গীতাঞ্জলি

অন্তর মম বিকশিত করো

অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে। নির্মল করো উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে। জাগ্রত করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে। মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে। অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তরতর হে। যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ, সঞ্চার করো সকল কর্মে শান্ত তোমার ছন্দ। চরণপদ্মে...

অমন আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে

অমন আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে চলবে না। এবার হৃদয়-মাঝে লুকিয়ে বোসো, কেউ জানবে না, কেউ বলবে না। বিশ্বে তোমার লুকোচুরি, দেশ-বিদেশে কতই ঘুরি, এবার বলো, আমার মনের কোণে দেবে ধরা, ছলবে না আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে চলবে না। জানি আমার কঠিন হৃদয় চরণ রাখার যোগ্য সে নয়, সখা, তোমার হাওয়া...

আকাশতলে উঠল ফুটে

আকাশতলে উঠল ফুটে আলোর শতদল। পাপড়িগুলি থরে থরে ছড়ালো দিক্‌-দিগন্তরে, ঢেকে গেল অন্ধকারের নিবিড় কালো জল। মাঝখানেতে সোনার কোষে আনন্দে ভাই আছি বসে, আমায় ঘিরে ছড়ায় ধীরে আলোর শতদল। আকাশেতে ঢেউ দিয়ে রে বাতাস বহে যায়। চার দিকে গান বেজে ওঠে, চার দিকে প্রাণ নাচে ছোটে, গগনভরা...

আছে আমার হৃদয় আছে ভরে

আছে আমার হৃদয় আছে ভরে এখন তুমি যা-খুশি তাই করো। এমনি যদি বিরাজ অন্তরে বাহির হতে সকলি মোর হরো। সব পিপাসার যেথায় অবসান সেথায় যদি পূর্ণ কর প্রাণ, তাহার পরে মরুপথের মাঝে উঠে রৌদ্র উঠুক খরতর। এই যে খেলা খেলছ কত ছলে এই খেলা তো আমি ভালোবাসি। এক দিকেতে ভাসাও আঁখিজলে আরেক দিকে...

আজ ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায়

আজ ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা। নীল আকশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা। আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে, উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে; আজ কিসের তরে নদীর চরে চখাচখির মেলা। ওরে যাব না আজ ঘরে রে ভাই, যাব না আজ ঘরে। ওরে আকাশ ভেঙে বাহিরকে আজ নেব রে লুঠ করে। যেন জোয়ার-জলে ফেনার রাশি...

আজ বারি ঝরে ঝর ঝর

আজ বারি ঝরে ঝর ঝর ভরা বাদরে। আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা কোথাও না ধরে। শালের বনে থেকে থেকে ঝড় দোলা দেয় হেঁকে হেঁকে, জল ছুটে যায় এঁকেবেঁকে মাঠের ‘পরে। আজ মেঘের জটা উড়িয়ে দিয়ে নৃত্য কে করে। ওরে বৃষ্টিতে মোর ছুটেছে মন, লুটেছে ওই ঝড়ে, বুক ছাপিয়ে তরঙ্গ মোর কাহার পায়ে পড়ে।...

আজ বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে

আজ        বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে; চলেছে গরজি, চলেছে নিবিড় সাজে। হৃদয়ে তাহার নাচিয়া উঠিছে ভীমা, ধাইতে ধাইতে লোপ ক’রে চলে সীমা, কোন্‌ তাড়নায় মেঘের সহিত মেঘে, বক্ষে বক্ষে মিলিয়া বজ্র বাজে। বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে। পুঞ্জে পুঞ্জে দূর সুদূরের পানে দলে দলে চলে,...

আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার

আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার, পরানসখা বন্ধু হে আমার। আকাশ কাঁদে হতাশ-সম, নাই যে ঘুম নয়নে মম, দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম, চাই যে বারে বার। পরানসখা বন্ধু হে আমার। বাহিরে কিছু দেখিতে নাহি পাই, তোমার পথ কোথায় ভাবি তাই। সুদূর কোন্‌ নদীর পারে, গহন কোন্‌ অন্ধকারে হতেছ তুমি পার।...

আজি শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহে

আজি শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহে গোপন তব চরণ ফেলে নিশার মতো নীরব ওহে সবার দিঠি এড়ায়ে এলে। প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি, বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি, নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে। কূজনহীন কাননভূমি, দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে, একেলা কোন্‌ পথিক তুমি পথিকহীন পথের ‘পরে। হে একা সখা,...

আজি  বসন্ত জাগ্রত দ্বারে

আজি  বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে কোরো না বিড়ম্বিত তারে। আজি       খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো, আজি       ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো, এই          সংগীত-মুখরিত গগনে তব গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়ো। এই          বাহির ভুবনে দিশা হারায়ে দিয়ো       ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে।...

আজি গন্ধবিধুর সমীরণে কার সন্ধানে ফিরি বনে বনে

আজি      গন্ধবিধুর সমীরণে কার         সন্ধানে ফিরি বনে বনে। আজি  ক্ষুব্ধ নীলাম্বর-মাঝে এ কী  চঞ্চল ক্রন্দন বাজে। সুদূর দিগন্তের সকরুণ সংগীত লাগে মোর চিন্তায় কাজে– আমি খুঁজি কারে অন্তরে মনে গন্ধবিধুর সমীরণে। ওগো        জানি না কী নন্দনরাগে সুখে        উৎসুক যৌবন...

আনন্দেরই সাগর থেকে

আনন্দেরই সাগর থেকে এসেছে আজ বান। দাঁড় ধরে আজ বোস্‌ রে সবাই, টান রে সবাই টান্‌। বোঝা যত বোঝাই করি করব রে পার দুখের তরী, ঢেউয়ের ‘পরে ধরব পাড়ি যায় যদি যাক প্রাণ । আনন্দেরই সাগর থেকে এসেছে আজ বান। কে ডাকে রে পিছন হতে, কে করে রে মানা, ভয়ের কথা কে বলে আজ– ভয় আছে...

আবার এরা ঘিরেছে মোর মন

আবার এরা ঘিরেছে মোর মন। আবার চোখে নামে যে আবরণ। আবার এ যে নানা কথাই জমে, চিত্ত আমার নানা দিকেই ভ্রমে, দাহ আবার বেড়ে ওঠে ক্রমে, আবার এ যে হারাই শ্রীচরণ। তব নীরব বাণী হৃদয়তলে ডোবে না যেন লোকের কোলাহলে। সবার মাঝে আমার সাথে থাকো, আমায় সদা তোমার মাঝে ঢাকো, নিয়ত মোর...

আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে

আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে– আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে। এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে। রহিয়া রহিয়া বিপুল মাঠের ‘পরে নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে। এসেছে এসেছে এই কথা বলে প্রাণ, এসেছে...

আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ

আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা। নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা। এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে, এসো নির্মল নীল পথে, এসো ধৌত শ্যামল আলো-ঝলমল বনগিরিপর্বতে। এসো মুকুটে পরিয়া শ্বেত শতদল শীতল-শিশির-ঢালা। ঝরা মালতীর ফুলে আসন বিছানো...

আমার নয়ন-ভুলানো এলে

আমার নয়ন-ভুলানো এলে। আমি কী হেরিলাম হৃদয় মেলে। শিউলিতলার পাশে পাশে ঝরা ফুলের রাশে রাশে শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে অরুণ-রাঙা-চরণ ফেলে নয়ন-ভুলানো এলে। আলোছায়ার আঁচলখানি লুটিয়ে পড়ে বনে বনে, ফুলগুলি ওই মুখে চেয়ে কী কথা কয় মনে মনে। তোমায় মোরা করব বরণ, মুখের ঢাকা করো হরণ, ওই টুকু...

আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার

আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে। সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে। নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলি করি অপমান, আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে। সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে। আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে; তোমারি ইচ্ছা করো হে...

আমার এ গান ছেড়েছে তার

আমার এ গান ছেড়েছে তার সকল অলংকার, তোমার কাছে রাখে নি আর সাজের অহংকার। অলংকার যে মাঝে পড়ে মিলনেতে আড়াল করে, তোমার কথা ঢাকে যে তার মুখর ঝংকার। তোমার কাছে খাটে না মোর কবির গরব করা, মহাকবি, তোমার পায়ে দিতে চাই যে ধরা। জীবন লয়ে যতন করি’ যদি সকল বাঁশি গড়ি, আপন সুরে...

আমার এ প্রেম নয় তো ভীরু

আমার এ প্রেম নয় তো ভীরু, নয় তো হীনবল, শুধু  কি এ ব্যাকুল হয়ে ফেলবে অশ্রুজল। মন্দমধুর সুখে শোভায় প্রেমকে কেন ঘুমে ডোবায়। তোমার সাথে জাগতে সে চায় আনন্দে পাগল। নাচো যখন ভীষণ সাজে তীব্র তালের আঘাত বাজে, পালায় ত্রাসে পালায় লাজে সন্দেহ-বিহ্বল। সেই প্রচণ্ড মনোহরে প্রেম যেন...

আমার নামটা দিয়ে ঢেকে রাখি যারে

আমার      নামটা দিয়ে ঢেকে রাখি যারে মরছে সে এই নামের কারাগারে। সকল ভুলে যতই দিবারাতি নামটারে ওই আকাশপানে গাঁথি, ততই আমার নামের অন্ধকারে হারাই আমার সত্য আপনারে। জড়ো করে ধূলির ‘পরে ধূলি নামটারে মোর উচ্চ করে তুলি। ছিদ্র পাছে হয় রে কোনোখানে চিত্ত মম বিরাম নাহি মানে,...