আরোগ্য

অতি দূরে আকাশের সুকুমার পান্ডুর নীলিমা

অতি দূরে আকাশের সুকুমার পান্ডুর নীলিমা। অরণ্য তাহারি তলে ঊর্ধ্বে বাহু মেলি আপন শ্যামল অর্ঘ্য নিঃশব্দে করিছে নিবেদন। মাঘের তরুণ রৌদ্র ধরণীর ‘পরে বিছাইল দিকে দিকে স্বচ্ছ আলোকের উত্তরীয়। এ কথা রাখিনু লিখে উদাসীন চিত্রকর এই ছবি মুছিবার আগে। উদয়ন, ২৪ জানুয়ারি, ১৯৪১...

অলস শয্যার পাশে জীবন মন্থরগতি চলে

অলস শয্যার পাশে জীবন মন্থরগতি চলে, রচে শিল্প শৈবালের দলে। মর্যাদা নাইকো তার, তবু তাহে রয় জীবনের স্বল্পমূল্য কিছু পরিচয়। উদয়ন, ২৩ জানুয়ারি, ১৯৪১ –...

অলস সময়-ধারা বেয়ে

অলস সময়-ধারা বেয়ে মন চলে শূন্য-পানে চেয়ে। সে মহাশূন্যের পথে ছায়া-আঁকা ছবি পড়ে চোখে। কত কাল দলে দলে গেছে কত লোকে সুদীর্ঘ অতীতে জয়োদ্ধত প্রবল গতিতে। এসেছে সাম্রাজ্যলোভী পাঠানের দল, এসেছে মোগল; বিজয়রথের চাকা উড়ায়েছে ধূলিজাল,উড়িয়াছে বিজয়পতাকা। শূন্যপথে চাই, আজ তার কোনো...

আলোকের অন্তরে যে আনন্দের পরশন পাই

আলোকের অন্তরে যে আনন্দের পরশন পাই, জানি আমি তার সাথে আমার আত্মার ভেদ নাই এক আদি জ্যোতি-উৎস হতে চৈতন্যের পুণ্যস্রোতে আমার হয়েছে অভিষেক, ললাটে দিয়েছে জয়লেখ, জানায়েছে অমৃতের আমি অধিকারী; পরম-আমির সাথে যুক্ত হতে পারি বিচিত্র জগতে প্রবেশ লভিতে পারি আনন্দের পথে। ৭ পৌষ,...

উৎসর্গ (আরোগ্য)

কল্যাণীয় শ্রীসুরেন্দ্রনাথ কর বহু লোক এসেছিল জীবনের প্রথম প্রভাতে — কেহ বা খেলার সাথী, কেহ কৌতূহলী, কেহ কাজে সঙ্গ দিতে, কেহ দিতে বাধা। আজ যারা কাছে আছ এ নিঃস্ব প্রহরে, পরিশ্রান্ত প্রদোষের অবসন্ন নিস্তেজ আলোয় তোমরা আপন দীপ আনিয়াছ হাতে, খেয়া ছাড়িবার আগে তীরের...

এ আমির আবরণ সহজে স্খলিত হয়ে যাক

এ আমির আবরণ সহজে স্খলিত হয়ে যাক; চৈতন্যের শুভ্র জ্যোতি ভেদ করি কুহেলিকা সত্যের অমৃত রূপ করুক প্রকাশ। সর্বমানুষের মাঝে এক চিরমানবের আনন্দকিরণ চিত্তে মোর হোক বিকীরিত। সংসারের ক্ষুব্ধতার স্তব্ধ ঊর্ধ্বলোকে নিত্যের যে শান্তিরূপ তাই যেন দেখে যেতে পারি, জীবনের জটিল যা বহু...

এ কথা সে কথা মনে আসে

এ কথা সে কথা মনে আসে, বর্ষাশেষে শরতের মেঘ যেন ফিরিছে বাতাসে। কাজের বাঁধনহারা শূন্যে করে মিছে আনাগোনা; কখনো রুপালি আঁকে, কখনো ফুটায়ে তোলে সোনা। অদ্ভুত মূর্তি সে রচে দিগন্তের কোণে, রেখার বদল করে পুনঃ পুনঃ যেন অন্যমনে। বাষ্পের সে শিল্পকাজ যেন আনন্দের অবহেলা–...

