৩. পাড়ার মোড়

পাড়ার মোড়ে, দেবদারু তলায় এসে একটু দাঁড়ালাম। শীতের শালঘেরির ঘরে ঘরে দরজা বন্ধ। এই সন্ধ্যারাত্রেই নিশুতি বলে মনে হয়। পথঘাটও জনহীন প্রায়। যদিও এখনও সব অন্দরই কর্মচাঞ্চল্যে মুখর। পশ্চিমের বাজার অঞ্চলে লোকজন কিছু আছে নিশ্চয়। হয়তো শেষ মোটরবাসটা আসেনি এখনও। পশ্চিমের বাজার অংশ ধরে, দক্ষিণের স্কুলবাড়ি, বোর্ডিং আর শালঘেরি সাধারণ পাঠাগারের ওদিকটায় মোটামুটি একটু বেশি রাত পর্যন্ত লোকজন জেগে থাকে।

আমি দক্ষিণ দিকে ফিরলাম। মনে নতুন কোনও বাধা উদয় হবার আগেই, পাড়ার মধ্যে এসে পড়লাম। এ পাড়ায় শুধু ভবেনদের বাড়িই দোতলা। ওর ঠাকুরদা আর বাবা দুজনেই ছিলেন জেলা কোর্টের নামকরা উকিল। সে জন্য ওদের বাড়ির নামই হয়ে গেছে উকিলবাড়ি।

ভবেনের ঠাকুরদা রোজ যেতেন ঘোড়ায় চেপে আদালতে। আর ওর বাবা যেতেন ঘোড়ার গাড়িতে। শালঘেরিতে আর কারুর গাড়ি ছিল না। যদিও এখন সে সব কিছুই নেই। ঘোড়া এবং গাড়ি বিদেয় হয়েছে। আস্তাবলটা অনেক দিনই জুড়ে দেওয়া হয়েছে গোয়ালের সঙ্গে। উকিলদ্বয় মারা গেছেন। আছে শুধু বুড়ো ইন্দির সহিস। ঘোড়া এবং গাড়ি বেচা হয়ে গেলেও, চাবুকটা নাকি ইন্দির ছাড়েনি। শুধু ওই জিনিসটিই ওর নিজস্ব সম্পত্তির মধ্যে রয়ে গেছে। বোধ হয় দীর্ঘদিন ঘোড়ার সঙ্গে বিবাদ করে, ওর চরিত্রটাই ঝগড়াটে হয়ে গিয়েছে। প্রায়ই এর তার সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ ওর লেগেই আছে। অনেকে মজা পাবার জন্যেও ইন্দিরকে খোঁচায়। আর ইন্দিরের শেষ সাবধানবাণী হল, বেশি চালাকি করো না হে। মনে রেখ কী, চাবুকটো আমার হাত থেকে অখুনও খসে নাই।

পাড়ায় ঢুকলে বোঝা যায় ঘরে ঘরে কাজকর্মের চাঞ্চল্য। কথাবার্তায় মুখর। ভবেনদের বাড়ির বড় দেউড়ির মুখে মস্ত বড় কদম গাছ। বৈঠকখানায় আলো জ্বলছে। দক্ষিণ দিকে, পুবমুখী দুর্গামণ্ডপ। যদিও এখন আর দুর্গোৎসব হয় না। একটু উত্তর ঘেঁষে বসতবাড়ি। সেটাও পুবমুখী।

বৈঠকখানায় ঢুকে দেখলাম কেউ নেই। ওর বাবার আমলের টেবিল চেয়ার দেয়ালবাতি, আর আইনগত রেফারেন্স ও প্রাদেশিক আদালতগুলির ইতিহাসে আলমারি ঠাসা। ভিতরের উঠোনে আলোর আভাস। ছেলেবেলায় অনেকদিন এই ঘরটার পাশ দিয়ে পা টিপে টিপে লুকিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকেছি। যা রাশভারী লোক ছিলেন ভবেনের বাবা। দেখলেই ভয় লাগত। চোখে পড়লেই যে ধমকে উঠতেন, তা নয়। বড় জোর দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করতেন। কিন্তু তাতেই ঘাম বেরিয়ে যেত।

উঠোনের দিকে মুখ করে ডাকলাম, ভবেন! ভবেন আছিস?

এতক্ষণে হঠাৎ মনে পড়ল, ভবেনের মা এবং ছোট ভায়ের কথা সকালে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। আশ্চর্য! নিজের চিন্তায় এতই বিভোর হয়েছিলাম যে, এ সামান্য কথাটা জিজ্ঞেস করতেও ভুলে গিয়েছি। কাকিমা কিংবা ভবেনের ভাই শুভেনের কথা জিজ্ঞেস করাটা সৌজন্য বা লৌকিকতার মধ্যেও পড়ে না। ও কথাই প্রথম জিজ্ঞেস হওয়া উচিত ছিল। মন নিয়ে বিড়ম্বিত এ বিস্মৃতি দেখে, ভবেনও হয়তো অবাক হয়েছে। এমন সময় দেখলাম, একটি আলোর রেশ ক্রমেই এগিয়ে আসছে উঠোনের ওপর দিকে। এত গরম লাগছে কেন? হাতের চেটো, কান সব যেন গরম লাগছে।

আলোটা এসে দাঁড়াল বাইরের ঘরের সামনে। হ্যারিকেন হাতে ঝিনুক। চিনতে আমার ভুল হবার কথা নয়। কিন্তু সহসা যেন আমার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এল। গলা শুকিয়ে গেল। সারা দেহে একটি উষ্ণ তরঙ্গ বইতে লাগল। ছন্দপতন ঘটল বুকের স্পন্দনে। একটু বোধ হয় হাসল ঝিনুক। বলল, খুব সাধারণ গলায়, যেন আমাকে ও রোজই দেখছে, এমনিভাবে বলল, কে, টোপনদা নয়? বেশ লোক। ও আবার গেল তোমাকে ডাকতে। তোমার নাকি দেরি হচ্ছে। এসো।

আমি ঠিক ঝিনুকের দিকে তাকাইনি। আর ঝিনুকই যে বাতি নিয়ে একেবারে বৈঠকখানায় আসবে, ভাবতে পারিনি। কিন্তু বহুদিনের এক অশ্রুত গলার স্বর আমার স্বপ্নের মধ্যে বেজে উঠল যেন। বললাম, না, দেরি কোথায়? ও তো বাস্তবাগীশ লোক। শুধু শুধু আবার

–এসে পড়বে। তুমি এসে বসো।

আমার একটু সংকোচই হল। তবু বলতে পারলাম না যে, আমি বাইরের ঘরেই বসি। উঠোনে নেমে এলাম। ঝিনুক টুক করে পায়ে একটু হাত বুলিয়ে কপালে ছোঁয়ালে। আর আমি কিছু বলবার আগেই বলল, এসো।

সে এগিয়ে গেল। আমিও গেলাম।

ভবেনদের দোতলাটা খুবই সংক্ষিপ্ত। একতলায় দুখানা বড় বড় ঘর, ওপরেও দুখানি। কিন্তু নীচে, উঠোনের ওপারে, দক্ষিণ ভোলা বেশ বড় বড় পাতার ছাউনি দেওয়া মাটির দেওয়ালের ঘরগুলিই ওদের সাবেকি। সেখানেই ওদের আসল সংসার।

ঝিনুকের পিছনে পিছনে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলাম। বারান্দা পার হয়ে শেষের ঘরে গিয়ে ঢুকল ঝিনুক। ডাকল, এসো।

ঘরে ঢুকে দেখলাম, খাট, বড় আয়না, ছোট টেবিল, খান দুই চেয়ার রয়েছে এ ঘরে। বুঝলাম, এই ঘরেই ভবেন থাকে।

আয়নাটাকে যেন খারাপ লাগছে আমার। এত বড় যে, কোথাও একটু একান্তে সরে বসবার জো নেই। যেখানেই যাব, সেখানেই ছায়া থাকবে সঙ্গে সঙ্গে।

এইমাত্র নীচের বৈঠকখানা ঘরে গরম লাগছিল। এখন হঠাৎ বেশ ঠাণ্ডা লাগছে আমার। অনুভবের ক্ষমতা আমার এত ক্ষীণ হয়ে আসছে কেন!

ঝিনুক পিছন ফিরে কী করছিল, বুঝতে পারছিলাম না। সমস্ত পরিবেশটা এত স্তব্ধ আড়ষ্ট মনে হচ্ছিল, কেমন যেন অসহায় হয়ে পড়লাম। বলে ফেললাম, বেশ শীত পড়েছে।

ঝিনুক পিছন ফিরে হ্যারিকেনটা আর একটু উসকে দিতে দিতে বলল, দরজাটা বন্ধ করে দেব?

গলা ঝিনুকের বেশ পরিষ্কার। এ কথার রহস্য আছে কি না জানিনে। আগেও এমন কথা এমন সুরে শুনেছি। কিন্তু আজ আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, না না, বন্ধ করতে হবে না। ভবেনের মা কোথায়?

দিল্লিতে।

 দিল্লিতে? কেন?

ঠাকুরপো ওখানে আছেন।

ঠাকুরপো, অর্থাৎ ভবেনের ভাই। ঝিনুকের মুখে এ সব শব্দগুলি আর কখনও শুনিনি, তাই বোধ হয় একটু অদ্ভুত লাগছে।

জিজ্ঞেস করলাম, শুভেন কি এখন দিল্লিতে আছে তা হলে?

–হ্যাঁ।

বলেই সে বাইরে বেরিয়ে গেল। শুনতে পেলাম তার গলা দোতলার বারান্দা থেকে, আনিদি!

–অ্যাঁ?

–উনুনের আগুন ঠিক আছে তো?

আছে।

 –ঘুমিয়ো না যেন উনুনপাড়ে বসে।

–ঘুমাব ক্যানে বড় বউ। কিন্তুন, ইন্দিরটা যে ফিরে আসে না।

–আসবে, এই তো গেল।

ঝিনুক ঢুকল আবার। বলল, চেয়ারে বসলে কেন? বিছানায় উঠে, পা ঢেকে বসো।

টেবিলের ওপর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পাতা ওলটাচ্ছিলাম। বললাম, থাক।

-বলছিলে, বড় শীত করছে? কাল থেকে শীতটা একটু বেশিই পড়েছে।

মনে মনে ভাবলাম, আমি এসেছি বলে নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু এভাবে, এমন আড়ষ্ট হয়ে কতক্ষণ থাকা যায়। কোথাও কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। আমিই শুধু অস্বাভাবিক। কেন? সংসারের কোথাও কোনও বিচ্যুতি দেখিনে। কোথাও শোর নেই, গোল নেই, আঁকাবাঁকা নেই। তবে আমার এত সাহসের সাধনা কেন ব্যর্থ হয়?

আমি ফিরে তাকালাম ঝিনুকের দিকে। জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছ ঝিনুক।

 ঝিনুক খাটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ভাল।

তারপর মুখ তুলল। দেখলাম, ঝিনুকের সেই টানা টানা চোখ। মাথায় ঘোমটা নেই। কপালে টিপ নেই, সিঁথিতে সিঁদুর রেখা। ফরসা রং বলেই বোধ হয় ওর গালের ছোট্ট একটি কাটার দাগ চিরদিনই বেশি করে চোখে পড়ে। খাটো নয়, লম্বাও নয়, মাঝারি উচ্চতার একহারা ঝিনুক। যদিও এখন ঈষৎ মাংস লেগেছে গায়ে, সেটুকু যেন ওর আগের অপূর্ণতাকে পূর্ণ করেছে। আগের থেকে তাই একটু যেন বেশি সুন্দর লাগল। একটি লঘু তীক্ষ্ণতা ওকে ঘিরেছিল বরাবরই। এখন যেন সেটুকু আরও তীব্র হয়েছে। গলায় বুঝি একটি সরু চেন হার চিকচিক করছে। হাতে কয়েক গাছা করে চুড়ি। গেরুয়া রং-এর লালপাড় শাড়ি আর ছিটের ব্লাউজ ওর গায়ে।

পরিবর্তন সহসা কিছু চোখে পড়ে না। কেবল একটু বড় বড় লাগছে দেখতে ঝিনুককে। লাগবে। ঝিনুক বড় ছিল। আরও বড় হয়েছে।

ঝিনুকের চোখ অন্যদিকে। বলল, বিশ্বাস হল?

বললাম, কী?

–আমি ভাল আছি?

–অবিশ্বাস করব কেন?

হাসবার চেষ্টা করলাম। ঝিনুক বলল, তুমি কেমন আছ?

 বললাম, এত দিন ভাল ছিলাম না। কাল থেকে খুব ভাল আছি।

ঝিনুক চোখ তুলে তাকাল। ওর ভুরু যেন বেঁকে উঠে, আমার মনের গভীরে বিদ্ধ হল। বলল, ফিরে এসেছ বলে?

-হ্যাঁ।

ঝিনুক চোখ নামিয়ে, আবার তাকাল আমার দিকে। ও হাসছে। কিন্তু একটি অটুট গাম্ভীর্য যেন থমকে আছে কোথাও। বলল, পরিষ্কার হয়েছ অনেক।

পরিষ্কার? বললাম, ফরসা হওয়ার কথা বলছ? এসে শুনেছি সে কথা।

কার কাছে? পিসির?

 না। প্রথমে কুসুম বলেছে।

 কুসুম?

ঝিনুকের প্রশ্নবোধ চিহ্নে বেঁকে উঠল–কে কুসুম?

বললাম, হরলালকাকার মেয়ে।

 ঝিনুক বলল, ও, হ্যাঁ, উত্তরপাড়ার হরোকা’র মেয়ে কুসুম। তোমাদের বাড়িতেই তো থাকে, না? শেষ দিনের চিঠিটা কুসুমই নিয়ে গিয়েছিল ঝিনুকের কাছে। বললাম, হ্যাঁ, এসে তো তাই দেখছি। ঝিনুক আরও খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। কিন্তু কুসুমের কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেছে ঝিনুক। কুসুমের হাতে চিঠি পেয়েই তো ঝিনুক ছুটে এসেছিল। বাড়ির চারদিক পুলিশ বেষ্টিত। আমি বেরোবার জন্যে প্রস্তুত। বাবা দারোগার সঙ্গে কথা বলছিলেন দালানে। গ্রামের মেয়ে ঝিনুক। কিন্তু আমাদের শালঘেরির, বর্ষার তামাইনদীর মতো ও যেন সকল সংকোচ, সকল লজ্জা বিসর্জন দিয়ে প্লাবনের বেগে ছুটে এসেছিল। ঝিনুকের আঁচল উথল, চুল এলো, চোখে জলের ধারা। পরম ভাগ্য, ঘরে আমি তখন একলা। পিসি অন্য ঘরে গিয়ে কাঁদছিলেন। সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় দিতে পারবেন না বলে। তবু এক মুহূর্ত আমি সংকোচে সিটিয়ে গিয়েছিলাম বাবার কথা ভেবে। কারণ বাইরের উঠোন থেকে বাবা নিশ্চয় ঝিনুককে দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু ঝিনুক যে মুহূর্তে আমার পায়ের ওপর এসে আছড়ে পড়েছিল, সেই মুহূর্তে সকল দ্বিধা, লজ্জা আমারও ঘুচে গিয়েছিল। ঝিনুককে আমি দুহাতে টেনে তুলেছিলাম।

ঝিনুক রুদ্ধ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেছিল, তুমি চলে যাচ্ছ, আমি কী করে থাকব।

ওর যে কতখানি বেজেছিল, কত অসহায় বোধ করেছিল, ওর মতো মেয়েকে অমনি করে কেঁদে আছড়ে পড়তে দেখেই বুঝেছিলাম। সহসা কথা বলতে পারিনি। কিন্তু সময় ছিল না। দারোগার গলা ভেসে আসছিল, সীমন্তবাবু, আর দেরি করার উপায় নেই, তাড়াতাড়ি করুন।

আমি ডেকেছিলাম, ঝিনুক।

ঝিনুক সাঁড়াশির মতো শক্ত করে আমাকে ধরে ছিল। অচৈতন্য হবার পূর্বমুহূর্তের শক্তি সঞ্চয় করে যেন ফিসফিস করে বলেছিল, তোমাকে না দেখে কেমন করে থাকব? আমি যে আর কিছু ভাবতে ভুলে গেছি। টোপনদা, ভীষণ ভয় হচ্ছে, ভীষণ–

–খোকা!

 বাবার গলা ভেসে এসেছিল দালান থেকে। আমি কোনও রকমে ঝিনুকের কপালে আমার ঠোঁট স্পর্শ করেছিলাম। রুদ্ধস্বরে উচ্চারণ করেছিলাম, আর সময় নেই ঝিনুক।

আমি বেরিয়ে গিয়েছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, কিন্তু ভয়? কীসের ভয়ের কথা বলল ঝিনুক?

-কী ভাবছ?

 ঝিনুকের গলার স্বরে হঠাৎ চমকে উঠলাম। বিব্রত হয়ে বললাম, না, কিছু না। এই…।

স্বাভাবিক হতে চাইলাম। ঝিনুক বলল, শুনলাম, তোমার সেই তামাই সভ্যতার আবিষ্কারের নেশা এখনও যায়নি।

একটু কি শ্লেষ রয়েছে ঝিনুকের কথায়? বললাম, আবিষ্কারের নেশা? তা বলতে পার। কিন্তু যাবে কেন?

–এত দিন হয়ে গেছে, তাই বলছি।

–এত দিন মনে প্রাণে ওটারই ধ্যান করেছি।

 ঝিনুক চকিতে এক বার আমার চোখের ভিতরে ওর দৃষ্টি বিদ্ধ করল। বলল, তাই বুঝি?

বলে ঠোঁট টিপেই রইল।

আমার কপালের শিরাগুলি যেন দপদপ করতে লাগল। একটু জোর দিয়েই বললাম, হ্যাঁ। তামাইয়ের ধারে মাটির ওপরে যে জিনিসগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো যে কেউ ফেলে দিয়ে গেছে কিংবা উড়ে এসেছে, এমন তো মনে হয়নি কোনওদিন।

ঝিনুক বলল, হ্যাঁ, তুমি অনেক বার বলেছ, ওপরে যখন এটুকু দেখা গেছে, ভেতরে তখন আরও কিছু আছে।

আমি দৃঢ় হয়ে বললাম, আমার তাই বিশ্বাস। ধোঁয়া দেখলে আগুনের কথা মনে আসে।

ঝিনুকের চোখের ওপরে যেন একটি বিস্মিত জিজ্ঞাসা চিকচিক করতে লাগল। আমার এ বিশ্বাসে যেন তার ভারী সংশয়।

চোখে চোখ পড়তে ঝিনুক চোখ সরাল। বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, কী লোক রে বাবা! কখন গেছে, এখনও ফেরে না।

আমি বলে ফেললাম, ওটা একটা উল্লুক।

ঝিনুক চকিতে ফিরল আমার দিকে। হাসল বোধ হয়। তারপরই আবার মুখ ঘোরাল।

আমি একটু অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কী হল?

ঝিনুক মুখ না ফিরিয়েই বলল, কিছু না। গালাগালটা অনেক দিন বাদে শুনলাম কিনা।

–গালাগাল?

 –ওই আর কী, তোমাদের ভালবাসার ডাক। উল্লুক আর রাস্কেল।

সঙ্গে সঙ্গে আর একটি এমনি স্নেহের গালাগাল মনে পড়ে গেল, খরাসনী। যদিও ঝিনুকের খরতা কোনওদিনই ওর ওপরের নিয়ত স্রোতে দেখা যায়নি। সে চিরদিন অন্তস্রোতেই বহমান। কিন্তু ঝিনুক রাগ করলেই ওকে খরাসনী বলে ডাকতাম।

ঝিনুক বলল আবার, বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে না?

বললাম, উপীনকাকার সংবাদ আমি জেলে বসেই পেয়েছি। পিসির চিঠিতে শালঘেরির প্রায় কোনও সংবাদই বাদ পড়ত না।

আমার বিয়ের সংবাদ?

কথাটি যেন আলতো করে, অনায়াসে ছুঁড়ে দিল ঝিনুক। আর আমার সমস্ত মুখটা পুড়ে যেন ছাই হয়ে গেল। কিন্তু ঝিনুক জিজ্ঞেস করতে পারে, আমি জবাব দিতে পারিনে?

বললাম, তাও পেয়েছি।

ঝিনুক পিছন ফিরে দু পা বাইরে গেল। যেন অনেক দূর থেকে জিজ্ঞেস করল, পেয়ে?

যত দূরে যায় ঝিনুক, তত যেন একটা ফাঁসের দড়ি কষে কষে যায় আমার গলায়। দৃষ্টি যত অন্ধ, তত দুর্নিরীক্ষ্যের জন্য আমার চোখের ব্যাকুলতা। নিজেকে মুখ খুঁজড়ে পড়ে থাকা একটি দূর অন্ধকার কোণে আবিষ্কার করে, তাকে ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে এলাম। যেন কী একটি খুশি চলকে উঠল আমার গলায়। বললাম, খুব খুশি হয়েছি ঝিনুক।

ঝিনুক মুখ ফেরাল। ঝিনুকের মুখ স্পষ্ট দেখতে পেলাম। হাসি গাম্ভীর্য কিছুই নেই যেন। তার পরেই আমাকে জিজ্ঞেস করল, একটু চা খাবে?

কথার কোনও পরস্পর সম্পর্ক খুঁজে পেলাম না। বললাম, খাব।

ঝিনুক চলে গেল। কিন্তু আমার যেন মনে হতে লাগল, আমি একজন আসামি। অপর পক্ষের উকিল এসে আমাকে উলটোপালটা প্রশ্ন করে তার নিজের তথ্য জেনে গেল।

চোখে পড়ল ঝিনুকের আর ভবেনের ছবি। বোধ হয় জেলা শহর থেকে বাঁধিয়ে এনেছে ভবেন। ঝিনুক যেন মুখটি একটু বেশি উঁচু করে তুলে ধরেছে। তুলনায় ভবেনের মুখ একটু বেশি নিচু। তখনও গোঁফ রাখেনি।

নীচে শক্ত উঠোনে জুতোর শব্দ পাওয়া গেল। তারপরেই ভবেনের ঈষৎ উঁচু গলা, ঝিনুক।

বোঝা গেল, সে রান্নাঘরের দিকেই গেল। আবার শোনা গেল, এসে গেছে? ওপরের ঘরে?

বলতে বলতেই সিঁড়িতে জুতোর শব্দ শোনা গেল। বারান্দা পেরিয়ে ঘরে এল ভবেন। বলল, বেশ। বাড়ি গিয়ে শুনি এই যাচ্ছে। আর আমি বিকেল থেকে হাঁ করে বসে আছি।

বললাম, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তুইও তো অনেকক্ষণ গেছিস।

–অনেকক্ষণ? আমি তো পথে আর কোথাও যাইনি, দাঁড়াইনি। অনেকক্ষণ কী করে হবে?

কী জানি। আমার তো মনে হচ্ছিল, এক ঘণ্টা হয়ে গেছে।

–একলা বসে আছিস নাকি?

না, ঝিনুক ছিল। চা করতে গেল বোধ হয়।

–চা করতে? কিন্তু ও তো রান্নাঘরে নেই।

 বলতে বলতে ভবেন বাইরের বারান্দায় গেল। ডাকল, আনিদি, ও আনিদি!

কী বুইলছ।

–তোমাদের বড় বউ কোথায় গেলেন?

জবাব এল নীচের কোনও ঘর থেকে, আমি নীচে এসেছি। যাচ্ছি। আনিদিকে চায়ের জল চাপাতে বলে এসেছি।

বাইরের বারান্দা থেকে ভবেন আবার যখন ঘরে ঢুকল, তখন তার মুখে যেন একটি অস্পষ্ট ছায়া নেমে এসেছে। অন্যমনস্ক আর চিন্তিত মনে হল ওকে।

আমাকে বলল, বিছানায় এসে বস টোপন।

বললাম, ঠিক আছে, এখানেই বেশ আছি।

ভবেন বাইরের দিকে তাকাল। ঝিনুক ঢুকল এসে ঘরে। ভবেনকে জিজ্ঞেস করল, কিছু বলছ?

ভবেন যেন কেমন অসহায়ভাবে হেসে বলল, না, মানে তুমি নেই, টোপন একলা বসে আছে, তাই বলছিলাম।

দেখলাম, ঝিনুক পান খাচ্ছে। একটু একটু করে পানের রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তার ঠোঁটে। দু-একবার পান খেতে দেখেছি এর আগে ঝিনুককে। কখনও সখনও দু-একটা ঠাট্টাও বুঝি করেছি ওর পান খাওয়া নিয়ে। কিন্তু সে কথা আজ স্মরণ করলে আপন মনের বিড়ম্বনা বাড়বে। তাড়াতাড়ি বললাম, একলা কোথায়। এই তো সবে নীচে গেল।

ঝিনুক বলল, আমি ওষুধ খেতে গেছলাম।

ভবেন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, বিকেলে খাওনি ওষুধ?

-না, ভুলে গেছলাম।

লক্ষ করলাম, ভবেনের চোখের বিস্ময়ের ঘোরটা কাটল না। সেই সঙ্গে দুশ্চিন্তার ছায়া। একটু যেন ভয়ে ভয়েই বলল, অসময়ে না হয় না-ই খেতে ওষুধ। এতে উপকারের চেয়ে অপকারই করে বেশি।

ঝিনুক খাটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, কিছু হবে না।

এই সময়ে ভবেন চকিতে এক বার আমার দিকে আড়চোখে তাকাল। লক্ষ করলাম, আর দেখলাম, আমার সামনে আমার দুই পুরনো বন্ধু। ঝিনুক আর ভবেন, স্বামী ও স্ত্রী। আমার সকল প্রতিজ্ঞা বুঝি বা ব্যর্থ হয়। বুকের মধ্যে একটি তীব্র যন্ত্রণা আমাকে আড়ষ্ট করে তুলতে লাগল। গলার স্বর টুটি টিপে ধরতে এল। শেষে বুঝি তীরে এসে আমার তরী ডুবল। অসুখের কথা শুনে, কিছু না জিজ্ঞেস করাটা অশোভনীয়। ভবেনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, অসুখ করেছে নাকি?

ভবেন বলল, হ্যাঁ, নরেন বোস একটা ওষুধ দিয়েছে খেতে। ভেতরটা নাকি ওর খুব দুর্বল। মাঝে মাঝে

ঝিনুক বাধা দিয়ে বলে উঠল, থাক না। রোগ ব্যাধির কথা শুনতে আমার একটুও ভাল লাগে না।

 ভবেন যেন সংকুচিত হয়ে গেল। আমার দিকে এক বার দেখল।

 আমি বললাম, ভাল লাগার জন্যে কে আর অসুখের কথা বলে। কিন্তু অসুখটা কী?

 ঝিনুক বলল, কিছুই না। আমার শরীর কি খারাপ দেখছ? দিব্যি খাইদাই ঘুমোই। মাঝে মধ্যে একটু মাথা ঘোরা দুর্বলতা সকলেরই থাকে। কিন্তু তোমার বন্ধুর ধারণা, মারা গেলাম বলে।

দেখলাম ভবেন মুগ্ধ এবং অসহায় বিস্ময়ে ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মনে মনে অবাক হলাম। বললাম, দুশ্চিন্তা তো হয়।

ভবেন যেন কী বলবার চেষ্টা করল। ঝিনুক বলে উঠল, লাভ কী মানুষের দুশ্চিন্তা করে? শুনি তো, ইয়ৎ সৎ তৎক্ষণিকম।

ঝিনুকের মুখে সংস্কৃত শুনে মনে পড়ল, ও বিষয়ে সে ছেলেবেলা থেকেই সিদ্ধহস্ত। অনায়াসে আয়ত্ত করতে পারত, নিষ্ঠাও ছিল। গুরু ছিলেন স্বয়ং উপীনকাকা। কিন্তু ওর মুখে, ইহকালের সবই ক্ষণকালের জন্যে, কথাটা কানে সহসা বিধল। সংশয় ও সন্দেহের বিষে কালো হয়ে উঠল মন। ক্ষুব্ধ কুটিল প্রশ্ন উদ্যত হয়ে উঠল, এই কি ঝিনুকের জীবনের সর্বাঙ্গীণ আদর্শ নাকি? এই আদর্শের মন্ত্র নিয়ে কি সে একদা আমার সঙ্গে–তারপর ভবেনের–? পরমুহূর্তেই ভাবলাম, না, ঝিনুক হয়তো জীবন-মৃত্যুর সম্পর্কেই কথাটা বলেছে। বললাম, হয়তো সত্যি। মানুষ যদি মনে রাখতে পারত।…

ভবেন বলে উঠল, তা হলে ভয়ংকর ব্যাপার হত। সংসারটা মুনি ঋষিদের আড্ডা হয়ে উঠত।

 আমি হেসে উঠলাম। ঝিনুক বলল, তাই বলছি রোগের কথা থাক।

কথার মাঝ পথেই, বুক অবধি ঘোমটা টানা প্রায় একটি ভৌতিক মূর্তি এসে দাঁড়াল দরজায়। তার হাতে এক কাপ ধূমায়িত চা।

ভবেন বলে উঠল, ভেতরে এসো আনিদি, এ আমাদের টোপন।

আনিদি ওখান থেকেই ঘোমটাসহ মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল। তারপর ফিসফিস করে বলল, বড় বউ, চা-টা লিয়ে যাও।

আমরা সবাই হেসে উঠলাম। বাল-বিধবা আনিদি। এখন বয়স ঝুঁকেছে বার্ধক্যের দিকে। মেয়ে ছিলেন দরিদ্রের ঘরের। যেখানে বিয়ে হয়েছিল, সেটাও মোটেই সচ্ছলতার ডেরা ছিল না। বিধবা হয়ে পরের বাড়ির হেঁসেল নিয়ে তাই চিরদিন কাটাচ্ছে। কিন্তু লজ্জাবতী লতা সেই গাঁয়ের কলাবউয়ের মনটি মরেনি। এ শুধু লজ্জাই নয়। এর মধ্যে অনেকটাই শালীনতাবোধ।

আনিদি কোনওদিনই কথা বলেনি। ভবেনদের স্নেহ করত মায়ের মতো। আমাদের প্রতিও তার সেই স্নেহ। তবে কোনওদিনই সামনে আসবার প্রয়োজন হয়নি। সেইজন্য আজ সামনে আসতে অপরিচয়ের এই শালীন বেড়া।

ঝিনুক চা এনে দিল। বললাম, আর কেউ খাবে না? একলাই খাব?

 ভবেন বলল, আমি তো চায়ের ভক্ত কোনওকালেই নই। ও তো ওষুধ খেয়ে এসেছে।

দেখলাম, আনিদি তখনও দরজায় দাঁড়িয়ে। এবং ঘোমটার ফাঁক দিয়ে আমাকে দেখার কৌতূহল মেটাচ্ছে।

জিজ্ঞেস করলাম, ভাল আছ আনিদি।

ঘোমটার ভিতর থেকে জবাব এল, আছি বাবা। তুমাকে আর দেখব আশা ছিল না। সব্বাই বুইলছে, তুমার ফাঁসি হয়্যা যেইছে।

ভবেন যেন দোষ ক্ষালনের মতো তাড়াতাড়ি বলে উঠল, সেই সব্বাইটা কে আনিদি? আমাকে তো তুমি কোনওদিন কিছু জিজ্ঞেস কর নাই।

আমিদি বলল, গাঁওয়ের লোকে যে বুলে!

আমি হাসলাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম, ঝিনুক তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

বললাম, কিন্তু আনিদি, বিশ্বাস করো, ফাঁসি হয়নি। ওই দেখো, আমার ছায়া পড়েছে দেয়ালে।

আমার আর ভবেনের হাসি উচ্চকিত হয়ে উঠল। কেবল ঝিনুক হাসেনি। আনিদির শরীর তখনও হাসিতে কাঁপছিল। বলল, সি কথা বুলি নাই বাবা। ও ডাকারা তুমাকে ফাঁসি দিতে পারবে ক্যানে?

ছায়ার কথায় হাসির কারণ আর কিছুই নয়। এ এক সংস্কার গ্রাম্য মানুষের, ছদ্মবেশী প্রেতমূর্তির ছায়া পড়ে না। কারণ, আসলে তো সে বাতাস। ওর কোনও কায়া নেই।

আনিদি আবার বলল, বস, আমি যাই।

চলে গেল আনিদি। তবু একটু সময় যেন আমরা সবাই স্বাভাবিক হতে পেরেছিলাম। ভবেনের কথানুযায়ী আমরা অনেককাল পরে তিনজনে একত্র হয়েছি বটে। ঝিনুকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইহকালের সবই ক্ষণকালের জন্য। না হয় তাই হল। আজ এই ক্ষণটিতে আমরা একটু নতুন করে হাসতে পারি নে? আমরা তো শালঘেরির তিন সন্তান।

পরমুহূর্তেই আবার আমার মনে কুটিল অন্ধকার ঘিরে আসতে চাইল। সত্যি কি বিদ্রূপ করেছে। ঝিনুক। হয়তো বিদ্রূপই করেছে। সবই যে ক্ষণকালের, এই উপদেশ সে আমাকে দিয়েছে। যা ছিল, তা নেই।  

থাকবে না। কিন্তু জোর করে তাকে ধরে রাখব বলে শালঘেরিতে ফিরিনি। যা আছে তার সঙ্গে আছি। সেই ক্ষণিক যদি শুধু রং ফেরানো হয়, তবে আকাশে কত সময় কত রং-এর খেলা। তাকে আমি মুছতে পারিনে। নিজের হাতের তুলি দিয়ে বদলাতে পারিনে তার রং। সে যা, তাই দেখে আমার সুখ, আমার দুঃখ।

আকাশ আকাশের মতো থাকুক। আমি ঘুরে বেড়াব তার তলায়। ভবেন আমার বন্ধু। ঝিনুক আমার বন্ধুপত্নী। এই সত্যের কাছে কোনও ঠাঁই নেই নির্দেশ উপদেশ ইঙ্গিতের।

আমি বললাম, কী রে ভব। তারা যে সব চুপ করে রইলি?

ভবেন বলল, আজ তোর পালা টোপন।

এবার যেন ঝিনুক একটু স্বাভাবিকভাবে বলল, জেলের কথা বলো টোপনদা।

বললাম, জেলের কথা বলার কিছু নেই ঝিনুক। এক ঘর, এক দেয়াল। একই জায়গার মধ্যে সারাদিনের ঘোরাফেরা। গুনে চলবার দরকার ছিল না, ডাইনে বাঁয়ে সবসুদ্ধ কত পা চলব, তা আর গুনে রাখতে হত না, সেটাও রপ্ত হয়ে গেছল। আর প্রতি দিন, প্রতি মাসে বছরে বছরে একই মানুষের মুখ দেখা।

বলে হেসে ফেললাম। বললাম, সন্দেহ হত, জেলে আমাদের সীমানায় একই কাক শালিকেরা রোজ আসত। টের পেতাম একটা কাকের নাকে ছিল লোহার তারের নোলক। তাকে নানান জনে নানান নাম দিয়েছিল। তবে অধিকাংশের কাছে সে ছিল কাকের বউ কাকিনী। সে মেয়ে ছিল কি পুরুষ ছিল, সেটা আমরা জানতাম না। তার ওই তারের নোলক দেখে আমরা মনে করতাম, সে মেয়ে। খাবার কুড়োবার দরকার না থাকলেই দেখতাম, একটা নিমগাছের ডালে বসে সে তার চোখা ঠোঁটখানি বাড়িয়ে ধরত, আর তার সঙ্গীটি খুঁটে খুঁটে নোলক খোলার চেষ্টা করত। যেন মানুষের পরিয়ে দেওয়া লোহার বেড়ি থেকে কাকটা তাকে মুক্ত করতে চাইত। কিন্তু পারত না।

বলে আমি হাসলাম। ভবেন হাসল উচ্চ গলায়। ঝিনুকের ঠোঁটের কোণে যে হাসিটুকু কুঁকড়ে রয়েছে, তাতে হাসির চেয়ে দুর্বোধ্য বার্তার লক্ষণই বেশি।

ভবেন বলল, বাংলাতে তোর দখল আমার চেয়ে বেশি দেখছি। কাক কাকিনীর ভাল উপ্যাখ্যান বলেছিস।

ঝিনুক বলল, কিন্তু কাকের ঠোঁট তো খুব চোখা আর ধারালো। তাও কাটতে পারল না?

কথাটা বলেছিলাম পরিষ্কার মন নিয়েই। সন্দেহ হল ঝিনুকের কথা শুনে। এ কি সেই তার আলো-আঁধারির ভাসা।

কিছু না ভেবেই ভবেন বলল, সেটি পারবে না। এদিকে তুমি জানালায় তারের জাল দাও, ঠিক খুঁটে খুঁটে ছিঁড়ে ফেলবে। তবে আমাদের শালঘেরিতে কাকের উৎপাত কম। জেলা শহরে দেখেছি কুটোগাছটি ভোলা রাখবার জো নেই।

আমি বললাম, হিসেব নিলে বোধ হয় দেখা যাবে, কাকেরা শহরেরই বাসিন্দা। গ্রাম ওদের খুব পছন্দ নয়।

ঝিনুক বলল, আর কী করতে জেলে সারাদিন?

–জেলে কিছু করা যায় বলে আমার মনে হয় না। কেন না, জেলে আছি, এ কথাটা কখনও ভুলতে পারতাম না। করতাম যা, তা একটু পড়াশুনা।

–তোমার ওই আবিষ্কারের তত্ত্ব?

–তা বলতে পার। একটা মূলধন না হলে মানুষের চলে কেমন করে?

 ঝিনুক আমার চোখের দিকে এক বার তাকিয়ে, চুপ করল।

আমি বললাম, সে কথা যাক। শালঘেরির কথা শুনি।

 ঝিনুক বলল, আমাকে বলছ?

–তুমিই বলো।

ঠোঁট উলটে একটু হেসে বলল, শালঘেরির কোন রাস্তা কোনদিকে তাই বোধ হয় ভুলে গেছি। মাঝে মাঝে পুবপাড়ায় মায়ের কাছে যাই। আর কিছুই জানি না।

আমি বললাম, তা তো হবেই। সেদিন ছিলে গাঁয়ের মেয়ে, এখন বউ।

ভবেন বলল, তা নয় টোপন। শালঘেরির বউয়েরাও ঝিনুকের চেয়ে আজকাল বেশি সংবাদ রাখে গাঁয়ের।

ঝিনুক জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে তাকাল। আর আমার মনে হল, কোথায় যেন একটা বেসুর বাজছে। ভেবেছিলাম, ঝিনুক ভবেনের মাঝখানে, আমি মূর্তিমান বেসুর হয়ে বাজব হয়তো। হয়তো তাই বেজেছি। কিন্তু আরও একটা বেসুর যেন ফাঁকে ফাঁকে ধ্বনিত হয়ে উঠছিল, যা আমার অগোচরে রয়েছে। যা আমি আগে ভাবিনি। এখনও সংশয়ে ভুগছি। আর এ সংশয় এক বার যেন আমার অবচেতনে খচখচিয়ে উঠেছিল, গতকাল প্রথম ভবেনের সঙ্গে কথা বলে।

আমি প্রসঙ্গ বদলে বললাম, কাকিমা কেমন আছেন?

ঝিনুক বলল, মা আছে এক রকম। মার অনেক দোষ। বাবাকে একটুও ভুলে থাকতে পারে না। সংসারটা তাই গোল্লায় যাচ্ছে।

ঝিনুকের মুখ গম্ভীর দেখাল। বুঝতে পারি, কাকিমার যে দোষের কথা বলছে ঝিনুক, সে কথা বলতে আসলে তার কষ্টই হচ্ছে। উপীনকাকাকে ওঁর বন্ধুরা অনেক সময় ঠাট্টা করে স্ত্রৈণ বলেছেন। যদিও প্রায় জীবনের প্রান্তসীমায় দেখেছিলাম উপীনকাকা আর তাঁর স্ত্রীকে, তবু দুজনকে চিরদিনই আমাদের নতুন প্রেমিক-প্রেমিকা বলে মনে হয়েছে।

অনেক সমারোহ আর আড়ম্বরের মধ্যে আদর্শের বিজ্ঞাপন দেওয়া স্বামী-স্ত্রী দেখেছি। কিংবা অনাড়ম্বরের মধ্যেও যাদের অভ্যাসের বশে চিরদিন নিস্তরঙ্গ জীবন কাটাতে দেখেছি, তাদের সঙ্গে উপীনকাকাদের কোনও মিল নেই। প্রৌঢ় বয়সেও দেখেছি, উপীনকাকার চোখের দিকে তাকাতে গেলে, কাকিমার চোখে একটি সলজ্জ হাসি ফুটে উঠেছে।

কাকিমা বুঝি আজ তাই আর সংসারে মন দিতে পারেন না। যে সংসারের কুটোগাছটি নিজের হাতে সরাতেন, আজ সে সংসার গোল্লায় গেলেও বুঝি তাই আর কাকিমার চোখে পড়ে না।

কই, এক বারও তো ভাবিনি, কাকিমার কাছে যেতে হবে। এমনি করেই বুঝি মানুষের নিজের বিচার নিজের কাছে হয়। মনের ছোট বড় দেখা যায় এমনি করে। নইলে, সকালবেলা এক বারও কেন ভাবিনি, উপীনকাকা মারা গেছেন। কাকিমার কাছে এক বার যেতে হবে।

অনুশোচনার ভোগান্তিটুকু তোলা রইল কাল সকাল পর্যন্ত। আমি এসেছি, তবু যাইনি। কাকিমা কী না জানি ভাবছেন।

জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ভাই অমু, সে কী করছে আজকাল?

 ঝিনুক বলল, শহরে আছে। এবার আই-এ দেবে।

অমু উপীকাকা আর কাকিমার একটি মিলিত ছবি। কিন্তু ঝিনুককে আমার চিরদিন তার প্রতিবাদ বলে মনে হয়েছে। বোধ হয় উপীনকাকার মধ্যে কোথায় ঝিনুকের জড় লুকানো ছিল। যা ছিল তাঁর মধ্যে চাপা, তাই নিয়ে প্রকাশিত ঝিনুক। ঝিনুকের এই চরিত্রও।

এর পরে এল ভবেনদের প্রসঙ্গ। বোঝা গেল, ঝিনুককে পুত্রবধূ হিসেবে মন থেকে নিতে পারেননি ভবেনের মা। তাই তাঁর অধিকাংশ সময় কাটে শুভেনের কাছে দিল্লিতেই। কথাটা ভবেন হেসে উড়িয়ে দিতে চাইল। ঝিনুক তা দিল না। তার কথা থেকে বোঝা গেল, ভবেনের মায়ের অসন্তুষ্টির কারণ, তাঁর বিশ্বাস, ভবেন তার স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামীর সম্মান ও শ্রদ্ধা পায় না। শাশুড়ি হিসেবেও তিনি তাঁর কল্পিত পুত্রবধূকে পাননি ঝিনুকের মধ্যে।

ভবেন হয়তো প্রতিবাদ করতে চাইল। সংকোচে দ্বিধায় অস্বস্তিতে হাসল। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা যেন খুঁজে পেল না।

ইতিমধ্যে আনিদি ঘোষণা করল, রান্না শেষ। বড় বউ বললে সব ওপরে নিয়ে আসতে পারে।

আমি বললাম, ওপরে কেন কষ্ট করে বয়ে নিয়ে আসা? নীচেই যাই।

 ঝিনুক বলল, খাবারগুলোই শুধু ওপরে বয়ে নিয়ে আসতে হবে। আর সব ব্যবস্থাই এখানে আছে।

ভবেন বলল, নিতান্ত খেতেই বসব না। একটু জমিয়ে বসতে হবে তো।

ঝিনুক উঠে রান্নাঘরে যেতে যেতে ভবেনকে বলল, চেয়ারগুলো একপাশে সরিয়ে দাও।

আমাকে উঠতেই হল এবার খাটে। খাবার বোধ হয় ইতিমধ্যেই পাশের ঘরে পৌঁছানো হয়ে গিয়েছিল। মেঝেতে আসন পেতে জল দিয়ে ঠাই করে দিয়ে গেল আনিদি। পরিবেশন করল ঝিনুক। খাবার আয়োজনের কথা না ভোলাই ভাল। কোনও নিয়মকানুনের ধার না ধেরে ওটা বেহিসেবি হয়ে গেছে। মাছ মাংস নিয়ে সপ্ত ব্যঞ্জনেরও বেশি। পায়েস পিঠেও বাদ যায়নি। সবকিছু প্রায় শিল্পসম্ভারের মতোই চারপাশে সাজিয়ে দিল ঝিনুক। নইলে বুঝি মানায় না।

এ বাড়িতে এ আমার নতুন খাওয়া নয়। রান্নাঘরে বসেও খেয়ে গেছি, কিন্তু এমন নিখুঁত সাজানো গোছানো আয়োজনের মধ্যে নিমন্ত্রণের মতো খেতে হয়নি।

ভবেনের চেয়ে আমার যেটুকু বাড়তি ছিল, সেটুকু হল একটি কাঁচালঙ্কা আর বাটিতে একটু বড়ির ঝাল। বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা ঝিলিক হানল যেন কোনও এক দুরের অন্ধকারে।

না, তা নয়। যেন অনেক দিন আগের একটি ছোট কথার স্মৃতি কেউ বেড়ে দিয়েছে সামনে। লঙ্কা কোনওদিন দুচক্ষে দেখতে পারিনে। বড়ির ঝালটা অত্যন্ত প্রিয়।

চকিতে একবার ঝিনুকের দিকে তাকালাম। কিন্তু ঝিনুক যেন খাবার বেড়ে দেবার ব্যাপারেই ব্যস্ত। থাক, সে কথা আজ ভাবব না। বড়ির ঝালের বাটিতে হাত দিয়ে, তবু আর একবার চোখ তুলে দেখি, আমার দিকে নয়, ঝিনুক বাটিটার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তাকালাম বলে সে ভবেনের দিকে তাকাল।

ভবেন হেসে বলল, ওই অকিঞ্চিৎকর জিনিসটা ঝিনুক তোর জন্যে স্পেশাল করেছে।

বলেও ভবেনের হাসিটা থামল না। হাসতে হাসতেই বলল, তার সঙ্গে একটা পরীক্ষাও হয়ে গেল।

–পরীক্ষা?

–হ্যাঁ। জানা গেল, এখনও রান্নার ঝাল ছেড়ে শুধু লঙ্কা ধরিসনি।

বলে আরও হাসল ভবেন। ঝিনুক গিয়ে একটি চেয়ারে বসল। সেও হাসছিল। কথাগুলি আমার এমন কিছু খারাপ লাগল না।

কিন্তু ভবেনের উচ্চ গলার হাসির মধ্যে সেই বেসুর যেন বড় বেশি চড়া সুরে বেজে উঠল।

আমাদের পিছনে সেই বড় আয়না। চেয়ারের ওপর সামনে ঝিনুক। পায়ে তার আলতা লক্ষ করেছিলাম। এখন শালীন হওয়ার জন্যে লাল পাড় দিয়ে ঢাকা দিয়েছে। যদিও সে মাটিতে বসেনি। এই দরবারের দুই বশংবদ প্রজার সামনে সে চেয়ারে বসেছে যেন মহারানির মতো।

ঝিনুক মাটিতে না বসায় মনে মনে অবাক হলাম। রীতি সহবতের দিক থেকে সেটাই শোভনীয় ছিল। কিন্তু ঝিনুককে তাতে কতখানি মানাত জানি না। সে যেন ঠিক মানানসই জায়গাতেই বসেছিল।

আমি খাবার মুখে দেবার আগে বললাম, কিন্তু ভব, এ যে একেবারে সপ্তকাণ্ড রামায়ণ করে ফেলেছিস। এ কি বলি দিবি বলে শেষ খাওয়া খাওয়াচ্ছিস নাকি।

ভবেন ভাত মাখতে গিয়ে থেমে বলল, রাস্কেল তুই একটা।

ঝিনুকের আঁচল খসল। তুলে নিল না। এক হাত ওর হাতলে, আর এক হাত কোলে। ফরসার ওপরে যেন সুবর্ণচ্ছটার একটি ঝংকার ছিল। কিশোরী ঝিনুককে যখন দেখেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল, কচি পাতায় ঝলক ওঠা রোদ সেটা। তারপরে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছে, আমাদের এই শালঘেরির রক্তমৃত্তিকায় রোদের ঝিলিকের মতো।

জেল থেকে নতুন কিছু হয়তো দেখতে শিখিনি। অনেক দিনের কারাবাসী বঞ্চিত চোখ আমার অবাধ্য হয়ে উঠল। যা আমি সোজাসুজি তাকিয়ে দেখতে কুণ্ঠিত, আজ আমাকে চুরি করেই দেখতে হচ্ছে সেই রোদের খেলা। এই শীতের রাতে, শালঘেরির এই দোতলা ঘরটায় আমার মনে হল, ঝিনুকের অনাবৃত শরীরের অংশে রোদ লুকোচুরি করছে। সেই রোদ মিটিমিটি হাসছে যেন আমারই দিকে চেয়ে।

ঝিনুক বলল, জেলে কখন খেতে?

যখনই হোক, রাত নটার মধ্যে।

 –ভাগ্যিস সেখানে নিয়মকানুনের বালাই ছিল।

না থাকলে?

–প্রাণ খুলে অনিয়ম করতে।

ভবেন বলল, এইবার তার শোধ নেবে টোপন। মতলব যা করে এসেছে, তাতে নিয়মকানুনই ভূতের মতো তাকিয়ে থাকবে ওর দিকে। হ্যাঁ, মাছ কেমন খাচ্ছিস টোপন?

–খুব ভাল।

-ওঃ, সে এক মজার গল্প! আজ মাছের জন্য টক্কর লেগে গেছল তোর পিসির সঙ্গে। সামনাসামনি নয়। ফ্যাসাদে পড়েছিল বৈকুণ্ঠ।

কী রকম?

–বৈকুণ্ঠ একটি মাছ ধরেছে ওই বেলায়। সেটি গিয়ে দাবি করেছে আমাদের ইন্দির। আর জানিস তো, আমাদের ইন্দিরের গাড়ি নেই, ঘোড়া নেই, চাবুকখানি আছে। ছাড়বে না কিছুতেই। বৈকুণ্ঠর মহা মুশকিল। বলেছে, অই টোপন ঠাকুর আইসছে এত বছর বাদে ফাঁসি থিকে ছাড়া পেয়া, ওয়াঁকে দিতে লাগবে যে?ইন্দির তারে বাড়া। বলেছে, আরে রাখ তোর টোপন ঠাকুর। তার চেয়ে অনেক বড় মানুষ আসবে আমার কত্তার বাড়িতে। হয় আর একটি ধর, না হয় ওটাই দে বৈকুণ্ঠ। বেচারির মহা মুশকিল। বাজারও তখন কানা। অত বড় সরোবর, আবার জাল ফেলাও চাট্টিখানি কথা নয়। শেষে, ইন্দিরকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিরস্ত করে, সারা দুপুর বেচারি পরিশ্রম করেছে। আমাদের পুকুরে এসে জাল ফেলে এই মাছ ধরে দিয়ে গেছে। যাবার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমার বাড়িতে আবার কে আসবে গ ঠাকুর?

খুব গম্ভীর হয়ে বললাম, সীমন্ত চাটুজ্যে। বৈকুণ্ঠ বললে, তিনিটি আবার কে? বললাম, সে তুমি চিনবে না। আমাদের আসল লোক।

বলে ভবেন ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে হাসল। ঝিনুক তাকাল আমার দিকে।

আমি বললাম, আমিও তোকে তাই বলছি। কেন, এ খাওয়াটা আমাকে দুদিন বাদে খাওয়ালে কী হত? পালিয়ে যাচ্ছিলাম নাকি শালঘেরি থেকে?

ঝিনুক বলল, ও দোষটা তুমি আমাকে দাও। আমিই আসতে বলেছিলাম।

অতএব এর ওপরে আর কথা চলে না। ঝিনুকের গলায় মেঠো গানের সুর নেই। কিন্তু সুর আছে। উচ্চাঙ্গ সংগীতের আলাপের মতো সেই সুর, সবসময় ভবিষ্যতের অর্থ বহন করে। সহজ করে বললে বোঝায়, ঝিনুক যা বলছে, ওতে সে কোনও তাল মানের ভুল রাখেনি। যা শোনা গেছে, তারপরে নীরব থাকাই শ্রেয়।

ভবেন বলল, আর দুদিন বাদে খাওয়ালে হত মানে কী? তা তো তোকে খেতেই হবে?

অবাক হলাম। কোনও উৎসবের কথা ভেবে বললাম, কেন, কী আছে?

 ভবেন বলল, কী আবার থাকবে, কিছুই না। আসতে হবে তোকে রোজই।

তাই ভাল। বললাম, কাজকর্ম ছেড়ে ভবেন ঘোষালের অন্ন ধংসাব বসে বসে।

কাজকর্ম ছেড়ে কেন? কাজকর্ম করেই।

এ ক্ষেত্রে ঝিনুক নীরব। আর ভকেনকে বুঝতে পারছি। ওর সেই অপরাধবোধটা ওকে ছাড়ছে না। মনের ফাঁপরটা কাটাবার জন্যে এত তালবেতালের কথা।

খাওয়া হল। বাইরের বারান্দায় আচাবার জল ঢেলে দিল ঝিনুক। আপত্তি শুনল না। গামছা তুলে দিল হাতে। কিন্তু অস্বস্তি হল, ভবেনকে নিজে নিজে সব করতে দেখে। যদিও নিজের বাড়ি তবু ঝিনুকের একটা কর্তব্য আছে নিশ্চয়ই। আমার মনে হল, ভবেন যে আছে, সেটাও যেন ওর মনে নেই। এ নির্বিকার তার স্বামীর প্রতি অবহেলা, না, আমি সামনে আছি বলে সংকোচ? কিংবা, এ আমারই দেখার ভুল মাত্র হবে। তবুভবেনের মুখে যে একটি অসহায় আড়ষ্টতা রয়েছে, সেও কি আমার দেখার ভুল!

ঝিনুক পান দিতে এল। বললাম, ওটা আমি কখনও খাইনে ঝিনুক। ভবকে দাও।

 ঝিনুক বলল, খাও না জানি। আজ খাও। ওকে দিচ্ছি।

ঝিনুকের বাক্যটা সম্পূর্ণ করলে বলতে হয়, আজ তোমাকে ওটা কষ্ট করে খেতেই হবে। কেন? ঝিনুক নিজের হাতে সেজেছে বলে! তা ছাড়া ঝিনুকের এ সব গিন্নিত্বের গুণ কোনওদিনই দেখিনি। বসে খাওয়ানো, আচাননা, মোছানো, পান দেওয়া। উপীনকাকার বাড়িতে ও সব চিরদিন কাকিমাই করেছেন। বরং শুনতে পেয়েছি, কাকিমা বলতেন, এ মেয়ে যে বাড়িতে যাবে, সেই বাড়ির কপালে কী আছে ভগবান জানেন।

যদিও তিনি এবং আমরা সকলেই নিশ্চিন্ত ছিলাম, সে বাড়ির শুভই হবে। কারণ, ঝিনুক সম্পর্কে সকলের একটি বিশ্বাস ছিল।

ভবেন বলল, গড়গড়া টানবি টোপন? ভাল তামাক আছে।

তুই কি তামাক ধরেছিস নাকি?

মাঝে মাঝে খাই, যেদিন ইচ্ছে যায়। ইন্দির সাজেও ভাল।

বললাম, বেশ স্কুল মাস্টার হয়েছিস। কিন্তু আজ নয়, আর একদিন খাব। এবার যাই।

ভবেন বলল, দাঁড়া, ওঘর থেকে চাদরটা নিয়ে আসি। বাইরে এই জামা দিয়ে আর চলছে না।

ঝিনুক পা দোলাচ্ছে খাটে বসে। ধীরে ধীরে দোলাচ্ছে। হাতের ভর দিয়ে পিছন দিকে হেলে বসেছে সে। আমি জানি ও এখন তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

এই পা দোলানো ভঙ্গিটা অনেক দিনের চেনা। মনে আছে, কাকিমা দেখতে পেলেই বলতেন, পা দোলাসনি ঝিনুক। মেয়েদের পা দোলাতে নেই।

কখনও কখনও ধমক খেতে হত। কিন্তু ঝিনুকের মনে থাকত না। বিব্রত লজ্জায় হেসে উঠত। আর কোপ কটাক্ষে পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখত। যেন, যত দোষ পায়েরই। অথচ ঝিনুক যখন হাসত, কথা বলত, তখন স্থির হয়েই থাকত। তাই আমার জানা ছিল, কোনও কারণে চিন্তিত থাকলে, রাগ হলে, কিংবা মনের মধ্যে উত্তেজনা অস্বস্তি থাকলে, ও নীরব হয়ে যেত। পা দুলিয়ে যেত সমানে, নিজেরই অজান্তে। আর সেই সঙ্গেই, চুল খোলা থাকলে, পাকের পর পাক চলত আঙুলে, গলায় জড়াত ফাঁসের মতো। যেন ভোলা চুলগুলি নিয়ে কী করবে, ভেবে পেত না।

এখন ঝিনুকের চুল খোঁপা বাঁধা। তবু কী আশ্চর্য বিচিত্র মানুষের মন। মনে মনে যেন একটু সান্ত্বনা পেলাম এই ভেবে, ঝিনুকের এই এত সাবলীল স্বচ্ছন্দ ব্যবহারের মধ্যেও তার অসহজতা ধরা পড়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ পা দোলানিটা থামল। শুনলাম, ঝিনুক ডাকল, টোপনদা।

আমি সহজভাবেই ফিরলাম।

দেখলাম, ঝিনুক আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। সেইদিকে চোখ রেখেই বলল, না আসার পণ করনি তো মনে মনে?

-এই তো এসেছি।

আজকের দিনটা বাদ। ও পণ যেন রেখো না মনে।

সুর শুনে বোঝবার উপায় নেই, ঝিনুক আমাকে নির্দেশ দিচ্ছে, না অনুরোধ করছে। হয় তো এ ওর শঙ্কা। নাকি জেদের অগ্রিম বার্তা, জানিনে। কিন্তু অমন পণ করে অকারণ আমি কোথাও কোনও প্রশ্ন সৃষ্টি করতে চাইনি।

বললাম, কাজের পণ ছাড়া আর কোনও পণ নিয়ে ফিরিনি ঝিনুক।

-তাই বুঝি?

ঝিনুক চোখ ফিরিয়ে তাকাল। সহসা যেন আমার বুকের রক্তে একটা দোলা লেগে গেল। ঝিনুককে দেখে, ওর দেহের যে বর্ণনা মনে মনেও উচ্চারণ করিনি, তা-ই যেন আমার দীর্ঘকালের পুরুষ-প্রাণের মৌনতাকে মুখর করে তুলল। ও তিলোত্তমা নয়। কিন্তু ওর দেহের মধ্যাংশ থেকে, উধ্বাঙ্গের বক্ষ গ্রীবা, নিম্নাংশের কটি উরু ও জংঘা সব কিছুতেই একটি যেন মাপ করা ছন্দের বিন্যাস। যে বিন্যাসের মধ্যে একটি অনায়াস, তীব্র আকর্ষণের দ্যুতি। ঝিনুকের বসার ভঙ্গিতেই কিনা জানিনে, নতুন করে চোখে পড়ল যেন।

ওর কথার জবাবে হ্যাঁ বলে, তাড়াতাড়ি চোখ ফেরাতে গেলাম। হঠাৎ ঝিনুক খাট থেকে উঠে একেবারে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, দেখি, এটা কীসের দাগ, এই ঠোঁটের নীচে, চিবুকের কাছে? এটা তো ছিল না?

আমি চমকে উঠলাম। নিশ্বাস ফেলতে পারলাম না। একটি অস্পষ্ট গন্ধ আমার বুকের মধ্যে আবর্তিত হতে লাগল। মুখ তুলে, দরজা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। বললাম, কোথায়?

ঝিনুক বলল, এই যে, এখানে। দেখিনি তো আগে?

মনে পড়ল আমার। বললাম, ও, হ্যাঁ, দাড়ি কামাতে গিয়ে ব্রণ কেটে ফেলেছিলাম। সেফটিক হয়ে গেছল।

কথা শেষ করবার আগেই আমার চোখে পড়ল, বাইরের বারান্দার অন্ধকারে একটি অস্পষ্ট মূর্তি যেন থমকে দাঁড়াল। কিংবা ভুল দেখলাম। ভয় উত্তেজনা অস্বস্তি, এ সব কিছু ঢাকবার জন্যেই যেন আমি বিমূঢ়ভাবে হেসে উঠলাম। ডাকলাম, ভব, ভব।

এবং সত্যি, ভবেন ঢুকল ঘরের মধ্যে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে, চাঁদরের ভাঁজ খুলতে খুলতে, পান চিবুতে চিবুতে, আর হাসতে হাসতে। বলল, কী হয়েছে চিবুকে?

বলে সে আমার আর এক পাশে এসে দাঁড়াল। ঝিনুক কিন্তু একটুও সরল না। ভবেনকে বলল, নতুন দাগ।

ভবেন বলল, জেলের দাগ।

দু পা পেছিয়ে আমি বললাম, দাগের বিচার থাক। এবার চলি। কিন্তু ভব, তুই আর এই রাত করে, ঠাণ্ডায় বেরুতে যাচ্ছিস কেন?

ভবেন বলল, বরাবর যা করেছি, তাই করব। চল, এই পাড়াটা পার করে দিয়ে আসি।

বরাবর ভবেন তা-ই করেছে বটে। রাত করে ওদের বাড়ি এলে পাড়ার বাইরে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। আমিও আমাদের দেবদারুতলা পার করে দিয়ে যেতাম ওকে। ভবেন সেই পুরনো দিনের নিয়মগুলিই আজও বজায় রাখতে চায়। কিন্তু এই নতুন পরিবেশে, পুরনো নিয়ম কি চলবে!

ভবেন যেন অনুমতি নিচ্ছে, এমনি করে ঝিনুককে বলল, আমি তা হলে টোপনকে এগিয়ে দিয়ে আসি।

ঝিনুক কোনও জবাব না দিয়ে হাত বাড়িয়ে বাতিটা তুলে নিল। ভবেন এগিয়ে গেল দরজার দিকে। তখন ঝিনুকের গলা শোনা গেল, রাস্তার মাঝখানে গল্প করে রাত কাবার করে এসো না যেন।

ভবেন দরজার বাইরে থমকে দাঁড়িয়ে বলল, না, না।

তারপরে হঠাৎ হেসে উঠল। হাসতে হাসতে, পা বাড়িয়ে বলল, আয় টোপন।

ভবেনের চড়া গলার হাসিতে একটা অস্বস্তিকর বিস্ময় ঘিরে ঘিরে এল আমার মনে। কিন্তু ঝিনুককে না বলে পারলাম না, গল্প করে রাত কাবার তো দুরের কথা, আমি ওকে দু পা গিয়েই ফিরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

ঝিনুক চকিতে এক বার চোখ তুলে তাকাল আমার দিকে। একটি চিকুরহানা ঝিলিক যেন দেখলাম ওর ঠোঁটের কোণে। বলল, কথাটা তোমাকেও বলেছি। বাইরে দাঁড়িয়ে হিমে গল্প করলে তোমারও শরীর খারাপ হবে।

ও বাতি নিয়ে এগিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল আমার আগে আগে।

 দালান পার হয়ে উঠোনে এলাম। ঝিনুক আমার পিছনে পড়ল। বাইরে যাবার পথে, একটি মূর্তি দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম, কালো একটি গোটা পুরনো কম্বল মানুষের অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফাঁক দিয়ে মুখ দেখা যায়। কালো রেখাবহুল মুখ। চোখ দুটি যেন হলুদ বর্ণ। গুটিকয় অবশিষ্ট বড় বড় দাঁতের হাসি দেখতে পেলাম। পায়ের কাছে প্রায় ঝুঁকে পড়ে নমস্কার করতে এল।

চিনতে পারলাম। বললাম, ইন্দির যে। থাক থাক। কেমন আছ?

কালো লোল চামড়া হাতখানি কম্বলের মধ্যে ঢুকিয়ে, ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, ভাল মন্দ বুঝি না। বেঁচে রয়েছি, তাই আছি। তুমি ফিরে এসেছ তা হলে?

–কেন, ফিরব না ভেবেছিলে নাকি?

— হ গ দাদা, শুনেছি, আর তুমি ফিরে আইসবে না। তুমি নিকি পুলিশ খুন করেছ, তাই গরমেন্ট তুমাকে ফাঁসি দিবে।

অবাক হয়ে বললাম, পুলিশ খুন করেছি? কে বললে?

ইন্দির বলল, সবাই বুলছে। গড়াইয়ের আনিরুদদাদাকে যেমন গুলি করে মেরেছে, তুমাকে তেমনি ফাঁসি দিয়ে মারবে, সবাই বুলছে।

হাসতে গেলাম। কিন্তু তেমন যেন প্রাণ খুলে হাসতে পারলাম না। এ কি শুধু জনতার গুজব যে, আমি পুলিশ হত্যা করেছি, আমার ফাঁসি হবে। জনসাধারণ তো বীরত্বের জয়গান করতেই ভালবাসে। দেশপ্রেমিকদের শ্রদ্ধা করতেই অভ্যস্ত। অথচ এই পুলিশ হত্যা ও ফাঁসির গুজবের পিছনে যেন তেমন সুরটা বাজে না।

ইন্দির আবার বলল, আর দ্যাখ ক্যানে দাদা, ছোটা গাঁ-খানি যেন তুমার নাম বিস্মরণ হয়ে যেইছে।

কথাটা নিষ্ঠুর চাবুকের মতো ঘা দিল আমার মুখে। যেন সকল প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে, আমার মুখের সমস্ত আলো নিভিয়ে দিতে চাইল। জানিনে, মুখের চেহারা কেমন হল। আমি হেসে উঠলাম। ঝিনুক আমার পিছনে আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে। ইন্দিরের কথা ওর ওপরে কী ক্রিয়া করল, মুখের ছবিতে তা দেখতে ইচ্ছে করল। সাহস পেলাম না। কিন্তু জানি, ইন্দিরের মতো মানুষেরা ও কথা বিশ্বাস করেছিল। আমার অস্তিত্বকে তারা সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ভুলে গিয়েছিল প্রায়। কিছুটা হয়তো, অশিক্ষা কুসংস্কার থেকেই হয়েছিল। তবু যা তাদের বিশ্বাস, সে কথা বলতে বাধে না।

বললাম, চোখে দেখলে আবার হয়তো স্মরণ পড়বে ইন্দির।

ইন্দির বলল, নিচ্চয়। দেখলে কী গ, শুনেই সবাই বলতে নেগেছে। এই ধরে নিয়ে যাবার পর ছ মাস যে তুমার কুন খবর পাওয়া যায় নাই, তাইতেই অমন হল। তা কী রকম কী বুঝলে?

অবাক হয়ে বললাম, কীসের কী বুঝব ইন্দির?

–এই তুমার গা, যি জন্যে গেছেলে? স্বাধীনতা গ স্বাধীনতা।

এত বড় প্রশ্নটা আমাকে এ পর্যন্ত আর কেউ করেনি। সত্যিই তো! সাড়ে তিন বছর যে মানুষ রাজনৈতিক কারণে জেল খেটে আসে, ইন্দিরের মতো মানুষেরা তাকেই সে কথা জিজ্ঞেস করবে বইকী। আমার আত্মবিস্মৃত অবস্থাটাকে যেন খুঁচিয়ে সজাগ করে দিলে ইন্দির। পঁয়তাল্লিশ সালের শেষ দিকে কলকাতা ও বম্বের বিক্ষুব্ধ আন্দোলনের কথা আমার মনে পড়ল। তখন জেলে আমরা খবরের কাগজ পড়তে পেতাম না। পূর্ণ স্বাধীনতা দাবির ঘোষণার কথাও এখন যেন মনে পড়ল। তবু কতটুকুই বা ভেবেছি। কথা বলার যোগ্যতায় সত্যি মিথ্যে কিছু বলা যায় ইন্দিরকে। মুশকিল হচ্ছে ইন্দির রাজনীতি করে না, খবরের কাগজও পড়ে না। আমার কথাটাকে সে ধ্রুব বলে বিশ্বাস করে নিতে পারে।

তাই একটু সংশয় রেখেই বললাম, খুব বেশি কিছু বুঝিনি ইন্দির। তবে, লোকের ধৈর্যের বাঁধ বোধ হয় ভাঙছে। ইংরেজদের এবারে পাততাড়ি গুটোতে হতে পারে।

ইন্দির স্বাধীনতা বলতে কী বোঝে জানিনে। জানিনে, ইংরেজ থাকায় সে যা আছে, না থাকলে কী হবে। কপালের কাছে হাত তুলে বলল, দ্যাখ, অখন মা শালেশ্বরীর কী ইচ্ছা। তবে এত কষ্ট করেছ, তা কি বিফলে যাবে? তা যাবে না। এবার নিচ্চয় দেশখানি স্বাধীন হবে।

দেখলাম, ইন্দিরের হলদে কোল-ঢোকা চোখ, দৃষ্টি সমুখের কোনও কিছুতে আবদ্ধ নেই। বহু দূরে, উদ্দীপ্ত চোখে যেন সে তার স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখছে। তখনও তার ঘাড় দুলছে।

দেশপ্রেমিক মুক্ত রাজবন্দি আমি। বিস্মিত হয়ে ভাবলাম, এই স্বপ্নে দেখা, ইন্দিরদের সেই স্বাধীন দেশটি কেমন। তার চোখ দুটি দেখে তো মনে হয় না যে এ দেশে ইংরেজরা থাকবে না, শুধু সেইটুকুই তার স্বপ্ন। আরও কিছু, আরও অনেক মহৎ, আশ্চর্য, বিচিত্র, সুন্দর। ইন্দিরের কপালের সর্পিল রেখা, মুখের লোল চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে যেন বহুকালের ধ্যানের একটি প্রসন্ন উত্তেজনা। সেই দেশের অনাগত মূর্তিকে যেন সে চেনে।

লজ্জা পাব না, সংকুচিত হব না, দ্বিধা করব না বলতে, ইন্দিরের মতো সেই দেশের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা যেন আমারও নেই। আর অবাক হয়ে ভাবলাম, যে বিদেশিরা দেশকে অনেক অহংকার নিয়ে শাসন করে, তারা কি এই ভারতবর্ষের দূর গ্রামের ইন্দিরদের কথা একটুও জানে? এই কালো উলঙ্গ অশিক্ষিত অসহায় মানুষদের স্বপ্নের কথা! যারা চিরকাল মাথা নুয়ে, কপালে হাত ঠেকিয়ে তাদের সম্মান দেখিয়েছে, অথচ অশ্রদ্ধা অভিশাপ উপচে পড়েছে প্রাণ থেকে।

ইন্দিরের দিক থেকে চোখ ফেরাতে গিয়ে আর একবার যেন মনে মনে চমকে উঠে তার দিকে তাকালাম। আমার যে কষ্টের কথা সে বলেছে, সে মর্যাদার দাবি সহসা তুচ্ছ বোধ হল। আমি জেল খেটে যে কষ্ট পেয়েছি, ইন্দিরের জন্মগত অভিশাপে, সেই কষ্ট এই মানুষের সমাজে অনেক অপমানের গ্লানির মধ্যে ভোগ করেছে সে।

বললাম, ইন্দির, আমার জেল খাটায় এদেশের স্বাধীনতা আসবে না। যদি আসে, তোমাদের পাওয়ানার তাগিদেই আসবে।

ইন্দির কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, উ বাবা, তুমাদিগে না হলে, আমরা কে?

বৈঠকখানার কাছ থেকে ভবেনের গলা ভেসে এল, ইন্দিরদা, আজ ছেড়ে দে, পরে সময় পাবি। ইন্দির বলে উঠল, হঁহঁ, অখন আস গা।

আমি চকিতে এক বার পিছন ফিরে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলাম। ঝিনুক আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল।

বৈঠকখানার এবং অনেকখানি চত্বর পেরিয়ে গেটের কাছে আসতে আসতেও দেখলাম, হ্যারিকেনের আলোেটা পিছন ছাড়েনি। কদমতলায় এসে ঝিনুক দাঁড়াল। ভবেন কয়েক পা আগে এগিয়ে চলেছে।

ফিরে বলতে হল, চলি ঝিনুক।

ঝিনুক বলল, আবার এসো।

কোনও জবাব না দিয়ে এগিয়ে গেলাম। আলো নিয়ে ঝিনুক দাঁড়িয়ে আছে বুঝলাম।

পশ্চিমা শুকনো ঠাণ্ডা বাতাস বেশ জোরেই বইছে। অন্ধকার যেন আরও গাঢ়। দূরে, তামাইয়ের ধারেই হয়তো শেয়ালের ডাক শোনা গেল এক বার। কুকুর ডেকে উঠল কয়েকটা। শুকনো পাতা উড়ছে সড়সড় করে। গোটা শালঘেরিতে যেন একটি মানুষও জেগে নেই আর।

টর্চলাইটের বোতাম টিপতেই শীতার্ত রাতের অন্ধকার যেন বিরক্ত হয়ে একটু পথ ছেড়ে দিল। অন্ধকার এত গভীর যে, সহজে তার নড়বার ইচ্ছে নেই। কিন্তু ভবেন তেমনি আগে আগে এগিয়েই চলেছে। কথা বলছে না। বিমর্ষ বিস্ময়ে, খানিকটা দুঃখে মনে মনে না হেসে পারলাম না। ভবেন কি সত্যি অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল, এবং মনে মনে কিছু ভেবে নিল? তা হলে এত সহজে হাসতে হাসতে আসা যে আমার ব্যর্থ হল। যে অন্ধকারকে চাবুক কষে সরিয়ে রেখেছি, সে আর এক দিক দিয়ে এসে কি আমাকে কালিমা লেপে দিয়ে গেল।

ডাকলাম, ভব, দাঁড়া।

ও দাঁড়াল পিছন ফিরে। ঠিক আমার দিকে ওর চোখ নেই, অথচ আমারই দিকে যেন। এবং ঠোঁটের কোণে একটি দুর্বোধ হাসি। টর্চের আলোয় সহসা চোখে পড়ল, ভবেনের হাতে একটি লোহার ডাণ্ডা। আবার ওর মুখের দিকে তাকাবার চেষ্টা করলাম। স্পষ্ট দেখতে পেলাম না কিছু। শুধু অস্পষ্ট আলোয়, কোলে-ঢোকা লাল চোখ দুটি ওর চকচক করছে।

জিজ্ঞেস করলাম, ওটা কী?

লোহার রড।

 কী হবে?

 নিয়ে এলাম।

তাচ্ছিল্যভরে বলে, ভবেন আমার দিকে চোখ তুলল। বলল, ঝিনুক এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

সেটা আমিও আন্দাজ করেছিলাম। কেন, তা জানিনে। আমরা দুজনেই ফিরে তাকালাম। দূরে, ঝিনুকের হাতে একটি বিন্দুর মতো হারিকেনের আলো দেখা যাচ্ছিল। খুবই অস্পষ্ট হলেও ঝিনুকের অবয়বের একটু ইশারাও ফুটে উঠেছিল। সহসা এক ঝলক তীক্ষ্ণ শীতার্ত বাতাস আমাদের যেন আঁচড়ে দিল। কাছেই একটা তালগাছের শুকনো পাতা সড়সড়িয়ে উঠল। আমি ভবেনের দিকে তাকালাম। ভবেন একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে পিছন ফিরে আবার চলতে লাগল।

এবার আমরা ডাইনে মোড় নিলাম। ঝিনুককে আর দেখা যাবে না। পাড়াটাও ছেড়ে গেল আমাদের। সামনে খোলা বিস্তীর্ণ কাঁকর বালিমাটি প্রান্তর। মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্ত শাল আর তালগাছ।

বললাম, এবার তুই যা ভব।

 ভবেন বলল, চল, এই ফাঁকা জায়গাটা পার করে দিয়ে আসি।

ভবেন যেন কী ভাবছে, গলার স্বরটা ওর খুব স্বাভাবিক মনে হল না। আমি টর্চের আলোটা ফেলে ফেলেই চলছিলাম। সেই আলোয় মনে হচ্ছিল, ওর দৃষ্টি পথের দিকে নয়। শূন্য দৃষ্টি, শুধু আলো দেখে আন্দাজে চলছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ফাঁকা জায়গাটা পার হয়ে এসে, আমি দাঁড়ালাম। কাছেই আমাদের পাড়ার মুখের দেবদারু গাছটা পশ্চিমা বাতাসের দাপটে সা সা করছে।

বললাম, ভব, অনেক রাত হয়েছে, এবার তুই যা। তোর টর্চ আছে?

না।

–তবে এইটা নিয়ে যা।

ভবেন বলল, ছেড়ে দেব তোকে?

তবে কি এত রাতে তুই আমাকে বাড়ি অবধি পৌঁছুবি নাকি?

ভবেন বলল, তাই দিয়ে আসি চল টোপন। আমিও আলো ছাড়া ফিরব না। কিছুদিন ধরে বাঘের উৎপাত গেছে, তামাইয়ের ওপারে শালবনে। এপারেও হানা দিয়েছে কয়েকবার। তাই ডাণ্ডাটা নিয়ে বেরিয়েছিলাম।

চমকে উঠে বললাম, সে কী, এ কথা তো বলিসনি। তুই বা তা হলে একলা যাবি কেমন করে?

ভবেন বলল, আমি যেতে পারব, সে জন্য ভাবিস না। তোকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে, তোরই আলো নিয়ে আমি ফিরব।

বলে সে ডাণ্ডাটা দেবদারু গাছের গোড়ায় রেখে বলল, ফেরবার সময় নিয়ে যাব, চল।

উৎকণ্ঠায় বিমর্ষ হয়ে উঠলাম। পথ চলতে চলতেই বললাম, তেমন যদি জানতিস, তবে ইন্দিরকে সঙ্গে করে বেরুলেই হত।

ভবেন বলল, তার দরকার হবে না। রাত বিরেতে এ গাঁয়ে আমার চলাফেরা অভ্যেস আছে। তুই অনেকদিন চলিসনি।

বাড়ির কাছাকাছি যখন এসেছি, তখন ভবেন তার একটি হাত তুলে দিল আমার কাঁধের ওপর। বুঝলাম না, ওর সেই হাতটি কাঁপছে কি না। আমি ফিরে দাঁড়ালাম। আমিও ওর কাঁধে হাত তুলে দিলাম। টর্চের মুখ মাটির দিকে। অস্পষ্ট আলোয় দেখলাম, ওর কালো মুখ ও লাল চোখ দুটিতে কী একটা অসহায় ব্যাকুলতা যেন মাথা কুটছে।

বললাম, কিছু বলছিস ভব?

বুঝি রাত্রি বলেই ভবেনের গলা চুপি চুপি শোনাল। বলল, টোপন, যেন রেগে উঠিস নে, একটা কথা বলব।

বললাম, বল।

 ভবেন বলল, জেলে যাবার আগে যেমন উপীনকাকার বাড়ি যেতিস, তেমনি আমাদের বাড়ি যাস।

কী বলতে চায় ভবেন। আমি তার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করলাম। নিজের দিকে ফিরে দেখলাম, সেখানে সব অনুভূতিটুকু কখন প্রশ্নহীন শূন্যতায় পৌঁছেছে। কী বলব আমি সহসা ভেবে পেলাম না।

ভবেন আবার বলল, যাবি তো টোপন।

বললাম, ভব, যাব না এ কথা তো এক বারও বলিনি। কিন্তু যা সত্য, তাকে এমন বেঁকেচুরে অনাসৃষ্টি করে লাভ কী? উপীনকাকার বাড়িতে যেমন যেতাম, তোর ওখানেও তেমন করে যাব, এ কথা বললে আমার যাওয়া হয় কেমন করে? সে কি আর সম্ভব! আমি তোর বাড়িতেই যাব ভব।

ভবেন চকিতে এক বার আমার চোখের দিকে তাকাল। বলল, ও, বেশ। তবে তাই যাস। কিন্তু আমি মিথ্যা কথা বলি নাই টোপন। সত্যকে একটুও বাঁকাচোরা করিনি। দে, টর্চটা দে, যাই। কাল আসব।

আলো নিয়ে ভবেন চলে যাচ্ছিল। আমার মস্তিষ্কের মধ্যে যেন সবই এলোমেলো হয়ে একটা অর্থহীন আবর্তের জট পাকিয়ে গেল। ভবেন মিথ্যে বলেনি, সত্যকে একটুও বাঁকাচোরা করেনি, এ সব কথার মানে কী? আমি মনে করি, ভবেন ঝিনুক বিবাহিত দম্পতি। একদা ঝিনুকের একটিই মাত্র পরিচয় ছিল। সে উপীনকাকার মেয়ে। তখন আমি যে-ঝিনুকের কাছে যেতাম, আজ সে-ঝিনুক নেই। এই তো সত্যি। এর মধ্যে আর কোন সত্য লুকিয়ে আছে, যাকে ভবেন মিথ্যে দিয়ে বাঁকিয়ে চুরিয়ে তোলেনি।

আমি ফিরে তাকালাম। আর অন্ধকারে ভবেনের সেই মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে সহসা একটি দুর্বোধ তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা অনুভব করলাম। আমি যেন দেখলাম, সর্বনাশের শেষ ধাপে মুখ গুঁজে পড়ে আছে একটা মানুষ। সেই মুহূর্তেই বোধ হয় অর্থহীন, তবু আমার শূন্য মস্তিষ্কে অদ্ভুত দু-একটা কথা ঝিলিক হেনে গেল। আমি তাড়াতাড়ি ডাকলাম, ভব!

ভবেন দাঁড়াল। আমি এগিয়ে গেলাম। বললাম, একটা কথা তোকে জিজ্ঞেস করব?

ভবেন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, বল।

 চকিতে একটা বাধা আমার জিভ আড়ষ্ট করে দিল। তবু জিজ্ঞেস করলাম–তোদের এখনও ছেলেপিলে হয়নি কেন? ঝিনুকের দৈহিক–?

–কোনও বাধা নাই টোপন। নগেন ডাক্তার বলেছে। মা জেদ করে এক বার জেলা হাসপাতালের লেডি ডাক্তারকেও দেখিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু হয়নি।

ভবেনের মুখের ওপর অনেকগুলি রেখা গম্ভীর হয়ে উঠল। সে আমার চোখের দিকেই তাকিয়েছিল। আমি যেন ঠিক বুঝতে পারলাম না, সে কী বলতে চাইল। তবু আমার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এল। ওর চোখের দিকে তাকাতে আমার ভয় করল।

ভবেন মোটা গলায় থেমে থেমে আবার বলল, আর আমার কথাও জিজ্ঞেস করতে পারিস টোপন। আসলে তার কোনও প্রয়োজন নাই। চলি–

ও চলে গেল তাড়াতাড়ি।

আর আমি যেন দেখলাম, রাতারাতি যে মাটি কেটে ভবেন ফুলের আশায় বাগান করেছিল, সে মাটি নয়, বালিয়াড়ির ভূপ। সেখানে ফুল ফোটেনি, পাখি ডাকেনি। ভ্রমরটার গেছে পাখা গুটিয়ে। প্রজাপতিরা উড়ে এসে কোনও রংবাহার সৃষ্টি করেনি।

সেই বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে ভবেন কাঁটা ঝোঁপের মাঝখানে ভীত বিস্মিত ক্লান্ত চোখে যেন তাকিয়ে আছে।

আমিও যেন ভয় পেলাম। আমার সর্বাঙ্গ আড়ষ্ট হয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। শালঘেরির অরণ্য যেন আকাশ ছাড়াল। তারা চারদিক থেকে ঘিরে ধরতে লাগল আমাকে। আমি তাদের কাউকে চিনি না। পৃথিবীর আদিম রহস্যের মতো তারা ছায়া ফেলে ফেলে এগিয়ে আসতে লাগল আমাকে ঘিরে।

মহাকালের যে সেতুর কাছে আমার আশ্রয় প্রার্থনা ছিল, সে কোথায় গেল।

মনে হল, আমি বুঝি শালঘেরিতে ফিরে আসিনি। এক মায়া-অরণ্যের অলৌকিক ভয়াল ছায়ার ঘেরাও-এ বন্দি হয়ে পড়েছি।

ফিরে এসে বন্ধ দরজায় ঘা দিতে যাচ্ছিলাম। তার আগেই নিঃশব্দে দরজা খুলে গেল। অন্ধকার হলেও, বুঝলাম কুসুম।

বললাম, কী রে কুসুম, ঘুমোসনি?

 কুসুম সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, না।

 বললাম, তুই কি সন্ধে থেকে দরজায় দাঁড়িয়ে আছিস নাকি?

কুসুম বলল, তা কেন? মনে হল, কারা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, তাই এসেছি দরজা খুলতে।

দালানের বারান্দার দিকে যেতে যেতে বললাম, পিসি ঘুমোচ্ছে?

-হ্যাঁ।

কৃতজ্ঞতার চেয়ে অস্বস্তি বেশি হল আমার কুসুমের জন্য। কিন্তু ও এত চুপচাপ কেন? পিসির সঙ্গে ঝগড়া করেছে? না কি ঘুম পেয়েছে। পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

বললাম, যা শুয়ে পড়গে।

 কুসুম বারান্দা থেকে দালানে গিয়ে ঢুকল। আমি কয়েক মুহূর্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলাম। ভবেন এখন মাঠের ওপরে নিশ্চয়। শীতার্ত ঝোড়ো বাতাস রাত্রিটাকে নখে নখে ছিঁড়ছে। এক বার চকিতে মনে হল, দখিনপাড়ার অন্ধকারে এখনও কি সেই আলোর বিন্দুটি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মুহূর্ত পরেই বিস্ময় সংশয় ও একটি বিচিত্র জিজ্ঞাসা আমাকে কাঁপিয়ে দিল।

দালানে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম। ঘরের দিকে যেতে গিয়ে মনে হল, দেওয়ালের আবছায়ায় যেন কেউ লেপটে রয়েছে।

জিজ্ঞেস করলাম, কে?

–আমি।

কুসুম! কী করছিস ওখানে?

–খোঁপার কাঁটাগুলো খুলে নিচ্ছি, নইলে বড় বেঁধে। জেটি বিশ্বাস করতে চায় না।

ঘুমাৰ্ত বলে মনে হল না কুসুমের গলা। বললাম, যা যা শুয়ে পড়গে, অনেক রাত হয়েছে। বাতিগুলো সব নিভিয়ে ফেলেছিস নাকি!

না, তোমার ঘরে কমানো আছে।

আমি ঘরে গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম এল না অনেকক্ষণ। কখন এক সময় যেন শব্দ পেলাম, পিসির ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার। কোন এক ছায়ালোক থেকে ফিরে এলাম যেন। উৎকর্ণ হলাম। আর কোনও শব্দ নেই। কুসুম বুঝি শুতে গেল এতক্ষণে। এতক্ষণ অন্ধকার দালানে ভূতের মতো কী করছিল একলা একলা। মেয়েটা বড় অবাধ্য।

৩. পাড়ার মোড়

৩. পাড়ার মোড়

পাড়ার মোড়ে, দেবদারু তলায় এসে একটু দাঁড়ালাম। শীতের শালঘেরির ঘরে ঘরে দরজা বন্ধ। এই সন্ধ্যারাত্রেই নিশুতি বলে মনে হয়। পথঘাটও জনহীন প্রায়। যদিও এখনও সব অন্দরই কর্মচাঞ্চল্যে মুখর। পশ্চিমের বাজার অঞ্চলে লোকজন কিছু আছে নিশ্চয়। হয়তো শেষ মোটরবাসটা আসেনি এখনও। পশ্চিমের বাজার অংশ ধরে, দক্ষিণের স্কুলবাড়ি, বোর্ডিং আর শালঘেরি সাধারণ পাঠাগারের ওদিকটায় মোটামুটি একটু বেশি রাত পর্যন্ত লোকজন জেগে থাকে।

আমি দক্ষিণ দিকে ফিরলাম। মনে নতুন কোনও বাধা উদয় হবার আগেই, পাড়ার মধ্যে এসে পড়লাম। এ পাড়ায় শুধু ভবেনদের বাড়িই দোতলা। ওর ঠাকুরদা আর বাবা দুজনেই ছিলেন জেলা কোর্টের নামকরা উকিল। সে জন্য ওদের বাড়ির নামই হয়ে গেছে উকিলবাড়ি।

ভবেনের ঠাকুরদা রোজ যেতেন ঘোড়ায় চেপে আদালতে। আর ওর বাবা যেতেন ঘোড়ার গাড়িতে। শালঘেরিতে আর কারুর গাড়ি ছিল না। যদিও এখন সে সব কিছুই নেই। ঘোড়া এবং গাড়ি বিদেয় হয়েছে। আস্তাবলটা অনেক দিনই জুড়ে দেওয়া হয়েছে গোয়ালের সঙ্গে। উকিলদ্বয় মারা গেছেন। আছে শুধু বুড়ো ইন্দির সহিস। ঘোড়া এবং গাড়ি বেচা হয়ে গেলেও, চাবুকটা নাকি ইন্দির ছাড়েনি। শুধু ওই জিনিসটিই ওর নিজস্ব সম্পত্তির মধ্যে রয়ে গেছে। বোধ হয় দীর্ঘদিন ঘোড়ার সঙ্গে বিবাদ করে, ওর চরিত্রটাই ঝগড়াটে হয়ে গিয়েছে। প্রায়ই এর তার সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ ওর লেগেই আছে। অনেকে মজা পাবার জন্যেও ইন্দিরকে খোঁচায়। আর ইন্দিরের শেষ সাবধানবাণী হল, বেশি চালাকি করো না হে। মনে রেখ কী, চাবুকটো আমার হাত থেকে অখুনও খসে নাই।

পাড়ায় ঢুকলে বোঝা যায় ঘরে ঘরে কাজকর্মের চাঞ্চল্য। কথাবার্তায় মুখর। ভবেনদের বাড়ির বড় দেউড়ির মুখে মস্ত বড় কদম গাছ। বৈঠকখানায় আলো জ্বলছে। দক্ষিণ দিকে, পুবমুখী দুর্গামণ্ডপ। যদিও এখন আর দুর্গোৎসব হয় না। একটু উত্তর ঘেঁষে বসতবাড়ি। সেটাও পুবমুখী।

বৈঠকখানায় ঢুকে দেখলাম কেউ নেই। ওর বাবার আমলের টেবিল চেয়ার দেয়ালবাতি, আর আইনগত রেফারেন্স ও প্রাদেশিক আদালতগুলির ইতিহাসে আলমারি ঠাসা। ভিতরের উঠোনে আলোর আভাস। ছেলেবেলায় অনেকদিন এই ঘরটার পাশ দিয়ে পা টিপে টিপে লুকিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকেছি। যা রাশভারী লোক ছিলেন ভবেনের বাবা। দেখলেই ভয় লাগত। চোখে পড়লেই যে ধমকে উঠতেন, তা নয়। বড় জোর দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করতেন। কিন্তু তাতেই ঘাম বেরিয়ে যেত।

উঠোনের দিকে মুখ করে ডাকলাম, ভবেন! ভবেন আছিস?

এতক্ষণে হঠাৎ মনে পড়ল, ভবেনের মা এবং ছোট ভায়ের কথা সকালে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। আশ্চর্য! নিজের চিন্তায় এতই বিভোর হয়েছিলাম যে, এ সামান্য কথাটা জিজ্ঞেস করতেও ভুলে গিয়েছি। কাকিমা কিংবা ভবেনের ভাই শুভেনের কথা জিজ্ঞেস করাটা সৌজন্য বা লৌকিকতার মধ্যেও পড়ে না। ও কথাই প্রথম জিজ্ঞেস হওয়া উচিত ছিল। মন নিয়ে বিড়ম্বিত এ বিস্মৃতি দেখে, ভবেনও হয়তো অবাক হয়েছে। এমন সময় দেখলাম, একটি আলোর রেশ ক্রমেই এগিয়ে আসছে উঠোনের ওপর দিকে। এত গরম লাগছে কেন? হাতের চেটো, কান সব যেন গরম লাগছে।

আলোটা এসে দাঁড়াল বাইরের ঘরের সামনে। হ্যারিকেন হাতে ঝিনুক। চিনতে আমার ভুল হবার কথা নয়। কিন্তু সহসা যেন আমার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এল। গলা শুকিয়ে গেল। সারা দেহে একটি উষ্ণ তরঙ্গ বইতে লাগল। ছন্দপতন ঘটল বুকের স্পন্দনে। একটু বোধ হয় হাসল ঝিনুক। বলল, খুব সাধারণ গলায়, যেন আমাকে ও রোজই দেখছে, এমনিভাবে বলল, কে, টোপনদা নয়? বেশ লোক। ও আবার গেল তোমাকে ডাকতে। তোমার নাকি দেরি হচ্ছে। এসো।

আমি ঠিক ঝিনুকের দিকে তাকাইনি। আর ঝিনুকই যে বাতি নিয়ে একেবারে বৈঠকখানায় আসবে, ভাবতে পারিনি। কিন্তু বহুদিনের এক অশ্রুত গলার স্বর আমার স্বপ্নের মধ্যে বেজে উঠল যেন। বললাম, না, দেরি কোথায়? ও তো বাস্তবাগীশ লোক। শুধু শুধু আবার

–এসে পড়বে। তুমি এসে বসো।

আমার একটু সংকোচই হল। তবু বলতে পারলাম না যে, আমি বাইরের ঘরেই বসি। উঠোনে নেমে এলাম। ঝিনুক টুক করে পায়ে একটু হাত বুলিয়ে কপালে ছোঁয়ালে। আর আমি কিছু বলবার আগেই বলল, এসো।

সে এগিয়ে গেল। আমিও গেলাম।

ভবেনদের দোতলাটা খুবই সংক্ষিপ্ত। একতলায় দুখানা বড় বড় ঘর, ওপরেও দুখানি। কিন্তু নীচে, উঠোনের ওপারে, দক্ষিণ ভোলা বেশ বড় বড় পাতার ছাউনি দেওয়া মাটির দেওয়ালের ঘরগুলিই ওদের সাবেকি। সেখানেই ওদের আসল সংসার।

ঝিনুকের পিছনে পিছনে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলাম। বারান্দা পার হয়ে শেষের ঘরে গিয়ে ঢুকল ঝিনুক। ডাকল, এসো।

ঘরে ঢুকে দেখলাম, খাট, বড় আয়না, ছোট টেবিল, খান দুই চেয়ার রয়েছে এ ঘরে। বুঝলাম, এই ঘরেই ভবেন থাকে।

আয়নাটাকে যেন খারাপ লাগছে আমার। এত বড় যে, কোথাও একটু একান্তে সরে বসবার জো নেই। যেখানেই যাব, সেখানেই ছায়া থাকবে সঙ্গে সঙ্গে।

এইমাত্র নীচের বৈঠকখানা ঘরে গরম লাগছিল। এখন হঠাৎ বেশ ঠাণ্ডা লাগছে আমার। অনুভবের ক্ষমতা আমার এত ক্ষীণ হয়ে আসছে কেন!

ঝিনুক পিছন ফিরে কী করছিল, বুঝতে পারছিলাম না। সমস্ত পরিবেশটা এত স্তব্ধ আড়ষ্ট মনে হচ্ছিল, কেমন যেন অসহায় হয়ে পড়লাম। বলে ফেললাম, বেশ শীত পড়েছে।

ঝিনুক পিছন ফিরে হ্যারিকেনটা আর একটু উসকে দিতে দিতে বলল, দরজাটা বন্ধ করে দেব?

গলা ঝিনুকের বেশ পরিষ্কার। এ কথার রহস্য আছে কি না জানিনে। আগেও এমন কথা এমন সুরে শুনেছি। কিন্তু আজ আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, না না, বন্ধ করতে হবে না। ভবেনের মা কোথায়?

দিল্লিতে।

 দিল্লিতে? কেন?

ঠাকুরপো ওখানে আছেন।

ঠাকুরপো, অর্থাৎ ভবেনের ভাই। ঝিনুকের মুখে এ সব শব্দগুলি আর কখনও শুনিনি, তাই বোধ হয় একটু অদ্ভুত লাগছে।

জিজ্ঞেস করলাম, শুভেন কি এখন দিল্লিতে আছে তা হলে?

–হ্যাঁ।

বলেই সে বাইরে বেরিয়ে গেল। শুনতে পেলাম তার গলা দোতলার বারান্দা থেকে, আনিদি!

–অ্যাঁ?

–উনুনের আগুন ঠিক আছে তো?

আছে।

 –ঘুমিয়ো না যেন উনুনপাড়ে বসে।

–ঘুমাব ক্যানে বড় বউ। কিন্তুন, ইন্দিরটা যে ফিরে আসে না।

–আসবে, এই তো গেল।

ঝিনুক ঢুকল আবার। বলল, চেয়ারে বসলে কেন? বিছানায় উঠে, পা ঢেকে বসো।

টেবিলের ওপর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পাতা ওলটাচ্ছিলাম। বললাম, থাক।

-বলছিলে, বড় শীত করছে? কাল থেকে শীতটা একটু বেশিই পড়েছে।

মনে মনে ভাবলাম, আমি এসেছি বলে নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু এভাবে, এমন আড়ষ্ট হয়ে কতক্ষণ থাকা যায়। কোথাও কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। আমিই শুধু অস্বাভাবিক। কেন? সংসারের কোথাও কোনও বিচ্যুতি দেখিনে। কোথাও শোর নেই, গোল নেই, আঁকাবাঁকা নেই। তবে আমার এত সাহসের সাধনা কেন ব্যর্থ হয়?

আমি ফিরে তাকালাম ঝিনুকের দিকে। জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছ ঝিনুক।

 ঝিনুক খাটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ভাল।

তারপর মুখ তুলল। দেখলাম, ঝিনুকের সেই টানা টানা চোখ। মাথায় ঘোমটা নেই। কপালে টিপ নেই, সিঁথিতে সিঁদুর রেখা। ফরসা রং বলেই বোধ হয় ওর গালের ছোট্ট একটি কাটার দাগ চিরদিনই বেশি করে চোখে পড়ে। খাটো নয়, লম্বাও নয়, মাঝারি উচ্চতার একহারা ঝিনুক। যদিও এখন ঈষৎ মাংস লেগেছে গায়ে, সেটুকু যেন ওর আগের অপূর্ণতাকে পূর্ণ করেছে। আগের থেকে তাই একটু যেন বেশি সুন্দর লাগল। একটি লঘু তীক্ষ্ণতা ওকে ঘিরেছিল বরাবরই। এখন যেন সেটুকু আরও তীব্র হয়েছে। গলায় বুঝি একটি সরু চেন হার চিকচিক করছে। হাতে কয়েক গাছা করে চুড়ি। গেরুয়া রং-এর লালপাড় শাড়ি আর ছিটের ব্লাউজ ওর গায়ে।

পরিবর্তন সহসা কিছু চোখে পড়ে না। কেবল একটু বড় বড় লাগছে দেখতে ঝিনুককে। লাগবে। ঝিনুক বড় ছিল। আরও বড় হয়েছে।

ঝিনুকের চোখ অন্যদিকে। বলল, বিশ্বাস হল?

বললাম, কী?

–আমি ভাল আছি?

–অবিশ্বাস করব কেন?

হাসবার চেষ্টা করলাম। ঝিনুক বলল, তুমি কেমন আছ?

 বললাম, এত দিন ভাল ছিলাম না। কাল থেকে খুব ভাল আছি।

ঝিনুক চোখ তুলে তাকাল। ওর ভুরু যেন বেঁকে উঠে, আমার মনের গভীরে বিদ্ধ হল। বলল, ফিরে এসেছ বলে?

-হ্যাঁ।

ঝিনুক চোখ নামিয়ে, আবার তাকাল আমার দিকে। ও হাসছে। কিন্তু একটি অটুট গাম্ভীর্য যেন থমকে আছে কোথাও। বলল, পরিষ্কার হয়েছ অনেক।

পরিষ্কার? বললাম, ফরসা হওয়ার কথা বলছ? এসে শুনেছি সে কথা।

কার কাছে? পিসির?

 না। প্রথমে কুসুম বলেছে।

 কুসুম?

ঝিনুকের প্রশ্নবোধ চিহ্নে বেঁকে উঠল–কে কুসুম?

বললাম, হরলালকাকার মেয়ে।

 ঝিনুক বলল, ও, হ্যাঁ, উত্তরপাড়ার হরোকা’র মেয়ে কুসুম। তোমাদের বাড়িতেই তো থাকে, না? শেষ দিনের চিঠিটা কুসুমই নিয়ে গিয়েছিল ঝিনুকের কাছে। বললাম, হ্যাঁ, এসে তো তাই দেখছি। ঝিনুক আরও খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। কিন্তু কুসুমের কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেছে ঝিনুক। কুসুমের হাতে চিঠি পেয়েই তো ঝিনুক ছুটে এসেছিল। বাড়ির চারদিক পুলিশ বেষ্টিত। আমি বেরোবার জন্যে প্রস্তুত। বাবা দারোগার সঙ্গে কথা বলছিলেন দালানে। গ্রামের মেয়ে ঝিনুক। কিন্তু আমাদের শালঘেরির, বর্ষার তামাইনদীর মতো ও যেন সকল সংকোচ, সকল লজ্জা বিসর্জন দিয়ে প্লাবনের বেগে ছুটে এসেছিল। ঝিনুকের আঁচল উথল, চুল এলো, চোখে জলের ধারা। পরম ভাগ্য, ঘরে আমি তখন একলা। পিসি অন্য ঘরে গিয়ে কাঁদছিলেন। সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় দিতে পারবেন না বলে। তবু এক মুহূর্ত আমি সংকোচে সিটিয়ে গিয়েছিলাম বাবার কথা ভেবে। কারণ বাইরের উঠোন থেকে বাবা নিশ্চয় ঝিনুককে দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু ঝিনুক যে মুহূর্তে আমার পায়ের ওপর এসে আছড়ে পড়েছিল, সেই মুহূর্তে সকল দ্বিধা, লজ্জা আমারও ঘুচে গিয়েছিল। ঝিনুককে আমি দুহাতে টেনে তুলেছিলাম।

ঝিনুক রুদ্ধ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেছিল, তুমি চলে যাচ্ছ, আমি কী করে থাকব।

ওর যে কতখানি বেজেছিল, কত অসহায় বোধ করেছিল, ওর মতো মেয়েকে অমনি করে কেঁদে আছড়ে পড়তে দেখেই বুঝেছিলাম। সহসা কথা বলতে পারিনি। কিন্তু সময় ছিল না। দারোগার গলা ভেসে আসছিল, সীমন্তবাবু, আর দেরি করার উপায় নেই, তাড়াতাড়ি করুন।

আমি ডেকেছিলাম, ঝিনুক।

ঝিনুক সাঁড়াশির মতো শক্ত করে আমাকে ধরে ছিল। অচৈতন্য হবার পূর্বমুহূর্তের শক্তি সঞ্চয় করে যেন ফিসফিস করে বলেছিল, তোমাকে না দেখে কেমন করে থাকব? আমি যে আর কিছু ভাবতে ভুলে গেছি। টোপনদা, ভীষণ ভয় হচ্ছে, ভীষণ–

–খোকা!

 বাবার গলা ভেসে এসেছিল দালান থেকে। আমি কোনও রকমে ঝিনুকের কপালে আমার ঠোঁট স্পর্শ করেছিলাম। রুদ্ধস্বরে উচ্চারণ করেছিলাম, আর সময় নেই ঝিনুক।

আমি বেরিয়ে গিয়েছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, কিন্তু ভয়? কীসের ভয়ের কথা বলল ঝিনুক?

-কী ভাবছ?

 ঝিনুকের গলার স্বরে হঠাৎ চমকে উঠলাম। বিব্রত হয়ে বললাম, না, কিছু না। এই…।

স্বাভাবিক হতে চাইলাম। ঝিনুক বলল, শুনলাম, তোমার সেই তামাই সভ্যতার আবিষ্কারের নেশা এখনও যায়নি।

একটু কি শ্লেষ রয়েছে ঝিনুকের কথায়? বললাম, আবিষ্কারের নেশা? তা বলতে পার। কিন্তু যাবে কেন?

–এত দিন হয়ে গেছে, তাই বলছি।

–এত দিন মনে প্রাণে ওটারই ধ্যান করেছি।

 ঝিনুক চকিতে এক বার আমার চোখের ভিতরে ওর দৃষ্টি বিদ্ধ করল। বলল, তাই বুঝি?

বলে ঠোঁট টিপেই রইল।

আমার কপালের শিরাগুলি যেন দপদপ করতে লাগল। একটু জোর দিয়েই বললাম, হ্যাঁ। তামাইয়ের ধারে মাটির ওপরে যে জিনিসগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো যে কেউ ফেলে দিয়ে গেছে কিংবা উড়ে এসেছে, এমন তো মনে হয়নি কোনওদিন।

ঝিনুক বলল, হ্যাঁ, তুমি অনেক বার বলেছ, ওপরে যখন এটুকু দেখা গেছে, ভেতরে তখন আরও কিছু আছে।

আমি দৃঢ় হয়ে বললাম, আমার তাই বিশ্বাস। ধোঁয়া দেখলে আগুনের কথা মনে আসে।

ঝিনুকের চোখের ওপরে যেন একটি বিস্মিত জিজ্ঞাসা চিকচিক করতে লাগল। আমার এ বিশ্বাসে যেন তার ভারী সংশয়।

চোখে চোখ পড়তে ঝিনুক চোখ সরাল। বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, কী লোক রে বাবা! কখন গেছে, এখনও ফেরে না।

আমি বলে ফেললাম, ওটা একটা উল্লুক।

ঝিনুক চকিতে ফিরল আমার দিকে। হাসল বোধ হয়। তারপরই আবার মুখ ঘোরাল।

আমি একটু অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কী হল?

ঝিনুক মুখ না ফিরিয়েই বলল, কিছু না। গালাগালটা অনেক দিন বাদে শুনলাম কিনা।

–গালাগাল?

 –ওই আর কী, তোমাদের ভালবাসার ডাক। উল্লুক আর রাস্কেল।

সঙ্গে সঙ্গে আর একটি এমনি স্নেহের গালাগাল মনে পড়ে গেল, খরাসনী। যদিও ঝিনুকের খরতা কোনওদিনই ওর ওপরের নিয়ত স্রোতে দেখা যায়নি। সে চিরদিন অন্তস্রোতেই বহমান। কিন্তু ঝিনুক রাগ করলেই ওকে খরাসনী বলে ডাকতাম।

ঝিনুক বলল আবার, বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে না?

বললাম, উপীনকাকার সংবাদ আমি জেলে বসেই পেয়েছি। পিসির চিঠিতে শালঘেরির প্রায় কোনও সংবাদই বাদ পড়ত না।

আমার বিয়ের সংবাদ?

কথাটি যেন আলতো করে, অনায়াসে ছুঁড়ে দিল ঝিনুক। আর আমার সমস্ত মুখটা পুড়ে যেন ছাই হয়ে গেল। কিন্তু ঝিনুক জিজ্ঞেস করতে পারে, আমি জবাব দিতে পারিনে?

বললাম, তাও পেয়েছি।

ঝিনুক পিছন ফিরে দু পা বাইরে গেল। যেন অনেক দূর থেকে জিজ্ঞেস করল, পেয়ে?

যত দূরে যায় ঝিনুক, তত যেন একটা ফাঁসের দড়ি কষে কষে যায় আমার গলায়। দৃষ্টি যত অন্ধ, তত দুর্নিরীক্ষ্যের জন্য আমার চোখের ব্যাকুলতা। নিজেকে মুখ খুঁজড়ে পড়ে থাকা একটি দূর অন্ধকার কোণে আবিষ্কার করে, তাকে ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে এলাম। যেন কী একটি খুশি চলকে উঠল আমার গলায়। বললাম, খুব খুশি হয়েছি ঝিনুক।

ঝিনুক মুখ ফেরাল। ঝিনুকের মুখ স্পষ্ট দেখতে পেলাম। হাসি গাম্ভীর্য কিছুই নেই যেন। তার পরেই আমাকে জিজ্ঞেস করল, একটু চা খাবে?

কথার কোনও পরস্পর সম্পর্ক খুঁজে পেলাম না। বললাম, খাব।

ঝিনুক চলে গেল। কিন্তু আমার যেন মনে হতে লাগল, আমি একজন আসামি। অপর পক্ষের উকিল এসে আমাকে উলটোপালটা প্রশ্ন করে তার নিজের তথ্য জেনে গেল।

চোখে পড়ল ঝিনুকের আর ভবেনের ছবি। বোধ হয় জেলা শহর থেকে বাঁধিয়ে এনেছে ভবেন। ঝিনুক যেন মুখটি একটু বেশি উঁচু করে তুলে ধরেছে। তুলনায় ভবেনের মুখ একটু বেশি নিচু। তখনও গোঁফ রাখেনি।

নীচে শক্ত উঠোনে জুতোর শব্দ পাওয়া গেল। তারপরেই ভবেনের ঈষৎ উঁচু গলা, ঝিনুক।

বোঝা গেল, সে রান্নাঘরের দিকেই গেল। আবার শোনা গেল, এসে গেছে? ওপরের ঘরে?

বলতে বলতেই সিঁড়িতে জুতোর শব্দ শোনা গেল। বারান্দা পেরিয়ে ঘরে এল ভবেন। বলল, বেশ। বাড়ি গিয়ে শুনি এই যাচ্ছে। আর আমি বিকেল থেকে হাঁ করে বসে আছি।

বললাম, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তুইও তো অনেকক্ষণ গেছিস।

–অনেকক্ষণ? আমি তো পথে আর কোথাও যাইনি, দাঁড়াইনি। অনেকক্ষণ কী করে হবে?

কী জানি। আমার তো মনে হচ্ছিল, এক ঘণ্টা হয়ে গেছে।

–একলা বসে আছিস নাকি?

না, ঝিনুক ছিল। চা করতে গেল বোধ হয়।

–চা করতে? কিন্তু ও তো রান্নাঘরে নেই।

 বলতে বলতে ভবেন বাইরের বারান্দায় গেল। ডাকল, আনিদি, ও আনিদি!

কী বুইলছ।

–তোমাদের বড় বউ কোথায় গেলেন?

জবাব এল নীচের কোনও ঘর থেকে, আমি নীচে এসেছি। যাচ্ছি। আনিদিকে চায়ের জল চাপাতে বলে এসেছি।

বাইরের বারান্দা থেকে ভবেন আবার যখন ঘরে ঢুকল, তখন তার মুখে যেন একটি অস্পষ্ট ছায়া নেমে এসেছে। অন্যমনস্ক আর চিন্তিত মনে হল ওকে।

আমাকে বলল, বিছানায় এসে বস টোপন।

বললাম, ঠিক আছে, এখানেই বেশ আছি।

ভবেন বাইরের দিকে তাকাল। ঝিনুক ঢুকল এসে ঘরে। ভবেনকে জিজ্ঞেস করল, কিছু বলছ?

ভবেন যেন কেমন অসহায়ভাবে হেসে বলল, না, মানে তুমি নেই, টোপন একলা বসে আছে, তাই বলছিলাম।

দেখলাম, ঝিনুক পান খাচ্ছে। একটু একটু করে পানের রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তার ঠোঁটে। দু-একবার পান খেতে দেখেছি এর আগে ঝিনুককে। কখনও সখনও দু-একটা ঠাট্টাও বুঝি করেছি ওর পান খাওয়া নিয়ে। কিন্তু সে কথা আজ স্মরণ করলে আপন মনের বিড়ম্বনা বাড়বে। তাড়াতাড়ি বললাম, একলা কোথায়। এই তো সবে নীচে গেল।

ঝিনুক বলল, আমি ওষুধ খেতে গেছলাম।

ভবেন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, বিকেলে খাওনি ওষুধ?

-না, ভুলে গেছলাম।

লক্ষ করলাম, ভবেনের চোখের বিস্ময়ের ঘোরটা কাটল না। সেই সঙ্গে দুশ্চিন্তার ছায়া। একটু যেন ভয়ে ভয়েই বলল, অসময়ে না হয় না-ই খেতে ওষুধ। এতে উপকারের চেয়ে অপকারই করে বেশি।

ঝিনুক খাটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, কিছু হবে না।

এই সময়ে ভবেন চকিতে এক বার আমার দিকে আড়চোখে তাকাল। লক্ষ করলাম, আর দেখলাম, আমার সামনে আমার দুই পুরনো বন্ধু। ঝিনুক আর ভবেন, স্বামী ও স্ত্রী। আমার সকল প্রতিজ্ঞা বুঝি বা ব্যর্থ হয়। বুকের মধ্যে একটি তীব্র যন্ত্রণা আমাকে আড়ষ্ট করে তুলতে লাগল। গলার স্বর টুটি টিপে ধরতে এল। শেষে বুঝি তীরে এসে আমার তরী ডুবল। অসুখের কথা শুনে, কিছু না জিজ্ঞেস করাটা অশোভনীয়। ভবেনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, অসুখ করেছে নাকি?

ভবেন বলল, হ্যাঁ, নরেন বোস একটা ওষুধ দিয়েছে খেতে। ভেতরটা নাকি ওর খুব দুর্বল। মাঝে মাঝে

ঝিনুক বাধা দিয়ে বলে উঠল, থাক না। রোগ ব্যাধির কথা শুনতে আমার একটুও ভাল লাগে না।

 ভবেন যেন সংকুচিত হয়ে গেল। আমার দিকে এক বার দেখল।

 আমি বললাম, ভাল লাগার জন্যে কে আর অসুখের কথা বলে। কিন্তু অসুখটা কী?

 ঝিনুক বলল, কিছুই না। আমার শরীর কি খারাপ দেখছ? দিব্যি খাইদাই ঘুমোই। মাঝে মধ্যে একটু মাথা ঘোরা দুর্বলতা সকলেরই থাকে। কিন্তু তোমার বন্ধুর ধারণা, মারা গেলাম বলে।

দেখলাম ভবেন মুগ্ধ এবং অসহায় বিস্ময়ে ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মনে মনে অবাক হলাম। বললাম, দুশ্চিন্তা তো হয়।

ভবেন যেন কী বলবার চেষ্টা করল। ঝিনুক বলে উঠল, লাভ কী মানুষের দুশ্চিন্তা করে? শুনি তো, ইয়ৎ সৎ তৎক্ষণিকম।

ঝিনুকের মুখে সংস্কৃত শুনে মনে পড়ল, ও বিষয়ে সে ছেলেবেলা থেকেই সিদ্ধহস্ত। অনায়াসে আয়ত্ত করতে পারত, নিষ্ঠাও ছিল। গুরু ছিলেন স্বয়ং উপীনকাকা। কিন্তু ওর মুখে, ইহকালের সবই ক্ষণকালের জন্যে, কথাটা কানে সহসা বিধল। সংশয় ও সন্দেহের বিষে কালো হয়ে উঠল মন। ক্ষুব্ধ কুটিল প্রশ্ন উদ্যত হয়ে উঠল, এই কি ঝিনুকের জীবনের সর্বাঙ্গীণ আদর্শ নাকি? এই আদর্শের মন্ত্র নিয়ে কি সে একদা আমার সঙ্গে–তারপর ভবেনের–? পরমুহূর্তেই ভাবলাম, না, ঝিনুক হয়তো জীবন-মৃত্যুর সম্পর্কেই কথাটা বলেছে। বললাম, হয়তো সত্যি। মানুষ যদি মনে রাখতে পারত।…

ভবেন বলে উঠল, তা হলে ভয়ংকর ব্যাপার হত। সংসারটা মুনি ঋষিদের আড্ডা হয়ে উঠত।

 আমি হেসে উঠলাম। ঝিনুক বলল, তাই বলছি রোগের কথা থাক।

কথার মাঝ পথেই, বুক অবধি ঘোমটা টানা প্রায় একটি ভৌতিক মূর্তি এসে দাঁড়াল দরজায়। তার হাতে এক কাপ ধূমায়িত চা।

ভবেন বলে উঠল, ভেতরে এসো আনিদি, এ আমাদের টোপন।

আনিদি ওখান থেকেই ঘোমটাসহ মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল। তারপর ফিসফিস করে বলল, বড় বউ, চা-টা লিয়ে যাও।

আমরা সবাই হেসে উঠলাম। বাল-বিধবা আনিদি। এখন বয়স ঝুঁকেছে বার্ধক্যের দিকে। মেয়ে ছিলেন দরিদ্রের ঘরের। যেখানে বিয়ে হয়েছিল, সেটাও মোটেই সচ্ছলতার ডেরা ছিল না। বিধবা হয়ে পরের বাড়ির হেঁসেল নিয়ে তাই চিরদিন কাটাচ্ছে। কিন্তু লজ্জাবতী লতা সেই গাঁয়ের কলাবউয়ের মনটি মরেনি। এ শুধু লজ্জাই নয়। এর মধ্যে অনেকটাই শালীনতাবোধ।

আনিদি কোনওদিনই কথা বলেনি। ভবেনদের স্নেহ করত মায়ের মতো। আমাদের প্রতিও তার সেই স্নেহ। তবে কোনওদিনই সামনে আসবার প্রয়োজন হয়নি। সেইজন্য আজ সামনে আসতে অপরিচয়ের এই শালীন বেড়া।

ঝিনুক চা এনে দিল। বললাম, আর কেউ খাবে না? একলাই খাব?

 ভবেন বলল, আমি তো চায়ের ভক্ত কোনওকালেই নই। ও তো ওষুধ খেয়ে এসেছে।

দেখলাম, আনিদি তখনও দরজায় দাঁড়িয়ে। এবং ঘোমটার ফাঁক দিয়ে আমাকে দেখার কৌতূহল মেটাচ্ছে।

জিজ্ঞেস করলাম, ভাল আছ আনিদি।

ঘোমটার ভিতর থেকে জবাব এল, আছি বাবা। তুমাকে আর দেখব আশা ছিল না। সব্বাই বুইলছে, তুমার ফাঁসি হয়্যা যেইছে।

ভবেন যেন দোষ ক্ষালনের মতো তাড়াতাড়ি বলে উঠল, সেই সব্বাইটা কে আনিদি? আমাকে তো তুমি কোনওদিন কিছু জিজ্ঞেস কর নাই।

আমিদি বলল, গাঁওয়ের লোকে যে বুলে!

আমি হাসলাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম, ঝিনুক তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

বললাম, কিন্তু আনিদি, বিশ্বাস করো, ফাঁসি হয়নি। ওই দেখো, আমার ছায়া পড়েছে দেয়ালে।

আমার আর ভবেনের হাসি উচ্চকিত হয়ে উঠল। কেবল ঝিনুক হাসেনি। আনিদির শরীর তখনও হাসিতে কাঁপছিল। বলল, সি কথা বুলি নাই বাবা। ও ডাকারা তুমাকে ফাঁসি দিতে পারবে ক্যানে?

ছায়ার কথায় হাসির কারণ আর কিছুই নয়। এ এক সংস্কার গ্রাম্য মানুষের, ছদ্মবেশী প্রেতমূর্তির ছায়া পড়ে না। কারণ, আসলে তো সে বাতাস। ওর কোনও কায়া নেই।

আনিদি আবার বলল, বস, আমি যাই।

চলে গেল আনিদি। তবু একটু সময় যেন আমরা সবাই স্বাভাবিক হতে পেরেছিলাম। ভবেনের কথানুযায়ী আমরা অনেককাল পরে তিনজনে একত্র হয়েছি বটে। ঝিনুকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইহকালের সবই ক্ষণকালের জন্য। না হয় তাই হল। আজ এই ক্ষণটিতে আমরা একটু নতুন করে হাসতে পারি নে? আমরা তো শালঘেরির তিন সন্তান।

পরমুহূর্তেই আবার আমার মনে কুটিল অন্ধকার ঘিরে আসতে চাইল। সত্যি কি বিদ্রূপ করেছে। ঝিনুক। হয়তো বিদ্রূপই করেছে। সবই যে ক্ষণকালের, এই উপদেশ সে আমাকে দিয়েছে। যা ছিল, তা নেই।  

থাকবে না। কিন্তু জোর করে তাকে ধরে রাখব বলে শালঘেরিতে ফিরিনি। যা আছে তার সঙ্গে আছি। সেই ক্ষণিক যদি শুধু রং ফেরানো হয়, তবে আকাশে কত সময় কত রং-এর খেলা। তাকে আমি মুছতে পারিনে। নিজের হাতের তুলি দিয়ে বদলাতে পারিনে তার রং। সে যা, তাই দেখে আমার সুখ, আমার দুঃখ।

আকাশ আকাশের মতো থাকুক। আমি ঘুরে বেড়াব তার তলায়। ভবেন আমার বন্ধু। ঝিনুক আমার বন্ধুপত্নী। এই সত্যের কাছে কোনও ঠাঁই নেই নির্দেশ উপদেশ ইঙ্গিতের।

আমি বললাম, কী রে ভব। তারা যে সব চুপ করে রইলি?

ভবেন বলল, আজ তোর পালা টোপন।

এবার যেন ঝিনুক একটু স্বাভাবিকভাবে বলল, জেলের কথা বলো টোপনদা।

বললাম, জেলের কথা বলার কিছু নেই ঝিনুক। এক ঘর, এক দেয়াল। একই জায়গার মধ্যে সারাদিনের ঘোরাফেরা। গুনে চলবার দরকার ছিল না, ডাইনে বাঁয়ে সবসুদ্ধ কত পা চলব, তা আর গুনে রাখতে হত না, সেটাও রপ্ত হয়ে গেছল। আর প্রতি দিন, প্রতি মাসে বছরে বছরে একই মানুষের মুখ দেখা।

বলে হেসে ফেললাম। বললাম, সন্দেহ হত, জেলে আমাদের সীমানায় একই কাক শালিকেরা রোজ আসত। টের পেতাম একটা কাকের নাকে ছিল লোহার তারের নোলক। তাকে নানান জনে নানান নাম দিয়েছিল। তবে অধিকাংশের কাছে সে ছিল কাকের বউ কাকিনী। সে মেয়ে ছিল কি পুরুষ ছিল, সেটা আমরা জানতাম না। তার ওই তারের নোলক দেখে আমরা মনে করতাম, সে মেয়ে। খাবার কুড়োবার দরকার না থাকলেই দেখতাম, একটা নিমগাছের ডালে বসে সে তার চোখা ঠোঁটখানি বাড়িয়ে ধরত, আর তার সঙ্গীটি খুঁটে খুঁটে নোলক খোলার চেষ্টা করত। যেন মানুষের পরিয়ে দেওয়া লোহার বেড়ি থেকে কাকটা তাকে মুক্ত করতে চাইত। কিন্তু পারত না।

বলে আমি হাসলাম। ভবেন হাসল উচ্চ গলায়। ঝিনুকের ঠোঁটের কোণে যে হাসিটুকু কুঁকড়ে রয়েছে, তাতে হাসির চেয়ে দুর্বোধ্য বার্তার লক্ষণই বেশি।

ভবেন বলল, বাংলাতে তোর দখল আমার চেয়ে বেশি দেখছি। কাক কাকিনীর ভাল উপ্যাখ্যান বলেছিস।

ঝিনুক বলল, কিন্তু কাকের ঠোঁট তো খুব চোখা আর ধারালো। তাও কাটতে পারল না?

কথাটা বলেছিলাম পরিষ্কার মন নিয়েই। সন্দেহ হল ঝিনুকের কথা শুনে। এ কি সেই তার আলো-আঁধারির ভাসা।

কিছু না ভেবেই ভবেন বলল, সেটি পারবে না। এদিকে তুমি জানালায় তারের জাল দাও, ঠিক খুঁটে খুঁটে ছিঁড়ে ফেলবে। তবে আমাদের শালঘেরিতে কাকের উৎপাত কম। জেলা শহরে দেখেছি কুটোগাছটি ভোলা রাখবার জো নেই।

আমি বললাম, হিসেব নিলে বোধ হয় দেখা যাবে, কাকেরা শহরেরই বাসিন্দা। গ্রাম ওদের খুব পছন্দ নয়।

ঝিনুক বলল, আর কী করতে জেলে সারাদিন?

–জেলে কিছু করা যায় বলে আমার মনে হয় না। কেন না, জেলে আছি, এ কথাটা কখনও ভুলতে পারতাম না। করতাম যা, তা একটু পড়াশুনা।

–তোমার ওই আবিষ্কারের তত্ত্ব?

–তা বলতে পার। একটা মূলধন না হলে মানুষের চলে কেমন করে?

 ঝিনুক আমার চোখের দিকে এক বার তাকিয়ে, চুপ করল।

আমি বললাম, সে কথা যাক। শালঘেরির কথা শুনি।

 ঝিনুক বলল, আমাকে বলছ?

–তুমিই বলো।

ঠোঁট উলটে একটু হেসে বলল, শালঘেরির কোন রাস্তা কোনদিকে তাই বোধ হয় ভুলে গেছি। মাঝে মাঝে পুবপাড়ায় মায়ের কাছে যাই। আর কিছুই জানি না।

আমি বললাম, তা তো হবেই। সেদিন ছিলে গাঁয়ের মেয়ে, এখন বউ।

ভবেন বলল, তা নয় টোপন। শালঘেরির বউয়েরাও ঝিনুকের চেয়ে আজকাল বেশি সংবাদ রাখে গাঁয়ের।

ঝিনুক জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে তাকাল। আর আমার মনে হল, কোথায় যেন একটা বেসুর বাজছে। ভেবেছিলাম, ঝিনুক ভবেনের মাঝখানে, আমি মূর্তিমান বেসুর হয়ে বাজব হয়তো। হয়তো তাই বেজেছি। কিন্তু আরও একটা বেসুর যেন ফাঁকে ফাঁকে ধ্বনিত হয়ে উঠছিল, যা আমার অগোচরে রয়েছে। যা আমি আগে ভাবিনি। এখনও সংশয়ে ভুগছি। আর এ সংশয় এক বার যেন আমার অবচেতনে খচখচিয়ে উঠেছিল, গতকাল প্রথম ভবেনের সঙ্গে কথা বলে।

আমি প্রসঙ্গ বদলে বললাম, কাকিমা কেমন আছেন?

ঝিনুক বলল, মা আছে এক রকম। মার অনেক দোষ। বাবাকে একটুও ভুলে থাকতে পারে না। সংসারটা তাই গোল্লায় যাচ্ছে।

ঝিনুকের মুখ গম্ভীর দেখাল। বুঝতে পারি, কাকিমার যে দোষের কথা বলছে ঝিনুক, সে কথা বলতে আসলে তার কষ্টই হচ্ছে। উপীনকাকাকে ওঁর বন্ধুরা অনেক সময় ঠাট্টা করে স্ত্রৈণ বলেছেন। যদিও প্রায় জীবনের প্রান্তসীমায় দেখেছিলাম উপীনকাকা আর তাঁর স্ত্রীকে, তবু দুজনকে চিরদিনই আমাদের নতুন প্রেমিক-প্রেমিকা বলে মনে হয়েছে।

অনেক সমারোহ আর আড়ম্বরের মধ্যে আদর্শের বিজ্ঞাপন দেওয়া স্বামী-স্ত্রী দেখেছি। কিংবা অনাড়ম্বরের মধ্যেও যাদের অভ্যাসের বশে চিরদিন নিস্তরঙ্গ জীবন কাটাতে দেখেছি, তাদের সঙ্গে উপীনকাকাদের কোনও মিল নেই। প্রৌঢ় বয়সেও দেখেছি, উপীনকাকার চোখের দিকে তাকাতে গেলে, কাকিমার চোখে একটি সলজ্জ হাসি ফুটে উঠেছে।

কাকিমা বুঝি আজ তাই আর সংসারে মন দিতে পারেন না। যে সংসারের কুটোগাছটি নিজের হাতে সরাতেন, আজ সে সংসার গোল্লায় গেলেও বুঝি তাই আর কাকিমার চোখে পড়ে না।

কই, এক বারও তো ভাবিনি, কাকিমার কাছে যেতে হবে। এমনি করেই বুঝি মানুষের নিজের বিচার নিজের কাছে হয়। মনের ছোট বড় দেখা যায় এমনি করে। নইলে, সকালবেলা এক বারও কেন ভাবিনি, উপীনকাকা মারা গেছেন। কাকিমার কাছে এক বার যেতে হবে।

অনুশোচনার ভোগান্তিটুকু তোলা রইল কাল সকাল পর্যন্ত। আমি এসেছি, তবু যাইনি। কাকিমা কী না জানি ভাবছেন।

জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ভাই অমু, সে কী করছে আজকাল?

 ঝিনুক বলল, শহরে আছে। এবার আই-এ দেবে।

অমু উপীকাকা আর কাকিমার একটি মিলিত ছবি। কিন্তু ঝিনুককে আমার চিরদিন তার প্রতিবাদ বলে মনে হয়েছে। বোধ হয় উপীনকাকার মধ্যে কোথায় ঝিনুকের জড় লুকানো ছিল। যা ছিল তাঁর মধ্যে চাপা, তাই নিয়ে প্রকাশিত ঝিনুক। ঝিনুকের এই চরিত্রও।

এর পরে এল ভবেনদের প্রসঙ্গ। বোঝা গেল, ঝিনুককে পুত্রবধূ হিসেবে মন থেকে নিতে পারেননি ভবেনের মা। তাই তাঁর অধিকাংশ সময় কাটে শুভেনের কাছে দিল্লিতেই। কথাটা ভবেন হেসে উড়িয়ে দিতে চাইল। ঝিনুক তা দিল না। তার কথা থেকে বোঝা গেল, ভবেনের মায়ের অসন্তুষ্টির কারণ, তাঁর বিশ্বাস, ভবেন তার স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামীর সম্মান ও শ্রদ্ধা পায় না। শাশুড়ি হিসেবেও তিনি তাঁর কল্পিত পুত্রবধূকে পাননি ঝিনুকের মধ্যে।

ভবেন হয়তো প্রতিবাদ করতে চাইল। সংকোচে দ্বিধায় অস্বস্তিতে হাসল। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা যেন খুঁজে পেল না।

ইতিমধ্যে আনিদি ঘোষণা করল, রান্না শেষ। বড় বউ বললে সব ওপরে নিয়ে আসতে পারে।

আমি বললাম, ওপরে কেন কষ্ট করে বয়ে নিয়ে আসা? নীচেই যাই।

 ঝিনুক বলল, খাবারগুলোই শুধু ওপরে বয়ে নিয়ে আসতে হবে। আর সব ব্যবস্থাই এখানে আছে।

ভবেন বলল, নিতান্ত খেতেই বসব না। একটু জমিয়ে বসতে হবে তো।

ঝিনুক উঠে রান্নাঘরে যেতে যেতে ভবেনকে বলল, চেয়ারগুলো একপাশে সরিয়ে দাও।

আমাকে উঠতেই হল এবার খাটে। খাবার বোধ হয় ইতিমধ্যেই পাশের ঘরে পৌঁছানো হয়ে গিয়েছিল। মেঝেতে আসন পেতে জল দিয়ে ঠাই করে দিয়ে গেল আনিদি। পরিবেশন করল ঝিনুক। খাবার আয়োজনের কথা না ভোলাই ভাল। কোনও নিয়মকানুনের ধার না ধেরে ওটা বেহিসেবি হয়ে গেছে। মাছ মাংস নিয়ে সপ্ত ব্যঞ্জনেরও বেশি। পায়েস পিঠেও বাদ যায়নি। সবকিছু প্রায় শিল্পসম্ভারের মতোই চারপাশে সাজিয়ে দিল ঝিনুক। নইলে বুঝি মানায় না।

এ বাড়িতে এ আমার নতুন খাওয়া নয়। রান্নাঘরে বসেও খেয়ে গেছি, কিন্তু এমন নিখুঁত সাজানো গোছানো আয়োজনের মধ্যে নিমন্ত্রণের মতো খেতে হয়নি।

ভবেনের চেয়ে আমার যেটুকু বাড়তি ছিল, সেটুকু হল একটি কাঁচালঙ্কা আর বাটিতে একটু বড়ির ঝাল। বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা ঝিলিক হানল যেন কোনও এক দুরের অন্ধকারে।

না, তা নয়। যেন অনেক দিন আগের একটি ছোট কথার স্মৃতি কেউ বেড়ে দিয়েছে সামনে। লঙ্কা কোনওদিন দুচক্ষে দেখতে পারিনে। বড়ির ঝালটা অত্যন্ত প্রিয়।

চকিতে একবার ঝিনুকের দিকে তাকালাম। কিন্তু ঝিনুক যেন খাবার বেড়ে দেবার ব্যাপারেই ব্যস্ত। থাক, সে কথা আজ ভাবব না। বড়ির ঝালের বাটিতে হাত দিয়ে, তবু আর একবার চোখ তুলে দেখি, আমার দিকে নয়, ঝিনুক বাটিটার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তাকালাম বলে সে ভবেনের দিকে তাকাল।

ভবেন হেসে বলল, ওই অকিঞ্চিৎকর জিনিসটা ঝিনুক তোর জন্যে স্পেশাল করেছে।

বলেও ভবেনের হাসিটা থামল না। হাসতে হাসতেই বলল, তার সঙ্গে একটা পরীক্ষাও হয়ে গেল।

–পরীক্ষা?

–হ্যাঁ। জানা গেল, এখনও রান্নার ঝাল ছেড়ে শুধু লঙ্কা ধরিসনি।

বলে আরও হাসল ভবেন। ঝিনুক গিয়ে একটি চেয়ারে বসল। সেও হাসছিল। কথাগুলি আমার এমন কিছু খারাপ লাগল না।

কিন্তু ভবেনের উচ্চ গলার হাসির মধ্যে সেই বেসুর যেন বড় বেশি চড়া সুরে বেজে উঠল।

আমাদের পিছনে সেই বড় আয়না। চেয়ারের ওপর সামনে ঝিনুক। পায়ে তার আলতা লক্ষ করেছিলাম। এখন শালীন হওয়ার জন্যে লাল পাড় দিয়ে ঢাকা দিয়েছে। যদিও সে মাটিতে বসেনি। এই দরবারের দুই বশংবদ প্রজার সামনে সে চেয়ারে বসেছে যেন মহারানির মতো।

ঝিনুক মাটিতে না বসায় মনে মনে অবাক হলাম। রীতি সহবতের দিক থেকে সেটাই শোভনীয় ছিল। কিন্তু ঝিনুককে তাতে কতখানি মানাত জানি না। সে যেন ঠিক মানানসই জায়গাতেই বসেছিল।

আমি খাবার মুখে দেবার আগে বললাম, কিন্তু ভব, এ যে একেবারে সপ্তকাণ্ড রামায়ণ করে ফেলেছিস। এ কি বলি দিবি বলে শেষ খাওয়া খাওয়াচ্ছিস নাকি।

ভবেন ভাত মাখতে গিয়ে থেমে বলল, রাস্কেল তুই একটা।

ঝিনুকের আঁচল খসল। তুলে নিল না। এক হাত ওর হাতলে, আর এক হাত কোলে। ফরসার ওপরে যেন সুবর্ণচ্ছটার একটি ঝংকার ছিল। কিশোরী ঝিনুককে যখন দেখেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল, কচি পাতায় ঝলক ওঠা রোদ সেটা। তারপরে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছে, আমাদের এই শালঘেরির রক্তমৃত্তিকায় রোদের ঝিলিকের মতো।

জেল থেকে নতুন কিছু হয়তো দেখতে শিখিনি। অনেক দিনের কারাবাসী বঞ্চিত চোখ আমার অবাধ্য হয়ে উঠল। যা আমি সোজাসুজি তাকিয়ে দেখতে কুণ্ঠিত, আজ আমাকে চুরি করেই দেখতে হচ্ছে সেই রোদের খেলা। এই শীতের রাতে, শালঘেরির এই দোতলা ঘরটায় আমার মনে হল, ঝিনুকের অনাবৃত শরীরের অংশে রোদ লুকোচুরি করছে। সেই রোদ মিটিমিটি হাসছে যেন আমারই দিকে চেয়ে।

ঝিনুক বলল, জেলে কখন খেতে?

যখনই হোক, রাত নটার মধ্যে।

 –ভাগ্যিস সেখানে নিয়মকানুনের বালাই ছিল।

না থাকলে?

–প্রাণ খুলে অনিয়ম করতে।

ভবেন বলল, এইবার তার শোধ নেবে টোপন। মতলব যা করে এসেছে, তাতে নিয়মকানুনই ভূতের মতো তাকিয়ে থাকবে ওর দিকে। হ্যাঁ, মাছ কেমন খাচ্ছিস টোপন?

–খুব ভাল।

-ওঃ, সে এক মজার গল্প! আজ মাছের জন্য টক্কর লেগে গেছল তোর পিসির সঙ্গে। সামনাসামনি নয়। ফ্যাসাদে পড়েছিল বৈকুণ্ঠ।

কী রকম?

–বৈকুণ্ঠ একটি মাছ ধরেছে ওই বেলায়। সেটি গিয়ে দাবি করেছে আমাদের ইন্দির। আর জানিস তো, আমাদের ইন্দিরের গাড়ি নেই, ঘোড়া নেই, চাবুকখানি আছে। ছাড়বে না কিছুতেই। বৈকুণ্ঠর মহা মুশকিল। বলেছে, অই টোপন ঠাকুর আইসছে এত বছর বাদে ফাঁসি থিকে ছাড়া পেয়া, ওয়াঁকে দিতে লাগবে যে?ইন্দির তারে বাড়া। বলেছে, আরে রাখ তোর টোপন ঠাকুর। তার চেয়ে অনেক বড় মানুষ আসবে আমার কত্তার বাড়িতে। হয় আর একটি ধর, না হয় ওটাই দে বৈকুণ্ঠ। বেচারির মহা মুশকিল। বাজারও তখন কানা। অত বড় সরোবর, আবার জাল ফেলাও চাট্টিখানি কথা নয়। শেষে, ইন্দিরকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিরস্ত করে, সারা দুপুর বেচারি পরিশ্রম করেছে। আমাদের পুকুরে এসে জাল ফেলে এই মাছ ধরে দিয়ে গেছে। যাবার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমার বাড়িতে আবার কে আসবে গ ঠাকুর?

খুব গম্ভীর হয়ে বললাম, সীমন্ত চাটুজ্যে। বৈকুণ্ঠ বললে, তিনিটি আবার কে? বললাম, সে তুমি চিনবে না। আমাদের আসল লোক।

বলে ভবেন ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে হাসল। ঝিনুক তাকাল আমার দিকে।

আমি বললাম, আমিও তোকে তাই বলছি। কেন, এ খাওয়াটা আমাকে দুদিন বাদে খাওয়ালে কী হত? পালিয়ে যাচ্ছিলাম নাকি শালঘেরি থেকে?

ঝিনুক বলল, ও দোষটা তুমি আমাকে দাও। আমিই আসতে বলেছিলাম।

অতএব এর ওপরে আর কথা চলে না। ঝিনুকের গলায় মেঠো গানের সুর নেই। কিন্তু সুর আছে। উচ্চাঙ্গ সংগীতের আলাপের মতো সেই সুর, সবসময় ভবিষ্যতের অর্থ বহন করে। সহজ করে বললে বোঝায়, ঝিনুক যা বলছে, ওতে সে কোনও তাল মানের ভুল রাখেনি। যা শোনা গেছে, তারপরে নীরব থাকাই শ্রেয়।

ভবেন বলল, আর দুদিন বাদে খাওয়ালে হত মানে কী? তা তো তোকে খেতেই হবে?

অবাক হলাম। কোনও উৎসবের কথা ভেবে বললাম, কেন, কী আছে?

 ভবেন বলল, কী আবার থাকবে, কিছুই না। আসতে হবে তোকে রোজই।

তাই ভাল। বললাম, কাজকর্ম ছেড়ে ভবেন ঘোষালের অন্ন ধংসাব বসে বসে।

কাজকর্ম ছেড়ে কেন? কাজকর্ম করেই।

এ ক্ষেত্রে ঝিনুক নীরব। আর ভকেনকে বুঝতে পারছি। ওর সেই অপরাধবোধটা ওকে ছাড়ছে না। মনের ফাঁপরটা কাটাবার জন্যে এত তালবেতালের কথা।

খাওয়া হল। বাইরের বারান্দায় আচাবার জল ঢেলে দিল ঝিনুক। আপত্তি শুনল না। গামছা তুলে দিল হাতে। কিন্তু অস্বস্তি হল, ভবেনকে নিজে নিজে সব করতে দেখে। যদিও নিজের বাড়ি তবু ঝিনুকের একটা কর্তব্য আছে নিশ্চয়ই। আমার মনে হল, ভবেন যে আছে, সেটাও যেন ওর মনে নেই। এ নির্বিকার তার স্বামীর প্রতি অবহেলা, না, আমি সামনে আছি বলে সংকোচ? কিংবা, এ আমারই দেখার ভুল মাত্র হবে। তবুভবেনের মুখে যে একটি অসহায় আড়ষ্টতা রয়েছে, সেও কি আমার দেখার ভুল!

ঝিনুক পান দিতে এল। বললাম, ওটা আমি কখনও খাইনে ঝিনুক। ভবকে দাও।

 ঝিনুক বলল, খাও না জানি। আজ খাও। ওকে দিচ্ছি।

ঝিনুকের বাক্যটা সম্পূর্ণ করলে বলতে হয়, আজ তোমাকে ওটা কষ্ট করে খেতেই হবে। কেন? ঝিনুক নিজের হাতে সেজেছে বলে! তা ছাড়া ঝিনুকের এ সব গিন্নিত্বের গুণ কোনওদিনই দেখিনি। বসে খাওয়ানো, আচাননা, মোছানো, পান দেওয়া। উপীনকাকার বাড়িতে ও সব চিরদিন কাকিমাই করেছেন। বরং শুনতে পেয়েছি, কাকিমা বলতেন, এ মেয়ে যে বাড়িতে যাবে, সেই বাড়ির কপালে কী আছে ভগবান জানেন।

যদিও তিনি এবং আমরা সকলেই নিশ্চিন্ত ছিলাম, সে বাড়ির শুভই হবে। কারণ, ঝিনুক সম্পর্কে সকলের একটি বিশ্বাস ছিল।

ভবেন বলল, গড়গড়া টানবি টোপন? ভাল তামাক আছে।

তুই কি তামাক ধরেছিস নাকি?

মাঝে মাঝে খাই, যেদিন ইচ্ছে যায়। ইন্দির সাজেও ভাল।

বললাম, বেশ স্কুল মাস্টার হয়েছিস। কিন্তু আজ নয়, আর একদিন খাব। এবার যাই।

ভবেন বলল, দাঁড়া, ওঘর থেকে চাদরটা নিয়ে আসি। বাইরে এই জামা দিয়ে আর চলছে না।

ঝিনুক পা দোলাচ্ছে খাটে বসে। ধীরে ধীরে দোলাচ্ছে। হাতের ভর দিয়ে পিছন দিকে হেলে বসেছে সে। আমি জানি ও এখন তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

এই পা দোলানো ভঙ্গিটা অনেক দিনের চেনা। মনে আছে, কাকিমা দেখতে পেলেই বলতেন, পা দোলাসনি ঝিনুক। মেয়েদের পা দোলাতে নেই।

কখনও কখনও ধমক খেতে হত। কিন্তু ঝিনুকের মনে থাকত না। বিব্রত লজ্জায় হেসে উঠত। আর কোপ কটাক্ষে পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখত। যেন, যত দোষ পায়েরই। অথচ ঝিনুক যখন হাসত, কথা বলত, তখন স্থির হয়েই থাকত। তাই আমার জানা ছিল, কোনও কারণে চিন্তিত থাকলে, রাগ হলে, কিংবা মনের মধ্যে উত্তেজনা অস্বস্তি থাকলে, ও নীরব হয়ে যেত। পা দুলিয়ে যেত সমানে, নিজেরই অজান্তে। আর সেই সঙ্গেই, চুল খোলা থাকলে, পাকের পর পাক চলত আঙুলে, গলায় জড়াত ফাঁসের মতো। যেন ভোলা চুলগুলি নিয়ে কী করবে, ভেবে পেত না।

এখন ঝিনুকের চুল খোঁপা বাঁধা। তবু কী আশ্চর্য বিচিত্র মানুষের মন। মনে মনে যেন একটু সান্ত্বনা পেলাম এই ভেবে, ঝিনুকের এই এত সাবলীল স্বচ্ছন্দ ব্যবহারের মধ্যেও তার অসহজতা ধরা পড়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ পা দোলানিটা থামল। শুনলাম, ঝিনুক ডাকল, টোপনদা।

আমি সহজভাবেই ফিরলাম।

দেখলাম, ঝিনুক আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। সেইদিকে চোখ রেখেই বলল, না আসার পণ করনি তো মনে মনে?

-এই তো এসেছি।

আজকের দিনটা বাদ। ও পণ যেন রেখো না মনে।

সুর শুনে বোঝবার উপায় নেই, ঝিনুক আমাকে নির্দেশ দিচ্ছে, না অনুরোধ করছে। হয় তো এ ওর শঙ্কা। নাকি জেদের অগ্রিম বার্তা, জানিনে। কিন্তু অমন পণ করে অকারণ আমি কোথাও কোনও প্রশ্ন সৃষ্টি করতে চাইনি।

বললাম, কাজের পণ ছাড়া আর কোনও পণ নিয়ে ফিরিনি ঝিনুক।

-তাই বুঝি?

ঝিনুক চোখ ফিরিয়ে তাকাল। সহসা যেন আমার বুকের রক্তে একটা দোলা লেগে গেল। ঝিনুককে দেখে, ওর দেহের যে বর্ণনা মনে মনেও উচ্চারণ করিনি, তা-ই যেন আমার দীর্ঘকালের পুরুষ-প্রাণের মৌনতাকে মুখর করে তুলল। ও তিলোত্তমা নয়। কিন্তু ওর দেহের মধ্যাংশ থেকে, উধ্বাঙ্গের বক্ষ গ্রীবা, নিম্নাংশের কটি উরু ও জংঘা সব কিছুতেই একটি যেন মাপ করা ছন্দের বিন্যাস। যে বিন্যাসের মধ্যে একটি অনায়াস, তীব্র আকর্ষণের দ্যুতি। ঝিনুকের বসার ভঙ্গিতেই কিনা জানিনে, নতুন করে চোখে পড়ল যেন।

ওর কথার জবাবে হ্যাঁ বলে, তাড়াতাড়ি চোখ ফেরাতে গেলাম। হঠাৎ ঝিনুক খাট থেকে উঠে একেবারে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, দেখি, এটা কীসের দাগ, এই ঠোঁটের নীচে, চিবুকের কাছে? এটা তো ছিল না?

আমি চমকে উঠলাম। নিশ্বাস ফেলতে পারলাম না। একটি অস্পষ্ট গন্ধ আমার বুকের মধ্যে আবর্তিত হতে লাগল। মুখ তুলে, দরজা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। বললাম, কোথায়?

ঝিনুক বলল, এই যে, এখানে। দেখিনি তো আগে?

মনে পড়ল আমার। বললাম, ও, হ্যাঁ, দাড়ি কামাতে গিয়ে ব্রণ কেটে ফেলেছিলাম। সেফটিক হয়ে গেছল।

কথা শেষ করবার আগেই আমার চোখে পড়ল, বাইরের বারান্দার অন্ধকারে একটি অস্পষ্ট মূর্তি যেন থমকে দাঁড়াল। কিংবা ভুল দেখলাম। ভয় উত্তেজনা অস্বস্তি, এ সব কিছু ঢাকবার জন্যেই যেন আমি বিমূঢ়ভাবে হেসে উঠলাম। ডাকলাম, ভব, ভব।

এবং সত্যি, ভবেন ঢুকল ঘরের মধ্যে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে, চাঁদরের ভাঁজ খুলতে খুলতে, পান চিবুতে চিবুতে, আর হাসতে হাসতে। বলল, কী হয়েছে চিবুকে?

বলে সে আমার আর এক পাশে এসে দাঁড়াল। ঝিনুক কিন্তু একটুও সরল না। ভবেনকে বলল, নতুন দাগ।

ভবেন বলল, জেলের দাগ।

দু পা পেছিয়ে আমি বললাম, দাগের বিচার থাক। এবার চলি। কিন্তু ভব, তুই আর এই রাত করে, ঠাণ্ডায় বেরুতে যাচ্ছিস কেন?

ভবেন বলল, বরাবর যা করেছি, তাই করব। চল, এই পাড়াটা পার করে দিয়ে আসি।

বরাবর ভবেন তা-ই করেছে বটে। রাত করে ওদের বাড়ি এলে পাড়ার বাইরে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। আমিও আমাদের দেবদারুতলা পার করে দিয়ে যেতাম ওকে। ভবেন সেই পুরনো দিনের নিয়মগুলিই আজও বজায় রাখতে চায়। কিন্তু এই নতুন পরিবেশে, পুরনো নিয়ম কি চলবে!

ভবেন যেন অনুমতি নিচ্ছে, এমনি করে ঝিনুককে বলল, আমি তা হলে টোপনকে এগিয়ে দিয়ে আসি।

ঝিনুক কোনও জবাব না দিয়ে হাত বাড়িয়ে বাতিটা তুলে নিল। ভবেন এগিয়ে গেল দরজার দিকে। তখন ঝিনুকের গলা শোনা গেল, রাস্তার মাঝখানে গল্প করে রাত কাবার করে এসো না যেন।

ভবেন দরজার বাইরে থমকে দাঁড়িয়ে বলল, না, না।

তারপরে হঠাৎ হেসে উঠল। হাসতে হাসতে, পা বাড়িয়ে বলল, আয় টোপন।

ভবেনের চড়া গলার হাসিতে একটা অস্বস্তিকর বিস্ময় ঘিরে ঘিরে এল আমার মনে। কিন্তু ঝিনুককে না বলে পারলাম না, গল্প করে রাত কাবার তো দুরের কথা, আমি ওকে দু পা গিয়েই ফিরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

ঝিনুক চকিতে এক বার চোখ তুলে তাকাল আমার দিকে। একটি চিকুরহানা ঝিলিক যেন দেখলাম ওর ঠোঁটের কোণে। বলল, কথাটা তোমাকেও বলেছি। বাইরে দাঁড়িয়ে হিমে গল্প করলে তোমারও শরীর খারাপ হবে।

ও বাতি নিয়ে এগিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল আমার আগে আগে।

 দালান পার হয়ে উঠোনে এলাম। ঝিনুক আমার পিছনে পড়ল। বাইরে যাবার পথে, একটি মূর্তি দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম, কালো একটি গোটা পুরনো কম্বল মানুষের অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফাঁক দিয়ে মুখ দেখা যায়। কালো রেখাবহুল মুখ। চোখ দুটি যেন হলুদ বর্ণ। গুটিকয় অবশিষ্ট বড় বড় দাঁতের হাসি দেখতে পেলাম। পায়ের কাছে প্রায় ঝুঁকে পড়ে নমস্কার করতে এল।

চিনতে পারলাম। বললাম, ইন্দির যে। থাক থাক। কেমন আছ?

কালো লোল চামড়া হাতখানি কম্বলের মধ্যে ঢুকিয়ে, ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, ভাল মন্দ বুঝি না। বেঁচে রয়েছি, তাই আছি। তুমি ফিরে এসেছ তা হলে?

–কেন, ফিরব না ভেবেছিলে নাকি?

— হ গ দাদা, শুনেছি, আর তুমি ফিরে আইসবে না। তুমি নিকি পুলিশ খুন করেছ, তাই গরমেন্ট তুমাকে ফাঁসি দিবে।

অবাক হয়ে বললাম, পুলিশ খুন করেছি? কে বললে?

ইন্দির বলল, সবাই বুলছে। গড়াইয়ের আনিরুদদাদাকে যেমন গুলি করে মেরেছে, তুমাকে তেমনি ফাঁসি দিয়ে মারবে, সবাই বুলছে।

হাসতে গেলাম। কিন্তু তেমন যেন প্রাণ খুলে হাসতে পারলাম না। এ কি শুধু জনতার গুজব যে, আমি পুলিশ হত্যা করেছি, আমার ফাঁসি হবে। জনসাধারণ তো বীরত্বের জয়গান করতেই ভালবাসে। দেশপ্রেমিকদের শ্রদ্ধা করতেই অভ্যস্ত। অথচ এই পুলিশ হত্যা ও ফাঁসির গুজবের পিছনে যেন তেমন সুরটা বাজে না।

ইন্দির আবার বলল, আর দ্যাখ ক্যানে দাদা, ছোটা গাঁ-খানি যেন তুমার নাম বিস্মরণ হয়ে যেইছে।

কথাটা নিষ্ঠুর চাবুকের মতো ঘা দিল আমার মুখে। যেন সকল প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে, আমার মুখের সমস্ত আলো নিভিয়ে দিতে চাইল। জানিনে, মুখের চেহারা কেমন হল। আমি হেসে উঠলাম। ঝিনুক আমার পিছনে আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে। ইন্দিরের কথা ওর ওপরে কী ক্রিয়া করল, মুখের ছবিতে তা দেখতে ইচ্ছে করল। সাহস পেলাম না। কিন্তু জানি, ইন্দিরের মতো মানুষেরা ও কথা বিশ্বাস করেছিল। আমার অস্তিত্বকে তারা সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ভুলে গিয়েছিল প্রায়। কিছুটা হয়তো, অশিক্ষা কুসংস্কার থেকেই হয়েছিল। তবু যা তাদের বিশ্বাস, সে কথা বলতে বাধে না।

বললাম, চোখে দেখলে আবার হয়তো স্মরণ পড়বে ইন্দির।

ইন্দির বলল, নিচ্চয়। দেখলে কী গ, শুনেই সবাই বলতে নেগেছে। এই ধরে নিয়ে যাবার পর ছ মাস যে তুমার কুন খবর পাওয়া যায় নাই, তাইতেই অমন হল। তা কী রকম কী বুঝলে?

অবাক হয়ে বললাম, কীসের কী বুঝব ইন্দির?

–এই তুমার গা, যি জন্যে গেছেলে? স্বাধীনতা গ স্বাধীনতা।

এত বড় প্রশ্নটা আমাকে এ পর্যন্ত আর কেউ করেনি। সত্যিই তো! সাড়ে তিন বছর যে মানুষ রাজনৈতিক কারণে জেল খেটে আসে, ইন্দিরের মতো মানুষেরা তাকেই সে কথা জিজ্ঞেস করবে বইকী। আমার আত্মবিস্মৃত অবস্থাটাকে যেন খুঁচিয়ে সজাগ করে দিলে ইন্দির। পঁয়তাল্লিশ সালের শেষ দিকে কলকাতা ও বম্বের বিক্ষুব্ধ আন্দোলনের কথা আমার মনে পড়ল। তখন জেলে আমরা খবরের কাগজ পড়তে পেতাম না। পূর্ণ স্বাধীনতা দাবির ঘোষণার কথাও এখন যেন মনে পড়ল। তবু কতটুকুই বা ভেবেছি। কথা বলার যোগ্যতায় সত্যি মিথ্যে কিছু বলা যায় ইন্দিরকে। মুশকিল হচ্ছে ইন্দির রাজনীতি করে না, খবরের কাগজও পড়ে না। আমার কথাটাকে সে ধ্রুব বলে বিশ্বাস করে নিতে পারে।

তাই একটু সংশয় রেখেই বললাম, খুব বেশি কিছু বুঝিনি ইন্দির। তবে, লোকের ধৈর্যের বাঁধ বোধ হয় ভাঙছে। ইংরেজদের এবারে পাততাড়ি গুটোতে হতে পারে।

ইন্দির স্বাধীনতা বলতে কী বোঝে জানিনে। জানিনে, ইংরেজ থাকায় সে যা আছে, না থাকলে কী হবে। কপালের কাছে হাত তুলে বলল, দ্যাখ, অখন মা শালেশ্বরীর কী ইচ্ছা। তবে এত কষ্ট করেছ, তা কি বিফলে যাবে? তা যাবে না। এবার নিচ্চয় দেশখানি স্বাধীন হবে।

দেখলাম, ইন্দিরের হলদে কোল-ঢোকা চোখ, দৃষ্টি সমুখের কোনও কিছুতে আবদ্ধ নেই। বহু দূরে, উদ্দীপ্ত চোখে যেন সে তার স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখছে। তখনও তার ঘাড় দুলছে।

দেশপ্রেমিক মুক্ত রাজবন্দি আমি। বিস্মিত হয়ে ভাবলাম, এই স্বপ্নে দেখা, ইন্দিরদের সেই স্বাধীন দেশটি কেমন। তার চোখ দুটি দেখে তো মনে হয় না যে এ দেশে ইংরেজরা থাকবে না, শুধু সেইটুকুই তার স্বপ্ন। আরও কিছু, আরও অনেক মহৎ, আশ্চর্য, বিচিত্র, সুন্দর। ইন্দিরের কপালের সর্পিল রেখা, মুখের লোল চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে যেন বহুকালের ধ্যানের একটি প্রসন্ন উত্তেজনা। সেই দেশের অনাগত মূর্তিকে যেন সে চেনে।

লজ্জা পাব না, সংকুচিত হব না, দ্বিধা করব না বলতে, ইন্দিরের মতো সেই দেশের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা যেন আমারও নেই। আর অবাক হয়ে ভাবলাম, যে বিদেশিরা দেশকে অনেক অহংকার নিয়ে শাসন করে, তারা কি এই ভারতবর্ষের দূর গ্রামের ইন্দিরদের কথা একটুও জানে? এই কালো উলঙ্গ অশিক্ষিত অসহায় মানুষদের স্বপ্নের কথা! যারা চিরকাল মাথা নুয়ে, কপালে হাত ঠেকিয়ে তাদের সম্মান দেখিয়েছে, অথচ অশ্রদ্ধা অভিশাপ উপচে পড়েছে প্রাণ থেকে।

ইন্দিরের দিক থেকে চোখ ফেরাতে গিয়ে আর একবার যেন মনে মনে চমকে উঠে তার দিকে তাকালাম। আমার যে কষ্টের কথা সে বলেছে, সে মর্যাদার দাবি সহসা তুচ্ছ বোধ হল। আমি জেল খেটে যে কষ্ট পেয়েছি, ইন্দিরের জন্মগত অভিশাপে, সেই কষ্ট এই মানুষের সমাজে অনেক অপমানের গ্লানির মধ্যে ভোগ করেছে সে।

বললাম, ইন্দির, আমার জেল খাটায় এদেশের স্বাধীনতা আসবে না। যদি আসে, তোমাদের পাওয়ানার তাগিদেই আসবে।

ইন্দির কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, উ বাবা, তুমাদিগে না হলে, আমরা কে?

বৈঠকখানার কাছ থেকে ভবেনের গলা ভেসে এল, ইন্দিরদা, আজ ছেড়ে দে, পরে সময় পাবি। ইন্দির বলে উঠল, হঁহঁ, অখন আস গা।

আমি চকিতে এক বার পিছন ফিরে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলাম। ঝিনুক আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল।

বৈঠকখানার এবং অনেকখানি চত্বর পেরিয়ে গেটের কাছে আসতে আসতেও দেখলাম, হ্যারিকেনের আলোেটা পিছন ছাড়েনি। কদমতলায় এসে ঝিনুক দাঁড়াল। ভবেন কয়েক পা আগে এগিয়ে চলেছে।

ফিরে বলতে হল, চলি ঝিনুক।

ঝিনুক বলল, আবার এসো।

কোনও জবাব না দিয়ে এগিয়ে গেলাম। আলো নিয়ে ঝিনুক দাঁড়িয়ে আছে বুঝলাম।

পশ্চিমা শুকনো ঠাণ্ডা বাতাস বেশ জোরেই বইছে। অন্ধকার যেন আরও গাঢ়। দূরে, তামাইয়ের ধারেই হয়তো শেয়ালের ডাক শোনা গেল এক বার। কুকুর ডেকে উঠল কয়েকটা। শুকনো পাতা উড়ছে সড়সড় করে। গোটা শালঘেরিতে যেন একটি মানুষও জেগে নেই আর।

টর্চলাইটের বোতাম টিপতেই শীতার্ত রাতের অন্ধকার যেন বিরক্ত হয়ে একটু পথ ছেড়ে দিল। অন্ধকার এত গভীর যে, সহজে তার নড়বার ইচ্ছে নেই। কিন্তু ভবেন তেমনি আগে আগে এগিয়েই চলেছে। কথা বলছে না। বিমর্ষ বিস্ময়ে, খানিকটা দুঃখে মনে মনে না হেসে পারলাম না। ভবেন কি সত্যি অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল, এবং মনে মনে কিছু ভেবে নিল? তা হলে এত সহজে হাসতে হাসতে আসা যে আমার ব্যর্থ হল। যে অন্ধকারকে চাবুক কষে সরিয়ে রেখেছি, সে আর এক দিক দিয়ে এসে কি আমাকে কালিমা লেপে দিয়ে গেল।

ডাকলাম, ভব, দাঁড়া।

ও দাঁড়াল পিছন ফিরে। ঠিক আমার দিকে ওর চোখ নেই, অথচ আমারই দিকে যেন। এবং ঠোঁটের কোণে একটি দুর্বোধ হাসি। টর্চের আলোয় সহসা চোখে পড়ল, ভবেনের হাতে একটি লোহার ডাণ্ডা। আবার ওর মুখের দিকে তাকাবার চেষ্টা করলাম। স্পষ্ট দেখতে পেলাম না কিছু। শুধু অস্পষ্ট আলোয়, কোলে-ঢোকা লাল চোখ দুটি ওর চকচক করছে।

জিজ্ঞেস করলাম, ওটা কী?

লোহার রড।

 কী হবে?

 নিয়ে এলাম।

তাচ্ছিল্যভরে বলে, ভবেন আমার দিকে চোখ তুলল। বলল, ঝিনুক এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

সেটা আমিও আন্দাজ করেছিলাম। কেন, তা জানিনে। আমরা দুজনেই ফিরে তাকালাম। দূরে, ঝিনুকের হাতে একটি বিন্দুর মতো হারিকেনের আলো দেখা যাচ্ছিল। খুবই অস্পষ্ট হলেও ঝিনুকের অবয়বের একটু ইশারাও ফুটে উঠেছিল। সহসা এক ঝলক তীক্ষ্ণ শীতার্ত বাতাস আমাদের যেন আঁচড়ে দিল। কাছেই একটা তালগাছের শুকনো পাতা সড়সড়িয়ে উঠল। আমি ভবেনের দিকে তাকালাম। ভবেন একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে পিছন ফিরে আবার চলতে লাগল।

এবার আমরা ডাইনে মোড় নিলাম। ঝিনুককে আর দেখা যাবে না। পাড়াটাও ছেড়ে গেল আমাদের। সামনে খোলা বিস্তীর্ণ কাঁকর বালিমাটি প্রান্তর। মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্ত শাল আর তালগাছ।

বললাম, এবার তুই যা ভব।

 ভবেন বলল, চল, এই ফাঁকা জায়গাটা পার করে দিয়ে আসি।

ভবেন যেন কী ভাবছে, গলার স্বরটা ওর খুব স্বাভাবিক মনে হল না। আমি টর্চের আলোটা ফেলে ফেলেই চলছিলাম। সেই আলোয় মনে হচ্ছিল, ওর দৃষ্টি পথের দিকে নয়। শূন্য দৃষ্টি, শুধু আলো দেখে আন্দাজে চলছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ফাঁকা জায়গাটা পার হয়ে এসে, আমি দাঁড়ালাম। কাছেই আমাদের পাড়ার মুখের দেবদারু গাছটা পশ্চিমা বাতাসের দাপটে সা সা করছে।

বললাম, ভব, অনেক রাত হয়েছে, এবার তুই যা। তোর টর্চ আছে?

না।

–তবে এইটা নিয়ে যা।

ভবেন বলল, ছেড়ে দেব তোকে?

তবে কি এত রাতে তুই আমাকে বাড়ি অবধি পৌঁছুবি নাকি?

ভবেন বলল, তাই দিয়ে আসি চল টোপন। আমিও আলো ছাড়া ফিরব না। কিছুদিন ধরে বাঘের উৎপাত গেছে, তামাইয়ের ওপারে শালবনে। এপারেও হানা দিয়েছে কয়েকবার। তাই ডাণ্ডাটা নিয়ে বেরিয়েছিলাম।

চমকে উঠে বললাম, সে কী, এ কথা তো বলিসনি। তুই বা তা হলে একলা যাবি কেমন করে?

ভবেন বলল, আমি যেতে পারব, সে জন্য ভাবিস না। তোকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে, তোরই আলো নিয়ে আমি ফিরব।

বলে সে ডাণ্ডাটা দেবদারু গাছের গোড়ায় রেখে বলল, ফেরবার সময় নিয়ে যাব, চল।

উৎকণ্ঠায় বিমর্ষ হয়ে উঠলাম। পথ চলতে চলতেই বললাম, তেমন যদি জানতিস, তবে ইন্দিরকে সঙ্গে করে বেরুলেই হত।

ভবেন বলল, তার দরকার হবে না। রাত বিরেতে এ গাঁয়ে আমার চলাফেরা অভ্যেস আছে। তুই অনেকদিন চলিসনি।

বাড়ির কাছাকাছি যখন এসেছি, তখন ভবেন তার একটি হাত তুলে দিল আমার কাঁধের ওপর। বুঝলাম না, ওর সেই হাতটি কাঁপছে কি না। আমি ফিরে দাঁড়ালাম। আমিও ওর কাঁধে হাত তুলে দিলাম। টর্চের মুখ মাটির দিকে। অস্পষ্ট আলোয় দেখলাম, ওর কালো মুখ ও লাল চোখ দুটিতে কী একটা অসহায় ব্যাকুলতা যেন মাথা কুটছে।

বললাম, কিছু বলছিস ভব?

বুঝি রাত্রি বলেই ভবেনের গলা চুপি চুপি শোনাল। বলল, টোপন, যেন রেগে উঠিস নে, একটা কথা বলব।

বললাম, বল।

 ভবেন বলল, জেলে যাবার আগে যেমন উপীনকাকার বাড়ি যেতিস, তেমনি আমাদের বাড়ি যাস।

কী বলতে চায় ভবেন। আমি তার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করলাম। নিজের দিকে ফিরে দেখলাম, সেখানে সব অনুভূতিটুকু কখন প্রশ্নহীন শূন্যতায় পৌঁছেছে। কী বলব আমি সহসা ভেবে পেলাম না।

ভবেন আবার বলল, যাবি তো টোপন।

বললাম, ভব, যাব না এ কথা তো এক বারও বলিনি। কিন্তু যা সত্য, তাকে এমন বেঁকেচুরে অনাসৃষ্টি করে লাভ কী? উপীনকাকার বাড়িতে যেমন যেতাম, তোর ওখানেও তেমন করে যাব, এ কথা বললে আমার যাওয়া হয় কেমন করে? সে কি আর সম্ভব! আমি তোর বাড়িতেই যাব ভব।

ভবেন চকিতে এক বার আমার চোখের দিকে তাকাল। বলল, ও, বেশ। তবে তাই যাস। কিন্তু আমি মিথ্যা কথা বলি নাই টোপন। সত্যকে একটুও বাঁকাচোরা করিনি। দে, টর্চটা দে, যাই। কাল আসব।

আলো নিয়ে ভবেন চলে যাচ্ছিল। আমার মস্তিষ্কের মধ্যে যেন সবই এলোমেলো হয়ে একটা অর্থহীন আবর্তের জট পাকিয়ে গেল। ভবেন মিথ্যে বলেনি, সত্যকে একটুও বাঁকাচোরা করেনি, এ সব কথার মানে কী? আমি মনে করি, ভবেন ঝিনুক বিবাহিত দম্পতি। একদা ঝিনুকের একটিই মাত্র পরিচয় ছিল। সে উপীনকাকার মেয়ে। তখন আমি যে-ঝিনুকের কাছে যেতাম, আজ সে-ঝিনুক নেই। এই তো সত্যি। এর মধ্যে আর কোন সত্য লুকিয়ে আছে, যাকে ভবেন মিথ্যে দিয়ে বাঁকিয়ে চুরিয়ে তোলেনি।

আমি ফিরে তাকালাম। আর অন্ধকারে ভবেনের সেই মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে সহসা একটি দুর্বোধ তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা অনুভব করলাম। আমি যেন দেখলাম, সর্বনাশের শেষ ধাপে মুখ গুঁজে পড়ে আছে একটা মানুষ। সেই মুহূর্তেই বোধ হয় অর্থহীন, তবু আমার শূন্য মস্তিষ্কে অদ্ভুত দু-একটা কথা ঝিলিক হেনে গেল। আমি তাড়াতাড়ি ডাকলাম, ভব!

ভবেন দাঁড়াল। আমি এগিয়ে গেলাম। বললাম, একটা কথা তোকে জিজ্ঞেস করব?

ভবেন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, বল।

 চকিতে একটা বাধা আমার জিভ আড়ষ্ট করে দিল। তবু জিজ্ঞেস করলাম–তোদের এখনও ছেলেপিলে হয়নি কেন? ঝিনুকের দৈহিক–?

–কোনও বাধা নাই টোপন। নগেন ডাক্তার বলেছে। মা জেদ করে এক বার জেলা হাসপাতালের লেডি ডাক্তারকেও দেখিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু হয়নি।

ভবেনের মুখের ওপর অনেকগুলি রেখা গম্ভীর হয়ে উঠল। সে আমার চোখের দিকেই তাকিয়েছিল। আমি যেন ঠিক বুঝতে পারলাম না, সে কী বলতে চাইল। তবু আমার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এল। ওর চোখের দিকে তাকাতে আমার ভয় করল।

ভবেন মোটা গলায় থেমে থেমে আবার বলল, আর আমার কথাও জিজ্ঞেস করতে পারিস টোপন। আসলে তার কোনও প্রয়োজন নাই। চলি–

ও চলে গেল তাড়াতাড়ি।

আর আমি যেন দেখলাম, রাতারাতি যে মাটি কেটে ভবেন ফুলের আশায় বাগান করেছিল, সে মাটি নয়, বালিয়াড়ির ভূপ। সেখানে ফুল ফোটেনি, পাখি ডাকেনি। ভ্রমরটার গেছে পাখা গুটিয়ে। প্রজাপতিরা উড়ে এসে কোনও রংবাহার সৃষ্টি করেনি।

সেই বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে ভবেন কাঁটা ঝোঁপের মাঝখানে ভীত বিস্মিত ক্লান্ত চোখে যেন তাকিয়ে আছে।

আমিও যেন ভয় পেলাম। আমার সর্বাঙ্গ আড়ষ্ট হয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। শালঘেরির অরণ্য যেন আকাশ ছাড়াল। তারা চারদিক থেকে ঘিরে ধরতে লাগল আমাকে। আমি তাদের কাউকে চিনি না। পৃথিবীর আদিম রহস্যের মতো তারা ছায়া ফেলে ফেলে এগিয়ে আসতে লাগল আমাকে ঘিরে।

মহাকালের যে সেতুর কাছে আমার আশ্রয় প্রার্থনা ছিল, সে কোথায় গেল।

মনে হল, আমি বুঝি শালঘেরিতে ফিরে আসিনি। এক মায়া-অরণ্যের অলৌকিক ভয়াল ছায়ার ঘেরাও-এ বন্দি হয়ে পড়েছি।

ফিরে এসে বন্ধ দরজায় ঘা দিতে যাচ্ছিলাম। তার আগেই নিঃশব্দে দরজা খুলে গেল। অন্ধকার হলেও, বুঝলাম কুসুম।

বললাম, কী রে কুসুম, ঘুমোসনি?

 কুসুম সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, না।

 বললাম, তুই কি সন্ধে থেকে দরজায় দাঁড়িয়ে আছিস নাকি?

কুসুম বলল, তা কেন? মনে হল, কারা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, তাই এসেছি দরজা খুলতে।

দালানের বারান্দার দিকে যেতে যেতে বললাম, পিসি ঘুমোচ্ছে?

-হ্যাঁ।

কৃতজ্ঞতার চেয়ে অস্বস্তি বেশি হল আমার কুসুমের জন্য। কিন্তু ও এত চুপচাপ কেন? পিসির সঙ্গে ঝগড়া করেছে? না কি ঘুম পেয়েছে। পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

বললাম, যা শুয়ে পড়গে।

 কুসুম বারান্দা থেকে দালানে গিয়ে ঢুকল। আমি কয়েক মুহূর্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলাম। ভবেন এখন মাঠের ওপরে নিশ্চয়। শীতার্ত ঝোড়ো বাতাস রাত্রিটাকে নখে নখে ছিঁড়ছে। এক বার চকিতে মনে হল, দখিনপাড়ার অন্ধকারে এখনও কি সেই আলোর বিন্দুটি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মুহূর্ত পরেই বিস্ময় সংশয় ও একটি বিচিত্র জিজ্ঞাসা আমাকে কাঁপিয়ে দিল।

দালানে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম। ঘরের দিকে যেতে গিয়ে মনে হল, দেওয়ালের আবছায়ায় যেন কেউ লেপটে রয়েছে।

জিজ্ঞেস করলাম, কে?

–আমি।

কুসুম! কী করছিস ওখানে?

–খোঁপার কাঁটাগুলো খুলে নিচ্ছি, নইলে বড় বেঁধে। জেটি বিশ্বাস করতে চায় না।

ঘুমাৰ্ত বলে মনে হল না কুসুমের গলা। বললাম, যা যা শুয়ে পড়গে, অনেক রাত হয়েছে। বাতিগুলো সব নিভিয়ে ফেলেছিস নাকি!

না, তোমার ঘরে কমানো আছে।

আমি ঘরে গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম এল না অনেকক্ষণ। কখন এক সময় যেন শব্দ পেলাম, পিসির ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার। কোন এক ছায়ালোক থেকে ফিরে এলাম যেন। উৎকর্ণ হলাম। আর কোনও শব্দ নেই। কুসুম বুঝি শুতে গেল এতক্ষণে। এতক্ষণ অন্ধকার দালানে ভূতের মতো কী করছিল একলা একলা। মেয়েটা বড় অবাধ্য।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *