প্রথম অংশ - প্রাকৃতিক
দ্বিতীয় অংশ - ঐতিহাসিক (১. হিন্দু-বৌদ্ধ যুগ)
দ্বিতীয় অংশ - ঐতিহাসিক (২. পাঠান রাজত্ব)

১. তামস যুগ

প্রথম পরিচ্ছেদ তামস যুগ

দুর্দ্দিন একাকী আসে না। ব্যক্তিগত জীবনে বা দেশের ইতিহাসে সেই একই কথা। বঙ্গদেশ যখন পাঠানের হাতে স্বাধীনতা হারাইল, তখন শত দুৰ্দ্দৈব আসিয়া তাহাকে গ্রাস করিয়াছিল। যশোহর-খুলনার অবস্থা আরও শোচনীয়। শুধু শাসন বা সমাজ সম্বন্ধীয় বিপ্লব নহে, প্রাকৃতিক বিপ্লব ও তাহাকে বিপর্যস্ত করিয়াছিল। আমরা প্রাকৃতিক বিবরণে এ সকল বিষয় আলোচনা করিয়াছি। তাহাতে দেখা গিয়াছে, সেনরাজত্বের পূর্ব্বে যেমন কয়েকস্থানে কয়েকটি বিপ্লব হইয়াছিল, সেনরাজত্বের অবসানের প্রাক্কালেও সেইরূপ সুন্দরবন অঞ্চলে, যশোহর-খুলনার দক্ষিণাংশে একটি প্রবল প্লাবন ও অবনমনে বহুবিস্তৃত প্রদেশ নিম্ন হইয়া জলমগ্ন হয়। খুলনার অধিকাংশ এবং যশোহরের দক্ষিণদিকে কতকাংশ এইভাবে নিম্ন হইয়া বাসের অযোগ্য হয়। ইহার বিশেষ কোন বিবরণ সংগ্রহ করা যায় না। কারণ পরবর্ত্তী দুই শত বৎসরের মধ্যে এই অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয় নাই এবং এই যুগে দেশের লোক অরাজকতার মধ্যে নানাবিধ অত্যাচারে পীড়িত হইয়া সৰ্ব্বদা এরূপ শঙ্কিত থাকিত যে, তাহারা কোনও প্রকার পুঁথিপত্রে দেশের অবস্থার কোন বিবরণ রাখিয়া যায় নাই। খুলনার দক্ষিণভাগের অধিবাসিগণ কতক বিনষ্ট, কতক বাসত্যাগ করিয়া উত্তর মুখে পলায়ন করিয়াছিল। উত্তরভাগে যাহারা আত্মরক্ষা করিয়াছিল, তাহারা নিজের প্রাণ ও জাতিমান রক্ষার জন্য এত ব্যস্ত ছিল যে, পরের কথার খবর লইতে অবসর পাইত না। এইভাবে প্রায় দুইশত বৎসর গিয়াছিল। খৃষ্টীয় ১২০০ অব্দ হইতে ১৪০০ অব্দ পর্য্যন্ত দুই শত বৎসরকে আমরা তামস-যুগ বলিতে পারি। কারণ এ যুগের ইতিহাস অন্ধতমসাচ্ছন্ন।

এই বিপ্লব উত্তরদিকে ভৈরব নদ পর্য্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল; তখন ভৈরব ও ভদ্র উভয়ের মধ্যবর্ত্তী স্থানে যথেষ্ট লোকের বসতি ছিল। এই সময় হইতে ঐ প্রদেশ হীনাবস্থ হইয়া পড়ে, এবং অদ্য পৰ্য্যন্তও সে অবস্থার বিশেষ পরিবর্তন হয় নাই। জমি নিম্ন হইলে জলমগ্ন হয়, ক্রমে পলিদ্বারা ভূমি উচ্চ হইতে থাকে; উচ্চভূমিতে প্রথমতঃ জঙ্গল হয়; জঙ্গলাকীর্ণ স্থান ব্যাঘ্রাদি হিংস্র জন্তুর বাসভূমি হইয়া পড়ে, উহাদের উৎপাতে নিকটবর্ত্তী জনস্থান ত্যাগ করিয়াও লোকে অন্যত্র পলায়ন করিতে থাকে; এইজন্য যতদূর বিপ্লব বিস্তৃত হইয়াছিল, তাহারও উত্তরে অনেকদূর পর্য্যন্ত লোকের বাস উঠিয়াছিল। তাহার নিকটে যাহারা বাস করিত, তাহাদিগকে সবলে হিংস্র জন্তুর সহিত যুদ্ধ করিয়া আত্মরক্ষা করিতে হইত। এজন্য অধিবাসী যাহারা ছিল, তাহাদিগকে সাহসী ও সবল হইতে হইয়াছিল।

