সেই ছেলেটি যে সব কিছু জানতে চাইত

সেই ছেলেটি যে সব কিছু জানতে চাইত

এক দেশে এক ছেলে ছিল। সব কিছু জানবার তার ভারী আগ্রহ। যত কথা যত প্রশ্ন সব তার দাদুর কাছে।

‘ও দাদু বলো না কে গাছগুলোকে দোলায়?’

‘হাওয়া’, দাদু উত্তর দেয়।

‘কে হাওয়াকে বইতে বলে?’

‘আঃ হা, তা আমি কোত্থেকে জানব? বলছি না, আমিও শুনেছি। হাওয়া যখন গাছের ফাঁকে ফাঁকে বয় তখন গাছ দোলে।’

‘গাছ দুলতে দেখেছি দাদু কিন্তু হাওয়া কোনওদিন চোখে দেখিনি।’

‘তা বেশ তুমি যখন বলছ এবার হাওয়া এলেই জিজ্ঞেস করব— কী গো তুমি কেন বও, কে বইতে বলে, আরও সব কিছু।’

‘আচ্ছা দাদু হাওয়া থাক। তুমি নিশ্চয়ই বলতে পারবে, তারাগুলো কে জ্বালায়?’

ছেলেটি থামে না। কী-ই বা না সে জানতে চায়! দাদু বলেন, ‘তোমার কথার উত্তর আমি দিই কী করে? আমি তো আর আকাশে যাইনি। তুমি বরঞ্চ ওই যে মেঘের তলে তলে বক আর চিল উড়ে বেড়ায় তাদের জিজ্ঞেস কোরো।’

‘আজই খুব ভোরে একটা বক দেখেছিলাম। ইচ্ছে হচ্ছিল আমিও ওর সঙ্গে অমনি ডানা মেলে উড়ে যাই। আচ্ছা দাদু, ওরা উড়ে উড়ে কোথায় যায়?’

‘সত্যি বলতে কী শিশুরাই জানে ওরা কোথায় যায়। হয়তো যায় ওই গরম দেশে যেখানে বরফ পড়ে না।’

‘আচ্ছা দাদু সত্যি নাকি বকেরা মানুষ হয়ে যেতে পারে?’

‘জানিনে বাপু সত্যি না মিথ্যে। তবে হ্যাঁ শুনেছি বটে ওই অনেক দূরে শহর নগর ছাড়িয়ে, পাহাড় পর্বত পেরিয়ে আছে এক মস্ত সাগর। সাগর পেরিয়ে এক মস্ত মরুভূমি। তারপরেই খাড়া মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ঘন অন্ধকার বন। আর সেই বনের মাঝখানটিতে একটা সুন্দর জল টলটল হ্রদ। বেশি গভীর নয়। ওই হ্রদেই বকের দল চান করে। বকেরা ওই হ্রদের জলে একবার ডানা ডুবিয়েছে কি অমনি তারা মানুষ হয়ে যায়।’

‘তারপর?’

‘তারপর তারা দোর থেকে দোর ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। আর জানিনে বাপু।’

আমি নিজেই জেনে আসব ব্যাপারখানা কী। ছেলেটি আপন মনেই ভাবে।

পরদিন ভোর না হতেই সে নিজের অতিপ্রিয় কাঠের ঘোড়াটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তার ঘোড়াটা কেমন? সে হল যেমন তেমন একটা কাঠের তক্তা। চেরিগাছের কাঠের তক্তা ঘষে মেজে রং করা। গাঁয়ের আর পাঁচটা ছেলের যেমন থাকে তেমনি। ‘এই… য়ো… হ্যাট’ চিৎকার করে ছেলেটি বলে। তারপর? তারপর সে উড়ে চলল হু হু করে দূরে, দূরে আরও দূরে, আরও বহু দূরে। পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে চলেছে তো চলেছেই। একবার একটু থামলে। জিরিয়ে নেবে। দূরে দেখবার ভঙ্গিতে চোখের উপর হাত রেখে আরও বহু দূরের পাহাড় পেরিয়ে তাকালে। তারপর ঘোড়াটাকে আদর করে বললে, ‘যদি আমাকে ওই পাহাড় পেরিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারিস, তা হলে দাদুর যত মণিমুক্তো আছে সব দিয়ে তোকে সাজিয়ে দেব।’ এই কথা কানে যেতেই ঘোড়ার সে কী ফুর্তি। খটখট পায়ে শব্দ তোলে। টগবগ টগবগ চলে। সোঁ সোঁ উড়ে যায়। একবার ‘এইয়ো’ বলে কেশর ফুলিয়ে এক লম্ফ। আর দেখে কে, ঘোড়া উঠে গেল সেই এক্কেবারে উঁচুতে। সেখানে হাত বাড়ালেই আকাশ ছোঁয়া যায়। ‘এক্কেবারে পাখি হয়ে গেছি।’ আহ্লাদে গদগদ হয়ে ছেলেটি বলে। আর টুপি খুলে নাড়িয়ে নাড়িয়ে নীচের সব কিছুকে বিদায় জানায়। অর্ধেক দিন উড়ে চলার পর ঘোড়া পেরিয়ে গেল কত গিরি কত পর্বত। সন্ধ্যা যখন হয় হয় তখন এসে পৌঁছোল উদার দিগন্ত ছোঁয়া নীল সমুদ্রের উপর। থেকে থেকেই ছেলেটি নীচে তাকায়। তার চোখে বালি ঢুকছে। নীচে অন্তহীন সমুদ্র। পাড় দেখা যায় না। কেবল ঢেউয়ের উপরে মাঝে মাঝে দু’-চারটে মাছ চমকে ওঠে। আর ঢেউয়ের তালে তালে সমুদ্রের বুকে পাল তুলে নাচছে নৌকোর সারি। নীচে তাকিয়ে ছেলেটির ভারী ভয় করতে লাগল। ইচ্ছে হল ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে তক্ষুনি বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু হঠাৎ চোখে পড়ল অনেক দূরে উঁচু পাথরে বাঁধানো পাড়। আর সেই পাথরের উপর সার দিয়ে বসে আছে সাদা পাখির দল।

‘এই তো আমার পাখির দল। কেমন ওদের ধরে ফেললুম দেখলে?’ মনে মনে ছেলেটি দাদুর সঙ্গে কথা বলে। তারপর চলল সেই পাখির দলকেই লক্ষ্য করে।

ঘোড়া থামল গিয়ে ওই এক্কেবারে পাখির দলের কাছে। বকের দল চুপ। একবার ছেলেটির দিকে তাকালে আবার চুপ করে বসে রইল। যেন একটু দম ফেলে জিরিয়ে নিলে। তারপর বকের দল আবার উড়ে গেল।

আরে আরে আমায় ফেলে ওরা চলল কোথায়? ছেলেটি ভারী অবাক হয়ে গেল। তারপর চটপট আবার চড়ে বসল নিজের কাঠের ঘোড়াটার পিঠে।

পাখির দলের পিছন পিছন সে এসে পড়ল সোনালি মরুভূমির উপর। সাতদিন ধরে পাখির দল উড়ে চলল সেই মরুভূমির উপর দিয়ে। আর তাদের সঙ্গে সাতদিন উড়ে চলল কেঠো ঘোড়ার পিঠে বসে সেই ছেলেটি যে সবকিছু জানতে চাইত। রাত হলেই পাখির দল গরম বালির উপর নেমে আসে। ডানা দুটো ছড়িয়ে টানটান করে মেলে দিয়ে আরাম করে ঘুমিয়ে নেয়। উঃ সে কী ঘুম। আর ছেলেটি তাদের কাছেই দাঁড়িয়ে সারারাত ঠায় পাহারা দেয়। সাপখোপের হাত থেকে বাঁচায়।

আট দিনের দিন মরুভূমি শেষ হল। দেখা দিল বন। বনের মধ্যে চকচক করে উঠল এক হ্রদ। পাখির দল পাখার গতি স্তব্ধ করে দিলে। তারপর নামল হ্রদের পাড়ে। যতদূর সম্ভব গলা বাড়িয়ে হ্রদের জল আকণ্ঠ পান করল। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল জলে। পাখা ঝটপট করে সাঁতার দিতে লাগল জলে। আর যেই না ডানার সব পালক বেশ ভিজে উঠেছে অমনি সব পাখি হয়ে গেল জলজ্যান্ত মানুষ। একটিও বাদ রইল না। পরনে তাদের চওড়া লাল সালোয়ার, লাল কোমরবন্ধ, সাদা নাগরা, মাথায় ভেড়ার লোমের টুপি।

‘তুমি কেন আমাদের দলের পিছন পিছন এলে?’ ওই বকের দলেরই একজন শুধোয়। লোকটি বুড়ো এক কসাক। তার লম্বা লম্বা দাড়ি পৌঁছেছে একেবারে কোমরবন্ধ পর্যন্ত।

‘আমি দেখতে চাই, বরফের দিনে শীতকালে তোমরা কোথায় থাকো।’ ছেলেটি বলে।

‘তা হলে এসো আমাদের সঙ্গে,’ বুড়ো বক ছেলেটিকে বলে। তারপর তারা চলল গভীর বনে। বনের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে গেছে পায়ে চলার পথ।

বন পেরিয়ে পাখির দল ডাইনে ঘুরল। এসে পৌঁছোল হাজার লোকের বাস এমন এক শহরে। সেই শহরে পথের ধারে ধারে শতখানেক ছোটখাটো দোকান। কেউ বা হার মালা কিনলে, কেউ বা কিনলে চিনির পাখি, কেউ বাঁশি, অথবা মধু দেওয়া কেক, আরও কত কী। বাক্স বোঝাই করে নিলে ছোটখাটো সুন্দর সুন্দর জিনিস দিয়ে। বাক্স উপচে পড়ছে। এবার শহর ছেড়ে চলল তারা। বাঁয়ে মোড় নিলে। দ্রুত পায়ে হেঁটে পৌঁছোল এক ছোট্ট গাঁয়ে। গাঁয়ের বাড়িগুলো সব নলখাগড়া দিয়ে তৈরি। এটাই হল বকেদের গাঁ। সাদা সাদা ঘরগুলো একটার গায়ে একটা হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। দূর থেকে দেখে মনে হয় ঠিক ঝড়ে উত্তাল পাগলা ঝরনার ফেনার দল যেন কার নির্দেশে স্তব্ধ হয়ে গেছে। গ্রামের প্রায় শেষ প্রান্তে এই বকের দলের সঙ্গে দেখা হল একদল মহিলার। বিরাট দল। সব বয়সের মহিলা— বৃদ্ধা, তরুণী, বালিকা, শিশু কেউ বাদ নেই। এরাই হল বকেদের আত্মীয়কুটুম। সেই লম্বা দাড়িওয়ালা কসাকটি ছেলেটিকে বললে, ‘আমায় ঘরে ফিরিয়ে নিতে কেউ আসেনি গো। বউ আমার সেই কবে মারা গেছে। আর ছেলেমেয়েরা? তারা তো বহুবছর আগে একদিন সব কোথায় যে উড়ে চলে গেল আর ঘরে ফিরল না। চলো-না তুমি আমার সঙ্গে। আমার ঘরে থাকবে।’

বুড়ো কসাক ছেলেটিকে নিয়ে গেল তার ঘরে। ছেলেটি কুঁড়েঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে ঢুকতে যাবে হঠাৎ মনে পড়ল তার কাঠের তক্তা ঘোড়ার কথা। তক্তাটাকে দরজায় ঠেস দিয়ে রাখলে। দু’জনে খাওয়া দাওয়া সারলে তারপর শুয়ে পড়ল। পরদিন সকালে খুব ভোরে সবাই তখনও ঘুমোচ্ছে, কসাকটি উঠে গেল উট চালকের কাছে। হুকুম করলে দুই কুঁজওয়ালা একটা উট সাজিয়ে আনতে। বললে তার দু’পাশে ঝুলবে মস্ত দুটো থলে। থলে ভরতি লেবু। উটচালক মোটা একটা গাছের ডালে হেলান দিয়ে বসে ছিল। দোরগোড়ায় চেরি কাঠের তক্তাটা দেখে গাছের ডাল ছেড়ে ওই কাঠের তক্তাটা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলে।

একটু পরেই সেই যে ছেলেটি সব কিছু জানতে চাইত তার তো ঘুম ভাঙল। আর তার অতি প্রিয় কাঠের তক্তা ঘোড়াটা নেই দেখে সে কী কান্না!

‘বকদাদু, ও বকদাদু, কে চুরি করলে আমার তক্তা ঘোড়া?’

বুড়ো কসাক তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘কিচ্ছু ভেবো না। তোমার তক্তা ঘোড়া আবার আমি বানিয়ে দেব।’

‘তুমি তো জানোই না আমার তক্তা ঘোড়া কেমন উড়তে পারে। ডানা থাকলে যেমন ওড়ে ঠিক তেমনি।’ চোখ ঘষতে ঘষতে ছেলেটি বলে, ‘এখন আমি কেমন করে মায়ের কাছে যাব?’

‘তা নিয়ে ভেবো না, কোনও চিন্তা নেই। বসন্তকালে আমরা যখন তোমাদের গাঁয়ে যাব তখন কি ভাবছ তোমাকে এখানে ফেলে রেখে যাব? নাও চলো, এবার আমরা মাছ ধরতে যাই। ওই ছোট্ট ঝরনাটার ধারে বসে কেমন তুমি আর আমি মাছ ধরব। আর অন্য বকের দল যাবে ওই বনে কমলালেবু আর কলার খোঁজে। আর সন্ধ্যাবেলা নাচ গান খানা পিনা। একটি লোকও বাদ যাবে না।’

বুড়ো তো ছেলেটিকে নিয়ে গেল ঝরনার ধারে। নলখাগড়ার কঞ্চি কেটে বানালে দুটো ছিপ। সুতো বেঁধে বঁড়শি আটকে টোপ লাগিয়ে বসলে মাছ ধরতে। মাছের দল আসে আর যায়। সোনার রঙের তাদের পাখনা। লাল লাল তাদের চোখ। সন্ধ্যা হবার আগেই ঝুড়ি একেবারে ভরে গেল। তারপর তো দু’জনে ফিরে এল কুঁড়েতে। দরজা খুললে। আগুন জ্বালালে। মস্ত হাঁড়িতে কানকোর সুপ চড়ালে। লঙ্কার গুঁড়ো মেশালে। সন্ধ্যা ঘোর হয়ে এল। বুড়ো বক সুপের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে একটু চেখে দেখলে। ‘বাঃ খাসা হয়েছে। কী সোয়াদ।’ ছেলেটি ওই সুপ খেলে না। ও খেল তিনটে লেবু আর চারটে কলা।

এই ভাবেই দিন চলে। সপ্তাহ যায়। মাস ঘোরে। বছর কাটে। আবার বসন্তকাল এল। বুড়ো বক সেই নলখাগড়ার গাঁ ছেড়ে রওনা দিল। চেনাশোনা সক্কলের কাছে বিদায় নিলে। তারপর বনের মাঝে সেই যে প্রায় লুকোনো হ্রদ, সেইদিকে হাঁটা দিলে। হ্রদে পৌঁছে যেই না আবার ডুব দিলে কোথায় গেল সেই বুড়ো কসাক। হয়ে গেল ধবধবে সাদা বক। ছেলেটি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। তারপর নিজেই নেমে গেল হ্রদের জলে। অমনি ওর পা দুটো হয়ে গেল বকের মতো। পিঠ থেকে বেরিয়ে এল এক জোড়া ডানা। আর দু’চোখের মাঝে যেখানে ছিল তার সুন্দর নাকটা সেইখান থেকেই বেরিয়ে এল মস্ত একটা ঠোঁট। ডানাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে সেও উড়ে চলল বকের দলের সঙ্গে।

আকাশের বুকে উড়ে চলেছে বড় একটা বকের দল। মরুভূমি, সমুদ্দুর, বিরাট উঁচু উঁচু শৃঙ্গওয়ালা গিরিপর্বত পেরিয়ে তারা শেষকালে এসে পৌঁছোল সেই ছেলেটির গাঁয়ে। অপূর্ব সুন্দর এক সকাল। ছেলেটি দূর থেকেই চিনতে পেরেছে দাদুর বাড়িটা। চিমনিটা বহুদিনের ঝুলকালিতে ঢাকা। বাগানের গাছে গাছে এখনও শুকনো ফুলের দল কুঁচকে কুঁচকে ডাল আঁকড়ে আছে। বুড়ো বক গিয়ে বসল ছেলেটির দাদুর বাড়ির চেরিফুলের গাছটাতে। অন্য বকেরা জলা জায়গা ঘিরে ঘিরে উড়ে বেড়াতে লাগল। আর ছোট্ট বক গিয়ে নামল সোজা দাদুর বাড়ির উঠোনে। এক পা দু’পা করে গুটিগুটি এগোতে লাগল উঠোন পেরিয়ে চৌকাঠের দিকে। খোলা দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে এল ছেলেটির মা। পরনের এপ্রনটা ঝাড়তে ঝাড়তে দেখে উঠোনে বক অতিথি। মা তো আর চেনে না। হাত নেড়ে বকটাকে তাড়াতে লাগল— ‘হুস হুস যা! যা! ভাগাড়ে যা, কোথাকার আক্কুটে। আমাদের দোরে মিথ্যে কেন বাপু?’

ছোট্ট বকের মনটা ভারী খারাপ হয়ে গেল। মা কিনা তাকে তাড়িয়ে দিলে। সে চলে গেল আস্তাকুঁড়ে। তারপর খুঁটে খুঁটে খেয়ে বেড়াতে লাগল। একটু পরেই মা আবার ঘরের বাইরে এল। পিঠের উপর কাঠের গামলা বয়ে সোজা চলে গেল নদীর দিকে কাপড় কাচতে। ছোট্ট বকও পায়ে পায়ে মায়ের পিছন পিছন চলল। কিন্তু বেশি কাছে যেতে সাহস হল না। নদীর বুকে নুয়ে পড়া একটা উইলো গাছের ডালে গিয়ে বসল। মা প্রথমেই গলা থেকে খুলল কারে ঝোলানো সোনার মোহরটা। রাখল শান বাঁধানো পাড়ে। তারপর গামলায় জল ভরল। হাত দিয়ে ঘষে ঘষে কাপড় কাচতে লাগল। কাপড় কাচা হলে মা কাপড়গুলো নিয়ে কাছাকাছি রোদে মেলে দিতে গেল। আর ছোট্ট বক করেছে কী সেই ফাঁকে চট করে উড়ে এসে বসল শান বাঁধানো মেঝের উপর। তারপর ঠোঁট দিয়ে খপ করে মোহরটা তুলে নিয়ে সোজা উড়ে গেল আস্তাকুঁড়ে। আর মোহরটা লুকিয়ে রাখল জড়ো করা পালকের স্তূপের নীচে। রোজ রাত্রে ছোট্ট বক মায়ের খাটের পাশের জানলায় গিয়ে বসে আর বলে, ‘শুভ রাত্রি, ভাল করে ঘুমোও।’ ঠিক যেমনটি বলত যখন সে মানুষ ছিল। দেখতে দেখতে বসন্তকাল চলে গেল। গ্রীষ্ম শেষ হয় হয়। বকের দল আয়োজন করছে আবার দূর দেশে উড়ে যাবার। ছোট্ট বকের ভারী মন খারাপ। তার মোটেই ইচ্ছে নেই আত্মীয়স্বজন, চেনা ঘর, চেনা গাঁ ছেড়ে যাবার। যেখানেই বলো না কেন, যে দেশেই সে গেছে পাহাড় পর্বত, গিরিবন, সমুদ্দুর পেরিয়ে সারাক্ষণ তার মনের মধ্যে একটা ইচ্ছেই ঘুরে ফিরে এসেছে— যাই যাই— ফিরে যাই— মা’র কাছে ফিরে যাই। কিন্তু উপায় নেই। বনে ঢাকা হ্রদের ধারে আবার বকের দল উড়ে এল। একদিকে দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমি। বকের দল হ্রদে নামল। আবার তারা মানুষ হয়ে গেল। আর সেই ছেলেটি যে সব কিছু জানতে চাইত সেও হ্রদের জলে ডুব দিয়ে আবার মানুষ হয়ে গেল। বুড়ো কসাক ঠিক এসে দাঁড়াল তার পাশটিতে। ছেলেটিকে নিয়ে গেল তার ছোট্ট কুঁড়েতে। পরদিন সকাল হতে না হতেই ছেলেটির হাত ধরে বেরিয়ে পড়লে। মাছ ধরতে হবে। ছেলেটি বিষণ্ণ মুখে পাড়ে বসে থাকে আর মায়ের কথা ভাবে। তার দু’গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। একটু পরেই তার ছিপে পড়ে জোর টান। ছেলেটি এক টানে ছিপটা পাড়ে তুললে। ওমা, সামনেই দেখে কী একটা মস্ত সোনালি মাছ।

মাছ বললে, ‘কাঁদছ কেন?’

‘নিজের গাঁয়ে নিজের ঘরে ফিরে যাব।’

‘তা বাপু যাব যাব বলছ তো যাচ্ছ না কেন?’ সোনালি মাছ শুধোয়।

‘কী করে যাব বলো? চুরি করে নিয়েছে আমার চেরি কাঠের তক্তা ঘোড়াটা। এখন আমি উড়ব কার পিঠে।’ ছেলেটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কথা বলে।

সোনালি মাছ বলে, ‘শোনো তবে, তুমি যদি আবার আমাকে জলে ছেড়ে দাও, তবে আমি বলতে পারি তোমার তক্তা ঘোড়া কোথায় আছে।’

ছেলেটি তাড়াতাড়ি করে মাছটাকে বঁড়শি থেকে ছাড়িয়ে দিলে জলে ছেড়ে। সোনালি মাছ জলে পড়েই কয়েক পাক ঘুরে নিলে। তারপর মস্ত দলবল নিয়ে সাঁতরে সোজা চলে গেল জলের অনেক তলায়। একটু পরে জলের বুক থেকে মাথা উঠিয়ে হেঁকে বললে, ‘গত বছর গ্রীষ্মকালে তুমি বুড়োর ঘরে ঘুমোচ্ছিলে। ওই বুড়ো গিয়েছিল উটচালককে ডাকতে। ওই উটচালকই তোমার তক্তা ঘোড়াটা নিয়েছে। ভেবেছিল উট চালাবার ছড়ি বানাবে। কিন্তু উট নিয়ে কাঠের সাঁকো পেরিয়ে যাবার সময় তক্তাটা হাত ফসকে জলে পড়ে যায়। ঝরনা সেটা বয়ে নিয়ে যায় আটাকলে। তক্তাটা সবাই কাঁটাঝোপের শিকড় ভেবে ফেলে দিল নদীর পাড়ে। এখন তক্তাটা আছে সেই পাড়ের কাছেই।’

কথাটা শুনেই ছেলেটি দৌড়োল বকমাসির কাছে। বকমাসি আটাকালে কাজ করে। তন্ন তন্ন করে আনাচ কানাচ খুঁজলে। সে কী খোঁজা। আটাকলের চাকা, ঘরবার, ঝরনার পাড়, নদী নালা কিচ্ছুটি বাদ দিল না। ওমা হঠাৎ দেখে তক্তাটা বকমাসির হাতে। বকমাসি ছেলেটিকে বলে, ‘এই নাও গো তোমার তক্তা।’

তক্তাটা হাতে নিয়ে ছেলেটি তারপর দু’পায়ের মাঝে তক্তাটা শক্ত করে ধরে তক্তার উপর বসে বললে, ‘হেই য়ো… হ্যাট’ অমনি চেরি কাঠের তক্তার ঘোড়া উড়ে চলল। সোজা গিয়ে উঠল উঁচু আকাশে। নলখাগড়া দিয়ে বানানো বকেদের গাঁ ছাড়িয়ে ঘোড়া উড়ে চলল সেদিক পানে, যেদিকে নিজের দেশ। সাত দিন সাত রাত পর, ছেলেটি গিয়ে পৌঁছোল দাদুর বাড়ির উঠোনে। দরজা ছিল খোলা। দৌড়ে সোজা ঢুকে গেল ঘরে। মা কিন্তু ছেলেকে চিনতে পারল না।

দেখো কাণ্ডখানা। কত বড় হয়ে গেছে। মা চিনবে কী করে।

‘আমি তো তোমারই ছেলে।’ চিৎকার করে ছেলেটি বলে।

‘আমার ছেলে, না গো না’ মা বিষণ্ণ মুখে মাথা নেড়ে বলে। ‘আমার ছেলে দু’বছর হল হারিয়ে গেছে। সে বাপু তোমার চেয়ে মাথায় ছোট ছিল। তুমি আমার ছেলে নও।’ এই বলে মা কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

ছেলেটি তখন মাকে সব কথা খুলে বলল। সে কোথায় গিয়েছিল, কী হয়েছিল সব।

‘তা বাছা, এখন প্রমাণ করবে কী করে যে তুমি আমারই ছেলে। অজানা অচেনা অন্য কারও ছেলেও তো হতে পারো।’

ছেলেটি একটু ভাবলে। তার হঠাৎ মনে পড়ল সেই মোহরটার কথা। মাকে বললে কেমন করে মায়ের মোহরটা সে চুরি করে আস্তাকুঁড়ে পালকের তলে লুকিয়ে রেখেছিল। মস্ত উঁচু ছাইয়ের গাদা। ছেলেটি মইটা আনলে। পালক সরাল। খুঁজে বের করল ছাইয়ের গাদার ভিতর থেকে সেই সোনার মোহরটা। মা তো এক্কেবারে অবাক। তবে তো ছেলেটা ঠকায়নি। মা তাড়াতাড়ি ছেলেকে বুকে তুলে জড়িয়ে ধরল।

‘বল, সত্যি করে বল, হলপ করে বল, আর কোনওদিন বাড়ি ছেড়ে পালাবি না। দিব্যি করে বল, আর বক হয়ে উড়ে যাবি না।’

মায়ের আঁচলের তলে মুখ গুঁজে ছেলেটি বলে,‘সত্যি বলছি মা, হলপ করে বলছি, আর কোনওদিন উড়ে যাব না।’

আর তারপর? ছেলেটি মায়ের কোল থেকে নেমে তার চেরিগাছের তক্তা ঘোড়াটা অতি যত্ন করে তাকের উপর লুকিয়ে রেখে দিল। মাঝে মাঝে আজও তক্তাটা দেখে আর সেই বকদের দেশের কথা, একা কসাক বুড়োর কথা ভাবে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *