচ্ছে, সমস্যা সম্পর্কে জ্ঞান। সমস্যার চরিত্র সম্পর্কে ধারণা। মানুষের সামাজিক জীবনের মৌলিক কোনো সমস্যারই চূড়ান্ত সমাধান আজও সাধিত হয়নি। সমস্যাহীন সামাজিক জীবন কল্পনা করা সম্ভব নয়। মানুষের জীবনে আদিকাল থেকে যা চলে এসেছে, তা তার জীবনের সমস্যার চরিত্র অনুধাবনের চেষ্টা এবং সমাধানের প্রয়াস। সমস্যা অনুধাবনের এ-চেষ্টা এবং সমাধানের প্রয়াস অনন্তকাল ধরেই চলবে। ‘মানুষ’ শব্দের অর্থই তাই : সমাধানে সচেষ্ট সমস্যাপূর্ণ এক জীবন।

মনুষ্যজীবনের এই অশেষ অভিযাত্রায় ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ এক অনন্য সাথি এবং পথপ্রদর্শক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের উচ্চতর শিক্ষা এবং ব্যাপকতর সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর গুরুত্ব অনুধাবন করে গ্রন্থখানির চতুর্থ সংস্করণ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ জন্য তাঁরা অনুবাদক হিসাবে আমার এবং পাঠক হিসাবে ছাত্র-ছাত্রী এবং জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তিমাত্রেরই কৃতজ্ঞতার পাত্র।

‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর বাংলা অনুবাদের তৃতীয় সংস্করণটি নিবেদিত হয়েছিল প্রকাশকালের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত মানুষের জীবন ও জ্ঞানসাধনার অনিবার প্রয়াসের উদ্দেশে। গ্রন্থের বর্তমান চতুর্থ সংস্করণটি নিবেদিত হল বিংশ শতাব্দীর যবনিকা-মুহূর্তের বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মহত্তর জীবনসৃষ্টির সংগ্রামে নিরত মানুষের উদ্দেশে।

সরদার ফজলুল করিম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অক্টোবর ১৯৯২

.

মুখবন্ধ : তৃতীয় সংস্করণ

‘প্লেটোর রিপাবলিক’ বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম এক চিরায়ত সৃষ্টি। চিরায়ত সৃষ্টির এই বৈশিষ্ট্য যে, তার মধ্যে মানুষের জীবনের মৌলিক সত্যগুলির যে-প্রকাশ ঘটে সেই সত্যগুলি কাল থেকে কালে মানুষের সংকটে এবং সমস্যায় মানুষের পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে। সে-কারণে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে সাম্প্রতিক সময়ে ১৯৮৮ সালে মহাপ্লাবনের ন্যায় যে বন্যার আঘাত এসেছে এবং তার জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে, সে সংকটেও মানুষের সমাজিক রাষ্ট্রীয় জীবনযাপনের মৌলিক সমস্যার চিন্তায় ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ আবার আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। এমন দুর্যোগের সময়ে জ্ঞানের সাধনায় যে-শিক্ষার্থীরা নিরত আছেন তাঁদের কাছে ‘প্লেটোর রিপাবলিক’কে পুনরায় পৌঁছে দেবার দায়িত্ব থেকে ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করা হল।

‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর তৃতীয় সংস্করণটিও প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ। দ্বিতীয় সংস্করণও তাঁরাই প্ৰকাশ করেছিলেন। তাঁদের এই সিদ্ধান্তের জন্য উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নানের নিকট আমি কৃতজ্ঞতা বোধ করছি।

‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর দ্বিতীয় সংস্করণের সকল কপি নিঃশেষিত। পাঠকবর্গ এবং ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে’ প্লেটোর রিপাবলিক’ বেশ কিছুদিন যাবৎ দুষ্প্রাপ্য হয়ে রয়েছে। অষ্টআশির প্লাবনের বিপর্যয়ের কারণে গ্রন্থের মুদ্রণে বিলম্ব ঘটেছে। কিন্তু সে-বিলম্ব ছিল অনিবার্য। প্রাকৃতিক সে-দুর্যোগের দাগ আমাদের ব্যক্তিগত এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের জীবন থেকে এখনও মুছে যায়নি। তবু এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মীবৃন্দ এবং মুদ্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউটের প্রেসকর্মীবৃন্দ গ্রন্থখানির মুদ্রণকার্য যে সম্পন্ন করেছেন, তাতে তাঁরা সকলেই যেমন আমার, তেমনি পাঠকবৃন্দ এবং ছাত্র-ছাত্রীদের ধন্যবাদের পাত্র হবেন।

‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর বর্তমান সংস্করণটি মূলত ইতিপূর্বকার দ্বিতীয় সংস্করণের ফটো-কম্পোজিশনের প্রক্রিয়ায় মুদ্রিত। সে-কারণে এবং সময়ের স্পল্পতার জন্য পূর্বতন সংস্করণের কোনো সংশোধন করা সম্ভব হয়নি।

পূর্বতন সংস্করণে কোনো গুরুতর মুদ্রণপ্রমাদ ছিল না। বর্তমান মুদ্রণও কিছুটা ত্রুটিযুক্ত থাকলেও, বড় রকমের কোনো প্রমাদ এতে নেই বলেই আমার বিশ্বাস। তথাপি অনুবাদসহ অপর কোনো ভুলত্রুটি যদি আগ্রহী ছাত্র-ছাত্রী এবং পাঠকবৃন্দের দৃষ্টিগোচর হয় তবে তা অনুবাদককে অবগত করলে, আমি কৃতজ্ঞ থাকব।

‘প্লোটোর রিপাবলিক’-এর বাংলা অনুবাদের দ্বিতীয় সংস্করণটি নিবেদিত হয়েছিল প্রয়াত ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী এবং কবি হাবিবুর রহমান : এই মহৎপ্রাণ স্মরণীয়দের স্মৃতির উদ্দেশে। ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর অনুবাদের তৃতীয় সংস্করণটি নিবেদিত হল ‘৮৮ সালের মহাপ্লাবনের মধ্যেও জীবনকে নতুন করে এবং সংগতিময় করে গঠন করার জন্য জ্ঞানের সাধনায় ও সংগ্রামে নিরত মানুষের উদ্দেশে।

সরদার ফজলুল করিম
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৩১শে অক্টোবর, ১৯৮৮।

.

মুখবন্ধ : দ্বিতীয় সংস্করণ

প্লেটোর রিপাবলিক ১ম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল আগস্ট, ১৯৭৪ সনে। বইখানি তখন প্রকাশ করেছিল ঢাকার বর্ণমিছিল প্রকাশনা। ১৫ই নভেম্বর ‘৭৪ তারিখে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দীনের আমন্ত্রণে গ্রন্থখানির প্রকাশনা উপলক্ষে একটি আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। আজ ১৯৮২ সনের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর দ্বিতীয় সংস্করণের সেই প্রকাশনা অনুষ্ঠানের উপর রক্ষিত আমার ক্ষুদ্র রোজনামচাটি এখানে তুলে দেওয়ার জন্য একটা আগ্রহ বোধ করছি।

