বিহারী পর্ব

৩৪. সুন্দরের কোন মন্ত্রে মেঘে মায়া ঢালে

সুন্দরের কোন মন্ত্রে
মেঘে মায়া ঢালে
ভরিল সন্ধ্যার খেয়া
সোনার খেয়ালে

আব্দুস ছালাম, আমার শ্রদ্ধেয় শ্বশুর, আমার আব্বার নামে নাম। কিন্তু উনি সব সময় ‘সালাম’ বানানটা ‘ছ’ দিয়ে লিখতেন। দৈনিক আজাদ পত্রিকা বোধকরি ওনাদের সময় ‘স’-এর উচ্চারণটা ‘ছ’ দিয়ে লেখার পরামর্শ দিতেন এবং তা এখনো অনেক মেনে চলেন :

আমি ওঁকে বাবা ডাকতাম। সুতরাং একজন আব্বা, অন্যজন বাবা, বাবাকে প্রথম দেখি ১৯৫৪ সনে আমার মেজো বোনের শ্বশুর হিসেবে (পরবর্তীতে আমারও)। বেশ শক্ত সমর্থ মানুষই বটে, তখন তাঁর বয়স ছিল, ৫৪/৫৫-র ঘরেই হবে। চটপটে হাঁটা, কথাও সোজাসাপ্টা। আমি তো তখনও ১০ হইনি— অত বুঝতামও না কিছু— কিন্তু কোনো কারণে বোধ করি রেগেছিলেন সে দিনটিতে।

সেই মানুষটিকে পরে দেখলাম যখন এইটে পড়ি। গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম তাঁদের। আব্বা আম্মা বোনদের সাথে। ওই বোধহয় তখন আমার প্রথম গ্রাম দেখা, কারণ তিন বছরের মুর্শিদাবাদ মনে থাকার কথা নয়।

গ্রামের নাম বেরাইদ। ঢাকা শহরের অদূরে-কিন্তু যোগাযোগ-এর সুবিধার অনুপস্থিতিতে মনে হতো কোথায় যেন! ডেমরা থেকে বালু নদী দিয়ে নৌকায় যাওয়া হয়েছিল। দুতিন ঘণ্টা লেগেছিল। গ্রামটা বর্ষাকালে একটা দ্বীপ হয়ে থাকে। প্রতি বছর বর্ষাকালে তার আশেপাশের সমস্ত নীচু জমি বাৎসরিক বন্যায় ঢুবে থাকে— শীতে সোনালী ধানের আলোয় তা আবার আলোকিত হয়। আরও অনেক ইতিবৃত্ত রয়েছে, নিশ্চয় এ গ্রামের, তবে আমি যেটকু জানি, তা হলো-সুলতানি আমলের একটা চমৎকার মসজিদ প্রমাণ করে যে এ গ্রাম অতি পুরাতন ঐতিহ্যে ঋদ্ধ।

একটা হাইস্কুল আছে, যার একজন শিক্ষক আব্দুস সালাম সাহেব। যিনি ওই এলাকায় সালাম মাস্টার নামে পরিচিত। আর তাঁর বাড়িটা পরিচিত মাস্টার বাড়ি নামে।

আমার বিয়ের পর সালাম মাস্টারকে অতি নিকট থেকে জানার সুযোগ হলো। তখনো তিনি সুঠাম দেহের অধিকারী, কথা সুস্পষ্ট, কিন্তু আঞ্চলিক ভাষাটাই তাঁর প্রিয়-সেভাবেই কথা বলেন।

একদিন জিজ্ঞেস করলেন—

এখনো নাটক কর?

জি বাবা।

অফিসে অসুবিধা হয় না?

এখনো হয়নি।

সংস্কৃতি চর্চা ভাল জিনিস। মানুষের মন ভাল রাখে। কিন্তু কাজে ফাঁকি দিবা না, ওইটা হবে নাফরমানি।

কথাগুলো আজও বাজে কানে।

এরপর থেকে যখনই দেখা হতো প্রথম প্রশ্নই ছিল—

কি নাটক করতেছ? (Stage-এর নাটকের কথা

নামটা শুনে বলতেন—

পত্রিকায় দেখছি, নাম করছে তোমার।

.

প্রতিদিন পত্রিকা না পড়লে খাওয়া হজম হতো না বাবার। তখন ঢাকা থেকে পত্রিকা যেতে যেতে দুপুর হয়ে যেত। উনি বাড়ির সামনের রাস্তায় পায়চারী করতেন হকারের জন্যে। শুধু পত্রিকা নয়, চিত্রালীও পড়তে দেখেছি-আর মাসিকের মধ্যে সম্ভবত ‘মাহেনও’ তাঁর প্রিয় ছিল। এই পড়ার নেশা অগ্রগণ্য অবশ্যই। তাঁর পুরোনো সিন্দুক থেকে আমি সেই ব্রিটিশ আমলের মাসিক পত্রিকা বের করে পড়েছি, তাতেই বুঝেছি, এ নেশা তাঁর যৌবনকালের, কিংবা কৈশোরেরও হতে পারে।

বাবার একটু ইতিহাস বলে নি এখানে-ম্যাট্রক পাশ করেন ঢাকা মুসলিম হাইস্কুল থেকে। ইন্টারে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ছোট থেকেই একটু উড়ুউড়ু ছিল মনটা। বংশের সবাই ব্যবসায়ী ছিলেন, ব্যাপারী। বেরাইদের অধিকাংশ মানুষের ব্যবসা ছিল চামড়া। এখনও তাই— মানে যারা বাপ দাদার ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন— তাঁরা এই ব্যবসাই করেন। কিন্তু আমার শ্বশুর ছিলেন ব্যতিক্রম। সাদেম ব্যাপারী, গ্রামের মোড়ল পাড়ার অন্যতম এক মোড়ল— তাঁর বাবা। বাবা তাঁকে ব্যবসায় নিতে পারেননি। তিনি পড়বেন! সেই সূত্রে ঢাকা কলেজে ভর্তি।

কিন্তু তিনি, ওই যে বই পড়ার নেশা, ঢাকার সিনেমাও দেখতেন— সেটাও নেশা— ঘোরের মধ্যে ছিলেন— আইএসসি পরীক্ষার ভর্তির ফি নিয়ে রওয়ানা দিলেন বোম্বের পথে, হ্যাঁ বোম্বে। সিনেমায় ঢুকবেন নাকি দেখতেই যাবেন প্রিয় শিল্পীদের, সেটা জানা নেই তাঁর তখনও। ট্রেনে চড়ে পৌঁছলেন দিল্লি। সঙ্গে আরও দু’জন সহপাঠি, এলাকারই ছেলে। সেখানে কি করে যেন জানলেন আর্মিতে সৈনিক নিচ্ছে। রিক্রুট হয়ে গেলেন— জোয়ানের পদে। দুদিন টেনিং ক্লাস করে হয়রান। তৃতীয় দিন দাড়ি কেটে না যাওয়ায় ওস্তাদের দুই চড়। পরদিন সকালে পালালেন ক্যাম্প ছেড়ে। এবার পৌঁছলেন বোম্বাই। স্বপ্নের শহর। ফিল্মের দরজায় ঢোকা তো আর সহজ নয়। কোনো নায়ক নায়িকার দেখা পাওয়া সে তো ডুমুরের ফুল দেখার মত।

পকেটের পয়সা শেষ এর মধ্যে। জাহাজের খালাসির চাকরি পেলেন। জোয়ান ছেলে। শরীরের শক্তি, মনের বল-ভালই। কাজ হলো কিছুদিন-পকেটে এল বাড়ি ফেরার মত পয়সাও। বাড়ির পথে এবার কলকাতা। ঘুরতে ঘুরতে কীভাবে যেন থিয়েটারের খোঁজ পেলেন। কটা থিয়েটার দেখে একদিন ফিরলেন বেরাইদ।

এবার সামেদ ব্যাপারী আর দেরী করলেন না। ছেলের পায়ে দিলেন বেড়ি। পুবাইলের শেখ বাড়ির সুন্দরী মহিতুন নিসার সাথে জাকজমকের সাথে বিয়েটা সম্পন্ন করলেন। থিতু হলেন সালাম সাহেব। গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা হলো— সেখানে মাস্টারী শুরু করেন এক সময়। সেখানে থিয়েটারকে নিয়ে এলেন তিনি-অভিনয় এবং নির্দেশনা দু’টো কাজই করতেন। বেরাইদ স্কুলের তিন পুরুষের মাস্টার তিনি। শুধু বেরাইদ কেন? রূপগঞ্জের প্রতিটি গ্রামেই তাঁর ছাত্র। তাই তিনি সালাম মাস্টার হিসেবে এক কিংবদন্তী পুরুষ আজও।

এই মানুষটার ওপর লেখাটা প্রয়োজন মনে করলাম-কারণ তাঁর জীবন এবং দর্শন আমাকে মুগ্ধ করেছে— আমার প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল, আমার সাংস্কৃতিক জগৎটাকে তিনি শ্রদ্ধা করতেন, ভালোবাসতেন, আমাকে প্রয়োজনীয় উপদেশ দিতেন-আর সাংসারিক ব্যপারে সব কথা বলতেন শিরীর সাথে।

শিরীর ওপর তাঁর সাংঘাতিক আস্থা, অন্য ছেলে মেয়েদের চেয়ে ওকে আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন— প্রায় সব ব্যাপারেই শিরীর পরামর্শ নিতেন। শিরী কিন্তু কনিষ্ঠতম সন্তান তাঁর। কিছু হলেই বলতেন—

শিরীরে জিজ্ঞাসা করো, দেখ সে কি বলে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অসুস্থ অবস্থায় বেরাইদে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সে কথা বলা হয়েছে— কিন্তু এই চার মাস সেখানে অবস্থান কালে তাঁর নৈকট্য আমাকে আবিষ্ট করেছে তাঁর ক্রিয়া কর্মে। ধর্মভীরু একজন সৎ মানুষ, কিন্তু ভীষণভাবে সংস্কৃতিপ্রিয়। আমি কোনোদিন তাঁকে এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা করতে দেখিনি। দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবি, লুঙ্গি তাঁর চেহারার ট্রেডমার্ক। সূর্য ওঠার আগে তাঁর শুরু হতো দিন। ফজর পড়ে হাঁটা দিতেন দক্ষিণে বালু নদীর পাড়ে বাজারে। রেকি করে দেখতেন নতুন কী কী এসেছে মাছ, বিশেষ করে জেলেরা মাত্রই হয়তো ধরেছে— তিনি অর্ডার করে দিয়ে আসলেন।

বাড়ি ফিরে যে বিশ্রাম নেবেন তা নয়, ওই উত্তর দিকে নৌকার ঘাটের কাছের বাজারে যাবেন, মানুষের সাথে কথাবার্তা হবে— ঢাকার খবর নেবেন— বাড়ি ফিরে নাস্তা করে হয়তো কিছুক্ষণ বিশ্রাম— তারপর আবার উত্তরের বাজারে-এবারে সাক্ষাৎ কেনাকাটা হবে। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর বিশ্রাম— বিকেল থেকে মসজিদের সামনে আলাপ আলোচনা, নানা বিষয়ে। একেবারে এশা পড়ে বাড়ি ফেরা।

চিঠি লেখার নেশা ছিল বাবার। সুন্দর ঝরঝরে হস্তাক্ষরে লিখতেন পরিচিত জনদের। আমি লিবিয়ায় থাকতে বাবা লিখতেন আমাকে। উপদেশ দেয়ার চেয়ে ওঁর জানার বিষয় ছিল-লিবিয়া কেমন, সেখানকার মানুষজন, এসব আলোচনাই প্রাধান্য পেত তাঁর লেখায়।

রূপগঞ্জ এলাকার সালাম মাস্টার একজনই ছিলেন— এখনও মানুষ মনে করে সেই সালাম মাষ্টারকে— যিনি ঝুট ঝামেলা, ও আপদ-বিপদে মানুষকে সৎ পরামর্শ দিতেন-যদিও তিনি ইউনিয়ন পরিষদের কেউ ছিলেন না।

কিন্তু মানুষ শুনতো তাঁর কথা।

আমার খুব মনে পড়ে কটি কথা—

কাজে ফাঁকি দেয়াটা নাফরমানি।

সংস্কৃতি মানুষের পরিচয়, সংস্কৃতির চর্চা মনকে সুস্থ রাখে।

কোনোদিন ভুলেও জিজ্ঞাসা করেননি— কত বেতন পাই? ভবিষ্যতের জন্য টাকা পয়সা জমাচ্ছি কিনা! আমার ওপর তাঁর অগাধ আস্থা ছিল।

হঠাৎ একবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমার শাশুড়ি ভাবলেন বোধহয় তাঁর শেষ সময়। আমাদেরকে জরুরি খবর পাঠানো হলো-

দেখতে হলে দ্রুত চলে এসো।

শিরী আর আমি হাজির হলাম।

বিছানায় পড়ে থাকা মানুষটা উঠে বসলেন এবং ঘণ্টা খানেকের মধ্যে চলাফেরা শুরু করলেন।

কাজ ফেলাইয়া আসছো কেন? কে খবর দিছে? আমি তো ভালো আছি।

পরের দিন একদম তাজাা। ফিরে এলাম আমরা।

কিছুদিন পর হঠাৎ শাশুড়িকে বললেন— মনটা ভাল না, শিরীরে খবর দাও।

খবর এল গ্রাম থেকে, বাবা যেতে বলেছেন।

আমরা গড়িমসি করতে করতে দু’তিন দিন পার। হঠাৎ রাত বারটায় গ্রাম থেকে লোক এল-

সালাম মাস্টার নাই।

আমাদের আফসোসের নেই শেষ। তিনি বুঝেছিলেন এবার সময় হয়েছে যাবার। আমরা বুঝিনি।

পরদিন পুরো বেরাইদ লোকে লোকারণ্য, রূপগঞ্জ এলাকার সমস্ত মানুষ মনে হয় যেন বেরাইদে হাজির। শুধু তাদের তিন পুরুষের শিক্ষক সালাম মাস্টারকে একবার চোখের দেখা দেখবার জন্য।

এক ছেলে খুলনায় থাকার কারণে সিদ্ধান্ত হলো— জোহর পড়ে জানাজার পর লাশ বাড়ির বারান্দায় থাকবে— ছেলে বিকেলে এলে দাফন হবে।

এরপরই ঘটলো আসল ঘটনা। নামায শেষ হওয়া মাত্র— একদল আলেম লাশ কাঁধে নিয়ে আসহাদুআল্লাহ…. বলে রওয়ানা হলেন। প্রথমে ধীর পদক্ষেপে, বাড়তে লাগলো তাদের গতি, আমরা হেঁটে পারছি না তাঁদের সাথে। শেষে দেখি সবাই দৌড়চ্ছে— আসহাদু আল্লাহ ধ্বনি উঠছে আকাশে বাতাসে। কেউ কেউ চিৎকার করে বলছেন— লাশ কিন্তু বাড়িতে যাবে।

কে শোনে কার কথা। জনতা যেন নেশায় আক্রান্ত হয়েছে— ছুটছে

আমরা ছুটতে ছুটতে এসে দেখি-করবস্থানে এসে পড়েছি— দাফন শেষ। দোয়া পড়ছে সবাই।

এ ঘটনাকে কী বলবো জানি না। তবে একজন সৎ মানুষের জীবনের অবসান এমন সুন্দরভাবেই হওয়ার কথা বৈকি।

বাবা চলে গেছেন ১৯৯৩ সনের ২৫ ফেব্রুয়ারী তারিখে, ৯৩ বছর বয়সে।

বিনম্র শ্রদ্ধা সালাম মাস্টার॥

বাবার মৃত্যুর পর শাশুড়ি মহিতুন্নিসাকে নিয়ে আমরা চিন্তিত হয়ে পড়লাম, গ্রামের বাড়িতে একা তাঁর জীবন কাটবে কিভাবে! তাঁকে শহরে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হলো কিন্তু তিনি অনড়, গ্রামের বাড়ি ছেড়ে আসবেনই না। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে শেষ পর্যন্ত শহরে আনতে পারা গেছিল এবং তিনি কখনো আমার বাসায় কখনো দুই ছেলের বাসায় এভাবেই সময় কাটাতেন। তখন আমাদের জন্য সময়টা ছিল খুব ভালো, মনে হতো মাথার উপর একটা ছায়া সবসময় বিরাজ করছে।

দুঃখজনকভাবে এক সময় বাথরুমে পড়ে আহত হয়ে দীর্ঘদিন কোমায় কাটিয়ে ৯৯ বয়সে এই ধরাধাম ত্যাগ করে আমাদের পুরোপুরি এতিম করে চলে গেলেন। সেটা ছিল ২০০৭ সালের ১২ মে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *