নিগূঢ় সত্তার গান – আসমা পাগল
Nigurh Sottar Gaan A Collection of Bengali Songs by Asma Pagol
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি, ২০১৭
.
উৎসর্গ
মরমী কবি ও সাধক
মহামতি জালাল উদ্দীন খাঁ
.
নিগূঢ় সত্তার গান
কার ভারে ন্যূব্জ হয়ে ভাব উদয় হয়
দুনিয়া নয়নে মেলে সদা হাস্যময়।
বিরিক্ষি বনে থাকে মন আপনায়
সকল মহিমা যার
তার গান অসামান্য মানবেই গায়।
মানবের পায়ে আসমার হাজার সালাম
নমস্য পদে পদে গীত রচিলাম।
.
গানের জগৎ প্রাণের জগৎ। প্রাণের জাগরণই আলোর লীলা, সুরের লীলাবিলাস। সুরের গহন নিগূঢ়ময়তা প্রাণে দোলা দিয়ে যে সহজ সরল নিবেদন তৈরি করে তা গানের কথা ও বাণীর মর্ম ভেদ করে সত্য ও সত্তার অনুসন্ধানে রত অন্তরের অতল ভাবে ডুবে থাকে। সেই অন্তরই বাংলা গীতিকাব্যের সারবত্তা, বাংলার বাউল গানের সারসংক্ষেপ। লালন সাঁইজি থেকে শীতালং শাহ, হাছন রাজা, রশীদ উদ্দীন, উকিল মুন্সী, জালাল উদ্দীন খাঁ, চাঁন মিয়া, কাঙাল পঞ্চানন, শাহ আব্দুল করিম প্রমুখ গুণী সাধকের প্রভাবে বর্তমানে বাউল-সাধকদের গানের যে বিস্তার ও অভিপ্রকাশ তা একই পরম্পরা জারি রাখে।
বাংলার মূল ভাব ও মরমে বাউল গানের কথা ও সুরের নিজস্ব সরলতা আপন বৈভবকে চিনিয়ে দেয় নিগূঢ় তালাশের মাধ্যমে। বাউল গানের কথা নিছক শব্দমাত্র নয়, বরং ভেদ পরিচয়, মানুষ পরিচয়, পরমসন্ধান, সাধনভজনরীতির মাধ্যমে আপনতালাশের ভাবমহিমায় উজ্জ্বল। বাউল গানে দেহ ও ব্রহ্মাণ্ড অবিচ্ছেদ্যভাবে অঙ্গীভূত এবং দেহ— প্রাণ, প্রকৃতি ও সত্তার এক অনন্যসাধারণ ভাব দেহের মাঝেই লীলাকারে পরম। বাউল গানে দেহভাণ্ডই ব্রহ্মাণ্ড, দেহের তালাশেই ব্রহ্মাণ্ডের তালাশ, নিজেকে চেনার অন্বেষণ-আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই আত্মতত্ত্ব, মানুষভজনা এবং পরমতত্ত্বের সাধন ও অনির্বচনীয় অভিপ্রকাশ। প্রাণপ্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কের শক্তি দিয়েই প্রাণের দরদ ও আকুতি প্রকাশ পায় বাউল গানে।
‘নিগূঢ় সত্তার গান’ বাউল গানের যে অভিমুখ সে দিকেই অন্তর্মুখীন।
গীতিকাব্যের জগতে আমার আবির্ভাব অনেক আগে থেকে হলেও আমার ভাবপরিমণ্ডলের জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন কবি মামুন খান, কবি জুয়েল মোস্তাফিজ, কবি সরোজ মোস্তফা, কবি হাসান মাহমুদ, কবি মুজিব মেহদী, গল্পকার দেবলুলাল মুন্না, সংগীতপ্রেমী হাবিবুর রহমান সাম্য, চিত্রনির্মাতা গোলাম রাব্বানী বিপ্লব, চিত্রনির্মাতা আবু সাইয়ীদ, শিল্পী প্রমোদ দত্ত প্রমুখ। প্রত্যেকের সাথে আলাপচারিতায়, আড্ডায় আমরা গান গেয়েছি, গান শুনেছি, অন্তর ও অন্তরালের ভাবমহিমায় একসাথে উদ্ভাসন-উন্মুখ হয়ে উঠেছি নানা বৈচিত্র্যে, ভাবে, গল্পে এবং স্বতঃস্ফূর্ত পরম গীতিকা রচনায়। ভাবুক আনন্দ মজুমদার উসকে দিয়েছেন কথায়, ভাবে ও ভাবনায়। ভাবুক রেজাউল করিম অনেকগুলো কাব্য সুর করেছেন, গেয়েছেন, প্রশংসা করেছেন, প্রেরণা দিয়েছেন। এদের সবার কাছে আমি ঋণ- বাসনামুক্ত জীবনযাপনের অঙ্গীকার করি।
বাংলা গানের বিশাল সায়রে এই কয়েকটি কাব্য বিন্দুও নয়। তবুও কাব্য গীত হলে তা মানবের ভাব ও মরমে যদি সামান্য আনন্দ জাগায় তা হবে আমার দিনযাপনের সহায়ক।
আসমা পাগল
মাঘ ১৪২৩, ঢাকা।
.
নিগূঢ় সত্তার গান
১.
ও পরম, ও রূপ, আমার স্বরূপ কই খুঁজে পাই
কোথা হতে এসে জগৎ-সংসার বশে মন মজলাই।
ষড়রিপুতোড়ে, অরূপে ফুটেছে ফুল স্বরূপে সাকারে
নিরাকার হতে, সহস্ৰ সংকেতে, এত অনাচারে।
আমি তারে খুঁজি, খুঁজে তার দেখা পাই না আর
কে আপন-পর, এই মন-দেহ সাকার না নিরাকার।
আসমার অন্তরে কে বাস করে সদায় রূপ-অরূপে
কেমনে তাহারে চিনি তারে জানি দিব্য-রূপাকারে।
২.
অর্থ আমায় ভেদ করেছে
সহস্র ভেদ জগতে আছে
মিছামিছি ভেদের পাছে
ঘুরছে রে মন আলেক সাঁই
যে রূপ আপনায় ভাসে
সেই রূপ জগতে নাই।
আপনার রূপ মাটি দিয়া
তাতে কিছু পানি মিশাইয়া
আগুন হাওয়া ভরাট কইরা
দেখতে আছেন শ্যাম-রাই।
আমার আমি দেখতে জানি
নিজের রূপে শ্যামকে মানি
রাইরূপ ধরে মানুষ চিনি
ভেদের অর্থ কেমনে পাই।
বেদ-বেদান্তর খুঁজে
কোরান বাইবেল পৃষ্ঠা মাঝে
চিহ্নের পরে চিহ্ন সাজে
পাগলা আসমার বেলা নাই।
গূঢ় ভেদার্থ কেমনে চলে
নিজের রূপে যাঁতাকলে
ষড়রিপুর ঘোরের চালে
মিছা জীবন না পায় ঠাঁই।
আসমা পাগলে বলে
আপনায় আপনি হলে
যে রূপ অন্তরে ভাসে
সেই রূপ জগতে নাই।
৩.
জের জবর পেশ সন্ধি করে
এক অঙ্গে কত রূপ না ধরে
অর্থের মহার্থ লয়ে করছে কত আলাপন
মন মজিলে মনে মিলবে মানিকরতন।
হীরাকাঞ্চন অর্থ লোভে
হিংসা গরিমা ভবে
আসমা পাগলে ভাবে
ভাবের মাঝেই আপন ধন।
যে রূপ শরীরে এসে
লৌকিকে অলৌকিক হাসে
বসে বসে চিন্তা কর
দেহের ভিতর কী গোপন।
দেহের দুইশ ছয়টি হাড়ে
কী লেখা কোন অক্ষরে
শরিয়তে কী উত্তর তার
বাতেন ঘরে আলোড়ন।
আট কুঠুরি নয় দরোজা
ছয় রিপুতে বাঁকা সোজা
শক্তি থাকতেও তুমি কোঁজা
মনসায়র কর সিঞ্চন।
বলে আসমা মহাজন
মন মজিলে মনে মিলবে মানিকরতন।
৪.
একটি গাছে কয়টি পাতা
কয়টি চুলের একটি মাথা
রোদন করলে যথাতথা
মিটবে কিনা মনের তাপ
কী ফল ধরিল গাছে করিতেছে লাফালাফ।
পাতার রঙে বেহুঁশ হয়ে
ফলের রূপে সকল থুয়ে
ভবের রসে মজে কয়ে
ভাণ্ড ভুলে করিতেছ তামশা-পাপ।
এ গাছের শিকড়ে মূলে
দেখো চেয়ে হৃদয় খুলে
নিজেরে আপনায় পাবে
প্রেমসাগরে দিয়ে ঝাঁপ।
রিপুর রং যে লক্ষকোটি
এক রূপ ধরে হয় যে খাঁটি
মনকে করে পরিপাটি
মিটাও মনের ঘোর সন্তাপ।
কী ফল ধরিল গাছে করিতেছে লাফালাফ।
সকল মহিমা তোমার
মিটাও আসমার মনের তাপ।
৫.
ও মন আমায় সঙ্গে নিও
আপন হয়ো দিলদরিয়ার বন্ধুজন
কানার ভিড়ে কানা ভিড়ে
করিতেছে কী গুঞ্জন।
গুনগুনাগুন মৌমাছিরা
যৌবনে কী রং দেখায়
রঙে মজে ভব মাঝে
চালাও তরী কোন ফেকায়।
এই নাওয়ে কেউ যাত্রী নাইরে
মাঝি নিজেই যাত্রী হয়
বেনিশানে মুক্তি না হয়
না জানলে নিজ পরিচয়।
লগিবৈঠা সাগর মাঝে
না পায় কূলকিনারা
মনরে ধরো ঊর্ধ্বে তুলে
আপন রূপের ইশারায়।
আসমা কাঙালে বলে
রূপের যেথা নাহি শেষ
তেল ফুরালে জ্বলবে বাতি
বুজলে আখি অনিমেষ।
৬.
ভাণ্ড থুয়ে কাণ্ড খুঁজে
পাইবা না মন জীবনভর
কী রূপ ধরিলে দেহে
রূপের পাগল মনচোর।
মন মজিল যাতে
মন ধরে না জাতেপাতে
দেহ আপন মনছায়াতে
সদায় কাঁপে থরথর।
রূপের অসংখ্য নিশান
দেহের ভিতর করিছে গান
কী অফুরান প্রাণের মায়া
মন ভজিয়ে মনকে ধর।
তিরিশ পারা কোরান বলে
সৃষ্টিকথা ভেদ বাইবেলে
বিজ্ঞানেও শূন্যতা বলে
সেই ভেদার্থ না জানিলে
কোন রূপে তুই আপন পর।
আপনায় আপনি মজে
দেহকায়া শূন্য মাঝে
পড়ছে ছায়া আপন কায়া
মজার ওই আয়নার ভিতর।
আসমা পাগলে বলে
এত কেন ছলেকলে
অসারেতে জীবন গেলে
না লইলে আপন খবর।
৭.
কার প্রেমে মজিলা তুমি মনমহাজন।
রিপুর তাড়নায় মরে
ষড়যন্ত্রের অনাচারে
জীবাচারে নষ্ট করে বায়ুর সিংহাসন।
রূপ রূপান্তরে গিয়ে
রাধাকৃষ্ণ উড়ায় হিয়ে
রাধারূপে কৃষ্ণ হাসে
দেখ কীরূপ সম্মিলন।
পঞ্চভূতে দেহ ভাসে
পঞ্চবায়ু অধরা হাসে
পঞ্চআত্মা জীবের কায়ার
উতলা মানুষের মন।
পঞ্চ ম কার লোভের তোড়ে
পঞ্চভূতের অনাচারে
পঁচিশতত্ত্বে মাটির মানুষ
করিছে রূপ বিরাজন।
না পাইয়া পথের দিশা
পঞ্চরসে মজছো নিশায়
নেশা কাটিলে দেখো
ঘুরতে আছে নিরাঞ্জন।
আসমা পাগলে বলে
প্রাণসুশীতল ছায়াতলে
দেখো চেয়ে শূন্যমাঝে
ভাণ্ডারেতে মহাধন।
কার প্রেমে মজিলা তুমি মনমহাজন।
৮.
আলিফ লাম মিম-এ যা হয়
অর্থের অর্থ ভেদ রয়
সেই ভেদ না জানিলে
জনে জনে ভেদাভেদ হয়।
এক কথা কোরানে বলে
মাওলা-হুজুর নেয় আমলে
আউল বাউল কী কথা কয়
জানিলে ভেদ ঘুচে নিশ্চয়।
আল্লাহর নিরানব্বই নামে
আলিফ ইশারায় থামে
লাম লইয়া করুণা নামে
মিমে কি মোহাম্মদ (সা:) হয়?
অর্থ লইয়া কী বিপদে
অর্থভেদ কি এমনি সাধে?
জের জবরে পেশ না ধরে
জাহের না যায় বাতেন ঘরে
তার ভেদার্থ গোপনে রয়।
আলিফ মিমে সন্ধি করে
লামালিফকে হাজির করে
কোরান কিতাবে পড়ে
মিলে নাই ভেদের পরিচয়।
চিহ্নে চিহ্নে বিবাদ করে
শূন্যে শূন্যে একাকারে
কোরান বাইবেল বেদান্তরে
মন মজিয়া মন সৃজন হয়।
মন তো ভেদ মানে না
মন পিরিতে শরিকানা
মায়ার বনে আনাগোনা
মন ভজে মন পেতে হয়।
চিহ্নের ভেদাভেদ থুইয়া
আপনারে শূন্যে ধরিয়া
সকল ভেদাভেদ ভুলিয়া
যাচাই করো নিজ পরিচয়।
আলিফ লাম মিমে যা হয়।
ভেদার্থ গোপনে থাকে আসমা পাগলে কয়।
৯.
আগুনে পানি মিশাইয়া
তাতে কিছু মাটি দিয়া
হাওয়ার উপর শূন্যে হাঁটে
আজব কলের দেহাই
এমন রঙের কারখানা আর নাই।
কারখানাতে দুইশ ছয়টি হাড়
হাড়ের উপর আছে নয়টি দ্বার
তার উপরে কুলুপ আঁটা
রং-রঙিলা মাতে সবাই।
আজব-রঙা মানুষ একখানি
শরিয়তে প্রকাশ্য হয় তাহার জবানি
জানময়না বাতেনে গেলে
নিজেরে কি চিনতে পাই?
জবানে জনে জনে
হিংসা গরিমার মনে
সুয়াচাঁন যায় কোনখানে
আসমা পাগল ভাবে সদাই।
এমন রঙের কারখানা আর নাই।
১০.
মন উড়েছে অসীম সীমায়
মনের কি আর ধর্ম হয়
ধর্ম নিয়া যথাতথা ধর্মের কত অপচয়!
কে দিয়াছে তোমায় সীমা
তুমি কে ভাই কোন সীমার
ধর্মে বলে এমন কথা অধর্মেরও ধর্ম রয়।
মানুষে মানুষে যে ভেদ
ধর্মে কি রয়েছে এই ছেদ
ধর্ম বলে মানুষ ভজো ভুলিয়া সব ভেদাভেদ।
মানুষ খুঁটি আপন রূপে, এতটা নড়বড়ে নয়।
মানছে কেবা ধর্ম তাহার সেই বিচার বা কে করে
মরার আগে দেখরে মন জিন্দায় একবার মরে
ধর্ম যাহার, তাহার রীতি মানব ধর্মের পরিচয়।
ভাইবে পাগল আসমা বলে
মনের আবার কী জাতপাত
ধর্ম ছুঁতা, ধর্ম রীতি চল মনারে মনের সাথ।
ধর্ম লয়া যে অনাচার ইহা কি অধর্ম নয়!
সীমা লয়া টানাহেঁচড়ায় অসীমে কী যাইবে মন
উপড়ে ফেলে সীমার রেখা আছে এমন কোন সুজন
মন চলেছে অসীম সীমায় শুনরে আসমার পাগলা মন।
সীমা নাই মানুষের মনে সীমার কথা কোন সীমার কয়।
১১.
নৌকায় কেবল একটি যাত্রী মাঝি নাই
সেই নৌকায় সমুদ্র পাড়ি কেমনে তাই
ভাবিতেছে মনে মনে আসমা পাগল সদাই
লঘু পাপে হইল গুরু দণ্ড সাঁই।
নৌকা এখন ঘুরিতেছে মাঝ সায়র
জলের চক্র পাড়িতেছে ভীষণ রাগ
তোমারে না চিনলে রে মন জগৎ বৃথাই
লঘু পাপে হইল গুরু দণ্ড সাঁই।
যাত্রী তুমি মাঝিও তুমি ধরলে হাল
আপন রূপে মজে দেখো নিজেই মাতাল
সেই রূপের তো আকার বিকার কিছুই নাই
লঘু পাপে হইল গুরু দণ্ড সাঁই।
১২.
মেদিনীমণ্ডল মাঝে যে আদমের উদয় হয়
যার কাছে সব ভাবে মূর্ত হয়।
দুই ঘাড়ে দুই ফেরেস্তা রে
আদমের প্রহরা করে
আদমে সেজদায় গেলে
ফেরেস্তারা নত হয়।
আদমে আদমে খাড়া
সেই আদমে হয় কি মরা
আদমের সুরতে আদম জগৎজুড়ে উদয় হয়।
আদমের দুটি পায়ে
শয়তান পড়ে লুটায়ে
আদমের রূপ দেখিয়া বসুধা উজল হয়।
বসুধায় কামকামিনী
মোহিনীমণ্ডল রূপিণী
আদমের রিপুর তোড়ে আদম অসহায় হয়।
আদমে আদমে মিশে
রূপসায়রে যায় সকাশে
আদমে আদমের সৃজন
আদম সুরতের মরণ নয়।
আপনার আদম রূপে
বসত করে কোন অরূপে
অরূপে স্বরূপে আদম উদয় হয়ে ভাব মুক্ত হয়।
আসমা পাগলে বলে
আদমের সুরত হালে
রূপে মজিয়া আদম অরূপে সে স্বরূপ লয়।
১৩.
আমার দেহের ভিতর করিতেছ কেমন খেলা
কলকব্জা আর বা’ত্তর হাজার তার পেঁচিয়ে
চৌদ্দ তলা ভবন গড়ে, কোন আন্ধারে আলোক দিয়ে
আমি অন্ধ, জগদ্বন্দ্ব পড়ে থাকি নিঃস্ব হয়ে, এক-একেলা।
ভবন জুড়ে দশটি তালা কেমন করে ঝুলিতেছে
একটা বন্ধ নয়টা খোলা এর হিসাব কে নিয়াছে
আমি নাচি যেমন নাচাও, পাতার পরান কেমনে বাঁচাও
দোলাও কেমন কম্প্রথরো কেমন তোমার আজব লীলা।
আসমা পাগলে ভাবে, রঙিলা তোমার অনন্ত স্বভাবে
এলোমেলো কত খেলায় করছি কত হেলাফেলা
পশম দুঃখে জরজর, মায়ার জালে ডরডর, কতই না অবহেলা
আমার দেহের ভিতর কেমন বায়ু খেলিতেছে এমন খেলা!
১৪.
এক-আকার হয়ে একাকারে ঘুরিতেছে মানুষের মন।
আকার বিচার কে-বা করে এক-আকারেই আলোড়ন
দুইয়ে হয় না বোঝাপড়া মানুষ এক-আকারেই গড়া
আঠারো মোকামের পোশাক পরা সেরা এই নূরের রওশন।
দেহ থুয়ে ভাণ্ড নাই আর দেহের ভিতর বাঁচামরা
পরম ধরম চিরায়ত রূপ-অরূপে পাগলপারা
আসমা পাগল ভবের ভাবে বিষম খেয়ে আধা মরা
সাকারে নিরাকার দেখে ঘুমের ঘোরেই জাগরণ।
১৫.
ভাবের বিশ্ব নিখিল নিঃস্ব কাঁদিতেছে ভবে
রঙের দুনিয়ার মায়া আর কত কলরবে
হাসিতেছে খেলিতেছে বেখবরে সবে
যেদিন সমন আসবে তোমার চলে যেতে হবে।
মনরঙিলা আজবদেহ কত কাণ্ড করে
আঠারো মোকামের দেহ শূন্য যানে ওড়ে
উড়িতে উড়িতে পাখি যায় রে উজান গাঁয়ে
দেখা যায় না ধরা যায় না মন থাকে অভাবে।
পঞ্চভূতে গড়া জিনিস পঞ্চভাবে মজে
ষড়রিপুর যন্ত্রখানা মাটির কায়ায় সাজে
দেহভাণ্ডে জগৎ লুটায় পড়ে অর্থভেদে
আপনভাবে না মজিয়ে আপন হয় সে কবে।
পাগল আসমার ভাব গেল না ভাবেই মরে তবে
ভাবের বিশ্ব নিখিল নিঃস্ব কাঁদিতেছে ভবে।
যেদিন সমন আসবে তোমার চলে যেতে হবে।
১৬.
কে-বা আমি কোথায় ছিলাম এসেছি কোথা হতে
আসছি একা চলেই যাব একেলা শূন্য হাতে।
ছিলাম কোথায় জানলাম না তা ফন্দিফিকির
যথাতথা ভাবরসের অন্তরে গিয়া ভাব মিশাইয়া রই তাতে।
উপ্রে একটা আসমান খালি কেবা আসমানের মালি
কে বসাইছে তারার মেলা প্রস্ফুটনের অমর রাতে।
অমরা মনময়ূরা অন্তরেতে রয় যে ধরা
খালি করে যাবে একদিন অবেলা সূর্যপাতে।
ভাবদুনিয়া ডুব সাঁতারে পাইলাম না কোথাও তাহারে
নূরের কারিশমায় আসমা পাগল হয়া রয় তার সাথে।
কে-বা আমি কোথায় ছিলাম এসেছি কোথা হতে।
১৭.
আমার মানব জনম গেল বিফল
কেমনে তোমারে চিনি
লোকে যে যা বলে বলুক আমি কানে তা না শুনি।
তাইরে নাইরে তাইরে নাইরে গেল জনম বিফলে
রাধা থাকে কৃষ্ণের আশায় কবে মিলন হবে বলে।
হেরা গুহায় জপন করে মোহাম্মদ নাম হয় তাহার
আসিলেন ভবের মাঝারে হইয়া উম্মতের কাণ্ডার
তুমিও তোমার কাণ্ডারি রাখিও মনে তোমার।
মানব জনম যায় বিফলে কেউ না রাখে খোঁজ তাহার।
কৃষ্ণলীলা বোঝা যে ভার মথুরা থাকে কোথায়
বৃন্দাবন যে মনের মাঝে আছে যে তোমার উপায়
মানব জনম যায় বিফলে রাখিও খোঁজ তায় তোমার।
নূহের প্লাবন আইল ভবে দেখল না দুই চোখে কেউ
রাবেয়া বশরী সাজায় জলেতে বিছানার ঢেউ।
মনসুর হাল্লাজ আল্লা বলে আমার কাল্লা রয় কোথায়
তুমি আল্লা বাস কর যে আমার অন্তর-কাল্লায়।
মানব জনম যায় বিফলে কেউ না নিল খোঁজ তাহার
আসমা পাগলের অন্তর পুইড়া হইল ছারেখার।
ছাই কইরা ভাসাইয়া দিলাম এমন জনম চাই কি আর
আসমা পাগলের জীবন পুইড়া হইল ছারেখার।
১৮.
তোমার কবে আসবে সমন
তৈরি হও তাড়াতাড়ি ও মন।
নিজের সাজন সাজো তাড়াতাড়ি
ও আমার কোন-বা দেশে বাড়ি রে।
আমি চালাই উজানে নাও
তুমি ভাটির দেশে থাক
তুমি কত রঙের ছবি আঁক
আমার বন্ধুরে না পাই রে।
বন্ধু বিনা জগৎ কানা
সংসারধর্ম ফানা ফানা
দশদিকে দশ রাইতের কানা
বেনিশানে ঘুরছে রে।
আসমার নিশান হইলে সারা
কলবে-তে আন্ধার মারা
চুল নড়ে না হুকুম ছাড়া
দয়াল তুমি কই থাক রে।
১৯.
পিঞ্জুরায় কে দেয় তালা
সকলি মন পিরিতের জ্বালা
ছটফট অন্তরের মাঝে আগুন বয়ে যায়।
তুমি মায়ার গয়না ছেড়ে কোথায় যাও
আমারে কি পাও না-পাও ভরা সায়রে
পাইতাছি পিরিতের ফাঁদ নিঠুর দুনিয়ায়।
তোমার যত সাধ লও পূরণ করিয়া
তোমারে ছাড়িয়া মন নাই যেতে চায়।
আসমা পাগলের অন্তর সাজে সোনার নায়।
২০.
প্রেম সাগরে তোমার তরে কত রঙের খেলা করে
যে রাতে নাচে নি রাধা কৃষ্ণ কেমন খেলা ধরে।
পিরিতের গোপন রীতি তোমার মনে এত ভীতি
ভয়ের শানে আসমা গীতি আসমান থিকা ঝরে।
আসমানের সকল তারা আসমা পাগল বাঁধনছাড়া
আমায় লইয়া নাড়াচাড়া ধরা নিজেই আত্মহারা
গতিবিধি বুঝলে পড়ে খুঁজলে আপন মানুষ হবি
অমূল্যে পাবে যে ধন, পিরিতে রয় সে নিধি, অগোচরে।
২১.
অকূলে আমারে কেউ পাবে না খুঁজে দুনিয়ায়
তোমারে যদি পাওয়া যায় অথৈ অপূর্ণায়
মনকে বলি যাস নে ওপার ঘর করে নড়বড়
গহন বুকে ঢেউ লাগল আপন এখন পর।
যার লাগিয়া মালা গাঁথি সে-ও বোঝে না তার স্বভাব
ফুল শুকায়া মরে গেলে কেউ বুঝে না তার অভাব
তোমারে চাই না বাঁকা কূলে চাই অন্তরের অন্তর।
আসমায় তোমারে চায় ও দয়াল নিরন্তর।
২২.
আমার মরণ হবে কি বারণ
যদি করো মন ওরে নিবারণ।
প্রকৃতি হলে তোমার গরলে
গোপী বিনে কৃষ্ণ কেমনে প্রকাশিলে
আমি প্রকৃতি আমার খোলো আবরণ।
প্রেমানন্দে যদি তুমি যেতে চাও
আমারে ফিরিয়া আবারো তাকাও
তোমারে ঘিরিয়া রাখে খ্যাপার আনন।
আসমা পাগলে ভনে তুমি শ্যাম কোন কারণে
রাধারে রাখিয়া সনে করো পরের সাধন।
২৩.
আজব কলের দেহ নিয়া অযথাই ঘুরে
মায়ার মুখেরা কোথায় যায় চলে!
হাড়ের বেদনায় চড়ে গহন মায়ায়।
মুখ হারিয়ে গেলে অরূপে পাগলে
বসে থাকে নূরে, আয়নায়
ঘোড়া চড়ে কে যেন কই চলে যায়!
কেশরের টগবগে উড়ালে আপনায় তাকাই
আসমার আত্মখনি কবে কোথা পাই
পাব রে তোমারে দয়াল, সাঁইয়ের দয়ায়।
২৪.
ভাবের তালাশে ভাব পাওয়া যায়
মনের তালাশে মন।
দেহের তালাশে অন্তর মিলে
সেই দেহ করো সিঞ্চন।
ভাবের কত রূপ
আর রূপের কত ভেদ!
রূপ ধরে দুনিয়ার মানুষ
করে কত খেদ।
আসমার খেদ গেল না
এই জীবনের তরে
আমারে খুঁজিয়া বেড়াই
মানুষের অন্তরে।
২৫.
আমারি আলোক আমি দিয়াছি ছড়ায়ে
তোমাদের জড়ায়ে সে বেঁচে থাকে রূপে
অরূপ ভাসিয়া বেড়ায় নূরে আলোক সায়রে
আসমার অন্তরে সদায় পরমে রয়।
অন্তর ছাড়িয়া যায় অন্তরে অন্তরে
আপনার রূপ নিয়া বসে নিরন্তরে
রঞ্জনে হয় না তো রং সকল সময়
চোখ বুজিয়া দেখো আলোর অব্যয়।
সংকেতে উড়াই শ্বাস পুড়িবার তরে
শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ রাখি আপন অন্তরে
যদি তোমায় দয়াল সাঁই সদয় হয়।
২৬.
জাদুর কৌটা রে তোর ভিতরে বাস করে কে রে
তুই আমারে চিনলি না রে কেমনে চিনি তোরে।
কৌটা দেখি স্বর্ণমোড়া আঠারো মোকামে গড়া
ছয় রিপুতে বাঁকাত্যাড়া পঁচিশতত্ত্বের দেহ রে।
কৌটা তোমার রূপখানি দেখি নি তোমার খনি
দেহখনি আলোয় ভরা দেখবে মানুষ কী করে।
কৌটা আমার মাথার মণি
আমি কি তাহারে চিনি
তারে লয়া ছিনিমিনি সইবে না এই অন্তরে।
তুমি আমার প্রেমরঙিনি আমি কি তোমার জবানি
তোমারে না পাইলে আমি থাকিব কেমন করে।
তোমার বসত অচিনপুরে
চিনলাম না আমি তোমারে
আসমা মহাজনে বলে কেন কর হেলা রে।
২৭.
কী বাতি জ্বালাইলা দুনিয়াতে দয়াল পরম সাঁই।
কী বাতি জ্বালাইলা দুনিয়াতে।
তোমায় খুঁজি আলোর প্রাতে তোমায় খুঁজি আন্ধা রাতে
কী বাতি জ্বালাইলে তুমি তোমায় খুঁজে নাহি পাই।
কী বাতি জ্বালাইলা দয়াল সাঁই।
প্রেমের বাতি একখান আছে, সবাই ঘুরে তাহার পাছে
জাহেরে বাতেনে খুঁজে কোথাও আলো মিলে নাই।
কী বাতি জ্বালাইলে দয়াল সাঁই।
একটি জ্বলে আশেকেতে, আরেকটা জ্বলে মাশেকেতে
আশেক মাশেক মিলে গেলে তোমায় খুঁজে খানিক পাই।
আশেক মাশেক মিলে তারা অন্তরেতে পায় যে ঠাঁই
কী বাতি জ্বালাইলা দুনিয়াতে দয়াল পরম সাঁই।
তুমি থাকো আলো ভরায় কিম্বা থাকো অন্ধ তারায়
তোমায় খুঁজে বেড়াই হেথা কোথাও তোমায় নাহি পাই
কী বাতি জ্বালাইলা দুনিয়াতে দয়াল পরম সাঁই।
তুমি থাকো নিরাকারে লও যে আকার ইচ্ছা করে
আকারে বিকারে তোমায় কোথাও খুঁজে নাহি পাই
কী বাতি জ্বালাইলা দয়াল সাঁই।
আলোর ভিতর কে বা জ্বলে, জলে থাকো অন্তরালে
পাতার কাঁপন কারে দোলায় আসমা পাগল দেখে নাই
কী বাতি জ্বালাইলে দয়াল সাঁই।
কী বাতি জ্বালাইলা দুনিয়াতে দয়াল পরম সাঁই।
২৮.
আমি কেমনে রাখিব পরান কেমনে আমি একা রই
পরান গেছে পরের বাড়ি সই গো, পরের বাড়ি সই।
সই যে আমার পর হইল আমারে একা ছাড়িল
তোমার লাগি দিবানিশি একলা তোমার পানে রই
পরান আমার ছাইড়া গেল কই।
পরানে পরান রাখি মাথার বিষে জ্বলছে আঁখি গো
আমার চোখের জলে বুক যে ভাসে
পরান আমার কেমনে সই।
পরানে পরান রাখিয়া প্রেমের জ্বালা তোমায় কই
পরান আমার ছাইড়া গেল কই।
তুমি থাকো বৃন্দাবনে আমি থাকি মথুরা সনে
রাধাকৃষ্ণ হইলে মিলন প্রেমেরই আস্বাদন সই।
পরান আমার ছাইড়া গেল কই।
এই পরানে ডুব দিয়া থাকিতে হয় ভাসিয়া গো
ভাসা-ডুবা অন্তরমাঝে গুপ্তধনের মতন রই।
পরান আমার ছাইড়া গেল কই।
আসমা পাগলে বলে পরান রে তুই ছলেবলে
কূট-কৌশলে আমায় নিলে পরানের ভিতরে রই।
পরান আমার ছাইড়া গেল কই।
২৯.
আমি কৃষ্ণ প্রেমে মজে রে সই পরান শুধু জ্বলে।
রাধা বলে শ্যামের পিরীত আর ভালো কি সই নিরলে।
আমি রাধা শ্যামের পিরীত ভুলি যে কোন অনলে।
তোমার সনে পিরীত কইরা কুলমান গেল হইরা
আমি এখন যেন যাব মইরা তোমারে না পেলে।
কৃষ্ণ বাজায় বেজায় বাঁশি,
আমি তাহার আশায় থাকি
আশায় আশায় জীবন গেল
কৃষ্ণ যে রয় কোন নিরলে।
এমন লীলা খেলা যত, কৃষ্ণ যে মোর মনের মতো
কৃষ্ণ ছাড়া রাধার জীবন পুড়িয়া হয় ছাই অনলে।
তুমি আমার প্রেম রাধারে
কৃষ্ণ বাঁশির উদাস সুরে
মন উদাসী দিবানিশি মরি লাজে মরি যে নিরলে।
আসমা পাগলে বলে, রাধা ও কৃষ্ণ মিলে
প্রেমের বাতি জ্বালাইছে আগুনে অনলে রে সই।
৩০.
ভেদজ্ঞানে অভেদ জানো মন।
মনের সাথে মন মিশায়া করো উদযাপন।
বেদ বেদান্ত কোরান বাইবেল
সকলে কয় ভেদের কথা
ভেদ অভেদের জানলে মাথা
চেনা-জানা হয় সহজ ধন।
পরমার্থের প্রস্তাবনা মানুষ ছাড়া কেউ পারে না
মানুষ দিয়া নিজকে জানা এই হইল মূল অন্বেষণ।
শত্রুমিত্র কী-বা বলি উপ্রে একটা আসমান খালি
সাত আসমানের প্রহরালি মনের মাঝেই সপ্তধন।
সিন্ধুবিন্দু কোথায় থাকে আসমানে কী রঙ যে আঁকে
দমের মাঝেই সাত আসমানে করছে কত আলাপন।
আম পাতা আর জামের পাতায় এমন কী আর তফাৎ হয়
জাতি ধর্ম মানুষ বানায় মানুষ করে নিজের ক্ষয়
সেই মানুষেই অর্থ খোঁজে বিলীন হয় সে কোন কারণ।
করণে কারণ থাকে মন যে চলে এঁকেবেঁকে
মনেতে মন মিশায়া হয় যে প্রেমের উন্মোচন।
আসমা পাগলে ভনে ভেদ অভেদের জ্ঞান লও জেনে
প্রেম দরিয়ায় ঝাঁপ দিয়া করো সহজ মনের সাধন।
৩১.
আদিতে জীবন হয় নি সৃজন মানুষে কোথায় রয়।
আদিতে জগৎ ছিল না মানুষ, মানুষে কোথায় রয়।
ছিল না আসমান, ছিল না জমিন
ছিল না মনে মনের মলিন।
ছিল না পাহাড়, ছিল না সায়র
ছিল না মরুময়।
ছিল না অনল ছিল না মরণ ছিল না চোখের জল
আদিতে জীবন হয় নি সৃজন জীবন সে কোথায় রয়।
ছিল না দুঃখ ছিল না যন্ত্র ছিল না স্বরে কোনো মন্ত্ৰ
যত্রযত্র মানুষে মানুষে বিভেদ কেন যে হয়।
আদিতে জগৎ ছিল না মানুষ, মানুষে কোথায় রয়।
মানুষে মানুষে রূপের সকাশে
সেই মানুষে মানুষ বানায়া
কোথায় সে গোপন হয়।
আদিতে জগৎ ছিল না মানুষ, মানুষে কোথায় রয়।
আদিতে জীবন হয় নি সৃজন মানুষ সে কোথায় রয়।
৩২.
দয়াল তুমি আছো কোথায়।
আসমা পাগলে বলে ছলে বলে কী কৌশলে
ধরা পড়ে আছে রে মন
আর সে ঠাঁই কোথাও না পায়।
আছো তুমি মাথার চুলে আছো তুমি দেহের জালে
তোমায় খুঁজে বেড়াই সদায়, তোমায় না আর খুঁজে পাই।
দয়াল তুমি আছো কোথায়।
প্রকাশেতে গাছের ডালে আছো তুমি পাতার আড়ালে
অন্তরালে থেকে তুমি মাত তুমি কত খেলায়।
কোন গোপনে লুকায় থাকো, অরূপ রূপের ছবি আঁকো
রেখার ভিড়ে তুমি থাকো দয়াল তোমায় খুঁজে না পাই।
দয়াল তুমি আছো কোথায়।
মানুষের ভিতরে থেকে মানুষ জন্মাও নিজের হাতে
সেই মানুষে খুঁজে ফিরে অন্তরেতে পায় কী তোমায়
দয়াল তুমি আছো কোথায়।
৩৩.
সোনার জীবন একদিন তোর হইব রে মরণ
সাধের জীবন একদিন তোর হইব রে মরণ
পাগল জীবন একদিন তর হইব রে মরণ।
ভুল করিয়াও ভুল কইরো না
ভুলের সাঁকো পার হইও না
ভুলেতে চরণ ফেলো না সত্য ধরো আজীবন।
ভুল করিয়াও ভুল কইর না
জীবন থাকতে মইর না
জীবনে ধরে থাকো মায়ের শ্রীচরণ।
সোনার জীবন একদিন তোর হইব রে মরণ
সাধের জীবন একদিন তোর হইব রে মরণ।
৩৪.
যেদিন গেছিলাম মরে
তোমার ঐ রূপের ধারে
রূপ অরূপেরে ডরে
কেমনে বোঝাই তোমারে।
আমি তো আমার আমি
আমায় কী আমি চিনি
তোমায় না চিনলে পরে
জীবন আমার যায় বৃথা রে।
বন্ধু তুমি কোন সুজনা
থাকো কোন্ হৃদয়কোণা
তোমার ভিতর আনাগোনা
মিছা এই জগৎ সংসারে।
বন্ধু আমি তোমায় বিনা
করি মানা কাম ছাড়ে না
কামে কাজে লেনাদেনা রূপে
তোমায় দেখি না রে।
তোমায় না দেখলে পাগল
আসমা হয় যে ঘোর দিওয়ানা
বন্ধু তোমার মনে কেন দোনামোনা
যেদিন গেছিলাম মরে।
৩৫.
আমি ছাইড়া যামু শহর রে
পরান পাখির লাগি রে
কান্দনে কান্দনে হইব
আমার অঙ্গের ভাগী রে
আমার পরান পাখি রে
তোরে লইয়া ছাইড়া যামু শহর রে।
তুই যে পাখি একলা আমার
আমার দেহ তোমার খামার রে
অন্তর দিয়া ঘিইরা রাখি পাখির পরান রে।
পাখি তোমার চোখ দুইখানা
একখানা তার মন যে হয়
তোমায় দেইখা নয়ন কান্দে
মনে আসমার ঝরনা বয়
সেই ঝরনায় করব সিনান মনাপাখির সনে রে।
আমি ছাইড়া যামু শহর রে
রেরেরেরেরে।
৩৬.
ঘুমের দেশে যাবে বলে
ঘুমে কাটে জীবন ছলেবলে
যে ঘুমায় না সে আত্মা দেখবে কোনজনে
যে চিনলা না মানুষ, মানুষের মন না জেনে।
দেহ একটা মোমের পাহাড়
তাহার আছে নয়টি দ্বার
একটি খোলা দশটি বন্ধ
খবর নিলো না কেউ কাহার।
আসমা পাগলে বলে দেহের মনে হও একাকার
আকারে রয়েছেন তিনি সাঁই নিরাঞ্জন নিরাকার।
৩৭.
ওরে পাগল মন।
আসমান অতিকায় খালি
কে যে আসমানের মালি
কাঁপিতেছে ডংকারে সমগ্র দেহযান
জীবন তো থেমে আছে ওহে দয়াময়।
জীবনে জীবন বিকায় কে কারে কয়
যে জন আপনায় জ্বলে
সে জন রয় নিরলে
জীবনে জীবন খুঁজে পাবে না হৃদয়।
মানবের সকল অহংকার
সকলি বৃথা তার বুঝতে না হলে
কে নেয় আমলে এই ভার
সকলি আন্ধার মূলে হয়।
সায়রের অতল যদি যাও
দেখিবে রহস্য বাহার
জীবনের সমাচার
যেখানে লুকিয়ে রয়।
সেই থেকে যদি কিছু জ্ঞান পাও
তাহারে ধরিবারে চাও
আপন অন্তরে বাজাও
অচিন পাখি তবু যে অধরা রয়।
মানুষ তো জন্মেছে মরা
তাই জ্যান্তে মরা হও
এই ভেদ লও মেনে
আসমা পাগলের সনে
দেখিবে সে কী করে মুদিবে নয়ন
জীবে পরম বাঁচে, জীবাত্মায় পরম ধন রয়।
৩৮.
দেহের বাইরে কোনো জ্ঞান নাই
সুভাবে বিস্তার হলে স্বভাবে তা পাই।
সহজ জীবনে যারে পাওয়া যায়
মনেমুখে এক হলে আপন স্বভাব তায়।
জীবন প্রকৃতি ও ভাণ্ডে আছে যা
একাকার দেহ অনুরাগে ব্রহ্মাণ্ডে তা।
উড়ে গেলে সূয়া বাকি আর রয়
গোপীভাবে মনরং প্রজাপতি হয়।
তুমি স্বামী খ্যাপা প্রভু ওহে দয়াময়
আসমা পাগলে বলে বায়ু অক্ষয়।
বায়ুতে মিশিয়া তুমি সাজাও সিংহাসন
অমৃত হৃদয় সঁপে করো হে চরণ সমর্পণ।
৩৯.
তুমি ভক্তি তুমি মুক্তি তুমি গোপী মন
ভক্তি মুক্তি সিদ্ধি দিয়া হয় প্রেমের সাধন।
বিভাগে বিরহ বাড়ে হও প্রেমে নিবেদন
জন্ম-মৃত্যু-জরা- ত্রিতাপে জ্বলে জীবে চিরন্তন।
নিষ্কামে নিষ্কৃতি মিলে ভজন কর হে চরণ
যে পায় সে নির্জনে পায় লীলা নিরঞ্জন।
চিত্ত নিত্য নাচে সত্যে সদানন্দ মন
বিনা গোপী প্রেম বিনে থাকিব কেমন।
প্রেমের বিনিময় একমাত্র প্রেমে- নিত্য সত্য সনাতন
তুমি অধরাসুধা- পূর্ণ পুণ্য বলে আসমা মহাজন।
৪০.
নিদমহলের দুয়ারখোলা
অন্ধ হলে তারার মেলা কেমনে দেখা যায়
ফুল ফুটেছে খুশবু ছড়ায় আমার অন্তরায়
তার কিছুটা বিলায়ে দেই আর কিছুটা নিদে
আলোর বাতি জ্বলছে পরান খুবই সাদাসিধে।
যে পাখি বসে না ডালে তার কি ওড়ার দোষ
ডানা মেলে যায় চলে অশেষের ধারে
আমার ঠিকানা নাই, নাই ঘরবাড়ি
আমি অরূপের সাঁই করি আসমানদারি।
অন-অক্ষর ব্যাপ্ত যেথা হয়
দেখো চেয়ে, সেখানেই আমার অহং-জয়
আমি অব্যয় পাড়ে ছিলাম কূলকিনারাহীন
কে তুমি বেড়াও খুঁজে আসমার সাকিন।
***





Leave a Reply