চোখ যে মনের কথা বলে – লিরিক্স – কাজী আজিজ আহমেদ
চোখ যে মনের কথা বলে
চোখে চোখ রাখা শুধু নয়
চোখের সে ভাষা বুঝতে হলে
চোখের মতো চোখ থাকা চাই ॥
ছোট্ট এ মন কখনো চোখে
অনুরাগের পত্র লেখে
চিঠির সে ভাষা বুঝতে হলে
মনের মতো মন থাকা চাই।।
তাই তো এ চোখ কখনো হাসে
অশ্রুজলে কখনো ভাসে
ভাবের সে ভাষা বুঝতে হলে
ছবির মতো ছবি আঁকা চাই ॥*
কথা : কাজী আজিজ আহমেদ,
সুর : খোন্দকার নূরুল আলম,
কণ্ঠ : খোন্দকার নূরুল আলম,
অভিনয় : রাজ্জাক,
চিত্রপরিচালক : আমীর হোসেন
যে আগুনে পুড়ি (২ জানুয়ারি ১৯৭০)
.
ছবির টাইটেল ও রেকর্ডে এ গানের গীতিকার হিসেবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম উল্লেখ থাকলেও গানটির প্রকৃত রচয়িতা কে—দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়টি অমীমাংসিত। এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় এ ছবির চিত্রপরিচালক আমির হোসেনের কাছ থেকে।
.
‘চোখ যে মনের কথা বলে’ গানটির প্রকৃত রচয়িতা কে
গবেষণা – আসলাম আহসান
রেকর্ডে যে আগুনে পুড়ি (১৯৭০) ছবির ‘চোখ যে মনের কথা বলে’ গানটির গীতিকার হিসেবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম থাকলেও এ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। এ গানের শিল্পী যে খোন্দকার নূরুল আলম-এ নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। তবে গানটি প্রাথমিকভাবে তুলে দেওয়া হয়েছিল মাহমুদুন্নবীর কণ্ঠে। খোন্দকার নূরুল আলম যখন মহড়ায় গানটি কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুন্নবীকে শেখানোর প্রয়োজনে হারমোনিয়াম সহযোগে গাইছিলেন, ঠিক তখনই এ ছবির পরিচালক আমির হোসেনসহ উপস্থিত সবাই অনুরোধ করে বলেন, ‘খোন্দকার ভাই, গানটিতে বরং আপনি নিজেই কণ্ঠ দিন না! আপনার কণ্ঠেই তো গানটি ভালো শোনাচ্ছে।’
সবার অনুরোধ, বিশেষ করে পরিচালক আমির হোসেনের কথা উপেক্ষা করতে না পেরে কিছুটা অনিচ্ছার সঙ্গে চূড়ান্ত রেকর্ডিংয়ের সময় এ গানে কণ্ঠ দেন এ ছবির সংগীত পরিচালক খোন্দকার নূরুল আলম।
এ তো গেল কণ্ঠশিল্পীর প্রসঙ্গ। কিন্তু গানটি লিখেছিলেন কে? রেকর্ডে তো সুস্পষ্টভাবেই গীতিকারের নাম আছে। তাহলে সংশয়টি সৃষ্টি হলো কীভাবে, সে প্রসঙ্গে একটু বলা প্রয়োজন। ২০১৫ সালের ২৬ ও ২৭ এপ্রিল দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে পালিত হয় লোককবি আবদুল হাই মাশরেকী’র ৯৬তম জন্মজয়ন্তী। এ অনুষ্ঠানের গুণীজন সংবর্ধনা পর্বে অন্যদের সঙ্গে সংবর্ধিত হন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ও গীতিকার কাজী আজিজ আহমেদ। এ পর্বেই কাজী আজিজ আহমেদ রচিত উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে ‘চোখ যে মনের কথা বলে’ গানটির উল্লেখ করা হয়। বিখ্যাত কোনো কোনো গান নিয়ে একাধিক গীতিকারের দাবি উঠেছে এমন ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু মনে হলো বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখা দরকার। শুরু হলো অনুসন্ধান। নানা সূত্র থেকে নানা রকম তথ্য আসতে থাকে। অবশেষে এ ছবির চিত্রপরিচালক আমির হোসেনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করি। ঝিনাইদহ থেকে ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে তিনি আমাকে যে চিঠি লেখেন, পাঠকের জ্ঞাতার্থে এর স্ক্যান কপি হুবহু সংযুক্ত করা হলো।
AMIR HOSSAIN MALITA
Advocate
Supreme Court of Bangladesh
Freedom Fighter, Film Director,
Ex-Mayor, Jhenaidah Municipality,
Convenor, District Community Police
Jhenaidah, Founder of Red Crescent,
Daibetic Association BNSB & Eye &
Diabetic Hospital, Jhenaidah Foundation etc.
“MALITA BARI”
Post & Dist : Jhenaidah – 7300
Phone : 0880451-62375 (Res.)
088-0451-62683 (Office).
Mobile : 01727665841
Date: ১৭-১২-২০১৫ খ্রী
Re: সুপ্রিয় আসলাম আহসান
সালাম, শুভেচ্ছা ও দোয়া বাদ জানাচ্ছি, শাহীন ফিল্মসের ব্যানারে আমার পরিচালিত ‘যে আগুনে পুড়ি’ ছায়াছবির “চোখ যে মনের কথা বলে, চোখে চোখ রাখা শুধু নয়……..” গানটা নিয়ে আপনি জানতে চেয়েছেন কখন, কিভাবে, কোন পরিস্থিতিতে এ গান লেখা হয়, সুর করা হয়, কোথায় বসে, কে সুর করেন, কে লেখেন এবং কোন স্টুডিও রেকর্ড করা হয় ইত্যাদি।
আমার ছবির ২/১টি গান ছেটে ফেলে নতুন করে সিকোয়েন্স লিখে এই গানটি সংযোজন করেছিলাম। আর এ গানে বাদ্যযন্ত্র বলতে ছিলো কেবল মাত্র হারমোনিয়াম আর তবলা ডুগী-তবলা। বলতে পারেন এ ছিলো আমার একটা এক্সপিরিমেন্ট। আমি চিন্তা করলাম, অনেক রকমের বাদ্যযন্ত্রের দ্বারা গান রেকর্ড না করে সাদামাটাভাবে এদেশের (তখনকার পাকিস্তান) আনাচে কানাচে যে বাদ্যযন্ত্র চলে তা দিয়ে গান রেকর্ড করলে কেমন হয়? শ্রোতারা কেমনভাবে নেয় বিষয়টা সেটা দেখার জন্য এক্সপিরিমেন্টটা করতে আমি উদ্যোগী হলাম। এই গানটি রেকর্ডিং-এ সবচেয়ে কম খরচ হয়েছিল। যে ২/১টা গান বাদ্য দিয়েছিলাম, তার মধ্যে “দুনিয়া বড় আজবখানা, নিয়ম কানুন নেই কো জানা” গানটার কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। হ্যাঁ, প্রিয় গায়িকা ফেরদৌসী রহমান রহমান, আবদুল জব্বার, সাবিনা ইয়াসমিন, মোহাম্মদ আলি সিদ্দিকী প্রমুখ শিল্পীর কণ্ঠে যে গানগুলো রেকর্ড করেছিলাম, তাতে ডজন ডজন বেহালাসহ অনেক বাদ্যযন্ত্র থাকতো বা ছিল। কোন কোন গান রেকর্ড করতে অনেক বার টেক করতেও হয়েছিল। যেমন- ফেরদৌসী রহমানকে দিয়ে “তুমি যদি বলে দিতে কি দিয়ে তোমায় আমি করবো সম্বোধন” গানটি অনেক বার টেক করেছিলাম সালাহ্উদ্দিন ভাইয়ের স্টুডিওতে। আমার একটা চ্যালেঞ্জ ছিল রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ থাকার বিরুদ্ধে। যেহেতু আমি ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনের একজন সৈনিক ও রবীন্দ্রসংগীতের একজন শ্রোতা, সে কারণেই, কিংবা হয়তো নিছক খেয়ালের বসে আমার ছবিতে রবীন্দ্রসংগীত সংযোজন করেছিলাম। কণ্ঠ দিয়েছিলেন অজিত রায় ও নিলুফার ইয়াসমিন। (নিলুকে নিয়েছিলাম ছবির চরিত্রের সঙ্গে মিল রেখে, অজিতের সাথে গলা মেলাবে, দর্শকের যেন মনে হয় মেয়েটি রবীন্দ্রসংগীতে অপরিপক্ব।) গানটি ছিল, “কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না, শুকনো ধূলো যত।”
আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে যে, বিশেষ করে “চোখ যে মনের কথা বলে…” গানটার বদৌলতে ‘যে আগুনে পুড়ি’ ছবিটা এতটাই হিট করে যে, ঐ সময়ের জনপ্রিয় নায়িকা “নিলো’ অভিনীত ছবি “ বানজারান কে কোন এক সিনেমা হল থেকে নির্ধারিত তারিখের আগেই নামাতে হয়েছিল, যাক সে কথা-
আমার ছবির কাজ শুরু করি আমার বন্ধু মরহুম আল মাসুদ- তৎকালীন সহকারী পরিচালককে নিয়ে গেন্ডারিয়ার চেয়ারম্যান অফিসে বসে। গল্প প্রাথমিকভাবে দাঁড় করিয়ে আমার ছবির চিত্রনাট্যকার কাজী আজিজ আহমেদকে দিয়ে তা চূড়ান্ত করি। নামকরণের দায়িত্ব দিই তৎকালীন সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম শ্রেণির ১ম, ২য় ও ৩য় ছাত্র সৈয়দ আকরাম হোসেন, আশফাকুর রহমান ও আহমদ কবিরের কাছে। ওরা অনেকগুলো নাম জমা দিলে আমি কাজী আজিজ, আমার ছবির সংগীত পরিচালক খোন্দকার নূরুল আলম, আমার ছবির প্রধান সহকারী পরিচালক আজহারুল ইসলাম খান ও বন্ধু চাষী নজরুলকে সাথে নিয়ে আলাপ আলোচনা করে সৈয়দ আকরাম হোসেনের দেওয়া ‘যে আগুনে পুড়ি’ নামটাকে বেছে নিই। এখানে বলে রাখা ভালো, আমার প্রথম ছবি পরিচালনা কালে আমার সর্ব কনিষ্ট সহকারী পরিচালক আলমের পরামর্শও আমি বিবেচনায় নিতাম। এই টিম ওয়ার্কই হয়তো ছবিটাকে দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করেছিল। তবে সে সময় যেহেতু রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ ছিল, সে কারণে আমার ছবিতে উপরে বর্ণিত গানটা সংযোজন করায় দারুণ বেগ পেতে হয়েছিল। ছবির সেন্সর পেতে অনেক ঝামেলায় পড়েছিলাম। সেন্সর বোর্ডের অন্যতম সদস্য ডঃ নীলিমা ইব্রাহিমসহ অন্যান্যদের কাছে কৃতজ্ঞ। সেন্সর বোর্ডে ছবি প্রজেকশন করার ক্ষেত্রে তৎকালীন মন্ত্রী আব্দুস সবুর খান সহযোগিতা করেছিলেন। তা না হলে ঐ সময়ে ছবি আসলে রিলিজই হতো না। নায়িকা কলাকুশলী আঃ রাজ্জাক, আনোয়ার হোসেন, কবরী, সুচন্দা, রোজী সুলতানা, কাজী খালেক, হাসমত, ছোট কাজল (কবরী), ছোট রাহাত (রাজ্জাক); [এদের আসল নাম মনে নেই] রানী সরকার, মেসবাহ উদ্দীন, আলতাফ, রাজু আহমেদ, মায়া হাজারিকা প্রমুখের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমি কৃতজ্ঞ কাজী আজিজ আহমেদ, আজহারুল ইসলাম খান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, খোন্দকার নূরুল আলম সহ সকলের কাছে। ক্যামেরাম্যান নাসের, সহকারী ক্যামেরাম্যান অরুণ, মেকআপ ম্যানদের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। আমি কৃতজ্ঞ আমার ওস্তাদ চলচ্চিত্র পরিচালক সৈয়দ আউয়ালের কাছে। আমার ছবির সম্পাদনাও তিনি করেন। তাঁর পরিচালিত আজমল ফিল্মসের ‘অপরিচিতা’ ছবিতে তিনি আমাকে সহকারী পরিচালকের স্বীকৃতি দেন, ক্লাপস্টিক হাতে দেন এবং ঐ ছবিতে আমি সুমিতা দেবীর নাচের দৃশ্যে তবলা বাদকের ভূমিকায় ছিলাম। আমি কৃতজ্ঞ জহির রায়হান ভাইয়ের কাছে, কত বার তাঁকে বিরক্ত করেছি কায়েত টুলীর বাসায় গিয়ে। আমার শিফট-এর অভাব হলে শেষের দিকে তিনি নিজের শিফট থেকে তিন-চারটা শিফট ছেড়ে দিয়ে আমাকে ছবির কাজ শেষ করতে সহযোগিতা করেছিলেন। আমার ছবির কাজ শেষ করে ধরনা দিয়েছিলাম লিও দোসানী, এভারেডী পিকচার্স, ইস্টার্ন ফিল্মসহ অনেক ডিসট্রিবিউটরের কাছে। আমি বয়সে অকেবারেই তরুণ। পাক ভারত উপমহাদেশের সর্ব কনিষ্ট পরিচালক তখন আমি এবং এ ছিল আমার প্রথম ছবি। ছবিতে নিষিদ্ধ রবীন্দ্রসংগীত থাকায় তারা ছবি নিতে চাননি। অবশেষে ফরাশগঞ্জের মডার্ন ফিল্মসের মালিক প্রয়াত নারায়ণ বাবু তাঁর ম্যানেজার পরিমলের সুপারিশে আমার ‘যে আগুনে পুড়ি’ ছবিটা ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে সোয়া লক্ষ টাকা অগ্রীম দিয়ে নিয়েছিলেন যা ছিল একটি ব্যতিক্রমী বিষয়। কারণ তখন হাউজ প্রটেকশন দিয়ে ডিস্ট্রিবিউটররা ছবি হাউজে/সিনেমা হলে দিতেন। অনেক কথা বলেছি- তবু আমার মনে যে কথার পাহাড় জমে আছে তা থেকে হয়তো পাহাড়ের পাদদেশে একটা ছোট পাথরের টুকরো তুলে ধরলাম। ভাইটি, আপনার জানতে চাওয়া বিষয়টা চাপা পড়ে গেছে বলে আমি ক্ষমা চাইছি।
একদিন বিকাল বেলা নায়িকা সুচন্দা আমার ৬৪, বড় মগবাজার অফিস কাম বাসার নিচে এসে গাড়ি থামিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে উপরে তাকাতেই আমি তাঁর আসার কারণ বুঝতে পেরে কোন কথা না বলে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিই আমি তাঁর বাসায় (কায়েত টুলীতে) গিয়ে কথা বলবো। আমি মেয়েদেরকে আমার বাসায় না আসতে অনুরোধ জানাতাম। কেবল মাত্র রানী সরকার, মায়া হাজারিকা, সুমিতা দেবী (আমার বাসার কাছেই থাকতেন) আসতেন। কোন কোন সময় রহিমা খালাও আসতেন।
যাই হোক, আমার ও সুচন্দার চোখাচুখি দেখে কাজী আজিজ বলে ফেললেন “চোখে চোখে কথা হয়ে গেল, চোখ তো মনের কথা বলে।” যতদূর মনে পড়ে আমি বলেছিলাম ‘সব চোখ কি মনের কথা বলে।’ ঐ সময় আমরা বিকেলে আমার বাসায় প্রতি দিনের মতো চিত্রায়িত অংশের আলাপে ছিলাম। যাঁরা ছিলেন তাঁরা হলেন কাজী আজিজ, খোন্দকার নূরুল আলম, আজহারুল ইসলাম খান প্রমুখ। খোন্দকার নূরুল আলম কাজী আজিজকে বললেন এই চোখাচুখি নিয়ে একটা গান লিখতে। যে কথা সেই কাজ। কাজী আজিজ “চোখ যে মনের কথা বলে, চোখ চোখ রাখা শুধু নয়……” লিখে বলেন- ‘এর পর কি লিখব!’ একটু চোখ বুজে থেকে লিখলেন “ চোখের সে ভাষা বুঝতে হলে চোখের মতো চোখ থাকা চাই, চোখ যে মনের কথা বলে…।” গানটা প্রায় শেষ করে এনেছেন কাজী আজিজ। এমন সময় গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার এলেন। আজিজ সাহেব তাঁকে পুরো গানটা পড়ে শোনালেন, শেষের দিকের কথাগুলো পড়ে শোনালে মাজহার সাহেব কিছু শব্দ চয়নে সহযোগিতা করেন। আসলে পুরো গানটা কাজী আজিজেরই লেখা এতে সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ নেই। গানটা লেখা শেষে খোন্দকার নূরুল আলম হারমোনিয়াম নিয়ে বসেন সুর করতে আর আমি ছিলাম তবলায়। অল্প সময়ের মধ্যে খোন্দকার সুর করলেন।
ইতিমধ্যে মাহমুদুন্নবী এসেছিল। তাঁর কণ্ঠে গান তোলা হলো। রাত তখন অনেক। ক্রন্ডিক টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করা হলো। স্থির করলাম নতুন সিকোয়েন্স লিখে এ গান ছবিতে লাগাবো। কিছু চিত্রায়িত অংশ ও ২/১ টা গান ফেলে দেবো। করলামও তাই।
দুর্ভাগ্য যে, ছবির শেষ পর্যায়ে আমার সাথে প্রডিউসার এস.এম.এ.আহাদ ও তাঁর দুই বন্ধু ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের মোশাররফ হোসেন ও চৌগাছার শাহাদতুর রহমানের সঙ্গে বিশেষ কারণে (?) মনোমালিন্য হয়। যার ফলশ্রুতিতে এক রাতে ১২টারও পরে আমাকে ঘুম থেকে তুলে আমার প্রডাকশন ম্যানেজার রণজিৎ দত্ত আমার সামনে আমার মতিঝিল ইউনাইটেড ব্যাংক, এলিফ্যান্ট রোডের হাবিব ব্যাংক ও জিন্নাহ এভিনিউয়ের কমার্স ব্যাংকের তিনটা একাউন্টের চেক বইয়ের সব ব্ল্যাংক পাতাতে এবং ১২ ডেমি ও ২টা ১.৫০ পয়সার নন জুডিসিয়াল ব্ল্যাংক স্ট্যাম্প ধরে সই করতে বলে। আহাদ সাহেব তাঁর হাতে থাকা রিভলবার নাড়তে নাড়তে ধমক দিয়ে আমাকে সই করতে বাধ্য করেন। আমার চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন শাহাদতুর রহমান, মোশাররফ হোসেন ও আমার প্রধান সহকারী আজহারুল ইসলাম খান। ঐ সময় আমার সাথে আল্লাহ ছাড়া কেউ ছিল না। সই না করার মতো কোন সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়েই সই করেছিলাম চেকের সব পাতায়, ডেমি ও নন জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে। এই ঘটনার পর স্বভাবতই আমার মানসিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। আমার এই বিপর্যস্ত অবস্থার সুযোগ নিয়েছিলেন আমার প্রধান সহকারী আজহারুল ইসলাম খান। সামগ্রিক পরিকল্পনা করে টাইটেল শুট করার সব ব্যবস্থা থাকলেও আজহার নিজের মতো করে কিছুটা ঢেলে সাজান এবং টাইটেল শুট করেন যেখানে আমার নামটা ছিল দূরবীক্ষণ দিয়ে দেখবার মতোই ছোট হরফে এবং আজহারের নাম প্রধান সহকারীর স্থলে বড় হরফে “সহযোগী পরিচালক” হিসেবে দেখানো হয়। গীতিকারের স্থানে কেবল মাত্র গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম থাকে এবং নির্বাহী প্রযোজকের স্থলে এস.এম.এ আহাদকে “প্রযোজক” দেখানো হয় (অথচ ফাইনান্সর ছিলাম আমি নিজেই)। টাইটেলটা আজহারুল ইসলাম খাঁন তার মতো করে করেছিলেন। ছবি রিলিজ হয় ৭০ সালের জানুয়ারিতে। ইতিমধ্যে আমি আইনি পেশা আবার শুরু করেছি।
এক সপ্তাহ পরে আমি কোর্ট থেকে বাসায় ফিরে দেখি বাসার মেইন গেইটের দরজায় বড় মাস্টার লক পিতলের তালা, একেবারে আনকোরা নতুন তালা। প্রোডাকশন ম্যানেজার আমাকে ২৪৬/- টাকা হাতে দিয়ে বলে- আপনি অন্য বাসা ভাড়া নেন। এখানে মালিক আহাদ সাহেব আপনাকে থাকতে নিষেধ করেছেন ইত্যাদি। আহাদ সাহেব ছবি পরিচালনার প্রতিশ্রুতি তো দূরে থাক, আমার একাউন্ট থেকে যে টাকা তুলে নিয়েছিলেন সে টাকা বহুবার চিঠি দিলেও ফেরত দেয়নি। আমি দোয়া করি আহাদ সাহেবের মরহুমা স্ত্রী খাতুনের (ফনী) জন্য। তিনি আহাদ সাহেবের ঐ অমানবিক কাজের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন ওমর সঙ্গ কোম্পানীর ইঞ্জিনিয়ার টাঙ্গাইলের এম.
আব্দুল আজিজ। তাঁর মা আমাকে ডাকলেন এবং ঘরে নিয়ে গেলেন। তিনি চার ঘরের একটিতে আমাকে থাকতে দিলেন, বললেন, “তুমি বাবা এখানেই থাকবে।” আমার কাজের ছেলে শহীদ হাউ মাউ করে কেঁদেছিল। আল্লাহর অশেষ রহমত যে, আমি ঐ জগত থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছি। আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিয়েছেন।
উল্লেখ্য যে, নির্বাহী প্রযোজক এস.এম.এ আহাদ, তাঁর বন্ধু মোশারফ হোসেন, শাহাদতুর রহমান ও আমার প্রধান সহকারী পরিচালক আজহারুল ইসলাম খান পরলোক গমন করেছেন। আমার অকৃত্রিম বন্ধু আল মাসুদও দুনিয়া ছেড়ে গেছে। আমাকে যিনি ঐ জগতে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন- বাচ্চু ভাই ও পরিচালক সৈয়দ আউয়ালও পরলোকগত। অন্যেরা কে কোথায় আছেন বা নেই, জানি না। জীবিত বা পরলোকগত কারো বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। দোয়া করি আল্লাহ তাঁদেরকে সবাইকে হেদায়েত দান করুন, শান্তিতে রাখুন।
মুহাঃ আমীর হোসেন মালিতা
এ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ঢাকা।
১৭-১২-২০১৫ খ্রী
.
আমির হোসেনের চিঠির বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার যে, ‘চোখ যে মনের কথা বলে’ গানটির গীতিকার কাজী আজিজ আহমেদ।
তা ছাড়া গানটি প্রসঙ্গে ২ মে ২০১৪ তারিখে প্রেরিত মোবাইলে এক খুদে বার্তায় (SMS) চাষী নজরুল ইসলাম বর্তমান লেখককে জানান : ‘মূল লেখক কাজী আজিজ আহমেদ। নাম গেছে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের। সুচন্দার চোখ দেখে আজিজ ভাই লিখেছেন। সে অনেক কথা।’ গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে হোটেল সোনারগাঁও- এ Hongkong and Shanghai Banking Corporation (HSBC) আয়োজিত ‘চোখ যে মনের কথা বলে’ শীর্ষক এক বিশেষ অনুষ্ঠানে নায়িকা সুচন্দার বক্তব্য থেকেও এ গানের গীতিকার হিসেবে কাজী আজিজ আহমেদের নামটি উঠে আসে।
গানটির চূড়ান্ত রূপায়ণে গাজী মাজহারুল আনোয়ারও সম্পৃক্ত, আমির হোসেনের চিঠিতে এর উল্লেখ আছে, যা উপেক্ষা করা যায় না।
Leave a Reply