এক – ফিয়োদর পাভলভিচ কারামাজভ

এক – ফিয়োদর পাভলভিচ কারামাজভ

আলেক্সেই ফিয়োদরভিচ কারামাজভ—ফিয়োদর পাভলভিচ কারামাজভের তৃতীয় পুত্র। ফিয়োদর পাভলভিচ ছিল আমাদের মহকুমার একজন জমিদার। এক সময় আমাদের এলাকায় লোকটার নাম শোনা যেত—এবং এখনও যে লোকে মনে করতে পারে এর কারণ তার শোচনীয় ও রহস্যজনক মৃত্যু। ঘটনাটা ঘটেছিল আজ থেকে ঠিক তেরো বছর আগে। সে কাহিনি যথাস্থানে বলা যাবে। নামেই জমিদার, জীবনের অতি অল্প সময় সে তার জমিদারিতে কাটিয়েছে। তার সম্পর্কে কেবল একটি কথাই বলতে হয়—অদ্ভুত চরিত্রের লোক। তবে ওরকম লোকের দেখা হামেশা মেলে না একথা বলা যায় না—ঠিক এমনই এক চরিত্রের যে শুধু কুৎসিত আবার নোংরাই নয়, কাণ্ডজ্ঞানহীনও বটে, যদিও সেই জাতের কাণ্ডজ্ঞানহীন, যাদের আর কোনো বিষয়ে না হোক, নিজেদের বিষয়সম্পত্তি সামলানোর ব্যাপারে জ্ঞান বেশ টনটনে। ফিয়োদর পাভলভিচ যখন জীবনযাত্রা শুরু করে তখন বলতে গেলে তার কিছুই ছিল না। সামান্য ছোটোখাটো জমিদার। সুযোগ পেলে যার তার বাড়িতে পাত পেতে বসে যেত, উঞ্ছবৃত্তি করে জীবন কাটত। কিন্তু যখন সে মারা যায় তখনও তার কাছ থেকে নগদ টাকাই পাওয়া গিয়েছিল এক লক্ষ রুবল। তা সত্ত্বেও আমাদের সারা মহকুমা জুড়ে একেবারে কাণ্ডজ্ঞানহীন উদ্ভট লোক হিসেবে তার সারাটা জীবন কাটে। আবারও বলছি: বোকামি নয়—উদ্ভট বলে যাদের আমরা জানি তাদের অধিকাংশই বেশ চালাক আর ধূর্ত প্রকৃতির—আসলে এটাকে বলা যায় স্রেফ কাণ্ডজ্ঞানহীনতা, তা আবার বিশেষ এক জাতের, জাতিগত।

লোকটা বিয়ে করেছিল দুবার। তিন ছেলে। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে—বড়ো ছেলে দমিত্রি ফিয়োদরভিচ—মিতিয়া। বাকি দুজনের একজন ইভান, আরেকজন আলেক্সেই- আলিয়োশা। তাদের জন্ম দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে। ফিয়োদর পাভলভিচের প্রথম স্ত্রী আমাদেরই মহকুমায় মিউসভ নামে রীতিমতো সম্পন্ন ও অভিজাত এক জমিদার পরিবারে মেয়ে। অগাধ বিষয়সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী, সুন্দরী, তার ওপর প্রাণচঞ্চল বুদ্ধিমতী অমন একটি মেয়ে, যার দেখা পাওয়া আজকাল না হলেও সেকালে নিতান্তই দুষ্কর ছিল, লোকসমাজে অপদার্থ নামে পরিচিত ওরকম একটা বাজে লোককে কী করে যে স্বামী হিসেবে বেছে নিতে পারল তার বিশদ ব্যাখ্যার মধ্যে আমি যাচ্ছি না। আজ থেকে দুই প্রজন্ম আগের রোমান্টিক যুগের একটি মেয়েকে আমি জানতাম—এক ভদ্রলোককে সে ভালোবেসেছিল, যে-কোনো সময় স্বচ্ছন্দে তাকে বিয়েও করতে পারত, কিন্তু বছরের পর বছর তার সঙ্গে প্রহেলিকাময় প্রণয়লীলার পর শেষকালে কেন যেন তার মাথায় ঢুকল যে তাদের মিলনের পথে দুর্লঙ্ঘ্য বাধা আছে। তাই এক ঝড়ের রাতে উঁচু খাড়া পাড় থেকে গভীর খরস্রোতা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন করল—স্রেফ ঝোঁকের মাথায়, শেক্সপীয়রের ওফেলিয়ার মতো হওয়ার ইচ্ছায়। তার বহুকালের পছন্দসই বড়ো সাধের ওই খাড়া উঁচু পাড়টা যদি অমন চোখ জুড়ান না হত, ওই জায়গায় যদি নেহাৎ সাদামাঠা একটা গদ্যময় সমতল পাড় থাকত তাহলে আত্মহত্যার ঘটনাটা হয়তো আদৌ ঘটত না। ঘটনাটা সত্যি এবং ভেবে দেখতে গেলে আমাদের রুশিদের জীবনে গত দু-তিন প্রজন্মের মধ্যে এরকম বা সমজাতীয় ঘটনার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। ঠিক তেমনি, আদেলাইদা ইভানভনা মিউসভার এই অদ্ভুত আচরণও নিঃসন্দেহে ছিল অন্যদের ধ্যানধারণার প্রতিধ্বনি। সেই সঙ্গে এর পেছনে ছিল অন্তরের অবরুদ্ধ চিন্তার জ্বালা। সে হয়তো নারী স্বাধীনতা ঘোষণা করতে চেয়েছিল, হয়তো চেয়েছিল তার আত্মীয়স্বজন ও পরিবার পরিজনের স্বেচ্ছাচার আর সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধাচরণ করতে। ধরে নেওয়া যেতে পারে, অলীক কল্পনার মোহে একমাত্র একটি মুহূর্তের জন্য তার মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে উঞ্ছজীবী হওয়া সত্ত্বেও ফিয়োদর পাভলভিচ আসলে প্রগতিমুখী এক যুগসন্ধিক্ষণের নির্ভীক ও তেজস্বী প্রবক্তাদের একজন। অথচ লোকটাকে একটা খল প্রকৃতির ভাঁড় ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। আরও চটক সৃষ্টি করেছিল প্রণয়ীর সঙ্গে আদেলাইদা ইভানভনার গোপনে গৃহত্যাগ, যা তার নিজের কাছে পরম উপভোগ্য মনে হয়েছিল। এদিকে ফিয়োদর পাভলভিচের তখন যা মানসিক অবস্থা তাতে এমন একটা সুযোগ গ্রহণ করতে তার এতটুকু বাধেনি— এর জন্য সে মুখিয়েই ছিল। যেন তেন প্রকারেণ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া তখনও তার একমাত্র লক্ষ্য। বড়ো ঘরের সঙ্গে সম্পর্ক পাতান আর ভালো যৌতুক হস্তগত করার সম্ভাবনায় সে পুলকিত। ওদের দুজনের মধ্যে ভালোবাসা বলতে যা বোঝায় তা সম্ভবত একেবারেই ছিল না-না ভাবী বধূর দিক থেকে, না তার দিক থেকে— এমনকি আদেলাইদা ইভানভনার রূপ যৌবনের কোনো অভাব না থাকা সত্ত্বেও। ফিয়োদর পাভলভিচের মতো অতবড় একটা লম্পট, যে সারাটা জীবন মেয়েমানুষের পেছনে ছোঁক ছোঁক করে বেড়িয়েছে, কোনো বাছবিচার না করে সারা জীবন সামান্যতম প্রশ্রয়ের ইঙ্গিতে মেয়েমানুষের পেছনে দৌড়েছে, তার ক্ষেত্রে এই ঘটনাটা বোধ করি একটা আশ্চর্য ব্যতিক্রম। একমাত্র এই নারীই তার কামনা তেমন জাগ্রত করতে পারল না।

ফিয়োদর পাভলভিচের সঙ্গে গৃহত্যাগের অনতিকাল পরেই আদেলাইদা ইভানভনার মোহভঙ্গ হল। সে আবিষ্কার করল স্বামীর প্রতি গভীর বিতৃষ্ণা ছাড়া আর কোনো অনুভূতি তার মনের মধ্যে নেই। ফলে এই পরিণয়ের স্বরূপ প্রকাশ পেতে খুব বেশি দেরি হল না। মেয়ের পরিবার অবশ্য সহজই এই ঘটনাকে মেনে নিল, পলাতককে তার প্রাপ্য অংশ মিটিয়েও দিয়েছিল। কিন্তু স্বামী স্ত্রীর জীবনে ইতিমধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে গিয়েছিল, ঝগড়াঝাঁটি তাদের নিত্য লেগে থাকত। শোনা যায় এক্ষেত্রে নববধূ এত বেশি উদারতা ও মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছিল যে ফিয়োদর পাভলভিচের ব্যবহারের সঙ্গে তার কোনো তুলনাই চলে না। একথা জানতে কারও বাকি নেই যে আদেলাইদা ইভানভনা পঁচিশ হাজার রুবল হাতে পেতে না পেতে ফিয়োদর পাভলভিচ সঙ্গে সঙ্গে তার পুরোটা হাতিয়ে নেয়— সে টাকার আর কোনো হদিশ মেলেনি। যৌতুক হিসেবে এছাড়া যে একটি গ্রামের জমিদারী আর শহরের একটা সুন্দর বাড়ি মহিলার ভাগে পড়েছিল তাও লোকটা সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল তৈরি করে নিজের নামে লিখিয়ে নেওয়ার তালে ছিল, এ ব্যাপারে চেষ্টার ত্রুটিও সে করেনি। এই নিয়ে বেহায়ার মতো সমানে ঝোলাঝুলি আর ঘ্যানঘ্যান করে স্ত্রীর মনের মধ্যেও তার প্রতি যে অবজ্ঞা ও বিতৃষ্ণার ভাব সে জাগিয়ে তুলেছিল একমাত্র তার ফলস্বরূপ শেষ পর্যন্ত শুধু মানসিক ক্লান্তিবশত, স্রেফ স্বামী রত্নটির হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যই হয়তো তার নামে দানপত্র সে লিখে দিত। কিন্তু সৌভাগ্যবশত মহিলার বাপের বাড়ির আত্মীয়স্বজন মাঝে পড়ে প্রতারণার সে পথ বন্ধ করে দেয়। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মারামারির ঘটনা যে বিরল ছিল না তা সুবিদিত। তবে জনশ্রুতি এই যে ফিয়োদর পাভলভিচ মারত না, মারত আদেলাইদো ইভানভনা। রোদে পোড়া তামাটে বর্ণের এই বদমেজাজি, জেদি অসহিষ্ণু প্রকৃতির মহিলাটি ছিল অসাধারণ শারীরিক শক্তির অধিকারিণী। শেষ পর্যন্ত এক দিন ধর্মশিক্ষায়াতনের এক সহায়সম্বলহীন নিঃস্ব শিক্ষগুরুর সঙ্গে গৃহ পরিত্যাগ করে সে চলে গেল। ফিয়োদর পাভলভিচের হাতে রেখে গেল তিন বছর বয়সের সন্তান মিতিয়াকে। ফিয়োদর পাভলভিচ কালবিলম্ব না করে বাড়িটাকে দস্তুরমতো একটা হারেম বানিয়ে ফেলল, নিত্য মেতে রইল উচ্ছৃঙ্খল পানোৎসবে। এরই ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলে সে টহল দিয়ে বেড়াত সারাটা জেলা, যাকে পেত তারই সামনে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দিয়ে কুলটা আদেলাইদা ইভানভনার নামে নালিশ করত, প্রসঙ্গত নিজেদের দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে এমন সমস্ত খুঁটিনাটি বিবরণ জানাত যা যে কোনো স্বামীর পক্ষে মুখে আনা রীতিমতো লজ্জাজনক। আসল কথা, সর্বসমক্ষে অপমানিত স্বামীর হাস্যকর ভূমিকায় অভিনয় করে, এমনকি রসিয়ে রসিয়ে নিজের অপমানের জ্বালার বিশদ বর্ণনা দিয়ে সে যেন মনে মনে সুখ উপভোগ করত, এমনকি এক ধরনের আত্মপ্রসাদও অনুভব করত। শ্রোতাদের পক্ষে কেউ কেউ ঠাট্টা করে তার মুখের ওপরই বলত, ‘দেখে শুনে মনে হয়, তোমার পদোন্নতি হয়েছে হে ফিয়োদর, পাভলভিচ। দুঃখ কর আর যাই কর, তোমাকে ত দিব্যি খুশি খুশি দেখাচ্ছে।’ অনেকে আবার এমন কথাও বলতে লাগল যে নতুন করে ভাঁড়ামি করার সুযোগ পেয়ে তার খুশি আর ধরে না এবং লোকে যাতে আরও বেশি হাসে সেই উদ্দেশ্যে ইচ্ছে করে এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন নিজের হাস্যকর অবস্থাটা সে বুঝতে পারছে না। কিন্তু কে বলতে পারে, হয়তো এটা ছিল তার এক ধরনের সরলতা? অবশেষে পলাতকার সন্ধান পাওয়া গেল। বেচারি তার সেই প্রেমিকার সঙ্গে সাংকৃত পেতেবুর্গে গিয়ে আস্তানা গেড়েছে, সেখানে অবাধ মুক্ত জীবনের স্রোতে মনেপ্রাণে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। ফিয়োদর পাভলভিচ সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠল, পেতেবুর্গে যাবার তোড়জোড় করতে লাগল। কেন?—তা সে নিজেও জানে না। হয়তো শেষ পর্যন্ত যেতও। কিন্তু এরকম একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল যাত্রার আগে মনের জোর আনার খাতিরে মদের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেবার বিশেষ অধিকার তার আছে। ঠিক সেই সময় তার স্ত্রীর বাপের বাড়ির লোকেরা পেতেবুর্গে মহিলার মৃত্যুসংবাদ পেল। হঠাৎ মৃত্যু, এক বাড়ির চিলেকোঠায়। কেউ বলে মরেছে টাইফাসে, কেউ বা বলে ক্ষুধার তাড়নায়। ফিয়োদর পাভলভিচ যখন তার স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ পেল তখন সে নেশায় চুর। শোনা যায় সেই অবস্থায় নাকি সে ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে আকাশের দিকে দুহাত তুলে আনন্দে চিৎকার করতে থাকে: ‘হে প্রভু, এক্ষণে তোমার দাসকে অব্যাহতি দান কর।’ কারও কারও কথায়, সে নাকি একটা বাচ্চা ছেলের মতো এমন হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে যে লোকে তাকে দুচক্ষে দেখতে না পারলে কী হয় তার দশা দেখে দুঃখবোধ করে। হয়তো দুইই সত্যি। অর্থাৎ কিনা স্ত্রীর হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সে আনন্দে যেমন আত্মহারা হয়েছিল, তেমনি যে স্ত্রী তাকে মুক্তি দিয়ে গেল তার জন্য চোখের জলও ফেলল- একই সঙ্গে। মানুষ, সে যত বড়ো দুর্বৃত্তই হোক না কেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিন্তু দেখা যায় তাদের সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা, সাধারণত তার চেয়ে অনেক বেশি সাদাসিধে ও সরলমতি। তাছাড়া আমরা নিজেরাও তো তাই।