॥ ৮ ॥
স্নান করে চা খেয়ে শরীরের ক্লান্তি দূর হল ঠিকই। কিন্তু মন ছটফট, বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ। ফেলুদা তদন্তে লেগে গেছে। পুরী আমাদের হতাশ করেনি।
কিন্তু সেই সঙ্গে এও মনে হচ্ছে, এতে ফেলুদার ট্যাঁকে কিছু আসবে কি? অবিশ্যি কেস তেমন জমাটি হলে রোজগার হল কি না হল সেটা ফেলুদা ভুলে যায়। অনেক সময় রোজগার যেগুলোতে হয়—মানে, যেখানে মক্কেল ঘরে এসে ফেলুদাকে তদন্তের ভার দেয়, সেখানে পকেট ভরলেও মন ভরে না, কারণ রহস্যটা হয় মামুলি। আবার এমন অনেকবার হয়েছে যে ফেলুদা শখ করে তদন্ত করেছে, পয়সা হয়তো কিছুই আসেনি, অথচ রহস্য জটিল হওয়াতে সমাধান করে মন মেজাজ মগজ সব একসঙ্গে চাঙিয়ে উঠেছে।
‘কাকে সাসপেক্ট করছ, তপেশ?’ আটটা নাগাত প্রশ্ন করলেন লালমোহনবাবু। উনি এতক্ষণ হাত দুটোকে পিছনে জড়ো করে আমাদের ঘরে পায়চারি করেছেন।
আমি বললাম, ‘চুরি করার সুযোগ সবচেয়ে বেশি নিশীথবাবুর, কিন্তু সেইজন্যেই উনি করবেন বলে মনে হয় না। এ ছাড়া হিঙ্গোরানির তো লোভ ছিলই ওই পুঁথির ওপর। বিলাস মজুমদারও টাকা আর প্রতিশোধের জন্য করতে পারেন। তারপর লক্ষ্মণ ভট—’
‘না না না,’ ভীষণভাবে প্রতিবাদ করে উঠলেন লালমোহনবাবু। ‘এমন একজন লোককে এর মধ্যে টেনো না—প্লিজ। কী অলৌকিক ক্ষমতা ভেবে দেখো তো ভদ্রলোকের।’
‘আপনার কী মনে হয়?’ আমি পালটা প্রশ্ন করলাম।
‘আমার মনে হয় তুমি আসল লোকটাকেই বাদ দিয়ে গেলে।’
‘কে?’
‘সেন মশাই হিমসেলফ্।’
‘সে কী? উনি নিজের জিনিস চুরি করতে যাবেন কেন?’
‘চুরি নয়, চুরি নয়, পাচার। চোরাই মাল পাচার করলেন অ্যাদ্দিনে। হিঙ্গোরানি হাইয়ার প্রাইস অফার করেছেন, আর উনি বেচে দিয়েছেন। লোককে বলছেন চুরি।’
আমি ভেবে দেখছিলাম লালমোহনবাবুর কথা ঠিক হতে পারে কি না, এমন সময় রুম বয় এসে খবর দিল যে, আমার টেলিফোন আছে। ফেলুদা।
রুদ্ধশ্বাসে নীচে গিয়ে ফোন ধরলাম।
‘কী ব্যাপার?’
‘শ্যামলালবাবু বলেছেন?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু কিছু বুঝতে পারলে?’
‘নিশীথবাবু হাওয়া।’
‘তাই বুঝি? পুলিশে খবর দিল কে?’
‘সে সব গিয়ে বলব। আমি আধ ঘণ্টার মধ্যেই ফিরছি। ভুবনেশ্বর কেমন লাগল?’
‘ভাল। ইয়ে—’
ফেলুদা ফোন রেখে দিয়েছে।
লালমোহনবাবুকে বললাম। ভদ্রলোক মাথা চুলকে বললেন, ‘সিন অফ ক্রাইমে একবার গিয়ে পড়তে পারলে ভালই হত, তবে তোমার দাদা বোধহয় চাইছেন না।’
আরও এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যখন ফেলুদা এল না, তখন সত্যিই চিন্তা হতে শুরু করল। রুম-বয়কে বলে আরেক দফা চা আনিয়ে নিলাম। দুজনে পালা করে পায়চারি করছি। ইতিমধ্যে একটা অন্যায় কাজ করে ফেলেছি, কিন্তু না করে পারলাম না। ফেলুদার খাতাটা খাটের উপরই ছিল, তাতে আজ দুপুরে ও কী লিখেছে সেটা দেখে ফেলেছি, যদিও মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝিনি। ওর ধনী ব্যবসায়ী মক্কেল হরিহর জরিওয়ালার দেওয়া ‘ক্রস’ মার্কা ডট পেনে একটা পাতায় ছড়িয়ে লেখা রয়েছে—
ডায়াবিড?—গাউট—সাপ?—কী ফিরে আসবে? ছেলেকে চেনে না কেন?—কালোডাক? কাকে? কেন?—লাঠি হাতে কে হাঁটে?…
নটা নাগাত ধৈর্য ফুরিয়ে গেল। যা থাকে কপালে বলে দুজন বেরিয়ে পড়লাম। সাগরিকা থেকে ফিরতে হলে ফেলুদা সমুদ্রের ধার দিয়ে শর্টকাটই নেবে। আমরা তাই হোটেল থেকে বেরিয়ে ডাইনেই ঘুরলাম।
কালও রাত্রে রেলওয়ে হোটেল থেকে সমুদ্রের ধার ধরে ফিরবার সময় মনে হয়েছে, দিনে আর রাতে কত তফাত। ঢেউ-এর গর্জন যেমন দিনে তেমনি রাত্তিরেও চলে, কিন্তু রাত্রে সমস্ত ব্যাপারটা আবছা অন্ধকারে ঘটে বলে গা ছমছম করে অনেক বেশি। প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেয়াল। জলের ফসফরাস না থাকলে এমন মেঘলা রাত্তিরে কি ঢেউগুলো দেখা যেত?
দূরে বাঁয়ে আকাশটা যে ফিকে হয়ে আছে, সেটা শহরের আলোর জন্য। সামনে দূরের টিমটিমে আলোর বিন্দুগুলো নিশ্চয় নুলিয়া বস্তির।
আমরা দুজনে যতটা পারা যায় জল দূরে রেখে বাঁদিক ধরে চলতে লাগলাম। ঢেউয়ের ফেনা আমাদের বিশ-পঁচিশ হাত দূর অবধি গড়িয়ে এসে থেমে যাচ্ছে। লালমোহনবাবুর সঙ্গে টর্চ আছে, কিন্তু অপ্রয়োজনে সেটা ব্যবহার করার কোনও মানে হয় না।
আজ সারাদিন বৃষ্টি না হওয়ায় বালি শুকনো কিন্তু তাও পা বসে যায়। এ বালি দিঘার মতো জমাট নয় যে প্লেন ল্যান্ড করবে। লালমোহনবাবু কেড্স পরেছেন, আর আমি চপ্পল। এই চপ্পলেই হঠাৎ জানি কীসের সঙ্গে ঠোক্কর খেলাম, আর খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখ থুবড়ে বালিতে। লালমোহনবাবুও ‘কী হল, কী হল’ করে এগিয়ে এসে কীসে জানি বাধা পেয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ে দুবার ‘হেলপ্ হেলপ্’ বলে বিকট চিৎকার করে উঠলেন। আমি ধরা গলায় বললাম, ‘আমার পেটের নীচে দুটো ঠ্যাং।’
‘বলো কী!’
আমরা দুজনেই কোনওরকমে উঠে পড়েছি, লালমোহনবাবু টর্চটা জ্বালাতে চেষ্টা করে পারছেন না বলে সেটার পিছনে থাবড়া মারছেন।
একটা গোঙানির শব্দ, আর তারপর একটা মানুষের শরীর বালি থেকে উঠে বসল। চোখে যত না দেখছি, তার চেয়ে বেশি আন্দাজে বুঝছি।
‘হাতটা দে—’
ফেলুদা!
আমি ডান হাতটা বাড়ালাম। ফেলুদা সেটা ধরে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ আমার পিঠে হাত রেখে টলল।
টর্চ জ্বলেছে। লালমোহনবাবু কাঁপা হাতে আলোটা ফেলুদার মুখে ফেললেন। ফেলুদা নিজের ডান হাতটা সাবধানে মাথার উপর রেখে যন্ত্রণায় মুখটা বিকৃত করে হাতটা নামিয়ে নিল।
টর্চের আলোতে দেখলাম হাতের তেলোয় রক্ত।
‘ফে ফ্-ফেটে গেছে?’ ফাটা গলায় প্রশ্ন করলেন জটায়ু।
কিন্তু ফেলুদার চোখে ভ্রূকুটি। —‘কী রকম হল?’
ফেলুদাকে এত হতভম্ব হতে দেখিনি কখনও। ও নিজের পকেট থেকে ছোট্ট টর্চটা বার করে এদিক ওদিক ফেলল। এক জোড়া জুতো পরা পায়ের ছাপ ফেলুদা যেখানে পড়েছিল তার পাশ থেকে চলে গেছে উঁচু পাড়টার দিকে, যেখানে বালি শেষ হয়ে গেছে।
আমরা এগিয়ে গেলাম পায়ের ছাপ ধরে। পাড় এখানে বুক অবধি উঁচু। উপরে ঘাস আর ঝোপড়া। কাছাকাছির মধ্যে বাড়ি-টাড়ি নেই। যেখানে লোকটা ওপরে উঠে গেছে, সেখানে বালিতে কিছু ঘাসের চাবড়া পড়ে থাকতে দেখে বুঝলাম, লোকটাকে বেশ কসরত করে উঠতে হয়েছে।
ফেলুদা হোটেলমুখো ঘুরল, আমরা তার পিছনে।
‘আপনি কতক্ষণ এই ভাবে পড়ে ছিলেন বলুন তো?’ লালমোহনবাবুর গলার স্বর এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ফেলুদা রিস্টওয়াচের ওপর টর্চ ফেলে বলল, ‘প্রায় আধ ঘণ্টা।’
‘মাথায় তো স্টিচ দিতে হবে মনে হচ্ছে।’
‘না,’ বলল ফেলুদা। —‘আমার মাথায় শুধু বাড়ি লেগেছে, জখম হয়নি।’
‘তা হলে রক্ত—?’
ফেলুদা কোনও জবাব দিল না।