শুধু হিংস্র জন্তুর উৎপাত নহে, দেশে তখন উৎপাত অনেক। প্রধান উৎপাত অরাজকতা। হিন্দুরাজত্ব গিয়াছে, মুসলমান রাজত্ব প্রকৃতভাবে আরদ্ধ হয় নাই, এই সন্ধিযুগে দেশে রাজা নাই বলিলেও চলে, অথবা দেশের রাজা একজন নহে, যে যেখানে পারে, দশজনে রাজত্ব করিতেছিল, তাহাও বলা যাইতে পারে।[১] পশ্চিমে, গৌড়ে পাঠানগণ রাজপাট বসাইয়াছিলেন, পূৰ্ব্বভাগে, রামপালে সেনরাজগণ তখন বঙ্গে কর্ণধার; মধ্যে, সমতট অঞ্চলে ভীষণ অরাজকতা বিরাজ করিতেছিল। গৌড়মণ্ডলে পাঠানেরা তখনও ভাল ভাবে আত্মপ্রতিষ্ঠা করিতে পারেন নাই, বিশেষতঃ সেনরাজগণের বিক্রমে তাহাদের পূর্ব্বমুখী গতি রুদ্ধ হওয়ায়, তাহারা স্বচ্ছন্দে রাজ্যবিস্তার করিবার মত নিরাপদ হইতে পারেন নাই। পূর্ব্বদিকে সেনগণ মুসলমান শক্তিকে প্রতিহত করিলেও তাহাদিগকে দেশান্তরিত করিবার মত শক্তিশালী ছিলেন না; এজন্য তাঁহারাও পশ্চিমদিকে অগ্রসর হইয়া অজানিত শত্রুর মুখে পড়িবার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। সুতরাং সমতট শাসন করে কে? যশোহর-খুলনার যে অংশে বিপ্লবের পর হিন্দুবৌদ্ধ প্রজা বাস করিতেছিল, তাহারা দস্যু-দুর্বৃত্তের উৎপাতে মহাবিভ্রাটে পড়িয়াছিল।

গৌড় অধিকার করিয়াই পাঠানেরা বঙ্গের রাজা হন নাই। তাঁহাদিগের বঙ্গ অধিকার করিতে অনেক দিন লাগিয়াছিল। পাঠান আমলে সমগ্র বঙ্গদেশ কখনও তাঁহাদের সম্পূর্ণ অধিকারে আসিয়াছিল কিনা ঘোর সন্দেহ। মহম্মদ খিলিজীর পরবর্ত্তী পাঠান রাজারা সর্ব্বদা দেশীয় জমিদার ও প্রজার সহিত অধিকার লইয়া ব্যস্ত ছিলেন। তাহাতে আবার দিল্লীর সম্রাটকে সন্তুষ্ট রাখিতে হইত। মহম্মদ-ই-বক্তিয়ার যখন মগধে আসিয়াছিলেন, তখন লর্ড ক্লাইবের মত তাঁহাকে কেহ চিনিত না, মানিত না। পরে তিনি বঙ্গ অধিকার করিয়া যখন দিল্লীশ্বর কুতব উদ্দীনকে সংবাদ দিয়াছিলেন, তখনই তাঁহার পরিচয় হয়। তিনি কুতবের নির্দেশমত বঙ্গবিজয় করিয়াছিলেন, ইহার বিশেষ কোন প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তিনি শত্রুর দেশে আত্মপ্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য দিল্লীশ্বরের সহায়তার প্রত্যাশায় তাঁহার অধীনতা ঘোষণা করেন। তখন হইতে বঙ্গদেশ দিল্লীর সহিত রাজনৈতিক সম্পর্কযুক্ত হয়। নতুবা তখন আর্য্যাবর্তে দিল্লীর মত বহুস্থান ছিল, বঙ্গদেশকে বিশেষভাবে দিল্লীর ছন্দানুবর্ত্তী হইবার বিশেষ কোন কারণ ছিল না। এই দিল্লীর অধীনতার ফলে বঙ্গদেশে ভীষণ রাজত্ব-বিভ্ৰাট হইয়াছিল।

দুই চারি বৎসর রাজত্ব করিতে করিতে কোন পাঠান রাজা হঠাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে বা গুপ্তশত্রুর অসির আঘাতে দেহত্যাগ করিলে, সিংহাসন লইয়া মারামারি কাটাকাটি হইত। দিল্লী হইতে নিৰ্ব্বাচিত হইতেন একজন, স্থানীয় পাঠানেরা নির্ব্বাচন করিতেন আর একজন, হয়ত বীরবিক্রমে এক তৃতীয় ব্যক্তি উভয়ের গণ্ডে চপেটাঘাত করিয়া রাজগদি কাড়িয়া লইতেন। মহম্মদ-ই-বক্তিয়ার হইতে আরম্ভ করিয়া এই ব্যাপার বহুদিন চলিয়াছিল। পাঠকগণ প্রয়োজন বোধ করিলে বাঙ্গালার ইতিহাসে সে দীর্ঘ রাজতালিকা পাঠ করিতে পারেন। আমাদের তাহার বিশেষ কিছু প্রয়োজন নাই, কারণ গৌড়ে কে রাজা হন বা না হন, যশোহর-খুলনায় তাহার খবর পৌঁছিত না। সেখানে রাজা ছিলেন দুই চারিজন ভূমিভিদ ভূধ্যধিকারী। ইতিহাসে তাঁহাদের কথা নাই।

পাঠানেরা ছিলেন নবাগত পরদেশীয়। তাঁহারা তখনও বঙ্গদেশকে আপন দেশ বলিয়া মানিয়া লন নাই। পরবর্ত্তী যুগে যেমন তাঁহারা হিন্দুর সহিত মিলিয়া মিশিয়া ধৰ্ম্মপ্রবৃত্তি বা জন- হিতৈষণার বিনিময়ে শান্তিসুখ লাভ করিতেন বা শিল্প-সুষমায় বঙ্গভূমিকে শোভাময়ী করিয়াছিলেন, সেদিন এখনও আসে নাই। পরের দেশে আসিয়া এখন প্রথম কার্য্য আত্মরক্ষা এবং তৎপরে অর্থ সংগ্রহ বা রাজ্যবিস্তারের নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা। তাহাতে আবার প্রতিবন্ধক পদে পদে। যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া, পূর্ব্বতন রাজাকে রাজ্যভ্রষ্ট করিয়াও রাজ্য জয় হয় নাই। প্রজায় মানে না, পাঠান সেনানীকে যেখানে সেখানে বিড়ম্বিত করে, উদ্রিক্ত হইয়া সবলে আক্রমণ করিতে আসিলে, প্রজারা ঘরবাড়ী ছাড়িয়া পলায়; প্রাণ দেয়, তবুও ধৰ্ম্ম দিতে চায় না; অর্থভাণ্ডার মাটীর তলে পুতিয়া বা জলাশয়ে নিক্ষেপ করিয়া যায়, তবু তদ্বারা নবাগত শাসকের সম্মান রক্ষা করে না। এ বড় বিষম দায়। দেশ জয় করিয়াও যদি দেশের রাজস্ব করগত না হয়, তাহাতে ভীষণ বিরক্তি ও অন্ধতা আসে। পাঠানদিগেরও তাহাই আসিয়াছিল।

অন্য ধর্ম্মাবলম্বীর পক্ষে স্বর্গের রাস্তা বন্ধ, ইহাই ইসলাম বা খৃষ্টধর্ম্মের মূল সূত্র। যাঁহারা খাঁটি মুসলমান বা খৃষ্টান তাঁহারা দৃঢ়রূপে এ মতে বিশ্বাসবান্। সুতরাং অন্য কোন কারণে না হউক, পরহিতরতির জন্য স্বকীয় ধর্ম্মমত প্রচার করা তাঁহারা কর্তব্য মনে করেন। মুসলমানদিগের মধ্যে যে- কোন উপায়ে এই কর্তব্য পালন করার প্রথা চলিয়া আসিতেছিল এবং তাহা হইতেই অসির সাহায্যে ধর্ম্মমত প্রচারের কথা উঠিয়াছে, এ কথা তাহাদের শাস্ত্রাদেশ নহে। তবু অন্য দেশে সেভাবে ধৰ্ম্মমত প্রচারিত হউক বা না হউক, পাঠান-আমলে বঙ্গদেশে যে হইয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই। কারণ এখানে উপায়ান্তর ছিল না। হিন্দুর মত স্থিতিশীল বা পরিবর্তনের বিরোধী জাতি জগতে নাই। সে জাতির দর্শনশাস্ত্র এত উন্নত যে, কথার বশে তাহাদিগকে বশীভূত করা একেবারে অসম্ভব। অথচ তাহাদের ধর্ম্মাচার মুসলমান হইতে এত ভিন্ন, এত বিরুদ্ধ যে, হিন্দুরা আচারে ব্যবহারে হিন্দু থাকিলে, তাহাদিগের নিকট হইতে পাঠানেরা কোন প্রকার সহানুভূতি প্রত্যাশা করিতে পারিতেন না।

সুতরাং হিন্দু বৌদ্ধকে মুসলমান করিয়া লওয়াও ধর্ম্ম বা রাজনীতি সব দিক হইতেই পাঠানের সাধনা হইয়াছিল। ইহার জন্য তাহারা অনেক স্থলে হিন্দু বৌদ্ধের উপর অমানুষিক অত্যাচার করিয়াছিলেন। ফলে এই দাঁড়াইয়াছিল যে, এদেশের বহুসংখ্যক লোক মুসলমান-ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তজ্জন্যই আজ দেখিতে পাই, বঙ্গের অনেক স্থানে হিন্দু অপেক্ষা মুসলমান অধিবাসীর সংখ্যা অধিক। ইহারা সকলেই পরদেশাগত মুসলমানের বংশধর নহেন, প্রত্যুত ইহার অধিকাংশ হিন্দু সমাজের নানা স্তর হইতে ধর্মান্তরিত। বল প্রয়োগ না করিলে লোকে ধর্মান্তর গ্রহণ করিত কি না, তাহা খৃষ্টীয় ধর্ম্মের প্রচার-প্রতিপত্তি হইতে বুঝা যাইতেছে। দেড়শত বর্ষের চেষ্টার ফলে এখনও খৃষ্টানের সংখ্যা মুষ্টিমেয় রহিয়াছে বলা যায়। খৃষ্টানের সংখ্যা বৃদ্ধি না হইলেও এতদ্বারা ধর্ম্মবিষয়ে শান্তিপ্রিয় খৃষ্টীয় শাসনের সহৃদয়তার মহিমা ঘোষণা করিতেছে।

ধর্ম্মপ্রচারের কথা ছাড়িয়া দিলেও অন্য কারণেও তখন বল-প্রয়োগের আবশ্যক হইয়াছিল। অত্যাচার না করিলে অর্থাগম বা রাজ্য বিস্তারের কোন সম্ভাবনা ছিল না। সুতরাং দেশে অত্যাচারের স্রোত প্রবাহিত হইয়াছিল। এই অত্যাচারের ফল হিন্দু অপেক্ষা বৌদ্ধগণ অধিক ভোগ করিতেন। বৌদ্ধদিগের উপর এই অত্যাচার সেনরাজত্বের সময় হইতে চলিয়া আসিতেছিল। কিন্তু সেনরাজগণ সামাজিক শাসন বা অন্যবিধ গুপ্ত কৌশলে বৌদ্ধদিগের প্রতিপত্তি খর্ব্ব করা ব্যতীত দেববিগ্রহ বা মন্দিরাদি ভাঙ্গিয়া বৌদ্ধদিগকে উৎসন্ন করিতে পারিতেন না। বহুপূর্ব্বে বুদ্ধদেব হিন্দুদের দশাবতারের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিলেন; সুতরাং বৌদ্ধদিগের প্রতি বিদ্বেষ থাকিলেও বুদ্ধমূৰ্ত্তি বা বৌদ্ধনীতির প্রতি তাঁহাদের বিদ্বেষ ছিল না, পরন্তু বুদ্ধমূর্তি দেখিলে হিন্দুরা সকলেই প্রণাম করিতেন। সেনরাজগণ সময়ে সময়ে একটা কৌশল অবলম্বন করিয়া বৌদ্ধদিগকে নির্যাতন করিতেন। শ্রমণ ও ব্রাহ্মণে চিরকাল বিরোধ ছিল; সেনরাজগণ কোন বৌদ্ধমঠের সন্নিকটবর্ত্তী স্থান ব্রাহ্মণকে দান করিতেন। ব্রাহ্মণগণ পূৰ্ব্বানুগত আন্তরিক বিদ্বেষবশতঃ অল্পে অল্পে মঠের জমি করায়ত্ত করিয়া লইতেন; বৌদ্ধেরা সাধারণতঃ বিবাদপ্রিয় ছিলেন না; বিবাদ হইলেও তাহাতে কায়স্থের সাহায্যে ব্রাহ্মণেরাই জয়লাভ করিতেন।

পাঠান বিজয়ের পর মুসলমান কর্তৃকই এইরূপ অত্যাচার অধিক হইতেছিল। মূৰ্ত্তিমাত্রেই ইসলামের বিরাগের কারণ হইত। তাহাতে আবার দেশময় বৌদ্ধমূর্তি। অহিংসাধর্মী বৌদ্ধেরা কিছু নিরীহ; তাঁহারা কোন মঠ বা সংঘারামে একত্র অধিক সংখ্যাতে বাস করিতেন। বিহারসমূহে বহু অর্থ সঞ্চিত থাকিত, ইহা মগধবিজয়ী পাঠানের জানা ছিল। সুতরাং একটি বিহার আক্রমণ করিলে যেমন অপরিমিত অর্থ পাওয়া যাইত, তেমনই এক সময়ে অসংখ্য লোককে মুসলমান ধৰ্ম্ম গ্রহণে বাধ্য করা যাইত। এইরূপ একটি বিহার ধ্বংসের কথা ঐতিহাসিক মীনহাজ স্পষ্ট ভাষায় লিখিয়া গিয়াছেন। বঙ্গে আগমনের পূর্ব্ববৎসর মহম্মদ খিলিজী মগধে ওদন্তপুরী নামক স্থানে বহুদূর বিস্তৃত প্রাচীর ও পরিখা-পরিবেষ্টিত প্রাসাদমালা দেখিয়া উহাকে রাজধানী কল্পনা করিয়া আক্রমণ করেন। সে প্রাসাদের অধিবাসিগণ দ্বার বদ্ধ করিয়া কিছুকাল আত্মরক্ষা করে। কিন্তু পাঠান বীরের নিকট অব্যাহতি পাইল না। মহম্মদ বক্তিয়ার পশ্চাদ্ভাগ হইতে বীরবিক্রমে প্রবেশ করিয়া অল্প সময়ে অসংখ্য লোকের হত্যাসাধন করিয়া অপরিমিত ধন-রত্ন লুণ্ঠন করিলেন। সে স্থানের অধিবাসীর অধিকাংশই মুণ্ডিতশীর্ষ ব্রাহ্মণ এবং তাহারা সকলেই নিহত হইয়াছিল। সেখানে রাশি রাশি পুস্তক ছিল; সে সকল পুস্তক কি বিষয়ক তাহা জানিবার জন্য ব্রাহ্মণদিগের সন্ধান করা হইল, কিন্তু সে হতভাগ্যদিগের প্রায় সবই মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল। অবশেষে মুসলমান বিজেতা জানিয়া বিস্মিত হইলেন যে, সেই দুর্গ বা নগরী কোন রাজধানী নহে, তাহা একটি বিরাট বিদ্যামন্দির বা বৌদ্ধবিহার।[২] ইহাই মুসলমান ঐতিহাসিকের নিজের কথা। এই ত মাত্র একটি বিহারের কথা, পাঠানেরা এমন যে কত বৌদ্ধ মঠ ও সংঘারামের ধ্বংস সাধন করিয়াছিলেন, তাহার সংখ্যা নাই। যাহারা ব্রাহ্মণ ও রাজসৈন্য প্রভেদ বুঝিতে পারেন না, বিদ্যামন্দিরকে রাজপ্রাসাদ বলিয়া ভুল করেন, অগ্রে রক্তস্রোত বহাইয়া পরে পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন, তাঁহারা ধর্মপ্লাবিত মগধ-বঙ্গে আসিয়া কত স্থানে কত যে অত্যাচার করিয়াছিলেন, তাহা বলিবার নহে। এই অত্যাচার যে ঐতিহাসিক সত্য, তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে ইহা পাঠানদিগের নূতন নহে। রাজ্যজিগীষু জাতি মাত্রেই পররাজ্যের উপর এরূপ অত্যাচার করিয়াছেন। প্রত্যেক দেশের ইতিহাসে সে অত্যাচার কাহিনী আছে। হিন্দু-বৌদ্ধে, শাক্ত-বৈষ্ণবে বিবাদসূত্রেও অত্যাচার কম হয় নাই। কিন্তু এক্ষণে ‘গতস্যানুশোচনা নাস্তি’।

যতদিন পর্য্যন্ত পাঠানগণ অস্থিরভাবে কেবলমাত্র অর্থের সন্ধানে ব্যাপৃত ছিলেন, বঙ্গদেশে বাসস্থান স্থির করেন নাই, ততদিন এইভাবে অত্যাচার চলিয়াছিল। অত্যাচারের ভয়ে হিন্দুগণ পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়া জঙ্গলাকীর্ণ সমতটে বা হিন্দুশাসিত নদীবহুল পূর্ব্ববঙ্গে পলায়ন করিতে লাগিলেন। বৌদ্ধেরা মঠ ছাড়িয়া পলাইতেন না, মঠগুলি অনেক সময়ে প্রাচীন রাজধানীর নিকটে অবস্থিত ছিল, এজন্য বৌদ্ধদিগের উপর মুসলমানের অত্যাচার অধিক হইয়াছিল। কতক নিহত হইত, কতক সৰ্ব্বস্বান্ত হইয়া মুসলমান ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিত। আর আর যে সকল নিম্নশ্রেণীর জাতির দূরদেশে যাইবার সংস্থান ছিল না, তাঁহারাও মুসলমান হইতেন, মুসলমানী কথা কহিতেন, মুসলমানী সাজে সাজিতেন, কিন্তু ধর্ম্মের বিশেষ ধার ধারিতেন না। পূৰ্ব্বেও যেভাবে অন্নসংস্থান করিতেন, পরেও তাহাই করিতে লাগিলেন। বৌদ্ধেরা যে সকলেই মঠে বাস করিতেন, সংসারধর্ম্মত্যাগী ছিলেন, তাহা নহে। অনেক গৃহস্থ বৌদ্ধ বুদ্ধ-প্রচারিত সারনীতির মর্ম্ম জানিতেন না, তাঁহারা বিকৃত মতের পক্ষপাতী হইয়া সদ্ধর্ম্ম ত্যাগ করিয়া ধর্ম্মের পূজা করিতেন। এই ধর্ম্মপূজক বৌদ্ধগণ পাঠানের হস্তে এমনভাবে নির্যাতন ভোগ করিতেছিলেন যে, অবশেষে তাঁহারা প্রাণের দায়ে পাঠানের পক্ষাবলম্বন করিয়া তাঁহাদের যশোগান করিতেন। এমন কি তাঁহারা নবাগত মুসলমানকে ধর্ম্মাবতার বলিয়া গ্রহণ করিতেও কুণ্ঠিত হন নাই। রামাই পণ্ডিত-কৃত শূন্য- পুরাণের শেষভাগে নিরঞ্জনের উষ্মা’ নামক যে একটি ক্ষুদ্র অধ্যায় সম্ভবতঃ পরবর্ত্তী সময়ে প্ৰক্ষিপ্ত হইয়াছিল, উহাতে এই বিষয়ের একটি সুন্দর বর্ণনা আছে :

‘ধৰ্ম্ম হৈল্যা জবনরূপি, মাথায়েতে কাল টুপি, হাতে শোভে ত্রিরুচ কামান।
চাপিআ উত্তম হয়, ত্রিভুবনে লাগে ভয়, খোদায় বলিয়া এক নাম।।
নিরঞ্জন নিরাকার, হৈলা ভেস্ত অবতার, মুখেত বলেত দম্বদার।
যতেক দেবতাগণ, সবে হয়্যা একমন, আনন্দেতে পরিল ইজার।।
ব্রহ্মা হইল মহামদ, বিষ্ণু হৈলা পেকাম্বর, আদম্ফ হৈল সুলপানি।
গণেশ হইল গাজী, কার্ত্তিক হৈল কাজি, ফকির হৈলা যত মুনি॥’[৩]

লোকে কথায় বলে ‘শক্তকে সবাই ভক্ত’, এখানে ধর্ম্মভক্তদিগের অবস্থাও তাহাই দাঁড়াইয়াছিল। পাঠানেরা ‘জোর যার, মুল্লুক তার’ এই নীতি ঘোষণা করিয়া বাষ্পসিক্ত বঙ্গের অধিবাসীদিগকে অশ্রুসিক্ত করিয়া তুলিয়াছিলেন। দেশীয় লোকেরা জাতি, প্রাণ ও অধিকার রক্ষার জন্য সর্ব্বদা এরূপ চেষ্টা করিতেন, সর্ব্বদা একস্থান হইতে অন্যত্র পলায়নের জন্য এরূপভাবে প্রস্তুত থাকিতেন যে, তাঁহারা এ যুগে কোন মৌলিক চিন্তা বা বিদ্যাচর্চ্চা করেন নাই, কোন ইতিবৃত্ত, গোষ্ঠীকথা বা বংশকারিকাদির রচনা করেন নাই; এমন কি, এ যুগে বৌদ্ধগণ কোন পুস্তক রচনা ত দূরের কথা, কোন প্রাচীন পুঁথি হাতে লিখিয়া নকল করিতেও পারিতেন না। এ পর্যন্ত এ যুগে মাত্র তিনখানি পুঁথি নকল করা হইয়াছিল, দেখা গিয়াছে। সে তিনখানিই বৌদ্ধ পুঁথি এবং উহা তিন জন কায়স্থে নকল করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে বঙ্গাধিকারী হরিনারায়ণ মিত্র যে পুঁথিখানি নকল করেন, তাহার নাম, ‘সভাতরঙ্গিণী’। বিদ্যাচর্চ্চাদির যখন এই দশা, তখন সে যুগের ইতিহাস কেন পাওয়া যায় না, তাহা বলাই বাহুল্য! এই জন্যই এ যুগকে তামস-যুগ বলিয়াছি।

এই যুগে কিছুদিন পৰ্য্যন্ত যশোহর-খুলনায় পূর্ব্ববঙ্গের সেনরাজগণের শাসন চলিয়াছিল। প্রথম প্রথম তাঁহারা পূর্ব্ববঙ্গ হইতে কর সংগ্রহ করিতেন। কিন্তু কেহ বিদ্রোহী হইলে, তাহা দমন করিবার সাধ্য ছিল না; কারণ বিদ্রোহিগণ আবশ্যক হইলে পশ্চিমবঙ্গের পাঠান শাসকের শরণাপন্ন হইয়া আত্মরক্ষা করিত ও এককালীন কিছু অর্থাদি উপঢৌকন দিয়া দেশের মধ্যে নিজের স্বাধীনতা কিনিয়া লইত। এইরূপে বর্ত্তমান যশোহরের উত্তরাংশে মাগুরা ও ঝিনাইদহ মহকুমার অন্তর্গত প্রদেশে সে সময়ে কতকগুলি ক্ষুদ্র জমিদারের আবির্ভাব হইয়াছিল। এই সময় হইতে শৈলকূপার উন্নতি আরব্ধ হয়। হিন্দুর মধ্যে অনেক আত্মকলহ পাঠানের রাজ্যবিস্তারের পথ পরিষ্কার করিয়া দিয়াছিল।

এইভাবে ২০/২২ জন পাঠান নৃপতি দিল্লীর অধীন থাকিয়া ১৪০ বৎসর যাবৎ বঙ্গদেশ শাসন করেন। তন্মধ্যে শতাধিক বৎসর কাল পূর্ব্ববঙ্গ তাঁহাদের করায়ত্ত হয় নাই। ফিরোজ শাহের সময় পূৰ্ব্ববঙ্গ অধিকৃত হইয়াছিল। ১৩৩৯ খৃষ্টাব্দে ফকরউদ্দীন পূর্ব্ববঙ্গে এবং সাসুদ্দীন ইলিয়াস্ পশ্চিমবঙ্গে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ইলিয়াস্ পরে সমগ্র বঙ্গের স্বাধীন পাঠান নৃপতি হন। এই সময় হইতে বঙ্গদেশ বাঙ্গালা নামে আখ্যাত হয়। ইলিয়াস্ সবল হস্তে দেশ শাসন করিতেন। তাঁহার মৃত্যুর পর অল্পকালমধ্যে দেশে নানা অরাজকতা উপস্থিত হয়। এই সময় দেশীয় জমিদারেরা প্রাধান্য লাভ করেন। গণেশ পূর্ব্বে উত্তরবঙ্গে ভাতুড়িয়া পরগণার জমিদার ছিলেন। তিনি গৌড়াধিপকে নিহত করিয়া রাজা হন। তিনি, তাঁহার পুত্র ও পৌত্র প্রায় ৪০ বৎসর কাল রাজত্ব করেন। এ সময়ে হিন্দু বা দেশীয়দিগের উপর অত্যাচার হয় নাই; যথেষ্ট বৃত্তি পাইয়া ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতগণ পুনরায় শাস্ত্রচর্চ্চাদি আরম্ভ করেন। এই সময়ে যশোহর-খুলনায় রীতিমত বসতি স্থাপন ও সমাজ বন্ধন আরম্ভ হইয়াছিল। আমরা এক্ষণে তাহারই কথা বলিব।

পাদটীকা :

১. [পরবর্ত্তীকালে ডোম্মনপালের সুন্দরবন তাম্রশাসন আবিষ্কারে এই ছোট ছোট রাজার একজনের নাম পাওয়া শ্রী- গিয়াছে (Indian Hist. Quarterly, Vol. X, P. 321)। এই নামোদ্ধারে কিছু মতভেদ ছিল। প্ৰথমে পড়া হয়, মডোম্মনপাল’। ঐতিহাসিক দীনেশচন্দ্র সরকার ও রমেশ চন্দ্র মজুমদার একমত হইয়া বলেন, ইহা শ্রীম (দ)- ডোম্মনপাল হইবে। এই তাম্রশাসন হইতে জানা যায়, ইনি অযোধ্যার পাল বংশোদ্ভূত। তথা হইতে আসিয়া ‘পূৰ্ব্ব-খাটিকা।’ (খাড়ী অঞ্চল, সুন্দরবন) ‘উপার্জিত’ করেন। কিভাবে ‘উপার্জ্জিত’ হয়, তাহা অবশ্য জানা যায় না। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, ডোম্মনপাল স্বাধীন ভাবেই শাসন করিতেছিলেন। ডোম্মনপাল শৈব ছিলেন; কিন্তু ‘ভগবান নারায়ণকেও’ শ্রদ্ধা জানাইতে কুণ্ঠিত ছিলেন না। এই তাম্রশাসনের তারিখ, ১১১৮ শক বা ১১৯৬ খৃষ্টাব্দ। ইহা ভিন্ন আরও দুইটি কারণে এই তাম্রশাসন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমতঃ, ইহাতে ভূদান ক্ৰিয়া রাজপুরুষ হিসাবে যাঁহাদের বিজ্ঞাপিত হইতেছে, তাঁহাদের মধ্যে ‘রাজ্ঞী’ বা মহিষীর উল্লেখ আছে। পালবংশের একটি লিপিতেও এরূপ স্থলে ‘রাজ্ঞীর’ কোথাও উল্লেখ নাই। দ্বিতীয়তঃ, এলোরায় যে রেখা নির্ভর চিত্র- পরিকল্পনার সূত্রপাত হয়, তাহার এক পূর্ণপরিণতি রূপ ডোম্মনপালের পট্টোলীর পশ্চাদপটে উৎকীর্ণ আছে।—দ্রষ্টব্য, নীহাররঞ্জন রায়, ‘বাঙালীর ইতিহাস’, এবং History of Bengal, Dacca Univ. Vol. 1 –শি মি]

২. Raverty’s Tabaqat-i-Nasiri. p. 552; এই পুস্তকের ২৪৫ পৃ দ্রষ্টব্য।

৩. সাহিত্যপরিষদ্ হইতে প্রকাশিত ‘শূন্য-পুরাণ’, ১৪১ পৃ।

৪. ‘Raja Kans from the testimony of coins appears to have reigned from 810 to 817 A. H. or 1407 to 1414 A. D., but he appears to have actually usurped the Government earlier in 808 A. H.’ Reaazu- s-Salatin, ed. by M. A. Salam. P. 113. note.

লাউড়িয়া কৃষ্ণদাসের ‘বাল্য-লীলা সূত্রে’ রাজা গণেশের রাজ্যারোহণকাল স্পষ্ট ভাবে আছে :

‘গ্রহপক্ষাক্ষিশশধুতিমিতে শাকে সুবুদ্ধিমান্।
গণেশো যবনং জিহ্বা গৌড়েকচ্ছত্রধৃগভূ॥’

অর্থাৎ ১৩২৯ শকে বা ১৪০৭ খৃঃ অব্দে গণেশ রাজা হন। [ডাঃ নলিনীকান্ত ভট্টশালী দেখাইতে চাহিয়াছেন যে, এই রাজা গণেশই সিংহাসন দখল করিবার পর ‘দনুজমর্দন দেব’ উপাধি ধারণ করেন। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার এই মতই সমর্থন করেন।—এই পুস্তকের ‘দনুজমর্দন দেব’ পরিচ্ছেদের পাদটীকা দ্রষ্টব্য–শি মি]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *