প্রথম পুস্তক
দ্বিতীয় পুস্তক
তৃতীয় পুস্তক
চতুর্থ পুস্তক
পঞ্চম পুস্তক
ষষ্ঠ পুস্তক
সপ্তম পুস্তক
অষ্টম পুস্তক
নবম পুস্তক
দশম পুস্তক

২. পলিমারকাস : ন্যায় হচ্ছে বন্ধুর প্রতি বন্ধুত্ব, শত্রুর প্রতি শত্রুতা

অধ্যায় : ২

[৩৩২–৩৩৮]
পলিমারকাস : ন্যায় হচ্ছে বন্ধুর প্রতি বন্ধুত্ব, শত্রুর প্রতি শত্রুতা

ন্যায়ের একটা সংজ্ঞা পাওয়া গেছে বটে। কিন্তু সেটিই কি চরম যুক্তির কষ্টিপাথরে তাকে তো টিকতে হবে। সত্যকথন এবং অন্যের দায়শোধ মহৎ গুণ বটে। এরূপ মহৎ গুণ তো মানুষের আরও আছে। কিন্তু সব মহৎ গুণের আন্তরিক সেই গুণটি কী, যে-গুণের কারণে এই গুণকে আমরা উত্তম গুণ বলে বিবেচনা করি? তা ছাড়া সক্রেটিস, সিফালাসের দায়শোধের গুণটিকে বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছেন যে, অবস্থানির্বিশেষে দায়শোধ বা ঋণশোধকে মহৎ গুণ বলা চলে না। উন্মাদ ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য অস্ত্র প্রত্যর্পণকে কি মহৎকার্য বলা চলে? অর্থাৎ কোনো গুণের বিচারে প্রেক্ষিতের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। পটভূমি পরিবর্তিত হয়ে একটি মহৎ গুণকে অ-মহৎ গুণে পর্যবসিত করতে পারে। কিন্তু ন্যায় হবে এমন গুণ যে অবস্থানির্বিশেষে মহৎ বলে বিবেচিত।

সক্রেটিসের এই সমালোচনার জবাবে পলিমারকাস প্রখ্যাত কোনো কবির উল্লেখ করে ন্যায়ের একটি নূতন সংজ্ঞা তৈরি করার চেষ্টা করলেন। পলিমারকাস বললেন : ন্যায় হচ্ছে বন্ধুর প্রতি বন্ধুত্ব প্রদর্শন এবং শত্রুর প্রতি শত্রুতা। অর্থাৎ যার যা প্রাপ্য তাকে তা-ই দেয়াই হচ্ছে ন্যায়। এক্ষেত্রে একটি কথা উল্লেখযোগ্য। প্রাচীন গ্রীসে পবিত্র এবং অলংঘনীয় কোনো ধর্মগ্রন্থ ছিল না। লোকে কবিদেরই ঐশ্বরিক জ্ঞানের আধার বলে মনে করত। তাই কোনো সমস্যায় কবিদের বাণীর বরাত দেওয়া সাধারণ রীতি ছিল। কিন্তু সক্রেটিস বিনা প্রশ্নে কবিদের বাণী স্বীকার করতে চাননি। বরঞ্চ সক্রেটিস প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, কবিদের অনেক বাণী যুক্তির বিচারে টেকে না। এবং যারা যুক্তির বিচারে টিকতে পারে আমরা কেবল সেই বাণীকেই গ্রহণ করতে পারি। কাজেই কবির বরাতে আমরা যদি বলি ‘যার যা প্রাপ্য, তাকে তা-ই দেয়াই ন্যায়’ তা হলে তাকেও যুক্তির বিচারে টিকতে হবে। এই উদ্দেশ্য নিয়ে সক্রেটিস এই সংজ্ঞাটির অন্তর্নিহিত অসঙ্গতি বিশ্লেষণ করে তার অসারতা প্রমাণের চেষ্টা করেন। এই প্রসঙ্গে সক্রেটিস বিভিন্ন কার্যের দক্ষতার প্রশ্নটি উত্থাপন করেন। মানুষের কর্ম বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত। এদের আমরা মানুষের গুণ, শিল্প, কলা বলে আখ্যায়িত করি। যেমন, চিকিৎসা বা নিরাময়-শিল্প, নৌচালনার শিল্প, পাদুকা তৈরির শিল্প। প্লেটোর মতে মানুষের জীবন যেসব কর্ম-শিল্পে বিভক্ত সেসব শিল্পে দক্ষতা-অর্জন মানুষের একটি স্বভাবগত এবং নীতিগত কর্তব্য। এই দক্ষতা-অর্জনকে প্লেটো অনেক সময়ে ন্যায় বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ এই দক্ষতা-অর্জন নির্ভর করে ব্যক্তির পক্ষে তার নির্দিষ্ট কর্মের লক্ষ্য অনুধাবনের ওপর। মানুষের প্রতিটি কর্মই হচ্ছে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাজ, উদ্দেশ্যসাধনমূলক কাজ। যে জুতা তৈরির শিল্পী তার এই শিল্পে দক্ষতা-অর্জন নির্ভর করে তার কর্মের উদ্দেশ্য কী, অর্থাৎ পরিণামে কর্মটি কী রূপ লাভ করবে, এর পূর্ণতম রূপটি কী হবে সে-সম্পর্কে শিল্পীর ধারণা থাকার উপর। যে-শিল্পীর তার শিল্পের পূর্ণতম রূপ সম্পর্কে যত সম্যক জ্ঞান, তত সে তার শিল্পে পূর্ণতর শিল্পী। নৌচালনার শিল্পের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। এদিক থেকে জীবনধারণটাও একটা শিল্প। এবং ব্যক্তির উত্তম জীবনধারণও জীবনধারণের পরিণতি বা জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞানের উপর নির্ভর করে। রাষ্ট্র-পরিচালনাও একটি শিল্প। এ-শিল্পে দক্ষতা নির্ভর করে এর মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ রাষ্ট্রের পূর্ণতম বিকাশ কিংবা সর্বোত্তম রাষ্ট্র সম্পর্কে জ্ঞানের উপর। প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষতা-অর্জনের আবশ্যকতা এবং দক্ষতা-অর্জন যে উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল, এই তত্ত্ব প্লেটো-দর্শনের অন্যতম মূল তত্ত্ব। রিপাবলিকের মধ্যে এই তত্ত্বটিই ন্যায় এবং উত্তম রাষ্ট্রের কল্পনার মূল নিয়ামক। এই তত্ত্বের দুটি তাৎপর্য : ১. উদ্দেশ্য কিংবা আদর্শের একটা অস্তিত্ব আছে। না হলে সে আমাদের জীবনের এবং জীবনের সকল ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় কার্যের নিয়ামক হতে পারত না। ২. উদ্দেশ্য বা আদর্শকে জানার চেষ্টা করতে হবে। উদ্দেশ্যকে জানা যায়। জানা না গেলে তাকে জানার চেষ্টা নিরর্থক হত। এবং তাকে জানার উপরই মানুষের কর্মের উৎকর্ষ নির্ভর করে। রাষ্ট্র- পরিচালনার ক্ষেত্রে রিপাবলিকের মূল প্রতিপাদ্য : রাষ্ট্র-পরিচালনা- রূপ শিল্পে · যাদের সর্বোত্তম দক্ষতা থাকবে তারাই রাষ্ট্রের শাসক হবে। উপরোক্ত দর্শনের ভিত্তিতেই প্লেটো আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা তৈরি করেছেন।

