নজ্জুমি কিতাব – মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর
প্রথম প্রকাশ: জুন ২০২৫
প্রচ্ছদ: মো. সাদিতউজ্জামান
অলঙ্করণ: ওয়াসিফ নূর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
Nojjumi Kitaab by Muhammad Alamgir Toimoor
.
ভূমিকা
নজ্জুমি কিতাব প্রথমবার লিখেছিলাম একটা সংকলনের জন্যে। অনেক তাড়াহুড়ো ছিল। কোনোমতে একটা গল্প লিখে পাঠিয়েছিলাম। তো গল্পটা পড়ে আমার এক পাঠক মন্তব্য করলো, এটা কী হলো? শুরু হতে না হতেই শেষ!” তাকে বলেছিলাম, কিছুদিন অপেক্ষা করো, এর দ্বিতীয় খণ্ড আসবে। মাস যায়, বছর যায়—কিন্তু দ্বিতীয় খণ্ড আর আসে না। এদিকে বিবলিওফাইলের সাব্বির নতুন উপন্যাসের জন্যে চাপ দিয়েই যাচ্ছে। প্রতি বইমেলায় আনকোরা গল্প না ছাপালে পাঠক নাকি লেখককে ভুলে যায়! কী আর করা, লিখতে বসতেই হলো। লিখতে লিখতে পেরিয়ে গেল দুবছর। গল্পটা যেমন অভিশপ্ত এক বই নিয়ে, তেমনি এই উপন্যাসও অশুভ। হার্ট ফেল হলো, ক্যাথ করা হলো। শরীরের তাকত কমে আদ্দেক হয়ে গেল। কম্পিউটারের সামনে বসতেই পারি না। সীমাহীন ক্লান্তি, কিছুক্ষণ পর শুরু হয় বেদম মাথাব্যথা। নাপা খাই, স্টেমিটিল খাই, টাফনিল খাই, ভিক্স মালিশ করি, সেলুনে গিয়ে মাথা বানাই—উঁহু, কিছুতেই কিছু হয় না। সেই সাথে আরেক উপসর্গ: নেই হয়ে গেছে স্মৃতি শক্তি। কিছু মনে থাকে না। জায়গার নাম, চরিত্রের নাম, তথ্য—সব ভুলে যাই। বারবার কেঁচেগণ্ডূষ করতে হয়। লেখার মাঝামাঝি ভার্সিটি থেকে তিন মাসের ছুটি নিয়ে ড্যালাস গেলাম। ক্লান্তি চেপে বসল আরও বেশি করে। বিছানা থেকে নিজেকে তুলতেই পারি না। ইচ্ছে হয় শুয়ে থাকি সারাদিন। আমার দুই ভাগনি হার্টের চিকিৎসা করে। দেখে- টেখে তারা বলল, হার্ট আছে একরকম, তবে ভবিষ্যতে পেসমেকার লাগাতে হতে পারে। আপতত জেটল্যাগের কারণে সমস্যা হচ্ছে। পর্যাপ্ত রেস্ট নিলে অবস্থার উন্নতি হবে। এদের একজন বলল, “ধরে নেন, এই তিনমাস আপনি স্যাবার্টিক্যালে আছেন। কে না জানে স্যাবাটিক্যাল লিভে থাকলে রিসার্চ করতে হয়। এই তিনমাস লেখালেখি করেন।”
এক মাস শুয়ে-বসে থেকে শুরু করলাম লেখালেখি। সকাল বেলা নিজেই নাস্তা বানিয়ে খেয়ে দশটা থেকে লেখা শুরু করি। চলে রাত আটটা-দশটা অব্দি। ঝড়ে বড়ো বড়ো গাছ ভেঙে পড়েছিল বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে। লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে করাত দিয়ে গাছের গুঁড়ি কেটে লগ সাজিয়ে রাখি। ভীষণ পরিশ্রমের কাজ। গাছের লগ জন্মের ভারী। ওগুলো সরাতে কালঘাম ছুটে যায়। সেই সাথে গাছ কাটার শ্রম তো আছেই। তবে একটা উপকার হলো এতে। কায়িক পরিশ্রমের ফলে ফ্রেস অক্সিজেন পেতে লাগল ব্রেন। পরিষ্কার হলো মাথা। আদ্যিকালে এ কারণেই ভারতের সাধুরা সাধনপীঠের আশেপাশে শাক- সবজি ফলাতেন।
