প্রথম অংশ - প্রাকৃতিক
দ্বিতীয় অংশ - ঐতিহাসিক (১. হিন্দু-বৌদ্ধ যুগ)
দ্বিতীয় অংশ - ঐতিহাসিক (২. পাঠান রাজত্ব)

২. বসতি ও সমাজ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – বসতি ও সমাজ

রজনীর অন্ধকার বিগত হইলে যেমন তরুণারুণভাতি সুপ্ত জগতকে প্রদীপ্ত করে, তামস-যুগ অতিবাহিত হইলেও তেমনই দেখা গেল, যশোহর-খুলনার যে সকল অংশ নিম্ন ও জঙ্গলাকীর্ণ হইয়া বাসের অযোগ্য হইয়াছিল, তাহাও আবার উন্নত ও পরিষ্কৃত হইয়া সভ্য সমাজের বসতিভূমি হইতেছে। যাঁহারা উপনিবেশ স্থাপন করিতেছিলেন, তাঁহারা যে কোন দূরবর্ত্তী বিদেশ হইতে আসিতেছিলেন, তাহা নহে। সেনরাজত্বের অবসান হইল, প্রাকৃতিক বিপ্লব হইল, পাঠান অধিকারের প্রাক্কালে দেশময় অরাজকতা চলিতে লাগিল, এইরূপ নানাবিধ কারণে লোকে নানাস্থানে চলিয়া গিয়াছিল; আবার যখন রাষ্ট্রবিপ্লবের আবর্ত্ত স্থিরভাব ধারণ করিল, দেশের ভূমি উন্নত হইয়া শস্যক্ষেত্রের উপযোগী হইল, পাঠানেরা বঙ্গদেশে বসতি নির্দ্দেশ করিয়া অপেক্ষাকৃত ধীরভাবে শাসনদণ্ড পরিচালনা করিবার জন্য দেশের লোকের সহায়তা চাহিলেন, তখন দেশে শান্তির আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে নূতন সমাজ গঠিত হইতে লাগিল।

পূর্ব্বেই বলিয়াছি ভৈরব নদের উত্তরভাগে প্রাকৃতিক বিপ্লবের বিশেষ প্রকোপ হয় নাই, সেখানে লোকে তত অধিক স্থান পরিত্যাগ করেন নাই, সুতরাং সেখানকার সামাজিক পরিবর্তনও অপেক্ষাকৃত কম হইয়াছিল। সে অংশে নূতন অধিবাসীদিগকে স্থান দিবার উপায়ও অধিক ছিল না; এজন্য যখন পাঠানরাজত্বের মধ্যভাগে পশ্চিমবঙ্গ হইতে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও পূর্ব্ববঙ্গ হইতে বৈদ্য কুলীনগণ এদেশে আগমন করিতেছিলেন, তাঁহারা জনবহুল উত্তরভাগ ত্যাগ করিয়া বিরলবাস দক্ষিণাঞ্চলকেই অধিক পছন্দ করিয়াছিলেন। নদীর পলিতেই ভূমি উচ্চ হয়; এজন্য অবনমিত স্থানে প্রথমে নদীর কূলই জাগে ও বসতির যোগ্য হয়। এজন্য যখন খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম হইতে নূতন উপনিবেশ স্থাপিত হইতেছিল, তখন দক্ষিণভাগের ভৈরব, ভদ্র, কপোতাক্ষ প্রভৃতি নদীকূলেই এই বসতি হইতেছিল। আমরা পরে দেখিতে পাইব, যখন খাঁ জাহান আলী প্রভৃতি সামন্তগণ সুন্দরবন আবাদ করিবার অগ্রদূত হইয়া আসিয়াছিলেন, তখন তাঁহারা ভৈরবের কূল দিয়া পূর্ব্বমুখে এবং কপোতাক্ষের কূল দিয়া দক্ষিণমুখে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। তাঁহাদের গতিবিধির জন্য এই পথে নূতন রাস্তা প্রস্তুত হইয়াছিল এবং সেই রাস্তার দুই ধারে তাঁহাদের জলাশয় ও মসজিদ প্রভৃতি কীৰ্ত্তিচিহ্নসমূহ এখনও বর্ত্তমান রহিয়াছে। তাঁহারা যে পথে গিয়াছিলেন, সে পথের অনেক স্থানে পূৰ্ব্ব হইতে লোকের বসতি নূতন করিয়া স্থাপিত হইতেছিল; যাহা বাকী ছিল, উহাদের সহচর ও সহায়কগণ এবং পরবর্ত্তী শাসককর্তৃগণের কার্য্যকারকগণ সে সকল স্থান পূরণ করিয়াছিলেন। ঐ সকল নদীগুলির কূলে কূলে বা সন্নিকটে এক্ষণে যাঁহাদের বসতি আছে, তাঁহাদের বংশের পূৰ্ব্ব কথা আলোচনা করিলে অধিকাংশ স্থানেই দেখা যাইবে, পাঠানরাজগণের সহিত তাঁহাদের কোন না কোন প্রকার বৈষয়িক সম্বন্ধ আছে। পাঠানরাজদিগের মধ্যে কেহ কেহ হিন্দুদেরও গুণের যথেষ্ট সমাদর করিতেন এবং কার্য্যতঃ সে সমাদরের পরিচয় দিতেন।

যাঁহারা এইভাবে নূতন বসতি স্থাপন করেন, তাঁহারা আসিলেন কোথা হইতে? ইঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ যে দূরবর্ত্তী স্থান হইতে আসিয়া নূতন দেশের নূতন বাসিন্দা না হইয়াছিলেন, তাহা নহে। তবে অধিকাংশ বিপ্লবের পূর্ব্বেও এই দেশে ছিলেন। বিপ্লবের জন্য স্থানান্তরিত হইয়া তাঁহারা যশোহরের নানাস্থানে বা নিকটবর্ত্তী অন্য কোন বিভাগে গিয়া কয়েক পুরুষ বসতি করিয়াছিলেন। পরে কতক সে সকল স্থান হইতে অত্যাচার-পীড়িত হইয়া, কতক পৰ্য্যাপ্ত শস্যলোভে, কতক বা অজানিত দূর প্রদেশে নূতন রাজার মত প্রতিপত্তি বিস্তারের কল্পনায় এ অঞ্চলে আসেন। অনেক কালের পতিত বা নবোত্থিত ভূমিতে যেমন ফসল ভাল হয়, তেমনই যাঁহারা নূতন প্রদেশে নববিক্রমে বসতি স্থাপন করেন, তাঁহাদেরও বংশ বা বলবৃদ্ধি হইয়া থাকে। পাঠান আমলে এইজন্য যশোহর-খুলনার দক্ষিণাংশে নানা বিষয়ে উন্নতি বা অবস্থান্তর দেখা গিয়াছিল।

কনোজাগত ব্রাহ্মণ কায়স্থগণ আদিশূরের নিকট হইতে গঙ্গাতীরে ভূমিলাভ করিয়া তথায় বাস করিতেছিলেন। বল্লালসেনের সময়ে তাঁহাদের মধ্যে যাঁহারা কৌলীন্য পাইয়াছিলেন, তাঁহারা ঐ প্রদেশেই বসতি করিতেছিলেন। গঙ্গা ছাড়িয়া দূরে যাইতে তাঁহারা সম্মত ছিলেন না। পাঠান রাজত্ব আরম্ভ হইলেও তাঁহারা সেই প্রদেশ ছাড়েন নাই। অবশেষে কোন স্থানে জাতিধর্ম্মের উপর অত্যাচার, কোথাও বা অরাজকতা, স্থানের অভাবে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কখনও বা রাজকার্য্যের জন্য অন্যত্র যাইবার আবশ্যকতা তাঁহাদিগকে স্থানত্যাগ করাইয়াছিল। এই সকল ব্রাহ্মণ-কায়স্থগণ ধৰ্ম্মনিষ্ঠ ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে কুলমর্য্যাদা ও সমাজসমস্যা লইয়া অধিকতর ব্যস্ত ছিলেন। ইহা ব্যতীত যে উদরান্নের সংস্থান একটা অবশ্য কৰ্ত্তব্য, তাহা অনেক সময় ভুলিয়া যাইতেন। তাঁহাদের এই দারিদ্র্যের সুযোগ পাইয়া অনেক অকুলীনও নিম্নশ্রেণীর ব্রাহ্মণ-কায়স্থগণ উঁহাদের সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ সংস্থাপিত করিতেন। এইভাবে যে সকল কুলদোষ ঘটিয়াছিল, পরে তাহার পরিহারকল্পে সমাজের বন্ধন আরও কঠোর করিবার প্রয়োজন হইয়াছিল। এই বৈবাহিক সম্বন্ধের জন্য ও স্বচ্ছন্দ জীবিকার লোভে কুলীনগণ গঙ্গাতীর ত্যাগ করিয়া অনেকে যশোহর-খুলনায় আসিয়াছিলেন। সুতরাং তাঁহাদিগকে যাঁহারা আনিয়াছিলেন, তাঁহারা এ প্রদেশের অধিবাসী ছিলেন। সে কাহারা?

শ্রোত্রিয় ও সপ্তশতী ব্রাহ্মণ, মৌলিক কায়স্থ, নবশায়ক, নানা জাতীয় বণিক্ ও নিম্ন শ্রেণীর শূদ্রগণ পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্ব্বে যশোহর-খুলনার অধিবাসী ছিলেন। চতুৰ্দ্দশ শতাব্দীতে বৈদ্যগণ কেবলমাত্র খুলনা জেলায় পয়োগ্রাম সেনহাটিগ্রামে বাস করিয়াছিলেন, তৎপূর্ব্বে এদেশে বৈদ্য ছিলেন বলিয়া জানা যায় না। চতুৰ্দ্দশ শতাব্দীর পর, অন্য বৈদ্য কুলীনেরা পূর্ব্ববঙ্গ হইতে আসেন। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ব্রাহ্মণ কায়স্থ কুলীনেরা এ প্রদেশে বাস করেন। চতুৰ্দ্দশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধ হইতে শ্রোত্রিয় ও সপ্তশতী ব্রাহ্মণ এবং মৌলিক কায়স্থেরা বিপ্লবগ্রস্ত প্রদেশে বসতি স্থাপন করিতে থাকেন। ইঁহাদের মধ্যে মৌলিক কায়স্থগণই নূতন উপনিবেশের অগ্রদূত হইতেন। তাঁহারা স্থান নির্ব্বাচন করিতেন, জঙ্গল আবাদ করিতেন, প্রবল শত্রু বা হিংস্রজন্তুর সহিত যুদ্ধ করিয়া জয়লাভ করিতেন, বিস্তৃত প্রদেশ দখল করিয়া সবিক্রমে শাসন করিতেন, পাঠান-রাজদরবারে সৈন্য পরিচালনা, মন্ত্রণা, রাজত্ব সংগ্রহ, এবং হিসাব ও তহবিল রক্ষা প্রভৃতি যাবতীয় গুরুতর রাজকার্য্যে মৌলিক কায়স্থগণ বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিতেন; এবং তাহার পুরস্কারস্বরূপ রাজসরকার হইতে রায়, চৌধুরী, মজুমদার, খাঁ, মুস্তৌফি, নিয়োগী, সরকার, মল্লিক প্রভৃতি নানা সম্মানিত উপাধি লাভ করিতেন। এ সব উপাধি যে ব্রাহ্মণের নাই, তাহা নহে; তবে কায়স্থের তুলনায় কম। ব্রাহ্মণগণ এই মৌলিক কায়স্থগণেরই গুরু-পুরোহিতরূপে দেবোত্তর ও ব্রহ্মোত্তর নিষ্কর ভূমি লাভ করিয়া বাস করিতেন। তাঁহাদের অনেকে সেই সকল নিষ্কর-ভূমি এখনও ভোগ করিতেছেন। কায়স্থগণই তাঁহাদিগকে বসতি করাইতেন ও প্রতিপালন করিতেন। কায়স্থগণ ক্ষত্রিয় কিনা তাহা প্রমাণ করিবার এ উপযুক্ত স্থান নহে, তবে এই সকল মৌলিক কায়স্থগণ যে তৎকালে তাঁহাদের কার্য্যে, ব্যবহারে, চরিত্রে, দানদাক্ষিণ্যে ও ব্রাহ্মণপালনে যথেষ্ট ক্ষত্রিয়ত্বের পরিচয় দিয়াছিলেন, ইতিহাস তাহার প্রকাশ্য সাক্ষ্য দেয়।

শুধু ব্রাহ্মণকে নহে, কুলীন কায়স্থদিগকে ইঁহারাই আশ্রয় দিতেন ও প্রতিপালন করিতেন। বল্লালী মৰ্য্যাদা মানিয়া লইয়া ইঁহারাই তাঁহাদিগের সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া শ্লাঘা বোধ করিতেন এবং ‘বোস ঠাকুর’, ‘ঘোষ ঠাকুর’দিগকে মাথায় করিয়া লইয়া অনুদান ও ভূমিদান করিয়া পূজা করিতেন। এখনও কুলীন কায়স্থদিগকে অধিকাংশ স্থানে কোন মৌলিক বংশের আশ্রিত বলিয়া পরিচয় দিতে হয়। আজ যদি এই সকল মৌলিক বা আদিম কায়স্থগণের অধস্তন পুরুষের দুরবস্থার সুযোগ পাইয়া ব্রাহ্মণ ও কুলীন কায়স্থগণ তাঁহাদের সামাজিক প্রতিপত্তির উপর কশাঘাত করেন, তবে তাহা নিতান্তই অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক হইবে।

এক্ষণে জিজ্ঞাস্য এই হইতে পারে যে, এই সকল সুলক্ষণযুক্ত কায়স্থগণ বল্লালী ব্যবস্থায় কৌলীন্য পাইলেন না কেন? কৌলীন্য কয় জনে পাইয়াছিলেন? তাহার বিচারই বা করিয়াছিল কে? কনোজাগত ব্রাহ্মণ কায়স্থেরা শূর ও সেন রাজগণের বৃত্তিভূক্ হইয়া রাজধানীর সন্নিকটে বাস করিতেছিলেন। পুরুষানুক্রমে রাজদরবারে আপনাদিগের উপস্থিতি জ্ঞাপন করিয়া স্তাবকতাদ্বারা রাজপ্রীতি আকর্ষণ করাই তাঁহাদের কার্য্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, বিচারসভায় ইহাদের বংশধরগণ অধিক সংখ্যক উপস্থিত ছিলেন। রাজবিচারে ইঁহারাই বিচারের সার সম্মান গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাহার মধ্যেও আবার দত্তবংশীয়গণ ভৃত্যত্ব হইতে একটু নিবৃত্ত হওয়া মাত্র কৌলীন্য-বিবর্জ্জিত হইয়াছিলেন। কিন্তু সেই দত্তরাই ছিলেন মহাসান্ধিবিগ্রহিক, মহাপাত্র, মহাসামন্ত প্রভৃতি উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত! লক্ষ্মণসেনের দরবারে দত্তের প্রাধান্য এত অধিক ছিল যে, কৌলীন্যলাভ তাহার নিকট নগণ্যই ছিল। মৌলিক কায়স্থেরা সেই সময় নানা কার্য্যব্যপদেশে বঙ্গরাজ্যের নানা ভাগে কার্য্যে নিরত ছিলেন; রাজধানীতে অনবরত যাতায়াত তখন অনায়াসগত ছিল না। আমরা বিশ্বাস করি, ধর্ম্মনিষ্ঠ শোত্রিয় ব্রাহ্মণ এবং কৰ্ম্মনিষ্ঠ মৌলিক কায়স্থগণ আভিজাত্যের জন্য দূরবর্তী স্থান হইতে রাজধানীতে আনাগোনা করিয়া উঠিতে পারে নাই। তাঁহাদের কৌলীন্য লাভে বঞ্চিত হইবার ইহাই অন্যতম কারণ।

বল্লালের কৌলীন্যপ্রথা দেশমধ্যে এক ভেদনীতি প্রবর্তন করিয়া বঙ্গদেশের সৰ্ব্বনাশ সাধন করিয়াছিল। এই কথা প্রবর্তিত হওয়ার পর হইতে সামাজিকের দোষগুণ বিচার ও জাতিমর্য্যাদায় কে বড়, কে ছোট, ইহাই লইয়া দেশের সৰ্ব্বজাতীয় লোক এমনভাবে ব্যতিব্যস্ত ও অনন্যকৰ্ম্মা হইয়াছিল যে, দেশের অবস্থার দিকে কেহ বিন্দুমাত্রও দৃষ্টিপাত করে নাই। কে কাহার অনুগ্রহণ করিবে, অন্নগ্রহণ না করিয়া কিরূপে শত্রুতা সাধন করা যায়, এই সকল সামাজিক কথা লইয়া লোকের এত অধিক মাথাব্যথা হইত যে, প্রকৃত অন্ন কোথা হইতে হয়, দেশের অন্ন দেশে থাকিবে কিনা, সে সকল চিন্তা তাহারা একেবারেই পরিহার করিয়াছিল। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার বিষয়ে তাহারা এতই উদাসীন হইয়াছিল যে, পাঠান বিজয়ের পরে দেশের কি পরিবর্তন হইল, তদ্বিষয়ে অধিকাংশ লোকেরই উদ্বোধন হয় নাই। এক্ষণেও বল্লালী নীতির কুফল ফলিতেছে, লোকের সর্ব্বপ্রকার বিদ্বেষবুদ্ধি সামাজিক শাসনকে কলঙ্কিত করিতেছে। দেহবল, জ্ঞানবল, ধনবল, সকল বলের অভাব সামাজিক নির্যাতন দ্বারা পূর্ণ করা হইতেছে এবং সামাজিক শাসনের নামে কত ষড়যন্ত্র, নীচত্ব ও মিথ্যাচার যে দেশের মধ্যে বিনামূল্যে বিকাইতেছে, তাহার ইয়ত্তা নাই। কৌলীন্য-পরিপ্লাবিত দেশে মৌলিক ব্রাহ্মণ ও কায়স্থের সামাজিক উন্নতির একমাত্র উপায় হইয়াছে অর্থ। ইহা এখনও যেমন, পূৰ্ব্বেও তেমনি ছিল।

আমরা পূর্ব্বে বলিয়াছি যে, ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে যশোহর-খুলনার দক্ষিণে যে প্রাকৃতিক বিপ্লব হইয়াছিল, তাহার পরে ভৈরব, ভদ্র বা কপোতাক্ষ প্রভৃতি দক্ষিণদেশীয় নদীর কূলে যেখানে যখন বসতি স্থাপিত হইয়াছে, সেখানেই এতদঞ্চলের আদিম অধিবাসিগণ পুনরায় বাস করিয়াছেন। ইঁহারা বিপ্লবাদি কারণে কিছুকালের জন্য স্থানান্তরিত হইয়াছিলেন। এই সকল অধিবাসীর মধ্যে মৌলিক কায়স্থগণ প্রধান। তাঁহারা প্রথমে প্রায় সকলেই বৌদ্ধ ছিলেন এবং সেই বৌদ্ধধৰ্ম্মাক্রান্ত প্রাচীন সমতটে বাস করিতেন।১ ক্রমে তাঁহারা কৌলীন্যের প্রভাবে নবাগত কুলীন কায়স্থগণের সংস্পর্শে ও প্ররোচনায়, বৌদ্ধমত পরিত্যাগ করিয়া হিন্দু বৈষ্ণব হন। অনুসন্ধান করিলে দেখা যায়, মৌলিক কায়স্থগণ অধিকাংশই বিষ্ণুমন্ত্রে দীক্ষিত এবং কুলীন বংশজগণ তান্ত্রিক শাক্ত। তান্ত্রিক গুরুর প্রভাবে বঙ্গজ বৈদ্যগণ প্রায় সকলেই শাক্ত হন। মৌলিক কায়স্থগণ কুলীনদিগের প্রতিষ্ঠা করেন, কুলীনগণ গুরু-পুরোহিত ব্যতীত কোথায়ও থাকিতেন না। সুতরাং মৌলিকগণকেও কুলীনের গুরুপুরোহিত মানিয়া লইতে হইয়াছিল এবং তাঁহাদিগের বসতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করিতে হইয়াছিল। এই কুলীন আত্মীয় এবং ব্রাহ্মণগণের প্রভাবে ক্রমে ক্রমে মৌলিক কায়স্থগণের ধর্মমত পরিবর্তিত হইয়াছিল। এখন অনেক স্থলে মৌলিকদিগের অবস্থা এত শোচনীয় এবং তাঁহাদের আশ্রিত কুলীনগণ এত সমৃদ্ধিসম্পন্ন হইয়াছেন যে, কোন কায়স্থপ্রধান গ্রামে কুলীনগণই প্রধান এবং তাঁহাদের আশ্রয়দাতার কীর্তিকথা লুপ্তগাথায় পরিণত হইয়াছে।

আমরা সাধারণভাবে যে কয়েকটি কথা বলিলাম, বিশেষ অনুসন্ধান করিলে তাহার সত্যতা লক্ষিত হইবে, কারণ আমরা অনেক অনুসন্ধানের পর এইরূপ মন্তব্যে উপনীত হইয়াছি। এ বিষয়ে সকল দৃষ্টান্ত এখানে প্রদান করা দুঃসাধ্য এবং অনর্থকও বটে। সুতরাং ভৈরব-ভদ্রকূলে কতকগুলি স্থানের বসতির বিষয় উল্লেখ করিয়া সংক্ষেপতঃ কয়েকটি মাত্র দৃষ্টান্ত দিতেছি।

ভৈরবনদ যশোহরে প্রবেশ করিবার পর সিঙ্গিয়া পর্য্যন্ত এক প্রকার পূর্ব্বমুখেই আসিয়াছে। তৎপরে উহার গতি ক্রমশঃ দক্ষিণমুখী হইয়া বিপ্লবগ্রস্ত প্রদেশ দিয়া পূৰ্ব্বদিকে চলিয়া গিয়াছে। সিঙ্গিয়ার উত্তরে ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিপ্লব পৌঁছিয়াছিল বলিয়া মনে হয় না। সিঙ্গিয়ার পর হইতে যশোহর-কূলে নূতন বসতি হইতে থাকে। সেখান হইতে নদীর দুইধারে ক্রমান্বয়ে মৌলিক কায়স্থগণের আদিবাস দেখিতে পাওয়া যাইবে। চেঙ্গুটিয়ার কল্কীশ গোত্রীয় রায় চৌধুরী দত্তগণ বিখ্যাত। ইঁহারা বিঘটিয়ার দত্ত, উত্তর কালে সুবিখ্যাত সেনাপতি কালিদাস রায় এই বংশ উজ্জ্বল করেন। কালিদাসই বাঘুটিয়ার ঘোষ ও জঙ্গলবাধালের বসু সমাজের প্রতিষ্ঠাতা। দেয়াপাড়ার দেববংশ বহু প্রাচীন। ইহারা সাধারণতঃ চিত্রপুর ও কর্ণপুরের দেব বলিয়া এক্ষণে খ্যাত। পাঠান আগমনের পূর্ব্ব হইতে ইঁহারা এদেশের অধিবাসী ছিলেন। পাঠান-সরকারে চাকরী করিয়া যশস্বী হইয়া ইঁহারা নানা উপাধি লাভ করেন এবং যশোহর-খুলনার নানাস্থানে বসতি করিয়াছিলেন। দেয়াপাড়ার মজুমদার, ভাটিয়াপাড়ার বক্সী, কসুন্দীর সরকার, পাঁজিয়ার সরকার, রুদাঘরার হালদার, সাধুহাটীর সরকার, সুবলহাটির হালদার ও কোটাকোলের সরকারগণ এই দেববংশীয়। এই সকল স্থানেই ইঁহারা বহু কুলীন কায়স্থ ও সুব্রাহ্মণের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। তপনভাগের দাসগণও এইরূপ বিখ্যাত। তাঁহারা নড়াইলে, শোলপুর ও ভয়াখালি প্রভৃতি স্থানে বসতি করেন। আফরার ও শঙ্করপাশার সেনগণ ভৈরবকূলে অবস্থিত। ইঁহারা বিখ্যাত দ্বিগঙ্গার সেনবংশীয়, যশোহরে সিরিজদিয়া ও চণ্ডীবরপুর, খুলনায় মঘিয়া, বনগ্রাম, চিংড়াখালি এবং বরিশালে রায়েরকাটিতে এই একই বংশের অতুল সম্মান। শেষোক্ত চারিস্থানে ইঁহারা রাজোপাধিধারী এবং মঘিয়া, বনগ্রাম, চিংড়াখালি ভৈরবের কূলে অবস্থিত। শঙ্করপাশার নিকটে বর্ণীবিছালীর সিংহবংশ বিখ্যাত। ইঁহারাই তথাকার বসুদিগের প্রতিষ্ঠাতা। এখান হইতেই ইঁহারা ভৈরবকূলে বেলফুলিয়ার অন্তর্গত আইচগাতিতে বাস করেন, তথায়ও তাঁহারা কুলীনগণের প্রতিষ্ঠাতা এবং সম্পত্তিশালী ও দেব- দ্বিজসেবক। ভৈরব দিয়া আর একটু অগ্রসর হইলে পাইকপাড়ার দত্তগণ বিশেষ খ্যাতিসম্পন্ন। ইঁহারা দত্তদিগের বটগ্রাম সমাজভুক্ত; ঢাকুরিয়ার মজুমদারগণ এই বংশীয়। বালী সমাজের দত্তগণ যশোহর-খুলনায় বহুস্থানে বাস করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে ভৈরবকূলেই তাঁহাদের বাস অধিক। মৌভোগ, বাসড়ী, মুক্তীশ্বরী ও সিদ্ধিপাশার দত্ত, সেনহাটির মুস্তৌফি এবং রাঙ্গদিয়া ও শ্রীপুর-বনগ্রামের দত্তগণ এখনও স্ব স্ব স্থানে সমাজের প্রধান ব্যক্তি এবং বহু কুলীন ও ব্রাহ্মণের আশ্রয়দাতা। কাশ্যপ গোত্রীয় দত্তবংশীয়েরাই কালনার দত্ত এবং ভরদ্বাজ গোত্রীয় বালীর দত্ত নড়াইলের জমিদার। সিদ্ধিপাশার অপর পারে দামোদরের ব্রহ্ম, আর একটু অগ্রসর হইলে বারাকপুরের সেন এবং মহেশ্বরপাশার গুহবংশীয় মজুমদারগণ বিশেষ সম্মানিত। ইঁহারা বহু কুলীন আনিয়া বসতি করাইয়াছিলেন। মহেশ্বরপাশায় ঘোষ, বসু, মিত্র, সৰ্ব্বজাতীয় কুলীনের বাস। মহেশ্বর ঘোষের নামেই মহেশ্বরপাশা নাম হইয়াছে। ভৈরবপথে আরও অগ্রসর হইলে বেলফুলিয়ার ভদ্রগতিতে ভদ্রবংশীয় কায়স্থগণ পূৰ্ব্বকালে ক্ষমতাশালী ছিলেন। বেলফুলিয়ার রায়চৌধুরী উপাধিধারী বসুবংশীয় জমিদারগণ এই ভদ্রদিগের প্রতিষ্ঠিত। তৎপরে নন্দনপুরের নন্দীগণ এক সময়ে বিশেষ সম্মানিত ছিলেন, তাঁহারা তথায় বসু ও মিত্র কুলীনদিগকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ভৈরবপথে আলাইপুর ত্যাগ করিয়া পূর্ব্বমুখে অগ্রসর হইলে, মৌভোগের আদি বাসিন্দা বিষ্ণুবংশীয় বিনোদ খাঁ। তিনিই এখানে বাগাণ্ডাসমাজের বসুকুলীনদিগকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বিনোদ বিষ্ণু পাঠান আমলে খাঁ উপাধি ও প্রভূত ভূসম্পত্তি জায়গীর পান। ভৈরবকূলে রাজপাটের ও যশোহরের অন্তর্গত পাঁজিয়ার বিষ্ণুগণ এই একই বংশীয়। মৌভোগের পর নলধার ভঞ্জ চৌধুরিগণ বিখ্যাত। তাঁহারা এক সময়ে সমগ্র খড়রিয়া পরগণার অন্যতম জমিদার ছিলেন, নলধায় ও নিকটবর্ত্তী স্থানে তাঁহারা বহু কুলীন কায়স্থকে বসতি করাইয়াছিলেন। কালীগঞ্জের নিকটবর্ত্তী নতার ভঞ্জগণ এই একই কুলোদ্ভূত। সেই নতার নামানুসারে এখানে দ্বিতীয় নল্‌তা ক্রমে নলটা ও নলধা নামে পরিবর্তিত হইয়াছে। ভঞ্জবীর বিজয় রাম এক সময়ে প্রতাপাদিত্যের প্রধান সেনাপতি ছিলেন। ক্রমে অগ্রসর হইলে এইরূপ আরও মৌলিক কায়স্থের বসতি দেখা যাইবে। নন্ধা ও রাজপাটের রাহা, উত্তর পাড়ার দেববংশীয় নিয়োগী, রাখালগাছি ও হাউলীর নাগ ইঁহাদের মধ্যে বিখ্যাত। রাহাগণ মজুমদার উপাধিভূষিত হইয়া যশোহরে পবহাটী ও বাগডঙ্গা প্রভৃতি স্থানে সম্মানিত বংশ বলিয়া পরিচিত আছেন। উত্তরপাড়ার নিয়োগীগণ ধন্য পীতাম্বরের সন্তান বলিয়া খ্যাত এবং গোষ্ঠীপতিকুলভুক্ত। ইহাদের কথা বিশেষ ভাবে পরে আলোচিত হইতেছে। রাখালগাছির নাগবংশ খুলনা জেলায় একডাকে পরিচিত এবং অতিশয় সম্মানিত। তাঁহারা সে অঞ্চলে বহুকুলীনের আশ্রয়দাতা হইয়াছেন। এতদ্ব্যতীত বটগ্রামী রাঙ্গদিয়ার দত্তবংশ ও মঘিয়া প্রভৃতি স্থানের সেনবংশের কথা উল্লিখিত হইয়াছে।

কপোতাক্ষকূলেও এইরূপ মৌলিক কায়স্থগণের বসতি স্থাপিত হইয়াছিল। ইহার মধ্যে বোধখানার চৌধুরিগণ বিশেষ বিখ্যাত। ইঁহারা দেব-উপাধিধারী মৌলিক কায়স্থ। হুগলী সপ্তগ্রাম হইতে ইঁহাদের পূর্ব্বপুরুষ যশোহরে আসেন। ভৈরবকূলে বারবাজারে ইহাদের পূর্ব্বপুরুষদিগের আদিবাস বলিয়া কথিত হয়।[২] বোধখানায় যে ইঁহাদের বাস ছিল, তাহা তথাকার গড়বেষ্টিত রাজবাটীর ভগ্নাবশেষ হইতে এখনও স্পষ্ট জানা যায়। এই বোধখানা হইতে ক্রমে ইঁহারা গঙ্গানন্দপুরে, খুলনার মলইগ্রামে এবং ক্রমে ক্রমে যশোহরের সন্নিকটবর্ত্তী নয়াপাড়াগ্রামে এবং কপোতাক্ষতীরে রাডুলীগ্রামে বাস করেন। নিয়োগী উপাধিধারী ইহাদের এক শাখা খুলনার উত্তরপাড়া গ্রামে আছেন। ইঁহাদের পূর্ব্বপুরুষ হরিদেব সপ্তগ্রামের সন্নিকটে বাস করেন, তাঁহার অধস্তন সপ্তমপুরুষ পীতাম্বর দেব। ইনি নবাব দরবার হইতে খাঁ উপাধি পান এবং বহু সৎকার্য্যের ফলে সাধারণের নিকট ধন্য-পীতাম্বর বলিয়া খ্যাত হন। ইঁহারই অধস্তন পঞ্চম পুরুষ সুবিখ্যাত শিবদাস চৌখণ্ডী; তাঁহার বংশধরগণ হরিঢালী ও রাডুলী গ্রামে উঠিয়া যান। এ সকল স্থানই কপোতাক্ষের কূলে। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানাচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এই রাডুলীর রায়বংশ সমুজ্জ্বল করিয়াছেন। শিবদাস চৌখণ্ডীর বংশে অধস্তন চতুর্থ পুরুষে রাজা কংসনারায়ণ প্রাদুর্ভূত হন। তৎপুত্র রত্নেশ্বর যশোহর-নওয়াপাড়ায় বসতি করেন। রত্নেশ্বরের বৃদ্ধপ্রপৌত্র রতিকান্ত, কালীকান্ত প্রবল প্রতাপান্বিত জমিদার ছিলেন। ইঁহারা গোষ্ঠীপতি। শোভাবাজারের রাজবংশীয়গণ ইঁহাদিগের জ্ঞাতি। এই গোষ্ঠীপতি দেব-বংশ বঙ্গদেশের বহুস্থানে বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়াছেন, এবং নবরঙ্গকুলীনের সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া কায়স্থ সমাজের অধিনায়ক হইয়া রহিয়াছেন। বঙ্গদেশের সামাজিক ইতিহাসে ইহাদের স্তান অতি উচ্চে।[৩]

শুধু এই দেব-বংশীয়গণ নহেন, কপোতাক্ষকূলে সাগরদাঁড়ি ও তালার দত্ত, হরিঢালীর গুহমজুমদার, ভদ্রকূলে ভেরচির সিংহ প্রভৃতি মৌলিক কায়স্থগণ পাঠান আমলে সমাজে বিশেষ প্রতিপত্তিশালী ছিলেন। মৌলিক কায়স্থগণের মত এদেশে মৌলিক ব্রাহ্মণ অধিবাসীও ছিলেন। তাঁহাদের উপলক্ষেও কায়স্থদিগের মত এদেশে মৌলিক ব্রাহ্মণ অধিবাসীও ছিলেন। তাঁহাদের উপলক্ষেও কায়স্থদিগের গুরুপুরোহিতরূপে শ্রোত্রিয় ও কুলীন ব্রাহ্মণগণ ক্রমে এ অঞ্চলে আসিয়া বাস করেন। মৌলিক অর্থাৎ সাতশতী ব্রাহ্মণগণ ক্রমে ক্রমে শ্রোত্রিয়দিগের সহিত আদান প্রদান করিয়া মিশিয়া গিয়াছেন; অনেকস্থানে তাঁহারা এক্ষণে কষ্ট-শ্রোত্রিয় এবং এমন কি শুদ্ধ-শ্রোত্রিয় বলিয়া পরিচয় দিয়া থাকেন।[৪] ভৈরবকূলে অনেক স্থলে ইহারা বসতিস্থাপন করিয়া সভ্যতার আলোক বিকীর্ণ করিয়াছিলেন। মর্য্যাদাপ্রাপ্ত শ্রোত্রিয়গণ ইহাদের পন্থানুসরণ করিয়াছিলেন। মহেশ্বরপাশার সিন্দুরাবল্লভ, সেনহাটীর কাটানি, শ্রীফলতলার দাঙ্কুড়ী ও আজগড়ার ডাইয়া গাঁই-ভুক্ত ব্রাহ্মণগণ বিশেষ পরিচিত। সাতক্ষীরার জমিদারবংশীয়েরা কাটানি গাঁই। মহেশপুর ও দক্ষিণ ডিহির গুড়, পিটাভোগের কুশারি, সেনহাটীর কাঞ্জারি, সেনহাটী ও ঘাটভোগ প্রভৃতি স্থানের পাকড়াশী (সর্ব্ববিদ্যা বংশ), সেনহাটীর হড় এবং ভৈরবকূলে নানাস্থানে ডিংসাই, কুসুমকুলি প্রভৃতি প্রসিদ্ধ শ্রোত্রিয়গণ বসতি নির্দ্দেশ করিয়া যশোহর-খুলনা পবিত্র করিয়াছেন। ইঁহার মধ্যে গুড়দিগের এক অংশ পতিত হইয়া ‘পীরালি’ হন; কলিকাতার ঠাকুরবাবুরা কুশারি-বংশীয়। সর্ব্ববিদ্যা ও কাঞ্জারীগণ ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্যের গুরু এবং সমাজের শীর্ষস্থানীয়। স্থানান্তরে ইঁহাদের বিশেষ বিবরণ প্রদত্ত হইবে।[৫]

এস্থলে আমরা দেখাইতে চেষ্টা করিলাম যে, মৌলিক কায়স্থগণ ও পরে শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণেরা এদেশে আসিয়া কিরূপে বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন এবং বিপ্লবপ্লাবিত দেশে কিরূপে সামাজিকগণের সর্ব্ববিধ উন্নতির পথ পরিষ্কৃত করিয়া দিয়াছিলেন। ইঁহাদের দ্বারা সমাজ প্রতিষ্ঠিত হইবার প্রাক্কালে পাঠানেরা নানা সূত্রে এদেশে প্রবেশ করেন এবং তাহাদের সাময়িক অত্যাচারে ও নবশাসন প্রবর্তনে দেশমধ্যে তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হইয়াছিল। খুলনায় পাঠান আসিবার পূর্ব্বেই চন্দ্রদ্বীপে একটি স্বাধীন হিন্দুরাজ্য সংস্থাপিত হওয়ায় খুলনার অধিকাংশ সে রাজ্যভুক্ত হইয়া পড়ে। দনুজমৰ্দ্দন দেব সেই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।

পাদটীকা

১. ‘The kayasthas, if we exclude the descendants of those who are recognised as kulinas among the Dakshina Radhiya and Vangaja. Communities and who were Brahminic in their tendencies, were mostly Buddhists. These are all Maulikas, i.e., they originally belonged to this country, a Buddhist country.’–M. M. Haraprasad Sastri’s Introduction to N. N. Vasu’s Modern Buddhism, P. 20.

২. Westland’s Report. P. 156.

৩. এই দেববংশের বিস্তৃত বিবরণ পরবর্ত্তী খণ্ডে ‘বোধখানার চৌধুরী বংশ’ দ্রষ্টব্য।

৪. সম্বন্ধ নির্ণয়, ২৯০ পৃ।

৫. পরবর্ত্তী খণ্ডে ‘ব্রাহ্মণ-সমাজ’ দ্রষ্টব্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *