কারামাজভ ভাইয়েরা – ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
রুশ থেকে অনুবাদ – অরুণ সোম
(অসম্পূর্ণ বই)
‘কারামাজভ ভাইয়েরা’ দস্তইয়েভস্কির সর্ববৃহৎ রচনা, তাঁর জীবনের সর্বশেষ এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি।
দস্তইয়েভস্কির অন্য আরও উপন্যাসের মতো এই উপন্যাসটিও বাহ্যত একটি অপরাধের কাহিনি। উপন্যাসের প্লট আধুনিক যে-কোনও রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনির মতোই চমকপ্রদ, তার চতুর্দিকে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে আছে নানা উপকাহিনি, বিচিত্র সমস্ত ঘটনা।
প্রকরণের বিচারে বহুকণ্ঠের সমন্বয়ে বিশালতার আবহ সৃষ্টির যে কোরাস রীতির আশ্রয় তিনি তাঁর রচনাগুলিতে গ্রহণ করেছিলেন তারও চরমোৎকর্ষ এই উপন্যাসে।
গভীর দার্শনিক চিন্তায় সমৃদ্ধ এই উপন্যাস সর্বকালীন রাশিয়ার মহাগাথা, দস্তইয়েভস্কির সর্বাধিক আলোচিত মহাগ্রন্থ।
.
ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি-র (১৮২১-১৮৮১) জন্ম মস্কোয়। রাশিয়ার তৎকালীন রাজধানী পেতেবুর্গের মিলিটারি ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক হওয়ার পর ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে ‘অভাজন’ নামে ছোট উপন্যাস লিখে খ্যাতি অর্জন করেন।
অপরাধ ও শাস্তি (১৮৬৬), জুয়াড়ি (১৮৬৭), ইডিয়ট (১৮৬৯), কারামাজভ ভাইয়েরা (১৯৮০) তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। জীবিতকালেই তিনি তুর্গেনেভ্ ও তলস্তোয়ের সমপর্যায়ের লেখকে পরিণত হয়েছিলেন।
.
অরুণ সোম (জ. ১৯৩৮) রুশ ভাষায় বিশেষজ্ঞ প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। মস্কোর ‘প্রগতি’ ও ‘রাদুগা’ প্রকাশনে দীর্ঘ দুই দশকের কর্মসূত্রে রুশ ও সোভিয়েত ক্ল্যাসিক, শিশু ও কিশোর সাহিত্য, গল্প, উপন্যাস, গোগল, তুর্গেনেভ্, তলস্তোয়, চোখভ, শোলখভ্ প্রমুখের রচনা রুশ থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। তাঁর অনূদিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য তুর্গেনেভের পিতা পুত্র, শোলখড়ের প্রশান্ত দন, গোগলের রচনাসপ্তক, দস্তইয়েভস্কির অপরাধ ও শাস্তি, ইডিয়ট, তলস্তোয়ের যুদ্ধ ও শাস্তি। উল্লেখযোগ্য মৌলিক গ্রন্থ রুশ সাহিত্যের ইতিহাস, রবীন্দ্র চেতনায় রাশিয়া ও রবীন্দ্র চর্চায় রাশিয়া।
.
প্রচ্ছদ : সোমনাথ ঘোষ
.
এই পুস্তকের অন্তঃপ্রচ্ছদে আনুমানিক খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে রচিত একটি ভাস্কর্যের প্রতিলিপি মুদ্রিত হয়েছে। এই ভাস্কর্যের বিষয়: রাজা শুদ্ধোদনের রাজসভায় তিনজন জ্যোতিষী ভগবান বুদ্ধের জননী মায়াদেবীর স্বপ্নের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করছেন। জ্যোতিষীদের আসনের তলায় বসে করণিক তাঁদের বক্তব্য লিখে চলেছেন। অনুমান এটি ভারতের লিখনকলার প্রাচীনতম চিত্ররূপ।
উৎস : নাগার্জুন কোণ্ডা, খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতক
সৌজন্য : জাতীয় সংগ্রহালয়, নতুন দিল্লী
.
ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি, ১৮২১-১৮৮১: লেখক
অরুণ সোম, ১৯৩৮—অনুবাদক
বিষয়: উপন্যাস
প্রকাশক: সাহিত্য অকাদেমি
প্রথম প্রকাশ: ২०20
.
প্রসঙ্গত
‘কারামাজভ ভাইয়েরা’ প্রথমে ‘রুশবার্তা’ পত্রিকার ১৮৭৯ সালের নয়টি সংখ্যায় এবং ১৮৮০ সালের ৭টি সংখ্যায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। দস্তইয়েভস্কির জীবদ্দশাতেই পৃথক গ্রন্থাকারে ৩ হাজার মুদ্রণে প্রকাশিত হয় সাংকৃত্ পেতেবুর্গ থেকে, ১৮৮১ সালে, তাঁর মৃত্যুর তিন মাস আগে। পরবর্তীকালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত কোনো সংস্করণেই ধারাবাহিক প্রকাশের সময় যে সমস্ত মুদ্রণপ্রমাদ ঘটেছিল সেগুলির সংশোধন ছাড়া রচনাশৈলীগত তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়নি।
দস্তইয়েভস্কির চারটি সাধারণভাবে স্বীকৃত মহৎ সৃষ্টিরই (অপরাধ ও শাস্তি, ১৮৬৬; ‘ইডিয়ট’, ১৮৬৮; ‘অপদেবতা’, ১৮৭২: ‘কারামাজভ ভাইয়েরা’, ১৮৮০) বিষয়বস্তু হত্যাকাণ্ড। কারামাজভ ভাইয়েরা উপন্যাসের বিষয়বস্তু পিতৃহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েক জন আবেগপ্রবণ সন্তানের আত্মজিজ্ঞাসা ও তাদের মানসিক পরিবর্তন।
লেখকের এই শেষ উপন্যাসটির বিষয়বস্তুর সূত্র অনেকে সন্ধান করেছেন তাঁর নিজের বাবার শোচনীয় মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে। উপন্যাসের প্রথম দুটি অধ্যায়ের নায়ক, পরিবারের পিতা ফিয়োদর পাভলভিচ কারামাজভের মতোই লেখকের ও বাবা মিখাইল আন্দ্রেয়োভিচ খল প্রকৃতির ও ভ্রষ্টাচারী ছিলেন। প্রথম জীবনে মস্কোর মারিইস্কি হাসপাতালের চিকিৎসক ছিলেন, প্রাইভেট প্র্যাকটিসও করতেন। পরে ছোটোখাটো ভূস্বামীও হয়েছিলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর মদ্যপান ব্যভিচার ও অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। একবার তুলার কাছাকাছি তাঁর জমিদারি থেকে নিজেরই আরেকটি জমিদারি চেরমানোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পর তিনি আর ফেরেন না (উপন্যাসে ‘চেমানিয়া’ নামে উল্লেখ আছে এই জায়গাটির, যেখানে বুড়ো কারামাজভ তার মেজো ছেলে ইভানকে পাঠাতে চেয়েছিল)। ভূমিদাসদের সঙ্গে নিষ্ঠুর ব্যবহার করার দরুন হোক বা নারীঘটিত কোন কারণেই হোক—যা পরে কোনো কালে সঠিক ভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি—পথে তাঁর নিজের প্রজাদের হাতেই খুন হলেন মিখাইল আন্দ্রেইয়েভিচ। ফিরোদরের বয়স তখন মাত্র আঠারো বছর। সংবাদটি শোনার পর তিনি মূর্ছা গিয়েছিলেন। অনেকের মতে, এটা ছিল তাঁর প্রচ্ছন্ন মৃগীরোগের একটি বহিঃপ্রকাশ, তাঁর কোনো কোনো জীবন চরিতকারের অবশ্য স্থির বিশ্বাস এই মানসিক আঘাতই তাঁর পরবর্তী জীবনের চিরসঙ্গী মৃগীরোগের কারণ।
কারামাজভ ভাইয়েরা উপন্যাসে সংঘটিত পিতৃহত্যার ঘটনার সঙ্গে দস্তইয়েভস্কির নিজের বাবার ভাগ্যের অভ্রান্ত যোগাযোগের ব্যাপারটি তাঁর জীবনচরিতকার ও মনোবিদদের অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং মনোবিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুই ঘটনার যোগাযোগকে তাঁদের অনেকে বিশ্লেষণও করেছেন। এই বিষয়ে ‘দস্তইয়েভস্কি ও পিতৃহত্যা’ শিরোনামে জিগমুন্ড ফ্রয়েডের একটি বিশদ পর্যালোচনাও আছে, যদিও লেখক নিজে পিতৃহন্তা নন এবং কাহিনিতে যে ব্যক্তি বস্তুত হত্যা করেছিল তার সঙ্গে লেখকের আরও তফাত এই যে লোকটার মৃগীরোগ আগে থাকতেই প্রকট ছিল।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের ধারণা বালক ফিয়োদর একজন স্বৈরাচারী ব্যক্তির মৃত্যুর প্রত্যাশায় ছিল, আর সেই ব্যক্তিটি অন্য কেউ নয়—তারই ঘৃর্ণিত পিতা। একজন বালকের মনে মনে তার পিতাকে শাস্তিদানের এবং তাকে আক্রমণ করার এক গোপন ইচ্ছা অনেক ক্ষেত্রে প্রচ্ছন্ন মৃগীরোগগতও হতে পারে। সেই আকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি যখন সংঘটিত হয় তখন নিজে হাতে তা না ঘটালেও একটা অপরাধবোধ তার মনের মধ্যে বাসা বাঁধলেও বাঁধতে পারে, আর তখন নিজেকে শাস্তিদানের মধ্য দিয়ে আত্মমুক্তির আকাঙ্ক্ষা যদি তার প্রবল হয়ে ওঠে সেটাও বিচিত্র নয়। দস্তইয়েভস্কি জীবনে কখনও মুক্ত হতে পারেন নি সেই অপরাধবোধ থেকে যা তার নিজের জন্মদাতা পিতাকে খুন করার অভিপ্রায় থেকে উঠে এসেছিল। লেখকের পারিবারিক এবং অন্যান্য সূত্র থেকেও জানা যাচ্ছে সারাটা জীবন এই অপরাধবোধ তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। বন্ধু স্ত্রাখভকে তিনি বলেছিলেন নিজেকে তিনি একজন দাগী অপরাধী বলে মনে করেন। একটা অজানা অপরাধের ভার যেন সব সময় তাঁর ওপর চেপে থাকত। তাঁর মনে হত যেন তিনি কোনো বড়ো রকমের দুষ্কর্ম করেছেন, যা তাঁকে পীড়ন করছে। লেখকের কন্যার কথায় : সারা জীবন তিনি তাঁর বাবার বিভীষিকাময় মৃত্যুর বিশ্লেষণ করেছেন। ফিয়োেদর কারামাতের চরিত্র চিত্রণ করতে গিয়ে তিনি হয়তো তাঁর নিজের বাবার সঙ্কীর্ণ চিত্তের কথাই স্মরণে রেখেছিলেন, যা তাঁর সন্তানদের মনে তাঁর ব্যভিচার লাম্পট্য ও পানোন্মত্ততার দরুন নিদারুণ ত্রাসের সঞ্চার করত।….
চল্লিশ বছর নীরব থাকার পর কথাশিল্পী ওই ঘটনার ভিত্তিতে রচিত তাঁর অত্তিম রচনায় তাঁর নিজের মানসিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। ব্যভিচার, অপরাধ ও পাপ এবং নৈতিক অপরাধ, পাপবোধ ও আত্মশুদ্ধির এক জটিল মনস্তত্ত্ব গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে এই উপন্যাসে লেখক তাঁর সমাজচিত্তা, অধ্যাত্মচেতনা এবং অভিনব দর্শন চিত্তার এক নবদিগন্ত উদ্ঘাটন করলেন।
.
১৮৪৩ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর দস্তইয়েভস্কি ইঞ্জিনিয়ারিং- এর সরকারি ডিপার্টমেন্টের নকশা অফিসে চাকরি পান। কিন্তু পরের বছরই পদত্যাগ করেন। নিজেকে কবি বলে মনে হত, ইঞ্জিনিয়ার বলে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। ….. তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস ছিল ‘যে যা-ই বলুক, আমার ভবিষ্যৎ আমার নিজের হাতে এবং একমাত্র আমিই তার প্রভু।’ কোনো ভুল ছিল না।
এর এক বছর পরে ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হল তাঁর প্রথম উপন্যাস অভাজন। তখনকার দিনের সাহিত্য সমালোচনা জগতের একচ্ছত্র অধিপতি, প্রকৃতিবাদী সাহিত্যধারার পৃষ্ঠপোষক ভিসারিওন বেলিনস্কি এই তরুণ লেখকের মধ্যে ‘মহৎ লেখকের সম্ভাবনা’ দেখতে পেয়েছিলেন। দস্তুইয়েভস্কির উপন্যাসটিকে তিনি ‘শিল্পের সত্য’ আখ্যা দেন। উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি পড়ে চমকে উঠেছিলেন সমকালীন কবি, সাহিত্যস্রষ্টা ও কথাশিল্পী নেক্রাসভ্। ‘এক নতুন গোগলের উদয় হয়েছে।’ তিনি সহর্ষে বলে উঠেছিলেন। বস্তুত গোগলের বিচারমূলক বাস্তবতার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল দস্তইয়েভস্কির এই রচনায়।
প্রথম উপন্যাস তিনি লিখেছিলেন ধীরেসুস্থে প্রায় বছর খানেক ধরে। রাজধানীর বুদ্ধিজীবী মহলে প্রতিষ্ঠালাভের ফলে তরুণ লেখকের উৎসাহ বৃদ্ধি পায়। তিনি দ্রুতগতিতে বেশ কয়েকটি ছোটো ও বড়ো গল্প লিখে ফেললেন। দ্বৈত (১৮৪৬), প্রণয়িনী (১৮৪৭) এবং শুক্লা যামিনী (১৮৪৮) তাঁর এই পর্বের আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনা। এখান থেকেই লক্ষ করা যায় যে দস্তইয়েভস্কি দ্রুত তাঁর সাহিত্যের সুর পালটে ফেলেছেন, অন্যথায় বলা যেতে পারে এটাই ছিল তাঁর প্রকৃত স্বরূপ। সাধারণ বাস্তবতার মধ্যে যে-কল্পনার উপকরণ এবং মানবচৈতন্যের যে-গূঢ় তাৎপর্যময় ও তামসিক পরিচয় নিহিত থাকতে পারে কোনো কল্পিত জগতের আশ্রয় গ্রহণ না করে জার্মান ঔপন্যাসিক হফমানের (১৭৭৬ – ১৮২১) আদর্শে লেখক এগুলির মধ্যে তারই অনুসন্ধানে ও পরিচয় উদ্ঘাটনে প্রবৃত্ত। এ হল কাহিনি বিন্যাসের সেই কৌশল যেখানে ক্রমবর্ধমান নৈরাশ্যব্যঞ্জক পরস্পরবিরোধী তথ্যগুলির মধ্য দিয়ে পাঠককে অনুসন্ধান করতে হয় এবং স্থির করে নিতে হয় ঘটনাগুলি কোনো ভারসাম্যহীন চরিত্রের কল্পনা বা অতিপ্রাকৃতকে বাস্তবরূপে উপস্থাপনার প্রয়াস কিনা। দস্তইয়েভস্কির সমগ্র সাহিত্যসৃষ্টিতে অতঃপর যে বিষয়টি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল তা ছিল দ্বৈত ব্যক্তিত্বের অনুসন্ধান। বিশেষত ‘প্রণয়িনী’তে দস্তইয়েভস্কি নিম্নমধ্যবিত্তশ্রেণির পরিবেশ থেকে দূরে সরে গিয়ে যে ভাবে হমানের প্রকৌশল অথবা গোগলের পরবর্তীকালে অনুসৃত ‘সেন্টিমেন্টাল প্রকৃতিবাদের’ আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন বেলিস্কি তাকে স্বাগত জানাতে পারেননি। দস্তইয়েভস্কি সম্পর্কে অচিরেই তাঁর মোহভঙ্গ ঘটেছিল, যেমন ঘটেছিল গোগলের পরিণতিতে। গোগলের বিচ্যুতির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ লেখকের উদ্দেশে একটি দীর্ঘ পত্রও লিখেছিলেন বেলিনস্কি। জারের সেন্সরব্যবস্থা উক্ত পত্রের প্রকাশ ও প্রচারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
অভাজন উপন্যাসের সাফল্যের ফলে রাজধানীর প্রথম সারির সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়ে তাঁদের প্রভাবে, বিশেষত বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সমালোচক বেলিস্কির সঙ্গে আলাপ-আলোচনার প্রভাবে ফরাসি ও অন্যান্য ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রীদের রচনা পাঠ করার ফলে শুরুতে ইউরোপীয়, বিশেষত ফুরিয়ের সমাজতন্ত্রের দিকে বেশ খানিকটা ঝুঁকেছিলেন দস্তইয়েভস্কি। রাজধানীর রাজনৈতিক বিপ্লবীদের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন তিনি। ১৮৪৭-এর কোনো এক সময় থেকে তিনি পেতেবুর্গের বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী পেত্রাশেভস্কি পরিচালিত এক গোপন বিপ্লবী সংগঠকের উদ্দেশ্যে পেত্রাশেভস্কির জনৈক সহযোগী পরিচালিত প্রগতিশীল পাঠচক্রের সভায় যাতায়াত করতে থাকেন। পরে স্বৈরতন্ত্রবিরোধী সংগ্রামের উদ্দেশ্যে পেত্রাশেস্কির জনৈক সহযোগী পরিচালিত এক গোপন বিপ্লবী সংগঠক যোগ দেন। অথচ মনে রাখতে হবে এই সময়ের মধ্যে ‘দ্বৈত’ বা ‘প্রণয়িনীর’ মতো এমন সমস্ত রচনা তিনি লিখে ফেলেছেন যেগুলির সঙ্গে সমাজতন্ত্রী ধ্যানধারণার কোনো মিল ছিল না, সেই কারণে বেলিনস্কির বিরূপ সমালোচনার মুখে এঁকে পড়তে হয়েছিল। বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে মিলে গোপন ছাপাখানায় নিষিদ্ধ সাহিত্য মুদ্রণেও তাঁর উৎসাহ ছিল। এর একটা সঙ্গত কারণ অবশ্য খুঁজে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি তাঁর সাক্ষ্যে এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে তাঁর মনে হয়েছিল বর্তমান সরকারি সেন্সর ব্যবস্থার ফলে ‘সাহিত্যের পক্ষে তাঁর অস্তিত্ব বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই ভাবে চলতে থাকলে যাবতীয় শিল্প ও সাহিত্য লোপ পাবে। ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ট্র্যাজিডি- কোনোটারই কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।’ কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে আরও বড়ো একটা অভিযোগ ছিল এই যে পেত্রাশেস্কির পাঠচক্রের এক সভায় তিনি সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গোগলের কাছে লেখা বেলিস্কির চিঠি প্রকাশ্যে পাঠ করেছিলেন। কেন পাঠ করেছিলেন? ১৮৪৭ এর ১৫ জুলাই তারিখে লেখা সেই চিঠিতে তো সমালোচক বেলিনস্কি লেখককে তাঁর নিজের ভাবাদর্শ ও শিল্প থেকে পশ্চাদপসরণের জন্য কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছিলেন, প্রসঙ্গত স্বৈরাচার ও ভূমিদাস ব্যবস্থার স্বরূপও উদ্ঘাটন করেছিলেন! পরন্তু বেলিস্কির সঙ্গে দস্তইয়েভস্কির ইতিমধ্যে বিচ্ছেদও ঘটে গেছে।
দস্তইয়েভস্কির এই সব কার্যকলাপের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল, ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে তাঁর সত্যি সত্যি কতদূর সম্পর্ক ছিল, নাকি নতুন চিন্তাধারা নিছক তাঁর কৌতূহল জাগ্রত করেছিল, করলেও কতটা করেছিল, ষড়যন্ত্রকারীরাও কতটা ঐকান্তিক ছিল, সর্বোপরি এই ঘটনা তাঁর রক্ষণশীল মানসিকতার সঙ্গে কতটা মানানসই—এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। সে যাই হোক, ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে পেত্রাশেভস্কির পাঠচক্রের ওপর রাজরোষ নেমে আসে। এপ্রিল মাসে সংগঠনের বেশ কিছু সদস্যের সঙ্গে দস্তইয়েভস্কিও গ্রেপ্তার হন। সামরিক আদালতের বিচারে অন্যান্যদের সঙ্গে প্রাথমিক ভাবে তাঁরও প্রাণদণ্ডের আদেশ হয়েছিল। অনুষ্ঠিত হয় এক নিষ্ঠুর প্রহসনের দৃশ্য। দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের সঙ্গে দস্তইয়েভস্কিকেও হাজির করা হয় বধ্যভূমিতে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জার নিকলাইয়ের পূর্বপরিকল্পনামতো সে দণ্ডাদেশ মকুব করে সাইবেরিয়ায় বন্দিশিবিরে চার বছরের সশ্রম নির্বাসনদণ্ডে তাঁকে দণ্ডিত করা হল।
চার বছর সশ্রম নির্বাসনদণ্ড ভোগের পর আরও পাঁচ বছর তাঁকে শাস্তি ভোগ করতে হয় সাইবেরিয়ার এক ডিসিপ্লিনারি ব্যাটেলিয়নে সাধারণ সৈন্যের চাকুরি করে।
দশ বছর পরে তিনি যখন স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পরিবেশে ফিরে এলেন ততদিনে ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও তাঁর মধ্যে ছিল না। শুধু তা-ই নয়, সাইবেরিয়ায় অন্তরীণ থাকাকালেই তিনি বেশ কয়েকটি দেশাত্মবোধক গাথাও লিখে ফেলেছিলেন। যাঁর কল্যাণে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছিল সেই জার প্রথম নিকলাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর উদ্দেশে একটি প্রশস্তিও লিখে ফেলেছিলেন, যেখানে তিনি সম্রাটকে সূর্যের সঙ্গে তুলনা করেন এবং কুণ্ঠিত ভাবে স্বীকার করেন যে সম্রাটের নাম নেওয়ার অধিকার তাঁর নেই। দ্বিতীয় আলেক্সান্দ্রর রাজ্যাভিষেক উপলক্ষ্যেও এই সময় তিনি একটি প্রশস্তি লিখেছিলেন। লেখকের দৃষ্টিতে ততদিনে সামাজিক সমস্যাকে ছাপিয়ে উঠেছে মানুষের আধ্যাত্মিক সমস্যা, ধর্মীয় ও নৈতিক পুনরুজ্জীবনের আইডিয়া।
আরও পরে, ষাটের দশকে তিনি চের্নিশ্যেভূস্কি এবং অন্যান্য বিপ্লবী গণতন্ত্রীদের প্রকাশ্য বিরোধিতা করে লিখলেন ‘ভূতলবাসীর আত্মকথা’ (১৮৬৪)। সত্তরের দশকে তিনি যে ‘অপদেবতা’ (১৮৭২) লিখলেন সে তো বহিরাগত ভাবধারার প্রভাবে একটি জাতির আত্মবিনাশেরই কাহিনি। ‘অপদেবতার’ সেই ভূত যে ‘কমিউনিজমের ভূত’ নয় এমন কথা হলফ করে কে বলতে পারে? কমিউনিস্ট ইস্তেহার (১৮৪৭), ততদিনে রুশ ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রচারিতও হয়েছে। ১৮৭২ সালে মার্কসের পুঁজি পর্যন্ত রুশ অনুবাদে বেরিয়ে গেছে।
কারাদণ্ড ভোগের পর দস্তইয়েভস্কির নবলব্ধ অধ্যাত্মচেতনার আপাত-বিরোধিতা এখানেই যে তিনি তাঁর কারাদণ্ডকে পাপের প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ বলে মেনে নিয়েছিলেন, মানুষের অনুশোচনার আবশ্যকতা এবং যন্ত্রণাভোগ বা আত্মনিপীড়নের মধ্য দিয়ে তার মুক্তি সম্পর্কে লেখকের দৃঢ়বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত তাঁর একটি বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়।
.
কারামাজভ ভাইয়েরা উপন্যাসের মূল প্লটটি আধুনিক যে কোনো রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনির মতোই চমকপ্রদ ঘটনায় ঠাসা। তার চতুর্দিকে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে আছে নানা উপকাহিনি, বিচিত্র সব ঘটনা।
একটি সাধারণ বাস্তব ঘটনা লেখকের দৃষ্টিতে কীভাবে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে কারামাজভ ভাইয়েরা তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। গোগলের ইনস্পেক্টর জেনারেল বা তলস্তোয়ের পুনরুজ্জীবন-এর কাহিনির ভিত্তির মতো দস্তইয়েভস্কির এই কাহিনিরও মূলে ছিল একটি বাস্তব ঘটনা : পিতৃহত্যা এবং আদালতের বিচারে একজন নিরপরাধের সশ্রম কারাদণ্ডভোগ। দস্তইয়েভস্কি যখন সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন সেই সময় পিতৃহত্যার অপরাধে বিশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জনৈক বন্দি তাঁর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে : ইলিস্কি নামে এই লোকটা এককালে কোনো এক ব্যাটেলিয়নের সেকেন্ড লেফটেনান্ট ছিল। ‘ভূতলবাসীর আত্মকথা’র সূচনাতে এর প্রসঙ্গ আছে। সেখানে বলা হয়েছে লোকটা ছিল উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির, আপাদমস্তক ঋণে জর্জরিত, সম্পত্তির লোভে সে তার বাপকে খুন করে। কিন্তু সে তার অপরাধ স্বীকার করেনি। কারামাজভ ভাইয়েরা উপন্যাসের অন্যতম নায়ক দমিত্রির স্বভাব ও ভাগ্যের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যাচ্ছে, মিলে যাচ্ছে আরও এই কারণে যে ‘ভূতলবাসীর আত্মকথা’ প্রকাশের এক বছর ৮ মাস পরে সাইবেরিয়া থেকে দস্তইয়েভস্কির কাছে এই সংবাদ আসে যে তাঁর বর্ণিত ‘পিতৃহন্তা’ আসলে নিরপরাধ ছিল। সাক্ষ্যপ্রমাণের দ্বারা পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে। বিনা অপরাধে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগের পর অবশেষে সে মুক্তি পেয়েছে। ঘটনার আকস্মিক মোড়বদলে লেখক স্তম্ভিত। এই নতুন ট্র্যাজিডির ওপর ভিত্তি করে দস্তইয়েভস্কি একটি কাহিনির খসড়া লিপিবদ্ধ করেছিলেন ১৮৭৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। এই কাহিনিতে আছে দুই ভাই আর তাদের বুড়ো বাবা। বড়ো ভাইয়ের এক বাগদত্তা আছে, কিন্তু ছোটোজন মনে মনে তাকে ভালোবাসে। বড়ো ভাই সেনাবাহিনীর একজন তরুণ এসাইন। উচ্ছৃঙ্খল, গোঁয়ার গোবিন্দ গোছের। মার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির বখরা নিয়ে বাপের সঙ্গে তার বিবাদ—যেমন উপন্যাসের নায়ক দমিত্রির ক্ষেত্রেও হয়েছিল। বাপ নিখোঁজ হয়ে যায়। বেশ কিছু দিন কোনো খোঁজখবর নেই। ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পত্তি নিয়ে ভুমুল বচসা শুরু হয়ে গেল। এমন সময় একদিন পুলিশের আগমন। মাটি খুঁড়ে বুড়ো বাপের মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া গেছে। সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ বড়ো জনের বিরুদ্ধে। তার বাগদত্তা পর্যন্ত তাকে সন্দেহ করে। আসলে খুন করেছিল ছোটোজন, কিন্তু কারসাজি করে সাক্ষ্যপ্রমাণ এমন ভাবে সাজিয়েছিল যার ফলে বিচারে বড়ো জনের শাস্তি হল। হত্যাকারী আসলে কে এই নিয়ে জনসাধারণের মনেও সংশয় ছিল। বহু বছর বাদে ছোটো ভাই বিবেকের তাড়নায় তার অপরাধ স্বীকার করে- প্রথমে বড়ো ভাইয়ের কাছে, পরে সর্বসমক্ষে। এই খড়া কাহিনিরই আরও কিছু অদল বদল ঘটেছে কারামাজভ ভাইয়েরা উপন্যাসের মূল কাহিনিতে, কিছুটা প্রতিফলন ঘটেছে উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত ‘রহস্যময় আগন্তুক’ উপকাহিনিতে। শুধু তা-ই নয়। কারমাজভ্ ভাইয়েরা প্রসঙ্গে দস্তয়েভস্কি পত্রিকার সম্পাদনা দপ্তরে একথাও জানিয়েছিলেন: ‘আমার এই রচনায় আমার কাহিনির নায়কের মুখ দিয়ে যা যা কথা বেরিয়েছে, ছেলেদের সম্পর্কে যে সমস্ত ঘটনার উল্লেখ এখানে আছে সে সবই বাস্তবিক ঘটেছিল — এক কথায়, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কোথায়, তাও আমি বলে দিতে পারি। কোনোকিছুই স্বকপোলকল্পিত নয়।
কাহিনিতে মঠের জীবনযাত্রার যে বিস্তারিত বিবরণ আছে তাও লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতালব্ধ। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে শিশুপুত্র আলেক্সেইয়ের মৃগীরোগে মৃত্যু হলে সত্তপ্ত লেখক সান্ত্বনালাভের জন্য দার্শনিক সলভিয়োতের সঙ্গে ওপতিনা মঠে গিয়েছিলেন। উপন্যাসে সন্তানহারা জননীর উদ্দেশে মঠবৃদ্ধ মহাস্থবির জোসিমার উপদেশও এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। প্রসঙ্গত, এখানেও মৃত শিশুটির নাম আলেক্সেই। আবার উপন্যাসের নায়কও আলেক্সেই —আলিয়োশা।
হয়তো তা-ই, কিন্তু সবই একজন মহাপ্রতিভাধর শিল্পীর গভীর মানবতাসম্পন্ন দৃষ্টিতে নতুন ভাবে, নতুন আলোকে উদ্ভাসিত।
সত্তরের দশকে এই উপন্যাসের একটি খসড়ায় লেখক লিখেছিলেন: ‘দাঁড়াচ্ছে এই যে এক ভাই নাস্তিক ও নৈরাশ্যবাদী। অন্যজন রগচটা, উগ্রচণ্ড। তৃতীয় জন—ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, নব জীবনশক্তি, নতুন মানুষ (এবং নবীনতম প্রজন্ম — শিশুরা)।
গ্রন্থের সূচনায় সুসমাচার থেকে যে উদ্ধৃতি লেখক দিয়েছেন এই প্রসঙ্গে তা গভীর অর্থবহ। এর দ্বারা লেখক রাশিয়ার ভবিষ্যৎ শ্রীবৃদ্ধি সম্পর্কে তাঁর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন। রাশিয়া বর্তমানে যে অসুস্থতায় ভুগছে (দস্তইয়েভস্কির ভাষায় পচন, বিশৃঙ্খলা, অবক্ষয় ইত্যাদি) একদিন সে তা কাটিয়ে উঠবে। সেটা ঘটবে আলিয়োশার ভবিষ্যৎ কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে, যার ভূমিকা বর্তমান উপন্যাসে তেমন স্পষ্ট নয়। বর্তমান উপন্যাসের ভূমিকাতে লেখক বলেছেন: ‘…….কাহিনি দুটি। দ্বিতীয়টাই মুখ্য। তার উপজীব্য, আমাদের এই সময়ে, ঠিক এই বর্তমান মুহূর্তে আমাদের নায়কের কার্যকলাপ।’ নায়ক যে আলিয়োশা ভূমিকার প্রথম ছত্রেই একথাও তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। আলিয়োশাকে নিয়ে সেই মুখ্য কাহিনিই লেখক শেষ পর্যন্ত লিখে যেতে পারেননি। ঊনবিংশ শতাব্দীর সত্তর থেকে আশির দশকের মধ্যে আলিয়োশার কার্যকলাপই হত কারামাজভ সংক্রান্ত দ্বিতীয় উপন্যাস বা আখ্যানের মূল বিষয়বস্তু। লেখকের সহধর্মিণী আন্না দস্তইয়েভস্কায়া ১৯১৬ সালে জানিয়েছিলেন যে ১৮৮২ সাল নাগাদ ‘কারামাজ’- এর পরবর্তী অংশ নিয়ে বসার ইচ্ছে তাঁর ছিল। ‘আলিয়োশা তখন আর নবীন যুবা নয়, একজন পূর্ণবয়স্ক পরিণত মানুষ। বহু নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে সে ইতিমধ্যে লিজা খলাকোভার সঙ্গে এক জটিল জীবন কাটিয়ে এসেছে, মিতিয়া নির্বাসনদণ্ড ভোগের পর ফিরে এসেছে।……’ তৎকালীন বিখ্যাত সমালোচক সাংবাদিক ও প্রকাশক আলেক্সান্দ্র সের্গেইয়েভিচ সুভোরিন (১৮৩৪-১৯১২) তাঁর দিনলিপিতে লিখেছেন : ‘ফিয়োদর মিখাইলভিচ বলেছিলেন আলিয়োশা কারামাজকে নায়ক করে তিনি একটি উপন্যাস লিখবেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল মঠের জীবন যাপনের পর আলিয়োশা একজন বিপ্লবীতে পরিণত হবে। সে সত্যের সন্ধান করবে, সত্যের সন্ধান করতে করতে বিপ্লবের পথে যাত্রা করবে, রাজনৈতিক অপরাধে জড়িয়ে পড়বে, সে জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে।….. তার পর? কিন্তু এসবই জল্পনাকল্পনার বিষয়। তবে আলিয়োশাই যে কাহিনির নায়ক হত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই উপন্যাসের সমাপ্তি সেই রকম হলেও হতে পারত যাতে আলিয়োশার দ্বিধাবিভক্ত সত্তা মানুষের দুঃখদুর্দশা মোচনে বিপ্লবের ভূমিকা সম্পর্কে একটা বড়ো রকমের প্রশ্ন রেখে যেত।
কিন্তু কারামাজভ ভাইয়েরা আমরা যে আকারে পাচ্ছি সেটাই আমাদের বিচার্য বিষয়।
বিশিষ্ট রুশ চিন্তাবিদ এবং দস্তইয়েভস্কি গ্রন্থের (১৯৩৪) লেখক নিকলাই বের্দিয়ায়েত্ (১৮৭৪-১৯৪৮)-এর মতে, অপরাধ প্রসঙ্গে যে প্রশ্ন বারবার লেখকের কাছে অবধারিত ভাবে উঠে এসেছে তা হল মানুষের কোন কাজ অপরাধ সত্ত্বেও গ্রহণযোগ্য? মানুষের যে কোনো অপরাধকেই আমরা যুক্তি দিয়ে মেনে নিতে পারি?… অপরাধ ও শাস্তি, অপদেবতা, কারামাজভ ভাইয়েরা প্রতিটি উপন্যাসেই তিনি কোনো না কোনো ভাবে সে প্রশ্ন পাঠকের সামনে ভুলে ধরেছেন। বারবার ফিরে আসছে ‘অপরাধ ও শাস্তি’র রাসকোলনিকভের সেই চিন্তা- ‘কারামাজভ ভাইয়েরা’ উপন্যাসে রাকিতিনের মুখে আমরা শুনতে পাই, একজন বুদ্ধিমান মানুষের সব কিছুই করা সাজে। কী ভাবে কী করতে হয় তার জানা আছে। কিন্তু তুমি? খুন করে ফেঁসে গেলে, এখন জেলে পচে মর। দস্তইয়েভস্কির স্বাধীন মানুষের দ্বন্দ্ব যে প্রশ্ন থেকে শুরু হচ্ছে তা এই যে আমার স্বাধীনতা কি কোনো অলঙ্ঘনীয় নৈতিক বিধানে সীমাবদ্ধ, না কি আমি চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারী হওয়ার মতো স্বাধীন? তাঁর মনে হয়েছে স্বাধীনতা যখন স্বেচ্ছাচারের সীমায় নেমে আসে তখন মানুষ কোনো কিছুকেই আর পবিত্র বা নিষিদ্ধ বলে ভাবতে পারে না। সে তখন নিজেকেই ঈশ্বর বলে ভাবতে শুরু করে, ভাবে যা খুশি করার স্বাধীনতা তার আছে। অথচ এই রকম অভ্যগ্র স্বাধীনতা থেকেই মানুষ একটা নির্দিষ্ট ধারণার জালে আটকে পড়ে এবং শেষাবধি তার সত্যিকারের স্বাধীনতাই হারিয়ে ফেলে। এই সঙ্কটকে দস্তইয়েভস্তি অসাধারণ শিল্পনৈপ্যুণের ফলে বারবার উপস্থাপনা করেছেন তাঁর মহৎ দৃষ্টিভঙ্গিতে।
স্মের্দিকোভ যখন বুড়ো কারামাজভকে খুন করে তখন সমস্ত ‘পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য প্রমাণ’ দমিত্রির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। কিন্তু ইভান বুঝতে পারে যে অভিসন্ধিমূলক ভাবে না হলেও খুনের বৃদ্ধি পরোক্ষ ভাবে জুগিয়েছিল সে-ই, তাই উসকানিদাতা হিসেবে অপরাধের দায় তার ওপর বর্তায়। শেষে সে যে স্বীকারোক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তা অনেকটা অপরাধ ও শাস্তির রাসকোলনিকভের ধরনের। স্বীকারোক্তি করার আগে তার সঙ্গে দীর্ঘ তর্ক চলে শয়তানের। শয়তান তাকে এই যুক্তি দেয় যে ভালোমন্দের মধ্যে সমান ভার বজায় রাখার জন্য মন্দের প্রয়োজনীয়তা আছে। আবার ঘুরে ফিরে আসছে দস্তইয়েভস্কির সৃষ্ট চরিত্রগুলির সেই দ্বৈত সত্তা বা দ্বিধাবিভক্ত ব্যক্তিত্ব যা নিজেই নিজের বিরোধিতা করছে। ইভান, দমিত্রি, স্মের্দিকোভ্ এমন কি আলিয়োশা—এদের সকলের ক্ষেত্রেই একথা প্রযোজ্য। যে পরিস্থিতিতে বুড়ো কারামাজভের মৃত্যু হল ভাতে পরোক্ষ ভাবে ইভানকে কেন, এমনকি দমিত্রিকে এবং অল্পবিস্তর আলিয়োশাকেও দায়ী করা যেতে পারে বিশেষত দমিত্রিকে তো বটেই, যেহেতু মনে মনে বাবাকে খুন করার অভিপ্রায় তারও ছিল। আলিয়োশার একমাত্র অপরাধ এই যে সে অপরাধ নিবৃত্ত করতে পারত, অথচ চেষ্টা করেনি। অর্থাৎ নীতিগত ভাবে এরা সকলেই অপরাধী। প্রায় সকলেই বিবেকের তাড়নায় তাড়িত। প্রকৃত খুনি স্মের্দিকোভ আত্মহত্যা করল। প্রবল মানসিক চাপে ইভান স্নায়ুজ্বরে আক্রান্ত হল, তার জীবন সংশয় দেখা দিল। দমিত্রিকে ‘অপরাধ’ না করেও বিচারের প্রহসনে শাস্তি পেতে হল। সে শাস্তি মাথা পেতে নেওয়া ছাড়া তার গত্যন্তর রইল না। দমিত্রির নিজেরই মুখের কথায়, “দন্ড আমি মাথা পেতে নিচ্ছি এই কারনে নয় যে খুন করেছি, নিচ্ছি এই কারনেই যে খুন করতে চেয়েছিলাম, আর হয়ত সত্যি সত্যি করতামও।…” মানুষের এই দুঃখভোগকে দস্তইয়েভস্কি বড়ো রকমের মর্যাদা দিয়েছেন। অপরাধ ও শাস্তিতে দেখতে পাই রাসকোলনিকভ্ সোনিয়ার সামনে নতজানু হয়ে তাকে বলছে : “আমার এই প্রণতি তো তোমাকে নয়, মানুষের এই যে শত দুঃখযন্ত্রণা তাকেই।” ‘কারামাজভ ভাইয়েরা’ উপন্যাসেও দেখতে পাই দমিত্রির আসন্ন দুঃখ ভোগের আভাস পেয়ে মহাস্থবির জোসিমা তাকে প্রণতি জানাচ্ছেন। এই দুঃখভোগের মধ্য দিয়েই দমিত্রির মুক্তিলাভ ঘটেছিল।
অপরাধ ও শাস্তিতে খুনি কে আমরা আগে থাকতেই তা জানতাম। বিবেকের তাড়নায় সে কীভাবে নিজেই ধরা দিয়ে মুক্তি লাভ করল নানা বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে লেখক সেই আত্মশুদ্ধির কাহিনি আমাদের শুনিয়েছেন। কারামাজভ ভাইয়েরা উপন্যাসে খুনি কে আমরা জানি না, অথচ অনুমান করতে পারলেও সে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় আদালতের বিচারে শাস্তি পেতে হল এমন একজনকে যে প্রত্যক্ষ ভাবে হত্যার সঙ্গে যুক্ত নয়। অথচ নীতিগত ভাবে অপরাধের চিত্তা মনে মনে পোষণ করার কারণে আত্মশুদ্ধির জন্য এ শাস্তি তার প্রাপ্য। দত্তইয়েস্কির চিন্তা যে কীভাবে একটি বিরোধ থেকে আরেকটি বিরোধের সৃষ্টি করে, আবার তারই মধ্য দিয়ে সত্য উদ্ঘাটনে প্রবৃত্ত হয় এটা তারই এটা দৃষ্টান্ত। এতে পাঠকের বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে আদালতের দৃশ্যে লেখক প্রসিকিউটর ও কৌঁসুলির সওয়াল জবাবের বর্ণনা দিয়েছেন। পক্ষ প্রতিপক্ষের এই প্রচণ্ড বাদপ্রতিবাদের মধ্যেও আবার প্রসিকিউটর ও কৌঁসুলি দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত রেষারেষি এবং একজনের কর্মজীবনের পথে আরেকজনের প্রতিবন্ধকতার মানসিক দুর্বলতার দিকও উদ্ঘাটিত। বিশাল ও জটিল রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা ভুল পথে পরিচালিত হয়ে কী ভাবে একজন নির্দোষ ব্যক্তির দণ্ডবিধান করতে পারে তার দৃষ্টান্ত তিনি দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে লেখক এটাও দেখিয়েছেন যে একই ঘটনার দুটি ভাষ্য হতে পারে এবং দুটির যে কোনোটাই সমান সম্ভাবনাময়, অথচ কোনোটাই উপযুক্ত নয়, সমান ত্রুটিপূর্ণ, আবার একেকজনের নিজেরই দ্বৈতসত্তা পরস্পরবিরোধী, স্ববিরোধীও বটে।
ঠিক এই দৃষ্টিতেই বিচার করতে হয় যখন আমরা দেখি ফিয়োদর কারামাজভের মতো একজন ভ্রষ্টাচারী মঠের সাধুদের জীবনযাত্রার বিরূপ সমালোচনা করে বলে: “আরে, এদের এখানে কী কী খাবার তৈরি হয়েছে দেখি?… ওরে বাবা, এ যে দেখছি পুরোনো পোর্ট ওয়াইন, য়েলিসেইয়ে ব্রাদার্স-এর দোকানের সিল করা মধুর সুরা। বাহবা, বাবারা …. কী সব বোতলই না এনে বসিয়েছেন আমাদের সাধুবাবারা হে- হে- হে! বলি, এসব এখানে জোগাচ্ছে কে? রুশি চাষাভুসো, মেহনতি মানুষ হাতে কড়া ফেলে সামান্য যে কয়েকটি কপর্দক উপার্জন করছে, নিজের পরিবারকে বঞ্চিত করে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় কর ফাঁকি দিয়ে তা-ই এনে তুলে দিচ্ছে এখানে! আপনারা না পুণ্যাত্মা সাধুসন্তু, আপনারা কিনা দেশের মানুষকে শুষে খাচ্ছেন!’— সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত সমালোচনা। কিন্তু তাই বলে ফিয়োদর কারামাজভের মুখে! এমন ভাঁড়ামির সুরে। অথবা রাকিতিনের মতো নীতিজ্ঞানহীন সুযোগসন্ধানী যখন আদালতে বহুকালের বদ্ধমূল ভূমিদাসপ্রথার কু অভ্যাস এবং যথোপযুক্ত সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অভাবে বিশৃঙ্খলার কথা বলে অথবা সামাজিক অন্যায় অবিচারের ওপর প্রবন্ধ লেখে তখন তা সত্য হলেও কি বিশ্বাসযোগ্য শোনায়? আবার শয়তানের সঙ্গে ইভানের সাক্ষাৎকার অথবা ইভান রচিত মহাবিচারকের উপাখ্যান? বিশেষত মহাবিচারক সে ইভান নিজেই। লেখক খ্রিস্টের পক্ষে, কিন্তু যুক্তিবাদী ও সন্দেহবাদী ইভান নিজে? তার মহাবিচারকের মতে খ্রিস্ট অসম্পূর্ণ। এই পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠায় তিনি ব্যর্থ। সাধারণ মানুষের পরিপাক করার পক্ষে যিশু বড়ো বেশি মৌলিক। তাঁর বার্তা একমাত্র অলৌকিকতা ও শক্তির মোড়কেই টিকে থাকতে পারে। তাঁর স্মৃতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁর সম্পর্কে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। যিশুকে একথা স্বীকার করে নিতে হল। সেই স্বীকৃতির স্মারক হিসেবে গল্পের যিশু মহাবিচারককে চুম্বন করল। আলিয়োশাও তার স্বীকৃতিস্বরূপ চুম্বন করল কাহিনির রচয়িতা ইভানকে। কিন্তু এই অধ্যায়েও দেখা যাচ্ছে অনেক প্রশ্নেই ইভানের মতামত দ্বিধাবিভক্ত, পরস্পরবিরোধী।
উপন্যাসের পটভূমি বহু বিচিত্র চরিত্রের সমাহারে সমৃদ্ধ মঠের সাধুসন্ন্যাসী, কৃষক বিচারক, উকিল—কে নেই সেখানে? প্রতিটি চরিত্রচিত্রণে ঔপন্যাসিক তাঁর পরিণত ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রকরণের বিচারে দস্তইয়েভস্কি তাঁর উপন্যাসগুলিতে যে কোরাস রীতির আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন তারও চরমোৎকর্ষ ঘটেছে এই উপন্যাসে। বহুকণ্ঠের সমন্বয়ে (Polyphony) বিশালতার আবহ সৃষ্টি দস্তইয়েভস্কির উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ‘দস্তইয়েভস্কির শিল্পকলার সমস্যা’ প্রবন্ধে এই দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বিখ্যাত রুশ সাহিত্য সমালোচক ও তাত্ত্বিক মিখাইল বাখুতিন। প্রতিটি নায়ক-নায়িকার নিজস্ব কণ্ঠ, নিজস্ব আইডিয়া আছে—সেটা তার জীবনের মূলমন্ত্র অবশ্য তার মধ্যেও স্ববিরোধ আছে। কারামাজভূদের সকলেই এরকম ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠের অধিকারী—আর এই সব কন্ঠের, তাদের পরস্পর বিরোধিতার ঘাত-প্রতিঘাতে সৃষ্টি হয় বহুকণ্ঠের স্বর। তা ছাড়া একই ঘটনার বিবরণ নানা ভাবে শোনা যায় বিভিন্ন চরিত্রের মুখে—তাতেও সৃষ্টি হয় এই আবহ। বাতিনের সঙ্গে এ বিষয়ে একমত হয়ে আনাতোলি লুনাচারস্কি তাঁর দস্তইয়েভস্কিতে কণ্ঠস্বরের বহুত্ব’ প্রবন্ধে মন্তব্য করেছিলেন: “দস্তইয়েভস্কি যখন উপন্যাসের ধারাটি মনে মনে নির্মাণ করেছিলেন, চরিত্রগুলির বিকাশের স্তর নিয়ে ভাবছিলেন—সম্ভবত তখন কোনো পূর্বপরিকল্পিত ছক ধরে অগ্রসর হননি, কিংবা সে ভাবে অগ্রসর হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিংবা বাস্তবিকই তাঁর কাজের ধর্মটি ছিল কণ্ঠস্বরের বহুত্বধর্মী, অর্থাৎ তিনি স্বপ্নিল কিছু ব্যক্তিসত্তাকে একত্রীভূত করেই, তাদের চিন্তা ও চেতনার দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সূত্রেই সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। আবার এমনও হতে পারে যে নিজের সৃষ্ট চরিত্রগুলির মতাদর্শ ও নান্দনিক বোধের অভাবে ধ্যান ধারণাগত দ্বন্দ্ব-সংঘাত বিষয়ে দস্তইয়েভস্কি অতিমাত্রায় আগ্রহী ছিলেন।…
‘অপরাধ ও শাস্তি’ এবং ‘কারামাজ ভাইয়েরা পাশাপাশি মিলিয়ে পরতে গেলে সাধারণ পাঠকের দৃষ্টিতে আরও যে জিনিসিটি ধরা পড়ে তাও কম আকর্ষণীয় নয়। ‘অপরাধ ও শাস্তি’তে অপরাধীর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও মানসিক চাপে পড়ে তাকে শেষ পর্যন্ত তার অপরাধ স্বীকার করতে হয়েছিল, কিন্তু ‘কারামাজভ ভাইয়েরা’ – তে ঠিক তার বিপরীত একজন নিরপরাধের বিরুদ্ধে তথাকথিত কিছু পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য প্রমাণ পেয়ে তারই ভিত্তিতে তদন্তের ফলে কোনও মামলা যে কতদূর ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে এবং নিরপরাধ ব্যক্তি যে শাস্তি পেতে পারে এই উপন্যাসে তারই নিদর্শন আছে। বিচারের এই প্রহসনও অনেক সময় বাস্তব সত্য।
দস্তইয়েভস্কি তাঁর এই অসমাপ্ত উপন্যাসে শেষ কথা বলে কোনো কথা বলে যান নি— অবশ্য উপন্যাস সমাপ্ত হলেও হয়তো বলতেন না। তার বদলে মানবজীবন ও সমাজের সমস্যার পর সমস্যা, সেগুলির অন্তর্নিহিত পরস্পরাবিরোধিতা, অবিরাম একটি বিরোধ থেকে আরেকটি বিরোধের উদ্ভবের কাহিনি বিবৃত করেছেন একের পর এক চমকপ্রদ ঘটনাবিন্যাসের মধ্য দিয়ে। উপন্যাসের ঘটনা অফুরান। পাত্রপাত্রীরা বড়ো তাড়াহুড়ো করে কথা বলে, যেন সময়ের বড়োই অভাব। লেখক নিজেও ঘন ঘন মূল কাহিনি মুলতুবি রেখে আরেকটি নতুন উপাখ্যানের অবতারণা করেন, প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে চলে যান— যেন তাঁর অনেক কথা বলার আছে, কিন্তু আশঙ্কা যে শেষ পর্যন্ত বলে উঠতে পারবেন না।
দস্তইয়েভস্কির উপন্যাসের গঠন শিথিল। তাঁর রচনায় এবং রচনাশৈলীতে, বাক্যবিন্যাসে ‘গৃহিণীপনার অভাব’ আছে। অনেক সময় বাক্য পর্যন্ত অসম্পূর্ণ। সর্বত্রই একটু অগোছাল, বেখেয়লি ভাব। তাঁর চরিত্রগুলিও ‘হঠাৎ-হঠাৎই’ উত্তেজিত হয়ে পড়ে, বড় বেশি, ‘চেঁচিয়ে’ কথা বলে, কথায় কথায় ‘ফ্যাকাশে হয়ে যায়, মূর্ছা যায়। এমন কি অদ্ভুত কাণ্ড এই যে ক্রোধে লাল না হয়ে রক্তশূন্যও হয়ে যায় তাদের কারও কারও মুখ। বিশেষত তাঁর নারী চরিত্রগুলি প্রায় সকলেই হিস্টিরিয়াগ্রস্ত। অতিশয়োক্তি, অতিরঞ্জন? তুর্গেনেভের কথায় : ‘….এ হল মৌলিক লেখক আখ্যা অর্জনের একটা সস্তা উপায়।’ কিন্তু এই মৌলিকতাই হয়ত বা নামান্তরে পরাবাস্তবতা যার সাহায্যে কোন কোন ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা বা তার মর্মমূলে প্রবেশ করাও সম্ভব? এটাও দস্তইয়েভস্কির একটা নিজস্ব প্রকরণ—ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস দিয়ে বাস্তবকে দেখানোর একটা কৌশল।
তাঁর ভাষারীতি সেকেলে। তাঁর রচনায় বেশ কিছু অপ্রচলিত শব্দের এবং প্রচলিত শব্দের অপ্রচলিত অর্থে প্রয়োগও আছে যা তাঁর সমকালীন লেখকদের লেখার মধ্যে—যেমন তল্স্তোয়ের ক্ষেত্রে—এমনকি পূর্বসুরী পুশকিনের রচনাতেও দেখা যায় না। সেই তুলনায় তাঁর ভাষারীতিকে সাবেকিই বলতে হয়। এত কিছু সত্ত্বেও কাহিনির গতি এমনই দুর্বার যে টানটান উত্তেজনার মধ্যে তা পাঠকদের টেনে রাখে, ঘটনার ঘনঘটায় পাঠককে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে হয়।
দস্তইয়েভস্কি অতি জটিল ও পরস্পরবিরোধী। তৎকালীন বুদ্ধিজীবী ও লেখক মহলে তাঁর সম্পর্কে নানা ধরনের মত প্রচলিত ছিল। ইভান বুনিন তাঁকে স্রেফ ‘বাজে’ লেখক বলে মনে করতেন। মাক্সিম গোর্কির কথায়: ‘দস্তইয়েভস্কির প্রতিভার মহিমা অবিসংবাদিত। শিল্পসৃষ্টির ক্ষমতায় তাঁর প্রতিভা বুঝি-বা একমাত্র শেক্সপিয়রের সমতুল। কোন কোন সমালোচক তাঁকে ‘পাগলা গারদের শেক্সপিয়র’ আখ্যাও দিয়েছেন। তাঁর পরম ভক্ত টোমাস মান পাঠকদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন: ‘দস্তইয়েভস্কি—তবে পরিমিত মাত্রায়। কিন্তু তাহলে ত দস্তইয়েভস্কির রচনা সীমিত সংখ্যায় প্রকাশের যে নীতি সোভিয়েত আমলে প্রচলিত ছিল তাকেই সমর্থন করতে হয়।
অরুণ সোম
কলকাতা
২ এপ্রিল, ২০১০
উপন্যাসের চরিত্র-পরিচয়
ফিয়োদর পাভলভিচ কারামাজভ : জমিদার, ৫৫ বছর বয়স
আদেলাইদা ইভানভনা (মিউসভা) : ফিয়োদর পাভলভিচের প্রথম স্ত্রী
দমিত্রি ফিয়োদরভিচ (ডাক নাম মিতিয়া): ফিয়োদর কারামাজভের বড়ো ছেলে, আদেলাইদার গর্ভজাত, কাহিনির শুরুতে ‘২৮ বছরের যুবা’ বলে উল্লিখিত।
পিয়োতর্ আলেক্সান্দ্রভিচ মিউসভ : আদেলাইদার খুড়তুত দাদা, বড় ছেলে মিতিয়ার মামা
সোফিয়া ইভানভনা : ফিয়োদর পাভলভিচের দ্বিতীয় স্ত্রী। গির্জার কোন এক অজ্ঞাতকুলশীল কর্মচারীর মেয়ে, জনৈক জেনারেলের বিধবা পত্নীর কাছে মানুষ।
ইভান বা ইভান ফিয়োদরভিচ : ফিয়োদর পাভলভিচ কারামাজভের দ্বিতীয় পুত্র, সোফিয়া ইভানভনার গর্ভজাত।
আলেক্সেই (‘আলিয়োশা’ ডাক নামেই সমধিক পরিচিত) : কনিষ্ঠ পুত্র, সোফিয়া ইভানভনার গর্ভজাত। উপন্যাসের এক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে: আলিয়োশার যখন ২০, ইভানের ২৪, দমিত্রির ২৭ পেরিয়ে গেছে।
গ্রিগোরি ভাসিলিয়েভিচ কুতুজভ্ : ফিয়োদরের ভৃত্য
মার্ফা ইগনাতিয়েনা : গ্রিগোরির স্ত্রী
এফিম পেত্রোভিচ পলিয়েনভ : জেলার রাজপুরুষ প্রধান, ইভান ও আলেক্সেইয়ের এককালের অভিভাবক।
সাধু জোসিমা : মহাস্থবির বা মঠবৃদ্ধ, বয়স ৬৫
প্রভু পাইসি : মঠের জনৈক শাস্ত্রজ্ঞ
সাধু ইওসিফ : মঠের গ্রন্থাগারিক, ধর্মযাজক
মিখাইল ওসিপভিচ রাকিতিন : ধর্মীয় বিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষার্থী, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘রাকিতিন’ পদবি ধরে উল্লেখ করা হয়েছে, কদাচিৎ ‘মিখাইল’ নামে বা ‘মিশা’ ডাকনামে। ২০-২২ বছর বয়স
পিয়োতর ফোমিচ্ কালাগানভ্ : বছর কুড়ি বয়স, মিউসভের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়, আলিয়োশার বন্ধু।
মাক্সিমভ্ : জনৈক দুর্দশাগ্রস্ত জমিদার
পাভেল ফিয়োদরভিচ স্মের্দিকোভ্ : ফিয়োদরের ভৃত্য, তার অবৈধ সন্তান।
কাতেরিনা ইভানভনা ভের্খভৎসেভা : জনৈক কর্নেলের মেয়ে। বনেদি ঘরের পরমা সুন্দরী, এক সময় দুমিত্রির বাগদত্তা। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়া, জনৈক জেনারেলের বিধবার সূত্রে প্রভুত বিত্তের মালিক।
আগাফিয়া ইভানভনা : উক্ত কর্নেলেরই প্রথম পক্ষের কন্যা
আগ্রাফেনা আলেক্সান্দ্রভনা সুভেতলোভা (‘গ্রুশেনকা’ ডাক নামেই সমধিক পরিচিত) : এককালে সামসোনভ নামে এক ব্যবসায়ীর অভিভাবকাধীন, পরে ফিয়োদর কারামাজভের কারবারের কর্মচারী। ২২ বছর বয়স। ‘আগ্রিপিনা’ নামেও তাকে সম্বোধন করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক সম্বোধনে ও উল্লেখে মাদাম সভেতলোভা
কুজ্মা কুজমিচ সামসোনভ্ : জনৈক ব্যবসায়ী, গ্রুশেনকার অভিভাবক
গোরস্তকিন : জনৈক কাঠের ব্যবসায়ী, ‘খোচর’ নামে পরিচিত
মঠাধ্যক্ষ নিকলাই মাদাম খখলাকোভা বা কাতেরিনা ওসিপভনা : অভিজাত জমিদার মহিলা, বিধবা, তেত্রিশ বছর বয়স। কোথাও বা চল্লিশ বলা হয়েছে।
য়েলিজাভিয়েতা খখলাকোভা (লিজে বা লিজা) : তার মেয়ে বছর চৌদ্দ বয়স
পরফিরি : আশ্রমের ব্রতচারী শিষ্য
প্রভু ফেরাপোন্ত : আশ্রমবাসী সাধু, ৭৫ বছর বয়স
প্রোখরভা : জনৈক অধস্তন সামরিক অফিসারের বিধবা স্ত্রী
সন্তু সেলিভেস্তর মঠ থেকে আগত জনৈক তীর্থযাত্রী সন্ন্যাসী
নিকলাই ইলিচ্ স্নেগিরিয়োভ্ : সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া ক্যাপ্টেন, ফিয়োদর কারামাজভের কাজের সহযোগী। ‘ফতো কাপ্তান’ নামে পরিচিত। দমিত্রির হাতে নিগৃহীত।
ভারভারা নিকলাইয়েনা : তার বড়ো মেয়ে
ইলিয়া (‘ইলিউশা’ ডাক নামে পরিচিতি) : ক্যাপ্টেনের ছেলে, স্কুলের পড়ুয়া, ৯ বছর বয়স।
নিনা নিকলাইয়েনা : ক্যাপ্টেনের ছোটো মেয়ে
আরিনা পেত্রোভুনা : ক্যাপ্টেনের স্ত্রী, ৪৩ বছর বয়স
মারিয়া কন্দ্রাতিয়েভনা : জীর্ণদশাগ্রস্ত বসতবাড়ির কর্ত্রীর মেয়ে, মস্কো থেকে আগত।
‘রহস্যময় আগন্তুক’ : পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রৌঢ়, নামে উল্লেখ নেই, যদিও উল্লেখযোগ্য চরিত্র, তবে লেখক যখন তার সম্পর্কিত প্রসঙ্গের যবনিকা টেনেছেন, তখন শেষ পংক্তিতে একবার শুধু ‘মিখাইল’ নামে উল্লেখ করেছেন।
মরোজভা : বণিক মরোজভের বিধবা স্ত্রী, যার বাড়িতে গ্রুশেনকা ভাড়া থাকত।
ফেনিয়া (ফেদোসিয়া মার্কভনা) : গ্রুশেনকার দাসী
পিয়োতর ইলিচ পেরখোতিন : যুবক, সরকারি আমলা, যার কাছে যার কাছে মিতিয়া তার পিস্তল বন্ধক রেখেছিল।
ত্রিফন বরিসভিচ : মোক্রয়ের জনৈক সরাইওয়ালা
মুসিয়ালভিচ : জনৈক পোল বংশোদ্ভুত ব্যক্তি গ্রুশেনকার প্রণয়ী
ভ্রুবলিয়োভস্কি : উক্ত ব্যক্তির সঙ্গী, পোল বংশোদ্ভূত
মিখাইল মাকারভিচ মাকারভ : জেলা পুলিশ সুপার, বৃদ্ধ।
ভারবিনস্কি : জেলা পরিষদের ডাক্তার। যুবক।
ইপ্পলিত কিবিল্লভিচ : প্রসিকিউটর বলে পরিচিত। আসলে ডেপুটি প্রসিকিউটর, ৩৫ বছর বয়স
নিকলাই পারফেনভিচ নেল্যুদভ : বিচারবিভাগীয় তদন্তকারী
মাদ্রিকি মাদ্রিকিয়েভিচ শমেরৎসোভ : মোক্রয়ের থানার পুলিশ ইনস্পেক্টর
মাদাম ক্রাসোতকিনা (আন্না ফিয়োদরভনা) : জনৈক সরকারি আমলার বিধবা পত্নী, ত্রিশ বছর বয়স।
কোলিয়া ক্রাসোতকিন : তার ছেলে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র, বছর চৌদ্দ বয়স।
দার্দানেলভ্ : মাধ্যমিক স্কুল-শিক্ষক
ডাক্তার – গিন্নি : জনৈক নিখোঁজ ডাক্তারের স্ত্রী, মাদাম ক্রাসোতকিনার বান্ধবী ও ভাড়াটে।
নাস্তিয়া : ডাক্তার-গিন্নির মেয়ে, আট বছর বয়স
কোস্তিয়া : ডাক্তার-গিন্নির ছেলে, সাত বছর বয়স
স্মরভ্ : বছর এগারো বয়স, স্কুল-পড়ুয়া, জনৈক অবস্থাপন্ন সরকারি আমলার ছেলে।
ফেতিউকোভিচ : বয়স চল্লিশ, মস্কো থেকে আগত আইনজীবী, দমিত্রির পক্ষ সমর্থনকারী কৌঁসুলি।
ডাক্তার হেরৎসেনশটুবে : জার্মান বংশোদ্ভূত স্থানীয় চিকিৎসক, সত্তর বছর বয়স।
.
উৎসর্গ
আন্না গ্রিগোরিয়েভনা দস্তইয়েভস্কায়া[১]
আমি তোমাদিগকে যথার্থ কহিতেছি, যথার্থই কহিতেছি : গমের বীজ ক্ষেত্রে পতিত হইলে উহার বিনাশ না ঘটিলে একাকী রহিয়া যায়; বিনাশ ঘটিলে তবেই প্রভূত ফল প্রসব করে। (যোহান কথিত সুসমাচার অধ্যায় ১২, শ্লোক ২৪)[২]
.
গ্রন্থকারের নিবেদন
আমার কাহিনির নায়ক আলেক্সেই ফিয়োদরভিচ কারামাজভের জীবনবৃত্তান্ত লিখতে বসে আমি কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্ত।[৩] ঘটনা এই যে আলেক্সেই ফিয়োদরভিচকে যদিও আমি আমার কাহিনির নায়ক বলছি, তবু আমি নিজেই জানি যে লোকটাকে মহাপুরুষ আদৌ বলা যায় না। তাই অনুমান করতে পারি অনিবার্য কারণে প্রশ্ন উঠতে পারে: আপনার আলেক্সেই ফিয়োদরভিচ কীসে এমন অসাধারণ যে আপনি তাকে আপনার নায়ক হিসেবে বেছে নিলেন? কী এমন কাজ সে করেছে? কার কার কাছে এবং কী কারণে তার খ্যাতি? আমি একজন পাঠক হয়ে তার জীবনের ঘটনাবলি জানার পেছনে কেনই বা সময় নষ্ট করতে যাব?
এই শেষ প্রশ্নটিই সবচেয়ে বেশি মারাত্মক, যেহেতু এর উত্তরে আমার মাত্র একটি কথা বলার থাকে: হয়তো উপন্যাস থেকে আপনি নিজে তা দেখতে পারেন। কিন্তু উপন্যাস পাঠ করার পরও যদি আপনার চোখে তা ধরা না পড়ে? আমার আলেক্সেই ফিয়োদরভিচের মধ্যে যে উল্লেখযোগ্য কোনো বৈশিষ্ট্য আছে এ বিষয়ে যদি আপনি একমত না হন? আমার একথা বলার কারণ এই যে এটা আমি আগে থাকতে অনুমান করতে পারছি এবং অনুমান করে মনে দুঃখ পাচ্ছি। আমার কাছে সে একজন উল্লেখেযোগ্য ব্যক্তি, কিন্তু পাঠকের কাছে সেটা প্রমাণ করতে পারব কিনা সে বিষয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে। তার কারণ এই যে মানুষটি হয়তো বা কীর্তিমান, কিন্তু তার সেই কীর্তি অস্পষ্ট, অনির্দিষ্ট। তবে আমাদের মতো এমন এক সময়ে লোকের কাছ থেকে স্পষ্টতা দাবি করাও বোধহয় অদ্ভুত। একটা বিষয়ে সম্ভবত সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই: লোকটা অদ্ভুত, এমনকি খাপছাড়া গোছের। কিন্তু অদ্ভুত ও খাপছাড়া প্রকৃতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেয়ে সম্ভবত ব্যাঘাতই বেশি ঘটাতে পারে, বিশেষত লোকে যখন অংশের পর অংশ জুড়ে সামগ্রিক রূপ গড়ে তুলতে এবং সার্বিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে সামগ্রিক কোনো অর্থের সন্ধানে আগ্রহী। অথচ একজন খাপছাড়া লোক অধিকাংশ ক্ষেত্রে খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন। তাই নয় কি?
এখন আপনি যদি আমার এই শেষ সিদ্ধান্তটির সঙ্গে একমত না হয়ে উত্তরে বলেন: ‘ঠিক তা নয়’ অথবা ‘সব ক্ষেত্রে তা হয় না’ তাহলে আমার নায়ক আলেক্সেই ফিয়োদরভিচের তাৎপর্য সম্পর্কে আমি উৎসাহ বোধ করতে পারি। তার কারণ, একজন খাপছাড়া মানুষ সবক্ষেত্রে যে খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন নয়, তা তো বটেই, এমন কি সময় সময় তার মধ্যে সাধারণ ধর্মের নির্যাসও খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে সমসাময়িক আর সবাই বাকি সকলে কোনো এক দমকা হাওয়ায় কেন যেন সাময়িক ভাবে তা থেকে বিচ্ছিন্ন।…
নিতান্ত নীরস ও বিভ্রান্তিকর এই সব কৈফিয়ত দানের মধ্যে না গিয়ে কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াও অবশ্য শুরু করা যেত। পছন্দ হলে অমনিতেই লোকে পড়বে। কিন্তু মুশকিল এই যে জীবনবৃত্তান্ত আমার একটা অথচ কাহিনি দুটি।[৪] দ্বিতীয়টিই মুখ্য। তার উপজীব্য আমাদের এই সময়ে, ঠিক এই বর্তমান মুহূর্তে আমার নায়কের কীর্তিকলাপ। প্রথম উপন্যাসের ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে তেরো বছর আগে—[৫] এমনকি এটাকে উপন্যাস বলাও একেবারে ঠিক হবে না—বরং বলা যেতে পারে আমার নায়কের প্রথম যৌবনের একটি ক্ষণিক মুহূর্ত মাত্র। এই প্রথম উপন্যাসকে বাদ দিয়ে চলা আমার পক্ষে অসম্ভব, কেন না তা হলে দ্বিতীয় উপন্যাসের অনেক কিছুই দুর্বোধ্য থেকে যাবে। তাতে কিন্তু আমার প্রাথমিক অসুবিধা আরও জটিল হয়ে পড়ছে: আমি, অর্থাৎ স্বয়ং জীবনীকারই যদি মনে করি যে এরকম একটা সাদামাঠা ও বৈশিষ্ট্যহীন মানুষের ক্ষেত্রে একটি উপন্যাসই হয়তো বাড়তি, তাহলে আবার দুটো কেন? আমার এই আত্মম্ভরিতার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে?
এ সমস্ত প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গিয়ে যেহেতু আমি বিভ্রান্ত, তাই ঠিক করেছি কোনো রকম সমাধানের চেষ্টা না করে সেগুলিকে এড়িয়েই যাব। বলাই বাহুল্য, বিচক্ষণ পাঠক অনেক আগে থাকতে অনুমান করতে পেরেছেন যে একেবারে গোড়া থেকে সে দিকেই আমার ঝোঁক। আমার ওপর তাঁর ক্ষোভ শুধু এই কারণে যে মিছিমিছি আমি কতকগুলো অন্তঃসারশূন্য কথা আর মূল্যবান সময় ব্যয় করছি। এর যথাযথ উত্তর অবশ্য আমি দেব: অন্তঃসারশূন্য কথা আর মূল্যবান সময় আমি ব্যয় করেছি প্রথমত, ভদ্রতার খাতিরে, দ্বিতীয়ত ওটা আমার একটা চালাকি—আগে থাকতে সতর্ক করে দিলাম আর কি। প্রসঙ্গত অখণ্ডতার অপরিহার্য ঐক্যবন্ধন থাকা সত্ত্বেও আমার উপন্যাস যে আপনা আপনি দুটি উপাখ্যানে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে এই ভেবে আমি বরং খুশি। প্রথম উপাখ্যানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পরে পাঠক নিজেই স্থির করতে পারবেন দ্বিতীয়টি ধরা তাঁর পক্ষে সমীচীন হবে কিনা। অবশ্য কারও ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই—প্রথম উপন্যাসের দুটো পৃষ্ঠা পড়ার পর ইচ্ছে হলে বই সরিয়ে রাখতে পারেন, পরে আর নাও খুলতে পারেন। তবে এমন কিছু কিছু বিচক্ষণ পাঠকও আছেন যাঁরা নিরপেক্ষ বিচারে যাতে কোন ভুল না হয় সেই উদ্দেশ্যে অতি অবশ্য পড়ে শেষ করতে চাইবেন—রুশ সমালোকেরা সকলেই এই জাতের। হাজার হোক এ ধরনের মানুষও যে আছেন তা ভেবে আমি মনে মনে স্বস্তি বোধ করে থাকি। যাবতীয় নিষ্ঠা ও বিবেচনাবোধ সত্ত্বেও প্রথম আখ্যানের পর উপন্যাসটি সরিয়ে রাখার অজুহাত যদি তাঁদের থাকে তা অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত বলে আমি শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে রাজি আছি। ভূমিকায় এর বেশি কিছু আমার বলার নেই। এটা যে বাড়তি সে বিষয়ে আমার এতটুকু দ্বিমত নেই, কিন্তু লেখা যখন একবার হয়ে গেছে তখন থাকলই বা।
এবারে কাজের কথায় আসা যাক।



বাকি পর্বগুলোও চাইই
সেরা একটা কাজ হচ্ছে।
এটা কবে শেষ হবে?