* * *

পলিমারকাসের প্রস্তাবিত সংজ্ঞার অসঙ্গতি বিশ্লেষণশেষে সক্রেটিস বললেন : “তা হলে পলিমারকাস, আগের কথাটি আর থাকে না। এরূপ বলার আর অর্থ থাকে না যে, ন্যায় বা ধর্মের অর্থ হচ্ছে অপরের দেয়কে শোধ করা এবং দেয় বা ঋণ বলতে বুঝাবে বন্ধুর প্রতি বন্ধুত্ব আর শত্রুর প্রতি শত্ৰুতা।’

“পলিমারকাস বললেন : সক্রেটিস তোমার সঙ্গে আমি একমত।”

.

যুক্তির উত্তর-পুরুষ। এবার তা হলে তুমি আমায় বলো, তোমার সিমোনাইডিস ধর্ম কিংবা ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে সত্যকারভাবে কী বলেছেন?

পলিমারকাস বললেন : সিমোনাইডিসের মতে দায়শোধই হচ্ছে যথার্থ ধর্ম কিংবা ন্যায়পরায়ণতা। আর তাঁর এ-মতকে আমার যথার্থ বলেই বোধ হয়।

: যুক্তির ক্ষেত্রে তোমার এরূপ সিদ্ধপুরুষের কথাকে সন্দেহ করতে আমার অবশ্যই ভয় হয়। কিন্তু আসল কথা কী জান পলিমারকাস, তোমার এই জ্ঞানী পুরুষের কথা তোমার নিকট খুব স্বচ্ছ বোধ হলেও আমার নিকট ঠিক তার উলটাটিই বোধ হচ্ছে। কারণ, তিনি নিশ্চয়ই একথা বলবেন না যে, দায়শোধ ধর্ম বলে একজন উন্মাদকে তার পূর্বপ্রদত্ত মারণাস্ত্র আমি ফিরিয়ে দেব। অথচ আজ যে উন্মাদ কাল সে এই দ্রব্য আমার নিকট গচ্ছিত রেখেছিল। তার গচ্ছিত দ্রব্য অবশ্যই আমার দায়। তার নিকট তার এ-ঋণে আমি ঋণী, একথাও আমি অস্বীকার করতে পারিনে।

হ্যাঁ, একথা তোমার সত্য, সক্রেটিস।

তা হলে উন্মাদ তার দত্ত দ্রব্যকে ফেরত চাইলে আমি তা ফিরিয়ে দেব না?

না, কোনোক্রমেই তা তুমি ফিরিয়ে দিতে পার না।

তা হলে ‘ঋণশোধেই ধর্ম’ বলতে সিমোনাইডিস নিশ্চয়ই উন্মাদের এরূপ ঋণশোধকে বোঝাতে চাননি। ঠিক নয় কি?

না, তা তিনি চাননি। কেননা, সিমোনাইডিস একথাও বলেছেন যে, যে বন্ধু সে তার বন্ধুর মঙ্গল সর্বদাই কামনা করবে, অমঙ্গল নয়।

অর্থাৎ, দু’জনে যদি আমরা পরস্পরের সুহৃদ হই আর তোমার গচ্ছিত স্বর্ণের প্রত্যর্পণে যদি তোমার কোনো ক্ষতি কিংবা অমঙ্গল ঘটে তা হলে সে-স্বর্ণের প্রত্যর্পণ আমার পক্ষে ঋণশোধের কার্য হবে না। তোমার সিমোনাইডিসের কথার তো এরূপই অর্থ করবে তুমি। ঠিক নয় কি পলিমারকাস?

হ্যাঁ, তোমার একথা ঠিক সক্রেটিস। তাঁর কথার এরূপ অর্থ

বেশ। কিন্তু যে আমার সুহৃদ নয়, যাকে আমি আমার শত্রু মনে করি তার গচ্ছিত ধনের প্রত্যর্পণ কি আমার পক্ষে সঙ্গত হবে?

নিশ্চয়ই। আমার তো মনে হয়, আমার নিকট শত্রুর যা প্রাপ্য অর্থাৎ তার ক্ষতি কিংবা অমঙ্গল, তাকে তা ফিরিয়ে দেওয়াতে অসঙ্গতির কিছু নেই।

তা হলে সিমোনাইডিসের কথাকে কবিদের বাণীর অনুরূপই ধরতে হয়। তাঁদের মতো সিমোনাইডিসও ধর্ম সম্পর্কে নেতিবাচক অভিমতই পোষণ করেন। কেননা, তাঁর কথার আসল অর্থ হচ্ছে এই যে, যার যা প্রাপ্য তাকে তা ফিরিয়ে দেওয়াই হচ্ছে ধর্ম। ধর্ম তাঁর কাছে যথার্থই একটা ঋণ-পরিশোধের ব্যাপার।

আমারও তা-ই মনে হয়।

তা-ই যদি সত্য হয়, তা হলে ব্যাপারটা কিন্তু একটু সাংঘাতিকই হয়ে দাঁড়াবে, পলিমারকাস। কেননা, তেমন ক্ষেত্রে যদি আমরা সিমোনাইডিসকে জিজ্ঞেস করি, ঔষধের কিংবা বলা যাক চিকিৎসকের দেয় কার প্রতি কী, তা হলে সে-প্রশ্নের জবাবে তিনি কী বলবেন?

তেমন প্রশ্নের জবাবে তিনি নিশ্চয়ই বলবেন যে, দেহের প্রতি ঔষধের দেয় হচ্ছে নিরাময়ের উপকরণ, খাদ্য, পানীয় আর শক্তি।

উত্তম কথা। তা হলে রন্ধনশাস্ত্রের দেয় কি রইল?

রন্ধনশাস্ত্রের দেয় হচ্ছে, খাদ্যবস্তুকে গ্রহণযোগ্য করে দেওয়া।

তা হলে ধর্মের দেয় কার প্রতি কী?

সক্রেটিস, পূর্বের উপমাগুলোর তাৎপর্যকে মেনে নিলে এখানেও আমাদের বলতে হয় যে, ধর্ম বলতে আমরা সুহৃদের প্রতি সৎ এবং শত্রুর প্রতি অসৎ দানকে বুঝব।

তা হলে এটাই সিমোনাইডিসের কথার তাৎপর্য?

আমার তো তা-ই মনে হয়।

বেশ। কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় কাকে তুমি বন্ধুর প্রতি বন্ধুত্ব এবং শত্রুর প্রতি শত্রুতা-প্রদর্শনে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি বলে মনে করবে?

তেমন অবস্থাতে চিকিৎসকই একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি।

অসুস্থ অবস্থা ব্যতীত, ধরো আমরা সমুদ্রযাত্রায় একটা বিপদের মুখে পড়েছি, তখন কে সে উত্তম ব্যক্তি?

সে অবশ্যই আমাদের সমুদ্রযানের কর্ণধার এবং পরিচালক।

তুমি বলেছ, যে ন্যায়পরায়ণ সে শত্রুর প্রতি যেমন শত্রুতাসাধনে, তেমনি বন্ধুর প্রতি বন্ধুত্বসাধনে সক্ষম। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, কোন্ ক্ষেত্রে সে তার এই ক্ষমতার প্রয়োগ করবে এবং এরূপ ক্ষমতা প্রয়োগে কোন্ উদ্দেশ্যসাধনে সে সচেষ্ট হবে?

সক্রেটিস, এ-প্রশ্নের জবাব তো সহজ। যে ন্যায়পরায়ণ সে শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে আর বন্ধুর সঙ্গে সখ্যেই তার এই ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।

উত্তম কথা, প্রিয় পলিমারকাস। কিন্তু আমার সুস্থ অবস্থায় নিশ্চয় আমার কোনো চিকিৎসকের আবশ্যক হবে না। তাই নয় কি?

না, সুস্থ অবস্থায় আমাদের কোনো চিকিৎসকের আবশ্যক হয় না। তেমনি, যে সমুদ্রে যাত্রা করেনি তারও নিশ্চয় কর্ণধারের কোনো প্ৰয়োজন পড়ে না?

না, তারও কর্ণধারের কোনো প্রয়োজন নেই।

তা হলে শান্তির সময়ে তোমার ন্যায়পরায়ণতা বা ধর্মের কোনো ভূমিকা রয়েছে, একথা আমরা বলতে পারিনে?

না সক্রেটিস, এমন কথা আমি বলতে পারিনে।

তা হলে তুমি বলতে চাও, কেবলমাত্র যুদ্ধের সময়ে নয়, শান্তির সময়েও ধর্মের করণীয় কিছু রয়েছে?

অবশ্যই।

শান্তির সময়ে ধর্ম কি ক্ষেতের শস্য গোলায় তুলবে?

উপমাটা অসম্ভব নয়।

অথবা এও বলতে পার, পাদুকা তৈরি করার ন্যায়, ধর্ম শান্তির সময়েও কিছু তৈরি করতে থাকবে?

তাও বলতে পার।

তা হলে এবার আমাদের বলা উচিত ধর্ম নির্দিষ্টভাবে কী কার্য সাধন করবে?

নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে বলা যায়, চুক্তির ক্ষেত্রে ধর্মের অবশ্যই একটি ভূমিকা আছে, সক্রেটিস।

চুক্তি বলতে তুমি অংশীদারদের মধ্যে লেনদেনের চুক্তি বোঝাতে চাইছ? হ্যাঁ, আমি ঠিক এরূপ চুক্তির কথাই বলছি।

আচ্ছা ধরো, সতরঞ্চ খেলার অংশীদারদের লেনদেনের বিষয়টি। এরূপ ক্ষেত্রে কাকে তুমি অধিকতর উপযুক্ত বলে বিবেচনা করবে? একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে, না একজন কৌশলী খেলোয়াড়কে?

কৌশলী খেলোয়াড়ই এখানে অধিকতর উপযুক্ত ব্যক্তি।

শুধু তা-ই নয়। কারিগরির ব্যাপারটিকেও ধরা যাক। একটি গৃহ-তৈরির বেলায়, তার ইট-পাথর ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে কি তুমি গৃহ-তৈরির কারিগরের চেয়ে অধিকতর উপযুক্ত অংশীদার বলে বিবেচনা করবে?

না, বরঞ্চ আমি তার বিপরীত ব্যক্তি অর্থাৎ কারিগরকেই উপযুক্ত মনে করব।

বীণাবাদনের ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই দক্ষ বাদকের চেয়ে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি অধিকতর উপযুক্ত নয়। তা হলে অংশীদারিত্বের এমন কোন্ ক্ষেত্র আছে, যেখানে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিই অধিকতর উপযুক্ত?

আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতার ভূমিকা রয়েছে বলে আমি মনে করি।

পলিমারকাস, তোমার কথা আমি স্বীকার করলাম। কিন্তু অর্থের ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার ভূমিকাকে নিশ্চয়ই তুমি খুব উপযুক্ত বিবেচনা করবে না; কেননা অর্থ দিয়ে অশ্ব-ক্রয়ের ক্ষেত্রে অশ্ব-বিশেষজ্ঞের চেয়ে অবশ্যই তুমি ন্যায়পরায়ণের পরামর্শকে অধিকতর উপযুক্ত বলে বিবেচনা করতে পারবে না?

তা অবশ্য সত্য।

কিংবা ধরো তুমি একটি জাহাজ ক্রয় করতে চাইলে। সেখানেও কি এসব যানের বিষয়ে জাহাজ-নির্মাতা কিংবা এসব যানের যারা পরিচালক তাদের চেয়ে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি খুব কাজের হবে?

না।

তা হলে স্বর্ণ-রৌপ্যের আর্থিক অংশীদারিত্বে বা লেনদেনে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির ভূমিকা আমরা কোথায় পাই?

কেন? অন্তত কোনো সম্পদকে নিরাপদে গচ্ছিত রাখার ক্ষেত্রে তার প্রয়োজনীয়তা আমরা বোধ করি।

তুমি বলতে চাচ্ছ যে, টাকাপয়সা ব্যবহার না করে আমরা যখন কেবল জমাতে থাকি তখনই ন্যায়পরায়ণের প্রয়োজন পড়ে?

হ্যাঁ, আমি ঠিক সেকথাই বলতে চাচ্ছি।

তার অর্থ টাকা যখন অনাবশ্যক, ন্যায়পরায়ণতা তখনই আবশ্যক?

হ্যাঁ, সেরূপ সিদ্ধান্তই আমাদের গ্রহণ করতে হয়।

অর্থাৎ তুমি যখন তোমার কাটছাঁটের কাঁচিখানাকে শিকায় তুলে রাখতে চাইবে, তখনই মাত্র ন্যায়পরায়ণতা ব্যক্তির এবং রাষ্ট্রের খেদমতে আসতে সক্ষম হবে; কিন্তু কাঁচিখানার বাস্তব প্রয়োগ যখন তুমি শুরু করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার বদলে দ্রাক্ষাকুঞ্জের দক্ষ মালীরই দরকার পড়বে?

হ্যাঁ, তা তো বটেই।

ঠিক তেমনিভাবে একখানি বর্ম কিংবা বীণাকে যখন তুমি তোমার গৃহে অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রাখবে তখন ন্যায়পরায়ণতা তোমাকে সাহায্য করতে সক্ষম হবে; কিন্তু যখন তুমি এদের ব্যবহার করার প্রয়াস পাবে তখন তোমাকে একজন সৈনিক এবং একজন সঙ্গীতজ্ঞেরই শরণাপন্ন হতে হবে।

হ্যাঁ, একথাও ঠিক।

তা হলে সবক্ষেত্রেই ব্যাপারটি এইরূপ। অর্থাৎ, কোনো একটি বস্তু যখন অনাবশ্যক তখনই ন্যায়পরায়ণতার আবশ্যক, আর বস্তুটি যখন আবশ্যক, ন্যায়পরায়ণতা তখন আমাদের নিকট অনাবশ্যক।

এই সিদ্ধান্তই আমাদের গ্রহণ করতে হয়।

আবার দ্যাখো, একটি রোগের নিরাময়ের কিংবা প্রতিরোধের কৌশল যে জানে সে অবশ্যই সে-রোগটি তৈরি করার উপায়টিও জানে।

একথা সত্য।

সমরক্ষেত্রেও আমরা তাকেই উত্তম শিবিররক্ষক বলে বিবেচনা করব যে সঙ্গোপনে তার প্রতিপক্ষের শিবিরকেও অতিক্রম করে অগ্রসর হয়ে যেতে সক্ষম হবে।

হ্যাঁ, অবশ্যই।

অর্থাৎ উত্তম লশকর উত্তম তস্কর? অথবা বলতে পার উত্তম রক্ষকই উত্তম ভক্ষক?

আমার তো মনে হয়, এরূপ সিদ্ধান্তই আমাদের গ্রহণ করতে হচ্ছে।

তা হলে তো আমাদের বলতে হয়, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি যদি অর্থের রক্ষক হিসাবে উত্তম বলে বিবেচিত হয় তা হলে সে অর্থের উত্তম অপহরণকারী বলেও বিবেচিত হবে?

আমাদের যুক্তির তাৎপর্য তা-ই।

তা হলে দেখা যাচ্ছে, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত একজন তস্করে পরিণত হয়ে গেল! এ-শিক্ষা নিশ্চয়ই তুমি হোমারের কাছ থেকে পেয়েছ, পলিমারকাস! হোমার ঠিক এমনি করে তাঁর প্রিয়পাত্র অডিসাসের মাতামহ অটোলাইকাস সম্পর্কে প্রশংসা করতে যেয়ে বলেছেন : “অপহরণে আর মিথ্যাভাষণে তাঁর মতো উত্তম ব্যক্তির আর জুড়ি ছিল না।” কাজেই এবার আমি দেখতে পাচ্ছি, তুমি, হোমার এবং সিমোনাইডিস তিনজনই এ-বিষয়ে একমত যে, ন্যায়পরায়ণতা হচ্ছে আসলে একটি চৌর্য-কৌশল কিংবা কলা-বিশেষ। অবশ্য আমি এখানেই ইতি দিচ্ছিনে। এ চৌর্যকলার সাধনা অবশ্যই ‘বন্ধুর ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের জন্য আর শত্রুর ক্ষেত্রে শত্রুতার জন্য’। পলিমারকাস, একথাই তো তুমি বলেছিলে। নয় কি?

না, সক্রেটিস, নিশ্চয়ই এরূপ কথা আমি বলিনি। অবশ্য সঠিকভাবে আমি কী বলেছি তা আমি স্মরণ করতে পারছিনে। কিন্তু একথা সত্য, তোমার শেষের কথাগুলোকে আমি এখনও স্বীকার করি।

অতি উত্তম, পলিমারকাস! তা হলে অপর একটি প্রশ্ন তোলা যাক : বন্ধু এবং শত্রু বলতে কাদের তুমি বোঝাতে চাও? যারা প্রকৃতভাবেই বন্ধু কিংবা শত্রু তাদের, কিংবা যাদের বন্ধু কিংবা শত্রু বলে মনে হলেও যারা বন্ধু কিংবা শত্রু নয় তাদের?

নিশ্চয়ই। আমরা যাকে ভালো মনে করি তাকে ভালোবাসা এবং যাকে খারাপ মনে করি তাকে ঘৃণা করাই তো আমাদের পক্ষে স্বাভাবিক

সে তো বটেই! কিন্তু ভালোমন্দ সম্পর্কে কি আমরা অনেক সময়ে ভুল করিনে? কেননা, এমন অনেক মানুষ আছে যারা প্রকৃতপক্ষে ভালো নয়; কিন্তু তাদের দেখে ভালো মনে হয়; আবার খারাপের ব্যাপারেও যে খারাপ নয় তাকে খারাপ বোধ হতে পারে। নয় কি?

হ্যাঁ, একথা সত্য।

তা হলে যারা বিচারে ভুল করবে তাদের নিকট বন্ধুই শত্রু এবং শত্রুই বন্ধু বলে বোধ হবে?

হ্যাঁ, তা-ই হবে।

তা হলে এক্ষেত্রে বন্ধুর প্রতি শত্রুতা এবং শত্রুর প্রতি বন্ধুত্ব প্রদর্শন কোনো অন্যায় হবে না?

না, স্পষ্টতই এরূপ ক্ষেত্রে কোনো অন্যায় হতে পারে না।

কিন্তু যে উত্তম সে অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ, আর যে ন্যায়পরায়ণ সে নিশ্চয়ই কারুর প্রতি কোনো অন্যায় করতে পারে না। ঠিক নয় কি?

হ্যাঁ, তোমার একথা ঠিক সক্রেটিস।

কিন্তু তোমার আগের বক্তব্য অনুযায়ী ন্যায়পরায়ণ বা উত্তমের প্রতি অন্যায়াচরণে কোনো অন্যায় নেই।

না, না, সক্রেটিস, তা কী করে হতে পারে? এরূপ কথা বলা তো নীতি-বিগর্হিত।

তা হলে আমাদের কথাটা এভাবে বলতে হয় যে, ন্যায়বানের প্রতি সৎ-আচরণ আর যে অসৎ তার প্রতি অন্যায়াচরণ করাই আমাদের পক্ষে সঙ্গত।

হ্যাঁ, তোমার এবারের কথাটিকে গ্রহণ করা চলে।

কিন্তু আমাদের একথারও পরিণতি খেয়াল করে দ্যাখো : অনেক মানুষ আছে যারা মানবচরিত্র সম্পর্কে অজ্ঞ। এরা বন্ধু-বিচারে ভুল করে। অসৎ লোক এদের বন্ধু হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অসৎ লোকের প্রতি অন্যায়াচরণ যখন সঙ্গত তখন এরূপ বন্ধুর ক্ষতিসাধন করা অসঙ্গত কিংবা অন্যায় নয়। এরূপ লোকের আবার এমন শত্রুও থাকে যারা আসলে সৎ। কিন্তু শত্রু হলেও যেহেতু তারা সৎ সেজন্য তাদের কোনো ক্ষতিসাধনের পরিবর্তে তাদের মঙ্গলসাধন করাই সঙ্গত। ব্যাপারটা যদি এই দাঁড়ায়, তা হলে কিন্তু সিমোনাইডিসের বক্তব্যের বিপরীত অর্থই আমাদের গ্রহণ করতে হয়।

তোমার এ-অভিমত খুবই যথার্থ সক্রেটিস। এবার আমার মনে হচ্ছে, ‘বন্ধু’ এবং ‘শত্রু’ কথা দুটির ব্যবহারে আমাদের কিছু ভুল হয়েছে। সে-ভুলটি আমাদের সংশোধন করা আবশ্যক।

আমি জিজ্ঞেস করলাম : কী ভুল আমরা করেছি বলে তোমরা মনে হয়, পলিমারকাস?

পলিমারকাস বললেন : যাকে সৎ বলে মনে হয় তাকেই আমরা বন্ধু বলে মনে করেছি। এটি আমাদের ভুল।

তা হলে এ-ভুলের সংশোধন তুমি কীভাবে করতে চাও?

সক্রেটিস, ভুলটি সংশোধন করে আমাদের বরঞ্চ বলা উচিত, বন্ধু বলে বিবেচিত হবে কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি—যে শুধুমাত্র আপাতভাবে নয়, সত্যকারভাবেই উত্তম এবং সৎ। যাকে উত্তম বলে শুধুমাত্র মনে হবে, কিন্তু যে আসলে উত্তম নয় তাকে আমরা সত্যকার বন্ধু বলে গ্রহণ করব না। যে সত্যকারভাবে শত্রু নয় তার সম্পর্কেও আমরা কথাটি এমনভাবেই বলব।

পলিমারকাস, তোমার যুক্তি হচ্ছে, যে উত্তম সেই-ই আমাদের বন্ধু, আর যে মন্দ বা খারাপ সেই-ই আমাদের শত্রু?

হ্যাঁ সক্রেটিস, আমার কথা তা-ই।

অর্থাৎ আমরা পূর্বে যেখানে সোজাসুজি বলেছিলাম, বন্ধুর প্রতি বন্ধুত্ব আর শত্রুর প্রতি শত্রুতা দেখানো সঙ্গত, সেখানে এবার আমাদের বলা উচিত, বন্ধু যখন সত্যকার বন্ধু হবে—অর্থাৎ বন্ধু যখন সৎ এবং উত্তম হবে, তখনই তার প্রতি বন্ধুত্ব দেখানো এবং শত্রু যখন যথার্থভাবে শত্রু হবে, তখনই তার প্রতি শত্রুতা দেখানো আমাদের সঙ্গত।

হ্যাঁ, এবার যেভাবে তুমি কথাটি বলেছ সেটিই যথার্থ বলে বোধ হচ্ছে। বেশ! কিন্তু যে ন্যায়বান তার পক্ষে কি কারুর কোনো ক্ষতিসাধন সঙ্গত হতে পারে?

কেন নয় সক্রেটিস? যারা সত্যই দুষ্ট এবং তার শত্রু তাদের ক্ষতিসাধন করা তার পক্ষে অবশ্যই সঙ্গত।

আচ্ছা একটা অশ্বের কথা ধরো। একটা অশ্ব যখন আঘাতপ্রাপ্ত হয় তখন সে লাভবান হয়, না ক্ষতিগ্রস্ত হয়? অর্থাৎ তার উন্নতি ঘটে, না অবনতি ঘটে?

তার অবশ্যই অবনতি ঘটে।

কিন্তু কিসে তার ক্ষতি ঘটে? নিশ্চয়ই ক্ষতি ঘটে তার অশ্বত্বে, কুকুর কিংবা অপর কোনো জন্তুর গুণের ক্ষেত্রে নয়।

একথাও ঠিক।

তা হলে একজন মানুষ যখন আহত হবে তখন মানুষ হিসাবে তার উত্তম গুণগুলোরই কি ক্ষতি ঘটবে না?

অবশ্যই। মানুষের উত্তম গুণেরই ক্ষতি ঘটবে।

কিন্তু মানুষের উত্তম গুণ বলতে কি ধর্ম কিংবা ন্যায়পরায়ণতাকে বোঝায় না?

নিশ্চয়ই ন্যায়পরায়ণতাই মানুষের উত্তম গুণ।

তা হলে যে-মানুষ আহত হয় সে এই আঘাতের কারণেই ন্যায়পরায়ণতাকে হারাতে শুরু করে? নয় কি?

হ্যাঁ, তা-ই বটে।

এবার সঙ্গীতজ্ঞের কথা ধর। যে সঙ্গীতজ্ঞ কিংবা বাদক সে কি অপর কাউকে অ-সঙ্গীতজ্ঞ করে তুলতে পারে? অথবা অশ্বচালকের কথা ধরো। সে কি অপর মানুষকে নিকৃষ্ট অশ্বচালকে পরিণত করতে পারে?

না, তাও অসম্ভব।

তা হলে যে ন্যায়পরায়ণ সে কি তার ন্যায়পরায়ণতা দিয়ে অপরকে অসৎ করে তুলতে পারে? কথাটা আর একটু ব্যাপকভাবে বলা চলে। আমরা বলতে পারি, সৎ কি তার সততা দিয়ে অপরকে অসৎ করে তুলতে পারে?

অবশ্যই না।

অর্থাৎ তাপ যেমন শৈত্যকে সৃষ্টি করতে পারে না, তেমনি সৎ-ও অসৎকে সৃষ্টি করতে পারে না।

ঠিক তা-ই, সক্রেটিস

অথবা বলা চলে, শুষ্কতা যেমন আর্দ্রতা সৃষ্টি করতে পারে না।

হ্যাঁ, তা তো বটেই।

উত্তমের পক্ষে তাই আঘাত করে অপরের ক্ষতিসাধন করা সম্ভব নয়।

না, উত্তম কাউকে আঘাত করে অধম করতে পারে না।

এবং ন্যায়পরায়ণ এবং উত্তম তো অভিন্ন? নয় কি?

হা, এরা উভয়েই অভিন্ন।

তা হলে বন্ধু কিংবা অ-বন্ধু, কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ন্যায়পরায়ণ এবং উত্তমের কাজ নয়; বরঞ্চ যে ন্যায়পরায়ণ এবং উত্তম নয়, অর্থাৎ যে অসৎ সেই-ই মাত্র অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ঠিক নয় কি?

সক্রেটিস, তুমি যা বলছ তাকে খুবই যথার্থ বলে বোধ হচ্ছে।

তা হলে পলিমারকাস, আগের কথাটি আর থাকে না। কেননা, আমরা যথার্থভাবেই প্রমাণ করেছি, কাউকে আঘাত করে ক্ষতিগ্রস্ত করা কোনো ক্ষেত্রেই ন্যায্য কিংবা সঙ্গত বলে বিবেচিত হতে পারে না। একথা যদি সত্য হয় তা হলে এরূপ বলার কোনো অর্থ থাকে না যে, ‘ন্যায়’ বা ‘ধর্মে’র অর্থ হচ্ছে অপরের দেয়কে শোধ করা এবং দেয় বা ঋণ বলতে বোঝাবে বন্ধুর প্রতি বন্ধুত্ব আর শত্রুর প্রতি শত্রুতা। এরূপ অভিমত পোষণ করা এখন আর বিজ্ঞোচিত হবে না।

পলিমারকাস বললেন : সক্রেটিস তোমার সঙ্গে আমি একমত।

তা হলে এবার যদি কেউ এরূপ অভিমতকে সিমোনাইডিস, বিয়াস কিংবা পিটাকাস অথবা অপর কোনো জ্ঞানী কিংবা সত্যদ্রষ্টার অভিমত বলে চালাতে চায় তবে আমরা দু’জনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার সঙ্গে লড়াই করব। তুমি এ-প্রস্তাবে রাজি তো পলিমারকাস?

সক্রেটিস, তোমার পাশে থেকে লড়াই করতে আমি সর্বদাই প্রস্তুত রয়েছি।

বস্তুত এই অভিমতটি কার অভিমত বলে আমি বিশ্বাস করি, তুমি জান?

কার অভিমত?

আমার বিশ্বাস, পেরিয়ানডার কিংবা পারডিকাস কিংবা জারাক্সেস অথবা থিবের ইজমেনিয়াস অথবা এমনিতরো কোনো সম্পদশালী এবং শক্তিমত্ত মানুষের সম্পদ এবং শক্তির গর্বে স্ফীত হয়ে এই অভিমতের সৃষ্টি করেছে যে, ‘বন্ধুর প্রতি বন্ধুত্ব এবং শত্রুর প্রতি শত্রুতাসাধনই ধৰ্ম।’

হ্যাঁ, সক্রেটিস, এবার আমার মনে হচ্ছে, তোমার এই কথাই যথার্থ।

আমি বললাম : হ্যাঁ পলিমারকাস, আমার বিশ্বাস এ-অভিমত এঁদেরই সৃষ্টি। কিন্তু এখন ধর্ম বা ন্যায়পরায়ণতার এই সংজ্ঞা যদি খণ্ডিত হয় তা হলে নূতনভাবে ধর্মের কী সংজ্ঞা আমরা তৈরি করতে পারি?

আমি লক্ষ করছিলাম, আমাদের আলোচনার মাঝখানে কয়েকবারই থ্র্যাসিমেকাস যুক্তির লাগামটি নিজের হাতে নিয়ে নেবার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু যতবারই তিনি আমাদের সংলাপের মধ্যে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছিলেন ততবারই মজলিসের অন্য শ্রোতাগণ আমাদের আলোচনার পরিণতি দেখা আগ্রহে তাঁকে দাবিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু এবার যেইমাত্র আমি এবং পলিমারকাস আমাদের আলাপ শেষ করে আলোচনায় খানিকটা বিরতি দিয়েছি অমনি নিজেকে আর সংযত রাখতে না পেরে গ্র্যাসিমেকাস একটি হিংস্র জন্তুর মতো আমাদের উপর দস্তুরমতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাঁর ভঙ্গি দেখে আমরা রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠলাম।

থ্র্যাসিমেকাস এবার সমগ্র মজলিসটিকে লক্ষ্য করে গর্জন করে উঠলেন : গণ্ডমূর্খের দল, তোমরা করছ কী? সক্রেটিস এরই মধ্যে তোমাদের সবাইকে বশীভূত করে ফেলল! এরচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় আর কী হতে পারে? তোমরা কী মূর্খ যে সবাই মিলে সক্রেটিসকে কাবু না করে একে অপরকে আঘাত করে চলেছ! আর তোমাকেও বলছি, সক্রেটিস। তুমি যদি সত্যিকারভাবে জানতে চাও, ধর্ম কী, তা হলে কেবলমাত্র অপরকে প্রশ্ন করে চলার এই কৌশলটি তোমাকে পরিত্যাগ করতে হবে। তুমি নিজে নির্দিষ্টভাবে কিছু বলবে না পাছে কোনো প্রতিপক্ষ তোমাকে ভ্রান্ত প্রমাণিত করে। তথাপি তুমি অপরকে প্রশ্ন করে যাবার সুবিধাটি ভোগ করবে, এরূপ অবস্থা চলতে পারে না। তোমাকেও এবার অন্যের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। একজনকে প্রশ্ন করাটা খুব শক্ত কিছু নয়। আর এরূপ লোকের সংখ্যাও কিছু কম নয় যারা সুন্দরভাবে প্রশ্নই করতে পারে, কিন্তু কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না। তা ছাড়া জবাবের ক্ষেত্রেও তুমি যে ধর্ম কিংবা ন্যায়পরায়ণতাকে কেবল দায়িত্ব কিংবা সুবিধা কিংবা লাভ কিংবা কোনো প্রাপ্তি বা আগ্রহ বলে অভিহিত করে পার পেয়ে যাবে, তেমনটিও হবে না। তুমি জবাব দিলে আমাদের প্রশ্নের সুস্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট জবাবই তোমাকে দিতে হবে।

এ্যাসিমেকাসের এরূপ তম্বি শুনে আমি দস্তুরমতো আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। বস্তুত তাঁর এই হুমকি শুনে তাঁর দিকে তাকাতে যেয়ে আমি ভয়ে কেঁপেই উঠছিলাম। তথাপি আমি সর্বশক্তি দিয়ে হুঙ্কারকারী থ্রাসিমেকাসের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। কেননা, আমার দৃষ্টি তাঁর মুখের দিকে স্থিরনিবন্ধ না করলে তাঁর গর্জন আমাকে অবশ্যই বাকরহিত করে ফেলত। যখন দেখলাম তাঁর হুঙ্কার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন আমি সাহস করে চোখ তুলে একদৃষ্টিতে তাঁর দিকে চেয়ে রইলাম। এর ফলটি উত্তম হল। তাঁকে জবাবদানের একটা সাহস আমি নিজের মধ্যে যেন বোধ করলাম।

কম্পিত কণ্ঠেই আমি বললাম : প্রিয় থ্র্যাসিমেকাস, আমাদের উপর তুমি নির্দয় হয়ো না। পলিমারকাস এবং আমি আলোচনা করছিলাম। সে-আলোচনায় আমাদের ভুলত্রুটি কিছু হতে পারে। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি এরূপ ভুলত্রুটি আমরা ইচ্ছা করে করিনি। সত্যের স্বর্ণখণ্ডের অন্বেষণে আমরা একে অপরের দ্বারস্থ হচ্ছিলাম। একথা যথার্থ। কিন্তু তাতে পরস্পরকে আঘাত করার ইচ্ছা আমাদের ছিল এরূপ মনে করা তোমার উচিত নয়। কেননা, সেরূপ হলে ক্ষতি আমাদেরই হবে। সত্যের অন্বেষণে তা হলে আমরা ব্যর্থ হব। বস্তুত ধর্ম স্বর্ণের চেয়েও মূল্যবান। তার অনুসন্ধানে আমরা যখন রত তখন আমরা একে অপরের নিকট আত্মসমর্পণ করছি বা হেরে যাচ্ছি, তোমার এরূপ ভাবাও অনুচিত। সেজন্যই বলছি, প্রিয় সাথি, তুমি বিশ্বাস করো, আমরা সত্যের সন্ধানলাভের জন্য যথার্থই আগ্রহশীল, ঐকান্তিকভাবেই উৎসুক। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সত্যকে সন্ধান করে বার করার উপযুক্ত ক্ষমতা আমাদের নেই। এই যখন আমাদের অবস্থা তখন তোমার মতো সর্বজ্ঞের আমাদের প্রতি ক্রোধের পরিবর্তে একটু করুণা হওয়া উচিত। নয় কি বন্ধু?

আমার কথার জবাবে মুখে একটি তিক্ত হাসি টেনে থ্র্যাসিমেকাস বললেন : এ হচ্ছে অপরকে পরিহাস করার তোমার পরিচিত বিশিষ্ট ভঙ্গি, সক্রেটিস। তারপর অপর সবাইকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন : তোমরা সবাই এবার বুঝে দ্যাখো, সক্রেটিস সম্পর্কে আমার সাবধানবাণী ঠিক হয়েছে কি না। আমি আগেই বলেছিলাম যে, তাকে তোমরা যা-কিছু প্রশ্ন কর-না কেন সে ব্যঙ্গ, পরিহাস কিংবা অপর কোনো কৌশলে তার জবাবটি এড়িয়ে যাবেই।

আমি বললাম : থ্র্যাসিমেকাস, তুমি অবশ্যই একজন দার্শনিক। আর একথা তুমি ভালো করেই জান যে, তুমি যদি একদিকে একজনকে প্রশ্ন কর, কী কী দিয়ে বারো সংখ্যাটি তৈরি হয় এবং অপর দিকে তাকে নিষেধ করো, তোমার প্রশ্নের জবাবে সে বলতে পারবে না, দুটো ছ’তে কিংবা তিনটে চারে অথবা ছ’টা দুয়ে কিংবা চারটা তিনে বারো হয় তা হলে সেও তোমাকে বলতে পারে : থ্র্যাসিমেকাস, তোমার এই জবরদস্তি বন্ধ করো। তা না হলে কারুর পক্ষেই তোমার এই প্রশ্নের জবাবদান সম্ভব হবে না। কারণ, সে সঙ্গতভাবেই পালটা জবাবে তোমাকে বলতে পারে, “তুমি কি বলতে চাও থ্র্যাসিমেকাস, তোমার নিষিদ্ধ সংখ্যাগুলোর মধ্যেই যদি তোমার প্রশ্নের জবাব থাকে তা হলে তোমার জবরদস্তির কারণে সঠিক জবাবের বদলে আমি এমন সংখ্যার উল্লেখ করব যে-সংখ্যা আদৌ সঠিক নয়?’ থ্র্যাসিমেকাস, এই প্রশ্নের জবাবটি তুমি কীভাবে দিতে পারবে বলে মনে কর?

থ্র্যাসিমেকাস বললেন : সক্রেটিস, তোমার কথার ভাবটি এমন যেন দুটো দৃষ্টান্ত এক হল।

আমি বললাম : দুটো দৃষ্টান্ত কেন এক হবে না থ্র্যাসিমেকাস? আর যদি এক না-ও হয়, তবু তুমি যাকে প্রশ্ন করেছ তার কাছে যদি তারা এক বলেই বোধ হয় তা হলে তুমি কিংবা আমি তাকে নিষেধ করি কিংবা না করি, সে যা সঠিক বিবেচনা করে তা বলাই কি তার উচিত হবে না?

একথার মানে সক্রেটিস, তুমি নিষিদ্ধ জবাবদানই স্থির করেছ?

হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। যদি তোমার নিষিদ্ধ জবাবগুলোর মধ্যেই আমি আমার যথার্থ জবাবকে দেখতে পাই তা হলে সে-জবাবদানে অবশ্যই আমি কুণ্ঠিত হব না।

থ্রাসিমেকাস বললেন : কিন্তু ধরো, নিষিদ্ধ জবাবগুলোর চেয়ে ধৰ্ম সম্পর্কে অধিকতর উত্তম একটি জবাবকেই আমি তোমার নিকট উপস্থিত করলাম। তা হলে এ-বাবদ দেয় কী হবে বলে তুমি মনে কর?

বারে! আমার দেয় কী? মূর্খ আমি জ্ঞানী থ্র্যাসিমেকাসকে আবার কী দেব? জ্ঞানীর নিকট জ্ঞানই তো আমার প্রাপ্য। আমার আবার দেয় কী?

বাহ্! কী চমৎকার কথা! বিনা পয়সাকড়িতেই তুমি জ্ঞান লাভ করবে?

বেশ, আমি না হয় তোমাকে পয়সাই দেব। আমার যখন অর্থাগম হবে তখন তোমারও নিশ্চয়ই তা থেকে কিছু প্রাপ্তি ঘটবে।

গ্লকন বললেন : এখনও তোমার টাকার অভাব নেই সক্রেটিস। আর থ্রাসিমেকাস, তোমারও ঘাবড়াবার কোনো কারণ নেই। তুমি জ্ঞান দান করো। সক্রেটিসের ঋণ না হয় আমরা সবাই মিলে চাঁদা তুলেই শোধ করব।

থ্র্যাসিমেকাস বললেন : তাতেই-বা ভরসা কোথায় গ্লকন? সক্রেটিস তো তখনও তার চিরাচরিত কৌশল নিয়ে প্রশ্নের জবাব কেবল এড়িয়েই যাবে। সে কেবল অন্যের জবাবকেই ছিন্নভিন্ন করার দক্ষতা দেখাতে পারে। নিজের জবাবদানে সে অক্ষম।

প্রিয় বন্ধু! আমার বিরুদ্ধে এ-অভিযোগ বস্তুত ভিত্তিহীন। তুমিই বলো, যে জানে এবং নিজেই স্বীকার করে সে কিছুই জানে না, সে তোমার প্রশ্নের জবাব দিতে কেমন করে সক্ষম হবে? আর কোনোকিছু সম্পর্কে যদিবা তার সামান্য এবং অস্পষ্ট একটা ধারণা থেকে থাকে তো, ‘জ্ঞানবানে’র নিষেধে সে-জবাবও তার স্তব্ধ। এমন অবস্থায় এ বেচারির বলার আর কী থাকতে পারে? এর পক্ষে বক্তা হওয়া কিংবা কোনো জবাবদান আদৌ সম্ভব নয়। বরঞ্চ বক্তা হওয়া তাকেই সাজে যে জানে এবং দাবি করে সে জানে। এমন জ্ঞানীমাত্রই অপরকে জবাব দিতে পারে। কাজেই থ্র্যাসিমেকাস, জবাব দেওয়া তোমাকেই সাজে। তুমিই দয়া করে আমাদের সবার উপকারের জন্য এবং বিশেষ করে আমার জ্ঞানের জন্য জবাব দাও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *