• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

পিক্সেলের ভিতর মানুষ – মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

লাইব্রেরি » মোহাম্মদ শাহজামান শুভ » পিক্সেলের ভিতর মানুষ – মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
পিক্সেলের ভিতর মানুষ - মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
লেখক: মোহাম্মদ শাহজামান শুভবইয়ের ধরন: সায়েন্স ফিকশন / বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী

পিক্সেলের ভিতর মানুষ – মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

উৎসর্গ

এই গল্প সকল কিশোর ও কিশোরীর জন্য—
যারা প্রাথমিক আলোয় ভয়ে কেঁপে ওঠে,
যারা লজ্জা আর ট্রলের আড়ালে নিজেদের হারায়,
যারা ছোট্ট হাত দিয়ে বড় কাজ করতে চায়,
যারা বন্ধুত্ব, বোঝাপড়া এবং সাহসের সন্ধান করে।

তোমাদের জন্য এই গল্প লেখা হলো—
যদি কখনও ভয় তোমার হৃদয় ঘিরে ধরে,
যদি কখনও তুমি একা মনে কর,
তাহলেও মনে রাখো—
তুমি শক্তিশালী, তুমি সাহসী,
তুমি একা নও।

এই বই তোমাদের হাতে—
ছোট্ট চোখ, ছোট হাত, বড় মন,
ভয়কে জয় করার শক্তি,
বন্ধুত্বের আলো, এবং নতুন গল্পের সূচনা।

ভূমিকা

আজকের কিশোরের জীবন শুধুই কক্ষের দেয়াল বা স্কুলের মাঠে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের বাস্তবতা ছড়িয়ে আছে স্ক্রিনের আড়ালে—সোশ্যাল মিডিয়ার ফিড, ভিডিও, স্ট্যাটাস, কমেন্ট এবং একটানা ডিজিটাল দৃষ্টি। এই ভেতরেকার জগতে হঠাৎ এক ক্ষুদ্র ঘটনা, এক মুহূর্তের ভিডিও, বা একটি ছবি অপ্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারে। ভয়ের অনুভূতি, লজ্জা, একাকীত্ব—সবকিছু একই সঙ্গে ঘিরে ধরে কিশোরকে।

এই উপন্যাসের নায়ক আরিফ, ঠিক এমন একটি সময়ের মুখোমুখি হয়। তার জীবনে প্রবেশ করে ভয়, ট্রল, বিদ্রুপ, এবং এক ধরণের মানসিক চাপ। কিন্তু সে একই সঙ্গে খুঁজে পায় সাহস, বন্ধু, বোঝাপড়া এবং নতুন সম্পর্কের শক্তি। গল্পের প্রতিটি অধ্যায় শুধু আরিফের কাহিনী নয়—এটি আমাদের সময়ের কিশোরদের গল্প।

“পিক্সেলের ভিতর মানুষ” উপন্যাসটি ডিজিটাল যুগের কিশোরদের মানসিক যাত্রা, একাকীত্ব, বুলিং, এবং বোঝাপড়া নিয়ে লেখা। এটি দেখায় যে, ভয়কে স্বীকার করা, মুখোমুখি হওয়া, এবং একে অপরকে সমর্থন করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি অধ্যায় ভেতরের দ্বন্দ্ব, সাহসিকতা এবং বন্ধুত্বের শক্তি প্রকাশ করে।

এই গল্পে আছে:

  • সচেতনতা—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভয় ও বুলিং কীভাবে কাজ করে।
  • সাহসিকতা—ভয়কে স্বীকার করা এবং মুখোমুখি হওয়া।
  • বোঝাপড়া ও ক্ষমা—ভুল বোঝাপড়ার পর সম্পর্ক পুনর্গঠন।
  • বন্ধুত্বের শক্তি—সমর্থন এবং একতার মূল্য।

ভয়, লজ্জা, ট্রল—সবই কিশোর জীবনের অংশ হতে পারে, কিন্তু সাহস, বোঝাপড়া এবং বন্ধুত্বের শক্তি এই উপন্যাসে বারবার প্রমাণিত হয়। পাঠক দেখবে, প্রতিটি ছোট্ট পদক্ষেপ, প্রতিটি কথা, প্রতিটি ছবি কিভাবে জীবন বদলে দিতে পারে।

এটি শুধু একটি কিশোর গল্প নয়। এটি শিক্ষার, বোঝাপড়ার, সাহসের এবং নতুন শুরু করার গল্প। পিক্সেলের ভিতর মানুষ পাঠকের মনে প্রশ্ন তুলবে—আমরা কি ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহসী? আমরা কি অন্যকে বোঝার চেষ্টা করি? এবং শেষ পর্যন্ত আমরা কি একসাথে শক্তিশালী হতে পারি?

এ বইটি সকল কিশোর এবং কিশোরীদের জন্য, যারা ভয়ের সঙ্গে লড়াই করছে, এবং যারা বোঝাপড়া, ক্ষমা এবং বন্ধুত্বের শক্তি খুঁজছে।

সূচীপত্রঃ

১. ভিডিও
২. করিডরের চোখ
৩. বাড়ির নীরবতা
৪. ফিসফিসের সঙ্গী
৫. নতুন ছাত্রী
৬. পোস্টার
৭. ছায়ার মুখ
৮. কাউন্সেলিং রুম
৯. অনলাইন যুদ্ধ
১০. ভেঙে পড়া
১১. বাবার গল্প
১২. দেয়ালের লেখা
১৩. মুখোমুখি
১৪. মঞ্চে দাঁড়ানো
১৫. বন্ধুত্বের জয়


অধ্যায় এক: ভিডিও

আরিফ রহমান জানত না—একটা দুপুর এভাবে শুরু হতে পারে। জানালার পাশের বেঞ্চে বসে সে খাতার কোণায় অজান্তেই পেন্সিল দিয়ে ছোট ছোট বর্গ আঁকছিল। বর্গের ভেতরে আরেকটা বর্গ, তার ভেতরে আরেকটা—পিক্সেলের মতো। সে ভাবছিল, ছবিটা পরে বাড়িতে গিয়ে রঙ করবে। বাইরে মেঘলা আকাশ, জানালার কাচে ধুলো জমে আছে, আর ক্লাসরুমে স্যারের গলা একঘেয়ে ঢেউয়ের মতো ভেসে আসছে—অর্থনীতি, উৎপাদন, চাহিদা–যোগানের গ্রাফ। শব্দগুলো আরিফের কানে ঢুকছিল না, শুধু বাতাসে ভাসছিল।

হঠাৎ পেছনের বেঞ্চ থেকে ফিসফাস।

—“এইটা দেখছিস?”

আরিফ প্রথমে পাত্তা দেয়নি। স্কুলে ফিসফাস নতুন কিছু নয়। প্রতিদিনই কেউ না কেউ কারও কানে ঝুঁকে কিছু বলে, তারপর চাপা হাসি। কিন্তু আজ হাসিগুলো একটু আলাদা—খুব ধারালো, খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

ডেস্কের নিচে মোবাইলের আলো জ্বলে উঠছে। কেউ স্ক্রিন ঢেকে দেখছে, কেউ আবার গলা টিপে হাসছে। সামনে বসা রাশেদ হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে আরিফের দিকে তাকাল। চোখে এমন একটা দৃষ্টি, যেন সে কোনো অদ্ভুত জিনিস দেখছে।

আরিফ অস্বস্তি বোধ করল।

সে খাতাটা বন্ধ করল। কলমের ঢাকনা লাগাতে লাগাতে নিজের বুকের ভেতর একটা টান টান ভাব টের পেল—যেমন হয় পরীক্ষার আগে, যখন প্রশ্নপত্র উল্টানোর ঠিক আগের মুহূর্তে বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি ওঠে।

তার ফোন ভাইব্রেট করল।

একবার।

দু’বার।

তিনবার।

সে তাকাল না।

কিন্তু পাশের বেঞ্চে বসা ছেলেটা ফিসফিস করে বলল,
—“ভাই, এটা তো তুই!”

আরিফের বুকের ভেতর কিছু একটা হড়কে পড়ল।

সে ধীরে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে নোটিফিকেশনের সারি—একটার পর একটা। ক্লাস গ্রুপ, পাড়ার বন্ধুদের গ্রুপ, এমনকি দূরের এক আত্মীয়ের মেসেজও।

একটা লিংক।

তার আঙুল কেঁপে উঠল।

সে ক্লিক করল।

ভিডিওটা শুরু হলো—ঝাঁকুনি দেওয়া ক্যামেরা, করিডরের সাদা দেয়াল, পেছনে কারও হাসি। তারপর সে নিজেকে দেখল। গত সপ্তাহের ঘটনা। টিফিনের সময় সে বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
—“তুই এত চুপচাপ থাকিস কেন?”

সে তখন আধা মজা আধা লজ্জায় বলেছিল,
—“চুপ থাকলে মানুষ ভাবে আমি বুদ্ধিমান।”

পুরো কথাটা ছিল ভিন্ন। সে এরপর যোগ করেছিল,
—“আসলে আমি গুলিয়ে যাই।”

কিন্তু ভিডিওতে সেই অংশ নেই।

শুধু আছে প্রথম লাইনটা।

তারপর কাট।

তার মুখের এক অদ্ভুত ফ্রেম—চোখ আধা বন্ধ, ঠোঁটে অস্বস্তিকর হাসি।

তারপর নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা:

“চুপ থাকলে মানুষ ভাবে আমি বুদ্ধিমান 🤡”

পেছনে লাগানো হাসির শব্দ। এডিট করা।

আরিফের গলা শুকিয়ে গেল।

ক্লাসরুমটা হঠাৎ খুব ছোট হয়ে এল। দেয়ালগুলো যেন এগিয়ে আসছে। বাতাস ঘন হয়ে গেছে। বোর্ডের লেখা অস্পষ্ট লাগছে। স্যারের কণ্ঠ দূর থেকে ভেসে আসছে, যেন পানির নিচে দাঁড়িয়ে কেউ কথা বলছে।

সে আবার স্ক্রল করল।

ভিউ কাউন্ট—৩২… ৪১… ৫৭…

সংখ্যাটা যেন চোখের সামনে লাফাচ্ছে।

মন্তব্যগুলো পড়তে সাহস পেল না প্রথমে।

কিন্তু পড়ে ফেলল।

“ভাই রে ভাই 🤣”

“এইটা আবার কী মাল”

“ইন্টেলেকচুয়াল!”

“চুপ থাকলে নাকি জিনিয়াস!”

একটা মন্তব্যে কেউ লিখেছে—
“এই ছেলেটা সব সময় এমনই আজব।”

আরিফ ফোনটা নামিয়ে রাখল।

কিন্তু কথাগুলো নামল না।

ওগুলো যেন তার চোখের ভেতরে আটকে গেল।

সে তাকাল বোর্ডের দিকে। চকের দাগ ঝাপসা। নিজের নামটা যেন মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—আরিফ, আরিফ, আরিফ—কিন্তু ওই নামটার সঙ্গে এখন আর আগের মতো অনুভূতি নেই। যেন কেউ সেটাকে টেনে ছিঁড়ে অন্য রকম বানিয়ে ফেলেছে।

পেছনে কেউ ফিসফিস করল—
—“এইটা তুই না?”

আরেকজন বলল—
—“আসলেই তুই বলছিস নাকি?”

আরিফ মুখ তুলল না।

তার কানে রক্তের শব্দ।

টুপটাপ।

টুপটাপ।

মনের ভেতর একটা অদ্ভুত হিসাব চলছিল—কে ভিডিও করল? কে পোস্ট করল? কে প্রথম শেয়ার করল?

সে কারও সঙ্গে চোখাচোখি করতে চাইছিল না। চোখাচোখি হলেই যেন সব ভেঙে পড়বে।

স্যার হঠাৎ বললেন,
—“আরিফ, বোর্ডে আয়।”

আরিফ চমকে উঠল।

সে দাঁড়াল। পা দুটো ভারী লাগছে। হাঁটতে গিয়ে মনে হলো সবাই তাকিয়ে আছে। প্রতিটা চোখ একটা করে ক্যামেরা।

বোর্ডে দাঁড়িয়ে সে প্রশ্নটাই ঠিকমতো বুঝতে পারল না।

—“কী হবে?” স্যার আবার বললেন।

আরিফের গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না প্রথমে। সে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
—“স্যার… আমি…”

কেউ পেছনে চাপা হাসল।

সে শুনতে পেল।

সে জানে না সে কল্পনা করছে নাকি সত্যিই কেউ হাসছে। এখন সব শব্দই সন্দেহজনক।

—“বসে পড়ো,” স্যার বিরক্ত গলায় বললেন।

আরিফ বসে পড়ল।

ক্লাস শেষ হওয়ার ঘণ্টা যখন বাজল, তার মনে হলো ঘণ্টাটা যেন তার মাথার ভেতর বাজছে, খুব জোরে।

করিডরে বেরোতেই বুঝল—ভিডিওটা আরও ছড়িয়েছে।

কেউ থেমে থেমে তাকাচ্ছে।

কেউ মোবাইল তুলে নিচ্ছে।

কেউ আবার হাসি লুকিয়ে রাখছে না।

তার বন্ধু শাওন এগিয়ে এসে বলল,
—“ভাই… এইটা তো…”

শাওনের বাকিটা বলা হয়নি।

আরিফ মাথা নাড়ল।

সে জানে।

সে সব জানে।

বাথরুমে ঢুকে সে দরজা লাগিয়ে দিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকাল। একই মুখ। একই চোখ। তবু যেন বদলে গেছে।

সে ফিসফিস করে বলল,
—“আমি তো এইরকম না…”

কথাটা আয়নায় আটকে রইল।

বাইরে কেউ হাত ধুচ্ছে। পানি পড়ার শব্দ। সাধারণ একটা দিন। কিন্তু তার ভেতরে দিনটা ভেঙে গেছে।

সে আবার ফোন খুলল।

ভিউ—১৪৬।

আরিফ ফোনটা বন্ধ করল।

কিন্তু স্ক্রিনটা যেন তার চোখের পাতার ভেতর ঢুকে গেছে।

সে বুঝতে পারল—আজ থেকে মানুষ তাকে অন্যভাবে দেখবে।

একটা কাটা ভিডিও দিয়ে।

একটা হাসির ইমোজি দিয়ে।

একটা স্ক্রিন দিয়ে।

সে প্রথমবার বুঝল—

স্ক্রিনও অস্ত্র হতে পারে।

আর অস্ত্রটা এখন তাক করা আছে তার দিকেই।


অধ্যায় দুই: করিডরের চোখ

ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে করিডরটা ভেঙে পড়ল মানুষের শব্দে—চেয়ার টানার খসখসানি, বইয়ের তাক্কা, দরজার ধাক্কা, জুতোর ঘষা। অন্যদিন এই শব্দগুলো আরিফের কানে আলাদা করে লাগত না। স্কুল মানেই তো শব্দের নদী। কিন্তু আজ প্রতিটা আওয়াজ যেন আলাদা আলাদা করে তার নাম ডেকে উঠছে।

সে ব্যাগটা কাঁধে তুলল। বুকের ভেতর ভারী কিছু চেপে আছে—একটা অদৃশ্য পাথর। দরজা পেরোতেই করিডরের সাদা আলো চোখে লাগল। জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছে, মেঝেতে লম্বা ছায়া। এই করিডর দিয়েই সে প্রতিদিন হাঁটে। কতদিন ধরেই তো। আজ হঠাৎ জায়গাটা অপরিচিত লাগছে, যেন কেউ রাতে এসে সব দেয়াল সামান্য বাঁকিয়ে দিয়েছে।

দুই ধাপ এগোতেই থামল।

পাশের গ্রুপটা হঠাৎ চুপ করে গেছে।

এই চুপ করে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

কথা থামার শব্দটা নেই—শুধু একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। আর সেই ফাঁকা জায়গাটা যেন সরাসরি তার গায়ে এসে লাগে।

সে চোখ নামিয়ে নিল।

মেঝের দিকে তাকিয়ে হাঁটা শুরু করল।

পাথরের টাইলসে ছোট ছোট দাগ। কোথাও গাম জমে আছে। কোথাও কালো দাগ—হয়তো কারও জুতোর ছাপ। সে হিসাব করতে লাগল—একটা দাগ থেকে আরেকটা দাগ পর্যন্ত কত পা লাগে। এইভাবে হাঁটলে সময় কেটে যায়। মাথার ভেতরের শব্দগুলো একটু কমে।

কিন্তু কমে না।

ডানে কোথাও চাপা হাসি।

বামে ফিসফিস—

—“এইটাই না?”

—“হ্যাঁ রে…”

আরিফ শুনতে চায় না।

কিন্তু কানে ঢুকে পড়ে।

সে দেয়ালের দিকে একটু সরে হাঁটে, যেন দেয়ালটা তাকে আড়াল করবে। সাদা রঙ খসে খসে উঠেছে। কোথাও নীল মার্কারের দাগ—কোনো নাম, কোনো তারিখ, আধখানা হার্ট। সে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে চায়, কিন্তু হাত ওঠে না।

একটু সামনে তিনজন দাঁড়িয়ে। একজন ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরেছে। স্ক্রিনটা আধখানা দেখা যাচ্ছে। ছোট্ট একটা ফ্রেম—কেউ কথা বলছে। সে নিজেকে চিনতে পারল না প্রথমে। তারপর বুঝল।

তার বুকটা আরও ভারী হয়ে গেল।

সে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল।

—“এই ভাই…”

কণ্ঠটা থামল মাঝপথে।

আরিফ হাঁটা বাড়াল।

সে জানে না তারা তাকে ডাকছিল কি না। এখন সব ডাকই সন্দেহজনক।

তার মাথার ভেতর গতকালের ভিডিওটা আবার চালু হয়ে গেছে। নিজের মুখ, কাটছাঁট করা বাক্য, হাসির ইমোজি। সে মনে মনে বলল, দেখিস না। শুনিস না। হাঁটতে থাক।

কিন্তু করিডরের চোখগুলো থামে না।

চোখ মানে শুধু চোখ না—মোবাইলের ক্যামেরাও চোখ।

সে প্রথমবার বুঝল, একটা ফোন হাতে মানেই কেউ তোমাকে ধরে ফেলতে পারে। আটকে ফেলতে পারে। ফ্রেমে পুরে রাখতে পারে।

একজন হঠাৎ তার পাশ দিয়ে ছুটে গেল। কাঁধে ধাক্কা লাগল।
—“সরি,” শব্দটা বেরোল, কিন্তু চোখে চোখ রাখল না ছেলেটা।

আরিফ থমকে গেল এক সেকেন্ড।

তারপর আবার হাঁটা।

ক্লাস সেভেনে থাকতে সে একবার করিডরে দৌড়ে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল। সবাই হাসছিল। তখনও খারাপ লেগেছিল। কিন্তু সেটা ছিল মুহূর্তের। আজকেরটা আলাদা। আজ হাসিটা থেমে থাকে না। আজ হাসিটা স্ক্রিনে আটকে যায়।

একটা গ্রুপের মাঝখান দিয়ে যেতে হলো।

সে অনুভব করল—কেউ তাকাচ্ছে। সরাসরি না। পাশ ফিরে। কৌণিক চোখে।

এই কৌণিক তাকানোটাই সবচেয়ে কষ্ট দেয়।

সে দেয়ালের দিকে আরও সরে গেল।

হঠাৎ মনে হলো—দেয়ালটা যদি কথা বলতে পারত! যদি বলত, এই ছেলেটা এমন না।

কিন্তু দেয়াল চুপ।

দেয়াল সব সময়ই চুপ থাকে।

সে বাথরুমের দিকে মোড় নিল। ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। আয়নায় নিজের মুখটা আবার দেখল। আলোটা খারাপ। চোখের নিচে হালকা কালচে দাগ। ঠোঁট শক্ত হয়ে আছে।

সে নিজের দিকে তাকিয়ে বলল না কিছু।

ভয় পেল—কথা বললে কণ্ঠ কেঁপে যাবে।

বাইরে কেউ ঢুকল। ট্যাপ খুলল। পানি পড়ার শব্দ। সাধারণ দিনের শব্দ। অথচ তার মাথার ভেতর ঝড়।

সে আবার বেরিয়ে এল।

করিডরে ফিরতেই শব্দগুলো আবার শুরু।

এখন আর হাসি লুকোনো না।

কেউ সরাসরি তাকিয়ে আছে।

কেউ আবার খুব জোরে কিছু বলছে, যেন সে শুনে ফেলে।

—“ভাই, মানুষ নাকি চুপ থাকলে জিনিয়াস!”

হাসি।

আরিফ থমকে গেল।

এইবার সত্যিই থামল।

সে বুঝতে পারল—এই করিডরটা আর আগের মতো নয়। এখানে হাঁটলে শুধু নিজের পা শোনা যায় না। অন্যের চোখও শোনা যায়।

চোখের শব্দ হয় না।

কিন্তু অনুভূত হয়।

সে ব্যাগের ফিতা শক্ত করে ধরল।

কতটা শক্ত করে ধরলে মানুষ ভাঙে না?

সে জানে না।

শুধু হাঁটতে থাকে।

দেয়ালের দিকে তাকিয়ে।

যেন দেয়ালের ভেতর ঢুকে যেতে পারলে সব শেষ হয়ে যাবে।

যেন সাদা রঙের আড়ালে লুকিয়ে গেলে কেউ আর ভিডিও বানাতে পারবে না।

কিন্তু সে জানে—

লুকোনো যায় না।

স্ক্রিনে ঢুকে গেলে মানুষ আর শুধু মানুষ থাকে না।

সে তখন একটা ফ্রেম।

একটা ক্লিপ।

একটা মিম।

আর এই করিডরের প্রতিটা চোখ যেন বলছে—

আমরা দেখেছি।

অধ্যায় তিন: বাড়ির নীরবতা

বাসার গেট ঠেলে ঢুকতেই আরিফের মনে হলো, আজ বিকেলের আলোটা অন্যরকম। সূর্যটা যেন একটু নিচু হয়ে গেছে, জানালার কাচে পড়ে আলোটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। এই আলো সে প্রতিদিনই দেখে। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, আলোও বুঝি তাকে দেখছে—চুপচাপ, নিরুপম, কোনো মন্তব্য না করে।

সে জুতা খুলে বারান্দায় রাখল। সাধারণত খুলে রাখে এলোপাথাড়ি। আজ লাইন করে রাখল। যেন জুতোগুলো সোজা না হলে তার ভেতরের অস্থিরতা আরও চোখে পড়বে।

ভেতরে ঢুকতেই রান্নাঘর থেকে ভাজার শব্দ ভেসে এল—তেলে কিছু একটা ছ্যাঁকা দিচ্ছে। পেঁয়াজের গন্ধ। কাঁচা মরিচের ঝাঁঝ। এই গন্ধগুলো অন্যদিন তাকে ক্ষুধার্ত করে তুলত। আজ মনে হলো গন্ধগুলো ভারী, মাথার ওপর ঝুলে আছে।

—“আরিফ, এসেছিস?”

মায়ের কণ্ঠ।

স্বাভাবিক।

খুব স্বাভাবিক।

এই স্বাভাবিকতাই আজ অস্বাভাবিক লাগছে।

—“হুম।”

সে নিজের ঘরের দিকে হাঁটল।

ব্যাগটা খাটের ওপর ছুড়ে ফেলল। ব্যাগের ভেতর থেকে বইয়ের মলাট ঠকঠক করে উঠল। শব্দটা একটু বেশি জোরে হলো। সে থমকে গেল, যেন কেউ শুনে ফেলেছে।

দেয়ালের দিকে তাকাল।

পোস্টার—একটা পাহাড়ের ছবি। নিচে লেখা: Explore. অনেকদিন আগে লাগিয়েছিল। তখন ভাবত, বড় হলে ঘুরবে, ছবি তুলবে, আঁকবে। আজ মনে হলো পোস্টারের পাহাড়টাও খুব দূরে।

সে খাটে বসে পড়ল।

ফোনটা পকেট থেকে বের করল না।

জানত—বের করলে আবার দেখবে।

তবু ফোন যেন পকেটের ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে।

কিছুক্ষণ বসে থাকল।

তারপর দরজা খুলে আবার বেরোল।

ড্রয়িংরুমে বাবা খবরের কাগজ পড়ছেন। চশমার ওপর দিয়ে টিভির স্ক্রলিং নিউজ দেখছেন। স্ক্রিনে কোনো রাজনীতিকের মুখ। নিচে লাল লাইনে খবর চলছে।

বাবা তাকালেন।

—“স্কুল কেমন গেল?”

প্রশ্নটা এত সাধারণ যে আরিফের বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে উঠল।

এই প্রশ্নটার ভেতর তো এত কিছু ঢোকানো যায়।

সে বলল,
—“ভালো।”

একটা শব্দ।

ভালো।

এত ছোট যে তার সব ভয়, লজ্জা, অপমানের জায়গা হলো না।

বাবা আবার কাগজে চোখ নামালেন।

এইটুকুই?

আরিফ দাঁড়িয়ে রইল।

হয়তো বাবা আবার কিছু জিজ্ঞেস করবেন।

কিন্তু করলেন না।

টিভির শব্দ একটু বাড়ল।

সে হাঁটতে হাঁটতে রান্নাঘরে গেল।

মা চুলা নেড়ে দিচ্ছেন। ঘাম জমেছে কপালে। ফ্রাইপ্যান থেকে ধোঁয়া উঠছে।

—“হাত-মুখ ধুয়ে আয়। ভাত দিচ্ছি।”

এই কথাটা প্রতিদিনই শোনে।

আজ শুনে মনে হলো—এটা যেন কোনো দেয়াল। ওর দিকে এগিয়ে আসে, আবার থেমে যায়।

সে বাথরুমে গেল।

কল খুলে মুখে পানি দিল।

আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকাল।

স্কুলের করিডরের চোখগুলো যেন এখানে এসেও লেগে আছে।

সে চোখ নামিয়ে নিল।

খাবারের টেবিলে বসে তিনজন।

বাবা, মা, আরিফ।

চামচের শব্দ।

প্লেট ঠোকার আওয়াজ।

ভাতের গন্ধ।

মা বললেন,
—“আজ তোমার পছন্দের ডাল করেছি।”

আরিফ মাথা নেড়ে নিল।

সে খেতে পারছে না ঠিকমতো।

ভাত মুখে নিলে গিলতে কষ্ট হয়।

বাবা বললেন,
—“আগামী সপ্তাহে পরীক্ষার ফরম ফিলাপ।”

এই কথাটাও স্বাভাবিক।

সবই স্বাভাবিক।

অস্বাভাবিক শুধু তার ভেতরটা।

সে ভাবল—এখন বলব।

এখনই।

বলব—আজ স্কুলে একটা ভিডিও ছড়িয়েছে। সবাই হাসছে। আমি করিডরে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে হাঁটছি।

কিন্তু কথাগুলো গলায় আটকে রইল।

মা তার দিকে তাকালেন।

—“কী হলো? শরীর খারাপ?”

এইবার সুযোগ।

সে মুখ খুলল।

তারপর বন্ধ করল।

—“না।”

মা আর কিছু বললেন না।

এই নীরবতাটা যেন মোটা হয়ে উঠল।

টেবিলের মাঝখানে ঝুলে রইল।

সে বুঝতে পারল—নীরবতাও শব্দ করে।

শব্দ না করেও।

খাবার শেষে সে ঘরে চলে এল।

দরজা লাগাল না।

শুয়ে পড়ল।

ছাদের ফ্যান ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে কটকট আওয়াজ করছে।

সে চোখ বন্ধ করল।

কিন্তু চোখের ভেতর আবার করিডর।

ফিসফাস।

হাসি।

মোবাইলের স্ক্রিন।

সে উঠে বসে ফোনটা বের করল।

নোটিফিকেশন—আরও।

গ্রুপে কেউ লিখেছে—

“ভাই ভিডিওটা এখন অন্য স্কুলেও গেছে।”

তার বুক কেঁপে উঠল।

সে স্ক্রিন বন্ধ করল।

ফোনটা বালিশের নিচে ঢুকিয়ে দিল।

যেন লুকিয়ে রাখলে সব থেমে যাবে।

কিন্তু থামে না।

দরজার বাইরে বাবার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে—মায়ের সঙ্গে বাজারের কথা বলছেন।

স্বাভাবিক।

সবাই স্বাভাবিক।

শুধু সে নয়।

সে মনে মনে বলল—আমি কি একাই দেখছি?

সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

বাইরে বিকেলের আলো কমে এসেছে। পাশের বাসার ছাদে জামা শুকোচ্ছে। একটা বিড়াল দেয়াল বেয়ে উঠছে।

জীবন চলছে।

তারটা যেন আটকে গেছে।

সে প্রথমবার বুঝতে পারল—ঘরের নীরবতা করিডরের হাসির চেয়েও ভারী।

কারণ এখানে কেউ হাসছে না।

এখানে কেউ কিছু বলছে না।

আর সেই না-বলা কথাগুলো বুকের ভেতর জমে জমে পাথর হয়ে যায়।

সে দরজার ফাঁক দিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল।

বাবা টিভির দিকে।

মা ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছেন।

তারা জানে না।

অথবা জানতে চাইছে না।

এই দুইটার পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম।

কিন্তু ভয়ংকর।

আরিফ আবার খাটে বসল।

স্কেচবুকটা বের করল।

খুলে দেখল—ফাঁকা পাতা।

পেন্সিল ধরল।

হাত কাঁপছে।

একটা মুখ আঁকল।

চোখ বড়।

মুখ ছোট।

চারপাশে ছোট ছোট আয়তক্ষেত্র—স্ক্রিনের মতো।

মাঝখানে মানুষটা দাঁড়িয়ে।

একাই।

সে হঠাৎ থামল।

নিজের আঁকাটা দেখে বুক ভারী হয়ে এল।

সে বুঝল—এই নীরবতা একদিন চিৎকার হয়ে বেরোবে।

কিন্তু আজ না।

আজ শুধু জমছে।

ঘরের ভেতর।

তার ভেতর।

পিক্সেলের ভেতর আটকে থাকা মানুষের মতো।

অধ্যায় চার: স্কেচবুক

ঘরের বাতিটা জ্বালাল না আরিফ। জানালা দিয়ে আসা সন্ধ্যার আলোতেই বসে রইল। ছাদের ফ্যান ঘুরছে ধীরে, বাতাসে গরমের ভার। দেয়ালের পোস্টারের পাহাড়টা এখন শুধু কালো ছায়া—আর কোনো অভিযান ডাকছে না, বরং দূরের কোনো নিশ্চুপ জায়গার মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে খাটের ওপর বসে ব্যাগটা টেনে কাছে আনল, জিপ খুলল, বইখাতার নিচ থেকে স্কেচবুকটা বের করল। মোটা কাগজের কভার, কোণাগুলো একটু ভাঁজ হয়ে গেছে। কয়েক মাস ধরে সে খুলেনি এটা। যেন খুললেই ভেতর থেকে এমন কিছু বেরিয়ে আসবে, যেগুলোকে সে নিজেই ভয় পায়।

খুলতেই কাগজের গন্ধ পেল—হালকা ধুলো আর কাঠের মিশ্রণ। প্রথম পাতায় পুরোনো আঁকা: একটা নদী, ওপারে গাছ, মাঝখানে ছোট্ট নৌকা। তখন সে শুধু দৃশ্য আঁকত। মানুষ কম। মানুষ আঁকতে গেলেই মনে হতো, কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না। আজ সে সরাসরি মানুষ আঁকল।

একটা ডিম্বাকৃতি মুখ।

তারপর চোখ।

চোখ দুটো বড় করে ফেলল।

খুব বড়।

যেন সব দেখছে।

অথবা সব দেখাতে বাধ্য।

চারপাশে সে ছোট ছোট বর্গ আঁকতে শুরু করল—একটার ভেতরে আরেকটা, ঠিক যেমন ক্লাসে বসে খাতার কোণায় আঁকছিল। পিক্সেলের মতো। স্ক্রিনের মতো। বর্গগুলো যত বাড়ে, মাঝখানের মানুষটা তত ছোট হয়ে যায়।

সে থামল।

পাতার দিকে তাকিয়ে রইল।

এই মানুষটা কি সে?

নাকি সবাই যাকে দেখছে?

পেন্সিলের দাগ একটু গাঢ় করল। মুখের কোণে একটা আধখানা হাসি এঁকে দিল—যেন কেউ জোর করে মুখটা টেনে দিয়েছে। তারপর হঠাৎ রাবার দিয়ে ঘষে ফেলল। হাসিটা উঠে গেল, কিন্তু দাগটা রয়ে গেল—ছায়ার মতো।

তার ভেতরটা হঠাৎ হালকা কেঁপে উঠল।

স্কুলের করিডর মনে পড়ে গেল।

হাসি।

ফিসফাস।

মোবাইলের আলো।

সে মাথা ঝাঁকাল। যেন ঝাঁকালেই স্মৃতি ঝরে পড়বে।

আরেকটা পাতা উল্টাল।

এবার সে করিডর আঁকল। লম্বা দেয়াল, জানালা, মেঝের টাইলস। দেয়ালের পাশে একটা ছোট মানুষ—দেয়ালের দিকে মুখ করে হাঁটছে। মাথাটা নিচু। চারপাশে চোখ—শুধু চোখ। শরীর নেই। চোখগুলো ভাসছে।

সে থামল।

নিজেই আঁকায় ভয় লাগছে।

এতদিন সে আঁকত পাহাড়, গাছ, নদী। এখন আঁকছে চোখ।

সে বুঝল—এই চোখগুলো তার মাথার ভেতর ঢুকে গেছে।

দরজার বাইরে বাবার কাশি শোনা গেল। মা কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। স্বাভাবিক জীবন চলছে। অথচ সে যেন ঘরের ভেতর আরেকটা ঘর বানিয়ে ফেলেছে—কাগজের ঘর, পেন্সিলের দেয়াল, যেখানে শুধু তার ভয়গুলো থাকে।

সে আবার আঁকতে লাগল।

একটা মোবাইল ফোন।

স্ক্রিনে তার মুখ।

স্ক্রিনের বাইরে অনেক হাত—হাতগুলো ফোন ধরে আছে, ফোন ছুঁচ্ছে, ফোন ছুড়ে দিচ্ছে অন্যদিকে।

হাতের সংখ্যা গুনতে পারল না।

তারপর সে নিজের অজান্তেই পাতার নিচে লিখে ফেলল—

আমি কি শুধু একটা ক্লিপ?

লেখাটা দেখে সে চমকে উঠল।

সে কি এই কথাটা ভাবছিল?

সে কলম নামিয়ে রাখল।

পাতার দিকে তাকিয়ে রইল।

মনের ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরছে—যদি সে এই কথাগুলো কাউকে বলত? বাবাকে? মাকে? শাওনকে?

ভাবতেই বুকের ভেতর আবার সেই চেপে ধরা অনুভূতি।

না।

সে এখনো বলতে পারে না।

কিন্তু কাগজকে বলা যায়।

কাগজ হাসে না।

কাগজ ভিডিও বানায় না।

কাগজ শুধু ধরে রাখে।

সে আরও আঁকতে লাগল—একটা ছাদ, ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছেলে, চারপাশে অন্ধকার। আকাশে ছোট ছোট আলো—নোটিফিকেশনের মতো। প্রতিটা আলো যেন ডাকছে, কিন্তু কাছে গেলে পুড়ে যাবে।

তার হাত একটু কাঁপছে।

পেন্সিলের দাগ কেঁপে কেঁপে উঠছে।

সে হাত থামাল।

নিজের কব্জি ধরে রইল কিছুক্ষণ।

শ্বাসটা ধীরে নিল।

ছাড়ল।

এই প্রথম সে বুঝল—সে ভয় পাচ্ছে, কিন্তু ভয়টা বেরিয়ে আসছে।

পাতায়।

দাগে।

ছায়ায়।

সে আরেকটা পাতা উল্টাল।

এবার শুধু একটা মুখ আঁকল।

চোখ দুটো বন্ধ।

চারপাশে কোনো স্ক্রিন নেই।

কোনো চোখ নেই।

ফাঁকা।

এই ছবিটা দেখে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা টান লাগল।

এইটা কি সে হতে চায়?

হঠাৎ মনে হলো—এটাই তো আসল লড়াই। সবাই যখন স্ক্রিনে তাকে আটকে ফেলছে, সে কাগজে নিজেকে ছাড়িয়ে দিতে চাইছে।

সে নিচে ছোট করে লিখল—

আমি শুধু যা দেখানো হয়, তা নই।

লেখাটা খুব সুন্দর হয়নি। হাত কাঁপছিল।

তবু সে কাটেনি।

দরজার বাইরে মায়ের ডাক—
—“আরিফ, পড়তে বসবি না?”

সে বলল,
—“একটু পরে।”

এই ‘একটু পরে’র মধ্যে সে কত কিছু ঢুকিয়ে দিল।

ভয়।

লজ্জা।

রাগ।

কিন্তু মা সেটা শুনলেন না।

শুনলেন শুধু শব্দ।

আরিফ আবার পাতার দিকে তাকাল।

স্কেচবুকটা এখন আর শুধু খাতা না।

এটা একটা জায়গা।

যেখানে সে নিজের কথা বলতে পারে।

যেখানে করিডরের চোখ ঢুকতে পারে না।

যেখানে ভিডিও কাটছাঁট করা যায় না।

সে হঠাৎ স্কেচবুকটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরল।

এই কাগজগুলোই এখন তার প্রথম ঢাল।

প্রথম আশ্রয়।

সে জানে না কাল স্কুলে কী হবে।

আরও হাসি?

আরও ফিসফাস?

আরও ভিডিও?

কিন্তু আজ রাতে, এই মুহূর্তে—

সে নিজের গল্পটা নিজে আঁকছে।

পিক্সেলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

অধ্যায় পাঁচ: নতুন ছাত্রী

পরের দিন সকাল থেকেই আরিফের মন অস্থির। ক্লাসে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। বাতাসে শুকনো পাতা উড়ে যাচ্ছে। যেন সেই পাতাগুলোও চুপচাপ আরিফের কণ্ঠে যা নেই তা শুনতে চায়। স্যারের আওয়াজ ফিসফিস করছে পেছনে, কিন্তু আরিফের চোখের সামনে শুধু দরজা। দরজার ওপারে নতুন কেউ দাঁড়িয়ে—মিতু।

মিতু এখনই ক্লাসের তৃতীয় সারিতে বসে। ছোট, আঁচল বাঁধা চুল, চোখের নিচে হালকা ছায়া। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো—সে কোনো হাসি বা ফিসফাসে মনোযোগ দিচ্ছে না। শুধু খাতা খুলে নোট নিচ্ছে। আরিফ প্রথমবার মনে করল, কেউ নিশ্চুপ থাকতে পারলেও চোখ দিয়ে সব দেখানো যায়। মিতুর চোখ ঠিক সেইভাবে তাকিয়ে আছে—চুপচাপ, কিন্তু সব মনোযোগ তার দিকে।

ক্লাসের সবাই ফিসফাস করছে। আরিফ শুনতে পেল, কেউ বলছে—“নতুন, তাই তো খুব চুপচাপ।” আরেকজন, “বিস্তারিত জানব না।” কিন্তু মিতু যেন ওদের কথায় কান দেয় না। সে শুধু নিজে খাতায় লিখছে, চোখে কোনো ভয় নেই।

আরিফের বুক ভারী হয়ে গেল। এ যেন সেই প্রথম মানুষ, যাকে সে সত্যিই দেখার মতো। যে দেখছে, কিন্তু হাসি বানাচ্ছে না। যে শুনছে, কিন্তু কেটে ফেলছে না।

গান্ধী হলে বলা যেত—চুপ থাকা কিন্তু শক্তি। আরিফ প্রথমবার বুঝল, কেউ চুপচাপ থাকতে পারে, কিন্তু তা মানে ভয় নয়।

বেলা বেজে গেছে, ক্লাস শেষে সবাই বেরোচ্ছে। আরিফ ব্যাগ তুলল। মিতু এগিয়ে এল।

—“তোমার আঁকা স্কেচবুকটা দেখেছি,” সে হেসে বলল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে—চোখের কোনো হাসি নেই, শুধু স্বীকৃতি।

আরিফ থমকে গেল। সে জানত—এই স্কেচবুকটা তার ভেতরের ভয় আর লজ্জার ঠিকানা।

—“আমি চাই… আমি শুধু…”, আরিফ কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলা আটকে গেল।

মিতু শুধু মাথা নেড়ে বলল—
—“ঠিক আছে। আমি বুঝতে পারছি।”

ক্লাসের রঙিন হাওয়া, জানালার আলো, ফ্লোরের টাইলস সব মিলিয়ে আরিফ হঠাৎ বুঝল—যে করিডরের চোখগুলো তাকে দেখে, সবই এখন দূরে।

মিতুর চুপচাপ চোখে চোখ রাখার শক্তি যেন সব ক্ষুদ্র তীক্ষ্ণ শব্দগুলোকে থামিয়ে দিল।

আরিফ প্রথমবার স্বীকার করল—সে একা নয়। অন্তত কেউ আছে, যে দেখে, কিন্তু ছিঁড়ে দেয় না।

স্কেচবুকটা ব্যাগে রেখে সে বসে পড়ল। মনে হলো, আজ থেকে হয়তো আর সব কিছুকে একা টানতে হবে না।

ক্লাসের বাইরে বের হয়ে সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে একটু গভীর শ্বাস নিল। বাইরে হালকা বাতাস, ধুলো, পাতা—সবই স্বাভাবিক। কিন্তু তার ভেতরের অশান্তি একটু কমে গেছে।

মিতু কেবল ছিল। আর চুপচাপ থাকা কিছু শক্তি হতে পারে—এটাই হয়তো তার প্রথম পাঠ।

আরিফ বুঝতে পারল—ভয় মানে সব সময় একা থাকা নয়। কখনও কখনও, ভয়কে সামনে রেখে কেউ শুধু দাঁড়িয়ে থাকলে, কিছু পরিবর্তন ঘটে।

স্কুলের করিডরের চোখ, মোবাইলের স্ক্রিন, ফিসফাস—সবই এখন তার চোখে কম ভয়ংকর। অন্তত এই মুহূর্তে।

সে ব্যাগটা আঁকড়ে ধরল।

স্কেচবুকটা বুকের কাছে চেপে রাখল।

মনের ভেতরে এক অদ্ভুত আশা জন্ম নিল।

যে, হয়তো কেউ সত্যিই দেখতে চায়, দেখতে চায় শুধু তাকে, ভিডিও বা হাসির ফ্রেম নয়।

অধ্যায় ছয়: পোস্টার

স্কুলের হলের দেয়ালে লাগানো পোস্টারের জন্য আজ আরিফ ও মিতুর জন্য প্রথম বড় কাজ। তারা দু’জনই ব্যাগ থেকে রঙিন কাগজ, মার্কার, স্কেচবুকের খাতার ফাঁকা পাতা বের করল। মিতু হাতের মধ্যে স্কেচপ্যাড ধরে রেখেছে, আরিফ ব্যাগ থেকে পোস্টার আনছে। বাইরের জানালা থেকে বিকেলের আলো ভেতরে ঢুকছে, মেঝেতে হালকা ছায়া পড়ে। বাতাসে ধুলো ভেসে যাচ্ছে, যেন সময়ও একটু থেমে আছে।

—“তুমি কি মনে করো সবাই আমাদের পোস্টার দেখতে চাইবে?” আরিফ হেসে বলল, কিন্তু চোখে ভয়।

মিতু চুপচাপ হেসে বলল—“না, কিন্তু আমাদের চেষ্টা করার কথা।”

এই সংলাপেই তাদের মধ্যে অদৃশ্য সেতু তৈরি হলো। আরিফ বুঝল—মিতু শুধু দেখছে, মূল্যায়ন করছে না। সে বুঝল, কারও দৃষ্টিভঙ্গি শুধু রাখা বা কেটে ফেলা নয়, বরং কেউ আসলেই বোঝে, সেটাই শক্তি।

হলটা বড়। দেয়ালে পুরোনো স্ক্রিপ্টে লেখা, আর কিছু ছেঁড়া পোস্টার। নতুন পোস্টার লাগানো মানে পুরোনো কিছু সরাতে হবে। আরিফ মার্কার ধরে রাখল। সে লিখতে শুরু করল—বড় বড় অক্ষরে:

“চুপ থাকলে কেউ বুঝে না। কথা বলো। দাঁড়াও। সাহায্য করো।”

মিতু পেন্সিল ধরে রেখেছে। সে কিছু আঁকছে—ছোট ছোট চিহ্ন, চোখ, হাসি, হাত ধরে থাকা হাত। তারা দু’জনের কাজ মিলিয়ে এক রূপক ছবি তৈরি হলো।

কিন্তু হঠাৎ শুনতে পেলেন—পিছন দিক থেকে ফিসফিস। কিছু ছেলেমেয়ের কণ্ঠ। কেউ বলছে—“দেখে নাও, আরিফ ও মিতু আবার নতুন দোষ দেখাতে যাচ্ছে।”

হঠাৎ আরিফের বুকের ভেতর আবার কাঁপুনি। করিডরের দিনগুলো মনে পড়ল। স্ক্রিন, ফিসফিস, হাসি।

মিতু ধীরে তার হাত ধরে বলল—“ভয় পেও না। আমরা শুধু ছবি আঁকছি। আর চেষ্টা করছি।”

এই ছোট কথাটাই যথেষ্ট। আরিফ বুঝল—কেউ পাশে দাঁড়ালেই ভয় হ্রাস পেতে পারে।

হলটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা পোস্টার লাগাতে লাগল। কেউ ফোন বের করে নকল হাসি বানাচ্ছে, কেউ টুকরো টুকরো ফিসফিস করছে, কেউ আবার পেছন দিক থেকে তাদের দিকে নজর রাখছে।

তবু আরিফ আর মিতু থেমে না। তারা আঁকছে, লিখছে, নিজের কথা বলছে। তাদের কাজ এক ধরনের দৃঢ়তা প্রকাশ করছে—যা স্ক্রিনে কখনও দেখা যাবে না।

কিছুক্ষণের মধ্যে পোস্টার লাগানো হয়ে গেল। বড় বড় অক্ষরে লেখা, চোখ, হাত, হাসি—সব মিলিয়ে এক নতুন দৃশ্য। তারা দু’জন একে অপরের দিকে তাকাল।

—“শেষ হয়েছে,” মিতু হেসে বলল।

আরিফ মাথা নেড়ে হেসল। বুকের ভিতরের ভার হালকা হয়ে গেল।

হলটা আবার শান্ত। আলো ঠিকঠাক পড়ছে। বাইরে জানালার বাতাস হালকা। কিন্তু আরিফ জানে—স্কুলের চোখ এখনো তাদের দিকে আছে।

কেউ কোনো শব্দ করছে না।

কেউ মোবাইল বের করল না।

কিন্তু তাদের পোস্টার আরেক ধরনের কথা বলছে—ভয়কে চ্যালেঞ্জ করা যায়। ভয়কে কাটানো যায়।

আরিফ ব্যাগ তুলে খুঁজতে লাগল তার স্কেচবুক।

মিতু বলল—“তোমার গল্পটা আমাদের পোস্টারের মতোই। প্রথমে ভাঙা মনে হলেও, কেউ পাশে থাকলেই শক্তি হয়।”

আরিফ বুঝল—সেই শক্তি আজ প্রথমবার স্পর্শ করল।

হল থেকে বেরোতে গিয়ে তারা একে অপরের দিকে চেয়ে হালকা হেসল।

মোবাইলের স্ক্রিনে আজকের ছবি ধরে রাখার চেষ্টাও অপ্রয়োজন। কারণ বাস্তব চোখ সবসময় স্ক্রিনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।

হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মাথার ভেতর আরেকটা কথা ঘুরছে—ভয় মানেই সবসময় একা থাকা নয়। ভয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করলে, এক নতুন গল্প শুরু হয়।

অধ্যায় সাত: ছায়ার মুখ

দিন শেষ হওয়ার পর স্কুলের করিডর ফাঁকা হতে শুরু করল। কিন্তু আরিফের ভেতর আজও সেই করিডরের চোখের স্মৃতি কেঁপে ওঠে। পোস্টার লাগানো শেষে সে মিতুর সঙ্গে এক পাশের বেঞ্চে বসে আছে। নরম বিকেলের আলো জানালা দিয়ে ভেসে আসছে। বাতাসে শুকনো পাতা, দূরের গাছের শাখা ঘুরছে। তবু আরিফের মন খুব ভারী। মনে হলো, আজকের দিনটা শুধু পোস্টারের জন্য নয়—কোনো কিছু উন্মোচনের জন্যও।

হঠাৎ পেছন দিক থেকে কণ্ঠ ভেসে এলো। চুপচাপ, কিন্তু তীক্ষ্ণ—একটি ফিসফিস। কেউ বলল—“আরিফ, তুমি জানো কি কারা ভিডিওটা বানিয়েছে?”

আরিফ চোখ বড় করে করিডরের ফাঁকা দেয়াল দেখে। সে কিছু বুঝতে পারল না। তখন মিতু, ধীরে কণ্ঠে বলল—“আমি জানি।”

আরিফ ঘুরে তাকাল। মিতুর চোখের দিকে তাকিয়ে সে প্রথম বুঝল—এটা আর কোনো সাধারণ ধারণা নয়। এটা বাস্তব তথ্য।

মিতু বলল,
—“ছেলেটা, যে ভিডিও বানিয়েছে, আজকে ক্লাসে ছিল। সে একেবারে চুপচাপ, কিন্তু চোখে সব ছাপ রেখেছে।”

আরিফের বুকের ভেতর ঝাঁকুনি। করিডরের চোখগুলো আবার জীবিত হয়ে উঠল মনে হলো।

—“কিন্তু সে…?” আরিফ আটকে গেল।

—“হ্যাঁ,” মিতু বলল, “সে শুধু ফিসফিস করে নয়, সে স্ক্রিনের ভেতর থেকে সবাইকে দেখেছে। আর নিজের ভয় লুকিয়েছে। তুমি যেমন ভেবেছ, তারও ভেতর ভয় ছিল, শুধু সে সেটা ঢেকে রাখেছে।”

আরিফ মাথা নেড়ে বলল, “কিন্তু কেন?”

মিতু চুপচাপ এক হাত দিয়ে আরিফের কাঁধে টাচ দিল। “কারণ সবাই দেখবে, হাসবে। কেউ বুঝবে না তার কারণ।”

এই কথা আরিফের বুকের ভেতর আরও ভারী হয়ে গেল। সে এবার প্রথমবার ভাবল, ভিডিও ছড়ানো ছেলেটারও নিজের নীরবতার গল্প আছে। শুধু সে ভুল জায়গায় প্রকাশ পেল।

হঠাৎ বাইরে খেলার মাঠের আওয়াজ ভেসে এলো। বাচ্চাদের পা, বলের টপ টপ শব্দ, হাসি। করিডরের ফাঁকা দেয়াল যেন সব শব্দ শোষণ করছে। আরিফ জানল, প্রতিটি ছেলেমেয়ের চোখে তারা নিজেদের মতো ভাঙন লুকিয়ে রাখে।

মিতু এবার ধীরে বলল—“আরিফ, তুমি জানো কি? ছেলেটার নাম… তার চোখের ভেতরে যে ছায়া আছে, সেই ছায়া সবাই দেখেছে। ভিডিওতে তুমি, তারাও, সবাই। কিন্তু আমরা সবসময় শুধু হাসি দেখেছি। সে হাসি লুকিয়ে রাখে, ভয় লুকিয়ে রাখে।”

আরিফ মাথা নেড়ে, বুক ভারী করে শ্বাস নিল। হঠাৎ করিডরের বাতাস তাকে চেঁচিয়ে বলছে—সব দেখছে, সব শুনছে।

—“সে ঠিকই বলেছে, ‘চুপ থাকলে মানুষ মনে করে বুদ্ধিমান’। কিন্তু সত্য হলো—ভয় লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।”

মিতু উঠে দাঁড়াল, আরিফকে হাত দিয়ে টেনে তুলে বলল—“এসো, আমরা এটাকে ঠিক করি। আমরা পোস্টারের মতোই, চোখে চোখ রাখব, কিন্তু কেউ ভাঙবে না।”

দু’জন করিডরের মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেল। দূরের জানালার আলো যেন তাদের পিছনে ছায়া ফেলছে। আরিফ বুঝল—আজ থেকে শুধু স্ক্রিন নয়, বাস্তব চোখও তার গল্প দেখতে চাইছে।

তাদের পেছনে যে ছেলেটি ভিডিও বানিয়েছিল, সে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ, মাথা নীচু। কিন্তু আরিফ প্রথমবার তার চোখে ভয়ের প্রতিচ্ছবি দেখল। সে শুধু ভিডিওর “ছায়া মুখ” ছিল, আর আজ বাস্তব চোখের সামনে দাঁড়াল।

আরিফের মনে হলো—যে ছায়া এতদিন তাকে ভেঙেছে, আজ সেই ছায়ারও মানুষ আছে।

মিতুর হাত শক্ত করে ধরে সে ভিতরে বলল—“ভয় মানে সবসময় একা থাকা নয়। কখনও কখনও, ভয়কে দেখলেই দেখা যায়, আসল মানুষ কে।”

দু’জন আবার পেছনের করিডর দিয়ে বেরোতে লাগল। পায়ের শব্দ, বাতাসের ফিসফিস, দূরের লাফ—সব মিলিয়ে মনে হলো, এক নতুন দিন শুরু হয়েছে।

স্ক্রিনের ভেতরের হাসি আর ছায়া, বাস্তব চোখে চোখ—সব মিলিয়ে আরিফ প্রথমবার বুঝল, ভয়ের মুখ শুধু ভয়ই নয়। তা আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার প্রথম ধাপ।

অধ্যায় আট: কাউন্সেলিং রুম

কাউন্সেলিং রুমের দরজা খুলতেই আরিফের বুকের ভেতর কাঁপুনি বেড়ে গেল। রুমটা ছোট, সাদা দেয়াল, একটা মেঝের কার্পেট, আর এক কোণে চেয়ারের সারি। মাঝখানে ডেস্ক। ডেস্কের ওপর গরম কফির কাপ, নোটবই, কলম। কিন্তু সবকিছুর চেয়ে ভয়ংকর মনে হলো—ফাঁকা চেয়ার। কাউন্সেলরের চেয়ার, যা আরিফের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেন প্রশ্ন করছে—“তুমি কি সত্যিই বলতে পারবে?”

সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো, যেদিন করিডরের চোখ তাকে ভেঙেছে, সেই চোখগুলো এখনও তার চোখে অদৃশ্য হয়ে ভেসে আছে। হাত কাঁপছে। গলা শুকিয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে চেয়ারটার দিকে এগোলো।

—“বসো,” কাউন্সেলরের কণ্ঠ কোমল, কিন্তু দৃঢ়।

আরিফ বসল। পা কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতর কিছু একটা চাপা ধাক্কা খাচ্ছে। প্রথমে কিছুই বলার সাহস নেই। তারপর কণ্ঠটা বের হলো—কাঁপা, ছোট্ট, গোঁফের মতো।

—“আমি… আমি… ভিডিও…”

কাউন্সেলর কেবল মাথা নেড়ে শুনছেন। কোনো বিচলনা নেই। কোনো হাসি নেই। শুধু চোখে চোখ রাখছেন। আরিফের গলার শব্দ আর ভয় একসাথে ঘরটি ভরে দিল।

—“স্কুলের করিডরে, সবাই… আমার দিকে… হা…”

কণ্ঠ থেমে গেছে। শ্বাস নিতে নিতে হাতগুলো বসের নিচে জড়িয়ে ধরল। বুক ভারী হয়ে গেছে। চোখে পানি জমছে।

কাউন্সেলর ধীরে বললেন—“এটা স্বাভাবিক। তুমি একা নও। ভয় স্বীকার করাটা শক্তি।”

আরিফ মাথা নেড়ে, আবার ছোট্ট গলায় বলল—“কেউ বুঝবে না। সবাই হাসবে। আমি… আমি লজ্জা পাচ্ছি।”

কাউন্সেলর আবার চোখে চোখ রেখে বললেন—“তাদের হাসি তোমার কথা বলার আগেই রোখে না। তুমি যদি নিজের গল্প বলো, সে তোমার হয়ে যাবে। ভয়কে চুপ না রেখে বলার শক্তি দেখাবে।”

আরিফ চোখ মুছে নিল। মনে হলো, এই প্রথম কেউ তার কথা শুনছে, তবে কেটে ফেলে বা ফ্রেমে বন্দী না করে। শুধু শুনছে। বোঝছে।

কিছুক্ষণের জন্য সে নীরব হয়ে রইল। রুমের শীতল বাতাস, ডেস্কের কলমের আওয়াজ, দূরের হালকা পা ভেসে এলো—সব মিলিয়ে যেন তার মনকে শান্ত করছে।

শেষ পর্যন্ত সে ছোট্ট হেসে বলল—“আমি… আমি চাই, কেউ বোঝুক। আমি ভয় পাই, আর… কেউ ভিডিও বানিয়েছে।”

কাউন্সেলর মাথা নেড়ে বললেন—“ঠিক আছে। তুমি এটি বলেছ। এবার আমরা একসাথে ভাবব, কীভাবে তুমি ভয়কে মোকাবিলা করবে। তুমি একা নও।”

আরিফ বুক ভরে শ্বাস নিল। মনে হলো, সেই চাপে ভরা করিডরের চোখ আর ভিডিওর স্ক্রিন একটু হ্রাস পেল।

ফলে, প্রথমবার সে বুঝল—ভয় স্বীকার করলে তা চুপচাপ ভেতরে জমে থাকে না। কথা বললেই, অদৃশ্য লুকানো ভয় আলোকিত হয়, আর অন্তরের ভারি চাপ হালকা হয়।

আরিফ ধীরে চেয়ারের পিঠে মাথা দিল। মনে হলো, আজ থেকে সে শুধু স্ক্রিনে আটকে নেই। বাস্তব মানুষ—কাউন্সেলর, মিতু, এবং নিজের ভেতরের সাহস—এবার তার পাশে আছে।

রুমের নীরবতা আর আলো এক নতুন শক্তি এনে দিল। আরিফ বুঝল, কথার শক্তি কখনও কখনও স্ক্রিনের চেয়ে বড়।

অধ্যায় নয়: অনলাইন যুদ্ধ

ঘরে বসে আরিফের চোখ কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে টিকেই আছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ—সবই আজ তার যুদ্ধক্ষেত্র। ভিডিও, যা গতকাল ক্লাসে পোস্ট হয়েছিল, এখন একাধিক গ্রুপে ছড়িয়ে পড়েছে। তার নোস্টিফিকেশন বার গর্জন করছে। প্রতিটা লাল দাগের নোটিফিকেশন যেন বুকের ভেতর ভাঙা ঢেউ ছুড়ে দিচ্ছে।

সে প্রথমে ভিডিও সরানোর চেষ্টা করল। ক্লিক, রিপোর্ট, মেসেজ—সব। কিন্তু প্রতিটি ক্লিক যেন নতুন সমস্যা। নতুন লিংক, নতুন গ্রুপ, নতুন স্ক্রিন। প্রতিটি স্ক্রিনের ভেতর একই চোখ, একই হাসি। স্ক্রিনের বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ জোরে ফিসফিস করছে। কেউ কমেন্টে লিখছে—“আরে ভাই, আবার কেমন নাটক?”

আরিফ মনে মনে চিৎকার দিতে চাইল। হাত কাঁপছে। চোখ লাল। বুকের ভেতর আবার সেই ভার। সে জানে—যত দ্রুত ভিডিও সরানোর চেষ্টা করবে, চাপ তত বাড়ছে।

মিতু পাশে বসে দেখে। চুপচাপ। কখনও ধীরে বলে—“শান্ত হও। একটু ধীরে ধীরে। আমরা একসাথে আছি।”

কিন্তু শব্দগুলো বাইরে গিয়ে ট্রলদের চোখে পৌঁছাচ্ছে। অনলাইন চ্যাটে কেউ লিখছে—“এতো ভয় পাওয়ার কি আছে? ভাই, একটু হেসে নাও।” কেউ ছবি বানাচ্ছে, মিম বানাচ্ছে। প্রতিটি কমেন্ট যেন তার ভেতরের ভাঙনকে আরও গাঢ় করছে।

আরিফ নিজের পিছে তাকালো। কারও শারীরিক উপস্থিতি নেই। তবু সে চেপে ধরছে মনে, স্ক্রিনের ভেতর কেউ আছে। চোখের সামনে হাসি, ভয়, অপমান—সবই একসাথে ভেসে আসছে।

সে হঠাৎ ঠিক করল—রিপোর্ট করবে। প্রতিটি লিঙ্ক, প্রতিটি গ্রুপ। নোটিফিকেশন, রিপোর্ট, ফর্ম, স্ক্রিনশট। ঘরটা এখন তার যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি স্ক্রিনের পলক—সবই তার আত্মসম্মান বাঁচানোর জন্য।

কিন্তু সাথে সাথে চাপ বেড়ে যাচ্ছে। বুক ভারী। ঘাম। হাত কাঁপছে। ফোনটা বারবার বাজছে। মেসেজ। কল। নতুন কমেন্ট। আরিফ থমকে যায়।

মিতু আবার বলল—“আরিফ, ভয় দেখলে স্ক্রিন ভয় বাড়ায়। তুমি যেভাবে মোকাবিলা করছ, সেটা সাহস। তুমি একা নও।”

আরিফ হালকা হেসে, আবার ক্লিক করল। প্রতিটি লিঙ্ক, প্রতিটি স্ক্রিন—এখন সে শুধু ভিডিও সরাচ্ছে না। সে নিজের ভেতরের ভয়, লজ্জা, লড়াই—সবকে সামলাচ্ছে।

কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো, অনলাইন স্ক্রিন শুধু অপমান নয়। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে তা শক্তি। ভিডিও সরানো, রিপোর্ট করা—সবই তার নিজের গল্পকে ফিরে পাওয়ার ছোট ছোট পদক্ষেপ।

হঠাৎ চুপচাপ হল। নোটিফিকেশন কমে গেল। স্ক্রিনে নতুন কিছু নেই। চাপ হ্রাস পেল। কিন্তু মনে হলো—কাল আবার শুরু হবে। নতুন ভিডিও, নতুন ট্রল, নতুন ফিসফিস।

আরিফ জানল—এই যুদ্ধ শেষ নয়। তবে আজ সে প্রথমবার নিজেকে লড়তে দেখেছে। ভেতরের ভয়, চাপে থাকা হৃদয়, শিহরণ—সব মিলিয়ে এক নতুন শক্তি।

সে ফোন বন্ধ করে ডেস্কে মাথা রেখে শ্বাস নিল। চোখে জল, তবে কিছুটা হালকা। হঠাৎ বুঝল—স্ক্রিনের চোখ সবসময় ভয় দেখায় না। কখনও কখনও সে চোখই নিজেকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

আরিফ প্রথমবার অনুভব করল—ভয়কে সরাসরি মোকাবিলা করা মানে একধরনের স্বাধীনতা।

অধ্যায় দশ: ভেঙে পড়া

সকালবেলার ক্লাস শুরু হওয়ার সাথে সাথে আরিফের বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ বেড়ে গেল। করিডরের চোখ, স্ক্রিনের ফিসফিস, অনলাইন ট্রলদের মন্তব্য, এবং নিজের ভেতরের ভয়—সব মিলিয়ে এত ভারী হয়ে উঠল যে মনে হলো, প্রতিটি শ্বাসে তার ফুসফুসের ভেতর পাথর জমে যাচ্ছে। হাত কাঁপছে। চোখ ম্লান। সে চেয়ারে বসেই নিজেকে ধরে রাখতে চেষ্টা করছে। স্যার বোর্ডে লিখছেন, পড়াচ্ছেন—কিন্তু আরিফের ভেতর প্রতিটি শব্দ যেন আঘাতের মতো পড়ছে।

হঠাৎ ক্লাসরুমের আলো, ছাত্রদের হাসি, কলমের আওয়াজ—সবই তার চারপাশে ঘূর্ণায়মান হয়ে ওঠল। গলা শুকিয়ে গেছে। হঠাৎ মনে হলো, সে আর কিছু শুনতে পারছে না। চোখের সামনে অন্ধকার ভেসে আসছে। কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে, কেউ নয়। শুধু দৃষ্টি। আরিফ বুঝল—স্কুলের প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি ফিসফিস, প্রতিটি স্ক্রিনের চোখ আজ তার উপর চাপিয়েছে সব।

মাথা ভারী, হাত-মাথা মিলিয়ে বুক চেপে ধরছে। হঠাৎ ক্লাসে বসে সে অনুভব করল—পা আর কাজ করছে না। হঠাৎ বুকের ভেতর কাঁপুনি, মাথা ঘুরছে। চোখে ধোঁয়া। এক মুহূর্তে সব ধ্বংসের মতো অনুভূত হলো। আরিফের দেহ শিথিল হতে লাগল। চেয়ার থেকে তার শরীর হঠাৎ হেলে পড়ল।

ছাত্ররা চিৎকার করতে শুরু করল। স্যার ছুটে এলেন। আরিফের হাতে কেউ জল দিতে ধরল। তার চোখে জল। বুকের চাপ হ্রাস পেল না, বরং হৃদয়ের ভেতর অদৃশ্য ভয় আরও গভীর হলো। সে নিজেকে বুঝতে পারল না। কারও মুখ, কারও কথা—সবই দূরে। কেবল ভেতরের কণ্ঠ, যা বলে—“আমি ভেঙে পড়ছি, আমি একা।”

কাউন্সেলরের কথা মনে হলো। কথাগুলো, “ভয় স্বীকার করাটা শক্তি”—আজ প্রথমবার সত্যি। কিন্তু এতক্ষণ দেরি হয়ে গেছে। তার শরীর তার মনের কথা বহন করতে পারছে না।

হঠাৎ কেউ তাকে সাপোর্ট করল। একজন বন্ধু হাত ধরে দাঁড় করালো। আরিফ চোখ খুলল। ক্লাসের আলো, বন্ধু, শিক্ষক—সবই তার ভেতরের ভাঙনকে দেখতে পাচ্ছে। বুকের ভার হালকা হচ্ছে।

এই অজ্ঞান হয়ে পড়া মুহূর্তে আরিফ বুঝল—স্ক্রিনের চোখ, করিডরের হাসি, অনলাইন ট্রলরা—সবই তার ভেতরের ভয়কে মাত্র বহিঃপ্রকাশ করেছিল। কিন্তু পাশে কেউ থাকলেই, কেউ শুনলেই, সেই ভয়কে সামলানো যায়।

আরিফের হাত কাঁপছে, চোখ এখনও জলভরা। বুকের ভেতর ধীর-ধীরে নতুন শক্তি জন্ম নিচ্ছে। ভাঙন মানে সবসময় শেষ নয়। কখনও কখনও, ভাঙা দেহ এবং চাপের শারীরিক প্রকাশই নিজেকে নতুনভাবে দেখার প্রথম ধাপ।

সে নিজেকে সাপোর্টের মধ্যে পেয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস নিল। মনে হলো—আজ থেকে আর সে শুধু স্ক্রিনের ভয় বা ট্রলদের চাপে আটকে থাকবে না। ভাঙা হলেও, সে দাঁড়াতে জানে। ভাঙা মানে শেষ নয়। এটি নতুন শুরু।

অধ্যায় এগারো: বাবার গল্প

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকছে। আরিফের ঘরে বাতি জ্বালানো হয়নি। সে সোফার কোণে বসে আছে, বুকের মধ্যে এক ধরণের অস্থিরতা। তবে আজকের অস্থিরতা আর একাকীত্ব নয়—এটা জানা এবং বোঝার চাওয়ার। বাবার চেহারা জানালার পাশে আলোয় হালকা ঝলমল করছে। সে ধীরে বসেছে। চায়ের কাপ হাতে ধরে।

—“বাবা, আপনি… স্কুলে এইসব কি কখনও হয়েছে?” আরিফ কণ্ঠ কাঁপছে। চোখে অদ্ভুত আশঙ্কা।

বাবা প্রথমে চুপচাপ তাকালেন। তারপর হালকা হেসে বললেন—“আমারও কিশোর বয়সে অনেক কিছু হয়েছিল, আরিফ। কেউ ভাবত না যে আমি ভয় পাই, কেউ বুঝত না। তবু, ভেতরের অনুভূতিগুলো সবসময় ছিল।”

আরিফ মাথা হেলিয়ে শোনছে। বাবা চায়ের কাপ রেখে এগিয়ে বসলেন। চোখে আলো, কিন্তু ভেতরে কষ্টের ছাপ।

—“একবার,” বাবা শুরু করলেন, “আমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ আমাকে ট্রল করেছিল। স্কুলে, ক্লাসে। হাসি, ফিসফিস, ভিডিও—সবই ছিল। আমি বুঝতাম, সবাই শুধু মজা করছে, কিন্তু ভিতরে আমার বুকটা কেঁপে উঠত। আমি চুপচাপ থাকতাম, কারো সঙ্গে শেয়ার করতাম না। কারো কাছে সাহস নেই—ভয় ছিল।”

আরিফের চোখ বড় হয়ে গেল। নিজের চোখের সামনা—যেমন করিডরের চোখ, স্ক্রিনের চোখ, অনলাইন ট্রলদের চোখ—বাবার কথার সঙ্গে মিল খাচ্ছে।

—“কিন্তু বাবা, আপনি কি একা ছিলেন?” আরিফ জিজ্ঞাসা করল।

—“না,” বাবা বললেন, “আমার মা, একজন ভালো শিক্ষক, আমাকে বুঝতে চেষ্টা করতেন। শুধু বোঝাতেই নয়, কখনও কখনও কেবল পাশে থাকত। আর একদিন, আমি চুপচাপ না থাকলেও, সেই ভয় আমাকে শক্তি দিয়েছে। ভয়ের সঙ্গে লড়াই শিখিয়েছি। আরিফ, ভয় মানে সবসময় হার নয়। ভয়কে স্বীকার করলেই তুমি শক্তিশালী হতে পারো।”

আরিফ অনুভব করল—বাবার চোখের গভীরতা, তাদের সংলাপের নীরবতা, পুরো ঘরের আলো—সব মিলিয়ে এক ধরণের শান্তি। প্রথমবার সে বুঝল, বাবা শুধু গল্প শোনাচ্ছেন না। তিনি দেখাচ্ছেন—ভয়কে নিজের মধ্যে বেঁধে রাখার পরিবর্তে, তা শেয়ার করলে তা হালকা হয়।

—“আপনি কি… আমি কি, আপনি যেমন শক্তি পেয়েছিলেন, আমি কি সেই শক্তি পেতে পারি?” আরিফ কণ্ঠ কাঁপছে।

—“অবশ্যই,” বাবা হেসে বললেন। “কিছুক্ষণের জন্য ভাঙা লাগলেও, ভয়কে স্বীকার করলেই তুমি নিজের গল্পের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারো। আরিফ, মনে রেখো, ভয় মানে সবসময় হার নয়। তুমি এখন যে ভাঙা অবস্থায় আছো, তা নতুন শক্তির প্রথম ধাপ।”

আরিফের বুকের ভার হালকা হতে লাগল। চোখের জল লুকাতে চেষ্টা করল। তবে এবার কেবল ভয় নয়—একধরনের নতুন আশা, নতুন দৃঢ়তা।

ঘরের নীরবতা আবার আস্তে আস্তে স্থির হলো। চায়ের কাপগুলো হালকা ধ্বনিতে ডেস্কে রাখা হলো। বাবা ও ছেলে, দুইজনই জানল—এটি শুধু গল্প নয়। এটি সংলাপ, শিখন এবং এক নতুন বন্ধনের সূচনা।

আরিফ প্রথমবার ভেতরে অনুভব করল—স্ক্রিনের চোখ, করিডরের হাসি, অনলাইন ট্রল—সবই এখন তার বাস্তব চোখের সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। তিনি জানলেন, ভয়কে স্বীকার করা মানে হার নয়। এটি শিখার প্রথম ধাপ।

অধ্যায় বারো: দেয়ালের লেখা

স্কুলের সকাল ধীরে ধীরে খোলা বাতাসে মিশছিল। সাপ্লিমেন্টারি ক্লাস শেষে আরিফ ব্যাগটা টেনে নিয়ে পেছনের চত্বরে দাঁড়াল। পাশে মিতু, ব্যাগে রঙিন পেন্সিল, চিত্রনির্দেশক মার্কার, স্কেচবুক—সবই প্রস্তুত। আজ তাদের উদ্দেশ্য বড়—স্কুলের প্রধান দেয়াল, যেটি পুরনো পোস্টার আর টুকরো টুকরো স্ক্র্যাচ দিয়ে ভরা, সেই দেয়ালটাকে তারা নতুন জীবনের স্পর্শ দিতে চায়।

—“আরিফ, তুমি কি সত্যিই নিশ্চিত? আমরা কি এটা করতে পারি?” মিতু বলল, কণ্ঠে লাজুক উত্তেজনা।

—“হ্যাঁ… আমরা চেষ্টা করব। শুধু চেষ্টা। এটা হয়তো পরিবর্তন আনার প্রথম পদক্ষেপ,” আরিফ ধীরে বলল। বুকের ভেতর আগের ভয়, ট্রল, ভিডিও, করিডরের ফিসফিস—সব মিশে আছে। তবে আজ কিছু ভিন্ন। পাশে মিতু আছে। তার চুপচাপ সমর্থন।

দু’জন ব্যাগ খুলল। রঙিন মার্কার, ব্রাশ, রঙ, স্কেচবুক, সমস্ত কিছু টেবিলে সাজানো হলো। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে তারা প্রথমে স্কেচ করার জন্য রঙিন চকলেটের মতো সাদা স্থান চিহ্নিত করল। দেয়াল বড়, তবে তাদের চোখে এই প্রজেক্ট একধরনের যুদ্ধক্ষেত্র। এটি শুধু ছবি নয়। এটি তাদের ভেতরের গল্প, তাদের ভয়, এবং তাদের নতুন শক্তি প্রকাশ করার মাধ্যম।

হঠাৎ, স্কুলের প্রধান শিক্ষক এগিয়ে এলো। তিনি দৃষ্টিতে স্থির, তবে চেহারায় বিনয়।

—“তোমরা কি করছ?” প্রধান শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন।

—“স্যার, আমরা অনুমতি নিয়ে দেয়ালে বুলিং-বিরোধী শিল্পকর্ম আঁকতে চাই। যাতে সবাই বুঝতে পারে, ভয়কে মোকাবিলা করা যায়, কেউ একা নয়,” আরিফ বলল।

স্যার প্রথমে চুপচাপ তাকালেন। তারপর ধীরে বললেন—“ভালো, তবে সাবধান। স্কুলের নিয়ম মানো। অন্য শিক্ষার্থীর জন্যও এটি উদ্বুদ্ধ হতে হবে।”

আরিফ ও মিতু একসাথে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। প্রধান শিক্ষকের চোখে এক ধরণের অনুমোদন এবং মৃদু প্রেরণা দেখা গেল।

দু’জন চুপচাপ দেয়ালের কাছে চলে গেল। আরিফ প্রথমে দেয়ালের বিশাল, ফাঁকা স্থান দেখল। মনে হলো, এই ফাঁকা দেয়াল যেন তাদের ভেতরের ভয়কে শোষণ করতে চাইছে। মিতু কপালে হাত দিয়ে দেয়ালটি অঙ্কন করতে শুরু করল।

—“আমরা কি প্রথমে চোখ আঁকব?” মিতু জিজ্ঞাসা করল।

—“হ্যাঁ। চোখ মানে সবাইকে দেখার প্রতীক। শুধু দেখবে, তবে আঘাত করবে না। সেই গল্প,” আরিফ বলল।

তারা দু’জন একসাথে কাজ শুরু করল। ব্রাশ, মার্কার, রঙ—সব মিলিয়ে দেয়ালে প্রথম চোখ। চোখগুলো বড়, গভীর, চারপাশে ছোট ছোট হাতের দাগ। হাতগুলো যেন ভাঙা আত্মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। আরিফ আঁকছে, মিতু পাশে হাত ধরছে, চুপচাপ।

ধীরে ধীরে রঙিন রঙ ছড়িয়ে পড়ল দেয়ালে। চোখের মধ্যে আলোর প্রতিফলন। হাত ধরে থাকা হাত। এক কোণে ছোট্ট হাসি।

—“দেখো, আরিফ, এটি শুধু ছবি নয়। এটি আমাদের গল্প,” মিতু বলল।

—“আমি জানি। কিন্তু এখনও মনে হয় কেউ হাসবে, কেউ ভিডিও করবে। আমি ভয় পাচ্ছি,” আরিফ স্বীকার করল।

—“ভয় থাকবে। কিন্তু আমরা একসাথে আছি। একসাথে চেষ্টা করলে, ভয় হ্রাস পাবে। এটিই মূল কথা,” মিতু শান্ত কণ্ঠে বলল।

দু’জন কয়েক ঘণ্টা কাজ করল। রঙ ছড়িয়ে পড়ল, চিহ্ন আঁকা হলো, রূপক ছায়া ফুটে উঠল দেয়ালে। তাদের হাত কাঁপছে, ঘাম। কিন্তু চোখে নতুন দীপ্তি।

হঠাৎ কিছু শিক্ষার্থী চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকালো। কেউ ফোন তুলল না। কেউ ফিসফিস করল না। শুধু দেখল।

—“দেখো, তারা আসলেই দেখছে,” আরিফ চুপচাপ বলল।

কাজ শেষ হওয়ার আগে, তারা একটি বড় লেখা করল—“ভয়কে চ্যালেঞ্জ করো, একা নয়।”। শব্দগুলো বড়, রঙিন। চোখের পাশে ছোট হাত, মুখের পাশে হাসি, চারপাশে আলো—সব মিলিয়ে এক দৃশ্য।

দু’জন কাজ শেষ করে পেছনে দাঁড়িয়ে তাকাল। দেয়াল তাদের গল্প বলছে। প্রতিটি রঙ, প্রতিটি রেখা, প্রতিটি চোখ—সবই তাদের ভেতরের ভয়কে প্রকাশ করছে, কিন্তু শক্তি দেখাচ্ছে।

বন্ধুরা আসতে শুরু করল। প্রথমে চুপচাপ। তারপর কেউ বলল—“দারুণ লাগছে!”। কেউ বলল—“আমি আগে বুঝতাম না, ভয় মানে সবসময় হার নয়।”

ছাত্রছাত্রীরা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে নতুন ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হলো। আরিফ জানল—এটি শুধু ছবি নয়। এটি শিক্ষার মাধ্যম। ভয়ের গল্পকে পরিবর্তনের শক্তি দেখাচ্ছে।

মিতু হাসল। আরিফও। ঘরের মধ্যে, দেয়ালের সামনে, ধীরে ধীরে নতুন আলো।

এখনো ভিডিও নেই। কোনো ট্রল নেই। শুধু বাস্তব চোখ, বাস্তব অনুভূতি।

এই প্রথম তারা বুঝল—ছবি ও শব্দ মিলিয়ে একটি দেয়াল কেবল রঙ নয়। এটি গল্প। এটি ভয়ের সঙ্গে লড়াই। এটি প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বলছে—“তুমি একা নও।”

       দেয়াল শেষ করার পর প্রথম রিঅ্যাকশন আসতে শুরু করল। ক্লাসের বন্ধুদের চোখে এক অদ্ভুত বিস্ময়, একটু দ্বিধা, আর একধরনের প্রশংসা মিশে আছে। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকাল। কেউ ধীরে ধীরে চুম্বকতার মতো দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল। আরিফ ও মিতু একসাথে দাঁড়িয়ে দেখছে—ছবি শুধু রঙ নয়, ভাবের প্রতিফলন।

—“দারুণ লাগছে,” হাসি মুখে একজন বলল।
—“আমি আগে বুঝতাম না, ভয় মানে সবসময় হার,” অন্যজন যোগ করল।

আরিফের বুকের ভেতর ঢেউ উঠল। এই প্রথম, সে শুধু দেখছে না, অনুভব করছে—তার ভয়, চাপ, ট্রল, ভিডিও—সব কিছু এখন অন্যদের চোখে পড়ছে, কিন্তু আর ভয় তৈরি করছে না। বরং অন্যদের জন্য শিক্ষার এক ক্ষুদ্র আলো জ্বালাচ্ছে।

মিতু পাশে এসে বলল—“দেখো, আমরা শুধু ছবি আঁকিনি। আমরা গল্প বলেছি। কেউ যদি একবার দেখল, মানে আমরা সফল।”

ছাত্ররা একে অপরকে চোখে চোখ দিয়ে দেখল। কেউ লাজুক, কেউ কৌতূহলী। কেউ জানতে চাইল—“আমরা কি সাহায্য করতে পারি?”। আরিফ ও মিতু একে অপরের দিকে তাকাল। প্রথমবার তারা বুঝল—ভয়কে স্বীকার করার পর, সমর্থনের হাত বাড়ানো সহজ হয়।

হলটা এখন অন্য রকম। দেয়ালের রঙ, চোখ, হাত, হাসি—সব মিলিয়ে শুধু শিল্পকর্ম নয়। এটি একটা বার্তা, একটি নীরব ডাক, যা সবাইকে বলে—“তুমি একা নও। ভয়কে চ্যালেঞ্জ করো।”

দু’জন ধীরে স্কুলের অন্যান্য দেয়ালগুলোও দেখল। ছোট্ট অক্ষর, ছোট্ট হাত—প্রতিটি শিক্ষার্থী আগ্রহী হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ নিজের স্কেচবুক খুলল, কেউ রঙের টুকরো আনল। আরিফ প্রথমবার বুঝল, এক জুটি চেষ্টা শুধু নয়, এটা পুরো স্কুলকে একত্র করতে শুরু করেছে।

পরের দিন খবর ছড়িয়ে গেল। অনলাইনেও কিছু ছবি পোস্ট হলো—স্কুলের অনুমতি নেওয়া হলেও, ছোট্ট ভিডিও ক্লিপ, ছবি, এবং স্ট্যাটাসগুলো ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিটি কমেন্ট ইতিবাচক।

—“দারুণ,” একজন লিখল।
—“আমার স্কুলেও এই ধরনের কিছু করা দরকার।”
—“আমাদেরও চেষ্টা করা উচিত।”

আরিফ মনেই ভাবল—স্ক্রিনের চোখ, যা এতদিন ভয় দেখিয়েছে, এবার শক্তি দেখাচ্ছে। ভয়কে প্রকাশ করার সাহস ইতিবাচক বার্তা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

মিতু ধীরে বলল—“আরিফ, দেখছো? ভয় স্বীকার করলেই, তুমি শুধু নিজের জন্য লড়াই করো না। তুমি অন্যদের জন্যও নতুন দিশা দেখাচ্ছো।”

আরিফ মাথা নেড়ে হেসে উঠল। বুকের ভেতর ভার হালকা।
—“আমি বুঝতে পারছি। এটা শুধু দেয়াল নয়। এটা নতুন শুরু।”

স্কুলের শিক্ষকরা আসে, প্রথমে কিছুটা দ্বিধা। কিন্তু পরে সবাই উৎসাহিত হয়। কেউ বলতে শুরু করল—“আমরা চাই ছাত্রছাত্রীরা একে অপরকে সমর্থন করুক। যারা ভয়ে ভীত, তাদের পাশে থাকুক।”

এভাবে, ধীরে ধীরে, দেয়ালের ছবি এবং বার্তা স্কুলের প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর মনে ঢোকে। ছোট ছোট আলোচনা, হালকা ফিসফিস, সহমর্মিতা—সব মিলিয়ে এক নতুন সংস্কৃতি তৈরি হতে শুরু করে।

আরিফ অনুভব করল—ছোট্ট দুই চোখ, দুটি হাত, এক ছোট্ট বার্তা—সব মিলিয়ে কত বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বুঝল—শক্তি মানে শুধু নিজের ভেতরের ভয় মোকাবিলা করা নয়। শক্তি মানে অন্যদের জন্যও আশার আলো দেখানো।

মিতু পাশে এসে বলল—“আমরা যা করেছি, তা শুধু দেয়ালেই শেষ হয়নি। এই শক্তি, এই বার্তা সবাইকে ছুঁয়েছে।”

আরিফ চুপচাপ মাথা নেড়ে বলল—“হ্যাঁ, আর এই শক্তি আমরা যত দিন ধরে রাখব, ততদিন আমাদের ভয় আর একা থাকবে না।”

দু’জন আবার দেয়ালের দিকে তাকাল। প্রতিটি চোখ, হাত, হাসি—সবই যেন কথা বলছে। একটি নীরব সংলাপ। আরিফ বুঝল—ছবি শুধু রঙ নয়। এটি মানুষের সংযোগ, সাহস, সমর্থন এবং এক নতুন গল্পের সূচনা।

হঠাৎ বন্ধুরা এগিয়ে এল। কেউ বলে—“আমরা সাহায্য করতে চাই।” কেউ যোগ করল—“আমার স্কেচবুকও আনব।”
আরিফ হেসে বলল—“চল, সবাই মিলে কাজ করি। এখন শুধু আমরা নয়, সবাই অংশ নেবে।”

স্কুলের বাকি দিনগুলোতে, দেয়ালের ছবি সবাইকে প্রেরণা দিচ্ছে। ছোট্ট হাতে আঁকা হাত, চোখ, হাসি—সব মিলিয়ে বার্তা দিয়েছে—ভয়কে মোকাবিলা করা যায়। আরিফের মনে হলো—এটি শুধুমাত্র স্কুল নয়, এটি এক ধরনের জীবন পাঠ।

মিতু ধীরে বলল—“আরিফ, আমরা শুধু একে আঁকিনি। আমরা গল্প বলেছি। প্রতিটি চোখ, প্রতিটি হাত—সব মিলিয়ে নতুন শক্তি তৈরি করছে।”

আরিফের বুকের ভেতর ঢেউ ওঠে। চোখে জল, কিন্তু আনন্দের। হঠাৎ বুঝল—ভয় আর ট্রল, স্ক্রিন আর ফিসফিস—সবই এখন একটি শিক্ষার অংশ।

তিনি জানলেন—এখন তারা শুধু দেয়াল আঁকছে না। তারা মানুষের ভেতরের ভয়, আশা, শক্তি এবং সাহসকে প্রকাশ করছে।

দু’জন ধীরে ঘরে ফিরল। দেয়াল পেছনে রেখেই, তাদের মনে এক নতুন দৃঢ়তা। তারা জানে—যে গল্প শুরু হয়েছে, তা শুধু দেয়ালেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

শহরের অন্যান্য স্কুলেও, অনলাইনে, বন্ধুরা দেখেছে। ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া, নতুন আলোচনা, নতুন প্রচেষ্টা—সবই শুরু হয়েছে। আরিফ বুঝল—একটা ছোট্ট উদ্যোগও সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে।

শেষে, তারা দু’জন দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে হেসে উঠল। বুকের ভেতরের ভার হালকা। মন শান্ত। চোখে নতুন দীপ্তি।

—ভয় মানে সবসময় হার নয়। ভয়কে চ্যালেঞ্জ করলেই, নতুন শক্তি জন্মায়।

দেয়াল শেষ হওয়ার কয়েকদিন পর। স্কুলে সকাল বেলায় কেবল কক্ষের চারপাশের বাতাস নয়, ছেলেমেয়েদের মনেও পরিবর্তন ভেসে আসছে। আরিফ এবং মিতু প্রথমে শুধু তাদের নিজের জন্য রঙ এবং বার্তা আঁকেছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে—ছবি শুধু তাদের নয়, পুরো স্কুল কমিউনিটির।

ছাত্রছাত্রীরা দেয়ালের দিকে ধীরে ধীরে এগোয়। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ হালকা ফিসফিস করে একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে। আরিফ কিছুটা লাজুকভাবে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মনে হচ্ছে তার বুকের ভেতর এক নতুন শক্তি জন্মেছে।

—“দেখো, আরিফ, সবাই দেখছে!” মিতু বলল। তার চোখে উচ্ছ্বাস।

—“হ্যাঁ,” আরিফ হেসে বলল, “এখন শুধু আমাদের গল্প নয়, এটা সবাই দেখছে। আর সেই গল্প তাদেরও স্পর্শ করছে।”

প্রথমে কিছু শিক্ষার্থী শুধু ছবি দেখল। কেউ রঙিন চোখ, হাসি, ছোট হাতের চিহ্নে মুগ্ধ হল। পরের দিন তারা তাদের নিজের স্কেচবুক খুলল, নিজেদের ছোট্ট বার্তা আঁকল দেয়ালে। আরিফ মনে করল—ছোট্ট চোখ, ছোট্ট হাত, ছোট্ট বার্তা—সব মিলিয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে অনলাইনে ছবিগুলো ইতিবাচকভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। প্রথমে একটি ছোট্ট ভিডিও, তারপর কয়েকটি স্ট্যাটাস, স্টোরি—সব মিলিয়ে, স্কুলের বাইরে থেকেও কেউ কেউ রঙিন চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হলো।

—“আমরা কখনও ভাবিনি, শুধু একটি দেয়াল এত প্রভাব ফেলতে পারে,” মিতু বলল।

—“হ্যাঁ,” আরিফ হেসে বলল। “ভয় আর ট্রল—সবই এখন শক্তি এবং শিক্ষার অংশ হয়ে গেছে।”

এই সময় স্কুলের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের প্রশংসা করতে শুরু করল। কিছু শিক্ষার্থী জানতে চাইল—“আমরা কি আরও কিছু করতে পারি?”। আরিফ ও মিতু প্রথমবার বুঝল—ভয়কে স্বীকার করার পর, সমর্থনের হাত বাড়ানো সহজ।

ছাত্ররা একে অপরকে সহায়তা করতে শুরু করল। কেউ নিজস্ব স্কেচ আনল, কেউ নতুন বার্তা লিখল। দেয়াল ক্রমশ জীবন্ত হয়ে উঠল। আরিফ বুঝল—এটি শুধু ছবি নয়, এটি এক ধরণের জীবন পাঠ।

ব্রেক টাইমে, করিডরে ছোট্ট গোষ্ঠী হয়ে সবাই একে অপরকে গল্প শোনাচ্ছে—কি ভাবে তারা ভয়কে চ্যালেঞ্জ করছে, স্ক্রিনের ট্রলকে মোকাবিলা করছে। আরিফকে প্রথমবার অনুভব হলো—এটি শুধুই তার বা মিতুর প্রচেষ্টা নয়। পুরো স্কুলের ছাত্রছাত্রী এতে যুক্ত হচ্ছে, একে অপরকে সমর্থন করছে।

—“দেখো, আরিফ, আমরা শুধু দেয়াল আঁকিনি। আমরা স্কুলের সংস্কৃতি পরিবর্তন করছি,” মিতু ধীরে বলল।

আরিফ হেসে বলল—“হ্যাঁ। ভয়কে প্রকাশ করা মানে, সাহস দেখানো মানে, শুধু নিজেকে নয়, অন্যদেরও সাহায্য করা।”

বাকি দিনগুলোতে, স্কুলে ছোট ছোট আলোচনা শুরু হলো। শিক্ষকরা ক্লাসে গল্প বলছে—ছাত্রছাত্রীদের ভেতরের ভয়, সমর্থন, বন্ধুত্ব এবং সাহসের কথা। দেয়ালের ছবি, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বার্তা, সব মিলিয়ে নতুন শিক্ষা পরিবেশ তৈরি করছে।

আরিফ নিজেকে দেখছে—এক সপ্তাহ আগেও সে ভয়, লজ্জা এবং অনলাইন ট্রলের চাপের নিচে কেঁপে উঠত। আজ সে বুঝল—ছোট্ট উদ্যোগ, একত্রে কাজ, এবং সাহসী মনস্তত্ব কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

স্কুলের শেষে, আরিফ এবং মিতু আবার দেয়ালের দিকে দাঁড়িয়ে তাকাল। রঙিন চোখ, ছোট হাত, হাসি, বার্তা—সব মিলিয়ে একটি নতুন শক্তির প্রতীক।

—“আমরা শুধু দেয়াল আঁকিনি,” আরিফ বলল।
—“আমরা গল্প বলেছি, আশা ছড়িয়ে দিয়েছি, এবং শক্তি তৈরি করেছি।” মিতু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

এমন সময় এক ছাত্র এগিয়ে এলো—“আমিও চাই, আমি আমার স্কেচ দিয়ে সাহায্য করব।” আরিফ হেসে বলল—“দেখো, এটি শুধু আমাদের নয়, এখন সবাই অংশগ্রহণ করছে।”

বাহিরে, অনলাইনে, এবং স্কুলের অন্যান্য দেয়ালে ইতিবাচক বার্তা ছড়াতে লাগল। শিক্ষার্থীরা বুঝতে শুরু করল—ভয় মানে সবসময় হার নয়। ভয়কে স্বীকার করলে, সাহস, শক্তি, বন্ধুত্ব এবং আশা জন্মায়।

আরিফ মনে মনে বলল—“স্ক্রিনের চোখ, ট্রল, ভয়—সবই এখন শক্তি। আমরা একসাথে থাকলেই, কেউ একা নয়।”

মিতু পাশে এসে ধীরে আরিফের কাঁধে হাত রাখল। “আজ আমরা শুধু দেয়াল আঁকিনি। আমরা নতুন গল্প লিখছি, নতুন শক্তি তৈরি করছি। আর এই গল্প, এই শক্তি, সবাইকে স্পর্শ করছে।”

আরিফ চোখের কোণে জল, বুকের ভেতর এক ধরণের প্রশান্তি। হঠাৎ বুঝল—ভয়কে চ্যালেঞ্জ করার শক্তি শুধু নিজের মধ্যে নয়। এটি অন্যদের জন্যও উদাহরণ, নতুন আশা।

দু’জন ধীরে স্কুল থেকে বেরোল। দেয়ালের দিকে শেষবার তাকিয়ে। রঙিন চোখ, ছোট হাত, হাসি—সবই তাদের গল্প বলছে। আরিফ বুঝল—এটি শুধু দেয়াল নয়। এটি নতুন জীবন, নতুন শক্তি, নতুন সাহসের প্রতীক।

অধ্যায় ত্রয়োদশ: মুখোমুখি

স্কুলের বারান্দায় সূর্য ধীরে ধীরে নেমে আসছে। আরিফ বসে আছে বেঞ্চে, হাতে ছোট্ট নোটবই, চোখে অদ্ভুত উদাসীনতা। সে জানে, আজকে সে এক চূড়ান্ত ধাপ পাড়ি দিতে চলেছে—যে ছেলেটি তার ক্লাসের ভিডিও পোস্ট করেছিল, তার সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি দেখা। বুকের ভেতরে অনিশ্চয়তা, ভয়, এবং এক ধরণের ক্ষোভ মিশে আছে।

“আরিফ, তুমি কি প্রস্তুত?” মিতু ধীরে জিজ্ঞাসা করল। কণ্ঠে হালকা উদ্বেগ, চোখে সমর্থন।

আরিফ মাথা নেড়ে হেসে বলল, “প্রস্তুত না হলেও, এটা করতে হবে। যদি আমি মুখোমুখি না হই, ভয় আর লজ্জা শুধু ভেতরে জমে থাকবে।”

ছেলেটির দিকে ধীরে ধীরে এগোল। সে জানে—প্রথম দেখাতেই প্রতিক্রিয়া শীতল, আক্রমণাত্মক, বা উপেক্ষামূলক হতে পারে। তবে তার ভেতরের শক্তি বলছে—এটি বোঝাপড়ার প্রথম ধাপ।

—“তুমি… আমি… ভিডিওটা…” আরিফ কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

ছেলে চুপচাপ তাকাল। চোখে কোনো হাসি নেই, কোনো উপেক্ষা নেই—শুধু কৌতূহল। ধীরে ধীরে সে বলল—“আমি জানি… আমি ভাবিনি এটা এত বড় সমস্যা হবে। আমি… শুধু মজা করতে চেয়েছিলাম।”

আরিফ শ্বাস নিল। বুকের ভেতর লাল রঙের আগুনের মতো চাপ, ক্ষোভ—সব কিছু ঢেউয়ের মতো উঠল। কিন্তু সে কথা বলল—“তুমি বুঝতে পারছ কি? কত লজ্জা, কত ভয় আমাকে সহ্য করতে হলো?”

ছেলে মাথা নেড়ে বলল—“হ্যাঁ… বুঝতে পারছি। আমি ভুল করেছি। আমি… আমি চাই, কিছু করতে পারি?”

আরিফ কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকাল। মনে হলো—ক্ষমা সহজ নয়। ভেতরের ক্ষোভ, লজ্জা, হতাশা—সব এখনও আছে। কিন্তু বোঝাপড়া শুরু হয়েছে।

—“ভালো। প্রথমে বোঝাপড়া শুরু হচ্ছে। কিন্তু মনে রেখো, ক্ষমা আস্তে আস্তে আসে। সহজ নয়।”

ছেলে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। “আমি চেষ্টা করব, আরিফ। আমি চাই, আমরা ঠিকঠাক সমাধান করি। আমি চাই সবাই শান্তি পাক।”

আরিফ ধীরে ধীরে হাসল। বুকের ভেতর ভার কমতে লাগল। এই মুহূর্তটি ছিল নতুন শুরু—এক ধরণের মৃদু শান্তি।

মিতু পাশে এসে বলল—“দেখো, বোঝাপড়া শুরু হয়েছে। এটি সাহসের প্রথম ধাপ।”

আরিফ কণ্ঠ নরম করে বলল—“হ্যাঁ। ভেতরের ক্ষোভ এখনও আছে, কিন্তু আমরা কথা বলছি। বোঝাপড়া মানে শুধু কথোপকথন নয়। এটি নতুন শক্তি, নতুন দিক।”

ছেলেটি ধীরে ধীরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। তার চোখে লজ্জা, অনুশোচনা। আরিফ বুঝল—ভয় ও ভুলের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি হওয়া, ক্ষমা দেওয়া বা নেওয়া—সবই কঠিন, কিন্তু এটি সম্পর্কের পুনর্নিমাণের প্রথম পদক্ষেপ।

—“আমি… আমি চাই, আমরা ভালো হয়ে যাই,” ছেলেটি বলল।

—“চেষ্টা করলেই হবে। এক ধাপ এক ধাপ। আজ প্রথম ধাপ। আজ থেকে আমরা কথা বলব, বুঝব, আর সাহস দেখাব।”

আরিফ ধীরে ধীরে পেছনে হেঁটে গেল। ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল—“ধন্যবাদ, আরিফ। আমি চেষ্টা করব।”

মিতু পাশে এসে আরিফের কাঁধে হাত রাখল। “দেখো, এটা বড় কিছু। ভয়কে সরাসরি মোকাবিলা করা—এটাই সত্যিকারের শক্তি।”

আরিফ বুক ভরে শ্বাস নিল। মনে হলো—স্কুল, ট্রল, ভিডিও, ফিসফিস—সব কিছু এখন বোঝাপড়ার পথে। ভেতরের ক্ষোভ কমে গেল, ধীরে ধীরে শান্তি আসছে।

দু’জন ধীরে বারান্দা থেকে নেমে এল। সূর্য শেষবার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। আরিফ জানল—আজকের মুখোমুখি সংলাপ, ক্ষমা সহজ না হলেও, বোঝাপড়া শুরু হয়েছে। আর এটি শুধু তার জন্য নয়—পুরো স্কুলের জন্য নতুন দিশা, নতুন গল্পের সূচনা।

অধ্যায় চতুর্দশ: মঞ্চে দাঁড়ানো

সকাল বেলার আলো অ্যাসেম্বলি হলে ভেসে আসছে। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক—সবাই সমবেত। আরিফের বুকের ভেতর অদ্ভুত ধাক্কা। হাত কাঁপছে। গলা শুকিয়ে গেছে। চোখ চারপাশের জনতাকে খুঁজছে—কেউ হাসবে কি না, কেউ মজা করবে কি না।

মঞ্চের ধাপে ধাপে উঠে সে দাঁড়াল। কণ্ঠ কাঁপছে, কিন্তু মনে শক্তি। পুরো স্কুলের চোখ তার দিকে। মনে মনে ভাবল—“আমি একা নই। ভয়কে আমি চ্যালেঞ্জ করতে এসেছি।”

প্রথম বাক্য বের হল কাঁপা কণ্ঠে—
—“আজ আমি এখানে শুধু নিজেকে জন্য নয়, আমাদের সবাইকে কথা বলতে এসেছি। ভয়, ট্রল, অনলাইন, এবং একাকীত্ব—সব কিছু আমাদের চারপাশে আছে। কিন্তু আমরা একসাথে থাকলে, এই ভয়কে মোকাবিলা করা যায়।”

শ্রোতরা চুপচাপ। কেউ ফিসফিস করছে না। কেবল চোখের দৃষ্টি। আরিফ আরও দৃঢ়ভাবে বলল—
—“আমি জানি, অনেক সময় আমরা নিজেদের লজ্জা, ভয়, এবং অজানা চাপের মধ্যে আটকে পড়ি। আমি নিজেও তা দেখেছি। তবে আজ আমি বুঝেছি—ভয়কে স্বীকার করলেই আমরা শক্তিশালী হতে পারি। আর একে অপরকে সমর্থন করলেই আমরা একা থাকি না।”

মঞ্চের আলোয় সে নিজেকে অনুভব করল—ভয়ের সঙ্গে লড়াই, অজান্তে পেছনে থাকা ছেলেমেয়েদের কৌতূহল, এবং মিতুর সমর্থন—সব মিলিয়ে শক্তি।

—“আমাদের স্কুলের দেয়ালে, আমাদের গল্পের ছবিতে, আমরা দেখিয়েছি—ভয় মানে সবসময় হার নয়। ভয়কে চ্যালেঞ্জ করলেই নতুন শক্তি আসে, নতুন গল্প জন্মায়। সবাই একে অপরকে সমর্থন করতে পারলে, কেউ একা থাকে না।”

শ্রোতাদের মধ্যে কিছু হাত কাঁপছে। কেউ মাথা নেড়ে সম্মতি দেখাচ্ছে। কেউ চুপচাপ চোখ মুছে নিচ্ছে। আরিফ অনুভব করল—এই কণ্ঠশক্তি শুধু তার নয়, স্কুলের সকলের।

শেষে সে ধীরে ধীরে বলল—
—“আজ থেকে আমরা শুধু ভয়কে ভয় পাই না। আমরা শক্তি পাই। আমরা একে অপরকে সাহায্য করি। আমরা নতুন গল্প শুরু করি।”

মঞ্চের থেকে নেমে আসার সময় বুক হালকা। গলা শুকনো, চোখে জল। কিন্তু মনে এক অদ্ভুত শান্তি। সবাই হাত তালি দিচ্ছে, মৃদু হাসি। আরিফ জানল—ভয়, লজ্জা, অনলাইন ট্রল—সব কিছু মোকাবিলা করা সম্ভব। আর এই সাহসিকতা শুরু হয়েছে আজ থেকে।

মিতু পাশে এসে বলল—“দেখো, আরিফ, তুমি শুধু কথা বললে না। তুমি নতুন শক্তি দেখিয়েছ। স্কুলের সবাই দেখেছে।”

আরিফ হেসে বলল—“হ্যাঁ, আজ আমরা শুধু ভয়কে চ্যালেঞ্জ করিনি। আমরা সবাইকে দেখিয়েছি—আমরা একসাথে থাকলে, কেউ একা নয়।”

ছাত্রছাত্রীরা একে অপরকে দেখছে। আলো, শব্দ, এবং হৃদয়ের দ্যুতি—সব মিলিয়ে একটি নতুন শক্তি। অ্যাসেম্বলি হলের নীরবতা বলছে—ভয়কে মোকাবিলা করা যায়, কথা বলা যায়, বোঝাপড়া শুরু করা যায়।

আরিফ ধীরে ধীরে মঞ্চ থেকে নামল। চোখের কোণে জল, বুকের ভেতর প্রশান্তি। প্রথমবার সে বুঝল—ভয়কে স্বীকার করা মানে হার নয়। বরং, এটি নতুন সাহস, নতুন দিশা, নতুন শুরু।

অধ্যায় পঞ্চদশ: বন্ধুত্বের জয়

স্কুলের শেষ ঘণ্টার ঘণ্টা বাজছে। ক্লাসের দরজা খুলে ছেলেমেয়েরা বাইরে বেরোচ্ছে, কিন্তু আজ সবকিছু ভিন্ন। দেয়ালে রঙিন চিত্র, চোখ, ছোট হাত, বার্তা—সব মিলিয়ে যেন স্কুলের প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে একসাথে বাঁধছে।

আরিফ, মিতু, এবং কয়েকজন বন্ধু ধীরে ধীরে দেয়ালের সামনে দাঁড়াল। তারা জানে—আজকের দিন শুধু তাদের প্রচেষ্টা নয়, পুরো স্কুলের। ছোট্ট হাত, চোখ, হাসি, বার্তা—সব মিলিয়ে এক নতুন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

—“দেখো, আরিফ,” মিতু বলল, “সবাই অংশ নিচ্ছে। তারা শুধু ছবি দেখছে না, তারা গল্পও বুঝছে।”

—“হ্যাঁ,” আরিফ হেসে বলল, “এখন শুধু ভয় আর ট্রল নয়। আমরা একে অপরকে সমর্থন করার শক্তি দেখাচ্ছি। আমরা একসাথে থাকলে কেউ একা থাকে না।”

ছাত্রছাত্রীরা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। কেউ রঙিন স্কেচ আনে, কেউ নতুন বার্তা লিখতে চায়। আরিফ বুঝল—ছোট্ট উদ্যোগ, একত্রে কাজ, এবং সাহসিকতা কত বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এক কোণে সেই ছেলেটিও দাঁড়িয়ে। সে আগের মতো লজ্জিত, কিন্তু চোখে কৌতূহল। ধীরে ধীরে সে হাত বাড়াল—“আমি চাই সাহায্য করতে।”

আরিফ মাথা নেড়ে হেসে বলল—“চল, সবাই মিলে কাজ করি। আজ থেকে আমরা একসাথে নতুন গল্প লিখব।”

প্রথমে শিক্ষার্থীরা শুধু দেয়াল দেখছিল। এখন তারা সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে। অনলাইনে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে। স্কুলের শিক্ষকরা উৎসাহিত—ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বোঝাপড়া, সমর্থন এবং সাহসের শক্তি স্পষ্ট।

আরিফ অনুভব করল—ভয়কে স্বীকার করা, মুখোমুখি হওয়া, বোঝাপড়া শুরু করা—সবই কেবল তার নিজের জন্য নয়। এটি পুরো স্কুল কমিউনিটিকে শক্তিশালী করেছে।

—“আজ থেকে আমরা শুধু ভয়কে ভয় পাই না। আমরা শক্তি পাই। আমরা একে অপরকে সাহায্য করি। আমরা নতুন গল্প শুরু করি।” আরিফ উচ্চস্বরে বলল।

মিতু পাশে এসে বলল—“দেখো, বন্ধুত্ব, বোঝাপড়া এবং সাহস—সব মিলিয়ে আমরা জয়ী হয়েছি।”

ছাত্রছাত্রীরা একে অপরকে হেসে দেখল। ছোট হাত, চোখ, হাসি—সবই গল্প বলছে। সবাই অনুভব করছে—ভয় মানে সবসময় হার নয়। ভয়কে চ্যালেঞ্জ করলেই নতুন শক্তি জন্মায়।

শেষে, আরিফ ও মিতু একসাথে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে হালকা শ্বাস নিল। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে দেয়ালে পড়ে। রঙিন চোখ, হাত, হাসি—সব মিলিয়ে তাদের গল্প বলছে।

—“আজ আমরা শুধু দেয়াল আঁকিনি,” আরিফ বলল, “আমরা নতুন শক্তি দেখিয়েছি। সবাই একসাথে থাকলে, কেউ একা নয়।”

মিতু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। “সত্যি, আরিফ। বন্ধুত্ব, বোঝাপড়া এবং সাহস—এগুলোই জয়।”

শহরের অন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও অনলাইনে ছবিগুলো দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। তারা বুঝছে—একটি ছোট্ট উদ্যোগও সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে।

আরিফ, মিতু, এবং বন্ধুরা ধীরে স্কুল থেকে বেরোলো। দেয়ালের দিকে শেষবার তাকিয়ে। মনে হলো—ভয়, লজ্জা, অনলাইন ট্রল, সবই এবার শুধুই শিক্ষার অংশ। গল্প শেষ হয়নি। এটি নতুন সূচনা।

বুকের ভেতরে প্রশান্তি। চোখে আনন্দের জল। ধীরে ধীরে ধ্রুব সত্য বোঝা গেল—ভয়কে স্বীকার করলেই, সাহসী হওয়া যায়। বোঝাপড়া সহজ নয়, কিন্তু সম্ভব। বন্ধুত্বের শক্তি সবকিছুর উপরে।

আরিফ জানল—আজকের দিন শুধু তার নয়, মিতুর নয়, পুরো স্কুলের। এটি এক নতুন গল্প, এক নতুন শক্তি, এক নতুন বন্ধুত্বের জয়।

মননযন্ত্র : আত্মার প্রকৌশল

মননযন্ত্র : আত্মার প্রকৌশল – মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

রাষ্ট্র যখন অ্যালগরিদম - মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

রাষ্ট্র যখন অ্যালগরিদম – মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

নম্বরের বাইরে মানুষের গল্প - মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

নম্বরের বাইরে মানুষের গল্প – মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

অন্তর যখন কোড লেখে - মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

অন্তর যখন কোড লেখে – মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

Reader Interactions

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.