এ জীবনে সুন্দরের পেয়েছি মধুর আশীর্বাদ

এ জীবনে সুন্দরের পেয়েছি মধুর আশীর্বাদ, মানুষের প্রীতিপাত্রে পাই তাঁরি সুধার আস্বাদ! দুঃসহ দুঃখের দিনে অক্ষত অপরাজিত আত্মারে লয়েছি আমি চিনে। আসন্ন মৃত্যুর ছায়া যেদিন করেছি অনুভব সেদিন ভয়ের হাতে হয় নি দুর্বল পরাভব। মহত্তম মানুষের স্পর্শ হতে হই নি বঞ্চিত, তাঁদের অমৃতবাণী...

এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি

এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি– অন্তরে নিয়েছি আমি তুলি এই মহামন্ত্রখানি, চরিতার্থ জীবনের বাণী। দিনে দিনে পেয়েছিনু সত্যের যা-কিছু উপহার মধুরসে ক্ষয় নাই তার। তাই এই মন্ত্রবাণী মৃত্যুর শেষের প্রান্তে বাজে– সব ক্ষতি মিথ্যা করি অনন্তের আনন্দ বিরাজে। শেষ...

একা ব’সে সংসারের প্রান্ত-জানালায়

একা ব’সে সংসারের প্রান্ত-জানালায় দিগন্তের নীলিমায় চোখে পড়ে অনন্তের ভাষা। আলো আসে ছায়ায় জড়িত শিরীষের গাছ হতে শ্যামলের স্নিগ্ধ সখ্য বহি। বাজে মনে– নহে দূর,নহে বহু দূর। পথরেখা লীন হল অস্তগিরিশিখর-আড়ালে, স্তব্ধ আমি দিনান্তের পান্থশালা-দ্বারে, দূরে দীপ্তি দেয়...

ক্ষণে ক্ষণে মনে হয় যাত্রার সময় বুঝি এল

ক্ষণে ক্ষণে মনে হয় যাত্রার সময় বুঝি এল, বিদায়দিনের-পরে আবরণ ফেলো অপ্রগল্‌ভ সূর্যাস্ত-আভার; সময় যাবার শান্ত হোক, স্তব্ধ হোক, স্মরণসভার সমারোহ না রচুক শোকের সম্মোহ। বনশ্রেণী প্রস্থানের দ্বারে ধরণীর শান্তিমন্ত্র দিক মৌন পল্লবসম্ভারে। নামিয়া আসুক ধীরে রাত্রির নিঃশব্দ...

খ্যাতি নিন্দা পার হয়ে জীবনের এসেছি প্রদোষে

খ্যাতি নিন্দা পার হয়ে জীবনের এসেছি প্রদোষে, বিদায়ের ঘাটে আছি বসে। আপনার দেহটারে অসংশয়ে করেছি বিশ্বাস, জরার সুযোগ পেয়ে নিজেরে সে করে পরিহাস, সকল কাজেই দেখি কেবলি ঘটায় বিপর্যয়, আমার কর্তৃত্ব করে ক্ষয়; সেই অপমান হতে বাঁচাতে যাহারা অবিশ্রাম দিতেছে পাহারা, পাশে যারা...

ঘন্টা বাজে দূরে

ঘন্টা বাজে দূরে। শহরের অভ্রভেদী আত্মঘোষণার মুখরতা মন থেকে লুপ্ত হয়ে গেল, আতপ্ত মাঘের রৌদ্রে অকারণে ছবি এল চোখে জীবনযাত্রার প্রান্তে ছিল যাহা অনতিগোচর। গ্রামগুলি গেঁথে গেঁথে মেঠো পথ গেছে দূর-পানে নদীর পাড়ির ‘পর দিয়ে। প্রাচীন অশথতলা, খেয়ার আশায় লোক ব’সে পাশে...

চিরদিন আছি আমি অকেজোর দলে

চিরদিন আছি আমি অকেজোর দলে; বাজে লেখা, বাজে পড়া, দিন কাটে মিথ্যা বাজে ছলে। যে গুণী কাটাতে পারে বেলা তার বিনা আবশ্যকে তারে “এসো এসো” ব’লে যত্ন ক’রে বসাই বৈঠকে। কেজো লোকদের করি ভয়, কব্‌জিতে ঘড়ি বেঁধে শক্ত করে বেঁধেছে সময়– বাজে খরচের তরে...

দিদিমণি– অফুরান সান্ত্বনার খনি

দিদিমণি– অফুরান সান্ত্বনার খনি। কোনো ক্লান্তি কোনো ক্লেশ মুখে চিহ্ন দেয় নাই লেশ। কোনো ভয় কোনো ঘৃণা কোনো কাজে কিছুমাত্র গ্লানি সেবার মাধুর্যে ছায়া নাহি দেয় আনি। এ অখণ্ড প্রসন্নতা ঘিরে তারে রয়েছে উজ্জ্বলি, রচিতেছে শান্তির মণ্ডলী; ক্ষিপ্র হস্তক্ষেপে চারি দিকে...

দিন পরে যায় দিন

দিন পরে যায় দিন, স্তব্ধ বসে থাকি; ভাবি মনে, জীবনের দান যত কত তার বাকি চুকায়ে সঞ্চয় অপচয়। অযত্নে কী হয়ে গেছে ক্ষয়, কী পেয়েছি প্রাপ্য যাহা, কী দিয়েছি যাহা ছিল দেয়, কী রয়েছে শেষের পাথেয়। যারা কাছে এসেছিল, যারা চলে গিয়েছিল দূরে, তাদের পরশখানি রয়ে গেছে মোর কোন্‌ সুরে।...

দ্বার খোলা ছিল মনে

দ্বার খোলা ছিল মনে, অসর্তকে সেথা অকস্মাৎ লেগেছিল কী লাগিয়া কোথা হতে দুঃখের আঘাত; সে লজ্জায় খুলে গেল মর্মতলে প্রচ্ছন্ন যে বল জীবনের নিহিত সম্বল। ঊর্ধ্ব হতে জয়ধ্বনি অন্তরে দিগন্তপথে নামিল তখনি, আনন্দের বিচ্ছুরিত আলো মুহূর্তে আঁধার-মেঘ দীর্ণ করি হৃদয়ে ছড়ালো। ক্ষুদ্র...

ধীরে সন্ধ্যা আসে

ধীরে সন্ধ্যা আসে, একে একে গ্রন্থি যত যায় স্খলি প্রহরের কর্মজাল হতে। দিন দিল জলাঞ্জলি খুলি পশ্চিমের সিংহদ্বার সোনার ঐশ্বর্য তার অন্ধকার আলোকের সাগরসংগমে। দূর প্রভাতের পানে নত হয়ে নিঃশব্দে প্রণমে। চক্ষু তার মুদে আসে,এসেছে সময় গভীর ধানের তলে আপনার বাহ্য পরিচয় করিতে মগন।...

নগাধিরাজের দূর নেবু-নিকুঞ্জের

নগাধিরাজের দূর নেবু-নিকুঞ্জের রসপাত্রগুলি আনিল এ শয্যাতলে জনহীন প্রভাতের রবির মিত্রতা, অজানা নির্ঝরিণীর বিচ্ছুরিত আলোকচ্ছটার হিরন্ময় লিপি, সুনিবিড় অরণ্যবীথির নিঃশব্দ মর্মরে বিজড়িত স্নিগ্ধ হৃদয়ের দৌত্যখানি। রোগপঙ্গু লেখনীর বিরল ভাষার ইঙ্গিতে পাঠায় কবি আর্শীবাদ তার।...

নারী তুমি ধন্যা

নারী তুমি ধন্যা– আছে ঘর, আছে ঘরকন্না। তারি মধ্যে রেখেছ একটুখানি ফাঁক। সেথা হতে পশে কানে বাহিরের দুর্বলের ডাক। নিয়ে এসো শুশ্রূষার ডালি, স্নেহ দাও ঢালি। যে জীবলক্ষ্মীর মনে পালনের শক্তি বহমান, নারী তুমি নিত্য শোন তাহারি আহ্বান। সৃষ্টিবিধাতার নিয়েছ কর্মের ভার, তুমি...