৮. যতোটুকু প্রয়োজন

২২.

যতোটুকু প্রয়োজন, তার চাইতে চিন্তাগুলো সাজিয়ে নিতে অনেক কম সময় নিলাম আতংক, হতাশা সবকিছু মিলিয়ে আমার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল। মনে হলো স্বাভাবিকের চেয়ে সময়ের কাঁটা অনেক ধীর গতিতে এগুচ্ছে। এলিসের ঘরে যখন ফিরে গেলাম, তখন পর্যন্ত জেসপার ফিরে আসেনি। ওর সাথে একই রুমে বসে থাকতে আমার খানিকটা ভয় হলো- ভয়, এ কারণে যে, ও হয়তো কোনো ধারণা করে ফেলবে…এবং ভয় এ কারণে যে, তখন সবকিছু লুকিয়ে রাখা বেশ কষ্টকরই হয়ে দাঁড়াবে।

আমি এখন অনেক কিছু চিন্তা করতে পারছি ভেবে বেশ অবাকই হলাম। তবে চিন্তাগুলো আমার মনের ওপর চরমভাবে নির্যাতন চালাচ্ছে। একই সাথে চিন্তাগুলো বিক্ষিপ্তও বটে। কিন্তু আরো বেশি অবাক হলাম, যখন দেখলাম এলিস টেবিলের ওপর ঝুঁকে আছে। শুধু তাই নয়, ও দু হাতে টেবিলের কোণাটা আঁকড়ে ধরে রেখেছে।

“এলিস?”

আমি ওকে ডাকার পরও, কোনো পরিবর্তন লক্ষ করলাম না, কিন্তু ওর মাথাটা এপাশ-ওপাশ দুলতে লাগলো। আমি ওর চেহারা দেখতে পেলাম। ওর চোখজোড়া নির্লিপ্ত, হতাশ…আমার চিন্তার খেই হারিয়ে ফেললাম। নতুন করে মাকে নিয়ে আবার চিন্তা শুরু করলাম।

আমি দ্রুত এলিসের পাশে গিয়ে ওর হাতটা চেপে ধরলাম।

“এলিস!” জেসপারের আকস্মিক ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, এরপরই ও এলিসের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

“এটা কি?” জেসপার জানতে চাইলো।

আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে এলিস জেসপারের বুক বরাবর তাকালো।

 “বেলা,” এলিস বললো।

 “আমি এখানে ভালোই আছি,” আমি জবাব দিলাম।

এলিস ঘাড় বাঁকিয়ে আমার দিকে তাকালো। এখনো ওর চোখজোড়াকে নির্লিপ্তই মনে হলো। আমি এতোক্ষণে বুঝতে পারলাম, এলিস আসলে আমার সাথে কথা বলেনি, ও আসলে জেসপারের প্রশ্নের জবাব দিয়েছে।

“তুমি কি দেখতে পাচ্ছো এলিস?” আমি জিজ্ঞেস করলাম- এছাড়া আমি আর কোনো প্রশ্নও খুঁজে পেলাম না।

তীক্ষ্ণ চোখে জেসপার আমার দিকে তাকালো। অভিব্যক্তিকে যতোটা সম্ভব সংযত রেখে আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। বিভ্রান্ত চোখে ও একবার এলিসের দিকে একবার আমার দিকে তাকাতে লাগলো। ওদের বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখে ধারণা করতে পারলাম এলিস আসলে দেখতে পেয়েছে কী ঘটনা ঘটতে চলেছে।

এলিস এতোক্ষণে নিজেকে ধাতস্ত করতে পারলো।

“তেমন কিছু নয়,” অবশেষে এলিস জবাব দিলো। ওর কণ্ঠস্বর অনেকটাই শান্ত এবং নির্লিপ্ত কোণালো। “শুধু ওই আগের রুমটাই দেখতে পাচ্ছি।”

এলিস অবশেষে সরাসরি আমার দিকে তাকালো। তার অভিব্যক্তি স্বাভাবিকই মনে হলো। “তুমি কি এখনই ব্রেকফাস্ট করবে?”

“না, এয়ারপোর্টে গিয়েই কিছু একটা খেয়ে নেবো।” আমিও শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলাম। শাওয়ার নেবার জন্যে আমি বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম। জেসপারের সবকিছু জেনে যাওয়ার অতন্দ্রীয় ক্ষমতার কারণেই। এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্যে আমি উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলাম। যখন শুনলাম সাতটার ভেতরই এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছি, শুনে বেশ ভালো লাগলো। এ সময় কালো গাড়িটার পেছন দিকে চুপচাপ বসে থাকলাম। এলিসকে আমি দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। ওর মুখ জেসপারের দিকে ঘুরানো, কিন্তু সানগ্লাসের পেছনের চোখ জোড়া আদৌ কী দেখছে, এখান থেকে তা আমার মোটেও জানার কথা নয়।

“এলিস?” আমি একটু ভিন্নভাবে জিজ্ঞেস করলাম।

ও সতর্ক হয়ে উঠলো। “হ্যাঁ?”

 “এটা কিভাবে কাজ করে? তুমি যে সব কিছুই দেখে ফেলতে পারছো?”

পাশের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আমি প্রশ্ন করলাম। “এ্যাডওয়ার্ড বলেছে, এটা সবসময় নির্ভুল নাও হতে পারে…এর কি পরিবর্তন হতে পারে না?” এ্যাডওয়ার্ডের নামটা উচ্চারণ করতে আমার বেশ কষ্টই হলো।

“হ্যাঁ পরিবর্তন হতে পারে…,” এলিস বিড়বিড় করে বললো। “কিছু কিছু বিষয় আছে, অন্যান্য বিষয়ের চাইতে দ্রুত ঘটে…অনেকটা আবহাওয়ার মতো। মানুষদের নিয়ে চিন্তা করা বেশ কঠিন ব্যাপার। মানুষ যখন কোনো ভিন্ন ধরনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখনই আমি তাদের দেখতে পাই। কিন্তু ওই ব্যক্তির মন যদি সামান্যও পাল্টে যায় যদি কোনো নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তা যত ক্ষুদ্রই হোক- তাহলে সবকিছুই ভেস্তে যেতে পারে।”

আমি মাথা নাড়লাম। “তাহলে জেমস যতোক্ষণ পর্যন্ত না ফিনিক্স-এ আসার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তততক্ষণ পর্যন্ত তুমি কিছুই দেখতে পারছে না।”

“হ্যাঁ,” এবারো ও সতর্ক কণ্ঠে জবাব দিলো।

এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে জেমসের সাথে আমি যতক্ষণ না ওই আয়না লাগানো ঘরের কথা চিন্তা করছি ততোক্ষণ পর্যন্ত এলিস কোনই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তাহলে সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে মোটেও আমাকে চিন্তা করা যাবে না। তবে অবশ্য এটাকে এক ধরনের অসম্ভব কাজই বলতে হবে।

আমরা এয়ারপোর্টে উপস্থিত হলাম। ভাগ্য মনে হয় আমার সহায় হলো অথবা এটাকে বলা যেতে পারে মন্দের ভালো। এ্যাডওয়ার্ডের প্লেন চার নম্বর টার্মিনালে নামতে যাচ্ছে- ব্যস্ত টার্মিনাল, এখানেই সাধারণত বেশিরভাগ প্লেন ল্যান্ড করে। আমার এ ধরনের একটা টার্মিনালেরই প্রয়োজন ছিলো। অনেক বড়ো, সাধারণত মানুষের ভিড়ে সবাই হকচকিয়ে যায়। এখন তিন নম্বর লেভেল দিয়ে প্রবেশ করতে পারলেই সুযোগ পাওয়া যেতে পারে।

আমরা চার নাম্বার ফ্লোরে গাড়ি পার্ক করলাম। এখানে প্রচুর পরিমাণ গ্যারেজের সুবিধা আছে। আমরা তিন নাম্বার ফ্লোরে নেমে আসার জন্যে এ্যালিভেটরে উঠে পড়লাম। এখান দিয়েই সমস্ত যাত্রীকে প্রবেশ করতে হবে। বহির্গমন ফ্লাইটের তালিকার দিকে এলিস এবং জেসপার দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। বিভিন্ন শহরের ভালো-মন্দ নিয়ে ওদের আমি আলোচনা করতে শুনলাম- নিউ ইয়ুর্ক, আটলান্টা, শিকাগো। এ স্থানগুলোই কোনোটাই আমার দেখা নয়, হয়তো কোনোদিন আর দেখাও হবে না।

মেটাল ডিটেক্টর পার হয়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো চেয়ারগুলোর তিনটাতে গিয়ে বসলাম। জেসপার এলিস মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মানুষজনদের দেখছে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে ওর নজর আমার ওপরেই। আমার প্রতিটা নড়াচড়া ওরা আড়চোখে লক্ষ করছে। আমি কি তাহলে দৌড় দিবো?

এই লোকজনের ভিড়ে ওরা কি আমাকে আঁটকাতে পারবে? নাকি ওরা সহজভাবেই আমাকে অনুসরণ শুরু করবে?

আমার পকেট থেকে এ্যানভেলাপটা বের করে তা এলিসের কালো লেদার ব্যাগের ওপর রেখে দিলাম। ও একবার আমার দিকে তাকালো।

“আমার চিঠি,” আমি বললাম। এলিস মাথা নেড়ে, ট্যাপ ফ্ল্যাপের ভেতর চিঠিটা ঢুকিয়ে রাখলো। খুব শীঘ্রই এ্যাডওয়ার্ড এটা দেখতে পাবে।

যতোই সময় গড়াতে লাগলো এ্যাডওয়ার্ডের আসার সময়ও এগিয়ে আসতে লাগলো। কিন্তু জানি যে, এখন তা এক প্রকার অসম্ভব ব্যাপার।

এলিস এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার ব্রেকফাস্ট সেরে নেবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তাকে না বলে দিয়েছি।

আমি এরাইভালো বোর্ডের দিকে তাকালাম। দেখতে পেলাম একের পর এক ফ্লাইট সময়মতো এসে নামছে এয়ারপোর্টের মাটিতে। সিয়েটাল থেকে আসা ফ্লাইটটা এবার বোর্ডের একেবারে ওপরে দেখতে পেলাম।

এরপর পালানোর জন্যে আমার হাতে শুধু ত্রিশ মিনিট সময় থাকবে। ওর আসার সময়ও পাল্টে গেছে। দশ মিনিট আগেই এসে পৌঁছেচ্ছে ওর ফ্লাইট। এখন আমার হাতে মোটেও সময় নেই।

“এখন মনে হয় আমার খাওয়ার সময় হয়েছে, আমি দ্রুত এলিসের উদ্দেশ্যে বললাম।

এলিস দাঁড়িয়ে পড়লো। “আমি তোমার সাথে আসছি।”

“তোমার বদলে যদি জেসপার আসে, তাহলে কি তুমি কিছু মনে করবে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। “আমি খানিকটা…” বাক্যটা আমি সম্পূর্ণ করলাম না।

জেসপার উঠে দাঁড়ালো। এলিসের চোখে-মুখে এক ধরনের সঙ্কা, কিন্তু আমি স্বস্তিবোধ করলাম- ও বোধহয় কিছু সন্দেহ করছে না।

জেসপার আমার পাশে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো। ওর হাত আলতোভাবে আমার পিঠ ছুঁয়ে আছে। দেখে মনে হতে পারে ও আমাকে গাইড করে নিয়ে চলেছে। প্রথমবার এয়ারপোর্টের কোনো ক্যাফে দেখার পরও আমার মনে কোনো আগ্রহ জন্মালো না। সত্যিকার অর্থে আমি যা চাই সেটাই এখন আমার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে। অবশেষে কোণার দিকে আমি তা দেখতে পেলাম, এলিসের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আড়ালে; লেভেল থ্রী’র “লেডিস রুম।”

“তুমি কি কিছু মনে করবে?” জেসপারের পাশে হাঁটতে হাঁটতে আমি প্রশ্ন করলাম। “আমার সামান্য একটু সময় লাগবে।”

“আমি এখানেই অপেক্ষা করছি,” ও বললো।

যতো দ্রুত সম্ভব আমার পেছনের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল, আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। সময়টা হিসেব করে নিলাম। বাথরুম থেকে নিজেকে হারিয়ে ফেলা আমার জন্যে মোটেও কষ্টকর হলো না, কারণ এর বেরুনোর পথ দুটো।

দরজা দিয়ে বেরুতে এ্যালিভেটর পর্যন্ত দুরত্বটুকু অতি সামান্য। জেসপারের যেখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা সেখানেই যদি দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে কোনোভাবেই এখন আমি তার নজরে আসবো না। দৌড়ানোর সময় একবারো পেছন ফিরে তাকানোর সাহস পাইনি। এটাই এখন আমার একমাত্র পালানোর সুযোগ। এমনকি ও যদি দেখেও ফেলে, আমি এভাবেই দৌড়াতে থাকবো। লোকজন অবাক দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে, কিন্তু তাদের এই তাকানোয় মোটেও পাত্তা দিলাম না। কোণার দিকে পৌঁছতেই দেখতে পেলাম এ্যালিভেটরটা মাত্র নামার প্রতিক্ষায়- দরজাটা মাত্র বন্ধ হতে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে, দরজার ফাঁকে হাত গলিয়ে দিয়ে সেটা আবার খুলে ফেললাম। ভেতরে ঢুকে বুঝতে পারলাম এ্যালিভেটরের প্যাসেঞ্জাররা আমার ওপর বেশ বিরক্ত। লেভেল ওয়ানের বাটনটা চাপার সময় দেখতে পেলাম, ইতোমধ্যে ওটা চেপে রাখাই হয়েছে- “ওয়ান” লেখা বাটনটা জ্বল জ্বল করছে।

এ্যালিভেটরের দরজা খোলা মাত্র আমি ছুটে বেরিয়ে গেলাম। বেরুনোর সময় বিরক্ত প্যাসেঞ্জারদের কিছু সমালোচনা আমার কান এড়ালো না। লাগেজ নেয়ার জন্যে যাত্রীদের হৈ-হুল্লোড়ের কারণে আমার দৌড়ের গতি সামান্য কমাতে বাধ্য হলাম। বাহির’ লেখা দরজার কাছে এসে আমি দৌড় থামালাম। জেসপার এখনো আমাকে লক্ষ করছে এমন ধারণা করার কোনোই কারণ নেই আমার। তবে, ও যদি আমার গন্ধ অনুসরণ করে ধরার চেষ্টা করে তাহলে কয়েক সেকেন্ডও লাগবে না আমার কাছে পৌঁছতে। অটোমেটিক দরজা দিয়ে আমি লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম।

যাত্রীদের জটলার কারণে কোনো ক্যাব নজরে এলো না।

আমার হাতে মোটেও সময় নেই।

এলিস এবং জেসপার নিশ্চয়ই এতোক্ষণে বুঝে ফেলেছে যে, আমি পালিয়েছি।

মাত্র কয়েক ফুট দূরে থাকতে দেখতে পেলাম একটা সাটুল হাইয়েট-এর দরজা বন্ধ হতে যাচ্ছে।

“দাঁড়াও!” দৌড়াতে দৌড়াতে আমি চিৎকার করে উঠলাম। ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে আমি হাত নাড়তে লাগলাম।

 “এটা হাইয়েট যাওয়ার সাটুল?” দরজাটা খোলার পর ড্রাইভার আমার উদ্দেশ্যে বললো।

“হ্যাঁ,” আমি সমর্থন জানালাম, “ওখানেই আমি যাবো।” দ্রুত আমি সাটল-এ উঠে গেলাম।

প্রায় সবগুলো সিট-ই খালি পড়ে আছে। অন্যান্য যাত্রীদের কাছ থেকে যতোটা সম্ভব দূরে গিয়ে বসলাম আমি। জানালা পথে আমি বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলাম। সাইড ওয়ার্ক, এয়ারপোর্ট-একে একে সব পেছনে সরে যাচ্ছে। এখন আর আমি এ্যাডওয়ার্ডের কথা মাথায় আনতে চাইলাম না। আমি এখন কাঁদতেও পারবো না, নিজেকে নিজে বুঝ দিলাম আমি।

ভাগ্য এখনো আমার সহায়-ই বলতে হবে। হাইয়েট এর সামনের দিকে, ক্লান্ত দৃষ্টির বৃদ্ধ-বৃদ্ধা একটা ক্যাবের ট্রাঙ্ক থেকে শেষ স্যুটকেসটা নামাচ্ছেন। সাটল থেকে আমি প্রায় ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এলাম, এবং ক্যাবের দিকে দৌড়ে গেলাম। ক্যাবিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ওর পেছনের সিটটাতে বসে পড়লাম। ক্লান্ত দৃষ্টির বৃদ্ধ বৃদ্ধা-এবং সাটল ড্রাইভার একই সাথে অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো।

বিস্মিত ক্যাবিকে আমি মা’র ঠিকানাটা বললাম। “যতো দ্রুত সম্ভব আমার ওখানে যাওয়ার প্রয়োজন।”

“এটা তো স্কটসডেল-এ” অনেকটা অভিযোগের সুরে বললো ক্যাবি।

 ওর পাশের সিটের ওপর আমি চারশ বিশ ডলার ছুঁড়ে দিলাম।

 “এটা কি যথেষ্ট?”

 “অবশ্যই কিড, কোনো সমস্যাই নেই।”

সিটে বসে কোলের ওপর হাত রেখে চুপচাপ বসে থাকলাম। পরিচিত শহরটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো, কিন্তু জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর কোনো প্রয়োজন বোধ পর্যন্ত করলাম না। বরং আমার পরিকল্পনা নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম। এখন পর্যন্ত ঠিকমতোই এগুতে পেরেছি। তবে সামনে আমার জন্যে কী অপেক্ষা করছে, তার কিছুই আমি জানি না।

অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আমি চোখ বন্ধ করে দিবা স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। দিবাস্বপ্নে এ্যাডওয়ার্ডকে মনের কল্পনায় স্থান করে নিলাম-চিন্তা করলাম, ওর সাথে গাড়িতে ঘুরতে বেরিয়েছি।

আবার কল্পনা করলাম এ্যাডওয়ার্ডের সাথে এয়ারপোর্টে আমার দেখা হবে। পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উঁচু হয়ে আমি ওকে খোঁজার চেষ্টা করছি। কল্পনা করছি খুব শীঘ্রই ওর সাথে আমার দেখা হবে।

কল্পনার ভেতরও অবাক হলাম এই ভেবে যে, আমরা কোথায় যাচ্ছি।

উত্তরের কোনো স্থানের দিকে হবে হয়তো। তাহলে হয়তো নির্জন কোনো স্থানের দিকে আমরা যাত্রা করেছি। তাহলে আমরা দুজন আবার সূর্যাস্ত দেখতে পাবো।

“এই কতো নাম্বার যেন বলেছিলে?”

ক্যাবির কণ্ঠ শুনে আমার দিবাস্বপ্ন ভেঙে গেল। সমস্ত রঙিন রঙ মন থেকে মুহূর্তে মুছে গেল।

“আটান্ন-একুশ।” আমার কণ্ঠস্বর অন্যরকম কোণালো। ক্যাবি একবার আমার দিকে তাকালো।

“তাহলে আমরা পৌঁছে গেছি।” গাড়ি থেকে নামার সময় ক্যাবিকে খানিকটা উৎকণ্ঠিত মনে হলো। হয়তো মনে করছে আমি চেঞ্জটা চেয়ে বসবো।

“ধন্যবাদ আপনাকে,” প্রায় ফিসফিস করে বললাম কথাটা। নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেবার চেষ্টা করলাম, এখন আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পুরো বাড়িটাই এখন খালি। এখন আমার প্রচণ্ড তাড়া; মা আমার অপেক্ষায় বসে আছেন, ভীত, সম্পূর্ণভাবে এখন তিনি আমার ওপরই নির্ভর করে আছেন।

আমি দরজার দিকে দৌড়ে গেলাম। দরজা খুলে আমি রুমে প্রবেশ করলাম। বাড়িটা সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে আছে, একেবারে নির্জন, স্বাভাবিক। আমি ফোনের কাছে দৌড়ে গেলাম, কিচেনের আলো জ্বালিয়ে দিলাম। সাদা একটা বোর্ডের ওপর পরিষ্কার হস্তাক্ষরে দশটা ডিজিট লেখা আছে। টেলিফোনের কী-প্যাডের ওপর আমি আঙুলগুলো চাপতে লাগলাম। প্রথমবারেই আমি ভুল করলাম। ফোনটা হ্যাং আপ করে আবার ডিজিটগুলো চাপতে লাগলাম। এবার আমি সফল হলাম। কম্পিত হাতে রিসিভারটা আমি কানের কাছে ধরলাম। একবারই ফোনটা বেজে উঠলো।

“হ্যালো, বেলা,” স্বাভাবিক কণ্ঠে ওপাশ থেকে উত্তর ভেসে এলো। “তুমি খুব দ্রুত কাজটা সারতে পেরেছে। আমি খুব খুশি হয়েছি।”

“আমার মা কি ভালো আছেন?”

“উনি একেবারেই ভালো আছেন। বেলা, তোমার উৎকণ্ঠিত হওয়ার কিছু নেই। তোমার মা’র প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই। অবশ্য যদি না তুমি এখানে একা আসতে।” জেমস হালকা, আমুদে কণ্ঠে কথাগুলো বললো।

 “আমি এখন সম্পূর্ণ একা।” সত্যিকারভাবে জীবনে এতোটা একা আমি কখনো হয়নি।

“খুব ভালো কথা। তো, তুমি তো বেশ ভালোভাবেই জানো, ব্যালে স্টুডিওটা তোমার বাড়ির ঠিক কোণার দিকে অবস্থিত?”

“হ্যাঁ, ওখানে কীভাবে যেতে হবে আমি তা জানি।”

“ভালো কথা, তাহলে খুব শীঘ্রই তোমার সাথে আমার দেখা হচ্ছে।”

 টেলিফোনটা নামিয়ে রাখলাম।

রুম থেকে আমি ছুটে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাইরের রাস্তায় এখন প্রচণ্ড গরম।

বাড়ির দিকে পেছন ফিরে তাকানোর এখন আমার আর সময় নেই, আমি ফিরে দেখার চেষ্টাও করলাম না। আমি বাদে শেষবার ওই বাড়িতে যে প্রবেশ করেছিলো, সে হচ্ছে আমার চরম শত্রু।

আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম মা বড়ো ইউকেলিপটাস গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। ছেলেবেলায় ওই গাছের নিচে আমি নিয়মিত খেলা করতাম। ওই স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠার চেষ্টা করলেও আমি তা মন থেকে দূরে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করলাম।

আমার চলার গতি খুব ধীর মনে হলো- মনে হলো আমি যেন ভেজা বালির ওপর দিয়ে দৌড়াচ্ছি। হোঁচট খেতে খেতে অনেকবারই আমি নিজেকে সামলে নিলাম। একবার কংক্রিটের ওপর পড়েও গেলাম। অবশেষে আমি কোণায় এসে পৌঁছতে পারলাম। তবে এই রাস্তায় বেশ পরিবর্তন এসেছে। সূর্যের প্রখর তাপে চামড়ায় বেশ যন্ত্রণা হচ্ছে।

যখন ক্যাকটাসের শেষ কোথায় এসে পৌঁছলাম, স্টুডিওটা তখনই চোখে পড়লো, যতোটুকু মনে পড়ে একই রকম আছে। সামনের পার্কিং লটটা সম্পূর্ণ খালি হয়ে আছে। জানালায় আড়াআড়িভাবে ব্লাইন্ড লাগানো। আমার পক্ষে এখন আর কোথাও দৌড়ে পালানো সম্ভব নয় ভালোভাবে নিঃশ্বাসও নিতে পারছি না এখন। মার কথা চিন্তা করেই আমাকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হলো।

স্টুডিওটার একেবারে কাছে এসে দেখতে পেলাম- দরজার ওপর সাঁটানো গোলাপি রঙের একটা কাগজের ওপর কিছু একটা নোট লেখা আছে। কাগজে লেখা বসন্তকালীন ছুটি উপলক্ষে ডান্স ক্লাব বন্ধ রয়েছে। আমি দরজার হাতলের ওপর। সাবধানে হাত রাখলাম। তারপর ধীরে ধীরে নিচের দিকে চাপ দিলাম। লকটা ভোলাই আছে। ঘন ঘন কয়েকবার নিঃশ্বাস নিয়ে আমি দরজাটা খুলে ফেললাম।

লবিটা অন্ধকার হয়ে আছে, শীতল, এয়ার কন্ডিশনের মৃদু গুঞ্জন কোণা যাচ্ছে। দেয়াল ঘেঁষে প্লাস্টিকের চেয়ারগুলো সাজিয়ে রাখা। সম্প্রতি কার্পেটটা পরিষ্কার করার কারণে এখনো সেখান থেকে শ্যাম্পুর গন্ধ বেরুচ্ছে। পশ্চিম দিককার ডান্স ফ্লোর সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢেকে আছে। পূর্বের ফ্লোরটা বেশ বড় আকৃতির, শুধু ওখানেই আলো জ্বলছে। তবে জানালার ব্লাইন্ডগুলো সম্পূর্ণ নামানো।

আলো জ্বালানোর ফ্লোরটার দিকেই আমি এগিয়ে গেলাম। যদিও আতংকে আমার পা নড়াতে বেশ কষ্টই হলো।

“বেলা? বেলা?” সেই আতংকিত কণ্ঠস্বরেই মা আমাকে ডাকছেন। আমি দরজার দিকে ছুটে গেলাম।

আমি চারদিকে নজর বুলাতে লাগলাম- খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম মা’র কণ্ঠটা কোথা থেকে ভেসে আসছে। আমি মার হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দ লক্ষ করে আমি সাথে সাথে ঘুরে গেলাম।

মাকে আসলে দেখতে পেলাম টিভি স্ক্রীনে। আমার চুল বেনুনী করা। এই ভিডিওটা থ্যাংকসগিভিং এর সময়কার। তখন আমার বয়স মাত্র বারো। সেবার আমরা ক্যালিফোর্নিয়া গিয়েছিলাম দাদীমার সাথে দেখা করতে, গত বছরের আগের বছর তিনি মারা গেছেন। আমরা বীচ্-এ বেড়াতে গিয়েছিলাম। ঢেউয়ের খুব কাছে চলে গিয়েছিলাম বলে তিনি আতংকে চিৎকার করে উঠেছিলেন- “বেলা? বেলা?” এবং এর পরই টিভির স্ক্রীনটা নীল হয়ে গেল।

আমি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালাম। লোকটা কালো বেরুনোর পথটার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। এতোটাই নিশূপ যে, প্রথমে প্রায় ওকে আমি দেখতেই পেলাম না। ওর হাতে ধরা একটা রিমোর্ট কন্ট্রোল। বেশ খানিকক্ষণ আমরা একে-অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কিন্তু তারপর লোকটার মুখে হাসি দেখতে পেলাম।

লোকটা যতোটা সম্ভব আমার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। ভি.সি. আর পাশে লোকটা রিমোর্টটা রেখে দিয়ে আমার দিকে তাকালো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে মনোযোগ সহকারে দেখতে লাগলাম।

“বেলা, সবকিছুর জন্যে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত, কিন্তু তোমার মাকে এগুলোর ভেতর না জড়ালে আমি খুশি হতাম।” ওর কণ্ঠ বেশ ভদ্রোচিত কোণালো।

হঠাৎ-ই একটা চিন্তা আমার মাথার ভেতর খেলে গেল। মা নিরাপদেই আছেন। এখনো তিনি ফ্লোরিডাতেই আছেন। তিনি এখন পর্যন্ত ম্যাসেজটাও পাননি।

“হ্যাঁ,” আমি জবাব দিলাম। এতোক্ষণে আমি খানিকটা যেন স্বস্তি অনুভব করলাম।

“তোমার সাথে প্রতারণা করেছি বলে তুমি আমার সাথে রূঢ়ভাবে কথা বলবে না।

“আমি মোটেও তেমনভাবে কথা বলছি না।” হঠাৎ নিজেকে বেশ সাহসী মনে হলো আমার। এখন এর অর্থ আর কি হতে পারে? আশা করছি এর দ্রুত একটা নিপ্রতি ঘটবে। চার্লি এবং মা’র কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না এই লোকটা।

লোকটা আমার থেকে ফুট খানেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ওপর ওর দু’ হাত ভাঁজ করে রাখা। ঔৎসুক্য দৃষ্টিতে ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর মুখ দেখে ভয় পাওয়ার মতো তেমন কিছু খুঁজে পেলাম না। জেমস আর দশটা সাধারণ লোকের মতোই দেখতে। শুধু ওর চামড়ার রঙ অতিরিক্ত সাদা, আর চোখ জোড়া অতিরিক্ত উজ্জ্বল। ওর পরনে ফুল-হাতা নীল রঙের একটা জামা এবং রঙ চটানো জিনস।

 “আমার মনে হচ্ছে, তুমি এখনই বলে উঠবে, তোমার প্রেমিক ঠিকই রক্ষা করতে এখানে ছুটে আসবে?”

“না, আমি মোটেও তেমন কিছু চিন্তা করছি না। অন্ততপক্ষে আমি তাকে এ ধরনের কোনো অনুরোধই জানাইনি।”

“তাহলে ও নিজে থেকেই তা চেষ্টা করবে?”

“আমি তা বলতে পারবো না। ও অনেক আগেই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।”

“তোমার শেষ চিঠিটা কিন্তু বেশ রোমান্টিক ছিলো। তুমি কি মনে করো তোমার চিঠির বক্তব্যকে ও মেনে নেবে?” ওর কণ্ঠস্বর এখন সামান্য কঠিন কোণালো।

“আমি তেমনই আশা করছি।”

“হুমম্। ভালো কথা, পরবর্তীতে আমাদের আশার পরিবর্তনও ঘটতে পারে। চিন্তা করাটা খুবই সহজ ব্যাপার, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা প্রয়োগ ঘটানো বেশ কঠিন ব্যাপার। আমি অনেক বড়ো চ্যালেঞ্জ গ্রহণের আশায় আছি। শুধু ভাগ্য একটু সহায় হলেই আমি সহায় হবো।”

আমি চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলাম।

“যখন ভিক্টোরিয়া তোমার বাবাকে খুঁজে পেলো না। তখন আমি তাকে তোমার প্রতি নজর দিতে বললাম। বুঝতে পারলাম, তোমাকে খুঁজে বের করতে সমস্ত পৃথিবী জুড়ে চষে বেড়াতে হবে না, আমার পছন্দের জায়গায় বসে থেকেই আমি তোমাকে ধরে ফেলতে পারবো। তো, ভিক্টোরিয়ার সাথে কথা বলার পর আমি ফিনিক্স-এ আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। শুনতে পেলাম তুমি তোমার বাড়িতে ফেরার কথা চিন্তা করছে। প্রথম দিকে তোমার সাথে আমার সাক্ষাৎ হবে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। কিন্তু তারপরও আমাকে অবাক হতে হলো। মানুষের ভেতর অনেকগুলো গুণ রয়েছে; তারা কোনো কোনো স্থানের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ, কোথাও কোথাও তারা অতিরিক্ত নিরাপত্তা বোধ করে। তবে, কাজগুলো সবসময় নির্ভুলভাবে সমাধা করতে পারে না। তোমরা শেষে ঠিকই একটা স্থানে লুকিয়ে পড়লে কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলো না।

 “তবে এটা অবশ্যই অনুমান মাত্র; আমি মোটেও নিশ্চিত ছিলাম না। কাঙ্ক্ষিত শিকারের ওপর আমার এক ধরনের অনুভূতি জাগে- আমার ভেতরকার তখন ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করতে শুরু করে। আমি তোমার মা’র বাড়িতে উপস্থিত হওয়ার পরপরই তোমার ম্যাসেজ শুনতে পেলাম। তবে এটাও সত্য, কোথা থেকে তুমি ম্যাসেজ পাঠাচ্ছো, আমি প্রথমে তা বুঝতে পারলাম না। তোমার নাম্বারটা পাওয়ার পর আমার বেশ উপকার হলো। অবশ্য আমার ক্ষমতাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই, তুমি যদি এ্যান্টারটিকাতেও থাকতে, তাহলেও আমি অবস্থান সম্পর্কে জেনে যেতাম, যদি না তুমি তোমার চিন্তাকে রোধ করতে পারতে।

 “এরপর ফিনিক্স-এ আসার উদ্দেশ্যে তোমার প্রেমিক এ্যাডওয়ার্ড প্লেনে চাপলো। ভিক্টোরিয়া শুধুমাত্র আমার কারণেই ওদের ওপর নজর রাখতে শুরু করেছিলো। এটা এমন একটা খেলা, যাতে অনেক খেলোয়াড়, সুতরাং আমার একার পক্ষে এই খেলায় সফল হওয়া সম্ভব হতো না। এরপর আমার সঙ্গীরা ভরসা দিলো, যেভাবেই হোক তোমাকে আমার মুঠোর ভেতর এনে দিবে। আমি প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম; চিন্তা করে দেখলাম, তুমি তোমার আনন্দ ঘেরা বাড়িতে ফিরে আসবে; এবং সামান্য একটু প্রতারণার আশ্রয় নিলেই তুমি এখানে ছুটে আসবে।

 “খুবই সহজ, তুমি বুঝতেই পারছো, আমার মতো মানুষের কাছ থেকে এর। চাইতে নিশ্চয়ই ভালো কিছু আশা করতে পারো না।

সুতরাং, তুমি প্রেমিক এ্যাডওয়ার্ডকে প্রতারণা করেছে, তাই নয় কি?”

আমি কোনো জবাব দিলাম না।

“আমি এ্যাডওয়ার্ডের জন্যে ছোটো একটা চিঠি রেখে এসেছি, কথাটা শুনে তুমি কি খুব রাগ করছো?”

জেমস এক পা পেছনে সরে গেল। স্টেরিওর ওপর রাখা একটা পাম-সাইজ ডিজিটাল ক্যামেরাকে স্পর্শ করলো। ক্যামেরার জ্বলজ্বলে লাল লাইট দেখে বুঝতে পারলাম ওটা জেমস চালু করে রেখেছে। কিছু সময়ের ভেতরই ও ক্যামেরাটা এ্যাডজাস্ট করে নিলো। আমি আতংকিত চোখে ওর দিকে তাকালাম।

 “আমি দুঃখিত, তবে মনে হয় না, এটা দেখার পর ওর মনে আমাকে হত্যা করার কোনো বাসনা জাগবে। তাছাড়া কোনো কিছু ওর চোখ এড়িয়ে যাক সেটাও আমি চাই না। অবশ্যই এর সম্পূর্ণটাই আমি ওর জন্যে তৈরি করছি। তুমি সাধারণ একজন মানুষ মাত্র। আর ওই এ্যাডওয়ার্ড দুভার্গ্যবশত ভুল সময়ে ভুল জায়গায় এসে পড়েছে।”

হাসি মুখে ও আমার দিকে আরো খানিকটা এগিয়ে এলো। “আমরা শুরু করার আগে…”

ওর কথাটা কোণার পর পেটের কাছে আবার আমার মোচড় দিয়ে উঠলো। জেমস এমন কিছু বুঝাতে চাইছে যা হয়তো আমি কখনো কল্পনা করিনি।

“আমি শুধু ওর ভুলগুলো বার বার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, অতি সামান্যই বলতে পারো। এর ভেতরই সমস্ত জবাব খুঁজে পাওয়া যাবে এবং আমি খুবই ভয় পাচ্ছি এ্যাডওয়ার্ড এটা দেখে আমার সমস্ত মজাটাই নষ্ট করে দেবার চেষ্টা করবে। এরকম একবারই ঘটেছিলো, ওহ, তা অনেক আগের কথা। শুধুমাত্র একবারই আমার শিকার হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিলো।

“তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো, ভ্যাম্পায়াররা বোকার মতো তোমার মতো ছোটো খাটো শিকারকে পছন্দ করে ফেলে- যেমন এ্যাডওয়ার্ড করেছে। যখন বৃদ্ধ লোকটা জানতে পারলো আমি তার ক্ষুদে বন্ধুর পিছু নিয়েছি, ও তখন মেয়েটাকে আশ্রম থেকে চুরি করে নিয়ে গেল। লোকটা ওই আশ্রমেই কাজ করতো। আমি ভেবে পাই না কিছু সংখ্যক ভ্যাম্পায়ার কেন তোমাদের মতো মানুষদের রক্ষা করতে চায়। এরপর ওই বৃদ্ধ বন্ধু ওই মেয়েকে রক্ষা করলো। মেয়েটা ব্যথাটুকুও অনুভব করতে পারলো না- হায়রে অসহায় জীব! একটা সেলের ব্ল্যাকহোলে মেয়েটা আটকা পড়লো। প্রায় একশ বছর আগেকার ঘটনা। অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার জোরে নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মাহুতি দিলো। এই আশ্রমে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা করা হতো- এটা সেই উনিশ বিশ সালের ঘটনা। শর্ক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে অনেক মানসিক রোগীকে এখানে সুস্থও করে তোলা হয়। মেয়েটা চোখ খুলে দেখতে পেলো, পূর্ণ যৌবন নিয়ে সে নব জীবন লাভ করেছে। এমনো মনে হলো যেন সে এর আগে কখনো সূর্যই দেখেনি। বৃদ্ধ ভ্যাম্পায়ার তাকে শক্তিশালী নতুন ভ্যাম্পায়ারে রূপ দিয়েছে। সুতরাং এরপর আর তাকে স্পর্শ করার কোনো কারণ দেখতে পাইনি।” জেমস দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। “প্রতিহিংসার কারণেই আমি পুরাতনকে ধ্বংস করে ফেলি।”

“এলিস!” আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম। জেমসের কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেছি।

“হ্যাঁ, তোমার ক্ষুদে বান্ধবী। আমি খুব ভালোভাবে চিনতে পেরেছি। ওকে দেখে আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম। সুতরাং আমার ধারণায় তার সেই কষ্ট থেকে এখন সে সম্পূর্ণভাবেই মুক্তি লাভ করতে পেরেছে। আমি তোমাকে পেয়েছি, কিন্তু ওরা তাকে পেয়েছে। একটা মাত্র শিকার আমার হাতছাড়া হয়েছে- অতি সামান্য ব্যাপার। সত্যিকার অর্থে এ কারণে আমাকে সম্মান জানানোর প্রয়োজন।

“ও চমৎকার গন্ধ ছড়াতে পারে। ওই সুগন্ধ এখন পর্যন্ত আমি ভুলতে পারি না…এমন কি তোমার চাইতেও ও সুন্দর গন্ধ ছড়াতে পারে। দুঃখিত- আমি তোমাকে খাটো করার উদ্দেশ্যে এই কথা বলিনি। তোমার শরীরেও চমৎকার সুগন্ধ আছে। ফুলের সুগন্ধ, যেভাবেই হোক,..”

জেমস আরেক পা সামনে এগিয়ে এলো, এখন ও আমার থেকে মাত্র ইঞ্চি কয়েক দূরে দাঁড়িয়ে। চুল থেকে হেয়ার ব্যান্ড খুলে নিয়ে আমার মুখের ওপর দিয়ে ছড়িয়ে দিলো। আমার গলার ওপর ওর ঠাণ্ডা আঙুলের স্পর্শ অনুভব করলাম। চিবুকের ওপর ওর ঠাণ্ডা বৃদ্ধাঙ্গুলির স্পর্শ অনুভব করলাম, ওর চোখে-মুখে এক ধরনের ঔৎসুক্য ভাব। আমি ভীরুর মতো পালাতে চাইলাম, কিন্তু ভয়ে এমনভাবে জমে গেছি যে একটুও নড়তে পারলাম না।

“না,” আপনমনে সে বিড়বিড় করে হাত নামিয়ে নিলো। “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।” জেমস দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললো। “ভালো কথা, আমার মনে হচ্ছে, এতে আমি সফল হবো। এরপর তোমার বন্ধুদের এখানে ডেকে আনবো। কোথায় তোমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে সেই তথ্যটা ওদের জানিয়ে দিবো। এর সাথে সাথে আমার ক্ষুদ্র ম্যাসেজটাও ওদের জন্যে রাখা থাকবে।”

এখন আমি সম্পূর্ণ অসুস্থ বোধ করছি। আমার যে কষ্ট আসতে যাচ্ছে, সেটা আমি তার চোখেই দেখতে পেলাম। আমাকে ধ্বংস করে চলে যাওয়ার মাধ্যমেই সে নিবৃত্ত হবে না। তার এই ধ্বংস স্পৃহা কোথায় গিয়ে থামবে তা কোনোভাবেই আমি হিসেব করে বলতে পারছি না। আমার হাটু আবার কাঁপতে লাগলো এবং মনে হলো এখনই বুঝি আমি পড়ে যাবো।

ও খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে ঘুরতে লাগলো। স্বাভাবিকভাবেই, অনেকটা মিউজিয়ামে রাখা মূর্তিগুলো দর্শকরা যেভাবে দেখার চেষ্টা করে। মিউজিয়ামের দর্শকরা একটা অবস্থান বেছে নেয়, যে দিক তাকালে মোটামুটি তারা মূর্তিগুলোকে ভালোভাবে বুঝতে পারে। এখনো ওর মুখটা বন্ধুত্বসুলভই মনে হলো আমার কাছে। তবে কাজটা কোথা থেকে শুরু করবে, তা নিয়ে একটু চিন্তিত মনে হলো।

এরপরই লোকটা কাউচের ওপর নিজেকে ছুঁড়ে দিলো যেন। তবে ওর মিষ্টি হাসি ক্রমশ বিস্তৃত হতে লাগলো কুড়তা এবং নিষ্ঠুরতা মাখানো এক ধরনের অদ্ভুত হাসি। ওর দাঁত বেরিয়ে পড়েছে, ওগুলো চকচক করছে।

আমি নিজেকে কোনো সাহায্য করতে পারবো না আমি দৌড়ানোর চেষ্টা করলাম। যদিও জানি এখন তা একেবারেই ভিত্তিহীন এক কাজ। তবুও আমি আতংকিতভাবে এমারজেন্সি ডোরটার দিকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করলাম।

লোকটা সামনে থেকে আমাকে ধাক্কা দিলো। ঠিক বুঝতে পারলাম না, সে কী ব্যবহার করলো, হাত নাকি পা। আমি বুকের নিচে চেপে ধরলাম- বুঝতে পারলাম, আমি ছিটকে পেছনে গিয়ে পড়লাম। আয়নায় সজোরে মাথাটা টুকে যাওয়ায় ওটা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। আমার পাশে মেঝের ওপর কাঁচের টুকরোগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো।

এতোটাই হকচকিয়ে গেছি যে, প্রথমে আমি ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেললাম। এমনকি খানিক্ষণের জন্যে নিঃশ্বাসও নিতে পারলাম না।

ধীর পদক্ষেপে ও আমার কাছে এগিয়ে এলো।

“শব্দের চমৎকার একটা ইফেক্ট তৈরি হলো, বিক্ষিপ্ত ছড়ানো কাঁচগুলোর দিকে তাকিয়ে ও বললো। ওর কণ্ঠস্বর আবার বন্ধুত্বসুলভ হয়ে উঠেছে। “আমি ভেবে দেখলাম, আমার স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণের এই স্থানটাতে এক ধরনের নাটকীয়তা আছে। এ কারণেই তোমার সাথে আমি দেখা করতে চেয়েছি। এটা সত্যিকার অর্থেই একটা চমৎকার জায়গা, তাই নয় কি?”

আমি সম্পূর্ণভাবে লোকটাকে উপেক্ষা করলাম। হামাগুড়ি দিয়ে আমি অন্য দরজাটার দিকে এগুনোর চেষ্টা করলাম।

নিচু হয়ে ও আমার পায়ে লাথি মারলো। অসহ্য যন্ত্রণায় আমার মুখটা নীল হয়ে গেল। এই যন্ত্রণা আমি খানিক আগেই আরেকবার অনুভব করেছি। কিন্তু এবার আত্বচিৎকার রোধ করতে পারলাম না। লোকটা আমার ওপর ঝুঁকে পড়ে হাসতে লাগলো।

“তোমার শেষ ইচ্ছেটা কি মনে করে রেখেছো?” শান্ত কণ্ঠে ও আমাকে প্রশ্ন করলো। আমার ভাঙা পায়ের ওপর ও পায়ের আঙুলগুলো দিয়ে চাপ দিলো। শুধু আমি একটা আত্নচিৎকার শুনতে পেলাম আমার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসাই আত্নচিৎকার।

“এ্যাডওয়ার্ড আমার মুখোমুখি হোক, নিশ্চয়ই তুমি তা চাইছো না?”

“না,” কথাটা আমার গলার কাছে আটকে গেল। “না, এ্যাডওয়ার্ড অবশ্যই নয়।” এবং তারপরই আমার মুখের ওপর কোনো কিছু প্রচণ্ড জোরে আঘাত করলো। আমি আবার সেই ভাঙা আয়নার ওপর গিয়ে পড়লাম।

পায়ের অসহ্য ব্যথার সাথে সাথে মাথার পেছন দিকেও অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করলাম। ভাঙা কাঁচে আমার মাথার তালুর কোথাও কেটে গেছে। আমার চুল ভিজতে শুরু করছে। এবং তার থেকে এখন জামার কাঁধের কাছটাতেও ভিজে উঠেছে- এরপর শুনতে পেলাম কাঠের মেঝের ওপর রক্ত পড়ার শব্দ। রক্তের সামান্য ওই গন্ধেও পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো।

এতোকিছুর পরও অতি সামান্য এক আশার আলো দেখতে পেলাম। এর আগে ওর অস্বস্তি আমি খুব কমই লক্ষ করেছি, কিন্তু এখন ওর চোখ জোড়া অনিয়ন্ত্রিতভাবে জ্বলজ্বল করছে এবং তা আমার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্তই মনে হলো। রক্ত- সাদা জামা বেয়ে রক্তের একটা ধারা নিচের দিকে নেমে আসছে। আর তা ফোঁটায় ফোঁটায় কাঠের মেঝের ওপর এসে পড়ছে- মাটিতে পড়া ওই রক্ত চেটে চেটে খাওয়ার জন্যে জেমস মেঝের ওপর হামলে পড়লো। ওর মনে যাই থাকুক না কেন, তা ফলপ্রসূ করতে মনে হয় না খুব একটা বেশি সময় নেবে।

যা করার তা খুব দ্রুতই করতে হবে। যতোটুকু আমি আশা করছিলাম, তার সবই আমার মাথা থেকে রক্তের সাথে ঝরে পড়েছে। আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো।

মনে হলো যেন আমি পানির নিচ থেকে সব শুনতে পাচ্ছি, অনেক কিছুই, এমনকি ওই জেমসের গলা থেকে বেরিয়ে আসা অদ্ভুত গর্জন। চোখের সামনে দীর্ঘ এক সুড়ঙ্গ পথ দেখতে পেলাম-সুড়ঙ্গের কালো অন্ধকার আমাকে গিলে খেতে আসছে। শেষ আত্নরক্ষার খাতিরে দুহাতে আমি মুখ ঢেকে ফেললাম। আমার দু’চোখ বন্ধ হয়ে গেল মনে হলো পানির অতল গহ্বরে আমি ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি।

.

২৩.

যখন মনে হলো আমি ডুবে যাচ্ছি, তখনো মনে হলো, সত্যি নয়, আমি স্বপ্ন দেখছি।

আঁধারে ঘেরা পানির নিচ দিয়ে আমি কোথায় ভেসে চলেছি বুঝে উঠতে পারলাম না। তবে এরই ভেতর কানে ভেসে এলো সবচেয়ে মধুর শব্দটা একজনের কণ্ঠস্বর।

আমি আবার ভেসে ওঠার চেষ্টা করলাম এবং ভেসে উঠতে লাগলাম, প্রায় পাড়ের কাছাকাছি উঠে আসার চেষ্টা করলাম। হাত উপর দিকে তুলতে গিয়ে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করছি। কিন্তু এই স্রোত ঠেলে উপরে উঠে আসার সময় আমি একবারো চোখ খুলতে পারলাম না।

এবং তারপর মনে হলো, বোধহয় আমার মৃত্যু ঘটেছে।

কারণ গভীর পানি ভেদ করে আমি এক দেবদূতের কণ্ঠ শুনতে পেলাম- দেবদূত আমার নাম ধরে ডাকছে- আমি যে স্বর্গ লাভ করতে চেয়েছিলাম, সেই স্বর্গে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।

“ওহ্ না, বেলা না।” দেবদূত আতংকিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো।

আমি দেবদূতের কণ্ঠস্বরের প্রতি মনোযোগ দেবার চেষ্টা করলাম।

“বেলা, দয়া করে শোনো! বেলা আমার কথা কোণার চেষ্টা করো, দয়া করে আমার কথা শোনো! দেবদূত বিনীত অনুরোধ জানালো।

হ্যাঁ, আমি বলতে চাইলাম। অথবা অন্য কোনো কিছু। কিন্তু আমার ঠোঁট কোনো শব্দ খুঁজে পেলো না।

 “কার্লিসল!” দেবদূত ডাকলেন। তার কণ্ঠস্বরে এক ধরনের দৃঢ় প্রত্যয়। “বেলা, বেলা, না, ওহ্, দয়া করে কথা শোনো না, না!” দেবদূতের চোখের অশ্রু দেখতে না পেলেও ওর কান্নার শব্দ আমি ঠিকই শুনতে পেলাম।

দেবদূত কখনো কাঁদতে পারে না, এটা আমার ভুল ধারণা। আমি তাকে দেখার চেষ্টা করলাম। ওকে বলতে চাইলাম সবকিছুই ঠিক আছে, কিন্তু পানির গভীরতা অত্যাধিক বেশি, যার কারণে আমাকে নিচের দিকে চেপে ধরে রাখা হয়েছে।

এ-কারণে আমি ভালোভাবে নিঃশ্বাসও নিতে পারলাম না।

আমার মাথার নির্দিষ্ট একটা কেন্দ্রেই চাপটা অনুভব করছি। আর স্থানটাতে অসম্ভব যন্ত্রণা অনুভব করছি। এরপর আমার মাথার যন্ত্রণা অন্ধকার ভেদ করে দূরে সরে যেতে লাগলো। তার বদলে আরেকটা ব্যথা আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো- আগের চাইতেও অনেক তীব্র ব্যথা। আমি কেঁদে উঠলাম, নিঃশ্বাস নেবার জন্যে হাঁপাতে লাগলাম অতল অন্ধকারকে ভেদ করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম।

“বেলা!” দেবদূত কেঁদে উঠলো।

“ওর কিছু রক্তক্ষরণ হয়েছে, কিন্তু মাথার ক্ষতটা খুব একটা গভীর নয়।” একটা শান্ত কণ্ঠ থেকে তথ্যগুলো ভেসে এলো। “ওর পাটার দিকে নজর দেয়া উচিত। এটা ভেঙে গেছে।”

দেবদূতের কণ্ঠ দুঃখ এবং হতাশায় ভারাক্রান্ত।

শরীরের একপাশে আমি প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করলাম। এটা স্বর্গ হতে পারে না, হতে পারে কি?

স্বর্গে এতো যন্ত্রণা থাকার কথা নয়।

“আমার মনে হয়, পাঁজরের কয়েকটা হাড়ও বোধহয় ভেঙে গেছে,” একই কণ্ঠের মন্তব্য আমার কানে ভেসে এলো।

কিন্তু তীক্ষ্ণ ব্যথাটা এখন ধীরে ধীরে আর অনুভব করছি না। এখন নতুন এক ধরনের ব্যথা শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে আমার হাতে কেউ হেঁকা দিচ্ছে।

কেউ আমাকে পোড়ানোর চেষ্টা করছে।

“এ্যাডওয়ার্ড।” আমি তাকে ঢাকার চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমার কণ্ঠ অত্যন্ত ভারি এবং দুর্বল কোণালো। আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না।

“বেলা, তুমি ক্রমশই সুস্থ হয়ে উঠছো, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছে বেলা? আমি তোমাকে ভালোবাসি বেলা!”

“এ্যাডওয়ার্ড,” আমি আবার কথা বলার চেষ্টা করলাম। মনে হলো এবার আমার কণ্ঠ থেকে সামান্য একটু স্বর বেরুলো।

“হ্যাঁ, আমি এখানে।”

 “আমার খুব যন্ত্রণা হচ্ছে, অনেক কষ্টে কথাটা আমি বলতে পারলাম।

“আমি জানি বেলা, আমি জানি”- এরপর মনে হলো ওর কণ্ঠস্বর দূরে সরে গেছে। অভিযোগ জানালাম আমি- “তুমি কি কিছুই করতে পারছো না?”

 “দয়া করে আমাকে ক্ষমা করো…তুমি হালকাভাবে নিঃশ্বাস নেবার চেষ্টা করো বেলা, তোমার কষ্ট কম হবে,” অভয় দেবার ভঙ্গিতে বললেন কার্লিসল।

“এলিস?” আমি বিড়বিড় করে ওকে ডাকার চেষ্টা করলাম।

“এলিস এখানেই আছে। কোথায় তোমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে, ও আগে থেকেই জানতে পেরেছিলো।”

“আমার হাতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে, আমার কষ্টের কথা তাকে জানানোর চেষ্টা করলাম।

“আমি জানি বেলা। কার্লিসল তোমাকে এমন কিছু একটা দেবেন, দেখবে সব ভালো হয়ে গেছে।”

“আমার হাত জ্বলে যাচ্ছে!” আমি চিৎকার করে উঠলাম, শেষ অন্ধকার টুকু চোখের সামনে থেকে মুছে গেল। চোখ খুলে তাকালাম, কিন্তু আমি তার চেহারা দেখতে পেলাম না। খুব অভিমান হলো আমার, ও কেন আগুনটা দেখতে পাচ্ছে না!

আমি ওর ভীত কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। “বেলা?”

“আগুন! কেউ একজন আগুনটা নেভাও!” আমি এমনভাবে চিৎকার করে উঠলাম, যেন সত্যিকারেরই কোনো আগুন আমাকে পুড়িয়ে ফেলতে যাচ্ছে!

“কার্লিসল! ওর হাতটা!”

“ওই লোকটা বেলাকে মারাত্নক আহত করেছে,” অভিযোগের সুরে বললেন কার্লিসল।

আমি বুঝতে পারলাম, এ্যাডওয়ার্ড আতংকে নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে।

“এ্যাডওয়ার্ড, তোমাকেই কাজটা করতে হবে।” মাথার কাছে দাঁড়ানো এলিসের। কণ্ঠ চিনতে আমার কষ্ট হলো না। চোখের পাতার ওপর ও শীতল আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে।

“না!” এ্যাডওয়ার্ড আঁতকে উঠলো।

“এলিস,” আমি গুঙিয়ে উঠলাম।

 “এখন একটা সুযোগ আছে অবশ্য,” কার্লিসল বললেন।

“কি সেটা?” এ্যাডওয়ার্ড আকুল কণ্ঠে জানতে চাইলো।

“দেখ, তুমি যদি চুষে ওর শরীর থেকে বিষটা বের করে ফেলতে পারো, তাহলেই ক্ষতটা দ্রুত শুকিয়ে যাবে এবং বেলাও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে।” কাসিলের কথা শুনে, মাথার ভেতর নতুনভাবে এক ধরনের চাপ অনুভব করতে লাগলাম। মনে হলো কোনো কিছু আমার মাথার ভেতর ঢুকছে আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। এই নতুন চাপ ক্ষণিকের জন্যে আগুনের যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দিলো।

“ওতেই কি কাজ হবে?” এলিসের কণ্ঠে এক ধরনের শঙ্কা।

“আমি ঠিক জানি না,” কার্লিসল বললেন। “কিন্তু যা করার আমাদের দ্রুত করতে হবে।”

“কার্লিসল, আমি…” এ্যাডওয়ার্ড খানিকটা ইতস্তত করলো। “ঠিক বুঝতে পারছি না কাজটা আমি আদৌ করতে পারবো কিনা।” ওর চমৎকার কণ্ঠস্বরের উৎকণ্ঠা এড়াতে পারলো না।

“যাই হোক এটা তোমার ব্যাপার। আমি তোমাকে এছাড়া আর কোনো সাহায্য করতে পারছি না। তুমি যদি ওর বিষাক্ত রক্তটুকু বের করে ফেলতে পারো, তাহলে ওর রক্তপড়াও আমি বন্ধ করতে পারবো।”

“এ্যাডওয়ার্ড,” অসহ্য যন্ত্রণায় আমি প্রায় চিৎকার করে উঠলাম বুঝতে পারছি আমার চোখ আবার বন্ধ হয়ে আসছে। ওর চেহারা দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষায় চোখজোড়া অনেক কষ্টে আবার খুললাম। আবার ওকে দেখতে পেলাম। শেষ পর্যন্ত এ্যাডওয়ার্ডের চমৎকার চেহারাটা দেখার আবার সুযোগ ঘটলো আমার। আমার দিকে ও তাকিয়ে আছে, ওর অভিব্যক্তিতে আমার প্রতি তার প্রচণ্ড মর্মর্যাতনা ঝরে পড়ছে।

“এলিস, বেলার পায়ের সাথে ব্রেস লাগানোর চেষ্টা করো!” কার্লিসল আমার ওপর ঝুঁকে এসে নির্দেশ দিলেন। “এ্যাডওয়ার্ড কাজটা তোমাকে এখন অবশ্যই করতে হবে, নয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।”

এ্যাডওয়ার্ড মুখটা নামিয়ে নিলো। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, এতোক্ষণ ওখানে যে শঙ্কা এবং ইতস্তত ভাবটা ছিলো, তার বদলে সেখানে ভিন্ন ধরনের এক আত্নবিশ্বাস খেলা করছে। ধীরে ধীরে ওর চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠছে। আমি অনুভব করলাম, এ্যাডওয়ার্ড আমার যন্ত্রণার স্থানগুলোর ওপর ওর বরফ শীতল আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে এবং ক্ষতস্থানটার ওপর দৃষ্টি নিবন্ধ করে রেখেছে। এরপর এ্যাডওয়ার্ড ওই ক্ষতস্থানের ওপর মুখটা নামিয়ে আনলো এবং বরফ শীতল ঠোঁটজোড়া আমার চামড়ার ওপর স্থাপন করলো।

প্রথমে ব্যথাটা আরো বেশি অসহ্য মনে হলো। চিৎকার করে ওঠার সাথে সাথে ওর শীতল হাতে আমাকে চেপে ধরলো বিছানার সাথে। এরই ভেতর এলিসের কণ্ঠস্বর কানে এলো, ও আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। মেঝের ওপর আমার পা ভারী কিছু দিয়ে আটকে রাখা। অন্যদিকে কার্লিসল শক্ত হাতে আমার মাথা চেপে ধরে রেখেছে।

এরপর খুব ধীরে ধীরে আমার হাতের ব্যথাটা কমে আসতে লাগলো। হাতের আগুন একেবারে প্রায় নিভে গেছে- যতোটুকু জ্বলছে তা অতি সামান্য, এর থেকে সামান্য একটু চিনচিনে ব্যথাই অনুভব হতে পারে। এখন আমি সেই রকম চিনচিনে ব্যথাই অনুভব করছি মাত্র।

ঘুম ব্যথার স্থানটা এখন দখল করে নিতে চাইছে। আমার ভয় হলো, আবার বুঝি আমি সেই অন্ধকার কালো পানির গভীরে তলিয়ে যেতে যাচ্ছি- ভয় হলো একবার যদি ওই অন্ধকার-কালো পানির ভেতর ডুবে যাই, তাহলে আবার এ্যাডওয়ার্ডকে হারিয়ে ফেলবো।

“এ্যাডওয়ার্ড,” ওকে ডাকার চেষ্টা করলাম, কিন্তু নিজের কণ্ঠ আমি নিজেই শুনতে পেলাম না।

“ও এখানেই আছে বেলা।”

“থাকো, এ্যাডওয়ার্ড, তুমি আমার সাথে থাকো…”।

 “আমি তোমার সাথেই থাকবো।” ওর কণ্ঠ একেবারে স্বাভাবিক কোণালো।

 খানিক বাদে আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলাম। আগুনটা চলে গেছে।

“ব্যথাটা কি ভালো চলে গেছে?” মনে হলো অনেক দূরের কোথাও থেকে কার্লিসল আমাকে প্রশ্নটা করলেন।

“ওর রক্ত বিশুদ্ধ হয়ে গেছে।” শান্ত কণ্ঠে বললো এ্যাডওয়ার্ড। “ওর বিষের স্বাদ আমি পেয়েছি।”

“বেলা?” কার্লিসল আমাকে ডাকলেন।

আমি জবাব দেবার চেষ্টা করলাম। “মা…”

“যন্ত্রণাটা কি চলে গেছে?”

 “হ্যাঁ,” দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আমি বললাম।

“অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে এ্যাডওয়ার্ড।”

 “আমি তোমাকে ভালোবাসি, ও জবাব দিলো।

“আমি জানি,” আমি ক্লান্তভাবে নিঃশ্বাস ফেললাম।

আমি পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দটা যেন শুনতে পেলাম; এ্যাডওয়ার্ড একটু হাসলো। মনে হলো ও খানিকটা স্বস্তিবোধ করছে।

“বেলা?” কার্লিসল আবার আমাকে ডাকলেন।

আমি ভ্রু কুঁচকালাম; আমি এখন একটু ঘুমোতে চাই। “কি?”

 “তোমার মা কোথায়?”

“ফ্লোরিডায়, আমি আবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম। “জেমস আমার সাথে প্রতারণা করেছিলো এ্যাডওয়ার্ড। ও আমাদের একটা ভিডিও টেপ দেখেছিলো।”

“এলিস।” আমি আমার চোখ জোড়া খোলার চেষ্টা করলাম। “এলিস, ওই ভিডিও- জেমস তোমাকে আগে থেকেই জানতো। তুমি কোথা থেকে এসেছো, ও তা জানতে পেরেছিলো। আমি ওকে জরুরি কিছু একটা বলতে চাইলাম, কিন্তু আমার কণ্ঠ জড়িয়ে এলো। “আমি গ্যাসোলিনের গন্ধ পাচ্ছি,” এলোমেলো চিন্তার ভেতর থেকেও কোনোভাবে কথাটা বলতে পারলাম।

“ওকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে, কার্লিসল বললেন।

“না, আমি ঘুমোতে চাই,” অভিযোগের সুরে বললাম আমি।

“মিষ্টি সোনা, তুমি ঠিকই ঘুমোতে পারবে, আমি তোমাকে নিয়ে যাবো।” এ্যাডওয়ার্ড আমাকে সান্ত্বনা দিলো।

এবং আমি ওর বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হলাম, ওর বুকের কাছে গুটিসুটি মেরে চোখ বন্ধ করে রাখলাম। এখন আমার শরীরে কোনো ব্যথাই নেই।

“এখন তুমি ঘুমোও বেলা,” শেষ, এই শব্দটাই আমি শুনতে পেলাম।

.

২৪.

চোখের ওপর একটা উজ্জ্বল-সাদা আলো এসে পড়ায় আমি চোখ মেলে তাকাতে বাধ্য হলাম। যে সাদা ঘরে এখন আমি অবস্থান করছি, তা আমার একেবারে অপরিচিত। আমার পাশের জানালায় আড়াআড়ি ব্লাইন্ড লাগানো। মাথার ওপরকার উজ্জ্বল আলোয় আমার চোখ প্রায় বাঁধিয়ে দিচ্ছে। শক্ত এবং অসমান্তরাল বিছানার ওপর সাথে সাথে আমি লাফিয়ে উঠলাম- বিছানায় রেইল লাগানো।

মাথার নিচকার বালিশ প্রায় সমান্তরাল- তুলোগুলো মাঝে মাঝে ডেলা পাকিয়ে আছে। আমার খুব কাছের কোথাও থেকে বীপ্ বীপ করে এক ধরনের শব্দ ভেসে আসছে। এর অর্থ হচ্ছে এখনো আমি বেঁচে আছি। মৃত্যু ঘটলে এ ধরনের অস্বস্তিবোধ করতাম না।

আমার হাতে আঁকাবাকা পরিষ্কার সব টিউব লাগানো, মনে হলো মুখের পাশ দিয়েও নাকের নিচে একই রকমের কিছু একটা লাগানো আছে। এটা সরিয়ে দেবার জন্যে আমি হাতটা তোলার চেষ্টা করলাম।

“না, তুমি একটুও নড়বে না।” শীতল আঙুলের একটা হাত আমার হাতটা চেপে ধরলো।

“এ্যাডওয়ার্ড?” আমি সামান্য একটু মাথা ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। ওর মুখটা মাত্র ইঞ্চি কয়েক দূরেই দেখতে পেলাম। ওর চিবুক আমার বালিশের পাশে রেখে নিচু হয়ে বসে আছে। “ওহ্ এ্যাডওয়ার্ড, আমি খুবই দুঃখিত!”

 “শশ…” ও আমাকে চুপ করার নির্দেশ দিলো। “এখন সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে।”

“কি হয়েছিলো?” আমি সবকিছু স্মরণে আনতে পারলাম না। ওগুলো আমি স্মরণে আনার চেষ্টা করতে লাগলাম।

 “খুব বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিলো। আমিই আসলে দেরি করে ফেলেছিলাম।” ফিসফিস করে বললো এ্যাডওয়ার্ড।

“এ্যাডওয়ার্ড, আমি আসলে খুব বোকা। আমি সত্যিই ভেবে নিয়েছিলাম, মা-ই আমাকে ডাকছেন,” ওই স্মৃতির সামান্য একটু মনে পড়লো আমার।

“এলিস ওদের ডাকতে গেছে।

রেনে এখানেই আছেন- এখানে বলতে, এই হাসপাতালে। ও বোধহয় এখন কোনো খাবারের ব্যবস্থা করতে গেছেন।”

“ও এখানে?” আমি উঠে বসতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু এ্যাডওয়ার্ড আবার আমাকে শুইয়ে দিলো।

 “উনি দ্রুত ফিরে আসবেন, বলে গেছেন,” এ্যাডওয়ার্ড বললো। “কিন্তু এখন তোমার শান্ত থাকা উচিত।”

“কিন্তু তুমি তাকে সব বলতে গেলে কেন?” আমি আতংকিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলাম।

আমি আসলে তাকে এসব কোনো কথাই জানাতে চাইছিলাম না। আমি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি, ভ্যাম্পায়ার আমাকে আক্রমণ করেছিলো, ইত্যাদি কোনো কথাই নয়। “কেন তুমি বলতে গেলে আমি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি?”

“জানালা গলিয়ে তুমি সিঁড়ির ওপর পড়ে গিয়েছিলে এমন কথাই তাকে বলা হয়েছে।” ও একটু থামলো। “তুমি পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিলে, যার কারণে হাসপাতালে না এনে উপায় ছিলো না।”

আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললাম, খানিকটা মর্মাহতও হলাম।

 “আমি কতোই না খারাপ মেয়ে, তাই না?” আমি জিজ্ঞেস করলাম ওকে।

“তোমার পা ভেঙেছে, বুকের পাঁজর ভেঙেছে চারটা, মাথার খুলিতে কিছু চিড় ধরেছে, চামড়ার অনেকখানি অংশে ঘষা লেগে ছুঁড়ে গেছে। সুতরাং এতোগুলো ক্ষতি শরীরের ওপর দিয়ে এক সাথে হওয়ার কারণে প্রচুর রক্তক্ষরণ ঘটেছে। ওরা তোমাকে কিছু ট্রান্সফিউশন দিয়েছে, আমার তা পছন্দ হয়নি। কিছু সময়ের জন্যে তোমার প্রকৃত গন্ধটাই ওরা নষ্ট করে ফেলেছে।”

“এ কারণে নিশ্চয়ই তোমার ভেতর একটা পরিবর্তন আসবে- একদিক থেকে ভালোই হয়েছে সবকিছু মিলে।”

“না, তোমার প্রকৃত গন্ধটা নিতেই আমি পছন্দ করি।”

“তুমি এই গন্ধ গ্রহণ করো কিভাবে?” শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলাম তাকে। নিশ্চয়ই ও জানে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আমি তাকে প্রশ্নটা করেছি।

“আমি ঠিক বলতে পারবো না। আমার বিস্মিত চোখের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বললো এ্যাডওয়ার্ড।

আমি চোখ বন্ধ করে খানিকক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকলাম।

আমার দিকে না তাকিয়েই ও দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললো। “এটা থামিয়ে রাখা…এটা থামিয়ে রাখা আমার পক্ষে এক অসম্ভব ব্যাপার,” ও ফিসফিস করে বললো। “অসম্ভব। কিন্তু আমাকে তা করতেই হচ্ছে।” অবশেষে মুচকি হেসে ও আমার দিকে তাকালো।

“আমি অবশ্যই তোমাকে ভালোবেসে যাবো।”

“গন্ধের মতো নিশ্চয়ই আমার স্বাদটাও তেমন একটা ভালো নয়?” স্লান হেসে আমি জবাব দিলাম।

“তোমার গন্ধের চাইতেও অনেক ভালো। এতোটাই ভালো যা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।”

“আমি দুঃখিত,” আমার মন্তব্যটা ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম।

এ্যাডওয়ার্ড খানিকক্ষণ সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে থাকলো। “সবকিছুর কি কৈফিয়ত দেয়া সম্ভব?”

“আমি আবার কখন কৈফিয়ত চাইতে গেলাম?”

 “তুমি নিজেকে চিরকালের জন্যে দূরে সরিয়ে নেবার চেষ্টা করেছিলে।”

“আমি দুঃখিত, আমি আবার কৈফিয়ত দেবার চেষ্টা করলাম।

“আমি জানি, কেন তুমি এটা করেছিলে।” ওর কণ্ঠস্বর বেশ শান্ত শোনাল। “অবশ্যই এটা আমার একটা ধারণা মাত্র। তুমি বলেছিলে, তুমি আমার জন্যে অপেক্ষা করবে।”

“তুমি নিশ্চয়ই আমাকে যেতে দিতে না!”

 “না,” ও আমাকে সমর্থন জানালো। “অবশ্যই আমি তোমাকে যেতে দিতাম না।”

হঠাৎ ও উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলো। “বেলা, কি হয়েছে তোমার?”

 “জেমসের কি হলো?”

“তোমার ওপর আক্রমণ প্রতিহত করার পর, ওকে এমেট এবং জেসপারের হাতে তুলে দিই। ওরাই ওর ব্যবস্থা করেছে।”

ওর কথা শুনে আমি খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। কারণ এমেট কিংবা জেসপার, কাউকেই আমি কাছাকাছি দেখতে পেলাম না।

“ওদের ওই রুমটা ছেড়ে চলে যেতে হয়…ওখানে অনেক রক্তপাত ঘটেছিলো।”

“কিন্তু তুমি থেকে গিয়েছিলে।”

“হা, আমি থেকে গিয়েছিলাম।”

 “কিন্তু এলিস এবং কার্লিসল…” আমি বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চাইলাম।

 “ওরাও যে তোমাকে ভালোবাসে, নিশ্চয়ই তুমি তা জানো।”

শেষ দৃশ্যটা আমার মনে হতে বেশ খারাপই লাগলো। এলিস আমাকে কিছু একটা স্মরণ করিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলো। “এলিস কি টেপটা দেখেছিলো?” উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে আমি তাকে প্রশ্ন করলাম।

“হ্যাঁ,” এ্যাডওয়ার্ডের কণ্ঠস্বর অন্যরকম শোনালো।

 “ও ওই সময় অন্ধকারের ভেতর ছিলো, সেই কারণেই কিছু মনে করতে পারছিলো না।”

“আমি জানি। এলিস এখন সবই বুঝতে পেরেছে।”

আমি ওর মুখটা স্পর্শ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোনো কিছু আমাকে থামিয়ে দিলো। আড়চোখে তাকিয়ে দেখতে পেলাম আমার হাতের সাথে আই.ভি আটকানো আছে।

“উঃহ্।” আমি যন্ত্রণায় ঝাঁকিয়ে উঠলাম।

“কি হলো তোমার?” উত্তষ্ঠিত হয়ে ও প্রশ্ন করলো আমাকে।

 “সুঁই,” হাতের দিকে ইশারা করে আমি ব্যাখ্যা করলাম।

“একটা সুঁইকে ভয় পাচ্ছে!” আপন মনে বিড়বিড় করলো এ্যাডওয়ার্ড। “ওহ, একটা স্যাডিস্ট ভ্যাম্পায়ার নির্যাতন করে মেরে ফেলতে পারে জেনেও যে তার কাছে ছুটে যায়, তার আবার সামান্য একটা সুঁইকে ভয়!”

আমি চোখ পাকালাম। ওর অভিব্যক্তি বুঝার চেষ্টা করলাম। আমি অন্য প্রসঙ্গে আসতে চাইলাম।

“তুমি এখানে বসে আছো কেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ও আমার অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। বুঝতে পারলাম, আমার কথায় ও বেশ মর্মাহত হয়েছে। “তুমি কি চাও, আমি এখান থেকে চলে যাই?”

“না!” আমি প্রতিবাদ জানালাম। “না, আমি ভাবছিলাম মা’র কথা। তিনি যদি মনে করেন, তুমি এখানে কেন? উনি ফিরে আসার আগেই একটা গল্প তেরি করতে হবে আমাকে।”

“ওহ্,” ও বললো, “আমি ফিনিক্স এসেছি তোমার সাথে কথা বলতে, কোনোভাবে আমি তোমাকে বুঝিয়ে ফরকস্-এ নিয়ে যেতে চাই।” ওর চোখ জোড়ায় এক ধরনের আত্নবিশ্বাস লক্ষ করলাম। ওর কথায় যুক্তি আছে। “তুমি আমার সাথে দেখা করতে রাজি হয়েছে, এবং কার্লিসল এবং এলিসের সাথে আমি যে হোটেলে উঠেছি, সেখানে তুমি দিন কয়েক বিশ্রাম নেবে- অবশ্যই আমরা বাবার সাথেই এখানে এসেছি। কিন্তু তুমি তার আগেই একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে। সুতরাং তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন। তুমি এখন সবকিছু ভালোভাবে মনেও করতে পারছো না…”

আমি খানিকক্ষণ চিন্তা করলাম এ্যাডওয়ার্ডের গল্পটা নিয়ে। “গল্পটা আমার কাছে খানিকটা দুর্বল বলে মনে হচ্ছে। যেমন ধরো তুমি কোনো ভাঙা জানালা দেখাতে পারবে না…”

“তা অবশ্য ঠিক। এলিস গল্পটাকে সমর্থন জানিয়ে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করবে। এ নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। উনি নিশ্চয়ই হোটেলের ভাঙা জানালা দেখতে যাবেন না!” ও আমাকে ভরসা দেবার চেষ্টা করলো। “ওসব চিন্তা বাদ দিয়ে এখন তোমার উচিত বিশ্রাম নেয়া।”

অবশ্য আমি আর এ নিয়ে মাথা ঘামানোর চেষ্টাও করলাম না।

“মার সামনে কিন্তু আমাকে লজ্জাতেই পড়তে হবে।” বিড়বিড় করে বললাম আমি।

ও আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো। “হুম, আমি খুব অবাক হচ্ছি…”

ও আমার ওপর ঝুঁকে এসে কপালের ওপর ওর ঠোঁট জোড়া স্পর্শ করলো। কিন্তু এরপরও বীপ-এর শব্দ আমার কানে জোড়ালোভাবে বাজতে লাগলো।

“আমি অনেক আগেই এ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করে রেখেছি।” ক্রু কুঁচকে মন্তব্য করলো এ্যাডওয়ার্ড।

“তোমাকে আমার চুমুটা কিন্তু দিয়ে ওঠা হয়নি,” অভিযোগের সুরে আমি বললাম। “আমাকে টেক্কা দেবার চেষ্টা করবে না তুমি।”

এ্যাডওয়ার্ড হালকাভাবে ওর ঠোঁট জোড়া আমার দিকে এগিয়ে আনতে গেল।

কিন্তু ওর আর চুমু খাওয়া হলো না।

“মনে হচ্ছে, তোমার মা আসছেন,” ও বললো।

“তুমি এখান থেকে কোথাও যাবে না,” এ্যাডওয়ার্ডকে আমি অনুরোধ জানালাম। এখন আমি রীতিমতো এক ধরনের আতংক অনুভব করছি।

আমার চোখের আতংক ও অনুধাবন করতে পারলো। আমি কোথাও যাচ্ছি না,” ও প্রতিজ্ঞা করলো, “আমি শুধু স্থান পরিবর্তন করবো।”

ও একটা শক্ত চেয়ারে গিয়ে বসলো।

এখন আমি মার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। তিনি কারও সাথে কথা বলতে বলতে আসছেন। মনে হলো কোনো নার্সের সাথেই তিনি কথা বলছেন।

দরজাটা খুলে গিয়েই সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেল। উনি সরাসরি আমার দিকে তাকালেন।

“মা!” আমি ফুঁপিয়ে উঠলাম। আমার কণ্ঠে ভালোবাসা এবং স্বস্তি একই সাথে ঝরে পড়লো।

উনি একবার এ্যাডওয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে বিছানার পাশে রাখা টি-টোড় এর ওপর বসে পড়লেন।

“ও বোধহয় এখান থেকে আর নড়বে না, নড়বে কি?” আপনমনে বিড়বিড় করলেন তিনি।

“মা, তোমাকে দেখে আমার খুবই ভালো লাগছে!”

উনি নিচু হয়ে আমাকে আদর করলেন।

 “বেলা, আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”

“আমি দুঃখিত মা। কিন্তু এখন সব ঠিক হয়ে গেছে, আমি মাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলাম।

“তোমাকে চোখ খুলতে দেখেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি।” উনি আমার বিছানার কোণায় গিয়ে বসলেন।

হঠাৎ মনে হলো ওই সময়কার কোনো কথাই আমার মনে নেই- কী হয়েছিলো এখন পর্যন্ত আমি কিছুই জানতে পারিনি। “চোখজোড়া আমার কতোক্ষণ বন্ধ হয়েছিলো?”

“শুক্রবার পর্যন্ত। তুমি বিকালে সামান্য একটু চোখের পাতা নাড়ালে।”

“শুক্রবার?” আমি একটু দুঃখ পেলাম। কিন্তু আমি আর কিছুই স্মরণ করতে চাইলাম না।

“মিষ্টি সোনা, তুমি খুব মারাত্বক আহত হয়েছিলে।”

“জানি, ওই কষ্ট এখনো আমি অনুভব করতে পারছি যেন।”

“তুমি খুবই ভাগ্যবান। ডাঃ কুলিনের মতো মানুষ ওখানে উপস্থিত ছিলেন। উনি আসলেই অতি চমৎকার মানুষ… যদিও বয়স তেমন বেশি নয়। ডাক্তারের চাইতে তাকে মডেল বলেই মনে হয়…”।

“কার্লিসলের সাথে তোমার পরিচয় হয়েছে?”

“এ্যাডওয়ার্ডের বোন এলিস ও খুব মিষ্টি মেয়ে।”

 “আসলেই ও খুব ভালো মেয়ে,” আমি তাকে সমর্থন জানালাম।

মা ঘাড় উঁচু করে এ্যাডওয়ার্ডের দিকে তাকালেন। “ফরকস এ যে তুমি এতো ভালো একজন বন্ধু পেয়েছে, তা কিন্তু আমাকে জানাওনি।”

আমি মুখ কুচকে যন্ত্রণাটা সহ্য করার চেষ্টা করলাম।

“কোথায় যন্ত্রণা হচ্ছে তোমার?” উৎকণ্ঠিত হয়ে মা প্রশ্ন করলেন।

“না ঠিক আছে, আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম। আমার যে একেবারেই নড়া নিষেধ, প্রতিবারই আমি তা ভুলে যাই। মা এ্যাডওয়ার্ডের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন।

সুযোগটাকে এবার আমি কাজে লাগানোর চেষ্টা করলাম। “ফিল কোথায়?” মা কে প্রশ্ন করলাম আমি।

“ফ্লোরিডাতেই আছে। বেলা, তুমি ধারণাই করতে পারবে না! যখন আমরা মাত্র ফিরে আসতে যাচ্ছি, ঠিক তখনই শুভ সংবাদটা!”

“ফিল নিশ্চয়ই কাজ পেয়েছেন?” অনুমান করেই বললাম কথাটা।

 “হ্যাঁ! তুমি ঠিকই ধারণা করেছো! সূর্যের আলো, তুমি বিশ্বাস করতে পারো?

 “এটা নিঃসন্দেহে বিরাট ব্যাপার মা!”

“জ্যাকসনভেইল তোমার কাছে সত্যিই খুব ভালো লাগবে। আমার নির্লিপ্ত চোখের প্রতি লক্ষ না করেই মা বলে যেতে লাগলেন। “এ্যাকরন নিয়ে যখন ফিল কথা বলতে শুরু করলো। আমি খানিকটা ভয় পেয়ে গেলাম। এ্যাকরনের বরফসহ সবকিছুই আমার অসহ্য লাগে। তুমি তো ভালোভাবেই জানো ঠাণ্ডা আমি কতোটা অপছন্দ করি! কিন্তু এখন আমরা থাকছি জ্যাকসনভেইলে! এখানে সূর্য সবসময় ঝকমক করে, তাছাড়া হিউমিডিটিও মোটেও খারাপ বলা যাবে না। আমরা দু’জন খুবই চমৎকার একটা জায়গা খুঁজে বের করেছি থাকার জন্যে। হলুদ এবং সাদার মিশেলে রঙ করা। সামনে একটা পোর্চ আছে- অনেকটা পুরাতন সিনেমায় যেমন দেখা যায়। বাড়ির চারদিক ঘিরে প্রচুর ওকগাছ। মিনিট কয়েক হাঁটলেই সমুদ্র। তাছাড়া তোমার জন্যে আলাদা

একটা বাথরুমও আছে”।

“দাঁড়াও, মা!” আমি মাঝপথে তার কথা থামিয়ে দিলাম। এ্যাডওয়ার্ড এখনো চোখ বন্ধ করেই আছে, কিন্তু মনে হয় না ও ঘুমিয়ে পড়েছে। “তুমি কি বলতে চাইছো? আমি কোনোভাবেই ফ্লোরিডায় যাচ্ছি না। আমি ফরসেই থাকবো।”

“কিন্তু তোমার এ ধরনের ছেলেমানুষীর তো কোনো কারণ দেখতে পাচ্ছি না, মা হেসে উঠলেন। “ফিলের এখন সবকিছু সামলে নেবার ক্ষমতা আছে। আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করেই তোমাকে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

“মা।” আমি ইতস্তত করে বললাম। “মা, আমি ফরকসেই থাকতে চাই। ওখানকার একটা স্কুলে ইতোমধ্যে আমি নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছি, এর মধ্যে আমার বেশ কিছু মেয়ে বন্ধুও তৈরি হয়েছে?”- বন্ধু কথাটা উচ্চারণ করার সাথে সাথে মা আড়চোখে আরেকবার এ্যাডওয়ার্ডকে দেখে নিলেন। সুতরাং কথার মোড় আমি অন্যদিকে ঘুরানোর চেষ্টা করলাম– “এবং চার্লি, আমাকে চার্লির খুবই প্রয়োজন। উনি ওখানে একেবারে একা পড়ে আছেন। এমনকি তিনি ভালোভাবে রান্না পর্যন্ত করতে পারেন না।”

“তুমি তাহলে ফরকস্ এ থাকতে চাচ্ছো?” মা জিজ্ঞেস করলেন। কণ্ঠের রাগ তিনি চাপা দিতে পারলেন না। এ্যাডওয়ার্ডের ওপর একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে এসে, আবার তিনি প্রশ্ন করলেন, “কেন?”

“আমি তো বললামই-স্কুল, চার্লি আউঃ!” আমি শ্রাগ করেছিলাম। বুঝতে পারলাম, শ্রাগ করার মতো সুস্থ এখনো হয়ে উঠতে পারিনি।

অসহায়ের মতো একটা হাত তিনি আমার হাতের ওপর রাখলেন।

“বেলা, মিষ্টি সোনা আমার, তুমি ফরককে ঘৃণা করো,” উনি আমাকে স্মরণ করিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন।

“এখন আমার কাছে নজরটা খারাপ লাগছে না।”

তিনি আবার ভ্রু কুঁচকে, একবার এ্যাডওয়ার্ড এবং আরেকবার আমাকে দেখে নিলেন।

“এই ছেলেটাই কি?” ফিসফিস করে বললেন তিনি।

আমি মিথ্যে বলার জন্যে মুখ খুলছিলাম, কিন্তু মিথ্যে বলতে পারলাম না।

“ও একটা কারণ মাত্র,” আমি স্বীকার করে নিলাম। কতো বড়ো কারণ, তার ব্যাখ্যা দেবার প্রয়োজন বোধ করলাম না।” তোমার কি এ্যাডওয়ার্ডের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে?”

“হ্যাঁ,” খানিকটা ইতস্তত করে এ্যাডওয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে মা উত্তর দিলেন।” আমার মনে হয় ওই ছেলেটা তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছে।”

“আমারও তাই ধারণা মা।”

“ওকে তোমার কেমন ছেলে বলে মনে হয়?” মৃদু কণ্ঠে তিনি জানতে চাইলেন।

আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে অন্য দিকে তাকালাম। “বলতে পারো, আমি অনেকটা পাগলের মতো ভালোবাসি ওকে…”

“ভালো কথা, আমার মনে হয় ছেলেটা বেশ ভালোই, চমৎকার আচরণ, দেখতেও সুন্দর, কিন্তু বেলা তুমি এখনো অনেক ছোটো…” তার কণ্ঠে অনিশ্চয়তার ভাব ফুটে উঠলো।

“আমি জানি মা, ও নিয়ে তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমাদের সম্পর্ক কেবল শুরু হয়েছে মাত্র।” আমি তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলাম।

“তাহলে ঠিক আছে, আমাকে সমর্থন জানালেন মা।

এরপর মা ঘাড় উঁচু করে দেয়ালে ঝুলানো বড় ঘড়িটার দিকে তাকালেন।

“তোমার কি এখন যাওয়া প্রয়োজন মা?”

উনি একবার ঠোঁট কামড়ে ধরলেন। “ফিল বোধহয় খানিকক্ষণের ভেতরই ফোন করবে… আমি জানতাম না এরই ভেতর তোমার ঘুম ভেঙ্গে যাবে…”

“কোনো সমস্যা নেই মা, তুমি যেতে পারো, তাকে আশ্বস্ত করে বললাম আমি। “আমি একাই থাকতে পারবো।”

“আমি অবশ্য খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসছি। এসে, এখানেই ঘুমানোর একটা ব্যবস্থা করে নিতে পারবো।”

“আরে না মা, তোমাকে ওসব কিছুই করতে হবে না। তুমি বাড়িতেই ঘুমাবে।”

“আমার বেশ ভয় লাগছে, অনেকটা কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে বললেন মা। “বাড়ির আশপাশে ইদানিং অপরাধ খুব বেড়ে গেছে। এখানে একা থাকতেও আমার ভয় লাগে।”

“অপরাধ?” সতর্ক কণ্ঠে আমি প্রশ্ন করলাম।

“কেউ একজন ওই ভাস স্টুডিও ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করেছিলো। ওই যে আমাদের কোণায় যে স্টুডিওটা ছিলো না, সেটাতে। কে-যেন ওটাতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে ওখানকার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই, একেবারে পুড়ে সব ছাই হয়ে গেছে। ওটার সামনে থেকে অপরাধীরা একটা গাড়ি চুরি করে নিয়ে গেছে। ওখানে যে তুমি নাচতে যেতে, সেই স্মৃতি তোমার মনে আছে মিষ্টি কোণা?”

“হ্যাঁ মা, ঠিকই মনে আছে।” উত্তরটা দিলেও ভয়ে আমার মুখ শুকিয়ে এলো।

“তুমি বললে আমি এখানে থেকে যাই।”

“কোনো দরকার নেই মা। আমি ভালোই থাকবো। এ্যাডওয়ার্ডও এখানে থাকতে পারে।”

“আমি রাতে তাহলে ফিরে আসছি।” আমি মার কথার ভেতর আমাকে সতর্ক করে দেবার একটা চেষ্টা লক্ষ করলাম।

“আমি তোমাকে ভালোবাসি মা।”

“বেলা আমিও তোমাকে খুবই ভালোবাসি। সাবধানে চলাফেরার চেষ্টা করবে। আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”

এ্যাডওয়ার্ডের চোখ এখনো বন্ধ হয়েই আছে।

একজন নার্স এসে আমার সমস্ত টিউব পরীক্ষা করতে লাগলো। মা আমার কপালে একবার চুমু খেলেন। হাতের তালুর ওপর আলতোভাবে চাপ দিলেন।

হার্ট মনিটর থেকে বেরুনো চার্ট-পেপারটা বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখলেন।

“মিষ্টি সোনা, তুমি কি কোনো কারণে উত্তেজিত হয়ে আছো? এখানে তোমার হার্ট-রেট খানিকটা বেশি দেখাচ্ছে।”

“আমি ভালোই আছি,” নাসর্কে আমি আশ্বস্ত করলাম।

“তুমি ঘুম থেকে উঠলে রেসিডেন্স নার্সকে ডেকে দিবো। উনি তোমাকে একটু পরীক্ষা করে যাবেন।”

উনি বেরিয়ে যেতেই এ্যাডওয়ার্ড আমার বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো।

 “তুমি একটা গাড়ি চুরি করেছো?” ভ্রু কুঁচকে এ্যাডওয়ার্ডকে প্রশ্ন করলাম।

 আমার প্রশ্ন শুনে ও হাসলো। “ওই গাড়িটা খুবই ভালো। খুব জোরে চলে।”

“তোমার তন্দ্রা কেমন হলো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“বেশ মজার।” চোখ কুঁচকে ও উত্তর দিলো।

এরই ভেতর আরেকজন নার্স প্রবেশ করলেন আমার রুমে। হার্ট মনিটরের দিকে। তাকিয়ে দেখে নিলেন সবকিছুই ঠিক মতো আছে কিনা।

“ব্যথা বাড়লে অবশ্যই জানাবে মিষ্টি সোনা,” নার্স বললেন, “তাহলে আরেকটা আই ভি দিতে হবে তোমাকে।”

“না, না, আমি তীব্র প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করলাম। “আমার কিছুরই প্রয়োজন নাই। এখনই আমি মোটেও চোখ বন্ধ করতে চাইছি না।”

“সোনা, এতোটা সাহস দেখানো ভালো না। মনের ওপর কোনো চাপ, মোটেও তোমার জন্যে সুখকর হবে না। এটা তোমাকে বুঝতে হবে। তোমার এখন পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন।” মহিলা খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলেন। আমি কিছুই বলতে পারলাম না, শুধু একটু মাথা নাড়লাম।

“ঠিক আছে, দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম। “আপনারা প্রস্তুত হলে আমাকে জানাবেন।”

নার্স মহিলা এ্যাডওয়ার্ডের দিকে একবার বাঁকা চোখে তাকালেন। তারপর উত্তষ্ঠিত চোখে যন্ত্রপাতিগুলো দেখে নিলেন।

“তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।” মহিলা বেরিয়ে যেতেই এ্যাডওয়ার্ডকে অনুরোধ জানালাম আমি।

“আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না,” এ্যাডওয়ার্ড প্রতিজ্ঞা করে বললো।

আমার দু’গালের ওপর ও তার ঠাণ্ডা হাত দিয়ে স্পর্শ করলো।

“এখনো ভালো লাগছে?” ও প্রশ্ন করলো আমাকে।

“হ্যাঁ,” সংক্ষিপ্ত জবাব দিলাম আমি।

 ও মাথা নেড়ে চিড়বিড় করে কিছু একটা বললো।

আমি জানি যে, আমার শান্ত থাকা উচিত, কিন্তু নিজেকে আমি মোটেও শান্ত রাখতে পারছি না।

“তুমি প্রতিজ্ঞা করো,” আমি ফিসফিস করে বললাম।

 “কি?”

“তুমি ভালোভাবেই তা জানো।” আমি ক্রমশই ওর ওপর রেগে উঠছি। সরাসরি ও আমার কাছে কোনো প্রতিজ্ঞা করতে চাইছে না। আমাকে ছেড়ে ও কখনোই যাবে না, একবারো সে জোর দিয়ে বলেনি।

“আমি তোমাকে খোলামেলাভাবে একটা কথা জানাতে চাই যে, আজ পর্যন্ত কারও সাথে কোনো সম্পর্কের অভিজ্ঞতা হয়নি আমার, আমি বললাম। “তবে, এটা কিন্তু একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার… একজন ছেলে এবং একজন মেয়ের কোনো না কোনোভাবে সম্পর্ক হতেই পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে একজনই শুধু আরেকজনকে রক্ষা করার জন্যে ছুটে আসবে। আমার মনে হয়, উভয় উভয়কে রক্ষা করাটাই নিয়ম হওয়া উচিত। তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছো। নয়তো এতোক্ষণে আমাকে ফরকস্ এর কবরস্থানে চির নিদ্রায় শায়িত থাকতে হতো।”

এ্যাডওয়ার্ড ওর বাহু ভাঁজ করে আমার বিছানার ওপর রাখলো। তারপর চিবুকটা ওই বাহুর ওপর স্থাপন করলো। ওর অভিব্যক্তি একেবারে স্বাভাবিক। এখন দেখে মনে হলো না ও আমার ওপর রেগে আছে।

“তুমি আমাকে রক্ষা করেছো,” শান্ত কণ্ঠে বললো এ্যাডওয়ার্ড।

“আমি সবসময় লইস লেইন হতে পারবো না, আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম। “আমি সুপারম্যান পছন্দ করি।”

“আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, তুমি কী নিয়ে কথা বলছো।” ওর কণ্ঠ শান্ত কোণালো।

“আমার মনে হয় আমি পারবো।”

“বেলা তুমি জানো না। এটা নিয়ে আমি প্রায় নব্বই বছর চিন্তা করেছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারিনি।”

“তোমার কি মনে হয় না, কার্লিসলই তোমার জীবন রক্ষা করেছেন?”

“না, তেমন চিন্তা করার ইচ্ছে নেই আমার।” কথা বলতে বলতে এ্যাডওয়ার্ড একটু থামলো। কিন্তু আমার জীবনের অনেকটাই পার করে দিয়েছি। আমি এর ভেতর তেমন কিছুই করতে পারিনি।

“তুমি আমার জীবন বেলা। তুমিই আমার কাছে একমাত্র মহার্ঘ বস্তু যা হারাতে আমি ভয় পাই।” কথাটা শুনে এই মুহূর্তে আমার বেশ ভালো লাগলো।

যদিও তাকে দেখে অত্যন্ত শান্ত মনে হলো। অন্তত আমার কাছে তেমনই মনে হলো।

“আমি এটা করতে পারবো না বেলা। আমার পক্ষে তোমার সাথে এটা করা সম্ভব নয়।

“কেন নয়?” বেশ জোর দিয়েই আমি কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কথাটা তেমন জোরালোভাবে বেরলো না। “তুমি বলতে যেও না কাজটা খুবই কঠিন! আজকের পর অথবা আমার ধারণায় দিন কয়েক আগে… যাইহোক, তারপরও হতে পারে, এটা কোনো ব্যাপারই ছিলো না।”

ও আমার দিকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকালো।

“কিন্তু ব্যথা?” ও আমাকে প্রশ্ন করলো।

আমার মুখটা সাদা হয়ে গেল। এ বিষয়ে আমার পক্ষে কোনো সাহায্য করা সম্ভব নয়। কিন্তু আসল অভিব্যক্তি কোনোভাবেই প্রকাশ করতে দেয়া যাবে না। অনুভূতিটা যে মিষ্টি-মধুর এবং স্মরণে রাখার মতো… সেভাবেই প্রকাশ করতে হবে সবকিছু। আমার শরীরের শিরাগুলোর ভেতর দিয়ে এখন আমার আগুন জ্বলে যাচ্ছে।

“সেটা আমার সমস্যা,” আমি বললাম। “আমি ঠিকই এটা সামলে নিতে পারবো।”

“চার্লি?” এ্যাডওয়ার্ড শান্ত কণ্ঠে জানতে চাইলো। “রেনে?”

মিনিট খানিক পার হয়ে গেল, আমি তার উত্তর দিতে পারলাম না। উত্তরটা দেবার জন্য মুখ খুললাম, কিন্তু সেখান থেকে কোনো শব্দ বেরুলো না।

“দেখো, এটাকে কোনো সমস্যা বলে ধরা উচিত নয়, বিড়বিড় করে অবশেষে আমি উত্তর দিতে পারলাম। “রেনে সবসময় তার নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করতে চেয়েছেন। তাছাড়া তার ইচ্ছেগুলো জোর করে আমার ওপর আরোপ করারও চেষ্টা করেছেন। চার্লি নিরপেক্ষ একজন মানুষ। অন্যের ইচ্ছের ওপর কখনো তিনি হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেননি। সারাজীবন আমি তাদের দায়িত্ব নিতে পারবো না। সুতরাং আমার জীবন আমার কাছেই।

“তুমি ঠিক কথাই বলেছো, ও তীক্ষ্ণ কণ্ঠে উঠলো। “এবং সে কারণেই আমি তা শেষ হয়ে যেতে দেবো না।”

গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে আমি শান্ত করার চেষ্টা করলাম।

“তুমি ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠছে,” এ্যাডওয়ার্ড বললো, “দিন কয়েকের ভেতর তুমি এখান থেকে চলে যাবে। খুব জোর দুই সপ্তাহ।”

“আমি ওর দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালাম। এখন আমি মরতে চাই না ঠিকই.. কিন্তু একদিন আমাকে মরতেই হবে। দিনের প্রতিটা মিনিটে চলে যাওয়া মানে আমার আয়ু কমে আসা।”

এ্যাওয়ার্ড একবার ভ্রু কুঁচকে চোখ বন্ধ করলো। “তুমি তা কিভাবে মনে করছো? সেটা কিভাবেই বা ঘটবে যদি আমি তোমাকে না যেতে দিই এবং অবশ্যই আমি তোমাকে যেতে দিচ্ছি না।”

আমি ফুঁপিয়ে উঠলাম। চোখ খুলে ও অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। “এটা লটারি জেতার মতো একটা ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে।”

“আমাকে লটারির পুরস্কার হিসেবে ধরে নেবার কিছু নেই,” ও অভিযোগ জানালো।

“হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো। তুমি লটারির পুরস্কারের চাইতে অনেক বেশি দুলর্ভ।”

“বেলা এগুলো নিয়ে এখন আলোচনা না করলেও চলবে। সমস্ত রাতটাই তোমার জন্যে পড়ে আছে। আর রাত পার হলেই তুমি সব ভুলে যাবে।”

“তুমি যদি এমন মনে করো,” আমি বললাম, “যদি এমন মনে করো, তাহলে বলতে হয়, তুমি আমাকে এক বিন্দুও চিনতে পারোনি। মনে রেখো, এই পৃথিবীর তুমিই একমাত্র ভ্যাম্পায়ার নও।”

এ্যাডওয়ার্ড আবার চোখ বন্ধ করলো।

“এলিস ইতোমধ্যে অনেক কিছু দেখে নিয়েছে, তাই নয় কি?” অনুমানের ওপর নির্ভর করে প্রশ্ন করলাম আমি। “ওর বলা কথাগুলোই তোমাকে চিন্তিত করে তুলেছে। ও জানে যে, আমি তোমাকে ভালোবাসি… একদিন।”

“ও ভুল বলেছে,” এ্যাডওয়ার্ড প্রতিবাদ জানালো, “ও দেখেছে, তোমার একদিন মৃত্যু ঘটবে। যদিও তেমন কিছু আমি ঘটতে দিবো না।”

“তুমি কখনোই আমাকে এলিসের সাথে তুলনা করবে না, প্রতিবাদ জানালাম আমি।

বেশ খানিকক্ষণ আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

“তো আমাদের এখন গন্তব্য কোথায়?” একটু অবাক কণ্ঠে আমি জানতে চাইলাম।

“মনে হয় কোনো কানাগলিতে,” ঠাট্টা করে বললো এ্যাডওয়ার্ড।

আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম। “আউঃ!” বিড়বিড় করে শব্দটা উচ্চারণ করতে বাধ্য হলাম আমি।

“তুমি এখন কেমন বোধ করছো? নার্সকে ডাকার বাটনটার ওপর চোখ রেখে প্রশ্ন করলো ও।

“আমি ভালো আছি,” মিথ্যে বলতে বাধ্য হলাম আমি।

“তোমার কথা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না,” শান্ত কণ্ঠে বললো এ্যাডওয়ার্ড।

 “আমি এখন মোটেও ঘুমোতে চাইছি না।”

“তোমার এখন বিশ্রাম নেয়া প্রয়োজন। এতোসব তর্কবিতর্ক করার সময় নয় এখন। তোমার শরীরের অবস্থা মোটেও ভালো নয়।”

“তাহলে কথা দাও,” আমি ওকে স্মরণ করিয়ে দিলাম।

“বেশ মজা পেয়েছে না? ফন্দি করে আমার কাছ থেকে কথা আদায়ের চেষ্টা হচ্ছে?” বাটনটা টেপার জন্যে হাত বাড়ালো।

“না!”

কিন্তু এ্যাডওয়ার্ড আমার অনুরোধে মোটেও পাত্তা দিলো না।

“হ্যাঁ?” দেয়ালে লাগানো স্পীকার বেজে উঠলো।

“আমার মনে হয় রোগীর ভালো ব্যথানাশক ওষুধের প্রয়োজন,” শান্ত কণ্ঠে বললো ও। আমার উৎকণ্ঠিত মুখের দিকে ও একবারো ফিরে তাকালো না।

“আমি একজন নার্সকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।” স্পীকারে ভেসে ওঠা কণ্ঠস্বর গম্ভীর কোণালো।

“আমি কোনো মতেই ওষুধ দিতে দিবো না,” প্রতিজ্ঞা করার সুরে বললাম আমি।

“আমার মনে হয় না তোমাকে ওরা বিস্বাদ কিছু গিলতে বলবে।”

আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। আমার চোখের আতংকও ও লক্ষ করলোলা, হতাশ হয়ে এ্যাডওয়ার্ড দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।

“বেলা, তোমার শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। সুস্থ হয়ে ওঠার জন্যে তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন। তুমি এতো অদ্ভুত চরিত্রের কেন? ওরা নিশ্চয়ই তোমার শরীরে নতুনভাবে সুঁই ফুটাতে যাচ্ছে না।”

“সুঁই ফুটানো নিয়ে আমার কোনো ভয় নেই।” আমি প্রতিবাদ জানালাম। “আমার চোখ বন্ধ হওয়া নিয়েই আমার যতো ভয়।”

এ্যাডওয়ার্ড আমার কথা শুনে হেসে ফেললো। ওর শীতল দুই তালু আমার দুই গালের ওপর স্থাপন করলো। “তোমাকে বলেছিই যে, তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না। তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই; তোমার যতোক্ষণ ভালো লাগবে, আমি এখানেই থাকবো।”

আমি হাসিটা তাকে ফিরিয়ে দিলাম। “তুমি কিন্তু চিরকালের জন্যে এই অঙ্গিকার করছো, মোটেও তা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবে না।”

“ওহ্, তুমি খুব বেশি বাড়াবাড়ি করছে।”

আমি অবিশ্বাস নিয়ে মাথা নাড়লাম বিষয়টা আমাকে খুব হতাশ করেছে।” রেনে যখন ওই কথাটা বললেন, আমার পক্ষে তা হজম করা বেশ কষ্টকর হয়েছিলো। আমার চাইতে তোমারই তা বেশি খারাপ লাগার কথা।”

“মানুষের আসলে এগুলোই সুন্দর দিক,’ ও আমাকে বললো। “তবে মানুষ সবকিছু একইভাবে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে না।”

আমি চোখ কুঁচকে ওর দিকে তাকালাম। “তোমার যা মন্তব্য করার করে ফেলতে পারো। নিজের ভেতর ওগুলো চেপে রাখার কোনো অর্থ নেই।”

আমার কথা শুনে এ্যাডওয়ার্ড হেসে উঠলো, আর তখনই আমার রুমে নার্স প্রবেশ করলেন।

নার্স আড়াচোখে ওর দিকে তাকাতেই ও ছোটো ঘরটাতে গিয়ে দু’হাত ভাঁজ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো।

“এখনই তুমি ঘুমিয়ে পড়বে মিষ্টি সোনা।” মিষ্টি করে হেসে টিউবের ভেতর ওষুধটা ইনজেক্ট করতে করতে মন্তব্য করলেন নার্স। “এখন তোমার বেশ ভালো লাগবে।”

“ধন্যবাদ।” অনিশ্চিতভাবে বিড়বিড় করে নার্সকে আমি সমর্থন জানালাম।

ওই সময়ই নিশ্চয়ই নার্স চলে গিয়েছিলেন, নয়তো ঠাণ্ডা হাতের কোমল স্পর্শ আমি অনুভব করতাম না।

“আছো তাহলে! থাকো।” স্লান কণ্ঠে বললাম আমি।

“আমি থাকবো।” ও প্রতিজ্ঞা করলো। “বলেছি-ই তো যতোক্ষণ তোমার ভালো লাগবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করবো তোমার জন্যে।”

আমি মাথা নেড়ে ওকে সমর্থন জানানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওটা আমার কাছে খুব ভারি বলে মনে হলো। “কিন্তু সেটা একই রকম কথা হলো না।” আমি বিড়বিড় করে বললাম।

ও হেসে উঠলো। “ওটা নিয়ে তুমি এখন আর আমার সাথে তর্ক করবে না। ঘুম ভেঙ্গে অনেক তর্ক করার সুযোগ পাবে তুমি।”

আমার কানের কাছে ওর ঠোঁটের স্পর্শ অনুভব করলাম।

 “আমি ভালোবাসি তোমাকে।” ও ফিসফিস করে বললো।

 “আমি তা ভালোভাবেই জানি,” শান্তভাবে ও হাসলো।

আমি মাথাটা সামান্য একটু ঘুরানোর চেষ্টা করলাম… ওকে খোঁজার চেষ্টা করলাম। ও জানে এরপর আমি কী করতে চাই। ওর ঠোঁট আমার ঠোঁটের ওপর আলতোভাবে স্পর্শ করলো।

“ধন্যবাদ,” আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম।

“যেকোনো সময়।”

.

উপসংহার

খুব সাবধানে এ্যাডওয়ার্ড আমাকে গাড়িতে তুললো, যেন আমি সিল্ক কিংবা শিফনের কোনো কাপড়। গাড়ি পর্যন্ত সামান্য পথটুকুতে ও ফুল ছড়িয়ে দিয়েছে। আমি একটু রেগেই ছিলাম ওর কাণ্ড দেখে, কিন্তু এ্যাডওয়ার্ড সম্পূর্ণভাবে তা উপেক্ষা করলো।

গাড়ির পেছন সিটে আমাকে বসিয়ে দিয়ে ও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো। এরপর ও দীর্ঘ সরু রাস্তায় গাড়িটা বের করে আনলো।

 “এখন তোমাকে বলতে হবে কী ঘটতে যাচ্ছে?” আমি ওকে শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম। আমি সবকিছু দেখে যে খুব অবাক হয়েছি, ও তা বুঝতে পারছে।

“আমার অবাক লাগছে, এখনো তুমি কিছুই বুঝতে পারছে না। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ও হালকাভাবে একটু হাসলো।

 “তুমি যে দেখতে খুবই সুন্দর, অবশ্যই আমি তা এর আগে অনেকবার উল্লেখ করেছি, তাই নয় কি?” আমি সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্যে তার কাছ থেকে আরেক বার প্রশ্নটা করলাম।

 “হ্যাঁ।” ও আবার দাঁত বের করে হাসলো। আমি তাকে কালো পোশাকে এর আগে কখনো দেখিনি। সাদা চামড়ার সাথে এই পোশাক চমৎকারভাবে মানিয়ে গেছে।

হঠাৎ টেলিফোন বেজে ওঠায় আমার চিন্তার জাল ছিন্ন হয়ে গেল। জ্যাকেটের পকেট থেকে এডওয়ার্ড তার সেল ফোনটা বের করলো। কলার আই, ডি’র দিকে এক নজর তাকিয়ে জবার দিলো।

“হ্যালো, চার্লি বলছেন?” শান্ত কণ্ঠে কথাটা বললো এ্যাডওয়ার্ড।

“চার্লি?” আমি ভ্রু কুঁচকালাম।

চার্লি নিশ্চয়ই আমার ফরকস্-এ ফিরে যাওয়ার কথা শুনে উৎফুল্ল হয়ে আছেন।

চার্লি নিশ্চয়ই কিছু একটা বলেছেন, যার কারণে এ্যাডওয়ার্ডের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে উঠেছে।

“আপনারা নিশ্চয়ই ছেলেমানুষী করছেন!” এ্যাডওয়ার্ড হাসতে হাসতে বললো।

“কি হয়েছে?” আমি জানতে চাইলাম।

ও আমার প্রশ্নের কোনো জবাব দিলো না “কেন তুমি চার্লির সাথে কথা বলার সময় বিরক্ত করছো?” এক ধরনের স্বস্তি নিয়ে ও রাগ করলো। ও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলো।

“হ্যালো টাইলার? আমি এ্যাওয়ার্ড কুলিন বলছি।” ওর কণ্ঠস্বর বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না টাইলার আমাদের বাড়িতে কি করছে? “আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত, এখানে একটু আমাদের ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে, কিন্তু বেলাকে আজ রাতে তোমরা পাচ্ছো না।” এ্যাডওয়ার্ডের কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। তার কণ্ঠে এখন এক পাষানের সুর।” তেমনভাবে বলতে গেলে, আমাদের ব্যাপার নিয়ে কেউ যদি নাক গলাতে আসে, তাহলে ও আর কোনো রাতেই ওখানে উপস্থিত হবে না। কিছু মনে করো না। তোমার বিকেলটা পন্ড হওয়ার জন্যে আমি আন্তরিক দুঃখিত।” অবশ্য ওর কণ্ঠে কোনো রকম দুঃখ প্রকাশ হতে দেখলাম না।

রাগে আমার মুখ এবং গলা জ্বলতে লাগলো। আমার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে নামতে লাগলো।

অবাক দৃষ্টিতে ও আমার দিকে তাকালো। “শেষ কথাটা কি আমার খুব বেশি বলা হয়ে গেছে? আমি তোমাকে খাটো করার উদ্দেশ্য নিয়ে আসলে কিছু বলিনি।”

আমি ওর কথাটায় মোটেও পাত্তা দিলাম না।

এখন আসলেই বিষয়টা ব্রিত্তকর হয়ে উঠেছে। এ্যাডওয়ার্ডের সাথে আমাকে নিয়ে স্কুলে এখন সব মুখরোচক গল্প রচনা শুরু হবে। আমার মনে হয় বিষয়টা এ্যাডওয়ার্ড একবারো চিন্তা করে দেখেনি।

“সবকিছুকে এতোটা জটিল মনে করো না বেলা,” ও অভয় দিলো আমাকে। আমি জানালা পথে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম।

“তুমি এই কাজটা কেন করতে গেলে এ্যাডওয়ার্ড?” ভীত কণ্ঠে আমি তাকে প্রশ্ন করলাম।

“বিশ্বাস করো বেলা, তুমি যেমন চিন্তা করছো, সেরকমই কি আমরা কিছু করছি?”

এলিস দীর্ঘ সময় ব্যয় করে আজ আমাকে বিউটি কুঈন বানানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমার কাছে এখন এগুলোর কিছুই ভালো লাগছে না।

আমি ধারণা করলাম আমার সম্মানে নিশ্চয়ই কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু এখন তা আমার কাছে একেবারে মূল্যহীন।

রাগের কারণে গড়িয়ে নামা চোখের পানিতে আমার গাল ভিজে যাচ্ছে। মনে পড়লো আজ আমি চোখে মাসকারা ব্যবহার করেছি। আমি দ্রুত চোখের নিচটা মুছে নিলাম। নয়তো সবার সামনে আর কিছুই লুকানো সম্ভব হবে না। চোখ নিচটা মোছর সময় বুঝতে পারলাম এলিস আজ ওয়াটার প্রুফ মেক-আপ ব্যবহার করেছে। ও হয়তো আগে থেকে কিছু একটা ধারণা করতে পেরেছিলো।

“এটা আমি ঠাট্টা করেছি। এতে তোমার কান্নার কি হলো?” হতাশ কণ্ঠে ও প্রশ্ন করলো আমাকে।

“কারণ আমি পাগল!”

“বেলা!” চোখ বড়ো বড়ো করে ও আমার দিকে তাকালো।

“কি?” ম্লান কণ্ঠে প্রশ্ন করলাম আমি।

 “আমাকে একটু মজাও করতে দেবে না?”

“ভালো কথা, মজা কারো, কে নিষেধ করেছে?” একই রকম ম্লান কণ্ঠে আমি কথাগুলো বললাম। “আমি কিছুই আর বলবো না। কিন্তু দেখবে ঠিকই আমার একটা না একটা ভাগ্য বিপর্যয় ঘটবে। হয়তো দেখবে আমার আরেক পা ভেঙ্গে বসে আছি। এই জুতাটার দিকে তাকিয়ে দেখো! এটা একটা মৃত্যু ফাঁদ!” আমার ভালো পাটার প্রতি ঈঙ্গিত করে কথাগুলো বললাম ওকে।

“হুমম্।” যতোটা সময়ের প্রয়োজন তার চাইতে অধিক সময় ব্যয় করে আমার পা’টা দেখার চেষ্টা করলো ও। “তোমাকে একটা তথ্য জানানোর জন্য আমাকে ধন্যবাদ জানানো উচিত। এলিস আজ রাতে উপস্থিত থাকছে।”

“এলিস আজ ওখানে যেতে পারে?” আমি খানিকটা স্বস্তিবোধ করলাম কথাটা শুনে।

“জেসপার, এমেট… এবং রোজালেও উপস্থিত থাকছে, ও আমাকে নতুন তথ্যটা জানালো।

যতোটুকু স্বস্তি অনুভব করেছিলাম, মুহূর্তে তা মন থেকে মুছে গেল। রোজালে উপস্থিত থাকলে, মনে হয় না ওর সামনে আমি খুব একটা স্বাভাবিক হতে পারবো। এমেটকে নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমাকে পেলে ও খুশিই হবে।

 “চার্লিও উপস্থিত থাকছেন নাকি এতে?” কৌতূহল দমাতে না পেরে প্রশ্ন করলাম আমি।

“অবশ্যই।” দাঁত বের করে হাসলো ও, যদিও টাইলার উপস্থিত থাকছে না আজ।”

আমি দাঁতে দাঁত চাপলাম। টাইলার এতোবড়ো প্রবঞ্চক কীভাবে হতে পারলো!

আমরা স্কুলে এসে উপস্থিতও হলাম। পার্কিং লটে দেখতে পেলাম রোজালের লাল কনর্ভাটিবলটা দাঁড়িয়ে আছে। আকাশে আজ হালকা মেঘ জমে আছে। পশ্চিম দিক থেকে ওই হালকা মেঘের ফাঁক থেকে মাঝে মাঝে সূর্যের আলো উঁকি মারছে।

এডওয়ার্ড গাড়ি থেকে নেমে আমার দরজা খুলে ধরলো এবং আমাকে নামতে সাহায্য করতে হাত বাড়িয়ে দিলো।

আমি চুপচাপ বসে থাকলাম। হাত ভাঁজ করে রাখার কারণে ওর হাত বাড়িয়ে দিয়েও কোনো লাভ হলো না। রঙ বেরঙের আনুষ্ঠানিক পোশাক পরিহত অসংখ্য মানুষ চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওরা এই দৃশ্যের স্বাক্ষী হয়ে থাকুক, আমি তা মোটেও চাইলাম না।

এ্যাডওয়ার্ড দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। “যখন তোমাকে কেউ হত্যা করতে চায়, তুমি সিংহের মতো সাহসী হয়ে ওঠো… এবং যখন কেউ তোমাকে নাচার আহ্বান জানায়…” ও তার মাথা নাড়লো।

“আমি ঢোক গিলোম। নাচ!”

“বেলা, তোমাকে দুঃখ দেবার জন্যে আমি কিছু করিনি। ঠিক আছে, এখন তোমাকে নামতেও অনুরোধ করবো না।”

ওর কথা শুনে আমার একটু ভালো লাগলো। বোধহয় ও আমার মুখ দেখে কিছু বুঝতে পারলো।

“তাহলে এখন,” ও শান্ত কণ্ঠে বললো। “নিশ্চয়ই তোমার আগের মতো খারাপ লাগছে।” আবার ও হাতটা বাড়িয়ে ধরলো।

ফিনিক্স হোটেলের বলরুমে সবাই জমায়েত হয়েছে। ওই নাচ জিম-ও হতে পারতো। কিন্তু এটাই সম্ভবত শহরের একমাত্র সবচেয়ে বড়ো রুম, যেখানে একসাথে এতোগুলো মানুষ একসাথে নাচতে পারে। যখন আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম, আমি অবাক হয়ে গেলাম। বেলুন, রঙিন কাগজ ইত্যাদি দিয়ে অদ্ভুত সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে বলরুমটাকে।

“আমার কাছে এটাকে হরর মুভির মতো মনে হচ্ছে, এখনই ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটতে শুরু করবে” আমি শিউরে উঠলাম।

“ভালো” টিকেট টেবিলের দিকে এগুতে এগুতে ও বিড়বিড় করলো–” এখানে মনে হয় আজ প্রচুর ভ্যাম্পায়ারের উপস্থিতি ঘটেছে।

আমি ডান্স ফ্লোরটার দিকে তাকালাম। মাঝখানে ডান্সফ্লোরের চারদিকে ঘিরে বেশ খানিকটা খালি অংশ। একজোড়া নৃত্য শিল্পী নাচার সময় ফ্লোরের ওপর আর সবাই খালি অংশটুকুতে ইচ্ছে করলে অপেক্ষা করতে পারবে।

এমেট এবং জেসপার তাদের ক্লাসিক নৃত্যের পারদর্শীতা দেখালো। এলিসকে আজ কালো সার্টিনের পোশাকে চমৎকার দেখাচ্ছে।

“আমি কিন্তু আজ সারারাত নাচার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি!” ও আমাকে সাবধান করে দেবার চেষ্টা করলো।

“এ্যাডওয়ার্ড,” আমার গলা শুকিয়ে এলো।” সত্যি করে বলছি, আমি কিন্তু মোটেও নাচতে জানি না।”

“ভয় পাওয়ার কিছু নেই,” ও ফিসফিস করে বললো। “আমি নাচতে পারি।”

 “মনে হচ্ছে, আমার বয়স বুঝি পাঁচ,” আমি হাসতে হাসতে বললাম।

“তোমাকে দেখে মোটেও পাঁচ বছরের শিশুর মতো মনে হচ্ছে না,” ও বিড়বিড় করে বললো। কয়েক সেকেন্ড ও আমাকে ওর বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখলো।

এলিসের চোখে চোখ পড়ে গেল আমার। ও আমাকে দেখে একটু হাসলো। মনে হলো এলিস আমাকে উৎসাহ দেবার চেষ্টা করছে। আমিও ওর হাসিটা ফিরিয়ে দিলাম। মনে হচ্ছে এর সবকিছুই এখন আমার কাছে বেশ ভালো লাগছে।

“না, তেমন একটা খারাপ লাগছে না এখন,” ওর সামনে স্বীকার করে নিতে আমার মোটেও লজ্জা লাগলো না।

কিন্তু এ্যাডওয়ার্ড দরজার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রাগে ওর মুখ থমথম করছে।

“কি হলো?” বিস্মিত কণ্ঠে আমি প্রশ্ন করলাম। ওর অভিব্যক্তি বুঝার চেষ্টা করলাম। কিন্তু রেগে ওঠার কারণ ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। অবশেষে ওর রাগের কারণ বুঝতে পারলাম। জ্যাকব ব্ল্যাক তার টাক্স পরে আসেনি। ওর পরনে ফুল হাতা সাদা জামা এবং টাই। চুলগুলো পেছনে পনিটেইল করে বেঁধে রাখা। ও আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

এ্যাডওয়ার্ড শান্তভাবে কিছু একটা বলে উঠলো।

“উহুঃ, দ্র ব্যবহার করার চেষ্টা করো!” আমি ওকে সাবধান করলাম।

এ্যাডওয়ার্ডের কণ্ঠ অন্য রকম কোণালো। “ও তোমার সাথে বকবক করতে আসছে।”

জ্যাকব অবশেষে আমাদের সামনে এসে হাজির হলো। একই সাথে ওর মুখে বিব্রত এবং কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গি লক্ষ করলাম।

“এই যে বেলা, তুমি এখানে উপস্থিত থাকবে এমনই আশা করছিলাম।” জ্যাকবের কথা শুনে মনে হলো, ও বোধহয় উল্টো কিছু আশা করছিলো।

“এই যে জ্যাকব।” আমি হাসি মুখে বললাম। “কেমন চলছে সবকিছু?”

“তোমাদের আলোচনায় বাধা দিলাম না তো?’ এ্যাডওয়ার্ডের দিকে এই প্রথমবারের মতো তাকিয়ে, অপ্রতিভভাবে প্রশ্ন করলো জ্যাকব।

এ্যাডওয়ার্ডের মুখ আগের মতোই নির্বিকার করে রেখেছে।

 “ধন্যবাদ, ভদ্রতা করে জ্যাকব বললো।

আমার দিকে তাকিয়ে এ্যাডওয়ার্ড একটু মাথা নেড়ে অন্যদিকে চলে গেল।

জ্যাকব আমার কোমরের কাছে হাত রাখলো এবং আমি ওর বুকের ওপর হাত রাখলাম।

“ওয়াও, জ্যাকি, এখন তোমার দৈর্ঘ্য কত?”

ও একটু হাসলো। “ছ’ফুট দুই।”

আমরা আসলে নাচছি না। আমার পা জোর প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তার বদলে পা জোড়াকে খুব কম ব্যবহার করে একপাশ থেকে আরেকপাশে একটু নড়াচড়া করতে চেষ্টা করলাম শুধু।

“তো, এখানকার রাত তুমি কিভাবে কাটাচ্ছো?” কৌতূহলী না হয়েই প্রশ্ন করলাম তাকে।

 “তুমি বিশ্বাস করবে, এই অনুষ্ঠানে আমার জন্যে বাবা আমাকে মাত্র বিশ ডলার দিয়েছেন?” খানিকটা লজ্জিত কণ্ঠে বললো।

“হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করছি,” আমি বিড়বিড় করে বললাম। “যাই হোক, তোমার বোধহয় এখানে ভালোই লাগবে। পছন্দের কিছু খুঁজে পেলে কি?” খোঁচা দেবার উদ্দেশ্যেই আমি প্রশ্নটা করলাম জ্যাকবকেথ।

“হ্যাঁ,” ও দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। “কিন্তু ও আরেকজনের সাথে জুটি বেঁধে ফেলেছে।”

ও সেকেন্ড কয়েকের জন্যে আমার ঔৎসুক্য দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে নিলো- আমরা উভয়েই দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলাম। কোনো কারণ ছাড়াই আমরা বিব্রতবোধ করলাম।

“তোমাকে আজ দেখতে চমৎকার লাগছে,” লজ্জিত মুখে মন্তব্য করলো জ্যাকব।

“উম, ধন্যবাদ। তো বিলি তোমাকে এখানে আসতে দিলো কেন?” দ্রুত প্রশ্ন করলাম আমি। যদিও এর উত্তরটা আমার জানাই আছে।

জ্যাকব প্রশ্নটা শুনে একটু অস্বস্তিবোধ করলো। ও বললো, তোমার সাথে কথা বলার নাকি এটাই সবচেয়ে নিরাপদ স্থান।”

জ্যাকব আবার অন্যদিকে তাকালো। “তুমি আবার আমাকে পাগল বলে ধরে নিও না, ঠিক আছে?”

“তোমাকে পাগল ভাবার কোনো কারণ নেই জ্যাকব!” আমি ওকে নিশ্চিত করলাম।

গানটা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমি জ্যাকবের বুকের কাছ থেকে হাতটা নামিয়ে নিলাম।

আমার কোমরের কাছ থেকেও ও হাতটা সরিয়ে নিলো। কিন্তু খানিকটা ইতস্তত করতে দেখলাম ওকে। ও আহত পায়ের দিকে একবার তাকালো। “তুমি কি আবার নাচার কথা চিন্তা করছো নাকি? নয়তো বলো কোথায় যাবে, আমি তোমাকে সাহায্য করি।”

এ্যাডওয়ার্ডই আমার হয়ে উত্তরটা দিলো। “ঠিক আছে জ্যাকব। আমি ওকে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারবো।”

জ্যাকব প্রায় আঁতকে উঠলো। বড়ো বড়ো চোখে এ্যাডওয়ার্ডকে দেখতে লাগলো। এ্যাডওয়ার্ড যে আমাদের পাশেই দাঁড়িয়েছিলো, জ্যাকব তা মোটেও লক্ষ করেনি।

“এই যে, আমি তোমাকে ওখানে দেখতে পেলাম না,” এ্যাডওয়ার্ড কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে বললো। আমি মনে করলাম, আশপাশে কোথাও খুঁজলে হয়তো তোমাকে দেখতে পাবো।”

আমি একটু হাসলাম। “হ্যাঁ, আমি তোমাকে অনেক পরে দেখতে পেয়েছি।”

“দুঃখিত,” দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে জ্যাকব আরেকবার দুঃখ প্রকাশ করলো।

পরবর্তী গানটা শুরু হওয়ার সাথে সাথে এ্যাডওয়ার্ড তার হাত দিয়ে আমার কোমর প্যাচিয়ে ধরলো। এটা ধীর লয়ের গানের সাথে টেম্পো ডান্স। কিন্তু নাচের প্রতি মোটেও মনোযোগ দিলো না এ্যাডওয়ার্ড।

 “খুব মজা পেলে?” টিটকারী দিয়ে প্রশ্ন করলাম আমি।

“খুব একটা নয়,” পাল্টা টিটকারী করতে ছাড়লো না এ্যাডওয়ার্ড।

“বিলির ওপর রাগ করে লাভ নেই,” আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম। “চার্লির কারণেই ও আমাকে নিয়ে উত্তষ্ঠিত। এর ভেতর ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপার নেই।”

“বিলিকে নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই,” ও আমার অভিযোগ খণ্ডনোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ওর ছেলের আচরণে আমি খুব বিরক্ত।”

ওকে খানিকটা পেছনে সরিয়ে দিয়ে, আমি ওর মুখটা দেখার চেষ্টা করলাম।

 “কেন?”

 “প্রথমত, ও আমার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিয়েছে।”

অবাক দৃষ্টিতে আমি ওর দিকে তাকালাম।

এ্যাডওয়ার্ড একটু হাসলো। “আমি তোমার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, তোমাকে ছেড়ে আজ রাতে কোথাও যাবো না। কিন্তু ওর কারণে ঠিকই তোমাকে ছেড়ে যেতে হয়েছে।” ও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলো।

“ওহ! ঠিক আছে, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।”

“ধন্যবাদ। কিন্তু এরপরও আরো কিছু আছে।” এ্যাডওয়ার্ড ভ্রু কুঁচকালো।

ওর পরবর্তী কথা কোণার জন্যে আমি অপেক্ষা করে থাকলাম।

“ও তোমাকে সুন্দরী বলেছে,” অভিযোগের সুরে বললো এ্যাডওয়ার্ড। “এটা নিঃসন্দেহে অপমানজনক। আজ তোমাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।”

আমি হেসে উঠলাম। “তুমি একটু হিংসুটে প্রকৃতির।”

“পাশাপাশি এমন চিন্তা যে আমি করিনি, তা কিন্তু নয়। আমার দৃষ্টি শক্তি অত্যন্ত প্রখর।”

আমরা আবার দুলতে লাগলাম।

“তো এগুলো কি তোমার ব্যাখ্যা করার খুব প্রয়োজন ছিলো?” আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম।

ও আমার দিকে তাকালো। একটু বিভ্রান্ত মনে হলো।

খানিকক্ষণ ও কি যেন চিন্তা করলো, তারপর আমাকে নিয়ে অন্যদিকে রওনা হলো। ভিড় এড়িয়ে ও পেছন দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। শেষ মুহূর্তে দেখতে পেলাম জেসিকা এবং মাইক জুটি বেঁধে নাচছে। আমাকে দেখে জেসিকা হেসে হাত নাড়লো। আমি দ্রুত তার প্রতি হাসিটা ফিরিয়ে দিলাম। এঞ্জেলাও ওখানে উপস্থিত, ক্ষুদে বেন চেনির বাহু বন্ধনে আবদ্ধ এঞ্জেলাকে বেশ সুখি বলে মনে হলো। ও আমাকে দেখতে পেলো না। শুধু আমি ওদের মৃদু হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। লী, সামান্থা এবং লরেন একবার আমাদের দেখে নিলো। কিন্তু কাউকে পাত্তা না দিয়ে আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম। সূর্যাস্তের শেষ আলো আকাশকে সামান্য একটু আলোকিত করে রেখেছে।

সবার দৃষ্টি এড়িয়ে যখন মনে হলো আমরা সম্পূর্ণ একা, ও সাথে সাথে বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করে নিলো। তারপর কোলে তুলে নিয়ে ঝাকড়া গাছগুলোর নিচে পাতা বেঞ্চগুলোর দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। এ্যাডওয়ার্ড একটা বেঞ্চের ওপর বসে আমাকে ওর বুকে জড়িয়ে ধরে রাখলো। ইতোমধ্যে আকাশে চাঁদ দেখতে পেলাম। হালকা মেঘের আড়াল থেকে চমৎকারভাবে উঁকি মারছে চাঁদটা। চাঁদের সাদা আলোয় ও মুখটা ম্লান দেখাচ্ছে। ওর চেহারায় কাঠিন্য, চোখে ইতস্তত ভাব।

“আবার সেই চন্দ্রালোক,” ও বিড়বিড় করলো। “আরেকটা সমাপ্তি। দিনটা যেমনই হোক, তা শেষ হয়ে যায়, সবসময় আমাদের জীবন থেকে একটা করে দিন চলে যেতে থাকে।”

“কিছু কিছু বিষয় আছে, যা কখনো শেষ হয় না,” আমি পাল্টা বিড়বিড় করে মন্তব্য করলাম।

এ্যাডওয়ার্ড দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।

“আমি তোমাকে নাচের আসরে এনেছি, কারণ কোনো কিছুই আমি তোমাকে বাদ দেয়াতে চাই না। আমার কারণে তুমি সবকিছু থেকে দূরে সরে থাকবে, এটা আমার মনের ইচ্ছে নয়। আমি তোমাকে একজন মানুষ হিসেবেই ভাবতে চাই।”

“আমি কিন্তু এ নিয়ে তোমাকে কোনো অভিযোগ জানাইনি। সবকিছুই আমার ভালো লেগেছে- ভালো লাগছে,” আমি মন্তব্য করলাম।

“তার কারণ আমি তোমার সাথে আছি,” এ্যাডওয়ার্ড বললো, “তুমি কি আমার কিছু প্রশ্নের জবাব দিবে?”

“আমি কি সবসময় তোমার প্রশ্নের জবাব দিই না?”

“শুধু বলো, তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দেবে,” খানিকটা ক্ষিপ্ত হয়ে বললো এ্যাডওয়ার্ড।

“ঠিক আছে!” সহজ সমর্থন জানালাম আমি।

“তোমাকে যখন এখানে আনছিলাম তুমি কি অবাক হয়েছিলে?”

“হ্যাঁ, হয়েছিলাম।”

“সেটাই,” ও আমাকে সমর্থন জানালো। “কিন্তু তোমার নিশ্চয়ই অন্য কোনো ধারণা ছিলো…আমি জানতে খুব আগ্রহী- যখন তোমাকে ভিন্ন ধরনের পোশাকে সাজাতে বলে ছিলাম, তখন তুমি কি মনে করেছিলে?”

ঠোঁট চেপে আমি ইতস্তত করলাম। “আমি তোমাকে বলতে চাইছি না।”

“তুমি প্রতিজ্ঞা করেছো,” ও প্রতিবাদ জানালো।

 “আমি জানি।”

“তাহলে বলতে সমস্যা কোথায়?”

“আমার ধারণা এটা বললে তুমি দুঃখ পাবে।”

এ্যাডওয়ার্ড আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। “আমি তবুও জানতে চাই। দয়া করে তুমি আমাকে বলো।”

আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম। ও আমার উত্তর কোণার আশায় অপেক্ষা করে রইলো।

“ভালো কথা…আমার ধারণা ছিলো এটা কোনো সাধারণ অনুষ্ঠান হবে।…কিন্তু ধারণা করতে পারিনি…এটা কোনো মানুষের অনুষ্ঠান…একটা নাচের অনুষ্ঠান!” ব্যাখ্যা করে বলার চেষ্টা করলাম আমি।

“মানুষের অনুষ্ঠান?” ও ম্লান কণ্ঠে প্রশ্ন করলো। ও শব্দটার ওপর বিশেষভাবে জোর দেবার চেষ্টা করলো।

আমি আমার পোশাকটা আরেকবার দেখার চেষ্টা করলাম। নক্সা করা সমান্তরাল সিফন কাপড়ের ভিন্ন ধরনের এক পোশাক। আমার উত্তর কোণার আশায় ও আবার অপেক্ষা করতে লাগলো।

“ঠিক আছে, আমি একটু ইতস্তত করে বললাম। “আমি আশা করেছিলাম যে তুমি মত পাল্টেছো…সে কারণে তুমি যাই হোক আমাকে পরিবর্তন করতে চাইছো।”

আমি ওর মুখে ডজন খানিক আবেগ লক্ষ করলাম। এর কিছুর আমি মর্ম উদ্ধার করতে পারলাম রাগ…ব্যথা…এবং তারপর মনে হলো সবগুলো আবেগ একই স্থানে জড়ো করার চেষ্টা করছে।

“তুমি ভেবেছিলে এটা ব্ল্যাক-টাই-এর মতো কোনো অনুষ্ঠান হবে?” টিটকারী দেবার ভঙ্গিতে ও প্রশ্ন করলো।

আমি বিব্রতভাবকে লুকানোর চেষ্টা করলাম। আমি ঠিক জানি না এগুলো কীভাবে কাজ করে। অন্ততপক্ষে আমার কাছে এটাকে খুবই সাধারণ মনে হয়েছে। এর ভেতর আমি নতুন কোনো মজা খুঁজে পাইনি।”

“না, তুমি ঠিকই বলেছো, এতে তেমন কোনো মজা ছিলো না, “ও সমর্থন জানালো আমাকে। ওর মুখ থেকে হাসি মুছে গেছে। এটা হয়তো এক ধরনের তামাশা বলে মনে হতে পারে। তবুও, তুমি যা আশা করেছিলে, সত্যিকারভাবেই আশা করেছিলে?”

 ‘সত্যিকার অর্থেই আমি অন্য ধরনের কিছু আশা করেছিলাম।”

ও গভীরভাবে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললো। “আমি জানি। এবং তা তুমি মনে প্রাণেই আশা করেছিলে?”

“তাহলে এর পরিসমাপ্তি ঘটানোর জন্যে প্রস্তুত হওয়া প্রয়োজন,” আপনমনে ও বিড়বিড় করলো, “এটা হয়তো তোমার জীবনের চন্দ্রালোক হয়ে থাকবে সারা জীবন এই আলো জ্বলজ্বল করতে থাকবে। তুমি সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে।”

“এটা মোটেও শেষ নয়, এটা কেবল শুরু মাত্র, নিঃশ্বাস চেপে রেখে ওর কথায়। অসমর্থন জানালাম আমি।

“আমি এর ভেতর কোনো মঙ্গল দেখতে পাচ্ছি না,” ও দুঃখিত কণ্ঠে বললো।

“তোমার কি মনে আছে, একবার তুমি আমাকে বলেছিলে যে, আমার কোনো কিছুই নাকি, আমি পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই না?” → তুলে আমি জিজ্ঞেস করলাম ওকে। “তোমার ভেতরও কিন্তু একই ধরনের অন্ধত্ব রয়েছে!”

“আমি কী, তুমি তা ভালোভাবেই জানো।”

আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম।

 কিন্তু এর ভেতর আমি কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করলাম। বেশ খানিকক্ষণ ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।

“তাহলে তুমি এখন প্রস্তুত?” ও জিজ্ঞেস করলো।

“উম্।” আমি ঢোক গিললাম। “হ্যাঁ?”

ও হাসলো। এরপর ওর মাথাটা সামনের দিকে এগিয়ে আনলো। আমার চোয়ালের চামড়ার ওপর ওর ঠাণ্ডা ঠোঁট জোড়া ঘষতে লাগলো….

“এখনই?” ও ফিসফিস করে প্রশ্ন করলো, ওর শীতল নিঃশ্বাস আমার ঘাড়ের ওপর পড়তে লাগলো। আমি শিউরে উঠলাম।

 “হ্যাঁ,” ফিসফিস করে আমি ওকে সমর্থন জানালাম। আমার কণ্ঠস্বর ভেঙে আসুক মোটেও আমি তা চাইলাম না। আমি তাকে প্রতারণা করছি, এমন কোনো ধারণা করলে খুবই মর্মাহত হবে ও- কাজটা সম্পন্ন না করেই দূরে সরে যাবে। আমার যা সিদ্ধান্ত নেবার, তা আমি নিয়েই ফেলেছি। এবং তা বুঝে শুনেই নিয়েছি।

ও এমনভাবে হাসলো যে, কিছুই বুঝতে পারলাম না। ও পেছনে সরে গেল। ওর মুখ দেখে মনে হলো না কাজটা করতে ও রাজি আছে।

“আমি যে তোমার কথা মতো কাজ করবো তা বোধহয় এতো সহজে বিশ্বাস করতে চাইছো না,” অদ্ভুত কণ্ঠে ও কথাটা বললো।

“একটা মেয়ে স্বপ্ন দেখতে জানে।”

ও আবার ভ্রু কুঁচকালো। “এটা নিয়ে তুমি কেমন স্বপ্ন দেখছো? একটা দানব হয়ে উঠবে?”

“তেমন কিছুই নয়,” আমি বললাম। ওর দানব শব্দটা শুনে আমি একটু মর্মাহত হলাম। “সবসময় যে স্বপ্ন দেখি, তা হচ্ছে সারাটা জীবন তোমার সাথে আমি কাটিয়ে দিবো।”

ওর অভিব্যক্তি পাল্টে গেল।

“বেলা।” আমার ঠোঁটের ওপর ও আলতোভাবে ওর আঙুল বুলাতে লাগলো। “আমি তোমার সাথেই থাকবো- এটাই কি যথেষ্ট নয়?

ওর আঙুল ছোঁয়ানো ঠোঁটে আমি হালকাভাবে একটু হাসার চেষ্টা করলাম “এখনকার জন্যে তা যথেষ্ট।”

আমি ওর মুখ স্পর্শ করলাম। “দেখো,” আমি বললাম। “আমি তোমাকে যতোটা ভালোবাসি, এই পৃথিবীর সবকিছু একসাথে করলেও তার পূরণ হবে না। এটা কি যথেষ্ট নয়?”

“হ্যাঁ, এটা যথেষ্ট, এ্যাডওয়ার্ড হেসে জবাব দিলো। “চিরজীবনের জন্যে এটাই আমার জন্যে যথেষ্ট।”

এরপর আবার সে হাঁটু গেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে এলো, তারপর শীতল ঠোঁট জোড়া আমার কণ্ঠনালীর ওপর স্থাপন করলো।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *