বিশেষজ্ঞ

আমি খুব খেয়াল করে দেখেছি, খাবার টেবিলের আলোচনাগুলো সব সময় খুব ফলপ্রসূ হয়। না হয়ে উপায় কী! টেবিলে কী সুন্দর সাজানো থাকে কলা, পেঁপেসহ আরও কত ফল! আর এ জন্যই পড়ার টেবিলের চেয়ে খাবার টেবিল আমার এত ভালো লাগে। এই যে এখন বাসার সবাই খাবার টেবিলে বসে ‘আসন্ন কোরবানি এবং আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা করছি, আমার ধারণা এটাও ফলপ্রসূ হবে। প্রধান বক্তা বাবা তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, তোমরা জানো, ঈদের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। আমাদের প্রতিবেশীরা গরু-ছাগল কিনলেও আমরা এখনো কিনি নাই। কারণ, আমরা ধীরে বহে মেঘনা নীতিতে বিশ্বাসী। তাড়াহুড়া করলে কোনো কাজে কামিয়াব হওয়া যায় না। গরু কেনাটা হেলাফেলার জিনিস না। এর জন্য প্রচুর হোমওয়ার্কের প্রয়োজন। এরই মধ্যে আমাদের পর্যবেক্ষক টিম বিভিন্ন হাট দেখে তাদের রিপোর্ট পেশ করেছে। রিপোর্ট দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে গরুর দাম অত্যন্ত বেশি। গরু জবাইয়ের আগে ব্যাপারিরা ক্রেতাদের একেবারে জবাই দিয়ে দিচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে আমরা বেশ সতর্ক। এখন গণতান্ত্রিক উপায়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কোন রঙের গরু কিনব।
এতক্ষণ কেউ কথা বলার সুযোগ পায়নি, তাই ফ্লোর পেয়েই আমি সবার আগে বলে উঠলাম, আমাদের অবশ্যই স্মার্ট-ফ্যাশনেবল একটা গরু কেনা উচিত। সে ক্ষেত্রে কালোই বেস্ট।
আপা বলল, অসম্ভব। কালো রং অশুভ। কালো গরু কেনার কোনো মানেই হয় না। লাল গরু কিনতে হবে। লাল রংটা খুবই সুইট।
দেখ আপা, তুই কিন্তু বর্ণবৈষম্য করছিস। রং আবার সুইট হয় কী করে? তুই কি রং খেয়ে দেখেছিস নাকি? তা ছাড়া বাবার ডায়াবেটিস। তুই কোন সাহসে তার সামনে ‘সুইট’ শব্দটা উচ্চারণ করলি?
খামোশ! বাবা ধমকে উঠলেন, লাল-কালো দুটোই বাদ। সাদা গরু কেনা হবে। সাদা শান্তির প্রতীক। আমাদের পুরো দেশেই শান্তির অভাব।
রান্নাঘর থেকে কাজের ছেলে রফিক বলল, খালুজান, সাদা কালারটা তো দুই দিনেই ময়লা হইয়া যাইব।
বাবা চোখ পাকিয়ে বললেন, ছাগলটা বলে কী? ওকে হাটে নিয়ে গেলে তো ভালো দামে বিক্রি করা যাবে! তোমরা সবাই শোনো। গরু কেনার প্রস্তুতি শেষ। আমার এক বন্ধু বিশিষ্ট গবাদিপশু বিশেষজ্ঞ, ওকে সঙ্গে নিচ্ছি। আশা করছি ১৫ মিনিটের মধ্যেই আমরা কাঙ্ক্ষিত গরুটা কিনে বাসায় এসে চা খেতে পারব।
আমি বললাম, বাবা, আমার এক বডিবিল্ডার বন্ধু আছে, ওকেও আসতে বলি।
কেন? বডিবিল্ডার দিয়ে কী হবে?
গরুটা টেনে বাড়ি পর্যন্ত আনতে হবে না? শক্তিশালী একজন থাকলে ভালো।
কোনো প্রয়োজন নেই। ট্রাকে করে গরু আনা হবে। ওপরে শামিয়ানা থাকবে, যাতে গরুর কোনো কষ্ট না হয়।
বাহ! চমত্কার। আমি বাসের বদলে সিএনজিতে যেতে চাইলেই তোমার প্রেশার হাই হয়, আর গরুর জন্য ট্রাক-শামিয়ানা! এক কাজ করো, এসি গাড়ির ব্যবস্থা করো। আর ‘কসাইয়ের শহর’ আমেরিকার শিকাগো থেকে চারজন কসাই নিয়ে আসো। ঈদ হোক ঝামেলামুক্ত!
এক চড় দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দেব বেয়াদব! মারব এখানে, দাঁত পড়বে বাথরুমে। আমার সঙ্গে বেয়াদবি? যা এখান থেকে।
আপা বলল, খুব ভালো হয়েছে, চড় দিলে না কেন, বাবা? ওর মতো ছেলেকে রুটিন করে চড় দেওয়া উচিত। আমি কি রুটিন করে দেব?
তুইও দূর হ! পুরো বাড়িটাই গরু-ছাগলের হাট হয়ে যাচ্ছে।
সকালে আমরা গরু কিনতে হাটে প্রবেশ করলাম। নারী কোটায় আপা বাদ পড়ে যাওয়ায় আমি খুবই আনন্দিত। কিন্তু বাবার বিশেষজ্ঞ বন্ধু বারবার আমার দিকে কেন তাকাচ্ছে তা বুঝলাম না। তার তাকানোর কথা গরুর দিকে। আমার চেহারায় বোকা ভাব থাকতে পারে কিন্তু গরুর সঙ্গে কোনো মিল থাকার কথা না। তবে আমার দিকে বারবার তাকানোর কারণেই উনি গোবরে পা পিছলে মাটিতে পড়ে গেলেন। আমি হাসি চেপে বললাম, চাচা আপনার গায়ে গোবর লেগেছে।
বাবা ধমকে উঠলেন, গরুর হাটে গোবর লাগবে না তো কি রসগোল্লার সিরা লাগবে? রামছাগল!
চাচা বললেন, এইটা কোনো ব্যাপারই না! ভাতিজা, তুমি মোবাইলে রিমাইন্ডার দিয়ে রাখো। আর ১০ মিনিটের মধ্যে গরু কেনা হবে।
১০ মিনিট হয়ে গেল ২ ঘণ্টা, পুরো হাট একবার চক্কর দেওয়া শেষ, কিন্তু গরু কেনা হলো না। কোনো গরুই তার পারফরম্যান্স দিয়ে চাচাকে খুশি করতে পারে না। চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন, এই দেশের কী যে হবে! একটা পারফেক্ট গরু পেলাম না। হাঁটতে হাঁটতে যখন বাবার ভুঁড়িটা তিন ইঞ্চি ভেতরে ঢুকে গেল, তখন হঠাত্ একটা গরু ভালো লাগল চাচার। তিনি গরুটার মাথায় হাত বুলিয়ে দাঁত দেখে সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, বাহ, কী সুন্দর শান্ত-নিরীহ গরু! মারে না তো ঢুসঢাস। একদম ঠান্ডা। তার কথাটা মনে হয় গরুর আত্মসম্মানে লাগল। সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে এমন ধাক্কা দিল যে চাচা চলে গেলেন আমাদের সীমানার বাইরে। আমরা দ্রুত তাঁকে ধরে ওঠালাম, তিনি হাসার চেষ্টা করে বললেন, এটা কোনো ব্যাপারই না। শুধু কোমরটা বোধহয় গেছে।
বাবা বললেন, থাক। আজ আর ঘুরে কাজ নেই। পরে আবার আসব। এখনো তো চার-পাঁচ দিন সময় আছে। কী বলিস? আর তোর ওই বডিবিল্ডার বন্ধুটাকেও নিয়ে আসিস। সবাই মিলে গরু কেনার মাজেজাই অন্য রকম। পারবি না?
পারব না কেন? এটা কোনো ব্যাপারই না! আমি হাসিমুখে বললাম। আঙ্কেলের মুখটা একটু মলিন দেখাল। হয়তো কোমরের ব্যথাই এর মূল কারণ।

আদনান মুকিত
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, নভেম্বর ২৩, ২০০৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *