১. কিকিরা ফ্লুট বাজাচ্ছেন

০১.

তারাপদ এসে দেখল, কিকিরা বসে বসে ফ্লুট বাজাচ্ছেন। দেখে অবাক হয়ে গেল। যাত্রাদলের বাজনদারদের মতন চোখ বুজে মাথা দুলিয়ে-দুলিয়ে ফ্লুট বাজানোর শখ যে কেন চাপল কিকিরার কে জানে। হাসিও পাচ্ছিল তারাপদর। কিকিরার ওই ছাতিতে কী ফ্লুট বাজে। প্যাঁ-পোঁ অদ্ভুত খাপছাড়া সং ছাড়া আর কিছুই আওয়াজ বেরোচ্ছিল না ফ্লুট থেকে। অথচ কিকিরার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন মেডেল-পাওয়া ফ্লুটমাস্টার।

তারাপদ হেসে ফেলে ডাকল, “স্যার?”

সাড়া দিলেন না কিকিরা, তারাপদকে দেখলেন মাত্র।

 তারাপদ খুব বিনীতভাবে বার-তিনেক ‘স্যার স্যার’ করল।

কিকিরা মুখের সামনে থেকে বাদ্যযন্ত্রটি সরালেন শেষ পর্যন্ত। বললেন, “এসো।” বলে দম নিতে লাগলেন।

তারাপদ বলল,”স্যার, এটা কী বাজাচ্ছিলেন?”

“ক্ল্যারিনেট। তোমরা বলো, ক্ল্যারিওনেট।”

“ফ্লুট নয়?”।

“গোলাপও চেনো না, গাঁদাও চেনো না। যা তোমার মুখে আসে বলে যাচ্ছ।” বলে বাদ্যটি কোলের ওপর রাখলেন। “ফু-লু-ট। ঘা, ও ভদ্রলোকে বাজায়।”

তারাপদ হাত জোড় করে হাসতে হাসতে বলল, “সত্যিই স্যার, কোনোটাই চিনি না। তা আপনি হঠাৎ প্যাঁ-পোঁ শুরু করলেন কেন? যাত্রাদল খুলবেন নাকি।”

কিকিরা মুখ-চোখের অদ্ভুত এক ভঙ্গি করে বললেন, “আমি কিকিরা দি গ্রেট, আমি খুলব যাত্রার দল। বলছ কী?”

তারাপদ হাসির তোড়েই বলল, “আপনি কিকিরা দি ওয়ান্ডার… : গ্রেট ম্যাজিশিয়ান। কখন কী মতি হয় আপনার কে জানে।”

কিকিরা এবার খানিকটা খুশি-খুশি মুখ করে বললেন, “ব্যাপারটা কী জানো তারাপদ। এই জিনিসটি আমি নটবর কর্মকারের কাছ থেকে কালই কিনেছি। চোর-বাজারের নটবর। বেটা নিজেও পয়লা নম্বর থিফ। আমায় বলল, অ্যালফ্রেড থিয়েটারের শশী শীল এই ক্ল্যারিওনেটটি বাজাতেন। গায়ে নাম লেখা আছে এস এস।”

“শশী শীল কে?”

“তোমাদের নিয়ে জ্বালা। কিস্যু জানো না। শশীবাবু ছিলেন পয়লা নম্বর ক্ল্যারিওনেট হ্যান্ড। মাস্টার লোক। পিয়ানোয় দু’কড়ি, বেহালায় ছোটু বড়াল আর ক্ল্যারিওনেটে শশী শীল–এরা ছিলেন থ্রি মাস্টারস। লোকে বলত, থ্রি মাসকেটিয়ারস। সেকালের থিয়েটারপাড়া কাঁপিয়ে রাখতেন ওঁরা। তিনজনেই মারা যান ভিখিরির মতন। ছেলেপুলেগুলো যে যা পেরেছে বাপ-ঠাকুরদার জিনিস বেচে দিয়েছে।”

তারাপদ বলল, “ও! ব্যাপারটা এতক্ষণে বুঝলাম। শশীর ছেলে কাশী বাপের জিনিস চোরা বাজারে ঝেড়ে দিয়েছিল কবে, সেই জিনিসটি আপনি কিনেছেন। এই তো?”

কিকিরা বললেন, “শশীর ছেলে, কাশী না ঋষি–আমি জানি না বাপু। জিনিসটা নটবরের কাছে এসেছিল, কিনে নিলাম। কত মূল্যবান জিনিস বলো?”

তারাপদ মাথা নাড়ল। কিকিরা যা কিনে এনে জড়ো করেন, সবই যে মহামূল্যবান–এটা স্বীকার করে নেওয়াই ভাল। পাথুরেঘাটার কোন যদু মল্লিক যে কলকেটিতে দম মেরে নিয়ে টপ্পা গাইতেন, সেই বাঁধানো কলকেটিও যে অতি মূল্যবান–কিকিরার কাছে তাও স্বীকার করে নিতে হবে। নয়ত বিপদ।

কিকিরা এবার উঠলেন, “জল খেয়ে আসি বোসো। চায়ের কথা বলে দিই বগলাকে। কী খাবে চায়ের সঙ্গে। বার্মিজ ওমলেট খাও। চট করে হয়ে যাবে।”

তারাপদ মুখ টিপে হাসল, বলল, “যা হোক হলেই হল। আপনার এখানে এত রকম খাবার খেয়েছি যে, চাঁদু বলে কুকিং-এর ব্যাপারেও আপনি অরিজিনাল…।“

“কোথায় সেই স্যান্ডেল উড?”

“পরে বলছি, আপনি জল খেয়ে আসুন।”

 কিকিরা আর দাঁড়ালেন না। ঘর ছেড়ে চলে গেলেন।

কিকিরা চলে যাবার পর তারাপদ অন্যমনস্কভাবে ঘরের চারদিক দেখতে লাগল। মানুষটির সঙ্গে এই ঘরটির অদ্ভুত মিল। বিচিত্র ছাঁটের, আর বেয়াড়া রংচং-অলা এক আলখাল্লা-পরা কিকিরাকে বাড়িতে যেমনটি দেখায় এই ঘরটিও সেইরকম অদ্ভুত দর্শন। এ-ঘরে কী নেই? কিকিরার সিংহাসন-মাক চেয়ার ছাড়াও যত্রতত্র বিচিত্র সব জিনিস ছড়ানো। পুরনো দেওয়ালঘড়ি, চিনে মাটির জার, বড় বড় পুতুল, কালো ভুতুড়ে আলখাল্লা, চোঙাঅলা সেকেলে গ্রামোফোন, ম্যাজিকঅলার আই বল, ফিতে জড়ানো ধনুক, পাদরিসাহেবের টুপি, ম্যাজিক ছাতা আর তলোয়ার, পায়রা-ওড়ানো বাক্স, টিনের চোঙ-কোনটা নয়! তার সঙ্গে এক-দু’মাস অন্তর জমানো ম্যাজিক-মশাল, গাঁজার কলকে, বাহারি মোমদান-এ-সব তো জমেই যাচ্ছে দিনের পর দিন। চন্দন ঠাট্টা করে। বলে, “কিকিরা আপনার এই মিউজিয়ামটির নাম দিন “ছানাবড়া ঘর, সত্যিই এই দৃশ্য দেখলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়।”

কিকিরা ফিরে এলেন। আজ তাঁর পরনে হাফ-আলখাল্লা, মানে জামার হাত দুটো কনুই পর্যন্ত লম্বা, কোমরের ঝুল হাটুতক, জামার-রং নীল। মাথায় টুপি। নেই। রুক্ষ বড় বড় চুল ঘাড় পর্যন্ত ছড়ানো। লম্বা নাক, বসা গাল, সরু থুতনি আর বোগা হাড়জিরজিরে কিকিরার চেহারার মধ্যে কিন্তু কী-যেন একটা আকর্ষণ আছে। উনি মজাদার মানুষ এটা বোঝা যায়, আবার নজর করলে ওঁর ভালমানুষি স্বভাবটাও ধরা পড়ে। তারাপদরা অবশ্য জানে, কিকিরার বুদ্ধির ধারেকাছেও তারা পৌঁছতে পারবে না।

কিকিরা নিজের জায়গায় বসতে বসতে বললেন, “স্যান্ডেল উডের খবর কী যেন বললে?”

“চাঁদু হসপিটালে ডিউটি দিচ্ছে।”

“ওর এমনি খবর ভাল?”

“হ্যাঁ। তবে বলছিল, এবার না- ট্রান্সফার করে দেয়। কোনো গাঁ-গ্রামে পাঠিয়ে দেবে।“

“আগে দিক। তোমার খবর কী?”

“এমনিতে ভাল। তবে আপনার কাছে একটা খবর নিয়ে এসেছি।”

“কী খবর?”

তারাপদ পকেট থেকে কিছু-একটা বার করতে করতে বলল, “দেখাচ্ছি। আপনাকে। তার আগে গৌরচন্দ্রিকাটা সেরে নিই।”

“বলো?”

“আমাদের অফিসে জগন্নাথ দত্ত বলে একজন আছে। আমার চেয়ে বয়েসে খানিকটা বড়। আমরা বলি জগুদা। জগুদারা থাকে বিডন পার্কের দিকে। মানে সেকেলে পুরনো কলকাতা পাড়ার এক গলিতে। পৈতৃক বাড়ি। সাত শরিক। জগুদা মানুষটি খুব ভাল। মাটির মানুষ। কিন্তু জগুদার কতক রোগ আছে অদ্ভুত। কাছে গিয়ে আচমকা গায়ে হাত দিলে বা জোরে ডাকলে ভূত দেখার মতন চমকে ওঠে, সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়, কেমন তোতলাতে শুরু করে, কথা বলতে পারে না অনেকক্ষণ। আমরা ঠাট্টা করে জগুদার নাম দিয়েছি নার্ভাস সিস্টেম, মানে ওর নার্ভাস সিস্টেমে গোলমাল আছে।”

কথার মাঝখানে চা নিয়ে এল বগলা।

বগলার সঙ্গে আগেই বাড়িতে পা দিতে-না-দিতেই তারাপদর কথাবার্তা হয়ে গিয়েছে। তারাপদ বলেছিল, “বগলাদা আমার পেটে আগুন জ্বলছে। আমাকে তুমি লুচি আর বেগুনভাজা খাওয়াবে। কিকিরার ওইসব মুলতানি আলুর দম, খানদানি কচুরি, কিসমিসের পকৌড়া আমায় খাওয়াবে না। আমার পেটের নাড়িভুড়ি আমারই বুঝলে তো, কিকিরার নয়। প্লিজ বগলাদা, সেরেফ লুচি আর বেগুনভাজা। কিকিরাকে কিছু বোলো না। উনি যখন জানবেন, তখন জানবেন। জানলেও তো গলা কাটতে পারবেন না।”

তারাপদর কথা মতনই বগলা লুচি-বেগুনভাজা নিয়ে এসেছে। অবশ্য কিকিরা খানিকটা আগেই সেটা ধরতে পেরেছেন। বগলাকে বার্মিজ ওমলেট বানাবার পরামর্শ দিতে গিয়ে দেখেন, সে লুচির ময়দা মেখে নিয়েছে।

বগলার সঙ্গে, তারাপদর চোখাচোখি হল। মুখ টিপে হাসল বগলা। তারাপদ একবার কিকিরার দিকে চোরের মতন তাকিয়ে অপরাধীর ভঙ্গিতে হাসল একটু।

খাওয়া শুরু করার আগেই তারাপদ একটা ইনল্যান্ড লেটার কার্ড এগিয়ে দিল কিকিরাকে।

কিকিরা বললেন, “কী আছে এতে?”

“পড়ে দেখুন।”

“পড়ছি। আগে মুখে শুনি।”

তারাপদ লুচি মুখে দিল। চিবোতে চিবোতে বলল, “ক্লীং রিং হিং…”

ইনল্যান্ড চিঠিটা দেখতে দেখতে কিকিরা বললেন, “মানে?” বলে চোখ তুলে তারাপদর দিকে তাকালেন, “হিং টিং ছট?”

তারাপদ বলল, “আপনি চিঠিটা মন দিয়ে পড়ুন–আমি ততক্ষণে একটু ইট করে নিই, ভেরি হাংগরি, স্যার।”

কিকিরা চিঠি পড়তে লাগলেন।

তারাপদর সত্যিই খিদে পেয়েছিল খুব। খেতে-খেতে কিকিরার চোখ-মুখ দেখছিল। কিকিরা চিঠি পড়তে পড়তে এতই অবাক হচ্ছিলেন যে, তাঁর চোখের পলক পড়ছিল না, মুখ হাঁ হয়ে যাচ্ছিল।

বার-দুই চিঠিটা পড়ে কিকিরা তারাপদর দিকে তাকালেন। “কী ব্যাপার হে! এই শুদ্ধানন্দ প্রেসিদ্ধ কল্পবৃক্ষঃ-টি কে?” কল্পবৃক্ষঃ-এর বিসর্গটি বেশ জোরের সঙ্গে মজার গলায় উচ্চারণ করলেন। তারপর ঠাট্টা করে বললেন, “এ যে তোমার স্যাংসক্রিট ট্রি।”

খানিকটা খাওয়ার পর তারাপদর আর তাড়া ছিল না। জলও খেয়েছে আধগ্লাস মতন। কিকিরার কথায় হেসে ফেলল। তারপর ধীরেসুস্থে খেতে লাগল। বলল, “কে আমি কেমন করে জানব স্যার। উনি নিজেই বলেছেন প্রেতসিদ্ধ এবং কল্পবৃক্ষঃ।”

কিকিরা বললেন, “তা তো দেখছি। উনি আবার বিশুদ্ধ প্রেসিদ্ধ। মানে দাগমারা খাঁটি প্রেত-সিদ্ধপুরুষ। ভেজাল নয়। এরকম মহাত্মা ব্যক্তি তো আগে আমি দেখিনি, তারাপদ।…ক্লীং রিং হিং…বাঃ, এ যেন ভূতের হাতে বেল রিংগিং…ছন্দ আছে হে, বাজছে ভাল…ক্লীং রিং হিং…।”

তারাপদ বলল, “চিঠিটা স্যার আমি জগুদার কাছ থেকে কেড়েকুড়ে নিয়ে এলাম। বললাম, আমাকে দাও, আমি একজনকে জানি, যিনি ভূত-প্রেতের ব্যাপারে মাস্টার। এ টু জেড পর্যন্ত জানেন ভূতপ্রেতদের। ওঁর কাছে ভূতপ্রেতদের ডিরেক্টরি আছে–খুঁজে বার করে নেবেন নামধাম…” বলে তারাপদ হাসতে লাগল, “ঠিক বলিনি স্যার?”

কিকিরা বললেন, “দাঁড়াও, আরও একবার পড়ি চিঠিটা। তুমিও শোনো।”

কিকিরা চিঠি পড়তে শুরু করলেন

“ক্লীং রিং হিং

কাঁঠালতলা গলি
টেগোর ক্যাসেল স্ট্রিট (উঃ)
 কলিকাতা
২৯ অগ্রহায়ণ ১৩৯৫

 মহাশয়,

আমাদের পরমারাধ্য গুরু প্রেতসিদ্ধ কল্পবৃক্ষঃ শুদ্ধানন্দজির আশীর্বাদ জানিবেন। তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী এই পত্র লিখিতেছি।

গত ২০ অগ্রহায়ণ রাত্রিকালে গুরু শ্ৰদ্ধানন্দজি যখন সূক্ষ্ম শরীরে আত্মালোকে বিচরণ করিতেছিলেন তখন আপনার পরমারাধ্যা পরলোকবাসী মাতৃদেবী সুরমা দেবীর সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ ও কথোপকথন হয়। আপনার দুর্দশা বিষয়ে মাতৃদেবী সবিশেষ অবগত আছেন। তাঁহার ব্যাকুলতারও অবধি নাই। আপনি যে আর্থিক ও মানসিক কষ্ট ভোগ করিতেছেন তাহাতে তিনি অতীব কাতর। আপনার ভগ্নির বিবাহ অবশ্যই হইবে, অর্থ ও অলঙ্কারের জন্য আটকাইবে না। আপনার মাতৃদেবী তাঁহার ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অলঙ্কারগুলি গোপনে এমন স্থানে গচ্ছিত রাখিয়াছেন, যাহা আপনারা কেহই জানেন না। আকস্মিক মৃত্যু হেতু তিনিও আপনাকে কিছু জানাইয়া যাইতে পারেন নাই। এক্ষণে জানাইতে চান। প্রত্যক্ষভাবে আপনাকে জানানো সম্ভব নয়, যেহেতু তিনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রূপে আত্মালোকে বিচরণ করিতেছেন, আর আপনি মর্ত্যলোকে। যাহাই হউক, প্রেতসিদ্ধ শুদ্ধানন্দজি মারফত নিজ পুত্রকন্যার সুখ শান্তির জন্য তিনি গোপন বিষয়টি জানাইতে ইচ্ছুক। তিনি যে কী পরিমাণ ধনরত্ন রাখিয়াছেন আপনি জানেন না। এ-বিষয়ে আপনি যত শীঘ্র সব শুদ্ধানন্দজির সহিত সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ করুন।

আমাদের পরমারাধ্য গুরু শুদ্ধানন্দজি একাদশ তন্ত্রমন্ত্র সাধনায় সিদ্ধ। মাত্র চতুর্দশ বৎসর বয়েসে গৃহত্যাগ করিয়া ইষ্ট গুরু অন্বেষণ করিয়াছেন। পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র, জনপদ-শ্মশান–এই দেশের কোথায় না ভ্রমণ করিয়াছেন, কত মহাসাধন্দ্রে সংস্পর্শেই না আসিয়াছেন। দুঃখীর দুঃখ মোচন, দুর্গতজনের দুর্গতি দূর করাই তাঁহার একমাত্র ব্রত।

আপনি অবিলম্বে শুদ্ধানন্দজির সহিত সাক্ষাৎ করুন। উদ্বেগ দুশ্চিন্তা দূর হইবে। আসিবার পূর্বে পত্র দিবেন।

গুরুজির আশীবাদ লইবেন। ইতি

নিবেদক, কৃষ্ণমূর্তি।

 পুনশ্চ পত্রটি সঙ্গে আনিবেন। পত্ৰ-বিষয়ে গোপনতা অবলম্বন না করিলে আপনর শত্ৰুজন হইতে ক্ষতির আশঙ্কা।“

চিঠি পড়া শেষ হল। কিকিরা যেন হাঁফ ছাড়লেন।

 তারাপদ চা খেতে শুরু করেছিল। লুচি খাওয়ার পর্ব শেষ।

 কিকিরাও চায়ের কাপ টেনে নিলেন। বললেন, “হাতের লেখাটি বেশ। ছাপার হরফ যেন।”

“হ্যাঁ, মুক্তাক্ষর। কিন্তু কিকিরা চিঠি থেকে কী আন্দাজ হচ্ছে আপনার?”

“কী আন্দাজ করতে বলছ?”

“বাঃ, আপনি হলেন কিকিরা দি গ্রেট! ভুজঙ্গ কাপালিকের ভুতুড়ে খেলা আপনি ধরতে পেরেছিলেন, আর এ তো কোন শুদ্ধানন্দ। আপনার কাছে ছেলেমানুষ স্যার।”

কিকিরা চা খেতে-খেতে বললেন, “তোমার অফিসের বন্ধুর নাম যেন কী বললে?”

“জগন্নাথ দত্ত। আমরা জগুদা বলি।”

“মা নেই?”

“না, মা মারা গিয়েছেন বছরখানেকের ওপর। বাবা অনেক আগেই।”

“বোন আছে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। একটি মাত্র বোন। জগুদার নিজের কোনো ভাই নেই। বোনই সব।”

“বোনের বিয়ে?”

“কথাবার্তা হয় মাঝে-মাঝে, এগোতে পারে না। বিয়ে দেবার ক্ষমতা জগুদার নেই। যা মাইনে পায় দুই ভাই-বোনের চলে যায় কোনোরকমে। আমারই মতন অবস্থা, কিকিরা। আমি তবু ঝাড়া হাত-পা। একা মানুষ।”

কিকিরা হাত বাড়িয়ে চিঠিটা রেখে দিলেন, দিয়ে চুরুটের খাপ টেনে নিলেন।“কী তুমি বলছিলে তখন? সাত শরিকের বাড়ি…?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। কলকাতার সেকেলে বনেদি পরিবার একটা বাড়ি আছে তিন-চার পুরুষের। সে বাড়ির চেহারা দেখলে মনে হবে, মাথার ওপর বাড়ি পড়ো-পড়ো।”

কথাটা আর তারাপদকে শেষ করতে দিলেন না। কিকিরা বললেন, “বুঝেছি। ইট বার করা, ভাঙা, অশ্বত্থ গাছের ডালপালা গজিয়েছে ভাঙা, ফাটা দেওয়ালে। গঙ্গাজলের, ফাটাফুটো ট্যাংক, গিরগিটি, টিকটিকির আড়ত…এই তো।”

“ইয়েস স্যার।”

“কজন শরিক?”

“মুখে বলি সাত শরিক। তা জগুদা বলে চার শরিক।”

“শরিকরা তোমার জগুদারই আত্মীয় তো?”

“হ্যাঁ, খুড়তুতোর খুড়তুতো, জেঠতুতোর জেঠতুতে। ভেরি কমপ্লিকেটেড স্যার।“

“জগন্নাথের সঙ্গে সম্পর্ক নিশ্চয় ভাল নয়।”

“কেমন করে হবে। যে যার নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। অভাবী সকলেই। তাদেরও ঘাড়ে বড় বড় সংসার। ওর মধ্যে দু-একজন ধড়িবাজও আছে।”

“বুঝেছি।”

 কিছুক্ষণ চুপচাপ। কিাি একটা চুরুট ধরালেন। আঙুলের মতন সরু, লম্বায় ছোট।

তারাপদ বলল, “ব্যাপারটা পুরো চিটিংবাজি। নয় কি?”

“তা আর বলতে। তবে দেখতে হবে প্রেতসিদ্ধ কল্পবৃক্ষ শুদ্ধানন্দটি কে? কী তার মতলব? কে তাকে বলেছে জগন্নাথের মা মারা যাবার আগে বেশ কিছু গয়নাগাটি ধনরত্ন লুকিয়ে রেখে গিয়েছেন?”

“আমিও তাই বলি। এমন কে আছে যে এই কাজ করবে? কেনই-বা করবে? কিসের স্বার্থ তার? নাকি জগুদার সঙ্গে কেউ তামাশা করছে?”

কিকিরা চোখ বুজে কিছুক্ষণ চুরুট ফুকলেন। তারপর বললেন, “তোমার জগুদা কী বলছে? তামাশা?”

তারাপদ মাথা নাড়ল। বলল, “জগুদা ভীষণ ভাল, নিরীহ। ভিতু। যে যা বলে জগুদা বিশ্বাসও করে নেয়। আমি কথা বলেছি জগুদার সঙ্গে। দেখলাম মায়ের কথাটা সে বিশ্বাস করে নিয়েছে।”

কিকিরা বললেন, “কোন কথাটা? মায়ের সঙ্গে শুদ্ধানন্দর দেখা হওয়া, না গয়নাগাটি লুকিয়ে রাখা?”

“দুটোই। বলে তারাপদ চায়ের কাপ সরিয়ে রাখল। ঢেকুর তুলল বড় করে। বলল, “জগুদা খুবই মাতৃভক্ত। বাবা মারা গিয়েছেন বছর আট-নয় আগে। তখন জগুদার বয়েস কম। মাথার ওপর মা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। বোনও ছোট। কত কষ্ট সহ্য করে মা তাদের মানুষ করেছেন। জগুদা বলে, মা না থাকলে ওরা ভেসে যেত। শক্ত হাতে মা হাল ধরেছিলেন বলে ওরা বেঁচে গিয়েছে।”

কিকিরা অন্যমনস্কভাবে বললেন, “বেশ তা না হয় হল। কিন্তু মা যে যথেষ্ট সোনাদানা লুকিয়ে রেখে গিয়েছেন এ কথা কেমন করে বিশ্বাস করছে তোমার জগুদা?”

তারাপদ বলল, “আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। জগুদা বলল, ব্যাপারটা অসম্ভব নয়। মা ছিলেন হিসেবি, বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণ। ভবিষ্যতের কথা সব সময় ভাবতেন। বিশেষ করে বোনের কথা। তা ছাড়া সেকালের বনেদি বাড়ির বউ, জগুদার দাদামশাই-দিদিমাও একসময়ের পয়সাঅলা লোক। নিজের মায়ের কাছ থেকে জগুদার মা নিশ্চয় অনেক কিছু পেয়েছিলেন। জগুদারা ছেলেবেলায় মায়ের গয়নাগাটি দেখেছে।”

 “না হয় দেখল। কিন্তু তারাপদ, জগুদার মা সব সোনাদানা লুকিয়ে রাখবেন কেন?”

তারাপদ বলল, “বাড়ির অন্যদের ভয়ে। জগুদার যেসব জ্ঞাতিরা ও বাড়িতে থাকে তাদের দু-একজন পয়লা নম্বরের শয়তান। চোর, গুণ্ডা, বদমাশ। ওদের ভয়েই মা সোনাদানা লুকোতে পারেন।”

কিকিরাও চা শেষ করে চায়ের কাপ সরিয়ে রাখলেন। নিজের মনেই কিছু ভাবছিলেন। ঘর বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। শীত এখনও পড়েনি। তবে এই সন্ধের মুখে গা শিরশির ভাব হয়। উঠলেন কিকিরা। বাতি জ্বালিয়ে দিলেন ঘরের।

“তা হলে?” কিকিরা বললেন হঠাৎ।

তারাপদ বলল, “আপনি বলুন?”

“তুমি বলছ, এই প্রেতসিদ্ধ শুদ্ধানন্দ মহারাজকে একবার দেখা দরকার। তাই না?”

“রাইট স্যার।”

“তোমার জগুদা কি মহারাজের কাছে গিয়েছে?”

“না। তার যাবার ইচ্ছে। ভয়ে যেতে পারছে না।”

“চিঠিটা কতদিন হল পেয়েছে ও?”

“দিন পাঁচেক।”

“কাকে কাকে দেখিয়েছে?”

“আমাকে আর ঘোষালদাকে।“

“ঘোষালদা লোকটি কে?”

 “আমাদের সিনিয়ার। জগুদার খুব বন্ধু।”

“চিঠি দেখে কী বলল, ঘোষাল?”

“বলল, বাজে ব্যাপার, ফালতু। জগুদার সঙ্গে কেউ মজা করেছে। ভিতু মানুষ জগুদা, ভয় দেখিয়ে তামাশা করেছে।”

কিকিরা নিজের জায়গায় এসে বসলেন। মাথার চুল ঘাঁটলেন। বললেন, “তা তোমার জগুদাকে নিয়ে এলে না কেন?”

“আনতাম। ভাবলাম আপনাকে না বলে আনা কি ভাল হবে। তা ছাড়া জগুদাকৈ বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আনতে হবে। বললেই যে জগুদা আসবে মনে হয় না। ধরে আনতে হবে।”

কিকিরা বললেন, “তবে তাই নিয়ে এসো। কথা বলে দেখি। ভাল কথা, চন্দনকে কিছু বলেছ?”

“না। সময় পেলাম না। কাল-পরশু বলব।”

“ঠিক আছে।…আপাতত তুমি তোমার জগুদাকে ম্যানেজ করো। করে এখানে নিয়ে এসো। দেখি, কথা বলে দেখি। তারপর কিছু একটা করা যাবে।”