১৫. কলকাতার জেলে

১৫

কলকাতার জেলে, বন্দি কুষ্ঠ রুগিদের সীমানায় এক বছর কয়েক মাস কেটে গেল। কয়েক মাস ধরে সেই ডাক্তারটি আর আসে না। নতুন এক জন ডাক্তার আসে। নতুন ডাক্তারের কথাবার্তা ব্যবহার আলাদা। রুহিতন যদি আগের ডাক্তারের কথা জিজ্ঞেস করে, তার একটি জবাব, ‘জানি না।’ রুহিতন ভাবে, মানুষ যা কিছুকেই আজব বলুক, মানুষের থেকে আজব আর কিছু নেই সংসারে। কিন্তু সেই ডাক্তারটির আসা যখন থেকে বন্ধ হয়েছে, তখন থেকেই একটা কথা বিদ্যুৎ চমকের মতো তার বারে বারে মনে পড়ে যায়। একটা কথা না, একটা মুখ। শনিলালের জোতে কাজ করত। নাম পেরওয়া। কেন যে ওর বাপ মা পেরওয়া নাম রেখেছিল, বা আর কেউ রেখেছিল, কে জানে। পেরওয়া মানে পায়রা। ও ছিল বাগান থেকে চলে আসা ভূমিজ পরিবারের ছেলে। পেরওয়া তার খুব বন্ধু ছিল, বিশেষ করে মুক্ত এলাকা গড়ে তোলার সময় ও ছিল রুহিতনের প্রায় সবসময়ের সঙ্গী। শনিলাল ওর চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেক জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিল বলে খুব আফসোস ছিল। আর মুক্ত এলাকা যখন আক্রান্ত হয়েছিল, পেরওয়া ওদের গুলিতে প্রথম মরেছিল।

রুহিতনের চোখে যেন একরাশ ঢ্যালা মাটির মধ্যে, পেরওয়ার মুখ একটা ঝকঝকে ছুঁচের মতো চিকচিক করে উঠেছিল। মারা যাবার কয়েক মাস আগে থাকতেই পেরওয়ার হাতে মুখে লাল ডুমো ডুমো দাগ দেখা যেত। ওর নাক কান ভুরু আর মুখের চামড়ার চেহারাও যেন কেমন বদলিয়ে যাচ্ছিল। পেরওয়া অবিশ্যি দাদের মলমই মাখত। রুহিতনের তখন সে সব বিশেষ নজর করে দেখার সময় ছিল না। পেরওয়ার সঙ্গে তার প্রায়ই একসঙ্গে খাওয়া শোয়া বসা ছিল।

এখন রুহিতনের শরীরে কোথাও ক্ষত নেই। কিন্তু পায়ের আঙুল প্রায় একটাও অবশিষ্ট নেই। হাতের আঙুলগুলো অর্ধেকের ওপর খসে গিয়েছে। এ জীবনে তার শরীরে আর নখ বলে কিছু গজাবে না। নাকের সামনের উঁচু জায়গাটা একেবারে সমান হয়ে গিয়েছে। ঠোঁটের ওপরে পাতলা চামড়া ঢাকা দেওয়া দুটি ছিদ্র কেবল। হাতে পায়ে, বিশেষ করে মুখে, চোখের কোলে, গালে কপালে তার নতুন চামড়া গজিয়েছে। ঘায়ের ওপর গজানো নতুন চামড়ার মতো তা লাল দেখায়। চোখের পাতা আগের মতোই পুচ্ছহীন লাল। ভুরুতে চুল গজায়নি। মাথার চুল ফাকা, চকচক করে। দুই কানেরই লতি খসে গিয়েছে। ছেলেবেলায় মায়ের বিঁধিয়ে ফুটো করা কানে, সেই মোটা কাঠি দুটো আর নেই।

রুহিতন আজকাল নিজের হাত পায়ের দিকে তাকিয়ে পেরওয়াকে দেখতে পায়। এই কথাটা সেই ডাক্তারকে বলার খুব ইচ্ছে হয়। কিন্তু তার কোনও খবর নেই। ডাক্তার ছেলেটা তাকে কিছু বলেওনি, সে আর আসবে না। তবে আগে যেমন সে ভাবত, যার কাছ থেকে তার শরীরে এই রোগ এসেছে, তার ওপর রাগে আর ঘৃণায় জ্বলে উঠবে, তা মোটেই মনে হয় না। বরং পেরওয়াকে সে জীবনে আর কখনও দেখতে পাবে না, এই ভেবে কষ্ট হয়।

রুহিতনের ইদানীং কাশি বেড়েছে। কাশতে গিয়ে সে দুর্বল বোধ করে। এখনকার ডাক্তারটা কিছুই বিশেষ বলে না। হঠাৎ একদিন তাকে আবার জেলের বাইরে গাড়িতে তোলা হল। আগের মতোই সশস্ত্র রক্ষী দিয়ে ঘেরা। নেই শুধু সেই অফিসারটা, যে তাকে সিগারেট সাধত, আর অনেক কথা বকবক করত। রুহিতন এখন অবিশ্যি বিড়ি আর খায় না। খেলে কাশি পায়, বুকে লাগে।

জেলখানা থেকে গাড়িতে চেপে, বেশিক্ষণ রুহিতনকে চলতে হয়নি। একটা বাড়িতে ওকে নিয়ে যাওয়া হল। দেখে মনে হয়, এটা একটা হাসপাতাল। সেখানে একটা ঘরে তার বুকের ফটো তোলা হল। এরা যাকে এক্স-রে বলে। ফটো তোলার পরেই তাকে আবার জেলখানায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা হল। আর এই ঘটনার ঠিক সাত দিন পরে দুপুরের খাবার খাওয়ার কিছু পরে, জেলের এক জন অফিসার এল। কী রকমের অফিসার, কে জানে। কোনও ইউনিফর্ম তার গায়ে ছিল না। রুহিতনের মনে হল, জেলারের থেকে ছোট কেউ হবে। তার সঙ্গে এক জন ওয়ার্ডার। সাদা পোশাকের অফিসারটি এসে, ওয়ার্ডারকে দিয়ে রুহিতনের সেল খোলাল। তারপরে রুহিতনকে বলল কয়েদির পোশাক ছেড়ে, টিনের সুটকেস থেকে তার নিজের পোশাক পরে নিতে।

রুহিতন জানে, প্রশ্ন আর প্রতিবাদ বৃথা। হয়তো নতুন কোনও উপসর্গের শুরু হতে চলেছে। সে তার পায়জামা আর লাল ডোরা কাটা শার্ট পরে নিল। তার যে রবারের স্যান্ডেল ছিল, সেটা সে এখন আর পায়ে দেয় না। আঙুলহীন পায়ে স্যান্ডেল জোড়া পরা যায় না, চলাও যায় না। রুহিতন দেখল ওয়ার্ডার নিজেই তার সুটকেসটা হাতে তুলে নিল, আর বলল, ‘চলিয়ে।’

কোথায়? এ জিজ্ঞাসা নিরর্থক। কিন্তু এভাবে তার নিজের জামাকাপড় পরে, আট বছর কয়েক মাস পরে, নিজেকেই তার নিজের কাছে অচেনা লাগল। ওদের এ ব্যাপারটা বেশ অভিনব বলে মনে হল। আর নিজের পায়জামা শার্ট পরে বেরিয়ে আসতেই, বন্দি কুষ্ঠ রুগিরা সবাই তাকে হাত তুলে, নানা রকম চিৎকার আর ভাষায় বিদায় সম্ভাষণ জানাল। এ সবের মানে কী? পুরনো রুগি বন্দিরা সবাই নেই। অনেকে চলে গিয়েছে, নতুন এসেছে কিছু। কিন্তু যাই হোক, রুহিতনও ওদের দিকে হাত তুলে বিদায় নিল।

রুহিতনের হাঁটার ভঙ্গিটা এখন একেবারেই বদলিয়ে গিয়েছে। কেবল যে গুহ্যদ্বারের ওপরের হাড়ে চিড় খাওয়ার জন্য, তা না। পায়ের আঙুলগুলো না থাকায়, পায়ের সামনের অংশ বাঁকিয়ে মাটিতে চেপে চেপে চলতে হয়। তাতে তার দুই হাত অতিরিক্ত দোলে। আর খুব ধীরে, এক রকম খুঁড়িয়ে চলতে হয়।

রুহিতন সাদা পোশাকের অফিসার আর ওয়ার্ডারের সঙ্গে জেলের অফিসে এল। তাকে দেখেই জেলার লোকটি বলে উঠল, ‘খেলুবাবুরা আমাকে খুব ধরেছিল, এক বার দেখা করিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু হুকুম নেই আর। আমিই গিয়ে বলেছিলাম, রুহিতন কুরমির ছুটি হয়ে গেল। তা ছাড়া আর সময়ও হাতে বিশেষ নেই। এই যে তোমার রেলের টিকেট। থ্রি টায়ার। শুয়ে যেতে পারবে।’ বলে দুখানা টিকিটের একটা মোড়ক রুহিতনের হাতে দিতে গিয়ে জামার বুক পকেটে ঢুকিয়ে দিল। আবার বলল, ‘একটু বসো, দু-একটা টিপছাপ নিতে হবে। কিন্তু—।’ জেলার হঠাৎ থেমে গিয়ে, সাদা পোশাকের অফিসারের দিকে ফিরে অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘মিস্টার মজুমদার, রুহিতন কুরমির টিপছাপ আমি নেব কেমন করে? ওর আঙুল কোথায়?’

মিস্টার মজুমদার লোকটি টেবিলের কাছে গিয়ে অন্য খাতা দেখতে দেখতে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘যে-আঙুল আছে, তারই টিপছাপ নেবেন। এর আবার বলাবলির কী আছে? তা ছাড়া, এটা এমন কিছু একটা বড় ব্যাপার না।’

রুহিতনেব বুকের কাছে একটা কথাই বাজছিল, ছুটি। ছুটি? কোথায় যাবে রুহিতন? এ কীসের ছুটি? এই ধরনের ছুটির কথা সে কখনও ভাবেনি, চায়নি, মনে কোনও প্রস্তুতিও নেই। সাদা পোশাকের অফিসার তার কাছে এসে বলল, ‘বোসো, এই চেয়ারেই বোসো। শিয়ালদা থেকে দার্জিলিং মেল সন্ধ্যাবেলায় ছাড়ে। আমি তোমাকে শিয়ালদায় নামিয়ে দিয়ে আসব। তারপরে ওখানে টিকেটটা দেখালেই, রেলের লোকেরা তোমার জায়গা দেখিয়ে দেবে। নিউ জলপাইগুড়িতে গাড়ি দাঁড়াবে। সেখান থেকে তোমাকে বাসে চেপে বাড়ি যেতে হবে। রেল গাড়িতে অনেক অসুবিধে আছে। কিষাণগঞ্জে নেমে, গাড়ি বদলিয়ে পূর্ণিয়া থেকে গলগলিয়া হয়ে যেতে হবে। তোমার পক্ষে এতটা ওঠানামা কষ্টকর। শিলিগুড়ি থেকে বাস পেয়ে যাবে। লোককে জিজ্ঞেস করলেই হবে। বাস ভাড়া আর পথ খরচার জন্য এই টাকা তুমি রাখো।’ কথাটা বলে অফিসারও জেলারের মতো তার পকেটে কয়েকটি টাকা ঢুকিয়ে দিল।

শিলিগুড়ি থেকে বাসে? চুনীলাল মৌজায় ? তার মানে, সত্যি ছুটি! আর এ খবরটা খেলুবাবুরা পেয়েছিল বলে দেখা করতে চেয়েছিল? রুহিতনের মন আর মস্তিষ্ক কোনও কাজ করছে না। সুখ বা আনন্দ কিছুই ঠিক তানুভূতি হচ্ছে না। কেবল একটা উত্তেজনায়, তার ক্ষয়প্রাপ্ত হাত-পা যেন কাঁপছে। এ রকম একটা দিনের কথা সে কখনও ভাবেনি। এ রকম একলা একলা ছুটি, সে কখনও ভাবেনি। সমস্ত ব্যাপারটা তার কাছে কেমন অদ্ভুত লাগছে। সে যে রুহিতন কুরনি, সেই দুরন্ত বাস্তবটাই যেন মিথ্যা হয়ে উঠছে। রুহিতন কুরমির এ রকম একলা একলা ছুটি! অথচ সত্যি সত্যি তার পকেটে রেল গাড়ির টিকেট, পথের রাহা খরচা। কিন্তু সে কি সত্যি তরাইয়ের সেই জোতে যাচ্ছে? যেখানে—যেখানে মঙ্গলা ছেলেমেয়ে মা—সেই মুক্ত এলাকায়! রুহিতনের মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। অসুখের সময় তার ঘাম নির্গত হওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে হাত পা মুখ। এখন সে ঘামছে। তার ভিতরে উত্তেজনার সঠিক কেন্দ্রটা যে কোথায় সে ঠিক বুঝতে পারছে না।

১৬

থানার এলাকা ধরলে খড়িবাড়ি। রুহিতনের কাছে নিউ জলপাইগুড়ি রেল স্টেশন নতুন। সে শিলিগুড়ি স্টেশন চেনে। কিন্তু বাসে উঠতে হল নিউ জলপাইগুড়ি থেকে। আর সেখান থেকে শিলিগুড়ির ওপর দিয়ে, মাটিগাড়া চা বাগান থেকে রাস্তা পুবে বেঁকেছে। পাশে পাশে তরাইয়ের রেল লাইন। এই সব রাস্তাই চেনা, নখদর্পণে। কিন্তু শিলিগুড়ি শহরটাকে তো যেন চেনাই যায় না। আট-সাড়ে আট বছরের মধ্যে সমস্ত কিছুই এত বদলিয়ে গিয়েছে, রুহিতন বেশ খানিকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। অনেক জায়গার চেহারা সে চিনতে পারেনি। তাকে চিনতে পারেনি সারা পথের একটা মানুষও। কলকাতার শেয়ালদা স্টেশনে, গাড়ির মধ্যে রেলের এক জন লোক কাগজ হাতে তার নামটা দু বার বলেছিল। কেউ কেউ তার দিকে ফিরে তাকিয়েও দেখেছিল, আবার নির্বিকার চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিল।

রুহিতন নিউ জলপাইগুড়ি থেকে, ভিড়ের মধ্যে কোনও রকমেই বাসে উঠতে পারত না। পুব-দক্ষিণে, তার বাসস্থানের তাঞ্চলে কোন বাস যাবে, তাও সে চিনতে পারেনি। চেনা বা ওঠা, কোনওটাই তার ক্ষমতায় ছিল না। কিন্তু একেবারে অচেনা একটা লোক এসে তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, সে কোথায় যাবে? রুহিতন একটু চমকেই উঠেছিল। লোকটি চেনা না, অথচ মনে হয়েছিল, ওর জিজ্ঞাসার ভঙ্গির মধ্যে খুব একটা চেনা চেনা ভাব। সে-ই তাকে ঠিক বাসটা দেখিয়ে দিয়েছিল। টিনের সুটকেসটা তাকে ঘাড়ের ওপর চেপে ধরে রেখে চলতে হয়েছিল। মাঝে মাঝে চেষ্টা করেছিল হাতে ঝুলিয়ে নেবার। অসুবিধা ছিল খুব। মুঠি পাকিয়ে ধরার উপায় ছিল না। তবু সে আঙুলের অবশিষ্টাংশ সমেত হাতলের মধ্যে হাতটা গলিয়ে ঝুলিয়ে নিয়েছিল। বেশিক্ষণ সেইভাবে রাখতে পারেনি।

রুহিতনকে মোটর বাসের মধ্যেও কেউ চিনতে পারেনি। অবিশ্যি চেনাশোনা একটা মুখও তার চোখে পড়েনি। এ রকম হওয়ার কথা ছিল না। বাস শহর ছাড়িয়ে ভিতর দিকে ঢোকবার পরেই, সে মোটামুটি সব জায়গাগুলো চিনতে পেরেছিল। সে বাসের মধ্যে বসবার জায়গা পেয়েছিল। সুটকেসটা রাখবার জায়গাও পেয়েছিল। যেতে যেতে প্রত্যেকটি চা বাগান সে চিনতে পেরেছিল, আর ভিতরের রাস্তাগুলোও। মাটিগাড়া চা বাগানের থেকে বেশ খানিকটা পুবে, বাগডোগরা সিংগিঝোরা, কৃষ্ণপুর আর অটল চা বাগান। অটল থেকেই, রাস্তা দক্ষিণে, নকশালবাড়ির দিকে নেমেছে। নেমে, দক্ষিণ তরাইয়ের ছোট চা বাগান ছাড়িয়ে, মৌজা আর জোতের দিকে গিয়েছে। দক্ষিণ তরাইয়ের চা বাগানের কাছেই তাকে নামতে হয়েছিল। পথে আসতে আসতে একটা নতুন ব্যাপার চোখে পড়ল। ঘন ঘন পুলিশের চেক পোস্ট, ছাউনি, আর মিলিটারি ঘাঁটি। আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গিয়েছে। তার মানে কী? মুক্তাঞ্চল সম্পর্কে যে সব ব্যর্থ আর হতাশার খবর পেত, সে সবই ভয়ংকর সত্যি। কিন্তু একটা চেনা লোকও চোখে না পড়ার মানে কী? তাকে কারোর চিনে উঠতে না পারার কারণ সে জানে। সে কথা ভেবে, বুকের মধ্যে বড় নিশ্বাসে ভারী হয়ে উঠলেও, কী উপায় আছে? শুধু মুখ না, তার গোটা চেহারাটাই বদলিয়ে গিয়েছে।

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে থেকেই গোলমাল শুরু হয়েছিল, তা ঠিক না। গোলমাল গতকালের জেলখানা থেকেই। তার চিন্তা ভাবনা অনুভূতি ঠিকমতো যেন কাজ করছে না। ভিতরে কেবল একটা উত্তেজনা থরথর করছে। আর তার ফলেই, সমস্ত ব্যাপারেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। সে যখন নকশালবাড়ি পৌছল, তখন বেলা বেশ চড়ে উঠেছে। দক্ষিণ তরাই চা এস্টেটের ছোট বাগিচা ছাড়াবার পরেই, কিছু যাত্রীর মুখে রামধন মৌজার নাম শোনা গেল। আর রুহিতনের বুকের মধ্যে একটা অস্বস্তিকর উত্তেজনায় ধকধক করতে লাগল। অথচ রামধন মৌজার নাম যারা করল, তারা কেউই তার চেনা না। দক্ষিণ তরাই কোম্পানির বড় চা বাগানের পরেই নামতে হল। এখান থেকে হাঁটা পথ, জোতের ভিতর দিয়ে।

রুহিতন যেখানে নামল, সেখানকার চেহারাটাও ঠিক আগের মতো আর নেই। কিছু দোকানপাট, মানুষের ভিড় বেড়েছে। উত্তর দিকে তাকালেই আকাশের গায়ে পাহাড়। মিরিক, সুকিয়াপোখরি, দার্জিলিং, পুলবাজার। তরাইয়ের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে, পাহাড়ের ওপর পর্যন্ত চোর বাটো আছে। স্থানীয় লোকেরা অনেকে সেই পথেই চলাফেরা করে। মুক্ত এলাকার সীমানাটাও এখান থেকে কিছুটা উত্তরে। কিন্তু তার চোখে, প্রথমেই পড়ল ইউনিফর্ম পরা দুজন পুলিশের লোক। রাস্তার ধারে, মাঝখানে একটা সাইকেল রেখে তারা হেসে হেসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। নিতান্ত সাধারণ সেপাই বলে মনে হয় না, ইনস্পেক্টর হবে। তারা রুহিতনের দিকে দু-এক বার তাকাল। নির্বিকার দৃষ্টি। আশেপাশের সকলেই নির্বিকার, কেউ প্রায় তার দিকে তাকিয়ে দেখল না। কিন্তু গোটা ছবিটা যেন রুহিতনকে জানিয়ে দিচ্ছে, মুক্ত এলাকার অস্তিত্ব সত্যি আর নেই। এখানেও নিউ জলপাইগুড়ির মতো ঘটনা ঘটল। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক জন বাঙালি পান চিবোতে চিবোতে এসে তাকে জিজ্ঞেস করল, সে কোথায় যাবে? রুহিতন জায়গার নাম বলল। লোকটা তাকে খুব অবাক করে দিয়ে একটু হাসল, তারপর যেদিকে যেতে হবে, সেদিকে আঙুল দেখিয়ে সরে গেল। লোকটাকে সে কোনওকালে দেখেছে বলে মনে করতে পারল না। এখানে তাকে রাস্তা বলে দেবারও কোনও দরকার ছিল না। কে লোকটা? আর আশ্চর্য, এখানেও তার চেনা মুখ একটাও চোখে পড়ল না। কেবল এক জন বুড়োকে ছাড়া। বুড়োটি মারোয়াড়ি শেঠ দেওড়া। বড় মুদিখানার গদিতে বসে আছে। পাশেই তাদের বিরাট শস্যের আড়ত। উত্থানের সময় লোকটা পালিয়ে বেঁচেছিল। রুহিতন নিজের পথে হাঁটতে আরম্ভ করল। অনেকটা সময় তার লাগবে, কারণ খুব আস্তে আস্তে, নীচের বস্তিদেশ এগিয়ে, আঙুলহীন পায়ের পাতা চেপে তাকে হেঁটে যেতে হবে।

রুহিতন যে রাস্তা দিয়ে চলেছে, আগে এর চারপাশে বেশ জঙ্গল ছিল। এখন অনেক ফাঁকা। প্রায়ই এক-একটা নতুন বাড়ি চোখে পড়ছে। যে বাড়িগুলো ঠিক সাধারণ কৃষক মজুরের না। মালিক যে কারা, কে জানে। উঁচু কাঠের মেঝের ওপরে ঝকঝকে বাড়িগুলো দেখলেই মনে হয়, নতুন বড়লোকেরা কেউ কেউ এদিকে এসে বাস করছে। রুহিতন একলা না, আর কেউ কেউ রাস্তা দিয়ে চলেছে। তাদের দেখে খুব চেনা চেনা লাগে। কিন্তু কেউই ঠিক চেনা না। অথবা রুহিতনই কারোকে চিনতে পারছে না। কারণ, এখনও পর্যন্ত কোনও ঘটনাকেই সে বাস্তব বলে মেনে নিতে পারছে না। জেল থেকে তার ছুটি। সে রেল গাড়িতে চেপে এল, শিলিগুড়ি থেকে বাসে এসে এখন যাচ্ছে তার বাড়িতে। সে রুহিতন কুরমি। একমাত্র বোঙায় (অপদেবতা) পেলেই এ রকম কেউ মেনে নিতে পারে। অনেক কাল আগে হলে, রুহিতন হয়তো এ রকম বিশ্বাস করত। কিন্তু বাঙায় পাওয়ার বিশ্বাস অনেক কাল আগেই সে হারিয়েছে। যেমন মঙ্গলার ডাইনিতে বিশ্বাস হারিয়েছিল। মঙ্গলা !..মঙলি!

না, রুহিতন এ বাস্তবকে আর অস্বীকার করতে পারছে না, সে কলকাতার জেলখানা থেকে ছুটি পেয়ে চুনীলাল মৌজায় ফিরে এসেছে। শুধু চুনীলালে নয়, সে প্রায় তার বাড়ির কাছে এসে পড়েছে। আর মঙ্গলার কথা মনে হওয়া মাত্রই, তার ভিতরের উত্তেজনার ঝংকারটা বেড়ে উঠল। ভিতরের এই উত্তেজনার জন্যই, বাস্তব অবস্থাটাকে সে ঠিকমতো বিচার করতে পারছে না। অথচ মেনেও নিতে পারছে না যেন।

রুহিতন যতই ভিতরে ঢুকতে লাগল, বন জঙ্গলও বাড়তে লাগল। তা দেখে সে যেন স্বস্তি পেল। এই তো সেই পুরনো চেহারা। শাল, শিমুল, শিরীষ, তুণ, চিকরাসি—বড় বড় গাছের ভিড়। বনের ফাঁকে ফাঁকে চাষের জমি দেখা যাচ্ছে। চার পাশে মাটির আল তুলে, মাঝখানে ঝোরার জল ধরে রাখা। আমনের সময় এখন না। বোরোও ঠিক না, তার ঠিক আগের মৌসুম। তবু মাঠ প্রায় সবখানেই সবুজ দেখাচ্ছে। রবিশস্য উঠে গিয়েছে আগেই। মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে বড় বড় জমিতে কুমড়োর চাষ হচ্ছে। তা ছাড়া অনেক রকম ধানের কথাও আগেই শোনা গিয়েছিল। মাঠ জুড়ে হয়তো তারই চাষ হয়েছে। এমন না যে বীজধানের চারা গজিয়েছে, বা বোরাগাড়া হয়েছে মাত্র। দেখে মনে হচ্ছে ফলন্ত খেত। কিন্তু এ আবার কী? রুহিতন প্রায় থমকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তেই যাচ্ছিল। বনের ছায়ায়, অফিস বাংলোর মতো ঝকঝকে লাল বাংলো। পুলিশের পোশাকপরা এক জন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরের দিকে নতুন থানা হয়েছে নাকি? পিছনে সাইকেলের ঘণ্টি আর লোকজনের কথার স্বরে পিছন ফিরে দেখলে সেই খাকি ইউনিফর্ম পরা দুজন আসছে। তাদের সঙ্গে সেই ধুতি পাঞ্জাবি পরা, পান খাওয়া লোকটিও। এরা কি তার পিছনে পিছনেই আসছে নাকি?

রুহিতনের সন্দিগ্ধ মনে মুক্ত এলাকার কোনও আশাই এখন আর নেই। নিবিড় গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে বেলা দেখে মনে হচ্ছে, রোদ শিলিগুড়ির দিকে ঢলে পড়ছে। মেচি নদীতে কি ছায়া ঘনায়? পাহাড়ের ঠাণ্ডা বাতাস কি নেমে আসছে? পাহাড়ের মাথায় আকাশ পরিষ্কার, তবে এ সময়ে ধোয়া মোছা নীল হয় না। খানিকটা ঘস ঘসা ভাব। তবু উত্তরে দার্জিলিং-এর আকাশে প্রায়ই একটা যেন কী আবছা লাল মতো ঝকঝকিয়ে উঠছে। দূরের সেই বরফ পাহাড়ই হবে। ঝিঝির ডাক স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রুহিতন ঘামতে আরম্ভ করেছে। সে বেশ হাঁপিয়ে পড়েছে।

১৭

‘রুহিতন কুরমি না? আমি বলছি, সেই লোক।’

কথাটা কানে যেতেই রুহিতন থমকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। অনেকটা মদেশীয়া ভাষায় কথাটা কেউ বলে উঠল। এখানে নানা রকমের কথা চলে। সাঁওতাল ভূমিজ মুণ্ডা কুরমি ওঁরাও, এরা নিজেদের মধ্যে নিজেদের ভাষাতেই কথা বলে। যেমন নেপালিরা বা রাজবংশি ক্ষত্রিয়রা নিজেদের মধ্যে নিজের ভাষাতেই কথা বলে। তা ছাড়াও একটা জগাখিচুড়ি ভাষা আছে। সেই ভাষাতেই আদান-প্রদান চলে। অন্যথায় আদিবাসী বলতে যাদের বোঝায় তাদের পশ্চিমা বলা হয়। বাঙালি ছাড়া হিন্দি ভাষাভাষীদেরও পশ্চিমা বলা হয়। কেবল মারোয়াড়িদের ক্ষেত্রে, মারোয়াড়ি বা শেঠজি ইত্যাদি প্রচলিত আছে।

রুহিতন দেখল, এক জায়গায় ছোটখাটো একটি ভিড় তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কারোর চোখে কৌতূহল। কেউ অবাক। কেউ কেউ হাসছে। জায়গাটা চিনতে রুহিতনের ভুল হল না। বারোয়ারি কালী পূজার জায়গা। আগের তুলনায় চেহারাটা একটু অন্য রকম হয়েছে। গাছতলায় একটা ছোট চালাঘর হয়েছে। কিন্তু কারা এরা? লুঙ্গিপরা আর পাঞ্জাবি গায়ে গোফ দাড়িওয়ালা লোকটিকে খুবই চেনা লাগছে। আর সে-ই হাসতে হাসতে রুহিতনের দিকে এগিয়ে এল। বলল, ‘কী, চিনতে পারো? আমি কিন্তু তোমাকে ঠিক চিনতে পেরেছি। দেখে অবশ্য চেনবার উপায় নেই। আল্লার দেওয়া রোগ ব্যামো, কী আর করা যাবে।’

তার মানে, রুহিতনের আসবার খবর আগেই এখানে পৌঁছেছে! এ লোকটা কি রুকনুদ্দিন আহমেদের ভাই কাছিমুদ্দিন? রুকনুদ্দিন তো রুহিতনদের দলের হাতেই নিহত হয়েছিল। এখন রুহিতনের মনে নেই, ওর কোনও ছেলে ছিল কি না। তবে ভাই ছিল, তাকে সে চিনত। নাম কাছিমুদ্দিন। হ্যা, এই সেই লোক! মিরিকের খাসমহল থেকে দার্জিলিং-এ পালিয়ে গিয়েছিল। কাছিমুদ্দিন লেখাপড়া করা লোক, অনেক দিকে তার যোগাযোগ ছিল। পুলিশের কর্তা, বড় নেতা, ধনী বাগানের মালিক আর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার খুব ওঠা-বসা ছিল। রুনুদ্দিনের সে বিশেষ ভরসা ছিল। সে আবার বলল, ‘আমরা তোমাকে নিতে এসেছি রুহিতন। দাও দেখি বাকসোটা, এটা আর তোমাকে বইতে হবে না।’ বলে এক রকম জোর করেই রুহিতনের হাত থেকে সুটকেসটা নিয়ে পিছন ফিরে বলল, ‘এই, একজন এটা ধর তো।’

সঙ্গে সঙ্গে এক জন অল্পবয়সি খালি নেংটি পরা জোয়ান ছুটে এসে সুটকেসটা নিল। কাছিমুদ্দিন আবার বলল, ‘বলো এবার, আমাকে চিনতে পারছ কি না?’

রুহিতন এই প্রথম তার স্বর শুনে বুঝতে পারল, সে সানুনাসিকস্বরে কথা বলে। দ্বিধাভরে বলল, ‘কাছিমুদ্দিন—।’

কাছিমুদ্দিন হই হই করে চিৎকার করে উঠল, ‘ঠিকঠিক! আরে আমরা হলাম পুরনো লোক। চিনতে পারবে না?’ বলে সে এক হাত দিয়ে রুহিতনের গলা জড়িয়ে ধরল।

রুহিতনের ঘাড়টা শক্ত হয়ে উঠল। অবিশ্যি তার ঘাড়ে তেমন শক্তি নেই। কাছিমুদ্দিন তাকে গলা জড়িয়ে ধরে অভ্যর্থনা করছে? বাস্তবের এ কি সব বিপরীত কীর্তি।

আরও এক জন রুহিতনের কাছে ছুটে এসে বলল, ‘আমাকেও তা হলে চিনতে পারছ?’

অল্পবয়সি জোয়ান, হাঁটুর ওপর ধুতি আর জামা পরা। কথায় রাজবংশিদের আঞ্চলিক টান স্পষ্ট। রুহিতন চিনতে পারল না। কাছিমুদ্দিন বলে উঠল, ‘আরে এটা তো বরালাল! শনিলালের ছেলে।’

বরালাল মানে বরাহলাল! অনেক ছোট ছিল। এখন বেশ বড় হয়ে গিয়েছে। রুহিতন মনে মনে ভাবল, শনিলাল তো বেঁচে গিয়েছিল। সে এখন নিশ্চয়ই বহাল তবিয়তে আছে। কোথায় মুক্ত এলাকা আর কাদের মাঝখানে এসে পড়ল রুহিতন? কাছিমুদ্দিন পিছন ফিরে চিৎকার করে করে, হাত তুলে ডাকল, কী হল? দিল নারায়ণবাবু আসেন। আচ্ছালাল দূরে কেন? এসো হে নরসিং ছেত্রী। কিন্তু রুহিতনের ছেলে দুটো গেল কোথায়? বুধুয়া আর করমা! এই, আয় না রে, বাপের কাছে আয়।’

রুহিতনের বুকের মধ্যে এমন থরথর করতে লাগল, মনে হল, সত্যি তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। বুধুয়া আর করমা! কোথায়? গোটা ভিড়টা এবার তার দিকে এগিয়ে এল। কিন্তু তার মধ্যে বুধুয়া আর করমা কে, সে চিনে উঠতে পারছে না। ন’বছর চলছে। এত দিনের না দেখা। কত্ত বড় হয়েছে ওরা, কেমন দেখতে হয়েছে, কে জানে? ওদের তা হলে মেরে ফেলা হয়নি, এটা বোঝা যাচ্ছে। মনের খুব গভীরে এই উৎকণ্ঠা আর সন্দেহ ছিল, তার ছেলে মেয়ে বউ কেউ বেঁচে নেই, সবাইকেই হয়তো মেরে ফেলেছে। অথচ ছেলেদের জীবিত থাকার কথা শুনেও, রুহিতন যেন তেমন একটা স্বস্তি আর সুখ বোধ করতে পারছে না। কোনও ব্যাপারটাই বাস্তব বলে মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।

‘এই যে, বুধুয়া আর করমা।’ কাছিমুদ্দিন দুটি জোয়ান ছেলের হাত ধরে কাছে টেনে নিয়ে এল, বলল, ‘যা, বাপের কাছে যা।’

রুহিতন বুধুয়া আর করমার দিকে তাকাল। সে চিনতে পারছে দুজনকে। চেহারার মধ্যে দুজনেরই কিছু ফারাক ছিল। বড় হয়ে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু চিনতে পারছে। বুধুয়া মঙ্গলার চেহারা পেয়েছে, আর করমা তার। দেখলে মনে হয় করমাই বড়। বুধুয়ার থেকে ওর চেহারাটা লম্বা আর চওড়া। তবে আর যাই হোক ওরা তো কুরমি মাহাতোর ছেলে! দেখে মোটেই বোঝা যাচ্ছে না। বড়কা ছেত্রীর মতো পাতলুন পরা, হাওয়াই শার্ট গায়ে। পায়ে দুজনেরই রবারের স্যান্ডেল। দুজনের মাথায় জবজবে করে তেল লাগিয়ে আঁচড়ানো। বুধুয়ার বাঁ হাতের কবজিতে একটা ঘড়ি। ওরা দুজনেই রুহিতনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার দিকে এক পাও এগিয়ে এল না। দুজনের দৃষ্টি দেখে মনে হল, রুহিতকে ওরা চিনতে পারছে না। যেন অচেনা কোনও একটা লোককে দেখছে। আর ওদের গম্ভীর মুখে ভারী একটা অস্বস্তির ছাপ।

রুহিতন বুঝতে পারছে, ছেলেদের পক্ষে তাকে চিনে ওঠা নিশ্চয় মুশকিল হচ্ছে। স্বাভাবিক। সেই দুর্বলতা তার বুকের মধ্যে কেমন ঝোরার জলের মতো কলকলিয়ে উঠছে। বাপের প্রাণ কি এই রকম হয়? অনেক কাল পরে নিজের ছেলেদের দেখলে বুকের মধ্যে কি কলকল করে ধারা বইতে থাকে? কিন্তু ওরা তো কেমন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এগিয়ে আসার কোনও লক্ষণই নেই। সে কি নিজেই এগিয়ে গিয়ে ওদের স্পর্শ করবে?

রুহিতনের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। এত কাল বাদে, দেখাশোনা নেই, খবরাখবর নেই, কেউ এ রকম গম্ভীর আর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তার হাত ধরা যায় না। নিজের সন্তান হলেও না। তা ছাড়া ওদের মুখগুলোও কেমন শক্ত, সোজাসুজি রুহিতনের দিকে তাকাচ্ছে না। ওদের জামাকাপড় ঘড়ি ভোলভালও কেমন ভিন্ন রকমের। তবু কী আশ্চর্য রুহিতন হাসল। হেসে ছেলেদের দিকে তাকাল। তার চোখে ফুটে উঠল নীরব জিজ্ঞাসা, ‘তোদের মা কেমন আছে? বেঁচে আছে তো? আর আমার সেই অন্ধ বুড়ি মা? আর দুধি? আমার সেই রাঙা মেয়েটি ?’

‘খবর আমরা কালই পেয়ে গেছি।’ কাছিমুদ্দিন বলল, ‘তুমি ফিরে আসছ, সে খবর কালই নয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনিশপেকটার সায়েব বলেছে। তখনই ঠিক করলাম, আমরা এখান থেকে তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব।’

রুহিতন দেখল গরিব সাধারণ মানুষেরা কেউই প্রায় আসেনি। যারা এসেছে, তাদের সে চেনে না। অনেকগুলো বছর কেটে গিয়েছে সত্যি। তা বলে সময়ের কি কোনও কাণ্ডাকাণ্ড বোধ নেই? সব কিছুকেই অবাস্তব আর মিথ্যা করে তুলবে? এখনও অন্তত সেই রকমই মনে হচ্ছে। আর অদল বদল যতই হোক, রুহিতন যেন গন্ধের দ্বারা বুঝতে পারছে, এরা কেউ ঠিক তার জগতের লোক না। দিল নারায়ণ, আচ্ছালাল, নরসিং ছেত্রী এদের দেখে খানিকটা ব্যবসায়ী মহাজন বা জোতদারের মতো লাগছে।

‘চলো চলো রুহিতন, এখানে আর দেরি করার দরকার নেই।’কাছিমুদ্দিন তার হাত ধরে আস্তে টানল, বলল, ‘ঘরের দিকে চলো।’

রুহিতন তার আঙুলহীন পায়ের পাতা টিপে এগিয়ে চলল। কয়েকটা বাচ্চা ছেলে হই হই করে আগে ছুটল। দুটো কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠল।

১৮

রুহিতন তার বাবার আমলের ঘরটা দেখে থমকিয়ে দাঁড়াল। পশ্চিমের জমি একটু ঢালু ছিল। মাটি দিয়ে তা সমান করা হয়েছিল। অথচ এখন পশ্চিমেই খানিকটা হেলে পড়েছে। কোমর ভাঙা বুড়ো মানুষের মতো। কিন্তু পুবদিকের অংশে চালায় নতুন করে বিন্না ঘাস দিয়ে ছাওয়া হয়েছে। আর সেখানেই খুঁটির সঙ্গে একটি পুষ্ট গাভী বাঁধা। ভিড় দেখে সেও রুহিতনদের দিকে তাকাল। যেন মঙ্গলাই চোখ তুলে তাকাল।

‘এখানে দাঁড়ালে কেন?’ এবার নরসিং ছেত্রী মিশেল ভাষায় বলল, ‘তুমি কি ভাবছ এটা তোমাদের ঘর?’ বলে সে হাসল।

তার সঙ্গে সকলেই হেসে উঠল। রুহিতন অবাক হল। এতে হাসবার কী আছে? সে কি তার নিজের ঘরটাও চিনতে পারবে না? হ্যাঁ, একটা কঠিন অসুখ তার হয়েছিল। ঝড়ে একটা গাছ ভেঙেচুরে যে রকম চেহারা হয় অনেকটা সেই রকম তার অবস্থা। আগের মতো খসে যাওয়া ডালপালা তার নতুন করে গজাবে না। কিন্তু সে বেঁচে তো আছে। এখন তার শরীরের সব জায়গা অনুভূতিশীল, প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ঘামে। কানে একটু খাটো আছে। চোখে পুরোপুরি দেখতে পায় আগের মতোই। গলার স্বরটা খোনা মতো হয়ে গিয়েছে, কারণ মাঝখানের হাড়টা ক্ষয়ে বসে গিয়েছে। কিন্তু আগের মতো ভাঙা ফ্যাসফেসে নেই।

‘আচ্ছা, ও সেটা জানবে কী করে বলো?’ দিল নারায়ণ লোকটি বলল, ‘সব কিছু বদলে গেছে, ও তো আর জানতে পারেনি। বাড়ির সঙ্গে কোনও যোগ ছিল না, বাড়ির লোককেও জেলে গিয়ে দেখা করতে দেয়নি। যদ্দুর জানি এদের চিঠিপত্তর লেখালেখি ছিল না।’

চিঠিপত্র। সেটা মোটেই সম্ভব ছিল না। রুহিতন বা মঙ্গলা কেউ-ই কোনও ভাষায় লেখাপড়া জানে না। কাছিমুদ্দিন বলল, “শোনো রুহিতন, তোমার বাড়ি এখন এটা না, ওটা৷’ বলে পুব দিকে কাঠের পাটাতনের ওপর একটি কাঠের ঘর দেখাল।

রুহিতন অবাক হয়ে সেদিকে তাকাল। কালো আলকাতরা দিয়ে কাঠের আর মাথার টিনের গায়ে রং করা। ঘরের পাটাতনের মেঝে মোটা মোটা শালবল্লার খুঁটির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। বলতে গেলে প্রায় জোতদার মহাজনের বাড়ির মতোই। এ সব বাড়ি বন্যার জলে সহজে নষ্ট হয় না। মইয়ের মতো কাঠের সিড়ি ওপরে উঠেছে। সামনের দিকে ওপরে খানিকটা বারান্দার মতো খোলা জায়গা। প্রায় মোহন ছেত্রীর বাড়ির মতো যেখানে মুক্ত এলাকার খাদ্যভাণ্ডার ধর্মগোলা করা হয়েছিল। বাড়ির সামনে আশেপাশে ভুট্টা লাগানো হয়েছে। কয়েকজন স্ত্রীলোক সেখানে দাঁড়িয়ে এদিকেই দেখছে।

কাছিমুদ্দিনই রুহিতনের হাত ধরে বলল, ‘চলো। সরকার তোমার বউ ছেলেদের চাষের জমি দিয়েছে, নতুন বাড়িটার খরচও তারাই দিয়েছে। তোমার এ বাড়ি তো তিন বছর আগে বানের জলে ডুবে গেছল। এসো।’ সে রুহিতনকে ধরে নতুন বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

সরকার চাষের জমি দিয়েছে, নতুন বাড়ি করে দিয়েছে! রুহিতন কুরমির ছেলে বউকে? কাছিমুদ্দিন তখনও বলে চলেছে, ‘ঘটনা যাই ঘটে থাক, তুমি হলে রুহিতন কুরমি। সরকার তোমার ওপর অবিচার করতে পারে না। আগের সেই দিনকাল আর নেই, বুঝলে? তোমার মতো অনেককেই সরকার এখন জমি দেবার চেষ্টা করছে। তবে তোমার কথা আলাদা। তুমি হলে রুহিতন কুরমি। আমাদের পার্টি, সরকারি বাবুদেরও নজর রাখতে বলা হয়েছে, যেন তোমার পরিবারের কোনও ক্ষতি না হয়।’

রুহিতন নিজেই ভাবল, সে রুহিতন কুরমি। কিন্তু সে কি সেই আগের রুহিতন কুরমি আছে? তার নিজের নামটাও যেন অবান্তর লাগছে। সে সকলের সঙ্গে ভুট্টার খেতের মাঝখান দিয়ে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। গোটা ভিড়টা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। কাছিমুদ্দিনই হেঁকে বলল, ‘কই রে বুধুয়া, তোর মাকে আসতে বল। তোর বউকে নিয়ে আসতে বল।’

মেয়েদের একটা দলকে দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল। এখন সামনে তারা নেই। কাঠের সিঁড়ির পাশ দিয়েই কাঠের দেওয়াল ঢাকা। ডান দিকে কোণ নিয়েছে। সামনেই একটা বেঞ্চি পাতা। বেঞ্চির ধারে চারটে মোটা শাল খুঁটির ওপরে আর একটা ছোট ঘর। জোতদারদের ফসল রাখবার মতো। সেখানে খুঁটির গায়ে একটি সাইকেল ঠেকিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে।

‘আমার মা? সে কোথায় ?’ রুহিতন ঠিক বিশেষ কারোর দিকে না তাকিয়ে আশেপাশে দেখে, এই প্রথম একটা কথা জিজ্ঞেস করল।

শনিলালের ছেলে বাহলাল বলল, ‘সে তো অনেক দিন মারা গেছে। সেই খুনখারাপির পরের পরের বছরেই।’

খুনখারাপির বছর? বরাহলাল মুক্ত এলাকা তৈরির কথা বলছে? মনের এই জিজ্ঞাসার মধ্যেই ডান দিকে কাঠের দেওয়ালের পাশ থেকে একটি মূর্তি এগিয়ে এল। রুহিতনের বুকের ভিতর বিদ্যুতের মতো চমকিয়ে উঠল। মঙ্গলা! মঙলিই তো? কিন্তু এও কি অপদেবতার কারসাজি? ওর যেন বয়স আগের থেকে কমে গিয়েছে। সিঁথিতে কপালে মেটে সিঁদুরের দাগ আর টিপ। চুল টেনে আঁচড়ানো, খোঁপা বাঁধা। দু হাতে দুটো রুপোর মতো বালা। সত্যি রুপোর বালা নাকি? মিলের লালপাড় শাড়ি পরা। নাকেও কী একটা চিকচিক করছে। ও ঠিক ওর ছেলেদের মতোই গম্ভীর মুখে অচেনা অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। রুহিতনকে যেন চিনতে পারছে না। তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত তাকে দেখল। ওর চোখের দৃষ্টিতে যেন ভয়।

রুহিতনের ভিতরের উত্তেজনার কেন্দ্রে যেন ভূমিকম্প হল। মা মারা গিয়েছে। মঙ্গলা তার দিকে অবাক ভয়-ত্রস্ত চোখে দেখছে। সে কি কাঁদবে না, মঙ্গলার দিকে তাকিয়ে হাসবে? তার বুকের ঝোরায় কলকল করছে। মঙ্গলাও কি তার কাছে আসবে না? ওকে দেখেই যেন মনটা আরও কলকলিয়ে উঠছে। ও নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে আর একটা বিয়ে করে বসেনি?

একটি তেরো-চৌদ্দ বছরের লজ্জামুখী ডাগর চোখ মেয়ে, মঙ্গলার পাশে এসে দাঁড়াল। মঙ্গলা রুহিতনের দিকে তাকাল। তারপর মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল, ‘বুধুয়ার বউ।’

ব্যাটার বউ। রুহিতনের পুচ্ছহীন লাল চোখের পাতাগুলো ভিজে উঠেছিল। কিন্তু সে নিঃশব্দে হাসল। বুধুয়ার কিশোরী বউটি রুহিতনের দিকে এক বার তাকিয়েই আড়ালে চলে গেল। লজ্জা পেয়েছে। স্বাভাবিক। রুহিতন খোনা স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘দুধি? দুধি কোথায়?’

মঙ্গলার মুখে হাসির আভাস মাত্র নেই। বলল, ‘দু মাস হল মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বলাইঝোড়ায় থাকে, চা বাগানে।’ বলেই সে অন্যান্যদের দিকে একবার তাকিয়ে আড়ালে চলে গেল।

কাছিমুদ্দিন রুহিতনকে বেঞ্চির ওপর বসিয়ে দিয়ে বলল, ‘বসো বসো। বাড়ির লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলো। আমরা আবার পরে আসব।’ বলে সে সবাইকে হাত দিয়ে চলে যাবার ইশারা করে, কয়েকটা বাচ্চা ছেলে মেয়েকে ধমকিয়ে উঠল, ‘এই, তোরা এখানে কী দেখছিস? পালা সব পালা এখান থেকে। তারপরে চলে যাবার আগে স্বর চড়িয়ে বলে গেল, এই বুধুয়া, আমরা চললাম রে, কাল আবার আসব।’

রুহিতনের সামনে থেকে গোটা ভিড়টাই চলে গেল। আর বিকালের ছায়াও যেন নিবিড় হয়ে এল। কতগুলো ধাড়ি আর বাচ্চা মুরগি রুহিতনের পায়ের কাছে ঘোরাফেরা করতে লাগল। দু-একটা লাফিয়ে তার গায়েও উঠল। কাঠের সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে একটা কুকুর তার দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে আস্তে আস্তে ল্যাজ নাড়াল। চেহারাটা মোটামুটি সম্পন্ন গৃহস্থের। সাইকেলটা কার? বুধুয়া করমা কি এখন সাইকেলেরও মালিক? সবই সরকারের দেওয়া সাহায্য ?

মুরগিগুলোর হঠাৎ ব্যস্ততায় রুহিতন চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল, মঙ্গলা এসেছে। ওর হাতে বেতের তৈরি একটি পাত্র। সেটা হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিল। রুহিতন পাত্রটা নিয়ে দেখল, ভুট্টার খই ভরতি। এক ডালা সাদা ফুলের মতো। রুহিতন হঠাৎ টের পেল, তার ভীষণ খিদে পেয়েছে। কিন্তু দুঃসাহসী মুরগির বাচ্চাগুলো রীতিমতো লোভী। ওদের ছোট মুখে ধরবে না, তবু ভুট্টার খইয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

‘চা দেব? মঙ্গলা জিজ্ঞেস করল।

রুহিতন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হুঁ হুঁ, চা খাব। মঙলি, সবই যেন কেমন বদলে গেছে, না? তুই কেমন আছিস?’

রুহিতনের কথা শেষ হবার আগেই, মঙ্গলা মুখ ফিরিয়ে আড়ালে চলে গেল। রুহিতন লাল বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল। মঙ্গলা কোনও জবাব দিল না। যে দিক দিয়ে ও চলে গেল, সে দিকে তাকাল। অন্ধকার খুব তাড়াতাড়ি নামছে। আড়াল থেকে অস্পষ্ট কথাবার্তার স্বর ভেসে আসছে।

রুহিতন মুখ ফিরিয়ে হাত দিয়ে ভুট্টার খই তুলতে গেল। কিছু খই নীচে পড়ে গেল, কয়েকটি তার থাবায়। সে তাড়াতাড়ি মুখের মধ্যে পুরে দিল। পড়ে যাওয়া খই মুখে নিয়ে মুরগিগুলো দৌড়-ঝাঁপ লাগিয়ে দিল। দ্রুত নেমে আসা অন্ধকারের মধ্যেও সে বাড়ির চারপাশে নানা রকম সবজির বাগান দেখতে পেল। আশেপাশের গাছপালা, পুবের বাঁশঝাড়ের মালিক কি তার ছেলেরাই? সমস্ত ব্যাপারটাই এখনও তার কাছে অবাস্তব লাগছে।

অন্ধকার বেশ নিবিড় হয়ে আসছে। রুহিতন প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। সে অনুমান করতে পারছে আশেপাশে কারা চলাফেরা করছে। কিন্তু সে কারোকে দেখতে পাচ্ছে না। একটা আলো তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। দেখা গেল, মঙ্গলা এক হাতে জ্বলন্ত হ্যারিকেন, আর এক হাতে একটা অ্যালুমিনিয়ামের বড় গেলাস নিয়ে এগিয়ে এল। হ্যারিকেনটা মাটির ওপর রেখে, অ্যালুমিনিয়ামের ধূমায়িত চায়ের গেলাসটা বেঞ্চির ওপর রাখল। কাঠের সিঁড়ির কাছে সরে গিয়ে বলল, ‘বদলে তো যাবেই। সবই বদলে গেছে। তোমার সময়ে এক রকম ছিল, এখন আর এক রকম হয়েছে। আমরা যে বেঁচে আছি, সেটাই তো তাজ্জব।’

‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়েছে।’ রুহিতন খোনা স্বরে বলল, ‘আমার খুব ভয় ছিল, তোমাদের কারোকে আর কখনও হয়তো দেখতে পাব না।’

মঙ্গলা বলল, ‘তা এক রকম তাই-ই। আমাদের তো অনেকে মেরে ফেলতেই চেয়েছিল। মারাংবুরুর দয়ায় বেঁচে গেছি।’

মঙ্গলা তা হলে এখন মারাংবুরুর দয়ায় বিশ্বাস করে? ডাইনি পোড়ানোতেও কি ওর বিশ্বাস ফিরে এসেছে? সে বেতের তৈরি পাত্রটা দু হাতে মুখের সামনে তুলে, জিভ দিয়ে কিছু খই মুখের ভিতর ঢুকিয়ে নিল। আর মঙ্গলার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই, তাড়াতাড়ি মুখটা বুজিয়ে ফেলল। মঙ্গলা যেন গা ঘিনঘিনে ভয় পাওয়া চোখে দেখছিল। রুহিতন মুখের ভিতর খইগুলো চিবোতে ভুলে গেল। তারপরে একটু হাসবার চেষ্টা করে বলল, ‘মাখা নরম জিনিস না হলে, আমি হাতে তুলে খেতে পারি না। গোটা হাতটাই হয়তো খসে যেত, চিকিৎসা না হলে।’

‘জানি, জেলে তোমাকে ওরা এই ব্যানোর বিষ খাইয়েছিল।’ মঙ্গলা বলল।

রুহিতন মাথা নেড়ে বলল, ‘না না, এটা পরে আমি বুঝেছি। আমাদের পেরওয়ার কথা মনে আছে? পেরওয়ার থেকেই এই রোগ আমার শরীরে এসেছিল।’

‘পেরওয়ার থেকে?’মঙ্গলা যেন ঝংকার দিয়ে উঠল, ‘যত সব বাজে মিথ্যা কথা।’

রুহিতন অবাক আরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল, ‘মিথ্যা কথা!’

মঙ্গলা কোনও জবাব দিল না। কিন্তু ওর মুখটা অবিশ্বাসে শক্ত হয়ে উঠেছে। বলল, ‘কী হবে এ সব কথা বলে। থাক।’

রুহিতনের মনটা আহত বিষন্নতায় ভরে উঠল। সমস্ত বর্তমানটাকে মিথ্যা মনে হচ্ছে। অথচ অতি ভয়ংকর বাস্তব। সে দু হাত দিয়ে অ্যালুমিনিয়ামের গেলাসটা তুলে চায়ে চুমুক দিল। বলল, ‘ওরা—বুধুয়া করমারা সব কোথায় গেল?’

‘আছে এদিকে ওদিকে।’ মঙ্গলা বলল, ‘ওরা তো এখন বড় হয়েছে, নিজেদের মতো চলে। শিলিগুড়িতে একজন দিল্লির মন্ত্রী আসবে, ওরা তাই নিয়ে ব্যস্ত।’

রুহিতন মঙ্গলার কথাগুলোর যথার্থ অর্থ যেন বুঝতে পারল না। আসলে কথাটা তার মনের গভীরে বিদ্ধ হয়েছে। তাই সে মঙ্গলার মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। মঙ্গলা আবার বলল, ‘তাই কাছিমুদ্দিনের সঙ্গে ওরা এখন খুব ঝান্ডা নিয়ে বেড়ায়। নরসিং ছেত্রী—ও তো মোহন ছেত্রীর ভাইপো। সিকিম থেকে এখানে এসেছে সম্পত্তি দেখাশোনা করতে। বুধুয়া করমা ওরা সবাই এক দল।’

রুহিতনের মনে হল, তার বুকের ঝোরাটার কলকলানি শুকিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলার কথা সে বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তার কি কিছু করার আছে? সে যা করেছিল, তার বাপ কোনও দিন তা করেনি। তার ছেলেরাই বা নিজেদের মতো চলবে না কেন? তবু মনে হচ্ছে, জেলের থেকেও বাইরের বাস্তবতায় অসংগতি যেন অনেক বেশি।

এই সময়ে হঠাৎ বাজনার সঙ্গে গানের কলি ভেসে এল। রুহিতন মঙ্গলার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। কিন্তু জবাবে আগেই, ট্রানজিসটরের হঠাৎ মোটা ভারী স্বরেই সে ব্যাপারটা বুঝতে পারল। জেলেও মাইক লাগিয়ে অনেক সময় রেকর্ড বা রেডিয়ো শোনানো হত।।

মঙ্গলা বলল, ‘চলো তোমাকে পুরনো বাড়িতে নিয়ে যাই।’

রুহিতন ব্যাকুল উৎসাহে বলল, হঁ হঁ, চলো।’

মঙ্গলা হ্যারিকেনটা তুলে নিল। বলল, ‘চায়ের গেলাস আর বেতের ডালাটা নিতে পারবে?’

রুহিতন বুঝতে পারল না, এগুলো নিয়ে যাবার কী দরকার। তবু সে দু হাতে গেলাসটা নিয়ে বগলে চাপাল, আর বেতের পাত্রটা দু হাতে ধরে নিয়ে, মঙ্গলাকে অনুসরণ করে, তার বাবার আমলের তৈরি বাড়ির সামনে এল। সেই গাভীটা এখন আর এখানে বাঁধা নেই। রুহিতন সামনের দাওয়ায় আস্তে আস্তে উঠল। চালের দিকে তাকাল। মঙ্গলা বলল, ‘পুব দিকে ঘরের খানিকটা জায়গা ভাল আছে, সেখানেই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’

রুহিতন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কীসের ব্যবস্থা?’

মঙ্গলাও অবাক চোখেই তাকাল, ঠিক যেন সেই স্নেহময়ী গাভীটার মতোই। কিন্তু ও যেন আগের মতো আর নেই। বলল, ‘কেন, তোমার থাকবার ব্যবস্থা করেছি। একটা খাটিয়া দিয়েছি, এসো দেখবে। চালাটাও বিন্না ঘাস দিয়ে নতুন করে পুব দিকে ছেয়ে দিয়েছি। তোমার থালা বাসন জলের বালতি, সব রেখে দিয়েছি।’ বলতে বলতে ও হ্যারিকেন নিয়ে পুব দিকে এগিয়ে গেল।

রুহিতন আধো অন্ধকারে সেইদিকে তাকিয়ে রইল। মঙ্গলার কথা যেন সে বুঝতে পারছে না। তার বগলে অ্যালুমিনিয়ামের গেলাস। হাতে বেতের বোনা একটা ডালা। মঙ্গলার স্বর ভেসে এল, ‘কই এদিকে এসো।’

রুহিতন আঙুলহীন পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল। ঘরে ঢুকে দাঁড়াল। খাটিয়ার ওপর কাঁথা বালিশ রয়েছে। সে মঙ্গলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে আমি একলা থাকব? তুই থাকবি না?’

‘আমি?’মঙ্গলার ছায়াটা যেন বেড়ার গায়ে কেঁপে উঠল। ও দরজার সামনে গিয়ে বলল, ‘আমি কী করে তোমার কাছে থাকব? তুমি জেলে যে রকম ছিলে, সে রকম আলাদাই থাকবে। তোমার তো আর এখন সকলের সঙ্গে থাকা চলবে না। আমি সবসময়ে তোমার খাবার দিয়ে যাব। ‘মঙ্গলা কথাগুলো সোজাসুজি রুহিতনের দিকে তাকিয়ে বলছে না। কখনও তার পা হাত, মুখের কোনও এক পাশ, অথবা বেড়ার গায়ে ছায়াটার দিকে তাকিয়ে বলছে, ‘তোমার খাওয়া পরার কোনও দুঃখ হবে না। করমের কৃপায় আমাদের এখন সবই আছে। কালী গাইয়ের দুধ খেতে পাবে তুমি।’

কালী গাই। কে যেন গাইত, ‘কালী গাইয়ের কাজল কালো চোখ।’ রুহিতন মঙ্গলার মুখের দিকে তাকাল। জীবনে এই প্রথম মনে হল, কুরমি মাহাতোর বুক ফাটছে। কিন্তু সত্যি কি আর ফাটে? সে বলল, ‘মঙলি, আমার ব্যামো এখন আর নেই। আমি ভাল হয়ে গেছি। তোমার সঙ্গে, তোমাদের সকলের সাথেই আমি থাকতে পারি।’ তার খোনা স্বরের কথাগুলো শোনাল অনেকটা শিশুর আবদারের মতো।

মঙ্গলার মুখ অবিশ্বাস আর বিরক্তিতে শক্ত হয়ে উঠল। ওর চোখের দৃষ্টিতেও অবিশ্বাস আর খরতা। বলল, ‘সে তো তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এ সব ব্যামো কারোর হলে লোকেরা তাকে ঘরে রাখে না। ছেলেরা তো তবু তোমাকে এই পুরনো ভিটায় রাখতে রাজি হয়েছে।’

রুহিতন মঙ্গলার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, প্রাণের অটল বিশ্বাস থেকে ও কথা বলছে। রুহিতন বিশ্বাস করত গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা যায়। যারা করত, অটল বিশ্বাসেই তারা সব চুরমার করে দিয়েছিল। কিন্তু বুকের ঝোরায় একি প্রবল বেগের ধারা? মঙ্গলার দিকে তাকিয়ে সে খুঁড়িয়ে দু পা এগিয়ে এল। মঙ্গলার চোখে সাবধানী ত্রস্ততা। ও দরজার বাইরে পা রাখল। রুহিতন জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কি বাহা সামহা করেছিস নাকি?’

মঙ্গলার চোখ দুটো ঝিলিক দিয়ে উঠল। তারপরে মুখে হাত চেপে, শরীর কাঁপিয়ে হেসে উঠল। মুখের থেকে হাত সরিয়ে বলল, ‘তোমার কি সেই রকম মনে হচ্ছে, আমি আবার একটা সাঙা করেছি?’

রুহিতন সেই হাসি দেখে কোনও কথা বলতে পারল না। হ্যারিকেনের আলোয় তাকে যেন পুরোপুরি মানুষের মূর্তির মতো দেখাচ্ছে না। তার পুচ্ছহীন চোখের পাতা আরক্ত, অপলক। মঙ্গলা আবার বলল, না, সে সাধ আমার আর হয় নাই।’

মঙ্গলার এই কথার মধ্যে রুহিতনের প্রাণের কোথায় যেন একটা সুখ ও দুঃখের ঝটাপটি লেগে গেল। আর তার মাঝখান থেকে, সে যেন আশা নিরাশার সংশয়িত দোলায় বলে উঠল, ‘মঙুলি, সেই সব দিনের কথা তোর মনে আছে তো? আমাদের সেই মুক্ত স্বাধীন অঞ্চলের দিনগুলো?’

মঙ্গলার ভুরু কুঁচকে উঠল, মুখও শক্ত হল। বলল, ‘কী হবে সে সব দিনের কথা মনে রেখে? আমার এখন আর তেমন মনেও পড়ে না।’

মঙ্গলার কথা শেষ হবার আগেই, বাইরে যেন কার গলার স্বর শোনা গেল। মঙ্গলা এক বার পিছন ফিরে তাকাল। পিছনে সরে গেল কয়েক পা। ফিরে তাকাল আবার রুহিতনের দিকে। বলল, ‘আমি যাই। বুধুয়ার বউ মাংরি একলা রান্না করছে। আমি এসে তোমার ভাত দিয়ে যাব।’ বলে মঙ্গলা পিছন ফিরে অন্ধকারে মিশে গেল।

রুহিতন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। কে ডেকে নিয়ে গেল মঙ্গলাকে? কোনও পুরুষের স্বর। তার ছেলেরা কেউ? নাকি আর কেউ?…জবাব দেবার কেউ নেই। নিষ্কম্প হ্যারিকেনের আলো, স্থির ছায়া। মাথার ওপরে চালের বাতায় কোথায় ঝিঝি ডাকছে। রুহিতন পিছন ফিরে তাকাল। পশ্চিম দিকটা মুখ থুবড়িয়ে পড়েছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল, তার ছেলেবেলার দিনগুলো। বড় হওয়ার দিনগুলো। পিছনের দিকে মা থাকত। বেড়ার আড়ালে বলদ। তখন এ ঘরে অন্য গন্ধ ছিল। সে খোলা দরজার দিকে আবার তাকাল। মঙ্গলা চলে গিয়েছে। মায়ের সেই গানই তার কানে বাজতে লাগল, ‘উত্তরে উনাইল ম্যাঘ/পচ্ছিমে বরষিল গ!/ভিজি গেল গাবানি কাপড়।’….কী জীবন! কোথায় মেঘ ঘনায়, কোথায় বর্ষায়। জীবনের রঙিন কাপড়খানি কেবল ভিজে যায়।

১৯

তরাইয়ের নিশীথ রাত্রি। কত রাত কে জানে? রুহিতন ঘরের নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে খাটিয়ার ওপর শুয়েছিল। মঙ্গলা এসে তাকে ভাত তরকারি ঢেলে দিয়ে গিয়েছিল তার আলাদা পাত্রে। বলে গিয়েছিল, ‘খেয়ে নাও। দরজাটা অন্দর থেকে বন্ধ করে দিয়ো।’ যাবার আগে দরজাটা টেনে দিয়ে চলে গিয়েছিল। হুঁ, কুরমি মাহাতোর ছেলে কি কখনও ভাতের ওপর রাগ করে? কিন্তু ও হে মাহাতোর ব্যাটা, সব ভাত কি খাওয়া যায় ? সেই ক্ষুধা তার পেটে ছিল না। সে ভাত মুখে দিতে পারেনি। শুধু যেটুকু সময় মঙ্গলা ছিল, সে ওর দিকেই তাকিয়ে দেখেছিল। ওর গায়ের সেই গন্ধটা সে পায়নি। তার নাকের পাটা এখন নেই, তবু গভীর করে নিশ্বাস নিয়েছিল।

রুহিতন কিছুক্ষণ পরেই টের পেয়েছিল, ভেজানো দরজা ঠেলে একটা কুকুর ঢুকেছিল, আর জানোয়ারটা লুব্ধ অবাক-ত্রাসে, ভাত তরকারি খাচ্ছে। সে তখন একটা গল্প ভাবছিল। মঙ্গলার গল্প, অনেক দিন গল্পটা ও রুহিতনকে শুনিয়েছে। মঙ্গলার স্বরেই গল্পটা তার কানে বাজছিল, ‘তারপর…হ্যাঁ তারপরে সোয়ামি তার বউকে বলল, এই মন্ত্র-পড়া জল তুমি আমার গায়ে ছিটিয়ে দাও, আমি মস্তবড় একটা কুমির হয়ে যাব। তারপরে আবার জল ছিটিয়ে দিলে, যেমন মানুষ তেমনি হয়ে যাব।…বউ ভাবল, তাই আবার কখনও হয় নাকি? মন্ত্র পড়া জলের এত গুণ? দেখি তো। এই না বলে, ঘটি কাত করে জল নিয়ে সোয়ামির গায়ে ছিটিয়ে দিল। যেই না দেওয়া, অমনি সোয়ামি একটা বিরাট কুমির হয়ে গেল! দেখলে প্রাণ ভয়ে উড়ে যায় বউ সেই কুমির দেখে ছুটে পালাতে গেল। আর তার পা লেগে, ঘটের মন্ত্র পড়া সব জল গড়িয়ে পড়ে গেল।…

‘তারপর? আহ্ হা ! তারপর কুমিরকে আর মানুষ করা যায় না। বউ দূর থেকে ভয়ে ভয়ে তাকায়, কাছে যেতে সাহস পায় না। এমন করে দিন যায়। দিন চলে যায়। কিন্তু মানুষটা তো এখন কুমির। কত দিন সে আর না খেয়ে থাকে? দুঃখে আর খিদেয় তার চোখ দিয়ে জল পড়ল। বউ ছাই বুঝতে পারল না। কুমির তখন ঘর থেকে বেরিয়ে, উঠোন ডিঙিয়ে, বাড়ির কাছেই এক দিঘিতে গিয়ে নামল। ডুব দিয়ে অনেক মাছ খেয়ে, অনেক দিনের খিদে মেটাল।

‘বউ এসে দাঁড়িয়ে রইল দিঘির পাড়ে। কুমির আবার ভেসে উঠল। দিঘির পাড়ের কাছে এগিয়ে এসে বউয়ের দিকে তাকাল। বউ বলল, ওগো, তোমাকে আবার কেমন করে ফিরে পাব? কুমির কথা বলতে পারে না। জবাব দেবারও কিছু নেই। কারণ সেই মন্ত্র পড়া জল তো আর পাওয়া যাবে না।…

‘তারপর দিনের পরে দিন চলে যায়। বউ ঘাটে এসে বসে থাকে সোয়ামিকে দেখবে বলে। কুমির মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে। বউয়ের দিকে তাকায়, আবার গহীন জলে ডুব দেয়। এমনি করেই তাদের জীবনটা কাটল। কুমিরের বউ ঘাটে বসে থাকে, কুমির ভেসে উঠে তাকায়…।’

এইটুকুই গল্প। মঙ্গলার স্বর ঘুমে ডুবে গেল। গল্পটা বারে বারে মনে পড়ল। তারপরে গভীর রাত্রের নিকষ কালো অন্ধকারে, রুহিতন উঠে বসল। আঙুলহীন পায়ের পাতা টিপে ঘরের বাইরে এল। তরাইয়ের নিশুতি ঘুমন্ত রাত। কালো আকাশের পটে ঝিকমিক করছে নক্ষত্র। খোলা জায়গায় এসে পশ্চিমের দিকে তাকাল। শুকতারাটা দেখতে পেল না। গাছের আড়ালে চলে গিয়েছে? উত্তরের পাহাড়ে, নক্ষত্রের মতোই, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কয়েকটি আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে। সে পুবদিকে চলতে আরম্ভ করল। তার চোখের সামনে ভাসছে অধিকারী বাবার দিঘি। দিঘির উঁচু পাড়ের পুবে, মেচি নদীর দিকে আট বছর আগেও কিছু জঙ্গল ছিল। সেই জঙ্গলের এক জায়গায়, মাটির নীচে, রুহিতন শেষ সম্বল হিসাবে কিছু জিনিস রেখেছিল। এখনও কি তা আছে? দিঘির চারপাশে এখন বেশ লোকের বসতি। অধিকারী বাবার মন্দিরে সবসময়েই ভিড়। মাঘ মাসে সেখানে পূজা আর মেলা হয়। লোকের মানত করা বলির পশু ও পায়রাদের বলি দেওয়া হয় না। দিঘির পাশে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিশাল দিঘি। কালো জলের বুকে ঘন গুল্ম দেখলে নামতে ভয় করে। সেই দিঘির মাছ কেউ ধরে না।

রুহিতন হেঁটে চলেছে। অনেক দূরের পথ। ময়নাগুড়ি মৌজা। কাছ দিয়েই রেল লাইন গিয়েছে। রেলের একটা সাঁকোও আছে। রুহিতন সর্বাঙ্গ ঠেলে, দুলিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত হাঁটতে লাগল। পথ তার চেনা। মাঠের পথ, চোর বাটো।

পথের যেন শেষ হতে চায় না। রুহিতনের কানে হঠাৎ দূর থেকে কলকল শব্দ ভেসে এল। মেচি নদীর স্রোতের শব্দ। পুবের আকাশ কি ফরসা হয়ে আসছে? তা হলে বিপদ! কিন্তু ওই যে, সেই দিঘির উঁচু পাড়! এখনও গাছপালার ভিড় আছে। রুহিতন কলকল করে ঘামছে। শেষ রাত্রের বাতাসেও গা শুকোচ্ছে না। বাঁধানো ঘাটটা কোন দিকে ছিল, মনে আছে। সে তার বিপরীত দিকে এগিয়ে গেল। দিঘির উঁচু পাড়ে সোজা হয়ে ওঠা তার পক্ষে সম্ভব না। সে হামা দিয়ে উঠতে লাগল। সেই অর্জুন গাছটা কোথায় ? এতগুলো বছরের মধ্যে কেউ কেটে ফেলেনি তো? উঁচু পাড় ভাঙেনি তো?

রুহিতন তার স্থির লক্ষ্যে হামা দিয়ে এগিয়ে ওপরে উঠে আস্তে আস্তে সোজা হয়ে দাঁড়াল। পুবের আকাশ যেন কিঞ্চিৎ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। অর্জুন গাছটাকে সে দেখতে পেল। গাছটা আছে! তা হলে, হয়তো সবই আছে। সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অর্জুন গাছের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেখান থেকে দিঘির ঢালু জমির দিকে। কিন্তু শাবল, কোদাল, কিছুই তো নেই সঙ্গে? সে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল। একটা গাছের ডাল চোখে পড়ল। সেটাকে দু হাতের থাবায় চেপে ধরে, ঢালু দিকে এগিয়ে গেল। তারপরেই তার বুকের মধ্যে যেন ঢাকের বাদ্যি বেজে উঠল। আশ্চর্য! আছে আছে, সেই পাথরের চিহ্নটা আছে। বৃষ্টির জলের ধারায় মাটি কিছু ধসেছে। কিন্তু পাথরটা আছে। এই জায়গাটার কথা দিবাবু জানত।

রুহিতন পাথরটা পা দিয়ে ঠেলে, সেখানে বসল। বসতে গিয়ে, হড়কে যাচ্ছিল। শুয়ে পড়ে পতন আটকাল, তারপর দু থাবায় গাছের ডাল দিয়ে মাটি খোঁচাতে লাগল। এত শক্ত? যেন পাথর! কিন্তু তাকে থামলে চলবে না। খোঁচাতে খোঁচাতে এক সময় নরম মাটি পাওয়া গেল। নরম মাটির এক জায়গায়, একটা গর্ত বেরিয়ে পড়ল। ঝুর ঝুর করে মাটি ঝরে পড়ল। সেই মুহুর্তেই চোখে পড়ল, সেই জিনিসের একটা অংশ। রুহিতন দু হাত ঢুকিয়ে, মুখ থুবড়িয়ে পড়ে, বন্দুকের বাঁট থাবায় চেপে টানল। সহজে ওঠবার নয়। অনেকক্ষণ চেষ্টার পরে, ডবল ব্যারেল একটা বন্দুক বেরিয়ে এল। আশেপাশে ছিটকে পড়ল মাটি। একটি ছোট বাকসোও দেখা গেল!

রুহিতন বন্দুকটা দুই হাঁটুতে চেপে ধরে, বাকসোটা তুলল। মোটা পিজবোর্ডের বাকসো, হাত দিতেই খসে খসে পড়ল। তার সঙ্গে কতগুলো টোটা। থাবায় তুলে টোটার গন্ধ শুকল। মাটির সোঁদা গন্ধ, গা স্যাঁতসেঁতে। সে বন্দুকটা তুলে নিল। গাছের ফাঁক দিয়ে আবছা আলো এসে পড়েছে। দেখা গেল, কাঠের বাঁটে পোকা বা উইয়ে খাওয়া ফুটো ফুটো দাগ। দুই ব্যারেলের মুখেই মাটি জাম হয়ে রয়েছে।

রুহিতন তার ডান হাতের তর্জনীর অবশিষ্ট তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে ট্রিগারে রাখল। বুকের কাছে বাঁট চেপে, ট্রিগারে ক্ষয়প্রাপ্ত তর্জনী দিয়ে চাপ দিল। জঙ ধরার একটা শব্দ হল। কিন্তু ট্রিগার নড়ে উঠল। এই ক্ষয়প্রাপ্ত আঙুল এখনও ট্রিগার টিপতে সক্ষম! রোদ খাইয়ে শুকোলে কি আবার এ বন্দুক চালানো যাবে? টোটাগুলো কাজ করবে? ব্যারেলের মুখ থেকে মাটি বের করে দিলে, গুলি বেরোবে? সে হাঁফাচ্ছে।

রুহিতনের সর্বাঙ্গে দরদর ঘাম ঝরছে। মুখের ভিতর থেকে জিভটা বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। না, বসে থাকা সম্ভব না। বুকের মধ্যে নিশ্বাস রাখবার জায়গা নেই যেন। সে আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ল। বন্দুকটা রইল তার বুকের পাশে মাটিতে। কাত হয়ে মাথাটা রাখল জোড়া ব্যারেলের ওপর। পুচ্ছহীন লাল চোখের পাতা বুজে এল। তার মনে এখন একটি মাত্র সান্ত্বনা, সে অপমান আর অভিশপ্ত আশ্রয় থেকে নিজের যথার্থ জায়গায় ফিরে এসেছে, সে বুঝতে পারছে, গভীর ঘুম আসছে তার।

বিশাল দিঘির কালো জল বাতাসে শিহরিত হচ্ছে। ঘন গুল্মের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ এক একটি রুপোলি ঝিলিক দিচ্ছে। গভীর কালো জলের লতাগুল্মের মধ্যে সেই রুপোলি ঝিলিক ধারালো রেখায় বেঁকে উঠছে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *