গল্পে গল্পে কৃষ্ণকথা – রামানন্দ সরস্বতী
A collection of short stories on the life of
LORD SHREE KRISHNA from different Puranas
by Shree Ramananda Saraswati.
প্রথম সংস্করণ – কলকাতা বইমেলা – জানুয়ারি, ২০০৭
প্রকাশক – প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী, গিরিজা লাইব্রেরী
প্রচ্ছদ-শিল্পী – সঞ্জয় মাইতি
.
উৎসর্গ
প্রয়াত বড়দা ব্রহ্মানন্দ দে’র উদ্দেশ্যে
.
কথামুখ
রাসে গোপীরা বলেছিলেন—”তব কথামৃতং তপ্তজীবনং কবিভিরীড়িতং
কল্মষাপহম্। শ্রবণমঙ্গলং শ্রীমদাততং ভুবি গৃণন্তি তে ভুরিদা জনাঃ।।”
—ভাগবত দশমস্কন্ধ।
অর্থাৎ তোমার কথারূপ অমৃত সংসারের ত্রিতাপ জ্বালায় দগ্ধ জীবের মহাকল্যাণ স্বরূপ ও পাপনাশক। তোমার কথামৃত শ্রবণে জীবের সার্বিক মঙ্গল হয়। তাই ব্রহ্মাদি তত্বদর্শীরা তোমার কথাকে সংসারের সারসর্বস্ব বলে বর্ণনা করেছেন। ধরায় যাঁরা তোমার কথা কীর্তন করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই ভাগ্যবান। পূর্বজন্মে তাঁরা বহু দান-ধ্যান করেছিলেন বলেই তোমার কথা কীর্তনে তাঁদের রুচি হয়। শ্রীচৈতন্যদেবও বলেছেন, ”পরং বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণ সংকীর্তনম্।” ‘গল্পে গল্পে কৃষ্ণকথা’র অধিকাংশ গল্পই মদীয় আচার্যদেব বিশ্ববন্দিত শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী মহারাজের শ্রীমুখে শোনা। কতিপয় গল্প বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাধুসন্তের মুখে শুনেছি। গল্পগুলির সূত্র শুধু ভাগবত বা মহাভারতই নয়। পদ্মপুরাণ, স্কন্দপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, গর্গসংহিতা ইত্যাদি গ্রন্থেও কৃষ্ণলীলাকথা বর্ণিত আছে। ভারত বিখ্যাত মহান সন্ত শ্রীসুদর্শন সিংহ, যিনি গীতা প্রেস প্রকাশিত ‘কল্যাণ’ পত্রিকায় ‘চক্রনামে’ লিখতেন, তাঁর রচিত কৃষ্ণবিষয়ক গ্রন্থাবলী থেকেও সাহায্য গ্রহণ করেছি। সন্তের ঋণ চির অপরিশোধ্য। তাই ঋণ স্বীকার করে সন্তমহিমা ছোট করতে চাই না। বরং সকল সন্তের কৃপারূপ ছত্রছায়ায় থেকে নিজের অক্ষমতা অকপটে স্বীকার করে, কৃতকৃতার্থ হতে চাই। কৃষ্ণকথা ছড়িয়ে আছে—নানা পুরাণে, উপপুরাণে, বেদে, সাহিত্যে—এককথায় ভারতের বৈদিক সাহিত্যের প্রায় সর্বত্র। অনুভবী সাধুসন্তের মুখে কৃষ্ণকথা বিশেষ তাৎপর্য্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। শুনতে শুনতে মনে হয় এত রস, এত আনন্দ কৃষ্ণকথায়! উপরে উদ্ধৃত ভাগবত শ্লোকটির ব্যাখ্যা করে সন্তরা বলেন—”সংসারে যখন কৃষ্ণ বা ভগবানকে সামনে রেখে আমরা কথা বলি, তখন সেই কথা হয় অমৃত—তাই ‘কথামৃতং’। আবার কৃষ্ণকে দূরে সরিয়ে রেখে যখন অন্য-কথা বা বিষয়-প্রসঙ্গ আলোচনা করি তখন কথা হয়—’মৃতং’ অর্থাৎ মৃতের সমান। ভারতীয় হিন্দুচেতনায় কৃষ্ণের স্থান আত্মা বা প্রাণবায়ুর মত। জনৈক সন্তের ভাষায়—‘Krishna is the soul and seed of the whole universe’. ভক্ত অর্জুনের ভাষায়—”পিতাসি লোকস্য চরাচরস্য ত্বমস্য পূজ্যশ্চ গুরুর্গরীয়ান।।”…(একাদশ অধ্যায়, গীতা) অর্থাৎ হে অমিত প্রভাব, আপনি চরাচর জগতের স্রষ্টা, পূজ্য, গুরু এবং গুরুরও গুরু। ভগবান শ্রীকৃষ্ণও গীতার দশম অধ্যায়ের বিংশতিতম শ্লোকে নিজের পরিচয় প্রসঙ্গে বলেছেন—
”অহমাত্মা গুড়াকেশ সর্বভূতাশয় স্থিতঃ।
অহমাদিশ্চ মধ্যঞ্চ ভূতানামন্ত এব চ।।”
অর্থাৎ হে জিতনিদ্র অর্জুন, আমিই সর্ব প্রাণীর হৃদয়ে অবস্থিত আত্মা। আমিই প্রাণিগণের উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়ের স্থান। গীতামুখে ভগবান নিজের তাত্বিক পরিচয় ও তত্বজ্ঞান প্রদান করেছেন। নিজের লীলাজীবনের কথা কিছুই বলেননি। বৃন্দাবন-মথুরা-দ্বারকায় কিভাবে অতিবাহিত হয়েছিল তাঁর জীবনের দিনগুলি, সে প্রসঙ্গে তিনি নীরব থেকেছেন। ভক্তের সম্মুখে নিজের জীবনের কথা বলতে হয়তো তিনি সঙ্কোচ অনুভব করেছিলেন। পিতা যেমন পুত্রের কাছে অনেক সময় তাঁর নিজের জীবনের সবকথা বলতে পারেন না—ভক্তের সম্মুখেও তিনি অনেকটা সেই নিয়ম বা বিধিই অনুসরণ করেছেন—লীলার দৃষ্টিতে, লীলার মাধুর্য্য সম্পাদনের জন্য। তাছাড়া নিজের জীবনের কথা নিজের মুখে ততখানি মানায় না-যতখানি মানায় বা শোভা পায় অন্যের মুখে। পিতার পিতৃত্ব, পিতা অপেক্ষা পুত্র বেশি আস্বাদন করেন। তদ্রূপ ভগবানের ভগবত্তা ভগবান অপেক্ষা ভক্ত বেশী আস্বাদন করেন। পিতার পিতৃত্ব আস্বাদন করে, পিতাকে নিয়ে গল্প বলতে পুত্রের যেমন সঙ্কোচন হয় না বরং তার পিতৃত্বের মাধুর্য্য পুত্রমুখেই সমধিক প্রকাশ হয় তদ্রূপ, ভগবানের ভগবত্তার মাধুর্য্য ভক্তমুখেই মানায়। তাই নানা পুরাণে উপাখ্যানে ব্যাস-শুকদেবাদি ঋষি মুনি ভক্তগণ ভগবানের বা জগৎপিতার লীলাজীবনের কথা বলেছেন। এরূপ ভক্তদের মুখনিঃসৃত হয়ে ভগবৎ লীলাকথা ‘অমৃতদ্রবসংযুতম্’ হয়। তত্বজ্ঞান বিতরণে ভগবান এক ও অদ্বিতীয়। কিন্তু ভগবৎ লীলাকথা পরিবেশনে ভক্ত ভগবানকেও ছাড়িয়ে যান। তাই ভক্তের মুখেই ভগবানের কথা শোভাবর্ধন করে। সন্তকবি তুলসীদাস বলেছেন—”হরি অনন্ত, হরিকথা অনন্তা।’ শুধু পুরাণসাহিত্যের মধ্যেই অনন্তের লীলাকাহিনী সীমিত নয়। অনন্ত ভক্তের হৃদয়ে অনন্তকাল ধরে বিরাজিত হয়ে—অনন্ত করেন অন্তহীন লীলা। পুরাণগ্রন্থাদির সাধ্য কি তাঁকে ধরে রাখবে? বর্তমান গ্রন্থে গল্পের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের লীলাজীবনের যে সব কাহিনী বিবৃত হয়েছেন তাঁর অধিকাংশই আমাদের অজানা। প্রচলিত জানা কাহিনী বা ঘটনার গণ্ডী ভেঙ্গে অজানা কাহিনীর রসে কৃষ্ণপ্রেমী পাঠক-পাঠিকাদের মজিয়ে দেওয়াই গ্রন্থটির সবিশেষ উদ্দেশ্য।
তাই তত্বকথা নয়, নয় জটিল রহস্যের আবরণ ভেদ করার অনর্থক প্রয়াস। মদীয় আচার্যদেব ব্রজবাসী সন্ত ও অন্যান্যদের মুখে যা শুনেছি, তাই যতটা সম্ভব সহজ, সরল ভাষায় নিজের অনুভব দিয়ে পাঠক-পাঠিকার দরবারে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। দু’চারটি গল্প পাঠক-পাঠিকাদের জানা থাকলেও, সেই জানার মধ্যে পাবেন অজানার আনন্দ নতুন দৃষ্টিকোণ। গ্রন্থের বেশীর ভাগ গল্পই সাধারণের অজানা। অজানাকে জানার আনন্দও তাই বাড়তি প্রাপ্তি। তত্ব-তথ্য-রহস্য গল্পের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। অন্তর্মুখী পাঠক-পাঠিকা নিজেই তা খুঁজে বের করে নেবেন। কথামুখের প্রারম্ভেই বলা হয়েছে ভগবৎকথা বা কৃষ্ণকথা জীবের পক্ষে মঙ্গলময় ও অমৃতপ্রদ। আজকের কর্মমুখর যান্ত্রিক ব্যস্ততার যুগে মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায়। অমৃতকথা শোনার সময় কোথায় তাদের? কৃষ্ণকথা বলার ও শোনার লোক বর্তমান সংসারে দুর্লভ বললেই চলে। সংসার চালাতে গিয়ে সব হিমসিম খাচ্ছে—পুরাণ-বেদ পড়বে কখন? কখন-ই বা শুনবে কৃষ্ণকথা?
কুরুক্ষেত্রের কোলাহলমুখর সংগ্রামময় পরিবেশের মধ্যেই কৃষ্ণ বলেছিলেন গীতা—শুনেছিলেন জীবরূপী অর্জুন। আমরাও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনে যখন হাটে বা বাজারে যাই, তখন সেখানে নানা গোলমাল-কলরবের মধ্যেই বস্তু বা দ্রব্য সংগ্রহ করি। হাটের গোলমাল শুনে থলে হাতে নিয়ে যদি ভাবি গোলমাল থামুক, তারপর হাটে গিয়ে দ্রব্য সংগ্রহ করবো, তারপর একসময় গোলমাল থেমে যাওয়ার পর হাটে প্রবেশ করলে দেখবো হাট শূন্য; পণ্য, পণ্যব্যবসায়ী ও গ্রাহকরা সব কেনাবেচা সেরে আপন আপন ঘরে ফিরে গেছেন। ফলে শূন্য থলে হাতে নিয়ে ফিরে আসতে হবে। ভবের হাটে বা বাজারেও তদ্রূপ চিত্তরূপ থলেতে কৃষ্ণকথারূপ দ্রব্য গোলমাল বা ব্যস্ততার মধ্যেই সংগ্রহ করতে হবে—অন্যথায় জীবন হবে শূন্য মরুময়। কৃষ্ণকথাই কথা—সংসারের বাকী কথা শুধুই ব্যথা। অন্তর্মুখী নর বা নারী যখন এই সত্য অনুভব করে তখন সে কৃষ্ণকথা বা ভগবৎকথা শোনার জন্য ব্যাকুল হয়। কিন্তু পিছন ফিরে দেখে জীবনের অনেকখানি বেলা সে পেরিয়ে এসেছে। তাই বলে হতাশ হওয়ার কারণ নাই—গীতামুখে ভগবান আমাদের অভয়বাণী শুনিয়েছেন—
‘স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ।’ [গীতা ২য় অধ্যায়, ৪০ সংখ্যক শ্লোক]
অল্প সৎকর্ম বা ধর্মের অনুষ্ঠান জীবকে সংসারের মহাভয় হতে পরিত্রাণ করে। ‘গল্পে গল্পে কৃষ্ণকথা’ ভগবানের অভয়বাণীকে সার্থক করার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মাত্র। ভাগবতের ভাষায়—
”যস্যাং বৈ শ্রূয় মানায়াং কৃষ্ণে পরমপুরুষে।
ভক্তিরুৎপদ্যতে পুংসঃ শোকমোহভয়াপহা।। [১ম স্কন্ধ, ভাগবত]
ভগবতকথা শুনলে জীবের শোক মোহ ভয় দূর হয়ে যায়। বিভিন্ন বয়সের নর-নারী গল্পের মাধ্যমে কৃষ্ণকে জানুক, বুঝুক। কৃষ্ণকথার রসে আবিষ্ট হয়ে কৃষ্ণময় হোক সকলের জীবন।
গ্রন্থটি রচনার সময় আমার সহধর্মিণী শ্রীমতী চন্দনা দে আমায় বিশেষভাবে সহায়তা করেছেন। নিরলস শ্রম ও উৎসাহ দিয়ে প্রেরণা যুগিয়েছে যোগ-সেন্টারের ছাত্রছাত্রীরা। ভগবানের কাছে এদের সর্বাঙ্গীন কুশল কামনা করি। এছাড়া নানা পরামর্শ দিয়ে, বিশেষভাবে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে ধন্য করেছেন গিরিজা লাইব্রেরীর স্বত্বাধিকারী ও প্রকাশক মাননীয় শ্রীযুক্ত প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী মহাশয় ও তাঁর কর্মীবৃন্দ। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পাঠক-পাঠিকার দরবারে এই গ্রন্থের আত্মপ্রকাশ। কৃষ্ণপ্রেমী এঁদের সকলকে জানাই আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।
গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য বিশেষভাবে সাহায্য করেছেন কাটোয়া কাছাড়ীপাড়ার বাসিন্দা শ্রীমতী গায়ত্রী চন্দ্র ও বলাগড় নিবাসী শ্রদ্ধেয় শিক্ষক শ্রীযুক্ত শঙ্কর সাধুখাঁ। শ্রীকৃষ্ণচরণে এঁদের মঙ্গলকামনা করি। জয় রাধা গোবিন্দ!
কিমধিকমিতি—
রামানন্দ
.
‘গল্পে গল্পে কৃষ্ণকথা’ লীলাময় শ্রীকৃষ্ণের অনন্ত লীলাজীবনের দু’চারটি মুক্তকণা যা, পড়তে পড়তে ছোট বড় সকলের হৃদয় আশাকরি আনন্দে ভরে উঠবে। হৃদয় হবে রসসিক্ত। লীলাময়ের লীলাজীবনের অনেক অজানা কাহিনী-কুসুমে গ্রন্থটি মালার ন্যায় গ্রথিত। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘কানু ছাড়া গীত নেই।’ প্রবাদটি শুধু বাংলার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। সমগ্র ভারতের অন্তর্জীবনের মূল সুরটি ‘কানুর গীতে’ মুখরিত। সে গীত বর্ষিত হয়েছে কখনও শঙ্খের নাদে, কখনওবা মুরলীর মূর্চ্ছনায়। ভক্তের ভাষায় দুটি গান গেয়েছিলেন কৃষ্ণ। একটি গান গেয়েছিলেন শঙ্খ হাতে নিয়ে। অন্যটি মুরলী অধরে রেখে। একটি গানের কথা ধরা আছে ‘শ্রীমদভগবদ গীতায়’। অপরটির সুরে ভরে আছে ভাগবতাদি পুরাণের প্রতিটি পৃষ্ঠা। মুরলী নিয়ে গান করতে করতে আনন্দে তিনি করেছিলেন নৃত্য। সে ছবি ধরা আছে ভক্তের হৃদয়ে। এই গ্রন্থে যেন শঙ্খ-মুরলী-নূপুর সহ আনন্দময়েরই ক্ষণিক আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। কৃষ্ণলীলার জয় হোক।





Leave a Reply