এই সর্বনাশ (উপন্যাস) লিখতে গিয়ে পেরিয়ে গেছে হাজার ঘণ্টারও বেশি। এর বেশিরভাগ চরিত্র, জায়গা, ঘটনা ঐতিহাসিক সত্য। বাস্তব ভিত্তি রয়েছে এগুলোর। বিশ্বাস না হলে অছিপুর, চায়না টাউন, বহরমপুর, গৌড়, খিদিরপুর, ইয়েমেনে গিয়ে দেখে আসুন। দেশীয় পটভূমিতে অতিপ্রাকৃত রোমাঞ্চকর উপন্যাস লেখা বেজায় কঠিন। যথেষ্ট তথ্য বা হিস্টোরিক্যাল ফ্যাক্টস পাওয়া যায় না। তাছাড়া, এখানকার লোকদের জীবনযাত্রা পশ্চিমা বিশ্বের নাগরিকদের মতো অ্যাডভেঞ্চারে ভরা না। এদেশে স্বীকৃত কোনো গুপ্ত সংঘ নেই। ধনী লোকেরা ব্যাংক লুট করতেই ব্যস্ত, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এম্পায়ার কিম্বা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করে ব্যাপক ক্ষমতা হাসিলের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। আর্ন্তজাতিক যোগাযোগ তো আরই নেই। শত শত বছর ধরে ধনী হয়ে বসে আছে, এমন কোনো পরিবারও নেই। হিটলারের ডান হাত, হাইনরিখ হিমলারকে বলা হয় অকাল্ট জাঙ্কি। হিস্টরিক্যাল আর্টিফ্যাক্ট আর অকাল্ট নিয়ে ব্যাপক নাড়াচাড়া করেছে এই লোক। ভুরি ভুরি প্রমাণ আছে তার এহেন কর্মকাণ্ডের। কত যে কাহিনি লেখা হয়েছে একে নিয়ে! ওদিকে রয়েছে আমেরিকার বেন ফ্র্যাঙ্ক। এমন চরিত্র আমাদের এখানে কোথায়? নাইট টেম্পলার কিম্বা ফ্রি মেসনের মতো কোনো সংগঠন এদেশে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। এখানে মাফিয়া বলতে বোঝায় কালা জাহাঙ্গীর, পিচ্চি হান্নান, মুরগি মিলনকে—মহল্লার অশিক্ষিত ঠ্যাকবাজ গুন্ডা। জন গটি, ভিটো কর্লিঅনি, কিম্বা আল কাপোন না। এরা কোসানোস্ট্রার মতো অর্গানাইজড ক্রাইম সিন্ডিকেট চালাচ্ছে, সেকথা ভাবাই যায় না। এত সীমাবদ্ধতার ভেতরেও দেশীয় পটভূমিতে কাজী আনোয়ার হোসেন কুয়াশা, মাসুদ রানা-এর মতো থ্রিলার লিখেছেন। সফলও হয়েছেন। তাকে আন্তরিক অভিনন্দন। যাহোক, তারপরেও ছিটেফোঁটা যা আছে তার ওপর ভর করেই লিখতে হয়েছে। আর সেকাজ করতে গিয়ে পশ্চিম বঙ্গে যেতে হয়েছে। কারণ, ঐতিহাসিক ঘটনা যা ঘটেছে তা প্রায় সব ওপারেই। পাঠকের কাছে অনুরোধ, এই ত্রুটি যেন তারা ক্ষমা করেন।
আরও একটা কথা না বললেই না। নজুমি কিতাব একমাত্র বই যেটা লেখা শেষ হওয়ার আগেই উৎসর্গ করতে হয়েছে। একদিন সন্ধে-বেলা ড্যালাস বোটানিক্যাল গার্ডেনে ক্রিসমাস লাইটিং দেখতে যাচ্ছি। গাড়িতে আমার বোন, দুই ভাগনি। গাড়ি চালাচ্ছে বড়ো ভাগনির হাজব্যান্ড। কেবল বিয়ে হয়েছে তাদের। তখন সাঁঝবাতি ছাপা হওয়ার তোড়জোড় চলছে। তো আমি হঠাৎ করে বলে ফেললাম ওই নতুন বই আমার বড়ো ভাগনি আর তার বরের জন্যে উৎসর্গ করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একথা শুনে ভাগনি-দম্পতি যতখানি উৎফুল্ল হলো ঠিক ততখানিই বিষণ্ণ হলো আমার ছোটো ভাগনি। পুরো বোটিনিক্যাল গার্ডেন একা একা ঘুরল। তারপর দুহপ্তা আমার সাথে দেখা করতে এলো না। বিষয় কী? খোঁজ নিয়ে জানা গেল: সাঁঝবাতির উৎসর্গ পত্রে তার নাম নেই, এজন্যে যার-পর-নাই অসন্তুষ্ট হয়েছে সে। আমার বোন তাকে বুঝিয়ে বলল, শিগ্রি আরও একটা বই বেরুবে। ওটা সাঁঝবাতির চেয়েও ঢের বেশি ভালো। ওই বই শুধু তাকেই উৎসর্গ করা হবে। কী আর করা তাড়াহুড়ো করে উৎসর্গ পত্র লিখলাম। তখন অব্দি বই লেখা হয়েছে মাত্র তিনভাগের দুই ভাগ!
সম্ভবত এটাই আমার লেখা শেষ উপন্যাস। বড়ো কলেবরে লেখার ধৈর্য বলেন, শক্তি বলেন—এর কোনোটাই আর নেই। বার্ধক্য গুণনাশিনী।
এই বই ধীর লয়ের লেখা। স্লো বার্নার। পাতায় পাতায় অ্যাড্রেনালিন রাশ কিম্বা রোলার কোস্টার রাইড সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। ধৈর্য ধরে যদি কোনো পাঠক পড়েন তো সে আলাদা কথা। তবে এটুকু বলতে পারি, পড়ার পর পাঠক যেন নিজেকে প্রতারিত মনে না করেন, সেদিকে নজর রেখেছি। সবশেষে আশা করবো এটা ছাপতে গিয়ে বিবলিওফাইল যে টাকা ঢেলেছে, অন্তত সেইটে যেন উঠে আসে।
—মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর
সিডার হিল, টেক্সাস।
.
Dedicated to cardiologist Dr. Noor E Subah, my niece
No human is perfect or can be perfect no matter how much they try. Of all humans I have come in touch with, the person whom I have found closest to perfection so far is Noor E Subah, who is more of a daughter to me than niece. God bless you my daughter.
-Muhammad A. Toimoor
.
এই বইয়ের সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবতার সাথে কোনো মিল পেলে তা কেবলই কাকতাল।
—লেখক





ধন্যবাদ।
হিমাদ্রি কিশোর দাশগুপ্ত এর এডভেঞ্চার সমগ্র 3 নম্বর বই টি দিলে ভালো হয়।
খুঁজে পেলে দেব।
তিন বাহু দশ মুখ। অনির্বাণ বাবুর এই বই টি দেওয়া যাবে?
অনেকদিন ধরে বইটির ডিজিটাল কপি খুঁজছিলাম। অনেক অনেক ধন্যবাদ আপলোড করার জন্য।