“১৫.১১.৭৪”। …আজ কিছুক্ষণ আগে এলাম জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর প্রকাশনার উপর একটি আলোচনার আয়োজন করেছিলেন। আলোচনাটিতে বেশ সুধী সমাবেশ হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বেশকিছু ছাত্রও এসেছিলেন। সভাপতিত্ব করলেন ডঃ মুজাফফর আহমদ চৌধুরী সাহেব। আমার অনুবাদ প্রসঙ্গে প্রবন্ধ পড়লেন কবি হাবিবুর রহমান এবং অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। এরূপ অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা এবং বর্তমান অনুবাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করলেন ডঃ রওনক জাহান, অধ্যাপক সা’দউদ্দীন এবং ডঃ মুহাম্মদ এনামুল হক। ডঃ কাজী মোতাহের হোসেন সাহেবও এসে কিছুক্ষণের জন্য অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। আলোচনায় ডঃ মুজাফফর আহমদ চৌধুরী এবং অপর সকলে বর্তমান অনুবাদখানির অকুণ্ঠ প্রশংসা করলেন। এরূপ গ্রন্থ প্রকাশে প্রকাশক তাজুল ইসলাম যে আগ্রহ এবং উদ্যোগ দেখিয়েছেন তার জন্য তাঁকেও তাঁরা প্রশংসা করেছেন। প্রবন্ধকার এবং আলোচকদের এরূপ অকুণ্ঠ প্রশংসায় আমি একদিকে সংকুচিত, অপরদিকে আনন্দিত বোধ করেছি। আমার এ অনুবাদের সীমাবদ্ধতার কথা আমি জানি। বৃহৎ পুস্তক। দীর্ঘকাল ধরে এর অনুবাদে আমাকে নিযুক্ত থাকতে হয়েছে। আমার নিজের প্রকাশক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা আছে। গ্রন্থের অনুবাদ এবং মুদ্রণকালে একাধিকবার আমার পাণ্ডুলিপি আমি পড়েছি। যথাসাধ্য তাকে উন্নত করার চেষ্টা করেছি। যেন সাহিত্যানুরাগী ও ছাত্র সম্প্রদায়ের নিকট বিশ্বসাহিত্যের এই চিরায়ত সম্পদের স্বাদ অন্ততঃ কিছুটা অনুভূত হয় তার জন্য অনুবাদে স্বাচ্ছন্দ্য আনার চেষ্টা করেছি। একে আরো উন্নত করা নিশ্চয়ই যায়। এক্ষেত্রে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ঠিকই বলেছেন। অধ্যাপক সা’দউদ্দীন প্লেটো-বিচারে নূতনতর দৃষ্টিভঙ্গীর প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করেছেন। বেনজামিন ফ্যারিংটন যেরূপ সক্রেটিস-প্লেটো-পূর্বযুগের গ্রীক বিজ্ঞান ও দর্শনের বস্তুবাদী বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে তার পটভূমিতে প্লেটো-এ্যারিস্টটলের দর্শনের সামাজিক ভূমিকার নতুন ব্যাখ্যাদানের চেষ্টা করেছেন সে দৃষ্টিভঙ্গিটি আমাদের দেশের শিক্ষা-আলোচনার ক্ষেত্রে আনা প্রয়োজন। ‘রিপাবলিক’-এর ভূমিকায় তার কিছুটা আভাস দিলেও এ মূল্যায়ন অধিকতর বিস্তারিত ভাবে করা আবশ্যক। ডঃ রওনক জাহান সংক্ষেপে বেশ সুন্দরভাবে অনুবাদের বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করে ‘রিপাবলিক’-এর সংলাপ মূলক পদ্ধতি শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োগ যে বাঞ্ছনীয় তার কথাও বলেলেন। ডঃ মুহাম্মদ এনামুল হক তাঁর এই বৃদ্ধ বয়সেও আমার অনুবাদখানি পাওয়ামাত্র বিরতিহীনভাবে পাঠ করে শেষ করেছেন। তিনি বললেন, অনুবাদের সাবলীলতা দশম পুস্তকে এসে যেন একটু শিথিল হয়ে পড়েছে। তাঁর মন্তব্যটি খেয়াল রাখার বিষয়। এদিকে খেয়াল রেখে আমি আবার দশম পুস্তকখানা পাঠ করব। ডঃ মুজাফফর আহমদ চৌধুরী এরূপ কাজের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন এবং এ্যারিস্টটলের ‘পলিটিকস’ গ্রন্থের অনুবাদেরও দাবী জানালেন।[১] অনুষ্ঠানের সংগঠকগণ আমাকেও কিছু বলতে বললেন। আলোচনাকারীদের এমন অকৃপণ প্রশংসায় আমি এরূপ বিব্রত বোধ করেছিলাম যে ঠিক গুছিয়ে কিছু বলতে পারলাম না। বর্তমান অনুবাদ প্রসঙ্গে বাংলাভাষায় গুরত্বপূর্ণ গ্রন্থাদি অনুবাদের সমস্যা এবং অবস্থা নিয়ে আলোচনা হলে ভাল হত। তাহলে আজকের আলোচনা এত ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমবদ্ধ থাকত না। কিন্তু কোনো সৃজনকর্মের প্রশংসা প্রশংসাকারীদের চরিত্রের উদারতার লক্ষণ। যাঁরা আলোচনা করেছেন তাঁরা উদার-হৃদয় বলেই দ্বিধাহীনভাবে অনুবাদককে উৎসাহদান করতে চেয়েছেন। আর সে উৎসাহদানের বিশেষ তাৎপর্য এই যে, প্লেটোর ‘রিপাবলিক’-এর ন্যায় চিরায়ত সাহিত্যের অনুবাদের প্রচেষ্টাকে আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও শিক্ষার বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে তাঁরা বিশেষ মূল্যবান বলে গণ্য করেন। বর্তমানে যে হতাশাজনক পরিস্থিতি সর্বত্র বিদ্যামান . . . তাতে যদি আমরা শিক্ষা ও সাহিত্যের কিছু মহৎ সৃষ্টি ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে তার কিছু পরিচয় সৃষ্টি করতে পারি, তবে সে সৃষ্টি নির্যাতিত মানুষের ভবিষ্যৎ সমাজের জন্য মহৎ ঐতিহ্যের সঞ্চয় হবে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক এবং আর্থিক জীবন অসহায় বলে মানসিক ক্ষেত্রেও যদি নিরন্ধ্র অন্ধকারকেই আমরা লালন করি তবে তা জীবনের চারিপাশের আশাহীনতাকে অধিকতর অনিবার্য করে তুলবে। আজকের আলোচনার সার্থকতার এই একটি দিক নিশ্চয়ই আছে।

এদিকটির বোধও নিশ্চয়ই সমাগত শ্ৰোতাসুধীদের মধ্যে রয়েছে। নইলে প্লেটোর ‘রিপাবলিক’-এর অনুবাদ প্রকাশের আলোচনায় এরূপ আগ্রহের সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব হত না। এই মনোভাবটিই আমি প্রকাশ করে বলার চেষ্টা করলাম।” …

জ্ঞানান্বেষী ও সাহিত্যানুরাগী ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষাবিদ এবং পাঠকবৃন্দ যাঁরা সেদিন এই অনুবাদকর্মকে উৎসাহিত করেছিলেন তাঁদেরই আগ্রহে ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর দ্বিতীয় সংস্করণের প্রকাশ আজ সম্ভব হচ্ছে। বেশ কিছুদিন হল গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের কপি নিঃশেষিত হয়ে গেছে। বাজারে কোথাও গ্রন্থের কপি পাওয়া যায় না। এজন্য অনেক ছাত্র-ছাত্রী, অধ্যাপক, অধ্যাপিকা আমার নিকট গ্রন্থখানির জন্য তাগিদ দিয়েছেন। কিন্তু পুস্তক প্রকাশনা শিল্পে যে-সংকট বিরাজ করছে তাতে এমন বৃহৎ আকারের গ্রন্থ পুনর্মুদ্রণে অগ্রসর হয়ে আসার মতো প্রকাশনা সংস্থা আমাদের এখানে বিশেষ দুর্লভ। যে প্রকাশনা সংস্থা প্ৰথম সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন ঐকান্তিক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আর্থিক সংকটের কারণে তাঁদের পক্ষেও এ পুস্তক দ্বিতীয় বার প্রকাশ করার সাহস করা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রনীতি, সাহিত্য এবং দর্শনের এমন চিরায়ত গ্রন্থের প্রয়োজন উপলব্ধি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ-সিদ্ধান্তের উদ্যোগ এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী সাহেবের নিকট থেকে। তিনি আগ্রহসহকারে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে এ-গ্রন্থকে পুনরায় প্রকাশ করা সম্ভব হত না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এজন্য তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা বোধ করি। ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দও নিশ্চয়ই তাঁর এ-সিদ্ধান্তে উপকৃত হবেন এবং তাঁরাও এজন্য কৃতজ্ঞতা বোধ করবেন।

আমাদের দেশে কোনো গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি তৈরিতেই লেখকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রেস থেকে শেষ পৃষ্ঠাটি বার করে নিয়ে আসা পর্যন্ত তাঁকে প্রায় ক্ষেত্রে পুস্তকের মুদ্রণের সঙ্গে উদ্বেগসহকারে যুক্ত থাকতে হয়। প্রথম সংস্করণের মুদ্রণকালে অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকেই আমি প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধে ঐকান্তিকতার সঙ্গে বলেছিলাম : “যে-কোনো সৃষ্টির চেয়ে একখানি পুস্তক অধিকতর রূপে একটি সাগ্রহ যৌথ সৃষ্টি।” বর্তমান প্রকাশের ক্ষেত্রেও আমার সেই একই অনুভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের প্রকাশনা কমিটির সদস্য সচিব ও জনসংযোগ অফিসার জবাব নুরল ইসলাম গ্রন্থখানি প্রকাশের আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাদি তদারক করেছেন। প্রকাশনা শাখার ভারপ্রাপ্ত সহকারী জনাব এফ্রানউদ্দীন আহমদ-এর সহযোগিতাও এক্ষেত্রে স্মরণীয়। তাঁদের নিকট এজন্য আমি বৃকজ্ঞ। বাংলা একাডেমী প্রেস পুস্তকখানি মুদ্রণের দায়িত্ব নিয়েছে। সেখানেও বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁরা মুদ্রণকার্যের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন, মহাব্যবস্থাপক থেকে প্রেসের অফিসার জনাব আফজাল হোসেন পর্যন্ত : তাঁদের সকলের সানন্দ সহযোগিতা ব্যতীত ‘প্লেটোর রিপাবলিক’-এর দ্বিতীয় সংস্করণের প্রকাশে অধিকতর বিলম্ব ঘটত। আমি তাঁদের সকলের কাছেই কৃতজ্ঞ। বর্তমান সংস্করণের প্রচ্ছদখানিও তৈরি করেছেন শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে। তিনি এজন্য আমাদের সকলের ধন্যবাদার্হ। প্রেসকর্মীরা যেমন, আমিও তেমনি প্রুফ সংশোধনের সময়ে গ্রন্থকে বানানবিভ্ৰাট থেকে যথাসম্ভব মুক্ত রাখার চেষ্টা করেছি। হয়তো গুরুতর ভুল কোথাও হয়নি। কিন্তু একেবারে যে ত্রুটিমুক্ত করা গেছে তা সত্য নয়।

কোনো গ্রন্থকে কারুর উদ্দেশে উৎসর্গ করার ব্যাপারটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপার নয়। লেখকের একটি আবেগ বা অনুভূতির কিছু উপাদানও এর সঙ্গে জড়িত থাকে। হয়তো লেখক এর মাধ্যমে তাঁর কোনো অনুভবকে প্রকাশ করতে চান।

১৯৭৪-এর মধ্যভাগে ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ যখন প্রকাশিত হয় তখন আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনে, বিশেষ করে জ্ঞানপরিচর্যার ক্ষেত্রে বিরাজমান পরিস্থিতি আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল গ্রন্থখানির উৎসর্গপত্রে নিম্নের বাক্যটির উৎকিরণে :

“১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ—
তবু যাঁরা জ্ঞানের চর্চা করেন,
এবং যুক্তিকে শ্রেয় জ্ঞান করেন
তাঁদের উদ্দেশে।”

বর্তমানে আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে বই হ্রাস পায়নি। সে কারণে বাক্যটির তাৎপর্য আজও অব্যাহত। কিন্তু বর্তমান দ্বিতীয় সংস্করণটিকে আমার উৎসর্গ করার ইচ্ছা হচ্ছে প্রথম সংস্করণের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন এবং আলোচনাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে অনুবাদককে উৎসাহিত করেছিলেন তাঁদের মধ্যকার জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, চিন্তাবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী এবং কবি ও সাহিত্যিক হাবিবুর রহমান, যে মহৎপ্রাণ ব্যক্তিরা আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশে

সরদার ফজলুল করিম
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৩০শে অক্টোবর, ১৯৮২

[১. এ্যারিস্টট্‌ল-এর পলিটিক্স গ্রন্থের সর্বশেষ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে মাওলা ব্রাদার্স থেকে ১৯৯৯ সনে।]

.

মুখবন্ধ : প্রথম সংস্করণ

ইংরেজী ভাষায় ‘রিপাবলিক’-এর একাধিক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক বেনজামিন জোয়েটের অনুবাদ ব্যতীত কর্ণফোর্ড, এইচ. ডি. পি. লী এবং রিচার্ডস-এর অনুবাদও আমাদের নিকট পরিচিত। জোয়েটের অনুবাদের ভাষা-মাধুর্য সুবিদিত। সাম্প্রতিককালে অনেক অনুবাদক প্লেটোর ভাষার মাধুর্যের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ না করে ‘রিপাবলিক’-এর বিষয়বস্তুর উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাতে মানুষের দৈনন্দিন সংলাপ যেরূপ সাধারণ ভাষায় সংঘটিত হয়, এই ভাষ্যকারগণ তাঁদের অনুবাদে সেরূপ ভাষা ব্যবহার করার প্রয়াস পেয়েছেন। এর ফলে এ সমস্ত অনুবাদে সাহিত্য-স্বাদের অভাব অনুভূত হয়। অথচ প্লেটো পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। গবেষকগণ এ ক্ষেত্রে একমত যে, প্লেটোর ভাষাশৈলী ছিল বিস্ময়কর। তাঁর বিপুল সংলাপরাজি ব্যঞ্জনার দিক থেকে গদ্যকাব্যের ঝঙ্কারময় সৃষ্টি। প্রাচীন গ্রীক ভাষার সঙ্গে আমরা অপরিচিত। কিন্তু জোয়েটের অনুবাদের ভাষার মাধুর্য আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। অবশ্য বর্তমান অনুবাদে আমি কেবল যে জোয়েটের উপর নির্ভর করেছি, এ কথা বলা যায় না। বাংলা ভাষায় প্রকাশের ক্ষেত্রে ভাষার সাবলীলতার দিকে আমি যথাসাধ্য দৃষ্টি দিয়েছি। কিন্তু জোয়েটের অনুবাদ যদি কোথাও দুর্বোধ্য বোধ হয়েছে তবে সেক্ষেত্রে কর্ণফোর্ড, লী এবং জোয়েট : সকলের ইংরেজী অনুবাদ পাঠ করে সম্ভাব্য অর্থকে আমি গ্রহণ করেছি।

‘রিপাবলিক’ অনুবাদের কাজটি অল্প সময়ের কোনো কাজ নয়। কন্তুতঃ এ কাজটি আমি প্রায় দশ বৎসর পূর্বে শুরু করি। প্লেটোর রচনার কোনো অনুবাদ বাংলাতে না থাকাতে আমাদের ভাষার ক্ষেত্রে দৈন্য হিসাবে বিবেচনা করে আমি একদিন প্লেটের কিছু কিছু রচনা ইংরেজী থেকে বাংলাতে পেশ করার কাজ শুরু করি। এর ফলশ্রুতি হিসাবে ‘সক্রেটিসের জবানবন্দী’ ‘ক্রিটো’ ‘ফিডো’, ‘চারমিডিস’, ‘লীসিস’ এবং ‘ল্যাচেস’–এই ছ’টি সংলাপের সংকলন হিসাবে আমার ‘প্লেটোর সংলাপ’ গ্রন্থখানি ১৯৬৫ সনে বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত হয়। অনুবাদখানি সাহিত্যানুরাগী এবং পাঠক সাধারণের নিকট থেকে বিশেষ সমাদর এবং প্রশংসা লাভ করে। ১৯৭৩ সনে এর একটি দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত অনুবাদ ব্যতীত ডঃ কাজী মোতাহার হোসেন সাহেব প্লেটোর ‘সিম্পোজিয়াম’ সংলাপখানি বাংলায় অনুবাদ করেছেন। ‘সিম্পাজিয়াম’ নামে তাঁর সে অনুবাদও বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ‘রিপাবলিক’ অনুবাদের কাজ দীর্ঘকাল পূর্বে শুরু করলেও ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রতিকূল অবস্থা এবং বিপর্যয়ের কারণে ধারাবাহিকভাবে এবং দ্রুততার সঙ্গে এর অনুবাদের কাজ চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে অনুবাদে বিরাম ঘটেছে। কিন্তু ‘রিপাবলিক’-এর প্রথম পুস্তকখানি কয়েক বছর পূর্বে, অধুনালুপ্ত ‘পরিক্রম’ পত্রিকাতে প্রকাশিত হলে সাহিত্যানুরাগী এবং ছাত্রসমাজের তরুণ বন্ধুদের নিকট থেকে অনুবাদটি সম্পূর্ণ করার তাগিদ আসে। সে অনুরোধে উৎসাহিত হয়ে আমি কাজটি নিয়ে আবার অগ্রসর হই। ইতিমধ্যে ১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসে বাংলা একাডেমী থেকে অধ্যাপক সৈয়দ মকসুদ আলী সাহেব অনূদিত ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ প্রকাশিত হয়।

চিরায়ত সাহিত্যভাণ্ডারের যে-কোনো সম্পদের অনুবাদ, প্রকাশ ও পরিবেশন যতো অধিক হাতে ঘটে ততো সেই সম্পদের উপলব্ধিতে যে সাহায্য হয় তাই নয়, তাতে আমাদের নিজেদের ভাষা এবং সাহিত্যেরও যে সমৃদ্ধি ঘটে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

‘রিপাবলিক’-এর বর্তমান অনুবাদ জোয়েট, কর্ণফোর্ড এবং এইচ. ডি. পি. লী’র ইংরেজী অনুবাদের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ। ‘রিপাবলিক’কে সাহিত্যানুরাগী এবং আগ্রহী ছাত্র-সাধারণের নিকট সহজবোধ্য এবং অনুধাবনযোগ্য করার জন্য অধ্যায়ক্রম, টীকা, ব্যাখ্যা এবং আলোচনার যে চেষ্টা বর্তমান পুস্তকে করা হয়েছে তার উল্লেখ ভূমিকাতে আছে। গ্রন্থমধ্যে আলোচিত বিষয়সমূহকে সহজে নির্দিষ্ট করার জন পুস্তক শেষে একটি নির্ঘণ্টও সংযোজিত হয়েছে। এরূপ পূর্ণাঙ্গ এবং ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ বাংলা ভাষাতে নেই বলেই এ জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও পরিশ্রম সত্ত্বেও কাজটি সম্পন্ন করার তাগিদ আমি অনুভব করেছি।

বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ হিসাবে ‘রিপাবলিক’ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সাহিত্য এবং সমাজতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য পুস্তক। আমাদের শিক্ষার মাধ্যম দ্রুত বাংলায় রূপান্তরিত হচ্ছে। বৈদেশিক কোনো ভাষা কোনো দেশেরই শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে চিরকাল বজায় থাকতে পারে না। ইংরেজীর শিক্ষণ এবং চর্চা অধিকতর সুনির্দিষ্ট, লক্ষ্যসম্পন্ন, উন্নত এবং সুসংগঠিত হবে—এটাই আমরা আশা করি। কিন্তু বাংলা মাধ্যমের ঔচিত্যের কারণেই যে ‘রিপাবলিক’-এর মতো পুস্তকের বাংলা অনুবাদ আবশ্যক, তা নয়। বাস্তব কারণে আমাদের দেশে শিক্ষার মান যেমন বিনষ্ট হয়েছে, তেমনি ইংরেজী শিক্ষার মানের অধিকতর অবনয়ন ঘটেছে। ফলে, আমাদের কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ডিগ্রী এবং ডিগ্রী-উত্তর পর্যায়ের ছাত্র-সাধারণের ইংরেজী পুস্তকসমূহ অনুধাবনের ক্ষমতা খুবই কম। শিক্ষার মান উন্নত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে মাতৃভাষায় জ্ঞানের ভাণ্ডারকে দ্রুত সমৃদ্ধ করে তোলা। ‘রিপাবলিক’-এর ন্যায় গন্থের বিষয়বস্তুর সঙ্গে আমাদের ছাত্র সমাজের পরিচয় শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু সে কাজ এ সমস্ত পুস্তকের উন্নতমানের অনুবাদের মাধ্যমেই মাত্র সম্ভব। বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এবং সাহিত্যানুরাগী পাঠকদের মনে বর্তমান অনুবাদ যদি প্লেটো এবং ‘রিপাবলিক’ সম্পর্কে কিছুটা আগ্রহ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়, তাহলে আমি আমার পরিশ্রমকে সার্থক বিবেচনা করব।

যাঁদের আগ্রহ এবং অনুরোধ আমাকে এই কাজে উৎসাহিত করেছে তাঁদের মধ্যে শ্রদ্ধাস্পদ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সাহেবের অকৃপণ উৎসাহদান আমার মনে সর্বদা জাগরিত থাকবে। বর্তমান পাণ্ডুলিপিখানা যখন আমি সঙ্কোচের সঙ্গে তাঁকে দেখাই, তখন তিনি এর যথাশীঘ্র প্রকাশের জন্য তাঁর আন্তরিক ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং এ ব্যাপারে যথাসাধ্য সাহায্য করার কথা তিনি বলেন। ছাত্র-সাধারণের জন্য বাংলাতে এরূপ পুস্তকের অনুবাদ এবং বাংলা ভাষায় বিভিন্ন বিষয়ে উন্নতমানের পুস্তক রচনাকে তিনি যে আন্তরিকভাবে কতো জরুরী বিবেচনা করেন তা তাঁর ঘনিষ্ঠ ছাত্র-শিক্ষক মাত্রই জ্ঞাত আছেন। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদেরও আমার আন্তরিক সস্নেহ কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁদের সঙ্গে দর্শন এবং রাষ্ট্রতত্ত্বের আলোচনা প্রসঙ্গে বর্তমান পাণ্ডুলিপির প্রেস কপি ব্যবহার করতে দেখে তাঁরা এ পুস্তকের দ্রুত প্রকাশের জন্য আগ্রহ প্রদর্শন করেছেন।

বাংলাদেশে কাগজ এবং মুদ্রণ শিল্পে যে অবিশ্বাস্য সংকট বিরাজমান তাতে এরূপ পুস্তক মুদ্রণ ও প্রকাশের কথা আজকাল একেবারেই অচিন্তনীয়। উনসত্তর-সত্তর সালের তুলনায় মুদ্রণ খরচের বহুগুণ বৃদ্ধি ব্যতীত মুদ্রণের কাগজ কেবল যে দুর্মূল্য তাই নয়, সে কাগজ এখন দুষ্প্রাপ্য। এরূপ অবস্থায় ‘বর্ণমিছিলের’ প্রকাশক-বন্ধু তাজুল ইসলাম সাহেব কোনো ব্যবসায়-লাভের কারণে নয়, শিক্ষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগের কারণেই প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ মুদ্রণ এবং প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর এই আগ্রহ ব্যতীত এ গ্রন্থ প্রকাশ হয়তো সম্ভব হত না। বস্তুতঃ, কোনো পুস্তকই কারো একার সৃষ্টি নয়। না লেখকের কিংবা অনুবাদকের। এ সত্যের প্রত্যয় বর্তমান গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে আমার অধিকতর দৃঢ় হয়েছে। অপর যে-কোনো সৃষ্টির চেয়ে একখানি পুস্তক অধিকতর রূপে একটি সাগ্রহ-যৌথ সৃষ্টি। ‘রিপাবলিক’-এর বর্তমান প্রকাশও একটি যৌথ সৃষ্টি। এতে আমার চেয়ে ‘বর্ণমিছিলের’ মালিক, তাঁর প্রেসের ম্যানেজার, কম্পোজিটারবৃন্দ, মেশিনম্যান, গ্রুফ সংশোধক এবং বার্তাবাহক কর্মীদের ইচ্ছা এবং পরিশ্রমের যোগান কম ঘটেনি। তাঁদের সকলের নিকটই আমি কৃতজ্ঞ। প্রখ্যাত শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী সাহেবের নিকটও বর্তমান পুস্তকের প্রচ্ছদের জন্য আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। শিল্পী, বিশেষ করে কাইয়ূম সাহেব কেবল যে একখানি পুস্তকের একটি উজ্জ্বল প্রচ্ছদ তৈরী করে পুস্তকের বহিঃসৌকর্য বৃদ্ধি করেন, তাই নয়; তিনি তাঁর অক্ষর, বর্ণ এবং পারিপাট্যের কল্পনার মাধ্যমে পুস্তকের অন্তর্নিহিত ভাবটি পাঠকের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস পান। এটি তাঁর বৈশিষ্ট্য।

মুদ্রণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই পুস্তকটিকে ত্রুটিশূন্য, বিশেষ করে বাংলা বানানের বিভ্রাট থেকে রক্ষা করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এটি খুব দুরূহ কাজ। তাঁদের সকলের চেষ্টা সত্ত্বেও হয়তো ভুল-ত্রুটি কিছু কিছু রয়ে গেছে। অনুবাদের চতুর্থ পৃষ্ঠার একটি ভুলের কথা এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক। আমার মনোযোগের অভাবে উক্ত পৃষ্ঠায় একটি ভুল রয়ে গেছে। ‘রিপাবলিক’ প্রসঙ্গে ‘দৃশ্য’ শিরোনামের নিম্নে মুদ্রিত পরিচয়টির শেষ বাক্য দু’টির সংশোধিত পাঠ হবে : ‘টিমিউস, হারমোক্রাটিস, ক্রিটিয়াস এবং অপর এক ব্যক্তি যার নাম জানা যায়নি—এদের নিকট সক্রেটিস আজ সমগ্ৰ কাহিনীটির বর্ণনা দিচ্ছেন।’ এছাড়া কোনো মারাত্মক ভুল গ্রন্থের মধ্যে যে নেই, এটি আনন্দের কথা। তথাপি অনুবাদের ক্ষেত্রে কিংবা অপর কোথাও গুরুতর কোনো ভুল দৃষ্টিতে এলে তা বর্তমান অনুবাদকের গোচরে আনার জন্য সহৃদয় পাঠকদের অনুরোধ জানাচ্ছি।

সরদার ফজলুল করিম
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২৫শে আগস্ট, ১৯৭৪

Book Content

ভূমিকা ও রিপাবলিকের প্রধান আলোচ্য বিষয়
প্রথম পুস্তক
১. ন্যায়ের সংজ্ঞা : আলোচনার সূত্রপাত
২. পলিমারকাস : ন্যায় হচ্ছে বন্ধুর প্রতি বন্ধুত্ব, শত্রুর প্রতি শত্রুতা
৩. থ্র্যাসিমেকাস : ন্যায় হচ্ছে শক্তিমানের স্বার্থ
৪. থ্র্যাসিমেকাস : অন্যায় ন্যায়ের চেয়ে অধিক লাভজনক
দ্বিতীয় পুস্তক
৫. ন্যায়ের সংজ্ঞা এখনও স্থির হয়নি
৬. রাষ্ট্র সংগঠনের উপাদান
৭. সমৃদ্ধ রাষ্ট্র
৮. অভিভাবকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
তৃতীয় পুস্তক
৯. অভিভাবকদের শিক্ষা
১০. শাসক বাছাই : তিন শ্রেণীর পারস্পরিক সম্পর্ক
চতুর্থ পুস্তক
১১. ন্যায় আবিষ্কৃত হয়েছে : রাষ্ট্রে ন্যায়ের অবস্থান : ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ
পঞ্চম পুস্তক
১২. মেয়ে এবং পুরুষের সমতা
১৩. যৌথ পরিবার ও বিবাহ
১৪. আদর্শ এবং বাস্তবের প্রশ্ন
১৫. দার্শনিক শাসক : দার্শনিকের সংজ্ঞা
ষষ্ঠ পুস্তক
১৬. দর্শনের দুর্নামের কারণ
১৭. ‘দার্শনিক শাসক’ কেবল কল্পনা নয়
১৮. দার্শনিক-শাসকের শিক্ষা
সপ্তম পুস্তক
১৯. জ্ঞানের চারটি স্তর
অষ্টম পুস্তক
২০. আদর্শ রাষ্ট্রের পতন
২১. কতিপয়তন্ত্র এবং কতিপয়তন্ত্রী চরিত্র
২২. গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্রী চরিত্র
২৩. স্বৈরতন্ত্র এবং স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্র
নবম পুস্তক
২৪. কে সুখী? ন্যায়বান, না অন্যায়কারী?
দশম পুস্তক
২৫. দর্শন এবং কাব্যের বিরোধ
আমি সরদার বলছি - সরদার ফজলুল করিম

আমি সরদার বলছি – সরদার ফজলুল করিম

প্লেটোর সংলাপ - সরদার ফজলুল করিম

প্লেটোর সংলাপ – সরদার ফজলুল করিম

এ্যারিস্টটল-এর ‘পলিটিকস’ - সরদার ফজলুল করিম

এ্যারিস্টটল-এর ‘পলিটিকস’ – সরদার ফজলুল করিম

আমি রুশো বলছি : দি কনফেশানস - সরদার ফজলুল করিম

আমি রুশো বলছি : দি কনফেশানস – সরদার ফজলুল করিম

Reader Interactions

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.