০৫. কাগজের নৌকো

বৃষ্টি এলেই কাগজের নৌকো বানানোর ধুম শুরু হতো, আর কেউ বড়ি দিলেই বৃষ্টি আসতো।

মনি ভাইজান তৈরি করতো তিনপালের জাহাজ। এক একটা জাহাজের এক একটা নাম থাকতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ। প্রিন্স অব ওয়েলস। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজে থাকতো চালভাজা, প্রিন্স অব ওয়েলস-এ কালো পিঁপড়ে, সুড়সুড়ি পিঁপড়ে। কিছুদূর গিয়েই বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটায় চাবচুব হয়ে জাহাজগুলো ডুবে যেত। মনি ভাইজান বলতো, ইংরেজদের দিন শেষ হয়ে আসছে–

তারপর ভাসমান পিপড়েগুলোর পাশে শুকনো পাতা ছেড়ে দিত মনি ভাইজান। বলতে লাইফবোট, অন্তত চেষ্টা করা যাক, যাতে ওরা প্রাণে বাঁচে—

তোজো আজ খুশির চোটে আস্ত একখানা ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাবে, বুঝলি পোকা!

তুমুল বৃষ্টির পর কেঁচো বেরুতো। রানিবুবুর বিড়াল কুন্তির খুব অপছন্দের ছিল এই কেঁচো। কেঁচো দেখলেই সে ফ্ল্যাশ ফাশ জুড়ে দিয়ে লাফালাফি করতো।

কুন্তি মনি ভাইজানের ধারেকাছে বড় একটা ঘেঁষতে চাইতো না, কি জানি, ভয় পেত বোধহয়। হয় একটা কাগজের ঠোঙার ভেতরে কুন্তির মাথা পুরে দিল, কুন্তি পিছনে হটা শুরু করলো, না হয় একটা ফিতে বেঁধে দিল কষে তার লেজে, মনি ভাইজান কুন্তিকে এইভাবে শাস্তি দিত। রানিবুবুকে কাঁদানোর সবচেয়ে সহজ রাস্তা ছিল এটাই।

রানিবুবুকে ভ্যা বললেই ক্ষেপে যেতো। মনি ভাইজান কতো কিছু যে বের করতো মাথা থেকে।

কুন্তির মারা যাওয়াটা বিরাট ঘটনা। আমরা বাড়িসুদ্ধ সবাই কেঁদেছিলাম। মুখে রক্ত তুলে আছড়ে-পিছড়ৈ মরেছিল কুন্তি, কে জানে কি হয়েছিল। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ বাগান থেকে ঘরে ঢুকলো সে, ঢুকে রানিবুবুর পায়ে গা ঘসে ম্যাও ম্যাও জুড়ে দিল, তারপরই শুরু হলো তার ছটফটানি। সে কি কষ্ট! দেখা যায় না। মা বললে, ওকে কেউ কিছু খাইয়ে দিয়েছে—

টিপু ভাইজান বললে, সাপে কামড়াতে পারে–

এতো কষ্ট পেয়েছিল! ও মরুক, এতো কষ্ট চোখে দেখা যায়। এই বলে কেঁদে উঠেছিল মা।

কান্নাকাটির ধুম পড়ায় পাড়াপ্রতিবেশীদের ভিড়ে ঘর ভরে গিয়েছিল, সে এক হুলস্থুল কাণ্ড।

আব্বা অফিস থেকে ফিরে এইসব কাণ্ড-কারখানা দেখে বোকা হয়ে গিয়েছিল। ছি, ছি, লোকে বলবে কি, কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই তোমাদের, এটা একটা ব্যাপার হলো?

সেই রাতেই কেনারাম কাকা থলের ভেতর ভরে একটা নতুন বিড়াল এনে হাজির করেছিলেন। অন্যেরা থামলেও রানিবুবুকে শান্ত করা যায়নি। কতো সুন্দর ছিল কুন্তি, কতো শান্ত–

হয়তো তাই, কুন্তির মতো আর হয়নি, অমন সুন্দর আর হয় না। বিছানার ওপরের একফালি চিকচিকে রোদ সারা গায়ে পাউডারের মতো মেখে রাজরাণীর মতো বসে থাকতো কুন্তি। রানিবুবুর পড়ার সময় অঘোরে ঘুমাতো সে কে।লের ভেতর। কখনো মোটা দেখে একটা খাতা বেছে নিয়ে বসতো, তার ওপর বসে বসে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতো সে মুখের দিকে।

কেনারাম কাকার দেয়া বিড়ালের নাম দেয়া হয়েছিল টোটা। টোটা ছিল ভীষণ বেয়াড়া। প্রায়ই সে পালিয়ে যেতো। তখন বাড়ি বাড়ি খোঁজা হতো। কতোবার যে ধরে আনতে হয়েছে তাকে। কারো কাছে বড় একটা ঘেষতো না সে, কেমন যেন একা একা স্বভাবের। আমাদের কাউকেই তার মনে ধরেনি। অবিশ্বাসের চোখে সে কটমট করে তাকিয়ে থাকতো। পাঁচিলের ওপরে শুয়ে শুয়ে কাটাতো সারাদিন। খিদে পেলে তবে ঘরে ঢুকতো, তারপর মিউমিউ করে ডাকতো, এমন ছিল তার জিদ।

একবার একটা শালিকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। সে ছিল খোঁড়া,, যেভাবেই হোক একটা ঠ্যাং তার ভেঙে গিয়েছিল। বাগানে গেলে আমাকে দেখলেই সে উড়ে আসতো, তারপর লাফিয়ে লাফিয়ে কাছে এসে কা কা চেঁচানি জুড়ে দিত। ধরে ধরে ফড়িং খাওয়াতাম ওকে। মনি ভাইজান একদিন বললে, শালিকটা কে জানিস?

আমি বললাম, কে?

আমাদের এক বোন। তুই দেখিসনি। তোর জন্মের ঠিক আগেই ও মরে যায়। ওর নাম ছিল তুলি–

ও তো পাখি!

মনি ভাইজান বললে, মরে পাখি হয়ে গেছে। আমরা তো ভাই, তাই আমাদের মায়া কাটাতে পারে না।

সব শুনে হাহাকার করে উঠেছিল বুকের ভেতর। তুলির কথা মনে পড়লে মাকেও দেখছি বসে বসে কাঁদতে।।

তারপর থেকে আমার একটাই কাজ, মাটির খুরিতে ভাত আর মাছ নিয়ে ফলশা গাছের পাশে সারা দুপুর বসে থাকা। বসে বসে কাঁটা বেছে মাছ-ভাত খাওয়াতাম। শুধু ভয় হতো, এই বুঝি কাঁটা বিধল গলায়। জিগ্যেস করতাম, তোমার কষ্ট হয়?

শীত লাগে না?

লেপের ভেতর শুতে চাও?

মা তোমার জন্যে এখনো কাঁদে—

সব কথার একটাই জবাব ছিল তার, ক্যাঁ, ক্যাঁ। রাগ হতো। নিজের ওপর। ও-তো সব বলে, ওর সব কথা; সব দুঃখ, সব কষ্ট সবকিছুর কথা। কেবল আমি এমন গাধা যে, তার এক বর্ণও বুঝি না।

পুঁটিকে জিজ্ঞেস করলাম একবার, পুঁটি তুমি পাখির কথা বোঝ?

পুঁটি বললে, ওমা, ওটা আবার একটা কাজ, ও তো খুব সহজ।

শালিকের কথা বোঝ?

বুঝবো না কেন! তবে শালিকদের ভাষা হলো তোর গিয়ে ওই উড়েদের মতো; তংকা বংকা হইছন্তি খাইছন্তি এই ধরনের, আমাদের নটবরের কথা শুনিসনি! তা যাই বল, বেশ কঠিন!

সব শুনে পুঁটি বললে, আমার সময় কখন যে, এতোসব শেখাবো তোকে? আমাদের বাবুদের বাড়ির দেমাকী বৌ মাগীর চোপা তো আর শুনিসনি! মাগীর দাতে আমি দড়ি হয়ে গেলাম, মলেও বাঁচি। উঠতে-বসতে শুধু কাজ আর কাজ। একটা হয়, ও যা বলে, আমি তা তোকে বুঝিয়ে দিতে পারি। কিন্তু কি দিবি আমাকে?

একটা ডবল পয়সা হাতে ভরে আমার সঙ্গে বাগানে গিয়েছিল পুঁটি। মাটির খুরি উল্টে শালিকটা যখন ভাতের ডেলা খাচ্ছে আর কা কা করছে, তখন পুঁটি বললে, ওমা, কি পাকা মেয়েরে বাবা, কি বলছে জানিস, বলছে, ও পাকা, পোকা, তোর খুব সুন্দর বউ হবে! ও পোকা, পোকা, তোমার বউ ঠিক পুঁটির মতো সুন্দর হবে। দেখেছ, কি চালাক! ওমা, পেটে পেটে কি বুদ্ধি!

বললাম, জিজ্ঞেস কর না, পা ভাঙলে কি করে?

পুঁটি বললে, ও তুলি, কি হয়েছিল তোমার পায়ে?

ক্যাঁ ক্যাঁ করে শালিকটা ডাকার পর পুঁটি বললে, দেখেছ দেখেছ, কি বজ্জাত! আমাকে নচ্ছার বলে গাল দিল। পাকিস্তান চায় বলে হিন্দু পাখিরা নাকি ওর ঠ্যাং ভেঙে দিয়েছে, শোন কথা! তা আমার কি দোষ বলো? ঐ শোন আবার কি বললে! বলছে, তোমার জাতভেয়েরা তো করেছে—

তুলিপাখি যে অমন গাল দিতে পারে, আমার তা বিশ্বাস হতো না। কতো দুপুর গাছতলায় বসে বসে কেটেছে। হা-পিত্যেশ করে বসে আছি, খুরিতে ভাত নিয়ে, আসে না, আসে না, কিছুতেই আর আসে না। শেষে হয়তো এলো।

যেদিন তুলি আসতো না, সবকিছু ফাঁকা হয়ে যেতো। সে যে কি কষ্ট! বুকের ভেতর গুমরে উঠতো কান্না। তখন সব পাখিদের দেখে আমার কান্না আসতো। কতো লোকের কতো ভাইবোন মরে গিয়ে এইভাবে পাখি হয়ে আছে, কেউ ওদের দ্যাখে না। কতো দুঃখ ওদের! রোদ-বৃষ্টি-শীতে কতো কষ্টই না ওদের হয়! না আছে ঘর, না লেপ-তোষক-কথা; গাছের ডালে ডালে কতো অনাদরে, কতো অবহেলায় ওদের দিন কাটে!

সেই তুলি, সেই তুলিপাখি, আমাদের সেই ছোট্ট বোন, একদিন কোথায় যে উড়ে গেল, আর সে ফেরেনি। মধুগুলগুলি আর সিঁদুর কৌটো আমগাছের ডালে শেষবারের মতো তাকে দেখা গেল; কোনো কথা বললে না সে। কি জানি, কেনু তার এমন অভিমান হলো।

এক একদিন এক একটা অদ্ভুত মানুষ এসে হাজির হতো। অবিকল গরুর মতো হাম্বা শব্দ করে দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে হাতের পয়সা বাজাতে লাগলো।  একদিন একটা যমদূতের মতো লোক, তার গলায় জড়ানো মোটা দড়ি। ভয় পেয়ে দৌড়ে পালিয়েছিলাম, মনে আছে। চাল আর একটা আনি নিয়ে তবে সে নড়েছিল। মার মুখে শুনেছিলাম, লোকটার নাকি গরু মরেছে। মরার সময় গরুর গলায় দড়ি থাকলে তার মালিককে নাকি এইভাবেই প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। গলায় দড়ি পেঁচিয়ে ঝাড়া এক মাস বাড়ি বাড়ি ঘুরে তাকে ভিক্ষে করতে হবে। কথা বলা বারণ।।

একবার এলো একটা খাড়া অন্ধ লোক। রোগা-পাতলা ছিপছিপে চেহারা। লোকটির দুটো চোখই পাথরের।

মার পরনে ছিল খুব চিকন পাড়ের সাদা শাড়ি। সে বললে, আপনার এ বিধবার বেশ কেন মা?

মা তো অবাক!

মনি ভাইজান আঙুল তুলে বললে, বলো দেখি কটা আঙুল?

লোকটি বললে, তিনটে।

এবার বলো, কি দেখছো?

লোকটি হেসে বললে, তুমি তো ভারি পাজি ছেলে হে! তুমি বক দেখাচ্ছো!

মনি ভাইজান বললে, এসব তোমার চালাকি। তুমি সব দেখতে পাও।

লোকটি বললে, দেখতে না পেলে বলছি কি করে! তবে তোমরা যেমন চোখ দিয়ে দ্যাখো, তেমন নয়!

ঠিক আছে দেখা যাবে, মনি ভাইজান বললে, আমি তোমার চোখ বেঁধে দেব, কামড়ালে কিন্তু ভালো হবে না!

গামছা দিয়ে কষে চোখ বেঁধে দেওয়ার পর মনি ভাইজান বললে, আচ্ছা এবার বলো কি দেখছো?

একটা বই, বিষাদ সিন্ধু!

এবার?

একটা ছবি, সুভাষচন্দ্র বসু!

মা বললে, তুই সর তো, আপনি কি চাল নেবেন, না পয়সা?

লোকটি বললে, ওসব নিয়ে আমি কি করবো মা? ইচ্ছে করলে আমাকে একমুঠো ভাত খাওয়াতে পারেন!

মা জিজ্ঞেস করলে, আপনি হিন্দু না মুসলমান?

সে বললে, আমি হিন্দু!

আমরা মুসলামান, আমাদের এখানে খাবেন?

মার কথার উত্তরে সে বললে, অন্নের কি কোনো জাত আছে মা?

লোকটি যখন খাচ্ছে তখন মনি ভাইজান কাছে বসে বললে, আমাকে চোখ বন্ধ করে দেখতে শেখাবেন!

কে কাকে শেখায়! শিখতে হয়।

মনি ভাইজান নাছোড়বান্দার মতো বললে, আমি আপনার পা টিপে দেব, যা বলবেন তাই করব, আপনি আমাকে শেখান।

লোকটি হেসে বললে, তোমার তো চোখ আছে বাবা, চেষ্টা করলেও তুমি পারবে না। তোমার মতো আমার চোখ নেই, তাই মন দিয়ে দেখতে হয়। মন সব পারে। ঐ যে এতো উঁচু হিমালয়, ইচ্ছে করলে এক লাফে ডিঙ্গিয়ে যেতে পারে ওটাকেও।

মনি ভাইজান বললে, ঠিক আছে, আপনি না হয় আমার চোখ নষ্ট করে দিন…

লোকটি মনি ভাইজানের পিঠে একটা হাত রেখে অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলো। বললে, তুমি খুব বোকা। চোখ দিয়ে যা দেখা যায়, তার সবই তো তুমি দেখতে পাচ্ছো; এর জন্যে আবার মনকে টেনে আনা কেন? চোখের চেয়ে মনের দেখার ক্ষমতা অনেক বেশি, সে অনেক দ্যাখে, অনেকদূর পর্যন্ত দ্যাখে, চোখ যা পারে না। তা তুমি যদি সেই সব দেখতে চাও, তাহলে আগে মনকে খুঁজতে হবে—

মনি ভাইজান বললে কি ভাবে—

যেমন ধরো আগে বের করতে হবে, সে আছে কোথায়। যখন বুঝবে সে ঐখানে, তখন তার কাছে যাবে বলবে আমি দেখতে চাই। সে আমাকে যা বলেছিল, তোমাকেই সেই একই কথা বলবে। বলবে, তুমি লোভী, লোভীরা কখনো দেখতে পায় না। তুমি সময় চাইবে। নিজেকে সংশোধন করে তারপর আবার তার কাছে যাবে। বলবে এখন আর আমার কোনো লোভ নেই, তুমি আমাকে যেমন ইচ্ছে বাজিয়ে দ্যাখো। সে পরীক্ষায় যদি তুমি টিকে যাও, তাহলে তখনকার তখনই তোমার মনের চোখ খুলে যাবে–

যাবার সময় চাপা গলায় লোকটি মাকে বললো, খেয়াল রাখবেন এর দিকে, বিশেষ যত্ন নেবেন। জগতে এমন কিছু মানুষ জন্মায় যারা, কেবল কষ্ট পেতেই ভালোবাসে–

কেমন যেন মনমরা হয়ে গিয়েছিল মনি ভাইজান এরপর থেকে। কারো সঙ্গেই মিশতো না। একা একা পুকুরপাড়ে বসে সবসময় পানির দিকে তাকিয়ে থাকতো। কখনো দ্যাখো পিঁপড়েদের চিনি খাওয়াচ্ছে, কখনো দ্যাখো গাছতলায় মাটির ওপর শুয়ে আছে, বলতে গেলে একেবারে অন্য রকমই হয়ে গিয়েছিল।

শেষে পড়লো জ্বরে। মাসখানেক ভুগেছিল। টাইফয়েড ধরনের একটা কিছু। সেরে যখন উঠলো, তখন আর চেনাই যায় না। দারুণ ভেঙে গিয়েছিল স্বাস্থ্য।

আবার সেই আগের মতো। ছবিদিকে দেখলেই চোখ ট্যারা করে বলে, স্টাইল! ব-র-ক-ধ-ঝ কুড় বা কুড় বা কুড় বা নিজ্জে—

ছবিদি খেপে ওঠে, ছোটলোক, গুণ্ডা।

রানিবুবুকে খোঁচা মেরে বলে, ভ্যাঁ!

রানিবুবু ছুটে যায় মার কাছে নালিশ করতে, তখন নিজে নিজেই কান ধরে ওঠ-বস করতে করতে মনি ভাইজান বলে, ঠিক আছে। ওকথা আর বলবো না, বলবো খ-চ-ট-ত-প-

পানুকে দেখতে পেয়ে বলে, বল ব্যাটা, ঝিনজার মানে কি?

পানু ভয়ে ভয়ে বলে, ঝাঁজা—

বাড়াবাড়িও ছিল। যেমন একবার:

গিনজার মানে কি?

গাঁজা–

চটে যাবার ভান করে মনি ভাইজান বললে, খোল ব্যাটা, প্যান্ট খোল। এই, কে আছিস, চাকু নিয়ে যায়, আজ ওর নুনু কাটবো, ওকে মুসলমান বানিয়ে ছাড়বো। বল আল্লাহ!

ভয়ে ভয়ে আলা না কি যেন বলে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিল পানু। সে বললে, ভগবান রাগ করবে, আমি পারবো না মনিদা, আমি পারবো না–

এ নিয়ে এক বিরাট ঝক্কি বেধেছিল। কিন্তু সেকথা যাক। কেনারাম কাকা মনি ভাইজানের হয়ে একদল উত্তেজিত মানুষের সামনে জোড়হাতে ক্ষমা চেয়েছিলেন, শুধু এইটুকু মনে আছে।

একটি বুড়ো ছিটকাপড়ওয়ালা ছিল। নমাস ছমাসে সে পিঠে ছিটকাপড়ের গাঁটরি নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসতো। খুব সম্ভব তার নাম ছিল জমাতালি। লোকটার সারা মুখে ছিল বসন্তের দাগ। যা সুন্দর ছিল তার হাসি! মনি ভাইজান বলতো, কোথেকে শিখেছ?

সে বলতো, শিখিনি, চাঁদনিচকের এক দোকান থেকে নগদ নসিকে দিয়ে কিনেছি।

দোকানের নাম?

হনহনে হাজরার দোকান। সবাই চেনে, জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে। কতো রকমের যে ভ্যারাইটি। আসামি, মাদ্রাজি, কাশ্মিরি, বিলিতি, সে কতো রকমের। তা তুমি তো আর আমার মতো গরিব নও, তুমি কাশিরটাই নিও, দামটা একটু চড়া, এই যা। হোক চড়া, তবে সুতো খুব খাঁটি, বুননও খুব ভালো; এমন মিহি পাকা রঙের যে, রোদ-বৃষ্টির সঙ্গে বাজি ধরলে জিতে যাবে।

তখন মনি ভাইজান জিগ্যেস করতো, তোমার হাসিটা কোথাকার?

চন্দননগরের! রঙটা ভালো তবে তেমন টিকসই নয়, অনেকবার ফেঁসে গেছে। কি আর করি, নদীয়ার শালকরদের কাছ থেকে হাতেপায়ে ধরে আবার রিফু করিয়ে নিতে হয়েছে। ঐ হাসিটা আছে বলেই দুটো করে খাচ্ছি–

একবার জমাতালি মাকে বললে, বুবুজি, দোয়া করবেন, আমাদের মেয়ের বিয়ের সব ঠিক হয়ে গেছে–

মা বললে, কোন্ মেয়ে?

মেয়ে তো আমার একটাই। তা ভালোই। ভিটেমাটি। ভিটেমাটি আছে। চেনাজানা ছেলে। দূর সম্পর্কে ভাইপো। বড় চিন্তা ছিল বুবুজি, ছবিরন আমার মা-মরা মেয়ে–

একটা পেতলের ঘড়া দিয়েছিল মা, এটা তোমার মেয়ের জন্যে নিয়ে যেও।

হাটখোলা পার হয়ে দক্ষিণ পাড়ার দিকে যাবার পথে পড়তো নগেন স্যাকরার দোকান। সময়ে অসময়ে কতো যে হাঁটাহাঁটি করতে হয়েছে ওই পথে। আমাদের বাড়ির সব সোনারূপোর গহনাই নগেন স্যাকরার বানানো। হয় টাকা, না হয় পুরোনো গহনা ঘর থেকে দেয়া হতো। প্রতিবারই সে টাকা ভেঙে বসে থাকতো। মনি ভাইজান আর আমাকে যেতে হতো তাগাদায়। গেলেই বলতো, মাকে বোললা, কালকেই আমি যাচ্ছি!

তার সে কাল বড় সহজে আর আসতো না। বেশিরভাগ সময়ই তাকে পাওয়া যেতো না, এমনিতেও তার যক্ষ্মারোগ ছিল। আব্বাকে না জানিয়ে মা এইসব তৈরি করাতো বলে কোনোরকমের উচ্চবাচ্য হতো না। সাধারণত আব্বা অফিসে চলে যাবার পর মা বলতো, ও মনি, বিকেলে একবার নগেন স্যাকরার কাছে যাস বাবা–

নগেন স্যাকরার বৌ-ছেলে-মেয়ে সবই ছিল। বাড়িতে গেলে তার বৌ গুষ্ঠি উদ্ধার করতো তার নাম ধরে। বলতো, কবেই বা সে বাড়িতে ছিল। দ্যাখোগে, হাটখোলায় সেই খুঁটেকুড়নি মাগীর আঁচল ধরে নির্ঘাত পড়ে আছে। এতে রক্ত ওঠে, তবু মরেও না। মরলে আমার হাড়ে বাতাস লাগতো।

শেষে হাটখোলায় মাধুর ঘরে তাকে পাওয়া যেতো। মাধু ছিল বিধবা। হাটখোলার ঘানিগাছ, বিস্কুটের তুন্দুর, আইসক্রিম ফ্যাক্টরি আর কামারশালার পিছনে একটা একচালা মাটির ঘরে সে থাকতো। বিশাল বিশাল দুটি বটগাছ পেছনে রেখে, গুচ্ছের আশ শ্যাওড়া চাকুন্দে বনমুলো কাঁটানটে আর বিড়ালহাঁচি শেকুলকাটার বন পার হয়ে, তবে সেখানে যেতে হতো।

মাধুর কেউ ছিল না। কখনো অন্য কাউকে সেখানে দেখিনি। বাড়ি-বাড়িতে সে খুঁটে আর গুল দিয়ে বেড়াতে। হাসলে তার গালে টোল পড়তো।

হয়তো নগেন স্যাকরাকে দেখা গেল, একটা গামছা কোনোমতে মালকোঁচা মেরে উঠেীনের চড়চড়ে রোদে উদোম গায়ে সটান উপুড় হয়ে পড়ে আছে মাদুরের ওপর। আর তার তেল জবজবে পিঠে আচ্ছামতো মালিশ করে দিচ্ছে মাধু। হচ্ছে না কিছু হচ্ছে না, আরো চাপ দাও, আরো চাপ দাও–

আমাদের দিকে চোখ পড়ায় হয়তো মাধু বলে উঠল, ওমা দ্যাখো দ্যাখো কারা এসেছে! এসো গো খোকাদাদারা, দাঁড়িয়ে রইলে কেন, এসো–

ততক্ষণে ধড়ফড় করে উঠে বসেছে নগেন স্যাকরা। আরে, মনিবাবু যে, কি ভাগ্যি! কি ভাগ্যি! শিগগির পিঁড়ে এনে বসতে দাও মাধু, শিগগির! এ কি যে সে কথা! মনিদাদাবাবু! পোকা দাদাবাবু! অবিশ্বাস্য! অবিশ্বাস্য!

আমার ছোট্ট সোনাদাদার মুখ লাল হয়ে গেছে রোদে—

এই বলে গ্লাসভরা পানি আর দুটো বাতাসা হাতে দিতো মাধু।

দু-একদিন এমন হয়েছে, মনি ভাইজান ফস করে বলে বসলো, আর নেই বাতাসা? থাকলে আরো দুটো দাও, পোকাটা একেবারে নেতিয়ে পড়েছে, কম দূরের পথ—

কাঁচুমাচু মুখে মাধু বলে, আজ তো আর নেই মনি দাদাবাবু! বেশি করে আনিয়ে রাখবো এরপর থেকে। ছোট্ট সোনাদাদাকে একদিন সন্দেশ খাওয়াব—

মা যেতে বলেছে তোমাকে আজকেই—

মনি ভাইজানের মুখে একথা শুনে নগেন স্যাকরা বলতো, আজকেই! নিজের চোখে তো দেখলে মনিবাবু, আজকে কি করে যাই! শরীরের গাঁটে গাঁটে খিল। ঝাড়ের বাঁশ, কিছুতেই আর ভাঙতে চায় না। কালই যাচ্ছি আমি, চিন্তা করতে বারণ করো মাকে–

কাল না গেলে কিন্তু ভালো হবে না–

অবশ্যই যাব, অবশ্যই যাবো! আমার নিজের গরজ আছে না? কতোদিন মাকে দেখিনি, কালই যাব।

ফেরার সময় ইচ্ছে করে একটা রূপোর আধুলি ফেলে রেখে আসে মনি ভাইজান উঠানের একপাশে। আমি দেখে ফেলায় বলে, কাউকে বলবি না, মাকেও না!

এই রকম ছিল সেসব।

একদিন দেখা গেল সত্যি সত্যিই পকেটে কোঁচা গুজে হাজির নগেন স্যাকরা। মা, মা কই— দরোজার বাইরে থেকেই চেঁচানি শুরু হয়ে যেতো তার। তারপর অনেকক্ষণ ধরে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে বাঁধাগতে সে বলতো, ছেলেকে মাপ করে দিন মা! মাপ না করলে আমি কিছুতেই মাথা তুলবো না।

যতো রকমের নষ্টামি আছে সব শিখেছ–এইভাবে শুরু হতো ঝাড়াই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মার রাগ পড়ে যেতো। বলতো, বোস, আমার জিনিস কই।

হয়ে এসেছে, এখন কেবল ছিলতে যে সময়টুকু। তা আগামী হপ্তাতেই পেয়ে যাবেন—

তোমার কথা আর ব্যাঙের মাথা!

মার যেমন কথা। দেখবেন এবারে কথার একন্নো আর নড়চড় হবে না।

একবার এলে সহজে আর উঠতে চাইতো না। বসে বসে রাজ্যির কথার ভুশুড়ি ভাঙতো সে। আঁটুলি হয়ে যেত। আমি কিন্তু চা না খেয়ে উঠব না, কতদিন মার হাতের চা খাইনি–

সে আমি জানি!

চা-মুড়ি খেতে খেতে সে বলতো, এইভাবে আপনাদের পাঁচজনের দয়ায় কোনোরকমে জীবন কাটছে মা, বড় কষ্ট!

তুমি তো নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছো। হাটেবাজারে পড়ে থাক, ঘর-সংসার দ্যাখে কে, এখন আর তোমাকে বিশ্বাস করে কে কাজ দেবে–

দিব্যি করে বলছি মা ইচ্ছে করে কাউকে আমি ফাঁকি দিইনি। সময়মতো দিতে পারিনি, দু আনা সোনা এদিক-সেদিক হয়ে গেছে, এইটুকুই তো অপরাধ। তা সে আমি দিয়ে দেব। কড়ায় ক্রান্তিতে আমি সকলের সব পাওনা মিটিয়ে দেব, সব হিসেব আছে আমার কাছে, ফাঁকি দিলে সে নরকেও ঠাঁই পাবো না!

মা বলতো, তুমি কাজে মন দাও, ঘরে মন দাও—

ঘরে বড়ো অশান্তি মা!

ঐ মাধু মাধু করেই তুমি মরবে—

একথা বলছেন কেন মা! কি দিয়েছি আমি তাকে। এই আপনার পা ছুঁয়ে বলছি ও আমার এক পয়সাও নেয় না। উল্টো নিজের কাছে দু-এক টাকা যা থাকে দরকারের সময় তাই দিয়ে দেয়। দুঃখী মানুষের খারাপটাই শুধু দ্যাখে লোকে, আমি তো জানি— এই বলে একদিন কেঁদে ফেলেছিল নগেন স্যাকরা।

বসে বসে বিকেল পার করে দিত। শেষে মাকে বলতে হতো, নগেন এবার তুমি যাও–

 

প্রতিবার যাবার সময় পাঁচটা টাকা করে নিয়ে যেতো সে। সেই যে গেল, তারপর যথারীতি আর নামগন্ধ নেই আসার। আবার হাঁটাহাঁটি করতে হতো, তাগাদার পর তাগাদা শুরু হতো, শেষে সেই একই নিয়মে ঝট করে একদিন এসে হাজির। প্রায় প্রতিবারই ওঠার সময় সে বলতো, আমার কাপটা কিন্তু আলাদা করে রাখবেন মা, রাজরোগের ব্যাপার! এই বলে সে হাসতো। অদ্ভুত একটা হাসি। এ ব্যাপারে আমরা সতর্কই ছিলাম। গা ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে গেলে পুকুরে ডুব দিয়ে আসতে হতো মনি ভাইজানকে।

একদিন বিকেলে শেঠ পুকুরের মাঠে মনি ভাইজানরা ফুটবল খেলছে আর আমি বসে বসে তা দেখছি। পেছনদিক থেকে সাদা থান পরা একজন হেঁটে গেল, কাপড়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে সে যাচ্ছে। মনে হলো এ আর কেউ নয়, মাধু।

হাত নেড়ে ইশরা করলাম মনি ভাইজানকে। হাঁপাতে হাঁপাতে একদৌড়ে কাছে এস বললে, কিরে?

মাধু কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছে–

কেন?

ঐ তো, দ্যাখো না—

মনি ভাইজান চেঁচিয়ে বললে, মাধু, ও মাধু, দাঁড়াও!

মাধুও দাঁড়াতে আমরা দুজন তার কাছে গেলাম। মনি ভাইজান বললে, কি হয়েছে তোমার, কাঁদছো কেন?

ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল মাধু। কাঁদতে কাঁদতে তার গলা ভেঙে গিয়েছিল। বললে কতো মানুষের কাছে গেলাম, কেউ কিছু দিল না, সবাই দুর দুর করে তাড়িয়ে দ্যায়। আমি কার কাছে যাবো খোকা দাদাবাবু

মনি ভাইজান বললে, কেন হয়েছে কি?

মানষুটা মরে যাচ্ছে—

ঘরের দোরেই তো হাসপাতাল, ধরে বেঁধে পাঠিয়ে দিতে পারলে সেখানে?

যেতে যে চায় না, কতো করে তো বলছি! বলছি যাও, নিজের ছেলেমেয়েদের কাছে যাও, তা যাবে না। বেশি দেরি নেই, হয়ে এসেছে, মাধু আমার এখানেই বরাদ্দ— ডুকরে কেঁদে উঠে মাধু বললে, মুখে শুধু এই কথা। হাত ধরে কাঁদে আর বলে, কিছু করতে পারলাম না। ইচ্ছে ছিল! আমি কি কিছু চেয়েছি! বুক ফেটে যায়, ও বাবাগো——

মাটির ওপরে বসে পড়লো মাধু, মনে হলো এইবার সে মরে যাবে। মনি ভাইজান নাক টিপে ধরলে হাঁ করে সে আকাশের দিকে মুখ তুলে দম নিলো।

মরবে তো! মনি ভাইজান বললে, নোড়ো না এখান থেকে, যাবো আর আসবো। তারপর এক দৌড়ে অদৃশ্য।

অল্পক্ষণের মধ্যেই আবার ফিরে এসেছিলো টাকা নিয়ে। খুব সম্ভব পাঁচ টাকা। আমাকে বলেছিল, খবরুদার, মাকে বলবি না পোকা, কাউকে না। কাল যদি ডিম-পরোটা হয়, আমার ভাগের থেকে আস্ত ডিমটাই তোকে দিয়ে দেব–

বলিনি। পরদিন ডিম হয়েছিল কিনা মনে নেই, তবে টাকার কথা কাউকে বলিনি। এখনো মনে আছে সে কান্নার কথা। অমন কান্না আর কাউকে কখনো কাঁদতে দেখিনি। মাধুর ভালো নাম ছিলো মাধুরী। মাধুর ভেতর থেকে বোধহয় মাধুরীই কেঁদে উঠেছিল সেদিন অমন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *