০৪. আধুনিক দেবতত্ত্ব

প্রখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ এরিক ফন দানিকেনের মতে – ‘দেবতা বলে আমরা যে এক শ্রেণীর অস্তিত্ববিহীন কাল্পনিক জীবের নাম শুনে থাকি, তাঁরা সকলেই অস্তিত্ববিহীন কাল্পনিক জীব নন। বহু দেবতার বাস্তবতার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন দেশের পুরাতত্ত্বের মাধ্যমে। গ্রীস, মিশর, ব্যাবিলন ও ভারতাদির পুরাণ-পুথিপত্তরসমূহে দেখা যায় যে, দেবতারা স্বর্গের অধিবাসী। তাঁরা এসেছিলেন স্বৰ্গদেশ থেকে পৃথিবীতে। বস্তুত তারা ছিলেন মহাকাশের কোনো অজানা গ্রহবাসী সুসভ্য মানুষ। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা এবং সাংস্কৃতিক জীবনে তারা ছিলেন পৃথিবীবাসী মানুষের চেয়ে বহুগুণে উন্নত। মানুষ যেমন আজ মহাকাশযান তৈরী করে মহাকাশযাত্রা শুরু করেছে, প্রস্তুতি নিচ্ছে গ্রহান্তরে যাবার জন্য, এমনভাবে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাঁরা হাজার হাজার বছর পূর্বে। যার ফলে তাঁরা আবিষ্কার করেছিলেন ‘পৃথিবী নামক আমাদের এ গ্রহটিকে। তাঁরা অবতরণ করেছিলেন ভূপৃষ্ঠে, বসবাসও করেছিলেন কিছুদিন কোনো কোনো দেশে কোনো এক যুগে। সে যুগের মানুষ তাদের অবয়ব, শৌর্য-বীর্য ও জ্ঞান-গরিমা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলো। সেদিনের মানুষের কাছে তারা পেয়েছিলেন ভক্তি, অর্ঘ্য, নৈবেদ্য এবং দেব, প্রভু ঈশ্বর ইত্যাদি আখ্যা। যেমন পেয়েছিলেন কলম্বাস সাহেব আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের কাছে। দেবতারা রথে (বিমানে) চড়ে আবলীলাক্রমে যাতায়াত করতেন স্বর্গে ও মর্ত্যে। অর্থাৎ বিমানযোগে পৃথিবী ও মহাকাশে তাদের নিজ গ্রহে। কোনো কোনো অভিযাত্রীদল একবার অভিযান চালিয়ে স্বগৃহে ফিরে যেতেন, কোনো কোনো দল আস্তানা করতেন, কোনো কোনো দল স্থাপন করতেন উপনিবেশ। যারা আস্তানা-উপনিবেশ স্থাপন করতেন, যে উদ্দেশ্যেই হোক – তারা মানুষের কোনো দলপতি, সমাজপতি বা রাষ্ট্রপতিকে বশবর্তী করে তার মারফতে (মানুষের কল্যাণ কামনায়) স্বমত প্রচার করতেন। তারা তাদের একান্ত ভক্তদের বর (আশীৰ্বাদ), রথ (বিমান) বা অস্ত্ৰাদি দান করতেন (অধুনা যেমন দান করে থাকে উন্নত দেশগুলো অনুন্নত দেশগুলোকে)। আবার অবাধ্য ব্যক্তিদের অভিশাপ দিতেন; আবশ্যক হলে যুদ্ধ করতেন।

ভাববাদী যিহিস্কেল (ইজেকিয়েল)-এর ঈশ্বরদর্শন সম্বন্ধে এক দীর্ঘ বিবরণ দৃষ্ট হয় পবিত্র বাইবেল গ্রন্থে। তাতে দেখা যায় যে, একদা (খৃ: পূ: ৫৯২) সদলে ঈশ্বর এসেছিলেন কবার নদীর তীরে যিহিকেলের সাথে সাক্ষাৎ করতে। দানিকেনের মতে – তা ছিলো গ্রহান্তরের কোনো এক বিমানবিহারী অভিযাত্রীদলের কবর নদীর তীরে অবতরণ। বিবরণটির কিয়দংশ এখানে উদ্ধৃত করছি।

“আমি দৃষ্টি করলাম, আর দেখ, উত্তর দিক হইতে ঘূর্ণিবায়ু, বৃহৎ মেঘ ও জাজ্জ্বল্যমান অগ্নি আসিল এবং তাহার চারিদিকে তেজ ও তাহার মধ্যস্থানে অগ্নির মধ্যবর্তী প্রতপ্ত ধাতুর ন্যায় প্রভা ছিল। আর তাহার মধ্য হইতে চারি প্রাণীর মূর্তি প্রকাশ পাইল। তাহদের আকৃতি এই – তাহাদের রূপ মনুষ্যবৎ। আর প্রত্যেকের চারি চারি মুখ ও চারি চারি পক্ষ। তাহদের চরণ সোজা, পদতল গো-বৎসের পদতলের ন্যায় এবং তাহারা পরিকৃত পিতলের তেজের ন্যায় চাকচিক্যশালী। তাহাদের চারপাশ্বে পক্ষের নীচে মানুষের হস্ত ছিল। চারি প্রাণীরই ঐরূপ মুখ ও পক্ষ ছিল ; তাহাদের পক্ষ পরস্পরসংযুক্ত ; গমনকালে তাহারা ফিরিত না ; প্রত্যেকে সম্মুখ দিকে গমন করিত।” উদ্ধৃতাংশটির স্থূল মর্ম এই – বিদ্যুৎচালিত কোনো আকাশযানযোগে সেখানে অবতরণ করলো একদল অভিযাত্রী, সংখ্যায় তারা চারজন।

পুনশ্চ “আর তাহদের মস্তকের উপরিস্থ বিতানের উর্ধ্বে নীলকান্তমণিবৎ আভাবিশিষ্ট এক সিংহাসনের মূর্তি ছিল ; সেই সিংহাসনের মূর্তির উপরে মনুষ্যের আকৃতিবৎ এক মূর্তি ছিল, তাহা তাহার উর্ধ্বে ছিল। তাহার কটির আকৃতি অবধি উপরের দিকে আমি প্রতপ্ত ধাতুর ন্যায় আভা দেখিলাম ; এবং তাহার কটির আকৃতি অবধি নিচের দিকে অগ্নিবৎ আভা দেখিলাম ; এবং তাহার চারিদিকে তেজ ছিল। বৃষ্টির দিনে মেঘে উৎপন্ন ধনুকের যেমন আভা, তাহার চারিদিকে তেজের আভা সেইরূপ ছিল। ইহা সদাপ্রভুর প্রতাপের মূর্তির আভা। আমি তাহা দেখিবামাত্র উপুড় হইয়া পড়িলাম এবং বাক্যবাদী এক ব্যক্তির রব শুনিতে পাইলাম।

“তিনি আমাকে বলিলেন, হে মনুষ্যসন্তান, তুমি পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াও, আমি তোমার সহিত আলাপ করিব। যে সময় তিনি আমার সহিত কথা কহিলেন, তখন আত্মা আমাতে প্রবেশ করিয়া আমাকে পায়ে ভর দিয়া দাড় করাইলেন, তাহাতে যিনি আমার সহিত কথা কহিলেন, আমি তাহার বাক্য শুনিলাম।”

উল্লিখিত উদ্ধৃতাংশের সারমর্ম এই— চারজন অভিযাত্রীর উপরে একজন সর্বাধিনায়ক ছিলেন। র্তার চেহারা ও শান-শওকত দর্শনে যিহিস্কেল বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে তাকে উপুড় হয়ে সেজদা করলেন এবং ভয়বিহ্বল চিত্তে অভিভূত হয়ে তার বাণী শ্রবণ করলেন। অতঃপর তা সাধারণ্যে প্রকাশ করলেন ঈশ্বরের বাণী বলে। সে বাণীগুলো স্থান পেয়েছে পবিত্র বাইবেল গ্রন্থে। ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের নিকট ঈশ্বরের বাণী বলে তা একান্তই পালনীয় বিষয়। কিন্তু যিহিস্কেল ভাববাদীর ঐরূপ ঈশ্বর – দেব, মহাদেব, জাভে ইত্যাদি আর যা-ই হোন, তিনি নিরঞ্জন, পরমব্রহ্ম বা স্বয়ং আল্লাহ নন কিছুতেই।

এ প্রসঙ্গে সীনয় বা তুর পর্বতে হজরত মুসা (আ.)-এর ‘জাভে নামক ঈশ্বর দর্শনের বিবরণটিও অনুধাবনযোগ্য। হয়রত মুসার ঈশ্বর দর্শন সম্বন্ধে পবিত্র বাইবেল (তৌরিত) গ্রন্থে লিখিত বিবরণটি এরূপ – “পরে তৃতীয় দিন প্রভাত হইলে মেঘগর্জন ও বিদ্যুৎ এবং পর্বতের উপরে নিবিড় মেঘ হইল, আর অতিশয় উচ্চরবে তুরীধ্বনি হইতে লাগিল, তাহাতে শিবিরস্থ সমস্ত লোক কাঁপিতে লাগিল। পরে মোশি (মুসা আ.) ঈশ্বরের সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য লোকদিগকে শিবির হইতে বাহির করিলেন, আর তাহারা পর্বতের তলে দণ্ডায়মান হইল। তখন সমস্ত সীনয় পর্বত ধূমময় ছিল ; কেননা সদাপ্রভু অগ্নিসহ তাহার উপর নামিয়া আসিলেন, আর ভাটির ধূমের ন্যায় তাহা হইতে ধূম উঠিতে লাগিল ; এবং সমস্ত পর্বত অতিশয় কাঁপিতে লাগিল ; আর তুরীর শব্দ অতিশয় বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। তখন মোশি কথা কহিলেন, এবং ঈশ্বর বাণী দ্বারা তাহাকে উত্তর দিলেন। আর সদাপ্রভু সীনয় পর্বতে, পর্বতের শিখরে, নামিয়া আসিলেন এবং সদাপ্ৰভু মোশিকে সেই পর্বতে ডাকিলেন, তাহাতে মোশি উঠিয়া গেলেন।”

উক্ত বিবরণে দেখা যায় যে, আলোচ্য সময়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো, তা আধুনিক কালের বিমান অবতরণের সময়েরই অনুরূপ এবং উক্ত বিবরণটিতে যে সমস্ত বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে, যথা – মেঘ, বিদ্যুৎ উচ্চরব, গজন, তুরীধ্বনি, ধূম, পর্বতকম্পন, পর্বত শিখরে সদাপ্রভুর নেমে আসা ইত্যাদি, ওর কোনোটিই পরম ঈশ্বরের (আল্লাহর) অবতরণের সঙ্গে সম্পকিত নয়, বরং সম্পকিত বিমানবতরণের সঙ্গে। দানিকেনের মতে – কোনো বিবেকবান ব্যক্তিই ওকে পরমেশ্বরের অবতরণ বলে মনে করতে পারেন না, পারেন জনৈক বৈমানিকের “বিমানাবতরণ বলে মনে করতে।

ইরানীয় ঋষি জোরওয়াষ্টার জেন্দআভেস্তা নামক গ্ৰন্থখানা নাকি পেয়েছিলেন বজ্রবিদ্যুৎ সমাকীর্ণ ঘোর নিনাদ সম্বলিত স্বর্গগত ইরানীয় দেবতা ‘আহুর মজদা-এর কাছে, কোনো এক পর্বতে বসে। অহুর মজদা নিরাকার ব্ৰহ্ম নন। কেননা তিনি ব্যক্তিসত্তার অধিকারী স্বৰ্গবাসী দেবতা।

খৃষ্ট ধর্মগুরু যীশু ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব পেয়েছিলেন স্বর্গগত একটি কবুতর পাখীর মাধ্যমে। এ বিষয়ে পবিত্র বাইবেল গ্রন্থের নিম্নোক্ত বিবরণটি দ্রষ্টব্য।

“পরে যীশু বাপ্তাইজিত হইয়া আমনি জল হইতে উঠিলেন, আর দেখ, তাহার নিমিত্ত স্বর্গ খুলিয়া গেল, এবং তিনি ঈশ্বরের আত্মাকে কপোতের ন্যায় নামিয়া আপনার উপরে আসিতে দেখিলেন। আর দেখ, স্বর্গ হইতে এই বাণী হইল, ইনিই আমার প্রিয় পুত্র, ইহাতেই আমি প্রীত।

উক্ত কবুতরটি স্বয়ং ঈশ্বর ছিলেন না এবং পৃথিবীর সাধারণ কবুতরও ছিলো না, ছিলো স্বগীয় কবুতর। কেননা পৃথিবীর সাধারণ কবুতরের কণ্ঠপ্রদেশে এমন কোনো স্বর্যন্ত্র নেই, যার দ্বারা সে মানুষের মতো কথা বলতে পারে। আর উক্ত বিবরণটি এমনই সরল-সহজ যে, ওর কোনো রূপকার্থ করার অবসর নেই। আকাশ বিজ্ঞানীদের মতে – আকাশ অনন্ত। আর অনন্ত আকাশে যদি ‘স্বর্গ নামীয় কোনো স্থান থেকে থাকে, তবে তা হবে আকাশের কোনো গ্ৰহ-উপগ্রহ নিশ্চয়ই।

এ ক্ষেত্রে দানিকেনের মতে — যীশুর শ্রুত বাণীটি হয়তো কবুতররূপী বিমান-এ আগত ভিন্ন গ্রহবাসী কোনো মানুষের মুখের বাণী। নতুবা যীশুর ভাবালুতা।

প্রাচীন মিশরীয়দের ধর্মপুস্তক আমদুয়াত গ্রন্থ, মৃতের গ্রন্থ ও ফটকের গ্রন্থত্রয়কে বলা হয় ঐশ্বরিক বা দৈবগ্রন্থ। ওর প্রণেতা নাকি মিশরীয় জ্ঞানের দেবতা থট এবং হাতের লেখাও নাকি তাঁরই সম্রাট হাবুরাবির হস্তে নাকি আইন গ্রন্থ প্রদান করেছিলেন সূর্যদেবতা ‘সমাস’। প্রাচীন গ্রীকদেশের আইন প্রণেতা বলা হয় গ্রীকদেবতা ‘ডাইওনিসাস-কে। হিন্দুদের বেদচতুষ্টয় রচিত হয়েছে নাকি দৈবশক্তিতে।

উক্ত আলোচনাসমূহের দ্বারা অনুমান হয় যে, সেকালের ধমীয় বিধিবিধান ও সামাজিক আইন-কানুনসমূহ প্রায় সমস্তই প্রণয়ন ও প্রবর্তন করেছেন স্বৰ্গবাসী দেবতা বা ঈশ্বর নামীয় ব্যক্তিরাই – মুনি-ঋষি, নবী-আম্বিয়া, কোনো সমাজপতি বা কোনো রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে।

সেকালে দেবতারা স্বর্গ থেকে নেমে আসতেন পৃথিবীতে বলতে গেলে ঘনঘনই। আর বিভিন্ন দেশে তাদের সংখ্যাও ছিলো অগণ্য। আরবের লাত-মানাত, কেনানে বাহু ইত্যাদি নানারকম ছিলেন দেবতা। আবার বিভিন্ন দেশের কতক দেবতারা ছিলেন একই ধাঁচের। যেমন মিশরে – আসিরিস, আইসিস, হোরাস , ব্যাবিলনে – আলু, বেল, ঈয়া ; ভারতে – ব্ৰহ্মা, বিষ্ণু, শিব ইত্যাদি। যে যুগে সমগ্র পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বোধহয় যে এক কোটিও ছিলো না, সে যুগে নাকি হিন্দুদের দেব-দেবীর সংখ্যা ছিলো প্রায় তেত্রিশ কোটি। ভারতীয় দেব-দেবীরা তো ঘাটিই করেছিলেন হিমালয় পর্বতের কোনো কোনো অঞ্চলে। শিবের ঘাটি ছিলো কৈলাস পর্বতে, নাম ছিলো তার কৈলাসপুরী এবং ইন্দ্রের ঘাঁটি ছিলো সুমেরু পর্বতে, নাম ছিলো তার অমরাবতী (এ সুমেরু পৃথিবীর উত্তর মেরু নয়, সে যুগের ভারতবাসীরা ভারতের উত্তরকেই পৃথিবীর উত্তর বলে মনে করত। আলোচ্য সুমেরু ও কৈলাস পর্বত হিমালয়েই অংশবিশেষ)। ব্ৰহ্মা, বিষ্ণু ইত্যাদি দেবতারা সেখানেই থাকতেন সপরিবারে। ভারতীয় দেবতাদের অধিনায়ক (রাজা) ছিলেন ইন্দ্র, তার রাজপুরীর নাম ছিলো বৈজয়ন্তা। দেবরাজ ইন্দ্রের সে পুরকেই বলা হতো ‘স্বর্গ। সেখানে ছিলো সুখ সাধনের নানাবিধ সামগ্রী। যথা – নন্দন কানন (এদন উদ্যান?), পারিজাত বৃক্ষ, সুরভি গাভী, উচ্চৈঃশ্ৰবা অশ্ব, ঐরাবত হস্তী, তৃপ্তিদায়ক আহার্য এবং দেবতাদের মনোরঞ্জনের জন্য ছিলো অঙ্গরা, কিন্নর, গন্ধৰ্ব ইত্যাদি গীতন্ত্যশীলা অঙ্গনা। এ ছাড়াও ছিলো — রথ (বিমান), সারথি (বিমান চালক), ধনু বজ ইত্যাদি নানাবিধ যুদ্ধাত্র। সে সুরম্য স্থানটি লাভের অভিলাষে এবং অন্যান্য স্বার্থসিদ্ধির মানসে সেকালের ভারতীয় আর্যরা দেব-দেবীগণের তুষ্টির উদ্দেশ্যে করেছিলো নানাবিধ যাগযজ্ঞ, হােম-বলি, স্তবস্তুতি এবং পূজা-অৰ্চনার প্রবর্তন ও প্রচলন।

পূর্বে বলা হয়েছে যে, কোনো কোনো সময় কোনো কোনো দেবতা ভক্তের স্তুতিবাক্যে তুষ্ট হয়ে তাকে বর, অস্ত্র ইত্যাদি দান করতেন। হয়তো কাউকে রথ (বিমান) উপহার দিতেন। আবার কেউ বিদ্রোহী হলে তাকে সবংশে নিধন করতেন।

রাবণের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা কুবেরের স্তবে তুষ্ট হয়ে তাঁকে পুষ্পক নামক একখানা বিমান প্রদান করেন। কিন্তু সে বিমানখানা রাবণ ছিনিয়ে নিয়ে তিনি তার মালিক হন। দেবতারা এতে কোপিত হয়ে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। রাবণের পুত্র মেঘনাদ সেই বিমানখানার সাহায্যে দেবরাজ ইন্দ্রকে বিমানযুদ্ধে পরাজিত করে ইন্দ্ৰজিৎ’ আখ্যপ্রাপ্ত হন এবং সেই বিমানখানার সাহায্যেই রাবণ সীতাদেবীকে হরণ করেন। পরিশেষে রাবণের মৃত্যু হলে রামচন্দ্র সীতাদেবীসহ ঐ বিমানখানা নিয়ে অযোধ্যায় যান। বোধহয় যে, যত্নাভাবে বিমানখানা সেখানেই বিনষ্ট হয়েছে। পক্ষান্তরে সেকালের বীর্যবন্ত রাজা দণ্ডক দেববিরোধী হওয়ায় ব্ৰহ্মা তার ব্ৰহ্মাস্ত্র (বোধহয়, এ কালের ডিনামাইট বা পারমাণবিক বোমা জাতীয় কোনো অস্ত্র) দ্বারা প্রজাপুক্তসহ রাজা দণ্ডককে সবংশে নিধন ও তার রাজ্যটি বিনষ্ট করেন। বহুকাল জনহীন থাকায় রাজ্যটি অরণ্যে পরিণত হয়। রাজা দণ্ডকের সেই রাজ্যটিকেই বলা হয় “দণ্ডকারণ্য (অধুনা আবাদ হচ্ছে)। আবার পাশ্চাত্যে দেবতারা তাদের কোনো কোনো ভক্তকে নিয়ে বিমানবিহার করেছেন। পক্ষান্তরে দেববিরোধী জনগণকে শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে তাঁরা ধ্বংস করেছেন ‘সদোম’ ও ‘যমোরা দেশকে।

মুনিঋষি ও দেবদেবীগণ প্রায় একইকালে বর্তমান ছিলেন এবং প্রায় একইকালে ঘটেছে তাঁদের তিরোভাব। এযুগে দেখা যায় না ওঁদের কাউকে। ওঁরা সকলেই এখন কালের কোলে ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু দেবতারা নাকি সবাই অমর এবং গঙ্গা, মনসা, চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদি বহু দেবদেবী আজও বেঁচে আছেন। অথচ জাভে, অহুর মজদ, ব্ৰহ্মা, বিষ্ণু, শিব, কাৰ্ত্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী ইত্যাদি দেবদেবীগণের কারো সাক্ষাৎ মেলে না। তারা গেলেন কোথায়? উত্তরে বলেছেন দানিকেন – ঐ শ্রেণীর দেবতারা আসলে হচ্ছেন গ্রহান্তরের মানুষ। তাঁরা ফিরে গেছেন মহাকাশে আপন গৃহে, হয়তো এখন মারা যেতেও পারেন। কেননা দেবতারা দীর্ঘজীবী হলেও অমর নন।

দেবতারা কোথায় গেলেন, তা বলেছেন দানিকেন সাহেব। কিন্তু কেন গেলেন, তা বলেননি তিনি। তবে তার মূল কারণ হয়তো যুগের সুযোগ-এর অভাব। সেকালের মানুষের মন ছিলো সরল, জ্ঞানের পরিধি ছিলো সংকীর্ণ। তাই তাদের গুরু পুরোহিতগণ যা বলতেন, তা তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস ও মান্য করতো অকাট্য-অভ্রান্ত বলে এবং দেবতাগণও স্বমত প্রচারের সুযোগ পেতেন তাঁদের ভক্তবৃন্দের মাধ্যমে। উত্তরোত্তর জ্ঞানবৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের গুরুবাদিতা হ্রাস পেতে থাকে। ফলে কমতে থাকে দেবতাগণের মহিমা। অবশেষে বুদ্ধ জ্ঞোনী) দেব যখন আবির্ভূত হয়ে প্রচার করলেন দেব-দেবীর স্তবস্তুতি ও পূজা-অৰ্চনার অসারতা-অযৌক্তিকতা, তখন থেকেই দেবতাদের পাত্তা গুটীতে হলো চিরতরে! যদিও ভারতীয় দেবতাদের ঔপনিবেশিক স্বৰ্গধামটি আর্য ভারত থেকে বেশী দূরে নয়, তথাপি আর কোনো দেবদেবীর ভারতের ভূমিতে পদার্পণের কথা শুনা যায় না, বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পরে। কেননা এ যুগে তাদের ভক্ত মুনি-ঋষি মেলে না। অভিন্ন কারণেই যীশুখৃষ্টের আবির্ভাবের পরে পশ্চিমাঞ্চলেও দেবতাদের আনা-গোনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

দেবতারা ছিলেন সর্ববিদ্যাবিশারদ, সর্বগুণে গুণী, জ্ঞান-বিজ্ঞানে অতি উন্নত। ভক্তগণ তাদের অনুরক্ত হয়েছেন, ভক্তিরসে আলুত হয়ে অৰ্চনা আরাধনা করেছেন, তাদের উদ্দেশ্যে অসংখ্য পশুবলি করেছেন (কেউ কেউ এখনো করে থাকেন) এবং নরবলিও দেওয়া হয়েছে কোনো কোনো দেশে। কিন্তু দেবগণের কোনো জ্ঞান-গুণের অনুশীলন করেননি কোনো ভক্তই তা বলা চলে। কেননা অসংখ্য মুনি-ঋষিদের মধ্যে সে সম্বন্ধে নাম করা যায় একমাত্র ঋষি চরকেরই।

তিনি নাকি চিকিৎসা তথা আয়ুৰ্বেদ শিক্ষা করেছিলেন দেবতা ব্ৰহ্মার কাছে। তাঁর প্রণীত চরক সংহিতা নামক সুপ্রসিদ্ধ চিকিৎসা পুস্তকখানা আজো মানুষের কল্যাণ-সাধন করছে। এতদ্বভিন্ন আর কোনো দেবদত্ত প্রযুক্তিবিদ্যা কোনো মুনি-ঋষি আয়ত্ত করেছেন বলে শোনা যায় না। দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে তার ভক্তগণ প্রার্থনা জানাচ্ছে হাজারো রকম, স্তুতিবাক্য রচনা করেছে অজস্র (ঋকবেদ দ্রষ্টব্য)। তিনি নাকি ছিলেন বজ্রবিদ্যুৎ সৃষ্টির অধিকর্তা (বিদ্যুৎ দ্বি-জ্ঞানীর)। কিন্তু কোন ঋষিই তাঁর কাছে উক্ত বিদ্যুৎ সৃষ্টির প্রণালীটি শিক্ষা করেননি বা করতে পারেননি। তা সৃষ্টির প্রণালী আবিষ্কার করেছেন ইটালীয় বিজ্ঞানী গ্যালভনি ও ভল্টা (১৭৬১)। দেবতারা বিমানবিদায়ও ছিলেন সুনিপুণ। তাঁরা বিমানে রেখে) চড়ে আসতেন স্বর্গ থেকে মর্ত্যে পৃেথিবীতে), ভ্রমণ করতেন যত্রতত্র। হা-করে চেয়ে দেখতেন মুনি-ঋষিগণ, আর দান করতেন শ্রদ্ধাঞ্জলি। কিন্তু দেবতাদের কাছ থেকে বিমান তৈরীর কলা-কৌশল আয়ত্ত করেননি কোনো মুনি-ঋষিই তা আবিষ্কার করেছেন আমেরিকার রাইট ভ্রাতৃদ্বয় ১৯০৩ সালে।

এখন বিজ্ঞানীদের অসাধ্য কোনো কাজ আছে বলে মনে হয় না। তারা এখন উন্নীত হয়েছেন দেবতার পর্যায়ে। তবে কোনো দেবদেবীর আরাধনায় তা সম্ভব হয়নি, হয়েছে জ্ঞানের সাধনায়। বিজ্ঞানীদের চন্দ্রাভিযান সফল হয়েছে, তাঁরা এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন গ্রহান্তরে যাবার জন্য। প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন গ্রহান্তরের মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে, বাক্যালাপ করতে। যদি তাদের গ্রহান্তরে গমন সম্ভব হয় এবং সেখানে থাকে যদি অনুন্নত জাতের মানুষ, তবে তাদের কাছে হয়তো তারাও পাবেন অর্চনা, আরাধনা, পূজা ; পৃথিবীর দেবতাদের মতোই পাবেন দেবতা বলে আখ্যা। কিন্তু তাঁদের সে দেবতাগিরি বজায় থাকবে ততোদিনই, যে পর্যন্ত না তারা জ্ঞান— বিজ্ঞানে উন্নত হয়। উন্নত হলে তাদেরও পাত্তা গুটাতে হবে তখন পৃথিবীর দেবতাদের মতোই।