বিহারী পর্ব

৩২. পায়ের তলায় সর্ষে

পায়ের তলায় সর্ষে

দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানো অনেকের নেশা। দারুণ এক নেশা। নতুন দেশ, নতুন নতুন প্রাকৃতিক দৃশ্য মন মননকে সতেজ ও সুন্দর করে রাখে। বিভিন্ন স্থানের মানুষ, তাদের ভাষা, তাদের সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটে, এতে ভ্রমণকারীর মস্তিস্কে নতুন নতুন ফ্যাকাল্টির উন্মোচন ঘটে।

আমার ঠিক নেশা নেই, তবুও শখ বলে একটা জিনিস কাজ করে মনের ভেতরে। ছোটবেলায় এ সুযোগ ঘটেনি, তাই হয়ে ওঠেনি। চট্টগ্রামে বসবাস করেও কক্সবাজার যাওয়া হযনি বাইশ বছর বয়স পর্যন্ত। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ বর্ষে শিক্ষা সফরে যাওয়া হলো প্রথম কক্সবাজার। দেশের ভেতর সে সময় ঢাকা, খুলনা, নাটোর, চট্টগ্রাম — এই ছিল আমার ভ্রমণের দৌড়।

প্রথম বিদেশ যাত্রা লিবিয়া— চাকরি করতে। ইউরোপের এত কাছে গিয়েও একবার সময় বের করে যাওয়া হয়নি। অর্থনৈতিক অবস্থার একটি বিশেষ ভূমিকা আছে সব অনীহার পেছনে।

এরপর সুযোগ এল ১৯৮৬তে লন্ডন যাবার। ওখানে তখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একশ পঁচিশতম জন্মদিন উৎসব উপলক্ষে আমাদের কিছু শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য। আমন্ত্রণটা এসেছিল আমারই অফিসের এক কলিগের মাধ্যমে। আমি স্বাভাবিক কারণেই আমন্ত্রণটি আমার থিয়েটার গ্রুপ নাগরিকের কাছে রাখলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে তা গৃহীত হলো। সেবার গেলাম আমরা, কিন্তু নাগরিক নয়— কে কে যাবে এ নিয়ে একটা মতপার্থক্যের কারণে নাগরিকের যাওয়া হলো না। গেলাম আতাউর রহমানের নেতৃত্বে আমি, জামালুদ্দিন, আসাদুজ্জামান নুর, লাকি হানাম, খালেদ খান, নীমা রহমান এবং এই নাটকের জন্য একজন শিল্পী ধরে নিয়ে — গানের দল থেকে – শিবলি মোহাম্মদ।

রবি ঠাকুরের বিভিন্ন প্রতিবাদী নাটকের অংশবিশেষ নিয়ে একটি মন্টাজ নাটক, আগল ভাঙ্গার পালা মঞ্চস্থ করেছিলাম আমরা। গ্রন্থনা ও পারিচালনায় ছিলেন আতাউর রহমান। লন্ডনের শ’থিয়েটারে শো হয়েছিল পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে। বেশ ক’দিন থাকা হয়েছিল তখন লন্ডনে— দেখলাম যারা দুশ বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছিল, তাদের দেশ, ওরা এখন ঐতিহ্য দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করে চলে।

সে সময় মাইমশিল্পী পার্থ এসেছিল প্যারিস থেকে, ওই অনুষ্ঠানে পারফর্ম করতে। ভারতের শিল্পীও ছিলেন। বিশেষ করে মনে পড়ে কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। সেই প্রথম সরাসরি গান শুনেছি তাঁর।

গানের দলের আমন্ত্রণ ছিল প্যারিসে। আমি অনুরোধ করলাম-যেতে চাই প্যারিস। ব্যবস্থা হয়ে গেল তাঁদের দলের সাথে— সব নামকরা শিল্পীরা ছিলেন, শুধু গান নয়, নৃত্য শিল্পীরাও ছিলেন। সেখানে দেখলাম আইফেল টাওয়ার, সপ্তম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য। প্রকৌশলের চমৎকারিত্ব। উপরে ওঠার অবকাশ হয়নি। মাত্র দুদিন ছিলাম। যাত্রাটা ছিল বাসে করে। অনুষ্ঠান হয়েছিল Unesco’র মিলনাতনে। পরিচয় হয়েছিল বাংলাদেশের অহংকার চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে। রাতের প্যারিসের পরিচয় পেলাম কিছুটা, আর সীন নদীতে নৌভ্রমণটাও মনে রাখার মতন ছিল।

আবার ১৯৮৮তে লন্ডন যাবার সুযোগ হলো, নাটকের জন্যই। এবার ঠিক মনে পড়ছে না কোন প্রতিষ্ঠান আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন-নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় গেল— দেওয়ান গাজীর কিসসা নিয়ে। লন্ডনেই শো হলো— আমাদের দলের বাইরের একজন গিয়েছিলেন আমাদের সঙ্গে— শান্তা ইসলাম। সম্ভবত নীমা রহমান যেতে না পারায় তার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য শান্তাকে নেয়া হয়েছিল।

এই দফায় সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিল— আমরা প্রায় পনেরো দিন আটকে ছিলাম লন্ডনে— কারণ বাংলাদেশ স্মরণকালের ভয়াবহতম বন্যার কবলে পড়েছিল। ঢাকা শহরের বিভিন্ন অঞ্চল হাঁটু পানিতে ডুবে যায় এবং সবচেয়ে মারাত্মক ছিল বিমানবন্দরে পানি উঠে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বিমান চলাচল। এখনকার মত তো মিনিটে মিনিটে পৃথিবীর যেকোনো স্থানে ফোন করা যেত না-আমরা দেশের এবং দেশের মানুষগুলোর জন্য খুবই চিন্তিত ছিলাম।

পরবর্তীকালে আবার সুযোগ হলো লন্ডন যাবার ১৯৯৩ সালে। হঠাৎ করেই। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রয়াত আনিসুল হকের সঞ্চালনায় একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান হতো “ঈদ আনন্দমেলা’– সেখানে একটা কুইজে আমি পেয়ে গেলাম একটা লাউ পুরস্কার। বেশ হাসাহাসি হলো সেটা নিয়ে দর্শকের মাঝে। তার পরই থলের বিড়াল বেরুলো। লাউয়ের পেটের ভেতর থেকে বেরুলো বিদেশ ভ্রমণের বিমানের জোড়া টিকিট। ঢাকা-কাঠমুন্ডু-ফ্রাঙ্কফুর্ট-লন্ডন এবং ফিরতি একই পথে।

শিরীকে নিয়ে গেলাম বিমানে কাঠমুণ্ডু— দুই রাত দুই দিন থেকে লুফৎহানসায় গেলাম ফ্রাঙ্কফুর্টে—। কাঠমুণ্ডুতে ত্রিভূবন বিমানবন্দর থেকেই হোটেল ঠিক করে যখন পৌছুলাম তখন সন্ধে। একটু পর দেখি Electricity গায়েব। মোমবাতি আর চার্জার দিয়ে আলোকিত হলো হোটেল। রাত বারোটার পর এলো বিদ্যুত, শুরু হলো Disco. সে সময় প্রচন্ড বিদ্যুত সমস্যা ছিল নেপালে।

পরের দিন ভোরে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে বেরুলাম, ড্রাইভারকে বললাম, এক দিনে যতটা সম্ভব কাঠমুন্ডু দেখাতে। সন্ধে পর্যন্ত তোমাকে বুক করলাম। খুবই চৌকশ ড্রাইভার সারাদিনে কাঠমুণ্ডুর যত মন্দির সব দেখিয়ে ফেললো। অসাধারণ সব স্থাপত্যকর্ম, বাঁদরের উপদ্রব প্রচুর, তারপরও মন্দিরগুলোর এক একটার অবস্থান চমৎকার। প্রকৃতির সৌন্দর্যেও দারুণ বটে। মন্দির, দরজা জানালাসহ সব কাঠোর কাজগুলি মনোমুগ্ধকর। বাজারে গিয়ে দেখি কত প্রকারের সব স্থানীয় কারুকাজ মণ্ডিত কাঠের তৈজষপত্র। বৃষ্টি ছিল সেদিন, তার পরও ভাল লেগেছিল— একটি বিষয় বিশেষ করে লক্ষ্যনীয়-রাস্তাঘাটে দড়িছাড়া ষাঁড় ঘুরে বেড়াচ্ছে অজস্র। পৃথিবীর একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র নেপাল। গরু তার দেবতা। ভগবানের নামে উৎসর্গীকৃত সব ষাঁড় আরামসে ঘুরছে ফিরছে আর খাচ্ছে। মানুষ ভক্তি করে তাদের প্রণাম জানাচ্ছে। এত ষাঁড় ঘুরছে, কিন্তু কোনো বিশৃঙ্খলা নেই।

পরদিন গেলাম ফ্রাঙ্কফুর্ট—। খালাতো ভাই চাঁদ এসে নিয়ে গেল তার বাসায়। তার আবার ইটালিয়ান স্ত্রী, পিনা। দুই বাচ্চাসহ ছোট্ট সংসার। ইটালিয়ান নামের শেষে খোন্দকার লাগিয়ে নাম রেখেছে বাচ্চাদের। তিন তিনটে দিন অবস্থান করেছিলাম ফ্রাঙ্কফুর্টে— দুটো পরিবারের সাথে যোগাযোগ হয়েছিল— রোকেয়া নামের মেয়েটি আর তার জার্মান স্বামী। পেন ফ্রেন্ডশিপ থেকে প্রেম ও বিবাহ, অন্যজন প্রকৌশলী আমারই বয়সী-স্ত্রী জার্মান। আমরা তাঁর বাড়িতে গেলাম। দেখাও করলেন না মহিলা! আর রোকেয়ার স্বামী লুঙ্গি পরে মাটিতে বসে ভাত খেলো এক সঙ্গে। দুতিন দিনে যতটা সম্ভব ঘুরিয়ে দেখালো চাঁদ, তবে সবচেয়ে আনন্দদায়ক হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোকের সৌজন্যে রাইন নদীতে ক্রজটা আর মদ তৈরির গ্রামটা দেখে।

চলে গেলাম লন্ডন। মামাতো ভাই ডালু ভাই আর তার স্ত্রী ডালিয়া (সেও আমার সম্পর্কে খালাতো বোন)। আতিথেয়তায় থাকলাম ক’টা দিন, ওয়েস্ট মিনিস্টার হল, টেমস নদীর পাড়, বিগবেন, রাজপ্রাসাদ, ট্রাফালগার স্কোয়ার এগুলোই ঘুরে ফিরে দেখা হলো। পার্থকে প্যারিসে ফোন করলাম, আসতে চাই তোর ওখানে।

চলে আসেন, আমি রিসিভ করে নেব।

গেলাম বাসে চড়ে। হোবারক্রাফটে ইংলিশ চ্যানেল পার হলাম। বাস স্টেশনে পার্থ হাজির। কদিন সেখানে কাটলো। ঘুরে ঘুরে পথে যা দেখবার সম্ভব সব ঘুরিয়ে দেখাল। এবার আর আইফেল টাওয়ারে ওঠাটা হাতছাড়া করিনি। একেবারে চূড়ায় উঠে ছবিটবি তুললাম। রাতের বেলা ঘুরে বেড়ালাম।

ব্যাস, ফিরে এলাম লন্ডন। চলো দেশে। আবার সেই ফিরতি পথে, ফ্রাঙ্কফুর্টে নামতে হয়নি, তবে কাঠমুণ্ডুতে লুফৎহানসা ছেড়ে বিমানে ওঠার জন্য সারাদিন ট্রানজিটে বসে কাটাতে হলো। সে কষ্টের কথা আর না বলি এখানে।

১৯৯৫ এর গ্রীষ্মে ডাক এলো আটলান্টিকের ওপারে থেকে। আমেরিকা থেকে নাগরিককে আমন্ত্রণ, নাটক নিয়ে বিভিন্ন স্টেটে মঞ্চায়ন করতে হবে। নিউইয়র্কের শানু নামের ভদ্রলোক এই ভ্রমণের উদ্যোক্তা।

চললাম আমেরিকা তিনটি নাটক নিয়ে— দেওয়ান গাজীর কিস্সা, খাট্টা তামাশা, আর মুখোশ। খুব কষ্টকর একটা ট্যুর হয়েছিল সেবার। প্রথমেই নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটে দেওয়ান গাজী, তারপর লং আইল্যান্ডে মুখোশ। সেখান থেকে ওয়াশিংটন ডিসি, ফিরে এসে লস এঞ্জেলসে দেওয়ান গাজী, স্যানহোসেতে মুখোশ, ফিরতি পথে শিকাগোতে খাট্টা তামাশা, আবার নিউইয়র্ক, আবার দেওয়ান গাজী— মোটামুটি পনেরো ষোলোদিনের জমজমাট ভ্রমণ— দেখার সময় কই— দৌড়ের ওপর ছিলাম আমরা। কোথায় কখন কি নাটক হয়েছিল— হিসেবে আমার ভুল হতে পারে— তবে এই তিনটি নাটকই ঘুরে ফিরে মঞ্চায়ন হয়েছে। এল.এ-র টিভি সিরিজ ‘বে ওয়াচ’ খ্যাত সমুদ্রতট ঘুরে এলাম, আর হলিউডের আশে পাশে শিল্পীদের নাম খোদাইকরা ফুটপাথে হেঁটে এলাম, এফআর খানের অক্ষয় কীর্তি সিয়ার্স বিল্ডিং দেখলাম-নিউইয়র্কে বিশেষভাবে Statue of liberty দেখা হলো। তার পরই আবার দৌড়, দেশে ফেরৎ।

আমেরিকা যাবার আগে আমার হঠাৎ করে জাপানে একটি অনুষ্ঠানের দাওয়াৎ এসে গিয়েছিল— এটা বোধকরি ৯৪তে। গানের শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ, বেবী নাজনীন আর পার্থ বড়ুয়া বাসায় এসে হাজির। জাপান যেতে হবে আমাকে আর বিপাশাকে-বাঙালিদের এক অনুষ্ঠানে তারা গান গাইবে আমরা একটু অভিনয় করবো। উদ্যোক্তার নাম মনে নেই, তবে জাপান প্রবাসী এক বাঙালির আমন্ত্রণ এটা। ভারতীয় শিল্পীও যাবেন ওই অনুষ্ঠানে— হ্যাঁ দেখা হয়েছে তাঁদের সাথে-মুনমুন সেন, বাপ্পী লাহিড়ী ও তাঁর বাবা অপরেশ লাহিড়ী। আমার তখন ঢাকায় ভীষণ ব্যস্ততা-তাও গেলাম মাত্র ৫ দিনের জন্য। তেমন কিছুই দেখা হলো না— শুধু গাড়ি চড়ে বেড়াতে বেড়াতে যা কিছু দেখা। ট্যুরের একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য— ব্যাংককে ছিল আমাদের ট্রানজিট। বিমানবন্দরে রাত কাটিয়ে শেষ রাতে ফ্লাইট ছিল জাপানের— হঠাৎ Immigration এ ধরা পড়ল পার্থর পাসপোর্ট-এর মেয়াদ নেই। ব্যাস ওকে ধরে বেঁধে নেবে আর কি! বোঝানো হলো ভুল হয়েছে-আমরা সরকারি অনুষ্ঠানে জাপান যাচ্ছি-আমাদের হেলপ করো ওরা কিছুতেই শুনবে না। ফোন করার অনুমতি দিল অনেক কাকুতি মিনতির পর। ফোন করলাম আমার বাল্যবন্ধু রাজিউল হাসানকে। রাজিউল তখন ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি -সে ওদের সাথে কথা বললো। ওরা মেনে নিল, রাজিউল নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছিল-আমি পার্থকে চিনি-সে বিখ্যাত গায়ক-আমি ভোর বেলা এসে ওর পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়িয়ে দেব। পার্থ রয়ে গেল আমরা চলে গেলাম জাপানে। পরদিন ভোরে রাজিউল রাবার স্ট্যাম্প আর প্রয়োজনীয় জিনিপত্র নিয়ে এসে ওকে ছাড়িয়ে প্লেনে ওঠিয়ে দিয়ে গিয়েছিল!

ফেরার পথে আমি আর বিপাশা একদিনের জন্য বন্ধু রাজিউলের বাসায় বেড়িয়ে এলাম। ওই আমার প্রথম ব্যাংকক দর্শন। একদিন রাত্রিকালীন মার্কেটে বেড়িয়ে এলাম-আর দেখলাম শুধু যানজট আর যানজট। মাত্র তখন ফ্লাইওভার তৈরি শুরু হয়েছিল। আজ থাইল্যান্ডকে বলা যায় ফ্লাই ওভারের দেশ!

৯৫তেই ভারত সরকারের সংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের RCC-র দাওয়াত পেল নাগরিক। আবার ছুটলাম দিল্লি। শো হলো দেওয়ান গাজী, মুখোশ-ঘুরে এলাম তাজমহল-লালকেল্লা, আগ্রার দরবারগুলো, তারপর বৃন্দাবন— এদিকে কুতুব মিনার। এ সময় হঠাৎ ভারতের রাষ্ট্রপতির মৃত্যু হওয়ায় আমরা পড়ে গেলাম এক সপ্তাহের শোক অনুষ্ঠানে। বসে রইলাম কলকাতার হিন্দুস্থান হোটেলে-তারপর আবার নাটক— কলকাতায় আর চন্দননগরে, চন্দন নগর আমাকে মুগ্ধ করেছে বৃটিশদের কলোনির মাঝে গঙ্গার পাড়ে, ছোট শহর চন্দননগরকে ফরাসিরা সব দিক থেকে রেখেছিল বড়ই মনোরম করে। বাঙালিরা কলকাতায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে চন্দনগনরে আশ্রয় নিতো-সে আর এক ইতিহাস।

৯৬তে আমাকে অফিস থেকে দুমাসের জন্য পাঠানো হলো লাওসে। ADB-র প্রকল্প-সেখানকার চারটি শহর ভিয়েনতিয়েন, পাকসে, সাবান্নাখেত এবং লুয়াংপ্রবাং-এর ড্রেনেজ সিস্টেমের ফিজিবিলিটি স্টাডিজের জন্য। দু’মাসের ম্যান মানথ, প্রকৃত পক্ষে আরও কিছুদিন বেশি থাকতে হয়েছিল। দুই ক্ষেপে কাজ ছিল আমার। চারটি শহরে ঘোরার যথেষ্ট অবকাশ ছিল। আর একটি মিটসুবিসি গাড়ি দিয়েছিল দুই বাঙালিকে— আমি আর অর্থনীতিবিদ ড: মফিজ কে। মফিজ সাহেব গাড়ি চালাতে পারতেন না বিধায়-আমার কর্তৃত্বেই ছিল গাড়িটি।

অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ লাওস। দালান কোঠার সংখ্যা খুবই কম— যে কারণে সৌন্দর্যটা প্রকট। দেশটাতে সেগুনগাছের প্রাবল্য। প্লেনে চড়লে যেদিকে দেখবেন-শুধু সেগুন গাছের সারি। বন্যপ্রাণির মধ্যে হাতি তাদের জাতীয় পশু। ওরা বলে Land of million elephants প্যাগোডার ছড়াছড়ি চতুর্দিকে।

লাওসে থাকতেই একটা চিঠি পেলাম লন্ডন থেকে। লিখেছেন আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। তাঁর লেখা একটি নাটকে অভিনয়ের জন্যে। আমাকে আর বিপাশাকে চান তাঁরা। ঢাকায় ফিরে যোগাযোগ হলো গাফ্ফার ভাইদের সাথে। তাঁরা লোক পাঠালেন, আমার সাথে চুক্তি সই হলো। গেলাম প্রায় এক মাসের জন্য-আমার পুরো ফ্যামিলিসহ, মুহিব বলে এক ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের বাসায় ছিলাম। রিহার্সাল দিয়ে নাটক মঞ্চস্থ হলো লন্ডন ও ম্যানচেস্টারে। পরিচালনায় ছিলেন অভিনেতা আমির খসরু। নাটকের নামটা মনে নেই, তবে জাতীয়তাবাদের চেতনার নাটক ছিল সেটি। এবারও কিছু ঘোরাঘুরি হল, বিশেষ করে উল্লেখ্য Stratford upon Avon-এ সেক্সপিয়ারের বাড়ি দেখা, কত নিখুঁত করে সাজিয়ে রেখেছে ওরা। -আমেরিকায় দেখেছিলাম Natural History Museum এখানেও দেখলাম London Museum প্যারিসের Louvre দেখা হয়েছিল গত বারে। কতকিছু দেখার আছে ওইসব মিউজিয়ামে-সব কি দেখা সম্ভব। তবে মোনালিসাকে অবশ্যই দেখে এসেছিলাম। আর লন্ডন মিউজিয়ামে দেখলাম উন্মুক্ত মমি।

এর পরের বছরই প্রযোজক আলী বশির-এর ধারাবাহিক নাটক করতে গেলাম থাইল্যান্ড। ব্যাংকক নয়, সোজা পাতায়াতে। সেও সুন্দর। আসলে সুন্দর তো আমার দেশের সমুদ্রতটও। কক্সবাজার, কুয়াকাটা এগুলো কি কম সুন্দর-কিন্তু ব্যবস্থাপনা হচ্ছে আসল-সাজেকের মত এরকম প্রাকৃতিক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য খুব কম যায়গায় দেখা যায়। কিন্তু সেটাকেও উল্টোপাল্টা সব বাড়িঘর তৈরি করে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে-পাহাড় কাটা হচ্ছে, নদী ভরাট হচ্ছে— খাল বন্ধ করে স্থাপনা বসানো হচ্ছে, প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাপনা তৈরি না করে যা খুশি একটা কিছু নির্মাণ করা হচ্ছে। মোট কথা আমরা প্রকৃতির সাথে বৈরী সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছি। তার কুফলও ভোগ করছি এখন!

বিদেশ ভ্রমণের ধারাবাহিক বিবরণ দেবো ভেবেছিলাম-আর সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ইতিমধ্যে বেশ অনেকবার ব্যাংকক যাওয়া হয়েছে নাটক করতে পরিবার নিয়ে বেড়াতে। ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি সবাইকে নিয়ে দল বেঁধে গিয়েছি— ব্যাংকক, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কতবার সে হিসাব রাখা হয়নি। পেনাং দ্বীপে ঘুরে এসেছি— সমুদ্রের ওপর বিরাট দীর্ঘ এক ব্রিজের ওপর দিয়ে কুয়ালালামপুরে গেলাম, পেট্রেনাস ভবনে উঠে শহর দেখা, সিঙ্গাপুর কড়া নিয়মকানুনের দেশ— সবই ঝকঝকে তকতকে।

গেলাম দুবাই। মরুভূমিতে বালির মধ্যে এ্যারাবিয়ান ডিনার উপভোগ সেটাই বা কম আনন্দের কি। আর বুরজ আল খলিফার ওপরে উঠে রাতের দুবাই দর্শন মনে রাখার মতো অবশ্যই। শারজা মাঠে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা দেখাটা আমার জন্য একটা বিশেষ পাওনা মনে করি আমি।

কয়েকবার কলকাতা যাওয়া আসা— নাটকে অভিনয় করতে, সিনেমা করতে, আবার শুধুই বেড়াতে-সেখান থেকে ২০১২তে হঠাৎ চলে গেলাম মুর্শিদাবাদের সেই গ্রামে যেখানে জন্ম হয়েছিল আমার-৫৬ বৎসর পর। সেটাও কম রোমাঞ্চকর নয় আমার জন্য। বাপ দাদার ভিটে দেখা— পূর্ব পুরুষের কবরস্থানে দাঁড়িয়ে মোনাজাত অবস্থায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়া— এগুলোও স্মরণীয় মুহূর্ত আমার জীবনে।

২০১২তে গেলাম চীন ভ্রমণে। শিরী আর আমি। চীন সম্পর্কে ধারণাটা পাল্টে গেল, ওরে বাবা! এরা তো পশ্চিমের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সেই স্কুলের বইতে পড়া আফিম খেয়ে নেশায় পড়ে থাকা চীন কই! এতো পৃথিবীর অন্য উন্নত বিশ্বের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ইংরেজি বলা গাইড পাওয়া গেল, লেটেস্ট মডেলের গাড়িতে করে ৫০০ মাইল দূরের পথ অতিক্রম করতে কত সময় লেগেছিল মনে নেই, তবে মনে হয়েছিল— উঠলাম আর পৌঁছুলাম।

কুনমিং-এর Stone Forest অত্যাশ্চর্য বস্তু। পাথরগুলো যেন গাছ, এক একটা একরকম Form নিয়ে যেন মাটি ফুঁড়ে বের হয়েছে। কুনমিং-এ ভোর বেলায় ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ফুল নিয়ে বাজারে আসাটা অনন্য সৌন্দয্যের প্রতীক। ডালি শহর যেন কয়েকশ বছর পূর্বের অবস্থায় দাঁড়িয়ে। উইঘরের বাসিন্দারা সবাই সেই রকম সাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে পথে ঘাটে। দোকানপাট বাড়িঘর সব তেমনি করে সাজানো যা শত শত বছর আগেও যেমন ছিল। পর্বতের ঢালে এক উপাত্যকায় যাকে ওরা বলে Switzerland of China –অন্যদিকে বিস্তৃত এক হ্রদ, তাতে করে ওই সব উইঘরের বাসিন্দাদের সাথে তিন ঘন্টা ক্রুজ, তাদের নাচগান দেখে— তাদেরই সাথে মধ্যাহ্নভোজ! আহ!

চমৎকার। জীবনে ভোলার নয়।

বেজিংএ গ্রেটওয়ালে হেঁটে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা। মনে হচ্ছিল চলে গেছি সেই যুগে। সেই সময়ে।! আসতেই ইচ্ছে করছিল না ওখান থেকে। গোটা বেজিং-এ শুধু মন্দির আর রাজ-রাজড়ার বিভিন্ন ঐতিহাসিক বাসস্থান। কোনটাকে বাদ দিয়ে কোনটাকে দেখবো! বুদ্ধদেবের কত প্রকারের মূর্তি। একজন ধর্মজাযকের দার্শনিক ভাব নিয়ে কত রকমের সৃষ্টি তৈরি হতে পারে না দেখলে বোঝার উপায় নেই।

কুনমিং-এ এসে আবার দেখা পেলাম হালাকুখান, চেঙ্গিস খান-এর আরও কতসব খানের প্রস্তর মূর্তি। সুন্দর করে রক্ষিত সব কিছু! মসজিদের স্থাপত্য আলাদা কিছু নয়-চাইনিজ স্টাইলে তৈরি, ভেতরে আরবি লেখা কোরানের বাণী— এসব এলাকায় ইসলাম এসেছিল সেই শুরুতেই!

পৃথিবীর খুবই কম অংশই দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তবু এতেই বুঝতে পেরেছি-এই বিশাল পৃথিবীর কিছুই জানি না আমি। প্রতিটি অঞ্চলের ভাষা-চালচলন, সংস্কৃতির কারণে কত পার্থক্য-যারা বিশ্ব ভ্রমণে বের হন তাঁরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে জ্ঞানের ভান্ডার ঋদ্ধ হয় ভ্রমণকালে।

কোভিডের আগে আগে একবার ব্যাংকক যাওয়া হয়েছিল— সেবার হুয়াহিন শহরে দুদিন ছিলাম। এ যেন অন্য জগৎ— থাইল্যান্ড বলতে আমরা ব্যাংকক আর পাতায়া বুঝি-উচ্ছল জীবন যাপনের নিদর্শন এগুলো। আর হুয়াহিন— শান্তশিষ্ট শহর-কোনো উচ্ছলতা নেই, নেই কোনো হৈ হুল্লোড়। প্রাকৃতির সৌন্দর্য্যে কোনোভাবেই কমতি নেই অন্যদের চেয়ে। রাজার নিজস্ব ভবন রয়েছে একটি-তার জন্যে রেল লাইন বিশেষভাবে তৈরি ব্যাংকক থেকে হুয়াহিন পর্যন্ত। বিশেষ ভাবে তৈরি রেল স্টেশনটা দেখার মত।

কো সে মেট দ্বীপ গিয়েছিলাম পুরো পরিবার নিয়ে-সে আর এক জগৎ। বালুচরে রিসোর্টে থাকা আর সমুদ্র, বালু, আর গাছপালার সংস্পর্শে রাতদিন বসবাস মনটাকে আলোড়িত করে। বহুবার ভেবেছি— এর চেয়ে কম কিছুতো নেই আমাদের-তাহলে কেন এমন হয় না— ওই যে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, দুর্নীতি আর আত্মীয় পোষণ— দলবাজদের অত্যাচার-অনাচারে সবকিছু ধ্বংসের মুখে।

বিপাশা হঠাৎ করে আমেরিকায় বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় পরপর দু’বছর যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া হলো আমাদের-২০২২ আর ২০২৩। শুধু বিপাশার লং আইল্যান্ডের বাড়িটাই নয়-এক একটা ব্যাপক ভ্রমণ হয়েছিল দুবারই। প্রথম দিনদশেক পরেই চলে গিয়েছিলাম লস এঞ্জেলেসে— এক ছোটভাই প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান ও তার স্ত্রী শেফার আমন্ত্রণে যাওয়া। লিবিয়ায় চাকরী করার সময় মোখলেসের সাথে পরিচয়-তখন থেকেই সে আমাদের অনেক কাছের মানুষ। নিয়ে গেল নেভাদাতে-দেখলাম বিশ্বজুয়ার কেন্দ্র লাস ভেগাস। সেখান থেকে এ্যারিজোনা-গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ন ফ্ল্যাগশিপ শহর-আরও কত কত সব অসাধারণ পর্যটন শহর ও ঐতিহাসিক যায়গায়। সেই একেবারে মেক্সিকো বর্ডার পর্যন্ত ঘোরা হলো— হাজার হাজার ফুট উচ্চতায় বিশাল হ্রদে নৌ ভ্রমণ— যার চারধারে শুধু হলিউডের সুপারস্টারদের প্রাসাদোপম অট্টালিকার সারি।

ক’দিন পর গেলাম আমার এক ভাগনে হাদির আমন্ত্রণে সিয়াটল। Washington state-এর এই শহরটিও অসাধারণ সৌন্দর্যে শোভিত। একদিকে প্রশান্ত মহাসাগর অন্যদিকে পর্বতমালা। কানাডার বর্ডারে অবস্থিত অতি চমৎকার শহর। দেখে এলাম বোয়িং নির্মাণের কারখানা। আর বিল গেটসের বাড়ির পাশ দিয়ে ঘুরে আসাটাও বেশ মজার ব্যাপার ছিল বৈকি!

২০২৩ শে আবার গেলাম দু’মাসের ভ্রমণে আমেরিকায়। লং আইল্যান্ডে খুঁটি গাড়লাম। কিন্তু ঘুরেই বেড়ালাম শুধু। প্রথমেই গেলাম হাদির বাড়ি সিয়াটলে। সেখান থেকে কানাডার ভ্যানকুয়েভার-ব্রিটিশ কলম্বিয়ার রাজধানী ভিক্টোরিয়া আইল্যাণ্ড-সুন্দর দ্বীপ একটা— ফেরিতে গেলাম। ছবির মত শহর সবই পুরোনো স্থাপত্যকলার নিদর্শন— একটা একটা করে যেন বইয়ের পাতা উল্টে গেলাম আমরা। রাত কাটিয়ে গেলাম হুইসলার শহরে। সেদিন তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ২ ডি. সেঃ। চতুর্দিকে ফল (FALL) মৌসুমের ছোঁয়া, গাছপালায় রং ধরেছে মনোমুগ্ধকর। যেদিকে তাকাই শুধু রঙের খেলা-সবুজ-হলুদ ম্যাজেন্টা, লাল। তার পরপরই কোনো কোনো এলাকায় ঝরাপাতার মেলা। ফ্রেঞ্চ প্রাতরাশ সেরে চলে এলাম ভ্যানকুয়েভার। সেখানে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের আমার সহযাত্রী মনসুরুদ্দিনের বাসায়। তার স্ত্রী শান্তার হাতের রান্না বান্নায় নৈশভোজ সেরে চলে এলাম সিয়াটল। তারপর দুদিন এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করে আবার নিউইয়র্কে।

নিউইয়র্কে কয়েকদিন ঘোরাঘুরি বিশেষ করে সমুদ্রের বিচগুলো— এত সুন্দরভাবে গোছানো— সারাদিন বালিয়াড়িতে বসে থাকলেও মনটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। গাংচিলগুলোর সাথে হয়ে যায় সখ্যতা। বড় চমৎকার পরিবেশ একটা। ওখানকার একটি থিয়েটার গ্রুপের সাথেও যোগাযোগ হয়েছে এর মধ্যে। এবার তারা আমাকে একটি সম্মাননা প্রদান করে কৃতজ্ঞতা পাশে বেঁধে ফেলেছে। আগামীতে হয়তো তারা আমার লেখা একটি নাটক মঞ্চে আনবে। গ্রুপ প্রধান ড. নজরুল, আমাদের বুয়েটিয়ান, প্রচুর সময় দেন থিয়েটারের জন্য-আসলে গ্রুপের প্রতিটি কর্মিই খুব নিষ্ঠার সাথে থিয়েটার চর্চা করছেন— শত ব্যস্ততার মাঝেও।

মেরিল্যান্ডে থাকে আমার এক শ্যালক প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান মইন। স্ত্রী কন্যা নিয়ে ছোট সংসার-কিন্তু বিশাল এক বাড়ির মালিক সে। অনেক আগেই নিমন্ত্রণ করে রেখেছিল ওয়াশিংটন ডিসি প্রত্যক্ষ করার জন্য। চলে গেলাম এক বিকেলে। আপ্যায়নের কোনো কমতি রাখেনি মইন আর স্ত্রী কন্যা।

পরদিন শুরু হয়ে গেল আমাদের ওয়াশিংটন প্রকল্প। বেচারা মইন গাড়ি পার্কিং-এর সমস্যার কারণে আমাদের নামিয়ে দিয়েই –ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু ঘুরে বেড়ায় একটি পার্কিং-এর খোঁজে— কখনো পায় কখনো না। কিন্তু তার কোনো ক্লান্তি ছিল না এ জন্যে। ১৯৯৫ এ একবার এসেছিলাম ওয়াশিংটন ডিসি। এবার কোনো পার্থক্য চোখে পড়ল না। তারা ঐতিহ্য রক্ষা করতে জানে আর আমরা ধ্বংস করতে। দু’দিন ধরে ঘুরলাম সকাল বিকাল ডিসি-র শহরে-প্রায় প্রতিটি মনুমেন্ট মিউজিয়াম গার্ডেন, হোয়াইট হাউজ, ক্যাপিটল ভবন, বাংলাদেশ দূতাবাস-মোটামুটি সবই দেখার চেষ্টা করা হলো! চোখের দেখাটাই সম্ভব, অনুভবের যায়গাটা সময়ের অভাবে অনেকটা ফাঁকাই থেকে যায়। তবে Space museum খুবই আকর্ষণীয় মনে হয়েছে আমার কাছে।

ওয়াশিংটনের ট্যুর প্রোগ্রামে ১টি দিন রাখা ছিল ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত Luray’s Cavern দেখার জন্য। এটা একটা গুহা, সেটা কয়েক হাজার বছর আগে কোনো একদিন ভূমিকম্পে সৃষ্ট গহ্বর। প্রলয়কান্ড ঘটে যাওয়ার পর গলন্ত লাভা গুলো হঠাৎ করেই জমতে শুরু করে ঠান্ডায়— আর সৃষ্টি হয় অসাধারণ সব ফরমের চিত্রকলা। প্রায় দেড় ঘণ্টাধিক সময় ধরে হেঁটে বেড়ালাম গুহার অভ্যন্তরে। মাথাটা ঝিম ঝিম করে ওঠে সৃষ্টিকর্তার এই অসামান্য রহস্য দর্শনে। আমার বেগম সাহেবা তো উত্তেজিত হয়ে প্রায় ৩০০ ডলার দিয়ে তিন টুকরা এমেথিস পাথর কিনে ফেললেন। বিপাশা, নাতাশা এবং আমাদের তিন বাড়িতে ড্রইং রুমে সেগুলো শোভা পাচ্ছে তখন থেকে।

গুহা থেকে বেরিয়েই গেলাম একটি গাড়ির মিউজিয়ামে -CAR & CARRIAGE CARAVAN, পৃথিবীর তাবৎ সব নামী দামী গাড়ির জন্ম থেকে অদ্যাবধি অসখ্য মডেলের নমুনা রয়েছে। ইংল্যান্ডের রানির ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ছবি তুলতে ভুলিনি আমরা।

ফিরতি পথে ফিশ এ্যান্ড চিপস-এ ভোজ। খাওয়া দাওয়ার বিবরণের চেয়ে জরুরি যেটা সেটা বলি। ২০২৩-এ আমেরিকা গিয়েছিলাম ওদের Fall সিজনটা উপভোগ করার জন্য। সেপ্টেম্বরে শুরু হয়েছে ফল। কিন্তু ভার্জিনিয়া থেকে ওয়াশিংটন ডিসির পথটার কথা ভোলার নয়। আঁকাবাঁকা, উঁচু নীচু পাহাড়ি পথ। দুধারে অসংখ্য গাছপালা যারা সেই মুহূর্তে রং বদলে এক অপূর্ব সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে প্রকৃতিতে। গাছের পাতার যে এমন রঙ-এর পরিবর্তন হয় না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

এত যে সুন্দর, amazing, চমৎকার বলছেন, আর মাসখানেক পর দেখলে বলবেন-ও এই!

মইন হঠাৎ বলে উঠলো।

কেন?

এই যে পাতার রঙ-এ হলো মরার আগে জ্বলে ওঠা। পাতা সব পড়ে যাবে। দেখেন ওই যে বাতাস এলো আর পাতা ঝরার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।

সত্যই দেখি পাতাগুলো ঝরছে তো ঝরছে। এ আর এক মনোরম দৃশ্য। বনভূমি ঝরাপাতা আবৃত হয়ে রয়েছে— যেন হলুদ রঙের কার্পেট।

এক মাস পর কি হবে?

প্রশ্ন করি আমি।

পত্রহীন, শ্রীহীন বৃক্ষরাজি। চতুর্দিকে শুধু কালো কালো ডালপালার বর্ণহীন চেহারা। আমার মনে হয় সেটারও আলাদা সৌন্দর্য আছে।

এবার হাসে মইন।

আপনি শিল্পী মানুষ। আপনি সবই পজিটিভ ভাবেন।

আমি একটু কলার উঁচু করে ভাব নিলাম এরপর!

তবে যদি মরা গাছের সৌন্দর্য্য দেখতে চান তো December Januaryতে বাফেলো যান -দেখবেন প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা মরা ডাল গুলোতে বরফের ছুরির মত ঝুলছে— রাতে যখন চাঁদের আলো পড়ে— আপনি তো দেখে পাগল হয়ে যাবেন। মনে হবে যেন বরফের কান্না। গতবার বাফেলোতে নায়গ্রা ফল দেখেছি। গ্রীষ্মে এবার দেখতে চাই টরোন্টো থেকে। নভেম্বরে যাব— যদি ভাগ্যে থাকে বরফের কান্না।

ওয়াশিংটনের সুন্দর ট্যুরের পর আবার বিপাশাদের ডেরায় ফিরে ক’দিন বিশ্রাম। বিপাশা-তৌকিরের অভিযোগের শেষ নেই— তাদের বাড়িতে থাকা হচ্ছে না আমাদের। হাসিই আমাদের একমাত্র উত্তর।

নিউইয়র্ক বুয়েটিয়ানদের সাথে সুন্দর একটি সন্ধ্যা কাটানো হলো জ্যাকসন হাইটে-এ। তারপর আবার এয়ারপোর্ট, আবার বিমানে চড়া সিকিউরিটি পার হওয়ার বিরক্তিকর ব্যাপার। পৌছুলাম ফ্লোরিডা। এ আর এক বাংলাদেশ। আকাশ বাতাস গাছপালা, খাল বিল সবই দেশের মতই লাগলো।

আমার এক জুনিয়র প্রকৌশলী বন্ধু আজিজ এবং তার স্ত্রী লাবণ্য রেখার আমন্ত্রণে গেলাম সেখানে। চারদিনের ট্যুরে। তাদের বড় সন্তানের বিবাহের ২৫তম বার্ষিকী উদযাপনের উপলক্ষ্যে। সেই ছেলে আদনান এক বিশাল খামার বাড়ির মালিক। সবকিছু দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। সে একটা মস্ত মাছের পুকুর কেটেছে— তার পাড়ে আমাকে দিয়ে একটি আম গাছের চারা রোপন করিয়ে-আমার আগমনটা স্মরণীয় করে রাখতে চাইলো। সবই প্রস্তুত ছিল। লাগিয়ে এসেছি আমগাছ। ফল ফললে আবার যাবার আমন্ত্রণ করা হয়েছে এর মধ্যে। বিয়ে বাড়ির ব্যস্ততার মধ্যেও আজিজ আর লাবন্য আমাদের অনেক অনেক সময় দিলো সেখানে এক চমৎকার দম্পতির সাথে পরিচয় হলো— ওই আদনানের বন্ধু ওরা। কিন্তু এত অমায়িক এবং চমৎকার ব্যক্তিত্বের অধিকারী যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। ওরা আমাদের চারজনের দেখাশোনা করলো দুদিন। ঘুরে বেড়ালাম Kennedy space centre আর Universal Studio-আরও নানান প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের স্পট গুলোতে। যত দেখি ততই বাংলাদেশের কথা মনে করিয়ে দেয়-বাঁশঝাড় দেখে তো পুরোই দেশ মনে হচ্ছিল-শুধু একটা গরুর বা মোষের গাড়ি হলেই, ব্যাস-পুরো বাংলাদেশ।

ফিরে এসে ভাবলাম নিউ ইয়র্কে একটু বিশ্রাম নেবো— দেশে আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে। ওদিকে Toronto তে শিরীর ভাস্তি বীনার দাওয়াত এখনো মেটানো হয়নি। অন্যদিকে L.A. থেকে মোখলেসের অভিমান ভরা নোট তো প্রায়ই আসছে whatsapp-এ। কী করি। L.A. কে বিসর্জন দিলাম। যদি আবার আসা হয় তাহলে L.A. তেই যাবো সবার আগে— এই সান্ত্বনা দিলাম মোখলেস আর শেফাকে।

প্রকৌশলী আহসানউল্লাহ এক সময় ঢাকায় আমার প্রতিবেশী ছিল। এখন Long Island প্রবাসী। অবসর জীবন যাপন করছে— বড়ই আনন্দের সাথে ঘুরে ঘুরে সময় কাটায়। বিপাশার বাসার খুবই কাছে থাকে। আমাদের প্রায় এদিক ওদিক নিয়ে যায়।

চলেন আপেল পেড়ে নিয়ে আসি।

আমরাও নেচে উঠলাম আহসানউল্লাহর কথায়।

গতবার সে আমাদের চেরি পিকিং-এ নিয়ে গিয়েছিল-সেই চেরি তোলার আনন্দেই রাজী হয়ে গেলাম। হায়রে আপেল-বাগানের মাটি আপেলে আপেলময়-গাছের ডালপালা তো দেখাই যায় না।

গতবার Strawberry-র বাগানে গিয়ে ও pick করা হয়েছিল।

এই যে প্রতি মৌসুমে— ফল পিকিং-এর আনন্দ এখানকার অধিবাসীরা পাচ্ছেন এটাও একটা উৎসবের ব্যপার বৈকি। জীবনে কাজ, খাওয়া আর ঘুমানোর মাঝে কেউ হয়তো আনন্দ পায়— কিন্তু তার বাইরেও যে কতভাবে জীবনকে মাধুর্যপূর্ণ করা যায়, বাইরে না গেলে বোঝা যায় না।

এই যে হ্যালোইন, ওদের একটা উৎসব। মিষ্টিকুমড়োর একটা বিরাট ভূমিকা এই দিনে-দেখলাম এবার। কী কী সব করে মিষ্টিকুমড়ো দিয়ে— খেতে গিয়ে দেখে তো মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়। যেদিকে তাকানো যায় শুধু কুমড়ো আর কুমড়ো। সব এক রঙের। দুদিন পর বিপাশা নিয়ে গেল NY. museum. বিরাট ভবনে এই মিউজিয়াম। এসব কি আর একদিনে দেখা সম্ভব। প্রথমেই ঢুকলাম মিশর অংশে। আল্লাহ, মমি দেখেই তো দিন পার হয়ে যায়। অনেক মমিকে দেখলাম উন্মুক্ত। তাদের পোশাক আশাক, জুতো, ব্যাগ, পাখা, খাওয়ার পাত্র কী নেই— আর স্থাপত্য সেও তো অনন্য।

প্রায় গোটা দিন পার মিশর দেখে— তারপর ঢুকলাম রোমানদের রাজ্যে। স্কাল্পচারের ছড়াছড়ি। গরু, ছাগল, ভেড়া, সিংহ, মানুষ কেউ বাদ যায়নি এই মূর্তি নির্মাতাদের হাত থেকে। কত রকম ভঙ্গী তাদের। দেব দেবীদের মূর্তির আবার অন্যরকম দ্যোতনা। রোমান স্থাপত্যকলার প্রদর্শন আর এক মনোজগতে নিয়ে যাবে দর্শককে।

কতক্ষণ ঘুরেছি আর ছবি তুলেছি খেয়াল নেই। খেয়াল হতে দেখি বিপাশা আর তার মা আমার ধারে কাছে নেই কেউ। তাদের খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে ফেললাম বেরুনোর পথ। পরে যখন পথ পেলাম— দেখি মা-বেটি বাইরে প্রবেশ পথের বিশাল সিড়ির ধাপে বসে গল্প করছে। তারা নাকি আমাকে খুঁজে না পেয়ে এখানে এসে বসেছে— আমি বেরুলেই দেখা হবে।

সেভাবে দেখা হলো না মিউজিয়াম। আবার যদি নিউইয়র্ক যাই, অবশ্যই প্রথম টার্গেট হবে আমার এই মিউজিয়াম।

২০২৩-এর আমেরিকা ভ্রমণের শেষ অংশ ছিল টরোন্টো যাওয়া-এক সপ্তাহের জন্য। মাঝে এক দিন সময়-বিপাশাদের সাথেই কাটলো।

বিপাশাদের বাসা লং আইল্যান্ডের এমন যায়গায় অবস্থিত-মনে হয় যেন একটি শান্তির পারাবার। বাড়িগুলো প্রায় একই ধাঁচের— দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরপর অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের জন্য এই এলাকাটা গড়ে তোলা হয়েছিল। সামনে পেছনে বেশ প্রশস্ত সবুজ চত্বর। নানান রকম ফুলের গাছ প্রায় প্রতিটি বাগানকে উজ্জ্বল করে রাখে প্রায় সারাটা বছরই। দুটো বাড়ির মাঝে ২০-২৫ ফুট দূরত্ব। প্রতিটি বাড়ির একই রং,সাদা। সঙ্গে কিছু কিছু ছাই রঙের বর্ডার। বিপাশাদেরটা দোতলা-বেশ বড়— ওরা ছিমছাম করে সাজিয়ে রেখেছে। প্রতিটা সকাল বাড়ির সামনে রোদ পোয়ানোটা আমার নেশা হয়ে গেছিল। দেখা হতো প্রথমেই এক জোড়া খরগোশের সাথে। চোখাচোখি হলেই লুকোতো ঝোঁপের আড়ালে। আর নিত্য দিনের খেলা চলতো কাঠবিড়ালির। নানান জাতের পাখির আনাগোনা তো ছিলই। আবহাওয়ার কোনো ঠিক ঠিকানা পাওয়া যেত না। তবে পূর্বাভাস সহজে ব্যর্থ হয় না। এই রোদ তো বিকেলে ঝুমঝুম বৃষ্টি। দুপুরে তাপমাত্রা ২২° তো সন্ধ্যায় দেখা যেত ৯/১০-এ নেমে গেছে। এর আগেরবার এক বৃষ্টির দিনে বিপাশা আমাদের নিয়ে গেল লং আইল্যান্ডের অন্য এক এলাকায়-আহা, সে কি দৃশ্য— রাস্তার দুই পাশে শুধু চেরি ফুলের গাছ। বৃষ্টির সাথে বেশ একটু বাতাস। চেরি ফুল ঝরে পড়ে সব এলাকা গোলাপী চাদরে পরিণত হয়েছে। মনমাতানো আবহাওয়া-পাগলের মত বৃষ্টিতে ভেজা ছবি তোলা হয়েছিল প্রচুর।

বিপাশার বাগানে প্রচুর গাছ রয়েছে। বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়ে রভোডেনড্রন ফুল। এক সাথে সারা গাছে যখন ফুল ফোটে— মনে হয় গোটা এলাকা আলোকিত হয়ে রয়েছে। সেবারে তৌকির হঠাৎ করে সবজি বাগান করার ব্যাপারে উৎসাহিত হলো-সেকি পরিশ্রম-কষ্টলি ব্যাপারও বটে— বীজ, চারা, সার ইত্যাদির দাম কিন্তু ভালই। তবে ওরা সে বছর যে সবজি বাগান থেকে পেয়েছে— খেয়ে আর বিলিয়ে কুল পায়নি। পরেরবার অবশ্য সেই উৎসাহ দেখিনি তৌকিরের। বরং ওই সময়টা তৌকির পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। প্রচুর বই কেনে। ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক সব— আর বিপাশা-সংসার কর্ম করেও আঁকা আঁকির পেছনে সময় দেয় প্রচুর। নিউ ইয়র্কের আর্ট কালচার মহলে মোটামুটি ভালই পরিচিতি লাভ করেছে দেখলাম।

লোকজন কম, গাড়ি চলাচল সীমিত। সকাল বিকাল হাঁটার অত্যন্ত উৎকৃষ্ট স্থান, এবং মোটামুটি তার সৎব্যবহার করতে কসুর করিনি আমি। আমার মত বুড়োদের সাথে প্রায় প্রতি সকালেই সাক্ষাৎ ঘটতো পথে— হাই, Good morning বলে মিষ্টি হাসি বিনিময় ছিল নিয়মিত।

টরোন্টো পৌঁছালাম নভেম্বরের মাঝামাঝি। শিরীর প্রথম বায়না ছিল দিনের বেলা নায়াগ্রা ফল দেখবে ওপার থেকে। হৈ চৈ করে রওয়ানা হলাম— কিন্তু যেতে যেতে বিকেল গড়িয়ে গেল। আসলে প্রচুর কালো মেঘ জমে চারদিক হয়ে গেল অন্ধকার। তখন দিনের টরোন্টো ফলস দেখা হলো না। সকালে দেখা ‘টরোন্টো’ টাওয়ার আর কিছু সাইট ভিজিট সম্ভব হলো। রাতে বুয়েটিয়ানদের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ফিরলাম বীনা-দোলনের বাসায়।

পরদিন আমাদের নিয়ে ঘোরার দায়িত্ব ছিল ভায়রাভাই নুরুল আলম খান এবং তার পুত্র জোবায়েরের। তারা আসতেই শিরীর বায়না— আগে সে নায়গ্রা দেখবে— কাল রাতে অন্ধকারে দেখা হয়নি। তাই সই। আবার চললাম সেখানে। পথে ওরা নিয়ে গেল এক নীরব নিঃশব্দ স্থানে যেখানে স্থানীয় প্রাচীন অধিবাসীদের ঘরবাড়ি এবং নানান আসবাবপত্র, অস্ত্রশস্ত্রের সমাহার। এগুলো দেখলে মনটা যেন কেমন করে ওঠে। চোখের সামনে মনে হয় সেই সব মানুষগুলো হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে।

এবার দেখা হলো নায়গ্রা ফলস from Canada side at day. শিরী দৌড়ে গিয়ে উঠল Steamer-এ। আমি আগেই বলেছি উঠবো না। যাক তার আশাটা তো পূরণ হলো। এরপর আরো দুদিন ছিলাম টরোন্টো-পুরোনো বন্ধুদের সাথে দিন কাটানো, মজাই লাগলো-রাতের শহীদ মিনারও দেখা হলো। বেশ কাটলো— তবে সবার এক কথা— ওখানে এক মাসের সময় নিয়ে আসবেন।

তারপর নিউ ইয়র্ক হয়ে সোজা ঢাকা ২০২৩ এর ২০ নভেম্বর। এয়ারপ্লেন থেকে দেশের মাটিকে দেখলেই একটা রোমাঞ্চ জাগে শরীরে। এজন্যই বলে ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা। তোমাতে বিশ্বময়ী, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা’। কী শান্তি।

আসলে বিদেশ ভ্রমণ আনন্দের, মনের দুয়ার খুলে যায় নানান মানুষ আর তাদের সংস্কৃতির সাহচর্যে— তাই বলে আমার দেশ কি কম!

বছর দশেক আগে বাংলাদেশের ২১টি জেলা-উপজেলায় কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। টেলিভিশনের একটি শিক্ষামূলক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে গিয়ে।

সে বছর SSC তে যেসব দরিদ্র ছাত্র GPA-5 পেয়েছিল তাদের মধ্যে ছাব্বিশ জনকে নিয়ে অনুষ্ঠান তৈরি হয়েছিল আমার নির্দেশনায়। উত্তরে পঞ্চগড়, দক্ষিণে টেকনাফ, ওদিকে খুলনা, এদিকে সিলেট ময়মনসিংহ— এ সমস্ত এলাকার মধ্যে বাছাই করে ২৬টি স্কুলের ২৬ জন ছাত্রর বাড়ি গিয়ে তাদের ইন্টারভিউ-২৫ মিনিটের অনুষ্ঠান।

তখন দেখেছি বাংলার সৌন্দর্য। এভাবে তো দেখা হয়নি আগে। প্রতিদিন একটা করে ইন্টারভিউ, রাতে নিকটস্থ শহরে থাকা, ভোরে উঠে অন্য এক বাড়ি রওয়ানা হওয়া, বেশ রোমাঞ্চকর ছিল অনুষ্ঠানটি। দেশের নদী, খাল, ডোবা, পাহাড়, টিলা, ধান ক্ষেত, অন্যান্য ফসলের ক্ষেত, কখনো গাড়িতে, কখনো ফেরিতে, কখনো নৌকোয়, কখনো ঘোড়ায় চড়ে— সে ছিল সত্যি অপূর্ব অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে ভাল অভিজ্ঞতা হলো পঞ্চগড়ে এক অটিস্টিক সাঁওতাল মেয়েটির বাড়িতে বসে মধ্যাহ্নভোজ। আবার নাটোরে এক সুইপার পরিবারের সাথে সারাটা দিন কাটানো। ইউটিউবে এখন দেখা যায় সেসব অনুষ্ঠান ‘MIZAN MEDHABI দেশের মুখ। ঘুরে ঘুরে খোলা আকাশ দেখা, ডিঙিতে চড়ে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মাছ ধরা, গরুর গোয়ালে বসে রাত জেগে যে ছেলেটা পড়ে GPA -5 পেয়েছে তার মুখে চমৎকার ইংরাজি শোনা, আরো কত কি— সুন্দর, বড়ই সুন্দর আমার দেশ— এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সে যে আমার জন্মভূমি

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *